৪
ক্যাপ্টেন আলিয়া, তোমাদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক ব্যাপারে কথা বলছি, তুমি কিছু মনে করছ না তো? বলল আহমদ মুসা।
স্যার, আপনি কথা বলবেন, আর আমি কিছু মনে করব, এটা আমার, ভাবনারও অতীত স্যার। আপনার প্রতি আমার আস্থা প্রবল, ভংগুর নয় বলে আমি মনে করি। ক্যাপ্টেন আলিয়া বলল। আবেগ জড়িত তার কণ্ঠ।
ধন্যবাদ ক্যাপ্টেন আলিয়া। মেজর পাভেল ওবাদিয়ায় আসতে চাচ্ছিল। কারণ জিজ্ঞাসা করায় তোমাদের কাহিনী আমি তার কাছ থেকে জানতে পারি। বলল আহমদ মুসা।
পাভেল খুব ভালো ছেলে স্যার। মানুষ হিসাবেও সৎ ছেলে, অফিসার হিসাবেও অত্যন্ত দায়িত্বশীল। তাকে নিয়ে আমি গর্বিত স্যার। কিন্তু বাবা তার প্রতি অবিচার করেছেন। এখন ওবাদিয়া আসা তার জন্যে কঠিন। প্রায় লাগালাগি হওয়ায় তিনি গ্যারিসনে আসলেই বাবা টের পাবেন। বাবা আমার কাছে তার আসা পছন্দ করবেন না বলেই আমি এখানে আমাদের আলোচনার ব্যবস্থা করেছি। ক্যাপ্টেন আলিয়া বলল।
তোমার বাবার এই পরিবর্তনটা কেন? এ নিয়ে তুমি কোনো চিন্তা করেছ? বলল আহমদ মুসা।
চিন্তা করেছি স্যার। কিন্তু বুঝতে পারিনি, কোনো কারণ আমি খুঁজে পাইনি। তিনি কোথাও গিয়েছিলেন। সেখান থেকে ফিরে আসার পরই তাঁর এই পরিবর্তন। ক্যাপ্টেন আলিয়া বলল।
তিনি কি কোনো আত্মীয় বাড়ি গিয়েছিলেন? বলল আহমদ মুসা।
না, তিনি আত্মীয় বাড়ি যাননি। কোথায় যাচ্ছেন তা বাড়িতে বলেও যাননি। বাড়িতে আমরা মহাদুশ্চিন্তায় ছিলাম। আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে খোঁজ নেবার পর তাকে নিখোঁজ রেকর্ড করে আমরা সরকারিভাবে অনুসন্ধানের কাজ শুরু করতে যাচ্ছিলাম। এই সময় উধাও হয়ে যাবার পঞ্চম দিনে তিনি বাড়িতে ফিরে এলেন। কিন্তু তিনি জানালেন না কোথায় গিয়েছিলেন। তিনি এটুকুই শুধু বলেছিলেন; ব্যবসায়ের কাজে আমি কয়েকদিন বাইরে ছিলাম। রত্ন দ্বীপের বাইরে গিয়েছিলেন কিনা তাও তিনি জানাননি।
তোমার কি মনে আছে, তিনি উধাও হয়েছিলেন বা চলে গিয়েছিলেন কোথা থেকে? বলল আহমদ মুসা।
আমি সেদিন হেডকোয়ার্টারে গিয়েছিলাম। তাই তার সাথে ঐ দিন আমার দেখা হয়নি। তবে বাড়ি আসলে মা বললেন, তোর বাবা লাঞ্চে আসেননি। সাধারণ একটা শার্ট পরে সকালে বেরিয়ে গেছেন। কোট জ্যাকেট কিছুই নেননি। মায়ের কথাকে আমি তখন খুব গুরুত্ব দেইনি। রাতে তিনি যখন ফিরলেন না, তখন আমার চিন্তা হলো বাবা তো এমন। ইনফরমাল পোষাক পরে বাড়ির পরিমণ্ডলের বাইরে কখনই কোথাও যান না। ক্যাপ্টেন আলিয়া বলল।
ক্যাপ্টেন আলিয়া, আমাদের একজন নিরাপত্তা কর্মী একটা তথ্য। দিয়েছিল, সেটা নিশ্চয় ভুলে গেছ। বলল মেজর পাভেল।
ও, ইয়েস। ধন্যবাদ মেজর পাভেল। স্যার, আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আছে। আমার বাবা যেদিন বাড়ি থেকে বের হন, সেদিনই আমাদের একজন নিরাপত্তা কর্মী আমার বাবাকে পাহাড়ে আমাদের বাগানে ঘুরতে দেখেছে। ক্যাপ্টেন আলিয়া বলল।
আপনাদের বাগানটা এই নিরাপত্তা আউটপোস্ট থেকে কোন্ দিকে? বলল আহমদ মুসা।
এখান থেকে আরও কিছুটা দক্ষিণে। ক্যাপ্টেন আলিয়া বলল।
তার মানে পাহাড়ের আরও গভীরে? আচ্ছা বল তো ক্যাপ্টেন আলিয়া, উনি কি মাঝে-মধ্যেই বাগানে যেতেন? বলল আহমদ মুসা।
বাগানটা বাবার খুব প্রিয়। কিছুটা অবসরে থাকলেই তিনি বাগানে। গিয়ে সময় কাটান। হ্যাঁ, আপনি ঠিকই বলেছেন বাগানটা পাহাড়ের আরও একটু গভীরে। ক্যাপ্টেন আলিয়া বলল।
ক্যাপ্টেন আলিয়া বলতে পারেন, উনি বাসায় ফিরেছিলেন কোন পথে কোন্ দিক দিয়ে? বলল আহমদ মুসা।
সংগে সংগে উত্তর দিল না ক্যাপ্টেন আলিয়া। স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল আহমদ মুসার দিকে। তার চোখে অবাক দৃষ্টি। এমন প্রশ্নের অর্থ কি? অন্য কেউ এমন প্রশ্ন করলে হাসতাম। কিন্তু প্রশ্ন করেছে আহমদ মুসা। অতএব অবাক না হয়ে উপাই নেই। মুহূর্ত কয়েক চুপ থেকে ক্যাপ্টেন আলিয়া বলল, বাবা যখন বাড়ি ফেরেন, তখন আমি বাড়িতে ছিলাম না, আমাদের গ্যারিসন অফিসেও ছিলাম না। আমি নিজে কিছু। দেখিনি। তবে কাবার্বা, ক্যাসলে যাবার সম. ওবাদিয়ার পাহাড়ী আউটপোস্ট থেকে একটা টেলিফোন পেলাম। জানাল, আউটপোস্টের একজন নিরাপত্তা কর্মী দেখেছে একটা গাড়িতে আমার বাবা বাড়ির দিকে যাচ্ছেন। এর অর্থ তিনি পাহাড়ের দিক থেকে এসেছিলেন।
ক্যাপ্টেন আলিয়া কথা শেষ করার পর আহমদ মুসা সংগে সংগেই কিছু বলল না। ভাবছিল সে।
ক্যাপ্টেন আলিয়া, ফেরার পর তাকে কেমন মনে হয়েছে আপনাদের? বলল আহমদ মুসা।
বাবাকে ক্লান্ত মনে হয়েছে আমার কাছে। কথা-বার্তার মধ্যে স্বতস্ফূর্ততার অভাব ছিল। তার আনন্দ প্রকাশের অন্তরালে কেমন একটা প্রচ্ছন্ন বিষণ্ণতা ছিল। দুএক দিনের মধ্যে তার ভেতরে পাভেল সম্পর্কে পরিবর্তন লক্ষ্য করতে শুরু করলাম। ক্যাপ্টেন আলিয়া বলল।
ওবাদিয়ার পেছনের পাহাড় সম্পর্কে আপনার অভিজ্ঞতা কেমন আছে ক্যাপ্টেন আলিয়া? বলল আহমদ মুসা।
ক্যাপ্টেন আলিয়া তাকাল আহমদ মুসার দিকে। বলল, স্যার, ঠিক কি জানতে চান?
ওবাদিয়ার পাহাড়ী অঞ্চলে কোনো গোপন স্থাপনা, গোপন ঘাঁটি বা লুকানোর মতো গুহার সন্ধান করছি। তুমি এই এলাকার মানুষ। তুমি কিছু জান কিনা? বলল আহমদ মুসা।
ক্যাপ্টেন আলিয়ার ভ্রু কুঞ্চিত হলো। তার চোখে-মুখে অস্বস্তির ভাব ফুটে উঠল। বলল, স্যার আপনি বাবাকে সন্দেহ করছেন?
না, তোমার বাবাকে সন্দেহ করিনি। কিন্তু উনি বিপদগ্রস্ত হয়েছেন কিনা, এটা আমি ভাবছি। বলল আহমদ মুসা।
কিভাবে বিপদে পড়তে পারেন? কারা বিপদে ফেলতে পারে? জিজ্ঞাসা ক্যাপ্টেন আলিয়ার।
সেটা আমার কাছে এখনও স্পষ্ট নয়। আমার মাথায় দুটি চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে! এক. তোমার বাবা ওবাদিয়ার পাহাড়ী অঞ্চলে কোথায় ছিলেন? আমার মনে হচ্ছে তিনি ইচ্ছার বিরুদ্ধে ছিলেন। দুই, যারা সেদিন কিডন্যাপ হয়েছিল, তারা কিডন্যাপারদের মুখে শুনেছিলেন, তাদেরকে ওবাদিয়ায় নিয়ে যাওয়া হবে। বলল আহমদ মুসা।
ক্যাপ্টেন আলিয়া, মেজর পাভেলের চোখে-মুখে বিস্ময় ফুটে উঠল। বিস্ময়ে কিছুক্ষণ কথা সরল না ক্যাপ্টেন আলিয়ার মুখ থেকে। এক সময় তার মুখ থেকে স্বতস্ফূর্তভাবে বেরিয়ে এলো ও গড?
ঠিক স্যার, ওবাদিয়ার পাহাড়ী অঞ্চলে সন্ত্রাসী মিড ব্ল্যাক সিন্ডিকেটের কোনো ঘাটি থাকলে, কয়েকদিন ওবাদিয়ার পাহাড়ী অঞ্চলে বাবা কোথায় ছিলেন, এ প্রশ্ন বড় হয়ে উঠে। তাছাড়া বাবার পরিবর্তনও তাৎপর্যময় হয়ে উঠে। ক্যাপ্টেন আলিয়া বলল।
ধন্যবাদ ক্যাপ্টেন আলিয়া। এখন বল আমাদের করণীয় কি? বলল আহমদ মুসা।
একটু ভাবল ক্যাপ্টেন আলিয়া। বলল, এখন কি করণীয়- এটা বলা স্যার আমার বুদ্ধিতে কুলোবে না। ওটা আপনিই বলবেন। আমি এটুকু বলতে পারি যে, ওবাদিয়ার পাহাড়ী অঞ্চলে সন্দেহজনক স্থাপনা, ঘটি বা বাড়ির খোঁজ করতে হবে। আর বাবার জীবনে কি ঘটেছে তা জানতে হবে।
হাসল আহমদ মুসা। বলল, করণীয় তো বলেই ফেললে ক্যাপ্টেন আলিয়া। ধন্যবাদ। এখন কিভাবে এগোনো যাবে, সে সম্পর্কে তোমাদের ধারণা বল।
বলুন মেজর পাভেল স্যার। আপনি শুরু করুন। ক্যাপ্টেন আলিয়া বলল।
আমি মনে করি ওবাদিয়ার পাহাড়ী এলাকা খুব বড় নয়। এক দিনের একটি কম্বিং অপারেশন হলেই গোপন কোনো স্থাপনা বা ঘাঁটি থাকলে তা বেরিয়ে পড়বে। বলল মেজর পাভেল।
ঠিক তো একথা আমার মনেই হয়নি। আমি ভাবছিলাম কোন পথে এগোনো যায়। এটা তো সহজ ও নিশ্চিত একটা পদক্ষেপ। ক্যাপ্টেন আলিয়া বলল।
তোমরা দুজনেই সহজ ও নিশ্চিত একটা পথ বাতলিয়েছ। ধন্যবাদ। কিন্তু আমাদের লক্ষ্য শুধু ওদের ঘাঁটি বা বাড়ি খুঁজে বের করা নয়। আমাদের আরও বড় লক্ষ্য হলো, ওদের সম্পর্কে ভালোভাবে জানা যায় এমন সব তথ্য যোগাড় করা এবং সম্ভব হলে ওদের জীবন্ত পাকড়াও করা। এ দুটি কাজের মাধ্যমে বাড়ি, ঘাটিরও সন্ধান পাওয়া যাবে। কিন্তু কম্বিং অপারেশনে গেলে ওরা সবসহ পালাবে। শূন্য ঘাঁটি পেলেও ওতে আমাদের কোনো লাভ হবে না। বলল আহমদ মুসা।
ঠিক বলেছেন স্যার। আমরা এতোটা গভীরে গিয়ে ভাবিনি। আমরা তো চাচ্ছি, মিড ব্ল্যাক সিন্ডিকেটের ষড়যন্ত্র উন্মোচন করা এবং এই অকল্যাণের শক্তিকে ধ্বংস করা। আপনি ঠিক বলেছেন স্যার, ওদের জানা ও পাকড়াও করা আমাদের লক্ষ্য। এটা করতে গেলে ওদের ঘাঁটি বা বাড়িও আমরা পেয়ে যাব। মেজর পাভেল বলল।
আমার বাবা যদি সত্যিই ওদের কবলে পড়ে থাকেন, তাহলে তার কাছ থেকে কোনো সাহায্য আমরা পেতে পারি না? বলল ক্যাপ্টেন আলিয়া।
প্রত্যক্ষ কোনো সাহায্য আমরা তাঁর কাছ থেকে পাব না। কিন্তু তার মাধ্যমে ব্যবস্থা করে আমরা মূল্যবান তথ্য যোগাড় করতে পারি।আমি ক্যাপ্টেন আলিয়াকে অনুরোধ করব, তাকে তার বাবার সবগুলো মোবাইল মনিটর করতে হবে এবং তার সাথে কারা সাক্ষাৎ করতে আসে, যতটা পারা যায় তাদের চিহ্নিত করতে হবে। বলল আহমদ মুসা।
আহমদ মুসা তাকাল মেজর পাভেলের দিকে। বলল, মেজর পাভেল, তোমাদের কি মোবাইল ট্রাকিং যন্ত্র আছে?
জি, আছে স্যার। মেজর পাভেল বলল।
তাহলে ক্যাপ্টেন আলিয়া তার বাবার মোবাইলগুলো ট্রাকিং করতে পারে। এই সাথে তার বাবার সঙ্গে কারা কখন দেখা করছেন, সেটা দেখা এবং যতটা সম্ভব তাদের পরিচয় যোগাড় করাও তার দায়িত্বের মধ্যে থাকবে। বলল আহমদ মুসা।
বাবার টেলিফোন ট্রাকিং করবে তার মেয়ে, ব্যাপারটা বিব্রতকর। এই দায়িত্বটা অন্য কাউকে দিলে দ্বিতীয় কাজটা আমি সহজেই করতে পারি। ক্যাপ্টেন আলিয়া বলল।
ঠিক বলেছ ক্যাপ্টেন আলিয়া। তোমার বাবার মোবাইল ও টেলিফোন ট্রাকিং তোমার জন্যে বিব্রতকর, কিন্তু অন্য কেউ তা করলে সেটা হতে পারে তোমাদের পরিবারের জন্যে ক্ষতিকর। আমি চাই, ঐ একটি মাত্র বিষয় ছাড়া তোমাদের পারিবারিক সিক্রেসি তোমাদের কাছেই থাকবে। এজন্যে দায়িত্বটা তোমার উপর থাকাই ভালো। বলল আহমদ মুসা।
ধন্যবাদ স্যার। দেখছি, কোনো বিষয়ই আপনার বিবেচনার বাইরে থাকে না। আমি এদিকটা একেবারে চিন্তাই করিনি। অনেক ধন্যবাদ স্যার। আপনাকে। আপনার দেয়া দায়িত্ব আমি গ্রহণ করলাম স্যার। ক্যাপ্টেন আলিয়া বলল।
ক্যাপ্টেন আলিয়ার ইন্টারকমের নীল বাতি নিভে গিয়ে লাল বাতি জ্বলে উঠল।
ক্যাপ্টেন ইন্টারকমের স্পীকার অন না করে রিসিভারটা তুলে নিল। ওপারের কথা শুনে বলল, হ্যাঁ বল লেফটেন্যান্ট জামিল।
ওপাশের কথা শোনার পর বলল, কতক্ষণ আগে? ক্যামেরা হাতে ছিল?,
কোন দিকে পালিয়েছে?
আচ্ছা। বিষয়টা এত দেরিতে জানালে কেন? লোকটা কেমন দেখতে, রত্ন দ্বীপের?
ওপারের কথা বেশ কিছুক্ষণ ধরে শুনে বলল, ঠিক আছে লেফটেন্যান্ট জামিল। ও.কে ধন্যবাদ। কল অফ করে ক্যাপ্টেন আলিয়া ফিরে দাঁড়াল আহমদ মুসার দিকে। বলল, স্যার একটা ঘটনা ঘটেছে। আপনারা যখন আমাদের আউটপোস্টের গেট দিয়ে প্রবেশ করেন, তখন গেটের বিপরীত দিকের বাগানের ভেতর দাঁড়িয়ে একজন লোক ফটো তুলেছে। আপনাদের। আমাদের লোকরা তাদের ধরার চেষ্টা করলে তারা পালিয়ে যায়।
ভ্রূ কুঞ্চিত হলো আহমদ মুসার। একটু চিন্তা করে বলল, ওরা কোন্ দিকে পালিয়ে গেছে?
পশ্চিম দিকে। ক্যাপ্টেন আলিয়া বলল।
আহমদ মুসা কোনো কথা বলল না। ভাবছিল সে। আহমদ মুসা। এখানে আসছে, এটা ওরা কি করে জানতে পারল? বলল আহমদ মুসা, ক্যাপ্টেন আলিয়া আমি এখানে আসছি, এ খবর ফাঁস হয়ে গেছে। শত্রুরা জানতে পেরেছে এ খবর। ফটোগ্রাফার হিসেবে যাকে তোমাদের লোক দেখেছে, সে আসলে কনফার্ম হতে এসেছি। ফটোও সেই তুলেছে।
থামল আহমদ মুসা মুহূর্তের জন্যে, সংগে সংগেই আবার বলল, ক্যাপ্টেন আলিয়া এই আউটপোস্টে তোমার সিকিউরিটি ফোর্সরা এখন কোথায়?
ক্যাপ্টেন আলিয়া একটু চমকে ওঠার মতো চেহারা নিয়ে বলল, স্যার এটা জিজ্ঞাসা করছেন কেন? ওদের কয়েকজন গেটে আছে। অধিকাংশই চারদিকে পাহারায় আছে।
রুটিন পাহারা? জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।
হ্যাঁ, তাই তো। কিন্তু এসব জিজ্ঞাসা করছেন কেন স্যার? ক্যাপ্টেন আলিয়া বলল।
ক্যাপ্টেন আলিয়া, মেজর পাভেল আমি মনে করছি যেকোনো সময় তোমাদের এই আউটপোস্ট আক্রান্ত হবে। বলল আহমদ মুসা।
লাফ দিয়ে উঠে সোজা হয়ে দাঁড়াল মেজর পাভেল ও ক্যাপ্টেন আলিয়া। তাদের চোখে-মুখে অপার বিস্ময়! বলল মেজর পাভেল, সত্যিই কি আমরা এমন পরিস্থিতির মুখে পড়তে যাচ্ছি? আমাদের সিকিউরিটি ফোর্সকে সেভাবে এলার্ট করা নেই!
আমি আসার পর এক ঘন্টার মতো সময় গেছে। আমি আসার সাথে সাথে ওদের কাছে গ্রীন সিগন্যাল পৌঁছেছে। ওরা প্রস্তুত হয়ে আসতে কতটুকু সময় লাগবে আমি জানি না। তবে এক ঘন্টা সোয়া ঘন্টা সময় যথেষ্ট হতে পারে। তারা নিশ্চয় ধারণা করবে আমি বেশি সময় একটা সিকিউরিটি পোস্টে দেব না। সুতরাং তাড়াহুড়া করবে এটা স্বাভাবিক। বলল আহমদ মুসা।
আমি বুঝতে পেরেছি স্যার। আমাদের আরও সাবধান হওয়ার দরকার ছিল। আপনার পরিচয় প্রকাশ হয়ে পড়া নিশ্চয় আমরা ঠেকাতে পারতাম। স্যার আমি আসছি, বাইরের ব্যবস্থা আমি দেখি কি করা যায়।
বলেই ডবল মার্চ করে ছুটল দরজার দিকে, বাইরে বেরুবার জন্যে।
দরজার পরেই একটা কোর্ট ইয়ার্ড। বেশ বড়। কোর্ট ইয়ার্ডের উত্তর। পাশে পূর্ব অংশে আউটপোস্টের অফিস। এর পশ্চিম অংশ ও পশ্চিম পাশ জুড়ে সিকিউরিটি ফোর্সের ব্যারাক। আউটপোস্টে ঢোকার গেটটা পূর্ব। অংশের মাঝামাঝি জায়গায়। গোটা আউটপোস্টটাই প্রাচীর ঘেরা।
ক্যাপ্টেন আলিয়া দরজায় পৌঁছতেই আউটপোস্টের চারপাশ থেকে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র গর্জন করে উঠল প্রায় একই সাথে।
স্টেনগানের ব্রাশফায়ার।
দরজায় থমকে দাঁড়িয়ে পেছনে তাকাল ক্যাপ্টেন আলিয়া।
ক্যাপ্টেন আলিয়া ফিরে এস। অনেকটা নির্দেশের কণ্ঠে বলল আহমদ মুসা। তার কণ্ঠ শান্ত, সহজ। মুখ উদ্বেগহীন। যেন ঘটনা তার উপর কোনো ক্রিয়া করেনি।
থমকে দাঁড়িয়েই ক্যাপ্টেন আলিয়া তাকিয়েছে আহমদ মুসার দিকে। তার মুখ উদ্বেগ-উত্তেজনায় পিষ্ট।
মেজর পাভেলেরও একই অবস্থা। সেও তাকিয়েছে আহমদ মুসার দিকে। আকস্মিকতায় সে হতভম্ব, বিমূঢ়।
আহমদ মুসার নির্দেশ পেয়ে ক্যাপ্টেন আলিয়া আহমদ মুসার সামনে এসে মেজর পাভেলের পাশে দাঁড়াল।
এখনি দুজনে দুটি স্টেনগান ও কিছু ম্যাগজিন নিয়ে তোমরা পূর্বদিক থেকে ব্যারাকের প্রথম যে ঘর সেখানে পজিশন নাও। আর…..।
আহমদ মুসা কথা শেষ করার আগেই মেজর পাভেল বলল, স্যার, ওঁরা এখনও ভেতরে ঢোকেনি। আমরা গেটে গিয়ে ওদের বাধা দিতে পারি।
ধন্যবাদ মেজর। কিন্তু না। ওদের ভেতরে ঢোকার সুযোগ দাও। সবাই ওরা ভেতরে ঢুকুক। ওদের যখন ভেতরে ঢোকা শেষ হবে, কোর্ট ইয়ার্ডের মাঝামাঝি যখন ওরা পৌঁছবে, তখন তোমরা গুলি শুরু করবে। যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত গুলি তোমাদের থামবে না। ঠিক আছে? যাও, আল্লাহ হাফেজ। বলল আহমদ মুসা।
ওদের বিস্ময় লাগল আহমদ মুসার সহজ, শা ও হাসিমাখা মুখ দেখে। মুখটিতে তারা অভয় আলোর যে প্রকাশ দেখল, তা যেন তাদের মনের ভয়, উদ্বেগকে দূর করে দিল। মেজর পাভেল ও ক্যাপ্টেন আলিয়া পরস্পর একবার মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে ছুটল ব্যারাকের সেই প্রথম ঘরটিতে পজিশন নেবার জন্যে।
আহমদ মুসা অফিসের পাশাপাশি তিনটি কক্ষের দরজা খুলে দিল। তারপর মাঝের দরজার আড়ালে পজিশন নিল। তার দুই হাতে দুটি এম ১৬ মেশিন রিভলবার।
এক দেড় মিনিটের মধ্যেই গুলি করতে করতে শর্করা প্রবেশ করল আউটপোস্টের কোর্ট ইয়ার্ডে। কোর্ট ইয়ার্ডের মাঝামাঝি পর্যায়ে এসেই তাদের দ্বিধাগ্রস্ততা দেখা দিল। কোনো দিক থেকে কোনো বাধা এ পর্যন্ত না পাওয়ায় তারা যেন বুঝতে পারছিল না কোন দিকে যাবে তারা, ব্যারাকের দিকে, না অফিসের দিকে?।
তাদের এই দ্বিধাগ্রস্ত অবস্থায় ব্যারাক থেকে মেজর পাভেল ও ক্যাপ্টেন। আলিয়ার গুলি বর্ষণ শুরু হলো। ( উন্মুক্ত কোর্ট ইয়ার্ডে এভাবে আকস্মিক আক্রমণের শিকার হয়ে তারা কেউ শুয়ে পড়ল, কেউ কেউ অফিস কক্ষের উন্মুক্ত দরজার দিকে দৌড়াতে লাগল।
ওরা দরজার কাছাকাছি আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করল আহমদ মুসা। যারা দরজার দিকে ছুটে আসছিল, তাদের সামনে শত্রু ছিল না বলে তাদের সবারই স্টেনগানের ব্যারেল নিচে নামানো।
আহমদ মুসা তার দুই তর্জনী দুই এম-১৬ এর ট্রিগারে রেখে বেরিয়ে এল। চিৎকার করে বলল, ফেলে দাও তোমরা তোমাদের হাতের স্টেনগান।
উত্তরে ওদের সবার স্টেনগান উপরে উঠে আসছিল আহমদ মুসার লক্ষ্যে। আহমদ মুসার দুই এম-১৬ দুই প্রান্ত থেকে গুলি শুরু করল। দুই প্রান্ত থেকে দুই হাত সামনে এসে জোড় হবার আগেই চিৎ হয়ে শুয়ে পড়েছে আহমদ মুসা সামনে থেকে আসা গুলি থেকে আত্মরক্ষার জন্যে। সামনে যে কয়েকজন তাদের পেছনে বিক্ষিপ্তভাবে ছিল আরও কয়েকজন টার্গেটে চলে এলো।
সামনে গুলি বর্ষণ শেষ হবার সাথে সাথেই আহমদ মুসা মাথা সামনে ছুঁড়ে দিয়ে দেহটাক দুই বার ঘুরিয়ে নিল এবং আবার চিৎ হয়েই ভূমিশয্যা নিল। তার হাতে প্রস্তুত দুই এম-১৬ মেশিন রিভলবার। মাটিতে দেহ স্থির হবার আগেই আহমদ মুসার দুই মেশিন রিভলবার অগ্নিবৃষ্টি শুরু করল।
পেছনে আরও যারা আসছিল খোলা দরজা দিয়ে অফিস রুমের দিকে তারাও আহমদ মুসার এই গুলি বৃষ্টির শিকারে পরিণত হলো।
ওদিকে যারা কোনো শেল্টার না পেয়ে মাঠের মাঝখানে শুয়ে পড়েছিল আত্মরক্ষার জন্যে, মেজর পাভেল ও ক্যাপ্টেন আলিয়ার অবিরাম গুলি বৃষ্টির শিকার হওয়ায় তারাও কোনো দিকেই আর সরে যেতে পারেনি। শোয়া অবস্থাতেই তাদের শরীর ঝাঁঝরা হয়ে গেছে।
আহমদ মুসা গুলি বন্ধ করে চারদিকটা দেখে প্রথমে উঠে বসল, তারপর উঠে দাঁড়াল।
প্রথম থেকেই মেজর পাভেল ও ক্যাপ্টেন আলিয়া আহমদ মুসাকে দেখতে পেয়েছিল। তারা আহমদ মুসাকে উঠে দাঁড়াতে দেখল, তখন মেজর পাভেল ও ক্যাপ্টেন আলিয়া গুলি বর্ষণ বন্ধ করে ছুটে বেরিয়ে এলো আহমদ মুসার কাছে।
ধন্যবাদ স্যার, আমরা যুদ্ধে জয়ী হয়েছি। বলল মেজর পাভেল ও ক্যাপ্টেন আলিয়া একসাথে। আবেগে প্রায় অবরুদ্ধ তাদের কণ্ঠ।
ধন্যবাদ তোমাদের। তোমরা তোমাদের দায়িত্ব পুরোপুরি পালন করেছ। এরা দেখছি বিরাট সংখ্যায় এসেছিল। এই মাঠেই দেখা যাচ্ছে। ওদের পঁচিশটি লাশ পড়ে আছে। চল দেখি বাইরে ওরা আমাদের কি ক্ষতি করেছে। বলল আহমদ মুসা।
স্যার, আপনি ভেতরেই অপেক্ষা করুন। বাইরে কোনো শত্রু ওঁৎ পেতে থাকতে পারে। আপনাকে হত্যার জন্যেই তারা এই বিরাট আয়োজন করেছিল। বাইরেটা আমরাই দেখে আসছি। মেজর পাভেল বলল।
স্যার, মেজর পাভেল স্যার ঠিকই বলেছেন। বাইরে শত্রু ওঁৎ পেতে থাকার সম্ভাবনা অবশ্যই আছে। ক্যাপ্টেন আলিয়া বলল।
বাইরে ওদের কোনো লোক নেই। বাইরেটা নিরাপদ করে ওরা সর্বশক্তি নিয়ে ভেতরে ঢুকেছিল। বাইরে কিছু দূরে তাদের ইনফরমার থাকতে পারে। চল। বলল আহমদ মুসা।
সবাই বাইরে এল। গেটে দাঁড়ানো দুইজনসহ মোট ছয়জন নিরাপত্তা। কর্মী মারা গেছে। নিহত প্রত্যেক নিরাপত্তা কর্মীকে চেক করে দেখতে। পেল তাদের উপর আক্রমণ এতোটাই আকস্মিক ছিল যে, কেউ তাদের স্টেনগান হাতে নেবারও সুযোগ পায়নি।
রত্ন দ্বীপের নিরাপত্তা কর্মীরা আগে লাঠি ছাড়া অন্য কোনো অস্ত্র বহন করতো না। কিন্তু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কন্যা ডেসপিনা ও জাহরা নামের অন্য একজন মেয়ে কিডন্যাপ হওয়া ও চারজন নিরাপত্তা কর্মী মারা যাওয়ার পরমুহূর্ত থেকেই নিরাপত্তা কর্মীদের স্টেনগান ও রিভলবার দেয়া হয়েছে।
ক্যাপ্টেন আলিয়া, আপনি আপনার গ্যারিসন থেকে কিছু নিরাপত্তা কর্মীকে ডেকে পাঠান এই মুহূর্তে। আর মেজর পাভেল, আপনি কর্নেল জেনারেল রিদা আহমদকে এক্ষণি সব ঘটনা জানান এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকেও অবহিত করুন। তারা তাদের দায়িত্ব পালন করবেন। আর যতক্ষণ নিরাপত্তা কর্মীরা না আসছে, ততক্ষণ আমরাই বাইরের গেটে পাহারায়। থাকবো।
দশ মিনিটের মধ্যেই ক্যাপ্টেন আলিয়ার গ্যারিসন থেকে দশজন নিরাপত্তাকর্মী এসে গেল। বিশ মিনিটের মধ্যেই এসে গেল স্বয়ং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস কনস্টানটিনোস এবং নিরাপত্তা ফোর্সের প্রধান কর্নেল জেনারেল রিদা আহমদ ও তার সাথের অন্যান্য অফিসার।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস কনস্টানটিনোস, কর্নেল জেনারেল রিদা আহমদ, মেজর পাভেল, ক্যাপ্টেন আলিয়া এবং অন্যান্য অফিসারসহ আহমদ মুসা বসা ওবাদিয়ার পাহাড়ী আউটপোস্ট অফিসে।
গোটা ঘটনার রিপোর্ট দিচ্ছিল মেজর পাভেল। সবে বক্তব্য শেষ করেছে মেজর পাভেল। তখন ক্যাপ্টেন আলিয়ার ইন্টারকম রেড সিগন্যাল দিতে শুরু করল।
ক্যাপ্টেন আলিয়া, দেখ তোমার ইন্টারকম কি বলে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলল।
স্যরি ফর ডিস্টারবিং। আমি দেখছি স্যার।
ক্যাপ্টেন আলিয়া ইন্টারকমে কথা বলল।
কথা বলার পর ইন্টারকম হোন্ড করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে বলল, স্যার, আমার বাবা পাশের রুমে। তিনি আমার সাথে দেখা করতে এসেছেন।
তোমার বাবা মানে ডেভিড অ্যারিয়েল? ডাক, তাকে এখানে ডাক। পাশের রুমে কেন? এ কথা শেষ করেই বলল, ঠিক আছে তুমি নয়, আমিই তার সাথে কথা বলছি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক্যাপ্টেন আলিয়ার হাত থেকে রিসিভার নিয়ে কথা বলল ডেভিড অ্যারিয়েলের সাথে। আসতে বলল এই কক্ষে।
ডেভিড অ্যারিয়েল ও তার বডিগার্ড আসার কথা শুনে চমকে উঠল আহমদ মুসা।
কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ক্যাপ্টেন আলিয়ার পি.এ মার্গারেট ক্যাপ্টেন আলিয়ার বাবা ডেভিড অ্যারিয়েলকে নিয়ে এ ঘরে প্রবেশ করল।
একটা অস্পষ্ট বিপ বিপ শব্দ আসছিল আহমদ মুসার কানে। শেষে সে বুঝল শব্দটা তারই রিস্টওয়াচ থেকে।
আহমদ মুসা দ্রুত এবং সবার অলক্ষ্যে তার চোখ দুটি নামিয়ে নিয়ে এলো তার রিস্টওয়াচের দিকে, তার সন্দেহ কি সত্যি হতে যাচ্ছে। দেখল, তার হাতঘড়ির স্ক্রিনে একটা ফ্লাসিং রেড ডট। চমকে উঠল আহমদ মুসা। একটা শক্তিশালী বোমা তাদের বসে থাকার জায়গা থেকে দশ মিটার পশ্চিমে। তার মানে বোমাটা ক্যাপ্টেন আলিয়ার পি.এর কক্ষে। ঘড়ির স্ক্রিনে বোমার যে রেডিয়াস দেখা যাচ্ছে তার মধ্যে রয়েছে। ক্যাপ্টেন আলিয়ার তিন অফিস কক্ষ, ব্যারাক ও কোর্ট ইয়ার্ডের একাংশ। বোমাটা কার কাছে? কে আনল? বোমাটা যেকোনো সময় বিস্ফোরণ ঘটতে পারে।
আহমদ মুসা দ্রুত এক্সকিউজ মি! বলে উঠে দাঁড়াল। তারপর বলল, মি. ডেভিড অ্যারিয়েল আপনি কি একা এসেছেন?
না, সাথে বডিগার্ড এসেছে। কেন? জবাব দিয়ে প্রশ্ন তুলল ডেভিড অ্যারিয়েল। তার মুখে বিরক্তির প্রকাশ স্পষ্ট।
আহমদ মুসা ডেভিড অ্যারিয়েলের প্রশ্নের জবাব না দিয়ে মনে মনে হিসাব করল, ডেভিড অ্যারিয়েল তার বডিগার্ড নিয়ে অফিসে, প্রবেশের কমপক্ষে পাঁচ মিনিট পার হয়েছে। নিশ্চয় বোমাটি দূর নিয়ন্ত্রিত। পাঁচ মিনিট কম সময় নয়, আর কত সময় দেবে ওরা! _ বিব্রত ক্যাপ্টেন আলিয়া, বিস্মিত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ সবাই তাকিয়ে আছে। আহমদ মুসার দিকে।
আহমদ মুসা তাকাল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দিকে। বলল, মি, হোম মিনিস্টার ক্রিস কনস্টানটিনোস, আপনার ধ্যমে সবার কাছে আমার অনুরোধ, এই মুহূর্তে এই ঘর ত্যাগ করে আমাদের কোর্ট ইয়ার্ডের দক্ষিণ প্রান্ত পর্যন্ত যেতে হবে এবং সেটা খুবই দ্রুত! বলে নিজে তার ব্যাগটা নিয়ে যাবার জন্যে পা বাড়াল।
কিন্তু কেন মি. আহমদ মুসা? জিজ্ঞাসা করল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
নিচু, কিন্তু স্পষ্ট কণ্ঠে আহমদ মুসা বলল, আমি আশঙ্কা করছি, যেকোনো সময় এখানে ভয়ংকর বোমার বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। বলল আহমদ মুসা।
আহমদ মুসার কথা বিদ্যুৎ স্পৃষ্টের মতো কাজ করল। সবাই দ্রুত উঠে দাঁড়াল।
ক্যাপ্টেন আলিয়ার আব্বাও। কিন্তু সে দ্রুত উঠে দাঁড়িয়ে বলল, আমার বডিগার্ডের কাছে আমার একটা জরুরি ডকুমেন্ট আছে, ওটা নিয়ে আমি এখনই আসছি।
বলে পাশের ঘরের দিকে যাবার জন্যে সে পা বাড়াল।
আহমদ মুসা তার সামনে দাঁড়িয়ে বাধা দিয়ে বলল, আপনি ঐ ঘরে যেতে পারেন না। আপনি বাইরে চলুন।
আমি তাহলে বডিগার্ডকে ডাকছি? বলল ক্যাপ্টেন আলিয়ার আব্বা
ডেভিড অ্যারিয়েল একটু শক্ত কণ্ঠে।
আপনি বডিগার্ডকে ডাকতেও পারবেন না, তার সাথে কথাও বলতে পারবেন না। আপনি প্লিজ বাইরে চলুন। আহমদ মুসার কণ্ঠ শান্ত, কিন্তু খুবই শক্ত।
অপমানিত হবার চিহ্ন ফুটে উঠল ডেভিড অ্যারিয়েলের চোখে-মুখে। বলল লে আহমদ মুসাকে, আপনি সৌজন্যের সীমা লংঘন করেছেন।
সে বিচার পরে হবে। আপনি প্লিজ এখন চলুন। আগের সেই শক্ত কণ্ঠ আহমদ মুসার।
ক্যাপ্টেন আলিয়া এবং মেজর পাভেল দুজনেই দাঁড়িয়ে আছে। বিমূঢ় ভাবে। তারা বিব্রত। ডেভিড অ্যারিয়েল যা বলছেন, তার পেছনে যুক্তি আছে। কিন্তু আহমদ মুসা কেন বডিগার্ডকে ডাকতে ও কথা বলতেও দিতে রাজি নয়- এটা তারা কিছুতেই বুঝতে পারছে না। বোমার ব্যাপারটা সত্য হলে বডিগার্ডেরও তো বাঁচা দরকার। কিন্তু তবুও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আহমদ মুসার সিদ্ধান্তকেই সমর্থন করছে।
শেষ পর্যন্ত সবাই প্রায় বেরিয়ে গেলে ক্যাপ্টেন আলিয়া তার বাবাকে ধরে নিয়ে ঘর থেকে বাইরে বেরুবার জন্যে হাঁটতে লাগল।
সবার শেষে আহমদ মুসা বেরিয়ে এলো ঘর থেকে।
কোর্ট ইয়ার্ডের দক্ষিণ প্রান্তে অনেকেই পৌঁছে গেছে। অনেকে মাঠের মাঝ বরাবর।
আহমদ মুসা যখন বোমার রেডিয়াস সার্কেল পার হতে যাচ্ছে, তখন ভীষণ শব্দে মাটি কেঁপে উঠল। প্রচণ্ড বিস্ফোরণের শব্দ হলো।
আহমদ মুসা ছিটকে পড়ার মতো শব্দের সাথে সাথেই লাফ দিয়ে পড়ল গিয়ে বেশ খানিকটা দূরে মাটির উপর।
ধোঁয়ায় ছেয়ে গেল চারদিক।
আহমদ মুসা মাটির উপর শুয়ে ভাবল ক্যাপ্টেন আলিয়ার পি.এ. মার্গারেটের কথা। কষ্ট লাগল মনে। নিরপরাধ মেয়েটা কি প্রাণ হারাল? ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও তাকে ডাকা গেল না। তাকে ডাকতে গেলেই ডেভিড অ্যারিয়েলের বডিগার্ড সব জানতে পারত। বডিগার্ড বেরিয়ে গেলে বিপদ আরও বাড়ত।
ঘন ধোঁয়ায় ঢেকে গেছে চারদিকটা।
কোর্ট ইয়ার্ডের একদম শেষ প্রান্তে গিয়ে দাঁড়িয়েছে স্বরাষ্ট্রান্ত্রী, কর্নেল জেনারেল রিদা আহমদ ও অন্যান্য স্টাফ। ওখানে ধোঁয়া তেমন পৌঁছেনি।
সেখানে গিয়ে পরে পৌঁছল তার বাবাসহ ক্যাপ্টেন আলিয়া এবং তাদের সাথে মেজর পাভেলও।
আহমদ মুসা কোথায়? সবাই আমরা এখানে পৌঁছেছি। তিনি কোথায়? স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জিজ্ঞাসা করল মেজর পাভেল ও ক্যাপ্টেন। আলিয়াকে।
উনি সব শেষে কক্ষ থেকে বেরিয়েছেন। উনি আমাদের সাথেই ছিলেন। নিশ্চয় তিনি আছেন কোথাও।
তাকে দেখ। ডাকো। তিনি সাক্ষাৎ দেবদূতের মতো আমাদের রক্ষা করেছেন। ঈশ্বর তাকে কি অদ্ভুত ক্ষমতা দিয়েছেন। তিনি বাতাস থেকে বিপদের সন্ধান পেলেন এবং আমাদের রক্ষা করলেন। সমস্ত জীবনের জন্যে তিনি আমাদের কৃতজ্ঞতা পাশে বেঁধে ফেলেছেন। বলল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি তো আমাকে হাত ধরে মৃত্যুর মুখ থেকে টেনে এনেছেন। আমি তো তার মত উপেক্ষা করেই ওঘরে যাচ্ছিলাম বডিগার্ডের কাছে। গেলে নির্ঘাত বিস্ফোরণের কবলে পড়তাম। সে সময় আহমদ মুসার রূঢ় আচরণ আমার খুব খারাপ লেগেছিল, কিন্তু তার ঐ রূঢ় আচরণই আমাকে রক্ষা করেছে। তার সম্পর্কে আগেও আমি শুনেছি কিন্তু ভাবিনি, এমন বিস্ময়কর মানুষ তিনি যাকে শুধু শ্রদ্ধাই করা যায়। ক্যাপ্টেন আলিয়ার বাবা ডেভিড অ্যারিয়েল বলল।
আহমদ মুসা এল।
আহমদ মুসাকে দেখেই ক্যাপ্টেন আলিয়ার বাবা ডেভিড অ্যারিয়েল তাকে জড়িয়ে ধরে বলল, আমার তখনকার ব্যবহারের জন্যে আমি দুঃখিত। আপনার কথা না শুনলে আমি মারা পড়তাম। আপনি আমাকে বাঁচিয়েছেন নির্ঘাত এক মৃত্যুর হাত থেকে।
কাউকে মারা বা বাঁচানো সব আল্লাহ তায়ালার কাজ। তাঁকেই ধন্যবাদ দিন। আমি আপনাকে কয়েকটা কথা বলতে চাই, বলতে পারি? বলল আহমদ মুসা।
আহমদ মুসাকে স্বাগত জানিয়ে বলল, আপনাকে কোনো সাহায্য করতে পারলে আমি খুশি হবো। বলুন। ডেভিড অ্যারিয়েল বলল।
আপনার বডিগার্ড যাকে এনেছিলেন, তাকে কতদিন ধরে চেনেন? বলল আহমদ মুসা।
আমার আগের বডিগার্ড ছুটিতে। নতুন বডিগার্ডকে নিয়োগ দিয়েছি তিন চার দিন হলো। বলল ডেভিড অ্যারিয়েল।
একে কোত্থেকে পেয়েছেন? আগে থেকে পরিচিত?
আগে থেকে পরিচিত নয়। আমার এক বন্ধুর রিকমেন্ডেশনে তাকে আমি নিয়েছি। বলল ডেভিড অ্যারিয়েল।
সেই বন্ধুটি আপনার সাথে পরিচিত কত দিন থেকে? জিজ্ঞাসা করল আহমদ মুসা।
সপ্তাহ দুই থেকে পরিচিত। হঠাৎ করেই তাদের সাথে পরিচিত হই। বলল ডেভিড অ্যারিয়েল।
আমি নিশ্চিত, আপনার সে বন্ধুরাই আপনার বডিগার্ডের মাধ্যমে বোমাটা পাঠিয়েছিল। আহমদ মুসা বলল।
আমাকে হত্যার জন্যে? বলল ডেভিড অ্যারিয়েল। তার চোখে-মুখে উদ্বেগ।
না আপনাকে নয়, আমাকে হত্যার জন্যে। কিন্তু তারা জানত আমাকে এভাবে হত্যা করতে গিয়ে আপনি, আপনার বডিগার্ডসহ সবাই নিহত হবেন। বলল আহমদ মুসা।
কিন্তু বডিগার্ড তো তাদের লোক। তাকে তারা হত্যা করবে কেন? বলল ডেভিড অ্যারিয়েল।
অনেক সময় বড় লাভ করতে গিয়ে ছোট লাভ কুরবানী দিতে হয়। আহমদ মুসা বলল।
কিন্তু বডিগার্ডটি তার মৃত্যুর কথা জেনেও কেন বোমাটি বহন করবে? বলল ডেভিড অ্যারিয়েল।
আমি নিশ্চিত, বডিগার্ড জানত না যে সে বোমা বহন করছে। পকেটে বহন করার মতো একটা প্যাকেট দিয়ে তাকে নিশ্চয় এ ধরনের কথা বলা হয়েছিল যে, প্যাকেটে একটা সাউন্ড মনিটরিং আছে, এটা শুধু বহন করলেই চলবে। আহমদ মুসা বলল।
এত নৃশংস ওরা? তাদের স্বার্থ পূরণের জন্যে তাদের লোক, আমাকেসহ এত লোককে তারা হত্যা করতে চেয়েছে! বলল ডেভিড অ্যারিয়েল।
আহমদ মুসা তাকাল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দিকে। বলল, মি. হোম মিনিস্টার, আপনি এদিকের জন্যে কি ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার তা করুন। আমি মনে করছি, আইন-শৃখলা পরিস্থিতি নিয়ে একটু বসা দরকার।
মি. ডেভিড অ্যারিয়েলের নতুন বন্ধু যারা জড়িত এই বোমা বিস্ফোরণের সাথে, তাদের পাকড়াও করা গেলে তো আমরা অনেক কিছু জানতে পারবো। মি. ডেভিড অ্যারিয়েল নিশ্চয় আমাদের সহযোগিতা করবেন। বলল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস কনস্টানটিনোস।
মি. ডেভিড কনস্টানটিনোস এ ব্যাপারে আমাদের কোনো সহযোগিতা করতে পারবেন না, উপরন্তু তাঁর বন্ধুদের ব্যাপারটা যে এখানে আলোচনা হয়েছে, আমরা তাদের সন্দেহ করেছি, এ বিষয়টাও তাদের জানতে দেয়া যাবে না। এ ব্যাপারে মি. ডেভিড অ্যারিয়েল তাদেরকে কিছু জানানো ঠিক হবে না।
কেন? প্রশ্ন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর।
মি. ডেভিডকে কোনওভাবে তারা সন্দেহ করলে, কিংবা মি. ডেভিডের প্রতি তারা বিশ্বাস হারালে, মি. ডেভিডকে তারা বাঁচতে দেবে না। বলল আহমদ মুসা।
ভীতি ও আশঙ্কায় মুখ চুপসে গেছে ডেভিড অ্যারিয়েলের। বলল, জনাব আহমদ মুসা ঠিক বলেছেন। ওরা এটা করতে পারে।
করতে পারে নয় জনাব করবে। আমি তো আশঙ্কা করছি মি. ডেভিড অ্যারিয়েল। যেকোনো সময় বিপদ ঘটতে পারে। এই বোমা বিস্ফোরণের জন্যে আপনার বডিগার্ডকে সন্দেহ করা হবে এবং সেই হেতু আপনিও সন্দেহের তালিকায় পড়বেন। আপনি তাদের কথা ফাঁস করে দিতে পারেন। সুতরাং প্রথমেই ওরা চেষ্টা করবে আপনার মুখ বন্ধ করার জন্যে। বলল আহমদ মুসা।
মি, আহমদ মুসা আপনি যা বলেছেন, সেটাই ঘটবে। আমি তাদের। জানি। তাহলে এখন আমি কি করব? ডেভিড অ্যারিয়েল বলল। তার দিশেহারা অবস্থা।
আমি মনে করি আপনার নিরাপত্তার সহজ উপায় হলো একথা ঘোষণা করে দেয়া যে, নিরাপত্তা বাহিনী আপনাকে গ্রেফতার করেছে। আমি মনে করি আপনি রাজধানীতে গিয়ে কয়েকদিন নিরাপত্তা বাহিনীর প্রোটেকশনে থাকুন। বলল আহমদ মুসা।
ডেভিড অ্যারিয়েল তাকাল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস কনস্টানটিনোসের দিকে।
হ্যাঁ মি. ডেভিড অ্যারিয়েল আহমদ মুসা ঠিক বলেছেন। আপনি আমাদের সাথে রাজধানীতে চলুন। নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে কয়েকদিন থাকুন আমাদের মেহমান হিসাবে।
বলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাকাল কর্নেল জেনারেল রিদার দিকে। বলল, তুমি ওর জন্যে একটা ভালো ব্যবস্থা করো।
আমি যদি রাজধানীতে কোনো আত্মীয়ের বাড়িতে আত্মগোপন করে থাকি, কিংবা দেশের বাইরে যাই? বলল ডেভিড অ্যারিয়েল।
দেখুন মি. ডেভিড অ্যারিয়েল, আপনি এমনকি নিরাপত্তা বাহিনীর কাস্টোডিতে থাকলেও আপনাকে ওরা উদ্ধার ও মুখ বন্ধ করার চেষ্টা করবে। কারণ আপনিই একমাত্র জীবন্ত সাক্ষী তাদের বিরুদ্ধে। বিদেশেও আপনি নিরাপদ নন। আহমদ মুসা বলল।
ডেভিড অ্যারিয়েল হতাশভাবে তাকাল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দিকে। বলল, আপনি যা বলেছেন তাই করুন।
মি. ডেভিড অ্যারিয়েল, আপনার কাছে আমার একটা অনুরোধ আছে। আমি এখনি এই পাহাড়ে ঢুকতে চাই। আমি মনে করি এই ওবাদিয়ার পাহাড়ে ওদের একটা ঘাটি বা আস্তানা ধরনের কিছু আছে। আপনি কি আমাকে কোনো সাহায্য করতে পারেন? বলল আহমদ মুসা।
আহমদ মুসা ওবাদিয়ার পাহাড়ে ঢুকবে শত্রুদের ঘাঁটির সন্ধানে, একথা শোনার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, কর্নেল জেনারেল রিদা আহমদ, মেজর পাভেল, ক্যাপ্টেন আলিয়াসহ উপস্থিত সব নিরাপত্তা অফিসারের চোখে মুখে বিস্ময় ও উদ্বেগ দেখা দিল। বিস্ময়ে মুখ ছেয়ে গেছে ডেভিড অ্যারিয়েলেরও। আহমদ মুসার অনুরোধের জবাব সে সংগে সংগে দিল না। তার দুচোখে শূন্য দৃষ্টি। ভাবছে সে। এক সময় তার শূন্য দৃষ্টি গিয়ে নিবদ্ধ হলো আহমদ মুসার মুখে। বলল ধীরকণ্ঠে, আপনার সম্পর্কে আমি শুনেছি আহমদ মুসা। আপনার কাছে আমি কিছুই লুকাতে পারবো না। আপনি ইতিমধ্যেই হয়তো সব জেনে ফেলেছেন। আপনার প্রশ্ন শুনে আমার কাছে মনে হয়েছে আমার সম্পর্কে আপনার অজানা কিছু নেই। এরপরও আপনি আমাকে রক্ষা করেছেন, নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে আপনার চেয়ে বড় বন্ধু আমার আর কেউ নেই। কথা শেষ করতে পারলো না ডেভিড অ্যারিয়েল। কান্নায় কণ্ঠে কথা আটকে গেল তার।
কান্না চেপে ডেভিড অ্যারিয়েল পকেট থেকে রুমাল বের করে চোখ মুছল। বলল সে কান্নাজড়িত কণ্ঠে, আমি আমার জনগণের কাছে অপরাধ করেছি। আমার দেশ আমাকে যে শাস্তি দেয় আমি তা মাথা পেতে নেব। আমি আমার জীবন ও পরিবারের নিরাপত্তার কথা ভেবে ওদের কথায় সায় দিয়ে, ওদের সাহায্য করে আমার দেশকে আমি বিপদে ফেলতে যাচ্ছিলাম। থামল ডেভিড অ্যারিয়েল।
ক্যাপ্টেন আলিয়ার দুচোখ থেকে অশ্রু গড়াচ্ছে। সে আস্তে আস্তে পিতার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। পিতার কাঁধে হাত রেখে বলল, বাবা আমি তোমার জন্যে গর্বিত। তুমি দেশকে ভালোবাস বলেই এই সাহসের কথাগুলো বলতে পারলে বাবা।
ডেভিড অ্যারিয়েল তাকাল মেয়ের দিকে। বলল, আহমদ মুসার মানবতা, মানুষের প্রতি ভালোবাসা আমাকে এই সাহস যুগিয়েছে মা, আমাকে সংশোধনও করেছে। ডেভিড অ্যারিয়েলের কণ্ঠ আবেগে ভারি।
হ্যাঁ বাবা, উনি আল্লাহর এমন একজন প্রিয় বান্দাহ যার কাছে বিপন্ন মানুষের সাহায্য ও সেবার চেয়ে বড় কিছু নেই। বলল ক্যাপ্টেন আলিয়া অঞরুদ্ধ কণ্ঠে।
ডেভিড অ্যারিয়েল রুমালে ভালো করে চোখ-মুখ মুছে নিয়ে দুধাপ পিছিয়ে গিয়ে ঘাসের উপর বসে পড়ল। বলল, মি, আহমদ মুসা আসুন। বসে কথা বলি। আহমদ মুসা গিয়ে তার সামনে বসল।
ডেভিড অ্যারিয়েল তার কিডন্যাপ হওয়া থেকে কথা শুরু করল। বন্দী থাকার অবস্থা, মিড ব্ল্যাক সিন্ডিকেট তাদের পরিকল্পনার কথা তাকে বলা, প্রলোভন দেখানো ইত্যাদি সবকিছুই একে একে আহমদ মুসাকে সে বলল। তাদের কাছে থেকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ওদের যা কিছু জেনেছে, দেখেছে সবকিছু সে জানাল আহমদ মুসাকে। তারপর ওদের আস্তানার বিবরণ, সেখানে যাবার পথ সবই বলল সে আহমদ মুসাকে। সবশেষে সে বলল, অঢেল ধনভাণ্ডার উদ্ধার করার জন্যে দ্বীপের যত লোক তাদের মারার দরকার হবে তারা তা মারবে।
শুধু দ্বীপের গোপন ধনভাণ্ডার লুট করাই কি তাদের লক্ষ্য, না আরও। কিছু লক্ষ্য আছে? বলল আহমদ মুসা।
মিড ব্ল্যাক সিন্ডিকেটের মূল লক্ষ্য দ্বীপের ধনভাণ্ডার লুট করা। তবে যারা তাদের অর্থ যোগাচ্ছে, তারা চায় দ্বীপে মুসলিম-খ্রিস্টান-ইহুদি সমঝোতা ও সহযোগিতাকে ধ্বংস করতে এবং সমঝোতা-সহযোগিতার অনন্য দৃষ্টান্তকে তারা এই দেশ থেকে মুছে ফেলতে চায়। এর মাধ্যমে তারা এই দ্বীপকেও তাদের দখলে আনতে চায়। ডেভিড অ্যারিয়েল বলল।
এই পক্ষটা কে বা কারা? বলল আহমদ মুসা।
আমি এটা জানতে পারিনি। তারা এ ব্যাপারে মুখ খোলেনি। দেখেছি, মিড ব্ল্যাক সিন্ডিকেট ঐ পক্ষকে বাঘের মতো ভয় করে। ওদের কোনো কথার অন্যথা তারা করে না। ডেভিড অ্যারিয়েল বলল।
ধন্যবাদ মি. ডেভিড অ্যারিয়েল। আপনার এই সাহায্য আমার কাছে অমূল্য। অনেক ধন্যবাদ! বলল আহমদ মুসা।
দুজনেই উঠে দাঁড়াল।
আহমদ মুসাদের দিকে এগিয়ে এলো স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস কনস্টানটিনোস। বলল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, ধন্যবাদ ডেভিড অ্যারিয়েল। আর মি. আহমদ মুসা। আমরা আনন্দিত যে প্রয়োজনীয় সব তথ্যই পেয়েছেন। রত্ন দ্বীপের স্বার্থে আপনার এই ত্বরিত উদ্যোগকে আমরা অভিনন্দিত করছি। কিন্তু একটা ব্যাপারে আপনার সিদ্ধান্ত আমরা মানতে পারছি না। এখানে আমরা সবাই আলোচনা করে দেখলাম, আপনাকে এখনই এবং একা.আমরা ওবাদিয়ার পাহাড়ে যেতে দিতে পারি না।
হাসল আহমদ মুসা। বলল, আমরা বলা যায় এখন যুদ্ধক্ষেত্রে। শত্রুকে অপ্রস্তুত অবস্থায় ধরে ফেলা যুদ্ধের একটা মূল্যবান কৌশল। শত্রু কোনো নতুন পরিকল্পনা করার আগেই শত্রুর নিকট আমি পৌঁছতে চাই।
আমরা আপনার সাথে দ্বিমত করি না। ঠিক আছে আপনি যান। সিকিউরিটি ফোর্স সাথে নিন। মেজর পাভেল, ক্যাপ্টেন আলিয়া তো আপনার পরিচিত হয়ে গেছে। বলল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস কনস্টানটিনোস।
আমি ওবাদিয়ার পাহাড়ে যুদ্ধ করতে যাচ্ছি না। আমি যাচ্ছি মিড ব্ল্যাক সিন্ডিকেট সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানতে। এ কাজের জন্যে ওদের আস্তানায় ঢুকতে হবে। এই কাজটা করতে হবে গোপনে, অতি সন্তর্পণে। এই ধরনের কাজ তাই একা করতে হয়। আহমদ মুসা বলল।
গোপন অভিযান একাধিক লোক নিয়েও হতে পারে। আপনি অন্তত: মেজর পাভেলকে সাথে নিয়ে যান। বলল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
হা মি. ক্রিস কনস্টানটিনোস, আমি মেজর পাভেলকে সাথে নিতে পারি সে যদি এই ঝুঁকি নিতে রাজি হয়। আহমদ মুসা বলল।
আপনার সাথী হতে পারলে আমি মরতেও রাজী আছি। আপনাকে ধন্যবাদ স্যার। বলল মেজর পাভেল।
ধন্যবাদ মেজর পাভেল। মৃত্যুভয়কে যে জয় করতে পারে, সে ভালো সাথী। আল হামদুলিল্লাহ। আহমদ মুসা বলল।
মেজর পাভেল স্যার যাচ্ছে স্যারের সাথে। আমিও যাব। বলল ক্যাপ্টেন আলিয়া।
না ক্যাপ্টেন আলিয়া। তুমি ওবাদিয়া গ্যারিসনের দায়িত্বে আছ। তোমাকে এখানেই থাকতে হবে প্রস্তুত হয়ে। এটা আমার অনুরোধ। আহমদ মুসা বলল।
অনুরোধ নয় স্যার, আদেশ বলুন। আমি আপনার আদেশ পালন করব। বলল ক্যাপ্টেন আলিয়া।
ধন্যবাদ ক্যাপ্টেন আলিয়া। আহমদ মুসা বলল।
স্যার, আমার একটা জিজ্ঞাসা আছে। আপনি আমাদের সবার সাথে বসে ছিলেন। আপনি জানলেন কি করে যে, আমার পি.এ-র ঘরে বোমা আছে এবং সে বোমা আছে বাবার বডিগার্ডের কাছে? বলল ক্যাপ্টেন আলিয়া।
ধন্যবাদ ক্যাপ্টেন আলিয়া, এ প্রশ্ন আমারও। সুযোগ হয়নি প্রশ্নটা করার। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলল।
অন্যান্য সবাই একযোগে বলে উঠল, এ বিষয়ে আমাদের মনেও কৌতূহল রয়েছে। আমরাও জানতে চাই তিনি কিভাবে এটা সম্ভব করলেন?
হাসল আহমদ মুসা। বলল, যখন শুনলাম ডেভিড় অ্যারিয়েল, তার বডিগার্ডসহ এখানে এসেছেন মিড ব্ল্যাক সিন্ডিকেটের এত বড় বিপর্যয়ের পরও, তখনই মনে হলো মিড় ব্ল্যাক সিন্ডিকেট এদের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক পাল্টা আঘাতের ষড়যন্ত্র করেছে কিনা। চিন্তা করলাম পাল্টা আঘাত কি হতে পারে? এই প্রশ্নের সন্ধান করতে গিয়ে আমি আমার হাতঘড়ির ডেটোনেশন মনিটর অন করে দিয়েছিলাম। হাতঘড়ির এই ডেটোনেটরই পাশের ঘরের বোমা ডিটেক্ট করেছে। আমি সংগে সংগেই বুঝেছিলাম ডেভিড অ্যারিয়েলের বডিগার্ডই জেনে অথবা না জেনে বোমাটি বহন করছে, যা দূর নিয়ন্ত্রিত হবার সম্ভাবনাই বেশি। সম্ভাবনা সত্য প্রমাণ হয়েছে। বাইরের কোনো এক স্থান থেকে বোমাটির বিস্ফোরণ ঘটানো, হয়েছে।
কথা শেষ করেই কাউকে কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে বলল, আর কোনো কথা নয়। আমাকে এখনি বেরুতে হবে। বলে আহমদ মুসা তাকাল মেজর পাভেলের দিকে।
