৫৫. ডেথ ভ্যালি

চ্যাপ্টার

হাসপাতালের স্যুটে আহমদ মুসার কক্ষের দরজায় দাঁড়িয়ে বলল, ‘আমি ম্যাক আর্থার, ভেতরে আসতে পারি স্যার?’
‘এস ম্যাক আর্থার।’ বলল আহমদ মুসা।
ম্যাক আর্থার ঘরে ঢুকল।
‘কি ব্যাপার ম্যাক আর্থার? কোন খবর?’ বলল আহমদ মুসা।
‘স্যার, দাউদ ইব্রাহিমের পরিবার এবং তাদের সাথে রবার্ট রবিনসনের পরিবার এসেছে আপনার সাথে দেখা করতে। দেখা করেই চলে যাবে তারা।’ ম্যাক আর্থার বলল।
মিষ্টি হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘ওরা আমার বিপদের সময়ের সাথী ছিল। ওদেরকে সম্মানের সাথে নিয়ে এস। তার আগে ওদের বসার ব্যবস্থা কর ম্যাক আর্থার।’ বলল আহমদ মুসা।
বিশাল কক্ষ। প্রয়োজন মত চেয়ার আনা হলো।
দশ মিনিটের মধ্যে দুই পরিবার আহমদ মুসার কক্ষে প্রবেশ করল। সবার পরনেই স্টেরিলাইজড ইউনিফরম। আহমদ মুসার স্যুটে প্রবেশ করে প্রথমেই সকলকে পোশাক পাল্টাতে হয়েছে।
আহমদ মুসা হেসে সকলকে স্বাগত জানাল। বলল, ‘সবাই আপনারা কেমন আছেন? জনাব রবার্ট রবিনসন, বাড়ি ছাড়তে হওয়ায় আপনাদের অনেক কষ্ট হয়েছে। দুঃখিত আমি। মরিয়ম মারুফা, এলিজা, জনার্দন তোমরা সবাই ভালো আছ নিশ্চয়?’ থামল আহমদ মুসা।
কথা বলে উঠল রবার্ট রবিনসন, ‘আমাদের দুই পরিবারের পক্ষ থেকে আপনাকে অভিনন্দন। আপনি আমেরিকা ও আমেরিকান জনগণের জন্যে যা করেছেন, তার জন্যে আমেরিকান জনগণের সাথে আমরাও কৃতজ্ঞ। আপনার সাথে আমাদের কিছু মেশার সুযোগ হয়েছিল সেজন্যে আমরা আরও গর্বিত। চিরদিন মনে থাকবে আমাদের সেই দিনগুলোর কথা।’ কণ্ঠ ভারি হয়ে উঠল রবার্ট রবিনসনের।
‘আহমদ মুসার মুখও গম্ভীর হয়ে উঠল। বলল, ‘আমি মানুষ, মানুষের জন্যে কাজ করার যে সুযোগ আল্লাহ আমাকে দিয়েছেন, তার জন্যে আমি তাঁর কাছে কৃতজ্ঞ।’ বলল আহমদ মুসা।
‘ধন্যবাদ আহমদ মুসা স্যার। মানুষকে এইভাবে ভালোবাসার কথা বলা আমি আগে কারো কাছে শুনিনি, আর শুনবো কি না তাও জানি না। দেশ, জাতীয়তা, ধর্ম, বর্ণের বেড়া ভেঙে মানুষকে আপন করে নেয়ার জন্য চাই খুব বড় হৃদয়। ধন্যবাদ স্যার, আপনাকে।’ রবার্ট রবিনসন বলল।
‘জনাব রবার্ট রবিনসন, আমরা এক আদমের সন্তান। গোটা মানব সমাজ ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ। মানুষকে ভালোবাসা আমাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। মানুষের মুক্তি, কল্যাণের জন্যেই আমাদের ধর্ম ইসলাম।’ বলল আহমদ মুসা।
‘হয়তো তাই হবে। আপনিই তার প্রমাণ। রবার্ট রবিনসন বলল।
আহমদ মুসা কিছু বলতে যাচ্ছিল, তার আগেই এলিজা বলে উঠল, ‘স্যার, আমি একটা অভিযোগ নিয়ে এসেছি।’
‘বল।’ আহমদ মুসা বলল। তার মুখে হাসি।
‘ডেথ ভ্যালিতে এককভাবে এতবড় অভিযানের দায়িত্ব আপনার উপর থাকার পর আপনি সেদিন আমাদের বাড়িতে ক্রিমিনালদের সাথে সংঘর্ষে যাবার ঝুঁকি নিয়েছিলেন। তখন আপনার বড় কিছু হয়ে গেলে ডেথ ভ্যালি অভিযানের কি হতো? আমেরিকানদের কি হতো? একথা মনে হলেই আমার বুক কেঁপে উঠে। আপনি সেদিন ঐ ঝুঁকি নেয়াতে আপনার মূল দায়িত্বের প্রতি অবহেলা করা হয়েছিল। কেন আপনি এটা করেছিলেন?’ বলল এলিজা।
প্রথমে আহমদ মুসার মুখে হাসি ফুটে উঠেছিল, পরে গম্ভীর হয়ে উঠল। বলল, ‘তোমার অভিযোগ সত্য বোন। মানবিক বিবেচনার দাবি এটাই। কিন্তু এলিজা দুনিয়াতে মানুষই সবকিছু ঘটায় না। যা ঘটবার তা আল্লাহই ঘটান। মানুষের দায়িত্ব হলো, সেই ঘটনায় বুদ্ধি-বিবেকের রায় অনুসারে ভূমিকা পালন করা। আমি সেটাই করেছিলাম। তবে আল্লাহই তা করিয়েছিলেন। সুতরাং আমার কোন দোষ হয়নি।’ বলল আহমদ মুসা।
‘এতবড় ভারি কথা বুঝতে আমার সময় লাগবে স্যার। কিন্তু ভাবছি ডেথ ভ্যালির অপারেশনের কথা। এই ব্যাপারে আপনি কিছু বললেন না?’ এলিজা বলল।
হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘এই ঘটনাতেও আমি থাকব, এটা আল্লাহরই পরিকল্পনা ছিল। আল্লাহর অন্য পরিকল্পনা থাকলে সে ভাবেই ঘটনা ঘটত।’
‘ধন্যবাদ। বুঝেছি স্যার। আপনি বিবেক অনুসারে কাজ করবেন, যা ঘটাবার তা আল্লাহই ঘটাবেন। আমাদের খৃস্টানদের মধ্যে এমন বিশ্বাস নেই। আর প্র্যাকটিসিং ধর্মও আমাদের নয়।’ এলিজা বলল।
আহমদ মুসা কয়েকবার তাকিয়েছিল রবার্ট রবার্টসনের দিকে। এবার জিজ্ঞাসা করল রবার্ট রবিনসনকে, ‘ইনি কে? আপনার বাড়িতে দেখেছি বলে মনে হয় না।’
হাসল রবার্ট রবিনসন। বলল, ‘ওকে আপনার সাথে পরিচয়ই করানো হয়নি। ওনি আমার বড় ভাই রবার্ট রবার্টসন। ভার্জিনিয়ায় ওর বাড়িতেই তো আমরা ছিলাম। আর একটা খবর হলো, হাসপাতালে আপনার ওপর যে হামলা হবে এ খবর উনিই দিয়েছিলেন।’
আহমদ মুসার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। বলল রবার্ট রবার্টসনকে উদ্দেশ্য করে, ‘ধন্যবাদ! অনেক ধন্যবাদ আপনাকে। আপনার দেয়া তথ্য অমূল্য উপকার করেছে আমাদের। ওদের ষড়যন্ত্র রোধ করা গেছে আপনার দেয়া তথ্যেই।’
‘আমার খুবই ভালো লাগছে। আমি আপনার এবং দেশের কাজে লাগতে পেরেছি। বাই দি বাই স্যার, আরেকটা তথ্য আজ পেলাম। জানি না আদৌ সেটা কোন তথ্য কি না। তবে আমার সন্দেহ হচ্ছে একটা সিমিলার শব্দের জন্য। সে শব্দটা হলো ‘বিগ বস’। আমার দেয়া আগের তথ্যেও ‘বিগ বসের’ নির্দেশনার কথা বলা হয়েছিল। এ তথ্যেও সেই ‘বিগ বসে’র নির্দেশের কথা আছে।’ বলল রবার্ট রবার্টসন।
আহমদ মুসার ভ্রু কুঞ্চিত হয়ে উঠল। বলল, ‘প্লিজ বলুন তথ্যটা কি?’
‘আজ অফিস থেকে আমি বাজার হয়ে ফিরছিলাম। একটা পাবলিক কল অফিসের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম। পাবলিক কল অফিসটি টপলেস, সাধারণত এমনটা দেখা যায় না। ভেতরে একজন ক্ষুদ্র অয়্যারলেসে কথা বলছিল PCO-এর টেলিফোনে নয়। তার কথার ‘বিগ বস’ শব্দটি আমার কানে গেল। আমি থমকে দাঁড়ালাম। আগেও একটি বড় ঘটনায় এই শব্দটি আমি শুনেছি, তখন একথা আমার মনে পড়ে গিয়েছিল। আমি শুনতে লাগলাম তার কথা। কণ্ঠ উচ্চ নয়, কিন্তু অস্পষ্ট শব্দগুলো বুঝার মত ছিল। সে বলছিল, ‘বিগ বস’ ক্ষেপে গেছেন। ইতিমধ্যেই তিনি হাসপাতালের সব খবর পেয়েছেন। ডুপন্ট সিনাগগের বটম ফ্লোর আজ রাতেই খালি করতে বলেছেন। যেকোনো মূল্যে কাঁচামালগুলো, কম্পিউটারের হার্ডডিস্কগুলো এবং গুরুত্বপূর্ণ টেস্টিং যন্ত্রপাতিগুলো রক্ষা করতে হবে নতুনভাবে কাজ শুরু করার জন্যে। লিখে নাও, যাবে ২৯৯ নাম্বারের বটমে থ্রি নট থ্রি’র বটম হয়ে। লিখে নিয়েছ। ও.কে. বাই। ও.কে. বাই শুনেই আমি হাঁটা শুরু করে দিয়েছিলাম।’ থামল রবার্ট রবার্টসন।
‘ধন্যবাদ জনাব, আমার মনে হয় আপনার শোনা মেসেজটা খুবই মূল্যবান। ধন্যবাদ আপনাকে।’
বলেই আহমদ মুসা ম্যাক আর্থারকে বলল, ‘তোমার কাছে অয়‍্যারলেস আছে?’
‘ইয়েস স্যার।’ বলে ম্যাক আর্থার অয়্যারলেসটি আহমদ মুসার কাছে নিয়ে এল।
‘জনাব জর্জ আব্রাহামকে কল দাও।’ বলল আহমদ মুসা।
ম্যাক আর্থার কল করল এফবিআই প্রধান জর্জ আব্রাহাম জনসনকে।
সংযোগ হলেই অয়্যারলেসটি আহমদ মুসার ডান হাতে তুলে দিল।
আহমদ মুসা সালাম দিয়ে বলল, ‘জনাব আগের সেই একই সূত্র থেকে খবর। ডুপন্ট সিনাগগের আন্ডারগ্রাউন্ড কোন ফ্লোরে এইচ থ্রি’র স্টোর বা ল্যাব থাকতে পারে। আজ রাতেই ওরা এগুলো শিফট করবে। তাদের নতুনভাবে কাজ শুরু করার সবকিছু নাকি ওখানে আছে। এখনকার মত এটুকুই জনাব। আরও একটা তথ্য আছে সেটা আমি ম্যাক আর্থারকে বলছি। সে আপনাকে জানাবে।’
‘ধন্যবাদ আহমদ মুসা। সূত্রকে আমার ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাবে। আমার মনে হচ্ছে খুব মূল্যবান ইনফরমেশন। আমি নির্দেশ দিচ্ছি এখনি কাজ শুরু করার। আহমদ মুসা ধন্যবাদ। তোমার শরীর কেমন? তোমাদের বাসা থেকে আমাদের মায়েরা ঘণ্টাখানেকের মধ্যে তোমার ওখানে যাচ্ছে। ও.কে. আহমদ মুসা।’
কথা শেষ হয়ে গেল।
আহমদ মুসা তাকাল রবার্ট রবার্টসনের দিকে। বলল, ‘এফবিআই প্রধান জর্জ আব্রাহাম জনসন আপনাকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন।’
বলেই আহমদ মুসা তাকাল মরিয়ম মারুফাদের দিকে। বলল, ‘তোমরা যে কথা বলছ না?’
‘স্যার, কি বলব আমরা? খুশিতে আমরা অনেক কেঁদেছি। এমন দিন আমেরিকার দেখব ভাবিনি। মিডিয়ায় যখন দেখছি আমেরিকানদের স্লোগান, ‘আমেরিকানস এণ্ড মুসলিমস আর ব্রাদার্স,’ তখন আনন্দের আবেগ আমরা বুকে ধারণ করতে পারছিলাম না। চোখ ফেটে তা নেমে এসেছে অশ্রু হয়ে। আপনার রক্তের মূল্যে এই দিন আমরা পেয়েছি।’
মরিয়ম মারুফার শেষ কথাগুলো কান্নায় আটকে যাচ্ছিল।
কথা শেষ করে অশ্রু গোপন করার জন্য মুখ নিচু করল সে।
মরিয়ম মারুফার আবেগ আহমদ মুসাকেও স্পর্শ করেছিল। সংগে সংগে সে কথা বলতে পারল না। একটু সময় নিয়ে বলল, ‘আল্লাহর শুকরিয়া আদায় কর বোন। তিনি যা চেয়েছিলেন, সেটাই তিনি করেছেন। আলহামদুলিল্লাহ।’
‘আলহামদুলিল্লাহ।’ বলে উঠল মরিয়ম মারুফা, তার বাবা নূর ইউসুফ ও ভাই দাউদ ইব্রাহিম।
আহমদ মুসা দাউদ ইব্রাহিমের দিকে চেয়ে বলল, ‘দাউদ ইব্রাহিম তো এই ডেথ ভ্যালির ঘটনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। আলহামদুলিল্লাহ।’
দাউদ ইব্রাহিম লজ্জিত কণ্ঠে বলল, ‘স্যার, আমি মাত্র আপনার আদেশ পালন করেছি।’
কথাটা শেষ করেই দাউদ ইব্রাহিম বলল, ‘স্যার, আপনাকে বলা হয়নি, সিটিতে আমরা একটা বাড়ি পেয়েছি। বাবার কেসের রায় স্থগিত হয়েছে এবং রিট্রায়ালের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আমরা শহরে ফিরে এসেছি স্যার।’
‘আলহামদুলিল্লাহ। খুশি হলাম। ওয়াশিংটনে বেড়ানোর আরেকটা জায়গা হলো আমার।
আরও কিছুক্ষণ কথাবার্তা চলল।
রবার্ট রবিনসন এক সময় বলে উঠল, ‘আমরা অনেক সময় নিয়েছি।
এবার আমরা উঠছি। অনুমতি দিন স্যার। আর সেই সাথে একটা অনুরোধ করে রাখি, আমাদের বাড়িটাকে ভুলবেন না। ম্যাডামসহ যদি আপনাকে পাই, তাহলে তার চেয়ে বড় পাওয়া আমাদের আর কিছু হবে না। দাউদ ইব্রাহিমের বাড়ি এবং আমাদের বাড়িকে এক দৃষ্টিতে দেখার জন্যে অনুরোধ করছি।’ রবার্ট রবিনসন বলল।
হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘দুই বাড়িকে একসাথে বেঁধেও ফেলতে পারেন?’
‘কিভাবে?’ রবার্ট রবিনসন বলল। তার কণ্ঠে কিছুটা বিস্ময়!
‘আমি আর এগোবো না। আপনারা ভেবে দেখবেন।’ বলল আহমদ মুসা।
ভাবছিল রবার্ট রবিনসন। বলল, ‘কিছুটা বুঝেছি স্যার। আপনার ইচ্ছা আমাদের জন্যে আদেশ। এর বেশি আজ আর কিছু বলছি না স্যার।’ বলে উঠে দাঁড়াল রবার্ট রবিনসন।
সকলেই উঠে দাঁড়াল। একে একে বিদায় নিল সবাই।
সবাইকে বিদায় দিয়ে এসে ম্যাক আর্থার আহমদ মুসার সামনে দাঁড়াল। বলল, ‘স্যার মি. রবার্টসনের দেয়া কিছু তথ্যের বিষয় এফবিআই প্রধান স্যারকে অবহিত করার কথা বলেছিলেন, সে ব্যাপারে আমার করণীয় কি?’
‘ধন্যবাদ ম্যাক আর্থার স্মরণ করিয়ে দেয়ার জন্যে। মি. রবার্টসনের দেয়া তথ্যের মধ্যে দুটি বাড়ির নাম্বার আছে। একটি ২৯৯, অপরটি ৩০৩। তার দেয়া তথ্য অনুসারে, সিনাগগ থেকে তাদের মূল্যবান মালামাল তারা ২৯৯ নং বাড়ির বটম ফ্লোর থেকে ৩০৩ নং বাড়ির বটম ফ্লোর হয়ে সুড়ঙ্গের মাধ্যমে নিয়ে যাবে। এই তথ্যটা আমি এভাবে অত লোকের মধ্যে তাকে জানাতে চাইনি। এখন তুমি তাকে জানিয়ে দাও।’
বলল আহমদ মুসা।
‘ইয়েস স্যার।’ বলে ম্যাক আর্থার কক্ষ থেকে বেরিয়ে সামনের কক্ষে চলে গেল। কিছুক্ষণ পর ম্যাক আর্থার আবার আহমদ মুসার ঘরে ঢুকল।
সামনে দাঁড়িয়ে মাথা নিচু করে বলল, ‘স্যার, অল্পক্ষণের মধ্যেই ম্যাডামরা আসবেন। আমি তার অ্যারেঞ্জমেন্ট করতে চাই।’
আহমদ মুসা ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘হ্যাঁ, ওরা মিনিট পনেরোর মধ্যেই এসে যাবেন।’
ম্যাক আর্থার কক্ষ থেকে চেয়ার সরিয়ে ফেলে ঘরটিতে পাঁচ সিটের সোফার সাথে একটা তিন সিটের সোফা এনে যোগ করল। ফ্লাওয়ার ভাসে টাটকা ফুল এনে বসাল। দুটি সেন্টার টেবিলের ফলদানিতে বাদাম, আখরোট, কিশমিশ, প্রভৃতি শুকনো তাজা ফল রাখল। সেন্টার টেবিলের নিচের তাকে সফট ড্রিংকসহ কিছু প্রাকৃতিক ঝরনার পানির প্যাক রাখল।
জোসেফাইনরা এসে গেল।
সারা জেফারসনই তার তৈরি প্রটোকলে সবার আগে রেখেছিল জোসেফাইনকে। তাই জোসেফাইনই প্রথমে ঘরে ঢুকবে, সবাই তাকে ফলো করবে।
জোসেফাইন ঘরে ঢুকল।
আহমদ মুসা তাকিয়েছিল দরজার দিকে। জোসেফাইনকে ঢুকতে দেখে উঠতে চেষ্টা করে ব্যথা পেয়ে ধপ করে তার মাথাটা পড়ে গেল বালিশে।
জোসেফাইন ছুটে গেল আহমদ মুসার কাছে। মাথায় হাত রেখে বলল, ‘উঠতে গিয়েছিলে কেন? খুব ব্যথা লেগেছে?’ উদ্বেগ ও মমতায় মাখানো নরম কণ্ঠ জোসেফাইনের।
জোসেফাইনের প্রশ্নের জবাব না দিয়ে আহমদ মুসা বলল, ‘কেমন আছ জোসেফাইন?’
‘কেমন থাকতে পারি, বল?’ বলল জোসেফাইন।
‘আহমদ আবদুল্লাহ কোথায়?’ আহমদ মুসা বলল।
জোসেফাইন পেছনে তাকাল। দেখল কেউ নেই পেছনে।
‘ওরা আমার পেছনেই আসছিল। গেল কোথায়?’ বলল জোসেফাইন।
‘ওরা কারা?’ আহমদ মুসা বলল।
‘সারা জেফারসন, আহমদ আবদুল্লাহ এবং মা জিনা জেফারসন।’
‘তাহলে বুঝতে পারনি ওরা কোথায়?’ আহমদ মুসা বলল।
‘না, বুঝতে পারছি না।’ বলল জোসেফাইন।
হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘আমার কাছে তোমাকে একা আসার সুযোগ দেয়ার জন্যে সবাইকে আটকে দিয়েছে সারা জেফারসন।’
হাসল জোসেফাইন। বলল, ‘ভীষণ দুষ্টু সারাটা, বুদ্ধির শেষ নেই। দেখছি আমি।’
বলে জোসেফাইন দরজার দিকে এগোতে চাইল। আহমদ মুসা খপ করে তার হাত ধরে কাছে টেনে নিল। জোসেফাইন ভারসাম্য হারিয়ে আহমদ মুসার বুকের ডান পাশটায় পড়ে গেল। আহমদ মুসা ডান হাত দিয়ে তাকে আরও কাছে টেনে নিল।।
জোসেফাইন একটু ঘুরে আহমদ মুসার কপালে একটা চুমু খেয়ে বলল, ‘প্লিজ, ছেড়ে দাও। দুষ্টুদের ধরে আনি।’
হাসল আহমদ মুসা। ছেড়ে দিল সে জোসেফাইনের হাত। জোসেফাইন ছুটে চলে গেল বাইরে। সবাইকে সাথে করে নিয়ে এল।
আহমদ আবদুল্লাহ সারার হাত ধরে তার সাথে তাকে টেনে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আহমদ মুসার কাছে এসে দাঁড়াল।
আহমদ মুসা আহমদ আবদুল্লাহর মুখ থেকে চোখ উপরে তুলে সারা জেফারসনের দিকে একবার তাকিয়ে সালাম দিয়ে আহমদ আবদুল্লাহর দিকে তার ডান হাত বাড়িয়ে দিল। বলল, ‘কেমন আছ বেটা?’
আহমদ আবদুল্লাহ ডান হাত দিয়ে সারা জেফারসনকে ধরে রেখেছে। বাম হাত দিয়ে বাবার হাত জড়িয়ে ধরে বলল, ‘তুমি এখন ভালো আছ বাবা। কিন্তু তুমি হাসপাতালে কেন?’
‘আমি ভালো আছি কি করে জানলে বাবা?’ আহমদ মুসা বলল।
‘আমি টিভিতে তোমাকে দেখেছিলাম, তোমার গায়ে কি সব ময়লা, রং। তবে এখন ঠিক আছ।’
‘হ্যাঁ বাবা, আমি এখন ঠিক আছি।’ আহমদ মুসা বলল।
‘আলহামদুলিল্লাহ।’ বলেই আহমদ আবদুল্লাহ সারা জেফারসনের হাত একটু টেনে উপরে তুলে বলল, ‘একে তুমি চেন বাবা, আমার মাম্মি।’
আহমদ মুসা একটু বিব্রত হলো। জোসেফাইনকে দেখিয়ে বলল, ‘ইনি কে বেটা?’
আহমদ আবদুল্লাহ সংগে সংগেই জবাব দিল, ‘আম্মা, আমার আম্মা। আর এ আমার মাম্মি।’
আহমদ মুসা তাকাল জোসেফাইনের দিকে।
জোসেফাইন নিজের জোড়া ঠোঁটের তর্জনি লম্ব আকারে লাগিয়ে ইংগিত করল এ নিয়ে কথা না বলতে।
বুঝল আহমদ মুসা। হেসে উঠল। বলল, ‘তোমার মাম্মিকে আমি চিনি বাবা।’
বলে একবার সারা জেফারসনের দিকে মুখ তুলে তাকিয়ে চোখ নিচু করে বলল, ‘কেমন আছেন মিস সারা? কতদিন পরে দেখা বলুন তো!’
বিব্রত সারা জেফারসনের মুখ লাল হয়ে উঠেছে। মুখে তার লজ্জার জড়তা।
‘স্যরি, এ প্রশ্নটা আমারই জিজ্ঞাসা করা উচিত আপনাকে। স্যরি, সালাম দিতেও ভুলে গেছি।’ বলল সারা জেফারসন অনেকটা কাঁপা কণ্ঠে।
‘আমিও তো সালাম দিতে ভুলে গেছি সারা।’ জোসেফাইন বলল।
‘সালাম একটা দোয়া। তোমরা সালামের চেয়ে অনেক বেশি দোয়া আমার জন্যে করেছ, করছ। আর ভুল তো হতেই পারে। আসলে আমাদের কারও মনই স্বাভাবিক অবস্থায় নেই।’
বলে আহমদ মুসা সারা জেফারসনের মা জিনা জেফারসনের দিকে মুখ ফিরাল। বলল, ‘মা, আপনি কেমন আছেন?’
‘এখন আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি। কিন্তু ভালো ছিলাম না-বাছা! তোমার উপর দিয়ে যে ঝড় বয়ে গেল, তার কষ্ট আমরাও পেয়েছি। আল্লাহর হাজার শোকর, সব ঝড় থেমে গেছে। তোমার সেরে উঠতে যদিও সময় লাগবে, কিন্তু তোমাকে এমন সুস্থ অবস্থায় দেখে আমাদের খুব আনন্দ লাগছে বাছা!’ বলল জিনা জেফারসন।
‘আমার উপর দিয়ে অনেক বিপদের ঝড় বয়ে গেছে সত্য, কিন্তু কষ্ট অনুভব করতে পারিনি। সেই তুলনায় আপনাদের অসহনীয় যন্ত্রণা সহ্য করতে হয়েছে। কষ্ট আপনারাই বেশি পেয়েছেন।’ আহমদ মুসা বলল।
‘কি বলব বাছা! এই দু’জনের দিকে আমি তাকাতে পারিনি। আমার জোসেফাইন মা ধৈর্যের এক জীবন্ত প্রতিমূর্তি। তবু বুক জোড়া ব্যথার প্রকাশ তো আটকানো যায় না। সে তুলনায় সারা অনেক পাতলা। অল্প চাপেই ভেঙে পড়া তার স্বভাব।’ বলল জিনা জেফারসন।
‘মা, জোসেফাইন সম্পর্কে আপনি ঠিক বলেছেন। বিপদ-বিপর্যয়ে সে পাথরের মত শক্ত হয়ে দাঁড়াতে পারে। কিন্তু মিস সারা অতটা পাতলা নয় মা, যেভাবে আপনি বললেন। আমি তো দেখেছি, দুঃখ ও বিপদের সময় সেও সব ভয়ের উর্ধ্বে উঠতে পারে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘মা, আমি আহমদ আবদুল্লাহকে স্যুটটা একটু ভালো করে ঘুরিয়ে দেখিয়ে আনি।’
বলেই জোসেফাইনের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘যাই আপা। দেখ, আহমদ আবদুল্লাহ কেমন উসখুস করছে।’
‘ঠিক আছে, ঘুরিয়ে নিয়ে এস।’ বলল জোসেফাইন।
‘আমাকে নিয়ে চল সারা, আমিও দেখি। ভাইকে একা তুমি সামলাতে পারবে না।’
বলে সারার মা জিনা জেফারসনও উঠে দাঁড়াল।
‘তাহলে আমি বাদ থাকি কেন?’ বলল জোসেফাইন।
‘বাছা একা থাকবে। আর একজন কেউ থাকলে তুমিও যেতে।’ বলল জিনা জেফারসন।
সারা জেফারসনরা কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেল।
জোসেফাইনের মুখ লজ্জায় লাল হয়ে উঠেছে।
হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘তোমার মুখ লাল হয়ে উঠল কেন? ওরা তো অন্যায় কিছু করেনি। তোমার জন্যেই তো ওরা এটা করল।’
জোসেফাইন আহমদ মুসার মাথার পাশে বসতে বসতে বলল, ‘এই দুষ্টু বুদ্ধি সব সারার।’
‘দুষ্টু বুদ্ধি বলছ কেন, এটা তো ওর শুভ বুদ্ধি। কতদিন পরে আমাদের দেখা হলো বলতো? সেই যে সৌদি সরকারের অনুরোধে প্যাসিফিকে গেলাম। তারপর কত দিন!’ আহমদ মুসা বলল।
‘তোমার এসব মনে করবার সময় কখনো হয়েছে!’ বলল জোসেফাইন। তার কণ্ঠে অভিমান।
আহমদ মুসা জোসেফাইনের একটা হাত হাতের মুঠোতে নিয়ে বলল, ‘আমার মনটা জেনে বলছ?’
জোসেফাইন ধীরে ধীরে নিজের মাথাটা আহমদ মুসার মাথার উপর আলতোভাবে রেখে বলল, ‘জানি আমি। জানি বলেই তো নিজের মনটাকে শক্ত রাখার চেষ্টা করি, যাতে তুমি দুর্বল না হয়ে পড়।’
জোসেফাইনের চোখের দু’ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল আহমদ মুসার কপালে।
আহমদ মুসা জোসেফাইনের হাত ছেড়ে দিয়ে কপাল থেকে জোসেফাইনের অশ্রুর সেই ফোঁটা তর্জনিতে নিল। বলল, ‘জান এই অশ্রুটা কি? হৃদয়ের অন্তহীন ভালোবাসার অনন্তরূপের গলিত প্রকাশ।
এই অশ্রু যার জন্যে তার চেয়ে ভাগ্যবান দুনিয়াতে কেউ নেই।’
জোসেফাইন ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। বলল, ‘এবার আমি খুব কষ্ট পেয়েছি। এবার তুমি আমাকে অনেক বেশি সময় দেবে।’
আহমদ মুসা-জোসেফাইনের মাথা একটু তুলে ধরে তার চোখে, মুখে, কপালে চুমু এঁকে দিল। বলল, ‘এবার আমি আর অন্যথা করব না। তুমি যা চাও তাই হবে।’
জোসেফাইন আহমদ মুসার কপালে আর একটি চুমু দিয়ে উঠে বসে বলল, ‘কথা কিন্তু দিলে।’
‘তোমাকে কথা দিয়ে কথা রাখিনি, এমন ঘটনা মনে হয় ঘটেনি।’ আহমদ মুসা বলল।
‘সেই জন্যেই তো স্মরণ করিয়ে দিলাম।’ বলল জোসেফাইন।
জোসেফাইন আহমদ মুসার মাথার চুলে হাত ঢুকাল। গোটা মাথার চুলে আঙুল চালিয়ে বলল, ‘বাহ! তোমার চুল তো এখনো সুন্দরই আছে। কিভাবে এটা হলো।’
‘কেন দাউদ ইব্রাহিম ও রবার্ট রবিনসনের বাসায় তো কোন অসুবিধায় ছিলাম না।’ আহমদ মুসা বলল।
‘নিয়ে যাবে আমাকে ওদের কাছে। আমি কৃতজ্ঞতা জানাব।’ বলল জোসেফাইন।
‘নিয়ে যেতে হবে না, ওরাই ছুটে আসার জন্যে ব্যাকুল হয়ে আছে।
তোমরা আসার আগে ওদের দুই পরিবারই এসেছিল দেখা করতে। ওরা আমার এবং দেশের অশেষ উপকার করেছে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘আল্লাহ ওদের এর উত্তম জাযাহ দিন।’ বলল জোসেফাইন।
‘ছাড়, সারারা এতক্ষণ কোথায়? আহমদ আবদুল্লাহ কি করছে দেখি।’ বলল জোসেফাইন।
‘আচ্ছা জোসেফাইন, আহমদ আবদুল্লাহ সারাকে মাম্মি বলার ব্যাপারটা কি?’ হাসতে হাসতে বলল আহমদ মুসা।
জোসেফাইনও হেসে উঠল। বলল, ‘সে অনেক কথা। অনেক দৈবের ব্যাপার। আমরা আমেরিকায় এসে যখন এয়ারপোর্টে নামলাম। আংকেল জর্জ আব্রাহামের পরিবার, জেফারসন পরিবার গিয়েছিল আমাদের রিসিভ করতে। এর মধ্যে আহমদ আবদুল্লাহ গিয়ে মাম্মি মাম্মি বলে জড়িয়ে ধরেছিল সারা জেফারসনকে। সবাই অবাক! সারা তো স্তম্ভিত, বিব্রত। সে এতটাই আনমনা হয়ে পড়েছিল যে, তার হাতের ফুলের তোড়া মাটিতে পড়ে গিয়েছিল। কিন্তু আহমদ আবদুল্লাহর সেদিকে কোন ভ্রূক্ষেপ নেই। মাম্মি মাম্মি করে সারার কোলে উঠে তবেই ছেড়েছে। তারপর থেকে তার সারাদিন চলছে সারাকে নিয়ে। রাতেও ঘুমায় তার কাছে।’
‘স্ট্রেঞ্জ। সারা কিংবা মা কিছু মনে করেন না?’ আহমদ মুসা বলল।
‘মা বলেন, বাচ্চারা বেহেশতের ফুল। যা চায় ও বলুক। আর সারা কি বলবে, সে মাম্মিই হয়ে গেছে। আগের থেকেই দারুণ ভালোবাসে ও আহমদ আবদুল্লাহকে।’ বলল জোসেফাইন।
‘অবাক কাণ্ড। ‘আহমদ মুসা বলল।
‘আল্লাহর কোন ইচ্ছা হয়তো এই অবাক কাণ্ডের মধ্যে আছে।’ বলল জোসেফাইন মিষ্টি হেসে।
আহমদ মুসা তাকাল জোসেফাইনের দিকে। বলল, ‘কি বলতে চাচ্ছ তুমি?’ গম্ভীর কণ্ঠ আহমদ মুসার।
‘এখন সব কথা নয়। তুমি অসুস্থ।’ বলল জোসেফাইন।
‘কেন সব কথা এখন নয় বলছ জোসেফাইন?’ আহমদ মুসা বলল।
‘এই তো বললাম আল্লাহর ইচ্ছার কথা।’ বলল জোসেফাইন।
‘কি ইচ্ছা?’ আহমদ মুসা বলল।
‘এই কথাই তো এখন নয় বলছি। তবে একটা কথা তোমাকে বলি, ‘আমার ইচ্ছায় আমি আমেরিকায় এসেছি কেন বলতো?’
আহমদ মুসা একটু ভাবল। হাসল। বলল, ‘বেড়াতে এসেছ, এটাই তো কথা।’
‘শুধু বেড়াতে নয়, সারাকে নিয়ে যাবার একটা মিশন নিয়েও এসেছি।’ বলল জোসেফাইন। তার কণ্ঠ গম্ভীর।
আহমদ মুসা গভীর দৃষ্টিতে তাকাল জোসেফাইনের দিকে। বলল, ‘আমি বুঝতে…।’
জোসেফাইন আহমদ মুসার ঠোঁটে আঙুল চাপা দিয়ে বলল, ‘এ বিষয়ে আর একটি কথাও নয়। তোমাকে সব বলব আমি। বলার জন্যে অপেক্ষা করেছি বহুদিন।’
আহমদ মুসা আবার গভীর দৃষ্টিতে তাকাল জোসেফাইনের দিকে।
মনে তার অনেক কথা জাগল। জোসেফাইন কি বলতে চায়, মন কিছুটা যেন আঁচও করতে পেরেছে। একটা নতুন বিস্ময় এসে তার মনকে আচ্ছন্ন করল। কিন্তু কিছু বলা যাবে না। জোসেফাইনের আঙুল তখনও তার ঠোঁটে চেপে আছে।
আহমদ মুসা জোসেফাইনের হাত ধরে তার হাতে একটা চুমু খেয়ে বলল, ‘ঠিক আছে আমার জোসেফাইন, তথাস্তু।’

দিনে দু’একবার ঘরের মধ্যে দু’চার মিনিট পায়চারি করার অনুমতি দিয়েছে ডাক্তাররা আহমদ মুসাকে। এখন কক্ষের ব্যালকনিতে চেয়ারে গিয়ে বসতে পারে আহমদ মুসা। সে কক্ষে পায়চারি করছিল।
হঠাৎ তার অয়‍্যারলেস বিপ বিপ করে উঠল।
আহমদ মুসা অয়‍্যারলেস তুলে নিয়ে কানে ধরল।
ওপ্রান্ত থেকে শোনা গেল জর্জ আব্রাহাম জনসনের গলা।
আহমদ মুসা সালাম দিয়ে বলল, ‘কেমন আছেন জনাব?’
‘ভালো আছি আহমদ মুসা। তোমাকে একটা খবর জানাবার জন্যে কল করেছি। এ মাসের শেষের দিকে তুমি হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাচ্ছ। আগামি মাসের মাঝমাঝি তোমাকে নিয়ে একটা গেট-টুগেদারের আয়োজন করেছেন প্রেসিডেন্ট। একথাটা প্রেসিডেন্ট তোমাকে আগাম জানিয়ে রাখতে বলেছেন।’ বলল আব্রাহাম জনসন।
‘তেমন কিছু হতেই পারে। কিন্তু এত আগে সিদ্ধান্ত!’ আহমদ মুসা বলল।
‘প্রেসিডেন্ট থাকবেন তো। তাই এত আগাম চিন্তা।’ বলল জর্জ আব্রাহাম জনসন।
‘কারা থাকবেন সে গেট-টুগেদারে?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।
‘সিনেট ও কংগ্রেসের স্পীকারসহ নেতৃবৃন্দ, প্রেসিডেন্টের ক্যাবিনেট, গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কর্মকর্তারা, প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ, মানবাধিকার সংস্থাগুলোর নেতৃবৃন্দ- এই আর কি।’ বলল জর্জ আব্রাহাম জনসন।
‘বিরাট আয়োজন। জানেন তো এমন কিছু আমি এড়িয়ে চলি।’ আহমদ মুসা বলল।
‘তুমি আপত্তি করো না। এটা একটা প্রাথমিক ধারণা। লোক কমতেও পারে। আসল ব্যাপার হলো সকলের দাবির প্রেক্ষিতে এটা হচ্ছে। এজন্যে প্রেসিডেন্টও বেকায়দায় আছে।’ বলল জর্জ আব্রাহাম জনসন।
‘ঠিক আছে জনাব। আমি বলছিলাম, গেট-টুগেদার ছোট হলেই মানায় বেশি।’ আহমদ মুসা বলল।
‘ঠিক আছে শুনলাম। প্রেসিডেন্টেরও মাথায় এটা আছে। আচ্ছা, ও.কে. আহমদ মুসা।’
‘ও.কে. জনাব। আস্সালামু আলাইকুম।’ আহমদ মুসা বলল।
‘ওয়াআলাইকুম সালাম।’ বলল জর্জ আব্রাহাম জনসন।
কথা শেষ হয়ে গেল। মনটা যেন খারাপ হয়ে গেল আহমদ মুসার।
বসে পড়ল সোফায়। সামনের টেবিলে আজকের ওয়াশিংটন পোস্ট।
মনটা খুশি হয়ে উঠল তার।
পাতার পর পাতা উল্টিয়ে নিউজ হেডলাইনের উপর চোখ বুলাতে লাগল। মেগাজিন সেকশনের ইতিহাস-ঐতিহ্য বিভাগের একটা শিরোনামে এসে আহমদ মুসার চোখ আটকে গেল। শিরোনামটা হলো:
সুলতান গাজী সালাহুদ্দিন আইয়ুবের নিজস্ব বলে কথিত কবিলাটি আজ ধ্বংসের পথে। বিবরণে বলা হয়েছে, গাজী সালাহুদ্দিনের কবিলাটি কোন এক কাল থেকে বাস করছে আর্মেনিয়ার দক্ষিণ সীমান্তের প্রান্ত এলাকায়। এটা আজারবাইজান, ইরান ও তুরস্কের সীমান্ত ঘেষে। উঁচু পাহাড় ঘেরা, দুর্গম উপত্যকা, গভীর বনাঞ্চল নিয়ে তাদের বাস। এই এলাকায় বিভিন্ন দেশের মানুষ যখন বাড়ছে, এই কবিলার লোক তখন জ্যামিতিক হারে কমছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, খুব শীঘ্র এই কবিলার কোন অস্তিত্ব আর থাকবে না। জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থা ও ইউনেসকো এই বিষয় নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তারা কোন রাজনৈতিক বৈরিতা বা কোন নাশকতার শিকার কি না, তারও কোন হদিস করতে পারেনি ইউনেসকো। অনেক বড় ফিচার। সবটাই পড়ল আহমদ মুসা।
মনটা ভালো করার জন্যে পত্রিকা পড়তে বসে মনটা আরও খারাপ হয়ে গেল তার। রেখে দিল পত্রিকা। ধীরে ধীরে উঠে এসে শুয়ে পড়ল।
ঘড়ির দিকে তাকাল। বেলা ১০টা বাজতে যাচ্ছে। মনটা খুশি হয়ে উঠল তার। আহমদ আবদুল্লাহকে নিয়ে জোসেফাইন ও সারা এই হাসপাতালেই এসেছে। হাসপাতালের কাজ সেরে এখানে আসবে ওরা। ওদের আসতে দশটা বাজতে পারে বলে জানিয়েছে।
দশটা বাজার সাথে সাথেই আহমদ মুসার বেডের পাশের ইন্টারকম বেজে উঠল। আহমদ মুসা পাশ ফিরে বোতাম চেপে কল অন করল।
ম্যাক আর্থারের কণ্ঠ শোনা গেল। বলল, ‘স্যার ম্যাডামরা এসেছেন।’
‘ওদের আসতে বল ম্যাক আর্থার।’ বলল আহমদ মুসা।
শোয়া থেকে উঠে বসল আহমদ মুসা। অপেক্ষা করতে লাগল জোসেফাইনদের। দরজা খোলার শব্দ হলো। এসে গেছে ওরা।

পরবর্তী বই
আর্মেনিয়া সীমান্তে

Top