৫৫. ডেথ ভ্যালি

চ্যাপ্টার

মোবাইলে জর্জ আব্রাহাম জনসনের কণ্ঠ পেয়েই চমকে উঠল সারা জেফারসন। বলল, ‘গুড মর্নিং। সব খবর ভালো তো আংকেল?’
‘গুড মর্নিং। আমি তোমাদের গেটে। আমি আসতে চাই।’ বলল জর্জ আব্রাহাম জনসন।
বুকটা কেঁপে উঠল সারা জেফারসনের। আংকেল এই সাত সকালে আমাদের গেটে? কি ঘটেছে যে, আগে টেলিফোন করারও সময় হয়নি? অনেকটা কম্পিত কণ্ঠেই সারা জেফারসন বলল, ‘আমি আসছি আংকেল।’ বলে মোবাইল রেখে ছুটল সারা জেফারসন গেটের দিকে।
এ সময় মারিয়া জোসেফাইনও সেখানে হাজির।
সারাকে ছুটতে দেখে বলল, ‘কি ব্যাপার সারা? কি হয়েছে? ছুটে কোথায় যাচ্ছ?’
সারা জেফারসন মুখ পেছন ফিরিয়ে বলল, ‘জর্জ আংকেল গেটে।
ওকে নিয়ে আমি আসছি।’
জর্জ আংকেল মানে জর্জ আব্রাহাম জনসন গেটে? তিনি এসেছেন? খবর তো দেননি? হঠাৎ কি ঘটল। বুকটা কেঁপে উঠল জোসেফাইনের। মনে মনেই সে বলল, ‘লা হাওলা ওয়া লা-কুয়াতা ইল্লাহ বিল্লাহ।’
আল্লাহ ছাড়া আর কোন আশ্রয় ও শক্তি নেই।’
জোসেফাইনও এক পা দু’পা করে সামনে এগোতে লাগল।
জর্জ আব্রাহাম জনসনকে সাথে করে নিয়ে আসছে সারা জেফারসন।
‘আস্সালামু আলাইকুম।’ সালাম দিল জোসেফাইন জর্জ আব্রাহামকে।
‘ওয়াআলাইকুম। মা কেমন আছ? অনেকখানি বিমর্ষ লাগছে তোমাকে।’ আব্রাহাম জনসন বলল।
হাসার চেষ্টা করে জোসেফাইন বলল, ‘না, তেমন কিছু নয় আংকেল। আপনি আসুন।’
‘হ্যাঁ আংকেল তেমন কিছু নয়। তবে কিছু তো বটেই। আপনাকে কাছে পেলেই কিছু প্রশ্ন তো মনে জাগেই।’ বলল সারা জেফারসন।
জর্জ আব্রাহাম লাউঞ্জে একটা সোফায় বসতে বসতে বলল, ‘ঠিকই বলেছ সারা। আমি দুঃখিত। তোমরা অনেক কষ্ট পাচ্ছ।’ জর্জ আব্রাহামের গম্ভীর কণ্ঠ।
‘না আংকেল, কষ্ট নয়। এক ধরনের টেনসন বলতে পারেন।’ বলল সারা জেফারসন।
‘আমি প্রেসিডেন্টের কাছে যাচ্ছি এ পথ হয়ে। তাই আসলাম তোমাদের সাথে কথা বলব বলে। টেলিফোনে তো সব কথা বলা যায় না।’
বলে একটু থেমেই আবার শুরু করল, ‘তোমাদেরও দোয়া চাই আমরা। সকলেরই সম্মিলিত প্রার্থনা দরকার।’
মনে মনে চমকে উঠল জোসেফাইন ও সারা জেফারসন দু’জনেই। কি ঘটেছে? বড় কিছু ঘটেছে কি? মনে মনে অস্থির হয়ে উঠল দু’জনেই।
জর্জ আব্রাহাম জনসনই আবার কথা বলে উঠল, ‘আজকেই আহমদ মুসার ডেথ ভ্যালিতে প্রবেশের কথা। আমি খবর পেয়েছি, আহমদ মুসা ফজরের নামাজের পর একটু রেস্ট নিয়েই ডেথ ভ্যালির উদ্দেশ্যে বেরিয়েছে। আমরা…।’
‘মাফ করবেন আংকেল, উনি কি শেষ পর্যন্ত একাই ঢুকছেন ডেথ ভ্যালিতে?’ জর্জ আব্রাহাম জনসনের কথার মাঝখানেই কথা বলে উঠল সারা জেফারসন।
‘হ্যাঁ মা। আহমদ মুসার সিদ্ধান্ত আমরাও মেনে নিয়েছি।’ জর্জ আব্রাহাম জনসন বলল।
‘ডেথ ভ্যালিতে ঢোকার পথ কি পাওয়া গেছে আংকেল?’ জিজ্ঞাসা জোসেফাইনের।
‘না মা, পাওয়া যায়নি। তবে ডেথ ভ্যালির উত্তর-পাহাড়ের গায়ে লুকায়িত একটা পাথরে হিব্রু বর্ণমালায় কয়েকটা সংকেত পেয়েছে। সে সংকেত থেকে কিছু স্থান সে চিহ্নিত করেছে। তার ধারণা পথ সে পেয়ে যাবে।’ জর্জ আব্রাহাম জনসন বলল।
কথা শেষ করে নড়ে চড়ে বসে আবার শুরু করল, ‘আমরা খুব দুর্ভাবনায় আছি মা। একদিকে আহমদ মুসার নিরাপত্তার চিন্তা, অন্যদিকে ওদের আলটিমেটামের সময় শেষ হচ্ছে আজ দুপুর ১২টায়। এই সময়ের মধ্যে ওদের গোপন অস্ত্রটি ধ্বংস করতে না পারলে আমেরিকায় প্রলয়কাণ্ড ঘটে যাবে। আর আমরা যদি এ থেকে বাঁচার জন্যে শেষ কাউন্টার অফেনসিভে যাই, তাহলে আর এক ধরনের প্রলয় ঘটবে, বিপর্যয় আসবে দেশের রাজনীতিতে। অবশ্যম্ভাবী এই দুই প্রলয় থেকে বাঁচার জন্যে আমরা নির্ভর করছি আহমদ মুসার সাফল্যের উপর।’ থামল জর্জ আব্রাহাম জনসন।
‘আহমদ মুসাকে সাহায্যের কোন ব্যবস্থা আপনারা রেখেছেন কি না।’ বলল জোসেফাইন।
‘আমাদের কমান্ডো বাহিনী ওখানে ল্যান্ড করার জন্য হেলিকপ্টার নিয়ে প্রস্তুত আছে। আহমদ মুসা সংকেত পাঠাবার পর তারা অ্যাকশনে যাবে। আহমদ মুসা ওদিকটার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পর সংকেত পাঠাবে। আমরা তারই অপেক্ষা করব।’ জর্জ আব্রাহাম জনসন বলল।
‘আর উনি যদি সংকেত না পাঠাতে পারেন?’ বলল জোসেফাইন। তার কণ্ঠে উদ্বেগ।
‘অমন পরিস্থিতি যেন আল্লাহ না দেন। আমরা আশা করছি, সে সংকেত পাঠাতে পারবে।’ জর্জ আব্রাহাম জনসন বলল।
‘আমিন।’ বলল জোসেফাইন ও সারা জেফারসন দু’জনেই।
‘আমিন’ বলল জর্জ আব্রাহাম জনসনও। সাথে সাথেই জর্জ আব্রাহাম জনসন আবার বলে উঠল, ‘এই দোয়াই চাইতে এসেছি তোমাদের কাছে।’
‘হ্যাঁ আংকেল, যে ভয়াবহ পরিস্থিতির কথা আপনি বললেন, তা আমরা জানতাম না। তবু আমরা দোয়া করছি আহমদ মুসার জন্যে, দেশের জন্যেও। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আহমদ মুসাকে নিরাপদ করুন, তাকে সফল করুন এবং দেশকেও আল্লাহ নিরাপদ রাখুন। বলল জোসেফাইন।
‘আলহামদুলিল্লাহ। ধন্যবাদ মা তোমাদের।’
বলে একটু থামল। আবার বলল, ‘যখন যে খবর পাই, সংগে সংগে তোমাদেরও জানাবো আমি। আহমদ মুসার পকেটে ট্রান্সমিটার চিপস আছে। ভেতরের কথা ও শব্দ জাতীয় বিষয় অব্যাহতভাবে আমরা জানতে পারবো।’
‘ধন্যবাদ আংকেল। আমরা উদ্বেগে থাকব। আপনার কাছ থেকে খবর পেলে আমরা খুশি হবো।’ বলল সারা জেফারসন।
‘অনুমতি দাও মা, আমি উঠি। প্রেসিডেন্টের কাছে আটটার মধ্যে আমাকে পৌঁছতে হবে।’
বলতে বলতে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে উঠে দাঁড়াল জর্জ আব্রাহাম জনসন।
জোসেফাইন ও সারা জেফারসন এগিয়ে দিল জর্জ আব্রাহাম জনসনকে গেট পর্যন্ত।
গাড়িতে উঠতে গিয়ে ফিরে দাঁড়াল জর্জ আব্রাহাম জনসন। জোসেফাইনের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আমার জানা মতে এত বড়, এত গুরুত্বপূর্ণ, এতটা বিপজ্জনক, এতটা দায়িত্বপূর্ণ, এতটা প্রয়োজনীয় কোন অভিযানে আহমদ মুসা এভাবে যায়নি। আচ্ছা মা বলতো, আহমদ মুসার এই অভিযান সম্পর্কে তুমি কি ভাবছ?’
সংগে সংগেই সারা জেফারসন বলল, ‘এ পরিস্থিতিতে যা করা দরকার তিনি তাই করছেন। আল্লাহর প্রতি তাঁর অসীম ভরসা। আল্লাহ তাঁকে সাহায্য করবেন।’
‘ধন্যবাদ মা, এই কথাই আমি শুনতে চেয়েছিলাম। আজ এই পরিস্থিতিতে স্বস্তি, শক্তি ও আস্থার অবলম্বন এই একটাই। আসি মা। তোমরা ভালো থেক।’
গাড়িতে উঠল জর্জ আব্রাহাম জনসন। সকাল ৮টা ১৫ মিনিট।
প্রেসিডেন্ট ভবনের সিচুয়েশন কক্ষে সংকটকালীন কমিটির বৈঠক। এ বৈঠকে নিয়মিত সদস্য ছাড়াও কংগ্রেস ও সিনেটের সরকারি ও বিরোধী দলীয় ৪জন নেতাসহ সিনেট ও কংগ্রেসের দুই ইন্টেলিজেন্স কমিটির চেয়ারম্যানকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। প্রেসিডেন্ট মনে করেছে এই সংকটকালে সিনেট ও কংগ্রেস নেতাদের সবকিছু অবহিত থাকা দরকার।
সিচুয়েশন কক্ষে সবাই এসে আসন গ্রহণ করেছে। শুধু বাকি আছে প্রেসিডেন্ট, এফবিআই প্রধান জর্জ আব্রাহাম জনসন এবং সিআইএ প্রধান এডমিরাল ওয়াটসন।
ঠিক আটটা পনের মিনিটেই প্রেসিডেন্ট প্রবেশ করল মিটিংরুমে।
তার পেছনে পেছনে প্রবেশ করল জর্জ আব্রাহাম জনসন ও এডমিরাল ওয়াটসন।
সবাই উঠে দাঁড়াল। প্রেসিডেন্ট বসল। বসল সবাই।
বসে প্রেসিডেন্ট সবার দিকে চাইল। বলল প্রেসিডেন্ট, ‘সবাইকে গুড মর্নিং।’
একটু থামল প্রেসিডেন্ট। ধীরে ধীরে আবার কথা শুরু করল প্রেসিডেন্ট, ‘রাষ্ট্রীয় সংকটকালে আমরা আবার বসেছি। সিনেটের দুই নেতা এবং কংগ্রেসের দুই নেতাকেও আমি এ মিটিং-এ ডেকেছি।
তাঁদের সবকিছু জানা দরকার।’ থামল প্রেসিডেন্ট।
‘মি. প্রেসিডেন্ট, কোন্ রাষ্ট্রীয় সংকটের কথা বলছেন?’ সিনেটের বিরোধী দলীয় নেতা বলল।
‘হ্যাঁ, আমিও একথাই জানতে চাচ্ছিলাম।’ বলল কংগ্রেসের বিরোধী দলীয় নেতা।
সিনেট ও কংগ্রেসের সংখ্যাগরিষ্ঠ দুই নেতাও প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে প্রেসিডেন্টের দিকে চাইল।
‘ধন্যবাদ সিনেট ও কংগ্রেস নেতৃবৃন্দ, বিষয়টা আমি বলছি।’
বলে প্রেসিডেন্ট আহমদ মুসার কিডন্যাপ হওয়া, এইচ থ্রি’র ঘাঁটি থেকে আহমদ মুসার পালানো, ঘাঁটিটা সরকারি দখলে আসা, নতুন অস্ত্রগবেষণার সন্ধান লাভ, এইচ থ্রি’র তাড়া খেয়ে আহমদ মুসার গাড়ি সমেত নদীতে পড়ে নিখোঁজ হওয়া, আহমদ মুসার গোপন এক মাধ্যমে আমাদের কাছে খবর পৌঁছানো, যে সন্ত্রাসী সংগঠন এইচ থ্রি ভয়ংকর অস্ত্র তৈরি করেছে যা মিনিটেই আমেরিকার সমস্ত অস্ত্র অকেজো করে দেবার কথা, এইচ থ্রি’র আলটিমেটাম, তাদের শর্ত না মানলে আজ বেলা ১২টার পর তাদের আক্রমণ চালানোর কথা, জবাব হিসেবে সরকার কর্তৃক অস্ত্র ব্যবহারের আগেই ওদের অস্ত্র অকেজো করার উদ্যোগ নেয়া ইত্যাদি বিষয় সংক্ষেপে তুলে ধরল প্রেসিডেন্ট।
পিনপতন নীরবতার মধ্যে প্রেসিডেন্ট তার কথা শেষ করল।
প্রেসিডেন্ট কথা শেষ করলেও সবাই নীরব। সিনেট ও কংগ্রেসের চার নেতার চোখ-মুখ উদ্বেগে আচ্ছন্ন হয়ে গেছে। নিজেদের সামলে নিতে তাদের কিছু সময় লেগে গেল।
প্রথমে মুখ খুলল সিনেটের বিরোধী দলীয় নেতা। বলল, ‘আলটিমেটামের বিষয়টা প্রেসনোট আকারে আনা হয়নি কেন, জাতিকে জানানো হয়নি কেন?’
‘ধন্যবাদ। আলটিমেটামের বিষয়টি জানানো হয়নি কারণ, তিনটি শর্ত ফাঁস হলে আমাদের সাংঘাতিক একটি রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা প্রকাশ হয়ে পড়ত।’ বলল প্রেসিডেন্ট।
‘সেটা কি মি. প্রেসিডেন্ট?’ বলল কংগ্রেসের বিরোধী দলীয় নেতা।
‘সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ‘ম্যাগনেটিক ডেথ ওয়েভ (MDW) নামে একটা অস্ত্র আবিষ্কার করেছে, যা মুহূর্তে ও নিঃশব্দে হাজার হাজার মাইল দূরের মেটালিক সব অস্ত্র অকেজো করে দিতে পারে ৬ থেকে ১২ মাসের জন্যে। অস্ত্রগুলোর ম্যাগনেটিক ও ইলেকট্রনিক ব্যবস্থা পুনর্গঠন ছাড়া অস্ত্রগুলো আর কার্যকরীই করা যাবে না। এই অস্ত্র আবিষ্কারের কথা একদম গোপন রাখা হয়েছে।’ বলল প্রেসিডেন্ট।
‘কিন্তু সন্ত্রাসী পক্ষ কি এটা জানে?’ বলল সিনেটে সংখ্যাগুরু দলের নেতা।
‘শুধু জানে নয়, তারাও এই অস্ত্র তৈরি করেছে। এই অস্ত্রকে ডেটোনেট করার নিরাপদ ও নিয়ন্ত্রিত পদ্ধতিই মাত্র তারা আবিষ্কার করতে পারেনি।’ বলল প্রেসিডেন্ট।
‘কিন্তু মি. প্রেসিডেন্ট, তারা যে অস্ত্র দিয়ে আক্রমণের জন্যে প্রস্তুত, সেটা কোন অস্ত্র?’ সিনেটের বিরোধী দলীয় নেতা বলল।
‘সেটা আরেক ধরনের অস্ত্র। তার নাম ‘ম্যাগনেটিক ফায়ার ওয়েভ(MFW)’। এটা ভয়াবহ একটা ধ্বংসকরী অস্ত্র। এর অদৃশ্য শক্তি ব্ল‍্যাক ফায়ার মেটালিক অস্ত্র এবং মেটালিক সবকিছুকে নিঃশব্দে, নীরবে হাওয়া করে দেয়।’ বলল প্রেসিডেন্ট।
‘ও গড!’ বলে আর্তনাদ করে উঠল সিনেট ও কংগ্রেসের চার নেতা।
কংগ্রেসের বিরোধী দলীয় নেতা প্রায় কম্পিত কণ্ঠে বলে উঠল, ‘তাহলে আমরা এখন এই অস্ত্রের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে? তার মানে বেলা ১২টার পর যেকোনো সময় তারা এ অস্ত্র প্রয়োগ করতে পারে?’
‘আমরা সেই আশংকা করছি।’ বলল প্রেসিডেন্ট।
‘আত্মরক্ষার জন্যে কিংবা আগাম আক্রমণে গিয়ে নিজেদের বাঁচাবার জন্যে আমরা কি ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি?’ বলল সিনেটের বিরোধী দলীয় নেতা। তার কণ্ঠে উদ্বেগ।
‘এই অস্ত্র মোকাবেলা করা কিংবা প্রতিরোধ করার কোন ব্যবস্থা আমাদের হাতে নেই। সন্ত্রাসীরা এই অস্ত্র যে তৈরি করেছে তা আমাদের জানাই ছিল না। আহমদ মুসার মেসেজেই আমরা এটা প্রথম জানতে পারি।’ বলল প্রেসিডেন্ট।
‘আমরা জানতে পারলাম না, আহমদ মুসার মত একজন ব্যক্তি এটা জানল কিভাবে?’ বলল কংগ্রেসের বিরোধী দলীয় নেতা।
‘আহমদ মুসাকে তারা কিডন্যাপ করে তাকে বাধ্য করতে চেয়েছিল, দরকার হলে তার মগজ ধোলাই করে, আমেরিকান সরকারের গোপন অস্ত্রের ডেটোনেশন ফর্মুলা হাত করতে চেয়েছিল। এই সময়ই তাদের আবিষ্কৃত অস্ত্র সম্পর্কে জানতে পারে আহমদ মুসা এবং সেটাই সে আমাদের জানায়।’ বলল প্রেসিডেন্ট।
‘আলটিমেটাম শেষ হবার আগেই আমরা আগাম এয়ারস্ট্রাইক কিংবা ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে ওদের ঘাঁটি ধ্বংস করে আমাদেরকে নিরাপদ করতে তো পারি?’ সিনেটের বিরোধী দলীয় প্রধান বলল।
‘এক্ষেত্রে প্রধান সমস্যা হলো, ওরা ওদের ম্যাগনেটিক পাহারা. ব্যবস্থার মাধ্যমে এই আক্রমণের বিষয় জানার সম্ভাবনা আছে। জানতে পারলে মুহূর্তেই একদিকে তারা আক্রমণকে নিষ্ক্রিয় করে দিতে পারে, অন্য দিকে তারা অফেনসিভে এসে আমাদের উপর সার্বিক আঘাত হানতে পারে। এজন্যে আক্রমণের ঝুঁকি নেয়া যাচ্ছে না। তাছাড়া আক্রমণ কোথায়, কয় জায়গায় করা হবে। এ ব্যাপারে আমাদের কাছে কোন তথ্য নেই। আহমদ মুসা ডেথ ভ্যালিতে ওদের একটা ঘাঁটি আছে বলে মনে করছিল। মাত্র গতকাল সন্ধ্যায় সে নিশ্চিত হয়েছে তার অনুমান ঠিক। ডেথ ভ্যালিতে ওদের একটা ঘাঁটি রয়েছে এবং এই ঘাঁটি থেকেই তারা আক্রমণের প্রস্তুতি গ্রহণ করছে।’ বলল প্রেসিডেন্ট।
‘আমরা আহমদ মুসার প্রতি কৃতজ্ঞ। কিন্তু দেখছি আমরা একদম আহমদ মুসা-নির্ভর হয়ে পড়েছি। আমাদের গোয়েন্দারা কি করছে?’ বলল সিনেটের বিরোধী দলীয় নেতা।
‘এর কারণ হলো, ওরা এখনও জানে যে, ওদের গোপন অস্ত্রের কথা আমরা জানি না। যেহেতু আহমদ মুসা ওদের ঘাঁটি থেকে পালাবার পরই নিখোঁজ হয়ে গেছে এবং তার সাথে আমাদের আর দেখা হয়নি, তাই সে এ বিষয়ে আমাদের কিছু জানাবার সুযোগও পায়নি। তাদের এই চিন্তাকে আমরা ভাঙতে চাই না। কারণ যে মুহূর্তে তারা এটা জানবে সে মুহূর্তেই তারা তাদের আত্মরক্ষার জন্যে আগাম আক্রমণে চলে আসবে। এজন্যেই আমরা আমাদের গোয়েন্দাদের কাজে লাগাচ্ছি না। তারা ধরা পড়লে, তাদের তৎপরতা সম্পর্কে তারা জানতে পারলে, ওরা ধরে নিতে পারে যে, নিশ্চয় আমরা কিছু জেনেছি। আমরা চাচ্ছি, নিখোঁজ আহমদ মুসার সাহায্য নিতে। আহমদ মুসাই তাদের সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি জানে।’ বলল প্রেসিডেন্ট।
‘ধন্যবাদ মি. প্রেসিডেন্ট, বিষয়টা আমি বুঝেছি।’ সিনেটের বিরোধী দলীয় নেতা বলল।
‘ওয়েলকাম, সম্মানিত সিনেট নেতা।’ বলল প্রেসিডেন্ট।
‘প্রেসিডেন্ট কথা শেষ করলেও আর কোন কথা কেউ বলল না।
সবার দিকে একবার চোখ বুলিয়ে প্রেসিডেন্টই আবার বলল, ‘সিনেট ও কংগ্রেসের সম্মানিত নেতৃবৃন্দ পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত হয়েছেন। এখন আমরা মূল আলোচনায় আসতে পারি।’
বলে প্রেসিডেন্ট একটু থেমে আবার শুরু করল, ‘এখন সকাল সাড়ে আটটা বাজে। বেলা ১২টায় ওদের আলটিমেটাম শেষ হয়ে যাচ্ছে। আমরা ওদের শর্ত মেনে নিতে পারিনি, তা মানা কোনো দিক দিয়েই সম্ভব নয়। কারণ তাতে আমাদের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব কিছুই থাকবে না। তাদের শর্ত মেনে না নেওয়ায় ওদের তৃতীয় বিকল্প সামনে এসে গেছে। বেলা ১২টার পর আমরা ওদের গোপন ও ভয়ংকর আক্রমণের মুখে পড়ব। এর মোকাবিলার জন্য আমরা যে পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি, সেটা হলো তারা যে অস্ত্র নিয়ে আক্রমণে আসার জন্যে প্রস্তুত হয়ে বসে আছে, সেই অস্ত্রকেই ধ্বংস অথবা অকেজো করে ফেলা। এ দায়িত্ব গিয়ে বর্তেছে আহমদ মুসার কাঁধে। আমাদের পরিকল্পনার ফল এটা নয়। এ যেন ঈশ্বরের সিলেকশন। এই পদক্ষেপ ব্যর্থ হলে আমাদের শেষ ও নিরুপায় পদক্ষেপ হলো ওদের অস্ত্র ধ্বংস বা নিষ্ক্রিয় করে দেবার জন্যে আমাদের MDW ব্যবহার করা। এতে আমরা ওদের হাতে পড়ার হাত থেকে বাঁচব বটে, কিন্তু আমাদের সব কৌশলগত ও অন্যান্য মারণাস্ত্র ধ্বংস হয়ে যাবে। এর সুযোগ গ্রহণ করবে ষড়যন্ত্রকারীরা। তারা আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পতন ঘটিয়ে ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করবে। সুতরাং এই শেষ অপশন আমাদের জনগণ ও দেশের জন্যে বিপজ্জনক। একমাত্র আহমদ মুসার সাফল্যই আমাদের দুই ধ্বংসাত্মক সংকট থেকে রক্ষা করতে পারে।’ থামল প্রেসিডেন্ট।
সিনেট ও কংগ্রেসের চার নেতার মুখ উদ্বেগ-আতংকে একেবারে পাণ্ডুর হয়ে উঠেছে। সংকটকালীন কমিটির সদস্য সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনী, সেনা গোয়েন্দা প্রধান, প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা উপদেষ্টা, সিআইএ ও এফবিআই প্রধান সকলের মুখ নিচু।
প্রেসিডেন্ট কথা শেষ করে তাকাল এফবিআই প্রধান জর্জ আব্রাহাম জনসনের দিকে। বলল, ‘মি. জর্জ জনসন সর্বশেষ পরিস্থিতি সম্পর্কে আপনি কমিটিকে বলুন।’
জর্জ আব্রাহাম জনসন আগেই মাথা তুলে সোজা হয়ে বসেছিল। বলল, ‘ইয়েস এক্সিলেন্সি।’
বলে একটু থেমে কথা শুরু করল জর্জ আব্রাহাম জনসন, ‘আহমদ মুসা আজ তার ভোরের প্রার্থনা শেষে ডেথ ভ্যালিতে প্রবেশের জন্যে যাত্রা শুরু করেছে। এ খবর পাওয়ার পর থেকেই আমি ফলো করার চেষ্টা করছি সেখানকার পরিস্থিতিকে। আমরা তার পকেটে কোনভাবেই ডিটেকটেবল নয় এমন আলট্রা সেনসেটিভ চিপস দিয়েছি। তিনি এগুলো ঘাঁটির যেখানেই যাবেন ছড়িয়ে দেবেন। ছড়িয়ে দিতে না পারলেও ক্ষতি নেই। তার পকেটে থাকলেও বেশ দূর পর্যন্ত আশেপাশের সবকিছুই মনিটর করতে পারবে চিপসগুলো। ঘড়ির টিক টিক শব্দ পর্যন্ত এর মনিটরিং-এ আসবে। ভোর থেকে মনিটরিং-এ কোন তথ্য পাওয়া যায়নি। এই মাত্র এক্সিলেন্সি কথা শেষ করার সময় চিপসের মনিটরিং-এ একটা ভারি কিছু পতনের শব্দ পাওয়া গেছে। একটা ভারি কিছু যেন নরম কিছুর উপর পড়েছে। একটা যান্ত্রিক শোঁ শোঁ শব্দও এর সাথে ছিল। এ থেকে বুঝা গেছে, ভারি জিনিসের পতনটা নিয়ন্ত্রিত। আমার মনে হয়েছে, একটা ভারি দরজার পাল্লা যেন নিয়ন্ত্রিতভাবে খুলে গিয়ে মাটিতে নরম কিছুর উপর পড়েছে। এটাই নিশ্চিত করে যে আহমদ মুসা ঢুকেছে ওদের ঘাঁটিতে।’ থামল জর্জ আব্রাহাম জনসন।
জর্জ আব্রাহাম জনসন থামতেই প্রেসিডেন্ট বলে উঠল, ‘চিপসের মনিটরিং তো ইফেক্টসহ সাউন্ড স্ক্রিনে আনা যায়।’
‘ইয়েস এক্সিলেন্সি, আনা যায়। সে ব্যবস্থাও করা হয়েছে। আপনি অনুমতি দিলে আমরা এটা স্টার্ট করতে পারি।’
‘অবশ্যই করবেন মি. জর্জ জনসন।’
বলে প্রেসিডেন্ট সিনেট ও কংগ্রেসের নেতৃবৃন্দসহ সবার দিকে একবার চেয়ে বলল, ‘ভদ্রমহোদয়গণ, ওদের আলটিমেটাম শেষ হওয়া পর্যন্ত মানে আড়াই ঘণ্টা সময় ধরে আমাদের মিটিং চলবে। ভালোই হলো। আমরা আহমদ মুসার অভিযান কিছুটা হলেও ফলো করতে পারবো এবং তার অভিযানের রেজাল্টও আমরা জানতে পারবো। ঈশ্বর না করুন, আহমদ মুসা যদি ব্যর্থ হন, তাহলে আমাদের MDW কাজে লাগাবার জন্য নিরুপায় সিদ্ধান্তও আমরা এখানে বসেই গ্রহণ করব। আমাদের পেন্টাগন ও স্ট্রাটেজিক কমান্ড রেডি আছে। স্ট্রাটেজিক কমান্ড চেষ্টা করবে MDW-কে নিয়ন্ত্রিত করে ক্ষতিকে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নিয়ে আসার।’
সিনেট ইন্টেলিজেন্স কমিটির চেয়ারম্যান বলল, ‘এত বড় সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে আমরা আমাদের বন্ধু রাষ্ট্রগুলোর সাথে বিকল্প নিয়ে আলোচনা করেছি নিশ্চয়? আর তাদের শর্ত মেনে নিলে তার ক্ষতিটা কত হতো?’
‘ধন্যবাদ সিনেট ইন্টেলিজেন্স কমিটির চেয়ারম্যানকে। আমরা তাদের দাবি মেনে নিলে আমাদের অস্ত্র অকেজো হয়ে পড়ত। অন্যদিকে সন্ত্রাসীদের আমাদের উপর ধ্বংসাত্মক আক্রমণের অস্ত্র ঠিকই থাকতো। এই অবস্থায় ওদের শর্ত মেনে নেবার অর্থ হলো আমেরিকান নেশন ও গণতন্ত্রের আত্মসমর্পণ সন্ত্রাসীদের কাছে। আমরা আমাদের বন্ধু রাষ্ট্রগুলোর সাথে এ বিষয় নিয়ে যতটা সম্ভব খোলাখুলি আলোচনা করেছি। MFW বা ‘ম্যাগনেটিক ফায়ার ওয়েভ’ নামের সন্ত্রাসীদের অস্ত্রের প্রতিরোধক কোন কিছুই নেই কারও কাছে। তারা সন্ত্রাসী এবং তাদের অস্ত্রের উপর গোপন আক্রমণ ও ধ্বংস করাকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। পরিস্থিতি কি দাঁড়ায় সে অনুসারে তারা আমাদের সাহায্য করতেও প্রস্তুত আছে।’ বলল প্রেসিডেন্ট।
‘ধন্যবাদ মি. প্রেসিডেন্ট। আমি বুঝতে পেরেছি। শতাব্দীর এক ভয়ংকর সংকটকে আমরা মোকাবিলা করছি। ঈশ্বর আমাদের সহায় হোন।’ বলল সিনেট ইন্টেলিজেন্স কমিটির চেয়ারম্যান।
‘ওয়েলকাম ইন্টেলিজেন্স কমিটির চেয়ারম্যান।’ বলল প্রেসিডেট।
কথা শেষ করেই প্রেসিডেন্ট তাকাল জর্জ আব্রাহাম জনসনের দিকে।
বলল, ‘মনিটরের জন্যে সাউন্ড স্ক্রিন চালু করছেন মি. জর্জ জনসন।’
‘সব ঠিক হয়েছে। এখনি সাউন্ড স্ক্রিন চালু হয়ে যাবে।’ জর্জ আব্রাহাম জনসন বলল।
কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সাউন্ড স্ত্রিনের সাথে চিপস মনিটরিং-এর ব্যবস্থা সেট হয়ে গেল। চালু হয়ে গেল সাউন্ড স্ক্রিন।
স্ক্রিন চালু করার সাথে সাথে একটা শক্ত ধাতব বস্তুর উপর পায়ের শব্দ শোনা গেল, তার সাথে দুটি সংক্ষিপ্ত শীষ দেয়ার মত শব্দও উঠল।
‘এক্সিলেন্সি এই শীষ দুটি বিশেষ ধরনের গ্যাসগানের।’ বলল সেনা গোয়েন্দা প্রধান প্রেসিডেন্টকে লক্ষ্য করে।
‘সংঘর্ষ তাহলে শুরু হয়ে গেছে। আহমদ মুসার কাছে তো গ্যাসগান নেই। ও গড?’ অনেকটা স্বগত উক্তির মত বলল প্রেসিডেন্ট।
সবাই প্রেসিডেন্টের কথা শুনতে পেল। সকলের মুখে নেমে এসেছে উদ্বেগের কালো ছায়া। সকলের চোখ সাউন্ড স্ক্রিনের দিকে নিবদ্ধ।

দরজাটি আস্তে আস্তে নেমে নিঃশব্দে মেঝের উপর সেট হয়ে গেল।
আহমদ মুসার মনে হলো মেঝেতে সেট হওয়া এই দরজার উপর দিয়েই নিশ্চয় যাতায়াত ব্যবস্থা।
দরজাটি মেঝেতে স্থির হবার পরেও আহমদ মুসা রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করতে থাকল কেউ বের হয় কি না তা দেখার জন্যে। প্রহরায় কেউ থাকলে অবশ্যই দরজা খুলে যাওয়া দেখে মনে করবে তাদেরই কেউ প্রবেশ করছে। কেউ না ঢুকলে নিশ্চয় তার মনে প্রশ্ন জাগবে, কি হলো, কেউ ঢুকছে না কেন? এই জিজ্ঞাসাই তাকে বের করে নিয়ে আসবে।
হলোও তাই।
হাতে গ্যাসগান ধরা ছ’ফুটের মত লম্বা একজন লোক ‘কে বাইরে আছেন, ভেতরে আসুন’ বলে মুখ বাড়িয়ে বাইরে উঁকি দিল।
এই সুযোগেরই অপেক্ষায় ছিল আহমদ মুসা। লোকটির সামনে বাড়ানো মুখের সাথে সাথে উন্মুক্ত ঘাড়টাও বাইরে বেরিয়ে এসেছিল।
উন্মুক্ত ঘাড়টা দেখার সাথে সাথেই আহমদ মুসার ডান হাত বিদ্যুৎবেগে উপরে উঠেছিল।
এই সময় আহমদ মুসাও তার নজরে পড়ে গেল।
আহমদ মুসার হাত উপরে উঠতে দেখেই লোকটি ঘটনা কি বুঝতে পেরেছিল এবং ভীত হবার বদলে জ্বলে উঠেছিল তার চোখ। এই পরিস্থিতিতে সে নিজেকে রক্ষা করবে, না আক্রমণে যাবে এই উভয় সংকট তার মধ্যে দেখা দিয়েছিল। সে আক্রমণে যাবারই সিদ্ধান্ত নিল। গ্যাসগানের ট্রিগার ছুঁয়েই ছিল তার আঙুল। চোখের পলকেই তার গ্যাসগানের ব্যারেলটা আহমদ মুসার লক্ষ্যে উপরে উঠল।
কিন্তু আহমদ মুসার উদ্যত ডান হাত ততক্ষণে তার উন্মুক্ত ঘাড়ে হাতুড়ির মত গিয়ে আঘাত করেছে।
সংগে সংগেই তার হাত থেকে গ্যাসগানটি খসে পড়ল। তার দেহটাও একবার ঘুরে উঠে পড়ে যাচ্ছিল। আহমদ মুসা দ্রুত গিয়ে তাকে ধরে ফেলল।
লোকটির সংজ্ঞাহীন দেহটাকে আহমদ মুসা পাঁজাকোলা করে নিয়ে সুড়ঙ্গের এক পাশে শুইয়ে রাখল। নিয়ে এল বাইরে গ্যাসগানটা। আহমদ মুসার দ্বিতীয় কাজ হলো বিশেষ ধরনের ক্লোরোফরম দিয়ে লোকটাকে কমপক্ষে অর্ধ দিবসের জন্যে ঘুম পাড়িয়ে রাখা। তৃতীয় কাজ হলো, পাহাড়ের গায়ের দরজাটাকে বন্ধ করা। কিন্তু বন্ধ করার চিন্তা করতেই তার মনে পড়ে গেল এই দরজাটা খোলা রাখতে হবে, যাতে ডাকলেই জর্জ আব্রাহাম জনসনের কমান্ডোরা সহজেই ডেথ ভ্যালিতে প্রবেশ করতে পারে। সুতরাং দরজা বন্ধ করার চিন্তা ত্যাগ করল আহমদ মুসা। তবে দরজা বন্ধ করার সিস্টেম সন্ধান করে জেনে নিল। দরজার বাইরের যেমন নব ছিল, ভেতরের গায়েও তেমনি নব আছে। নবটা পুশ করলেই দরজা তার জায়গায় ফিরে যাবে।
দরজার পরে যে সুড়ঙ্গ তা বেশ লম্বা। পাহাড়ের গা কেটে এই সুড়ঙ্গ তৈরি করা হয়েছে। দরজা দিয়ে দাঁড়িয়ে যাতায়াত করা যায়। সুড়ঙ্গের মাঝামাঝি ভেতরের মাথায়ও আরেকটা দরজা দেখা যাচ্ছে। সুড়ঙ্গের মাঝামাঝি ভেতরের শেষ পর্যন্ত কয়েকটি বৈদ্যুতিক বাল্ব সুড়ঙ্গটিকে আলোকিত করে রেখেছে। সুড়ঙ্গের বাইরের অংশে আলো অপেক্ষাকৃত কম। আলো যাতে বাইরে থেকে কোনভাবেই দেখা না যায় এজন্যেই বোধ হয় এই ব্যবস্থা।
আহমদ মুসা সংজ্ঞাহীন লোকটির পকেট হাতড়িয়ে একটা মানিব্যাগ ও একটি বিশেষ ধরনের অয়‍্যারলেস ট্রান্সমিটার পেল। ট্রান্সমিটারের ওয়েভপ্যানেলটা একবার দেখে নিয়ে পকেটে রেখে দিল। মানিব্যাগে মানি ছাড়া পেল ১২ মাসের একটা ক্যালেন্ডার কার্ড। ক্যালেন্ডারটা আহমদ মুসা মানিব্যাগে রেখে দিতে যাচ্ছিল, হঠাৎ সে দেখলো ক্যালেন্ডার কার্ডের কিছু কিছু তারিখে লাল নীল কালিতে মার্ক করা। মার্ক করা কেন?
আবার ক্যালেন্ডার কার্ডটায় নজর বুলাল আহমদ মুসা। ১২ মাসের ১২টা পয়লা তারিখের প্রথমটি রেড, দ্বিতীয়টি বু- এইভাবে সবগুলো পয়লা তারিখ মার্ক করা।
আহমদ মুসা একটু অবাক হলো। পকেটে রেখে দিল ক্যালেন্ডার কার্ডটা।
আহমদ মুসা এগোলো সুড়ঙ্গের ভেতরের বন্ধ দরজাটার দিকে।
সে বুঝল, এই সুড়ঙ্গে কোন সিসিটিভি নেই। থাকলেও অতি আত্মবিশ্বাসী এইচ থ্রি’র লোকরা তা মনিটর করার প্রয়োজন বোধ করে না। দিনের পর দিন অর্থহীন মনিটরিং করে তারা টায়ার্ডও হয়ে থাকতে পারে। তাদের অতি নিরাপদ ডেথ ভ্যালির আয়োজন কোনোভাবে প্রতিপক্ষের নজরে পড়তে পারে, এমন চিন্তা তাদের মাথায়ও আসছে না।
মনে হয় তাদের সমস্ত মনোযোগ বেলা ১২টার পরবর্তী সময়টার দিকে।
আহমদ মুসা সুড়ঙ্গের ভেতরের সামনে এসে পৌঁছেছে। সে দরজার সামনে এসে দাঁড়াল।
দরজাটা আগের দরজার মত নয়। প্লেইন স্টিল প্লেটের দরজা এটা। দরজার চারদিকটা দেখে বুঝল, ম্যানুয়ালি খোলা ও বন্ধ করা যায় না এ দরজা। তাহলে নিশ্চয় কী-বোর্ড কোথাও আছে, ভাবল আহমদ মুসা।
দরজা সংলগ্ন সুড়ঙ্গের দেয়াল এবং সুড়ঙ্গের ফ্লোর তন্ন তন্ন করে খুঁজল আহমদ মুসা। না কী-বোর্ড কিংবা কী-বোর্ডের মত কোন কিছু কোথাও নেই। অবশেষে দরজার উপর চোখ বুলাতে গিয়ে দরজার রঙে রং করা একটা টাচ কী-বোর্ড পেয়ে গেল। কী-বোর্ডটাতে সংখ্যা ও বর্ণ দুই ধরনের বিকল্প রয়েছে। এর অর্থ দরজা খোলা ও বন্ধ করার দুই ধরনের সিস্টেম হতে পারে। এর ফলে পাসওয়ার্ড বা কোড-অপশন অনেক বিস্তৃত হয়েছে।
বিরাট একটা বাঁধার সম্মুখীন হলো আহমদ মুসা।
আহমদ মুসার মন বলল, এ ধরনের পাসওয়ার্ড ব্যবস্থায় বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বিভিন্ন রকমের ধাঁধা ও সংকেত দেয়া থাকে।
আহমদ মুসা কী-বোর্ডের চারপাশে খোঁজ করতে লাগল। খুঁজতে গিয়ে দুটি নতুন জিনিস পেল। একটা হলো কী-বোর্ডের মাথার ১৩টি ক্ষুদ্র ডট। ডটগুলো প্রত্যেকটি একটি করে ছিদ্র। আর দ্বিতীয়, কী-বোর্ডের নিচে এন্ডিং মার্কের মত একটা চিহ্ন। চিহ্নটিতে সংখ্যা ‘ওয়ান’ ও ‘এ’ অ্যালফাবেট জড়াজড়ি করে আছে।
এ দু’টি জিনিস কি কোন কিছুর ইংগিত করছে? চিহ্ন দু’টির দিকে তাকিয়ে ভাবল আহমদ মুসা।
তার মনে হলো, কী-বোর্ডের মাথার উপরের ১৪টি ডটের অর্থ হতে পারে পাসওয়ার্ডটি ১৩ ডিজিটের। আর কী-বোর্ডের নিচের চিহ্নটিতে অ্যালফাবেট ও সংখ্যা জড়াজড়ির অর্থ হতে পারে পাসওয়ার্ডে সংখ্যা ও অ্যালফাবেট দুই-ই এখানে রয়েছে।
পাসওয়ার্ড কি হতে পারে?
এদের সংগঠনের দুই নাম, এদের আবিষ্কৃত অস্ত্রের নাম, এদের নেতাদের কারও নাম, এই স্থানের নাম ইত্যাদি যেকোনো একটি বা একাধিক মিলে পাসওয়ার্ড হতে পারে। কিন্তু সাথের সংখ্যাগুলো?
তাকাল আহমদ মুসা কি বোর্ডের সংখ্যাগুলোর দিকে। এক এক করে দেখল সংখ্যাগুলো। মোট সংখ্যা ১০টি।
সংখ্যাগুলো জলছাপের মত টাচ কিগুলোর উপর ভেসে আছে। আপাতত কোন বিশেষ বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করল না সংখ্যাগুলোর মধ্যে। তবে আগেই তার নজরে পড়েছিল, সংখ্যাগুলো আবছা লাল ও আবছা নীল সার্কেলে ঘেরা। কিন্তু অ্যালফাবেটগুলো এভাবে সার্কেলে ঘেরা নয়। এটা কি কোন সংকেত? সংকেত হলে প্রত্যেক সংখ্যার উপর একই ‘রকমের সার্কেল কেন?
হঠাৎ আহমদ মুসার মনে পড়ল সংজ্ঞাহীন গার্ড লোকটির পকেট থেকে পাওয়া ক্যালেন্ডারে লাল নীল মার্কের কথা। তাড়াতাড়ি পকেট থেকে ক্যালেন্ডার কার্ডটা বের করল। দেখল, ক্যালেন্ডার কার্ডের ১২টি এক তারিখের প্রথম মাসের এক তারিখ লাল, দ্বিতীয় মাসের এক তারিখ নীল, তৃতীয় মাসের এক তারিখ লাল- এভাবে অলটারনেটলি লাল নীল রং করা শেষ মাসের প্রথম তারিখ পর্যন্ত।
ক্যালেন্ডার কার্ডের লাল নীলের সাথে কী-বোর্ডের সংখ্যাগুলোর লাল নীল রঙের কি কোন সম্পর্ক আছে, ভাবল আহমদ মুসা। বোর্ডের লাল নীল সার্কেলের ব্যাখ্যা কি ক্যালেন্ডার কার্ডের লাল নীল সঠিক মার্ক? ব্যাখ্যাটা কি বলছে? যেহেতু বার মাসেরই ১ তারিখকে মার্ক করা হয়েছে এবং যেহেতু কী-বোর্ডের সংখ্যায় ১টি মাত্র এক রয়েছে, অতএব সংখ্যা এখানে ধর্তব্য নয়, ধর্তব্য হলো লাল ও নীলের পর্যায়ক্রমিক অবস্থান। লাল ও নীলের পর্যায়ক্রমিক ব্যবহার কি একথা বলছে যে, দরজা বন্ধ ও দরজা খোলার পাসওয়ার্ড সংখ্যাগুলো পর্যায়ক্রমে রয়েছে? যদি তাই হয়, তাহলে কী-বোর্ডের ১ থেকে শূন্য পর্যন্ত সংখ্যাগুলোর ১, ৩, ৫, ৭ ও ৯ সংখ্যাগুলো দরজা বন্ধের এবং ২, ৪, ৬, ৮ ও শূন্য সংখ্যাগুলো দরজা খোলার জন্যে।
কী-বোর্ডের ১০টি সংখ্যার মধ্যে লাল ও নীলের ভাগে ৫টি করে সংখ্যা পড়েছে। ১৩ ডিজিটের পাসওয়ার্ডের সংখ্যার স্থান যদি হয় পাঁচটি, পাসওয়ার্ডে তাহলে বাকি থাকে আরও ৮ ডিজিটের স্থান। এই স্থানগুলো কি অ্যালফাবেট পাসওয়ার্ডের জন্যে?
ক্যালেন্ডার কার্ডটি নাড়াচাড়ার সময় হঠাৎ একটা জায়গা বিদ্যুতের আলোতে ঝিলিক দিয়ে উঠল। জায়গাটা সে চোখের সামনে নিয়ে এল। দেখল, সাদা কালিতে ক্ষুদ্রাকারে লেখা ‘এইচ’। জানুয়ারি মাসের ক্যালেন্ডারের ‘জানুয়ারি’ নামের পাশে সাদা কালিতে এই এইচ লেখা।
সাদা কালিতে এই ‘এইচ’টি কেউ পরিকল্পিতভাবে লিখেছে। কেন? অন্য কোন মাসেও কি এভাবে কিছু লেখা রয়েছে?
আহমদ মুসা ফেব্রুয়ারি মাস পরীক্ষা করল। দেখল, ফেব্রুয়ারি মাসের নামের পাশে ঐভাবে সাদা কালিতে একটা সংখ্যা লেখা। সংখ্যাটা ‘৩’। এভাবে আহমদ মুসা একে একে মাসের নামগুলোর পাশটা পরীক্ষা করল। আগস্ট পর্যন্ত মাসের নামের পাশে একটি করে ‘অ্যালফাবেট’ পেল।
আহমদ মুসা গুণে দেখল, ৮ টি অ্যালফাবেট রয়েছে আগস্ট মাস পর্যন্ত। তারপর পর কোন মাসের নামের সাথে কিছু লেখা নেই।
খুশিতে মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল আহমদ মুসার। পাসওয়ার্ডের আটটা অ্যালফাবেট বাকি ছিল। পাঁচটি সংখ্যা আগেই পাওয়া গেছে। আট অ্যালফাবেট ও পাঁচ সংখ্যা মিলে ১৩ ডিজিটের পাসওয়ার্ড পূর্ণ হয়ে যাচ্ছে।
সংখ্যা ও অ্যালফাবেটগুলোকে একসাথে সাজাল আহমদ মুসা। অনুমিত পাসওয়ার্ডটা দাঁড়াল-২৪৬৮০ H3MFWMDW.
পাসওয়ার্ডটা তৈরি হওয়ার সাথে সাথেই দরজার কী-বোর্ডে তা টাইপ করল।
টাইপ করেই গ্যাসগানটা হাতে তুলে নিল আহমদ মুসা। দরজার ওপাশে কি আছে, কি হচ্ছে, কি দেখবে কিছুই আঁচ করার নেই। আল্লাহর উপর ভরসা করে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকা ছাড়া করার আর কিছুই নেই।
পাসওয়ার্ড টাইপের পর অপেক্ষা করল। কিন্তু দরজা যেমন স্থির ছিল তেমনই থাকল। পাসওয়ার্ড কাজ করল না।
চঞ্চল হয়ে উঠল আহমদ মুসার মন। হাতঘড়ির দিকে তাকাল। সময় ৯টা। ওদের আলটিমেটাম শেষ হবার জন্য সময় আছে মাত্র তিন ঘণ্টা।
পাসওয়ার্ডটার দিকে মনোযোগ দিল আহমদ মুসা। আহমদ মুসার মন বলছে, এই পাসওয়ার্ড কাজ করার কথা। এই পাসওয়ার্ডের কিছুই তার কল্পিত নয়। যে ইংগিতগুলো সে পেয়েছে সেই অনুসারে এই পাসওয়ার্ডই দাঁড়ায়।
হঠাৎ আহমদ মুসার মনে হলো, সংখ্যা ও বর্ণমালাভিত্তিক যে পাসওয়ার্ড সে সাজিয়েছে তা সাজানো ঠিক হয়েছে। সে সংখ্যা আগে দিয়েছে, তারপর বর্ণমালা। আবার ভাবল, এই সাজানোটা ঠিক হয়েছে কি না? ঠিক নাও হতে পারে। তাহলে পাসওয়ার্ডের বর্ণমালা কি আগে আসবে? হ্যাঁ, এটাও হতে পারে। ইংরেজি ‘নাম্বার’ ও ‘অ্যালফাবেট’ শব্দের ক্রম যদি ধরা হয়, তাহলে ‘অ্যালফাবেট’ ‘A’ আগে আসে, পরে আসে নাম্বার-এর ‘N’।
ডান হাতে গ্যাসগান রেখে বাম হাতের তর্জনি দিয়ে আবার নতুন পাসওয়ার্ডটি টাইপ করল, প্রথমে সিরিয়াললি বর্ণমালাগুলো, পরে নাম্বার।
পাসওয়ার্ডটি টাইপ শেষ হবার সাথে সাথে নিঃশব্দে নড়ে উঠল দরজা। খুলছে দরজাটা।
আহমদ মুসা গ্যাসগানের ট্রিগারে হাত রেখে গানটা বাগিয়ে ধরে সোজা হয়ে দাঁড়াল। দরজাটা ডানদিক থেকে বামদিকের দেয়ালে ঢুকে যাচ্ছিল।
আহমদ মুসা দরজার সাথে সাথে দরজার আড়াল নিয়ে বামদিকে সরতে থাকল। যতদূর সম্ভব অন্যের চোখ থেকে নিজেকে আড়াল করা এবং অন্যরা কে কোথায় আছে তা দেখার চেষ্টা করাই তার লক্ষ্য। কিন্তু বাম দিকের শেষ প্রান্তে পৌছে গেল তবুও কাউকে দেখতে পেল না আহমদ মুসা।
দরজার সম্পূর্ণটাই ঢুকে গেল বাম দিকের দেয়ালে। উন্মুক্ত দরজার এক প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে আহমদ মুসা। গুরুত্বপূর্ণ একটা দরজা বাইরে থেকে খুলে গেল, কিন্তু কেউ এল না, পাহারাতেও কেউ নেই! ব্যাপারটাকে অস্বাভাবিক মনে হলো আহমদ মুসার কাছে। আবার ভাবল, সিকিউরিটি ব্যবস্থা সম্পর্কে তারা নিশ্চিত বলেই তো অহেতুক এ স্থানে কোন পাহারা নেই। আবার তার মনে হলো, হয়তো আছে প্রহরী। তবে কোথাও বসে ঘুমাচ্ছে অথবা খোশগল্প করছে। যেহেতু ঘাঁটিতে বাইরে থেকে আক্রমণ বা অনুপ্রবেশের কোন চিন্তা বা আশংকা তাদের নেই- এজন্যে হতে পারে তাদের পাহারায় গাছাড়া ভাব। উন্মুক্ত দরজা পথে আহমদ মুসা বাড়ির একটা অংশ দেখতে পেল। দেখল উন্মুক্ত দরজার সামনে দিয়ে একটা প্রশস্ত করিডোর পূর্ব ও পশ্চিম দুই দিকেই এগিয়ে গেছে। পূর্ব দিকে কতদূর কোন দিকে এগিয়ে গেছে তা দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু পশ্চিম দিকে অল্প কিছু দূর এগিয়ে দক্ষিণ দিকে বাঁক নিয়েছে। আর দরজার সামনে করিডোরের পাশ দিয়ে উঁচু পাহাড়ের দেয়াল উঠে গেছে। দেয়ালটা করিডোরের সাথে একইভাবে ঘুরে গেছে। দেয়ালের এদিকে নিচের অংশে কোন দরজা জানালা দেখল না আহমদ মুসা।
আহমদ মুসা আরও কিছু সময় অপেক্ষা করল। কাউকে আসতে না দেখে দরজা থেকে করিডোরে বেরিয়ে এল। সে ঠিক করল পশ্চিম দিক হয়ে দক্ষিণ দিকে এগিয়ে যাওয়া করিডোরের পথেই সে সামনে এগোবে।
আহমদ মুসা দুহাতে গ্যাসগানটা বাগিয়ে ধরে এগোতে লাগল। গোটা পরিবেশকে অস্বাভাবিক মনে হলো তার কাছে। প্রহরী চারদিকে গিজ গিজ করার কথা দিনের গুরুত্বপূর্ণ এ সময়ে। তাহলে তারা কি প্রহরী উপরে রেখেছে তাদের মূল্যবান মারণাস্ত্রের নিরাপত্তায়? না তারা ঘাঁটির নিরাপত্তায় ওভারশিউর বলে প্রহরী তেমন রাখেনি?
আহমদ মুসা করিডোরের দক্ষিণমুখী বাঁকে গিয়ে পৌঁছেছিল। ঘুরছিল দক্ষিণ দিকে। এই সময় গ্যাসগান বাগিয়ে ধরা ডান হাতের উপর প্রচণ্ড একটা আঘাত এসে পড়ল। আহমদ মুসা দরজা থেকে বেরিয়ে সামনে এগোবার পর দরজার দুপাশটা ভালো করে দেখেনি। দরজার দুপাশেই রয়েছে দুটি গার্ডরুম। গাডরুমে দেয়ালের সাথে মেশানো ক্যামোফ্লেজ করা দরজা আছে। আর আছে কাচ ঘেরা গবাক্ষ।
এই দুই গার্ডরুমে দুইজন করে চারজন প্রহরী রয়েছে। দরজা খুলে যাওয়া ওরা টের পেয়েছিল। মনে করেছিল বাইরে থেকে তাদেরই কেউ আসছে। কিন্তু আহমদ মুসাকে গ্যাসগান হাতে করিডোরে দেখে তাদের ভুল ভেঙে যায়। দুই গার্ডরুম থেকে চারজন প্রহরী বিড়ালের মত নিঃশব্দে বেরিয়ে তারা আহমদ মুসার পিছু নেয়। করিডোরের দক্ষিণ মুখের বাঁকে তাদের একজন প্রচণ্ড আঘাত করেছে আহমদ মুসার ডান হাতে।
আহমদ মুসার হাত থেকে ছিটকে পড়ে গেল গ্যাসগানটা। আহমদ মুসা স্থির দাঁড়িয়ে গেল। পেছনে শত্রু, কিন্তু কয়জন? ভাবল আহমদ মুসা।
ভাবনা তার আর বেশি দূর এগোলো না। পেছন থেকে মাথায় ধাতব কিছু এসে ঠেকল। ধাতব স্পর্শ উপলব্ধি করে মনে হলো আহমদ মুসার বস্তুটি নিশ্চয় স্টেনগান ধরনের কিছু।
এরপরেই সামনে এসে দাঁড়াল তিনজন। তাদের একজন দাঁতে দাঁত চেপে কঠোর স্বরে বলল, ‘কে তুমি শয়তান? সিংহের গুহায় ঢুকলে কেমন করে, কোন্ সাহসে? আমাদের লোকটাকে হত্যা করেছ নাকি? তবে এসেছ যখন দেখবে মজা।’
তিনজনের হাতেই বিশেষ ধরনের স্টেনগান। এ ধরনের স্টেনগানে সাইলেন্সার লাগানো থাকে।
এরা চাপা স্বরে কথা বলছে, আবার স্টেনগানেও সাইলেন্সার লাগানো। এখানে জোরে কথা বলা, শব্দ করা হয়তো নিষিদ্ধ। এখানে বিশ্বের সর্বাধুনিক অস্ত্র গবেষণা, অস্ত্র তৈরি, অস্ত্র ব্যবহার ব্যবস্থার সাথে যুক্ত বিজ্ঞানী কিংবা অপারেটররা থাকে। হয়তো তাদেরকে সব রকম ভীতি ও ভাবনা থেকে দূরে রাখাই এর উদ্দেশ্য।
মাথায় আহমদ মুসা স্টেনগানের ব্যারেলের গুঁতো খেল। বলল পেছন থেকে, ‘সামনে আগাও শয়তান।’
সামনের তিনজনও আহমদ মুসার দিকে স্টেনগান তাক করে তার পেছনে হাঁটছে। আহমদ মুসাও তাদের সাথে হাঁটতে শুরু করেছে শান্তভাবে একটি কথাও না বলে। একটু সামনেই করিডোরের ডান পাশে পশ্চিম দিকে একটা দরজা। এরকম দরজা করিডোরের ডান পাশ বরাবর আরও দেখতে পেল আহমদ মুসা। এটা অনেকটাই অফিসঘরের মত।
দরজাটার সামনে গিয়ে একটু দাঁড়িয়েই আগের তিনজন ঘরে প্রবেশ করল এবং বলল, ‘নিয়ে এস শয়তানকে।’
ওরা তিনজন ঘরে ঢুকে চোখের আড়াল হতেই আহমদ মুসা গাছ থেকে ফল খসে পড়ার মত বসে পড়ল। লোকটি বুঝে উঠে তার স্টেনগানটি অ্যাডজাস্ট করার আগেই আহমদ মুসা দু’হাত বাড়িয়ে লোকটির দুই পা ধরে সামনে হ্যাঁচকা টান দিল। লোকটি চিৎ হয়ে পড়ে গেল।
তার হাতের স্টেনগান আহমদ মুসার কাছেই ছিটকে পড়ে গেল। দ্রুত স্টেনগানটি তুলে নিয়েই আহমদ মুসা ট্রিগার টিপল মাটিতে পড়ে থাকা লোকটির উদ্দেশ্যে। দুপ দুপ শব্দ করে কয়েকটি গুলি বেরিয়ে গেল।
গুলি করেই আহমদ মুসা লাফ দিয়ে ঘুরে দাঁড়াল স্টেনগানটি বাগিয়ে ধরে। ঘুরে দাঁড়িয়েই দেখতে পেল ঘরের ভেতরের তিনজন স্টেনগান বাগিয়ে বেরিয়ে আসছে। ওদের চোখে মুখে জিজ্ঞাসা। আহমদ মুসাকে স্টেনগান হাতে দেখে ওরা চমকে উঠেছে।
আহমদ মুসা সময় নষ্ট করেনি এক মুহূর্তও। ঘুরে দাঁড়িয়ে দরজার উপর চোখ পড়তেই সে স্টেনগানের ট্রিগার চেপে ধরেছিল।
প্রায় নিঃশব্দে এক পশলা গুলি বেরিয়ে গেল আহমদ মুসার স্টেনগান থেকে। দরজার উপরেই ওরা তিনজন আকস্মিকভাবে স্টেনগানের গুলির মধ্যে পড়ে গেল। গুলির অসহায় খোরাকে পরিণত হলো তারা। দরজার ভেতরেই ওদের তিনজনের লাশ মাটিতে পড়ে গেল।
করিডোরের দক্ষিণ দিক থেকে অনেকগুলো পায়ের শব্দ শুনতে পেল আহমদ মুসা। মনে হচ্ছে কিছু লোক ছুটে আসছে এদিকে। তাহলে কি সাইলেন্সার থাকা সত্ত্বেও গুলির শব্দ ওরা শুনতে পেয়েছে! কিংবা সিসিটিভির মনিটরে ওরা সবকিছু দেখতে পেয়েছে!
আহমদ মুসা একলাফে ঘরে ঢুকে গেল। দরজার উপরের লাশগুলো টেনে ভিতরে নিল।
পায়ের শব্দ দরজার কাছাকাছি এসে গেছে। আহমদ মুসা দ্রুত দরজার পাশে দেয়াল সেঁটে দাঁড়াল।
ওরা সংখ্যায় পাঁচজন। দৌড়ে এসে ওরা দরজার পাশ বরাবর থমকে দাঁড়াল। একজন বলল, ‘বাইরে একটা লাশ, ভেতর থেকেও রক্ত গড়িয়ে আসছে। ভেতরেও নিশ্চয় আহত-নিহত হয়েছে।’
আরেকজন বলল, ‘শয়তানটা কোন্ দিকে গেল, নিশ্চয় ঘরে নেই? চল একবার ঘরটা দেখি।’
‘উপরে কি জানানো হয়েছে?’ আরেকজন বলল।
‘ঘটনাটা কি আগে আমরা একটু জেনে নেই। শয়তানটা ভেতরে না বাইরে সেটাই তো এখনো জানা হয়নি।’ বলল দ্বিতীয় জন আবার।
‘হ্যাঁ, সেটিও ঠিক। এ প্রশ্ন তো উপর থেকে অবশ্যই করবেন। চল আগে ভেতরে দেখা যাক।’ তৃতীয়জন বলল।
আহমদ মুসা ওদের সব কথাই শুনতে পেয়েছিল। তার মন বলল, আক্রমণে যাবার এটাই সুযোগ। ওরা আক্রমণের জন্যে প্রস্তুত হলেও আক্রমণের মুডে ওরা এখন নেই। ওরা এখন অনুসন্ধানে নেমেছে।
ওরা পাঁচজন ঘরে ঢোকার জন্যে দরজার দিকে এগোচ্ছিল।
আহমদ মুসা দেয়ালের আড়াল থেকে এক ঝটকায় বের হয়ে স্টেনগানের ব্যারেল দরজার বাইরে বের করে ট্রিগার চেপে ধরল।
গুলি করার সাথে সাথে আহমদ মুসাও বের হয়ে এসেছিল দরজার বাইরে। দরজার বাইরের পাঁচজনই আহমদ মুসার গুলির খোরাক হয়ে গেল।
আহমদ মুসা ওদের দিকে একবার তাকিয়ে নিজের হাতের স্টেনগান ফেলে দিয়ে ওদের তিনটি সাইলেন্সার লাগানো স্টেনগান তুলে নিল। দুটি কাঁধে ফেলে ও একটি হাতে নিয়ে তা সামনে বাগিয়ে ছুটল করিডোর ধরে দক্ষিণ দিকে।
আহমদ মুসা নিশ্চিত যে, উপরে উঠার সিঁড়ি কিংবা লিফট নিশ্চয় ওদিকে আছে। সে দৌড়বার সময় দু’পাশেই খেয়াল রাখছে।
বেশ কিছুটা দৌড়াল আহমদ মুসা। দক্ষিণমুখী করিডোর যেখানে পুব দিকে বাঁক নিয়েছে সেখানে পৌঁছতেই সে দেখল পুব দিক থেকে কয়েকজন স্টেনগানধারী ছুটে আসছে।
ঠিক এই সময় পেছন থেকেও অনেকগুলো পায়ের শব্দ শুনতে পেল আহমদ মুসা। সে সবে পুব দিকের করিডোরে প্রবেশ করেছিল।
সে ঝাঁপিয়ে পড়ল করিডোরের মেঝের উপর। তার স্টেনগান সামনের দিকে বাগিয়ে ধরা। আহমদ মুসা গড়িয়ে করিডোরের বাম দিকের কোনায় সরে এল। এর ফলে পুব দিকের করিডোর তার চোখের সামনেই থাকল। কিন্তু দক্ষিণমুখী করিডোর থেকে ছুটে আসা লোকদের চোখ থেকে সে আড়াল হয়ে গেল। তবে ওরা বাঁকের মুখে না আসা পর্যন্ত আহমদ মুসাকে দেখতে পাবে না।
গড়াতে গিয়ে আহমদ মুসা বুঝতে পারল তার উরু ও ডান বাহু আহত হয়েছে। মেঝেতে ঝাঁপিয়ে পড়ার সময়ই এ দুটি গুলি তাকে আহত করেছে। গুলি দুটি উরু ও বাহুর কিছু অংশ ছিঁড়ে নিয়ে বেরিয়ে গেছে, না ভেতরে আছে তা আহমদ মুসা বুঝতে পারছে না। তবে যন্ত্রণা থেকে বুঝছে ক্ষত দুটি গভীর হতে পারে। কিন্তু এই যন্ত্রণা ও বেদনাকে প্রশ্রয় দেবার মত সময় তার হাতে এখন নেই।
আহমদ মুসা মেঝের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েই পুব দিক থেকে ছুটে আসা লোকদের লক্ষ্যে করিডোরের সমান্তরালে গুলি করা শুরু করেছিল, গড়িয়ে কোনায় সরে গিয়েও গুলি অব্যাহত রেখেছিল আহমদ মুসা।
ওরা পুব দিক থেকে করিডোর ধরে দৌড়ে আসছিল। গুলিও শুরু করেছিল ওরা। কিন্তু করিডোরের বাম পাশে গড়িয়ে যাবার অল্প সময় পরে ওদের গুলি বন্ধ হয়ে গেল।
আহমদ মুসা মাথাটা হঠাৎ তুলে দেখল ওরা সবাই করিডোরে শুয়ে আছে। সে ভাবল, ওরা আহত, নিহত, না জীবিত?
ওদের নিয়ে ভাববার আর সময় হলো না আহমদ মুসার। তার পেছনের করিডোরের পায়ের শব্দ আরও কাছে এসে গেছে।
আহমদ মুসা করিডোরের পুবমুখী বাঁকটার এপাশে শুয়ে থেকে দেহটাকে ঘুরিয়ে নিল।
ওদিকের পায়ের শব্দ হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল। দক্ষিণমুখী করিডোরে উঁকি দেয়ার জন্য আহমদ মুসা ক্রল করে ফুটখানেক সামনে এগোলো।
স্টেনগানের ট্রিগারে হাত রেখে আহমদ মুসা পলকের জন্যে উঁকি দিল করিডোরের দিকে। দেখল, ওরা বেশ কয়েকজন স্টেনগান বাগিয়ে বিড়ালের মত নিঃশব্দ পায়ে এগিয়ে আসছে।
ওরা তো দৌড়িয়ে আসছিল। হঠাৎ ওদের এই পরিবর্তন কেন? এ দিকের গোলাগুলি ওরা কি টের পেয়েছে। নিশ্চয় টের পেয়েছে। এই বিশেষ প্রহরীদের স্টেনগানে ডাবল সাইলেন্সার লাগানো থাকলেও গুলি বেরুনোর সময় খুব নিচু হলেও দুপ করে শব্দের একটা চেইন বেরিয়ে আসে। কেউ সতর্ক থাকলে এবং এই স্টেনগান থেকে বেরুনো ‘দুপ’ শব্দের সাথে পরিচিত হলে এটা তাদের কান এড়াবে না। নিশ্চয় এদেরও কান এড়ায়নি। এদিকে কি ঘটেছে ওরা কিছুই জানে না। সেটাই দেখার জন্যে এগোচ্ছে ওরা। এদিক থেকে ওরা মানসিকভাবে কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত অবস্থায় রয়েছে। এটা আহমদ মুসার জন্যে সুযোগ।
আহমদ মুসা স্টেনগান তিরিশ ডিগ্রি এ্যাংগেলে সেট করে অপেক্ষা করতে লাগল। এখন ওরা ৪৫ ডিগ্রি এ্যাংগেলে।
ওরা নিঃশব্দে দ্রুতই এগোচ্ছিল। এক মিনিটেরও কম সময়ে ওরা এসে গেল। আহমদ মুসা স্টেনগানের ট্রিগারে তর্জনি সেট করে স্টেনগানের নল দিয়ে মেঝেতে আঘাত করল।
শব্দের সাথে সাথেই ওরা চমকে উঠে এদিকে তাকাল। দেখতে পেল আহমদ মুসার মাথা ও স্টেনগানের ব্যারেল। ওরা সবাই তড়িঘড়ি করে স্টেনগানের নল এ কর্নারের দিকে তাক করছিল।
আহমদ মুসা স্টেনগানের ট্রিগার চেপে ধরে ওদের উপর দিয়ে ঘুরিয়ে নিল। করিডোরের মেঝেতে গড়িয়ে পড়ল ওদের পাঁচটি দেহ।
আহমদ মুসা উঠে দাঁড়িয়ে পুব দিক থেকে আসা করিডোরের উপর পড়ে থাকা লাশগুলোর দিকে একবার তাকাল। দেখল, ওরা ওখানে পাঁচজন নিষ্প্রাণ হয়ে পড়ে আছে।
আহমদ মুসা কোন্ দিকে যাবে বুঝতে পারছিল না। সামনেই করিডোরের ডান পাশে দেখল একটা দরজা আধা খোলা অবস্থায়।
আহমদ মুসা ভাবল, ঘরে ঢুকে পরিস্থিতি বুঝার জন্যে একটু সময় নেয়া দরকার। আরও কেউ আসে কি না, কোন্ দিক থেকে আসে।
আহমদ মুসা ঢুকে গেল ঘরে। ঘরটা অফিসঘরের মত সাজানো।
ঘরে ঢুকেই সামনে একটু বাম পাশে একটা অফিস টেবিল। টেবিলে এলোমেলোভাবে কিছু কাগজ-পত্র ছড়ানো। একটা কলম খোলা অবস্থায় টেবিলে পড়ে আছে। টেবিলের এক পাশে একটা পানির গ্লাস। গ্লাসে অর্ধেক পানি। রিভলভিং চেয়ারটা একদিকে বেঁকে আছে। মনে হচ্ছে এইমাত্র কেউ কাজ করতে করতে বেরিয়ে গেছে।
টেবিলের ডান পাশে একটা সাইড টেবিল। টেবিলে মেগাস্ক্রিনের একটা কম্পিউটার। স্ক্রিনটায় ভর্তি অনেকগুলো লাইভ ছবি। স্ক্রিনটার দিকে আহমদ মুসা তাকিয়েই বুঝল, এটা সিসিটিভির মনিটরিং স্ক্রিন।
আকাশের চাঁদ হাতে পাওয়ার মত খুশি হলো আহমদ মুসা। তার চোখ মনিটরিং স্ক্রিনের উপর আঠার মত লেগে গেল। যে করিডোর দিয়ে সে ঢুকেছিল তা দেখতে পেল। দক্ষিণমুখী করিডোরের শুরুর দিকে একটি লাশ, শেষের দিকে আরও পাঁচটি লাশ পড়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে। পুবমুখী করিডোরের লাশগুলোও সে দেখল। করিডোরের পাশের ঘরগুলোও দেখা যাচ্ছে। এর মধ্যে যে ঘরে আহমদ মুসা ঢুকে ছিল, সে ঘরের চারটি লাশও সে দেখল। পুবমুখী যেখানে লাশগুলো পড়ে আছে তার একটু সামনেই দু’তলায় উঠার সিঁড়ি। দু’তলার মাত্র দু’টি কক্ষ মনিটরিং স্ক্রিনে দেখা যাচ্ছে। একটি কক্ষ অফিসরুমের মত। তার সামনে প্রশস্ত করিডোর বা লাউঞ্জের মত জায়গা। তার পরেই একটা বিশাল কক্ষ। কক্ষের চারদিক কম্পিউটার ও নানা ধরনের যন্ত্রে ঠাসা। কক্ষের উত্তর দিকের দেয়ালের ভেতর দিয়ে পাইপ মোড়া গুচ্ছ গুচ্ছ নানারকম তার প্রবেশ করেছে এই ঘরে। ঘরের ঠিক মাঝখানে স্টিলের উঁচু প্ল্যাটফরম। প্ল্যাটফরমের উপর বিশাল আকারের জটিল সব যন্ত্রপাতি। যন্ত্রপাতির মাঝখানে স্তম্ভ আকারের এ্যান্টেনা জাতীয় কিছু। তার কালো কুচকুচে মাথাটা প্রবল বেগে ঘুরছে। প্ল্যাটফরমের উপর অনেক যন্ত্রপাতি এবং তার পাশে চারটি মেগাস্ক্রিনের সামনে বসে আছে চারজন। স্ক্রিনের উপর দিকে একটি করে লাল শিরোনাম, তা স্পষ্টই পড়া যাচ্ছে। একদম বাম পাশেরটায় লেখা কাউন্টডাউন ফেজ-১, দ্বিতীয়টায় কাউন্টডাউন ফেজ-২, তৃতীয়টায় কাউন্টডাউন ফেজ-৩। তারপরের লোকটার সামনের স্ক্রিনের শিরোনাম ফাইনাল ফেজ ফায়ার। পড়েই চমকে উঠল আহমদ মুসা। সবগুলো শিরোনামই লাইভ। তার মধ্যে শিরোনাম কাউন্টডাউন ফেজ-১ ফ্লাশ করছে। তার মানে অপারেশনে যাওয়ার প্রস্তুতি তারা শুরু করে দিয়েছে। কাউন্টডাউনের প্রস্তুতি চলছে। আহমদ মুসার মনটা কেঁপে উঠল। কম্পিউটার স্ক্রিনেই দেখল সময় পৌনে দশটা। সময় হাতে আছে মাত্র সোয়া দুই ঘণ্টা। তৎপর হয়ে উঠল আহমদ মুসা।
অপারেশন রুমের মনিটরিং স্ক্রিনের সামনের চারজন ছাড়া আর কাউকে দেখছে না আহমদ মুসা।
অপারেশন রুমের ওরা চারজন অপারেটিং সাইন্টিস্ট হতে পারে,
কিন্তু নেতৃস্থানীয়রা কোথায়? দু’তলায় নিশ্চয় আরো কক্ষ আছে, তারা নিশ্চয় কোথাও আছে।
আহমদ মুসা মনিটরিং স্ক্রিনের সামনে থেকে সরে এল। সবকিছু
মনিটর যে করছিল সে লোকটা কোথায়? কাজ করতে করতে নিশ্চয় সে উঠে গেছে! কোথায় গেল? যারা মারা গেছে তাদের মধ্যে সে নেই তো? থাকতেও পারে! মনিটর দেখেই সে প্রয়োজনীয় তথ্য প্রহরীদের দিয়েছে এবং সে কারণেই প্রহরীরা পরিকল্পিভাবেই আক্রমণে এসেছে। কিন্তু সে গেল কোথায়? মনিটরিং অবশ্যই এতক্ষণ আনঅ্যাটেনডেড থাকার কথা নয়। নিশ্চয় সে মারা পড়েছে। হতে পারে, হয়তো সে-ই ছিল নিচের তলার প্রহরীদের পরিচালক ও সমন্বয়কের দায়িত্বে এবং এই একই কারণে সিসিটিভির মনিটরিং-এর দায়িত্বও তার ছিল। অবস্থা দেখে হয়তো সেও প্রহরীদের সাথে অপারেশনে অংশ নেয় এবং মারা পড়ে।
অফিসরুম থেকে বের হলো আহমদ মুসা। সে এখন অনেকটাই নিশ্চিন্ত যে, নিচের তলায় কোন প্রহরী আর অবশিষ্ট নেই। বিশ একুশ জনের মত প্রহরী নিচের তলায় ছিল, আর তারা সবাই মারা পড়েছে।
আহমদ মুসা ডান দেয়ালের গা ঘেঁসে খুব সতর্কতার সাথে এগোতে লাগল। অল্প সামনেই উপরে উঠার সিঁড়ি। আর দু’ধাপ এগোলেই সিঁড়ির গোড়ায় পৌঁছা যাবে।
আহমদ মুসা কারো পায়ের শব্দ শুনতে পেল। শব্দটা সামনের সিঁড়ির উপর থেকে নিচের দিকে নেমে আসছে।
থমকে দাঁড়াল আহমদ মুসা। কারো কথা শুনতে পেল সিঁড়ি থেকে।
একজন উঁচুগলায় বলছে, ‘দানিয়েল কোথায় তুমি, ধরবো টেলিফোন?
কি ঘটছে জানতে বললাম, কিছুই জানালে না তো?’
আহমদ মুসা বুঝতে পারল নিচে কি ঘটেছে উপরের কেউ তা এখনো জানতে পারেনি। যে নিচে নেমে আসছে সে নিশ্চয় কর্মকর্তাদের কেউ একজন হবে। আহমদ মুসা ভাবল, তাকে ঠেকাতে হবে। তাকে কিছুই জানতে দেয়া যাবে না। সে স্টেনগানের ট্রিগারে তর্জনি রেখে এগোলো সিঁড়ির গোড়ায়।
দেয়ালের প্রান্তে আহমদ মুসা একটু দাঁড়াল লোকটা সিঁড়ির শেষ অংশে পৌঁছার অপেক্ষায়। পায়ের শব্দ শুনে বুঝল লোকটা প্রায় সিঁড়ির শেষ অংশে নেমে এসেছে।
আহমদ মুসা সিঁড়ির পাশে দেয়ালের প্রান্তে মুহূর্তের জন্যে একটু দাঁড়িয়ে এক ঝটকায় বেরিয়ে সিঁড়ির একেবারে গোড়ায় এসে দাঁড়াল এবং উদ্যত স্টেনগানের ব্যারেল লোকটির অবয়ব লক্ষ্যে তাক করেই ট্রিগারে চাপ দিল।
একঝাঁক গুলি গিয়ে জড়িয়ে ধরল লোকটিকে। লোকটির হাতেও একটা স্টেনগান ছিল।
অদ্ভুত ক্ষিপ্র লোকটি। এমন আকস্মিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েও সে তার স্টেনগান তুলেছিল। গুলির ঝাঁক গিয়ে তাকে আঘাত করলেও সে তর্জনি চাপল স্টেনগানের ট্রিগারে।
আহমদ মুসাও লোকটির স্টেনগান তাক করা দেখেছিল। তবে সে গুলি করার সময় পাবে আহমদ মুসা তা ভাবেনি। কিন্তু তবুও সে তার দেহটা ডান দিকে একটু ঝুঁকিয়ে দিয়েছিল।
কিন্তু আহমদ মুসা শেষ রক্ষা করতে পারল না। তার ভাবনা মিথ্যা প্রমাণ করে লোকটির স্টেনগান থেকে অনেকগুলো গুলি ছুটে এল। সে তার দেহ ডানদিকে ঝুঁকিয়ে দেয়ার কারণে বাম পাশ দিয়ে অনেকগুলো গুলি ছুটে গেল। তবে একটা গুলি এসে বাম কাঁধে প্রচণ্ডভাবে আঘাত করল। তীব্র একটা ব্যথা ও ঝাঁকুনি খেয়ে আহমদ মুসা বসে পড়ল। তার হাত থেকে পড়ে গেল স্টেনগান। সে ডান হাত দিয়ে চেপে ধরল বাম কাঁধ। মুহূর্ত কয়েকের জন্য চিন্তা ভোঁতা হয়ে পড়েছিল আহমদ মুসার।
কিন্তু শীঘ্রই নিজেকে সামলে নিল আহমদ মুসা। কাঁধের স্টেনগান দুটি থেকে একটা ফেলে দিয়ে শরীরটাকে টেনে তুলে উঠে দাঁড়াল সে। মনে হচ্ছে তার বাম কাঁধের ওজন যেন কয়েক গুণ বেড়ে গেছে।
সামনে গুরুত্বপূর্ণ কাজ বাকি, ভাবল আহমদ মুসা। সব ব্যথা-বেদনা, আঘাত ভুলে যেতে চেষ্টা করল সে। যতটা দ্রুত পারল সিঁড়ি দিয়ে উঠতে লাগল।
পৌঁছল গুলি খেয়ে পড়ে যাওয়া লোকটির কাছে। লোকটির শরীরের নিচের অংশ সিঁড়িতে, মাথা সিঁড়ির ল্যান্ডিং-এ।
তার ডান হাতের স্টেনগানটা হাত থেকে খসে পড়ে গেছে। কিন্তু হাতটা ঝুলে আছে সিঁড়ির একটা ধাপের উপর। তার হাতঘড়ির সাদা স্ক্রিনটা জ্বলজ্বল করছে।
আহমদ মুসা থমকে দাঁড়িয়েছিল লাশের পাশে। লোকটার হাতঘড়ির সাদা স্ক্রিনটা তার দৃষ্টিকে টেনে নিয়েছিল। হাতঘড়িটার সাদা স্ক্রিনের উপরের অংশে একটা লাল ডট ফ্লাশ করছিল।
ঘড়ির অস্বাভাবিক এই রেড ডটের ফ্লাশ করার অর্থ কি?
আহমদ মুসা ঘড়িটা খুলে নিল লোকটার হাত থেকে।
এ লোকটার হাতে এমন ঘড়ি কেন, লোকটা কে? এই চিন্তাও মাথায় এল আহমদ মুসার। সে লোকটার উবু হয়ে পড়ে থাকা মুখটা ঘুরিয়ে দিল।
লোকটার মুখের উপর চোখ পড়তেই চমকে উঠল আহমদ মুসা। এতো দেখছি ডেভিড কোহেন ক্যানিংহাম! এইচ থ্রি এবং ফোম-এর এক্সিকিউটিভ চীফ! বেচারা এভাবে এখানে মারা পড়ল! তাকে তো বাঁচিয়ে রাখা দরকার ছিল।
আহমদ মুসা তার পকেট সার্চ করল। অয়্যারলেস ওয়াকিটকি ছাড়া আর কিছুই পেল না। অয়্যারলেস তার পকেটে রেখে উঠে দাঁড়াল আহমদ মুসা। ঘড়িটাকে ভালো করে দেখল সে। ঘড়ির সামনের স্ক্রিনে ফ্লাশিং রেড ডট ছাড়া নতুন বা অস্বাভাবিক কোন কিছু পেল না।
ঘড়ির ব্যাক সাইডে দেখল একটা অস্বচ্ছ পেস্টিং টেপ লাগানো। টেপের উপর কোন কিছু লেখা নেই এবং এ টেপ লাগানোর কোন যৌক্তিকতাও খুঁজে পেল না আহমদ মুসা। কেন তাহলে এই টেপ?
টেপটি গড়ির ব্যাক থেকে তুলতে চেষ্টা করল আহমদ মুসা। সহজেই উঠে গেল টেপটি। টেপটি ফেলে দিতে যাচ্ছিল সে। হঠাৎ দেখতে পেল, টেপের ভেতরের সাইডে লাল রঙের কিছু লেখা।
টেপের এদিকটা চোখের সামনে নিয়ে এল আহমদ মুসা। লাল রঙের তিনটি লাইন। লাইন তিনটিতে লেখা- ‘কাউন্টডাউন স্টার্ট’। এর সাথে কিছু বিদ্‌ঘুটে সংখ্যা। দ্বিতীয় লাইনে, ‘কাউন্টডাউন স্টপ’। এর সাথেও ঐ ধরনের বিদ্‌ঘুটে কিছু সংখ্যা। তৃতীয় লাইনে লেখা, ‘ফাইনাল ফায়ার।’ এর পাশেও আগের লাইন দু’টির মত বিদ্‌ঘুটে সংখ্যার একটা সারি!
বিস্মিত, আনন্দিত আহমদ মুসা বুঝল, এ সবগুলোই কাউন্টডাউন ও ফাইনাল অপারেশন স্টার্ট-এর ‘পাসওয়ার্ড’। আহমদ মুসাদের জন্যে অমূল্য এক প্রাপ্তি এটা।
আহমদ মুসা ঘড়িটা ও টেপটা জ্যাকেটর পকেটে রেখে শরীর টেনে নিয়ে ছুটল দু’তলার অপারেশন রুমের উদ্দেশ্যে। দু’তলার সামনে উত্তর দিকে একটা লাউঞ্জ দেখতে পেল। হাতের ডান ও বাম দু’পাশেও অনুরূপ লাউঞ্জ সে দেখল। সামনের লাউঞ্জের মাঝ বরাবর একটা বড় দরজা। আহমদ মুসা মনিটরিং স্ক্রিনের অপারেশন রুমে প্রবেশের পথে এ রকম একটা বড় দরজাই দেখেছিল।
আহমদ মুসা দ্রুত দরজার উদ্দেশ্যে এগোলো। দরজায় একটু চাপ দিতেই দরজা খুলে গেল। ঘরে প্রবেশ করল সে।
ঘরটাকে বলা যায় অফিস কাম বিশ্রাম কক্ষ। অফিস টেবিল, অফিস আলমিরা, সোফা, ইজিচেয়ার সবকিছু রয়েছে এই ঘরে। এই ঘরের উত্তর দেয়ালে আরেকটা দরজা। আহমদ মুসা গিয়ে দরজা খুলে ফেলল।
ঘরের দিকে একবার তাকিয়েই সে বুঝল এটাই সেই বিশাল অপরেশন কক্ষ যা মনিটরিং স্ক্রিনে সে দেখেছে। ঘরের চারদিক নানা রকম কম্পিউটার ও যন্ত্রপাতিতে ঠাসা এবং ঘরের মাঝখানে আছে সেই উঁচু প্ল্যাটফরম। প্ল্যাটফরমে ঢাউস সাইজের বিশাল একটা যন্ত্র। সেই যন্ত্রকে সামনে রেখে চারজন লোক চারটি স্ক্রিনের সামনে বসে আছে। সে চারজন লোক সহসা মাথা ঘুরিয়ে তাকিয়েছে আহমদ মুসার দিকে। আহমদ মুসার হাতে স্টেনগান এবং তার গোটা শরীর রক্তে ভেসে যাচ্ছে দেখে চারজনেরই চোখ ছানাবড়া।
আহমদ মুসা ঐ চারজন লোক ও তাদের সামনে রাখা স্ক্রিনের দিকে তাকাল। নিচের মনিটরিং স্ক্রিনে সে যা দেখেছে এখানকার স্ক্রিনেও হুবহু তাই দেখা যাচ্ছে। কাউন্টডাউন ফেজ-১, কাউন্টডাউন ফেজ-২, কাউন্টডাউন ফেজ-৩ এবং ফাইনাল ফায়ার ফেজ- সবই দেখা যাচ্ছে চারটা স্ক্রিনে।
চার স্ক্রিনের সামনের চারজন লোক পলকহীন চোখে তাকিয়ে আছে আহমদ মুসার দিকে।
আহমদ মুসা ওদের দিকে স্টেনগান তুলে বলল, ‘অপারেশন কাউন্টডাউন কখন শুরু হয়েছে?’
বামদিকের স্ক্রিনের সামনের লোকটা বলল, ‘সকাল ৯টায় অপারেশন কাউন্টডাউন শুরু হয়েছে।’
‘শেষ হবে কখন?’ বলল আহমদ মুসা।
‘কাউন্টডাউনের ফাস্ট ফেজ শেষ হবে বেলা দশটায়, সেকেন্ড ফেজ চলবে সকাল ১১টা পর্যন্ত। দুপুর ১২টা পর্যন্ত চলবে থার্ড ফেজ।’ সেই আগের লোকটাই বলল।
‘কাউন্টডাউন বন্ধ করা যাবে কিভাবে?’ বলল আহমদ মুসা।
সঙ্গে সঙ্গে ওদের কাছ থেকে কোন উত্তর এল না।
আহমদ মুসা স্টেনগানের ব্যারেলটা ওদের উপর দিয়ে একবার ঘুরিয়ে এনে ধমকের সুরে বলল, ‘দেখুন আমি এক প্রশ্ন দু’বার করি না।’
সংগে সংগেই ওদিক থেকে উত্তর এল, ‘কাউন্টডাউনের দ্বিতীয় পর্যায় শেষ হওয়া পর্যন্ত কাউন্ট বন্ধ করা যাবে। কিন্তু কাউন্টডাউন একবার তৃতীয় পর্যায়ে প্রবেশ করলে আর তা বন্ধ করা যাবে না। কাউন্টডাউনের তৃতীয় পর্যায় এবং ফাইনাল ফায়ার কার্যত একই পর্যায়ের।’
‘কাউন্টডাউন তো প্রথম পর্যায়ে চলছে। এটা তো বন্ধ করা যাবে।’ বলল আহমদ মুসা।
‘বন্ধ করা যাবে। কিন্তু বন্ধ করার পাসওয়ার্ড আমাদের জানা নেই।’
চারজনের মধ্যে সেই লোকটাই বলল।
লোকটার মুখ থেকে পাসওয়ার্ডের কথা শুনেই আহমদ মুসার মনে হাতঘড়ির ব্যাক থেকে পাওয়া পাসওয়ার্ডের কথা ভেসে উঠল। তাহলে এখন সব পাসওয়ার্ড তার কাছেই। ফাইনাল ফায়ারের পাসওয়ার্ড কি ওদের কাছে নেই? জানতে হবে বিষয়টা।
‘পাসওয়ার্ড না পেলে কি কাউন্টডাউন বন্ধ করা যাবে না?’ বলল আহমদ মুসা।
‘না, বন্ধ করা যাবে না। স্বয়ংক্রিয়ভাবেই কাউন্টডাউন সেকেন্ড ও থার্ড ফেজ পেরিয়ে ফাইনাল ফায়ারে চলে যাবে।’ চারজনের একজন বলল।
‘কিন্তু ফাইনাল ফায়ারের জন্যে পাসওয়ার্ড-এর কি দরকার আছে?’ বলল আহমদ মুসা।
‘জি হ্যাঁ, ফাইনাল ফায়ারের জন্য পাসওয়ার্ড দরকার। কিন্তু কাউন্ট শুরু হবার পর তা যদি যথাসময়ে বন্ধ না হয় এবং ফাইনাল ফায়ার স্টেজে পৌঁছে যায়, তারপরে যথাসময়ে ‘ফায়ার’-এর জন্যে পাসওয়ার্ড দিতে হবে, যদি ফায়ার পাসওয়ার্ড না দেয়া হয়, তাহলে ৩০ মিনিট অপেক্ষার পর অটোম্যাটিক ফায়ার হয়ে যাবে।’ চারজনের সেই আগের জনই বলল।
‘ফায়ার বন্ধ করা যায় না?’ বলল আহমদ মুসা।
‘ফায়ার বন্ধের কোন পাসওয়ার্ড নেই। ফায়ারিং প্রসেসের ম্যানুয়াল ডিসকানেকশন ফায়ার বন্ধের একমাত্র বিকল্প পথ।’ বলল চারজনের একজন।
‘সহযোগিতার জন্যে আপনাদের ধন্যবাদ। প্লিজ, এখন চারজনই হাত উপরে তুলে উঠে আসুন এবং আমার সামনে মেঝেতে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ুন। বাম দিক থেকে তিনজন আগে আসুন।’ বলল আহমদ মুসা নির্দেশের সুরে।
সংগে সংগেই ওরা নির্দেশ পালন করল।
বাম দিক থেকে প্রথম তিনজন এসে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ল আহমদ মুসার সামনে। চতুর্থ জন দাঁড়িয়ে থাকল।
‘ঐ দেখুন ঐ প্যাকেট থেকে বেরিয়ে আসা সিল্কের কর্ডের একটা অংশ দেখা যাচ্ছে। আপনি গিয়ে কর্ড নিয়ে এসে এই তিনজনকে পিছমোড়া করে বেঁধে ফেলুন।’ বলল আহমদ মুসা চতুর্থজনকে লক্ষ্য করে।
‘যাচ্ছি স্যার, আমি কর্ড নিয়ে আসি। কিন্তু একটা কথা বলতে চাই স্যার মানুষ হিসাবে। আপনি মারাত্মক আহত স্যার। তিনটা গুলির আঘাত দেখতে পাচ্ছি আপনার দেহে। ক্ষত থেকে রক্তক্ষরণ হয়েই চলেছে। আপনার এখনই কিছু এইড দরকার।’ চতুর্থ লোকটি বলল।
আহমদ মুসা হাসল। বলল, ‘ধন্যবাদ আপনাকে মানুষ হিসাবে কথা বলার জন্যে। কিন্তু এসব বলে আমাকে দুর্বল করবেন না। আমি ভালো আছি। যান আপনি তাড়াতাড়ি কাজ করুন।’
লোকটি দ্রুত গিয়ে সিল্কের কর্ড নিয়ে এল এবং পিছমোড়া করে বেঁধে ফেলল তিনজনকে।
‘ধন্যবাদ সুন্দর করে বাঁধার জন্যে। এবার আপনি উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ুন। আপনাকেও বেঁধে ফেলতে চাই। দুঃখিত, এই মুহূর্তে আপনাকে বিশ্বাস করতে পারছি না। এই অপারেশন শেষ না হওয়া পর্যন্ত শত্রুপক্ষের কাউকেই বিশ্বাস করা যাবে না, এ নীতিই আমি অনুসরণ করতে চাই।’ বলল আহমদ মুসা।
লোকটি উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ল। আহমদ মুসা হাতের স্টেনগানটা পাশে রাখল। গুলিবিদ্ধ বাম কাঁধ ও গুলিবিদ্ধ বাম বাহুর যন্ত্রণায় কাতর কাঁধ ও হাতের সাহায্য নিয়েই আহমদ মুসা ডান হাত দিয়ে বেঁধে ফেলল চতুর্থ লোকটিকে।
বাঁধা শেষ করেই একটা চেয়ার দরজার মুখে টেনে নিয়ে ধপ করে বসে পড়ল। নিশ্চিত হলো, এখান থেকে ঘরের ভেতর ও বাইরে সমানভাবে নজর রাখা যাবে।
বসেই বুঝতে পারল আহমদ মুসা, যন্ত্রণা ও বেদনায় শরীর অনেক ভারি হয়ে গেছে। কাঁপছে তার শরীরটা।
স্টেনগান কোলের উপর রেখে পকেট থেকে জর্জ আব্রাহামের দেয়া প্লাস্টিকের এক বিশেষ ধরনের অয়্যারলেস বের করল। ওয়েভলেংথ ঠিক করাই ছিল জর্জ আব্রাহাম জনসনের অয়‍্যারলেসের সাথে। শুধু ট্রান্সমিটিং বাটনটা অন করল আহমদ মুসা। বাটন অন করেই বলল, ‘হ্যালো মি. জর্জ আব্রাহাম, আস্সালামু আলাইকুম।’

Top