৫
পাহাড়ী মেষপালকের পোষাকে আহমদ মুসা ও মেজর পাভেল হাঁটছিল পাহাড়ের অপ্রচলিত একটা পাহাড়ী পথ ধরে।
আহমদ মুসা আগে আগে হাঁটছে, মেজর পাভেল তার পেছনে পেছনে।
আহমদ মুসা ও মেজর পাভেল দুজনেরই কাঁধে ঝুলানো মেষপালকের ব্যাগ। হাতে তাদের একটি করে মেষপালকের মতোই বিশেষ লাঠি।
ওবাদিয়ার পাহাড় অঞ্চল খুব বড় নয়। কিন্তু দুর্গম। উঁচু, নিচু পাহাড়ের অবিন্যস্ত সারি। মাঝে মাঝে আঁকা বাঁকা উপত্যকা। বেশির ভাগ পাথুরে অঞ্চল। অনেক উপত্যকা সবুজ ঘাসে ঢাকা। উর্বর উপত্যকাও আছে। পাহাড়ী কিছু মানুষ রত্ন দ্বীপের পাহাড় এলাকায় বাস করে। ওবাদিয়ার পাহাড় এলাকায়ও তারা আছে। পশুপালন ও ফল উৎপাদন তাদের কাজ। দুধ, পশম, চামড়া, গোশত ও ফলের ব্যবসায় তাদের আয়ের উৎস। ফলের গুচ্ছের মতো ওরা চার পাঁচটি করে পরিবার পাহাড়ের বিভিন্ন স্থানে বাস করে। পাহাড়ের বুকে ছোট ছোট স্থাপনা গড়ে ওরা বাস করে থাকে।
ডান দিকে পাহাড়ের উপর একগুচ্ছ স্থাপনা দেখিয়ে আহমদ মুসা বলল, মেজর পাভেল, তুমি এই পাহাড়ীদের কেমন জান? এদের সাথে মিশেছ?
পাহাড়ে এবং পাহাড়ের বাইরেও এদের সাথে দেখা সাক্ষাৎ হয়েছে। ওদের গ্রামেও আমি গিয়েছি। আমাদের নিরাপত্তা বাহিনীতেও এদের কিছু লোক আছে। মেজর পাভেল বলল।
আহমদ মুসারা পথ চলছিল কখনও পরিচিত পথ ধরে, কখনও চিহ্নহীন অপরিচিত পথে। ডেভিড অ্যারিয়েল যে স্কেচ দিয়েছিল, তার সামনে রেখে তার আশপাশ দিয়েই পথ চলছিল আহমদ মুসারা।
ডেভিড অ্যারিয়েল যে পথ বাতলিয়েছে, তাতে মিড় ব্ল্যাক সিন্ডিকেটের আস্তানার দিকে অগ্রসর হবার প্রথম যে চিহ্ন, ত্রিভুজ পাহাড়, তা এখনও পাওয়া যায়নি। তার মানে এখনও অনেক পথ বাকি।
দুই ঘন্টার পথ চলেছে আহমদ মুসা।
পাহাড় ডিঙিয়ে উপত্যকা ঘুরে আসতে হয়েছে। খুব বেশি দূর আসা যায়নি।
পায়ের নিচে রাস্তাটা পাথুরে এবং এবড়ো-থেবড়ো। সুতরাং আশে পাশে চোখ রাখলেও নিচের দিকে তাকিয়ে সাবধানে পা ফেলতে হচ্ছে।
হঠাৎ মাটিতে পড়ে থাকা আধাপোড়া একটা সিগারেটের দিকে আহমদ মুসার নজর পড়ল। আহমদ মুসা সিগারেট খণ্ডটি একটু ঝুঁকে পড়ে তুলে নিল।
সিগারেট খণ্ডে হাত দিয়েই চমকে উঠল আহমদ মুসা। বেশ একটু গরম সিগারেট খণ্ডটি। তার মানে অল্পক্ষণ আগে এই পথ দিয়ে এক বা একাধিক লোক গেছে। কারা ওরা?
মেজর পাভেল, পাহাড়ী লোকরা কি ব্রান্ডের সিগারেট খায়? জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।
পাহাড়ীদের দুএকজন সিগারেট খায়, কিন্ত ব্রান্ডের সিগারেট নয়। পাহাড়ীরা অল্প সংখ্যক যারা ধূমপান করে, তারা এক ধরনের সিগারেট নিজেরা তৈরি করে তামাক পাতা এবং আরও কিছু মিলিয়ে। এগুলো ব্রান্ড সিগারেট থেকে অনেক সফট। তাই ব্রান্ড সিগারেট পাহাড়ে চলে না।
ধন্যবাদ মেজর পাভেল। আমার মনে হচ্ছে, কিছুক্ষণ আগে এই পথ দিয়ে শক্ররা গেছে বা এসেছে।
বলে দাঁড়িয়ে পড়ল আহমদ মুসা। তার সাথে মেজর পাভেলও তার পাশে এসে দাঁড়াল।
চারদিকে তাকাল আহমদ মুসা। চারদিকে ভালো করে তাকাতে গিয়ে সামনেই দেখল একটি পাহাড়। যে পাহাড়টাকে তার কাছে ত্রিভুজ বলে মনে হলো। ত্রিভুজের টপটা তাদের নাক বরাবর সামনে।
আহমদ মুসার সমস্ত মনোযোগ কেড়ে নিল পাহাড়ের ত্রিভুজ আকৃতি। ডেভিড অ্যারিয়েলের দেয়া তথ্য অনুসারে এই পাহাড়টিই মিড ব্ল্যাক সিন্ডিকেটের এলাকায় প্রবেশের প্রথম গেটওয়ে।
আহমদ মুসার মনোযোগে ছেদ নামল। পেছন থেকে শব্দ পেল। পায়ের অস্পষ্ট শব্দ বলে মনে হলো
সংগে সংগেই আহমদ মুসা শোল্ডার হোলস্টার থেকে রিভলবার বের করে ঘুরে দাঁড়াতে যাচ্ছিল। তার আগেই একটা ভারি কিছু মাথার পেছন দিকে চেপে বসল। এই সাথে একটা বাজখাই কণ্ঠ চিৎকার করে উঠল, চালাকির কোনো চেষ্টা করো না। দুই হাত উপরে তোল।
আহমদ মুসা কোনো ঝুঁকি নিল না। শত্রুরা কতজন, কি অবস্থায় আছে, তা সে জানে না।
আহমদ মুসা রিভলবারসহ দুহাত উপরে তুলল। মেজর পাভেলও হাত উপরে তুলেছে।
হাত থেকে রিভলবার ফেলে দাও। সেই বাজখাই গলাই আবার চিৎকার করে উঠল।
আহমদ মুসা হাত থেকে রিভলবার মাটিতে ছেড়ে দিল।
তোমরা কে, কারা? তোমরা আমাদের উপর এভাবে এসে পড়লে কেন?
বলতে বলতে আহমদ মুসা ঘুরে দাঁড়াল অনেকটা বেপরোয়া হয়েই, পেছনটা দেখার জন্যে।
পেছনে ওরা তিনজন। তিনজনের হাতেই রিভলবার।
আহমদ মুসারা তাদের নির্দেশ মোতাবেক হাতের রিভলবার ফেলে দেয়ায় শত্রুরা অনেকটা নিশ্চিন্ত হয়েছে। রিভলবারের ট্রিগার থেকে তাদের তর্জনি সরে গেছে। তাদের রিভলবারগুলো পয়েন্টেড নয়।
তোমরা কারা? আমাদের দিকে রিভলবার তুলেছ কেন? বলল আহমদ মুসা শত্রুদের উদ্দেশ্যে।
এই প্রশ্ন তো আমাদেরও। তোমাদের তো পাহাড়ের কেউ বলে মনে হচ্ছে না। তোমরা এদিকে কোথায় যাচ্ছ? শত্রুদের একজন বলল।
আমরা পাহাড়ী। থাকি বাইরে। আত্মীয়ের বাড়ি যাচ্ছি। বলল আহমদ মুসা।
তোমরা যাচ্ছ ত্রিভুজ পাহাড়ের দিকে। ওদিকে তো গ্রাম নেই। শত্রু সেই লোকটি বলল।
হঠাৎ আহমদ মুসার মনে পড়ে গেল ডেভিড অ্যারিয়েলের কাছে শোনা কথা। ত্রিভুজ পাহাড়ের পর ওদের প্রভাবিত এলাকা শুরু হলেও আরও একটু ভেতরে বামদিকে ত্রিয়াদা নামে একটা পাহাড়ী এলাকা আছে। এই এলাকাটা তারা নিশ্চিহ্ন করার ষড়যন্ত্র করছে।
গ্রামের নামটা মনে হওয়ার সাথে সাথেই আহমদ মুসা বলে উঠল, ক্রিয়াদার একটা গ্রামে আমরা যাচ্ছি।
ত্রিয়াদার একটা গ্রামে? তোমরা যেতে পারবে না সেখানে। ওদিকে কারও যাওয়া আজ নিষেধ। তোমাদের হাতে রিভলবার কেন?
চারদিকে যে মারামারি চলছে, তাতে বাঁচার জন্যে রিভলবার না রেখে উপায় কি। আপনাদের হাতেও তো রিভলবার দেখছি। যে আশঙ্কায় আপনাদের হাতে রিভলবার, সে আশঙ্কায় আমরাও। বলল আহমদ মুসা।
যা জান না, তা নিয়ে আর বকবক করো না। বলে শত্রুরা তিনজনই রিভলবার তাক করল আহমদ মুসা ও মেজর পাভেলের দিকে। বলল, তোমরা যদি বাঁচতে চাও, তাহলে যেখান থেকে এসেছ সেখানে ফিরে যাও এখনি।
তোমরা এভাবে নির্দেশ দিচ্ছ কেন? তোমরা তো পুলিশ নও। তাহলে তোমাদের কথা শুনব কেন? বলল আহমদ মুসা।
আমরা তোমাদের কিছুতেই ত্রিয়াদা এলাকায় যেতে দেবো না। আজ ওদিকে অপরিচিত কারও যাওয়া নিষিদ্ধ। বলল শত্রুদের একজন।
আমরা তো ত্রিয়াদায় অপরিচিত নই। আমরা যেতে পারবো না কেন? বলল আহমদ মুসা।
আর একটা কথাও নয়। দশ পর্যন্ত গুণব। এর মধ্যে না গেলে গুলি করব। শত্রুদের একজন বলল।
লোকটি গনা শুরু করেছে। গনা শুরুর সাথে সাথে তাদের তিনজনেরই তর্জনি উঠে এসেছে রিভলবারের ট্রিগারে।
গুণা ছয় অতিক্রম করেছে।
আহমদ মুসা শান্ত কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে বলল, গনা থামাও। আমাদের মারতে চাইলে তোমরাও মরবে।
আহমদ মুসার উত্তরে ওরা আরও উচ্চস্বরে গনা শুরু করল।
গনা নয় পর্যন্ত পৌঁছতেই আহমদ মুসার উপরে তুলে রাখা হাত যেন চোখের পলকে মাথার পেছনে ছুটে গিয়ে রিভলবার সমেত ফিরে এসেই গুলি বর্ষণ শুরু করল ওদের দিকে।
বিদ্যুৎ চমকের মতোই ঘটে গেল ঘটনাটা। আহমদ মুসাদের রিভলবার কেড়ে নেবার পর শত্রুরা আশা করেনি এভাবে পাল্টা আঘাত আসবে।
ওরা তিনজন লাশ হয়ে পড়ে গেল আহমদ মুসাদের সামনে।
মেজর পাভেল, ওদের অস্ত্রগুলো নিয়ে নাও। আর সার্চ কর ওদের। পকেটগুলো, কোনো কাগজপত্র মেলে কিনা দেখ।
আহমদ মুসা তিনটি লাশকে চলাচলের ট্রাক থেকে সরিয়ে রাখল একটা টিলার আড়ালে।
আবার তারা চলতে শুরু করল।
প্রবেশ করল তারা পাহাড়ের ত্রিভুজে।
মেজর পাভেল, আগে আমরা ত্রিয়াদা এলাকায় যেতে চাই। বলল আহমদ মুসা।
ওদের কথা শুনে মনে হচ্ছে ত্রিয়াদা অঞ্চলে আজ কিছু ঘটছে বা ঘটবে। যদি তাই হয় তাহলে সেখানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত ঠিক স্যার। মেজর পাভেল বলল।
আমিও তাই মনে করছি।
ত্রিয়াদা অঞ্চলে ভয়ংকর কিছু ঘটতে পারে। চল, আর সময় নষ্ট করা নয়। বলল আহমদ মুসা।
ত্রিয়াদা অঞ্চলের কোনো পথনির্দেশ ডেভিড অ্যারিয়েলের কাছ থেকে পায়নি আহমদ মুসা। শুধু এইটুকু সে জেনেছে ত্রিভুজ পাহাড় থেকে সোজা পুবে সবচেয়ে উঁচু পাহাড়-শৃঙ্গ, তার পাদদেশে অনেকগুলো উপত্যকার মেলা। ঐ উপত্যকাগুলো নিয়েই ত্ৰিয়াদা অঞ্চল। উপত্যকাগুলো গোল্ডেন গ্রীন নামে গোটা রত্ন দ্বীপে বিখ্যাত। সোনালি গমের ভাণ্ডার ঐ উপত্যকাগুলো। ভূমধ্যসাগরীয় ফলের সীমাহীন সম্ভারে পূর্ণ ক্ৰিাদা। অঞ্চলের উপত্যকা ও পাহাড়গুলো। ত্ৰিয়াদা অঞ্চলের উপত্যকাগুলোতে যারা বাস করে, তারা সুখী, সাহসী ও ঐক্যবদ্ধ। সম্ভবত এই কারণেই মিড ব্ল্যাক সিন্ডিকেট-এর কাছে ওরা বড় শত্রু এবং অসহনীয় তাদের অস্তিত্ব।
ত্রিভুজ পাহাড় থেকে বেরিয়ে পুব দিকে দ্রুত হাঁটতে লাগল আহমদ মুসারা। তাদের লক্ষ্য পুর দিকের আকাশে পাহাড়শৃঙ্গগুলোর সবচেয়ে উঁচু শৃঙ্গটি।
মসজিদ থেকে যোহরের নামাজ পড়ে পরিবার সমেত টিলা থেকে নামছিল ত্ৰিয়াদা এলাকা থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য সিমো সাঈদ আহমাদ। তার সাথে স্ত্রী উম্মে হানি হাফছা, মেয়ে ফাতিমা মারিয়েম ও ছেলে হাদি হাকাম।
এলাকার মসজিদটা টিলার উপরে। বড় মসজিদ। প্রায় হাজারের মতো মানুষ একসাথে নামাজ পড়তে পারে। নারী-পুরুষ সবাই মসজিদে। নামাজ আদায় করে।
পাশাপাশি দুটি টিলা। একটিতে মসজিদ। অন্যটিতে কলেজ ও কমুনিটি সেন্টার। মাঝখানের উপত্যকাটা ত্ৰিয়াদা এলাকায় প্রবেশের একমাত্র পথ। দুই পাশের দুই টিলা থেকে পাহাড় শ্রেণি দক্ষিণ ও উত্তরে চলে গেছে। পাহাড়গুলো ডিঙিয়েও ত্ৰিয়াদা উপত্যকা এলাকায় প্রবেশ করা যায়, কিন্তু তা খুব সহজ নয়। সুতরাং দুই টিলার মাঝের এই পথ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পথটি দুপাশের দুই টিলা পেরিয়ে একটা সড়কে গিয়ে পড়েছে। সড়কটি দুই টিলার পূর্ব পাশ দিয়ে দুপাশের পাহাড়শ্রেণির পাদদেশ বরাবর উত্তর-দক্ষিণ বিলম্বিত। এই সড়কটিই ত্ৰিয়াদা অঞ্চলের প্রধান সড়ক। গোটা ত্রিয়াদা অঞ্চলকে সার্কেল করে আছে। বৃত্তাকার এই সড়ক থেকে অনেক সড়ক বেরিয়ে ত্ৰিয়াদার উপত্যকাগুলোকে প্রধান সড়কের সাথে যুক্ত করেছে। সড়কগুলোতে গাড়ি চলে না, ঘোড়াই মূল বাহন। এ মসজিদ ও কলেজের বিপরীত দিকে রাস্তার পুবপাশে ত্রিয়াদা এলাকার গ্যারিসন এবং কিছু সরকারি অফিস। এটা ত্রিয়াদা অঞ্চলের শাসনকেন্দ্র। সেখানকার প্রশাসনিক ভবনুশীর্ষে রত্ন দ্বীপের পতাকা উড়ছে।
সিমো সাঈদ মসজিদ থেকে গিয়ে বসল তার বাড়ির ড্রইং রুমে। তাদের বাড়িটা আরও দুই টিলার উত্তরে উপত্যকা সড়কের একদম। পাশেই।
সিমো সাঈদের সাথে তার স্ত্রী ও ছেলে-মেয়ে সবাই এসে বসেছে।
মেয়ে ফাতিমা মারিয়েম বসতে বসতে বলল, বাবা তুমি ওবাদিয়া আউটপোস্টের খবর নিশ্চয় পেয়েছ?
বিমর্ষতার ছাপ নামল সিমো সাঈদের চোখে-মুখে। বলল, হ্যাঁ মা, প্রেসিডেন্টের দপ্তর থেকে কিছুক্ষণ আগে আমাকে জানানো হয়েছে। খুবই খারাপ খবর। কয়েকদিনে পরপর চারটি বড় ঘটনা ঘটল। আমাদের প্রায় দেড় ডজন নিরপত্তা কর্মী মারা গেল। শুনলাম, প্রেসিডেন্ট সাহেবরা খুবই উদ্বিগ্ন। আল্লাহ জানেন দেশে কি ঘটছে।
এ রকম কোনো দিনই হয়নি, এখন হচ্ছে কেন? বলল ফাতিমা মারিয়েম!
সেটাই তো কথা, এসব ঘটছে কেন? খুবই বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছে। আমাদের সরকার। আমাদের সরকার, প্রশাসন ও নিরাপত্তাকর্মীরা এসব। ঘটনায় অভ্যস্ত নয়। এসব ঘটনার মোকাবেলা কিভাবে করতে হয়, সে অভিজ্ঞতা তাদের নেই। মোকাবেলা করার মতো উপযুক্ত অস্ত্র ও তাদের নেই। সিমো সাঈদ বলল।
বাবা, বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্যাডেট কোর্সের কমান্ডার গতকাল ক্লাসে আমাদের বললেন, মাত্র একজন লোক রত্ন দ্বীপের পরিস্থিতি ঘুরিয়ে দিয়েছে। রত্ন দ্বীপের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে মাত্র একজন তোক আত্মরক্ষার মতো অসহায় অবস্থা থেকে শক্তিশালী আক্রমণাত্মক অবস্থানে নিয়ে গেছে। লোকটা কে জান বাবা? পত্রিকাগুলো তার সম্পর্কে কিন্তু বেশি কিছু লেখেনি। বলল এমপি সিমো সাঈদের ছেলে হাদি হাকাম।
তার সম্পর্কে আমাদেরকেও বেশি কিছু জানানো হয়নি। তিনি চান না তার সম্পর্কে, তার কাজ সম্পর্কে আলোচনা হোক। এই শর্তেই তিনি আমাদের সরকারকে সাহায্য করতে রাজি হয়েছেন। সিমো সাঈদ বলল।
অদ্ভুত লোক তো! মানুষ প্রচার চায়, প্রশংসা চায়। অথচ তিনি…।
হাদি হাকামের কথার মাঝখানেই তার বাবা সিমো সাঈদ বলে উঠল, তিনি এই সাধারণের ক্যাটেগরিতে পড়েন না। তিনি প্রেসিডেন্টের মেহমান। সৌদি আরব সরকার অনুরোধ করেছে তিনি রত্ন দ্বীপে। থাকাকালে তাকে আতিথ্য দেয়ার জন্যে। শুনেছি রাশিয়া-আমেরিকার মতো দেশ বিপদে পড়লে তার শরণাপন্ন হয়।
তাই হবে বাবা। সাধারণ বিবেচনার মধ্যে তিনি পড়েন না। ওবাদিয়া নিরাপত্তা আউটপোস্ট থেকে আমার বান্ধবী ক্যাপ্টেন আলিয়া টেলিফোন করেছিল। তার সম্পর্কে সে বলল, যুদ্ধ-কৌশল নির্ধারণে তিনি যত দ্রুত, ততটাই বিস্ময়কর! ওদের আকস্মিক আক্রমণে আউটপোস্টের বাইরের প্রহরীরা মারা যায়। কিন্তু পরে ওদের একজনও ফিরে যেতে পারেনি। পঁচিশজনই মারা পড়ে। এর পরেই সুইসাইড বোমা দিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, কর্নেল জেনারেল রিদাসহ আমাদের সকলকে হত্যার ওরা চেষ্টা করে। এটাও তার চোখে ধরা পড়ে যায়। বোমার বিস্ফোরণ ঘটে। যে বোমা বহন করছিল, সেই শুধু মারা যায়। তার পদক্ষেপে আমরা সবাই রক্ষা পেয়ে যাই। আরও অনেক কথা বলল ক্যাপ্টেন আলিয়া তার সম্পর্কে। তিনি শুধু অসাধারণ নন, মনে হয় একজন মিরাকল ম্যান তিনি। বলল ফাতিমা মারিয়েম।
সিমো সাঈদের সোফার পাশে সাইড টেবিলে রাখা ইন্টারকমে কল এলো গেটের সিকিউরিটি বক্স থেকে।
কল ধরল সিমো সাঈদ।
সিকিউরিটি থেকে জানানো হলো ফৈজি এসেছে। দেখা করতে চায়।
সিমো সাঈদ সিকিউরিটিকে বলল ফৈজিকে পাঠিয়ে দিতে।
ফৈজি ত্ৰিয়াদা এলাকার তথ্য-সন্ধানী টিমের সদস্য।
সিমো সাঈদ উঠে দাঁড়াল। বলল, তোমার বস। ততক্ষণে চা। আসুক।
বাড়ির বাইরের অংশে তিনটি ঘর নিয়ে সিমো সাঈদের অফিস।
অফিস কক্ষে গিয়ে বসল সে।
সিমো সাঈদের পিএ এসে ঘরে ঢুকল।
দেখ ফৈজি এসেছে। তাকে নিয়ে এস। পিএ-কে লক্ষ্য করে বলল সিমো সাঈদ।
পিএ চলে গেল। দুমিনিটের মধ্যেই একজনকে নিয়ে ঘরে ঢুকল।
লোকটি ফৈজি। ফৈজি সালাম দিল সিমো সাঈদকে।
ওয়া আলাইকুম সালাম। তোমার তো এ সময় আসার কথ নয়, ফৈজি। জরুরি কিছু? বলল সিমো সাঈদ।
জরুরি স্যার। মোবাইলে এ ধরনের কথা বলতে নিষেধ করেছেন বলে সাক্ষাতেই বলতে এসেছি। ফৈজি বলল।
ধন্যবাদ ফৈজি। বল। বলল সিমো সাঈদ।
স্যার, এনভাইরনমেন্টাল প্রোটেকশন গ্রুপ (ইপিজি) নামের একটি এনজিও পাহাড়ের যে এলাকায় কাজ করছে, সে এলাকায় আমার ডিউটি ছিল। আজ ডিউটিতে যাবার পথে একটা ভয়ংকর জিনিস আমার নজরে পড়ল। ইপিজি অফিস এলাকা থেকে মাইল খানেক নিচে একটা ভাঙা পরিত্যক্ত গির্জা আছে। সেখানে দেখলাম উত্তেজিত একটা সমাবেশ। গির্জার সামনের চত্বরে একটা পতাকা উড়ছে। একটা ব্যানার টাঙানো সেখানে। পতাকায় লেখা আমরা সবাই হাওয়ারী। আর ব্যানারে লেখা হাওয়ারী হত্যার প্রতিকার হবে না, প্রতিশোধ চাই। আপাদমস্তক কালো পোশাক পরা অনেক লোক সেখানে জড়ো হয়েছে। তাদের সকলের হাতে খাটো বাট, খাটো ব্যারেল ও লম্বা ম্যাগজিনের ভয়ংকর সব অটোমেটিক গান। আমি রাস্তা পরিবর্তন করে পেছনের জংগল পথে গিয়ে ভাঙা গির্জায় ঢুকলাম। সেখানে পেলাম খাদ্য ব্যবস্থাপনায় সংশ্লিষ্ট কয়েকজনকে। প্যাকেট করা খাদ্যের স্তূপ সেখানে। তারা আমাকে তাদের সাথের কাজের লোক মনে করল। কথায় কথায় আমি জানতে পারলাম, প্যাকেটকৃত খাদ্যগুলো এবং কালো পোষাকের লোকরাও এসেছে ইপিজি থেকে। অস্ত্রও তারা সরবরাহ করেছে। আরও জানতে পারলাম, গত কয়েকদিনে বিভিন্ন স্থানে প্রায় অর্ধশত খ্রিস্টানকে হত্যা করেছে নিরাপত্তা বাহিনী। তারই প্রতিশোধ নিতে ত্ৰিয়াদা এলাকার গ্রামগুলোতে এরা যাচ্ছে। ইপিজি থেকে নেতারা এলেই এরা যাত্রা করবে। সন্ধ্যার মধ্যেই এরা কাজ শেষ করবে। দীর্ঘ বক্তব্য দিয়ে থামল ফৈজি।
আতংক-উদ্বেগে ছেয়ে গেছে সিমোসাঈদের মুখ। ফৈজি থামতেই সে বলল, ওরা কতজন লোক?
পঞ্চাশ কিংবা তার কিছু বেশি হবে। ফৈজি বলল।
এত লোক এলো কোত্থেকে? সব মিলিয়ে ইপিজির রেজিস্ট্রিকৃত জনসংখ্যা মাত্র পনের জন। বলল সিমো সাঈদ।
কিন্তু ওরা বলল, সব ইপিজি থেকেই এসেছে। আমাদের কোন পাহাড়ী লোক নেই। এটা জিজ্ঞাসা করে জেনেছি। ফৈজি বলল।
আমাদের এখানকার ত্ৰিয়াদা নিরাপত্তা গ্যারিসন কি জেনেছে এ খবর? জিজ্ঞাসা সিমো সাঈদের।
জি স্যার। আমি আমাদের তথ্য-গ্রুপের প্রধানকে জানিয়েছি। তিনিই। নিরাপত্তা গ্যারিসনকে জানানোর কথা। ফৈজি বলল।
এখন তোমার কাজ কি? বলল সিমো সাঈদ।
আমি গ্যারিসনে ইদরিস আলভির সাথে দেখা করব। তিনিই আসার কাজ ঠিক করবেন। ফৈজি বলল।
ঠিক আছে এখনই ত্ৰিয়াদা নিরাপত্তা গ্যারিসনের প্রধান ক্যাপ্টেন হোয়ারি আব্দুল্লাহকে ডাকছি। বিষয়টি খুব উদ্বেগজনক। ধন্যবাদ ফৈজি। অনেক ধন্যবাদ তোমাকে। তুমি নিশ্চর ওদিকে যাচ্ছ। ওদের প্রতি পদক্ষেপের বিবরণ আমি চাই ফৈজি। ইদরিস আলভিকে বলো। বলল সিমো সাঈদ।
স্যার, আমি দেখছি আসার সময় থেকে আমার মোবাইলে নেটওয়ার্ক নেই। ইদরিস আলভী স্যারেরও ছিল না। এখনও নেটওয়ার্ক আসেনি। ফৈজি বলল।
সিমো সাঈদ পকেট থেকে মোবাইল বের করল। মোবাইলের দিকে চেয়েই সে বলল, আশ্চর্য! আমার মোবাইলেও নেটওয়ার্ক নেই। উদ্বেগ ও চিন্তায় ছেয়ে গেল সিমো সাঈদের মুখ।
ফৈজি তুমি গ্যারিসনে যাও। ক্যাপ্টেন হোয়ারি আব্দুল্লাহকে এখানে আসতে বল, এখনি। থেমেই আবার বলে উঠল সিমো সাঈদ।
সালাম দিয়ে ফৈজি দ্রুত চলে গেল।
সিমো সাঈদ দুহাতে হাত চেপে ধরে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে পড়ল। তার মনে তখন চিন্তার ঝড়।
যতই ভাবছে ততই আতংকগ্রস্ত হয়ে পড়ছে সিমো সাঈদ। শয়তানরা নিজেদের হাওয়ারী নাম দিয়েছে? হাওয়ারীরা তো হযরত ঈসা আ.-এর সত্যনিষ্ঠ সাথীর দল। এই নাম গ্রহণ করে তারা রত্ন দ্বীপের অধিবাসী এবং বাইরের দুনিয়ায় এই মেসেজ দিতে চায় যে তারা খ্রিস্টান স্বার্থ রক্ষার পক্ষে একটা সাচ্চা দল। তারা বিভেদ-বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে চায় রত্ন। দ্বীপে। গত কয়েকদিন ৪১জনের মতো সন্ত্রাসী মারা গেছে। তারা খ্রিস্টান হতে পারে, কিন্তু তারা তো রত্ন দ্বীপের লোক নয়। সবাই বাইরের লোক। সবাই তারা সন্ত্রাসী হামলা চালাতে গিয়ে মারা পড়েছে। তাদের জন্যে রত্ন দ্বীপের একজন খ্রিস্টানেরও সমর্থন নেই, সমবেদনাও নেই। হাওয়ারী নামে এরা কারা? নিশ্চয় মারা পড়া সন্ত্রাসীদেরই অংশ এরা। নিশ্চয় তারা খ্রিস্টান স্বার্থরক্ষার মুখোশ পরে সন্ত্রাস করতে আসছে। ইপিজি কারা? এরা এই সন্ত্রাসে অংশ নিচ্ছে কেন? তাহলে কি এরা সন্ত্রাসীদের সাথী, সাহায্যকারী?
নানা চিন্তা, দুশ্চিন্তার মাঝে ডুবে গিয়েছিল সিমো সাঈদ।
তার পিএ ঘরে ঢুকে সিমা সাঈদকে চিন্তামগ্ন দেখে একটু দ্বিধা করে বলল, এক্সকিউজ মি স্যার,।
সিমো সাঈদ ঘুম থেকে জেগে ওঠার মতো বলল, কি?
স্যার, ক্যাপ্টেন হোয়ারি আব্দুল্লাহ এসেছেন। পিএ বলল। সিমো সাঈদ সোজা হয়ে বসে বলল, নিয়ে এস তাকে। আমি তার জন্যেই অপেক্ষা করছি।
পিএর সাথে ঘরে ঢুকল ক্যাপ্টেন হোয়ারি আব্দুল্লাহ।
সালাম বিনিময়ের পর হোয়ারি আব্দুল্লাহ বলল, এ সব কি শুনছি স্যার?
ক্যাপ্টেন আব্দুল্লাহ, সব তো শুনেছেন? কথা শুরু করল সিমো সাঈদ।
জি স্যার ইদরিস আলভীর কাছে সব শুনেছি। বলল ক্যাপ্টেন আব্দুল্লাহ।
মোবাইলের নেটওয়ার্ক নেই। অয়্যারলেসে কি বিষয়টা জানাতে পেরেছ উপরে? সিমো সাঈদ বলল।
দুঃসংবাদ স্যার। আমাদের অয়্যারলেসও কাজ করছে না। বলল ক্যাপ্টেন আব্দুল্লাহ।
কেন অয়্যারলেসের আবার কি হল? শত্রুরা মোবাইল নেটে জ্যাম সৃষ্টি করেছে আমাদের বিপদ বাড়ানোর জন্যে। কিন্তু অয়্যারলেস তো এভাবে ব্লক হয় না কখনো! সিমো সাঈদ বলল।
স্যার, সর্বাধুনিক টেকনোলজিতে গোটা কম্যুনিকেশনই ব্লক করা যায়। বলল ক্যাপ্টেন আব্দুল্লাহ।
সর্বনাশ! এখন তাহলে কি হবে। রাজধানী থেকে সাহায্য তো দূরে থাক, আমরা আমাদের দুর্দশার কথা তাদের জানাতেও তো পারবো না। সিমো সাঈদ বলল।
স্যার, এটাই এখন বাস্তবতা। বলল ক্যাপ্টেন আব্দুল্লাহ।
তাহলে এখন কি চিন্তা করছ? সিমো সঈদের জিজ্ঞাসা ক্যাপ্টেন আব্দুল্লাহকে।
স্যার, যতদূর আমরা জানতে পেরেছি তাতে মনে হয়েছে, ওদের সশস্ত্র ফাইটিং জনশক্তি আমাদের চেয়ে দ্বিগুণ। আমাদের বিশজন নিরাপত্তা কর্মীর রয়েছে মাত্র ২০টি স্টেনগান। আশেপাশের ছাত্র যুবকদের একত্রিত করলে আমাদের জনশক্তি পঞ্চাশ হতে পারে। কিন্তু সবার জন্য অস্ত্র তো নেই। বলল ক্যাপ্টেন আব্দুবাহ।
মুখ শুকিয়ে গেছে সিমো সাঈদের। বলল, এক দিকে আমাদের অধিবাসীদের নিরাপত্তা দেয়া, অন্যদিকে লড়াইয়ে শত্রুকে পরাজিত করা এই দুই কাজের জন্যে জনশক্তি থাকলেও আমাদের কাছে অস্ত্র নেই। এই অবস্থা সামনে রেখে আপনারা আত্মরক্ষার জন্য কি কৌশল অবলম্বন করা যায় বলে চিন্তা করছেন?
সব বিবেচনা সামনে রেখে আমরা চিন্তা করেছি। আমাদের ক্ষুদ্র ফাইটিং ফোর্সকে যদি বিভক্ত করে মোতায়েন করি, তাহলে এই শক্তি দিয়ে শত্রুদের পরাভূত করা কঠিন। ওদের জন্যে লক্ষ্য অর্জন সহজ হয়ে যাবে। এজন্যে আমরা ঠিক করেছি, নিরাপত্তা কর্মীদের এক জায়গায় মোতায়েন করা হবে। আমাদের সকল অধিবাসীকেও এখানে আনা হবে। ছাত্র-যুবকদের হাতে থাকবে দেশীয় অস্ত্র। আমরা সম্মুখযুদ্ধে যাব না। গেরিলা কৌশলে আমরা ওদের উপর আঘাত হানবো দুইটা লক্ষ্যে। এক. যতটা সম্ভব চোরাগুপ্তা আক্রমণ করে ওদের হত্যা করা, দুই. ওদের অগ্রগতি ঠেকিয়ে রাখা। এভাবে ক্রমান্বয়ে ওদের দুর্বল করে এক পর্যায়ে সুযোগ বুঝে ওদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়া। বলল ক্যাপ্টেন হোয়ারি আব্দুল্লাহ।
ধন্যবাদ ক্যাপ্টেন আব্দুল্লাহ। বর্তমান অবস্থায় আত্মরক্ষার জন্যে এই কৌশলের কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু শেষ রক্ষা হবে কি না বলা মুশকিল। দুটি দিক আমার কাছে বড় হয়ে উঠছে। এক, আমাদের গ্রাম ও বাড়িগুলো অরক্ষিত থাকায় এগুলোতে লুটতরাজ, ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ করা ওদের জন্যে সহজ হবে। দুই, ওদের হাতে যদি বোমা, রকেট লাঞ্চার থাকে, তাহলে ওরা খুব কাছে না এসেও অতি সহজেই আমাদের অবস্থানকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করতে পারবে। সিমো সাঈদ বলল।
স্যার, আপনার সব আশঙ্কার সাথে আমি একমত। কিন্তু স্যার, আমরা আত্মরক্ষার জন্যে যা করেছি, তার চেয়ে ভালো কিছু এ মুহূর্তে আমরা করতে পারছি না। আরেকটা বিকল্প আছে স্যার, ত্ৰিয়াদা এলাকা পরিত্যাগ করে আমাদের পালিয়ে যাওয়া।
বলল ক্যাপ্টেন হোয়ারি আব্দুল্লাহ।
এতটা নিচে নামার চেয়ে যুদ্ধ করে শহীদ হওয়া অনেক ভালো। ঘরের ও প্রান্তের দরজার দিক থেকে বলে উঠল ফাতিমা মারিয়েম।
সিমো সাঈদ ও ক্যাপ্টেন আব্দুল্লাহ বিস্মিত চোখে ঘরের ও প্রান্তের দরজার দিকে তাকাল। দেখল, ওখানে সিমো সাঈদের মেয়ে ফাতিমা মারিয়েম, ছেলে হাদি হাকাম ও স্ত্রী আয়েশা দাঁড়িয়ে আছে।
আমিও তাই মনে করি বাবা, শত্রু ভয়ে সব ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার চেয়ে শাহাদাৎ অনেক বেশি কাম্য। বোন ফাতিমা মারিয়েমের কথা শেষ। হতেই বলে উঠল সিমো সাঈদের ছেলে হাদি হাকাম।
যখন তোমরা এসেই পড়েছে। ভেতরে এসে বস। বলল সিমো সাঈদ।
ওরা এসে বসল সিমো সাঈদের বাম পাশের চেয়ারগুলোতে। ক্যাপ্টেন আব্দুল্লাহ বসে আছে সিমো সাঈদের সামনে, মুখোমুখি।
তোমরা কখন এসেছ? সব কথা শুনেছ তোমরা? সব কথা শোনার পরেই কি তোমাদের ঐ মত? বলল সিমো সাঈদ স্ত্রী, ছেলে মেয়েদের লক্ষ করে।
সব শুনেছি আমরা। তোমরা চায়ের জন্যে কিছু বললে না, চা যখন ঠাণ্ডা হয়ে গেল, তখন দেরি কেন তা দেখার জন্যে আমরা এসেছিলাম। এসেই শুনলাম ভয়াবহ সব কথা এবং করণীয় কি তাও। বলল ফাতিমা মারিয়েম।
তোমরা চরম আবেগ থেকে কথা বলেছ, কিন্তু আমরা ঠাণ্ডা মাথায় কথা বলছি, শাহাদাতবরণ একটা অপশন হতে পারে। তবে আমরা ঐ সিদ্ধান্ত নেইনি। ক্যাপ্টেন আব্দুল্লাহ প্রথম যে অপশনটা বলেছে, সেটা আমাদের সিদ্ধান্ত। বলল সিমো সাঈদ।
ধন্যবাদ স্যার। সময় বোধ হয় আমাদের হাতে খুব বেশি নেই। এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্যে যা করতে হবে, তাতে প্রচুর সময় লাগতে পারে। আমি উঠতে চাই স্যার। ক্যাপ্টেন আব্দুল্লাহ বলল।
হ্যাঁ ঠিক। তোমাকে উঠতে হবে। হা শোন, আমি মনে করছি। আমি আমার পরিবার নিয়ে বাড়িতেই থাকব। বলল সিমো সাঈদ।
স্যার, এটা ঠিক হবে না। আমাদের সঙ্গে আপনার থাকা আরও এজন্যে দরকার যে, আপনার মূল্যবান পরামর্শ আমাদের দরকার হবে। মোবাইল, টেলিফোন, অয়্যারলেস বন্ধ হয়ে যাওয়ায় প্রয়োজনের মুহূর্তে আপনার সাথে যোগাযোগের আর কোনো মাধ্যম নেই। আমার অনুরোধ আপনি সকলের সাথে থাকুন। ক্যাপ্টেন আব্দুল্লাহ বলল।
ঠিক আছে ক্যাপ্টেন, তাই হবে। বলল সিমো সাঈদ।
তাহলে আমাদের লোকরা এসে কি আপনাদের নিয়ে যাবে? কাপ্টেন আব্দুল্লাহ বলল।
তোমাদের কারও আসার দরকার নেই। এক সময় আমরাই চলে যাব।
ধন্যবাদ স্যার। আমি উঠছি। উঠে দাঁড়াল ক্যাপ্টেন আব্দুল্লাহ।
সবাইকে সালাম দিয়ে যাবার জন্যে ঘুরে দাঁড়াল।
ক্যাপ্টেন আব্দুল্লাহকে কিছু বলার জন্যে উন্মুখ হয়ে উঠেছিল ফাতিমা। মারিয়েম। পরক্ষণেই চেপে গেল। কিছু বলল না।
তার চোখে-মুখে ভিন্ন ধরনের একটা উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা।
অনেকটাই শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশ ত্ৰিয়াদার গ্যারিসনে। সবার মধ্যেই অখণ্ড একটা গাম্ভীর্য। তাদের সাথে উদ্বেগের ছাপ। বড় কিছু ঘটতে যাচ্ছে, সেই আশঙ্কায় সবার মধ্যেই একটা অ্যাটেনশন ভাব।
নাম গ্যারিসন বটে, তবে এখানে থাকে মাত্র বিশজন নিরাপত্তা সৈনিক একজন ক্যাপ্টেনের নেতৃত্বে। গ্যারিসন শুধু আবার গ্যারিসনই নয়, এলাকার সরকারি অফিস আদালত তৈরি হয়েছে এই গ্যারিসনকে কেন্দ্র করেই। গ্যারিসন না বলে একে সরকারি অফিস কমপ্লেক্স বলাই ভালো। এখানে সরকারি, আধাসরকারি অফিসের লোকসংখ্যা নিরাপত্তা সেনাদের চেয়ে বেশি।
সিমো সাঈদ, ক্যাপ্টেন আব্দুল্লাহ, ক্যাপ্টেন আব্দুল্লাহর সহকারী লেফটেন্যান্ট রাফায়েল রবিন, হাদি হাকাম, ফাতিমা মারিয়েম এবং অন্য কয়েকজন বসে আলাপ করছিল গ্যারিসনের গেট সংলগ্ন অভ্যর্থনা কক্ষে।
গ্যারিসন কমপ্লেক্সে প্রবেশের মুখেই গ্যারিসন অভ্যর্থনা কক্ষ। এরপর রয়েছে সরকারি অফিস-আদালত।
গ্যারিসনের সবচেয়ে দুর্বল দিক হলো পাথরের তৈরি তার নিচু প্রাচীর। যে কেউ লাফ দিয়ে এ প্রাচীর টপকাতে পারে।
গ্যারিসন কমপ্লেক্সটা টিলা ধরনের উচ্চভূমির উপর অবস্থিত। উচ্চভূমির উত্তর ও দক্ষিণ দিকটা পাথরের খাড়া দেয়াল। এই দুই দিক দিয়ে গ্যারিসনে ঢোকা যায় না, বেরোনোও যায় না। পশ্চিম ও পূর্ব দিকে গ্যারিসন কমপ্লেক্সে প্রবেশের দুটি গেট আছে। এর মধ্যে পশ্চিম গেটটা নিরাপত্তা বাহিনীর জন্য এবং অপর গেটটা বেসামরিক লোকদের ব্যাবহারের জন্যে। দুই গেটের রাস্তা উচ্চ ভূমি থেকে ঢালু হয়ে নিচে নেমে গেছে। ঢালু পথ দিয়ে উঠে এসে গেট পেরুতে হয়। গোটা পশ্চিম, গোটা পূর্ব দিকটাই ঢালু। গেটের দুপাশের ঢালু স্থান দিয়ে উঠে এসে নিচু প্রাচীর লাফ দিয়ে পার হলেই গ্যারিসন কমপ্লেক্সে যে কেউ ঢুকতে পারে।
গ্যারিসন কমপ্লেক্সের নিরাপত্তা নিয়েই আলোচনা হচ্ছিল সিমো সাঈদ ও ক্যাপ্টেন আব্দুল্লাদের মধ্যে।
ক্যাপ্টেন আব্দুল্লাহ বলছিল, এত নিচু প্রাচীর কোনো নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানে তো দূরের কথা, কোনো প্রাইভেট বাড়িরও হয় না, হওয়া উচিত। নয়।
ঠিক বলেছ ক্যাপ্টেন আব্দুল্লাহ। কিন্তু সমস্যা হলো, নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তা রত্ন দ্বীপে কোনো সময়ই করা হয়নি এবং কখনো এটা কারও মাথায় আসেনি। এখানে বড় কোনো সংঘবদ্ধ পক্ষের দ্বারা রত্ন দ্বীপের শান্তি ভংগ হবে, এখানে স্টেনগান, মেশিনগানের ব্যবহার করতে হবে, এমনটা কেউই কখনও ভাবেনি। এই কারণেই অন্যান্য দেশের মতো এখানে সেনাবাহিনী গড়ে তোলার প্রয়োজন মনে করা হয়নি। ভারি অস্ত্র আমদানির কথা চিন্তা করা হয়নি। গত ৫০ বছরের মধ্যে রত্ন দ্বীপে কেউ গুলিবিদ্ধ হয়ে মরেনি। কয়েক দিন আগে পর্যন্ত আমাদের নিরাপত্তা বাহিনীর কর্মীদের হাতে কোনো বন্দুক ছিল না। তার কখনো প্রয়োজনও হয়নি। এই গ্যারিসনের পশ্চিম ও পূর্ব অংশে যখন এই নিচু প্রাচীর তৈরি হয়, তখন অনেকেই প্রশ্ন তুলেছিল এই অহেতুক খরচ কেন? এই প্রাচীর তুলে আমরা কি করতে চাই? নিরাপত্তা দানকারী প্রতিষ্ঠানকে তো নিরাপত্তা দেয়ার প্রয়োজন নেই। আমাদের রত্ন দ্বীপের সমাজ ও সরকারের কোনো শত্রু নেই। আমরা হাওয়ার সাথে লড়াই করছি কেন? যারা এ প্রশ্ন তুলেছিল, তারা তখন। ঠিক কথাই বলেছিল। আসলে রত্ন দ্বীপে কোনো বিভেদ ছিল না, বৈষম্য ছিল না এবং তাই কোনো হানাহানিও ছিল না। দুচার দিন। ধরে যে হানাহানি সৃষ্টি হয়েছে, তা বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো। এমন একটা পরিস্থিতির কথা আমরা কেউ কল্পনাও করিনি। সুতরাং ক্যাপ্টেন আব্দুল্লাহ আমাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে দোষ দিতে পারি না। বলল সিমো সাঈদ।
স্যরি স্যার, আমি যা বলছি তা পরিবর্তিত অবস্থার অনুভূতি থেকে। বোধ হয় সামনে আমাদেরকে এভাবেই ভাবতে হবে। ক্যাপ্টেন আব্দুল্লাহ বলল।
ক্যাপ্টেন আব্দুল্লাহর কথা শেষ হচ্ছে, তখন গেট দিয়ে প্রবেশ করল আচিলা, ফিলিপ। তথ্য গোয়েন্দা গ্রুপের সদস্য সে।
তাকে দেখেই সিমো সাঈদ তাকে ডাকল। সিমো সাঈদের মুখে নতুন উত্তেজনা।
আচিলা কাছে এলে সিমো সাঈদ বলল দ্রুত কণ্ঠে, ওদের দিকের অবস্থা কি ফিলিপ? ওরা কতজন? কোন পর্যন্ত এসেছে?
স্যার, ওরা সংখ্যায় একশ জনের মতো হবে। ওরা খুব সামনে এসে গেছে। আমাদের সামনে পাহাড়ের ওপাশে যে উপত্যকা, তার পরে যে পাহাড় তার গোড়া পর্যন্ত এসে গেছে ওরা। বলল আচিলা ফিলিপ।
নতুন করে উদ্বেগ-উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ল সিমো সাঈদসহ সবার চোখে-মুখে।
তাহলে দশ মিনিটও লাগবে না ওদের এখানে পৌঁছতে!
শুকনো কণ্ঠে কথাটা বলেই আবার প্রশ্ন করল, তাদের অস্ত্র-শস্ত্র কি তোমাদের চোখে পড়েছে?
তাদের প্রত্যেকের হাতে খাট ব্যারেল ও লম্বা ম্যাগাজিনের হ্যান্ড মেশিনগান। তার সাথে অনেকের কাঁধে আছে রকেট লাঞ্চার। এই অস্ত্রগুলো দেখা গেছে। আচিলা ফিলিপ বলল।
ওদের সংখ্যা সম্পর্কে তোমরা নিশ্চিত? বলল সিমো সাঈদ।
স্যার, ওরা একটি সংকীর্ণ গিরিপথ দিয়ে আসার সময় আমরা ওদের সংখ্যা গুণেছি। ওদের সংখ্য সাতানব্বই জন। আচিলা ফিলিপ বলল।
ওরা ওদের পতাকা, ব্যানার এখনও বহন করছে? বলল সিমো সাঈদ।
জি স্যার। সবার সামনে আছে ব্যানার। মধ্যখানে আছে পতাকা। ফিলিপ বলল।
ধন্যবাদ ফিলিপ। ঠিক আছে তুমি ফিরে যাও তোমার কাজে। ফিলিপ চলে গেল।
গ্রামবাসীদের মধ্য থেকে সক্ষম জনশক্তি শামিল করে আমাদের শেষ পর্যন্ত সংখ্যাটা কত দাঁড়াল ক্যাপ্টেন? সিমো সাঈদ বলল।
তরুণ, যুবকদের শামিল করার পর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে দেড় শত। তরুণ, যুবকসহ আমাদের জনশক্তির একটা বড় অংশ এলাকার বাইবে চাকরি, ব্যবসায়, পড়াশুনা ও অন্যান্য কাজে নিয়োজিত আছে। এই মুহূর্তে তাদের তো ফিরিয়ে আনার সুযোগ নেই। ক্যাপ্টেন আব্দুল্লাহ বলল।
দেড় শতজনের মধ্যে তোমাদের বিশজন নিরাপত্তা সেনাদের হাতে রয়েছে বিশটি স্টেনগান। অবশিষ্টদের হাতে তো দা, কুড়াল, ছুরির বেশি কিছু নেই। বলল সিমো সাঈদ। তার কণ্ঠের হতাশা সে চেপে রাখতে পারল না।
নিজেদের যা আছে, তাই নিয়ে অল্লাহর উপর ভরসা করে আমাদের লড়তে হবে স্যার। ক্যাপ্টেন আব্দুল্লাহ বলল।
তোমাদের গুলির স্টক কি পরিমাণ আছে? জিজ্ঞাস, সিমো সাঈদের।
বিশটা স্টেনগানে বিশ মিনিট চলার মতো গুলি আছে স্যার। ক্যাপ্টেন আব্দুল্লাহ বলল।
বাবা, তোমরা এসব হিসাব করো না। এতে ভয় হতাশা বাড়বে। এটা পরিষ্কার, আমাদের শক্তিতে আমরা দাঁড়াতে পারবো না। আমাদেরকে আল্লাহর সাহায্য চাইতে হবে, আর সিদ্ধান্ত নিতে হবে আমরা আমৃত্যু লড়াই করব। বলল ফাতিমা মারিয়েম। আবেগরুদ্ধ তার কণ্ঠ।
সিমো সাঈদ তাকাল মেয়ের দিকে। অশ্রুতে তার চোখ দুটি ঝাপসা হয়ে উঠল। গড়িয়ে পড়ল দুই ফোঁটা অশ্রু। বলল, ধন্যবাদ মা। তুমি ঠিক বলেছ। এসব হিসেব-নিকেশ করে আমরা পারবো না। আমরা যুদ্ধে শত্রুদের শক্তির চেয়ে অনেক পেছনে। আল্লাহর সাহায্যই আমাদের সম্বল। এই ন্যায়ের সংগ্রামে আমৃত্যু আমরা আক্রমণে থাকবো, এই সিদ্ধান্ত আমাদের প্রত্যেকের। চল আমরা যাই এ কথাই সবাইকে বলি যে, আল্লাহর উপর ভরসা করে আমরা প্রাণপণ লড়ে যাব। যার হাতে যা আছে তাই নিয়ে আমৃত্যু আমরা শত্রুর উপর আক্রমণ চালিয়ে যাব।
সবাই উঠে দাঁড়াল।
ফাতিমা মারিয়েম ক্যাপ্টেন আব্দুল্লাহর পাশে এসে দাঁড়াল। বলল, আমি কিন্তু তোমার পাশে থাকবো। মরতে হলে দুজন একসাথে মরব, বাঁচলে একসাথেই বাঁচব। মৃত্যু যদি আসেই, সেই সময় প্রার্থনা করব, আদালতে আখেরাতের কঠিন মুহূর্তগুলোতে যেন দুজন আমরা একসাথে থাকতে পারি, জান্নাতে একসাথে যেতে পারি, সেই তৌফিক যেন আল্লাহ আমাদের দেন।
ক্যাপ্টেন আব্দুল্লাহ আমিন বলে হাত বাড়িয়ে দিল ফাতিমা মারিয়েমের দিকে। ফাতিমা মারিয়েম জড়িয়ে ধরল সেই হাত।
হাঁটতে শুরু করল তারা সবার সাথে।
এই সময় ডজন ডজন স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র একসাথে গর্জন করে উঠল সামনের পশ্চিমের উপত্যকা ও পাহাড়ের দিক থেকে।
সিমো সাঈদ, ক্যাপ্টেন আব্দুল্লাহরা থমকে দাঁড়াল। ঘুরে দাঁড়াল। পশ্চিম দিকে।
সবাই উৎকর্ণ লো শব্দের দিকে।
স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের গুলি, অবিরাম চলছে।
কিছুক্ষণ কর্ণ হয়ে শুনল ক্যাপ্টেন আব্দুল্লাহ।
ওরা কি গুলি করতে করতে এগিয়ে আসছে ক্যাপ্টেন? উদ্বিগ্ন কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করল সিমো সাঈদ।
না স্যার, গোলাগুলি স্থির এক জায়গা থেকে হচ্ছে। আর গুলি এক রকমের নয় স্যার। ভারি স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের গুলিই বেশি। কিছু গুলি স্বয়ংক্রিয় রিভলবারের। ভারি অস্ত্রের গুলি প্রথম শুরু হয়েছে। পরে শুরু হয়েছে মেশিন রিভলবারের গুলি। একটু খেয়াল করে দেখুন স্যার। ভারি ও লাইট স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের গুলিও হচ্ছে। একসাথে হচ্ছে, কখনও একটার পর আরেকটা হচ্ছে। বলল ক্যাপ্টেন আব্দুল্লাহ।
তুমি কি আন্দাজ করছ ক্যাপ্টেন আব্দুল্লাহ?
সুনির্দিষ্ট করে বলা মুশকিল। তবে ভারি ও লাইট স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের ব্যবহার যতটা বুঝতে পারছি, তাতে মনে হচ্ছে পাল্টা পাল্টি গোলাগুলি হচ্ছে। ক্যাপ্টেন বলল।
ওদের নিজের মধ্যে হতে পারে কি? জিজ্ঞাসা সিমো সাঈদের।
নিজেদের মধ্যে হলে একই ধরনের অস্ত্রের ব্যবহার হতো। এখানে তা হচ্ছে না। ক্যাপ্টেন আব্দুল্লাহ বলল।
তাহলে? প্রশ্ন সিমো সাঈদের।
বুঝতে পারছি না স্যার। বিস্ময়কর লাগছে স্যার! আরেকটা জিনিস লক্ষ্য করছি, স্বয়ংক্রিয় রিভলবার ব্যবহারের উৎস এক বা দুই- এ ধরনের হবে। অন্যদিকে ভারি অস্ত্র ব্যবহারের উৎস অনেক। বলল ক্যাপ্টেন আব্দুল্লাহ।
এর দ্বারা কি বুঝা যাচ্ছে? আবার প্রশ্ন সিমো সাঈদেরই।
ঠিক জানি না। তবে আন্দাজ করছি, দুই পক্ষের এক পক্ষে অনেক লোক, অন্য পক্ষে এক বা দুই এর বেশি লোক হবে বলে মনে হয় না। বলল ক্যাপ্টেন আব্দুল্লাহ।
বুঝতে পারছি, প্রবল পক্ষটা আমাদের শত্রুপক্ষ। প্রায় একশত সংখ্যার প্রবল শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করছে এক বা দুই জন লোক! কেমন। করে সম্ভব এটা? এই দুঃসাহসি পক্ষটা কে? সিমো সাঈদ বলল।
কিছুই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না স্যার। সবই অনুমান। অপেক্ষা করতে হবে আমাদের। প্রকৃতই কি ঘটছে না জেনে আমরা কিছুই বলতে পারবো না। ক্যাপ্টেন আব্দুল্লাহ বলল।
এ সময় হাদি হাকাম চিৎকার করে উঠল, ঐ যে ফৈজি ছুটে আসছে, নিশ্চয় কোনো খবর আছে।
সবার দৃষ্টি নিচে গেটের দিকে ছুটে গেল। দেখল, তথ্য-গোয়েন্দা গ্রুপের সদস্য ফৈজি দ্রুত উঠে আসছে গ্যারিসনে।
উঠে এল ফৈজি।
গেটেই সবাই দাঁড়িয়েছিল।
জরুরি কোনো খবর আছে, ফৈজি? কি ঘটছে সেখানে? গোলা-গুলি কেন? ফৈজি কাছাকাছি পৌঁছতেই জিজ্ঞাসা সিমো সাঈদের।
সিমো সাঈদের সামনে এসে দাঁড়াল ফৈজি। বলল, স্যার একটা পক্ষকে তো আমরা চিনি, যারা নিজেদের হাওয়ারী বলে পরিচয় দিচ্ছে। অন্য পক্ষকে আমরা বুঝিনি। তবে ত্রিয়াদার পক্ষের লোক হতে পারে তারা।
বুঝলে কেমন করে যে তারা জিয়াদার পক্ষের লোক? হাওয়ারীদের সাথে লড়াই করছে বলে? জিজ্ঞাসা করল সিমো সাঈদ।
স্যার, তাদের কাছাকাছি একটা পাহাড়ের উপর লুকিয়ে ছিলাম। তখন নিচেই উপত্যকায় গোলাগুলি শুরু হয়।
খ্রিস্টার্ন হাওয়ারী লোকরা প্রশস্ত উপত্যকা দিয়ে সৈনিকের ব্যুহ রচনা করে আসছিল গিরিপথের দিকে। তাদের বিশেষ মেশিনগানগুলো সামনের। দিকে তাক করা। কারও কারও হাতে তাক করা রকেট লাঞ্চারও ছিল।
হঠাৎ পাশের জংগল থেকে একজন লোক বেরিয়ে এল। তার পরনে কালো প্যান্ট, গায়ে কালো জ্যাকেট। মাথায় কালো হ্যাট। পিঠে বহন। করছে একটা ব্যাগ।
সে এগোতে লাগল হাওয়ারীদের ব্যুহের দিকে। তাকে ঐভাবে এগোতে দেখে হাওয়ারীদের ব্যুহ দাঁড়িয়ে গেল।
লোকটিও ব্যুহ থেকে সাত আট গজ দূরত্বে গিয়ে দাঁড়াল। জ্যাকেটের দুই পকেটে তার দুই হাত।
সে দাঁড়িয়েই চিৎকার করে বলল, শোন, তোমরা হাওয়ারী নামের ঐ পতাকা নামিয়ে ফেল। ঈসা আ.-এর সাথী হাওয়ারীরা তোমাদের মতো রক্তপিপাসু হিংসুক ছিল না। তোমরা সন্ত্রাসীরা মিথ্যা পরিচয় নিয়ে ত্রিয়াদায় সন্ত্রাস চালাতে যাচ্ছ। পারবে না যেতে সেখানে।
হাওয়ারীদের ব্যুহের প্রথম সারির মাঝখানে দাঁড়ানো ফাদারের মতো টুপি ও পোষাক পরা একজন চিৎকার করে বলল, আমরা তো এসে গেছি ত্রিয়াদায়। সামনের উপত্যক র পরেই ত্ৰিয়াদা। কে আমাদের বাধা দেবে?
তোমার আমার সকলের স্রষ্টা আল্লাহর সাহায্যে আমিই তোমাদের বাধা দেব। সামনে এগোতে হলে তোমাদেরকে আমার লাশের উপর দিয়ে এগোতে হবে। বলল ব্যুহের সামনে গিয়ে দাঁড়ানো লোকটা।
ব্যুহের সামনের সারিতে দাঁড়ানো লোকটা আবার চিৎকার করে নির্দেশ দিল, ফায়ার! উড়িয়ে দাও শয়তানের দোসর ঐ লোকটাকে।
একসাথে গর্জন করে উঠল কয়েক ডজন হ্যান্ড মেশিনগান।
আমি ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলেছিলাম। বহের সামনে দাঁড়ানো, প্রতিবাদী লোকটার ভয়ানক পরিণতি দেখতে আমি চাইনি। ব্রাশ ফায়ারের জমাট গর্জনে একটু ছেদ নামলে আমি চোখ খুললাম দেখার জন্যে যে কি ঘটেছে, লোকটির অবস্থা কেমন দাঁড়িয়েছে।
কিন্তু চোখ খুলে আমি দেখলাম উল্টো চিত্র। হাওয়ারীদের ব্যুহের সামনের তিন চারটি সারির মানুষ রক্তাক্ত লাশে পরিণত হয়েছে। ব্যুহের পেছনের অংশ থেকে তখন গুলি চলছে। আর ব্যুহের সামনে দাঁড়ানো সেই লোকটি দুই হাতে দুই মেশিন রিভলবার নিয়ে ওদের নিশানা করে। গুলি ছুড়ছে। এক পর্যায়ে সে কয়েকটি লাশের আড়ালে দেহটাকে লুকিয়ে রেখে মাঝে মাঝে মাথা তুলে টার্গেটেড গুলিও চালাচ্ছে। একটু পরে দেখলাম, উপত্যকার এই প্রান্তের জংগল থেকে বেরিয়ে এসে আর একজন লোক গড়িয়ে গড়িয়ে এগিয়ে আগের সেই লোকটির কাছে পৌঁছল। লোকটি তাকে কি যেন বলল। দ্বিতীয় লোকটি গড়িয়ে গড়িয়ে আবার বাম দিকের জংগলে ঢুকে গেল। মিনিট পাঁচেক পরেই ঝুহের পেছন থেকে গুলি বর্ষণ শুরু হলো। ঠিক সে সময় সামনে থেকে প্রথম লোকটিও গুলি বর্ষণ শুরু করল। দুই দিক থেকে আক্রান্ত হয়ে হাওয়ারী লোকরা দুই পাশের জংগলের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু এই স্থানটাতে দুইপাশে ছিল বড় বড় পাথর, যা না ডিঙালে জংগলে ঢাকা সম্ভব নয়। কিন্তু দেখলাম যারাই পাথর ডিঙানোর চেষ্টা করছে, তারাই গুলি খাচ্ছে। এর জবাবে হাওয়ারীরা পাগলের মতো ব্রাশ ফায়ার করছে। কোনো টার্গেট ছাড়াই। এই অবস্থা দেখে আমি চলে এসেছি এই খবর এখানে পৌঁছানোর জন্যে। দীর্ঘ বিবরণ দিয়ে থামল ফৈজি।
মন্ত্রমুগ্ধের মতো তার কথাগুলো শুনছিল সিমো সাঈদ, ক্যাপ্টেন আব্দুল্লাহ, হাদি হাকাম, ফাতিমা মারিয়েমসহ উপস্থিত সকলেই।
ফৈজি থামতেই সিমো সাঈদ অনেকটা সম্মোহিতের মতো বলে।
শয়তানদের কত লোক মারা গেছে, তুমি কি আন্দাজ করতে পেরেছ ফৈজি??
আমার মনে হয় তিরিশ চল্লিশজন হবে। তবে তারা যে ফাঁদে পড়েছে, তাতে ওদের কেউ বাঁচবে বলে আমার মনে হয় না। প্রথম লোকটি তো লাশের আড়াল নিয়ে গুলি চালিয়ে যাচ্ছে। আর দ্বিতীয় লোকটি জংগলের আড়ালে থেকে গুলি করছে। তাকে কেউ দেখতে পাচ্ছে না, সে সবাইকে দেখে টার্গেট করে গুলি করছে। দুপাশের জংগলে যে তারা পালাবে, সেটাও ঝুঁকিপূর্ণ। তারা পাথর ডিঙাতে গেলেই গুলি খাবে। বলল ফৈজি।
তোমার কথাকে আল্লাহ সত্য করুন। ওদের হিংসার গ্রাস থেকে আল্লাহ ত্রিয়াদাকে রক্ষা করুন। কিন্তু বল তো লোকটি কে? বলল সিমো সাঈদ।
তা বলা মুশকিল স্যার। তবে, প্রথম লোকটির উচ্চারণ শুনে তাকে আমার কাছে রত্ন দ্বীপের লোক বলে মনে হয়নি। আর দ্বিতীয় ব্যক্তির কোনো কথা আমি শুনতে পাইনি। ফৈজি বলল।
প্রথম লোকটি আমাদের দেশের না হবার সম্ভাবনাই বেশি। কারণ তিনি যে ধরনের কথা বলেছেন নকল হাওয়ারীদের উদ্দেশে এবং যে সাহস ও দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন, তাতে লোকটিকে ঐ লোক বলেই মনে হচ্ছে। যিনি আমাদের সাহায্য করছেন, যিনি আজ ওবাদিয়ার আউটপোস্টে অত। বড় মিরাকল ঘটিয়েছেন এবং যিনি আজ সকাল পর্যন্ত ওদের চল্লিশজনের বেশি লোক মেরেছেন। বলল ফাতিমা মারিয়েম।
তুমি ঠিক বলেছ মা। তিনিই হবেন। কারণ একশর মতো উদ্যত স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের সামনে দাঁড়িয়ে ঐ কথাগুলো বলার মতো লোক আমাদের মধ্যে নেই। আমাদের দ্বীপের অখণ্ড শান্তি যেমন আমাদের কিছু উপকার করেছে, তেমনি কিছু ক্ষতিও করেছে। আমরা সাহস হারিয়ে ফেলেছি। হামলাকারী সশস্ত্র শত্রুর সামনে দাঁড়াবার অভ্যাস ও অভিজ্ঞতা কোনটাই আমাদের নেই। দেখ আমরা দেড়শ লোক, যাদের মধ্যে বিশজন স্টেনগানধারী আছে, একশজন শত্রুর সামনে দাঁড়িয়ে বিজয়ের স্বপ্ন দেখতে পারছিলাম না। অথচ একজন লোক কিভাবে মাত্র ৫ গজ দূর থেকে প্রায় একশ উদ্যত স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রকে চ্যালেঞ্জ করল! আমাদের রত্ন। দ্বীপবাসীদের কাছে এটা স্বপ্ন ছাড়া কিছু নয়! নিশ্চয় ইনি তিনিই হবেন! কিন্তু কে তিনি? তার সম্পর্কে অনেক কিছু শুনেছি। কিন্তু নাম কেউ বলেনি। সিমো সাঈদ বলল। তাঁর কণ্ঠ আবেগে ভারি।
নিশ্চয় তিনি এমন বড় কেউ, যাকে আমরা চিনব। এ কারণেই নাম বলা হচ্ছে না। সম্ভবত শত্রুদের অন্ধকারে রাখার জন্যেই। বলল ফাতিমা মারিয়েম।
ঠিক বলেছ ফাতিমা মারিয়েম। শত্রুদের প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে অন্ধকারে রাখা যুদ্ধের একটা বড় কৌশল। শত্রু যাতে যথাযথভাবে প্রস্তুত হতে না পারে, সতর্ক হতে না পারে, সাহস ও সিদ্ধান্তে যাতে ফাঁক থাকে, এ জন্যেই এমনটা করা হয়।
থামল একটু ক্যাপ্টেন আব্দুল্লাহ। কি একটা ভেবেই সংগে সংগে আবার বলল, আমার মনে হয় স্যার, আমাদের ওদিকে এগোনো দরকার।
সিমো সাঈদ সংগে সংগেই তাকাল ক্যাপ্টেন আব্দুল্লাহর দিকে। বলল, অবশ্যই ক্যাপ্টেন আব্দুল্লাহ, আমাদের ওখানে যাওয়া দরকার। তারা জীবনবাজি রেখে আমাদের জন্যে লড়াই করছেন আর আমরা যাব না? এখনি ব্যবস্থা কর ক্যাপ্টেন আব্দুল্লাহ।
ধন্যবাদ স্যার, আমি ব্যবস্থা করছি। আমি মনে করি লেফটেন্যান্ট কর্নেল রাফায়েল রবীনকে গ্যারিসনের দায়িত্বে রেখে পাঁচজন নিরাপত্তা সৈনিককে নিয়ে আমরা দশ বারোজন সেখানে যেতে পারি। ক্যাপ্টেন আব্দুল্লাহ বলল।
আমি কিন্তু যাবো বাবা। বলল ফাতিমা মারিয়েম।
না মা, তুমি তোমার মাকে নিয়ে মেয়েদের সাথে এখানে থাক। গোলাগুলির জায়গায় নাইবা গেলে। সিমো সাঈদ বলল।
বাবা রাসূল স-এর যুগে মেয়েরা রণাঙ্গনে গেছে। আমি যেতে পারবো না কেন? আমি তো হিযাবের মধ্যেই আছি। বলল ফাতিমা মারিয়েম ক্ষোভের সাথে।
আচ্ছা যাবে। ক্যাপ্টেন আব্দুল্লাহ, তুমি ফাতিমা ও হাদি হাকাম দুজনকেই সাথে রাখ। তাড়াতাড়ি কর ক্যাপ্টেন আব্দুল্লাহ। গোলাগুলি কিন্তু সেখানে সমানে চলছে।
এখনই যাত্রার ব্যবস্থা আমি করছি স্যার। বলে ক্যাপ্টেন আব্দুল্লাহ গ্যারিসনের ভেতর দিকে চলে গেল।
