৬
চারদিক স্তব্ধ।
গুলির শব্দ আর নেই।
বুক কাঁপছে সিমো সাঈদ, ক্যাপ্টেন আব্দুল্লাহ, ফাতিমা মারিয়েমসহ সকলের। সংকীর্ণ উপত্যকায় ঢোকার গিরিপথ পার হচ্ছে তারা। গিরি পথের ওপারে কি অপেক্ষা করছে তাদের জন্যে। কি দেখতে পাবে সেখানে গিয়ে তারা। যদি দেখে অন্য কিছু…! না তা হবে না, হতে পারে না। আল্লাহ রাব্বল আলামিন তাঁর সাহায্য আমাদের কাছ থেকে কেড়ে নেবেন না।
কিন্তু চারদিক হঠাৎ এভাবে স্তব্ধ হয়ে গেল কেন?
সবার আগে হাঁটছে ক্যাপ্টেন আব্দুল্লাহ। তার হাতে স্টেনগান। কোমরে ঝুলানো রিভলবার।
তার পেছনে স্টেনগানধারী পাঁচজন নিরাপত্তা সৈনিক। তাদের পেছনে সিমো সাঈদ, ফাতিমা মারিয়েম, হাদি হাকাম ও অন্যরা।
গিরিপথের মুখে পৌঁছে বাম হাত উপরে তুলে ঘুরে দাঁড়াল ক্যাপ্টেন আব্দুল্লাহ। বলল সে সিমো সাঈদকে লক্ষ্য করে, পাঁচজন নিরাপত্তা সৈনিকসহ আপনারা এখানে অপেক্ষা করুন। আমি উপত্যকায় নেমে সেখানকার পরিস্থিতি দেখে করণীয় ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেব। পরিস্থিতি অনুকূল হলে আমি, সাদা রুমাল উড়িয়ে আপনাদের সংকেত দেব উপত্যকায় নামার জন্যে। আর যদি বিপরীত কিছু হয় তাহলে আমি ফিরে এসে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেব।
আর যদি আপনার বিপদ হয়? বলল ফাতিমা মারিয়েম।
আমি আমাকে নিরাপদ রেখেই সবকিছু করব। বাকি আল্লাহ ভরসা। আল্লাহ যা করবেন সেটাই হবে। ক্যাপ্টেন আব্দুল্লাহ বলল।
ফাতিমা মারিয়েম কিছু বলতে গিয়েও চেপে গেল। মুখ নিচু করল।
তোমার পরিকল্পনা ঠিক আছে ক্যাপ্টেন আব্দুল্লাহ। তুমি কাউকে সাথে নেবে কিনা বিবেচনা করে দেখ। বলল যিমো সাঈদ।
পরিস্থিতি দেখার যে কাজে আমি যাচ্ছি, তা একার জন্যে সুবিধাজনক স্যার। ক্যাপ্টেন আব্দুল্লাহ সবাইকে সালাম দিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে গিরিপথ থেকে নেমে গেল।
জংগলের আড়াল নিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে উপত্যকার প্রান্তে গিয়ে পৌঁছল।
ক্যাপ্টেন আব্দুল্লাহ গিরিপথ থেকে নেমে জংগলের মধ্য দিয়ে কিছুটা দক্ষিণে এসে পৌঁছল। সেখান থেকে ঘটনার স্থান আরও কাছে এসে গিয়েছিল।
জংগলের প্রান্ত থেকে উঁকি দিয়ে সবকিছু স্পষ্ট দেখতে পেল। দেখল, সারি সারি লাশ পড়ে আছে। দুজন লোক দাঁড়িয়ে আছে লাশের পাশে। তারা লাশগুলোকে সার্চ করছে।
সার্চ করতে গিয়ে তাদের দুজনই এদিকে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। দুজনের মধ্যে একজনের উপর চোখ পড়তেই চমকে উঠল ক্যাপ্টেন আব্দুল্লাহ। উনি তো মেজর পাভেল, তাদের নিরাপত্তা বাহিনীর ডেপুটি প্রধান।
আনন্দে লাফিয়ে উঠল ক্যাপ্টেন আব্দুল্লাহ।
বেরিয়ে এলো জংগল থেকে। উড়িয়ে দিল সাদা রুমাল।
মিনিটখানেকের মধ্যেই সিমো সাঈদরা ছুটে নেমে এলো নিচে, উপত্যকায়। আহমদ মুসারাও দেখতে পেয়েছিল ক্যাপ্টেন আব্দুল্লাহ এবং সিমো সাঈদদের।
ওরা কি ত্ৰিয়াদা থেকে আসছে? বলল আহমদ মুসা মেজর পাভেলকে।
ইয়েস স্যার। আসুন স্যার, তাদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেই। এসে গেছে ওরা।
আহমদ মুসা ও মেজর পাভেল একসাথে কয়েক ধাপ এগোলো। সিমো সাঈদরাও এসে পড়েছে।
আহমদ মুসাকে সিমা সাঈদদের সামনে নিয়ে এসে সিমো সাঈদকে দেখিয়ে বলল, ইনি সিমো সাঈদ, জিয়াদা এলাকার নির্বাচিত সংসদ সদস্য। তিনি জিয়াদা অঞ্চলের প্রশাসনিক উপদেষ্টাও। মেজর পাভেল বলল। এরপর ক্যাপ্টেন আব্দুল্লাহ, ফাতিমা মারিয়েম, হাদি হাকামদের সাথে আহমদ মুসাকে পরিচয় করিয়ে দিল মেজর পাভেল। এরপর মেজর পাভেল আহমদ মুসা সম্পর্কে বলল, আর স্যারের সম্পর্কে তো আপনারা জানেন। তিনি আমাদের সম্মানিত নেতা, আমাদের গাইড।
সংসদের বৈঠকে আমরা তার সম্পর্কে কিছু শুনেছি। কিন্তু পরিচয় জানার সৌভাগ্য হয়নি। বলল সিমো সাঈদ।
নানা কারণে তার পরিচয় সাধারণভাবে জানানো হয় না। আপনারা দায়িত্বশীল ও সচেতন। হ্যাঁ, এখন আপনারা অবশ্যই তার পরিচয় জানবেন। তিনি আমাদের মহান ভাই আহমদ মুসা। মেজর পাভেল বলল।
নাম শোনার সাথে সাথে সবার চোখ গিয়ে আছড়ে পড়ল আহমদ মুসার ওপর। সিমো সাঈদ স্থির দৃষ্টিতে কয়েক মুহূর্ত আহমদ মুসার দিকে চেয়ে থেকে আসোলামু আলাইকুম বলে জড়িয়ে ধরল তাকে। ফাতিমা মারিয়েম ও হাদি হাকামের অপ্রতিরোধ্য আবেগ যেন অশ্রু হয়ে গড়িয়ে পড়ছে তাদের চোখ দিয়ে। ক্যাপ্টেন আব্দুল্লাহ স্যালুট দিয়ে বলল, স্যার, গোটা দুনিয়ায় আমাদের মতো যারা, তাদের আপনি আলোর মশাল। আপনি আমাদের প্রেরণা, আমাদের শক্তি।
আহমদ মুসা ক্যাপ্টেন আব্দুল্লাহর পিঠ চাপড়ে বলল, ইয়ংম্যান, প্রশংসা শুধু আল্লাহরই প্রাপ্য। আমার বুদ্ধি, আমার জ্ঞান, আমার সাহস, শক্তি, কিছুই তো আমি সৃষ্টি করিনি। এসব যিনি দয়া করে আমাকে দিয়েছেন, প্রশংসা তাঁরই। কারও সাক্ষাতে তার সামনে এই ধরনের প্রশংসা আল্লাহর রাসূল স. পছন্দ করেননি।
স্যার, এগুলো প্রশংসা নয় স্যার। এগুলো সত্যের প্রকাশ। আমাদের জন্যে এটুকুর প্রয়োজন আছে স্যার। আল্লাহ আমাদের মাফ করবেন। বলল ফাতিমা মারিয়েম। তার গালে তখনও অশ্রুর ধারা।
ধন্যবাদ বোন। তোমরা ভালো যুক্তি শিখেছ। আসল কথা কি জান, ব্যক্তি আমাদের কাছে বড় হওয়া উচিত নয়, তার কাজ বড় হতে হবে। যারা ব্যক্তিকে বড় করে দেখে, তারা ব্যক্তির পূজা করে, কিছুই শেখে না, সেই ব্যক্তির রেখে যাওয়া পতাকা তারা ঊর্ধ্বে তুলে ধরতে পারে না। আর ব্যক্তিকে নয়, কাজকে বড় করে দেখলে, সে কাজ শেখে, তার রেখে যাওয়া কাজ সে করে। এটাই আল্লাহ চান, রেসালাতের শিক্ষাও এটা। আহমদ মুসা বলল।
ধন্যবাদ স্যার। এই যে…।
ইশারা করে ফাতিমা মারিয়েমকে থামিয়ে দিয়ে আহমদ মুসা সিমো সাঈদের দিকে চেয়ে বলল, জনাব, আমাদের হাতে সময় খুব কম। আমি ও মেজর পাভেল পাহাড়ে ঢুকেছিলাম মিড ব্ল্যাক সিন্ডিকেটের ঘাঁটি খুঁজে বের করার জন্যে। এই সময় ত্ৰিয়াদার বিপদের কথা শুনে আমরা এদিকে চলে আসি। এ ঘটনার পর এই অঞ্চলের মিড ব্ল্যাক সিন্ডিকেটের ঘাঁটিতে অভিযান অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। এই ওবাদিয়া পাহাড় অঞ্চলের কোথায় মিড ব্ল্যাক সিন্ডিকেটের ঘাঁটি আছে, এ ব্যাপারে আপনারা কি কোনো সাহায্য করতে পারবেন?
সিমো সাঈদের হঠাৎ মনে পড়ল ফৈজির দেয়া তথ্য যে, ইপিজি-এর ঘাঁটি থেকেই হাওয়ারীদের জনবল, অস্ত্রবল সবই সরবরাহ করা হয়। অন্য কথায় হাওয়ারী নামের ছদ্মবেশে ইপিজিই ত্রিয়াদাকে ধ্বংস করার জন্য এই অভিযানে এসেছিল। ইপিজি কি ছদ্মবেশ? আসলে এরাই কি মিড ব্ল্যাক সিন্ডিকেট? এই চিন্তা করে সিমো সাঈদ দ্রুত বলল, জনাব, আমাদের গোয়েন্দা গ্রুপ আজই আমাদের একটা তথ্য দিয়েছে, হাওয়ারীদের এই অভিযানকে জনবল, অস্ত্রবল দিয়ে সাহায্য করেছে এনভাইরনমেন্টাল প্রটেকশন গ্রুপ (ইপিজি) নামের এনজিও। এদের অফিস আছে এই ওবাদিয়ার পাহাড় অঞ্চলের আরও একটু দক্ষিণ-পূর্বে, আরও একটু উপরে। আমার এখন মনে হচ্ছে ইপিজি নামটাও ছদ্মবেশ। এরাই মিড ব্ল্যাক সিন্ডিকেট হতে পারে।
অনেক ধন্যবাদ, জনাব। ইপিজির অফিস বা ঘাটির লোকেশনটা কি? জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।
আমি যাইনি কখনও ইপিজি অফিস এলাকায়। তবে আমাদের গোয়েন্দা ইনফরমাররা জায়গাটা চেনে। আমি তাদের একজনকে ডাকছি।
একটু থামল সিমো সাঈদ। সংগে সংগেই আবার বলল, জনাব, আপনি আমাদের দোরগোড়ায় এসেছেন। আমরা সর্বান্তকরণে আশা করছি, আমাদেরকে দয়া করে আতিথেয়তার সুযোগ দেবেন।
আপনাকে ধন্যবাদ। আপনার দাওয়াত গ্রহণ করতে পারলে খুব খুশি হতাম। ক্ষুধাও লেগেছে খুব। কিন্তু এ মুহূর্তে তা সম্ভব নয়। এখান থেকে অনেক লোক পালিয়ে যেতে পেরেছে। তারা জমায়েত হয়ে ওখানে পৌঁছাবার আগেই আমরা তাদের ঘাঁটিতে পৌঁছতে চাই। সেই গোয়েন্দা ছেলেটিকে আমাদের সাথে দিন অথবা লোকেশন পেলেই চলবে। বলল আহমদ মুসা।
স্যরি স্যার, ওরা জমায়েত হয়ে ঘাঁটিতে গেলেই না লাভ বেশি? তখন ওদের একসাথে পাওয়া যাবে। তাদের আগে পৌঁছলে তো ওদের অনেককেই পাবেন না। বলল ফাতিমা মারিয়েম।
ওদের ঘাঁটিতে গিয়ে লড়াই করা আমাদের লক্ষ্য নয়। ঘাঁটি থেকে এমন কিছু কাগজপত্র, দলিলপত্র আমরা পেতে চাই, যার দ্বারা জানা যাবে, তারা কারা? কেন এসব করছে? কি চায় তারা? তাদের গোড়া কোথায়? এসব জানলে তবেই ওদের সন্ত্রাস নির্মূল করা যাবে। তাছাড়া ওলা দল পরিত্যাগ করে পালাতেও পারে। ওদের যদি ধীরে-সুস্থে ঘাটি ছেড়ে চলে যাবার সুযোগ দেয়া হয়, তাহলে সব আলামত নষ্ট করে যাবে অথবা নিয়ে যাবে। আহমদ মুসা বলল।
বুঝেছি জনাব। ফৈজি এখনই আসছে। আমরা কি আপনাদের সাথী হতে পারি? অন্তত অস্ত্রধারীদের আপনারা সাথে নিতে পারেন। বলল সিমো সাঈদ।
জনাব, আসলে আমরা গোপন অভিযানে যাচ্ছি। বেশি লোক নিলে ব্যাপারটা গোপন রাখা নাও যেতে পারে। আহমদ মুসা বলল।
ফৈজি এসে গেল।
সিমো সাঈদ ফৈজিকে এনে আহমদ মুসার সামনে দাঁড় করিয়ে বলল, এ ফৈজি। আমাদের তথ্য-গোয়েন্দা গ্রুপের সদস্য।
আহমদ মুসা ফৈজিকে সালাম দিয়ে বলল, আপনি ইপিজি অফিসে গেছেন?
জি স্যার। কয়েকবার গেছি। ফৈজি বলল।
খুব অল্প কথায় লোকেশনটা বলতে পারবেন, প্লিজ? বলল আহমদ মুসা।
লোকেশন খুঁজে পেতে মজার চিহ্ন আছে। তিনটি ভিন্ন ভিন্ন পাহাড়ের ত্রিভুজের তৃতীয় ত্রিভুজটির পিরামিড আকৃতির মাথার পরেই গভীর উপত্যকা ঘেরা একটা প্রশস্ত টিলা আছে। ঐ টিলাতেই ইপিজির অফিস। ফৈজি বলল।
পাহাড়ের একটা ত্রিভুজ তো আমরা পার হয়ে এসেছি। পরের ত্রিভুজ দুটি কোথায়? বলল আহমদ মুসা।
স্যার, এখন থেকে দক্ষিণ-পূর্ব কোণের দিকে তাকিয়ে দেখুন। সবচেয়ে উঁচু মাথার একটা নাঙ্গা পাহাড় শীর্ষ দেখতে পাবেন। ওই পাহাড় শীর্ষকে নাক বরাবর রেখে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে এগোলে পাহাড়ের দুটি ত্রিভুজই পাওয়া যাবে। তৃতীয় ত্রিভুজটি ঐ নাঙ্গা পাহাড়ের নিচেই। ফৈজি বলল।
ত্রিভুজ ছাড়া পথের আর কোনো চিহ্ন আছে? বলল আহমদ মুসা।
ঐ নাঙ্গা পাহাড় সামনে রেখে ঠিক দক্ষিণ-পূর্ব কোণ বরাবর এগোতে পারলে কোনো পাহাড় ডিঙাতে হবে না। উপত্যকার পর উপত্যকা পেরিয়ে ইপিজি অফিসে পৌঁছা যাবে। পাহাড়ের দ্বিতীয় ত্রিভুজকে বাম পাশে এবং তৃতীয় ত্রিভুজকে ডান পাশে রেখে এগোতে হবে। ফৈজি বলল।
ধন্যবাদ ফৈজি। ইপিজি অফিস বা ঘাটি সম্পর্কে কিছু বল। তুমি কি স্কেচ এঁকে দিতে পার? বলল আহমদ মুসা।
পারব স্যার। ফৈজি বলল।
আহমদ মুসা তার পিঠের ব্যাগ থেকে একখণ্ড কাগজ এবং একটা কলম নিয়ে ফৈজির হাতে তুলে দিল।
ফৈজি বসে কাগজের শিটটি নিয়ে উরুর উপর রেখে স্কেচ আঁকল। প্রবেশ পথসহ প্যাসেজ, দরজা, চত্বর ইত্যাদি যতটা সম্ভব দেখাবার চেষ্টা করল। আঁকা শেষ করে কাগজের শিট ও কলম তুলে দিল আহমদ মুসার হাতে।
আহমদ মুসা স্কেচটির ওপর নজর বুলাল। বলল, তোমার স্কেচের উত্তর দিক তো কাগজের উপরের দিক তাই না?
লজ্জিত হলো ফৈজি। বলল, স্যরি স্যার, আমার ভুল হয়েছে। আমি পূর্বমুখী হয়ে বসে স্কেচ করেছি, সে কারণে স্কেচ-শিটের উপরের দিককে পূর্ব দিক ধরে নিয়েছি।
ধন্যবাদ ফৈজি। অসুবিধা নেই।
বলে আহমদ মুসা তাকাল সিমো সাঈদের দিকে। বলল, জনাব, আমরা এখন আসি।
জনাব জিয়াদার কঠিন এক দুঃসময়ে আল্লাহ আমাদের জন্যে আপনাকে পাঠিয়েছেন। ওদের সাথে লড়াইয়ে আমরা জিতব, তা আমরা আশা করতে পারিনি। আমরা মৃত্যুর জন্যে তৈরি হয়েছিলাম। কিন্তু আল্লাহ আমাদের বিজয় এনে দিয়েছেন। মহান আল্লাহর অপার মহিমা আমাদের গায়ে একটা কাঁটার আঁচড়ও লাগল না। আপনার দ্বারাই আল্লাহ এই অসাধ্য সাধন করলেন। আমাদের আকুল একটা কামনা ছিল আপনাকে আমরা ত্ৰিয়াদায় নিয়ে যাই। ফেরার পথে কি দয়া করে…!
সিমো সাঈদকে কথা শেষ করতে না দিয়েই বলে উঠল আহমদ মুসা, আমরা আদৌ ফিরব কিনা, কোন্ পথে কিভাবে ফিরব, সবই আল্লাহর হাতে। আমি কোনো ওয়াদা করতে পারছি না জনাব। তাড়াহুড়ার। প্রয়োজন নেই। আমি তো রত্ন দ্বীপে আরও কিছু দিন আছি।
আমরা আশায় রইলাম স্যার। বলল ফাতিমা মারিয়েম।
ভালো কোনো বিষয়ে আশাহত হতে আল্লাহ নিষেধ করেছেন। আহমদ মুসা বলল।
শান্তির এই রত্ন দ্বীপে এই বিপদ কেন এলো স্যার? গত পঞ্চাশ বছরে গুলি কিংবা আগ্নেয় অস্ত্রের আঘাতে একজন লোকও মারা যায়নি, কিন্তু মাত্র গত কয়েকদিনে প্রায় একশর মতো লোক মারা গেল এই দ্বীপে। বলল ফাতিমা মারিয়েম।
আল্লাহ ভালো জানেন। তবে আমি দুটি বিষয় অনুমান করি। এক. বাইরের কোনো গ্রুপ রত্ন দ্বীপে হঠাৎ কোনো স্বার্থের সন্ধান পেয়েছে অথবা রত্ন দ্বীপ নিয়ে কারো কোনো পরিকল্পনা আছে। দুই, আল্লাহ এই উপলক্ষে রত্ন দ্বীপের যোগ্যতা বাড়িয়ে দিতে চান। একটি রাষ্ট্রের আত্মরক্ষার জন্যে যে সর্বনিম্ন প্রস্তুতিটুকু থাকা দরকার তা রত্ন দ্বীপের নেই। আহমদ মুসা বলল।
ধন্যবাদ স্যার। আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। এই শেষের বিষয়টি আমাদের রাষ্ট্রনেতাদের মাথায় ভালোভাবে ঢুকা দরকার। বলল ক্যাপ্টেন আব্দুল্লাহ।
আহমদ মুসা হাসল। বলল, এটা তোমাদের কাজ, এটা সিমো সাঈদ সাহেবদের কাজ।
কথা শেষ করেই আর কোনো কথা নয় বলে আহমদ মুসা ঘুরে দাঁড়াল মেজর পাভেলের দিকে। বলল, মেজর পাভেল তুমি রেডি?
জি স্যার, আমি রেডি। আমি কিছু অ্যামুনেশন ক্যাপ্টেন আব্দুল্লাহর কাছ থেকে নিয়েছি। বলল মেজর পাভেল।
ঘটনাটা ক্যাপ্টেন আব্দুল্লাহকে হেড কেয়ার্টারে জানাতে বলেছ? আহমদ মুসা বলল।
জি স্যার। বলল মেজর পাভেল।
ধন্যবাদ। এবার চল।
বলে আহমদ মুসা ঘুরে দাঁড়িয়ে সবাইকে সালাম দিয়ে আবার ফিরল।
হাঁটা শুরু করল আহমদ মুসা। তার পেছনে পেছনে মেজর পাভেল।
সবার চোখ তাদের যাত্রাপথের দিকে।
বাবা পোস্ট মডার্ন যুগের আরেক হাতেম তাঈ তিনি। বলল ফাতিমা মারিয়েম। তার কণ্ঠ, ভারি।
অ্যান্থনি হুগো, তোমার গুপ্তধন সার্চ ফাইলটি নিয়ে এসো এখনি। বলল আইভান ম্যাথিউ। আইভান ম্যাথিউ মিড ব্ল্যাক সিন্ডিকেট-এর ওবাদিয়া ঘাঁটির প্রধান। আর অ্যান্থনি হুগো রত্ন দ্বীপে মিড ব্ল্যাক সিন্ডিকেটের গুপ্তধন সার্চ কমিটির সদস্য। অ্যান্থনি হুগো আজই রেনেটা ক্যাসল থেকে ওবাদিয়া ঘাঁটিতে এসেছে।
রেনেটা ক্যাসল রত্ন দ্বীপে মিড ব্ল্যাক সিন্ডিকেটের হেডকোয়ার্টার।
অ্যান্থনি হুগো রত্ন দ্বীপে গুপ্তধন সার্চ কমিটির ফাইল নিয়ে আইভান ম্যাথিউ-এর ঘরে এল।
স্যরি অ্যান্থনি, তুমি অনেক সময় আগে এসেছ। কিন্তু তোমার সাথে কথা বলতে পারিনি। জিয়াদা অভিযান নিয়ে সাংঘাতিক টেনশনে পড়েছি। দায়িত্বশীল কারও সাথেই যোগাযোগ করতে পারছি না। সব মোবাইলই বন্ধ। ওদের প্রায় ফিরে আসার সময় হয়ে গেল, কিন্তু কোনো খবরই ওদিক থেকে আসছে না। বলল আইভান ম্যাথিউ।
অ্যান্থনি হুগোরও কপাল কুঞ্চিত হয়ে উঠল। বলল, খারাপ কিছু ঘটেছে বলে আশঙ্কা করছেন? ভালোও তো হতে পারে। হয়তো আনন্দ ফুর্তি করতে গিয়ে খবর দিতে ভুলে গেছে।
কিন্তু ওরা কেউ কল অ্যাটেন্ড করবে না এটা তো হয় না। আশঙ্কার বিষয় এখানেই। বলল আইভান ম্যাথিউ।
খারাপ কিছু ঘটলে, অবশ্যই ওরা জানাবার কথা। অ্যান্থনি হুগো বলল।
দায়িত্বশীল না হলে জানাবার কাজ অন্য কেউ অনেক সময়ই করতে চায় না। পালিয়ে থাকার সুযোগ নেয় তারা। বলল আইভান ম্যাথিউ।
দায়িত্বশীল কেউ থাকবে না, সবাই মারা পড়বে, তার খবরও আসবে।, এমন ভাবার দরকার নেই স্যার। অন্য কোনো কারণও থাকতে পারে। অ্যান্থনি হুগো বলল।
এমন ঘটতেও পারে! আজই তো ঘটেছে। ওবাদিয়া আউটপোস্টে আমাদের সুপরিকল্পিত অভিযান সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। খবর দেবার মতো একজনও বেঁচে ছিল না। বলল আইভান ম্যাথিউ।
একটু থামল আইভান ম্যাথিউ। বলল আবার সংগে সংগেই, থাক এ বিষয়। আমি তোক পাঠিয়েছি খবর নেয়ার জন্যে। এখন বলুন আপনার কথা।
একটু নড়ে-চড়ে বসল অ্যান্থনি হুগো। বলল, গতকাল চীফ বস্ টেলিফোন করেছিলেন গুপ্তধনের লোকেশন সন্ধানের ব্যাপারে আমরা কতটা এগিয়ে তা জানার জন্য। তিনি খুব অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন যে, আমরা কোনো লোকেশন চিহ্নিত করার কাজে কিছুই এগোয়নি। ইমিডিয়েটলি তিনি রেজাল্ট দেখতে চান। আসলে রত্ন দ্বীপে আমাদের গোটা জনশক্তি দ্বীপ-প্রশাসনের সাথে আক্রমণ প্রতি-আক্রমণে জড়িয়ে পড়েছে। গুপ্তধন সন্ধানের কাজ বন্ধই হয়ে গেছে। কাজটি এখনি শুরু হওয়া দরকার। থামল অ্যান্থনি হুগো।
এতদিন রেনেটা ক্যাসল থেকে কেন্দ্রীয় একটা টিম এই কাজ করছিল। গুপ্তধন সন্ধানের কোনো ব্যাপারেই আমাদের কিছু জানানো হয়নি। বলল আইভান ম্যাথিউ।
এখন সন্ধানের কাজ দ্রুততার সাথে করতে বলা হয়েছে। এখন রত্ন দ্বীপ সরকার-ব্যবস্থা ধ্বংস ও সরকারের পতন ঘটানোর সর্বাত্মক চেষ্টা চলবে। কিন্তু এজন্যে গুপ্তধন সন্ধানের কাজ বন্ধ রাখা যাবে না। সরকার ব্যবস্থা ও সরকারের পতন হোক না হোক, গুপ্তধন আমাদের উদ্ধার করতে হবে এবং সেটা খুবই তাড়াতাড়ি। এজন্যেই গুপ্তধন সন্ধানের কাজ এখন রেনেটা ক্যাসলসহ সব কেন্দ্র থেকে করা হবে। পশ্চিমের আড্রিয়ানা অঞ্চলে রেনেটা ক্যাসল থেকে, দক্ষিণের ওবাদিয়া অঞ্চলে ইপিজি থেকে, পূর্বের গোয়েন্দালিয়া অঞ্চলে (কাবার্বা ক্যাসলসহ) জাদোক এবং উত্তরে আমোডি অঞ্চলে আরাগন থেকে সন্ধান চালানো হবে। অত্যন্ত দ্রুত কাজ সমাধার জন্যেই এটা করা হয়েছে। বলল অ্যান্থনি হুগো।
গোয়েন্দালিয়া অঞ্চলে জাদোক ও আমোড়ি অঞ্চলে আরাগনসহ রত্ন দ্বীপে মিড ব্ল্যাক সিন্ডিকেটের ৪টি ঘাঁটি রয়েছে। এই চারটির মধ্যে রেনেটা ক্যাসল হেডকোয়ার্টার হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
ধন্যবাদ হুগো। এখন বল হেডকোয়ার্টার আমাদেরকে এ ব্যাপারে কি সাহায্য করবে? আইভান ম্যাথিও বলল।
এ সম্পর্কে যতটুকু তথ্য আছে তা দিয়ে সাহায্য করবে হেডকোয়ার্টার, বাকিটা আপনাদের যোগাড় করতে হবে।
বলে অ্যান্থনি হুগো একটি ফাইল আইভান ম্যাথিউ-এর হাতে দিয়ে বলল, দেখুন এই ফাইলে চারটি স্থানে চারটি গুপ্তধনের ইতিহাস আছে। কোনোটিরই স্থানের নাম নেই, আছে পাহাড়ী পথের একটি করে স্কেচ, কিছু চিহ্ন এবং দুর্বোধ্য কিছু ল্যাটিন ও আরবি অ্যালফাবেট। এসব ব্যবহার করে গুপ্তধনের চারটি স্থান চিহ্নিত করতে হবে। = ফাইলে চোখ বুলাচ্ছিল আইভান ম্যাথিউ। বিস্ময়ে চোখ কপালে তুলে বলল, মহাব্যাপার অ্যান্থনি হুগো। বিশ্বের বিখ্যাত জলদস্যুদের ধনভাণ্ডার লুকানো আছে এই রত্ন দ্বীপে? দক্ষিণ আমেরিকা থেকে লুট করে আনা ট্রেজার শীপের স্বর্ণ পুনলুণ্ঠিত হয়ে তাও এখন রত্ন দ্বীপের মাটির তলে আছে। স্পেনের পরাজিত ও বিতাড়িত মুসলিমদের শত শত নৌকা জাহাজ লুট করে জলদস্যুরা। লুষ্ঠিত জাহাজ বোঝাই স্বর্ণ, মণি-মানিক্য জলদস্যুরা এই জনমানবহীন রত্ন দ্বীপেই লুকিয়ে রাখে। সত্যিই চমৎকার সব কাহিনী।
কাহিনী চমৎকার, সাত রাজারধনের চেয়েও বড় গুপ্তধনভাণ্ডার আরও বেশি বিস্ময়কর! কিন্তু গুপ্তধনের পথের নক্সা, দুর্বোধ্য চিহ্নগুলো এবং ল্যাটিন ও আরবি বর্ণগুলোর তাৎপর্য উদ্ধার করা তার চেয়ে অনেক বেশি কষ্টকর। আমাদের হেডকোয়ার্টার এখন সব বাধা দূর করে গুপ্তধন উদ্ধারকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। বলল অ্যান্থনি হুগো।
আমাদেরও চাওয়া এটাই। আইভান ম্যাথিউ বলল।
বলেই আইভান ম্যাথিউ তাকাল তার হাতঘড়ির দিকে। দেখল ৭টার বেশি বেজেছে। মনের আতংকটা তার নতুন করে জেগে উঠল। কারো
কোনো খবর নেই কেন? যাদের পাঠানো হলো, তারাও তো কিছু জানাচ্ছে না।
আইভান ম্যাথিও ইন্টারকম অন করে বলল, সাইমন, ওদিকের কোনো খোঁজ জান?
এখন পর্যন্ত কোনো খবর আমি জানি না। এইমাত্র একটি মেসেজ এসেছে ম্যারিও-এর কাছ থেকে। আমি মেসেজটা দেখে বলছি স্যার। বলল সাইমন।
তুমি মেসেজটা নিয়ে এসো এখনি। বলল আইভান ম্যাথিও।
আসছি স্যার। বলে সাইমন দ্রুত এলো।
বসো সাইমন। পড় তোমার মেসেজ। বলল আইভান ম্যাথিউ।
ধন্যবাদ স্যার! বলে বসল সাইমন। পড়ল মেসেজটা : খুব বড় ঘটনা ঘটে গেছে। ত্রিয়াদা পৌঁছার আগেই ক্রিক উপত্যকায় আমরা বাধার মুখে পড়ি। মাত্র একজন লোক আমাদের সামনে এসে দাঁড়ায়। একসাথে আমাদের অনেক মেশিনগান তাকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। কিন্তু অলৌকিকভাবে লোকটা বেঁচে যায় এবং সে পাল্টা আক্রমণ করে। পরে আরেকজন লোক তার সাথে যোগ দেয়। আমাদের অর্ধেকের মতো লোক মারা গেছে। বেঁচে থাকাদের অধিকাংশই আহত। আমিও আহত, চলবার মতো ক্ষমতা আমার নেই। অল্প কিছু যারা আহত হয়নি তারা পালিয়েছে ভয়ে। থামল সাইমন। মেসেজ পড়া শেষ।
বিষাদের ছায়া নেমেছে আইভান ম্যাথিউ-এর চোখে মুখে। স্বগত:কণ্ঠে বলল, এখানেও সেই একজন লোক। তাকে ধরার জন্যেই তো আমাদের সব আয়োজন। আর সেই কি না আমাদের এত বড় অভিযানকে ভণ্ডুল করে দিল!
আইভান ম্যাথিও তাকাল সাইমনের দিকে। বলল, এখন আমাদের এই ঘাঁটিতে কতজন লোক রয়েছে?
সব মিলিয়ে ১২জন। বলল সাইমন।
তাহলে পাঁচজনকে পাঠিয়ে দাও আহতদের উদ্ধার করার জন্যে। তারা শত্রুর হাতে পড়লে মহাক্ষতি হয়ে যাবে আমাদের। আইভান। ম্যাথিউ বলল।
ঘাটি অরক্ষিত হয়ে পড়বে না তো? বলল সাইমন।
পাঁচজন পাঠানোর পরও আমরা সাতজন থাকছি। অসুবিধা হবে না। আর ঘাঁটিতে ওরা হামলা চালাতে পারে বলে আমি মনে করি না। ঘাঁটির সন্ধান পাওয়া সহজ নয়। আইভান ম্যাথিউ বলল।
উঠছি স্যার। বলল সাইমন।
শোন সাইমন, ওদের প্রয়োজনীয় উপদেশ দিয়ে পাঠাবে।
সাইমন উঠে গেল।
মিড ব্ল্যাক সিন্ডিকেট-এর বিরাট ক্ষতি হয়ে গেল। প্রায় একশত খুবই মূল্যবান জীবন আমাদের হারিয়ে গেল। বস্ খুবই ক্রুদ্ধ হয়েছেন। গুপ্তধন উদ্ধার না হওয়া পর্যন্ত তিনি গুপ্তধন উদ্ধারের সাথে সম্পর্কিত নয় এমন সংঘাত এড়িয়ে চলতে বলেছেন, এ সিদ্ধান্ত খুবই যৌক্তিক। বলল অ্যান্থনি হুগো।
তুমি কথা তুলেছ, সে জন্যেই বলছি। শুধু গুপ্তধনের উদ্ধারই কি আমাদের লক্ষ্য হয়ে দাঁড়াচ্ছে? যার জন্যে আমরা কোটি কোটি ডলার নিয়েছি, সে কাজটা আমরা কখন করব। গুপ্তধন উদ্ধারের পর ঐ কাজের আবেগ, উৎসাহ কি আমাদের থাকবে? আইভান ম্যাথিউ বলল।
সেকাজটা ছাড়া হচ্ছে না। শুধু অগ্রাধিকার পরিবর্তন হচ্ছে। আগে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল রত্ন দ্বীপে ত্রিধর্মের ঐক্য ভেঙে তাদের মধ্যে অবিশ্বাস ও হানাহানির পরিস্থিতি সৃষ্টি করা, তারপর সরকারের পতন ঘটানো এবং সেই বিশৃঙ্খল পরিবেশে গুপ্তধনভাণ্ডার উদ্ধার করা। এখন এটুকু পরিবর্তন হয়েছে যে, দুই কাজ একই সময়ে করা হবে। যেহেতু সংঘাতের পরিবেশটা হঠাৎ বেড়ে গেছে, তাই ওদিকটা থেকে একটু সরে এসে গুপ্তধনভাণ্ডারগুলো চিহ্নিত করা এবং তা উদ্ধারের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা হওয়া দরকার, যাতে প্রয়োজনের মুহূর্তে ধনভাণ্ডারগুলো সরিয়ে নেয়া যায়। তা না হলে বিশৃঙ্খল পরিবেশে বিরূপ অবস্থার সৃষ্টি হবে, যারা রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করতে চায়, তারা কি করবে, সেটা অনিশ্চিত। সে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের জন্য ধনভাণ্ডার উদ্ধারের কাজ ফেলে রাখা যায় না বলেই অগ্রাধিকারের বিষয়টা পরিবর্তন করা হয়েছে। বলল অ্যান্থনি হুগো।
বলতো যারা আমাদের কোটি কোটি ডলার দিয়েছে রত্ন দ্বীপের রাজনৈতিক ব্যবস্থা ধ্বংস ও সরকারের পতনের জন্যে, তাদের আসল। লক্ষ্য কি? দ্বীপ দখল? এই ছোট দ্বীপ দখলের জন্যে তো এত কিছুর দরকার হয় না। একদল সৈন্য নিয়ে এলেই তো এ দ্বীপ দখল করে নিতে পারে তারা। আইভান ম্যাথিউ বলল।
শুধু দ্বীপ দখল ওদের লক্ষ্য নয়। রত্ন দ্বীপে তিন ধর্মের সংহতি ভেঙে পড়েছে, তাদের রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও সংবিধান ধ্বংস হয়েছে, এটা তারা দুনিয়াকে দেখাতে চায়। তারা বিশ্ববাসীকে বলতে চায়, ধর্মীয় সম্প্রীতি, সহাবস্থান সম্ভব নয়। বলল অ্যান্থনি হুগো।
এতে তাদের লাভ কি? কেন তারা এটা করবে? আইভান ম্যাথিউ বলল।
করবে, কারণ তারা ক্ষুদ্র সংহত এক সন্ত্রাসী গ্রুপ ও পাওয়ার ফুল ক্যুনিটির সদস্য। তারা গোটা দুনিয়ায় অবিশ্বাস, সন্ত্রাস ও সংঘাত ছড়িয়ে দিতে চায়। বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যেও তারা তাদের বশংবদ চরমপন্থী ও সন্ত্রাসী গ্রুপ তৈরি করছে, যারা পরোক্ষভাবে তাদেরকে সাহায্য করে থাকে তাদের লক্ষ্য অর্জনে। এরা দারুণ কুশলী। এরা গোপনে এক হাত দিয়ে সন্ত্রাসী তৈরি করছে এবং অন্য এক হাত দিয়ে প্রকাশ্যে সেই সন্ত্রাসীদের ধ্বংস করার নামে নিরপরাধ লক্ষ লক্ষ মানুষকে হত্যা করছে। তারা দুনিয়ার সকলকে দুর্বল ও বিভক্ত করে নিজেদের সবল ও সংহত রাখতে চাচ্ছে। বলল অ্যান্থনি হুগো।
হ্যাঁ, এদের সম্পর্কে আমি শুনেছি। কিন্তু এদের পক্ষেই যে আমরা কাজ করছি, তা আমার কাছে স্পষ্ট ছিল না। আইভান ম্যাথিউ বলল।
কার কাজ করছি, সেটা মিড ব্লক সিন্ডিকেটের কাছে বড় বিষয় নয়, বড় হলো টাকা। টাকা হলে যে কারও যেকোনো কাজ আমরা করতে। পারি। যখন ওদের সাথে মিড ব্ল্যাক সিন্ডিকেটের এই ডিল হয়, তখন আমি সিসিলিতে আমাদের হেডকোয়ার্টার ক্যাটেনিয়ায় ছিলাম। সেই কারণে আমি সবটা জানতে পেরেছি। বলল অ্যান্থনি হুগো।
হুগো মিড ব্ল্যাক সিন্ডিকেটের গোয়েন্দা গ্রুপের একজন অফিসার।
আইভান ম্যাথিউ কিছু বলতে যাচ্ছিল।
তার পাশে রাখা ইন্টারকমে নীল আলোর ফ্লাশ হতে লাগল।
আইভান ইন্টারকমের স্পীকার তুলে নিয়ে ইন্টারকম অন করে দিল।
স্যার, আমাদের ইলেকট্রনিক সার্ভিল্যান্সের প্রথম লাইন অব ডিফেন্স কেউ ক্রস করেছে। আমরা সিগন্যাল পেয়েছি। সাইমন বলল।
ক্রস করেছে ওরা কয়জন? জিজ্ঞেস করল আইভান ম্যাথিউ।
দুজন স্যার। বলল সাইমন।
কতক্ষণ আগে ওরা প্রথম প্রতিরক্ষা লাইন ক্রস করেছে? আইভান ম্যাথিও বলল।
এই মাত্র, দুমিনিটও হবে না। বলল সাইমন।
শোন সাইমন, তুমি তাড়াতাড়ি কাউকে নিয়ে ব্রীজে যাও। ব্রীজের মাঝখানের সংযোগ প্লেট এপারে সরিয়ে নাও। যদিও ইপিজির এই কেন্দ্র আমাদের ঘাঁটি, এটা শত্রুরা কোনো ভাবেই জানার কথা নয়। তবু সাবধান আমাদের হতে হবে। ক্রিক উপত্যকায় দুজন লোক আমাদের সর্বনাশ করেছে। এ পর্যন্ত যত ক্ষতি আমাদের হয়েছে, দুএকজন লোকের দ্বারাই হয়েছে। যাও, দ্রুত যাও আমি যা বলছি, তাই কর। আইভান ম্যাথিও বলল।
ইপিজির অফিসটি একটা সমতল প্রশস্ত পাহাড়ের মাথায়। পাহাড়টি একটা পাহাড়শ্রেণির অংশ। সবুজ পাহাড়ের এই অংশটা আরও বেশি সবুজ। এ সবুজের উত্তর প্রান্ত ঘেঁষে পাহাড়ে একটা বিশাল ক্রিক। অনেকটা ক্যানিয়নের মতো। ক্রিকটি কয়েকশ ফিট গভীর। প্রায় তিরিশ ফিটের মতো প্রশস্ত।
এই ক্রিকটির উপরই তৈরি হয়েছে ব্রীজ। ব্রীজের মাঝখানে স্থানান্তরযোগ্য দশ ফিটের একটা স্ল্যাব আছে। স্ল্যাবটি ইপিজি সেন্টারের দিকে সরিয়ে নেয়া যায় এবং স্প্রিং লক অফ করে আবার তা এভাবে সেট করাও যায়।
।সাইমন গিয়ে প্রিং লক অন করে স্ল্যাব দক্ষিণ প্রান্তে নিয়ে নিল।
বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল ইপিজি কেন্দ্র। আর কোনো বিকল্প রাস্তা নেই। ইপিজি-তে যাওয়ার।
সাইমন মোবাইলে জানিয়ে দিল আইভান ম্যাথিউকে যে ব্রীজকে বিচ্ছিন্ন করার কাজ শেষ হয়ে গেছে।
ওপার থেকে আইভান ম্যাথিউ বলল, ধন্যবাদ সাইমন। যদিও কোনো আশঙ্কা আমি করি না, তবু সতর্ক থাকা ভালো। তুমি ব্রীজের গোড়ায় একজন লোককে মোতায়েন রাখ। আর ব্রীজকে করে দাও অন্ধকার। অবশিষ্ট ৪জনকে প্রয়োজন মতো মোতায়েন কর। তোমার দায়িত্ব হলো ইলেকট্রনিক সার্ভিলেন্সের দিকে নজর রাখা। কোনো জন্তু জানোয়ার না হয়ে শত্রুরাই যদি আমাদের প্রথম ইলেকট্রনিক প্রতিরক্ষা লাইন পার হয়ে। থাকে, তাহলে তারা আরও অগ্রসর হবে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রতিরক্ষা লাইন তাদের পার হতে হবে ব্রীজে পৌঁছার আগেই। তৃতীয় প্রতিরক্ষা লাইনে ফাঁদ পাতা আছে। ফাঁদে তারা পড়ল কিনা জানতে হবে।
ঠিক আছে স্যার। বলল সাইমন।
সাইমন ব্রীজ থেকে ফিরে এলো ঘাঁটিতে। এগোলো দায়িত্ব বণ্টন করে দেবার জন্য সিকিউরিটি ব্যারাকের দিকে।
আহমদ মুসা তার ডান পাটা ফেলার পরেই হাতঘড়ির বিফ বিফ সিগন্যালের কনটিনিউয়াস সাউন্ড শুনতে পেয়ে থমকে দাঁড়িয়ে রিস্ট ওয়াচের স্ক্রিনের দিকে তাকাল। চমকে উঠল আহমদ মুসা, তার পায়ের নিচে ইলেকট্রিক তার।
মেজর পাভেল আহমদ মুসার সমান্তরালে চলছিল। সেও থমকে দাঁড়িয়েছিল। আহমদ মুসাকে ঘড়ির দিকে তাকাতে দেখে মেজর পাভেল আঁচ করল কিছু একটা ঘটেছে।
স্যার, কিছু ঘটেছে? জিজ্ঞাসা করল মেজর পাভেল।
মেজর পাভেল, তুমি ও আমি দুজনে একটা সূক্ষ্ম ইলেকট্রিক তারের ওপর পা দিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। আগেই সংকেত বেজেছে, কিন্তু আমি খেয়াল করিনি। ভয়ের কিছু নেই। খুবই নিচু ভল্টের তার। কোনো বিস্ফোরক এখানে নেই।
বলে পা তুলে সামনে এগোলো আহমদ মুসা ও মেজর পাভেল।
তাহলে ইলেকট্রিক তার কেন স্যার? বলল মেজর পাভেল।
এটা ওদের ইনফরমেশন নেটওয়ার্কের অংশ। আহমদ মুসা বলল।
তার মানে ওরা আমাদের উপস্থিতি জেনে ফেলেছে? বলল মেজর পাভেল।
জেনে ফেলতেও পারে? আহমদ মুসা বলল।
কথা শেষ করেই আবার বলে উঠল, এস মেজর পাভেল। শত্রু সাবধান থাকলেও লাভ, না থাকলেও লাভ।
সেটা কেমন স্যার? বলল মেজর পাভেল।
সাবধান না থাকার সুবিধা তো সকলের জানা। আর সাবধান থাকার সুবিধা হলো শত্ৰু আতংকিত থাকে, কি করব, কি করব না- এমন দ্বিধায় থাকে শত্রু। আহমদ মুসা বলল।
হঠাৎ থমকে দাঁড়াল আহমদ মুসা। হাত বাড়িয়ে মেজর পাভেলকেও এগোতে নিষেধ করল।
মেজর পাভেলও দাঁড়িয়ে গেল।
হাতঘড়িতে বিপ বিপ শব্দ শুনেই দাঁড়িয়ে গেছে আহমদ মুসা।
তাকাল আহমদ মুসা তার হাতঘড়ির স্ক্রিনের দিকে। দেখল আগের মতোই হাতঘড়ির স্ক্রিনে কয়েক মিলিমিটার লাল, খুব পাতলা একটা সরল রেখা।
ভয় নেই মেজর পাভেল। তিন ফুট সামনে আগের মতোই একটা ইলেকট্রিক তার বিছানো আছে। সেটারই অ্যালার্ট সিগন্যাল দিচ্ছে। ঘড়িতে। বলল আহমদ মুসা।
কথা শেষ করেই হাঁটা শুরু করল আহমদ মুসা। বলল, মেজর পাভেল, আমার পায়ে পা ফেলে দ্রুত চলে এসো। চার ফিট সামনেই ওটা পাতা আছে। আমরা ওটা টপকে যাব, যাতে ঘাঁটি থেকে দ্বিতীয় সিগনাল আর ওরা না পায়।
এভাবে আহমদ মুসারা তৃতীয় ইলেকট্রিক সিগন্যাল অয়্যারটা পার হয়ে গেল। দাঁড়াল আহমদ মুসা। সাবধানে টর্চের আলো যথাটা সম্ভব নিম্নমুখী রেখে পথ চলছিল তারা। টর্চের আলো নিভিয়ে দিল। ঘুটঘুঁটে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে ওরা দুজন।
তোমাদের গোয়েন্দা ছেলেটার স্কেচ অনুসারে আমার মনে হয় খুব কাছেই হবে ব্রীজটা। আমরা এই পাহাড়ে উঠে এক ঘন্টা হেঁটেছি। স্কেচে ব্রীজ পর্যন্ত হাঁটার পথটা এক ঘন্টারই বলা হয়েছে।
ব্রীজের ওপারেই তো ইপিজির ঘাঁটি। মেজর পাভেল বলল।
হ্যাঁ, বলা যায় ব্রীজের একদম লাগোয়া। বলল আহমদ মুসা।
আবার চলতে লাগল তারা। সাবধানে আলো ফেলে এবার অনেকটা হামাগুড়ি দেয়ার মতো করে চলছে তারা। এক সময় টর্চের আলো গিয়ে পড়ল একটা স্টিল পোলের গোড়ার উপর।
মেজর পাভেল আমরা ব্রীজের গোড়ায় এসে গেছি। বলে আহমদ মুসা তার টর্চের ফোকাস স্টিল পিলারের আশেপাশে ঘোরাল। দ্বিতীয় আরেকটি পিলারও দেখতে পেল, আগের পিলাটির সমান্তরালের সামান্য দূরে। তার কাছে মনে হলো ব্রীজটা টেমপোরারি এবং ঝুলন্ত।
আবার চলতে লাগল আহমদ মুসারা। আলো না জ্বালিয়ে, অনেকটা হাতড়িয়ে এবার চলছে তারা। সিঁড়ির গোড়ায় পৌঁছে গেল তারা দুজন। গোড়াটা ভালো করে দেখে নিয়ে বসল তারা দুজন পিলারের গোড়ায়। ব্রীজের দিকে মুখ করে। ব্রীজটাও ঘুটঘুঁটে অন্ধকার।
স্কেচ অনুসারে ব্রীজে আলো থাকার কথা মেজর পাভেল। আলো নিভিয়ে রেখেছে কেন ওরা! ইলেকট্রনিক সংকেত পাওয়ার পরই তারা এই কাজ করেছে! বলল আহমদ মুসা।
হতে পারে স্যার। আবার প্রয়োজন না থাকায় তারা আলো নিভিয়েও রাখতে পারে।
হ্যাঁ, মেজর পাভেল দুই সম্ভাবনাই আছে। বলল আহমদ মুসা।
আহমদ মুসা দুই মেশিন রিভলবার বের করে পরীক্ষা করতে করতে বলল, মেজর পাভেল, তোমার অস্ত্রগুলো পরীক্ষা করে নাও।
মেজর পাভেলও তার রিভলবারগুলো একবার দেখে নিল। উঠে দাঁড়াল দুজন। ওপারে যাবার জন্যে দুজন হাঁটা শুরু করেছে।
জংগল পথের চেয়ে ব্রীজের অন্ধকার একটুও কম নয়। অন্ধকার এতোটাই জমাট যে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। ব্রীজের নিচে ক্রিকের অন্ধকার ভয়াবহ ধরনের কালো। সেই অন্ধকার ব্রীজের আশপাশের অন্ধকারকে আরও গভীর করে তুলেছে। ব্রীজের উপর দিয়ে হাঁটছে দুজন পাশাপাশি। আহমদ মুসার দুচোখ স্থির ব্রীজের উপর।
একটু একটু করে দুলছে ব্রীজ। আহমদ মুসারাও হাঁটছে খুব ধীরে ধীরে। হঠাৎ আহমদ মুসা সামনে পা ফেলার জন্যে ডান পা তুলে ভূত দেখার মতো ভয়ানক চমকে উঠে নিজের দেহটাকে পেছন দিকে ঠেলে দিল। সেই সাথে বাম হাত দিয়ে মেজর পাভেলকেও পেছনের দিকে টেনে নিল। টাল সামলাতে না পেরে দুজনেই ব্রীজের ফ্লোরের উপর পড়ে গেল। পড়ে গিয়ে একটু সামলে নেবার পর মেজর পাভেল ফিসফিসে কণ্ঠে বলল, কিছু কি ঘটেছে স্যার? শত্ৰু কি সামনে?
উঠে বসেছে আহমদ মুসা। বলল, উঠে বসো মেজর পাভেল।
মেজর পাভেল উঠে বসল।
তোমার পায়ের সামনেই ব্রীজের ফ্লোরের দিকে তাকাও।
স্যার এদিকটায় ফ্লোর একটু বেশি অন্ধকার। কেন? সেই ফিসফিসে কণ্ঠে বলল মেজর পাভেল।
তোমার পায়ের পরেই ব্রীজের ফ্লোরে একটু হাত দাও। বলল আহমদ মুসা।
মেজর পাভেল সামনে একটু ঝুঁকে পড়ে ব্রীজের ফ্লোরে হাত দিতে গিয়ে ভীষণ আঁৎকে উঠল। বলল, কি সর্বনাশ! ব্রীজের ফ্লোর দেখছি এখান থেকে সরিয়ে নেয়া হয়েছে! ও গড, আমরা তো প্রায় পড়েই গিয়েছিলাম। গড় ব্লেস ইউ স্যার। আপনিও বেঁচেছেন, আমাকেও বাঁচিয়েছেন ক্রিকের কয়েকশ ফুট গভীরে পড়া থেকে।
আমিও আগে বুঝতে পারিনি। ডান পা সামনে ফেলতে গেলে অন্ধকারের পার্থক্যটা আল্লাহ আমার চোখে ধরি য়ে দেন। সাক্ষাৎ মৃত্যু থেকে আল্লাহ আমাদের বাঁচালেন। আলহামদুলিল্লাহ।
আলহামদুল্লিাহ। মেজর পাভেলও বলল।
মেজর পাভেল তুমি যে আলহামদুল্লিাহ পড়লে? বলল আহমদ মুসা।
স্যার, সেদিন ক্যাপ্টেন আলিয়া তো বলেছে, আমরা ইদানিং জোরে সোরে ইসলামের চর্চা করছি। স্যার, ইসলাম শুধু লিভিং রিলিজিওন নয়, এটা মানুষের দৈনন্দিন জীবনের ধর্ম, ইহকালেরও র্মি, পরকালেরও ধর্ম। মেজর পাভেল থামল।
ধন্যবাদ মেজর পাভেল।
মুখে কথা বললেও আহমদ মুসার কিন্তু তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিল সামনের দিকে বলল, সামনে আট দশ ফিট জায়গা থেকে ব্রীজের ফ্লোর সরিয়ে নেয়া হয়েছে। এই স্থানান্তরযোগ্য অংশটা নিশ্চয় ওপারে টেনে নিয়ে রাখা হয়েছে।
একদম দোর গোড়ায় এসে আছাড় খাওয়ার অবস্থা স্যার! আল্লাহ রক্ষা করেছেন। এখন ওপার থেকে মুভেবল অংশটা কিভাবে এদিকে আনা যাবে স্যার? মেজর পাভেল বলল।
আহমদ মুসা কিছু বলল না। উপরে তাকাল আহমদ মুসা। অন্ধকারেও দেখতে পেল দুই পারে চার পিলারের সংযোগকারী কালো স্টিলের বিশেষ রোপ। এই রোপগুলো আবার বহুমুখী রোপ দিয়ে ব্রীজকে দুপারের উঁচু। পিলারের সাথে টেনে রাখা হয়েছে।
আহমদ মুসা পিঠের ব্যাগ থেকে হুকওয়ালা নাইলনের দড়ি বের করল। বলল, মেজর পাভেল উপরে ব্রীজের স্টিল রোপে নাইলনের কর্ড আটকিয়ে তাতে ঝুলে ব্রীজের ওপারে যাওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প পথ নেই।
মাল্টি হুকের নাইলন কর্ড আপনার কাছে আছে স্যার? মেজর পাভেল বলল।
আছে মেজর প্যাভেল। তোমার কি এ ধরনের রোপে ঝোলার অভ্যেস আছে? বলল আহমদ মুসা।
ট্রেনিং-এর সময় তো শিখেছি। কিন্তু অভ্যেস যাকে বলে সেটা নেই। স্যার। মেজর পাভেল বলল।
অভ্যেস না থাকলে ঝুঁকি নেয়ার প্রয়োজন নেই। আমি ওপারে গিয়ে ব্রীজের মুভেবল অংশ সেট করব। তুমি এখানে বসে অপেক্ষা কর। বলল আহমদ মুসা।
আহমদ মুসা নাইলনের কর্ড গুছিয়ে নিয়ে বিসমিল্লাহ বলে ছুঁড়ে দিল মাথার উপরের স্টিল রোপের দিকে। প্রথম চেষ্টাতেই সফল হলো আহমদ মুসা।
আটকে গেল নাইলন কর্ডের হুক উপরের রোপের সাথে। কয়েকবার টানাটানি করে দেখল হুক ঠিকভাবে আটকেছে কি না স্টিলের রোপের সাথে।
আহমদ মুসা ডান হাতে রোপটি ধরে রেখে বাম হাত মেজর পাভেলের কাঁধে রেখে বলল, লোডেড অস্ত্র হাতে রেখো। শত্রুর বিরুদ্ধে প্রথম সুযোগটাকেই তুমি ব্যবহার করবে যদি প্রয়োজন হয়।
আহমদ মুসার দুই হাতেই বিশেষ গ্লাভস। নাইলন কর্ড ডান ও বাম হাতে পেঁচিয়ে ধরে একটু পেছনে সরে এসে সামনে কিছুটা দৌড়ে এগিয়ে গিয়ে লাফ দিল। নাইলন কর্ডে ঝুলে গেল তার দেহ। ছুটে চলল দ্রুত। মুহূর্তেই গিয়ে ওপারে ল্যান্ড করল। ল্যান্ডিংটাকে নিঃশব্দ করতে চেয়েছিল আহমদ মুসা। কিন্তু পারল না। গিয়ে ল্যান্ড করল সে ব্রীজের মাঝখান থেকে সরিয়ে নেয়া স্লবের উপর। স্লাবটা মনে হয় কিছুটা আলগা হয়েছিল। আহমদ মুসা তার উপর ল্যান্ড করার সাথে সাথেই তা শব্দ করে দেবে গেল। সেই শব্দের সাথে আহমদ মুসাও শুয়ে পড়ল স্ল্যাবটার উপর। তারপর আস্তে আস্তে গড়িয়ে চলে এলো স্ল্যাব থেকে ব্রীজের। মেঝের উপর। বেশ বড় ধরনের শব্দ হওয়ায় প্রতিক্রিয়া দেখতে চাইল আহমদ মুসা। জ্যাকেটের পকেট থেকে সে হাতে তুলে নিয়েছে আমেরিকা থেকে আনা একটা নতুন অটো-সাইলেন্সার মেশিন রিভলবার।
ল্যান্ড করার সময় শব্দ উঠার সাথে সাথে কোত্থেকে একটা কণ্ঠ কে বলে উঠেছিল। কিন্তু তারপরে সব কেমন যেন নীরব হয়ে গেল। আহমদ মুসা বুঝল, নিশ্চয় ওটা প্রহরীর কণ্ঠ। কথা বলে সে ভুল করেছিল, সে নিশ্চয় এগোচ্ছে কি ঘটেছে তা দেখার জন্যে। তার হাতে অবশ্যই মেশিনগান ধরনের কিছু প্রস্তুত আছে। তারা আবার একাধিকজনও হতে পারে। অপেক্ষা করছে আহমদ মুসা।
তার স্থির দৃষ্টি ব্রীজের গোড়ার দিকে। কিন্তু অন্ধকারটা খুবই গাড়। কিছুই দেখা যাচ্ছে না। মনে পড়ল নাইট ভিশন গগলসের কথা। মন এদিকে ব্যস্ত থাকায় কথাটা এ পর্যন্ত তার মনেই পড়েনি। জংগলের পথে আসার সময় গগলস প্রয়োজন পড়েনি। তখন দরকার ছিল টর্চের মতো উজ্জ্বলতর আলোর।
পকেটে হাত দিয়ে হার্ড কভারের নাইট ভিশন গগলসটা বের করে নিল। অন্ধকারেই গগলসের বিভিন্ন অংশকে সেট করে নিয়ে চোখে পরল।
সামনের অন্ধকার স্বচ্ছ হয়ে গেল। সে দেখল নীরবে পা বাড়িয়ে মাথা নিচু করে গুঁড়ি মেরে ব্রীজের উপর উঠছে একজন লোক। তার চোখে অন্ধকারে দেখার মতো কোনো গগলস নেই।
আহমদ মুসা নিঃশব্দে গড়িয়ে তার কাছাকাছি গেল। তাকে মারতে চাইল না সে। কাউকে সাবধান না করে কিংবা নিজেকে বাঁচাবার জন্যে না হলে আহমদ মুসা কাউকে মারে না।
আহমদ মুসা লোকটির কাছে গিয়ে উঠে দাঁড়াতেই লোকটি তা টের পেয়ে গেল। সে মাথা সোজা করে উঠে দাঁড়াতে যাচ্ছিল।
আহমদ মুসা তার রিভলবার আগেই বাম হাতে নিয়ে নিয়েছিল। সে ডান হাতের একটা কারাত চালাল লোকটির ঘাড়ে। জ্ঞান হারাল লোকটি। আহমদ মুসা তার হাত-পা বেঁধে, মুখে টেপ সেঁটে দিল।
আহমদ মুসা ফিরে এলো স্ল্যাবটার কাছে। দেখল, স্ল্যাবটা স্প্রিং লক দিয়ে আটকানো। স্প্রিং লকটা ম্যানুয়াল। লকটা অফ করে দিল আহমদ মুসা। সংগে সংগে স্ল্যাবটা একটা লম্বা শব্দ তুলে ব্রীজের ওপারের অংশের সাথে মিলে গেল।
মেজর পাভেল এসো। আহমদ মুসা ফিসফিসে কণ্ঠে তাকে ডাকল।
ধন্যবাদ স্যার। তাহলে ব্রীজের এদিকেও কোনো পাহারা ছিল না? বলল মেজর পাভেল।
একজন ছিল। তাকে ঘুম পাড়িয়ে রেখেছি। তবে একটা জিনিস বুঝতে পারছি না, যতটুকু সময় সে পেয়েছে, এর মধ্যে সে ভেতরে খবর পাঠাতে পেরেছে কি না? তার পকেটে কলিং বেলের রিমোট সুইচ বক্স পেয়েছি। আহমদ মুসা বলল।
কিছু বলার জন্যে মুখ খুলেছিল মেজর পাভেল।
হঠাৎ জ্বলে উঠল ব্রীজের আলো। তার সাথে সাথে শুরু হলো গুলির বৃষ্টি। আলো জ্বলে উঠার সংগে সংগেই মেজর পাভেলের হাতে একটা টান দিয়ে শুয়ে পড়েছিল আহমদ মুসা।
আহমদ মুসা গড়িয়ে ব্রীজের পুব পাশের ধার বরাবর সরে গেল। ব্রীজের দুপাশের ধার বরাবর এক ফুট উঁচু স্টিলের গার্ডার।
আহমদ মুসা ব্রীজের ধার ঘেঁষে ক্রলিং করে দক্ষিণ দিকে ব্রীজের শেষ প্রান্ত লক্ষ্যে এগিয়ে চলল।
গুলি বৃষ্টি চলছে। গুলিগুলো আসছে ব্রীজের বাম দিকের দক্ষিণ-পূর্ব। তিরিশ পঁয়ত্রিশ ডিগ্রি কৌণিক অবস্থান থেকে। ঘাঁটিটির স্কেচ অনুসারে ব্রীজের দক্ষিণ গোড়া থেকে পঞ্চাশ ষাট গজ পুবে এগোলেই ইপিজি ঘাঁটিতে ঢোকার প্রথম গেট। আহমদ মুসা বুঝল, ঐ গেট দিয়েই ঘাঁটির লোকরা বেরিয়ে এসেছে এবং ব্রীজের দিকে মাঝপথ পর্যন্ত এসেই গুলি ছুঁড়তে শুরু করেছে তারা। কিন্তু ওরা ব্রীজ বরাবর এসে গুলি বর্ষণ শুরু করল না কেন? ব্রীজের লাইট আগাম জ্বলে উঠার কারণেই কি! সেটাই হবে। লাইট জ্বলে উঠলে তারা আক্রান্ত হবার আগেই আক্রমণ শুরু করেছে। আহমদ মুসাদের জন্যে এটা আল্লাহর সাহায্য।
বিরতিহীন গুলি চালানোর মধ্য দিয়ে ওরা এগিয়ে আসছে। গুলির দেয়াল সৃষ্টি করে ওরা তার আড়ালে ব্রীজ রাবর পৌঁছতে চায় এবং নিশিচত করতে চায় আহমদ মুসাদের মৃত্যু।
মেজর পাভেলও আহমদ মুসার পাশাপাশি আসছিল। আহমদ মুসা ফিসফিসে কণ্ঠে মেজর পাভেলকে বলল, তোমার মাথা আমার সমান্তরালে থাকলে যে গুলি আমার মাথায় আঘাত করতে পারবে না, তা তোমার মাথায় আঘাত করবে। সুতরাং তোমার মাথা আমার কোমর বরাবর, খুব কম হলে আমার পেট বরাবর রাখতে পার।
আপনার অংক ঠিক স্যার। ধন্যবাদ। বলে মেজর পাভেল পেছনে সরে গেল।
আহমদ মুসা ব্রীজের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত পৌঁছল। সে প্রান্তটিতে একটা প্রশস্ত পিলার। আহমদ মুসা তার মাথা পিলারের আড়ালে রেখে তার। মেশিন রিভলবার সেট করল। রিভলবারের নলটাই শুধু পিলারের বাইরে। রাখল।
ওদের গুলি এসে এখন পিলারের পশ্চিম প্রান্তকেও হিট করছে। তার মানে ওরা ব্রীজের বরাবর অবস্থান থেকে অল্প দূরেই রয়েছে।
ওদের সবচেয়ে কাছের অবস্থানকে ধরে নিয়ে আহমদ মুসা বিসমিল্লাহ বলে রিভলবারের ট্রিগার চেপে ধরল। রিভলবারের নল যতটা সম্ভব পশ্চিম থেকে পুবদিকে সরিয়ে নিল। এভাবে কয়েকবার সে তার রিভলবারের নল ঘুরিয়ে ফিরিয়ে নিল।
এতক্ষণ ওরা গুলি ছুঁড়ছিল একতরফাভাবে। আহমদ মুসা গুলি শুরু করার পর অল্পক্ষণের মধ্যেই ওদের গুলি বৃষ্টি আগের তুলনায় পঞ্চাশ ভাগে নেমে এল। গুলির টার্গেট ক্ষেত্রের মধ্যেও কিছু পরিবর্তন এলো। তাদের কিছু গুলি পিলারের পাশ ঘেঁষে ব্রীজে প্রবেশ করতে শুরু করেছিল। এখন দেখা যাচ্ছে ওদের গুলি আর পিলার অতিক্রম করে আসছে না। এমনকি ওদের গুলি পিলারের পশ্চিম প্রান্তকে আঘাত করছিল, সেটাও বন্ধ হয়ে গেল। ওদের গুলি এখন পিলারের পূর্ব প্রান্ত এবং পিলার সংলগ্ন ব্রীজের গার্ডারকে আঘাত করছে। = মেজর পাভেল এখন সমান্তরালে উঠে এসো। পিলারের পাশ দিয়ে তুমিও গুলি চালাও। যতটা পার রিভলবারের মাথা পুব দিকে এগিয়ে। নাও।
এবার আহমদ মুসা ও মেজর পাভেল দুজনেই তাদের হাতের মেশিন রিভলবার থেকে গুলি বর্ষণ শুরু করল। একটানা মিনিটখানেক গুলি বর্ষণের পর ওদিকের গুলির শব্দ থেমে গেল। আহমদ মুসারাও গুলি ছোঁড়া বন্ধ করল। মিনিট খানেক অপেক্ষা করল। ওদিক থেকে কোনো গুলি আর এলো না।
মেজর পাভেল, চল আমরা ওদিকে এগোই। যারা এদিকে এসেছিল তারা সবাই মারাও যেতে পারে, আবার পিছু হটে পালাতেও পারে। দেরি করলে ওরা সংঘবদ্ধ হবার সুযোগ পাবে। মেজর পাভেলকে লক্ষ্য করে। বলল আহমদ মুসা।
আহমদ মুসা ও মেজর পাভেল ক্রলিং করে ব্রীজের অভ্যন্তর থেকে সামনের রাস্তায় বেরিয়ে এলো। রাস্তায় কোনো লাইট পোস্ট ছিল না। একটা আলো আছে ব্রীজের উপর, আরেকটা আলো দেখা যাচ্ছে গেটে, তা গেটের ভেতর মাঝ বরাবর। বাইরে আর কোথাও আলো নেই। ভাবল আহমদ মুসা জায়গাটাকে গোপন রাখার জন্যেই এটা করা হয়েছে? বাইরে আলো থাকলে তা দূর থেকে চিহ্নিত করা যেতে পারে। তাহলে ভেতরেও তো উন্মুক্ত আলো নেই!
রাস্তার উপর আবছা অন্ধকারের একটা চাদর। আহমদ মুসারা ক্রলিং করে রাস্তার পাশ ধরে এগিয়ে চলল গেটের দিকে ব্রীজ থেকে একটু পুবে রাস্তার উপর ৩টি লাশ পড়ে থাকতে দেখল তারা। রাস্তাটা একদম উন্মুক্ত, আড়াল নেবার মতো কিছু নেই। গুলি বৃষ্টির মুখে বেচারাদের বেঘোরে জীবন দিতে হয়েছে।
আহমদ মুসা সামনে চোখ রেখে দ্রুত অগ্রসর হচ্ছিল। রিভলবারের ট্রিগারে তার একটা আঙুল। হঠাৎ তার চোখে পড়ল দুজন লোক গেটের ভেতর দিক থেকে দ্রুত বেরিয়ে এলো এবং দুজনের হাত উপরে উঠেছে।
চোখে পড়ার সাথে সাথেই আহমদ মুসা প্রিং-এর মতো উঠে দাঁড়িয়ে বলল, মেজর পাভেল, সামনের দিকে দৌড় দাও।
কথা বলার সাথে সাথেই আহমদ মুসা রিভলবারের ট্রিগার চেপে ধরে সামনে দৌড় দিয়েছে। আহমদ মুসা বুঝে ফেলেছে ওরা বোমা ছুঁড়ছে।
বোমা ফেলায় ব্যস্ত থাকায় ওদের রিভলবার বের করে নিতে দেরি হবে। সেই সময়টুকু কাজে লাগাতে হবে ওদের পরাভূত করার জন্যে।
আহমদ মুসা যখন দৌড় দিয়েছে, তখন ওরা বোমা ছুঁড়ে ফেলেছে। ওরা যেখান থেকে বোমা ফেলছে আর আহমদ মুসা যেখান থেকে দৌড় দিয়েছে, সেই দূরত্বটা আহমদ মুসার বিভলবারের রেঞ্জের ভেতর ছিল। আর আহমদ মুসার গুলি বর্ষণ টার্গেটেড। পেছনে যখন বোমার বিস্ফোরণ ঘটল, তখন আহমদ মুসার রিভলবারের গুলি ওদের দুজনকে ধরে ফেলেছে।
ওদের বোমা ফেলাটাও ছিল টার্গেটেড। কিন্তু আহমদ মুসা ও মেজর পাভেল দৌড় না দিলে তাদের উপরই বোমার বিস্ফোরণ ঘটত। আহমদ মুসারা যে ক্রলিং করে এগিয়ে যাচ্ছে, সেটা দেখেই প্রস্তুতি নিয়ে তারা বোমা ফেলতে এসেছিল।
গুলিবিদ্ধ হয়ে দুজনেই ওরা ঢলে পড়েছে গেটের সামনের রাস্তায়।
আহমদ মুসা গেট বরাবর পৌঁছে লাশের দিকে গেল না। ছুটল গেটের দিকে। দেখল, দুজন লোক উন্মুক্ত গেটের একটা পিলারের আড়াল থেকে বেরিয়ে ছুটছে ভেতরের দিকে। আহমদ মুসাও তাদের পেছনে ছুটল। চিৎকার করে বলল, দাঁড়াও, তা না হলে গুলি করব।
লোক দুটি পলকের মধ্যে চরকির মতো ঘুরে দাঁড়াল। তাদের দুজনের দুহাত উপরে উঠছে।
আহমদ মুসার তর্জনি মেশিন রিভলবারের ট্রিগারেই ছিল। চেপে বসতে একটুও সময় লাগলো না। ছুটে চলল গুলির ঝাঁক।
ওদের দুজনের হাত উপরে উঠল, কিন্তু বোমা ছোঁড়ার সুযোগ পেল না তারা। গুলি বৃষ্টির কবলে পড়ে ঝরে পড়ল তাদের দেহ মাটিতে। প্রহরী বা সিকিউরিটির কেউ হলে পালিয়ে ভেতরে ঢুকতে সাহস পেত না।
আহমদ মুসা চারদিকে একবার তাকিয়ে মাথা নিচু করে দৌড় দিল তাদের দিকে। আহমদ মুসার মনে হয়েছে, এরা ঘাঁটির নেতৃবৃন্দের কেউ হবে। আহমদ মুসা তাদের পাশে গিয়ে বসে পড়ল। প্রথমে তাদের দুজনের মোবাইল খুঁজে নিল তাদের পকেট থেকে। আহমদ মুসা বসার সময়ই দেখতে পেয়েছিল নিহতদের পাশে একটা ফাইল পড়ে আছে। হামাগুড়ি দিয়ে একটু এগিয়ে ফাইলটা হাতে তুলে নিল আহমদ মুসা।
পেছনে পায়ের শব্দ শুনে রিভলবারের ট্রিগারে তর্জনি রেখে বো করে। পেছনে ঘুরল আহমদ মুসা। দেখল, মেজর পাভেল।
আহমদ মুসা হেসে বলল, মেজর পাভেল, শত্রুরা যে লুকিয়ে নেই, এ ব্যাপারে আমরা নিশ্চিত নই। যদি থাকে তাহলে তারা সামনে না এসে আক্রমণের জন্যে চোরাগুপ্তা পথ বেছে নেবে।
ঘাটির প্রায় চারদিকে ব্যারাকের মতো স্থাপনা আছে। শুধু পশ্চিম দিকের একটা অংশে অফিস টাইপের একটা বিল্ডিং। মেজর পাভেলকে বিল্ডিংটা দেখিয়ে বলল, চল দৌড় দিয়ে ওটায় গিয়ে উঠি।
আহমদ মুসারা দৌড় দিয়ে গিয়ে অফিসে উঠল।
ও ফাইলটা কি স্যার? বলল মেজর পাভেল আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে।
এই দুজনের একজনের হাতে ফাইলটা ছিল। এখনো খুলে দেখিনি কি আছে। বলে আহমদ মুসা ফাইলটা খুলল।
প্রথম পাতাটা দেখেই আহমদ মুসার চোখ-মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। উল্টালো একের এক পাতা। যতই দেখছে ততই তার চোখে মুখে ফুটে উঠছে একের পর এক বিস্ময়!
সে ফাইল বন্ধ করে তাকাল মেজর পাভেলের দিকে। বলল, মেজর পাভেল, আমাদের অভিযান সফল। আমি যা খোঁজ করছিলাম, তা পেয়ে গেছি। আলহামদুলিল্লাহ।
আলহামদুলিল্লাহ। ফাইলে কি পেলেন স্যার? মেজর পাভেল বলল।
মিড ব্ল্যাক সিন্ডিকেট রত্ন দ্বীপে কি জন্যে, কি করতে এসেছে তার বিবরণ। বলল আহমদ মুসা।
মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল মেজর পাভেলের। বলল, ধন্যবাদ স্যার। ধন্য
আপনার দূরদৃষ্টির। অসাধ্য সাধন করেছেন আপনি।
পাভেল তুমি আর ক্যাপ্টেন আলিয়া না কি ইসলাম চর্চা কর। তার কি এই রেজাল্ট? স্রষ্টা, প্রতিপালক, জল, স্থল এবং সর্বোপরি সর্বশক্তির আধার আল্লাহর চিরন্তন অথরিটি তুমি দেখছি উপেক্ষা করতে চাচ্ছ? সব শক্তি সাফল্য তো আমাকে দিয়ে দিলে, আল্লাহর জন্যে রইল কি? বলল আহমদ মুসা।
স্যরি স্যার। চর্চা করছি। প্রাকটিস করছি না বলেই এই ভ্রান্তি। বুঝেছি আমি, ইসলাম শুধু আলোচনার ধর্ম নয়, নিরপেক্ষ নিথর ধর্মও নয়। আরও বুঝেছি স্যার, বিশ্বাস হৃদয়ের জিনিস, কিন্তু কাজে-কর্মে বিশ্বাসের প্রকাশ না ঘটলে, হৃদয়ের বিশ্বাসও উবে যায়। এই বুঝাটা আমাদের কাজে পরিণত হয়নি। মেজর পাভেল বলল।
বাহ, সুন্দর বলেছ। লিখে রাখার মতো। বিশ্বাস ও কর্মে প্রকাশের। অভিষেক তোমাদের কবে হচ্ছে? বলল আহমদ মুসা।
জানি না স্যার, এ ব্যাপারে ক্যাপ্টেন আলিয়া আমার গুরু। এই আলোর পথ সেই আমাকে দেখিয়েছে। মেজর পাভেল বলল।
ঠিক আছে মেজর পাভেল। এবার কাজের কথায় আসি। আমার মনে হয় এই ঘাঁটিতে আর কেউ নেই। সম্ভবত ত্ৰিয়াদা অভিযানে এরা ঘাঁটি উজাড় করে লোক পাঠিয়েছিল। মেজর পাভেল, তুমি তোমার হেডকোয়ার্টারে টেলিফোন কর। জানাও এদিকের সব কথা। তাঁদের নির্দেশ কি শোন। তারপর চল, অফিসের অন্যান্য ঘর ও ব্যারাকগুলো সার্চ করে দেখি। বলল আহমদ মুসা।
মেজর পাভেল মোবাইল বের করল।
তুমি টেলিফোন কর। আমি পাশের রুমগুলো একটু দেখি।
বলে আহমদ মুসা পাশের ঘরের দিকে চলে গেল।
