৫৮. রত্ন দ্বীপ

চ্যাপ্টার

আহমদ মুসাকে বসিয়ে দিয়ে সিকিউরিটির লোকটা কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেল। তার সাথে ডাক্তারও।

বেড থেকে উঠে বসে আহমদ মুসাকে স্বাগত জানাল ডেসপিনা ও জাহরা। অসুস্থতার কথা জেনেও তাদের ডিস্টার্ব করতে আসার জন্যে ক্ষমা চেয়ে নিয়েছে আহমদ মুসা।

কক্ষটি বেশ বড়।

কক্ষের দরজা পূর্ব দিকে। ঘরের মাঝখানে ডেসপিনার বেড, উত্তর দক্ষিণে লম্বা। তার মাথা দক্ষিণ দিকে। তার প্রায় পাশেই জাহরার বেড। তার বেড়ও উত্তর-দক্ষিণে লম্বা, মাথা দক্ষিণে। তাদের পুব পাশে বেডের উত্তর প্রান্তের সমান্তরালে আহমদ মুসার বসার সোফা, দক্ষিণমুখী। ডেসপিনা ও জাহরার বেডের মাথার দিক উঁচু করা হয়েছে, যাতে তারা হেলান দিয়ে বসতে পারে কথা বলার জন্যে।

আহমদ মুসা সোফায় বসে আছে। ডেসপিনা ও জাহরা হেলান দিয়ে বসে আছে বেড়ে। তারা মুখোমুখি বসেছে।

আমি আগেই বলেছি কয়েকটা বিষয় তোমাদের কাছ থেকে আমার জানা দরকার। বলল আহমদ মুসা ডেসপিনা ও জাহরাকে।

আমরা আপনার পরিচয় জেনেছি জনাব আহমদ মুসা। আমরা গর্বিত আপনার দেখা পেয়ে। আপনার দেখা পাওয়া, আপনার সাথে কথা বলতে পারা সৌভাগ্যের ব্যাপার। আবারও আমরা কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি আপনাকে। আপনি আমাদের জীবন বাঁচিয়েছেন, সম্মান বাঁচিয়েছেন। বলুন স্যার, কি জানতে চান? ডেসপিনা বলল।

দেখ ডেসপিনা, জাহরা সামনাসামনি কোনো মানুষের প্রশংসা করা ঠিক নয়। এতে যে মানুষের প্রশংসা করা হয়, তার দুই ধরনের ক্ষতি হয়। এক, সে প্রশংসা কামনা করতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে, অবশেষে তার কাজের সে বিনিময়ও কামনা করতে শেখে। মানুষের জন্যে নিঃস্বার্থভাবে কাজ করার চেতনা তার মধ্য থেকে ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়। দুই. প্রশংসা লাভ মানুষের। মনে অহংকারের অনুভূতি সৃষ্টি করে। শয়তান এই সুযোগ গ্রহণ করে। অহংকার তার আরও বৃদ্ধি পায়। স্রষ্টার নেয়ামত অস্বীকারের প্রবণতা তার মধ্যে বাড়তে থাকে। এভাবে তাঁর নৈতিক জীবন ধ্বংস হয়ে যায়। বলল আহমদ মুসা নরম কণ্ঠে।

চোখ দুটি কিঞ্চিত নিচু রেখে কথা বলছিল আহমদ মুসা। আর ডেসপিনা ও জাহরা দুজন পলকহীন চোখে তাকিয়েছিল আহমদ মুসার দিকে। তার চোখে-মুখে বিস্ময়-বিমুগ্ধতা।

স্যার, আপনার কোনো যুক্তি অস্বীকার করার সাধ্য আমাদের নেই। তবে, একটা কথা স্যার, প্রশংসা আসলে কৃতজ্ঞতার বহিপ্রকাশ। এটা তো একজন উপকারীর প্রাপ্য। ডেসপিনা বলল।

প্রাপ্য হিসেবে ধন্যবাদই যথেষ্ট হতে পারে। আমাকে রক্ষা করেছেন, আমার প্রাণ বাঁচিয়েছেন- এ ধরনের বিবরণের কোনো প্রয়োজন পড়ে না। জীবন বাঁচাতে পারেন শুধু মাত্র আল্লাহ। জীবন-মৃত্যু একমাত্র তাঁরই হাতে। বলল আহমদ মুসা।

স্যরি স্যার, একটা কথা। যে সূক্ষ্ম মানবতা বোধ, যে ধরনের স্রষ্টার উপর নির্ভরতা আপনার, তাতে তো মারামারির মধ্যে আপনার থাকার কথা। নয়? বলল ডেসপিনা।

ওটা মারামারি নয়। দুটি পক্ষের মধ্যে অন্যায় স্বার্থের দ্বন্দ্ব যেখানে, সেটা মারামারি। কিন্তু আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ, কল্যাণের জন্য যুদ্ধ বা সংগ্রাম, এটা মারামারি নয়। এই নিঃস্বার্থ কল্যাণের জন্য যুদ্ধকে মানুষের ধর্ম ইসলামের পরিভাষায় জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ বলা হয়। আজ কিডন্যাপারদের বিরুদ্ধে আমি যে প্রতিরোধ করেছি, সেটা আমার জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ। কারণ এই প্রতিরোধ আমি নিঃস্বার্থভাবে করেছি, আল্লাহকে খুশি করার জন্যে করেছি, মানবতার জন্যে করেছি। বলল আহমদ মুসা।

কিন্তু স্যার, মুসলমানদের জিহাদ নিয়ে তো নানা কথা আছে। জিহাদ ও সন্ত্রাসকে এক করে দেখছেন অনেকেই। ডেসপিনা বলল।

এটা অজ্ঞতার ফল। কোথাও কোথাও বিদ্বেষ থেকেও এটা করা হচ্ছে। যারা এক সময় ধর্মকে আফিম বলত, তাদের মতো লোকরাই এখন জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহকে সন্ত্রাস বলছে। এরা উদ্দেশ্যমূলকভাবেই ইতিহাসের মুসলিম রাজা বা শাসকদের রাজ্য ও রাজকোষ বৃদ্ধির যুদ্ধকে জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ বলে চালিয়ে দিচ্ছে। অথচ এ সব ব্যক্তি বা গ্রুপ স্বার্থের দ্বন্দ্বে যুদ্ধ করেছে বা করছে, এসব জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ নয়।

ধন্যবাদ স্যার। এসব মূল্যবান কথা শুনে আমরা উপকৃত হলাম, কিন্তু আপনার বেশ কিছু সময় নষ্ট হলো। এখন আপনার নির্দেশ বলুন স্যার। ডেসপিনাই বলল।

নির্দেশ? আমি কি করে তোমাদের নির্দেশ দিতে পারি? আমার অনুরোধ আছে তোমাদের কাছে। বলল আহমদ মুসা।

পারেন স্যার। আমরা হয়তো আপনার বোন হতে পারবো না, কারণ আপনার বোন হবার মতো যোগ্যতা আমাদের নেই। কিন্তু আমরা আপনার ছাত্র তো হতে পারি। ডেসপিনা বলল। তার কণ্ঠ আবেগ-জড়ানো।

হাসল আহমদ মুসা। বলল, ইসলাম ধর্ম অনুসারে সবাই আমরা ভাই বোন। এখানে কোনো নতুন যোগ্যতার দরকার নেই। বলল আহমদ মুসা। * তবু মুসলিম হওয়া তো শর্ত। ডেসপিনা বলল।

এটা যদি মেনেও নিতে হয়, তাহলে বলব, তুমি তো মুসলিম। বলল, আহমদ মুসা।

বিস্ময় ছড়িয়ে পড়ল ডেসপিনার চোখে-মুখে। বলল, জি এ কথা কেন বলছেন? আমি মুসলিম কেউ কি তা আপনাকে বলেছে?

তুমি বলেছ। বলল আহমদ মুসা।

আমি বলেছি? আপনাকে? ডেসপিনা বলল। তার চোখে-মুখে জমাট বিস্ময়।

সত্যিই তোমার কাছ থেকেই জেনেছি। কিডন্যাপারদের গাড়িতে জাহরা যখন আল্লাহকে ডাকছিল, তখন তুমিও আল্লাহকে স্মরণ করেছিলে। গুলি করে লক ভেঙে যখন আমি তোমাদের কিডন্যাপারদের গাড়ি থেকে নামাচ্ছিলাম, তখন গাড়ির মেঝে থেকে কয়েক পাতার একটা পকেট বুক তুলে নিয়ে তাতে চুমু খেয়ে পকেটে রেখে দিয়েছিলে। পকেট বইটার নাম ছিল গাইডেন্স টু ইবাদাহ। তোমার ধর্মীয় পরিচয়ের জন্যে এ দুটি ঘটনাই আমার জন্যে যথেষ্ট ছিল। বলল আহমদ মুসা।

ধন্যবাদ স্যার। এত সূক্ষ্ম দৃষ্টি আপনার? প্রাণান্তকর উত্তেজনার মুহূর্তে এমন সুস্থ ও সূক্ষ্ম দৃষ্টি কি করে সম্ভব স্যার। ডেসপিনা বলল।

সম্ভব যদি তুমি উত্তপ্ত ও উত্তেজনাকর মুহূর্তে নিজেকে ঠাণ্ডা রাখতে পার, স্থির চিত্ত হতে পার। বলল আহমদ মুসা।

সমস্যা এটাই তো স্যার। আগুনের মতো উত্তপ্ত মুহূর্তে ঠাণ্ডা থাকা কি করে সম্ভব! স্থির চিত্ত হবো কি করে? বলল ডেসপিনা।

ভয় দূর করলেই ঠাণ্ডা থাকা, স্থিরচিত্ত হওয়া যাবে। ভয় দূর করার জন্যে এটা বিশ্বাস করতে হবে যে, জীবন-মৃত্যুর মালিক একমাত্র আল্লাহ। কোনো মানুষ যেমন জীবন দিতে পারে না, তেমনি মৃত্যুও আনতে পারে না, যদি মহান আল্লাহ তা না চান। আর যদি আল্লাহ চান, মৃত্যুর সময় যদি এসেই যায়, তাহলে তা রোধ করার ক্ষমতা পৃথিবীর কারো নেই। সুতরাং কাউকে, কোনো কিছুকে ভয় করার কোনো কারণ নেই। সব ব্যাপারে আল্লাহর উপর নির্ভর করলেই ভয়ের-ভার থেকে মুক্ত হওয়া যায়। বলল আহমদ মুসা।

গম্ভীর হয়ে উঠেছে ডেসপিনা এবং জাহরার মুখ। বলল ডেসপিনা, স্যার, যে দর্শনটা আপনি তুলে ধরলেন তা যতটা সত্য ততটাই ভারি। এই ভার সহ্য করার মতো ক্ষমতা থাকলেই তখন সত্যটা পাওয়া যাবে। এই ক্ষমতা পাওয়ার সাধ্য আমাদের মতো দুর্বলদের নেই স্যার।

গম্ভীর হয়ে উঠেছে আহমদ মুসার মুখ। নরম কিন্তু শক্ত উচ্চারণে বলল, দেখ মানুষ যখন নিজেকে ছোট ধরে নেয়, তখন আল্লাহ অখুশি হন। এটা মহান স্রষ্টা আল্লাহর প্রতি অমূলক দোষ আরোপের শামিল। আল্লাহ মানুষকে সীমার মধ্যে অসীম সম্ভাবনা দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। দেহ ও মন দুইই এই সম্ভাবনার আকর। এই সম্ভাবনার ব্যবহার না করে নিজেকে দুর্বল ভাবা অনুচিত।

মুহূর্তের জন্যে থামল আহমদ মুসা। তারপরেই বলল, এসো আমার আসল কথায় আসি। আমার…

আহমদ মুসা কথা শেষ করতে পারলো না। কক্ষের বাইরে ব্রাশ ফায়ারের শব্দ হলো। কক্ষের দরজা বন্ধ।

আহমদ মুসা দরজার দিকে একবার তাকিয়েই বলে উঠল দ্রুত কণ্ঠে, ডেসপিনা, জাহরা তোমরা বেড় থেকে নেমে দ্রুত মেঝেয় চলে যাও। কুইক।

আহমদ মুসার কথা শেষ হতে পারল না। ঝড়ের বেগে এক ঝটকায় দরজা খুলে গেল। কথা বলার সাথে সাথেই আহমদ মুসা সোফার পশ্চিম পাশে গড়িয়ে পড়ল। জ্যাকেটের পকেটের এম-১০ মেশিন রিভলবারের নতুন ভার্সন এম-১৬ বের করতে যাচ্ছিল। কিন্তু দ্রুত সিদ্ধান্ত চেঞ্জ করে বের করে নিল স্মোক বোম। মেঝেতে পড়েই সে বোমটি ছুঁড়ল দরজা লক্ষ্যে। র দরজার দিক থেকে প্রায় একই সাথে ব্রাশ ফায়ারের শব্দ হলো। শব্দের সাথে সাথে স্মোক বোমের বিস্ফোরণও ঘটে গেল।

স্মোক বোম ছোঁড়ার পরই সোফার আড়াল নিয়ে আহমদ মুসা দরজা লক্ষ্যে এম-১৬-এর গুলি বর্ষণ শুরু করেছিল। ওপারের গুলি ছোঁড়া বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত আহমদ মুসা এম-১৬-এর ট্রিগার থেকে তার তর্জনি আলগা করল না। রিভলবারের নল সে অব্যাহতভাবে ঘুরিয়ে নিল দরজা এবং দরজা সংলগ্ন গোটা এলাকা দিয়ে।

সাদা ধোঁয়ায় ভরে গিয়েছিল গোটা ঘর।

তিরিশ, পঁয়ত্রিশ সেকেন্ডের মধ্যে দরজার দিক থেকে গুলি আসা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।

গুলি বন্ধ করে আহমদ মুসা স্থান চেঞ্জ করে আরও একটু উত্তর দিকে সরে গেল তার সোফা ও বেডের দিক থেকে। আক্রমণকারীরা সব মরে গেছে, কিংবা গুলি বন্ধ করে সুযোগের অপেক্ষা করছে কিনা, তার একটা টেস্ট হওয়া দরকার।

আহমদ মুসা শুয়ে থেকে স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল, ডেসপিনা তোমরা ঠিক আছ কিনা? মেঝেতে শুয়ে থেকেই জবাব দেবে এক শব্দে।

ইয়েস। ডেসপিনাদের দিক থেকে ভেসে এলো শব্দটি।

কিন্তু শত্রুদের তরফ থেকে গুলি এলো না।

আহমাদ মুসা নিশ্চিত হলো, ওরা বেঁচে নেই কিংবা সরে গেছে। কিংবা হতে পারে ওরা নিজেদের প্রকাশ না করে কাছ থেকে আক্রমণের সুযোগ নেবার জন্যে এদিকে এগিয়ে আসছে।

আহমদ মুসা সোফা ও বেডের সামনে থেকে এগোবার সিদ্ধান্ত নিল। হাতের রিস্টওয়াচের ডিটেক্টর অপশন অন করে সোফা ও বেডের সামনে বরাবর জায়গার দিকে এগোতে লাগল।

রিস্ট ওয়াচের বিশেষ ডিটেক্টরটি জীবন্ত ও ধাতব কোনো কিছু লোকেশন ও দূরত্ব ডিকেক্ট করতে পারে ৩০ ফুট পর্যন্ত। জীবন্ত কোনো কিছুর ক্ষেত্রে লাল রং এবং ধাতব বস্তুর ক্ষেত্রে বেগুনি রং ইন্ডিকেট করে।

এগোচ্ছে আহমদ মুসা সোফা ও ডেসপিনাদের বেডের সামনে বরাবর। সে তার রিস্টওয়াচ স্ক্রিনে দেখতে পেল কক্ষের বিভিন্ন জায়গায় ৫টি লাল ডট। একটি সে নিজে, তার সামনে কক্ষের মধ্য পশ্চিম অংশের দুই রেড ডট ডেসপিনা ও জাহরাকে ইন্ডিকেট করছে। আর ঘরের মধ্য পূর্ব অংশে তিনটি রেড ডট নিশ্চয় হবে আক্রমণকারীদের। আহমদ মুসা থমকে গেল। আগে দেখতে হবে ওরা এগোচ্ছে, না স্থির হয়ে বসে সুযোগের অপেক্ষা করছে। পল পল করে বয়ে গেল পঁচিশ তিরিশ সেকেন্ড। হ্যাঁ, তিনটি রেড ডটই এগোচ্ছে।

আহমদ মুসা তখন সোফার সামনে বরাবর এসে গেছে। ডেসপিনাদের বেড় আরও একটু সামনে। এখান থেকেই ওদের একটু অবজার্ভ করার। সিদ্ধান্ত নিল।

হঠাৎ আহমদ মুসা দেখল, এগিয়ে আসা তিনটি রেড ডটের সামনে তিনটি বেগুনি ড্যাশ ফুটে উঠেছে এবং তিনটি ড্যাশ একসাথেই তার দিকে এঁকেবেঁকে এগোচ্ছে। চমকে উঠল আহমদ মুসা। তার মানে ওদের তিনজনের হাতের স্টেনগান তাকেই টার্গেট করেছে। কিভাবে? কেন? তাহলে ওদের কাছেও কি ডিটেক্টরের মতো কিছু আছে? না থাকলে তাকে লোকেট করল কেমন করে? কিন্তু ওরা ডেসপিনাদের টার্গেট করেনি কেন? তাহলে ওদের ডিটেক্টর কি কম শক্তিশালী? হতে পারে। আহমদ মুসার সাথে ওদের যে দূরত্ব, তার চেয়ে ডাবল হবে ডেসপিনাদের দূরত্ব, যদি তারা মেঝেয় নেমে ঘরের পশ্চিম পাশে সরে গিয়ে থাকে। এই কারণেই শত্রুদের ডিটেক্টরে ডেসপিনারা এখনও ধরা পড়েনি।

আহমদ মুসা তার মেশিন রিভলবার এম-১৬ পকেট থেকে হাতে তুলে নিল। শত্রুদের বেগুনি ড্যাশ মানে স্টেনগান বেঁকে এসে আহমদ মুসাকে তাক করে স্থির হয়ে গেল। এখনি ওদের তিনটি স্টেনগান একসাথে গর্জে উঠতে পারে।

আহমদ মুসা রিভলবারের ট্রিগারে তর্জনি রেখে চোখের পলকে গড়িয়ে কয়েক গজ সামনে বেডের কাছে এগিয়ে গেল। এই কারণে তিনটি স্টেনগানের ব্রাশ ফায়ার থেকে রক্ষা পেল আহমদ মুসা। সরে যেতে আর মুহূর্তকাল দেরি করলেই তিনটি স্টেনগানের মিলিত ব্রাশ ফায়ারের গ্রাসে পড়ত আহমদ মুসা।

গড়িয়ে আহমদ মুসার দেহস্থির হবার আগেই তার হাতের এম-১৬ গুলি বৃষ্টি শুরু করেছে। স্থির হয়েও গুলিবৃষ্টি অব্যাহত রাখল আহমদ মুসা।

ওপারের গুলিবৃষ্টি বন্ধ হয়ে গেছে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে তিনটি রেড মুছে গেল স্ক্রিন থেকে। তার মানে ওরা তিনজন গুলিবৃষ্টির গ্রাসে শেষ হয়ে গেছে।

আহমদ মুসা উঠে বসল।

ঘরের এদিকে ধোঁয়া তখন হালকা হয়ে গেছে।

তাকাল ডেসপিনাদের দিকে। তারা মাথা গুঁজে শুয়ে আছে ঘরের পশ্চিম দেয়াল ঘেঁষে।

ডেসপিনা, জাহরা তোমরা এখন উঠে বসতে পার। বলল আহমদ মুসা।

___ উঠে বসল দুজন। বিধ্বস্ত ওদের চেহারা।

আহমদ মুসা উঠে দাঁড়াল বাইরে বেরুবার জন্যে।

ঘরের ভিতরের সফেদ রঙের গাঢ় ধোঁয়াও এখন ফিকে হয়ে গেছে। চার দিক এখন স্বচ্ছ হয়ে উঠছে।

কক্ষের বাইরে স্টেট সিকিউরিটির চারজনের লাশ পড়ে আছে। অল্পক্ষণের মধ্যে খবর পেয়ে রত্ন দ্বীপের সিকিউরিটি ফোর্সের প্রধান কর্নেল জেনারেল রিদা আহমদ আমেদিও এসে পড়ল। খবর পেয়ে দ্রুত ফিরে। এসেছে গোয়েন্দা প্রধান ওসমান আবু তাসফিন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস কনস্টানটিনোস ও তার স্ত্রীও এসে হাজির তাদের মেয়ে ডেসপিনাকে দেখতে। স্টেট সিকিউরিটি হাসপাতালের লনে হাসপাতালের লোকসহ বিভিন্ন ধরনের মানুষের প্রচণ্ড ভিড়।

কর্নেল রিদা আহমদ আমেদি এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও তার স্ত্রী প্রায় একসাথে এসে পৌঁছে। তাদের পরে পরেই আসে গোয়েন্দা প্রধান ওসমান আবু তাসফিন।

তখন ঘরের মধ্যে প্রচণ্ড গুলাগুলির শব্দ হচ্ছে। কালচে সাদা ধোঁয়ায় ঘর ভর্তি। কে কাকে গুলি করছে বুঝার উপায় নেই। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, তার স্ত্রী, কর্নেল জেনারেল রিদা আহমদ, গোয়েন্দা প্রধান ওসমান আবু তাসফিন সকলেই বিমূঢ়, হতবিহ্বল। উদ্বেগ-উত্তেজনা তাদের চরমে। হাসপাতালের এই কক্ষেই আছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস কনস্টানটিনোসের মেয়ে ডেসপিনা, বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্য একটি ছাত্রী জাহারা এবং আহমদ মুসা।

রিদা আহমদের প্রশ্নের জবাবে একজন নার্স বলল, প্রায় সাত আটজন লোক আসে ডাক্তারের পোষাকে। আকস্মিকভাবে অ্যাপ্রনের ভেতর থেকে স্টেনগান বের করে তারা একসাথে গুলি করে সিকিউরিটির লোকদের। সিকিউরিটির লোকরা অস্ত্র তোলারও সুযোগ পায়নি। সিকিউরিটির লোকদের গুলি করেই তারা ম্যাডাম ডেসপিনার কক্ষের দিকে এগোেয়। লাথি মেরে তারা খুলে ফেলে দরজা। এই সময় কক্ষের ভেতরে বোমা ফাটার মতো একটা আওয়াজ হয় এবং সংগে সংগেই ব্রাশ ফায়ার শুরু হয়ে গেল। তখন দেখা যায় ধোঁয়ায় ঘর ভর্তি।

অস্ত্রধারীদের হাতে কি কি অস্ত্র ছিল? নার্সকে জিজ্ঞাসা করল কর্নেল জেনারেল রিদা আহমদ।

ওরা সবাই অ্যাপ্রনের আড়াল থেকে স্টেনগান বের করেছিল। আর কোনো অস্ত্র দেখিনি। নার্সটি বলল।

এ সময় হঠাৎ কক্ষের ভেতরের গোলাগুলি বন্ধ হয়ে গেল।

কক্ষের ভেতর গোলাগুলি বন্ধ হয়ে গেল কেন? সব কি শেষ? সন্ত্রাসীরা কি এখনই বেরিয়ে আসবে? ওদের পাকড়াও করার ব্যবস্থা কর। বলল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তার কণ্ঠ আর্তচিৎকারের মতো শুনালো।

তার স্ত্রী লুটিয়ে পড়েছে করিডোরের উপর। সে যেন কাঁদতেও ভুলে গেছে।

ওসমান আবু তাসফিন কয়েক পা এগিয়ে দরজায় উঁকি দিল। ঘরে জমাট ধোঁয়ার কুণ্ডলি বেরুতে পারছে না। দরজা দিয়ে কতটুকু আর বেরুবে।

গুলি থামলেও সন্ত্রাসীরা বেরিয়ে এলো না।

ঘরে ঢোকা যায় কিনা। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলল।

ধোঁয়া না সরলে বা কেন গোলা-গুলি বন্ধ হলো না জানলে ঘরে ঢোকা ঝুঁকিপূর্ণ হবে। অন্যদিকে ধোঁয়ার অন্ধকারে ঢুকে কোনো কিছুই করা যাবে না। বলল গোয়েন্দা প্রধান ওসমান আবু তাসফিন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে লক্ষ্য করে কর্নেল জেনারেল রিদা আহমদ বলল, স্যার, দুই ধরনের গোলাগুলির শব্দ শোনা গেল। স্টেনগানের শব্দ, তার পাশে মেশিন রিভলবারের শব্দ।

স্টেনগান ব্যবহার করেছে সন্ত্রাসীরা, মেশিন রিভলবার তাহলে ব্যবহার করেছে জনাব আহমদ মুসা। আরেকটা লক্ষণীয় বিষয় স্যার, স্টেনগানের শব্দ আগে বন্ধ হয়েছে, তার কিছুক্ষণ পরে বন্ধ হয়েছে মেশিন রিভলবারের শব্দ।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস কনস্টানটিনোসের মুখ কিছুটা উজ্জ্বল হয়ে উঠল। বলল, তার মানে তুমি বলতে চাচ্ছ, আহমদ মুসাই সন্ত্রাসীদের উপর ডমিনেট করছে! এ ঘটনাতেও কি তা বলা যায়?

তা বলা যায় না স্যার। কিন্তু এটুকু তো বলা যায় যে, শত্রুকে আক্রমণের পর্যায়ে আহমদ মুসা আছেন এখনও। আর স্যার, তিনি শত্রুর মোকাবেলায় থাকার অর্থ তিনি ম্যাডামদের নিরাপদে রাখবেন। বলল রিদা আহমদ আমেদি।

আহমদ মুসার উপর ভরসা আমাদের আছে। ঈশ্বর তোমার কথা সত্য করুন। আহমদ মুসাকে সাহায্য করুন ঈশ্বর। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস কনস্টানটিনোস বলল।

কক্ষের ভেতর গোলাগুলি আবার শুরু হয়ে গেল।

নতুন করে উৎকণ্ঠা-উদ্বেগের ঝড় বয়ে গেল কক্ষের বাইরে করিডোরে উপস্থিত সকলের উপর দিয়ে। সবাই অ্যাটেনশন দাঁড়িয়ে। কারও মুখে কোনো কথা নেই।

ভেতরে কি হচ্ছে রিদা! আবার গোলাগুলি শুরু হয়ে গেল। বলল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তার কণ্ঠ শুষ্ক ও কম্পিত।

রিদা আহমদ কিংবা ওসমান আবু তাসফিন কেউ কোনো কথা বলতে পারল না। মিনিটখানেকের মধ্যেই গোলাগুলির শব্দ থেমে গেল।

স্যার দেখুন, এবারও স্টেনগান থেকেই গুলি শুরু হয়েছিল। এবারও স্টেনগানের গুলি থেমে যাবার পর প্রায় ১০ সেকেন্টের মতো মেশিন রিভলবারের গুলি চলেছে। বলল রিদা আহমদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও গোয়েন্দা প্রধানকে উদ্দেশ্য করে।

হ্যাঁ রিদা, তুমি ঠিক বলেছ। বিষয়টা আমিও লক্ষ্য করেছি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলল। এ

রিদা আহমদ, চল এবার ঘরে ঢুকতে হবে। ধোঁয়া কেটে যাচ্ছে। দরজায় দেখ এখন আর ধোঁয়া নেই। বলল গোয়েন্দা প্রধান।

চলুন স্যার। বলে চলতে শুরু করল কর্নেল জেনারেল রিদা আহমদ। তার সাথে সিকিউরিটি ফোর্সের কয়েকজন অফিসার। তাদের হাতের স্টেনগান উদ্যত।

স্যার, দেখি আগে ঘরের কি অবস্থা। আপনি একটু দাঁড়ান। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে বলল গোয়েন্দা প্রধান ওসমান আবু তাসফিন।

ওসমান আবু তাসফিন ও রিদা আহমদরা দরজার দিকে পা বাড়াতেই দরজা দিয়ে বেরিয়ে এলো আহমদ মুসা। তার হাতে তখনও রিভলবার। বলল সে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং অন্য সবাইকে লক্ষ্য করে, আসুন আপনারা, লাশগুলোর ব্যবস্থা করুন। ডেসপিনারা ভালো আছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও তার স্ত্রী ছুটে এসে কক্ষে ঢুকে গেল।

গোয়েন্দা প্রধান ও রিদা আহমদরা তাদের পেছনে যাচ্ছিল। আহমদ মুসার পাশে গিয়ে তারা থমকে দাঁড়াল। বলল গোয়েন্দা প্রধান আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে, স্যার চলুন।

আহমদ মুসাও থমকে দাঁড়িয়েছিল।

বলল গোয়েন্দা প্রধানকে, স্টেট সিকিউরিটি ফোর্সের হাসপাতালের প্রধান বা বড় দায়িত্বশীল কি এখানে এসেছেন?

না, তেমন কাউকে আমি দেখিনি। কেন স্যার? গোয়েন্দা প্রধান ওসমান আবু তাসফিন বলল।

হাসপাতালটিতে ঢোকা ও বের হবার মোট গেট কয়টা? জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।

দুটি। একটি ঢোকার, আরেকটি বের হবার। বলল গোয়েন্দা প্রধান।

কোনো গোপন গেট নেই? জিজ্ঞাসা করল আহমদ মুসা।

আছে স্যার, একটি। বলল গোয়েন্দা প্রধান।

এই মুহূর্তে সমস্ত গেট বন্ধ করে দিতে হবে। আপাতত ডাক্তার, নার্স, রোগী এবং অন্য কেউ হাসপাতালে ঢুকতেও পারবে না, বের হতেও পারবে না। আহমদ মুসা বলল।

রত্ন দ্বীপের সিকিউরিটি ফোর্সের প্রধান কর্নেল জেনারেল রিদা আহমদও দাঁড়িয়ে পড়েছিল। সে এগিয়ে এলো। বলল, স্যার আমাদের ভুল হয়েছে। এই কাজ আরও আগে আমাদের করা উচিত ছিল। _ কথা শেষ করেই সে তাকাল গোয়েন্দা প্রধানের দিকে। বলল, স্যার, তাহলে আমি ওদিকটা দেখি। সব গেট বন্ধ করার ব্যবস্থা করে আমি আসছি।

বলে কর্নেল জেনারেল রিদা আহমাদ ছুটল বাইরে বেরুবার জন্যে।

স্যরি স্যার, আমাদের বড় ভুল হয়ে গেছে। কক্ষের ব্যাপার নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম, এই চিন্তা মাথায় আসেনি। বলল ওসমান আবু তাসফিন।

ঠিক আছে মি. ওসমান। এখানকার সবকিছু বাইরে জানাজানি হয়নি। সুতরাং সময় পার হয়ে যায়নি বলে আমি মনে করি। ওদিক এখন মি. রিদা। আহমদ দেখবেন। চলুন লাশগুলো পরীক্ষা করতে হবে।

বলে আহমদ মুসা কক্ষে ঢোকার জন্যে পা বাড়াল। তার সাথে ওসমান আবু তাসফিনও।

আহমদ মুসা ঘরে ঢুকতেই ছুটে এলো স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস কনস্টানটিনোস। পাগলের মতো জড়িয়ে ধরল আহমদ মুসাকে। বলতে লাগল, আপনি অসাধ্য সাধন করেছেন আহমদ মুসা। সন্ত্রাসী সাতজনকে মেরেছেন, রক্ষা করেছেন আমাদের দুই মেয়েকে আবার।

কথা শেষ করেই আহমদ মুসাকে টেনে নিয়ে গেল দুই বেডের কাছে। বেডের অবস্থা দেখিয়ে বলল, দেখুন কিভাবে বেড দুটি স্টেনগানের গুলিতে এফোঁড়-ওফোড় হয়ে গেছে। সেই সাংঘাতিক মুহূর্তে যদি আপনি মেয়ে দুটিকে বেড থেকে মেঝেতে গড়িয়ে পড়তে না বলতেন, তাহলে ওরা ঝাঁঝরা হয়ে যেতে স্টেনগানের গুলিতে।

মি, কনস্টানটিনোস আজ কিন্তু আমিই ওদের প্রথম টার্গেট ছিলাম।

বলে আহমদ মুসা তার বসে থাকা সোফা দেখিয়ে বলল, আমি ঐ সোফায় বসে ছিলাম। দেখুন, সোফার স্টিলের ফ্রেম শুধু আছে আর কিছু নেই।

তাইতো! সাংঘাতিক ব্যাপার। মনে হচ্ছে স্টেনগানের গোটা ম্যাগজিন এখানে শেষ করেছে। কিন্তু আপনাকে প্রথম টার্গেট করল কেন? বলল। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কনস্টানটিনোস।

ওদের দুই শিকার আমি কেড়ে নিয়েছি। তার উপর ওদের সাতজন আমার হাতে মারা পড়েছে। প্রতিশোধ নেবার জন্যেই আজ ওরা এসেছিল। প্রথমে তারা হাসপাতালে ভর্তি মেয়ে দুটিকে টার্গেট করে। পরে জানতে পারে আমি এখানে আসছি ওদের সাথে দেখা করতে। তখন তারা একসাথে তিন পাখি মারার সিদ্ধান্ত নেয়। আহমদ মুসা বলল।

ঈশ্বরকে ধন্যবাদ যে, ওদের উদ্দেশ্য সফল হয়নি। বলল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

আলহামদুলিল্লাহ। আল্লাহ আমাদের সাহায্য করেছেন।

বলে আহমদ মুসা এগোলো লাশগুলোর দিকে। সাতটি লাশের প্রত্যেকটির পকেট, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, এমনকি চুলও নেড়ে-চেড়ে দেখল। তার পাশেই দাঁড়িয়েছিল গোয়েন্দা প্রধান ওসমান আবু তাসফিন।

আহমদ মুসা সার্চ শেষ করে উঠে দাঁড়িয়ে গোয়েন্দা প্রধান ওসমান আবু তাসফিনকে বলল, মি. ওসমান তাসফিন, এবারও ওরা সংখ্যায় সাতজন। সাতজনের উল্কিতে এবারও সেই প্রাচীন ও মধ্যযুগের পালতোলা জাহাজের। সিম্বল। কিন্তু এবার ওদের নাম নেই। নামের বদলে আছে উল্কির নিচে একটা করে আরবি হরফ। হরফগুলো যদি ওদের নামের আদ্যাক্ষর হয়, তাহলে আগের সেই সাত নামই এদের সাতজনের।

এদেরও সেই একই নাম হবে কেন স্যার? বলল গোয়েন্দা প্রধান।

নামগুলো আসলে ওদের নাম নয়। নামগুলোও সিম্বল। এই সাত নামই ট্রেজার আইল্যান্ডের অভিযানে বিজয়ী হয়েছিল। আমার মনে হয় এরাও বিজয় না আসা পর্যন্ত এই সাত নামে অভিযান চালানো অব্যাহত রাখবে। আহমদ মুসা বলল।

মি. আহমদ মুসা, আপনার কাছ থেকে শোনার পর ইন্টারনেটে ট্রেজার আইল্যান্ডের কাহিনীর আউটলাইন পড়লাম। ঐ সাতজন তো ট্রেজার আইল্যান্ডে দ্বীপ জয় করতে যায়নি, গিয়েছিল ট্রেজার আইল্যান্ডের ধন ভাণ্ডার জয় করতে। বলল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস কনস্টানটিনোস।

এদের প্রকৃত উদ্দেশ্য কি তা আমরা জানি না মি. কনস্টানটিনোস। এর আগে আমি বলেছি, এরা কোনো একটা বড় লাভের জন্যে এসেছে। সেই লক্ষ্য তারা সামনে আনেনি। এখন তারা একটা উপলক্ষ কাজে লাগিয়ে বড় লাভের পথ পরিষ্কার করতে চায়। আহমদ মুসা বলল।

কক্ষে দ্রুত প্রবেশ করল কর্নেল জেনারেল রিদা আহমদ। আহমদ মুসার সামনে ছুটে এসে বলল, স্যার, আপনি যেভাবে বলেছিলেন, তিনটি গেটই সেভাবে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের কথা ছড়িয়ে পড়ার পর দুজন ডাক্তার পেছন, গেট দিয়ে পালাবার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু যখন দেখল যে পালানো যাবে না, তখন তারা জীবন দিয়েছে পটাশিয়াম সাইনাইড খেয়ে। থামল কর্নেল জেনারেল রিদা আহমদ।

ওদের কি সার্চ করা হয়েছে? জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।

না স্যার, এখনও সার্চ করা হয়নি। ঘটনার পরই আমি চলে এসেছি। বলল কর্নেল্ল জেনারেল রিদা আহমদ।

চলুন গিয়ে দেখি, ওরা ভেতরের না বাইরের লোক। ডাক্তার, না, ছদ্মবেশী। আহমদ মুসা বলল।

আহমদ মুসা ঘুরে দাঁড়িয়ে গোয়েন্দা প্রধান ওসমান আবু তাসফিনকে লক্ষ্য করে বলল, আপনি এখানেই থাকুন, মিনিস্টার সাহেব আছেন।

ঘুরে দাঁড়াল আহমদ মুসা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দিকে। বলল, হোম মিনিস্টার মি, কনস্টানটিনোস, ডেসপিনাদের সাথে আমার কথা শেষ হয়নি। আমি এখনি আসছি।

এরা অন্যকক্ষে যাচ্ছে। আপনি আসুন আহমদ মুসা। বলল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস কনস্টানটিনোস।

ধন্যবাদ! বলে আহমদ মুসা ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

কি ব্যাপার ক্রিস, লোকটি দেখছি তোমাদের উপর কর্তৃত্ব করছে, ইকুম দিচ্ছে, গাইড করছে! বলল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস কনস্টানটিনোসের স্ত্রী লিসা ক্রিস্টিনা।

কি বলছ মা, উনি তো আহমদ মুসা। আজ দুবার তিনি সাক্ষাৎ মৃত্যুর হাত থেকে আমাদের বাঁচিয়েছেন। বলল ডেসপিনা।

আমি খারাপ অর্থে বলিনি মা। তার প্রতি আমার অফুরান শ্রদ্ধা আছে। তিনি শুধু তোমাদের বাঁচাননি, তিনিও মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছেন। উনি তো বলছেন, তিনিই ছিলেন প্রধান টার্গেট। সত্যি দেখ, যে সোফায় তিনি বসেছিলেন, সে সোফার কি ত বস্থা। আমি যে কথাটা বলছি, সেটা হলো, বিদেশি হয়েও পরিস্থিতির ৫ টা নিয়ন্ত্রণ তিনি হাতে নিয়েছেন। আমরা পারিনি বলেই তাকে দায়িত্বটা নিতে হয়েছে। এই বিষয়টার দিকেই আমি সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। ডেসপিনার মা বলল।

লিসা ক্রিসিনা তুমি ঠিক ধরেছ, ঠিক বলেছ। আজ ভোর থেকে অল্প দ্বীপে যে তিনটি ভয়ানক ঘটনা ঘটেছে, সে ধরনের ঘটনা আমাদের রত্ন দ্বীপে কখনও ঘটেনি। এ ধরনের ঘটনা সফলভাবে মোকাবেলার অভিজ্ঞতা আমাদের নেই, এটা আমাদের স্বীকার করতেই হবে। এই কারণেই আহমদ মুসা স্বত:স্ফূর্তভাবেই যা করণীয় তা করছেন। এই দুর্দিনে ঈশ্বর তাকে পাঠিয়ে আমাদের সাহায্য করেছেন। তিনি যে বিস্ময়করভাবে কিডন্যাপারদের হাত থেকে আমাদের উদ্ধার করেছেন, যেভাবে আকস্মিকভাবে সাতজন অস্ত্রধারীর দ্বারা আক্রান্ত হয়েও নিজেকে রক্ষা করেছেন, দুই মেয়েকে রক্ষা করেছেন, শুধু নয় ওদের সাতজনকেই হত্যা করেছেন। স্বীকার করতেই হবে এমনটা আমাদের কাছে স্বপ্নের মতো। এমন ট্রেনিং আমাদের লোকদের নেই। প্রয়োজনও আমরা মনে করিনি কখনও। এই অবস্থায় অদৃশ্য শত্রুদের মোকাবেলার দায়িত্ব আমরা আহমদ মুসার উপর সব ছেড়ে দিয়েছি। এই কাজে তিনি আমাদের পরিচালনা করবেন এবং তিনি সেটাই করছেন লিসা ক্রিস্টিনা। আরেকটা কথা বিবেচনা কর লিসা, মার্কিন প্রেসিডেন্ট যেখানে তার সাহায্য নেন, রুশ সম্রাজ্ঞী যেখানে তার সাহায্য কামনা করেন, সেখানে আমাদের তো তাকে স্বর্গের দেবদূত ভাবতে হবে।

থামল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস কনস্টানটিনোস। ডেসপিনার মা লিসা ক্রিস্টিনার চোখ-মুখ বিস্ময়ে ভরে গেছে। বলল, তাকে দেবদূত বলছ কেন? তিনি দেবদূতদের চেয়ে বড়। দেবদূতদের মৃত্যুভয় থাকে না। কিন্তু তিনি মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে মেয়ে দুটিকে উদ্ধার করেছিলেন, আবার এখানে মৃত্যুকে মাথায় নিয়ে লড়াই করে নিজেকে এবং মেয়ে দুটিকে রক্ষা করেছেন। তিনি জয়ী হয়েছেন, কিন্তু মরেও যেতে পারতেন। কিন্তু দেখলাম সে চিন্তা তার মাথায় নেই। তার দৃষ্টি যেন শুধুই সামনে, পেছনে তাকাচ্ছেন না তিনি।

একটু থামল লিসা ক্রিস্টিনা। আবার বলল, কিন্তু তিনি হঠাৎ রত্ন দ্বীপে কিভাবে এলেন?

আমি ঠিক জানি না। উনি প্রেসিডেন্টের মেহমান। আহমদ মুসা রত্ন দ্বীপে কয়েকদিন অবসর যাপন করবেন, একথা সৌদি সরকার আমাদের প্রেসিডেন্টকে জানায়। প্রেসিডেন্ট তখনি তার আতিথ্য অফার করেন। তিনি রত্ন দ্বীপে আসেন আর্মেনিয়া থেকে, আর্মেনিয়ার বিশেষ এক বিমানে। অন্যদিকে তার পরিবার রত্ন দ্বীপে আসেন সৌদিয়ার এক বিশেষ বিমানে আমেরিকা থেকে।

বিশেষ বিমানে? বলল লিসা ক্রিস্টিনা। তার চোখে-মুখে বিস্ময়।

হ্যাঁ, বিশেষ বিমানে। আমি প্রেসিডেন্টের কাছে শুনেছি, সৌদি আরবসহ মুসলিম সরকারগুলো এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মতো বড় দেশ ও বিমান সংস্থাগুলো ভিভিআইপির মর্যাদা দেয় তাকে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলল।

এ ধরনের মানুষের জীবনের মূল্য অনেক। অথচ দেখ, রত্ন দ্বীপের দুজন মেয়েকে বাঁচাতে, রত্ন দ্বীপের একটা সমস্যা দূর করতে তিনি সেই জীবনকেই মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছেন! তিনি ভিভিআইপি হলেও অন্য ভিভিআইপির মতো নন। তিনি খুবই অসাধারণ। বলল লিসা ক্রিস্টিনা।

অল্প সময়ে তুমি তার ভক্ত হয়ে গেলে দেখছি। যাক, তুমি ঠিক বলেছ, তিন সত্যিই অসাধারণ। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলল।

তিনি পরিবারসহ কোথায় থাকছেন? স্টেট গেস্ট হাউসে? জিজ্ঞাসা লিসা ক্রিস্টিনার।

হ্যাঁ, স্টেট গেস্ট হাউজে। যে স্টেট গেস্ট হাউজটি প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের সাথে অ্যাটাক্ট সেই স্টেট গেস্ট হাউজে। কিন্তু তার পরিবার চলে গেছে আজ। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস কনস্টানটিনোস বলল।

পরিবার চলে গেছে, উনি যাননি? বলল লিসা ক্রিস্টিনা।

সকালের ঘটনার পর প্রেসিডেন্ট তাকে কয়েকদিন থেকে যাবার। অনুরোধ করেছিলেন। প্রেসিডেন্টের অনুরোধ তিনি রেখেছেন, কিন্তু পরিবার। পাঠিয়ে দিয়েছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলল।

ধন্যবাদ আহমদ মুসাকে। দুই লাখ লোকের ছোট্ট রত্ন দ্বীপের কথা তিনি শুনেছেন, গুরুত্ব দিয়েছেন। অনেক ধন্যবাদ তাকে। বলল লিসা ক্রিস্টিনা। তার মুখ গম্ভীর। কণ্ঠ আবেগে ভারি।

হাসপাতালের কর্মকর্তাদের একজন কক্ষে প্রবেশ করল। বিনীত কণ্ঠে বলল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে, স্যার, ম্যাডামদের কক্ষ রেডি। আমরা নিয়ে যেতে চাই।

দুটি ক্যারিয়ার ট্রলিও ঘরে প্রবেশ করেছে।

দুমিনিটের মধ্যেই তিন তলার ভিভিআইপি কক্ষে ডেসপিনাদের ট্রান্সফার করা হলো। এ কক্ষটি আরও বড়।

সামান্য স্পেস দিয়ে ডেসপিনা ও জাহরার বেডকে পাশাপাশি রাখা হয়েছে। বেড় দুটির দুপাশে চারটি করে সোফা রাখা হয়েছে। কক্ষটি ছাড়াও একটা গেস্টরুম এর সাথে অ্যাটাস্ট রয়েছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও তার স্ত্রী পাশাপাশি সোফায় বসে ডেসপিনাদের কাছে। শুনছে তাদের উদ্ধার ও তাদের কক্ষে লড়াইয়ের কাহিনী।

গোয়েন্দা প্রধান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে বলে একটু বাইরে গিয়েছিল।

গোয়েন্দা প্রধান ওসমান আবু তাসফিন ও কর্নেল জেনারেল রিদা আহমদ মুসাকে নিয়ে কক্ষে প্রবেশ করল।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস কনস্টানটিনোস উঠে দাঁড়িয়ে আহমদ মুসাকে তার পাশের সোফায় বসাল। বলল, সার্চ করে কিছু পাওয়া গেল জনাব আহমদ মুসা।

দুজন ডাক্তারই নকল। সন্ত্রাসী দলের সদস্য ছিল তারা। তাদের কাঁধে উল্কি আঁকা ছিল। কিন্তু তাদের নাম বা নামের আদ্যাক্ষর উল্কীর্ণ ছিল না।

একটু থামল আহমদ মুসা এবং সঙ্গে সঙ্গেই আবার বলে উঠল, আচ্ছা মি. ক্রিস কনস্টানটিনোস হোয়াইট বিয়ার ও থ্রি স্টার ব্রান্ডের গার্মেন্টস কি রত্ন দ্বীপে উৎপাদিত বা বাজারজাত হয়?

না মি. আহমদ মুসা, কোনো কাপড়ই রত্ন দ্বীপে উৎপাদিত হয় না। বলল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

এই দুই ব্রান্ডের কাপড় কোন দেশ থেকে ইম্পোর্ট করে কি রত্ন দ্বীপ? জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।

না মি. আহমদ মুসা, এই দুই ব্রান্ডের কোনো কাপড়ই ইম্পোর্ট হয় না রত্ন দ্বীপে। বলল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

ইম্পোর্ট হয় না, এই দুই ব্রান্ডের কাপড় কি কোনওভাবে রত্ন দ্বীপে আসে? জিজ্ঞাসা করল আহমদ মুসা।

সেরকম কোনো সম্ভাবনা নেই। ইম্পোর্ট হয় না, এমন পণ্যদ্রব্য রত্ন দ্বীপে পাওয়া যায় না। বলল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

আহমদ মুসা কিছু দূরে বসা গোয়েন্দা প্রধান ওসমান আবু তাসফিনের দিকে তাকাল। বলল, মি. ওসমান, আপনি খেয়াল করেছেন আগে যে সাতজন নিহত হয়েছে, এখানে যারা নিহত হলো, তাদের চুল কাটার ধরন মোটামুটি একই রকম।

ঠিক স্যার, একই রকম বলা যায়। বলল ওসমান তাসফিন।

এবং আমি এ কয়দিনে যতটা লক্ষ্য করেছি, রত্ন দ্বীপের কারও এ ধরনের চুল কাটা দেখিনি। আহমদ মুসা বলল।

একেবারে ঠিক স্যার। ওসমান তাসফিন বলল।

এসব দ্বারা মি. আহমদ মুসা কি বুঝাতে চাচ্ছেন? ওসমান তাসফিনের কথা শেষ হবার সাথে সাথে বলে উঠল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

নিহত এ ষোলজন সন্ত্রাসী কেউই আমার মনে হচ্ছে রত্ন দ্বীপের নয়। বলল আহমদ মুসা।

রত্ন দ্বীপের নয়? তার মানে বাইরের। কিন্তু বাইরের কে আসবে, কেন আসবে এই শক্রতার জন্যে? অবিশ্বাস্য লাগছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলল।

এসব প্রশ্নের উত্তর কেউ আমরা জানি না বলে মনে হয়।

একটু থেমেই আহমদ মুসা আবার বলল, মিস ডেসপিনাদের কাছ থেকে আমি কিছু জানতে চেয়েছিলাম। তাদের সাথে কথা আমার শেষ হয়নি।

ঠিক আছে কথা বলুন। ভালো আছে ওরা, কোনো অসুবিধা নেই। আমরা কি বাইরে যাব? বলল ডেসপিনার মা লিসা ক্রিস্টিনা।

না না, আপনারা থাকলে অসুবিধা নেই। বলল আহমদ মুসা।

ডেসপিনা ও জাহরার বেডের সামনের দিকটা একটু উঁচু করে দেয়া হয়েছিল। তারা দুজনেই উঠে হেলান দিয়ে বসেছে। মাথার নীচে বালিশ দিয়ে আরো আরামদায়ক করা হয়েছে বসাটাকে।

আহমদ মুসার কথা শেষ হতেই ডেসপিনা বলল, বলুন স্যার, তখন তো আপনি কথা শুরু করার মুহূর্তেই ঘটনাটা ঘটে গেল।

জাহরা বলল, আমাদেরও কিছু প্রশ্ন আছে স্যার।

ঠিক আছে। আচ্ছা তোমরা কিডন্যাপ হবার পর বেশ কিছু পথ ওদের গাড়িতে ছিলে। ওরা নিশ্চয় পরস্পর কথা বলেছে। ওদের এমন কোনো কথা কি তোমরা শুনেছ যা তোমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে? বলল আহমদ মুসা।

সংগে সংগে কথা বলল না ওরা। ভাবছে দুজনেই। প্রথমে ডেসপিনাই বলল, স্যার আমরা খুব টেনশনে ছিলাম। চিৎকার, কান্নাকাটি করছিলাম। ওদের কথা শুনবার মতো অবস্থায় আমরা ছিলাম না। কিছুই তেমন মনে পড়ছে না স্যার।

আচ্ছা, ওরা ঐ সময়ের মধ্যে টেলিফোনে কারও সাথে কথা বলেছে? জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।

হ্যাঁ স্যার, টেলিফোনে কথা বলেছিল। ডেসপিনা বলল।

টেলিফোন এসেছিল, না ওরা টেলিফোন করেছিল? বলল আহমদ মুসা।

ডেসপিনা কোনও কথা বলল না। ভাবছিল। জাহরাই জবাব দিল। বলল, টেলিফোনের রিং বাজতে শুনেছি স্যার, তার মানে টেলিফোন এসেছিল।

কি বলে টেলিফোন ধরেছিল? কোনো নাম বলেছিল, হ্যালো বলেছিল, না কি অন্য কিছু বলেছিল? ডেসপিনা জাহরা দুজনেই চিন্তা করতে লাগল।

ওরা কারও নাম বলেনি। হ্যালোও বলেনি। ইটালিয়ান স্টাইলে ওরা সম্বোধন করেছিল। বলল ডেসপিনা।

ইটালিয়ান স্টাইলে? ওদের কোনো কথা কি মনে আছে? জিজ্ঞাসা করল আহমদ মুসা।

কথা বলল না দুজনের কেউ। ভাবছে ওরা।

একটা কথা মনে পড়ছে স্যার। বলছিল, মিশন সাকসেসফুল। আমরা ফিরছি শিকার নিয়ে।

আরও কোনো কথা? জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।

তৎক্ষণাৎ কারও কাছ থেকেই কোনো উত্তর এলো না। দুজনেরই দ্রু কুঞ্চিত হলো। স্মৃতি হাতড়াচ্ছে ওরা দুজনেই।

নীরবতা ভাঙল এবার জাহরা। বলল, টেলিফোনে যে লোকটি কথা বলছিল, সে সম্ভবত, ওপ্রান্তের কোনো প্রশ্নের জবাবে ওবাদিয়ার নাম করেছিল। বলেছিল, না আমরা তা করছি না, ওবাদিয়াতেই তাদের আমরা নিয়ে যাব।

ভ্রু কুঞ্চিত হলো আহমদ মুসার। মনে মনে একবার উচ্চারণ করল ওবাদিয়া রত্ন দ্বীপের একটা ছোট পার্বত্য এলাকার নাম। কিন্তু মুখে সে বলল, তোমাদের কিছু বলেছিল ওরা?

আমরা কান্নাকাটি ও সাহায্যের জন্যে চিৎকার করতে থাকলে ওরা ধমক দিয়ে বলেছে, রত্ন দ্বীপের কারও সাধ্য নেই আমাদের হাত থেকে তোদের বাঁচায়। তোদর নিরাপত্তা বাহিনীকে আমরা গণার মধ্যেই ধরি না। মোটামুটি এ রকম কথাই তারা বলেছিল। বলল জাহরা।

ওদের কথা-বার্তা শুনে কি তোমাদের মনে হয়েছে ওরা রত্ন দ্বীপের লোক? জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।

তারা রত্ন দ্বীপের ভাষাতেই কথা বলেছে, কিন্তু শব্দের ব্যবহার ও অনেক শব্দের উচ্চারণ রত্ন দ্বীপবাসীদের মতো মনে হয়নি। ডেসপিনা বলল।

অনেক ধন্যবাদ ডেসপিনা, জাহরা। তোমাদের কথা তদন্তে কাজে লাগবে। ধন্যবাদ। ও ডেসপিনাদের ধন্যবাদ দিয়েই আহমদ মুসা তাকাল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দিকে। বলল, আমাকে এখন উঠতে হবে।। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস কনস্টানটিনোস কথা বলার আগেই ডেসপিনা দ্রুত কণ্ঠে বলল, স্যার, আপনার কথা শেষ হয়েছে। কিন্তু আমাদের কথা আছে।

হাসল আহমদ মুসা। বলল, ঠিক আছে, প্রয়োজনীয় হলে বল।

ঠিক প্রয়োজন বলব না। আমাদের কৌতূহল এটা। বলল ডেসপিনা।

ঠিক আছে, বল। আহমদ মুসা বলল।

বল জাহরা, তুমিই তো ভালো জান। বলল ডেসপিনা।

স্যার আপনার ব্যাপারে আমরা অনেক কিছু শুনেছি, পড়েছি। আমি হজ্জে গিয়েও আপনার বিষয়ে অনেক কথা শুনেছি। আমাদের কৌতূহল হলো, আপনার দেশ কোথায়। আপনার পরিবারে কে কে আছে?

হাসল আহমদ মুসা। বলল, আমার দেশ বলতে কোনো দেশ আর এখন নেই। তবে আমার জন্মস্থান আছে। সেটা বর্তমান পূর্ব তুর্কিস্তান, যা এখন চিনের সিংকিয়াং এলাকা। স্ত্রী, একটি ছেলে নিয়ে আমার একটা পরিবার আছে। আমার পারিবারিক বাসস্থান এখন মদিনা শরিফে।

আপনার স্ত্রী ও ছেলের নাম কি? স্ত্রী কোন দেশের মেয়ে? বলল জাহরাই।

আমার স্ত্রীর নাম মারিয়া জোসেফাইন এবং সারা জেফারসন। মারিয়া জোসেফাইন ফরাসি আর সারা জেফারসন আমেরিকান। ছেলের নাম। আহমদ আব্দুল্লাহ। আহমদ মুসা বলল।

আহমদ মুসার দুই স্ত্রীর কথা শুনে ভ্রু কুঁচকালো উপস্থিত সকলেই।

স্ত্রীর অধিকার লংঘন হয় বলে একাধিক স্ত্রীর বিষয়টিকে গ্রহণযোগ্য মনে করা হয় না। জাহরাই বলল।

তুমি যা বলেছ, সেটা ঠিক। আবার এটাও ঠিক যে, এ ধরনের ব্যতিক্রম যদি না থাকে তাহলে অনেক মানুষের মানবাধিকার পদদলিত হতে পারে। মানুষের স্রষ্টা আল্লাহ যখন এমন একটা ব্যতিক্রমী ব্যবস্থা করেছেন, তখন সব মানুষের অধিকার, সব মানুষের প্রয়োজন এবং মানুষের সব অবস্থার কথা বিবেচনায় নিয়েই এমন বিধান করেছেন। বলল আহমদ মুসা।

ধন্যবাদ স্যার। আপনি দুই বাক্যে যা বলেছেন, তার ব্যাখ্যা দুই ঘন্টাতেও সম্ভব নয়। স্যার, এটাই বাস্তব, সারা জীবনের জন্যে যে বিধান, যে বিধান দুই জীবনের জন্যে শুধু নয় তাদের বংশ পরম্পরার সাথে সংশ্লিষ্ট, সংশ্লিষ্ট সমাজ সংস্কৃতির স্বাভাবিক চাহিদার সাথে, সেরকম বিধানের ব্যতিক্রম, বিকল্প থাকা প্রয়োজন, যার বিধান আল্লাহ করেছেন। জাহরা বলল।

ধন্যবাদ জাহরা। তুমি সুন্দর বলেছ। কিন্তু সত্যিই আমার কৌতূহল হচ্ছে, পরার্থে যার জীবন, নিজের কোনো স্বার্থ ছাড়াই মানুষের স্বার্থে যিনি মৃত্যুর মুখে ঝাঁপিয়ে পড়েন, তিনি নিজের কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থে দ্বিতীয় বিয় করতে পারেন বলে আমি মনে করি না, তাহলে দ্বিতীয় মানে সারা জেফারসনের সাথে আপনার বিয়েটা কিভাবে হলো? এর মধ্যে নিশ্চয় একটা শিক্ষা আছে। সেটা আমি জানতে চাই। বলল ডেসপিনা।

আহমদ মুসা হাসল। বলল, ডেসপিনা এটা জানতে চাইলে তোমাকে মারিয়া জোসেফাইনের সাথে কথা বলতে হবে।

উনি তো সারা জেফারসনের প্রতিদ্বন্দ্বী। তার কাছে সত্যিকার কাহিনী জানা যাবে কেমন করে? বলল ডেসপিনা।

হাসল আহমদ মুসা। বলল, উনিই তো ঘটনা ঘটিয়েছেন। তিনিই জানেন ঘটনার সব।

কিন্তু এটা অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে। বলল ডেসপিনা।

অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে, কিন্তু বিশ্বাস্য বলেই তো ঘটনা ঘটেছে এবং এ ধরনের ক্ষেত্রেই বিশেষ ব্যতিক্রম হিসেবে দ্বিতীয় বিয়ের মতো ঘটনা। ঘটতে পারে। আহমদ মুসা বলল। * একটু থেমেই আহমদ মুসা বলল, এবার উঠতে হয়। মি. ক্রিস কনস্টানটিনোস আমি উঠছি। আমি কর্নেল জেনারেল রিদা আহমদকে একটু সাথে নিতে চাই। একটু কাজ আছে।

ঠিক আছে আহমদ মুসা। আপনি কাজের মানুষ। ঈশ্বর আপনাকে সাহায্য করুন। যার যখন প্রয়োজন তাকে আপনি ডাকতে পারেন। যেখানে প্রয়োজন সেখানেই যেতে পারেন। আপনি আপনার কাজের ব্যাপারে স্বাধীন। বলল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস কনস্টানটিনোস।

ধন্যবাদ মি. ক্রিস কনস্টানটিনোস।

বলে আহমদ মুসা উঠে দাঁড়াল।

স্যার, আমাদের কথা কিন্তু শেষ হয়নি। বলল ডেসপিনা।

পার্সোনাল কথা নিয়ে তোমাদের সময় নষ্ট করা উচিত নয়। অন্য কথা থাকলে তা বলার সময় সামনে আছে। রত্ন দ্বীপে আরও কিছু দিন আমাকে থাকতে হবে। আচ্ছা আসি।

বলে আহমদ মুসা হাঁটা শুরু করল কক্ষের বাইরের দিকে।

 

 

 

বলেছিলে রত্ন দ্বীপের নিরাপত্তা বাহিনী কিছুই করতে পারবে না। কি হচ্ছে, কারা করছে, এটা বুঝার আগেই সুতা কাটা মালার মতো রত্ন দ্বীপের সমাজ ও সরকার ধ্বংসের মুখে পড়বে! কিন্তু শুরুতেই তোমরা ধ্বসে পড়লে? একদিনের ঘটনায় জীবন হারালো আমাদের ষোলজন মানুষ! ওরা প্রত্যেকেই ছিল এক একটি রত্ন। তুমি ব্যর্থ হয়েছ লিউনার্দো। তোমার নেতৃত্ব ব্যর্থ হয়েছে। টেলিফোনের ওপ্রান্ত থেকে বলল মিডিটেরিয়ান ব্ল্যাক সিন্ডিকেট (মিড ব্ল্যাক সিন্ডিকেট)-এর প্রধান অগাস্টিন ইমানুয়েল।

টেলিফোনের ওপ্রান্তটি রত্ন দ্বীপে নয়, সিসিলি দ্বীপের ক্যাটানিয়ায়। এই ক্যাটানিয়াতেই মিড ব্ল্যাক সিন্ডিকেট-এর হেডকোয়ার্টার।

টেলিফোনের এপ্রান্তে রয়েছে, অপারেশন রত্ন দ্বীপ-এর নেতা ক্রিস্টোফার লিউনার্দো। তার হেডকোয়ার্টার রত্ন দ্বীপের রেনেটা ক্যাসলে।

রেনেটা ক্যাসল রত্ন দ্বীপের ভূগোল থেকে মুছে যাওয়া একটি নাম। ক্যাসলটি রত্ন দ্বীপের পশ্চিম উপকূলের পাহাড়ী এলাকায়। উঁচু পাহাড়ের দেয়াল ঘেরা ক্ষুদ্র একটা উপত্যকায় ক্ষুদ্র এই দুর্গটি। রেনেটা ক্যাসল তৈরি হয়েছিল জলদস্যুদের দ্বারা। উপকূলে নেমে পাহাড়ের আকাঁবাকা গিরিপথ দিয়ে সহজেই রেনেটা ক্যাসলে পৌঁছা যায়। কিন্তু এখান থেকে দ্বীপের অভ্যন্তরে যাবার পথ খুবই দুর্গম। শত শত বছর ধরে এখানে মানুষের যাওয়াত ছিল না।

মিড ব্ল্যাক সিন্ডিকেট জলদস্যুদের একটা পুরানো দলিল থেকে এই রেনেটা ক্যাসলের সন্ধান পেয়েছে। তারা জলদস্যুদের নকশা অনুসরণ করে রেনেটা ক্যাসল-এ আসে এবং একেই তারা অপারেশন রত্ন দ্বীপ-এর হেডকোয়ার্টার মনোনীত করে। এ ক্যাসলটি অনেকটা পাহাড়ে ঢাকা হওয়ার কারণে বিমান বা হেলিকপ্টার থেকেও একে দেখা যায় না।

নেতা অগাস্টিন ইমানুয়েলের কঠোর অভিযোগের জবাবে রত্ন দ্বীপে অপারেশনের চীফ ক্রিস্টোফার লিউনার্দো বলল, আমরা রত্ন দ্বীপের নিরাপত্তা বাহিনী কিংবা সরকারের হাতে পরাজিত হইনি। আমরা পরাজিত হয়েছি, আমাদের ষোলজন লোক মারা গেছে শুধুমাত্র এক ব্যক্তির হাতে, যে রত্ন দ্বীপের নিরাপত্তা বাহিনী ও সরকারের কেউ নয়।

শুকনো গলায় একটা ডোক গিলার জন্যে থামল ক্রিস্টোফার লিউনার্দো।

সংগে সংগেই ওপ্রান্ত থেকে বলে উঠল অগাস্টিন ইমানুয়েল, এটা তো আরও বড় ব্যর্থতা লিউনার্দো। একজন মাত্র ব্যক্তি একটা বাহিনী নয়। সে যেই হোক না কেন তার কাছে পরাজয় তোমার জন্য আরও বড় অপরাধ। শোন, তুমি মিটিং বন্ধ কর। আলেকজান্দ্রোকে পাঠিয়েছি। সে ওখানে যাচ্ছে। তাকেই সব দায়িত্ব বুঝে দিয়ে তুমি রত্ন দ্বীপ ত্যাগ করো। হেডকোয়ার্টারে এসে আমার কাছে রিপোর্ট করো।

দপ করে মুখের আলো নিভে গেল ক্রিস্টোফার লিউনার্দোর। তার চোখে নামল অন্ধকার। হেডকোয়ার্টারে তাকে কেন ডাকা হয়েছে, সেখানে তার ভাগ্যে কি ঘটবে তা সে জানে। মিড ব্ল্যাক সিন্ডিকেটে ব্যর্থতার কোনো স্থান নেই। যারা ব্যর্থ হয় তাদেরকে সংগঠন থেকে নয়, জীবন থেকেই ঝেড়ে ফেলা হয়।

টেলিফোন রাখল ক্রিস্টোফার লিউনার্দো। তাকাল টেবিলের তিন দিকে বসা সহকর্মীদের দিকে। বলল, মিটিং মুলতবি করছি। দিয়াগো আলেকজান্দ্রো আসছে, সেই রত্ন দ্বীপের দায়িত্ব নেবে।

বলে সে উঠে দাঁড়াল। কক্ষের বাইরে যাবার জন্যে পা বাড়াল ক্রিস্টোফার লিউনার্দো। ঘর থেকে বাইরে সে পা রেখেছে, এই সময় দিয়াগো আলেকজান্দ্রো সেখানে এসে পৌঁছল।

লিউনার্দো কোথায় যাচ্ছ? ভেতরে সবাই আছে? চল ভেতরে। বলল দিয়াগো আলেকজান্দ্রো।

দিয়াগো আলেকজান্দ্রোর সাথে আরও দুজন। ক্রিস্টোফার লিউনার্দো ঘরে ঢুকল। তার সাথে দিয়াগো আলেকজান্দ্রোও।

ঘরে ঢুকে দিয়াগো আলেকজান্দ্রো গিয়ে বসল ক্রিস্টোফার লিউনার্দোর চেয়ারে।

ক্রিস্টোফারের সাথে আসা দুজন দরজায় দাঁড়াল। আর ক্রিস্টোফার লিউনার্দো দাঁড়াল ঘরের এক পাশে।

চেয়ারে বসেই দিয়াগো আলেকজান্দ্রো বলল নিউনার্দোকে লক্ষ্য করে, লিউনার্দো, তোমার অস্ত্রগুলো টেবিলে রাখ।

লিউনার্দো কোনো কথা না বলে দুটি রিভলবার ও একটি ছুরি টেবিলে রাখল।

দিয়াগো আলেকজান্দ্রো দরজায় দাঁড়ানো দুইজনকে দেখিয়ে বলল, ওদের সাথে তুমি যাও লিউনার্দো। ওরাই তোমাকে হেডকোয়ার্টারে পৌঁছে দেবে।

ঠিক আছে আলেকজান্দ্রো আমি যাচ্ছি। বলে বেরুবার জন্যে দরজার দিকে পা বাড়াল। লিউনার্দো জানে অন্যথা করার কোনো সুযোগ তার নেই। আসলে সে এখন বন্দী। ঐ দুজন লোক তার সশস্ত্র প্রহরী। তাকে গুলি করে হত্যাসহ সব ক্ষমতা তাদের দেয়া আছে।

প্রহরী দুজনের সাথে চলে গেল ক্রিস্টোফার লিউনার্দো।

দিয়াগো তার টেবিলের তিন পাশের দিকে তাকিয়ে বলল, একদিনে আমাদের ষোলজন লোক মারা গেল, তোমাদের কারও কোনও বক্তব্য আছে? কেন ঘটল?

বিশাল টেবিলটার তিন পাশে ওরা সাতজন বসে। তাদের প্রত্যেকেরই চোখ-মুখ পাথরের মতো শক্ত ও মৌন।

প্রশ্নের উত্তরে সংগে সংগেই তারা কেউ কথা বলল না। অবশেষে নীরবতা ভেঙে একজন বলল, বস, আমি দুটি ঘটনার কোনোটাতেই ছিলাম না। দূরে পাহারায় প্রত্যক্ষদর্শীর কাছ থেকে যা শুনেছি, তাতে ঘটনা আমার কাছে মিরাকল মনে হয়েছে। দুটি ঘটনার কোনটাতেই লোকটা বাঁচার কথা ছিল না, কিন্তু সে শুধু বাঁচেইনি, দুটি ঘটনায় আমাদের ষোলজন লোককে হত্যা করেছে। থামল লোকটি।

অবশিষ্ট তোমরা কি মনে করো, বল। বলল দিয়াগো আলেকজান্দ্রো।

তারাও বলল, দুটি ঘটনা আমাদেরকেও বিস্মিত করেছে। আমাদের দক্ষ যোদ্ধারা এই ভাবে অসহায় পাখির মতো গুলি খেয়ে মারা গেল মাত্র একজনের হাতে, এই দায় একজন বা কারো ঘাড়ে চাপিয়ে সমাধান খুঁজে পাওয়া যাবে না।

তোমরাও দেখছি মরার আগে মরে বসে আছ, তাহলে আমরা অগ্রসর। হবো কি করে? আমাদের মূল কাজের তো কিছুই হয়নি। বলল দিয়াগো আলেকজান্দ্রো।

কাজের ব্যাপারেই আমরা কথা বলতে চাই। কাজটা আমাদের করতে হবে, লক্ষ্যে আমাদের পৌঁছতে হবে। এই বিষয়ে কথা বলুন। সামনে বসা আগের সেই লোকটিই বলল।

আমি সে জন্যেই এসেছি। বলল দিয়াগো আলেকজান্দ্রো।

তাহলে সেই কাজই শুরু করুন। প্রথমেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মেয়েকে কিডন্যাপ করার কি দরকার ছিল? সাধারণত বড় ঘটনার বড় রকম প্রতিরোধ হয়। তার চেয়ে সিনাগগ ধ্বসিয়ে দেয়ার মতো ছোট ঘটনা ঘটিয়ে দেশে নৈরাজ্য সৃষ্টি ও সরকারের পতন ঘটানো সহজ ছিল। সম্মুখ সংঘাত এড়িয়েও এই ধরনের কাজ করা যায়। মাগের ললাবটিই বলল।

কর্মসূচির ব্যাপারে তুমি নতুন কথা বলেছ। আমার ভালো লেগেছে। আমি হেডকোয়ার্টারের সাথে এ নিয়ে আলাপ করব। ন্তু এই মুহূর্তে প্রতিশোধমূলক বড় কিছু না ঘটালে মানুষ আমাদের ভয় করবে না, দুর্বল। ভাববে। কিছু একটা করতে হবে। বলল দিয়াগো আলেকজাতো।

হাসপাতালে আক্রমণ প্রতিশোধ নেয়ার জন্যেই ছিল। এই আক্রমণ আমাদের ক্ষতি করেছে। সম্মুখ আক্রমণের মাধ্যমে প্রতিশোধ নেয়ার চেষ্টা আবারও করা যায়। কিন্তু সেটা আমাদের ভালো ফল দেবে এ ব্যাপারে। আমরা নিশ্চিত নই। সম্মুখে বসাদের মধ্য থেকে আরেকজন বলল।

তোমার কথায় যুক্তি আছে। কিন্তু তাই বলে তো আমরা বসে থাকতে পারি না। বলল দিয়াগো আলেকজান্দ্রো।

আমাদের বর্তমান বিপর্যয়ের কারণ মাত্র একজন লোক। সে যেমন আমাদের বিপর্যয়ের কারণ, তেমনি সে সরকার ও রত্ন দ্বীপের মানুষের জন্যে উৎসাহ ও শক্তির ভিত্তি। যদি এই মুহূর্তে কিছু করতেই হয়, তাহলে হওয়া উচিত এই লোকটার উপর আঘাত হানা। বলল সামনে বসাদের অন্য একজন।

তুমি ঠিক বলেছ। আমাদের বসদের এ রকমই চিন্তা। ঠিক এই মুহূর্তে লোকটির উপর আক্রমণকেই আমরা টার্গেট হিসাবে নিচ্ছি। বল তোমাদের আর কোনো কথা আছে? বলল দিয়াগো আলেকজান্দ্রো।

আমাদের মূল লক্ষ্য সম্পর্কে আগে আমাদের তেমন ব্রিফ করা হয়নি। বলা হয়েছিল, রত্ন দ্বীপে গেলেই সব জানতে পারবে। কিন্তু তা জানানো হয়নি। রত্ন দ্বীপে এখন একশ লোকের একটা বাহিনী আছে। তারা। সকলেই মিড ব্ল্যাক সিন্ডিকেট এর কাজের ব্যাপারে। কিন্তু অহরহই আমাদেরকে তাদের প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়, আমরা কোন লক্ষ্যে কাজ করছি? বিশেষ করে যোজনের হত্যাকাণ্ডের পর এই প্রশ্ন আরও বড় হয়ে উঠেছে। বলল সামনে-বসা সেই প্রথম লোকটিই।

তৎক্ষণাৎ কিছু বলল না দিয়াগো আলেকজান্দ্রো। একটু চিন্তা করল। বলল, অপারেশন রত্ন দ্বীপ কোন্ উদ্দেশ্যে গঠিত তা সবারই জানার কথা। আর মিড ব্ল্যাক সিন্ডিকেট-এর আপনারা যারা সদস্য, তাদের সবার এটা অবশ্যই জানতে হবে।

একটু থামল দিয়াগো আলেকজান্দ্রো। পরমুহূর্তেই বলল, এই রত্ন দ্বীপ আসলেই একটা রত্ন দ্বীপ। এখানে লুকানো রয়েছে রত্নের ভাণ্ডার। প্রাচীন যুগে রোমানদের তাড়া খাওয়া, মধ্যযুগে ও আধুনিক যুগের শুরুতে কোথাও টিকতে না পরা দিশেহারা জলদস্যুদের অঢেল সম্পদ এসেছে নির্জন ও প্রাকৃতিক দুর্গের মতো এই দ্বীপে। ক্যারিবিয়ান দ্বীপাঞ্চল ও আমেরিকা অঞ্চল থেকে জাহাজ বোঝাই করে আনা স্বর্ণ লুণ্ঠিত হয় জলদস্যুদের দ্বারা। কোথাও নিরাপত্তা না পেয়ে সেগুলোও আনা হয় এই দ্বীপে। সেই অঢেল ধনভাণ্ডার উদ্ধার করাই আমাদের মিশন। আর রত্নভাণ্ডার আমাদেরই, কারণ যে জলদস্যুগ্রুপ তাদের ধনভাণ্ডার নিরাপদ করার জন্যে এই নির্জন দ্বীপে লুকিয়ে রেখেছিলেন, আমরা সেই জলদস্যুদের উত্তরসূরি। এর বেশি এখন জানার দরকার নেই বলে আমি মনে করি।

তাহলে আমরা ধনভাণ্ডার সন্ধান করলেই তো হয়। ধনভাণ্ডার উদ্ধার হলেই আমাদের মিশন শেষ। তাহলে আমরা কেন সরকারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নেমেছি, কেন দেশে নৈরাজ্য সৃষ্টি ও সরকারের পতন আমাদের। লক্ষ্য? বলল সামনে বসে থাকা লোকদের একজন।

হাসল দিয়াগো আলেকজান্দ্রো। একটুক্ষণ চুপ করে থাকল।

অ্যাটেনশন হওয়ার মতো একটু নড়েচড়ে বসল দিয়াগো আলেকজান্দ্রো। বলল, দুই কারণে এই কাজগুলো আমাদের করতে হচ্ছে। সরকারের পতন ঘটাতে না পারলে ধনভাণ্ডার উদ্ধারে আমাদের সফল হওয়া কঠিন। আরেকটা কারণ আছে। সেটা বলা যাবে না। আমাদের মিশনে অনেক টাকা প্রয়োজন। সেই টাকা আমরা একটা মহলের কাছ থেকে পেয়েছি একটা শর্তে। তারা আমাদের ধনভাণ্ডারের অংশ চায় না। তারা অন্যরকম একটা শর্ত দিয়েছে। সেই শর্তের কারণে আমাদের অনেক কিছু করতে হচ্ছে। তারা গোপন রাখতে বলেছে বলে সেটা প্রকাশ করা হচ্ছে না।

ঠিক আছে এখন করণীয় বলুন বস। আমরা কাজ করতে চাই। বলুন এখন কি করতে হবে আমাদের? বলল সামনে বসাদের একজন।

প্রথম কাজ অজ্ঞাত সেই লোকটির সন্ধান করা এবং তাকে হত্যা করা। দ্বিতীয় কাজ দ্বীপের মানুষের ঐক্য ও সংহতি নষ্ট করা। প্রধান তিনটি ধর্মের বিভিন্ন স্বার্থে আঘাত হেনে তাদের মধ্যে ভুল বুঝাবুঝি ও সংঘাতের সৃষ্টি করা। বলল দিয়াগো আলেকজান্দ্রো।

যুগ যুগ ধরে তাদের মধ্যে পারস্পরিক যে আস্থা গড়ে উঠেছে, তা নষ্ট করার ক্ষেত্রে আমাদের সব চেষ্টা এ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছে। বলল সামনে বসাদের একজন।

আমরা কাজ করে গেলে ওদের এই আস্থা ও বিশ্বাস দেখবে খুব তাড়াতাড়ি ভেঙে পড়বে।

চলুন তাহলে আমরা অগ্রসর হই। আমরা চুপ করে থাকলে ভীতি আমাদেরকে আরও গ্রাস করবে। চল আমরা এখন উঠি। বিকেলে আমরা তিনটি গ্রুপে ভাগ হয়ে রাজধানীতে যাব। উদ্দেশ্য লোকটিকে সন্ধান করা, সুযোগ পেলে তাকে হত্যা করা। বলে উঠে দাঁড়াল দিয়াগো আলেকজান্দ্রো। সবাই উঠলো।

 

 

 

এক নম্বর সার্কুলার রোড ধরে ছুটে চলেছে আহমদ মুসার গাড়ি। এক নম্বর সার্কুলার রোডটি গোটা দ্বীপকেই বেষ্টন করেছে। এই সার্কুলার রোডের সমান্তরালে পরপর আরও দুটি সার্কুলার রোড রয়েছে।

আহমদ মুসা ড্রাইভ করছে গাড়ি।

তার পাশে মেজর পাওয়েল পাভেল।

মেজর পাভেলেরই গাড়ি ড্রাইভ করার কথা ছিল।

নিরাপত্তা বাহিনীর প্রধান রিদা আহমদ এই নির্দেশই মেজর পাভেলকে দিয়েছিল। কিন্তু আহমদ মুসা তাকে ড্রাইভিং-এর পাশের সিটে বসিয়ে নিজে বসেছে ড্রাইভিং সিটে। আহমদ মুসা তাকে বলেছে, তোমাদের রাস্তায় গাড়ি চালানোতে আমি অভ্যস্ত হতে চাই, তুমি তো অভ্যস্ত আছই। সুতরাং অগ্রাধিকার আমারই।

মেজর পাভেল বিনীত হেসে বলেছে, স্যার, কোনো কিছুতেই আপনার অভ্যস্ত হবার প্রয়োজন নেই। ঈশ্বর প্রয়োজনীয় সবকিছুই আপনাকে অঢেলভাবে দিয়েছেন।

বলে মেজর পাভেল আহমদ মুসার পাশের সিটে গিয়ে বসল।

গাড়ি চলছে।

মেজর পাভেল, মনে হচ্ছে তুমি আমার সাথে আসতে চাচ্ছিলে না। কেন? বলল আহমদ মুসা।

স্যার, আপনার সাথে আসতে চাইনি, এটা নয়। আমি ওবাদিয়া এলাকায় আসতে চাচ্ছিলাম না। মেজর পাভেল বলল।

কেন? ওবাদিয়ায় আসতে চাচ্ছিলে না কেন? বলল আহমদ মুসা।

স্যার, অনেকদিন আমি ওবাদিয়া এলাকার দায়িত্বে ছিলাম। একটা কারণে রিলিজ নিয়ে এই এলাকা থেকে চলে যাই। সেজন্যে এই এলাকায়। আসা আমি অ্যাভয়েড করতে যাচ্ছিলাম। মেজর পাভেল বলল।

মেজর পাভেল, তুমি নিরাপত্তা বাহিনীর লোক। কোনো এলাকা সম্পর্কে তোমার নিজের উপর এমন বিধি-নিষেধ আরোপ ঠিক নয়। কি এমন ঘটেছিল মেজর পাভেল, যার কারণে তুমি এমন চিন্তা করতে বাধ্য হয়েছ? বলল আহমদ মুসা।

স্যার, আপনি জিজ্ঞাসা করলে আমার কিছুই আপনাকে না বলার থাকতে পারে না। বলছি স্যার।

একটু থামল মেজর পাভেল!

শুরু করল তার কথা আবার, ওবাদিয়া এলাকায় ডেভিড অ্যারিয়েল একজন প্রভাবশালী ব্যবসায়ী। এক সময় সে রত্ন দ্বীপ পার্লামেন্টে ইহুদি ধর্মীয় গ্রুপ থেকে সদস্যও ছিল। তার বিভিন্ন কাজে ইহুদি সম্প্রদায় মনে করে সে ধর্ম পালন যেমন করে না, তেমনি সুনীতিরও ধার ধারে না। এই কারণেই ইহুদি ধর্ম-গ্রুপের পক্ষ থেকে পার্লামেন্টে কোনো নমিনেশন আর পায়নি। তার একটি মেয়ে নিরাপত্তা বাহিনীতে আছে ক্যাপ্টেন র্যাংকে, নাম। আয়লা আলিয়া। দায়িত্ব পালন উপলক্ষেই তার সংগে আমার দেখা হতো। প্রায়ই। এরপর আমি যখন ওবাদিয়ায় দায়িত্ব নিয়ে গেলাম, সেও তখন বদলি হয়ে ওবাদিয়ায় এলো। তখন এই দেখা-সাক্ষাৎ আরও বাড়ল। দুজনের মধ্যে সম্পর্কও হয়ে গেল। ইনিশিয়েটিভ তার পক্ষ থেকেই ছিল। তার পরিবারের প্রকাশ্য সায়ও ছিল। আমারও অনিচ্ছা ছিল না। ভালো লাগত আমার তাকে। হঠাৎ কি হয়ে গেল। কয়েক দিনের জন্যে কোথাও চলে গিয়েছিল তার পিতা ডেভিড অ্যারিয়েল। ফিরে এলো অনেকটাই যেন নতুন মানুষ হয়ে। তার আচরণ আমার কাছে নতুন মনে হলো। ধীরে ধীরে আমার মনে হলো, শুধু আমার সাথে নয়, নিরাপত্তা বাহিনীর লোকদের সাথেও আচরণ তার ভালো নয়। তারপর মেয়েকেও চাকরি ছাড়ার জন্যে চাপ দিল। বলল তাকে, যাদের কাছে আমি সুব্যবহার পাইনি, তাদের। অধীনে তোমার চাকরি করার প্রয়োজন নেই। এখানেই শেষ নয়। একদিন। তাদের বাড়িতে আয়লা আলিয়ার উপস্থিতিতেই আমাকে বলল, পাভেল তুমি আর এখানে এসো না। আলিয়ার সাথে তোমার মেলামেশাও আমি পছন্দ করছি না। সংগে সংগেই আলিয়া তার বাবার এই অসৌজন্যমূলক ব্যবহারের তীব্র প্রতিবাদ করে। আমাকে নিয়ে বাবার সাথে তার বিতর্ক করা ঠিক নয় এ কথা বলে আমি চলে আসি। কাঁদতে শুরু করে আলিয়া। এ ঘটনার পর আমি ওবাদিয়া থেকে রিলিজ নিয়ে চলে আসি। ওবাদিয়ায় আমাদের নিরাপত্তা বাহিনীর আংলিক অফিস আলিয়াদের বাদুর। পাশেই। থামল মেজর পাভেল।

আহমদ মুসা গভীর মনোযোগের সাথে শুনছিল মেজর পাভেলের কথা। তার দুই চোখে কিছুটা আলো ছড়িয়ে পড়েছিল। বলল, মেজর পাভেল, তোমার সাথে আলিয়ার যোগাযোগ নেই?

আছে স্যার। আমরা মাঝে মাঝেই কথা বলি। তবে তাকে আমি আমার আগের কথাই বলি যে, আমাকে নিয়ে তার বাবার সাথে কোনো বিরোধ হোক আমি চাই না। কিন্তু এ কথা সে মানতে নারাজ। বলে সে, বিষয়টা বাবার নয়, আমার। বাবা আমার ব্যক্তিগত বিষয়ে জড়াবেন না আমি আশা করি। বলল মেজর পাভেল।

তুমি টেলিফোন কর আলিয়াকে। দেখ কোথায় সে। যদি পাও তাহলে আমি তার সাথে কর্থা বলতে চাই। আহমদ মুসা বলল।

ঠিক আছে স্যার। বলে মেজর পাভেল টেলিফোন করল ক্যাপ্টেন আলিয়াকে।

আহমদ মুসা তার সাথে কথা বলতে চায় এটা আলিয়াকে বলল মেজর পাভেল।

কথা বলা শেষ করে আহমদ মুসাকে জানাল, স্যার, আলিয়া ওবাদিয়ার নিরাপত্তা বাহিনীর অফিসেই আছে। আপনি তার সাথে কথা। বলবেন জেনে আকাশের চাঁদ হাতে পাওয়ার মতো খুশি হয়েছে সে। তবে তার মত হলো ওবাদিয়ার পাহাড়ী এলাকায় কতগুলো ট্যুরিস্ট স্পট আছে। তারই একটিতে নিরাপত্তা বাহিনীর একটা আউটপোস্ট আছে। সেখানে বসেই সে কথাবার্তা বলতে চায়।

ঠিক আছে, ভালো সিদ্ধান্ত নিয়েছে আলিয়া। সম্ভবত তোমার কথা ভেবেই এটা করেছে সে। তোমাকেও বিব্রত করতে চায় না, আবার তার বাবাকেও নতুন কথা বলার সুযোগ করে দিতে চায় না সে। আহমদ মুসা বলল।

 

 

 

ওবাদিয়া ইহুদি অধ্যুসিত এলাকা। দ্বীপের দশ হাজার ইহুদি অধিবাসীদের অর্ধেকের মতো বাস করে ওবাদিয়াতেই। ওবাদিয়া পাহাড়ী এলাকা। পাহাড়গুলো ভূমধ্যসাগরীয় ফলের বাগানে শোভিত। পাহাড়ের মধ্যে একটা সুন্দর উপত্যকা আছে ওবাদিয়ায়। খুবই উর্বর। প্রচুর গম ও সবজি উৎপাদন হয় এখানে। ওবাদিয়ার দক্ষিণ অংশটা পাহাড়। খুবই দুর্গম। খুব উৎসাহী ট্যুরিস্টরাও কিছু দূর পর্যন্ত যেতে পারে পাহাড় ডিঙিয়ে, খুব বেশি দূর ঢুকতে কেউ পারে না।

ওবাদিয়ার আউটলেট সেকশনও খুব গুরুত্বপূর্ণ। দ্বীপ থেকে বেরুবার উত্তর দক্ষিণে যে দুটি আউটলেট, তার দক্ষিণের আউটলেটটি ওবাদিয়ার গা ঘেঁষেই সাগরে নেমে গেছে। জনশ্রুতি আছে, প্রাচীন কালে ত্রিপলী ও বেনগাজি এলাকার আরব মুসলিমরা দ্বীপের দক্ষিণের আউলেট দিয়ে দ্বীপে প্রবেশ করে এবং ওবাদিয়া এলাকাতেই তারা বসতি গড়ে তোলে। জনশ্রুতি মতে ওয়াদিয়া ছিল এই এলাকাটার নাম। পরে ওয়াদিয়াও ওবাদি হয়ে যায়।

এক মিনিটের মধ্যেই আহমদ মুসার গাড়ি পৌঁছে গেল ওবাদিয়ার সেহ ট্যুরস্ট স্পটে।

নিরাপত্তা বাহিনীর আউটপোস্টের আঙিনায় থামল আহমদ মুসার গাড়ি।

জানতে পেরেই অফিস থেকে ছুটে বেরিয়ে এলো ক্যাপ্টেন আয়লা আলিয়া।

আহমদ মুসারা তখন গাড়ি থেকে নেমেছিল।

___ আয়লা আলিয়া ছুটে এসে আহমদ মুসাকে প্রথমে স্যালুট দিল এবং মাথা নিচু করে বাউ করল। পরে দুধাপ সরে এসে মেজর পাভেলকে স্যালুট দিল। আহমদ মুসার কাছে ফিরে এলো আবার ক্যাপ্টেন আলিয়া। বলল, স্যার, ক্যাপ্টেন আলিয়া হিসাবে আপনাকে স্যালুট দিয়েছি, মানুষ আলিয়া হিসাবে আপনাকে বাউ করেছি। স্যালুট দিয়ে মন ভরে না স্যার, বিশাল পাহাড়ের উচ্চতার সামনে মাথা নুইয়ে বাউ করেই শুধু তার বড়ত্বের সম্মান দেয়া যায়।

ক্যাপ্টেন আলিয়া, মানুষের কাছে মানুষের মাথা নোয়ানো ঠিক নয়। তাতে মানবতার অপমান হয়। বলল আহমদ মুসা।

স্যার, একথা আপনি বলবেন আমি জানি। অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপনি সৈনিক, শান্তি ও আদর্শের আপনি দূত। কিন্তু আপনার সবচেয়ে বড় পরিচয় আপনি মানুষ, আল্লাহর একজন প্রিয় বান্দা। স্যার, মাথা নোয়ানো সব সময় সব ক্ষেত্রে প্রভু ও দাসের অর্থ বহন করে না, বড়দের প্রতি সম্মান ও বিনয়ের নিদর্শনও হতে পারে। বলল ক্যাপ্টেন আলিয়া।

চমৎকার ক্যাপ্টেন আলিয়া, তুমি এসব কথা এভাবে বলতে পারছ কেমন করে? বলল আহমদ মুসা।

হাসল ক্যাপ্টেন আলিয়া। বলল, আমার ক্যাপ্টেন বন্ধু আছে। নাম ফাতমা ফায়জা। কলেজ থেকে আমাদের বন্ধুত্ব। নিরাপত্তা বাহিনীর ট্রেনিং-এ আমরা ব্যাসমেট। রুমমেটও ছিলাম আমরা। তার কাছ থেকে অনেক কিছু আমি শিখেছি। আপনার সম্পর্কেও আমি তার কাছ থেকে জেনেছি। তার কাছে আপনি স্বপ্নের রাজপুত্র, নতুন যুগের হাতেম তাঈ। যা-ই হোক, আমি এখন হাফ মুসলমান।

হাসল আহমদ মুসা। বলল, হাফ মুসলমান! হাফ মুসলমান কাকে বলে?

বিশ্বাসে মুসলমান, কিন্তু কর্মে নয়। বলল ক্যাপ্টেন আলিয়া।

বিশ্বাস শক্তিশালী হলে কর্মতো পরিবর্তন হয়ে যায়। আহমদ মুসা বলল।

ঠিক বলেছেন স্যার। তবে বিশ্বাসকে এখনও শক্তিশালী করছি। ক্যাপ্টেন আলিয়া বলল।

কথা শেষ করেই তাড়াতাড়ি বলে উঠল, স্যরি, আপনাদের দাঁড়িয়ে রেখে কথা বলছি। আসুন স্যার।

বলে ক্যাপ্টেন আলিয়া আহমদ মুসার সামনে থেকে একটু সরে পাশে গিয়ে হাঁটতে শুরু করল।

আহমদ মুসা ও মেজর পাভেলও হাঁটতে শুরু করেছে।

Top