৯. ককেশাসের পাহাড়ে

চ্যাপ্টার

সালমান শামিল তার বন্দীখানার বারান্দায় একটা থামের সাথে হেলান দিয়ে বসে। তার হিসেব ঠিক হলো। তার বন্দী জীবনের তিনদিন কেটে গেছে।
গোটা দেহ তার ক্লান্তি এবং অবসাদে ভেঙ্গে পড়ছে। তার চেতনা যেন অনেকটা আচ্ছন্ন। তিনদিন আগে নাস্তা করেছিলো ওসমান এফেন্দীর বাসায়। তারপর কার্যত তার পেটে আর কিছুই পড়েনি। আগের দিন সকালের মত আজ সকালেও বরফ কণা কুড়িয়ে পানির প্রয়োজন মেটাবার সে চেষ্টা করেছে। লোহার মত শক্ত বরফ কণাগুলো মুখে রেখে গলিয়ে পাকস্থলির পানির দাবি অনেকখানি পূরণ করেছে। কিন্তু তা সেই সকালের কথা। বরফের সেই শিশিরগুলো রৌদ্রালোকিত দিনে আর পাওয়া যায়নি। পাথরের এই বন্দীখানায় সবুজের কোন চিহ্ন নেই। মানুষ কেন, কোন প্রাণীরও জীবনধারণের কিছু নেই এখানে।
গত রাতে তীব্র ঠান্ডায় সে ঘুমাতে পারেনি। বরফের মত ঠান্ডা বারান্দায় শোবার কোন প্রশ্নই উঠেনি। ঘর থেকে বেরুবার পর সেই সুন্দর এয়ারকন্ডিশন্ড ঘরে আর সে প্রবেশ করেনি। খাঁচায় সে আবদ্ধ হতে চায় না। মৃত্যু আল্লাহ বরাদ্দ করে রাখলে তা আসবেই, কিন্তু আল্লাহ যেটুকু স্বাধীনতা ও সুযোগ রেখেছিল তাকে সে হারাতে চায়নি।
সারারাত সে শীত-কাঁপা দেহ নিয়ে বারান্দায় হেঁটে হেঁটে কাটিয়েছে। এতে শীত তাকে একেবারে জমিয়ে ফেলতে পারেনি, কিন্তু সারারাতের এ পরিশ্রমে সে আরও ক্ষুধার্ত, আরও ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। প্রায় সারাদিন আজ সে উঠানে শুয়ে শুয়ে গা গরম করেছে। তাতে গা গরম হয়েছে, খুব আরাম বোধ হয়েছে সত্য, কিন্তু রৌদ্র তাপে শরীরের শক্তি আরও ক্ষয়ে গেছে। ক্ষুধা-তৃষ্ণা আরও বেড়েছে। বেড়েছে ক্লান্তি এবং অবসাদ। উদ্বেগ এবং চিন্তা এই ক্লান্তি এবং অবসাদকে অনেক বাড়িয়ে দিচ্ছে। সালমান শামিল আল্লাহর উপরই সম্পূর্ণ নির্ভর করছে, কিন্তু সেই সাথে জালেমদের এই অক্টোপাস থেকে মুক্তির কথাও চিন্তা করছে। এই চিন্তাই তার মধ্যে এক ধরনের উদ্বেগও সৃষ্টি করছে।
বুকফাটা তৃষ্ণা যখন অসহ্য হয়ে উঠছে, তখন সালমান শামিল শুষ্ক জিহ্বাটার আগা জিহ্বার গোড়ায় আল-জিহ্বার উপর ন্যস্ত্ করছে। জিহ্বাটা সরস হয়ে উঠছে, মরুভূমি বুকও একটা ঠান্ডা হাওয়ার সজীব পরশ পাচ্ছে। বিজ্ঞানের ছাত্র সালমান জানে, এক সময় দেহ-রসের রি-সাইক্লিংও বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
সূর্য় হয়তো তখনো ডোবেনি। কিন্তু বন্দীখানায় ইতোমধ্যেই অন্ধকার নেমে আসতে শুরু করেছে। এই সাথে ঠান্ডাও অশ্বারোহীর মত ছুটে আসছে। সালমান শামিল বারান্দার থামে হেলান দিয়ে ভাবছে। ভাবছে মুক্তির কথাই। সারাদিনই ভেবেছে। ভেবেছে, তাকে পরিস্থিতির কাছে আত্মসমর্পণ করলে চলবে না। সালমান শামিল চিন্তা করে দেখেছে, শত্রুরা তাকে কঠিন ফাঁদে আটকালেও তার হাতে অনেকগুলো সুযোগ রয়ে গেছে। যেমন, মুক্তি-প্রচেষ্টার জন্যে তার হাত-পা খোলা আছে, তার মুক্তির পথে দৃশ্যত একটা তিনতলা বিল্ডিং এর আবেষ্টনিই মাত্র বাঁধা। তার আরেকটা সুযোগ হলো, তাকে না খাইয়ে তিলে তিলে হত্যা করার যেহেতু সিদ্ধান্ত, তাই তাকে শারীরিকভাবে আক্রমণ করে হত্যা করা হবে না। তারপর সালমান শামিল চিন্তা করেছে, সে এই বিল্ডিং-এর আবেষ্টনি থেকে বেরুতে চাইলে কি কি বাঁধা পাবে। তার কাছে টেলিভিশন ক্যামেরাকেই প্রধান বাঁধা বলে মনে হয়েছে। এই টেলিভিশন ক্যামেরার মাধ্যমেই শত্রুপক্ষ সব জানতে পারবে, সাবধান হবে এবং বাঁধা দেবে। আরেকটা অদৃশ্য বাঁধা হতে পারে, সেটা হলো বিদ্যুতায়িত তারের বেড়াজাল। এছাড়া এ বিল্ডিং এর বেষ্টনির বাইরে পাহারার ব্যবস্থা নিশ্চয় থাকবে। সালমান প্রথম বাঁধা অর্থাৎ টেলিভিশন ক্যামেরার বাঁধা মোকাবিলার চেষ্টা প্রথম করেছে। টেলিভিশন ক্যামেরার চোখগুলো কোথায় আছে? এ জিজ্ঞাসার জবাব সন্ধানের জন্যে সালমান শামিল গোটা দিন ধরেই চারদিকের বিল্ডিং পর্যবেক্ষণ করেছে। প্রত্যেক রুমেই টেলিভিশন ক্যামেরার চোখ রয়েছে তা বোঝাই যাচ্ছে, বাইরেটা দেখার চোথগুলো কোথায়? অনুসন্ধানের সময় হঠাৎ সালমান শামিলের মনে পড়েছে, দু’বার শত্রুরা তাকে লক্ষ্য করে কথা বলেছে, দু’বারই তা এসেছে চত্ত্বরের মাঝখানে বেদীর উপর দাঁড়ানো শামিউনের মূর্তির মুখ থেকে। তাহলে বক্তার মত কি সে দ্রষ্টারও দায়িত্ব পালন করছে? চত্ত্বরের মাঝখানে উঁচু বেদির উপর দাঁড়ানো তার পক্ষেই চারদিকের গোটা বিল্ডিং এবং চত্ত্বরের উপর নজর রাখা সহজ।
আশায় উদ্দীপ্ত সালমান শামিল ধীর পদক্ষেপে এগিয়ে গেছে শামিউনের মূর্তির কাছে।
মুষ্টিবদ্ধ ডান হাত উপরে তুলে নির্দেশ দিচ্ছে এমন ভংগিতে দাঁড়ানো শামিউন। তার ঠোঁট দু’টি অনেকখানি ফাঁক। চোখ দু’টি বিস্ফারিত। সালমান শামিল আনন্দের সাথে লক্ষ্য করেছে, চোখ দু’টি তার পাথরের নয়। তা যে ক্যামেরার শক্তিশালী লেন্স, তা সালমান শামিল এক নজর দেখেই বুঝতে পারল। সে লক্ষ্য করল, চোখ দু’টির সমান্তরালে মাথার পাশে ও পেছনে সাদা পাথরের রঙের সাথে মেলানো গোলাকৃতি আরও তিনটি লেন্স ক্যামেরার চোখ। প্রথম এই সাফল্যে ভীষণ খুশি হয়েছিল সালমান শামিল। মনে হয়েছিল, চোখগুলি এখনি অন্ধ করে দেয় সে। কিন্তু মনকে সান্ত্বনা দিয়েছিল, যথা সময়েই তা করতে হবে।
রাত তখন অনেক। থামে হেলান দেয়া থেকে সোজা হয়ে বসল শামিল। টেলিভিশন ক্যামেরার চোখ অন্ধ করে দিয়ে বিল্ডিং টপকে বেরিয়ে পড়ার যে পরিকল্পনা সে দিনের বেলা তৈরি করেছিল তা একবার গোটা ভেবে নিল। তারপর উঠে দাঁড়াল।
সারাটা চত্ত্বর জুড়ে বিদ্যুতের ম্লান আলো। সালমান শামিল ধীরে ধীরে শামিউনের মূর্তির কাছে গিয়ে দাঁড়াল। তারপর গা থেকে কোট খুলে তা চাপিয়ে দিল শামিউনের মাথায়। ঢেকে গেল গোটা মাথা। টেলিভিশন ক্যামেরার আই-লেন্সগুলো ঢাকা পড়ে গেল কোটের আড়ালে।
প্রথম এই কাজটা শেষ করে সালমান শামিল ছুটল বিল্ডিং-এর দক্ষিণ অংশের দিকে। দিনের বেলায় সে দেখে রেখেছিল, উপর থেকে একটা পানির পাইপ ওয়াল দিয়ে নেমে চত্ত্বরের মাঝ বরাবর একটা ট্যাপ পর্যন্ত এসেছে। বোধ হয় প্রয়োজন হলে চত্ত্বরে এ পাইপ দিয়েই পানি আনা হয়।
পানির পাইপের কাছে গিয়ে দাঁড়াল সালমান শামিল। কোটটা তো আগেই খুলেছে। এবার দ্রুত জুতাটাও খুলে উপরে তিনতলার ছাদে ছুঁড়ে ফেলে দিল। শুধু মোজাটাই পায়ে থাকল।
সালমান শামিল বিসমিল্লাহ বলে পানির পাইপে হাত রাখল। তারপর দ্রুত উঠতে শুরু করল। তার কাছে পরিষ্কার, নিরুপদ্রব সময় সে বেশি পাবে না। টেলিভিশন ক্যামেরার চোখ বন্ধ হয়েছে বা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে, তা তাদের কাছে ধরা পড়ার সংগে সংগেই ওরা ছুটে আসবে। সুতরাং তার আগেই তাকে কোন আড়ালে যেতে হবে।
অভ্যস্ত সালমান শামিল। পানির পাইপ বেয়ে উঠতে তার অসুবিধা হলো না। কিন্তু প্রচন্ড ক্লান্তি এসে তাকে ঘিরে ধরল। মনে হলো, দেহের ওজন যেন তার বহুগুণ বেড়ে গেছে। হাত দু’টি তার দেহের ওজন ধরে রাখতে পারছে না। বুক তৃষ্ণায় ফেটে যাচ্ছে, মুখ শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। ক্লান্তিতে মাথাটা ঝিম ঝিম করছে। চেতনা তার যেন ভোঁতা হয়ে যাচ্ছে। এক সময় দেখল তার উপরে উঠার গতিটা থেমে গেছে। সালমান শামিল মাথাটা ঝাঁকিয়ে চেতনাকে সতেজ করে তুলল। জিহবার আগা উল্টিয়ে আল-জিহবার গোড়ায় নিয়ে বুকটাকে ঠান্ডা করতে চেষ্টা করল। উপরে তাকিয়ে দেখল, আরও একতলা পরিমাণ দূরত্ব তখনও বাকি। ইঞ্চি ইঞ্চি করে আবার সে শরীরটাকে টেনে তুলতে লাগল। তিনতলার ছাদের সাইড-ওয়ালে ক্লান্ত দেহটাকে এলিয়ে দিয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ছাদকে পরীক্ষা করল সে। না, সেখানে কিছুই নেই সন্দেহজনক। সে দেহটাকে গড়িয়ে দিল ছাদের উপর। চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষন ধুঁকল সালমান শামিল। বুকের ধক-ধকানি কিছুটা কমে এলে, কিছুটা শক্তি সঞ্চয় হলে সালমান শামিল চোখ খুলল। পাশেই জুতা পড়ে থাকতে দেখল সে। জুতাটা পরে নিল। শরীরটা কাঁপছে। সে উঠে দাঁড়াতে পারল না।
চারদিকে ঘোরানো বিল্ডিংটা বেশ প্রশস্ত। সালমান শামিল বিল্ডিং এর দক্ষিণ অংশে উঠেছে।
হামাগুড়ি দিয়ে সালমান শামিল বিল্ডিং এর দক্ষিণ ধারে গিয়ে নিচে উঁকি দিল। নিচের দিকে তাকিয়ে তার মাথা ঘুরে গেল। নিচে অন্ধকার গভীর উপত্যকা। একই দৃশ্য সে দেখল পূর্ব এবং পশ্চিম পাশেও। সালমান শামিলের সামনে যে আশার আলো জ্বলে উঠেছিল তা যেন দপ করে নিভে গেল। সে কি গিরিখাদ ঘেরা কোন বিচ্ছিন্ন পর্বত শিখরে বন্দী! এজন্যেই কি তারা তাকে মুক্ত রেখেও নিশ্চিত আছে!
উত্তর প্রান্তের অন্ধকারের বুকে আলোর ধূসর একটা ছটা দেখা যাচ্ছে। সালমান শামিল টলতে টলতে এবার ওদিকে ছুটল। উদ্বেগ ও ছোটাছুটিতে তার ক্লান্তি আরও বাড়ল। পা তার দেহের ভার আর যেন ধরে রাখতে পারছে না।
উত্তর প্রান্তে গিয়ে কিছু দূরে পাহাড়ের উঁচু একটা শৃংগ দেখতে পেল। বরফমোড়া সফেদ শৃংগটি অন্ধকারেও যেন হাসছে। তারার ম্লান আলো সেখানে আলো আঁধারীর এক মায়াময় দৃশ্য রচনা করেছে।
নিচের দিকে তাকিয়ে সে দেখতে পেল, বিশাল এলাকা জুড়ে বিরাট বিরাট বিল্ডিং। আলো দেখা যাচ্ছে এখানে-সেখানে। সে আরও দেখতে পেল, ঐ বিশাল স্থাপনার সাথে তার বন্দীখানা সরু এক ব্রীজ দ্বারা সংযুক্ত। সশব্দে বহমান একটা ছোট্ট নদী উভয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। নদীটির উপর দিয়েই ব্রীজ। সালমান শামিল বুঝল, এতক্ষণ সে যে একটানা একটা শব্দ শুনতে পাচ্ছিল তা এই নদীর পানি দু’পাশের গভীর গিরিখাদে পড়ার শব্দ। নদী এল কোত্থেকে, সালমান শামিল ভাবল। নিশ্চয় ঐ বরফমোড়া পর্বত থেকে শক্তিশালী ঝর্ণা দুর্গের মত ঐ বিশাল স্থাপনার দু’পাশ দিয়ে এসে এই নদীর সৃষ্টি করেছে।
সালমান শামিল সরাসরি নিচের দিকে তাকিয়ে একটা একতলার ছাদ দেখতে পেল। একতলাটি ব্রীজের এপারের মুখে দাঁড়িয়ে। সে বুঝল, একতলাটি এ তিনতলারই একটা বর্ধিত অংশ।
এক তলার ছাদে নামতে হবে, সালমান শামিল সিদ্ধান্ত নিল। কিন্তু কিভাবে! এখান কোন পানির পাইপ নেই।
সালমান শামিল জুতা খুলে সহজে কারও চোখে না পড়ে এভাবে কার্নিশের গোড়ায় রেখে সে কার্নিশে নেমে পড়ল। উঁকি দিয়ে দেখল, কার্নিশের তিন-চার ফুট নিচেই তিনতলার জানালা। লোহার গরাদ দিয়ে বন্ধ। কার্নিশে ঝুলে ওখানে হয়তো পা রাখা যায়, কিন্তু হাত দিয়ে ধরার কিছু সেখানে নেই। সুতরাং একটাই পথ, দোতলার কার্নিশে লাফিয়ে পড়া। কার্নিশটা খুব প্রশস্ত নয়, কিন্তু সেখানে পড়ে দাঁড়াতে না পারলে একদম একতলার ছাদে গিয়ে আছড়ে পড়তে হবে। কিন্তু এই ঝুঁকি নেয়া ছাড়া কোন পথ নেই। অন্য কোন চিন্তা করার সময়ও নেই। অনুসন্ধান শুরু হয়ে গেলে মুশকিল হবে।
সালমান শামিল বিসমিল্লাহ বলে কার্নিশে ঝুলে পড়ল। একটুক্ষণ ঝুলে থেকে দেহটাকে স্থির করে নিয়ে একসময় হাতটা ছেড়ে দিয়ে ফলের মত খসে পড়ল দোতলার কার্নিশ লক্ষ্যে।
পা দু’টি কার্নিশে ঠিকমতই পড়ল। কিন্তু দেহের ভারসাম্য সে রাখতে পারল না। কার্নিশে পড়েই গড়িয়ে পড়ে গেল সে একতলার ছাদে।
দোতলার কার্নিশ থেকে গড়িয়ে পড়ায় তিনতলা থেকে পড়লে আঘাত যে রকমটা হত তা হলো না। তবু বাম হাঁটু এবং মাথায় প্রচন্ড ব্যথা পেল সালমান শামিল। সেদিন বন্দী হবার দিন মাথার যে জায়গাটায় আঘাত পেয়েছিল, আজও সেই জায়গাটাই ছাদের সাথে ঠুকে গেল। মাথাটা ঘুরে উঠেছিল কিন্তু জ্ঞান হারায়নি সে। সে ভাবছিল, তাকে কিছুতেই জ্ঞান হারালে চলবে না। সে সমস্ত শক্তি একত্র করে আঘাতকে সামলে নেয়ার চেষ্টা করল।
সে অনেকক্ষণ মরার মত পড়ে রইল এবং শক্তি সঞ্চয় করার চেষ্টা করল।
বেশ কিছু সময় পর সে চোখ খুলল। চিৎ হয়ে শুয়ে ছিল সে। দেখল, তার সামনে কিছু উপরেই দোতলায় একটা ছাদমুখী দরজা। দরজাটা বন্ধ।
সালমান শামিল বাম পাটা নাড়ল। না, নাড়তে পারছে। হাঁটুর আঘাত খুব বড় রকমের নয়। মাথার আঘাতের জায়গাটা খুব টাটাচ্ছে। হাত দিতেই হাত রক্তে ভিজে গেল। এতক্ষণে খেয়াল করল, তার সোয়েটারেরও কতক অংশ তাজা রক্তে ভেজা, মাথা থেকে রক্ত গড়িয়ে এসেছে।
খুবই দুর্বলতা অনুভব করল সালমান শামিল। জীবনীশক্তি যেন নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এভাবে পড়ে থাকা চলবে না।
সালমান শামিল যন্ত্রণাকাতর মাথাটা ধীরে ধীরে তুলে ক্রলিং করে এগিয়ে গেল ছাদের উত্তর কিনারায়। ছাদের উত্তর প্রান্তটা একেবারে ব্রীজের মুখ বরাবর গিয়ে শেষ হয়েছে। সালমান শামিল ছাদের সাথে মিশে অতি সন্তর্পণে নিচে উঁকি দিল। দেখেই বুঝল, একতলাটা একটা গেটরুম। সালমান শামিলের চোখ বরাবর নিচেই গেটটা। গেটের পাশে টুলে একজন প্রহরী বসে। তার হাতে স্টেনগান। গেটরুমের ভেতর রেকর্ডারে পপসংগীতের একটা রেকর্ড বাজছে।
সালমান শামিল মাথা সরিয়ে নিল। একটু বিশ্রাম নেয়ার জন্যে ছাদের উপর মাথাটা ন্যস্ত করল। এমন সময় ব্রীজের উপর অনেকগুলো পায়ের শব্দ শোনা গেল। শুয়ে থেকেই একটু চোখ ফিরাল সালমান শামিল। দেখল, চার-পাঁচজন লোক ব্রীজ দিয়ে ছুটে আসছে। তাদের হাতেও স্টেনগান।
ওরা যখন ব্রীজের এ প্রান্তে গেটরুমের দিকে এল, সালমান শামিল আস্তে তার একটা চোখ নিচের দিকে মেলে ধরলো। গেটের মাথায় ছাদের সাথে আটকানো বিদ্যুৎ বাতির স্ট্যান্ড। কিন্তু আলোতে শেড লাগানো থাকায় তার আলো উপরে উঠছে না। ফলে সালমান শামিল অনেকটা নিরাপদেই উঁকি দিতে পারছে।
ব্রীজ দিয়ে আসা লোকেরা গেটে যেতেই গেটম্যান উঠে দাঁড়িয়ে বলল, কি ব্যাপার, কিছু হয়েছে মনে হচ্ছে?
-চত্ত্বরের টেলিভিশন ক্যামেরা কাজ করছে না, নিশ্চয় কিছু একটা ঘটেছে।
-বন্দী তার কক্ষে নেই?
-কক্ষে সে ঢুকেই নি দু’দিন।
আর বাক্যব্যয় না করে ওরা ছুটল ভেতর দিকে। তাদের সাথে দারোয়ানও।
সালমান শামিল একবার ব্রীজের দিকে চাইল। ব্রীজটা পার হয়ে ওপারে বাড়িগুলোর মধ্য দিয়েই তাকে বেরুতে হবে। এখান থেকে মুক্ত হবার এ একটা পথই তার সামনে আছে। এবং এখনই তার সুযোগ। চিন্তা করার সাথে সাথেই সালমান শামিল সিদ্ধান্ত নিল।
গেটরুমের ছাদ থেকে সে লাফিয়ে পড়তে যাচ্ছিল। হঠাৎ তার খেয়াল হলো, গেটে টেলিভিশন ক্যামেরার চোখ অবশ্যই থাকবে। চিন্তার সংগে সংগেই সে থেমে গেল।
থমকে গিয়ে একটু চিন্তা করে সমাধান পেয়ে গেল। গেটের ছাদের সাথে মাত্র ফুটখানেক নিচে বৈদ্যুতিক বাল্ব জ্বলছে।
সালমান শামিল হাত বাড়িয়ে বাল্ব খুলে নিল। গরমে প্রায় হাতটা পুড়ে গেল তার। কিন্তু সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করার সময় নেই।
বাল্ব খুলে নেয়ার সাথে সাথেই সালমান শামিল নিচে লাফিয়ে পড়ল। পড়ল শক্ত পাথরের উপর। পড়ার ঝাঁকুনিতে প্রচন্ড এক চাপ সৃষ্টি হল মাথায়। মাথাটা ঘুরে গেল। দুর্বল শরীরটা যেন মাথাটা আর দাঁড় করিয়ে রাখতে পারছে না।
দাঁতে দাঁত চাপল সালমান শামিল। তাকে অজ্ঞান হওয়া চলবে না, বসে থেকে সময়ও খরচ করতে পারবে না। গেটের টেলিভিশন ক্যামেরার চোখ বন্ধ হওয়ার খবর ইতোমধ্যেই তারা পেয়ে গেছে। কি ঘটেছে তা দেখার জন্যে কেউ ছুটে আসছে নিশ্চয়।
ব্রীজের একটা পিলার ধরে উঠে দাঁড়াল সালমান শামিল। চোখের অন্ধকার তখনও কাটেনি। ব্রীজের রেলিং ধরে টলতে টলতেই ছুটল সে।
ব্রীজের মুখ থেকে একটা প্রশস্ত পাথুরে রাস্তা এগিয়ে গেছে সোজা সামনে। ব্রীজ পার হয়ে সালমান শামিল ঐ পথ ধরেই ছুটে চলল।
কিন্তু কয়েকগজ যেতেই সামনে অনেকগুলো পায়ের শব্দ শুনতে পেল। বুটের খট খট শব্দ দ্রুত এদিকেই আসছে। সামনের বাঁকটা ঘুরলেই তারা তাকে দেখতে পাবে। ধরা পড়ার তার বাকি নেই।
সালমান শামিল এদিক–ওদিক তাকিয়ে দেখল, ডানদিকে একটা ছোট রাস্তা বেরিয়ে পূর্ব দিকে চলে গেছে। কোন চিন্তা না করেই ঐ রাস্তা ধরে সালমান শামিল ছুটতে শুরু করল। রাস্তাটি এঁকে-বেঁকে এগিয়ে গেছে। ছোট ছোট অনেক গলিও এ রাস্তা থেকে দু’পাশে বেরিয়ে গেছে। নিশ্চয় এ রাস্তা কোন বড় রাস্তায় পড়েছে এবং সে রাস্তা তাকে মুক্তি সিংহদ্বারে পৌঁছাবে।
রাস্তায় কোন মানুষ নেই। নীরব, অন্ধকার রাস্তা। মাঝে মাঝে আলো আছে, কিন্তু তাও বড় স্লান।
সালমান আর শরীর টেনে নিয়ে চলতে পারছে না। টলতে টলতেই এগুচ্ছে সে।
হঠাৎ এক জায়গায় এসে সামনে মোটরসাইকেল এগিয়ে আসার শব্দ পেয়ে সালমান শামিল বাম দিকের এক গলিতে ঢুকে পড়ল।
বেশ কিছুদূর এগুবার পর সরু গলিটা একটা বিশাল তিনতলা বাড়ির লনে এসে শেষ হয়ে গেল।
সালমান শামিল লনে ঢুকে আর কিছু চিন্তা না করে বসে পড়ল। কোন চিন্তা করার শক্তিও তার ছিল না।
কিন্তু বসে পড়ার সাথে সাথেই সালমান শামিল অজ্ঞান হয়ে ঢলে পড়ল লনের পাথরের উপর। চলার ঝোঁক, এগুবার দৃঢ় সংকল্প তার যে চেতনাকে এতক্ষণ ধরে রেখেছিল, বসে পড়ার পর সে চেতনা আর থাকল না। ক্ষুধা-তৃষ্ণার দুঃসহ জ্বালা, দুর্বল আহত শরীরের প্রচন্ড ক্লান্তি এবং তীব্র উত্তেজনার মানসিক চাপ তাকে ঘুম পাড়িয়ে দিল।
লেডি জোসেফাইন পায়চারি করছিল দোতলার ব্যালকনিতে। সে দেখল, একজন লোক ছুটতে ছুটতে তাদের সামনের লনে এসে বসল, তারপর মাটির উপর ঢলে পড়ে গেল। বিস্ময়ের সাথে অনেকক্ষণ লক্ষ্য করল, না, লোকটির কোন নড়া-চড়া নেই। কে লোকটি? কি হল তার? লোকটি মরে গেল না তো? না জ্ঞান হারাল? চঞ্চল হয়ে উঠল লেডি জোসেফাইন।
লেডি জোসেফাইন আর্মেনিয়ার সবচেয়ে প্রাচীন এবং সবচেয়ে সম্মানিত সানাইন গীর্জার প্রধান পুরোহিত ফাদার পলের মা। ফাদার পল আর্মেনিয়ায় খৃস্টান ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা মহান সেন্ট গ্রেগরীর উত্তর পুরুষ। সানাইন গীর্জার ঐতিহাসিক ‘ক্রস’টি সেন্ট গ্রেগরী কর্তৃক নির্মিত হয় খৃস্টীয় ৪র্থ শতাব্দীতে। এই ঐতিহাসিক ও পবিত্রতম সানাইন গীর্জাকে কেন্দ্র করে গড়ে তোলা পর্বত শীর্ষের এই আমবার্ড দুর্গে হোয়াইট ওলফ প্রতিষ্ঠা করেছে তার হেডকোয়ার্টার। হোয়াইট ওলফ ফাদার পলকে ভয় এবং ভক্তি দুই-ই করে।
উদ্বিগ্ন লেডি জোসেফাইন নিজের ঘরে ফিরে এসে একটু পায়চারি করে চলে এল তার মেয়ের কক্ষে। মেয়ে সিস্টার মেরী ইতালীর ভ্যাটিকান সিটির খৃস্টান থিয়োলজী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। ছুটি কাটাবার জন্যে এসেছে বাড়িতে।
মেরী শুয়ে পড়েছিল। লেডি জোসেফাইন কক্ষের দরজায় দাঁড়িয়ে ডাকল, মা মেরী, এস তো।
–কোথায় মা? মাথাটা একটু তুলে জিজ্ঞাসা করল সিস্টার মেরী।
‘এস আমার সাথে’ বলে চলতে শুরু করল লেডি জোসেফাইন।
সিস্টার মেরীও শোয়া থেকে উঠে মায়ের পিছু নিল। মায়ের মতই অপরূপ তার গায়ের রং। লেডি জোসেফাইন আমেরিকার বিখ্যাত কিরকেশিয়ান গোত্রের মেয়ে। তার উপর তারুণ্য যেন সিস্টার মেরীকে একগুচ্ছ গোলাপে পরিণত করেছে।
মা লেডি জোসেফাইন আবার সেই ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। সিস্টার মেরীও তার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। মা জোসেফাইন নিচে লনের দিকে ইংগিত করে সব কথা মেরীকে বলল।
শুনেই মেরী দ্রুত বলে উঠল, মা চল নিচে গিয়ে দেখি।
–না দুর্গের নিরাপত্তা বিভাগকে আগে জানাবে?
–না মা। আমরা আগে দেখি না!
‘তাহলে চল’ বলে লেডি জোসেফাইন ফিরে দাঁড়িয়ে চলতে শুরু করল।
নিচে নেমে কাছে গিয়ে ওরা দেখল, সুন্দর স্বাস্থ্যবান এক যুবক। কপালের ডান পাশের একটা অংশ রক্তভেজা। ডান গাল বেয়ে রক্তের একটা ধারা নেমে এসেছে। গায়ে মাত্র সোয়েটার। পায়ে শুধু মোজা, জুতা নেই।
সিস্টার মেরী গায়ে হাত দিল। গা বরফের মত ঠান্ডা। তাড়াতাড়ি নাকে হাত দিয়ে নিঃশ্বাস পরীক্ষা করল। নিঃশ্বাস আছে। উজ্জ্বল চোখে সিস্টার মেরী মা লেডি জোসেফাইনের দিকে তাকিয়ে বলল, মা, লোকটি এখনও জীবিত।
–এখন কি করা? চিন্তিত কণ্ঠে বলল লেডি জোসেফাইন।
–এখন আমরা কি করতে পারি মা এত রাতে? মা’র কথাই পুনরাবৃত্তি করল উদ্বিগ্ন সিস্টার মেরী।
–যাই করা হোক, এখনি ভেতরে নিয়ে যেতে হবে। তা না হলে শীতেই মারা যাবে।
বলে লেডি জোসেফাইন ওভারকোটটা খুলে যুবকটিকে ঢেকে দিল।
ফাদার পলের এই বাড়িতে ফাদার পল, তার মা লেডি জোসেফাইন এবং বোন সিস্টার মেরী ছাড়া আর থাকে মাত্র কাজের একজন আয়া এবং ফাদার পলের একজন এ্যাটেনডেন্ট। আয়া মেয়েটি গতকাল ছুটিতে গেছে। আর ফাদার পল গেছে ভ্যাটিকানে ফাদারদের এক সম্মেলনে। তার সাথে এ্যাটেনডেন্টও। বাড়িতে এখন লেডি জোসেফাইন এবং সিস্টার মেরী ছাড়া আর কেউ নেই।
–মা, তুমি পেছনটা ধর, আমি মাথার দিকটা ধরছি। আমরা পারব নিয়ে যেতে। বলল সিস্টার মেরী।
মা ও মেয়ে ধরাধরি করে সংজ্ঞাহীন যুবকটিকে একতলার ড্রইংরুমে তুলল। টেবিল, টিপয় সরিয়ে কার্পেটের উপর যুবকটিকে শুইয়ে দিল তারা।
ক্লান্ত লেডি জোসেফাইন সোফায় বসে জিরোবার চেষ্টা করছে। আর সিস্টার মেরী যুবকটিকে কার্পেটে নামিয়ে ছুটে গেছে কম্বল আনার জন্যে।
অল্পক্ষণের মধ্যেই সিস্টার মেরী একটা কম্বল এবং গামলায় করে গরম পানি ও তোয়ালে নিয়ে এল।
ভ্যাটিকানের থিয়োলজি বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘সেবা’ একটা বিষয় হিসেবে শেখানো হয়। সুতরাং সিস্টার মেরী শুশ্রুষা ও প্রাথমিক চিকিৎসায় দক্ষ।
সিস্টার মেরী যুবকটির গায়ে কম্বল চাপিয়ে দিচ্ছিল। মা লেডি জোসেফাইন বলল, মা, তোর হাত-কাপড়ে রক্তের দাগ লেগেছে দেখেছিস্?
–দেখেছি মা, এখন কাপড় পাল্টিয়ে লাভ নেই। আরও কাজ আছে।
বলে সিস্টার মেরী গরম পানির গামলায় তোয়ালে ডুবিয়ে তা চিপে নিয়ে যুবকটির মুখে এবং হাতে-পায়ে সেঁক দিতে লাগল।
সিস্টার মেরী যুবকটির মুখ ও গলায় গরম তোয়ালের সেঁক দিচ্ছিল। এই সময় যুবকটি চোখ মেলল।
চোখ মেলে বিস্ময় দৃষ্টি নিয়ে কয়েক মুহূর্ত সিস্টার মেরীর দিকে তাকিয়ে থাকল। তারপর চোখ বুজল আবার। পরমুহূর্তেই আবার চোখ খুলে চারদিকে তাকাল। লেডি জোসেফাইন তখন সোফা থেকে উঠে যুবকটির সামনে এসে দাঁড়াল। লেডি জোসেফাইন এবং সিস্টার মেরী দু’জনার মুখই খুশিতে উজ্জ্বল।
যুবকটি চারদিক দেখে সিস্টার মেরীর আনন্দভরা মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, আমি কোথায়? আপনারা কারা?
বড় দুর্বল, অস্ফুটপ্রায় কণ্ঠ যুবকটির।
সিস্টার মেরী কম্বলটা যুবকটির গলা পর্যন্ত টেনে দিতে দিতে বলল, আপনি নিরাপদে আছেন, কেমন বোধ করছেন এখন?
–আমি পানি খাব। বড় শুকনো ও চিঁ চিঁ কণ্ঠস্বর যুবকটির। চোখ আবার বন্ধ করেছে যুবকটি।
যুবকটির এত দুর্বল ও শুকনো কণ্ঠস্বরে বিস্মিত হল, ঘাবড়েও গেল সিস্টার মেরী।
তাড়াতাড়ি গিয়ে পাশের ঘর থেকে এক বোতল ব্রান্ডি নিয়ে এল। গ্লাসে ঢেলে ‍যুবকটির মাথা বাম হাত দিয়ে একটু উঁচু করে ডান হাতে গ্লাসটি যুবকটির মুখের কাছে নিয়ে বলল, নিন।
যুবকটি চোখ খুলে গ্লাস দেখে তাড়াতাড়ি কম্বলের তলা থেকে হাত বের করে দু’হাতে ঠেস দিয়ে আধ-শোয়া হয়ে বসল। তারপর গ্লাসটি সিস্টার মেরী ঠোঁটের কাছে আনতেই দ্রুত মুখ সরিয়ে নিল যুবকটি। বলল, আমি মদ খাই না।
বিস্মিত সিস্টার মেরী গ্লাস সরিয়ে নিতে নিতে বলল, একটু অপেক্ষা করুন, আমি পানি নিয়ে আসছি।
লেডি জোসেফাইন ভীষণ বিস্মিত হয়েছে। যুবকটির একটু কাছে সরে এসে বলল, এই সময় একটু ব্রান্ডি খেলে খুবই উপকার হতো বাছা। সস্নেহ নরম কণ্ঠ লেডি জোসেফাইনের।
যুবকটি আবার শুয়ে পড়েছিল। লেডি জোসেফাইনের কথায় ধীরে ধীরে চোখ খুলে বলল, না মা, আমি মদ খাই না, খেতে পারব না।
যুবকটির ‘মা’ ডাক শুনে লেডি জোসেফাইনের মাতৃহৃদয় আলোড়িত হয়ে উঠল। যুবকটির পবিত্র, নিষ্পাপ, সুন্দর ও সারল্যভরা মুখের দিকে তাকিয়ে ভাবল, বড় ভালো ছেলে, কার যে বুকের ধন!
এগিয়ে গিয়ে জোসেফাইন যুবকটির মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, ঠিক আছে, খেয়ো না বাছা!
পানি নিয়ে এসেছে সিস্টার মেরী।
সিস্টার মেরী হাঁটু গেড়ে বসল যুবকটির মুখের কাছে। লেডি জোসেফাইন দু’হাত দিয়ে মাথা উঁচু করে তুলে ধরল। সিস্টার মেরী যুবকটির ঠোঁটে গ্লাস তুলে ধরল।
যুবকটি গোগ্রাসে গিলে ফেলল গ্লাসের সবটুকু পানি।
মুখ থেকে গ্লাসটি সরিয়ে নিচ্ছিল সিস্টার মেরী। আর লেডি জোসেফাইন যুবকটির মাথা রাখতে যাচ্ছিল। এমন সময় যুবকটির বুকটা আন্দোলিত হয়ে উঠল এবং মুখ থেকে ‘ওয়াক’ শব্দ উঠল।
যুবকটি নিজেই দু’হাতে ঠেস দিয়ে মাথাটা উঁচু করে তুলল।
সিস্টার মেরী ‘ওয়াক’ শব্দ শুনেই বুঝতে পেরেছিল। গ্লাসটি তাড়াতাড়ি ফেলে দিয়ে তোয়ালেটা তুলে নিয়ে যুবকটির মুখের কাছে ধরল। কিন্তু তার আগেই যুবকটির মুখ থেকে হড় হড় করে বেরিয়ে এসেছে বমন। সিস্টার মেরীর তোয়ালে ‘কিছু অংশ’ ধরতে পারল, কিন্তু একটা অংশ তীব্র গতিতে গিয়ে সিস্টার মেরীর মুখ ও গায়ে ছড়িয়ে পড়ল।
পরপর কয়েকবার বমনের বেগ এল। সিস্টার মেরীর তোয়ালে এরপর সবটুকুই ধরে নিল। লেডি জোসেফাইন আরেকটা শুকনো তোয়ালে নিয়ে এসেছিল। সিস্টার মেরী সেটাকে যুক্ত করে বমন ভালোভাবে ধরে নিয়ে উঠে দাঁড়ালো। লেডি জোসেফাইন যুবককে ধীরে ধীরে শুইয়ে দিল।
সিস্টার মেরী মুখ-হাত ধুয়ে বাথরুম থেকে ফিরে এল।
বমনের পর অসাড় হয়ে পড়েছিল যুবকটি। চোখ দু’টি তার বোজা।
সিস্টার মেরী এসে আবার তার সামনে হাঁটু গেড়ে বসল। তোয়ালে দিয়ে যুবকটির মুখের বমনের দাগ মুছে দিল।
যুবকটি চোখ খুলল। অশ্রু গড়িয়ে পড়ল তার দু’চোখ দিয়ে। বলল, আপনি, আপনারা কে জানি না। আমি দুঃখিত, আমাকে মাফ করবেন। যুবকটির ক্ষীণ কণ্ঠ কান্নায় রুদ্ধ হয়ে গেল।
সম্ভবত যুবকটি সিস্টার মেরীর মুখে গায়ে বমন করে দেয়ার জন্যেই এই দুঃখ প্রকাশ করল।
সিস্টার মেরীর রক্তাভ ঠোঁটে হাসির একটা রেখা ফুটে উঠল। কিন্তু যুবকটির কথার প্রতি কোন ভ্রুক্ষেপ না করেই বলল, আপনার বমনে এক বিন্দু খাদ্য কণাও নেই। আপনি খেয়েছেন কখন?
যুবকটি চোখ বন্ধ রেখেই বলল, আজ তিন দিন এক কণা খাবার, এক ফোঁটা পানিও ওরা আমাকে দেয়নি।
–কারা? হঠাৎ প্রশ্ন করল সিস্টার মেরী।
–এসব প্রশ্ন এখন নয়, যাও এক গ্লাস গরম দুধ নিয়ে এস।
লেডি জোসেফাইন সোফা থেকে উঠে তাড়া দিল মেরীকে। তার কণ্ঠে উদ্বেগ।
‘ঠিক বলেছ মা’ বলে সিস্টার মেরী দ্রুত খাবার ঘরের দিকে চলে গেল।
অল্পক্ষণ পরেই গ্লাসভর্তি দুধ নিয়ে ফিরে এল সে।
লেডি জোসেফাইন যুবকটির মাথার কাছেই বসেছিল। সে দু’হাতে যুবকটির মাথা তুলে ধরল। সিস্টার মেরী যুবকটির মুখে দুধের গ্লাস তুলে ধরল।
অর্ধেক গ্লাস খাবার পর মেরী বলল, একবারে নয়, এই অর্ধেকটা পরে খাবেন। বলে মুখ থেকে দুধের গ্লাস সরিয়ে নিল।
লেডি জোসেফাইন যুবকটির মাথা নামিয়ে রাখল। সিস্টার মেরী দুধের গ্লাস তার মা’র হাতে তুলে দিয়ে বলল, মা, তুমি দুধটা খাইয়ে দিও। আমি ফাস্ট এইড বক্সটা নিয়ে আসি।
সিস্টার মেরী চলে গেল।
কিছুক্ষণ পর ফাস্ট এইডের জিনিসপত্র নিয়ে সিস্টার মেরী ফিরে এল। এসে দেখল, যুবকটি দু’হাতে ঠেস দিয়ে আধ-শোয়া হয়ে বসে আছে। আর মা লেডি জোসেফাইন গ্লাসের বাকি দুধটুকু খাইয়ে দিচ্ছে।
দুধ খাওয়া হলে যুবকটি শুয়ে পড়ল।
সিস্টার মেরী যুবকটির মাথার পেছনে গিয়ে মাথায় হাত দিল। চোখ খুলল যুবকটি। মেরী তার মাথা তুলে ধরতে চেষ্টা করে বলল, ক্ষতের জায়গাটা ড্রেসিং করতে হবে, মাথার তলে একটা ওয়েল-পেপার বিছিয়ে দেই।
যুবকটি মাথা তুলে উঁচু হলো। কার্পেটের উপর তার কাঁধ পর্যন্ত ওয়েল-পেপার বিছিয়ে দিল মেরী।
মাথাটা রাখলে সিস্টার মেরী কপাল থেকে চুল সরিয়ে দেখল, ডান চোখের ইঞ্চিখানেক উপরে অনেকখানি জায়গা থেতলে গিয়ে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে। ক্ষত থেকে অল্প অল্প রক্ত ঝরছে এখনো।
সিস্টার মেরী ডেটল মেশানো পানিতে ন্যাকড়া ভিজিয়ে ক্ষত পরিষ্কার করা শুরু করল।
প্রথমে একবার মাত্র চমকে উঠল যুবকটি। তারপর গোটা সময় সে স্থির থাকল। তার শান্ত মুখেও কোন পরিবর্তন আসে নি। বিস্মিত হলো সিস্টার মেরী, আশ্চর্য শক্ত নার্ভ লোকটির। ক্ষত থেকে ছেঁড়া গোশত ও চামড়া তুলে ফেলতে হয়েছে। মুখে সে একটা উঃ শব্দও করে নি। ক্ষত পরিষ্কার করতে করতেই প্রশ্ন জাগল সিস্টার মেরীর মনে, লোকটি কে? উন্মুক্ত কপালের নিচে সুন্দর ঘন ভ্রু, নীল টানা চোখ, চোখের দৃষ্টি অত্যন্ত বুদ্ধিদীপ্ত ও পবিত্র, মুখে শিশুর সারল্য। লোকটি যে-ই হোক, সাধারণ নয়; কোন খারাপ লোক তো নয়ই।
মাথায় ব্যান্ডেজ বাঁধা শেষ হলে সিস্টার মেরী গরম পানিতে ন্যাকড়া ভিজিয়ে মুখ ও গলার রক্ত পরিষ্কার করে দিল।
কাজ শেষ করে মাথার তল থেকে ওয়েল পেপার এবং সবকিছু নিয়ে বাথরুমে চলে গেল।
লেডি জোসেফাইন একটু আগেই উঠে গিয়েছিল।
হাত-মুখ ধুয়ে বাথরুম থেকে বেরিয়ে এল সিস্টার মেরী। গায়ে তখনও তার গোলাপী নাইট গাউন। একটা ওভারকোট গায়ে চড়িয়ে বেরিয়েছিল। কিন্তু কাজের সময় তা খুলে রাখে। গাউনটি পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত নেমে যাওয়া। ঢিলা গাউনটি কোমরে বেল্ট দিয়ে আঁটা। কাজের সুবিধার জন্যে গাউনের হাতা কনুইর উপর গুটিয়ে রাখা। কিছু চুল কপালে নেমে এসেছে। গোলাপী শরীরে গোলাপী নাইট গাউন অপরূপ কম্বিনেশন। সিস্টার মেরী বেরিয়ে এসে দেখল, যুবকটি উঠে বসেছে। চোখ নিচু।
–এখন কেমন বোধ করছেন? জিজ্ঞাসা করল সিস্টার মেরী।
–ভালো। চোখ না তুলেই উত্তর দিল।
এ সময় লেডি জোসেফাইনও ফলের জুস নিয়ে এল।
লেডি জোসেফাইন যুবকটির কাছে বসে প্লেটে করে কেক এগিয়ে দিয়ে বলল, বাছা কেকটুকু খেয়ে নাও। ভালো লাগবে।
লেডি জোসেফাইন যুবককে কেক ও ফলের জুস খাইয়ে দিল।
–মা, ওর কাপড় পাল্টানো তো দরকার। বলল সিস্টার মেরী।
–ওপরে নিয়ে চল। শুইয়ে দিতে হবে। ওখানে গিয়েই পাল্টাবে।
সিস্টার মেরী মায়ের মুখের দিকে চাইল। তার চোখে প্রশ্নবোধক দৃষ্টি। তার মনে হচ্ছিল, নিচের গেস্টরুমে রাখলেই তো চলতো। উপরে চারটি শোবার ঘর। একটি ফাদার পলের, একটি লেডি জোসেফাইনের, একটি সিস্টার মেরীর এবং অন্যটি পারিবারিক মেহমানের জন্যে। কিন্তু সিস্টার মেরী মায়ের শান্ত, নিশ্চিন্ত মুখের দিকে চেয়ে আর কিছু বলল না। তার মনে হলো, দেখাশোনার অসুবিধা হবে মনে করেই হয়তো মা এই ব্যবস্থা করলেন।
সিস্টার মেরী যুবককে জিজ্ঞাসা করল, হাঁটতে পারবেন?
–পারব। বলল যুবকটি, বলেই ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল সে।
লেডী জোসেফাইন আগে আগে চলল। তাকে অনুসরণ করল যুবকটি। তার পেছনে সিস্টার মেরী।
উপরে মোট ৮টি রুম। ৪টি শোবার ঘর ছাড়াও আছে ফাদার পলের লাইব্রেরী রুম, সিস্টার মেরীর স্টাডি রুম, পারিবারিক ড্রইংরুম এবং স্টোররুম।
দোতলায় সিঁড়ির মুখেই ফ্যামিলি ড্রইংরুম। ড্রইংরুমের উত্তর পাশে ফ্যামিলি গেস্টরুম।
যুবকটি লেডি জোসেফাইনের সাথে গিয়ে গেস্টরুমে প্রবেশ করল। রুমে ছোট একটি খাট। এক পাশে চেয়ার টেবিল। ঘরের এক কোণে ছোট একটি ফ্রিজ।
লেডি জোসেফাইন ঘরে ঢুকে যুবকটিকে লক্ষ্য করে বলল, এ রুমেই আপাতত তুমি থাকবে। লেডি জোসেফাইন গিয়ে চেয়ারে বসেছিল।
যুবকটি গিয়ে বসল খাটের এক কোণে।
উপরে উঠেই মেরী চলে গিয়েছিল তার পিতার ঘরে। তার পিতার স্লিপিং গাউন নিয়ে সে প্রবেশ করল যুবকটির রুমে। যুবককে লক্ষ্য করে বলল, এগুলো পরে নিন।
লেডি জোসেফাইন এবং সিস্টার মেরী দু’জনেই রুম থেকে বেরিয়ে এল।
ক’মিনিট পরে ঘরে ঢুকল। দেখল, যুবকটি গাউন পরে বিছানায় উঠে বসেছে।
সিস্টার মেরী মা লেডি জোসেফাইনকে বলল, মা তুমি একটু বস, আমি আসছি।
বলে সিস্টার মেরী যুবকটির পরিত্যক্ত কাপড়গুলো নিয়ে ওয়াশিং রুমের দিকে চলে গেল। ক’মিনিট পর ফিরে এল।
এই সময় যুবকটিও বাথরুম থেকে এসে তার খাটে বসল। তাকে অনেকখানি ফ্রেশ দেখাচ্ছে। যে ম্লান আভা মুখে ছিল তা দূর হয়ে স্বাভাবিক লাবণ্য ফিরে এসেছে। মুখ নিচু করে বসেছিল যুবকটি। যুবকটিকে খুব লাজুক মনে হল। এমনটা খুব কমই দেখা যায়। ভাবছিল লেডি জোসেফাইন।
সিস্টার মেরী ও লেডি জোসেফাইন দু’জনেই তার দিকে তাকিয়ে ছিল। দেখলেই বুঝা যায়, দু’জনের চোখেই প্রশ্ন কিলবিল করছে। অবশেষে প্রশ্ন করল লেডি জোসেফাইন, তোমার নাম কি বাছা?
–সালমান শামিল। মুখ না তুলেই বলল যুবকটি।
নাম শুনে মা-মেয়ে দু’জনের কপাল যেন ঈষৎ কুঞ্চিত হলো। অবচেতনভাবেই যেন তারা তাকাল পরস্পরের দিকে।
–মুসলমান? লেডি জোসেফাইনই আবার প্রশ্ন করল।
–জ্বি। মুখ না তুলেই জবাব দিল যুবকটি।
–কি কর? কোথায় থাক?
–ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার ফিজিক্সের আমি ছাত্র। ইয়েরেভেনেই থাকি।
সিস্টার মেরীর কপালটা ঈষৎ কুঞ্চিত এবং দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল। বলল, গত বছর অনার্স পরীক্ষায় ফার্স্টক্লাস ফার্স্ট হলো, ইনিস্টিটিউটের ইতিপূর্বেকার সকল রেকর্ড ভংগ করে ‘অর্ডার অব মেরিট’ স্বর্ণপদক পেল, আপনি কি সেই সালমান শামিল?
সালমান মুহূর্তের জন্যে চোখ তুলে সিস্টার মেরীর দিকে তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নিল। বলল, হ্যাঁ।
সিস্টার মেরীর মুখে বিস্ময় ও আনন্দের একটা ঝিলিক দেখা গেল। কিন্তু পরমুহূর্তেই চোখে-মুখে উদ্বেগ টেনে বলল, কিন্তু আপনি এখানে কেন? এ অবস্থা কেন?
সালমান শামিল সংগে সংগেই কোন উত্তর দিতে পারল না। একটা চিন্তা, দ্বিধা যেন তার চোখে-মুখে ছায়া ফেলল। হোয়াইট ওলফের ঘাঁটিতে সবাইতো একরকমই হবে। আবার ভাবল, এরা কি তার প্রতি নিষ্ঠুর হতে পারে, বিশ্বাস হয় না।
সালমান শামিলকে চিন্তান্বিত দেখে লেডি জোসেফাইন বলল, তুমি কি ভয় করছ বাছা? তুমি তো ভাল ছেলে। তুমি অপরিচিত নও, তোমার কথা মেরীর বন্ধু সোফিয়া এ্যাঞ্জেলার কাছে আমিও শুনেছি।
সোফিয়ার নাম শুনে সালমান শামিলের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। বলল, সোফিয়াকে আপনারা চেনেন? ওতো আমার ক্লাসমেট।
–ও আমার ছোটবেলার বন্ধু। ইয়েরেভেনের প্রাথমিক ক্যাথলিক স্কুলে আমরা একসংগে পড়েছি। ইয়েরেভেনে গেলে আমরা ওর বাসায় যাই।
সিস্টার মেরী কথা শেষ করার পর সবাই চুপচাপ। ধীরে ধীরে মাথা তুলল সালমান শামিল। বলল, আপনারা বলা যায় আমাকে নতুন জীবন দিয়েছেন। কোন কথা গোপন করব না। তিনদিন আগে হোয়াইট ওলফ আমাকে ইনস্টিটিউট-গেট থেকে কিডন্যাপ করে আনে। এর আগেও আমাকে কিডন্যাপ করার একটা চেষ্টা ব্যর্থ হয়। কিডন্যাপ করে খাদ্য-পানিহীন একটা নির্জন বন্দীখানায় আমাকে বন্দী করে রেখেছিল। তারা আমাকে মৃত্যুদন্ড দিয়েছিল। খাদ্য-পানি থেকে বঞ্চিত করে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়াই ছিল তাদের উদ্দেশ্য। তিনদিন পর দুঃসাধ্য এক চেষ্টা চালিয়ে বন্দীখানা থেকে বেরিয়ে এসেছি।
লেডি জোসেফাইন ও সিস্টার মেরী নীরবে সালমান শামিলের কথা শুনছিল। তাদের চোখে-মুখে ভয় এবং বিস্ময়। কথা শেষ করে সালমান শামিল থামলেও তারা কোন কথা বলল না। লেডি জোসেফাইন হোয়াইট ওলফের সব কথাই জানে এবং একে সমর্থনও করে। আর সিস্টার মেরী কথা না জানলেও হোয়াইট ওলফের দয়ামায়াহীন ভয়ানক চরিত্রের কথা জানে এবং জানে, হোয়াইট ওলফের স্বার্থের বিরুদ্ধে গেলে কেউই নিস্তার পায় না।
অনেকক্ষণ পর লেডি জোসেফাইন বলল, কেন তোমার উপর তাদের এই রাগ?
–আমি আমার জাতিকে ভালবাসি। আমি তাদের স্বার্থের পক্ষে। দ্বিধাহীন কণ্ঠে বলল সালমান শামিল।
আবার নীরব হল লেডি জোসেফাইন। চিন্তা ও উদ্বেগের রেখা তার চোখে-মুখে। অনেকক্ষণ পর উঠে দাঁড়াল। বলল, অনেক ধকল গেছে তোমার উপর দিয়ে বাছা। বিশ্রাম নাও।
তারপর আরও কাছে এসে সালমান শামিলের মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, বাছা, ঈশ্বরই তোমাকে আমাদের কাছে এনেছেন। ঈশ্বরই তোমাকে রক্ষা করেছেন। তুমি কোন চিন্তা করো না বাছা, ঈশ্বর আছেন।
বলে লেডি জোসেফাইন ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
সিস্টার মেরী চেয়ারে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে সালমান শামিলের দিকেই তাকিয়েছিল।
এই সময় মুখ তুলল সালমান শামিল। মেরীর সাথে চোখাচোখি হয়ে গেল। সালমান শামিল চোখ নামিয়ে নিল। গম্ভীর মুখ সালমান শামিলের। বলল, আমি বোধহয় আপনাদের বিপদে ফেললাম!
ঠোঁটে একটা সূক্ষ্ম হাসি ফুটে উঠল সিস্টার মেরীর, এখন তাহলে কি করতে হবে আমাদের?
উত্তরের ধরনে সালমান শামিল চোখ তুলে তাকাল মেরীর দিকে। আবার চোখাচোখি হয়ে গেল। মেরীর ঠোঁটের সেই সূক্ষ্ম হাসিটি সালমান শামিল দেখতে পেল। চোখ নামিয়ে নিল সালমান শামিল।
মেরীর প্রশ্নের কোন জবাব দিল না।
মেরীই হেসে বলল, উত্তরটা আজকের মত পেন্ডিং থাক সালমান সাহেব। আপনি ঘুমান।
বলে বেরিয়ে যেতে যেতে বলল, টেবিলে নরমাল পানির বোতল থাকল। প্রয়োজন হলে এ পানিই খাবেন, ঠান্ডা পানি নয়। আর দরজা খোলাই থাকবে। দু’রুম ওপারে আমি থাকছি। প্রয়োজন হলে বিনা দ্বিধায় ডাকবেন।
বেরিয়ে গেল সিস্টার মেরী।
পরদিন সকাল।
সালমান শামিল ঘরে বসেই নাস্তা করছিল। সামনে চেয়ারে বসেছিল লেডি জোসেফাইন। তাকিয়ে সালমান শামিলের দিকে। একসময় সে বলে উঠল, তুমি ভাল ছেলে, ভাল ছাত্র, তুমি কেন রাজনৈতিক আবর্তে জড়ালে?
–বিশ্বাস করুন আম্মা, আমি কারও এক কণা ক্ষতি করিনি। আমি শুধু মজলুম স্বজাতিকে বাঁচাতে চেয়েছিলাম, তাদের আত্মরক্ষার, স্বার্থের পক্ষে দাঁড়িয়ে ছিলাম।
–কিছু বুঝি না বাছা, হোয়াইট ওলফও তো জাতির স্বার্থে কাজ করছে।
–কিন্তু জালেম কে, মজলুম কে সেটা দেখুন। সিস্টার মেরী একটু আগে মায়ের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল। তার হাতে সালমান শামিলের সদ্য ইস্ত্রি করা প্যান্ট, সোয়েটার ইত্যাদি। তার চেহারা কিছু উদ্বিগ্ন। সালমান শামিলের কথা শেষ হলে সে মাকে লক্ষ্য করে বলল, মা ওরা এদিকে খোঁজে এসেছে। প্রত্যেক বাড়ি দেখছে। এখানেও এসেছিল—
–তুমি তাদের কি বলেছ? মেরীকে কথা শেষ করতে না দিয়েই উদ্বিগ্ন কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করল লেডি জোসেফাইন।
–আমাদের বাড়ি দেখতে চায় নি, শুধু জিজ্ঞেস করেছে এরকম লোক এদিকে আসার খবর তারা জানে কিনা। আমি বলেছি, জানি না।
–বেশ করেছিস মা, স্পষ্ট জবাবই ভাল। ওরা এখন প্রতিহিংসায় উন্মত্ত।
বলে লেডি জোসেফাইন নাস্তার খালি প্লেটটা নিয়ে চলে গেল। তার মুখটা ম্লান, উদ্বিগ্ন সে।
সিস্টার মেরীর মুখটাও ম্লান।
তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে সালমান শামিল বলল, একটা ভুল হয়েছে মিস মেরী, আপনারা রাত্রে খাইয়ে দেবার পর চলে যাবার মত শক্তি আমার হয়েছিল। আরাগাত পর্বতের অঞ্চলটা আমি চিনি। রাত্রে আমবার্ড দুর্গ হতে আমি হয়তো পালাতে পারতাম। আপনাদের অসুবিধার কথা আমি বুঝতে পারছি।
ম্লান হাসল সিস্টার মেরী। বলল, হোয়াইট ওলফকে আপনি ভাল করে জানেন না। এই আমবার্ড দুর্গের কথাও জানেন না। এখান থেকে পালাবার একটাই পথ, কিন্তু ওখান দিয়ে একটা পিঁপড়াও পালানো অসম্ভব।
–ওরা যদি আপনাদের বাড়ি সার্চ করতো?
–আপনি কি ভয় করছেন?
–আমি কাপুরুষের মত যেমন মরতেও চাইনা, তেমনি মৃত্যু এলে বীরের মত তাকে আলিঙ্গনও করতে পারি। আমি ভাবছি আপনাদের সম্মানের কথা।
–মা বলেছেন না, ঈশ্বর আছেন!
একটা ঢোক গিলেই আবার সে প্রশ্ন করল, আচ্ছা বলুন তো, আমাদের ঈশ্বর, আর আপনাদের আল্লাহর মধ্যে কি কোন বিরোধ আছে?
–যিশু যাকে ঈশ্বর বলতেন, তিনিই আমাদের আল্লাহ।
–তাহলে এই বিরোধ কেন? কেন এই সংঘাত?
আমি ভ্যাটিকানে ধর্মতত্ত্ব নিয়েই পড়ছি। কিন্তু আমি দেখছি, ধর্মতত্ত্ব বিরোধ কমছে না, বাড়ছেই।
সিস্টার মেরী চেয়ারে বসে পড়েছিল। তার কোলের উপর সালমান শামিলের কাপড়।
–আপনি যে ধর্মতত্ত্ব পড়ছেন তা আপনাদের ঈশ্বর তৈরি করেননি, করেছেন মানুষ তার মনের মত করে।
–আপনাদের ধর্মতত্ত্বও কি তাই?
–না মিস মেরী, আমাদের কোরআন অবিকৃত আছে, রাসূল(সাঃ)-এর বাণীও অবিকৃতভাবে বাছাই করা হয়েছে। এই কোরআন ও হাদীসের বাইরে আমাদের ধর্মতত্ত্ব নেই।
–আপনার মত করে আমিও যদি এ মতকে চ্যালেঞ্জ করি এবং এমনকি বলি যে, আপনি যাকে ঈশ্বরের বাণী বলছেন তা ঈশ্বরের বাণী নয়।
সিস্টার মেরীর ঠোঁটে হাসি।
–আমি আপনার সাথে তর্কে যাবো না মিস মেরী। শুধু এতটুকুই বলব, নিরপেক্ষ ইতিহাস, নিরপেক্ষ বিবেক, নিরপেক্ষ অনুসন্ধান একবাক্যে আমার কথা সমর্থন করছে। তাছাড়া দেখুন, কোরআন যে আল্লাহর বাণী তার বড় প্রমাণ হল, একমাত্র কোরআনই কিন্তু মুসাসহ সব নবী-পয়গম্বরের প্রতি সুবিচার করেছে, একান্ত আপন করে দেখেছে। মানুষের রচিত গ্রন্থে এ সুবিচার ও নিরপেক্ষতা অসম্ভব ছিল।
–আপনার যিশুকে আপন করে নিলে, মেনে নিলে, আর বিরোধ থাকে কই?
–মেনে নেওয়ার অর্থ অনুসরণ করা নয়।
–তাহলে বিরোধ থেকেই যায়।
–সত্য একটাই, এক সত্যের উপর সবাই না এলে বিরোধ থাকবে।
–সত্য একটা ঠিক, সত্য হওয়ার দাবি তো একটা নয়।
–দাবি তো অনেক থাকবেই, কিন্তু বিচার-বিবেচনায় সত্য একটাই নির্দিষ্ট হয়।
–বিচার-বিবেচনার মানদন্ড যদি এক না হয়?
–যদি দমন-নিয়ন্ত্রণ না করা হয়, তাহলে মানুষের বিবেকের রায় কিন্তু দুই হয় না মিস মেরী।
–অর্থাৎ আপনি বলছেন, বিবেকের স্বাধীন রায় মানলে সে রায় যিশু নয়, আপনাদের নবী মুহাম্মদের দিকে যাবে?
–আচ্ছা আপনিই বলুন, ইব্রাহিম(আঃ)-এর মত মহান নবী হযরত মুসা(আঃ) আসার পর কার্যকর ছিলেন? ছিলেন না। আবার মুসা(আঃ) কি যিশু নবী হওয়ার পর কার্যকর ছিলেন? ছিলেন না। তাহলে হযরত মুহাম্মদ(সাঃ) আসার পর যিশুর দ্বীন কিভাবে কার্যকর থাকতে পারে?
সিস্টার মেরী সংগে সংগেই কোন উত্তর দিল না। তার চোখে বিস্ময়, আনন্দও। বেশ কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর বলল, আপনার মত অসাধারণের সাথে সাধারণ আমি বুদ্ধি-বিতর্কে পারব না। আপনি যে দৃষ্টিকোণ তুলে ধরেছেন, সেভাবে আমি বিষয়টাকে কখনও দেখিনি, জবাব দেবার আগে আমাকে অনেক ভাবতে হবে।
থামল সিস্টার মেরী। মুগ্ধ তার দৃষ্টি। একটু থেমে কোল থেকে সালমান শামিলের কাপড় তার দিকে এগিয়ে দিতে দিতে বলল, আপনার কোট কোথায়, জুতা নেই কেন?
-বন্দীখানার চত্ত্বরে দাঁড়ানো তোমাদের জাতীয় বীর শামিউনের মূর্তির মাথায় আছে টেলিভিশন ক্যামেরার ৫টি চোখ। ওর মাথায় কোটটি চাপিয়ে দিয়ে পালিয়েছি। আর পাইপ বেয়ে তিনতলায় উঠার সময় জুতা খুলে ফেলেছি।
-আপনি অসাধারণ ভাল ছাত্র। সেই সাথে এসব দুঃসাহসিক কাজের ট্রেনিং নিলেন কোথায়?
-সময়ের প্রয়োজনই মানুষকে সব শেখায়।
-আমাদের জাতীয় বীর শামিউন সম্পর্কে আপনার মত কি?
-আমার মতের প্রয়োজন নেই, আপনারা শামিউনের যে রূপ এঁকেছেন তাতেই সব স্পষ্ট।
-কি রূপ সেটা?
সালমান শামিলের ঠোঁটে এক টুকরো হাসি ফুটে উঠল। বলল, বন্দীখানার চত্ত্বরে শামিউনের মূর্তির চারদিক ঘিরে ২৭টি প্লেটে ২৬টি নরমুন্ডু সাজানো আছে। এই ২৬টি মুন্ডু আমাদের ২৬জন সম্মানিত নেতার। তাদের কিডন্যাপ করে, হত্যা করে, তাদের মাথা শামিউনকে অর্ঘ্য দেয়া হয়েছে। একটি প্লেট আমার মাথার জন্য খালি আছে।
একটু থামল সালমান শামিল। ঢোক গিলল। তারপর বলল, বল—-বলুন, শামিউনের কি রূপ এখানে তুলে ধরা হয়েছে? মুসলমানদের রক্তপানকারী হিসেবে নয় কি?
শেষ দিকে সালমান শামিলের কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে এল।
সিস্টার মেরীর চেহারাটাতেও পরিবর্তন ঘটল। প্রথমে বিস্ময়, তারপর বেদনার একটা ছায়া তার মুখ ঢেকে দিল।
সালমান শামিল থামার পর একটু নীরবতা।
সিস্টার মেরী মুহূর্তের জন্যে নিজের দৃষ্টিটা একটু নিচের দিকে নামিয়ে নিল। তারপর বলল, ‘বলুন’ নয়, ‘বল’ ঠিক আছে। আমাকে ‘তুমি’ বলবেন, ‘আপনি’ নয়।
আবার মুখ নামিয়ে নিল সিস্টার মেরী। একটু পরে মুখ তুলে বলল, যা বললেন তা সব ঠিক?
-নরমুন্ডুগুলির যেটি আমাদের যে নেতার, তার নামও লেখা আছে মাথার কংকালে। আর যাকে যে তারিখে কিডন্যাপ করা হয়েছে, সে ক্রম অনুসারেই মাথাগুলি সাজানো।
আবার মাথা নিচু করল, নীরব হল সিস্টার মেরী। বেদনায় মুখটা তার ম্লান। ভাবছে সে। অনেকক্ষণ পর সে বলল, আচ্ছা ওরা যে বলে, আত্মরক্ষার জন্যেই আমাদের এই আক্রমণ। আমরা মুসলমানদের না তাড়ালে ওরাই আমাদের তাড়াবে, আমরা ওদের না মারলে ওরাই আমাদের মারবে যেমন অতীতে গণহত্যা চালিয়েছে, গণউচ্ছেদ চালিয়েছে ওরা বার বার। এ অভিযোগের কি জবাব?
হাসল সালমান শামিল। বলল, মেরী, ভ্যাটিকানের থিয়োলজি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাসতো আবশ্যিক সাবজেক্ট। কি বলে তোমার সেই ইতিহাস?
সিস্টার মেরী ম্লান হেসে বলল, সে ইতিহাস কমবেশি হোয়াইট ওলফ যা বলছে, সে কথাই বলে। বিশেষ করে দু’টো গণহত্যার কথা নিয়ে ইতিহাস খুব বেশি আলোচনা করেছে। একটি আর্মেনিয়া তুরস্কের অংশ থাকা কালে ১৮৯৫ সালে তুরস্কের সুলতান আব্দুল হামিদ কর্তৃক আর্মেনীয় খৃস্টান জনগণের উপর হত্যা অভিযান, অপরটি হল ১৯১৬ সালে আর্মেনীয় জনপদে তুর্কি সৈন্যদের গণহত্যা।
সালমান বলল, ইসলামের নীতি ও শিক্ষা এবং কোন স্বেচ্ছাচারী রাজা-বাদশাহ নিছক তার রাজ্যের স্বার্থে যে কর্ম করেন তা এক নয় মেরী। তবু আমি বলব, তুমি যে ঘটনা দু’টোর কথা বললে তা ঘটনা নয়, অনেক ঘটনার অবশ্যম্ভাবী পরিণতি মাত্র। বিদেশি শক্তি তুরস্কের অংশ আর্মেনিয়া নিয়ে যে ষড়যন্ত্রে মেতেছিল তারই ফল এটা।
একটু থামল সালমান শামিল। তারপর আবার বলতে শুরু করল, তুর্কি শাসনে আর্মেনিয়াতে খৃস্টান ও মুসলমানরা শান্তিতেই বসবাস করছিল। তুরস্কের বৈরী ইউরোপের মিত্রশক্তি তুরস্কের সংখ্যালঘু খৃস্টানদের নিয়ে তুরস্ককে যে অব্যাহত যন্ত্রনা দিয়ে এসেছে, তারই একটা অংশ হিসাবে ১৮৭৮ সালে বার্লিন চুক্তির সুযোগে তারা আর্মেনিয়াতে নাক গলায়। তাদের কুমন্ত্রণা ও উস্কানির ফলে ‘দাসনাক্ত সুতুন’ নামে জেনেভাভিত্তিক একটি সন্ত্রাসবাদী সংগঠন আর্মেনিয়ায় হত্যা-সন্ত্রাস চালাতে শুরু করে। হত্যা-সন্ত্রাস ব্যাপক হয়ে উঠলে ১৮৯৫ সালে সুলতান আব্দুল হামিদ ‘দাসনাক্ত সুতুন’ এর বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনায় বাধ্য হন। খৃস্টান ঐতিহাসিকরা এরই নাম দিয়েছে গণহত্যা। দ্বিতীয় ঘটনার পটভূমি আরও মর্মান্তিক। ১৯১৩ সালের লন্ডন চুক্তির মাধ্যমে ইউরোপের মিত্রশক্তি নব্যতুর্কিদেরকে আর্মেনিয়ার খৃস্টানদের পৃথক বাহিনী গড়ার সুযোগ দিতে বাধ্য করে। রুশদের কাল হাত এই বাহিনী গঠনে সহায়তা করে। পরে ১৯১৬ সালে রাশিয়া আর্মেনিয়া দখল করে বসে এবং আর্মেনিয়ার খৃস্টানদের সাথে নিয়ে মুসলমানদের উপর গণহত্যা চালায়। এই পরিবেশে পরাজিত তুর্কি সৈন্যরা পালাবার সময় প্রতিরোধ হিসাবে খৃস্টান জনপদে হত্যাকান্ড চালায়। যুদ্ধ পরিবেশের এই হত্যাকান্ড আর শান্তিপূর্ণ পরিবেশে হোয়াইট ওলফের ঠান্ডা মাথায় হত্যাকান্ড এক জিনিস নয় মেরী।
সিস্টার মেরী মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সালমান শামিলের দিকে। সালমান কথা শেষ করলে বলল, ঘটনা দু’টির এই পটভূমি আমাদের ইতিহাসে নেই।
-আমি যে বিবরণ দিলাম, তা ইউরোপীয় খৃস্টান ঐতিহাসিকের বইতেই পড়েছি।
-আপনি বিজ্ঞানের সিরিয়াস বিষয়ের ছাত্র, এই ইতিহাস পড়ার সময় পান কখন?
-ইতিহাস যে জানে না, সে জাতির সচেতন সদস্য হতে পারে না, জাতিকে সে প্রকৃতপক্ষে কিছু দিতেও পারে না মেরী।
-জাতির জন্যে আপনি বুঝি খুব চিন্তা করেন?
-জাতির যখন এমন বিপদ তখন না ভেবে উপায় কি?
-জীবন-মৃত্যুর এ জটিল আবর্ত। এতে আপনি জড়িয়ে পড়েছেন। কিন্তু প্রতিভার কি একটা ভিন্ন দাবি নেই আপনার কাছে?
-আছে। সেটা আমার একটা লক্ষ্যের ব্যাপার। আর জাতির প্রতি যেটা, সেটা আমার দায়িত্ব। দু’টোই আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তবে আজ প্রথমটির সাথে আমার অস্তিত্বের প্রশ্ন জড়িত নেই, দ্বিতীয়টির সাথে আছে।
সিস্টার মেরীর মুগ্ধ দৃষ্টি সালমান শামিলের মুখে নিবদ্ধ। বলল, অর্থাৎ প্রতিভাবান সালমান শামিলের চেয়ে দায়িত্বশীল সালমান অনেক বড়।
একটু থামল মেরী। তারপর আবার শুরু করল, আমি এবং আমার বয়সের আরো যাদের দেখি, মনে করি সিরিয়াস ভাবনার সময় আমাদের এখনো আসেনি, কিন্তু আপনি দায়িত্বের এই শিক্ষা পেলেন কোত্থেকে?
–আমার ধর্মগ্রন্থ থেকে। সেখানে পিতা-মাতা, আত্বীয়-স্বজন, ধন-সম্পদ, বাড়ি-ঘর অর্থাৎ সকল প্রিয় জিনিস থেকে আল্লাহ, তার রাসূল(সাঃ) এবং আল্লাহর পথে সংগ্রামকে প্রিয়তর করে নিতে বলা হয়েছে।
সালমান শামিল থামল। মেরী কোন কথা না বলে মাথা নিচু করল। কিছুক্ষণ পর মাথা না তুলেই ধীরে ধীরে বলল, জানেন, আমাদের তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের বৃদ্ধ স্যারকে লাইব্রেরীতে একদিন আমি প্রশ্ন করেছিলাম, ধর্মীয় অবক্ষয় এত ব্যাপক কেন? কেন চার্চগুলো বিবর্ণ হয়ে যাচ্ছে, এমনকি বিক্রি হয়ে যাচ্ছে? তিনি অনেকক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থেকে বলেছিলেন, বেটি আরও পড়, বুঝবে। আমাদের ধর্ম সবদিক থেকে ‘লিভিং রিলিজিওন’ এর দায়িত্ব পালন করতে পারছে না, যেমন পারছে মোহামেডান ধর্ম।
এই সময় দেওয়াল ঘড়িতে ঢং ঢং করে দশটা বাজার শব্দ হলো।
সিস্টার মেরী প্রসঙ্গ পাল্টিয়ে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল, আপনার ওষুধ খেতে হবে।
বলে উঠে দাঁড়াল।
টেবিল থেকে ক্যাপসুল নিয়ে সালমান শামিলের সামনে দাঁড়াল। তার ডান হাতে ক্যাপসুল, আর বাম হাতে গ্লাস। বলল, হা করুন।
সালমান শামিল বলল, না না মেরী, গ্লাস ক্যাপসুল আমাকে দাও। তুমি অনেক কষ্ট করেছ। এটুকু কাজ আমাকে করতে দাও।
–ইস, কি যে কষ্ট করেছি!
–কি করনি, মুখে বমন করে দিয়েছি, এ দুঃখ আমার চিরদিন মনে থাকবে।
সিস্টার মেরী গম্ভীর হলো। বলল, দুঃখ, আনন্দ সবার কাছে একরকম নয়, এটা রিলেটিভ জিনিস। একজনের কাছে যেটা দুঃখের স্মৃতি, আরেক জনের কাছে সেটা সুখকর স্মৃতিও হতে পারে মনে রাখবেন।
বলে সিস্টার মেরী ক্যাপসুল এবং গ্লাস বিছানার উপর রেখে বেরিয়ে এল ঘর থেকে।
সালমান শামিলের ঘর থেকে নিজের ঘরে গিয়ে ঢুকল মেরী। বিছানায় গিয়ে বালিশ টেনে নিয়ে মুখ গুঁজল সে।