8
ডেভিড কোহেন ক্যানিংহাম টেলিফোনেই চিৎকার করে উঠল, ‘সোজা কথায় এস। বল, এফবিআই চিফ ওখানে কেন গিয়েছিলেন? আর তাকে অনুসরণকারী আমাদের চারজন লোক মারা পড়ল কেন?
‘মাই লর্ড, আমি বলছি। খোঁজ নিয়ে যেটা জানতে পেরেছি, ওখানে এফবিআই-এর একটা আউটপোস্ট আছে। সেখানেই গিয়েছিলেন তিনি। আমাদের চারজন লোকের মৃত্যুর ব্যাপারে জানা গেছে, তারা নাকি এফবিআই প্রধানের দিকে রিভলবার তাক করেছিল।’ পশ্চিম ওয়াশিংটন এলাকার ফোম-এর প্রধান বেঞ্জামিন বেনহাম কথাগুলো বলল।
‘তুমি কি বিশ্বাস কর এই কথা? তারা এফবিআই প্রধানকে মারতে যাবে কেন? তাদের উপর নির্দেশ ছিল তার উপর নজর রাখার জন্যে। তার সাথে আহমদ মুসার কোন যোগাযোগ হয় কি না, এটাই দেখার দায়িত্ব ছিল তাদের। এফবিআই প্রধানের প্রতি রিভলবার তাক করা, কিংবা তাঁকে মারার চেষ্টা করার কোন প্রশ্নই উঠে না।’ বলল ডেভিড কোহেন ক্যানিংহাম।
‘আমাদের চারজন লোক নাকি ধরা পড়তে যাচ্ছিল। সেই অবস্থায় এফবিআই প্রধানকে মেরে তারা পালাতে চেষ্টা করেছিল।’ বেঞ্জামিন বেনহাম বলল।
‘রাবিশ। এই কথার এক বিন্দুও সত্য নয়। ওরা চারজনই যখন আমাকে টেলিফোন করছিল, সেই সময় ওদের গুলি করে মারা হয়। গুলির শব্দ আমি শুনেছি। সিংগল বাটন কল-অপশনে ওরা চারজন একসাথে কল করেছিল। কল ও গুলি কেউ একসাথে করতে পারে না। সুতরাং তোমার খবর সত্য নয়। আমার মনে হয় সত্যটা হলো, গুরুত্বপূর্ণ কিছু জানাবার চেষ্টা ওরা চারজন করেছিল। কিন্তু সেটা ঠেকাবার জন্যেই তাদের গুলি করে মারা হয়। সেই গুরুত্বপূর্ণ খবরটা কি?’ বলল ডেভিড কোহেন ক্যানিংহাম।
‘মাই লর্ড। চেষ্টা করেও ঐ ধরনের কোন তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। ঐ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শুধু এফবিআই প্রধান ও তার গাড়িই শুধু ওদিকে গিয়েছে এবং এসেছে।’ বেঞ্জামিন বেনহাম বলল।
‘যখন এফবিআই প্রধান ফিরে আসেন, তখন তাঁর সাথে আর কেউ কি ছিল?’ জানতে চাইল ডেভিড কোহেন ক্যানিংহাম।
‘কেউ তার সাথে ছিল না। একা গিয়েছিলেন, একাই ফিরেছেন। এটা নিশ্চিত খবর মাই লর্ড।’ বেঞ্জামিন বেনহাম বলল।
‘এফবিআই প্রধানের মত লোক ওখানে এক ঘন্টা কি করছিলেন? কেন গিয়েছিলেন? আমাদের চারজন এমন কি দেখেছিল, যা চারজন একসাথেই আমাকে জানাতে চেয়েছিল? এসব প্রশ্নের উত্তর জানা না গেলে বলতে হবে কিছু জানা হলো না। তোমার কথাগুলো যা ওদের সাজানো…।’
লাইনটি কেটে গেল ডেভিড কোহেন ক্যানিংহামের। আরেকটি ভিআইপি ফোন কল ঢুকে পড়ল লাইনে। কলটি শিমন আলেকজান্ডারের।
শিমন আলেকজান্ডার সন্ত্রাসবাদী সংস্থা এইচ থ্রি এবং বিশ্ব জায়নবাদের নতুন গোয়েন্দা সংস্থা FOAM-এর প্রকৃত প্রধান অথবা বলা যায় গডফাদার বা মাস্টারমাইন্ড এবং ফাইনানসিয়ার। প্রকৃত অর্থে ডেভিড কোহেন একজন নির্বাহী প্রধানমাত্র।
‘আপনি স্যার? ও গড! আপনার কথাই ভাবছিলাম?’ ডেভিড কোহেন বলল।
‘কেন? বড় কিছু?’ বলল শিমন আলেকজান্ডার।
‘বড় ঘটনা স্যার। আমাদের চারজন লোককে ওরা আজ মেরে ফেলেছে। আমার মনে…।’
ডেভিড কোহেনের কথার মাঝখানেই শিমন আলেকজান্ডার বলে উঠল, ‘ঐ ঘটনা আমি শুনেছি। খুব বড় কি ঘটনা এটা?’
‘বড় এজন্যে যে, ওরা চারজনই কিছু জানাবার জন্যে আমাকে টেলিফোন করেছিল। সে মুহূর্তেই তাদের গুলি করে মেরে ফেলা হয়। আমার মনে হচ্ছে, তারা যাতে ইনফরমেশনটা বলতে না পারে এজন্যেই তাদের গুলি করে মেরে ফেলা হয়েছে।’ ডেভিড কোহেন বলল।
‘তুমি মনে করছ যে, খুবই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ছিল সেটা। বল তো কি তথ্য হতে পারে বলে মনে করছ তুমি?’ বলল শিমন আলেকজান্ডার।
‘আহমদ মুসার যদি তারা দেখা পেয়ে থাকে তাহলে তা গোপন রাখার জন্যে এই ধরনের হত্যাকাণ্ড চালাতে পারে।’ ডেভিড কোহেন বলল।
‘তার মানে তুমি বলতে চাচ্ছ তোমার লোকরা জর্জ আব্রাহাম জনসনের সাথে আহমদ মুসাকে দেখেছিল। সেই কথাই তারা তোমাকে জানাতে চেয়েছিল।’ বলল শিমন আলেকজান্ডার।
‘হ্যাঁ স্যার। আমি এটাই মনে করছি।’ ডেভিড কোহেন থামল।
‘কিন্তু এটা নিয়ে তুমি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছ কেন?’ বলল শিমন আলেকজান্ডার।
‘এই তথ্য পাবার জন্যেই তো ওদের মোতায়েন রেখেছি এবং সব জায়গায় খোঁজ করছি!’ ডেভিড কোহেন বলল।
‘সেটা ছিল শর্ত ও আলটিমেটাম দেয়ার আগের পরিস্থিতি। শর্ত ও আলটিমেটাম দেয়ার পর সে অবস্থা আর নেই। আহমদ মুসার ভূমিকা এখন গৌণ হয়ে গেছে। এখন আহমদ মুসা ওদের হাতে থাকলে কোন ক্ষতি নেই। আমরা যে শর্ত দিয়েছি, তা তারা সবাই মিলে মোকাবিলা করুক আমরা চাই। প্রথম দু’টি শর্তের কোনটাই তারা মানতে পারবে না। মানলে ওদের গোপন অস্ত্রের শক্তি আর থাকবে না। ধ্বংস করতে হবে। তখন আমরা হবো অপ্রতিদ্বন্দ্বী। আর প্রথম শর্ত দু’টি যদি না মানে, তাহলে তৃতীয় শর্তের জন্যে ওদের তৈরি থাকতে হবে। তাহলে তাদের সব অস্ত্রশক্তি ধ্বংস হবে। সুতরাং আমেরিকার সবাই মিলেও এই ধ্বংস এড়াতে পারবে না। আহমদ মুসারও এ ক্ষেত্রে করার কিছু নেই। আহমদ মুসার এখন কানাকড়ি মূল্যও নেই আমাদের কাছে। এ নিয়ে বৃথাই সময় নষ্ট করছ। এখন মনোযোগ দাও আমাদের দেয়া আলটিমেটামের দিকে।’ বলল শিমন আলেকজান্ডার।
‘ঠিক বলেছেন স্যার, আলটিমেটাম দেয়ার পর আহমদ মুসা আমাদের জন্যে বিবেচ্য বিষয়ই নয়। গোটা আমেরিকার শক্তিকেই তো আমরা চ্যালেঞ্জ করেছি। আহমদ মুসা তো একজন ব্যক্তি মাত্র।’ ডেভিড কোহেন বলল।
‘হ্যাঁ, এবার বুঝেছ কোহেন। এবার তোমার প্রস্তুতি কত দূর?’ বলল শিমন আলেকজান্ডার।
‘কোন্ প্রস্তুতি স্যার?’ ডেভিড কোহেন বলল।
‘কোন্ প্রস্তুতি? তুমি ঘুমিয়ে আছ, না জেগে আছ? ‘ম্যাগনেটিক ফায়ার ওয়েভ’ (MFW)-এর এটাক প্রস্তুতি, এটাই এখন একমাত্র কাজ আমাদের।’ বলল শিমন আলেকজান্ডার।
‘সেটা তো দু’দিন পরের ব্যাপার, প্রথম ও দ্বিতীয় শর্ত না মানার পর।’ ডেভিড কোহেন বলল।
‘কোহেন, তুমি এ ধরনের অবাস্তব চিন্তা নিয়ে সময় ব্যয় কর কেন? প্রথম দুই শর্তের কথা মাথা থেকে বাদ দাও। শর্তগুলো মানবে না জেনেই আমরা তা দিয়েছি, তৃতীয় পদক্ষেপ যাতে আমরা নিতে পারি। সুতরাং তৃতীয় পদক্ষেপটির ব্যাপারে আমাদের সবকিছু ফাইনাল করে ফেল।’ বলল শিমন আলেকজান্ডার।
‘সে ব্যবস্থা আমরা সম্পূর্ণ করে ফেলেছি স্যার। আলটিমেটামের তিন দিন শুরু হবার সংগে সংগে আমরা অপারেশন-ঘাঁটিতে সবাইকে নিয়ে ঢুকে গেছি। ধ্বংস শেষ করে আমরা ঘাঁটি থেকে বের হব। MFW-এর সবকিছু প্রস্তুত। আলটিমেটামের সময় শেষ হওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগে থেকে আমরা কাউন্টডাউন শুরু করব এবং আলটিমেটাম শেষ হবার প্রথম মিনিটেই আমাদের ম্যাগনেটিক ফায়ার ওফেভ (MFW)-এর বিস্ফোরণ ঘটবে এবং ধ্বংসলীলা শুরু হয়ে যাবে।’ ডেভিড কোহেন বলল।
‘তুমি নিজে উপস্থিত থাকছ তো?’ বলল শিমন আলেকজান্ডার।
‘আমি উপস্থিত থাকছি মানে? MFW বিস্ফোরণের ডেটোনেটিং ‘পাসওয়ার্ড’ তো আমার কাছে। শেষ মিনিটে আমি ওটা আমাদের অপারেশনের টেকনিক্যাল বাহিনীকে দেব যাতে প্রথম মিনিটেই আক্রমণ শুরু হতে পারে।’ ডেভিড কোহেন বলল।
‘আমাদের ঘাঁটি সুরক্ষিত এবং এর সন্ধান কারও কল্পনাতেও নেই, তবু বলছি ঘাঁটি সুরক্ষার কি ব্যবস্থা রেখেছ?’ বলল শিমন আলেকজান্ডার।
‘আপনি ঠিক বলেছেন স্যার। আমাদের সামরিক ঘাঁটি একটা ডেড প্লেসে। এমন প্লেস নিয়ে কেউ ভাবে না, ভাবার প্রশ্নও নেই। তাই এর নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবার কোন সুযোগ নেই। এর ‘প্রবেশ পথ’ খুঁজে পাওয়াকে যেভাবে ধাঁধার বাঁধনে বেঁধে রেখেছি, তা আমাদের লোক ছাড়া কারও পক্ষেই ভাঙা সম্ভব নয়। সুতরাং ঘাঁটির নিরাপত্তার ব্যাপারে আপনি নিশ্চিত থাকুন।’ ডেভিড কোহেন বলল।
‘নিশ্চিত আছি। তবু কথায় আছে না, সাবধানের মার নেই। সুতরাং সাবধান সব সময় থাকতেই হবে। আচ্ছা, তোমার লোক কি খবর নিচ্ছে আমাদের আলটিমেটাম পাওয়ার পর সরকারের অবস্থা কি? করছে কি ওরা?’ বলল শিমন আলেকজান্ডার।
‘ও, এই ব্যাপারে আপনাকে কোন খবর জানানো হয়নি। আলটিমেটামকে ওরা সাংঘাতিক গুরুত্ব দিয়েছে। ওটা পাওয়ার সংগে সংগে ওরা প্রশাসনে অঘোষিত জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে। সমস্ত অস্ত্রঘাঁটি এবং সাইলো ও সাইলো সন্নিহিত এলাকায় রেড এলার্ট জারি করেছে। বিজ্ঞানী ও টেকনিক্যাল স্টাফদের সকল ছুটি বাতিল করেছে। দিনে কয়েকবার করে প্রেসিডেন্ট তার নিরাপত্তা কমিটি নিয়ে আলোচনায় বসছে। মিটিং-এ ঢোকার সময় তাদের মুখ যতটা মলিন দেখা যাচ্ছে, মিটিং থেকে বের হবার সময় ওদের মুখ আরও চুপসে গেছে দেখা যাচ্ছে।’ ডেভিড কোহেন বলল।
হো হো করে হেসে উঠল শিমন আলেকজান্ডার। বলল, ‘আমি এই তো চেয়েছিলাম। দেখবে আলটিমেটামের শেষ সময় যতটা কাছে আসছে, ওদের উদ্বেগ-উত্তেজনা আরও বাড়বে। শেষে পাগল হয়ে যাবে ওরা, যখন ব্ল্যাক ফায়ার ওদের অস্ত্রাগার ও সাইলোগুলোকে ধ্বংস করবে। জান, আমার মেয়ে আলাইয়া অ্যানজেলা আজ আমার সাথে কথা বলেছে এবং আমাকে অভিযুক্ত করেছে। বলেছে আমাকে, নিজেকে আইনের হাতে তুলে দিতে। আমি হেসেছি আর বলেছি, অপেক্ষা কর মা। দেখবে, তোমার বাবা কোন ছোট কাজ করে না। যাক, শোন। সব কিছুই আমাদের ঠিকঠাক চলছে। বিজয় আমাদের জন্যে অপেক্ষা করছে। সব সময় যোগাযোগ রেখ। রাখি। গুডডে।’
যে স্থানে দাউদ ইব্রাহিমের অপেক্ষা করার কথা, সেখানে বসেছিল সে। ভাবছিল সে আহমদ মুসার কথা, জর্জ আব্রাহাম জনসনের কথা। একটু আনমনা হয়ে পড়েছিল দাউদ ইব্রাহিম।
হঠাৎ মাথায় একটা শক্ত কিছুর চাপ খেয়ে ঘুরে তাকাল সে। দেখল, তার মাথায় রিভলবার চেপে ধরে বাম পাশে একজন লোক দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখে হিংস্র দৃষ্টি।
‘কে তুই, পুলিশ না গোয়েন্দা?’ বলল রিভলবার ধরা লোকটি।
ভীষণ চমকে গিয়েছিল দাউদ ইব্রাহিম। তার উপর সে কিছুক্ষণ আগে আহমদ মুসারা যেখানে আছে, তার পিছন দিকে চারটি গুলির শব্দ শুনেছে। সেখানে কি ঘটেছে এটা নিয়ে সে আতংকে ছিল। আহমদ মুসাদের কিছু হলো কি না? আর সেদিক থেকেই লোকটি এসেছে কি না? তার ব্যাপারে সব সে জেনে ফেলেছে কি না। ইত্যাদি ভাবছিল সে।
তবু সাহস করে সে বলল, ‘আমি পুলিশ বা গোয়েন্দা কিছুই নই। পাশের গ্রামে আমার বাড়ি। আমার একজন লোককে খুঁজতে খুঁজতে আমি এখানে এসে পড়েছি।’
‘ধরা পড়লে সবাই এরকম কথা বলে। চল, উঠ।’ বলে লোকটি দাউদ ইব্রাহিমের মাথায় রিভলবারের বাঁট দিয়ে একটা ঠেলা দিল।
‘কোথায় যাব?’ বলল দাউদ ইব্রাহিম। তার মনে একটা ভীতি ছড়িয়ে পড়েছে। আহমদ মুসারা যাদের কথা বলে, এ লোকটি সেই সন্ত্রাসী দলের নয় তো? যদি তাই হয়, তাহলে তো এই লোকটির কাছে অনেক তথ্য আছে, যা তাঁদের অনেক উপকারে লাগতে পারে? এই চিন্তার সাথে সাথে দাউদ ইব্রাহিমের মনের ভীতি কিছুটা দূর হয়ে গেল। তার জায়গায় এই ইচ্ছা প্রবল হয়ে উঠল যে, এই লোকটিকে ধরতে হবে।
‘কোথায় যাবে? একদম পরপারে। তার আগে তোমার পেটের কথাগুলো বের করতে হবে। চল।’
কথা শেষ করেই লোকটি রিভলবারের নল দিয়ে আবার গুঁতা দিল দাউদ ইব্রাহিমের মাথায়।
লোকটি রিভলবারের নলের গুঁতা দিয়ে দাউদ ইব্রাহিমকে দক্ষিণ দিকে পাহাড়ের গোড়ার দিকে নামার জন্যে ইশারা করছিল।
লোকটির ইশারা মত চলতে লাগল দাউদ ইব্রাহিম। চলা শুরু করে চিন্তা করল, একবার যদি লোকটার হাত থেকে রিভলবারটা নিয়ে নেয়া যায় অথবা ফেলে দেয়া যায়, তাহলে লোকটাকে কাবু করা দাউদ ইব্রাহিমের জন্যে মোটেই কঠিন হবে না।
দাউদ ইব্রাহিমের হাতে ছিল ‘আমেরিকা টুডে’ কাগজের একটা পাতা। এ বিশেষ পাতাটি আজকের ‘আমেরিকা টুডে’ থেকে ছিঁড়ে নিয়েছিল পড়ার জন্যে। সে বসে বসে ভাবছিল আর মাঝে মাঝে এই কাগজটাই পড়ছিল।
লোকটির রিভলবারের নলের ঠেলা খেয়ে সামনে চলছিল, আর হাতের কাগজটিই টুকরো করছিল দাউদ ইব্রাহিম। ভীত, নিরীহ আজ্ঞাবহ মানুষের মত চলছিল দাউদ ইব্রাহিম এবং মাঝে মাঝে আবেদন করছিল তাকে ছেড়ে দেয়ার জন্যে। এক বুড়ো বাপ, আর এক ছোট বোন ছাড়া তার কেউ নেই, একথাও সে বলছিল।
চলা শুরু হলে ভীত, নিরীহ দাউদ ইব্রাহিমের ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে লোকটি রিভলবার নামিয়ে নিয়েছিল তার মাথা থেকে।
অনেকটা নেমে পাহাড়ের গোড়ায় তিন দিকে টিলা ঘেরা একটা স্বল্প পরিসর জায়গায় নিয়ে এল দাউদ ইব্রাহিমকে।
দাউদ ইব্রাহিমকে একটা পাথরের উপর বসিয়ে পাশেই আরেকটা উঁচু পাথরের উপর দাঁড়িয়ে লোকটি দাউদ ইব্রাহিমকে লক্ষ্য করে বলল, ‘চুপচাপ বসে থাক এবং ঈশ্বরকে ডাক। তোমার ব্যাপারে কি নির্দেশ হয় জেনে নিচ্ছি এখনি।’
বলে লোকটি বাম হাতে রিভলবার নিয়ে ডান হাত দিয়ে পকেট থেকে মাউথ অরগ্যান-এর মত ছোট্ট একটা জিনিস বের করল।
‘কি ব্যাপার এখন তুমি মাউথ অরগ্যান বাজাবে? এই না বললে আমার ব্যাপারে কি নির্দেশ আসে তা জানবে। অথচ মোবাইলের বদলে দেখছি মাউথ অরগ্যান বের করছ। ভাই আমাকে ছাড়ার ব্যবস্থা কর।’ বলল দাউদ ইব্রাহিম অনুনয়ের সুরে।
‘এখানে সব মোবাইল, টেলিফোন অচল। আমি তো কথা বলার জন্যেই এটা বের করছি। এটা মাউথ অরগ্যানের মত বাজানো যায়, কিন্তু আসলে এটা ম্যাগনেটিক পাওয়ার পরিচালিত বিশেষ ধরনের অয়্যারলেস।’ বলে লোকটি মাউথ অরগ্যানের তলায় বিশেষ জায়গায় একটা চাপ দিল। সংগে সংগেই মাউথ অরগ্যানটি ‘বিপ’ ‘বিপ’ শব্দ করে উঠল। তার সাথে দেখা গেল সবুজ আলোর ফ্লাশ।
লোকটি তার বাম হাতের রিভলবারটি দাউদ ইব্রাহিমের দিকে তাক করে বলল, ‘হ্যালো, মাই লর্ড। আমি ডেথ ভ্যালির দক্ষিণ গোঁড়া এলাকা থেকে ডেভিড বলছি।’
‘ইয়েস গো-অন।’ অয়্যারলেসে ওপার থেকে একটা কণ্ঠ বলে উঠল।
‘ধন্যবাদ মাই লর্ড। ডেথ ভ্যালির এপাশে সন্দেহজনকভাবে ঘুরতে দেখে একজন লোককে আমি আটক করেছি। সে বলছে, পাশের গ্রামে তার বাড়ি। তার একজন লোককে খুঁজতে এদিকে এসেছে সে। চেহারায় ও পোশাকে মেষপালকের মত মনে হচ্ছে। তার ব্যাপারে কি নির্দেশ মাই লর্ড?’ বলল এ পাশ থেকে লোকটি।
‘তার নাম কি?’ ওপারের কণ্ঠ বলল। প্রশ্ন শুনেই লোকটি তাকাল দাউদ ইব্রাহিমের দিকে।
বুঝল দাউদ ইব্রাহিম। বলল, ‘ডেভিড আব্রাহাম।’
লোকটি দাউদ ইব্রাহিমের নাম জানাল। শুনে ওপার থেকে বলল, ‘তুমি নিশ্চয় একজন ভুল লোককে ধরেছ। এ সময় এটা ঠিক হয়নি। যখন ধরেছই, তখন আর কিছু করার নেই। ও বেঁচে থাকলে আমাদের ক্ষতি। অতএব যা করার তাই করো। তবে লাশটা যেন কারও চোখে না পড়ে, পুলিশ যেন খুঁজে না পায়। আর শোন, সবার উপর নির্দেশ হলো, ডেথ ভ্যালি এলাকায় ধরাধরি, খুনোখুনি সব বন্ধ করা হয়েছে। আমরা চাই না পুলিশ বা গোয়েন্দাদের নজর এদিকে পড়ুক। ডেথ ভ্যালির বাইরে পাহাড়ে দু’চারজন মানুষ সব সময় দেখা গেছে, এখনও দেখা যেতে পারে। এগুলো আমরা এখন এড়িয়ে চলব। ছোটখাট কাজে হাত দিয়ে বড় কাজের আমরা কোন ক্ষতি করতে চাই না। মনে রেখ। ও.কে.। বাই।’
‘ও.কে. মাই লর্ড।’
বলে লোকটি অয়্যারলেস বন্ধ করে পকেটে রাখছিল। তার দৃষ্টি দাউদ ইব্রাহিম থেকে সরে গিয়েছিল। রিভলবার ধরা বাম হাতটাও তার অনেকখানি নিচে নেমে গিয়েছিল।
দাউদ ইব্রাহিম এই সুযোগ হাতছাড়া করল না। তার ব্যাপারে নির্দেশ তারও কানে এসেছে। তাকে হত্যা করার হুকুম এসেছে ওপার থেকে।
দাউদ ইব্রাহিম লোকটির রিভলবার ধরা হাতে আঘাত করল ডান হাত দিয়ে। সংগে সংগে রিভলবারটা তার হাত থেকে ছিটকে পড়ে গেল।
দাউদ ইব্রাহিম রিভলবারের পরিণতি দেখার অপেক্ষা না করে লোকটির হাতে আঘাত করেই তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে।
এতে ভালো ফল হলো। লোকটি একদম অপ্রস্তুত অবস্থায় ছিল।
একদিকে হাত থেকে রিভলবার পড়ে যাওয়া, অন্যদিকে সংগে সংগেই আক্রান্ত হওয়ায় সে প্রতিরোধ গড়বার কোনই সুযোগ পায়নি।
দাউদ ইব্রাহিম লোকটির উপর ঝাঁপিয়ে পড়লে দু’জনেই পাথরের উপর থেকে গড়িয়ে পড়ল নিচে।
নিচে পড়েই দাউদ ইব্রাহিম লোকটিকে জাপটে ধরে তার পিঠের উপর উঠে বসল এবং পাশ থেকে একটা পাথর নিয়ে লোকটির মাথায় আঘাত করল। এর সাথে সাথেই লোকটির দুই হাত টেনে এনে পিছমোড়া করে ধরল। তারপর গা থেকে জামা খুলে ছিঁড়ে বেঁধে ফেলল লোকটির দু’হাত।
মাথার আঘাতটা বেশ জোরেই হয়েছিল। সংগে সংগেই ঝিমিয়ে পড়ল লোকটি। রক্ত বেরুচ্ছে আহত জায়গা থেকে। এই কারণেই পিছমোড়া করে বাঁধা দাউদ ইব্রাহিমের জন্য খুব কঠিন হয়নি।
ছিঁড়ে ফেলা জামার আরেকটি অংশ দিয়ে লোকটির দুই পাও বেঁধে ফেলল দাউদ ইব্রাহিম। ঘটনা অসম্ভব রকম দ্রুত ঘটে গেল।
দাউদ ইব্রাহিম শরীর-স্বাস্থ্যে লোকটির চেয়ে ভালো এবং আহমদ মুসার সাথে কয়েকদিন থেকে সাহসও বেড়েছে তার। তার উপর ছিল জীবন বাঁচানোর দায় এবং আহমদ মুসার সাথে তার দেখা হওয়ার তাকিদ। লোকটির হাত-পা বাঁধার পর উঠে দাঁড়াল দাউদ ইব্রাহিম। এরপর প্রথমেই সে ভাবল, তাকে তার জায়গায় ফিরে যাওয়া দরকার। আহমদ মুসা এসে তাকে খুঁজবে এবং না পেলে চিন্তায় পড়ে যাবে। হয়তো তাকে খুঁজতে গিয়ে সময় নষ্ট হবে। কিন্তু যাবে কি করে? লোকটিকে এখন সে কি করবে? তার মনে হলো, এই লোকটি সম্পর্কে আহমদ মুসার জানা দরকার। শত্রুপক্ষের এই লোকটি তাঁর কাজেও লাগতে পারে। লোকটিকে কাঁধে করে কিংবা রিভলবারের ভয় দেখিয়ে তাকে যে সেখানে নিয়ে যাবে, এটাও সম্ভব নয়। কেউ কিংবা অনেকেই দেখে ফেলতে পারে এবং ঘটতেও পারে নতুন বিপদ। ইত্যাদি ভাবনায় যখন দাউদ ইব্রাহিম ঘোর অনিশ্চয়তায়, তখন সে আবার মাথার পেছনের দিকটায় রিভলবারের নলের মত ধাতব কিছুর চাপ অনুভব করল।
সংগে সংগেই তড়াক করে ঘুরে দাঁড়াল দাউদ ইব্রাহিম। দেখল, আহমদ মুসা হাসছে।
আহমদ মুসা বলল, ‘তোমাকে না দেখে আমি চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলাম। যাক অল্পতেই তোমাকে পেয়ে গেছি।’
‘কিন্তু জানলেন কি করে যে আমি এখানে? এলেন কিভাবে ঠিকঠাক মত?’ বলল দাউদ ইব্রাহিম।
‘তুমিই তো আমাকে নিয়ে এসেছ।’ আহমদ মুসা বলল।
‘কিভাবে?’ বলল দাউদ ইব্রাহিম। তার চোখে-মুখে বিস্ময়।
‘তুমি যে কাগজের টুকরো ফেলতে ফেলতে এসেছ ওখান থেকে, সেটা অনুসরণ করেই ঠিকঠাক আমি এখানে পৌছে গেছি।’
‘আমি একটা গোয়েন্দা বইতে এই কৌশলের কথা পড়েছিলাম। কিন্তু আমি ভাবিনি যে, এটা কাজে লাগবে। ধন্যবাদ স্যার।’ বলল দাউদ ইব্রাহিম।
‘ধন্যবাদ তো আমি তোমাকে দেব এই বুদ্ধি কাজে লাগানোর জন্যে। আচ্ছা যাক, এই যে লোকটাকে বেঁধে ফেলে রেখেছ এই-ই তো তোমাকে ধরে আনে রিভলবারের ভয় দেখিয়ে। তাই তো?’ আহমদ মুসার জিজ্ঞাসা।
‘আপনি ঠিক ধরেছেন স্যার। মাথায় রিভলবার ঠেকিয়ে সে-ই আমাকে এ পর্যন্ত আসতে বাধ্য করে।’ বলল দাউদ ইব্রাহিম।
‘তারপর? একে কুপোকাত করলে কিভাবে?’ আহমদ মুসা বলল।
ঘটনা সংক্ষেপে আহমদ মুসাকে জানিয়ে বলল, ‘আমার ব্যাপারে নির্দেশের জন্য লোকটা একটা টেলিফোন করেছিল। টেলিফোনের ও প্রান্ত থেকে তাদের বসের অনিচ্ছা সত্ত্বেও আমাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছিল। একদিকে এই মৃত্যু থেকে বাঁচা এবং আপনার কাছে পৌছা-এই দুই ইচ্ছা আমাকে এমন শক্তি যুগিয়েছিল, যার চিন্তা আমি নিজেও কোন দিন করিনি।’
‘অনিচ্ছা সত্ত্বেও বলছ কেন? এদের পরিচয় সম্পর্কে তুমি কি জেনেছ?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।
‘এ আপনাদের মানে আমাদের শত্রুপক্ষের লোক, টেলিফোন থেকে এটা আমি বুঝেছি। টেলিফোনের ওপার থেকে ওরা আমাকে ঐ অঞ্চল থেকে ধরে আনা পছন্দ করেনি। তারা এ এলাকায় এ ধরনের কোন ঘটনা ঘটতে দিতে চায় না, যাতে পুলিশ ও গোয়েন্দাদের চোখ এই এলাকার উপর পড়ে। আমি তাদের এ মনোভাবকেই ‘অনিচ্ছাকৃত’ বলেছি। অনিচ্ছা সত্ত্বেও আমাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয় এ কারণে যে, ধরার পর তারা আমাকে ছেড়ে দিতে চায়নি।’ বলল দাউদ ইব্রাহিম।
আহমদ মুসা সংগে সংগে কোন কথা বলল না। এই এলাকায় মানে ডেথ ভ্যালি এলাকায় এ সময় কিছু না ঘটুক তা তারা চাচ্ছে। আসল লক্ষ্য হলো, এ অঞ্চলের উপর পুলিশ ও গোয়েন্দাদের চোখ যেন না পড়ে। কেন? কেন তারা এই নজর পড়াকে ভয় করছে?
প্রশ্নগুলো সামনে আসার সাথে সাথে আহমদ মুসা রিভলবারটা কুড়িয়ে নিয়ে এগোলো বেঁধে রাখা লোকটির দিকে। পিছমোড়া করে বাঁধা অবস্থায় তাকে চিৎ করে শোয়াল আহমদ মুসা। বাঁধা হাত দু’টি বেকায়দা অবস্থায় থাকার কারণেই সম্ভবত যন্ত্রণায় সে কঁকিয়ে উঠল।
সেদিকে ভ্রূক্ষেপ না করে আহমদ মুসা রিভলবারের নল দিয়ে তার মাথায় একটা খোঁচা দিয়ে বলল, ‘তুমি এক্ষুণি যার সাথে কথা বললে সেই ডেভিড কোহেন ক্যানিংহাম এখন কোথায়?’
লোকটি অবাক হয়ে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকাল আহমদ মুসার দিকে। কিছু বলল না।
আহমদ মুসা রিভলবার তুলল তার মাথা লক্ষ্যে। বলল, ‘দেখ এক আদেশ আমি দুইবার দেই না।’
লোকটির চোখে-মুখে ভীতি ফুটে উঠল। কিন্তু মুখ খুলল না সে।
আহমদ মুসার তর্জনি নড়ে উঠল। চেপে বসল তা ট্রিগারের উপর। রিভলবার থেকে বেরিয়ে গেল একটা গুলি। গুলিটা লোকটার কানের উপরে মাথার চামড়ার একটা অংশ তুলে নিয়ে চলে গেল।
লোকটা চিৎকার করে উঠল।
আহমদ মুসা তার রিভলবার লোকটার মাথায় চেপে রেখেই বলল, ‘ঠিক ঠিক জবাব না দিলে দ্বিতীয় গুলি তোমার মাথা গুড়িয়ে দেবে।’
‘আমি জানি না, এই মুহূর্তে কোথায়। তবে গতকাল থেকে আজ সকাল পর্যন্ত ছিল ডেথ ভ্যালিতে।’ বলল সে যন্ত্রণাকাতর কণ্ঠে।
আহমদ মুসা এই তথ্যটা শুনে রোমাঞ্চিত হলো। তবু বলল, ‘ডেথ ভ্যালিতে কেন? ওখানে কোথায় আসবে, কিভাবে আসবে?’
‘ডেথ ভ্যালি তো ওদের ঘাঁটি। ওদের সব অস্ত্র তো এখানেই মোতায়েন। ওখানে কিভাবে প্রবেশ করে তা আমি জানি না। তবে এটুকু জানি ঢোকার সহজ পথ তারা তৈরি করেছে।’ বলল লোকটি।
আহমদ মুসা চাওয়ার চেয়ে বেশি পেয়ে গেল। ডেথ ভ্যালিতে যে ওদের অস্ত্রাগার বা ঘাঁটি আছে, এটা ছিল বিভিন্ন কার্যকারণ থেকে সৃষ্ট তার ধারণা। এখন সে নিশ্চিত হলো।
‘ওখানে ওদের কি অস্ত্র আছে? এমন একটা মৃত স্থানকে তারা বেছে নিল কেন?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।
‘তা জানি না স্যার। তবে কয়েকদিন থেকে বলাবলি হচ্ছে যে, আর তিন দিন পর আমেরিকার সব অস্ত্র ধ্বংস হয়ে যাবে। এরপর আমেরিকা আমাদের হাতে চলে আসবে।’ বলল লোকটি।
‘এদের কি সৈন্যবাহিনী আছে নাকি? কিভাবে দেশ দখলে আসবে?’
প্রশ্ন আহমদ মুসার।
‘তা আমরাও বুঝিনি স্যার। তবে সৈন্যবাহিনী নেই। কিছু লোকজন আছে।’
‘কত লোকজন আছে?’ আহমদ মুসা বলল।
‘সংখ্যা বলতে পারবো না স্যার। তবে সৈন্যবাহিনীর মত অত বেশি নয়।’ বলল লোকটি।
‘তারা কোথায় থাকে?’ জিজ্ঞাসা করল আহমদ মুসা।
‘ঘাঁটি ধ্বংস হবার পর তারা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকে, আমি সবকিছু জানি না স্যার।’ বলল লোকটি।
‘ডেথ ভ্যালিতে তো লোকজন আছে। কত লোক আছে এখানে?’ আহমদ মুসা বলল।
‘বলতে পারবো না স্যার। এ রকম কোন কথা শুনিনি। খুব বেশি লোক থাকার কথা নয়।’ বলল লোকটি।
‘কেন একথা বলছ?’ প্রশ্ন আহমদ মুসার।
‘আমাদের একজন স্যার একদিন বলেছিলেন, আমরা সংখ্যার চেয়ে দক্ষতাকে বেশি গুরুত্ব দেই। লোকের ভিড় আমরা পছন্দ করি না। আসলেও তাদের কোথাও লোকের ভিড় দেখা যায় না।’ বলল লোকটি।
‘ডেথ ভ্যালির বাইরে তো ওদের কোন পাহারা নেই। কেন?’ আহমদ মুসা বলল।
‘ডেথ ভ্যালির বাইরে তো আমরাই আছি। তবে উত্তর পাশে কোন পাহারা নেই।’ বলল লোকটি।
‘তোমরা কতজন আছ? আর উত্তর পাশে পাহারা নেই কেন?’ আহমদ মুসা বলল।
‘আমরা তিনজন ছিলাম, দু’জনকে সকালে ডেকে নেয়া হয়েছে শহর থেকে। আমারও বিকেলে চলে যাবার কথা।’ বলল লোকটি।
‘কেন এই পাহারার আর দরকার নেই?’ আহমদ মুসা বলল।
‘জানি না স্যার। শহরেই নাকি এখন কাজ বেশি।’ বলল লোকটি।
‘উত্তর দিকে পাহারা কোন সময়ই ছিল না?’ আহমদ মুসা বলল।
‘আগের কথা জানি না স্যার। তবে এখন নেই। আমাদেরও ওদিকে যাবার অনুমতি নেই। ওদিকে মানুষ যায় না বললেই চলে। ওদিকে কেউ পাহারায় থাকলে নাকি বাইরের মানুষের মধ্যে প্রশ্নের সৃষ্টি হবে।
মানুষের সন্দেহ এড়ানোর জন্যেই নাকি এই ব্যবস্থা।’ বলল লোকটি।
স্বস্তির একটা নিঃশ্বাস ফেলল আহমদ মুসা। মনে মনে বলল, ঘাঁটিটাকে তারা আপনাতেই সুরক্ষিত মনে করছে। নিশ্চয় ঘাঁটিতে ঢুকা ও বের হবার ব্যবস্থা এমনটাই নিশ্ছিদ্র তারা করতে পেরেছে যে বাড়তি পাহারার তাদের প্রয়োজন নেই। আহমদ মুসা মনে মনেই আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে বলল, এই অবস্থাকেই আল্লাহ তাদের বড় দুর্বলতায় পরিণত করুন।
‘তুমি যদি না ফের তাহলে ওরা কি করবে?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।
‘স্যার, আমি যেখানেই থাকি ওরা আমাকে লোকেট করতে পারবে। আমাকে খুঁজে বের করবে।’ বলল লোকটি।
‘অর্থাৎ তুমি যেখানে থাকবে, ঠিক সেখানে ওরা পৌঁছে যেতে পারবে?’ আহমদ মুসা বলল।
‘জি স্যার, তারা সেখানে পৌঁছতে পারবে।’ বলল লোকটি।
আহমদ মুসার ঠোঁটে অস্ফুট একটা হাসি ফুটে উঠল। আহমদ মুসা দাউদ ইব্রাহিমের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘দেখ এর পকেটে কি কি আছে সব বের কর।’
দাউদ ইব্রাহিম বলল, ‘যে রিভলবার আপনার হাতে সেটা লোকটির।’
পকেট সার্চ করে একটা মাউথ অরগ্যান, অয়্যারলেস ট্রান্সমিটার, একটা ছোট মানিব্যাগ পেল।
‘তোমাদের সবার কাছেই অয়্যারলেস ট্রান্সমিটার থাকে?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার লোকটিকে।
‘আমাদের সবার কাছেই এই ট্রান্সমিটার থাকে। আমাদের মোবাইল ব্যবহার নিম্নিদ্ধ। আর মোবাইলে কাজও হয় না।’ বলল লোকটি।
‘এখন তোমাকে ছেড়ে দেয়া হলে তুমি কি করবে?’ আহমদ মুসা বলল।
‘আমি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত এই এলাকায় থেকে তারপর চলে যাব বিকেলে।’ বলল লোকটি।
‘তুমি তো আমার সাথীকে হত্যা করতে পারলে না। তোমার বস-এর নির্দেশ পালন তো হলো না।’ আহমদ মুসা বলল।
লোকটি মুহূর্তকাল চুপ থেকে বলল, ‘আমাকে মিথ্যা কথা বলতে হবে। বলতে হবে যে, হত্যা করে লোকটিকে নিরাপদ জায়গায় ফেলে দিয়ে এসেছে।’
‘এত কিছু কাণ্ড ঘটল, এ সবকিছুই বলবে না তাদের?’ আহমদ মুসা বলল।
‘এসব বলা আর মৃত্যুকে ডেকে আনা এক কথা। বেঁচে থাকার জন্যেই আমাকে এ সবকিছু গোপন করতে হবে।’
আহমদ মুসা দাউদ ইব্রাহিমের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘এর বাঁধন খুলে দাও।’
বাঁধন খুলে দিলে লোকটি উঠে দাঁড়াল।
‘তোমার কানের উপরটায় গুলিতে যে ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে, তার কি ব্যাখ্যা দেবে তুমি?’ আহমদ মুসা বলল।
‘বলব যে, লোকটিকে ধরার সময় ধস্তাধস্তিতে একটা ধারাল পাথরের ঘষা খেয়ে ছিঁড়ে গেছে কিছুটা জায়গা।’ বলল লোকটি।
‘ওকে তার মানিব্যাগ, রিভলবার ও অয়্যারলেস ট্রান্সমিটার দিয়ে দাও।’ আহমদ মুসা বলল দাউদ ইব্রাহিমকে লক্ষ্য করে।
দাউদ ইব্রাহিম জিনিসগুলো দিয়ে দিল লোকটির হাতে।
‘তুমি চলে যাও। তুমি নিরাপদ থাক। গুডবাই।’ বলল আহমদ মুসা লোকটিকে।
লোকটি তাকাল আহমদ মুসার দিকে। বলল, ‘গুলিভর্তি রিভলবার আমাকে দিয়ে দিলেন! এখন যদি আমি গুলি করি।’
আহমদ মুসা হাসল। বলল, ‘এক গুলিতে তুমি দু’জনকে মারতে পারবে না। একজনকেও মেরে ফেলতে পারবে তাও নিশ্চিত নয়।
অতএব শত্রুতার চিন্তা তুমি করবে না।’
‘ধন্যবাদ স্যার। মানুষকে জয় করবার অদ্ভুত ক্ষমতা আছে আপনার। চলি স্যার। বাই।’ বলে চলতে শুরু করল লোকটি। লোকটি চলে গেল।
‘স্যার, লোকটিকে ছেড়ে দিলেন। আমাদের কথা, আমাদের জিজ্ঞাসাবাদের বিষয়ের কথা সে যদি বলে দেয়?’ বলল দাউদ ইব্রাহিম।
‘ওকে আটকে রাখলে ওরা সন্দেহ করতো যে, নিশ্চয় ডেথ ভ্যালিকে কেন্দ্র করে তাদের প্রতিপক্ষ কিছু করছে। সেক্ষেত্রে ডেথ ভ্যালির বাইরের নিরাপত্তার ব্যাপারে তারা তৎপর হতো। তাতে আমাদের এগোনোর ব্যাপারটা অপেক্ষাকৃত কঠিন হতো। দ্বিতীয়ত তার উপর সন্দেহ হওয়া থেকে বাঁচার জন্যে যা ঘটেছে, সেসব কিছুই সে কাউকে বলবে না’।’ আহমদ মুসা বলল।
বলেই আহমদ মুসা উঁকি মেরে দেখল, লোকটি কতদূর গেছে। তারপর সে সরে এসে বলল, ‘চল দাউদ ইব্রাহিম এবার যাই।’
‘কোথায়?’ বলল দাউদ ইব্রাহিম।
‘চল দেখবে। কাছেই থাকার জন্যে একটা বিশাল বাড়ি পাওয়া গেছে।’ আহমদ মুসা বলল।
দাউদ ইব্রাহিম তাকাল আহমদ মুসার দিকে। বলল, ‘চলুন।’
আহমদ মুসা টিলার ঘের থেকে বেরিয়ে পশ্চিম দিকে হাঁটতে শুরু করল। তার ও দাউদ ইব্রাহিমের পরনে তখনও মেষপালকের পোশাক।
সূর্য উঠেছে। কিন্তু ডেথ ভ্যালির কুয়াশাচ্ছন্ন এ ঢালে এখনও সকাল হয়নি। আহমদ মুসা এসে পৌঁছেছে ডেথ ভ্যালির উত্তর পাশের মাঝ বরাবর। আহমদ মুসার মনে তার স্বভাববিরুদ্ধ একটা ঝড়। এইচ থ্রি তাদের আলটিমেটামের চূড়ান্ত সময় ১২ ঘণ্টা পিছিয়ে এনেছে। তারা বলেছে, যেহেতু তাদের শর্তের ব্যাপারে ইতিবাচক কিংবা কোন সাড়াই দেয়া হয়নি। এতে পরিষ্কার যে, তাদের কোন শর্তই মানা হচ্ছে না। সুতরাং তারা সময় পিছিয়ে এনেছে। আহমদ মুসা সন্ধ্যায় দাউদ ইব্রাহিমকে জর্জ আব্রাহামের কাছে পাঠিয়েছিল। জর্জ আব্রাহাম জনসনই তার মাধ্যমে তাদের আলটিমেটামের খবর পিছিয়ে আনার মেসেজ আহমদ মুসার কাছে পাঠিয়ে জানিয়েছে যে, ওরা ওদের চূড়ান্ত সময় পিছিয়ে নেয়ায় তাঁদের সবার উদ্বেগ বেড়েছে। যদিও চাপ বাড়াবার জন্যে তারা এটা করেছে, কিন্তু আমাদের হাতের সময় কমে গেল। আহমদ মুসাকে শেষ সময়ের দিকে খেয়াল রাখার জন্য অনুরোধ জানিয়ে ইনভেলাপে বন্ধ করা একটা ছোট চিঠিতে জানিয়েছে, ‘অসহায় বিকল্প হিসেবে শত্রুকে ধ্বংস করার ব্যবস্থা হিসেবে আমরা স্থির করেছি, আলটিমেটামের শেষ ৫ মিনিট আগে ম্যাগনেটিক ডেথ ওয়েভ (MDW) আমরা ফায়ার করবো। এতে আমাদের সব অস্ত্রও ধ্বংস হয়ে যাবে বটে, কিন্তু শত্রুকে নিষ্ক্রিয় করে দেয়া সম্ভব হবে। উদ্বেগের বিষয় যে, কোনওভাবে যদি আমাদের প্রতিপক্ষ দেশ এটা জানতে পারে, তাহলে তাদের কাছে আমাদের অসহায় আত্মসমর্পণের কোন বিকল্প থাকবে না। আরও ক্ষতি হবে, সেটা হলো সরকারের পতন অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠবে। এই ভয়াবহ সব ক্ষতি থেকে দেশকে রক্ষা করতে পারে একমাত্র আহমদ মুসার চেষ্টা ও সাফল্য। চরম উদ্বিগ্ন প্রেসিডেন্টসহ আমরা সকলে। তোমার সাফল্য কামনা করছি আমরা।’
জর্জ আব্রাহামের কাছ থেকে এই সব খবর পাওয়ার পর আহমদ মুসার মনে যে ঝড়ের সৃষ্টি হয়েছিল, সে ঝড়ের নিবৃত্তি এখনও হয়নি। নিজের বা বিশেষ কয়েকজনের ক্ষতির বিষয় হলে কোন কথা ছিল না। যে ক্ষতির সামনে সে দাঁড়িয়ে আছে, সে ক্ষতি আমেরিকার মত একটা দেশের শক্তি-সামর্থ্য ও নিরাপত্তা, এমনকি স্বাধীনতার ক্ষতি। এই ক্ষতি হওয়া না হওয়া তার অভিযানের সফলতা ও ব্যর্থতার উপর নির্ভর করছে। এই অনুভূতিই তার মনকে কিছুটা অস্থির করে তুলেছে।
আহমদ মুসা ডেথ ভ্যালির উত্তর পাশের মাঝামাঝি এসে দাঁড়িয়েছে। সে উপর দিকে ওক গাছের রংধনুর দিকে তাকাল। রংধনুর মাঝামাঝি শীর্ষপয়েন্ট ঠিক করে তার বরাবর নিচে সরে এল আহমদ মুসা।
কুয়াশার উপর সূর্যের আলোর রিফ্লেকশনে একটা সফেদ আলো ছড়িয়ে পড়েছে পাহাড়ের গায়ে।
আহমদ মুসা দাঁড়িয়ে আছে একটা পাথরের উপর। ওক গাছের যে রংধনু সে দেখেছিল তার মধ্যবর্তী শীর্ষ বিন্দুর ঠিক নিচ বরাবরই সে দাঁড়িয়ে আছে।
উপর দিকে তাকাল আহমদ মুসা। সেই শীর্ষপয়েন্টটার দিকে। তার কপালটা ভাবনায় কুঞ্চিত। তার মনে ভাবনায় স্রোত। বৃত্তাকার বা অর্ধবৃত্তাকার কাঠামোর শীর্ষপয়েন্টে ঝুলে থাকে ঘণ্টা। ঘণ্টার ভেতরে থাকে ঘণ্টা বাজানোর ঝুলন্ত দণ্ড। তাকে বলা হয়েছে ‘টাংগ অব বেল’। ওক গাছের রংধনু আকারে অর্ধবৃত্তাকার কাঠামো পাওয়া গেছে। এখন পাওয়া দরকার ঘণ্টা এবং ঘণ্টাদণ্ড (টাংগ অব বেল)। কিভাবে পাওয়া যাবে? ওক গাছের আড়ালে আছে রংধনু, ঘণ্টা ও ঘণ্টাদণ্ড আছে কিসের আড়ালে? আশার কথা, ঘণ্টা পেলে তার সাথে ঘণ্টাদণ্ডও পাওয়া যাবে। কিন্তু কোথায় পাওয়া যাবে এই ঘণ্টা? ঘণ্টা সব সময় থাকে অর্ধবৃত্তাকার কাঠামোর শীর্ষপয়েন্টের কাছে, ঠিক নিচেই।
বিসমিল্লাহ বলে আহমদ মুসা অর্ধবৃত্তাকার ওক সারির মধ্যবর্তী শীর্ষপয়েন্ট লক্ষ্যে পাহাড়ের গা বেয়ে উঠা শুরু করল।
পাহাড়ের এ পাশের গাছগুলো ঘন নয়, বেশ পাতলা, বেশ স্পেস নিয়ে এক একটি গাছ আছে। ওক গাছের রংধনুর মধ্যবর্তী শীর্ষপয়েন্টে একটা চিহ্ন করেছিল আহমদ মুসা, সেই চিহ্ন সামনে রেখে এগিয়ে যাচ্ছে আহমদ মুসা।
পাহাড় বেয়ে উঠতে গিয়ে আহমদ মুসা দেখল, মাঝে মাঝেই পাথরের ফাঁদ। আলগা পাথরকে এমনভাবে পাহাড়ের গায়ে সেট করা আছে দেখলে মনে হবে এগুলো পাহাড়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু পা রাখলেই পাথরের সাথে গড়িয়ে পড়তে হবে গড়গড় করে। এরকম দু’একটা পাথরে হাত রেখে সাবধান হয়ে গেল আহমদ মুসা। যাচাই না করে কোন পাথরে আর পা রাখছে না আহমদ মুসা। কিন্তু তাতে অসুবিধা হচ্ছে না উঠতে। মনে হচ্ছে কেউ যেন উঠার পথটাকে সুন্দরভাবে সাজিয়ে রেখেছে। পাহাড়ে উঠা এমন সহজ ও সুশৃঙ্খল হতে পারে না। আহমদ মুসার মন কিসের সন্ধানে যেন উন্মুখ হয়ে উঠল। হঠাৎ একটা পাথরের পাশে গুটলি পাকানো গুঁড়া জাতীয় কিছু দেখে থমকে দাঁড়াল আহমদ মুসা। নিচু হয়ে একটা গুটলি তুলে নিল আহমদ মুসা। গুটলিটার উপর চাপ দিতে গিয়ে বিস্মিত হলো এজন্য যে, এটা ছিল সিমেন্ট-বালির মিশ্রণ। এই সিমেন্ট-বালির মিশ্রণ এখানে কি করে এল? পাথরের পাশটায় বসে পড়ল আহমদ মুসা। বসে মাথা নিচু করে পাথরটার নিচে উঁকি দিল সে। পাথরটার নিচে আরও বালি-সিমেন্ট দেখতে পেল। ভালো করে পাথরের তলাটা দেখতে গিয়ে আবারও বিস্মিত হলো আহমদ মুসা। পাথরটা সিমেন্টের প্লাস্টার দিয়ে পাহাড়ের গায়ের সাথে আটকানো।
বিস্ময়ে হা হয়ে গেল আহমদ মুসার মুখ। পাথর সিমেন্ট দিয়ে আটকানো! তার মানে এটা ম্যান-মেড একটা ট্রাক। পেছনে যে পাথরগুলো উপরে উঠাকে সুবিধাজনক করেছে সেগুলো সবই তাহলে এভাবে সেট করা, সিমেন্ট দিয়ে আটকানো? আহমদ মুসা কয়েক ফুট সামনে এই একই ট্রাকে আরেকটা পাথর দেখতে পেল এভাবে সেট করা। আহমদ মুসা লাফ দিয়ে উঠে গেল সেখানে। দেখল পাথরের তলাটা ঠিক ঐভাবে সিমেন্ট দিয়ে আটকানো।
খুশি হলো আহমদ মুসা। শুকরিয়া আদায় করল আল্লাহর। নিশ্চিত যে, এই পথেই ওরা ডেথ ভ্যালিতে যাতায়াত করে। যাতায়াতের জন্য এই ট্রাকটাতে সহজ। কারণ এই পথে ডেথ ভ্যালিতে ঘাঁটি তৈরির জন্যে নানা ওজনের, নানা আকারের জিনিস আনতে হয়েছে। নিশ্চিন্ত হলো আহমদ মুসা যে, এই ট্রাকই তাকে লক্ষ্যে নিয়ে যাবে।
আবার চলতে শুরু করল আহমদ মুসা। চলার গতি এবার দ্রুত হলো।
আহমদ মুসা পৌছে গেল ওক গাছের সেই রংধনুর মধ্যবর্তী যে গাছকে চিহ্ন ধরে আহমদ মুসা উঠে আসছিল, সে গাছের দশ বারো ফুটের মধ্যে। জায়গাটায় সমতল একটা বড় পাথর। পাথরটির উপর দাঁড়িয়ে আহমদ মুসা।
সকালের কুয়াশা এখানে নেই। সূর্য দেখতে পাওয়ার প্রশ্ন নেই, কিন্তু দিনের আলোয় ঝলমল করছে চারদিকটা।
আহমদ মুসা উপর দিকে চোখ তুলল। পাহাড়ের গা বেয়ে তার চোখ দু’টি উঠতে লাগল ওক গাছের অর্ধবৃত্তাকার রংধনুর মধ্যপয়েন্টের দিকে।
সামনেই একটা বড় পাথরের উপর চোখ দুটি আটকে গেল আহমদ মুসার। এবড়োথেবড়ো গায়ের পাথরটি পাঁচ ফিট লম্বা চার ফিট প্রস্থের হবে। পাথরটির আকৃতি ঠিক ঘণ্টা বা বেলের মতই।
হঠাৎ পাওয়ার আনন্দ তাকে এতটাই ঝাঁকানি দিল যে সে মুহূর্ত খানেকের জন্যে বাকহীন হয়ে গেল। এটাই কি সেই ঘণ্টা? এর অবস্থান অর্ধবৃত্তাকার ওক রংধনুর শীর্ষপয়েন্টের ঠিক নিচেই। পাথরটিকে যদি চেন দিয়ে বেলের মত করে টাঙানো হয়, তাহলে চেন গিয়ে শীর্ষপয়েন্টটিতেই বাঁধা পড়বে।
আহমদ মুসা আরও একটু ঘনিষ্ঠ হলো পাথরটির। এটাই যদি ঘণ্টা হয়, তাহলে ঘণ্টাদণ্ডটা কোথায়?
পাথরের এবড়োথেবড়ো গাটা আরও ভালোভাবে দেখতে লাগল আহমদ মুসা। পাথরটির উপরের দিকের মাথাটা একটা কয়েনের মত গোলাকার! এই গোলাকার একটা জায়গার উপর আহমদ মুসার চোখ দুটি আটকে গেল। পাথরটির গায়ে সামান্য উঁচু হয়ে থাকা গোলাকার জায়গার উপরটা মোটামুটি মসৃণ। সেখানে ক্ষুদ্রাকৃতির ইংরেজি কয়েকটা সংখ্যা পাথুরে রঙের কালিতে লেখা। সংখ্যাগুলো এক, সেভেন, এক এবং সেভেন। সংখ্যাগুলোর একসংগে মান দাঁড়াল এক হাজার সাতশ সতের বা সতেরশ সতের। সংখ্যাগুলোর তাৎপর্য কি? সংখ্যা সমন্বিত মান-এর কোন অর্থ আছে কি? সতেরশ সতের কি সালের নাম? এই সালের কোন ঘটনার প্রতি কি ইংগিত করা হয়েছে? কিন্তু এই সালের কোন ঘটনার কথা তার মনে পড়ছে না। কিংবা এই সংখ্যাগুলোর কোন আলাদা আলাদা অর্থ আছে কি না। বিচ্ছিন্নভাবে কিংবা সমন্বিতভাবে সংখ্যাগুলোর কোন অর্থ খুঁজে সে পেল না। তাহলে এ সংখ্যাগুলো কেন? একটু ভাবতে গিয়ে হঠাৎ আহমদ মুসার মনে ঝড়ের মত প্রবেশ করল একটা চিন্তা। আগের পাথরে লেখা ছিল হিব্রু ভাষায়, এ পাথরে ইংরেজি কেন? আহমদ মুসা আবার তাকাল পাথরের সংখ্যাগুলোর দিকে। সংখ্যাগুলোর উপর আর একবার নজর বুলাতেই ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠল আহমদ মুসার। তার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল, ওগুলো যেমন ইংরেজি সংখ্যা হতে পারে, তেমনি হতে পারে হিব্রু চারটি বর্ণ। হিব্রু এই চারটি বর্ণ মিলে যে হিব্রু শব্দ হয়, সে শব্দ হলো ‘কেরেন’। হিব্রু ‘কেরেন’ শব্দ মনে আসতেই চমকে উঠল আহমদ মুসা। এমন শব্দের সংকেতই তো খুঁজছে সে। হিব্রু ‘কেরেন’ শব্দের অর্থ আলোর কিরণ। এই আশার আলোকেই আহমদ মুসা খুঁজছে।
স্বস্তির একটা নিঃশ্বাস বেরিয়ে এল আহমদ মুসার বুক থেকে। তাহলে ঘণ্টার ঘণ্টাদণ্ড পাথরের এই ক্ষুদ্র নবটাই, ভাবল আহমদ মুসা। এই নবটার কোন ফাংশন আছে? এটাই যদি ঘণ্টাদণ্ড হয়, তাহলে তো এর ফাংশন থাকতেই হবে। কি সেটা?
আহমদ মুসা পাথরটার আরও ঘনিষ্ঠ হলো। হাত দিয়ে নবটা স্পর্শ করল। পাথরটির ঘনিষ্ঠ হওয়ায় আহমদ মুসা দেখল, পাথরের গা এবড়োথেবড়ো বটে, কিন্তু মাঝে মাঝে পাথরের যে মসৃণ গা দেখা যাচ্ছে, সেটার মসৃণতা পাথরের মত নয়, কেমন যেন রঙের প্রলেপের মত দেখতে। বিস্মিত আহমদ মুসা পাথরের একটা মসৃণ জায়গায় আঙুল দিয়ে টোকা দিল জোরে। তাতে যে শব্দ উঠল তা পাথরের ভারি ও সলিড শব্দ নয়, শব্দটা হালকা এবং খুব সংক্ষিপ্ত হলেও সুরের স্পন্দন রয়েছে তাতে। সংগে সংগেই আহমদ মুসা বুঝল, এটা পাথর নয় স্টিল। স্টিলের উপর পাথুরে রং করা হয়েছে এবং এবড়োথেবড়ো পাথর বসিয়ে স্টিলকে পাথরের রূপ দেয়া হয়েছে।
রোমাঞ্চ দিয়ে উঠল আহমদ মুসার শরীর। এটাই তাহলে ডেথ ভ্যালিতে ঢোকার দরজা। দরজাটাকে সফলভাবে ক্যামোফ্লেজ করা হয়েছে। একেবারে হাত দিয়ে টোকা না দিলে বোঝার উপায় নেই যে, এটা পাহাড়ের গায়ের নিরেট পাথর ছাড়া অন্য কিছু।
দরজা পাওয়ার পর আহমদ মুসার মন তৎপর হয়ে উঠল দরজা কিভাবে খোলা যাবে সে চিন্তায়। সে ভাবল নবটাকে যদি ঘণ্টাধ্বনি বলা হয়, তাহলে এটাই হবে দরজা খোলার চাবিকাঠি। আর নবের উপর লেখা ‘আলোর কিরণ’ শব্দ দু’টি এরই ইংগিত দিচ্ছে।
নবে চাপ দিল আহমদ মুসা। নব শক্ত, একটুও নড়চড় নেই। এবার আহমদ মুসা নবটাকে আস্তে আস্তে টানতে শুরু করল।
এবার নব নড়ল। উঠে এল ইঞ্চিখানেক। সংগে সংগে দরজা নড়ে উঠল। দরজার উপরের দিকটা আস্তে আস্তে আলগা হয়ে নামতে শুরু করল।
দরজা খুলছে। মেঝের দিকে নেমে যাচ্ছে। তার মাঝে ভেতরে ফাকা? সেটা কি সুড়ঙ্গ কিংবা সিঁড়ি হতে পারে? না কোন কক্ষ?
সাবধান হলো আহমদ মুসা। প্রহরীও থাকতে পারে।
আহমদ মুসা পাশে সরে দাঁড়াল, যাতে এই মুহূর্তে দরজা খুলে যাবার আগেই কারও নজরে না পড়ে যায়।
