৫৮. রত্ন দ্বীপ

চ্যাপ্টার

শুকতারা সবে দিগন্তের উপরে উঠেছে।

একটা মাইক্রো এসে সড়কের পাশে একটা পুরানো সিনাগগের ধার ঘেঁষে দাঁড়াল।

মাইক্রো থেকে লাফ দিয়ে নামল চারজন মানুষ। চারজনই মুখোশ পরা।

ছুটল সিনাগগের দিকে, সিনাগগের বিভিন্ন অংশের দিকে।

সিনাগগটি খুবই পুরানো। কয়েকশ বছরের পুরানো।

সিনাগগটি দ্বীপের উত্তর-পশ্চিম উপকূলে। একেবারে উপকূলে নয়। এই অংশের উপকূলটা এবড়ো-থেবড়ো পাহাড়ে ঢাকা। পাহাড়ী উপকূল থেকে দ্বীপের অভ্যন্তরে একটু এগোলেই একটা সমতল উপত্যকা। এ উর্বর উপত্যকায় রয়েছে বসতি। উপত্যকার মাঝখান দিয়ে দ্বীপের একটা প্রধান। সড়ক। এই সড়কের পাশেই সিনাগগটা।

দ্বীপটার নাম রত্ন দ্বীপ। ইংরেজি, স্প্যানিশ ভাষায় এটার নাম নিউ ট্রেজার আইল্যান্ড, সংক্ষেপে রত্ন দ্বীপ।

দ্বীপটি ভূমধ্যসাগরের মানচিত্রে প্রায় অদৃশ্য। একশ ষাট বর্গমাইল। আয়তনের ও দুই লাখ মানুষের ছোট্ট দ্বীপ এটা। সুন্দর ও মজার ভূ-প্রকৃতি এই রত্ন দ্বীপের। পাহাড়ের দেয়ালে দ্বীপের চারদিকটাই ঘেরা। দক্ষিণ ও উত্তর উপকূলে দুটি মাত্র উন্মুক্ত স্থান। দ্বীপে প্রবেশের পথ মাত্র এই দুটিই। কোনো কোনো স্থানে পাহাড় ডিঙানো হয়তো অসম্ভব নয়, কিন্তু তা খুবই কষ্টকর ও বিপজ্জনক। এ পর্যন্ত যারাই এ চেষ্টা করেছে শখের বশে, তাদের অনেকেই সফল হয়নি। কয়েকজন মারাও পড়েছে। সুতরাং দ্বীপটা একটা প্রাকৃতিক দুর্গ। দুর্গের ভেতরের দৃশ্য সুন্দর এবং বিস্ময়কর। দ্বীপের চারদিকের পাহাড় থেকে ভূমি কিছুটা ঢালু হয়ে দ্বীপের কেন্দ্রের দিকে নেমে গেছে। ঠিক কেন্দ্রে রয়েছে মিঠা পানির প্রাকৃতিক হ্রদ, যা সেচ ও খাবার পানির যোগান দেয়। হ্রদটির নাম লেক ফরচুন। আসলেই দ্বীপটির। মানুষের জন্যে লেকটি সৌভাগ্য-সমুদ্র। দ্বীপের মধ্যে ছোট ছোট টিলা এবং উর্বর উপত্যকার সারি। টিলাগুলোর মাথায় মানুষের বাড়ি ও গাছ-পালা এবং উপত্যকায় তাদের ফসল।

দ্বীপের বসতিটাও এক মজার কাহিনী। ইউরোপীয় মধ্যযুগের শেষ দিকে ইউরোপ, এশিয়া, আফ্রিকার নির্যাতিত মানুষরাই এই নির্জন ও নিরাপদ দ্বীপে বসতি গড়তে শুরু করে। এর মধ্যে ছিল মুসলিম খ্রিস্টান ইহুদি সব ধরনের লোকই। মুসলমানদের সবচেয়ে বড় সংখ্যা আসে স্পেন থেকে। স্পেনে মুসলমানদের হাত থেকে ক্ষমতা খ্রিস্টানদের হাতে চলে যাবার পর হত্যা ও ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচার জন্যে এবং বেঁচে যাওয়া নির্যাতিত, সর্বহারা মানুষের যে ঢল ভূমধ্যসাগরে নেমেছিল, তাদের বড় অংশ ডুবে মারা যায় অথবা জলদস্যুদের দ্বারা লুষ্ঠিত ও নিহত হয়েছিল। অবশিষ্টদের একটা অংশ ফরাসি উপকূলে আশ্রয় পেয়েছিল আর একটা বড় অংশ উঠেছিল বিভিন্ন দ্বীপে। নির্জন রত্ন দ্বীপেও এসেছিল প্রচুর মানুষ। এভাবে ইউরোপের রাজনৈতিক হানাহানিতে উদ্বাস্তু এবং নিরাপত্তার সন্ধানে খ্রিস্টানরা বিভিন্ন দিক থেকে এসেছিল এই দ্বীপে। ইউরোপের নির্যাতিত লাখ লাখ মানুষ এবং ফিলিস্তিনের ইহুদি-মুসলিমদের মধ্যকার হানাহানি এড়াবার জন্য কিছু ফিলিস্তিনিও এই রত্ন দ্বীপে এসেছিল। এই সব নির্যাতিত মানুষের উত্তরসূরিরাই আজ রত্ন দ্বীপের বাসিন্দা। শুরু থেকে কিছু জলদস্যুও ঘাঁটি গেড়েছিল দ্বীপটিতে।

দ্বীপটির উপর চারপাশের অনেক দেশেরই ক্ষমতাধরদের চোখ পড়েছিল। দ্বীপটি কোনো দিক দিয়েই কারো খুব কাছকাছি নয়, তবু দ্বীপটিকে দখলে নেয়ার জন্যে এক সময় সকলেই উঠে পড়ে লেগেছিল। দ্বীপটির অবস্থান লিবিয়া থেকে ৪০০ মাইল উত্তরে, ক্রিট দ্বীপ থেকে ৫০০ মাইল পশ্চিমে, গ্রিস থেকে ৫০০ মাইল দক্ষিণে, মাল্টা থেকে ৫৫০ মাইল পুর্বে এবং ইটালি থেকে ৬০০ মাইলেরও বেশি দক্ষিণ-পূর্বে। দ্বীপটি নিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় টানা-হেঁচড়া বেশি হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাতিসংঘের হস্তক্ষেপে দ্বীপটির স্বাধীনতা রক্ষা পায়। সবাই মেনে নেয় দ্বীপটি নিরপেক্ষ থাকবে এবং কেউ কোনো হস্তক্ষেপ করবে না। দ্বীপটিতে সেনাবাহিনী নেই। আনুষ্ঠানিক কোনো পুলিশ বাহিনীও নেই। স্থানীয়ভাবে তৈরি ক্যুনিটি পুলিশ শান্তি রক্ষা ও সামাজিক সাহায্য-সহযোগিতার কাজ করে। আঞ্চলিক কমুনিটি পুলিশের প্রতিনিধি নিয়ে পাঁচ হাজার সদস্যের একটা কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা বাহিনী রয়েছে। এই বাহিনীর একশ করে সদস্য দ্বীপের ১৫টি প্রশাসনিক জোনের প্রশাসনিক কেন্দ্রে মোতায়েন রয়েছে। আর পাঁচশ করে সদস্য রয়েছে দ্বীপের দুই প্রবেশ পথের বন্দর এলাকায়। অবশিষ্ট আড়াই হাজার সদস্য রিজার্ভ ফোর্স হিসেবে মোতায়েন রয়েছে দ্বীপের রাজধানী কাবার্বা ক্যাসলে। রাজধানীর এই কাবার্বা ক্যাসলের নাম মূলত ছিল খায়ের উদ্দিন বার্বারোসা ক্যাসল। কালক্রমে তা পরিবর্তিত হয়ে রূপ নিয়েছে কাবাবা ক্যাসলে। রত্ন দ্বীপ রাষ্ট্রে রূপ নেবার পর এই কাবার্বা ক্যাসল রাজধানী হয়েছে। আজ এই দ্বীপ রাষ্ট্র সব ধর্মের লোকদের আবাসভূমি। সব ধর্মের প্রতিনিধিদের থেকে নির্বাচিত একটা গণতান্ত্রিক সরকার দ্বীপের শাসনকাজ পরিচালনা করে।

চারজন যারা সিনাগগে প্রবেশ করেছিল, তাদের মধ্য থেকে একজন একজন করে দেড় মিনিটের মধ্যেই সিনাগগ থেকে বেরিয়ে এসে ছুটে গিয়ে গাড়িতে চড়ল। তারা গাড়িতে ওঠার সংগে সংগেই গাড়ি ছুটতে শুরু করল।

মাত্র তিন মিনিট। গাড়িটা দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে গেছে। এরপরই সিনাগগে প্রচণ্ড বিস্ফোরণের শব্দ হলো। ভোরের নীরবতা খান খান হয়ে ভেঙে পড়ল। সিনাগগের কয়েকটা অংশ প্রচণ্ড বিস্ফোরণে উড়ে গেল। পুরনো সিনাগগের কয়েকটা অংশ সম্প্রতি পুনর্নির্মিত হয়েছে। অন্যান্য অংশ রিপেয়ার করে সুন্দর রূপ দেয়া হয়েছে। বিস্ফোরণে পুনর্নির্মিত অংশগুলো ধ্বংস হয়ে গেল। সিনাগগের কয়েকজন কর্মচারী ও সিনাগগের পুরোহিত। রাব্বি বারুস বেনইয়ামিন বেরিয়ে এসেছে তাদের বাড়ি থেকে। সিনাগগের অল্প কয়েকশ গজ দূরেই তাদের বাড়ি। বেরিয়ে এসে তারা চিৎকার এবং হৈচৈ শুরু করেছে।

আশেপাশের এলাকা থেকে আরও লোক ছুটে এল। ছুটে এলো কমুনিটি পুলিশরাও। কয়েক মিনিটের মধ্যে দমকলও এসে হাজির হলো। চারদিকে চেঁচামেচি হৈচৈ।

কম্যুনিটি পুলিশ চেষ্টা করতে লাগল দুর্ঘটনার মূল স্থান থেকে মানুষকে দূরে সরিয়ে রাখতে, যাতে কোনো আলামত থাকলে তা নষ্ট না হয়ে যায়। ক্যুনিটি পুলিশরা আশপাশ এবং দগ্ধবিশিষ্ট জিনিসপত্রের মধ্যে আঁতিপাতি করে প্রয়োজনীয় আলামতকে খুঁজতে লাগলো। এ

অল্পক্ষণের মধ্যে সংবাদপত্র ও টিভি চ্যানেলের লোকরাও এসে গেল। সাংবাদিকদের ছুটাছুটি ও তাদের ক্যামেরার ক্লিক ক্লিক শব্দে নতুন দৃশ্যের অবতারণা হলো। তারা কথা বলতে লাগলো বিভিন্ন জনের সাথে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে, বিভিন্ন প্রশ্ন নিয়ে।

এই দিনই রত্ন দ্বীপের বিভিন্ন পত্রিকার মর্নিং এডিসনে সিনাগগে নাশকতার ঘটনা ও ছবি নিয়ে বিস্তারিত খবর বেরুল। রত্ন দ্বীপ ছোট-একটা ভূখণ্ড হলেও, সেখানে অনেকগুলো দৈনিক রয়েছে। স্প্যানিশ, আরবি, ইংরেজি, ইতালীয়, গ্রিস ভাষার দৈনিকগুলোর ভালো কাটতি আছে দ্বীপে। এদের মধ্যে স্প্যানিশ, আরবি ও ইংরেজি ভাষার দৈনিক বেশি জনপ্রিয়। সাকুলেশনের দিক দিয়ে আরবি দৈনিক রয়েছে সবার উপরে। কিন্তু দ্বীপের এলিট ও রাজনৈতিক মহলের মধ্যে ইংরেজি দৈনিক বেশি চলে।

ইংরেজি দৈনিক রত্ন দ্বীপ টাইমস সিনাগগের এই ঘটনার খবর নিয়ে লিখেছে :

আজ সূর্যোদয়ের ঘণ্টাখানেক আগে দ্বীপের আরাগন এলাকার একটা সিনাগগে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। বিস্ফোরণে সিনাগগের একটা বড় অংশ সম্পূর্ণ ধ্বসে গেছে। এই ঘটনায় মানুষের মধ্যে ভয়, বিস্ময় এবং তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে।

রাজধানী কাবাবা ক্যাসল থেকে যে হাইওয়েটা লেক ফরচুনের চারদিক ঘিরে তৈরি রিং রোডে গিয়ে পড়েছে, সেই হাইওয়ের একটা শাখা পশ্চিমে এগিয়ে আরাগন অঞ্চলের ভেতর দিয়ে চলে গেছে। এই সড়কের ধারেই সিনাগগটি। সিনাগগটি শত বছরেরও বেশি পুরনো। সম্প্রতি এর সংস্কার হয়েছে। ভেঙে পড়া অংশটি আগের আদলেই নির্মাণ করা হয়েছিল। বিস্ফোরণে সেই অংশটিও ধ্বসে পড়েছে। সিনাগগের পুরোহিত রাব্বি রারুস বেনইয়ামিন জানিয়েছেন, বিস্ফোরণের পর প্রার্থনাগৃহটি ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। কিভাবে ঘটল, কারা ঘটিয়েছে, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানিয়েছেন, এ ঘটনায় তিনি হতবাক হয়েছেন। তার কল্পনারও বাইরে এমন ঘটনার বিষয়টি। এই ঘটনা ঘটাতে পারে এমন কেউ আমার সন্দেহের মধ্যেও নেই। অন্যদিকে নিরাপত্তা বাহিনীর ক্যাপ্টেন জানিয়েছেন, ঘটনা। হিসাবে খুবই নতুন এটা। এ ধরনের ঘটনা ঘটাতে পারে, এমন ক্রিমিনাল

আমাদের তালিকায় নেই, রত্ন দ্বীপেও নেই। তবে কারা জড়িত আমরা তা। খুঁজে বের করার চেষ্টা করছি, করবো। তেমন কোনো আলামত এখনও আমাদের হাতে আসেনি। আধাপোড়া অবস্থায় একটি আরবি দৈনিকের অংশ বিশেষ পাওয়া গেছে। মনে করা হচ্ছে বোমাগুলো ঐ কাগজে মুড়িয়ে আনা হয়ে থাকতে পারে। আরবি কাগজ কোনো আলামত হতে পারে কি না? এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন, এ ঘটনা কারা ঘটাতে পারে তা নিয়ে কোনো চিন্তা আমরা করিনি।

রত্ন দ্বীপে এটা একটা ভয়াবহ ধ্বংসাত্মক ঘটনা। এ রকম ঘটনা আগে ঘটলেও তাৎপর্যপূর্ণ দুটি ঘটনা ইতিপূর্বে ঘটেছে। ধ্বংসকারিতার দিক দিয়ে না হলেও, প্রকৃতির দিক দিয়ে তিনটি ঘটনা একই রকম। ছয় মাস আগে ঈদুল ফিতরের আগের রাতে রাজধানীতে ঈদের নামাজের জন্যে তৈরি প্যান্ডেল আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়া হয়। ঈদগাহের মেহরাবটাও ধ্বসিয়ে দেয়া হয়েছিল। তার তিন মাস পরে ২৫ ডিসেম্বর বড় দিনের উৎসবের আগের রাতে রাজধানীর কেন্দ্রীয় গির্জার চত্বরে তৈরি দেশের সবচেয়ে বৃহৎ ক্রিসমাস ট্রি পুরোপুরি নষ্ট করে ফেলা হয়। লক্ষ্য করার বিষয় সিনাগগের ধ্বংসকাণ্ডে ব্যবহৃত বোমার মোড়ক হিসাবে যেমন আরবি কাগজ পাওয়া যায়, তেমনি ঈদগাহের ধ্বংসের স্থানে পাওয়া যায় কারও গলা থেকে ছিঁড়ে পড়া একটা ক্রস এবং নষ্ট হয়ে যাওয়া ক্রিসমাস ট্রির স্থানের একটু দূরে ফুলগাছের ঝোপে পাওয়া যায় একটা দীর্ঘ ফলার ছুরি- যা দিয়ে কাটা হয়েছে ক্রিসমাস ট্রিকে। ছুরির গোড়ায় আল্লাহু আকবার শব্দ লেখা। এই তিনটি ঘটনা কারা ঘটিয়েছে, তারা চিহ্নিত ও গ্রেফতার হয়েছে বলে এখনো জানা যায়নি। কিন্তু তিনটি ঘটনার মাধ্যমে রত্ন দ্বীপের প্রধান তিন কম্যুনিটির মধ্যে অবিশ্বাস ও দ্বন্দ্ব-সংঘাত সৃষ্টি এবং রত্ন দ্বীপের শান্তি-শৃঙ্খলা ও শাসনব্যবস্থা ধ্বংসেরই যেন চেষ্টা করা হয়েছে। দ্বীপের চিন্তাশীল মহল এই কথাই বলছেন। তবে সবগুলো ঘটনার তদন্ত সম্পূর্ণ হলেই জানা যাবে ঘটনাগুলোর পেছনে কি রয়েছে এবং কতটা গভীর ঘটনাগুলো।

সন্ত্রাসী এই ঘটনাগুলো মানুষের মধ্যে নিদারুণ উদ্বেগ ছড়িয়ে দিয়েছে। শত বছর আগে দ্বীপে প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর শান্তির নিলয় হয়ে উঠেছিল রত্ন দ্বীপ। এখন মুসলিম, খ্রিস্টান, ইহুদিরা পরম সম্প্রীতির মধ্যে বসবাস করছে। দ্বীপের ২ লাখ জনসংখ্যার চার ভাগের তিন ভাগ মানে দেড় লাখ মুসলমান, অবশিষ্ট জনসংখ্যার ৪০ হাজার খ্রিস্টান এবং দশ হাজার ইহুদি। সংখ্যাধিক্যের কারণে মুসলমানরা কতৃত্বের ক্ষেত্রে বেশি সুবিধা পেলেও সেখানে আধিপত্যের নাম গন্ধও নেই। মুসলিম, খ্রিস্টান ও ইহুদিদের মধ্যে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অধীনে রাজনৈতিক কর্তৃত্ব ভাগ করে নেয়া হয়েছে। পার্লামেন্টে তিন সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা হয়েছে। প্রেসিডেন্ট পদ্ধতির সরকার হলেও প্রেসিডেন্ট পার্লামেন্ট ভেঙে দিতে পারেন না, বিশেষ ক্ষেত্র ছাড়া তিনি মন্ত্রীদেরও বরখাস্ত করতে পারেন না। দ্বীপের সরকারে। প্রেসিডেন্ট মুসলিম, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী খ্রিস্টান এবং অর্থমন্ত্রী ইহুদি। এই ব্যবস্থার অধীনে অখণ্ড শান্তির মধ্যে বাস করছে রত্ন দ্বীপের মানুষ। এখানে ছোট ছোট ক্রাইম সংঘটিত হয়, কিন্তু কোনো সন্ত্রাসের ঘটনা গত একশ বছরে ঘটেনি। এ ধরনের ঘটনা ঘটতে পারে, মানুষ তা ভুলেই গিয়েছিল। সুতরাং তিনটি সন্ত্রাসী ঘটনা মানুষকে উদ্বেগাকুল করে তুলেছে।

দৈনিক রত্ন দ্বীপ টাইমস এই ব্যাপারে দ্বীপের অপরাধ বিশেষজ্ঞ, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও সমাজ নেতাদের সাথে কথা বলেছে। তারা বলেছেন, সন্ত্রাসী ঘটনা তিনটি খুবই বিস্ময়কর এবং দ্বীপের সমাজ ও রাজনীতির সাথে একান্তই বেমানান। তিনটি অপরাধের সবগুলোই ব্যক্তি নয়, গ্রুপভিত্তিক অপরাধ। আর অপরাধগুলোর মধ্য দিয়ে যে মানসিকতার প্রকাশ ঘটেছে, সেই মানসিকতা আমাদের দ্বীপে গ্রুপভিত্তিকভাবে থাকা তো দূরের কথা, কোনো ব্যক্তির মধ্যে থাকারও কোনো প্রমাণ এ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। তাদের সকলের অভিমত, ঘটনাংলো নিয়ে ব্যাপক ও গভীর তদন্ত প্রয়োজন। ঘটনাগুলোকে বিচ্ছিন্ন বলে মনে করারও কোনো সুযোগ নেই। ঘটনাগুলোই প্রমাণ করছে, ঘটনা বিভিন্ন হলেও সেসবের পেছনে একই উদ্দেশ্য কাজ করছে বলে মনে করা হচ্ছে।

সব সন্দেহ সম্ভাবনা সামনে রেখেই তদন্ত হাতে নেয়া হচ্ছে বলে সরকারি সূত্রে জানা গেছে। আগের ঘটনাগুলোও সঠিকভাবে সামনে এগোচ্ছে বলে তারা জানিয়েছেন। সব তদন্ত সম্পূর্ণ হবার আগে তারা কিছু বলতে নারাজ। তবে এটুকু জানিয়েছেন যে, ঘটনাগুলো সাম্প্রদায়িক নয় বলে তারা নিশ্চিত হয়েছেন।

রত্ন দ্বীপের অন্যান্য ইংরেজি, আরবি, স্প্যানিস, ল্যাটিন ও গ্রিস ভাষার কাগজগুলো প্রায় একই ধরনের খবর প্রকাশ করেছে। তারাও ঘটনাগুলোর গোড়া বিদেশে বা বিদেশিদের মধ্যে থাকতে পারে বলে মত প্রকাশ করেছে।

 

 

সকালেই কাবাবা ক্যাসলে মন্ত্রীসভার বৈঠক বসেছে।

রত্ন দ্বীপের প্রেসিডেন্সিয়াল ব্যবস্থায় প্রেসিডেন্ট মন্ত্রীসভায় সভাপতিত্ব করেন। তিনিই দেশের নির্বাহী প্রধান। প্রধানমন্ত্রীর কোনো পদ রত্ন দ্বীপের সংবিধানে নেই। সংবিধান অনুসারে প্রেসিডেন্টের পরেই মর্যাদার দিক দিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর স্থান। এরপর রয়েছে অর্থমন্ত্রী। পররাষ্ট্রমন্ত্রী রয়েছে চতুর্থ স্থানে। প্রেসিডেন্ট ও পররষ্ট্রমন্ত্রীর পদ মুসলিম কম্যুনিটির জন্যে নির্দিষ্ট। খ্রিস্টান ক্যুনিটির জন্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও ইহুদি ক্যুনিটির জন্যে অর্থমন্ত্রীর পদ বরাদ্দ রয়েছে সংবিধানে। অবশিষ্ট ৭জন মন্ত্রীর মধ্যে ৪জন প্রেসিডেন্ট ও অন্যান্য মন্ত্রীর মতো সংসদ সদস্যদের মধ্য থেকে নির্বাচিত হয়। এই চারজনের মধ্যে দুজন মুসলিম ক্যুনিটির এবং একজন করে খ্রিস্টান ও ইহুদি কম্যুনিটির জন্যে বরাদ্দ। বাকি তিনজন মন্ত্রী নির্বাচিত হন সংসদ সদস্যদের মধ্য থেকে নয়। এরা বাইরে থেকে মনোনীত। দ্বীপের মসজিদ সমিতি, গির্জা সমিতি ও সিনাগগ সমিতি কর্তৃক তারা মনোনীত হন। এরা মন্ত্রীসভায় স্ব স্ব ক্যুনিটির ধর্মমন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। দ্বীপের স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে উপযুক্ত ধর্মীয় শিক্ষা দেয়া হচ্ছে কিনা এবং স্ব স্ব ক্যুনিটিতে নিজেদের ধর্মের অনুশাসন ঠিকভাবে পালিত হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করে এই ধর্মমন্ত্রীরা। মন্ত্রীসভায় সব সদস্যের একটি করে ভোট রয়েছে, শুধু প্রেসিডেন্টের দুটি ভোট, একটি প্রেসিডেন্ট হিসাবে, অন্যটি মন্ত্রীসভার সভাপতি হিসাবে। প্রেসিডেন্ট মন্ত্রীসভায় গরহাজির থাকলে যিনি মন্ত্রী সভায় সভাপতিত্ব করবেন, তিনিই দুই ভোটের মালিক হবেন। মজার ব্যাপার হলো ছোট দ্বীপটিতে কোনো আমলাতন্ত্র নেই। নির্বাচিত প্রত্যেক সংসদ সদস্যের জন্য তার নির্দিষ্ট এলাকায় একটি করে সরকারি অফিস রয়েছে। ওই অফিস থেকেই এলাকার উন্নয়ন ও প্রশাসনিক কাজ পরিচালনা করা হয়। নির্বাচিত সংসদ সদস্য এবং তার এলাকার দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভোট প্রাপ্ত ব্যক্তি মানে তার প্রতিপক্ষ একসাথে মিলে অফিসের যাবতীয় কাজ। পরিচালনা করেন। নিরাপত্তা, উন্নয়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যকর্মীরা তাদের সহায়তা করে। এরা আঞ্চলিক অফিস কর্তৃক নিয়োগকৃত এবং এলাকার মানুষের অর্থে এদের ভাতার ব্যবস্থা হয়। কেন্দ্রীয় অর্থবিভাগ সবকিছুর সমন্বয় করে। সংসদ সদস্যরা পৃথক নির্বাচনের মাধ্যমে স্ব স্ব কম্যুনিটির ভোটে নির্বাচিত হয়। সংবিধান অনুসারে প্রত্যেক ক্যুনিটি তাদের সংখ্যার, প্রতি পাঁচ হাজারে একজন অনুপাতে সংসদ সদস্য পায়। তবে সংখ্যা যাই হোক, প্রত্যেক কম্যুনিটি কমপক্ষে দশ জন সংসদ সদস্য পাবে। এই হিসাবে বর্তমান পার্লামেন্টে ৪০ জনের জায়গায় সংসদ সদস্য ৫০জন। মুসলিমরা তাদের জনসংখ্যার অনুপাতে পেয়েছে ৩০জন সদস্য। আর খ্রিস্টান ও ইহুদিরা যথাক্রমে ৮ ও ২জনের স্থলে পেয়েছে ১০জন করে। সুতরাং রত্ন। দ্বীপে একজন সংসদ সদস্য যেমন জনপ্রতিনিধি, তেমনি তার দশ বছর মেয়াদকালীন সময়ের জন্যে এলাকার প্রশাসকও। আর মন্ত্রীরা তাদের স্ব স্ব মন্ত্রণালয়ের অধীন কাজের সাথে সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যদের গার্ডিয়ান ও গাউড। দেশের প্রধান নির্বাহী প্রেসিডেন্টের অধীনে মন্ত্রীসভা দ্বীপে সুশাসন ও শান্তি নিশ্চিত করে থাকে। ধর্ম-মত নির্বিশেষে মানুষ একে অপরের ভাই হিসাবে শান্তিতে বসবাস করে। দ্বীপের সব সক্ষম হাতকে কর্মীর হাতে পরিণত করা হয়েছে, সক্ষম, শিক্ষিতের কোন বেকারত্ব দ্বীপে নেই। অক্ষম অসহায়দের দ্বীপ সরকার ও জনগণ মর্যাদার সাথে পুনরবাসিত করেছে। মিনিমাম চাহিদা নিয়ে কোনো অভিযোগ কারও নেই।

শান্তির এই দ্বীপে আজ হঠাৎ করে এসব কি ঘটছে? কেন ঘটছে? কারা ঘটাচ্ছে? এসব প্রশ্নের উত্তর সন্ধানেই আজকের এই মন্ত্রীসভার বৈঠক।

ঘড়িতে মিনিট ও সেকেন্ডের কাঁটা ১২ টা এবং ঘন্টার কাঁটা ১০ টা স্পর্শ করতেই রত্ন দ্বীপের প্রেসিডেন্ট আবদুল করিম হিশাম মন্ত্রীসভায় সভাপতির আসনে এসে বসল।

মন্ত্রীসভার অন্য দশজন আগেই এসে তাদের স্ব স্ব আসন নিয়েছে। প্রেসিডেন্টের সামনে ডান পাশে পাঁচজন মন্ত্রী, বাম পাশে পাঁচ জন।

প্রেসিডেন্টের ডান পাশের সারির প্রথমে বসেছে হোম মিনিস্টার ক্রিস কনস্টানটিনোস এবং বাম পাশের সারির প্রথমে বসেছে অর্থমন্ত্রী বেন নাহান আরমিনো। অন্য আটজন ৪জন করে দুপাশে বসেছে।

প্রেসিডেন্ট আবদুল করিম হিশাম বসে সবার উপর একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে মন্ত্রীসভার কাজ শুরু করল। প্রেসিডেন্ট আল্লাহর ওপর হামদ-ছানা পাঠ করে, রাসূল স.-এর উপর দরূদ পড়ে বলল, আমি মন্ত্রীসভার জরুরি বৈঠকে সবাইকে স্বাগত জানাচ্ছি। আপনারা অবশ্যই জানেন কেন মন্ত্রীপরিষদের জরুরি এই বৈঠক। আজ আমাদের এক সিনাগগে ভয়াবহ সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটেছে। তাতে বিধ্বস্ত সিনাগগটি। বিধ্বস্ত হয়েছে শুধু সিনাগগ নয়, আহত হয়েছে আমাদের রাষ্ট্রের আদর্শ, দেশের শান্তি আর জনগণের সুখ। এর আগে ঈদ উৎসবের আগের রাতে ঈদ নামাজের প্যান্ডেল পোড়ানো, মেহরাব ধ্বংস করা, ক্রিসমাস উৎসবের আগের দিন কেন্দ্রীয় ক্রিসমাস ট্রি কেটে নষ্ট করে ফেলা একই ধরনের ঘটনা এবং একই মানসিকতা থেকে সৃষ্ট। এসব ঘটনা শুধু মানুষকে ভীত করেনি, তাদের মনে প্রশ্নেরও সৃষ্টি হয়েছে। আগের দুটি ঘটনায় দায়ী ক্রিমিনালরা ধরা পড়েনি। যা নিয়ে মানুষের মনে বিভ্রান্তি, সন্দেহ, অবিশ্বাস সৃষ্টির চেষ্টা করা হচ্ছে। সকলেই আমরা জানি এ নিয়ে গোপন প্রচার পত্রের মাধ্যমে মুসলিম, খ্রিস্টান ও ইহুদিদের একে অপরের বিরুদ্ধে উস্কে দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। সকলেই আমরা জানি আজকের ঘটনাসহ ঐসব ঘটনা এবং গোপন প্রচারণা ষড়যন্ত্রকারীদের, যারা রত্ন দ্বীপের শান্তি, সমৃদ্ধি, সহাবস্থান বিনষ্ট করতে চায়। কিন্তু তারা কারা, কি তাদের উদ্দেশ্য তা জনগণকে জানাতে আমরা ব্যর্থ হয়েছি। এই ব্যর্থতা ষড়যন্ত্রকারীদের প্রপাগান্ডাকেই মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলবে। যা এক ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি করবে।

আজকের ঘটনা এই উদ্বেগকে আরও ভয়ংকর করে তুলবে, যদি আমরা। ক্রিমিনালদের দিনের আলোতে আনতে ব্যর্থ হই, তাদের ষড়যন্ত্রের কাহিনী আমরা জনগণের কাছে প্রকাশ করে দিতে না পারি। এই পরিস্থিতি সামনে রেখেই আমি মন্ত্রীসভার এই জরুরি বৈঠক আহবান করেছি। সবার কথা আমি শুনতে চাই। ব্যর্থতা থেকে মুক্ত হবার একটা পথ আমাদের অবশ্যই বের করতে হবে। এই কথাগুলোর সাথে আমি মন্ত্রীসভার আলোচনার উদ্বোধন ঘোষণা করছি। থামল প্রেসিডেন্ট আবদুল করিম হিশাম।

সামনের গ্লাস থেকে একটু পানি পান করে আবার সোজা হয়ে বসল প্রেসিডেন্ট। মুখ তুলে চাইল সবার দিকে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস কনস্টানটিনোস একটু নড়ে-চড়ে বসে সামনের কাগজগুলো একটু ঠিক করে নিয়ে বলল, মাননীয় প্রেসিডেন্ট, আপনি আপনার উদ্বোধনী বক্তব্যে এ সময়ের জন্য জরুরি সব কথাই সুন্দর করে তুলে ধরেছেন। আপনাকে ধন্যবাদ। আপনি যথার্থই বলেছেন মাননীয়। প্রেসিডেন্ট যে, আজ মারাত্মক ঘটনার সাথে জড়িত ক্রিমিনালদের যদি ধরতে আমরা ব্যর্থ হই, ষড়যন্ত্রটা কি তা যদি জনগণের সামনে তুলে ধরতে না পারি, তাহলে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিতে পারে! দ্বীপের শান্ত পরিবেশ ও শান্তিপ্রিয় মানুষের মধ্যে সম্প্রদায়গত অবিশ্বাস সৃষ্টি হতে পারে, অবিশ্বাস এক সময় হানাহানিতেও রূপ নিতে পারে। সুতরাং আজকে যা ঘটেছে, তাকে আমাদের সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। ক্রিমিনালদের পাকড়াও করতেই হবে। তাদের ষড়যন্ত্রের মুখোশ উন্মোচন করতেই হবে। একটু থামল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিম কনস্টানটিনোস। টেবিলের কাগজ পত্রের দিকে একটু চোখ বুলাল। বলল প্রেসিডেন্টের দিকে মুখ তুলে, মাননীয় প্রেসিডেন্ট, কমিনিট আগ পর্যন্ত আমার কাছে গোয়েন্দা ও অন্যান্য সূত্রে। থেকে কিছু তথ্য এসেছে, তাতে সামনে এগোবার কোনো কু আমাদের হাতে আসেনি। যা আলামত আমাদের হাতে এসেছে তা হচ্ছে, একটি চারপাতার। আরবি দৈনিক পত্রিকার অংশবিশেষ- যা দিয়ে বোমার

মোড়ক ধাঁধা হয়েছিল, সাথে পত্রিকাটির ভেতরে একটি ইসলামি সংস্থার প্রচারপত্র, চারজন লোকের জুতার ছাপ এবং সন্ত্রাসীদের গাড়ির চাকার ছাপ। আলামতগুলো পাবার সাথে সাথেই দ্রুত তথ্য যোগাড়ে লেগে যায় আমাদের সংস্থাগুলো। গুরুত্বপূর্ণ কিছু আলামতের ব্যাপারে প্রাথমিক কিছু তথ্য তারা যোগাড়ও করেছে। আরবি দৈনিকটি দ্বীপের নর্থ পোর্ট-এর পশ্চিমে আথিনা উপত্যকা এলাকায় বিক্রি হয়েছিল। কিন্তু পত্রিকার ভেতরে ইসলামি সংস্থার যে প্রচারপত্র পাওয়া গেছে, সেটা পত্রিকার মাধ্যমে বিলি করা হয়নি। চাকার দাগ থেকে নিশ্চিত হওয়া গেছে, সন্ত্রাসীদের ক্যারিয়ারটা ছিল একটা মিনিমাইক্রো। চার চাকার একটা পুরাতন, অবশিষ্ট তিনটি চাকাই। একেবারে নতুন এবং চাকাগুলো টয়োটা কোম্পানির। চাকাগুলো কারা, কোন্ দোকান থেকে কিনেছে, তা জানার চেষ্টা করা হচ্ছে। ক্রিমিনালদের ফিংগার প্রিন্ট পাবার চেষ্টা ফলপ্রসূ হয়নি। মনে করা হয়েছিল মোড়কের

কাগজে মোড়কারীর আঙুলের ছাপ পাওয়া যাবে। কিন্তু মোড়ককারীর আঙুলের ছাপ কাগজে পাওয়া যায়নি। সম্ভবত তাদের হাতে গ্লাভস পরা ছিল। সব মিলিয়ে এসব থেকে সন্ত্রাসী কারা তার প্রত্যক্ষ আলামত পাওয়া। কঠিন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস কনস্টানটিনোসের কথার মাঝখানেই অর্থমন্ত্রী বেন নাহান আরমিনো বলে উঠল, স্যরি টু ইন্টারূপট মি. কনস্টানটিনোস। আচ্ছা, টায়ার ক্রেতার সন্ধান পাওয়া গেলে কি ক্রিমিনাল চিহ্নিত হবে?

ওটা একটা সম্ভাবন মাত্র। নিশ্চিত কিছু নয়। বলল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস কনস্টানটিনোস।

বোমার মোড়ক মানে আরবি পত্রিকাটির মধ্যে একটা ইসলামি সংস্থার প্রচারপত্র পাওয়ার আর র্তৈ গুরুত্ব থাকছে না। ওটা নিজেদের আড়াল করার জন্যে একটা ক্যামোফ্লেজ চক্রান্তকারীদের। তার মানে এ ঘটনায় কোনো আলামত আমরা পাচ্ছি না। অর্থমন্ত্রী বেন নাহান আরমিনো বলল।

আপাতত এটাই ঠিক মি. আরমিনো। তবে এই ঘটনা থেকে একটা বিষয় সম্পূর্ণ পরিষ্কার হয়ে গেল যে, এই ঘটনাগুলো উদ্দেশ্যমূলকভাবে ঘটানো হচ্ছে দ্বীপের শান্তি এবং আমাদের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করার জন্যে। বলল ক্রিস কনস্টানটিনোস।

এই বিষয়টি পরিষ্কারভাবে সামনে আসার পর উদ্বেগ কয়েক গুণ বেড়ে গেছে মি. ক্রিস কনস্টানটিনোস। এ ধরনের ঘটনা কোনো ব্যক্তি বা গ্রুপের অপরাধমূলক কিছু হলে ভয়ের তেমন কিছু ছিল না। অপরাধীদের পাকড়াও করে এর সমাধান করা যেত। দ্বীপের শান্তি ও মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্ক ও সম্প্রীতি বিনষ্ট করার জন্যে হওয়ায় ঘটনাগুলো অত্যন্ত বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোনো বড় চক্রান্ত, ষড়যন্ত্র এর পেছনে রয়েছে এবং সেটা হলো সন্দেহ ও অবিশ্বাসের বিষ ছড়িয়ে মানুষের মধ্যে অনৈক্য, বিভেদ, হানাহানির সৃষ্টি করা। তাতে আমাদের শান্ত দ্বীপটি অশান্তির আগুনে পুড়ে ছারখার হয়ে যাবে, ভেঙে পড়বে দ্বীপের শত বছরের পুরনো রাষ্ট্র-কাঠামো। এ ভয়াবহ বিপর্যয় থেকে বাঁচার জন্যে ষড়যন্ত্রের মূলোচ্ছেদ ঘটানোর মাধ্যমে জনগণকে সব জানিয়ে দেয়ার কোনো বিকল্প নেই। বলল প্রেসিডেন্ট আবদুল করিম হিশাম।

মাননীয় প্রেসিডেন্টের আশঙ্কার সাথে আমরা একমত। ষড়যন্ত্রকারীরা সুযোগ পেলে এই অবস্থা সৃষ্টি করতে পারে। তবে, মাননীয় প্রেসিডেন্ট, রত্ন। দ্বীপের মানুষের ঐক্য, সমঝোতা,সম্প্রীতি ভংগুর নয় বলে আমি মনে করি। বহু বছরের সমঝোতা, বহু বছরের আস্থা, বিশ্বাস ও পারস্পরিক নিরাপদ নির্ভরতার মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা মানুষের ঐক্যের ভিত্তি এতই মজবুত যে, এমন উটকো ঘটনা তার ক্ষতি করতে পারবে না। মানুষের আস্থা, বিশ্বাস নড়বড়ে হয়, অভিযোগ দানা বেঁধে ওঠে বঞ্চনার বেদনা থেকে, বঞ্চিত হবার জ্বালা থেকে। আমাদের রত্ন দ্বীপের কোনো গ্রুপ, কোনো সম্প্রদায়ের মধ্যে বঞ্চনা, বেদনা সৃষ্টি হবার কোনো সুযোগ নেই। সাধারণত দেখা যায় সংখ্যাগুরুর দ্বারা সংখ্যালঘিষ্ঠরা নানাভাবে নির্যাতিত, বঞ্চিতই হয়ে থাকে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাতেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে এমনটা ঘটে থাকে। কিন্তু আমাদের রত্ন দ্বীপ সবার থেকে ব্যতিক্রম। দ্বীপের চার ভাগের তিন ভাগ। মানুষ মুসলিম। আমাদের সংবিধান তাদের দিয়েছে মাত্র তিরিশজন সংসদ সদস্য, মন্ত্রীসভায় প্রেসিডেন্টসহ ৫জন সদস্য। আর খ্রিস্টানরা জনসংখ্যার পাঁচ ভাগের একভাগ হওয়া সত্ত্বেও সংবিধান তাদের দিয়েছে ১০টি সংসদ সদস্য ও তিনটি মন্ত্রীর পদ। অন্য দিকে জনসংখ্যার বিশভাগের এক ভাগ হয়েও ইহুদিদের জন্য সংবিধান দশজন সংসদ সদস্য ও তিনজন মন্ত্রী দিয়েছে। এভাবে সব ক্ষেত্রেই দেশের সংবিধান সংখ্যালঘুদেরকে তাদের চাওয়ার চেয়ে অনেক বেশি দিয়েছে। সংসদে সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের দশজন সদস্য বেশি রয়েছে, কিন্তু দেশের নির্বাহী পরিষদ মন্ত্রীসভায় সংখ্যালঘুরা সংখ্যাধিক্য পেয়েছে। সংবিধান এই ব্যবস্থা করেছে • এজন্যে যে, সম্প্রদায়গত বিভেদ-বৈষম্যের অনুভূতি যাতে সৃষ্টি হতেই না পারে। বাস্তবেও তাই হয়েছে। আমাদের দ্বীপ রাষ্ট্রটি সব মানুষের ঐক্য, সংহতি, সম্প্রীতি, সহযোগিতার রত্ন দ্বীপে পরিণত হয়েছে। ষড়যন্ত্রের কালো হাত এই বন্ধনকে ভাঙতে পারা অবশ্যই সহজ নয় মাননীয় প্রেসিডেন্ট। ক্রিস কনস্টানটিনোস বলল।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস কনস্টানটিনোস যা বলেছেন আমিও তার সাথে একমত। বিগত তিনটি ঘটনা দ্বারা ষড়যন্ত্রকারীরা লোকদের যতটা বিভ্রান্ত করতে চেয়েছিল, মানুষের মধ্যে যে সন্দেহ-অবিশ্বাস সৃষ্টি করতে চেয়েছিল, সেরকম কিছু বাস্তবে ঘটেনি। জিহোবা আমাদের সহায় হবেন। সব ষড়যন্ত্রের আমরা মূলোচ্ছেদ করতে পারবো মাননীয় প্রেসিডেন্ট। বলল অর্থমন্ত্রী বেন নাহান আরমিনো।

আপনাদের কথা সত্য হোক। আল্লাহ রাব্বল আলামিন আপনাদের কথা কবুল করুন।

একটু থামল প্রেসিডেন্ট। মুখ ঘুরিয়ে তাকাল প্রেসিডেন্ট মুসলিম, খ্রিস্টান ও ইহুদি তিন সম্প্রদায়ের ধর্মনেতাদের মনোনীত তিন-ধর্মমন্ত্রী, ড. শাইখ ইউসেফ ইয়াসিন আল আজহারী, ফাদার স্টিভেন অ্যানজেলোস এবং রাব্বি ড্যান দানিয়েলের দিকে। বলল তাদের লক্ষ্য করে, তৃণমূল পর্যায়ের মানুষের চিন্তা-ভাবনা আপনাদের বেশি জানার কথা। আপনাদের মন্তব্য আমাদের সবাইকে সাহায্য করতে পারে।

প্রেসিডেন্টের কথা শেষ হলে মুসলিম ক্যুনিটি থেকে ধর্মমন্ত্রী এবং রত্ন দ্বীপের কেন্দ্রীয় মসজিদের খতিব ড. শাইখ ইউসেফ ইয়াসিন বলল, মান নীয় প্রেসিডেন্ট, সাধারণ যে প্রতিক্রিয়া আমি লক্ষ্য করে আসছি, তা মোটামুটি একই রকম। তারা বিশ্বাস করছে না যে ঘটনাগুলো সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ থেকে হয়েছে। কিন্তু তারা বিস্মিত, কি করে তাহলে ঘটছে ঘটনাগুলো! আজ ফজরের নামাজের পর একটা সমাবেশ ছিল। সমাবেশ চলাকালীন খবরটি সেখানে পৌঁছে। উদ্বিগ্ন, বিস্মিত মানুষের মুখে একই রকম প্রশ্ন, এসব কারা করছে? কেন করছে? তারা ধরা পড়ছে না কেন? ঘটনার ভয়াবহতা তো ক্রমশ ঘটছেই। অপরাধীদের ধরতে সরকারের চেষ্টা যথেষ্ট হচ্ছে কিনা? এসব প্রশ্নই মুখ্য। সকলেই চাচ্ছে আশু এই অপরাধের সমাপ্তি ঘটুক। থামল মুসলিম ধর্মমন্ত্রী।

প্রেসিডেন্ট শাইখ ইউসেফ ইয়াসিনকে ধন্যবাদ দিয়ে তাকাল খ্রিস্টান ধর্মমন্ত্রী ফাদার স্টিভেন অ্যানজেলোস এবং ইহুদী ধর্মমন্ত্রী রাব্বি ড্যান দানিয়েলের দিকে।

নড়ে-চড়ে বসল ফাদার স্টিভেন অ্যানজেলোস। বলল, এক্সেলেন্সি মি. প্রেসিডেন্ট, ভাই শাইখ ইউসেফ ইয়াসিন যা বলেছেন তার সাথে আমি সম্পূর্ণ একমত। সম্প্রদায় নির্বিশেষে এই প্রশ্নগুলোই সব মানুষের মধ্যে।

আমি তার সাথে একটা কথাই যোগ করব। সেটা হলো, আজকের ঘটনায়। মানুষের মধ্যে ভীতিও ছড়িয়ে পড়েছে। অপরাধীদের পাকড়াও করতে সরকার পারছে না, এই চিন্তাই মানুষের মধ্যে যেন বড় হয়ে উঠছে।

ফাদার স্টিভেন অ্যানজেলোস থামতেই ইহুদি ধর্মমন্ত্রী রাব্বি ড্যান দানিয়েল সোজা হয়ে বসল। বলল, আমার সহযোগী দুই মাননীয় মন্ত্রী যা বলেছেন, সেটাই আমাদের জনমনের প্রকৃত চিত্র। বিস্ময়, উদ্বেগ, ভয় মানুষের মধ্যে বাড়ছে। তাদের বাইরে নতুন কোনো কথা আমার কাছে নেই। তবে আমার ভয় হচ্ছে, মাননীয় প্রেসিডেন্ট একটু আগেই যা বললেন, অপরাধীরা খুব তাড়াতাড়ি ধরা না পড়ে, মানুষকে যদি সত্যটা জানানো না যায়, তাহলে ভয়, ব্যর্থতা থেকে আমাদের মধ্যে পারস্পরিক সন্দেহ, অবিশ্বাস দেখা দিতে পারে। সেটা হবে খুবই ভয়ের কথা। থামল রাব্বি ভ্যান দানিয়েল।

প্রেসিডেন্ট সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলল, আমাদের তিনজন ধর্মমন্ত্রীর কথায় যা প্রকাশ পেল তা হলো, আমাদের প্রাথমিক বিস্ময় এখন। উদ্বেগের মধ্য দিয়ে, ভয়ে রূপান্তরিত হয়েছে। অপরাধীদের পাকড়াও করে যদি আমরা ষড়যন্ত্রের মুখোশ উন্মোচন করতে না পারি, তাহলে আমাদের জনগণের এই ভয় সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থায় রূপান্তরিত হবে, যা এক পর্যায়ে পারস্পরিক অনৈক্য, সংঘাতে রূপ নিতে পারে এবং শত্রুরা এটাই

প্রেসিডেন্ট একটু থামল। সকলের দিকে তাকাল প্রেসিডেন্ট। তার গম্ভীর মুখে ফুটে উঠল অসন্তুষ্টির একটা চিহ্ন। বলল, আমরা অপরাধীদের ধরতে পারিনি, ষড়যন্ত্রের উৎস্য উন্মোচন করতে পারিনি, এটা আমাদের ব্যর্থতা। জনগণ ধৈর্য ধরেছে। জনগণ আর আমাদের সময় দেবে না। একটা সময় আমি নির্দিষ্ট করতে চাই। এই সময়ের মধ্যে সমস্যার সমাধানে আমরা ব্যর্থ হলে আমি পার্লামেন্টের অধিবেশন ডেকে নতুন সরকার, নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আহ্বান জানাব। জনগণ একবার সরকারের উপর আস্থাহীন হয়ে পড়লে তা একটা দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়াবে এবং ভবিষ্যতের সরকার বিপদে পড়বে। এতে করে আমাদের প্রিয় রত্ন দ্বীপের শান্তি, স্থিতিশীলতা ধ্বংস হয়ে যাবে। আমি আপনাদের সুচিন্তিত মতামত চাই। থামল প্রেসিডেন্ট।

কেউ কোনো কথা বলল না প্রেসিডেন্ট থামলেও। পিনপতন নীরবতা। সবারই মুখ গম্ভীর হয়ে উঠেছে। সবার মুখে বিষণ্ণতার ছাপ স্পষ্ট।

নীরবতা ভাঙলো স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। বলল, আমাদের সম্মানিত মহামান্য প্রেসিডেন্ট একজন দেশপ্রেমিক মানুষ। একজন দেশ ও জাতিগত প্রাণ প্রেসিডেন্ট তার উপযুক্ত মত প্রকাশ করেছেন। আসলে আমরা শাসক নই, দেশ ও জাতির সেবক। আমরা নির্বাচিত হয়েছি, দায়িত্ব পেয়েছি জনগণের কাজ করার জন্যে, জনগণকে সুখে শান্তিতে রাখার জন্যে, দেশে শৃঙ্খলা ও নির্ভয় পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্যে। আমরা যদি তা করতে না পারি, তাহলে দায়িত্ব আমাদের ছেড়ে দেয়া উচিত। আমাদের প্রেসিডেন্ট এই কথাই বলেছেন। তবে মহামান্য প্রেসিডেন্ট আমি মনে করি, আমাদের প্রেসিডেন্ট ও সরকারের জন্যে সেই সময় এখনও আসেনি। আমরা ব্যর্থ হয়েছি, আমাদের জনগণও তা মনে করে না। তিন ধর্মমন্ত্রীর কথা থেকেও এটা পরিষ্কার হয়েছে। তিনটি ঘটনার মধ্যে আজকের ঘটনাই বড় এবং এই ঘটনার মধ্য দিয়েই ষড়যন্ত্রের বিষয়টা পরিষ্কার হয়ে উঠেছে। আগের দুটি ঘটনা বড় কিছু নয়। ঘটনা দুটির পেছনের ক্রিমিনাল ধরা পড়েনি বটে, কিন্তু আমরা সব অনুষ্ঠানের নিরাপত্তার ব্যাপারে সতর্ক হয়েছি। এরপর কোনো অনুষ্ঠানে ঐ ধরনের ঘটনা আর ঘটেনি। আজকের সন্ত্রাসী ঘটনা সম্পূর্ণ অন্য ধরনের এবং ধ্বংসাত্মক ঘটনা। এই ঘটনার তদন্ত শুরু হয়েছে। এখন অন্য কোনো চিন্তা না করে এই তদন্তকে সফল করে তোলা দরকার। মহামান্য প্রেসিডেন্টের সাথে আমি একমত যে, তদন্তের জন্যে একটা সময় সীমা নির্দিষ্ট করা দরকার এবং জনগণের অবগতির জন্যে তা ঘোষণাও করা উচিত।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস কনস্টানটিনোসের কথা শেষ হবার সাথে সাথে অর্থমন্ত্রী বেন নাহান আরমিনো বলে উঠল, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ঠিকই বলেছেন। আমরা ব্যর্থ হয়েছি, একথা বলার সময় এখনও আসেনি। তবে মাননীয় প্রেসিডেন্ট যা বলেছেন, তদন্তের সময়সীমা নির্দিষ্ট হওয়া প্রয়োজন। তাতে তদন্তের গতি ও গভীরতা দুই বাড়বে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এ ধরনের বড় ঘটনা তদন্তের অভিজ্ঞতা আমাদের লোকদে কম আছে। শু; তাদের দিয়ে এ কাজ কতটা সম্ভব হবে, সেটা নিয়েও আমাদের ভাবা দরকার এখনই। মাননীয় প্রেসিডেন্ট এ বিষয়ে কিছু বললে…।

অর্থমন্ত্রী বেন নাহান আরমিনোর কথার মধ্যেই উঠে দাঁড়াল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস কনস্টানটিনোস। তার অয়্যারলেস তার কান পর্যন্ত উঠানো। বলল সে

প্রেসিডেন্টকে লক্ষ্য করে, মহামান্য প্রেসিডেন্ট জরুরি কল এসেছে।

কথা বলে আসুন মি. কনস্টানটিনোস। আমরা অপেক্ষা করছি। বলল প্রেসিডেন্ট।

পাঁচ মিনিট পরেই মিটিং কক্ষে এলো স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কনস্টাটিনোস। ধীর পদক্ষেপে এলো সে ঘরে। জড়তা যেন তার দুই পাকে জড়িয়ে ধরেছে। বসল তার সিটে। তার চোখে-মুখে উদ্বেগ।

সবার দৃষ্টি তার উপর নিবদ্ধ। তাদেরও চোখে-মুখে উৎকণ্ঠা। বসেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস কনস্টানটিনোস প্রেসিডেন্টের দিকে তাকিয়ে বলল, খুব বড় দুঃসংবাদ মি. প্রেসিডেন্ট। আমার মেয়ে জোনা ডেসপিনা কিডন্যাপড় হয়েছিল। কিডন্যাপড হওয়া ডেসপিনাকে রক্ষা করতে গিয়ে মাননীয় প্রেসিডেন্টের ছেলে হামযা আনাস আমিন গুলিবিদ্ধ হয়েছে। ডিন্যাপারদের গাড়ি আটকাতে গিয়ে একজন ক্যাপটেনসহ চারজন সিকিউরিটি ফোর্সের সদস্য নিহত হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর শান্ত, ভারি কণ্ঠ একটা দম নিল।

প্রেসিডেন্ট শান্তভাবে শুনছিল। মন্ত্রীসভার অন্য সবার চোখে-মুখে প্রচণ্ড উদ্বেগ।

তারপর মি. কনস্টানটিনোস? জিজ্ঞাসা প্রেসিডেন্টের। শান্ত কণ্ঠ তার।

সিকিউরিটির লোকরা যখন কিডন্যাপারদের বাধা দেয়, তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেকটি মেয়ে ডেসপিনাকে উদ্ধারে এগিয়ে যায়। কিডন্যাপাররা কে আহত করে এবং ধরে নিয়ে যায়। এক নম্বর সার্কুলার রোড ধরে ওরা পোর্টের দিকে পালিয়ে যায়। পরবর্তী খবর হলো মহামান্য প্রেসিডেন্টের পারিবারিক মেহমান জনাব আহমদ মুসা বিমান বন্দর থেকে ঐ রাস্তা হয়ে ফিরছিলেন। তিনি মেয়েদের চিৎকার শুনতে পান। তার গাড়ি দিয়ে তিনি কিডন্যাপারদের গতিরোধ করে ওদের চ্যালেঞ্জ করেন। রক্তক্ষয়ী এক সংঘর্ষে ৬ জন কিডন্যাপারদের সকলেই মারা যায়। আমার মেয়ে ডেসপিনাসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐ মেয়েটির আর কোনো ক্ষতি ছাড়াই উদ্ধার হয়েছে। সন্ত্রাসীদের গাড়িটাও আমাদের সিকিউরিটি ফোর্সের হাতে এখন।

আলহামদুলিল্লাহ। আল্লাহ তায়ালার হাজার শোকরিয়া তিনি আমাদেরকে আরও বড় ক্ষতি থেকে রক্ষা করেছেন। একটু থামল প্রেসিডেন্ট।

প্রেসিডেন্ট থামতেই মন্ত্রীপরিষদ সদস্যরা কেউ আল্লাহকে, কেউ জিহ্বাকে, কেউ ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিল।

অতিথি আহমদ মুসা কি একা ছিলেন? ধন্যবাদ দেয়া শেষ করেই বলল অর্থমন্ত্রী বেন নাহান।

হ্যাঁ, একাই গাড়িতে করে ফিরছিলেন। বলল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস কাটিনোস।

___ একাই ফেরার কথা। তিনি তার পরিবারকে বিমানে তুলে দিতে গিয়েছলেন। একটা সিকিউরিটি গাড়ি আমি সাথে দিতে চেয়েছিলাম। তিনি পছন্দ করেননি। তার একা ফেরার পথে একজন সিকিউরিটি অফিসারকে বিমান বন্দর থেকে সাথে আসার ব্যবস্থা করতে চেয়েছিলাম। তাতেও রাজি হননি তিনি। বলল প্রেসিডেন্ট।

মজার লোক তো! মানুষ সিকিউরিটি সাথে পেলে খুশি হয়। আর তিনি নিতেই চাননি। বলল অর্থমন্ত্রী বেন নাহান।

মজার চেয়ে অনেক বড় বিস্ময়ের হলো, যেখানে আমাদের চারজন সিকিউরিটি কিডন্যাপারদের বাধা দিয়ে আটকাতে পারেনি, সেখানে তিনি একা ওদের বাধা দিয়ে ৬ জনকে হত্যা করে আমাদের মেয়েদের উদ্ধার করেছেন। শুধু তাই নয়, তিনি সিকিউরিটি ফোর্সকে টেলিফোন করে সেখানে ডেকে নিহত কিডন্যাপারদের এবং গাড়ি সার্চের বিভিন্ন ইনস্ট্রাকশন দিয়েছেন এবং গাড়ি ও নিহতদের তাদের হাওলায় দিয়ে আমাদের মেয়ে দুটিকে হাসপাতালে এনেছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলল।? সত্যি অতিথি একজন বিস্ময়কর ব্যক্তি! কে তিনি? বলল পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওমর আব্দুল্লাহ ঘানুসি।

হ্যাঁ, এই অবস্থায় অবশ্যই তার পরিচয় আপনারা জানতে চাইবেন এবং জানা উচিত। কিন্তু আমি বিষয়টা নিয়ে তার সাথে আলোচনা করতে চাই। তার কোনো অসুবিধা আছে কিনা তা জেনে নিতে হবে। তবে এটুকু আমি বলতে পারি যে, তিনি অসাধারণ এক ব্যক্তিত্ব। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সন্ত্রাস-ষড়যন্ত্র দমনে জগৎ জোড়া তার নাম। তবে তিনি প্রফেশনাল নন, দেশ ও মানুষকে সাহায্য-সহযোগিতা তিনি নিজ ইচ্ছাতেই করে থাকেন। ইসলামের পরিভাষায় ফি সাবিলিল্লাহ মানে আল্লাহর জন্যে তিনি কাজ করেন। বলল প্রেসিডেন্ট।

প্রেসিডেন্টের কথা শেষ হতেই অর্থমন্ত্রী বেন নাহান লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল। কিছু বলতে গিয়ে প্রেসিডেন্টের দিকে তাকিয়ে সংগে সংগেই বসে পড়ল। বলল, মাননীয় প্রেসিডেন্ট মাফ করবেন, মাফ করবেন আমার প্রিয় সহকর্মীরা, আমি আমার ভেতরের উচ্ছ্বাস ধরে রাখতে পারি নি। আমি তাকে চিনতে পেরেছি। তিনি আহমদ মুসা। গোটা দুনিয়ার গুরুত্বপূর্ণ রাজধানী, এমনকি হোয়াইট হাউজ এবং ক্রেমলিনের তিনি প্রিয়ভাজনই শুধু নয়, তারা তাকে সমীহ করে, সম্মান করে। এই তো কয়েক মাস আগে তিনি আমেরিকায় ছিলেন। আমেরিকাকে এই মহাসংকট থেকে বাঁচিয়েছেন। কদিন আগে তিনি ছিলেন আর্মেনিয়ায়। তিনি আর্মেনিয়াকে এক ভয়ানক ও জটিল ষড়যন্ত্র থেকে উদ্ধার করেছেন। তিনি শুধু অসাধারণ নন, বিস্ময়কর ও মিরাকল এক ব্যক্তিত্ব। মাননীয় প্রেসিডেন্ট, আমি বিশ্বাসই করতে পারছি না যে তার পা পড়েছে আমাদের রত্ন দ্বীপে।

বেন নাহান থামতেই পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওমর আব্দুল্লাহ ঘানুসি বলল, হ্যাঁ, খুব সম্প্রতি আমেরিকায় সন্ত্রাসীদের উদ্ভাবিত ভয়াবহ ধরনের আনবিক অস্ত্র নিয়ে মহাসংকটে পড়েছিল, সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছ থেকে আমি এটা শুনেছি। কদিন আগে আর্মেনিয়া একটা মহাসংকটে পড়েছিল, অতি সম্প্রতি আর্মেনিয়া সেই সংকট থেকে মুক্ত হয়েছে, সেটাও আমি জানি। কিন্তু জনাব আহমদ মুসাই সংকটগুলোর সমাধান করেছে কিনা, সেটা আমি জানি না। কোনো সূত্র থেকেই তার নাম বলা হয়নি।

আহমদ মুসার নাম প্রকাশ হওয়ার কথা নয়। তিনি নামের জন্যে কাজ করেন না। তার নাম গোপন রাখা হবে এই শর্তেই তিনি কাজ করেন। কিন্তু আমি জানতে পেরেছি আমাদের এক ইহুদি সূত্র থেকে। আপনারা নিশ্চয় জানেন না, ইহুদিরা নয়, একটি ইহুদি গ্রুপ মানে জায়নবাদী গ্রুপ আহমদ মুসার ঘোরতর শত্রু। জায়নবাদীরা যেখানেই যে ষড়যন্ত্র করেছে, তার মূলোচ্ছেদ করেছে আহমদ মুসা। সুতরাং জায়নবাদী ইহুদিরা তার সব খবর রাখে। তাদের সূত্র থেকেই আহমদ মুসার এই খবরগুলো আমি জানতে পেরেছি। বলল বেন নাহান, রত্ন দ্বীপের ইহুদি অর্থমন্ত্রী।

মি. নাহান, আহমদ মুসার পরিচয় আপনি যেভাবে তুলে ধরলেন, তাতে মনে হচ্ছে আহমদ মুসা আপনার খুবই প্রিয়। কিন্তু আপনিই বললেন, আহমদ মুসা ইহুদিদের ক্ষতি করেছে সবচেয়ে বেশি। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওমর আব্দুল্লাহ ঘানুসি বলল।

না, তিনি ইহুদিদের শত্রু এ কথা বলিনি, তিনি ইহুদিদের কোনো ক্ষতি করেননি। জায়াদী ইহুদি গ্রুপ তাকে শত্রু বলে মনে করে। তাদেরই নানা ষড়যন্ত্র, চক্রান্ত আহমদ মুসা বারবার বানচাল করে দিয়েছেন। আমরা ধর্মপ্রাণ ইহুদিরা তাকে খুবই ভালো জানি। সেজন্যে আহমদ মুসার ভয়ানক কিছু বিপদ ও দুঃসময়ে অনেক ইহুদি তাকে সাহায্য করেছে। বলল বেন নাহান।

আপনাদের সকলকে ধন্যবাদ। বিশেষ করে ধন্যবাদ দিচ্ছি অর্থমন্ত্রী। বেন নাহানকে। তিনি আহমদ মুসার যে পরিচয় তুলে ধরেছেন, তা আমি জানতাম না। পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাহেবের তথ্যও গুরুত্বপূর্ণ। এক হজ্জের সময় সৌদি আরবের মুহতারাম ভ্রাতৃপ্রতিম বাদশাহ আহমদ মুসার সাথে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। দিন পনের আগে সৌদি আরব থেকে আমাকে জানায় যে, আহমদ মুসা অবকাশ কাটাবার জন্যে পরিবারসহ রত্ন দ্বীপে। যাবে। আমরা তাকে আতিথ্য দিলে তারা খুশি হবেন। সেই সূত্রেই আমি তাকে আমার পারিবারিক অতিথি হিসাবে গ্রহণ করি।

একটু থামল প্রেসিডেন্ট। সোজা হয়ে বসল। বলল, আল্লাহর হাজার শোকর যে, এই সময়ে আল্লাহ তায়ালা আহমদ মুসাকে আমাদের মাঝে পাঠিয়েছেন। আমরা আশা করব রত্ন দ্বীপের এই সংকটে তিনি আমাদের পাশে দাঁড়াবেন।

কিন্তু আপনিই তো বললেন, তিনি প্রফেশনাল নন। কাজ করলে নিজের ইচ্ছাতেই করেন। তিনি কি ইচ্ছা করবেন? বলল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস কনস্টানটিনোস।

আজ তিনি আমাদের দুটি মেয়েকে বাঁচালেন। ছয়জন কিডন্যাপারকে হত্যা করলেন, এটা তো তিনি নিজ ইচ্ছাতেই করেছেন। এই শুভেচ্ছাই আমরা তার কাছে চাইব। তাছাড়া আমি শুনেছি, তিনি মজলুমদের সাহায্য করার, মানুষকে ষড়যন্ত্র, সন্ত্রাসের হাত থেকে বাঁচাবার কোনো আহ্বানই প্রত্যাখ্যান করেন না। প্রেসিডেন্ট বলল।

আবার টেলিফোন বেজে উঠল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস কনস্টানটিনোসের অয়্যারলেস।

মাফ করবেন মহামান্য প্রেসিডেন্ট বলে উঠে দাঁড়াচ্ছিল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মি. কনস্টানটিনোস আপনি বসুন। এখানে বসেই কথা বলুন। মন্ত্রীসভার কাজ স্থগিত থাকবে ততক্ষণ। বলেিডন্ট।

বসল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

অয়্যারলেসে কথা বলল। বলল মানে বেশির ভাগই শুনল ওপারের কথা। মাঝে মাঝে দুএকটা প্রশ্ন করল আর হু-হা করল, এই যা। সবশেষে বলল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, তোমরা সবদিক থেকে সতর্ক থেকো, কি করা যায় আমি দেখছি।

অয়্যারলেস রেখে দিল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তাকাল সে প্রেসিডেন্টের দিকে। বলল, মাননীয় প্রেসিডেন্ট, আরও কিছু জরুরি খবর আছে।

মুহূর্তের জন্যে থেমেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আবার শুরু করল, সন্ত্রাসী চক্রটি এবার কিডন্যাপ করতে এসে একটি প্রচারপত্র ফেলে যায়।

প্রচারপত্র? কিসের প্রচারপত্র? বলল বেন নাহান আরমিনো।

বিপজ্জনক প্রচারপত্র। যা বলা হয়েছে প্রচার পত্রে, তার সারাংশ হলো, রত্ন দ্বীপের মুসলিমরা শোষিত, বঞ্চিত, প্রতারিত হয়ে আসছে। দ্বীপের মোট জনসংখ্যার চারভাগের তিনভাগ হয়েও সংসদে সদস্য সংখ্যা মাত্র ৩০জন আর মন্ত্রীর সংখ্যা মাত্র ৪। আর খ্রিস্টান ও ইহুদিরা মোট জনসংখ্যার যথাক্রমে ৫ ভাগের এক ভাগ এবং ২০ভাগের ১ ভাগ হয়েও সংসদে ১০জন করে সদস্য ও ৩জন করে মন্ত্রীর অধিকারী। অর্থমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মতো গুরুত্বপূর্ণ পদ ইহুদি ও খ্রিস্টানদের দখলে। এভাবে দ্বীপের জনসংখ্যার চার ভাগের এক ভাগের হাতে চলে গেছে সুযোগ-সুবিধার সিংহভাগ। দ্বীপের মুসলিম জনগণ এটা মানবে না। আমরা সংগ্রাম শুরু করেছি, শেষ হবে আমাদের অধিকার ফিরিয়ে আনার মধ্যে দিয়ে। এই সরকার ও সংবিধান মুসলিম জনগণের শত্রু। শত্রুদের আইন ও নিয়ন্ত্রণ আমরা মানি না। সংক্ষেপে প্রচারপত্রের সারাংশ এটাই। আরেকটা কথা ওরা জানাল, সেটা হলো…।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কথার মধ্যেই কথা বলে উঠলেন প্রেসিডেন্ট। তার চোখে মুখে প্রবল অস্বস্তি ও উদ্বেগের চিহ্ন। বলল, মি. কনস্টানটিনোস, ওরা কথাগুলো ঠিক ঠিক বলেছে এবং আপনি ঠিক ঠিক শুনেছেন তো?

মহামান্য প্রেসিডেন্ট, ওরা আমাকে প্রচারপত্রটি পড়ে শুনিয়েছে। আমি যা বলেছি, তাতে কোনো ভুল নেই। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলল।

রত্ন দ্বীপের কোনো মুসলিমের এই বক্তব্য হতে পারে না। রত্ন দ্বীপের দেড় লাখ মুসলিমের সবার মুখ আমার সামনে আছে বলা যায়। তাদের কারও পক্ষেই এমন কিছু লেখা অসম্ভব। বলল প্রেসিডেন্ট।

অসম্ভব বলেই বিষয়টা আরও বেশি শংকা ও উদ্বেগের বিষয় মাননীয় প্রেসিডেন্ট। কেমন করে অসম্ভবটা সম্ভব হলো?

সবাই নীরব। উত্তরটা হয়তো কারো জানা নেই। প্রেসিডেন্টের মুখ নিচু হয়ে গিয়েছিল। ধীরে ধীরে মুখ তুলল প্রেসিডেন্ট। তার মুখ শক্ত, চোখে কঠিন দৃষ্টি। বলল, মি. কনস্টানটিনোস, আরো কি যেন বলছিলেন। আপনার কথা শেষ করুন।

হ্যাঁ, মহামান্য প্রেসিডেন্ট, বলছি। গোয়েন্দারা আমাকে জানাল, আহমদ মুসা মোবাইলে বারবার চেষ্টা করেও আপনাকে পায়নি। তিনি আপনার সাথে জরুরি কিছু কথা বলতে চান।

আকস্মিক জেগে ওঠার মতো নড়েচড়ে সোজা হয়ে বসল প্রেসিডেন্ট। বলল, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মি, কনস্টানটিনোস, আপনি গোয়েন্দা প্রধানকে বলুন, আহমদ মুসাকে অনুরোধ করে এখানে নিয়ে আসতে। আমারও কিছু জরুরি কথা আছে তার সাথে।

এখনই আমি গোয়েন্দা প্রধানকে বলছি মহামান্য প্রেসিডেন্ট।

বলেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কনস্টানটিনোস তার অয়্যারলেসে কল করল রত্ন দ্বীপের গোয়েন্দা প্রধান ওসমান আবু তাসফিনকে। বলল সে ওসমান আবু তাসফিনকে, জনাব, আমার সামনে মহামান্য প্রেসিডেন্ট বসে আছেন। তিনি চান আপনি জনাব আহমদ মুসাকে নিয়ে আমাদের বৈঠকের এখানে আসুন। আপনি মহামান্য প্রেসিডেন্টের ইচ্ছার কথা বলে তাকে অনুরোধ করুন এখানে আসার জন্যে।

ওপর থেকে গোয়েন্দা প্রধান ওসমান আবু তসফিন বলল, ও.কে স্যার, জনাব আহমদ মুসা এখানেই আছেন। তার মাছ থেকেই আমরা ব্রিফ নিচ্ছিলাম। আমি তাকে অনুরোধ করছি এবং এখনি নিয়ে আসছি স্যার।

১৫ মিনিটের মধ্যেই গোয়েন্দা প্রধান ওসমান আবু তাসফি আহমদ মুসাকে সাথে নিয়ে এসে পৌঁছল প্রেসিডেন্সিয় ল সেক্রেটারিয়েটে।

প্রেসিডেন্টের অতিথি রুমে আহমদ মুসাকে বসিয়ে, প্রেসিডেন্টের পি. এ.-কে সেখানে থাকতে বলে গোয়েন্দা প্রধান মন্ত্রীপরিষদ কক্ষের স্বরাষ্ট্রমন্ত্র। র দিকে এগোলো। আহমদ মুসা এসেছে, সেটা আগেই জানিয়েছে গোয়েন্দা প্রধান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও সংগে সংগে আহমদ মুসা এসেছেন তা জানিয়েছে প্রেসিডেন্টকে।

প্রেসিডেন্ট বলল, মি. ক্রিস কনস্টানটিনোস, আপনি নিজে গিয়ে আহমদ মুসাকে আমাদের এই সভাকক্ষে নিয়ে আসুন। যা এ পর্যন্ত ঘটেছে আজ, সে সম্পর্কে আহমদ মুসার কথা এবং তার মত জানতে মন্ত্রীসভার সকলেই আগ্রহী।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংগে সংগেই বাইরে চলে যায়। গোয়েন্দা প্রধান আবু তাসফিনও সাথে সাথে এসে গিয়েছিল। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাকে নিয়ে চলে যায়। প্রেসিডেন্টের অতিথি কক্ষে এবং আহমদ মুসার সাথে আলাপ-পরিচয় করে। তাঁকে ও গোয়েন্দা প্রধানকে নিয়ে চলে আসে মন্ত্রীপরিষদের সভাকক্ষে।

প্রেসিডেন্ট উঠে দাঁড়িয়ে সবার সাথে তাকে পরিচয় করিয়ে দিল।

সব মন্ত্রীই উঠে দাঁড়িয়েছিল প্রেসিডেন্ট উঠে দাঁড়াবার সাথে সাথেই।

প্রেসিডেন্ট বসতে বলল আহমদ মুসাকে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ডান পাশে প্রেসিডেন্টের কাছাকাছি আরেকটা চেয়ার এনে। রাখা হয়েছিল।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস কনস্টানটিনোস আহমদ মুসাকে নিয়ে সে চেয়ারে বসাল।

আহমদ মুসা বসলে প্রেসিডেন্টই কথা বলে উঠল, মুহতারাম আহমদ মুসা, আপনাকে স্বাগত, গল্প-কাব্যে-রূপকথায় আকাশের চাঁদ হাতে পাওয়ার যে আনন্দ আমরা দেখি, আপনাকে পেয়ে আমরা সেরকমটাই খুশি হয়েছি। আমার মনে হয়েছে আমাদের রত্ন দ্বীপকে বিশেষভাবে ভালোবাসেন আমাদের আল্লাহ। রত্ন দ্বীপে আমরা সব ধর্মের লোক সম্মিলিত হয়েছি সকলের স্ব স্ব অধিকারের ভিত্তিতে। এখানে কেউ কারও উপর আধিপত্য করে না। পার্লামেন্ট ও মন্ত্রীসভায় সব ধর্মের শক্তিশালী উপস্থিতি আছে। যে মানুষ যে ধর্মের, সে তার ধর্মের বিধান ও অনুশাসন দ্বারা পরিচালিত হয়। কোনো মুসলিম যদি স্বভাবে চোর, মানে জীবন রক্ষার প্রয়োজনে নয়, আর এটা যদি প্রমাণিত হয়, তাহলে তার হাত কাটা যাবে, কিন্তু খ্রিস্টান ইহুদিদের ক্ষেত্রে এই আইন বর্তাবে যদি না তারা একে কল্যাণকর বলে গ্রহণ করে। প্রতিটি মানুষের স্বাধীন মতামতকে এখানে সম্মান করা হয়। সবাই তাদের ধর্মের ভালো দিক তারা প্রচার করতে পারবে। মানুষ তার স্বাধীন ইচ্ছা অনুসারে অর্থাৎ কোনো প্রকার অন্যায় প্রভাব-প্রলোভনের শিকার না হয়ে তার ধর্মমত পরিবর্তনও করতে পারবে। কোনো ধর্মের সাথে সংশ্লিষ্ট নয়, এমন ব্যক্তিগত ও সামাজিক বিধান রাষ্ট্রীয় আইন হিসাবে সব ধর্মের লোকের জন্যে সমানভাবে প্রযোজ্য। এই রত্ন দ্বীপের একশ বছরের ঐতিহ্য এটা। এই নীতি রত্ন দ্বীপ রাষ্ট্রকে শান্তি ও সুখ এনে দিয়েছে, মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সৌহার্দ্য-সম্প্রীতি গড়ে দিয়েছে। সবাই এখানে সবার সহযোগী। এই শান্তি-সম্প্রীতির ঘরে আজ কেউ আগুন লাগাতে চাচ্ছে। এ পর্যন্ত সাম্প্রদায়িক ধরনের তিনটি হিংসাত্মক ঘটনা ঘটেছে। আজ প্রথম ভয়াবহ কিডন্যাপের ঘটনা ঘটল এবং এতে ১১ জন মানুষের জীবনহানি ঘটল। রত্ন দ্বীপ রাষ্ট্রের দীর্ঘ ইতিহাসে এমন ঘটনার নজীর নেই। রাম্বুল আলামিন আল্লাহ যেন বিশেষ দয়া করে আপনাকে পাঠিয়েছেন আমাদের দুটি মেয়ের জীবন ও সম্মান রক্ষার জন্যে। আমরা এবং আমাদের রাষ্ট্র মহান আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ, সেই সাথে আমরা কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। আপনাকেও। নিজের জীবন বিপন্ন করে আমাদের দুই মেয়েকে রক্ষা করেছেন আপনি। মহান ভাই আহমদ মুসা, আমাদের একান্ত চাওয়া যে, রত্ন দ্বীপের শান্তির ঘরে যারা আগুন লাগাচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে আপনি আমাদের সাহায্য করুন। থামল প্রেসিডেন্ট।

প্রেসিডেন্টের কথা শেষ হবার সাথে সাথেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস কনস্টানটিনোস ও অর্থমন্ত্রী বেন নাহান আরমিনোসহ সকলেই বলে উঠল, মাননীয় প্রেসিডেন্ট আমাদের কথাই বলেছেন। রত্ন দ্বীপ আজ অদৃশ্যপূর্ব এক সংকটে পড়েছে। আমরা আপনার সাহায্য চাই। আপনার কথা আমরা জেনেছি। আমরা আনন্দিত যে, স্রষ্টা বিশেষ অনুগ্রহ করে আপনাকে আমাদের মাঝে পাঠিয়েছেন।

ধন্যবাদ আপনাদের সকলকে। আমি মনে করছি, ধর্ম-মত নির্বিশেষে সকলের সম্প্রীতি ও সহাবস্থানের একটা উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত আপনার স্থাপন করেছেন রত্ন দ্বীপে। আপনাদের এই সাফল্য আমাকে মুগ্ধ করেছে। মহামান্য প্রেসিডেন্ট যে সংকটের কথা তুলে ধরেছেন, সে ব্যাপারে আমি কি করতে পারব জানি না। তবে বিষয়টা আমি আরও জানতে চাই। সেজন্যে মহামান্য প্রেসিডেন্টের আমি সাক্ষাৎ প্রার্থনা করেছিলাম।

আহমদ মুসা একটু থামল।

সংগে সংগেই প্রেসিডেন্ট বলল, মহান ভাই আহমদ মুসা, আপনার কাছে ঘটনা সব শুনব, তারপর আমরাও কিছু বলব এজন্যেই আপনাকে কষ্ট দিয়েছি। প্লিজ বলুন, কেন আপনি প্রেসিডেন্টের সাক্ষাৎ চেয়েছিলেন। যদি। কথাগুলো বিশেষ হয়, তাহলে আমরা অন্যকক্ষেও যেতে পারি।

না মহামান্য প্রেসিডেন্ট, এখানে বলতে আমার কোনো আপত্তি নেই। রত্ন দ্বীপের যে সংকট নিয়ে কথা হচ্ছে, সে বিষয়েই আমার কথা।

বলে একটু থেমেই আহমদ মুসা আবার শুরু করল, আজকের কিডন্যাপের ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্ট মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কন্যা, মাননীয় প্রেসিডেন্টের ছেলে এবং যে আরেকটি মেয়ে কিডন্যাপ হয়েছিল, তাদের সাথে কথা বলার অনুমতি চাই। দ্বিতীয় বিষয় হলো, যারা এ পর্যন্ত চারটি সাম্প্রদায়িক ও হিংসাত্মক ঘটনা ঘটাল, তাদের কারও কোনো পরিচয় জানা আছে কিনা, তারা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, না কোনো ক্রিমিনাল পক্ষ এবং তারা দেশি না বিদেশি? এই প্রশ্নগুলো এখন আমার সামনে আছে যা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। থামল আহমদ মুসা।

উত্তর এলো স্বয়ং প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে। বলল, মহান ভাই আহমদ মুসা, যাদের সাথে আপনি কথা বলতে চান, তাদের সাথে কথা বলার জন্যে কোনো অনুমতির প্রয়োজন ছিল না। তবু আপনি চেয়েছেন, তাই অনুমতি দিয়ে দিলাম। শুধু এই তিনজন নয়, রত্ন দ্বীপের যেকোনো কারো সাথেই কথা বলতে আপনার কোনো প্রকার অনুমতির দরকার নেই।

একটু থেমে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে লক্ষ্য করে বলল, মি. কনস্টানটিনোস, আমাদের সিকিউরিটি ফোর্সের দায়িত্বশীল, প্রশাসনের লোকজন, প্রশাসনিক ইউনিটগুলোর লোকজন সবাইকে বলে দেবেন তারা যেন আহমদ মুসাকে সব রকমের সহযোগিতা করে।

কথাগুলো শেষ করেই প্রেসিডেন্ট আবার ফিরে তাকাল আহমদ মুসার দিকে। বলল, প্রিয় ভাই, আপনি দ্বিতীয় যে বিষয়টা বলেছেন, তার কোনটাই আমাদের জানা নেই। আমরা এখনো একেবারেই অন্ধকারে আছি। আমাদের আগের তদন্তগুলোতে কোনো লোককে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি, এ পর্যন্ত কোনো লোক ধরাও পড়েনি। সুতরাং বলা মুশকিল শত্রুপক্ষ দেশি, না বিদেশি। তবে আমাদের কাছে দেশি কেউ বা বিদেশি কোনো রাষ্ট্র জড়িত থাকার বিষয়টা অসম্ভব বলে মনে হয়। আমরা যতটা অনুসন্ধান করেছি, যতটা তথ্য আমাদের কাছে তাছে, তাতে রত্ন দ্বীপের কেউ এ ধরনের কাজে জড়িত থাকতে পারে। অন্যদিকে কোনো বিদেশি রাষ্ট্র কোনো দিক দিয়েই আমাদের শত্রু তালিকায় নেই।

ধন্যবাদ মহামান্য প্রেসিডেন্ট। আজ কিডন্যাপারদের ৭জন মারা পড়েছে। এদের তো সিকিউরিটি ফোর্স ও গোয়েন্দারা পরীক্ষা করেছে এবং লাশগুলো পরীক্ষার জন্যে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এদের কোনো প্রকার

পরিচয় জানা গেছে কিনা? বলল আহমদ মুসা।

প্রেসিডেন্ট তাকাল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দিকে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একটু নড়েচড়ে বসল। বলল গোয়েন্দা প্রধান ওসমান আবু তাসফিনকে লক্ষ্য করে, এ ব্যাপারে নিশ্চয় বলবেন কিছু মি. ওসমান।

বলছি স্যার।

গোয়েন্দা প্রধান ওসমান আবু তাসফিন প্রেসিডেন্ট ও আহমদ মুসাকে সম্বোধন করে বলল, তারা দেশি কি বিদেশি, এখনি তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। সাতজনের দেহে একই রকমের উল্কি পাওয়া গেছে। এতে মনে হয় এরা একটা গ্রুপের লোক। উল্কিগুলোতে দেখা গেছে ধনুকের পেটে এন্টেনার মতো কিছু। রত্ন দ্বীপের কেউ কেউ উল্কির ব্যবহার করেন, কি এ ধরনের গ্রুপ উল্কি আগে কখনো দেখা যায়নি। ওদের সাতজনের নামও পাওয়া গেছে। ওদের প্রত্যেকের কপালে তাদের স্কিনের রঙে অ চন্দ্রাকারে লেখা। আনকমন হলেও এ ধরনের কোনো নাম রত্ন দ্বীপে আছে। নিশ্চয়। সুতরাং তারা দেশি, না বিদেশি চিহ্নিত করা যায়নি। থামল গোয়েন্দা প্রধান।

প্রিয় ভাই আহমদ মুসা, আপনিও ওদের লাশ দেখেছেন। আপনি কিছু কি সন্দেহ করছেন?

মহামান্য প্রেসিডেন্ট, আমিও ওদের লাশগুলোকে ভালোভাবে দেখার চেষ্টা করেছি। যা দেখেছি তা নিয়ে চিন্তাও করেছি। গোয়েন্দা প্রধান ঠিকই বলেছেন, ওদের পরিচয় এখন নিশ্চিত করে বলা মুশকিল। তবে ওদের নাম ও উল্কিকে একত্র করে দেখলে ওদের একটা গুরুতর পরিচয় স্পষ্ট হয়ে উঠে। থামল একটু আহমদ মুসা।

গুরুতর পরিচয়? বলল প্রেসিডেন্ট। তার চোখে-মুখে বিস্ময়ের ছাপ।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, গোয়েন্দা প্রধানসহ সকলেরই বিস্ময় দৃষ্টি আছড়ে পড়েছিল আহমদ মুসার মুখের উপর।

আবার শুরু করল আহমদ মুসা, ওদের সাতজনের বাহুতে যে উল্কি আছে, তার ভিন্ন আর একটা পরিচয়ও হতে পারে, যা ধনুকের মতো মনে হচ্ছে। তা আসলে হতে পারে মধ্যযুগের সমুদ্রগামী জাহাজের মূল ফ্রেমের ছবি। আর যাকে মনে হচ্ছে এন্টেনা, সেটা আসলে মাস্তুল স্ট্যান্ড, যাতে অনেকগুলো পাল টাঙানো যায়। এর অর্থ ওদের কাঁধের উল্কি মধ্যযুগের পালের জাহাজের প্রতীক। আর ওদের নামগুলোকে একসাথে করে দেখলে তাও খুবই তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়। ওদের সাতজনের নাম- সিলভা, জীম, লেভেজি, আব্রাহাম গ্রে, বেনগান, স্মোলেট এবং ট্রেলেওয়ানী। এই সাতটা নাম ট্রেজার আইল্যান্ড বইয়ের ধনভাণ্ডার উদ্ধারকারী সাতজনের নামের সাথে হুবহু মিলে যায়। একদিকে ওদের কাঁধে মধ্যযুগীয় পালতোলা জাহাজের প্রতীক চিহ্ন, অন্যদিকে ট্রেজার আইল্যান্ডের সাত চরিত্রের সাথে এদের সাতজনের নামের হুবহু মিল- এই দুই বিষয়কে সামনে রেখ আমার মনে হচ্ছে, বাইরের একটি গ্রুপ রত্ন দ্বীপে তাদের কোনো স্বার্থসি ন্যে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে। থামল আহমদ মুসা।

কেউ কোনো কথা বলল না। সবার চোখ আহমদ মুসার উপর নিবদ্ধ। তাদের চোখে বিস্ময় বিমুগ্ধ দৃষ্টি। গোয়েন্দা প্রধান ওসমান আবু তাসফিন এর দুচোখ তো বিস্ময়ে ছানাবড়া। তার মনে হচ্ছে, কোনো অলৌকিক শক্তি না থাকলে একজন কেমন করে ঐ দুটি বিষয়ের এমন ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে পারে! কোথায় ট্রেজার আইল্যান্ডের সাত চরিত্র আর কোথায় আজকের সাত কিডনপার। একটা ধনুকাকৃতির সিংগল রৈখিক একটা কাঠামো ও তার উপর এ্যান্টেনার মতো লম্বকে মধ্যযুগীয় পাল তোলা সমুদ্রগামী জাহাজ ধরে নেয়া খুবই শক্তিশালী একটা কল্পনা। কিন্তু মনে হচ্ছে এই কল্পনার শতভাগই বাস্তব। আহমদ মুসার প্রতি শ্রদ্ধায় নুয়ে গেল গোয়েন্দা প্রধান ওসমান আবু তাসকিনের সুন।

পিনপতন নীরবতা ভেঙে প্রথম কথা বলল প্রেসিডেন্ট, ধন্যবাদ আহমদ। মুসা! উল্কি এবং সাত নামের যে পরিচয় তুলে ধরেছেন, তা আমার কাছে খুব বাস্তবসম্মত মনে হচ্ছে এবং শুক্র গ্রুপটা যে বাইরের, সেটাও আমার কাছে এখন নিঃসন্দেহ মনে হচ্ছে। অনিশ্চয়তার জমাট অন্ধকারে এটা আমাদের জন্যে এক উজ্জ্বল আলো। আল্লাহ আপনাকে বিচারবুদ্ধির যে।

সাধারণ তীক্ষ্ণতা ও দূরদর্শিতা দান করেছেন তার জন্যে আমি আল্লাহর অশেষ শুকরিয়া আদায় করছি। আমার কাছে যে প্রশ্নটা এখন বড় হয়ে উঠছে, সেটা হলো রত্ন দ্বীপে তাদের স্বার্থটা কি? ছোট্ট আমাদের রত্ন দ্বীপ। এখানে লোভনীয় কোনো সম্পদ নেই, যেমনটা ছিল ট্রেজার আইল্যান্ডে। তাহলে স্বার্থটা কি, যেজন্যে বাইরের সন্ত্রাসী গ্রুপ আসবে রত্ন দ্বীপে?

তাদের স্বার্থটা কি, তা বলা মুশকিল এখন। সন্ত্রাসীরা কারা, তারা চরিত্রের দিক দিয়ে রাজনীতিক, না অপরাধী, রত্ন দ্বীপের কারো সাথে তাদের সম্পর্ক আছে কিনা, থাকলে কাদের সাথে? ইত্যাদি বিষয় সুস্পষ্ট না হলে বলা যাবে না তাদের স্বার্থটা কি। তবে আমার মনে হচ্ছে ওরা মূলত সম্পদ লোভী লোক। বলল আহমদ মুসা।

কিন্তু তারা সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসে জড়িয়ে পড়ছে কেন বা সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস ছড়িয়ে দিচ্ছে কেন? স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মেয়েকে কিডন্যাপের চেষ্টাও সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস হতে পারে। তাদের প্রচারিত প্রচারপত্র এই কথাই প্রমাণ করে। অর্থমন্ত্রী বেন নাহান বলল।

একটা লক্ষ্যে পৌঁছার নানা পথ হতে পারে। যে পথ সহজেই সুফল দিতে পারে, সাধারণত সে পথই গ্রহণ করা হয়ে থাকে। রত্ন দ্বীপের শত্রু সন্ত্রাসীরা কেন এই পথ বেছে নিয়েছে, এটা বুঝার জন্যে তাদের লক্ষ্য কি সেটা আমাদের জানতে হবে। যেটকু আমার মনে হচ্ছে তা হলো, তাদের লক্ষ্য ছোট কোনো কাজ নয়। ছোট কোনো কাজ তাদের লক্ষ্য হলে তারা হৈচৈ সৃষ্টির মতো এসব কাজ করত না। নিশ্চয় তারা এমন কিছু করতে চাচ্ছে, যার জন্যে সরকার ব্যবস্থা ভেঙে পড়া দরকার। সরকার ব্যবস্থা ভাঙার জন্যেই তাদের দরকার সাম্প্রদায়িক ও সামাজিক অবিশ্বাস, অনৈক্য ও সংঘাত সৃষ্টি করা। বলা যায়, এই কাজটাই তারা করছে। বলল আহমদ মুসা।

সবাই আহমদ মুসার দিকে হা করে তাকিয়ে আছে। তাদের চোখে-মুখে উদ্বেগ।

প্রেসিডেন্টের মুখেও নেমেছে একটা নিবিষ্টতা। বলল, সে বড় টার্গেটটা কি হতে পারে, যার জন্যে তারা সাম্প্রদায়িক ও সামাজিক ঐক্য সংহতি ধ্বংস করতে এবং সরকার ব্যবস্থা ধ্বংস করতে চাচ্ছে? আপনি বলেছেন। তারা লোভী। তাদের লোভটা কি অর্থ-সম্পদের, না ক্ষমতার, না রত্ন দ্বীপের ধর্মীয় ও সামাজিক সংহতি-সমঝোতা ধ্বংস করার?

কোটা তাদের লক্ষ্য আর কোন্‌টা উপলক্ষ তা এখন নিশ্চিত করে বলা, অসম্ভব। তবে আমি বলেছি, তারা বড় কোনো একটা লক্ষ্যে রত্ন দ্বীপের শান্তির রাজ্যে সংঘাত, সংঘর্ষ, ধ্বংস ডেকে আনতে চাচ্ছে। বলল আহমদ মুসা।

সবাই নীরব। সকলের চোখে-মুখে বাকরুদ্ধ এক উদ্বেগ যেন।

নীরবতা ভাঙল প্রেসিডেন্ট। বলল, এখন তাহলে করণীয় কি প্রিয় ভাই আহমদ মুসা। অতীতে আমরা তদন্ত করেছি, আজকের দুটি ঘটনা তদন্তের জন্যেও আমরা তদন্ত কমিটি গঠন করব। কিন্তু আমরা চাচ্ছি, আল্লাহ যখন আপনাকে আমাদের মাঝে দয়া করে প্রেরণ করেছেন, তখন আপনি এই তদন্তের দায়িত্বভার গ্রহণ করুন, প্লীজ। আমার এবং আমার গোটা মন্ত্রীসভার অনুরোধ এটা।

ধন্যবাদ মি. প্রেসিডেন্ট। আপনাদের অনুরোধ আমার কাছে আদেশের মতো। কিন্তু আমি এই দায়িত্ব পালন করব অন্যভাবে। আপনারা আপনাদের মতো করে তদন্ত কমিটি গঠন করুন। কমিটি কাজ করুক। আর আমাকে আমার মতো করে কাজ করতে দিন। চাইলে সবাই যেন আমাকে সাহায্য করেন, আমার কথা শোনেন, এটা দয়া করে নিশ্চিত করুন।

প্রেসিডেন্ট সবার দিকে তাকাল। তার দুচোখ ঘুরে এসে আবার নিবদ্ধ হলো আহমদ মুসার উপর। বলল, ধন্যবাদ প্রিয় ভাই আহমদ মুসা। আপনি যা বলবেন, তা শিরোধার্য আমাদের জন্যে। আমরা আপনার প্রস্তাব গ্রহণ করলাম। আমাদের দ্বীপের গোটা সিকিউরিটি ব্যবস্থা এবং প্রশাসন আপনি যা বলবেন সেই নির্দেশ পালন করবে। আমাদের তদন্ত কমিটিও আপনার সাথে যোগাযোগ রেখে কাজ করে যাবে। অনেক ধন্যবাদ প্রিয় ভাই। আপনাকে।

ধন্যবাদ মি. প্রেসিডেন্ট। এখন যে দুটি মেয়ে কিডন্যাপ হয়েছিল এবং যে ছেলেটি আহত হয়েছে, তাদের সাথে আমার কথা বলতে হবে। বলল আহমদ মুসা।

ওরা তিনজন স্টেট সিকিউরিটি হাসপাতালে আছে। আপনি যেকোনো সময় তাদের সাথে কথা বলতে পারেন। বলল প্রেসিডেন্ট। কথা শেষ। করেই তাকাল গোয়েন্দা প্রধানের দিকে। বলল, মি. ওসমান আবু তাসফিন, ভাই আহমদ মুসাকে তুমি হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে তাদের সাথে কথা বলার ব্যবস্থা করে দেবে।

ইয়েস মহামান্য প্রেসিডেন্ট। বলল গোয়েন্দা প্রধান।

মি. প্রেসিডেন্ট, আমি এখন উঠতে চাই, যদি আপনি অনুমতি দেন। আহমদ মুসা বলল।

হ্যাঁ, প্রিয় ভাই আহমদ মুসা। আল্লাহ আমাদের সাহায্য করুন, আপনাকে সফল করুন। আপনাকে পেয়ে আমরা আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করছি।

আহমদ মুসা উঠে দাঁড়াল। প্রেসিডেন্টসহ সকলকে সালাম ও শুভেচ্ছা জানিয়ে আহমদ মুসা কক্ষ থেকে বেরিয়ে এল।

গোয়েন্দা প্রধান তাকে গাইড করছিল।

 

 

হাসপাতাল কক্ষের দরজা নীরবে খুলে গেল।

দরজা দিয়ে প্রবেশ করুল হামযা আনাস। সেমেটিক ও ইউরোপীয় আর্য রঙের মিশ্রণ তার দেহে। সুন্দর, সুগঠিত তার দেহ। রত্ন দ্বীপের একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় রত্ন দ্বীপ স্টেট ইউনিভার্সিটির মিলিটারি ফ্যাকাল্টির ছাত্র সে। রত্ন দ্বীপে ছেলে-মেয়ে সবার জন্যে মিলিটারি ট্রেনিং অপরিহার্য, কিন্তু কেউ কেউ আবার বিশেষভাবে মিলিটারি সাবজেক্টের উপর উচ্চতর ডিগ্রি নেয়। এরাই দ্বীপে সিকিউরিটি ফোর্সের কমান্ডারের দায়িত্ব পায়।

হামযা আনাস আমিনের বাম বাহুতে ব্যান্ডেজ বাঁধা। তার বাম হাতটি গলার সাথে ঝুলিয়ে রাখা।

হাসপাতালের কক্ষটিতে দুগ্ধ ফেনিল একটা মেডিকেল বেড। বেডে শুয়ে আছে এক তরুণী, একটা শুভ্র ফুলের মতো দেখতে। তার কপালে ব্যান্ডেজ বাঁধা। তরুণী জোনা ডেসপিনার চোখ দুটি বোজা।

জোনা ডেসপিনা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস কনস্টানটিনোসের মেয়ে। রত্ন দ্বীপ স্টেট ইউনিভার্সিটির ফ্যাকাল্টি অব জেনারেল হিস্ট্রির ছাত্রী।

হামযা আনাস আমিন এগোচ্ছে জোনা ডেসপিনার দিকে। জোনা ডেসপিনার বেডের পাশে গিয়ে দাঁড়াল। মুহূর্তকাল দাঁড়িয়ে এগোলো তার মাথার দিকে। ডেসপিনার ব্যান্ডেজটি সে ভালো করে দেখল। ব্যান্ডেজে তাজা রক্ত দেখে বুঝল ডেসপিনার আহত স্থান থেকে রক্তক্ষরণ এখনও বন্ধ হয়নি। জ্বর আছে কিনা গায়ে?

হামযা আবার তার পাশে এসে দাঁড়াল। ঝুঁকে পড়ে ডেসপিনার একটা হাত তুলে নিল। হাত ঠাণ্ডা। না, জ্বর নেই, নিশ্চিত হলো হামযা আনাস। শশুশি হলো।

জোনা ডেসপিলার হাত ছেড়ে দিয়ে ঘুরে দাঁড়াচ্ছিল হামযা আনাস চলে যাবার জন্যে।

হাতে টান অনুভব করে মুখ ঘুরিয়ে নিল হামযা আনাস। দেখল জোনা ডেসপিনার হাত তার হাত জড়িয়ে ধরেছে।

হান্য একটু বস। বলল জোনা ডেসপিনা। ডেসপিনার দুই চোখ তখনও নেজা।

আমি মনে করেছিলাম ডেসপিনা তুমি ঘুমাচ্ছ! তুমি তো এখনও চোখ বুজে আছ। কি করে বুঝলে আমি ম্যা?

চোখ খুলল জোনা ডেসপিনা। বলল, তোমার গন্ধ আমার চেনা। তুমি যে একটা মাইল্ড ও মিষ্টি সেন্ট ব্যবহার কর, তা অদ্বিতীয়।

ডেসপিনার ফুলের মতো ঠোঁটে সুন্দর এক টুকরো হাসি।

ডেসপিনার পাশে বসল হামযা তার দিকে মুখ করে।

তুমি তো মারাত্মক আহত হয়েছ। বন্দুকধারীদের সামনে কো তুমি

ঐভাবে আমাকে রক্ষা করতে গিয়েছিলে? বলল জোনা ডেসৃপিনা। তার চোখে-মুখে উদ্বেগ।

দাঁড়িয়ে, দাঁড়িয়ে দেখলে তুমি খুশি হতে? বলল হামযা আনাস

আমার চেয়ে তোমার জীবন মূল্যবান আমার কাছে। জোনা ডেসপিনা বলল।

আমার মূল্যবান জীবন নিয়ে আমি বসে থাকি, আর তোমার মূল্যহীন জীবন ধ্বংস হয়ে যা, তাই না? বলল হামযা আনাস আমিন।

গুলিটা যদি তোমার আর ৪ ইঞ্চি নিচে লাগত, তাহলে কি হতো বল তো? বলল ডেসপিনা।

কিন্তু লাগেনি। বলল হামযা।

লাগেনি বলেই তোমাকে কথাগুলো বলতে পারলাম! লাগলে কি হতো। সেটাই আমার কথা।

যা ঘটেনি তা নিয়ে আর কথা নয়। এখন বল, কেমন আছ তুমি? বলল হামযা আনাস।

তোমার এই অবস্থায় তুমি কেন হাসপাতালের বেড থেকে উঠে এসেছ? শুধু আমি কেমন আছি এটা জানার জন্যে? জোনা ডেসপিনা বলল।

দোষ এতে অবশ্যই হয়নি। বলল হামযা আমিন।

চারজন সিকিউরিটির লোককে গুলি খেয়ে মরতে দেখেও তুমি আমাকে উদ্ধারের জন্যে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলে, আবার এত বড় একটা আহত অবস্থা নিয়ে হাসপাতালের বেড থেকে তুমি উঠেছ, তোমার এই আবেগকে আমি ভয় করি। জোনা ডেসপিনা বলল। তার কণ্ঠ ভারি।

হামা আমিন মুখ তুলে মুহূর্তের জন্যে ডেসপিনার দিকে তাকিয়ে বলল, আমার আবেগকে দোষ দিচ্ছ আমার নিরাপত্তার কথা ভেবেই তো? তোমার যেখানে জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন, সেখানে আমার নিরাপত্তার কথা ভেবে কি বসে থাকতে পারি, বল?

আমি তোমাকে বুঝাতে পারব না, মুক্ত হয়ে যতক্ষণ না তোমার খবর পেয়েছি, ততক্ষণ কি দুঃসহ যন্ত্রণার মধ্যে আমার সময় কেটেছে। আমার বেঁচে আসাটা নিরর্থক হয়ে গিয়েছিল। বলল জোনা ডেসপিনা। তার দুচোখ থেকে দুফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল দুগণ্ড বেয়ে।

তোমার চেয়ে আমার যন্ত্রণা আরও বেশি ছিল। আমি তোমার অসহায় চিৎকার শুনেছি, বাঁচাতে পারিনি। সেই যন্ত্রণা আমাকে হাসপাতালের বেডেও স্থির থাকতে দেয়নি। তোমাকে একবার নিজ চোখে দেখতে চেয়েছি। হামযা আনাস বলল।

ডেসপিনা চোখ বুজে ছিল। হামযা আনাসের কথা শেষ হতেই চোখ। খুলল। ডেসপিনার অশ্রুধোয়া মুখ অনেকটাই রক্তিম হয়ে উঠেছে। তার ঠোঁটে আনন্দের সূক্ষ্ম কম্পন। বলল একটু সময় নিয়ে ধীরকণ্ঠে, আল হামদুলিল্লাহ। আমার সৌভাগ্য। হৃদয়বান তুমি, আবেগ একটু বেশি।

হামযা আনাসের বিমুগ্ধ দৃষ্টি ডেসপিনার দিকে। বলল, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী খ্রিস্টান নেতা ক্রিস কনস্টানটিনোসের মেয়ের মুখে যে সোজাসুজি আলহামদুলিল্লাহ! আগে তো শুনিনি?

হাসল ডেসপিনা। বলল, মৃত্যুর মুখ থেকে একবার বেঁচে এসেছি, জীবন নিয়ে ভরসা আর আগের মতো রাখতে পারছি না। কেন নিজেকে আর গোপন রাখব?

কবে থেকে নিজেকে গোপন রাখছ? বলল হামযা আনাস। তার ঠোঁটে হাসি।

হাসল ডেসপিনাও। বলল, মনে করো না, তোমাকে ভালোবেসে আমি ইসলামকে ভালোবেসেছি। ইসলামের প্রতি আমার আগ্রহ ছোটবেলা থেকেই ছিল।

ইন্টারেস্টিং! সে কেমন করে? বলল হামযা আনাস।

সত্যিই ইন্টারেস্টিং। আমাদের পূর্বপুরুষ যারা স্পেন থেকে ইতালিতে মাইগ্রেট করে, তাদের পারিবারিক প্রধান ছিলেন ক্রিশ্চিয়ান ক্রিস্টোফার। তিনি ছিলেন পেশায় ডাক্তার, নেশা ছিল সমাজ সেবা। তিনি বাপ-মা, পরিবার-পরিজন হারা একজন মরিস্কো মেয়েকে বিয়ে করেন। মরিস্কো এই স্ত্রীকে নিরাপদ করার জন্যেই আমাদের পূর্বপুরুষ ক্রিশ্চিয়ান ক্রিস্টোফার। ইতালিতে মাইগ্রেট করেন। এই…।

ডেসপিনার কথার মাঝখানে হামযা আনাস বলে উঠল, মরিস্কো কি ডেসপিনা?

তোমার এ প্রশ্ন করারই কথা। আমিও জানতাম না। বাবার কাছ থেকে জিজ্ঞাসা করে জেনেছি। ১৪৯২ সালে গ্রানাডার পতনের মাধ্যমে স্পেনে মুসলিম শাসনের অবসান ঘটে এবং খ্রিস্টান রাজত্বের পত্তন হয়। ইতিহাসের ছাত্র হিসাবে আমি জানি এই তথাকথিত খ্রিস্টান শাসন ছিল অত্যন্ত নিষ্ঠুর ও অমানবিক। সমস্ত স্পেন জুড়ে চলে গণহত্যা, লুট তরাজ ও অগ্নিসংযোগ। ইসলাম ধর্মত্যাগ ও খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করাই ছিল তখন বাঁচার একমাত্র উপায়। তাই বাঁচার জন্যে অনেক মুসলিম খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করে। খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করলেও খ্রিস্টান সমাজ এদেরকে খ্রিস্টান বলে গ্রহণ করেনি। মনে করেছে এরা ছদ্মবেশী মুসলমান। অন্যদিকে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেছে বলে মুসলিম সমাজ থেকে তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। না ঘরকা, না ঘাটকা এই হতভাগ্য মানুষরাই মরিস্কো নামে অবিহিত। এমন একজন মরিস্কো তরুণীকেই বিয়ে করেন আমার পূর্বপুরুষ ক্রিশ্চিয়ান ক্রিস্টোফার। তরুণীর নাম ছিল মরিয়ম। তিনি ছিলেন মালাগা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেলের ছাত্রী। একটা লাশের স্তূপ থেকে আমার পূর্বপুরুষ তাকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করে। বাসায় নিয়ে যায়। তারপরে সুস্থ করে তোলে। বিয়েও হয়ে যায় তাদের। মধ্যে। কিন্তু বিয়ের আগে আমাদের ইতালির নতুন জেনারেশনের আদি মা মরিয়ম যয়নব জাহরা বলেন, আমার পরিবার বাঁচার জন্যে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করলেও আমি খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করিনি। খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেও আমার পরিবারের সদস্যরা কেউই বাঁচেনি, কিন্তু ভাগ্যক্রমে আমি বেঁচে গেছি। হাজারো লাশের স্তূপ থেকে আমাকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে। তখন আমি আরো দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হলাম যে, আমি মুসলিম হয়েই বাঁচতে চাই। আমাদের সেই পূর্বপুরুষ ক্রিশ্চিয়ান ক্রিস্টোফার এটা মেনে নেন। তবে ক্রিস্টোফার অনুরোধ করেন, তার নামটা একটু পাল্টাতে হবে। মেনে নেন মরিয়ম জয়নব জাহরা। তার নতুন নাম হয়ে যায় মেরী জোনা জুলিয়া, আগের নামের অনেকটা প্রতিধ্বনির মতো। তবে সারাজীবন তিনি স্বাধীনভাবে নিজের ধর্ম ইসলাম পালন করেছেন। আমাদের ইতালীয় জেনারেশনের আদি পিতা ক্রিশ্চিয়ান ক্রিস্টোফার তার ধর্মকে সম্মান। করেছেন, তাকে সব রকম সহযোগিতা করেছেন। তার নিরাপত্তার জন্যে তিনি ইতালিতে মাইগ্রেটও করেছেন। এই কাহিনী আমাদের পারিবারিক ইতিহাসের অংশ। এ ইতিহাস পরিবারের সবাইকেই জানতে হয়। আরেকটা মজার ইতিহাস হলো, আমাদের পরিবারের সাতজন মেয়ে এ পর্যন্ত ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন। তাদেরকে সম্মানের চোখেই দেখা হতো এবং তারা ও তাদের পরিবার আমাদের বৃহত্তর পরিবারের সদস্য ছিলেন। আমি তাদের তালিকার ইসলাম গ্রহণকারী অষ্টম সদস্য। আমার নামের জোনা শব্দ টি আমার আদি মায়ের নামের অংশ। আমি গর্বিত সেজন্যে।

দীর্ঘ বক্তব্য দিয়ে থামল জোনা ডেসপিনা।

হামযা আনাস হাসিমুখে প্রথম সালাম দিল জোনা ডেসপিনাকে। বলল, তোমার নতুন পরিচয়কে স্বাগত ডেসপিনা। তোমাদের পরিবারকেও অভিনন্দন। তোমার পরিবারের এই কাহিনী আমার এত ভালো লেগেছে যে, আমি ঔপন্যাসিক হলে এই কাহিনী নিয়ে একটা উপন্যাস লিখতাম। অদ্ভুত এই কাহিনী ডেসপিনা। অবিরল অশ্রু, অন্তহীন আনন্দ, অতলান্ত মানবিকতার চূড়ান্ত প্রকাশ আছে এই কাহিনীর পরতে পরতে। জানি না, হয়তো এমন হাজারো কাহিনীর সেদিন সৃষ্টি হয়েছিল। চোখের আড়ালেই তার আবার মৃত্যুও ঘটেছে।

হামযা আনাসের কণ্ঠ আবেগে ভারি হয়ে উঠেছে। জোনা ডেসপিনা ধীরে ধীরে উঠে বসল।

হামযা আনাস একটু দ্বিধা করে, তারপর একটু এগিয়ে ডেসপিনার দুকাধ ধরে তাকে উঠে বসতে সাহায্য করতে চেয়েছিল। ডেসপিনা তাকে নিষেধ করে বলল, দেখ আমি মুসলিম। আমি যখন একাই উঠে বসতে পারব, তখন অহেতুক স্পর্শ আমাদের এড়িয়ে চলাই ভালো।

ধন্যবাদ ডেসপিনা। বলে হাম্য আনাস তার জায়গায় ফিরে এল।

তোমাকে অনেক ধন্যবাদ হামা। তুমি আমার আদি মায়ের হৃদয়ের অবরুদ্ধ কান্না শুনতে পেয়েছ। আমিও এই কান্না শুনতে পাই। উঠে বসেই বলল ডেসপিনা। তার কণ্ঠ কান্নায় ভেজা।

এস ডেসপিনা আমরা তার কান্না ভুলে তার আনন্দকে স্মরণ করি। তিনি কান্নার উপর আনন্দের সৌধ নির্মাণ করেছেন। সেই সৌধ তোমাদের পরিবার। বলল হামযা আনাস।

হ্যাঁ হামযা। আমি গর্বিত যে আমি সেই পরিবারের সদস্য। জোনা ভেসপিনা বলল।

তোমার এ কথা কি তোমার বাবা-মা জানেন? জিজ্ঞাসা হামযা আনাসের।

জানেন। ডেসপিনা বলল।

তাদের প্রতিক্রিয়া কি? জিজ্ঞাসা করল হামযা আনাস।

আমাদের পরিবারে এটা সাধারণ ব্যাপার। বলেছি না যে, এর আগে আমাদের পরিবারের আরও সাতজন মেয়ে ইসলাম গ্রহণ করেছেন। তবে বাবা বলেছেন, এ নিয়ে কোন হৈ চৈ করো না। ধর্ম গ্রহণ-বর্জন এটা ব্যক্তিগত ব্যাপার। রত্ন দ্বীপ একে মানবাধিকার হিসাবে গ্রহণ করেছে। একটা মজার ব্যাপার ডেসপিনা, রত্ন দ্বীপে যা ধর্মান্তর ঘটেছে, তা সবই সলামের পক্ষে। এটা স্বাভাবিক কারণেই হচ্ছে, কোনো চাপ-প্রলোভন এখানে নেই। তবু বিষয়টা নিয়ে হৈ চৈ না করাই ভালো এবং মুসলিমরাও তা করছে না। বাবার এ কথা ঠিক। আমি এ কারণেই বিষয়টা কাউকেই জানাইনি। তোমাকেও নয়। আজ বিশেষ এক মুহূর্তে বলেই ফেললাম। বলল জোনা ডেসপি।

ধন্যবাদ ডেসপিনা। খুব খুশি হয়েছি আমি। হামযা আনাস বলল।

কেন, আগে খুশি ছিলে না? বলল ডেসপিনা।

ছিলাম।তবে এ খুশির স্বাদ আলাদা। হামযা আনাস বলল।

মিষ্টি হাসল জোনা ডেসপিনা। বলল, আমিও খুব খুশি হয়েছি। হতে পারে এটা তোমার ঐ নতুন স্বাদের ফলেই।

ধন্যবাদ ডেসপিনা! কিন্তু আর বসো না, শুয়ে পড়। বসলে মাথায় চাপ বাড়ে। হামযা আনাস বলল।

শুয়ে পড়ছি এখনি। জান, নামটাও আমি বদলে ফেলেছি। আমার আদি মার নামের শেষ দুই অংশ, যয়নাব জাহরা, গ্রহণ করেছি। আমি এখন যয়নাব জাহিরা। বলল ডেসপিনা। তার চোখে-মুখে উজ্জ্বল আনন্দ।

ওয়েলকাম জাহরা। খুব প্রিয় নাম এটা! জাহরা মানে জান- রক্তিম। কিন্তু তুমি তো সাদা! হামযা আনাস বলল একটু হেসে।

এবার সাদার সাথে লাল মেশীলাম। বলল ডেসপিনা। বলে একটা দম নিয়েই বলল, তুমি অনেকক্ষণ এভাবে বসে আছ। আর নয়, তুমি যাও। আমার মাথায় যে চাপ পড়ার কথা বলেছিলে, তার চেয়ে

অনেক বেশি চাপ তোমার আহত কাঁধে পড়ছে। যাও, উঠ।

উঠছি। চলে যেতে বলার জন্যে ধন্যবাদ। বলল হামযা আনাস। তার মুখে হাসি!

এটা চলে যেতে বলা নয়। হাসপাতালের বেড় থেকে উঠে এসে যে অন্যায় কবেছ, তার প্রতিবিধান করতে বলেছি। জোনা ডেসপিনা বলল।

তার মুখে কৃত্রিম গাম্ভীর্য।

কিছু না এলে এত কথা হতো? বলল হামযা আনাস।

তাও ঠিক। ধন্যবাদ। এবার এসো। মিষ্টি হাসির সাথে বলল জোন ডেসপিনা।

ডেসপিনার কথা শেষ হতেই কক্ষে ঢুকল মেট্রন। এসে দাঁড়াল ডেসপিনার সামনে। বলল, ম্যাডাম, জাহরা ম্যাডামকে আপনি আপনার কক্ষে নিয়ে আসতে বলেছেন?

হ্যাঁ। খুব একাকী লাগছে। জাহরাকে এখানে আনলে দুজনে গল্প করতে পারতাম। আমার কক্ষ বেশ বড়, কোনোই অসুবিধা হবে না। বলল জোনা ডেসপিনা।

আপাতত উনি আসছেন। তার রুমে আবার ফিরতেও পারবেন। এই ব্যবস্থাই তাহলে করছি ম্যাডাম। বলে মেট্রন চলে গেল।

আসি জোনা ডেসপিনা। জাহরা এলে ভালোই হবে। ভালো সময় কাটবে তোমাদের। ঠিকই সিদ্ধান্ত নিয়েছ। কিন্তু জাহরা হাসপাতালের বেড়ে কেন? বলল হামযা আনাস।

ও, তুমি জান না। তুমি গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে গেলে জাহরা ছুটে এসেছিল আমাকে বাঁচাতে। শয়তানরা তারও পায়ে গুলি করে এবং আমার সাথে তাকেও গাড়িতে তুলে নেয়। সেও আমার সাথে কিডন্যাপড হয়। জাহরাকে তুমি চেন? জোনা ডেসপিনা বলল।

ঠিক চিনাচিনি নেই। আসলে ও বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন্ বিভাগের ছাত্রী জানি না। সে আক্রমণ ও আত্মরক্ষা-কৌশল-এর একটা মিলিটারি কোর্স করে বাড়তি একটা বিষয় হিসেবে। ক্লাসে তাকে দেখেছি, নামও শুনেছি। সে আমাকে চেনে বলে মনে হয় না। বলল হামযা আনাস।

জোনা ডেসপিনার কক্ষের দরজা আবার খুলে গেল, একটা বেড় ঠেলে নিয়ে নার্সরা প্রবেশ করল ঘরে। বেডে শুয়ে আছে যাইনেব জাহরা।

গুড ইভেনিং জাহরা। বলল জোনা ডেসপিনা জাহরাকে লক্ষ্য করে।

জাহরা চোখ বন্ধ করে শুয়েছিল। ডেসপিনার কষ্ট পেয়ে চোখ খুলে মাথা ঘুরিয়ে তাকাল জোনা ডেসপিনার দিকে। ডেসপিনাকে দেখেই মুখে হাসি টেনে বলল, গুড ইভেনিং ডেসপিনা। কেমন আছ তুমি?

ভালো জাহরা। তুমি কেমন আছ? বলল জোনা ডেসপিনা।

জাহরার বেড ডেসপিনার বেডের পাশাপাশি সেট করা হয়েছে।

আমি ভালো আছি ডেসপিনা। আল্লাহর রহমতে গুলিটা গোড়ালির ৪ ইঞ্চি উপরের মাস্ল ভেদ করে গেছে। হাড় স্পর্শ করেনি। গুলিটাও বের হয়ে গেছে। সুতরাং বেঁচে গেছি আমি বড় ধরনের কাটাকুটি থেকে। তোমার কি অবস্থা? শুনলাম, তোমার আঘাতের যে ধরন, তাতে আঘাতটা যদি আর দেড় ইঞ্চি কানের দিকে এগিয়ে গিয়ে লাগত, তাহলে তোমার বড় ক্ষতি হয়ে যেত। যাক, আল্লাহ বাঁচিয়েছেন। জাহরা বলল।

ঠিক শুনেছ জাহরা। অল্পের জন্যে বড় ক্ষতি থেকে বেঁচে গেছি। মনে করেছিলাম দুএকদিনের মধ্যে ছাড়া পাব। কিন্তু ডাক্তার বলছেন, তিন দিন দেখার পর তারা বলবেন কখন ছাড়বেন। বুঝছি না এমন কি হয়েছে। বলল জোনা ডেসপিনা।

মাথার আঘাত। কোনো তাড়াহুড়া করা যাবে না ডেসপিনা। ডাক্তার যা বলবেন, তা মানতে হবে। জাহরা বলল।

হঠাৎ চুপ হয়ে গেল ডেসপিনা।

তার হাতের কব্জির দিকে তার চোখ দুটি নিবদ্ধ।

তার হাতের কব্জিতে একটা মেডিকেল স্ট্রিপ পেস্ট করা দেখা যাচ্ছে। ডেসপিনা স্ট্রিপটার দিকেই তাকিয়েছিল।

বিস্মিত হয়েছিল যাইনেব জাহরা। বলল, কি হলো ডেসপিনা? হঠাৎ চুপ হয়ে গেলে যে? কি দেখছ তুমি?

মুখে এক টুকরো হাসি ফুটে উঠল ডেসপিনার। পরক্ষণেই গম্ভীর হয়ে উঠল তার মুখ। বলল, আমার কব্জির এই মেডিকেল স্ট্রিপটি দেখে হঠাৎ আমার মনে পড়ল আমাদের যিনি বাঁচিয়েছিলেন, উদ্ধার করেছিলেন সেই দেবদূতের কথা। আমার আহত কব্জিতে তিনি এই মেডিকেটেড স্ট্রিপ লাগিয়ে দিয়েছিলেন। ধ্বস্তাধস্তির সময় আমার ঘড়ির চেন লেগেই কব্জির ঐ জায়গাটা গভীরভাবে কেটে গিয়েছিল। খুব ব্লিডিং হচ্ছিল। তাড়াহুড়ার মধ্যেই ঐ স্ট্রিপটি লাগিয়ে দিয়েছিলেন সেই দেবদূত।

হ্যাঁ, আমি দেখেছি ডেসপিনা। কিন্তু ওটা তো পুরনো কথা। এখন তোমার কি হলো ওটা নিয়ে? জাহরা বলল।

ডাক্তারের একটা কথা মনে পড়ায় নতুনভাবে স্ট্রিপটাকে দেখছিলাম। বলল ডেসপিনা।

ডাক্তারের কি কথা? জাহরা বলল। তার চোখে বিস্ময়।

আমার মাথাটা ব্যান্ডেজের পর বাম হাতটা এগিয়ে দিয়েছিলাম, ডাক্তারের দিকে। তিনি আমার কব্জির দিকে একবার তাকিয়েই বললেন, ___ ম্যাজিক স্ট্রিপটা কোত্থেকে লাগালেন, কোথায় পেলেন?

আমি বললাম, আমাকে যিনি উদ্ধার করেছিলেন, তিনি এটা পয়ে দিয়েছিলেন।

এই ম্যাজিক স্ট্রিপ নতুন বের হয়েছে আমেরিকায়। মার্কিন সেনাবাহিনী, এটা ব্যবহার করছে এখন। আমেরিকার বাইরে এটা এখনও যায়নি। খুব মজার স্ট্রিপ এটা। এখানে ওষুধ, ব্যান্ডেজ কোনো কিছুরই দরকার নেই। দেখবেন ২৪ ঘন্টার মধ্যে স্থানটা নিরাময় করে ট্রিপটা আপনাতেই উঠে যাবে। বলেছিলেন ডাক্তার। আমি ডাক্তারের সে কথাটাই ভাবছিলাম। কে এই লোকটি? লোকটি কি আমেরিকান ট্যুরিস্ট? লোকটি সম্পর্কে তুমি কিছু জান জাহরা? বলল ডেসপিনা।

আমিও লোকটির কথা সর্বক্ষণ ভাবছি। কিন্তু লোকটি সম্পর্কে তো এখনো কিছু জানা হয়নি। এখনও আমার মনে হচ্ছে যেন ঘটনাটা ফিলোর একটা অংশ ছিল। এমন অবিশ্বাস্য ঘটনা বাস্তবে চোখের সামনে দেখব, তা কখনও ভাবিনি। জাহরা বলল।

ঠিক বলেছ জাহরা। সে সময়ের কথা মনে হলে বুক আমার শিউরে ওঠে ভয়ে। লোকটির গাড়ি আমাদের বহনকারী কিডন্যাপারদের গাড়ি অতিক্রম করে চলমান আমাদের গাড়ির গতি রোধ করে সামনে দাঁড়াল। শান্ত কণ্ঠের একটা নির্দেশ ছুটে এল, গাড়ির মধ্যে যে বা যারা কাঁদছে, তাদের ছেড়ে দাও। উত্তর না দিয়ে, আদেশ পালন না করে কিডন্যাপাররা লোকটির গাড়ি লক্ষ্যে কয়েকটা গুলি করে লোকটির গাড়ির পাশ কাটিয়ে চলতে চেষ্টা করল। লোকটির গাড়ির দিক থেকেও কয়েকটি গুলি এল। কিডন্যাপারদের সামনের গাড়ির টায়ার প্রচণ্ড শব্দে ফেটে গেল। সংগে সংগে দুটি গাড়ি থেকে কিডন্যাপাররা বেরিয়ে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ল লোকটির ওপর। লোকটি আগেই বেরিয়ে এসেছিল। অসম্ভব এক অসম লড়াই শুরু হলো। তোমার নিশ্চয় মনে আছে, আমাদের তখন শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা। ওরা গাড়ি লক করে গেছে। বের হয়ে পালাবার কোনো উপায় আমাদের নেই। হঠাৎ গোলাগুলি থেমে গেল। রিভলবার হাতে লোকটি এসে গুলি করে আমাদের গাড়ির দরজা খুলে ফেলল। ভেতরে উঁকি দিয়ে আমাদের দেখে শান্ত কণ্ঠে বলল, আপনারা ঠিক আছেন?

আমি ভাবছিলাম লোকটি সম্পর্কে। তুমিই তখন উত্তরে বলেছিলে আমরা ভালো আছি। আপনি কি সামনের লোক? কিডন্যাপাররা কোথায়?

সে তখন পকেট থেকে মোবাইল বের করে একটা কল করে একজনকে বলল, সাতজন কিডন্যাপার সবাই মারা গেছে। তার শান্ত কণ্ঠ, শান্ত চেহারা, তাকে দেখে মনে হচ্ছিল যেন কিছুই ঘটেনি।

আমি কিছু বললাম না। তুমিও কিছু বললে না। লোকটি টেলিফোনে বলল, স্টেট সিকিউরিটি হেডকোয়ার্টার?

ওপারের কথা শুনে লোকটি বলল, ফাস্ট সার্কেল হাইওয়ে এবং এয়ারপোর্ট রোডের লিংকে সাতজন কিডন্যাপার মারা পড়েছে এবং কিডন্যাপ হওয়া দুজন মেয়ে উদ্ধার হয়েছে। আপনারা আসুন।

ওপারের কথা আবার সে শুনল এবং বলল, আমার পরিচয় জানার দরকার নেই। আমি অপেক্ষা করাছি। আপনারা আসুন।

মোবাইল অফ করে আমাদের দিকে তাকিয়েই সে বলল, আপনারা দুজন গাড়িতে একটু বসতে পারবেন? আমি যাব লাশগুলো দেখতে। অসুবিধা মনে করলে আমার সাথে আসতেও পারেন। তোমার মনে আছে। জাহরা কি শান্ত ও নিরুদ্বিগ্ন কণ্ঠে কথাগুলো বলেছিল লোকটি। এত বড় একটা ঘটনা ঘটল, সাতজন কিডন্যাপার হত্যার ঘটনা, কোনো কিছুরই কোনো উত্তাপ তার মধ্যে নেই। আমাদের দিকে চেয়ে দেখছে না, যেন আমরা কোনো দর্শনীয় বস্তুই নই।

আমরা তার পেছনে পেছনে গেলাম। সে এক এক করে লাশগুলোকে উল্টে-পাল্টে দেখল। একজন মেজরের নেতৃত্বে সিকিউরিটির লোকরা এল। তার সাথে পরিচয় করে লোকটি তাকে বলল, আপনারা লাশগুলো ও দুটি গাড়ির দায়িত্ব নিন। আমার ও কিডন্যপারদের একটা- এই দুটি গাড়িই অকেজো হয়ে পড়েছে। আমি কিডন্যাপারদের দ্বিতীয় গাড়িতে করে আহত মেয়েদের হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছি।

আপনার পরিচয় ও স্টেটমেন্ট কিছুই তো আমরা পেলাম না। বলল সিকিউরিটির মেজর লোকটি।

লোকটি সিকিউরিটিকে একটা কার্ড দেখাল। সংগে সংগে সিকিউরিটির মেজর লোকটিকে একটা স্যালুট দিয়ে বলল, স্যরি স্যার, আপনি যান।

লোকটি দ্বিতীয় গাড়িতে উঠে আমাদেরকে বসতে বলল। শান্ত কণ্ঠের একটা নির্দেশ। আমরা কোনো প্রশ্ন না তুলে গিয়ে বসলাম। লোকটি তার গাড়ি থেকে একটা ব্যাগ নিয়ে ফিরে এলো মিনিটখানেকের মধ্যেই। আমাদের সামনে এলো ব্যাগটা নিয়ে। আমাকে বলল, আমার চোখে চোখ

রেখেই, আপনার কপালটা থেতলে গেছে। আঘাত মারাত্মক, কিন্তু রক্ত খুব বেশি আর আসছে না। ডান হাতটা এদিকে দিন। কব্জি থেকে এখনও বেশ রক্ত ঝরছে। শান্ত, নরম গলার একটা আদেশ। আপন কারো আদেশের মতো। আমি তা পালন করলাম।

তারপর তিনি তোমার কাছে গেলেন। তারপর কি অসাধারণ ব্যবহার করলেন, তুমি তার সাক্ষি। এত কথা আমি বললাম শুধু একটা কথা বলার জন্যে যে, লোকটি ভয়ঙ্কর নয়, স্বচ্ছ-সুন্দর সাধারণ একটা মানুষ, কিন্তু তার কথা ও কাজ বিস্ময়কর! কোনো প্রশ্ন না তুলেই তার আদেশ আমরা পালন করেছি। সিকিউরিটির লোকরাও তার আদেশ পালন করেছে। কিডন্যাপাররা।

তার আদেশ পালন না করে সাতজনই জীবন দিয়েছে। কে এই লোক? ভয় নেই, উদ্বেগ নেই, সুন্দরী মহিলাদের কাছে নিজের বাহাদুরী জাহির করার কোনো চেষ্টা নেই, দায়িত্ব পালনে কোনো এদিক সেদিক নেই এবং একজন সৈনিক বা প্রফেশনাল গোয়েন্দার মতো দৃষ্টি। কে এই লোক? দীর্ঘ একটা বক্তব্য দিয়ে থামল জোনা ডেসপিনা।

ঠিক বলেছ ডেসপিনা। সেদিন থেকেই আমার মাথায় এ প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে যে, লোকটি আসলে কে? ম্যাজিকের মতো সাতজন সন্ত্রাসীকে একাই মেরে ফেলল এত দ্রুত! লোকটি রত্ন দ্বীপে একদমই নতুন, কোনো হাসপাতাল, ক্লিনিকই সে চিনত না। দেখ, একবারও সে আমাদের নাম পরিচয় জিজ্ঞাসা করেনি। হাসপাতালে গিয়েও যখন সবাইকে আমাদের নিয়ে ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠতে দেখল, তুমি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মেয়ে জানাজানি হয়ে গেল, তখনও তার চোখে-মুখে কোনো ভাবান্তর দেখিনি, যেন এটা কোনো ব্যাপারই নয়। আমাদেরকে অপারেশন থিয়েটারে নেয়ার আগে দেখ তুমি ও আমি তাকে ধন্যবাদ জানালাম। তিনি প্রথমবারের মতো একটু হেসে বলল, স্রষ্টাকে কৃতজ্ঞতা জানান। তিনি সাহায্য করেছেন। তারপরেই উপস্থিত সিকিউরিটির লোকদের শান্ত, নরম কণ্ঠে নির্দেশ দিলেন সাতজন সন্ত্রাসী মারা গেলেও প্রতিশোধের জন্যে ওদের সাথীরা সুযোগের সন্ধানে থাকতে পারে। সুতরাং হাসপাতালে উপযুক্ত সিকিউরিটি রাখবেন। এখানেও তার এই অযাচিত নির্দেশ সিকিউরিটিরা পা ঠুকে, স্যালুট দিয়ে সবকিছু অ্যাকসেপ্ট করে নিয়েছে। সত্যিই অস্বাভাবিক, অসাধারণ এই মানুষ। কে এই মানুষ রত্ন দ্বীপে? জাহরা বলল।

ডাক্তাররাও জিজ্ঞাসা করেছিলেন লোকটি সম্পর্কে। তারাও কিছু জানেন না। বলল ডেসপিনা।

একটু থেমেই ডেসপিনা আবার বলল, দেখি, বাবাকে জিজ্ঞাসা করতে হবে। S ডেসপিনার টেলিফোন বেজে উঠল। মোবাইলের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ডেসপিনা বলে উঠল, জাহরা বাবার টেলিফোন। এখনই জানতে পারব সব। বলে মোবাইলের লাউড স্পীকার অন করে দিল ডেসপিনা।

হ্যালো বাবা, বল কেমন আছ? ডেসপিনা কল রিসিভ করেই বলল।

কেমন আছ সেটা আগে বল মা। সবাই আমরা আতংকগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলাম। বল মা, এখন তোমার শরীর কেমন? ওপার থেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ত্রিস কনস্টানটিনোস বলল।

ভালো বাবা। মাথাটা একটু ভারি। মাথা তুলতে কষ্ট হচ্ছে। শুয়ে থাকতে কোনো সমস্যা নেই।

বাম কব্জির অবস্থাও ভালো বাবা। ডেসপিনা বলল।

আরেকটা মেয়ে আহত হয়েছিল, তার কি অবস্থা? বলল ওপার থেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

ওর নাম জাহরা বাবা। আমার বন্ধু। ওর হাঁটুর নিচের মাসলে গুলি লেগেছে। সে এখন ভালো আছে বাবা। বলল ডেসপিনা।

মন্ত্রীসভার বৈঠক শেষ হলেই আমি আসব। শুনলাম, তোমার মা ও অন্যরা এদিক হয়ে যাওয়ার সময় আমাকে সাথে করে নিয়ে যাবে।

মুহূর্তের জন্যে একটু থেমেই আবার বলল, শোন মা, একটা কথা বলছি। তোমাদের যিনি উদ্ধার করেছেন সন্ত্রাসীর হাত থেকে, তিনি বেসরকারিভাবে এই ঘটনাসহ আগের ঘটনাগুলোরও তদন্ত করবেন। প্রেসিডেন্ট ও মন্ত্রীসভা তাকে এ দায়িত্ব দিয়েছে। তোমাদেরকে কিছু কথা জিজ্ঞাসা করবেন তিনি। তিনি যা জিজ্ঞাসা করবেন, যা জান বলবে। তার কোনো অসম্মান যেন না হয় দেখো। আমাদের গোয়েন্দা প্রধান আবু তাসফিন তাকে নিয়ে যাবেন।

অবশ্যই বাবা, আমরা তাকে সহযোগিতা করব। আমরা তার প্রতি কৃতজ্ঞ। কিন্তু একটা জিজ্ঞাসা বাবা, তিনি কে? বলল ডেসপিনা।

মা, উনি খুব বড় মানুষ! রত্ন দ্বীপের সৌভাগ্য যে, তাকে এই সময়ে আমরা রত্ন দ্বীপে পেয়েছি। আমেরিকা রাশিয়ার মতো দেশও তার সাহায্য পেলে ধন্য হয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট, রাশিয়ার ম্রাজ্ঞীর মতো ব্যক্তিত্বরাও তাকে সম্মান করেন। ওর নাম আহমদ মুসা মা। তুমি চিনবে না। তিনি একজন মিরাকল মা। এখন রাখি মা। তোমার মাকে নিয়ে আমি এখনই আসছি।

ও.কে বাবা। এসো। বলল ডেসপিনা।

ও.কে। আসছি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলল।

ওপার থেকে কল অফ হয়ে গেল।

ডেসপিনাও কল অফ করে তাকাল জাহরার দিকে। জাহরা কিছু বলার জন্যে উসখুস করছে। ডেসপিনা বলল, বল জাহরা।

আমি একজন আহমদ মুসা সম্পর্কে কিছু জানি ডেসপিনা। জাহরা বলল।

জান? কোথায় বাড়ি? কি করেন? বলল ডেসপিনা।

অতটা জানি না। তার ব্যক্তিজীবন সম্পর্কে প্রচার খুব কমই হয়। ইন্টারনেট থেকে তার অ্যাকশন অ্যাকটিভিটি সম্পর্কে কিছু জেনেছি, আরও কিছু জেনেছি মদিনায় গিয়ে। মানুষের সংকট নিয়ে তার কাজ। এই সংকট সমাধানে তার পদধূলি পড়েছে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে, বিভিন্ন দেশে। তার সম্পর্কে বলা হয়, তিনি একই সাথে রবিনহুড, হাতেমতাই, জেমসবন্ড, মহান মুসলিম সংস্কারক ইমাম ইবনে তাইমিয়া ও জামালউদ্দিন আফগানির চরিত্র, চিন্তা ও কাজের অপূর্ব সমন্বয়। তার সম্পর্কিত ওয়েব সাইটগুলোতে গেলে তুমি বিস্তারিত অনেক কিছু জানতে পারবে।

কিন্তু সংবাদপত্রে এসব আসে না কেন? বলল ডেসপিনা।

অনেক সংকট অভ্যন্তরীণ ও সেনসেটিভ বলে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো তা প্রকাশ করে না। যেগুলো প্রকাশ হয়, প্রকাশ হতে পারে, সেখানে আহমদ মুসার শর্ত থাকে তার নাম, তার সংশ্লিষ্টতা তিনি প্রকাশ করতে দেবেন না। তিনি কাজ করেন নাম কিংবা কোনো লাভের জন্যে নয়। তার কাজ সংশ্লিষ্ট সেই দেশের নিরাপত্তাবাহিনীর কাজ হিসাবে দেখানো হয়। জাহরা বলল।

তার কে আছে বলতে পার জাহরা? জিজ্ঞাসা ডেসপিনার।

স্যরি ডেসপিনা, তার ব্যক্তিজীবন সম্পর্কে আমি কোথাও কিছু পাইনি। জাহরা বলল।

আজই যা আমি দেখলাম। অস্ত্রধারী সাতজন সন্ত্রাসীর বিরুদ্ধে একা ঝাঁপিয়ে পড়লেন। পরিবার-পরিজন থাকলে, কোনো পিছুটান থাকলে তার পক্ষে এভাবে মৃত্যুর মুখে ঝাঁপিয়ে পড়া কঠিন। বলল ডেসপিনা।

ডেসপিনার কথা শেষ হবার আগেই একজন ডাক্তার এবং একজন সিকিউরিটির লোক প্রবেশ করল। সিকিউরিটির লোকটি বলল ডেসপিনাকে লক্ষ্য করে, ম্যাডাম, প্রেসিডেন্টের অনুমতি নিয়ে একজন লোক এসেছেন আপনাদের সাথে কথা বলতে। তিনিই আপনাদের হাসপাতালে নিয়ে এসেছিলেন। তিনি কি এখন ভেতরে আসতে পারেন?

চোখ-মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল ডেসপিনা ও জাহরার। ডেসপিনা বলল, তাকে নিয়ে আসুন। আমরা জানি তিনি আসবেন।

স্যালুট দিয়ে সিকিউরিটির লোকটি চলে গেল। ডাক্তার রুমের অ্যাটেনড্যান্টকে ঘরটা একটু ঠিকঠাক করা এবং সোফাটাকে বেডের একটু কাছে নিয়ে আসার নির্দেশ দিল।

Top