৫৫. ডেথ ভ্যালি

চ্যাপ্টার

‘ডেভিড কোহেন, তুমি কি করে এতটা নিশ্চিত যে আহমদ মুসা নেই?’ জিজ্ঞাসা শ্যামসন শিমন আলেকজান্ডারের।
‘স্যার, যত জায়গায় খোঁজ নেয়া যায় সব জায়গায় খোঁজ নিয়েছি। সে কোথাও নেই।’ বলল ডেভিড কোহেন ক্যানিংহাম। এই ক্যানিংহামই এইচ থ্রি ও ফোম-এর প্রধানরূপে কাজ করছে। আর শিমন আলেকজান্ডার এইচ থ্রি ও ফোম-এর আসল নেতা। সে গডফাদার ও চেয়ারম্যান।
‘যেমন?’ বলল শিমন আলেকজান্ডার।
‘যেমন স্যার, আমরা প্রেসিডেন্টের অফিস, প্রেসিডেন্টের টেলিফোন সার্বক্ষণিক মনিটর করছি। আহমদ মুসা আসলে প্রেসিডেন্টের অফিস অবশ্যই জানবে। বিশেষ করে টেলিফোনে যোগাযোগ অবশ্যই হবে আহমদ মুসার সাথে প্রেসিডেন্টের। আহমদ মুসার সবচেয়ে যোগাযোগের যেটা নির্ভরযোগ্য জায়গা সেটা এফবিআই প্রধান জর্জ আব্রাহাম জনসনের বাড়ি এবং অফিস দুই স্থানেই আমরা লোক রেখেছি। তারা সার্বক্ষণিক মনিটরিং করে যাচ্ছে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, আহমদ মুসার বাসার প্রতি মুহূর্তের খবর আমরা নিচ্ছি। কোথাও আহমদ মুসা যোগাযোগ করেনি। কিংবা এ পক্ষরাও যোগাযোগ করে কোন হদিস পায়নি আহমদ মুসার। আহমদ মুসা ও আব্রাহাম জনসন এই দুই বাড়িতেই বিষাদের ছায়া। এটাও একটা বড় প্রমাণ যে, আহমদ মুসার কোন খবর তারা পায়নি। পেন্টাগনেও আমাদের লোক আছে। সেখানেও কোন খবর নেই।’ বলল ডেভিড কোহেন ক্যানিংহাম।
‘বিদেশের, বিশেষ করে মিডল ইস্টের দেশগুলোকে আমেরিকা কি বলছে, সেটা কি যোগাড় করতে পেরেছ? এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। মিডল ইস্টকে মানে বিশেষ করে সৌদি আরবকে আমাদের সরকার সত্যিকার খবর না জানিয়ে পারবে না।’ শিমন আলেকজান্ডার বলল।
‘পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আমাদের লোকেরা প্রতিদিনের খোঁজ নিচ্ছে। এমনকি যেসব মেসেজ সৌদি আরবে মার্কিন সরকার পাঠিয়েছে সেসবের কপি আমরা যোগাড় করেছি। সেসব মেসেজে এক কথাই বার বার বলা হয়েছে যে, আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা করছি আহমদ মুসাকে উদ্ধারের জন্যে।
তার কোন ক্ষতি হবে না। শীঘ্রই আমরা তাকে পাব আশা করছি।’
‘ব্রাভো! ব্রাভো! তাহলে নিশ্চিত আহমদ মুসাকে তারা পায়নি। পেলে তা সৌদি আরবের কাছে গোপন করত না। এর অর্থ হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন সাংঘাতিক চাপের মধ্যে আছে।’ শিমন আলেকজান্ডার বলল।
‘আমিও তাই মনে করি স্যার, আহমদ মুসাকে ওরা পায়নি। সাংঘাতিক চাপের মধ্যে ওরা এখন।’ বলল ডেভিড কোহেন ক্যানিংহাম।
‘আমাদেরও চাপ দেবার এটাই সময়। আহমদ মুসা নেই, সুতরাং আর কোন চিন্তা নেই। আহমদ মুসাকে দিয়ে যা করতে চেয়েছিলাম তা হলো না। আমাদেরকে এখন অন্য পথ নিতে হবে। সেটা হলো আলটিমেটাম।’ থামল শিমন আলেকজান্ডার।
শিমন আলেকজান্ডার থামতেই ডেভিড কোহেন ক্যানিংহাম বলল, ‘আলটিমেটাম? কি বিষয়ে আলটিমেটাম?’
‘কেন আমরা’ এখন আলটিমেটাম দিতে পারি, এটা বিশ্বাস হচ্ছে না? ভালো করে শোন, মার্কিন সরকারকে তিনটি শর্ত দিয়ে আলটিমেটাম দিতে হবে। এক. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যে ‘ম্যাগনেটিভ ডেথ ওয়েভ’ তৈরি করেছে, এটা জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে প্রকাশ করতে হবে এবং বিশ্বকে জানিয়ে জনসমক্ষে তা ধ্বংস করতে হবে। অথবা দুই. ‘MDW-এর সেন্ট্রিফিউজ কিংপিন আমাদের দিতে হবে। অথবা তিন, উক্ত দু’টি শর্তের কোন একটিও না মানলে আমরা আমাদের নিজস্ব পথ ধরব। শর্তগুলোর যেকোনো একটি গ্রহণের জন্য তিন দিনের আলটিমেটাম দেয়া হবে। বুঝেছ গোটা বিষয় ডেভিড কোহেন?’ বলল শিমন আলেকজান্ডার।
‘বুঝেছি স্যার। খুব চমৎকার। এই আলটিমেটাম ওদের দারুণ বিপদে ফেলে দেবে, যা থেকে বের হবার পথ তারা পাবে না। কিন্তু স্যার, ওরা প্রথম দু’টি শর্ত যদি মেনে না নেয় তাহলে আমরা নিজের পথে চলব বলেছি। তার অর্থ পরোক্ষভাবে আমরা হুমকি দিয়েছি যে, আমরা তাহলে আমাদের কাজ শুরু করব। সেটা কি?’ ডেভিড কোহেন ক্যানিংহাম বলল।
‘এটা কি জিজ্ঞাসা করার বিষয়। তিন দিন পার হওয়ার পর মুহূর্তেই আমরা চূড়ান্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করব। আমেরিকার সকল অস্ত্রাগার, সকল সাইলোর অস্ত্র ধ্বংস হয়ে যাবে। আমেরিকা পরিণত হবে ঢাল-তলোয়া-রহীন সরকারে। এই সময় আমাদের লবি সক্রিয় হয়ে উঠবে সরকারে, কংগ্রেসে, সিনেটে, বিভিন্ন স্টেটের গণ-সমিতিগুলোতে। এক দিনের মধ্যেই সরকারের পতন ঘটবে। আর আমরা তখন ক্ষমতায় আসীন হবো। এরপর গোটা দুনিয়া জয় করতে আমাদের বেগ পেতে হবে না।’ বলল শিমন আলেকজান্ডার।
‘ঈশ্বর আমাদের সহায় হোন। কিন্তু স্যার, হঠাৎ যদি তারা আহমদ মুসাকে পেয়ে যায়?’ ডেভিড কোহেন ক্যানিংহাম বলল।
‘খবরদার, এসব অলক্ষুণে কথা বলবে না। এতদিন যখন আহমদ মুসার সন্ধান মেলেনি। আর মিলবেও না।’
আহমদ মুসা চুপ করে বসে থাকার লোক নয়। আর আমাদের যে ইনফরমেশন তার কাছে আছে, তাতে আমেরিকান সরকারের সাথে দেখা করতে কালবিলম্ব করার কথা নয় তার। তা যখন করেনি, তখন নিশ্চিত সে আর বেঁচে নেই। আর আজে-বাজে চিন্তা না করে শোন, আলটিমেটাম ড্রাফট করে আমাকে পড়ে শোনাও।’
‘স্যার, ওটা আমি এখনই করছি। আর একটা বিষয় স্যার। আপনি তো বাইরে, তাহলে এদিকের লবি-ওয়ার্ক কিভাবে, কতখানি হচ্ছে, সেটা একটা প্রশ্ন?’ ডেভিড কোহেন বলল।
‘রাজনৈতিক ফ্রন্টের কথা তোমাকে চিন্তা করতে হবে না। আমাদের লবি কাজ শুরু করে দিয়েছে। আলটিমেটামের রেজাল্ট দেখার পর যখন আমাদের MFW অ্যাকশনে আসবে, তখন সেই ঝড়ো মুহূর্তে ঝড়ের মত আমাদের লবির লোকেরা বেরিয়ে আসবে। আমি রাখছি। তুমি আলটিমেটামের ড্রাফট তৈরি কর। রাখলাম। বাই।’ বলল শিমন আলেকজান্ডার।

জর্জ আব্রাহাম জনসন নির্দিষ্ট জায়গায় অসময়ে দাউদ ইব্রাহিমকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বিস্মিত হলো। এ সময় তো তার আসার কথা নয়। কেন আসল। আব্রাহাম জনসন তার বিশ্বস্ত পারসোনাল এ্যাটেনডেন্টকে পাঠাল দাউদ ইব্রাহিমকে ডেকে আনার জন্য।
দাউদ ইব্রাহিম এল।
আব্রাহাম জনসন কিছুটা বিরক্ত, কিছুটা উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলল, ‘কি ব্যাপার দাউদ? কোন বিশেষ খবর? আমাদের সব কথা তাকে বলেছ?’
‘স্যার, আহমদ মুসাকে আমি আর পাইনি। তাঁর কথা অনুসারে সেই গাছের তলায় আমার তাঁর সাথে দেখা হবার কথা, কিন্তু সে সময় তিনি সেখানে ছিলেন না। পাথরের তলায় যে মেসেজ রাখা ছিল, সে মেসেজও ঐভাবেই ছিল। তিনি তা নেননি। তার মানে গতকাল সারাদিন তিনি সেই গাছতলায় আসেননি। কোনও মতে রাত কাটিয়ে সকালেই ওখানে ছুটে গিয়েছি। আসার সময় আবারও দেখেছি সেই গাছের তলায়, সেই পাথরের তলায় রাখা মেসেজটা সেভাবেই রয়ে গেছে।’ বলল দাউদ ইব্রাহিম।
দাউদের কথা শুনে আব্রাহাম জনসনের মুখের ঔজ্জ্বল্য যেন দপ করে নিভে গেল। রাজ্যের চিন্তা এসে যেন ঝাঁপিয়ে পড়ল তার মনে। মুহূর্ত কয়েক কথা বলতে পারল না। পরে বলল, কোথাও গিয়ে কাজে আটকে গেছে হয়তো। এ না হলে কথার খেলাফ সে করত না।’
‘সেটা হলে তো ভালো।’ বলল দাউদ ইব্রাহিম।
‘আমরা সকলে সেটাই আশা করি।’ জর্জ আব্রাহাম জনসন বলল।
কথা বলল বটে জর্জ আব্রাহাম জনসন। কিন্তু নিজের কথায় নিজেই ভরসা পেল না। তার আয়ত্তাধীন হলে তো আহমদ মুসা কথার খেলাফ কখনো করার কথা নয়। কি হল তার? শেষ মুহূর্তে শত্রুর হাতে পড়ল না তো! এই কথা ভাবতে গিয়ে মন কেঁপে উঠল জর্জ আব্রাহাম জনসনের। আলটিমেটামের সময় মাত্র তিন দিন। এর মধ্যে যদি ওদের কিছু না করা যায় তাহলে তো সর্বনাশ হবে। এই সময় আহমদ মুসাকে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। আর এ সময়ই সে আবার নিখোঁজ! যে পরিস্থিতি তাতে এই মুহূর্তেই জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠক আহবান করা দরকার। এই খবর সবাইকে জানানো দরকার। চিন্তা করতে গিয়ে আনমনা হয়ে পড়েছিল জর্জ আব্রাহাম জনসন।
‘স্যার, এখন আমি কি করব?’ বলল দাউদ ইব্রাহিম জর্জ আব্রাহাম জনসনের উদ্দেশ্যে।
জর্জ আব্রাহাম জনসন মনোযোগ দিল দাউদ ইব্রাহিমের দিকে। গাম্ভীর্য নেমে এল তার চোখে-মুখে। বলল, ‘দাউদ ইব্রাহিম, আহমদ মুসাকে পেতেই হবে। তুমি চলে যাও। সেই গাছের আশেপাশে কোথাও লুকিয়ে থাক। দেখ আহমদ মুসা আসে কি না। তাকে পেলেই বলবে আলটিমেটামের কথা। আর তোমাকে একটা যন্ত্র দিচ্ছি। ছোট্ট যন্ত্র। আহমদ মুসার যে দেখা পেয়েছ, সেটা আমাকে সংগে সংগে জানাতে পারবে এই যন্ত্রের মাধ্যমে। এর বোতামে চাপ দিলে ঠিক এই ডেথ ভ্যালির উপর আকাশে আমাদের একটা যোগাযোগের উপগ্রহ আছে সেটাতে সংকেত পৌছবে, সে সংকেত উপগ্রহ রিলে করবে আমার কাছে। ঐ সংকেত পেলেই আমি বুঝব আহমদ মুসার দেখা পাওয়া গেছে।’ বলল জর্জ আব্রহাম জনসন।
‘কিন্তু স্যার, আহমদ মুসা স্যার বলেছেন ডেথ ভ্যালির এলাকা থেকে কোনই ইলেট্রনিক ওয়েভ বাইরে বেরুতে পারে না।’ দাউদ ইব্রাহিম বলল।
‘তাঁর কথা ঠিক। কিন্তু সেটা হোরাইজন্টাল ওয়েভ। কৌন হোরাইজন্টাল ওয়েভই ডেথ ভ্যালির অঞ্চলের বাইরে যেতে পারে না। কিন্তু ভার্টিক্যাল ওয়েভের উপর ম্যাগনেটিক শক্তির কোন কার্যকারিতা নেই। পরীক্ষা করেই আমরা এ ব্যবস্থা করেছি। তোমার কাজ শেষ হলে যন্ত্রটা আহমদ মুসাকে দিয়ে দেবে। আর দেখা হবার পর তাকে ছদ্মবেশে ডেথ ভ্যালির পূর্ব-দক্ষিণ গোড়ায় জংগলে ঢাকা ছোট একটা সাঁকো আছে, সেখানে তাকে নিয়ে আসবে সিগন্যাল পাঠাবার এক ঘন্টার মধ্যে। তোমাকে যে কথাগুলো বললাম, তা মনে রেখ। দেরি করো না, তুমি যাও।’
চলে গেল দাউদ ইব্রাহিম।
জর্জ আব্রাহাম জনসন ফিরে আসতে আসতেই ভাবল জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠক এখনি ডাকতে হবে। সব বিষয় ব্রিফ করে সমাধানের পথ বের করা দরকার।

বেলা এগারোটা বাজার দু’মিনিট আগেই জর্জ আব্রাহাম জনসন আপতকালীন ম্যানেজমেন্ট কক্ষে প্রবেশ করল। ঢুকে দেখল, সেনাবাহিনী প্রধান, বিমানবাহিনী প্রধান, নৌবাহিনী প্রধান, সেনা’ গোয়েন্দা প্রধান, সিআইএ প্রধান এবং প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা উপদেষ্টা আগেই এসে গেছে।
জর্জ আব্রাহাম জনসন ঢুকতেই প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা উপদেষ্টা বলে উঠল ‘মি. জনসন, মাত্র ১২ ঘন্টার মধ্যে আবার ডাকলেন। মিটিং-এর কথা শোনার পর থেকে আমি স্বাভাবিক হতে পারছি না।’
‘একই অবস্থা সকলের। মিটিং-এর ডাক শুনেই মনে হয়েছে বড় কিছু ঘটেছে।’ বলল সিআইএ প্রধান।
সময় তখন ঠিক ১১টা। সেনাগোয়েন্দা প্রধান কিছু বলতে যাচ্ছিল। এ সময় প্রেসিডেন্ট প্যাসেজের দরজা খুলে গেল। দরজায় এসে দাঁড়াল প্রেসিডেন্ট। সবাইকে শুভ সকাল জানিয়ে প্রেসিডেন্ট কক্ষে প্রবেশ করে নিজের চেয়ারে বসল।
সবাই উঠে দাঁড়িয়েছিল। প্রেসিডেন্ট বসার পর তারা বসল।
প্রেসিডেন্ট সবার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ভদ্র মহোদয়গণ, দেশ আজ ক্রাইসিসে। ১২ ঘণ্টা আগে যে আলটিমেটাম নিয়ে আলোচনা করেছিলাম, সেটা আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে।’
বলে থামল প্রেসিডেন্ট মুহূর্তের জন্যে। তাকাল প্রেসিডেন্ট জর্জ আব্রাহাম জনসনের দিকে। বলল, ‘মি. আব্রাহাম জনসন, নতুন যে ক্রাইসিস সৃষ্টি হয়েছে সে সম্পর্কে সবাইকে ব্রিফ করুন।’
‘এক্সিলেন্সি মি. প্রেসিডেন্ট এবং সম্মানিত সহকর্মীবৃন্দ, আলটিমেটাম সম্পর্কিত সব ঘটনা আপনারা জানেন। একটা নতুন পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটেছে। আহমদ মুসা প্রেরিত লোকের মাধ্যমে আলটিমেটামের একটা কপি পাঠিয়েছিলাম তার কাছে। তার সাথে কিছু জিজ্ঞাসা ও পরামর্শ। কিন্তু এসব কিছুই আহমদ মুসার হাতে পৌঁছেনি। আহমদ মুসার লোকটি মানে দাউদ ইব্রাহিমের সাথে দেখা করা এবং লিখিত কাগজের মাধ্যমে খবর দেয়া-নেয়ার যে ব্যবস্থা আহমদ মুসা করেছিল, সেটা ফেল করেছে। নির্দিষ্ট স্থানটিতেই আহমদ মুসা আর আসেনি। আহমদ মুসার সাথে সংযোগ এভাবে বিচ্ছিন্ন হবার পর আমরা নতুন সংকটে পড়েছি। আহমদ মুসাকে খোঁজার মত সময়ও আমাদের হাতে নেই। আলটিমেটামের একদিন অতিবাহিত হচ্ছে। আমাদের কি করণীয় এজন্যেই এই বৈঠকের আহবান।’ বলে থামল জর্জ আব্রাহাম জনসন।
সবাই তাকিয়েছিল জর্জ আব্রাহাম জনসনের দিকে। সবারই চোখে-মুখে চিন্তা ও উদ্বেগের ছাপ। সবাই নীরব।
অনেকের দৃষ্টি প্রেসিডেন্টের দিকে। প্রেসিডেন্টই কথা বলল আব্রাহাম জনসনকে উদ্দেশ্য করে, ‘আপনি কি ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন?’
‘আহমদ মুসার সেই লোকটিকে আবার সেই স্থানে ফেরত পাঠিয়েছি। নিরাপদ কোন স্থানে লুকিয়ে থেকে সেই স্থানটির উপর চোখ রাখতে বলেছি। আহমদ মুসা কোন কারণে গতকাল না আসতে পারলে আজ অবশ্যই আসবে। যদি আসে তাহলে তাকে ছদ্মবেশে ডেথ ভ্যালি পাহাড়ের গোড়ায় একটা নির্দিষ্ট স্থানে আনতে বলেছি। তার সাথে সরাসরি কথা হওয়া প্রয়োজন।’ বলল জর্জ আব্রাহাম জনসন।
‘ধন্যবাদ জর্জ। এই অবস্থায় এটাই বেস্ট সিদ্ধান্ত হয়েছে। ঈশ্বর করুন আহমদ মুসা যদি আজ আসে তাহলে তার সাথে আপনার সরাসরি সাক্ষাৎ হওয়া অবশ্যই প্রয়োজন। তাকে বলার বিষয়ও আছে, তার কাছ থেকে শোনার বিষয়ও আছে।’ বলল প্রেসিডেন্ট।
‘ইয়েস এক্সিলেন্সি।’ জর্জ আব্রাহাম জনসন বলল।
‘ঈশ্বর না করুন আহমদ মুসা আজ যদি না আসে, তাহলে আমাদের কর্মপন্থা কি হবে?’ বলল সিআইএ প্রধান।
‘আল্টিমেটামকে আমরা কিভাবে ফেস করতে পারি? আগেও বলেছি, প্রথমে আগাম আক্রমণ করে ওদের MFW ধ্বংস করা, দুই. ওদের ঘাঁটি গোটাটাই উড়িয়ে দেয়া, তিন, ওদের দ্বিতীয় দাবি মেনে নিয়ে কিছু সময় হাতে নেয়ার ব্যবস্থা করা। এর মধ্যে প্রথমটি অনিশ্চিত আহমদ মুসাকে না পাওয়া পর্যন্ত। দ্বিতীয়টি আরও অনিশ্চিত। ওদের সব ঘাঁটির সন্ধান আমাদের জানা নেই। অতএব তৃতীয় পন্থাই আমাদের জন্যে একমাত্র গ্রহণীয় অপশন হতে পারে।’ প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা উপদেষ্টা বলল।
‘এক্সিলেন্সি, শেষ বক্তব্য সম্পর্কে আমি কিছু বলতে চাই। দ্বিতীয় অপশন গ্রহণ করার অর্থ হলো একটি সন্ত্রাসী শক্তির হাতে গোটা দুনিয়াকে ক্রিপলকারী শক্তি তুলে দেয়া। যার শিকার আমেরিকাও হতে পারে। সুতরাং কোনমতেই আমরা শত্রুদের এই শর্ত গ্রহণ করতে পারি না।’ বলল সেনাপ্রধান।
‘সেনাপ্রধানের কথা ঠিক। কিন্তু সমস্যা হলো, সন্ত্রাসীদের প্রথম অপশন আমরা গ্রহণ করতে পারছি না। কারণ আগাম আক্রমণ চালিয়ে ওদের আক্রমণকারী অস্ত্র MFW আমরা ধ্বংস করতে পারছি না। ঐ অস্ত্র যেমন আমাদের নেই, তেমনি ঐ অস্ত্র ধ্বংস করার টেকনোলজিও আমাদের কাছে নেই। আমরা তাহলে কি শেষ অপশন গ্রহণ করে আমাদের আমেরিকাকে ওদের আক্রমণের হাতে তুলে দেব। তা আমরা দিতে পারি না। তবে শেষ অপশনের কোন টাইম লিমিট নেই। এটা আমাদেরকে কিছু সময় দিতে পারে।’ বলল সিআইএ প্রধান।
‘টাইম লিমিট না থাকার অর্থ এও হতে পারে যে, আলটিমেটাম শেষ হওয়ার পরবর্তী মুহূর্ত আক্রমণের সময় হতে পারে। মন্দটাই ধরে নেয়া উচিত।’ বলল প্রেসিডেন্ট।
‘ঠিক এক্সিলেন্সি। তাহলে এই মুহূর্তে আমাদের করণীয় কি, এটাই তো ঠিক করা করা যাচ্ছে না।’ বলল সিআইএ প্রধানই।
‘সন্ত্রাসীদের তিনটি অপশনের মধ্যে কোনটিই গ্রহণযোগ্য নয়। আমেরিকা ওয়ার্ল্ড পাওয়ার। সে যেমন নিজের দেশকে, তেমনি দুনিয়ার স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিতে পারে না। আগাম আক্রমণের কথাই আমাদের ভাবা দরকার।’ বলল সেনাপ্রধান।
‘ধন্যবাদ। এটাই গ্রহণীয় অপশন। এটার উপরই আমরা ওয়ার্ক করছি। কিন্তু আহমদ মুসার সাথে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় আমরা সমস্যায় পড়েছি।’ বলল জর্জ আব্রাহাম জনসন।
‘কিন্তু আহমদ মুসাকে পাওয়া না গেলে কি করণীয়। সেটাই এখন আমরা ভাবছি।’ বলল প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা উপদেষ্টা।
‘সন্ত্রাসীদের MFW-এর উপর আমাদের কোন অস্ত্রেরই আক্রমণ কার্যকরী নয়। আহমদ মুসার প্ল্যানটাই এ পরিস্থিতির জন্যে উপযুক্ত। অলক্ষ্যে ওদের ঘাঁটিতে প্রবেশ করতে হবে এবং মূল অস্ত্র ধ্বংস করে ওদের MFW-কে অকার্যকর করে দিতে হবে।’ বলল জর্জ আব্রাহাম জনসন।
‘আহমদ মুসাকে যদি না পাওয়া যায়, তাহলে আমাদের গোয়েন্দাদের কাউকে কিংবা কয়েকজনকে দিয়ে এ কাজ করার উদ্যোগ নেয়া যায় কি না?’ প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা উপদেষ্টা বলল।
‘না, সেটা সম্ভব নয়। ভালো করতে গিয়ে খারাপ হতে পারে।
সামান্য সন্দেহ করলেই তারা তাদের ধ্বংসলীলা শুরু করে দিতে পারে। ওদেরকে আহমদ মুসা জানে, সুতরাং একমাত্র আহমদ মুসাই এই ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্ব নিতে পারে।’ সিআইএ প্রধান বলল।
‘কিন্তু তাকেই তো পাওয়া যাচ্ছে না?’ উত্তরে বলল প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা প্রধান।
‘একটু সময় আমরা দেখতে পারি। আলটিমেটামের আজ প্রথম দিন। আরও দু’দিন বাকি। ঈশ্বর আমাদের সাহায্য করবেন।’ বলল প্রেসিডেন্ট।
কথা শেষ করেই প্রেসিডেন্ট তাকাল জর্জ আব্রাহাম জনসনের দিকে।
বলল, ‘মি. জর্জ, আপনি দাউদের বিষয়টার দিকে মনোযোগ দিন। কোন সিগন্যাল…’
‘এক্সকিউজ মি এক্সিলেন্সি, একটা সিগন্যাল এসেছে।’ এটা বলে জর্জ আব্রাহাম জনসন হাতঘড়িটা চোখের সামনে নিয়ে এল।
প্রেসিডেন্ট থেমে গিয়েছিল।
হাতঘড়ির উপর চোখ পড়তেই ডেট কেবিনে নীল আলোর সংকেত দেখতে পেল।
চোখ-মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল জর্জ আব্রাহাম জনসনের। বলল, ‘ঈশ্বরকে ধন্যবাদ এক্সিলেন্সি, দাউদ ইব্রাহিম আহমদ মুসাকে পেয়েছে।
সে সংকেত পাঠিয়েছে।’
‘ধন্যবাদ ঈশ্বরকে। তাহলে মি. জর্জ, আপনাকেই পরবর্তী প্রোগ্রামের জন্য কাজ শুরু করতে হবে।’ বলল প্রেসিডেন্ট।
‘ইয়েস এক্সিলেন্সি। আমি সেটাই ভাবছি।’
‘ধন্যবাদ মি. জর্জ।’
বলেই প্রেসিডেন্ট সবার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আপনারা সবাই শুনলেন, আহমদ মুসার ওখান থেকে রেসপন্স পাওয়া গেছে। আমরা মনে করছি, আলটিমেটাম সংক্রান্ত আমাদের মেসেজ সে পেয়েছে। তার চিন্তা, তার প্রোগ্রাম আমাদের কাছে অস্পষ্ট। তবে মি. জর্জের সাথে তার দেখা হচ্ছে। মি. জর্জ ফেরার পর আবার আমরা রাতে বসব। এখন আমরা উঠতে পারি।’
‘ঈশ্বরকে ধন্যবাদ। ধন্যবাদ মি. এক্সিলেন্সি প্রেসিডেন্ট। আমরা আশা করছি মি. জর্জের মিশন সফল হোক। আমরা রাতে ভালো খবরের প্রত্যাশা করব।’ সেনাবাহিনী প্রধান বলল।
‘ধন্যবাদ সকলকে। ঈশ্বর আমাদের সহায় হোন।’
বলে প্রেসিডেন্ট উঠে দাঁড়াল। উঠে দাঁড়াল সকলেই।
প্রেসিডেন্ট চলে গেল।

রবার্ট রবিনসনরা চলে যাবার পর আহমদ মুসা বাড়ির সুড়ঙ্গ পথ দিয়ে ডেথ ভ্যালিতে বেরিয়ে এল।
সুড়ঙ্গ পথটা খুব দীর্ঘ নয়। কিন্তু যে স্থানটিতে এসে সুড়ঙ্গ পথ শেষ হয়েছে, সেই স্থানটা থেকে অল্প গেলেই ডেথ ভ্যালির উত্তর প্রান্তে পৌঁছা যায়।
আহমদ মুসা পাহাড়ের একটা আড়াল থেকে হেঁটে ডেথ ভ্যালির উত্তর পাশে গিয়ে পৌঁছল।
আহমদ মুসা আজ ডেথ ভ্যালিতে এসেছেই তার অ্যাকসিডেন্টের জায়গাটা দেখার জন্যে। আহমদ মুসা অবাক হয়েছে পাহাড়ের গায়ের পাথর এভাবে স্লিপ কাটে না সাধারণত। বিশেষ করে আহমদ মুসা যে পাথরে পা রেখে সামনের আরেক পাথরে যাবার চেষ্টা করেছিল, সে পাথরটিকে তার নিচের বড় একটি পাথরে শক্তভাবে আটকে আছে দেখেই আহমদ মুসা তার উপর পা রেখেছিল। কিন্তু পাথরটা ওভাবে সরে গেল কেন?
আহমদ মুসা অ্যাকসিডেন্টের স্থানে যখন পৌঁছল, তখন বেলা ৮টা। মার্কিন পরিবেশ অনুযায়ী এটা খুবই সকাল।
সকালটাই বেছে নিয়েছে আহমদ মুসা। কারণ অন্তত এ সময় এ অঞ্চলে কোন মানুষ আসার কথা নয়। প্রথমত এটা ব্রেকফাস্টের সময়। ছাগল ইত্যাদি চরাতে আসার সময় এটা নয়। ডেথ ভ্যালি সংশ্লিষ্ট লোকও এ অঞ্চলে এখন আসবে না। কারণ বরিসদের সাথে আলোচনা করে আহমদ মুসা বুঝেছে, তারা রাতকেই বেছে নিয়েছে ডেথ ভ্যালিতে তাদের আসা-যাওয়ার জন্যে। তারা ডেথ ভ্যালিতে তাদের ঘাঁটি গড়ার সময়ও রাতের সময়টাকেই তারা ব্যবহার করেছে বেশি। সুতরাং ডেথ ভ্যালির এ অঞ্চলে আসার জন্যে দিন বিশেষ করে সকালের এই সময়টাই উত্তম।
অ্যাকসিডেন্টের জায়গায় এসে দাঁড়াল আহমদ মুসা। যে পাথরটার উপর তার পা দেয়া পাথর দাঁড়িয়েছিল, সে পাথরের উপরটা প্রায় মসৃণ বলা যায়। ভালো করে দেখে আরও বুঝল যে, এই মসৃণতাটা প্রাকৃতিক নয়, কেউ মসৃণ করেছে।
পাথরটার পাশে বসল আহমদ মুসা। কেউ মসৃণ করেছে কি না সেটাই আহমদ মুসা আরও ভালোভাবে দেখে নিশ্চিত হতে চেয়েছিল।
বসার পর পাথরের উপরের তলটা আরও পরিষ্কারভাবে নজরে এল আহমদ মুসার।
দেখতে গিয়ে এক জায়গায় হঠাৎ আহমদ মুসার চোখ আটকে গেল হিব্রু দু’টি শব্দের উপর। পাথরের রঙের কালি দিয়ে লেখা। খুব ভালো করে চোখ না ফেললে লেখাটা দেখাই যায় না।
হিব্রু দু’টি শব্দ আহমদ মুসাকে বিস্ময় ও আনন্দে আচ্ছন্ন করে ফেলল। এইচ থ্রি ও FOAM-এর যাদেরকে আহমদ মুসা দেখেছে, চিনেছে তারা সবাই ‘জু’ অর্থাৎ জায়োনিস্ট। ওরা, এই হিব্রু শব্দ এবং ডেথ ভ্যালি একসাথে মিলে যাচ্ছে। ওদেরই লেখা হবে এই হিব্রু শব্দ। কেন লিখেছে? এবং একটা পাথরের আড়ালে কেন রেখেছে? এর সাথে ডেথ ভ্যালির কি কোন প্রকার সম্পর্ক আছে? শব্দ দু’টি কি বলছে?
বেশ কষ্ট করে অনেকটা ক্যালিওগ্রাফির মত প্যাঁচানো অক্ষরে লেখা শব্দের পাঠোদ্ধার করতে পারল আহমদ মুসা।
উপরের শব্দটার অর্থ রংধনু, নিচের শব্দটার অর্থ হলো ‘টাংগ অব বেল’ অর্থাৎ বেল বা ঘন্টার ভেতরে ঝুলন্ত ধাতব খণ্ড যা দুলে দুলে ঘণ্টাকে বাজায়।
পাথরের গায়ে এই শব্দ দু’টো লেখার তাৎপর্য কি? নিশ্চয় কিছু বলার জন্যে কিংবা কিছু ইংগিত করার জন্যে এই শব্দ দু’টি লেখা হয়েছে। কিন্তু কি সেটা? রংধনু ও টাংগ অব বেল দিয়ে কি বুঝাতে চাওয়া হয়েছে?
বিষয় দু’টি নিয়ে আহমদ মুসা অনেক চিন্তা করল। রংধনু তো আকাশের প্রাকৃতিক একটা প্রতিচ্ছবি। এখানে রংধনু কোথেকে আসবে। আর রংধনুর পরের বিষয় হলো টাংগ অব বেল।
এই পাহাড়ে কিংবা পাহাড়ের এই রংধনু ধরনের কিছু আছে? রংধনু শব্দ দিয়ে তাকেই কি ইংগিত করা হয়েছে? আহমদ মুসা এ পাশের খাড়া পাহাড়ের গোটাটার উপর নজর বুলাল, না তেমন কিছুই চোখে পড়ল না।
পাহাড়ের এই উত্তর পাশের একটা মজার বৈশিষ্ট্য হলো, বড় বড় পাহাড়-পর্বতের যেমন স্লোলাইন থাকে, তেমনি এই পাহাড়ের ট্রি লাইন আছে। এই লাইনের উপরে কোন গাছ-গাছড়া নেই, একদম নিরেট পাথুরে পাহাড়। আর ট্রি লাইনের নিচে ক্রিকের পানির ধার পর্যন্ত গাছ-গাছড়ার বিস্তৃতি।
আহমদ মুসা যেখানে দাঁড়িয়ে আছে সেখান থেকে পাহাড়ের এই ধারকে ভালোভাবে দেখা যাচ্ছে না। হয় টপ, না হয় বটম থেকে দেখলে আকার যেভাবে নজরে আসে, পাশ থেকে দেখলে তা আসে না। টপে উঠা অসম্ভব, তবে বটমে নামা যেতে পারে।
বটমেই নামল আহমদ মুসা। একটা উঁচু পাথরের উপর দাঁড়িয়ে আহমদ মুসা নজর ফেলল পাহাড়ের গোটা এ পাশটার উপর। ভালো করে তাকাতেই আহমদ মুসা দেখতে পেল রংধনুটা। পাহাড়ের গায়ে ওক গাছের অবস্থান বিক্ষিপ্ত হলেও মূল সারিটার অবস্থা রংধনুর মতই লাগে, কোনভাবে ওক গাছের মূল কনসেনট্রেশন রংধনুর ধনুকের মত বাঁকা হয়ে পাহাড়ের গোটা এ পাশটা কভার করেছে।
রংধনু পাওয়া গেল। কিন্তু টাংগ অব বেল কোথায়? ওটার অর্থ কি? ‘রংধনু যদি ওক গাছের বাঁকা সারিকে ধরা হয়ে থাকে, তাহলে বেলের টাংগ মানে ঘণ্টা এবং তার ঝুলন্ত দণ্ড বলা হয়েছে কাকে?
ভাবল আহমদ মুসা অনেক। এক সময় তার মনে হলো, রংধনুর নিচেই টাংগ অব বেল শব্দ লিখা হয়েছে কেন? রংধনুর সাথে ঘণ্টা ও ঘণ্টাদণ্ডের কোন সম্পর্ক আছে কি? কি সেই সম্পর্ক? বেল বা ঘণ্টা বৃত্তাকার বা অর্ধবৃত্তাকার কাঠামোতে ঝুলানো থাকে। অর্ধবৃত্তাকার হলেই সেটা রংধনুর আকারের হয়। ওক গাছের যে অর্ধবৃত্তাকার রংধনু দেখা যাচ্ছে, সেখানে কি তাহলে ঘণ্টা ও ঘণ্টাদণ্ড পাওয়া যাবে? সেটা কি? কোথায় পাওয়া যাবে?
নতুন করে তাকাল আহমদ মুসা ওক গাছের বাঁকানো অর্ধবৃত্তের দিকে। ঘণ্টা তো টাঙানো থাকে বৃত্ত বা অর্ধবৃত্তের শীর্ষ পয়েন্ট থেকে। তাহলে ওক গাছের বাঁকানো অর্ধবৃত্তের ঠিক মধ্য-পয়েন্টের নিচে ঘণ্টা খোঁজ করতে হবে।
রংধনুর তাৎপর্য বুঝা গেল, কিন্তু ঘণ্টাদণ্ড দ্বারা কি বুঝানো হয়েছে? আহমদ মুসার হাতঘড়ি বিপবিপ সিগন্যাল দিয়ে উঠল।
আহমদ মুসা তাকাল ঘড়ির দিকে। সকাল দশটা বাজে। ১০টার সময় তো দাউদের আসার কথা সেই ওক গাছের তলায়। গতকাল যাওয়া হয়নি। মেসেজ ছিল কি না তাও দেখা হয়নি। আজ ঠিক সময়ে সেখানে যাওয়া দরকার। সাক্ষাৎ হওয়া দরকার দাউদ ইব্রাহিমের সাথে। এখনি যাত্রা শুরু করা দরকার।
আহমদ মুসা দ্রুত পাথরটা থেকে নামল। পাহাড় বেয়ে আবার যাত্রা শুরু করল।
আহমদ মুসাকে পেয়ে আকাশের চাঁদ হাতে পেয়েছে দাউদ ইব্রাহিম।
এ পর্যন্ত তার মনে জমে থাকা সব কথা গড়গড় করে বলে গেল সে।
সবশেষে বলল, ‘আপনার উপর ওরা সাংঘাতিকভাবে নির্ভর করেন। এফবিআই প্রধান বললেন যে, আপনার সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় খোদ প্রেসিডেন্টও ভেঙে পড়েছেন।’
‘রাখ তোমার এসব কথা, মানুষের সব ভরসা আল্লাহর উপর। মানুষকে তিনি যতটুকু ক্ষমতা দেন, মানুষ ততটুকুই করতে পারে।’ বলল আহমদ মুসা।
একটু থামল। ভাবনার চিহ্ন ফুটে উঠল তার চোখে-মুখে। আবার কথা বলা শুরু করল আহমদ মুসা, ‘তিন দিনের আলটিমেটামটা খুব সাংঘাতিক। তিন শর্তের কোনটাই মানা যায় না। প্রথম দু’টি তো মানার প্রশ্নই উঠে না। আর তৃতীয়টি হলো, শত্রুর গোপন আক্রমণের মুখোমুখি হওয়া, যে আক্রমণ প্রতিরোধের কোন উপায় নেই এবং আক্রমণের যে ধ্বংসলীলা, তা সহ্য করার ক্ষমতা আমেরিকার নেই।’
‘আমেরিকা তো জগতের একটা শ্রেষ্ঠ শক্তি, তাহলে আক্রমণ প্রতিরোধ করতে পারবে না কেন?’ দাউদ ইব্রাহিম বলল।
‘ঐ গোপন অস্ত্রের প্রতিরোধ করার কোন অস্ত্র আবিষ্কার এখনো দুনিয়াতে হয়নি। এই গোপন অস্ত্রটা সেই অস্ত্র, যার কথা তোমাদের বলেছি। ওটা ম্যাগনেটিক ফায়ার ওয়েভ। এই অস্ত্র মুহূর্তেই সব ধরনের ধাতব অস্ত্র নিমেষে ধ্বংস করে ফেলতে পারে। এটা ম্যাগনেটিক অশরীরী আগুন। এই আগুন রোধ করার কোন উপায় এখনো আবিষ্কার হয়নি।’
কেঁপে উঠল দাউদ ইব্রাহিম। তার উজ্জ্বল সাদা মুখটা পাংশু হয়ে গেল। বলল, ‘ইন্নালিল্লাহ, আমি বুঝতেই পারিনি ব্যাপারটা। আমাদের আমেরিকা মানে বিশ্বশক্তি তাহলে তো আজ ধ্বংসের মুখোমুখি। এখন কি হবে? কিভাবে গোপন শয়তানী শক্তির হাত থেকে রক্ষা পাবে আমেরিকা?’
‘বল আল্লাহু আকবর! আল্লাহ সর্বশক্তিমান। তিনি কি ফেরাউনকে ধ্বংস করেননি, বাঁচাননি কি মুসা আ.-কে? বাঁচাননি ইব্রাহিম আ.-কে?
আল্লাহকে ডাক।’ বলল আহমদ মুসা।
‘কিন্তু আল্লাহ তো বাঁচিয়েছেন মহানবী স.-কে, ইব্রাহিম আ.-কে। কিন্তু আমাদের আমেরিকা তো তা নয়।’ দাউদ ইব্রাহিম বলল।
‘মনে রেখ, আল্লাহর সাহায্য বন্ধ হয়ে যায়নি। আল্লাহ যাকে চান, যাদেরকে চান বাঁচান। কে তাকে মানল কিংবা মানল না তা তিনি দেখেন না। এজন্যেই তাঁর এক নাম রহমান।’
বলেই আহমদ মুসা একটু থেমে আবার বলল, ‘তুমি বললে এফবিআই প্রধান জর্জ আব্রাহাম জনসন আমার সাথে দেখা করতে চান। সেটা কখন?’ বলল আহমদ মুসা।
‘স্যার, সময় এসে গেছে। আমি তাঁকে সিগন্যাল পাঠিয়েছি। সিগন্যাল পাঠাবার এক ঘণ্টার মধ্যে মিটিং প্লেসে আমাদের পৌছা দরকার।’ দাউদ ইব্রাহিম বলল।
‘জায়গাটা কোথায়?’ বলল আহমদ মুসা।
‘ডেথ ভ্যালি পাহাড়ের দক্ষিণ-পূর্ব গোড়ায় জংগলে ঢাকা একটা সেতু আছে, ঐখানে।’ দাউদ ইব্রাহিম বলল।
‘ভালো জায়গা।’ বলল আহমদ মুসা
‘জায়গাটা চিনেন স্যার?’ দাউদ ইব্রাহিম বলল।
‘জানি। নিরাপদ জায়গা। চল।’ বলল আহমদ মুসা।
দাউদ ইব্রাহিম ব্যাগ থেকে কাউবয়ের পোশাক বের করে বলল, ‘এফবিআই প্রধান আপনাকে ছদ্মবেশে যেতে বলেছেন।’
আহমদ মুসা হেসে পোশাক নিয়ে নিল।
আহমদ মুসারা সেই স্থানে পৌছার আগেই জর্জ আব্রাহাম জনসন সেখানে পৌছে গিয়েছিল।
আহমদ মুসা একজন কাউবয়ের পোশাকে থাকলেও চিনতে পেরেছে জর্জ আব্রাহাম জনসন। কয়েক ধাপ এগিয়ে জড়িয়ে ধরল আহমদ মুসাকে। বলল, ‘তুমি আমাদের সাংঘাতিক দুশ্চিন্তায় ফেলে দিয়েছিলে।
কোথায় গিয়েছিলে? কোন বিপদে পড়নি তো?’
‘বলছি জনাব।’ আহমদ মুসা বলল।
এফবিআই প্রধান জর্জ আব্রাহাম জনসন আহমদ মুসাকে ছেড়ে দিয়ে তার পাশে দাঁড়াল।
ঠিক এই সময় একসাথে কয়েকটি রিভলবার গর্জন করে উঠল।
জর্জ আব্রাহাম জনসন মাথা তুলে পেছন দিকে একবার তাকাল। একটু হাসল। আহমদ মুসার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কি ঘটল আহমদ মুসা?’
আহমদ মুসাও হাসল। বলল, ‘এফবিআই-এর চারটি রিভলবার গুলি ছুঁড়েছে চার টার্গেট লক্ষ্য করে। সম্ভবত ঐ চারজন আপনাকে ফলো করে এখানে এসেছে।’
‘বুঝলে কি করে গুলি এফবিআই-এর লোকদের রিভলবারের?’ বলল জর্জ জনসন।
‘এফবিআই লোকরা যখন একসাথে গুলি ছোঁড়ে, তা একসাথে হয় না। গুলি চেইন আকারে চলে। একটা গুলিকে আরেকটা ফলো করে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘এটাও তোমার জানা আছে দেখছি? আহমদ মুসা তোমাকে ধন্যবাদ।’
বলেই পেছন দিকে তাকাল। বলল, ‘ওরা আসছে আহমদ মুসা। এস শুনি, তোমার কথা ঠিক কি না।’
আহমদ মুসা একটু সরে দাঁড়াল। এফবিআই-এর একজন জর্জ আব্রাহামকে স্যালুট দিল।
‘যাদের শিকার করলে ওরা কারা?’ বলল জর্জ আব্রাহাম।
‘স্যার, ওরা আপনাকে ফলো করে এসেছে। আমরা লুকিয়ে থেকে আপনাকে ফলো করে আসা লোকদের মার্ক করি। আমরা দেখলাম, যখনই আহমদ মুসা স্যার ওদের নজরে পড়েছে। সংগে সংগেই ওরা চারজনই পকেট থেকে এক ধরনের অয়‍্যারলেস বের করে প্রথমে কল করতে যাচ্ছিল। সেই সাথে রিভলবারও বের করেছিল। স্যার, কল ঠেকাবার জন্যে ওদের সংগে সংগেই হত্যা করা ছাড়া অন্য কোন বিকল্প ছিল না।’ আফিসারটি বলল।
‘হ্যাঁ, কল ও গুলি একসাথেই ঠেকিয়েছ তোমরা। ধন্যবাদ।’ বলল জর্জ আব্রাহাম জনসন।
‘অফিসার, যারা ফলো করেছিল, তাদের সংখ্যা চারজনই তো?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।
‘ওরা চারজনই। ওরা প্রেসিডেন্ট ভবন থেকেই স্যারকে ফলো করেছে। এটা আমরা কনফারম করেছি স্যার।’ অফিসার বলল।
‘ধন্যবাদ। ওরা আমাকে দেখার পর কোন কল করতে পারেনি, এটাই তো?’ বলল আহমদ মুসা।
‘জি স্যার। ওরা কোন কল সম্পূর্ণ করতে পারেনি।’
‘ধন্যবাদ।’ বলল আহমদ মুসা।
‘ধন্যবাদ অফিসার। হ্যাঁ, তোমরা এখন যাও।’ এফবিআই প্রধান জর্জ আব্রাহাম জনসন বলল।
এফবিআই-এর লোকরা ফিরে গেল তাদের পজিশনে।
এই সেতু এলাকা এফবিআই-এর একটা গোপন আউটপোস্ট। এর পাশ দিয়ে চলে যাওয়া হাইওয়ে এবং ডেথ ভ্যালি পাহাড়ের এ অংশের উপর নজর রাখা হয়।
এফবিআই-এর লোকরা চলে গেলে জর্জ আব্রাহাম জনসন দাউদ ইব্রাহিমকে দেখে নিয়ে তাকাল আহমদ মুসার দিকে।
বুঝল আহমদ মুসা। সে দাউদ ইব্রাহিমকে বলল, ‘দাউদ ইব্রাহিম, তুমি উপরে বেজ পয়েন্টটায় অপেক্ষা কর। আমি আসছি। তোমার কাছে কোন রিভলবার নেই তো?’ বলল আহমদ মুসা
‘নেই।’ দাউদ ইব্রাহিম বলল।
‘ঠিক আছে। রিভলবার কিংবা ধাতব অস্ত্র নিয়ে উপরে উঠা যাবে না। ওদের মনিটরে ধরা পড়ে যেতে হবে।’ বলল আহমদ মুসা।
দাউদ ইব্রাহিম সালাম দিয়ে চলতে শুরু করল।
আহমদ মুসা একটু হাসল। কিন্তু জর্জ আব্রাহাম জনসনকে সালাম দিতে বলল না ইচ্ছা করেই।
আহমদ মুসা দাউদ ইব্রাহিমদের সংক্ষিপ্ত কাহিনী জর্জ আব্রাহাম জনসনকে জানিয়ে বলল, ‘রিট্রায়াল বা অন্য কোনভাবে এই পরিবারকে বনবাস থেকে উদ্ধার করতে হবে।’
‘ঠিক আছে। আমার মনে থাকবে। আমি আজ জাস্টিস ডিপার্টমেন্টকে এ ব্যাপারে বলব। দাউদ ইব্রাহিম ছেলেটা ভালো। তার দায়িত্বশীলতায় আমরা খুশি হয়েছি।’ বলল আব্রাহাম জনসন।
‘ওর পিতা নূর ইউসুফও একজন দায়িত্বশীল অফিসার ছিল বলে আমার মনে হয়েছে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘সৎ, দায়িত্বপরায়ণরাও অনেক সময় ফাঁদে পড়ে। তার কেস আমরা দেখব আহমদ মুসা।’ বলল জর্জ আব্রাহাম জনসন।
‘ধন্যবাদ জনাব।’ আহমদ মুসা বলল।
‘এস’ বলে জর্জ আব্রাহাম জনসন সেতুর দিকে হাঁটতে শুরু করল।
সেতুর উপর নেমে এল তারা দু’জন।
সেতুটা ছোট একটা পাহাড়ী নদীর উপর। রক ক্রিক এলাকায় এ রকম ঝর্নাপুষ্ট নদী অনেক রয়েছে। রক ক্রিকের এ ছড়া-নদীটা সেতু এলাকায় এসে কিছুটা ওয়াইড, মনে হয় গভীরও হয়েছে। এখানকার পানিটা শান্ত।
আহমদ মুসারা সেতুর উপর পৌঁছতেই সেতুর পাশে একটা ছোট টিউব সাবমেরিন জেগে উঠল। সে টিউব সাবমেরিন থেকে একটা অটো সিঁড়ি উঠে এল সেতু পর্যন্ত। টিউব সাবমেরিনের পিঠে একটা দরজা খুলে গিয়েছিল। সিঁড়িটা সে দরজা দিয়েই বেরিয়ে এসেছে।
প্রথমে জর্জ আব্রাহাম জনসন, তার পিছে পিছে আহমদ মুসা সেই সিঁড়ি বেয়ে সাবমেরিনের ভেতর নেমে গেল। তারা ভেতরে ঢোকার সাথে সাথে সিঁড়ি গুটিয়ে গিয়ে ভেতরে ঢুকে গেল। সাবমেরিনের দরজাও বন্ধ হয়ে গেল। তারপর ডুবে গেল পানিতে।
একটা টেবিলের দু’দিকে পেতে রাখা দু’পাশের চেয়ারে বসল দু’জন।
‘এই টিউব সাবমেরিনে তুমি ও আমি ছাড়া আর কোন মানুষ নেই।
আমাদের নাস্তা, কফি সরবরাহ করবে রোবট। ওরাই সিঁড়ি দিয়ে আমাদের নিয়ে এসেছে।’ বলল আব্রাহাম জনসন।
‘টিউব সাবমেরিনে’র নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনাও কি রোবটদের হাতে?’ আহমদ মুসা বলল।
‘না, একটা টিম আছে। সাব অপারেশনে থাকার সময় ওরা থাকে। এখন সাবমেরিনকে রেস্টে রাখা হয়েছে।’ বলল আব্রাহাম জনসন।
টেবিলে নাস্তা ও কফি সরবরাহ করা হলো। রোবট নিখুঁতভাবে কাজটা করল।
নাস্তা খাওয়া শেষ করে কফির কাফে চুমুক দিয়ে জর্জ আব্রাহাম জনসন বলল, ‘প্রেসিডেন্ট সালাম ও শুভেচ্ছা জানিয়েছেন তোমাকে আহমদ মুসা। প্রেসিডেন্টসহ আমরা খুবই উদ্বিগ্ন। আমেরিকার ইতিহাসে এমন জটিল সংকট কখনও আসেনি। তুমি তো এদের তিন শর্ত ও আলটিমেটামের কথা জেনেছ। আর যখন তুমি ওদের সব বিষয় জান তখন বল সমাধান কি, তুমি কি ভাবছ?’ বলল আব্রাহাম জনসন।
‘প্রথমে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করছি যে, বড় একটা ক্ষতি থেকে তিনি আমাদের রক্ষা করেছেন। এই মাত্র যারা নিহত হয়েছে তারা টেলিফোন করতে পারলে ওরা জানতে পারত আমি বেঁচে আছি এবং সরকারের সংগে আমার যোগাযোগও রয়েছে। তাহলে এই মুহূর্তেই আগাম এ্যাকশন হিসেবে তারা MFW ব্যবহার করে বসত। ওরা টেলিফোন করতে না পারায় এবং ওরা সবাই নিহত হওয়ায় এটা নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে যে, এইচ থ্রি ও ফোমরা আগে যে অন্ধকারে ছিল আমার ব্যাপারে, এখনও তারা সেই অন্ধকারেই থাকবে। আপনার এফবিআই লোকদের ধন্যবাদ যে তারা ঠিক সময়ে ঠিক কাজটি করেছে। আমি বিস্মিত হচ্ছি যে, এই ছদ্মবেশেও তারা আমাকে দেখেই চিনতে পেরেছে। এর অর্থ হলো, তারা তাদের লোকদের আমার ফটো সব ফরমেটে মুখস্থ করিয়েছে। জনাব, আপনারা আলটিমেটাম ও শর্তগুলো সম্পর্কে কি চিন্তা করছেন?’ শেষ চুমুক দিতে দিতে বলল আহমদ মুসা।
‘এটা তোমাকে বলার দরকার আছে। প্রথম দু’টি শর্তের কোনটিই মানার মত নয়। আর তৃতীয়টা শর্ত নয়, থ্রেট। তাদের আক্রমণের জন্যে আমাদের প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে। প্রথম দুই শর্ত যেমন গ্রহণীয় নয়, তেমনি তাদের হুমকিও আমাদের জন্যে বিপজ্জনক। তাদের আক্রমণ প্রতিরোধের কোন উপায় আমাদের হাতে নেই। আর সময় মাত্র তিন দিন। এখন তাদের উপর পাল্টা আক্রমণই আমাদের কাছে একমাত্র অপশন।’ বলল জর্জ আব্রাহাম জনসন।
‘কথার কথা বলছি, একটা রাষ্ট্রের বা দেশের অস্ত্র ধ্বংস করলেই সে দেশ কি দখল করা যায়? একটা দেশের জনগণই সবচেয়ে বড় অস্ত্র।’ আহমদ মুসা বলল।
‘হ্যাঁ, আহমদ মুসা তোমাকে এই বিষয়টাও বলা প্রয়োজন। ওরা শুধু আমাদের অস্ত্র ধ্বংস নয়, আমাদের গণতান্ত্রিক রাজনীতিও ধ্বংস করবে। গোয়েন্দা সূত্রে আমরা জানতে পেরেছি এইচ থ্রি ও ফোমদের রাজনৈতিক লবি কাজ শুরু করে দিয়েছে। অস্ত্র ধ্বংস করার পরপরই তারা এটাকে ইস্যু বানিয়ে সরকারের ব্যর্থতার দায়ে একদিকে সরকারের পদত্যাগ দাবি করবে, অন্যদিকে দেশে সংঘাত-বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবে। সব অস্ত্র ধ্বংস হওয়ার আকস্মিক ঘটনায় সরকার, প্রশাসন ও জনগণের মধ্যেও একটা বিমূঢ় অবস্থার সৃষ্টি হবে। এই একই সুযোগ গ্রহণ করে ওরা ক্ষমতা দখল করে ফেলতে পারে। বিস্তারিত তথ্য আমরা পাচ্ছি। যা বললাম তাদের পরিকল্পনার এটাই সারাংশ।’ বলল জর্জ আব্রাহাম জনসন।
‘ওদের রাজনৈতিক পরিকল্পনাও দেখছি মারাত্মক। ওদের ষড়যন্ত্র দেখছি সুপরিকল্পিত ও সামগ্রিক।’ আহমদ মুসা বলল।
‘এখন তোমার কথা বল আহমদ মুসা। ওদের আক্রমণের শক্তি ধ্বংস করা ছাড়া কোন বিকল্প নেই। তুমি এ নিয়ে কি চিন্তা করছ?’ বলল জর্জ আব্রাহাম জনসন।
আহমদ মুসা তার আজকের ঘটনা ও অভিজ্ঞতা সংক্ষেপে জর্জ আব্রাহাম জনসনকে জানাল। তার অ্যাকসিডেন্ট হওয়া, পাথরে দু’টি হিব্রু শব্দ পাওয়া, তার অনুসন্ধান, সবই সংক্ষেপে বলার পর মত প্রকাশ করল, ‘গত দুই দিনের অভিজ্ঞতায় আমি এখন নিশ্চিত, ডেথ ভ্যালিতেই এখন ওদের ঘাঁটি। সম্ভবত সেটা সামরিক ঘাঁটি।’
‘তুমি ঠিক পথেই এগোেচ্ছ আহমদ মুসা। রংধনুকে তুমি পেলে ওক গাছের বাঁকা সারিতে। ঘণ্টা ও ঘণ্টাদণ্ডকে কোথায় পাবে?’ বলল জর্জ আব্রাহাম জনসন।
‘নিশ্চয় এর অর্থ আছে। পাওয়া যাবে অবশ্যই। আমার ধারণা এই সমস্যার সমাধান হলে ঘাঁটিতে ঢোকার পথ পেয়ে যাব। মজার ব্যাপার ঘণ্টা ও ঘণ্টাদণ্ডের লোকেশন ওক গাছের বাঁকা সারির যেখানে হবার কথা, সেটা ডেথ ভ্যালির ফ্লোর লেবেল।’ আহমদ মুসা বলল।
‘আলহামদুলিল্লাহ। তোমাকে আল্লাহ সাহায্য করুন। তোমার প্রত্যেকটা চিন্তা-ধারণা বাস্তব এবং এটাই সত্য হবে, ইনশাআল্লাহ। এখন তোমার প্রস্তুতি ও প্রয়োজনের কথা বল।’ বলল জর্জ আব্রাহাম জনসন।
আহমদ মুসা সংগে সংগে কথা বলল না। একটু ভাবল। বলল, ‘ভেতরে কি আছে, কারা আছে, কতজন আছে, কিভাবে আছে, কিভাবে প্রবেশ করব, কি করতে হবে, কিছুই জানি না। রিভলবার কিংবা এই জাতীয় ধাতব অস্ত্র সেখানে অচল। যা করতে হবে সেটা হলো, ওদের অস্ত্রেই ওদের সাথে লড়াই করতে হবে। যোগাযোগের জন্যে একটা কিছু দরকার। সম্পূর্ণ ধাতব পদার্থ বর্জিত অয়‍্যারলেস এই মুহূর্তে পেলে আমার কাজে লাগতে পারে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘সেটা আমার কাছে পাবে আহমদ মুসা। আর একটা জিনিস তোমাকে নিয়ে যেতে হবে। কিছু প্লাস্টিক কোটেড মাইক্রো চিপস।
এগুলো ম্যাগনেটিক পাওয়ার নিউট্রাল। এগুলোর অস্তিত্ব কোন ধরনের যন্ত্রে ধরা পড়বে না। তুমি ওদের ঘাঁটির যেখানেই যাবে চিপস ছড়াবে। তোমার পকেটে থাকলেও ওগুলো কাজ করবে। চিপসগুলো সব ঘটনা রিলে করতে পারবে। এই সিস্টেমে শুধু ফটো আসবে না।’ বলল জর্জ আব্রাহাম জনসন।
‘ধন্যবাদ। ভালো ব্যবস্থা করেছেন। আল্লাহ যেন সব ক্ষেত্রেই সফল করেন।’ আহমদ মুসা বলল।
‘আমিন।’ বলল জর্জ আব্রাহাম জনসন।

Top