৯. ককেশাসের পাহাড়ে

চ্যাপ্টার

আহমদ মুসা জীপে একা। নিজেই গাড়ি ড্রাইভ করছিল। তার জীপ গিয়ে প্রবেশ করল ইনস্টিটিউট অব অ্যাডভানসড নিউক্লিয়ার ফিজিকস-এর প্রশাসনিক ভবনের গাড়ি বারান্দায়। এ ভবনেরই নিচের তলায় ইনস্টিটিউট ডিরেক্টর পল জনসনের অফিস।
গাড়ি থামিয়ে গাড়ি থেকে নামল আহমদ মুসা।
গাড়ি বারান্দা থেকে উপরে বারান্দায় উঠার মুখে সিঁড়ির পাশে বসেছিল উর্দি পরা একজন এ্যাটেনডেন্ট।
সুন্দর শ্মশ্রুমন্ডিত অভিজাত চেহারার একজন যুবককে গাড়ি থেকে নামতে দেখে এ্যাটেনডেন্ট উঠে দাঁড়াল। সে একবার তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করল যুবকটিকে। অস্বাভাবিক কিছু খুঁজে পাওয়ার মত তার কপালটা হঠাৎ যেন কুঞ্চিত হয়ে উঠল।
আহমদ মুসা এ্যাটেনডেন্টের দিকে তাকিয়েই সিঁড়ি দিয়ে বারান্দায় উঠে আসছিল। এ্যাটেনডেন্টের চমকে উঠা দৃষ্টি এবং কপালের কুঞ্চন তার ভালো লাগল না।
বারান্দায় উঠে আহমদ মুসাই তাকে জিজ্ঞেস করল, ডঃ পল জনসনের অফিস কোনটা?
-স্যারের সাথে দেখা করবেন? এ্যাটেনডেন্ট পাল্টা প্রশ্ন করল।
-হ্যাঁ।
-তাহলে একটু অপেক্ষা করুন। স্যারকে বলে আসি। আপনার কি পরিচয় বলব?
-বলবেন, একজন সাধারণ মানুষ, আহমদ।
এ্যাটেনডেন্ট চলে গেল।
উত্তর-দক্ষিণ লম্বা বারান্দা। বারান্দায় উঠে লম্বালম্বি তাকালে যে দরজাটা চোখে পড়ে, সেটাই ডঃ পল জনসনের অফিস। এ্যাটেনডেন্ট নব ঘুরিয়ে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল। মনে হল ভেতর থেকে কোন সংকেতের অপেক্ষা করল। তারপর ঢুকে গেল।
মুহূর্ত কয়েক পরে সে বেরিয়ে এল।
আহমদ মুসাকে ইশারা করল যাওয়ার জন্যে।
নব ঘুরিয়ে আহমদ মুসা প্রবেশ করল ঘরে।
গোটা মেঝে পুরু সাদা কার্পেটে মোড়া। দেওয়ালেও সাদা কার্পেটিং। ধূসর টেবিল সামনে নিয়ে বসে আছেন লম্বা-চওড়া, শক্ত-সমর্থ ডঃ পল জনসন। তার সাদা মুখের উপর মাথায় সাদা চুলের গুচ্ছ। সব মিলিয়ে পবিত্র পরিবেশ।
আহমদ মুসা যখন ঘরে ঢুকল, মুখ তুলল ডঃ পল জনসন। তার স্বচ্ছ সারল্যভরা মুখের অভ্যন্তরে তার যে হৃদয় তাকেও মনে হল সাদা। আহমাদ মুসা খুশি হলো, প্রকৃতই একজন জ্ঞান-সাধকের মুখোমুখি সে।
ডঃ পল জনসন উঠে দাঁড়িয়েছিল। আহমদ মুসা তার সাথে হ্যান্ডশেক করল। ডঃ জনসন ইংগিত করল আহমদ মুসাকে বসার জন্যে।
আহমদ মুসা বসল, তারপর বসল পল জনসন। ডঃ জনসনের মুখ স্বাভাবিক, তাতে কোনই ভাবান্তর নেই। অপরিচিত কে এল, কেন এল এ নিয়ে তার যেন কোন মাথা ব্যথা নেই। শুধু আহমদ মুসার মুখে তার দৃষ্টিটা কয়েক মুহূর্ত যেন আঠার মত আটকে ছিল।
আহমদ মুসাই প্রথমে কথা শুরু করল। বলল, বিনা নোটিশে এসে আপনাকে বিরক্ত করার জন্যে দুঃখিত।
সামনের একটা ফাইল বন্ধ করতে করতে ডঃ পল জনসন বলল, বিনা প্রয়োজনে এসেছ?
না!
-তাহলে একথা কেন? প্রয়োজনে মানুষ তো মানুষের কাছেই যাবে।
-এভাবে চিন্তা আমরা কয়জন করি?
-কেউ করে না বলে তুমি করবে না, আমি করবো না কেন?
-ঠিক বলেছেন। এক, দুই করে ব্যক্তিরা যদি ভালো কাজ শুরু করে, তাহলে একদিন সেটাই সামাজিক হয়ে যাবে।
ডঃ জনসন একবার চোখ তুলে আহমদ মুসার দিকে চেয়ে চেয়ারে গা এলিয়ে দিয়ে চোখ বুজল। এবং স্বগতঃই যেন উচ্চারণ করতে লাগলঃ জ্ঞান এবং মানুষ স্রষ্টার সম্পদ, আর দুনিয়ায় যা কিছু আছে সব মানুষের সম্পদ। মানুষকে দুনিয়ার খিলাফত দানের অর্থ তো এটাই। কিন্তু খলিফারা যখন নিজের মালিক নিজে বনে গেল, সব জ্ঞানের অধিপতি যখন নিজেই হয়ে দাঁড়াল এবং খিলাফতকে যখন মনে করল নিজের সার্বভৌম রাজত্ব, তখনই তো মানুষের সমাজ হয়ে গেল অমানুষের সমাজ। একথাগুলো তোমাদের ধর্মই সবচেয়ে বেশি, সবচেয়ে স্পষ্ট করে বলে। তাহলে কেমন করে তুমি মনে কর যে, এক, দুই করে এগুলে সমাজ আপনাতেই একদিন ভালো হয়ে যাবে? সাড়ে তেরশ’ বছরে তো হয়নি!
আহমদ মুসার চোখে রাজ্যের বিস্ময়। কিন্তু সে বিস্ময় চেপে প্রশ্নের উত্তর দিতেই সে প্রথমে এগিয়ে এল। বলল, জনাব, এক, দুই করে সমাজ ভালো করা সহজ নয়, একথা ঠিক, সাড়ে তেরশ’ বছরেও এমন এক নিরংকুশ মানব সমাজ গড়া যায় নি, একথাও ঠিক। কিন্তু এক, দুই করেই যে একদিন সুন্দর, সুস্থ মানুষের সমাজ গড়া হয়েছিল এটাও সত্য। আমাদের নবী(সাঃ) অন্ধকার সমাজে ছিলেন একটি মাত্র এক আলোর মানুষ। কিন্তু এক, দুই করে তেইশ বছরের চেষ্টায় তিনি এক আলোর সমাজ গড়েছিলেন। দীর্ঘ ৪০ বছর যে সমাজ তার পূর্ণ দীপ্তি নিয়ে টিকে ছিল এবং তখনকার অর্ধেক পৃথিবী সে করায়ত্ত করেছিল। তারপর প্রাচুর্যের পথ ধরে আপনি যে তিনটি রোগের কথা উল্লেখ করেছেন, সেই রোগ ধীরে ধীরে ক্ষমতাসীনদের গ্রাস করতে লাগল। শাসনদন্ড ইসলামের হাত ছাড়া হলো, এক শ্রেণীর মুসলমান শাসনদন্ডের মালিক হলেও যারা, আপনি যা বলেছেন, নিজে নিজের মালিক বনে সব জ্ঞানের উৎস নিজেই হয়ে দাঁড়াল এবং খিলাফতকে পরিণত করলো তার সার্বভৌম রাজত্বে। এইভাবে গোটা মানব সমাজ আজ পুনরায় অন্ধকারে নিমজ্জিত। এই অবস্থায় আমাদের আজ হয় হতাশার জগদ্দল পাথর বুকে নিয়ে অন্ধকারে ডুব দিতে হবে, অথবা জ্বালতে হবে এক, দুই করে আলোর মশাল ঠিক মহানবীর পথ ধরে, নবীদের অনুকরণে। মহানবীর মতই যদি এ আলোকন প্রচেষ্টা চলে, তাহলে আলোর সমাজ আবার কায়েম হবে। এ পথ দীর্ঘ, কষ্টকর, কিন্তু এর কোন বিকল্প নেই।
ডঃ পল জনসন চেয়ারে গা এলিয়ে চোখ বন্ধ করে অনড় মনোযোগের সাথে কান পেতে ছিল আহমদ মুসার দিকে। আহমদ মুসার কথা শেষ হলে ডঃ পল জনসন ঐভাবে থেকেই প্রশ্ন করল, বৎস, যিশুর সেই হাওয়ারী, মুহাম্মদের সেই সাহাবীদের মত আলোক-সন্তানদের তুমি পাবে কোথায়?
আহমদ মুসা বলল, জনাব, গত সাড়ে তেরশ’ বছরের ইতিহাসে যিশুর হাওয়ারী, মহানবী(সাঃ) এর সাহাবীদের মত আলোক সন্তানদের আমরা বার বার দেখেছি, যাদের ত্যাগ ও কোরবানীর অমর গাঁথায় ইতিহাস ভরপুর। এখনও তারা আছে। শুধু প্রয়োজন সংগঠন এবং সংগ্রামের যা অতীতে প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে হয়নি।
ডঃ পল জনসন ধীরে ধীরে অনেকটা স্বগতঃ কণ্ঠে বলল, বৎস তুমি বড় বিপদে, অতীতে এমন জ্ঞান যারা লাভ করেছে তারা বিপদগ্রস্ত হয়েছে। তারপর সোজা হয়ে বসে মুখে হাসি টেনে বলল, বৎস, তাহলে এখন তোমার মনে নিশ্চয় কোন দুঃখ নেই–প্রয়োজনে মানুষ মানুষকে বিনা নোটিশেই বিরক্ত করতে পারে।
আহমদ মুসার মুখেও হাসি ফুটল। অন্তরও তার স্নিগ্ধ হল ডঃ জনসনের আন্তরিকতার স্পর্শে। আহমদ মুসা এবার তার আসল কথায় আসতে চাইল। বলল, জনাব, একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আমি আপনার কাছে এসেছি।
–সালমান শামিলের খোঁজ চাও, এই তো?
আহমদ মুসার চোখ দু’টি বিস্ময়ে বিস্ফারিত হলো। বলল, জনাব, আপনি কি করে জানলেন যে আমি এই প্রয়োজনেই এসেছি?
–বিজ্ঞানে অনেক স্বতঃসিদ্ধ বিষয় আছে। ঠিক তেমনি স্বতঃসিদ্ধ যে, অপরিচিত একজন মুসলিম যুবক সালমান শামিলের খোঁজেই মাত্র আমার কাছে আসতে পারে।
–জনাব, আমরা আপনার সাহায্যপ্রার্থী।
ডঃ পল জনসন আবার চেয়ারে গা এলিয়ে চোখ বুজল। যেন আপনার মধ্যে সে হারিয়ে গেল।
অনেকক্ষণ পর ধীরে ধীরে বলল, এমনি করে সাহায্য চেয়েছিল সোফিয়া এ্যাঞ্জেলাও। কান্নায় সে ভেংগে পড়েছে বার বার, সালমান শামিলকে খোঁজ করার জন্যে আমার সাহায্য চেয়েছে যেন অতুল ক্ষমতা আমার।
থামল ডঃ পল জনসন।
–সোফিয়া এ্যাঞ্জেলা কে জনাব?
–রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতা সেন্ট জর্জ সাইমনের মেয়ে।
–সেন্ট জর্জ সাইমনের মেয়ে? সালমানের সাথে কি সম্পর্ক তার?
–এ জবাব সোফিয়াই দিতে পারে বৎস।
একটু থেমে আবার বলতে শুরু করল ডঃ পল জনসন, তোমরা আমার সাহায্য চাও, আমি কার সাহায্য চাইব বল তো? আমার অতি প্রিয়, অতি আদরের এক ছাত্রকে আমার বুক থেকে ছিনিয়ে নিয়ে গেছে, আমি কার কাছে বলব, কার সাহায্য চাইব? আমি বৃদ্ধ হয়েছি, আমার দেবার মত কিছু নেই। ওরা যদি আমাকে বিনিময় হিসেবে চাইত, সালমানকে ছেড়ে দিত, আমি খুশি হতাম!
ডঃ পল জনসনের কন্ঠ ভারি। তার সাদা মুখটা ঈষৎ রক্তিম।
ডঃ জনসন নীরব হলো। আহমদ মুসাও কোন কথা বলতে পারলো না। ডঃ জনসনের আবেগ তাকেও অভিভূত করেছে।
অনেকক্ষণ পর আহমদ মুসা বলল, ওরা কত বড়, কত শক্তি ওদের সেটা আমাদের কাছে সমস্যা নয় জনাব, সমস্যা হলো ওদের সন্ধানের কোন সূত্র পাচ্ছি না আমরা।
ডঃ পল জনসন সোজা হয়ে বসল। তার দু’চোখে চাঞ্চল্য। বলল, পারবে ওদের মোকাবিলা করতে?
–পারব!
–জান তুমি, ওরা কত ভয়ংকর, কত শক্তি ওদের?
–জানি জনাব।
–এখান থেকে বের হবার পরই তুমি যদি সালমানের মত আক্রান্ত হও?
–আমি তারই জন্যে প্রস্তুত জনাব।
–কখনও ওদের মুখোমুখি হয়েছ?
–হয়েছি। তিনবার।
–কি ফল হয়েছে?
–দলের কাছে খবর পৌঁছাবার মতও কেউ বাচেঁনি ওদের। তবে ওরা ভয়ংকর তা স্বীকার করি। ওরা মরে, কিন্তু পিছু হটে না।
ডঃ জনসন বিস্ফারিত চোখে চেয়ে থাকল আহমদ মুসার দিকে। কিছুক্ষণ পর বলল, তোমার মধ্যে আগুন আছে তা প্রথমে দেখেই বুঝেছি, তোমার চেহারায়, দৃঢ়তায় অসাধারণত্ব আছে তাও বুঝতে পেরেছি। তোমার পরিচয় কি বৎস?
আহমদ মুসা মুখ নিচু করে ছিল। মুখ তুলল। একটু দ্বিধা করল, তারপর বলল, আপনার কাছে লুকাবার কিছু নেই, আমি মধ্য এশিয়া থেকে এখানে এসেছি আমাদের ভাইদের বিপদের খবর শুনে। আমার নাম আহমদ মুসা।
–আহমদ মুসা? কোন আহমদ মুসা? ফিলিস্তিন, মিন্দানাও, মধ্য এশিয়া বিপ্লবের নায়ক হিসেবে যার নাম খবরে পড়েছি, সেই?
–জ্বি, হ্যাঁ।
মাথা নিচু করল আহমদ মুসা।
ডঃ পল জনসনের চোখে পলক পড়ল না। এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আহমদ মুসার দিকে। বলল এক সময়, কল্যাণের সব প্রতিভা, সব যোগ্যতা আমার কাছে আনন্দের বৎস। আমি তোমাকে স্বাগত জানাচ্ছি। তুমি বিশ্ব-নন্দিত বিপ্লবী, তোমাকে ছাত্রের মত ‘তুমি’ বলেছি, কিছু মনে করনি তো?
–লজ্জা দেবেন না ‘স্যার’। আমি সালমান শামিলের ভাই। আমাকে ‘তুমি’ই বলবেন।
–তুমি আর্মেনিয়ায়, আমার কাছে স্বপ্ন মনে হচ্ছে। আমি এখন আস্থাশীল, তুমি যা বলেছ তা তুমি পারবে।
একটু থেমে আবার বলতে শুরু করল ডঃ পল জনসন, তুমি ওদের সন্ধান পাবার সূত্রের কথা বলেছ। আমি এ নিয়ে কোন সময় মাথা ঘামাইনি। ওদের হাত থেকে উদ্ধার করার কোন চিন্তা করা যেতে পারে বলেও আমি মনে করিনি। তবে এখন চেষ্টা করব, আমার সব সাধ্য দিয়ে তোমাকে সাহায্য করব, এ প্রতিশ্রুতি তোমাকে দিচ্ছি।
–তাহলে এখন উঠি জনাব। বলল আহমদ মুসা।
–উঠবে? ঠিক আছে।
উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে আহমদ মুসা বলল, আমি কি সোফিয়া এ্যাঞ্জেলার সাথে দেখা করতে পারি?
–পার। মেয়েটা খুশি হবে। খুব ভাল মেয়ে। সালমান শামিল অনার্সে ফার্স্ট হয়েছিল, সে সেকেন্ড হয়েছিল।
–জনাব, সোফিয়াদের বাড়ির লোকেশনটা?
–ভিক্টোরী স্কোয়ার থেকে যে রোডটা সোজা পশ্চিমে গেছে তার শেষ মাথায় ৭নং বাড়ি। কিন্তু তোমার সরাসরি যাওয়া কি ঠিক হবে? জর্জ সাইমন অত্যন্ত প্রভাবশালী এবং কট্টরবাদী রাজনীতিক।
–চিন্তা করবেন না জনাব, সবদিক বিবেচনা করেই সেখানে যাব।
‘এখন তাহলে আসি জনাব, আবার আসব’ বলে ঘুরে দাঁড়াল আহমদ মুসা।
আহমদ মুসার দিকে স্নেহভরা চোখে তাকিয়ে ছিল ডঃ পল জনসন।

আহমদ মুসা দরজার নব ঘুরিয়ে দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এল।
দরজা থেকে গাড়ি বারান্দার সবটাই দেখা যায়। সামনে তাকাতে গিয়ে আহমদ মুসার দৃষ্টি এমনিতেই জীপের দিকে গেল। জীপের দিকে চাইতেই দেখতে পেল, সেই এ্যাটেনডেন্ট জীপ থেকে নামছে। আহমদ মুসা জীপের দরজা বন্ধ করে আসেনি।
দৃশ্যটা দেখে চমকে উঠল আহমদ মুসা। মনে পড়ল আসার সময় দেখা এ্যাটেনডেন্টের সেই কুঞ্চিত কপাল এবং চমকে ওঠা চোখের কথা। কৌতুহলবশতঃ খোলা জীপে ওঠা অস্বাভাবিক হয়তো নয়। কিন্তু কুঞ্চিত কপাল এবং চমকে ওঠা চোখের সাথে এটা যোগ করলে ঘটনা তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। হঠাৎ আহমদ মুসার মনে পড়ল, এখান থেকে বেরিয়ে গেটে গিয়েই তো সালমান শামিল কিডন্যাপ হয়েছে। সালমান শামিলের এখানে আসার খবর কে হোয়াইট ওলফকে দিয়েছিল? যে দিয়েছিল সে কি এই এ্যাটেনডেন্ট হতে পারে না? এ্যাটেনডেন্ট হোয়াইট ওলফের কেউ, না চর? সে কি আহমদ মুসাকে চিনতে পেরেছে? চিনতে পারার জন্যেই কি চমকে ওঠা এবং কপাল কুঞ্চিত হওয়া? হোয়াইট ওলফ তার ফটো সব জায়গায় তো পৌঁছাতেই পারে।
মাথা নিচু করে চিন্তা করছিল আহমদ মুসা। সে মনে করল ডঃ পল জনসনকে সব কথা বলেই আসা দরকার।

আহমদ মুসা ফিরে দাঁড়াল। দরজার নব ঘুরিয়ে প্রবেশ করল ঘরে।
দরজা খোলার শব্দে মুখ তুলল ডঃ পল জনসন।
আহমদ মুসা বলল, আসব জনাব?
এস। ডঃ জনসনের চোখে কিছুটা চাঞ্চল্য। আহমদ মুসা এসে বসতেই জিজ্ঞাসা করল, জরুরি কিছু নিশ্চয়?
আপনার এ্যাটেনডেন্ট কেমন?
পুরানো এবং বিশ্বস্ত।
আমার সন্দেহ মিথ্যা না হলে সে হোয়াইট ওলফের লোক অথবা চর।
কি বলছ তুমি?
মনে হয় আমার সন্দেহে ভুল নেই।
সন্দেহের কিছু ঘটেছে?
কিছু ঘটেছে। আমার আরও ধারণা হচ্ছে, সালমান শামিল এখানে আসার খবর সেই হোয়াইট ওলফকে জানিয়েছিল।
তুমি এটা মনে কর?
বলে একটু থেমেই আবার সে শুরু করল, হতে পারে। ওরা সকলেরই মাথা খারাপ করেছে। সে আর বাদ থাকবে কেন।
ও কোথায় থাকে জনাব?
সরেজমিনে সন্ধান করে আরও নিশ্চিত হতে চাও বুঝি? মুখে একটুকরো হাসি।
জ্বি।
এ প্রশাসনিক ভবনের দক্ষিণ পাশে অধ্যাপকদের কোয়ার্টার। এর দক্ষিণ পাশের কোয়ার্টারগুলোতে কর্মচারীরা থাকে। ও থাকে একতলার ২১ নম্বর কোয়ার্টারে।
আপনার বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার একটা ম্যাপ দিয়ে আমাকে সাহায্য করতে পারেন?
‘অবশ্যই’ বলে ডঃ পল জনসন পাশের ড্রয়ার থেকে একটি ছাপানো পুস্তিকা এগিয়ে দিল। বলল, এর মধ্যে ম্যাপ এবং সব তথ্য পাবে।
আহমদ মুসা পুস্তিকাটির পাতা উল্টাল। মাঝখানে দু’পাতা ব্যাপী বিরাট স্কেচম্যাপ। একবার নজর বুলিয়ে নিয়ে বন্ধ করল। বলল, উঠি জনাব।
ডঃ জনসনের কাছে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে এল আহমদ মুসা। এবার দেখল, এ্যাটেনডেন্ট বারান্দায় সিঁড়ির মুখে তার নির্দিষ্ট জায়গায় বসে আছে।
আহমদ মুসা কাছে যেতেই উঠে দাঁড়াল। তার চোখটা নিচু। আহমদ মুসা মনে মনে হাসল। গিয়ে গাড়িতে উঠল।
এক্সপ্লোসিভ ডিটেকটর বের করে গাড়িটা একবার পরীক্ষা করল। না, সেরকম কিছু নেই। গাড়ি স্টার্ট দিয়ে দেখল ঠিক আছে, কম্পিউটার-আই গ্রীন সিগন্যাল দিচ্ছে। তাহলে সে গাড়িতে উঠেছিল কেন? কোন কাগজ-পত্রের সন্ধানে? সে কি সন্দেহ করেছে, না চিনতে পেরেছে? মনে হয় গেটে গেলেই এর উত্তর পাওয়া যাবে। সে চল্লিশ মিনিট কথা বলেছে ডঃ পল জনসনের সাথে। চিনতে পেরে থাকলে খবর দিয়ে এই সময়ের মধ্যে সব আয়োজন করে ফেলা সম্ভব।
আহমদ মুসা গাড়িতে স্টার্ট দিল।
ডঃ পল জনসনের অফিস থেকে সামনের রাস্তা সেন্ট জনপল রোডের দূরত্ব প্রায় ৪শ’ গজের মত। মাঝখানে ছোট আঁকা-বাঁকা রাস্তা, বাগান আর গাছের সারি। এই দূরত্বের মাঝ বরাবর জায়গায় একটা চৌমাথা। এখান থেকে একটা রাস্তা উত্তর দিকে ক্লাস বিল্ডিং এর দিকে, আরেকটা দক্ষিণ দিকে স্টাফ কোয়ার্টারের দিকে গেছে। একটা রাস্তা এডমিনিস্ট্রেটিভ বিল্ডিং থেকে বেরিয়ে এসে মিশেছে চৌরাস্তায়। চৌরাস্তা থেকে চতুর্থ রাস্তাটি সোজা পূর্বদিকে বেরিয়ে, পরে দক্ষিণ দিকে একটু টার্ন নিয়ে গেট পেরিয়ে সেন্ট জনপল রোডে গিয়ে পড়েছে।
রাত তখন ৮টা।
আহমদ মুসার জীপ চত্ত্বরের সেই চৌরাস্তার কাছাকাছি আসতেই আহমদ মুসা দেখতে পেল, চৌরাস্তার ডান পাশে দু’জন লোক মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কথা বলছে। একজন পূর্বমুখী, একজন পশ্চিমমুখী। পশ্চিমজনের চোখ জীপের হেডলাইটের দিকে। ওদের দু’জনের গায়েই ওভারকোট। মাথায় হ্যাট। ওদের পশ্চিমমুখী জনের ওভারকোটের নিচের পকেট থেকে বেরিয়ে আসা ধূসর নলটিকে ওয়াকি টকির নল বলেই আহমদ মুসার মনে হল।
আহমদ মুসার মন ছ্যাঁত করে উঠল। ওরা কি গেটের মূল বাহিনীর অগ্রবাহিনী? তাহলে ওরা জাল পেতেছে?
আহমদ মুসা তার জীপ একেবারে লোকটির গা ঘেঁষে দাঁড় করাল। ওরা প্রথমটায় আঁতকে উঠে এক ধাপ পিছিয়ে গেল। কিন্তু তারপরেই আবার স্থির হলো। ওদের হাত ওভারকোটের পকেটে।
আহমদ মুসা পাশ থেকে তার এম-১০ রিভালভারটি তুলে নিয়ে ওদের ডাকল। ওরা দু’জনেই কাছে এল।
আহমদ মুসার এম-১০ রিভলভারের নলটা গাড়ি দরজার আড়াল থেকে বেরিয়ে ওদের মুখোমুখি হলো।
আহমদ মুসা দ্রুত বলল, দেখ আমি অযথা খুনো-খুনি পছন্দ করি না। তোমাদের দু’জনের রিভলভার এবং ওয়াকি টকি দু’টো আমাকে—-
আহমদ মুসার কথা শেষ হবার আগেই বিদ্যুৎ বেগে ওদের হাত কোটের পকেট থেকে বেরিয়ে এল। কাল চকচকে রিভলভার। কিন্তু তাদের রিভলভারের নল আহমদ মুসা পর্যন্ত উঠে আসার আগেই আহমদ মুসার সচেতন, ক্ষিপ্র তর্জনী এম-১০-এর ট্রিগারে চেপে বসল। নিঃশব্দে বেরিয়ে গেল মেশিন পিস্তলের এক ঝাঁক গুলি। সাইলেন্সার লাগানো ছিল, একটুও শব্দ হলো না। লাশ দু’টিও নিঃশব্দে রাস্তার পাশে ছোট সুন্দর ফুলগাছগুলোর উপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেল।
এ সময় উত্তর দিক থেকে ছুটে আসা পায়ের শব্দ পাওয়া গেল। আহমদ মুসা মুখ সরিয়ে দেখল, চৌমাথার ওপার থেকে দু’জন ছুটে আসছে। তাদেরও পকেটে হাত। আহমদ মুসা ওদের হাতে পিস্তল না দেখে বুঝল, গুলির শব্দ ওরা পায় নি, সাথীদের পরিণতিও জানতে পারে নি। জীপ দাঁড় করিয়ে সাথীদের সাথে কি করছে সেই খবর বোধহয় নিতে আসছে ওরা।
ওরা জীপের কাছাকাছি আসতেই আহমদ মুসা জীপের জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে বলল, দেখ আমি তোমাদের কিছুই বলব না, তোমাদের পকেটের রিভলভার এবং ওয়াকি টকি ঐ পেছন দিকে বাগানে ছুঁড়ে ফেলে দাও। আমি চলে———
এবারও আহমদ মুসার কথা শেষ করতে ওরা দিল না। বিদ্যুৎ গতিতে ওরা পা পেছনে ছুঁড়ে দিয়ে উপুড় হয়ে মাটিতে শুয়ে পড়ল। আর সঙ্গে সঙ্গেই দু’টি গুলি ছুটে এল। ওরা অদ্ভুত কায়দায় শুয়ে পড়তে পড়তেই রিভলভার বের করে পজিশন করে নিয়েছিল। ওদের একটা গুলি দরজার ডান পাশের উপরের কোণটায় গিয়ে আঘাত করল। আরেকটা গুলি ৪৫ ডিগ্রি এ্যাংগেলে জানালা দিয়ে প্রবেশ করে গাড়ির ভেতরে ছাদে গিয়ে বিদ্ধ হলো। আহমদ মুসা সিটের সাথে সেঁটে না থাকলে গুলিটা আহমদ মুসার মাথার উপরের অংশ উড়িয়ে দিত।
আহমদ মুসার এম-১০ থেকেও সঙ্গে সঙ্গে গুলি বৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু তারা শুয়ে পড়ার ফলে প্রথম দিকের গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। কিন্তু তার পরেই এম-১০ এর নল নিচে নেমে যায়। ঝাঁঝরা হয়ে যায় ওদের শুয়ে পড়া দেহ।
আহমদ মুসা দ্রুত জীপের মুখ ঘুরিয়ে নিল। স্টাফ কোয়ার্টারের দিকে। সোজা গেট দিয়ে বেরুতে গিয়ে নতুন হাঙ্গামায় সে পড়তে চায় না। তার সময়ের মূল্য অনেক। এখন তার লক্ষ্য সোফিয়া এ্যাঞ্জেলার বাড়ি। এদের সাথে শক্তি পরীক্ষার সময় সামনে আসছে।
আহমদ মুসা বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যাপে চোখ বুলাতে গিয়ে দেখেছিল, স্টাফ কোয়ার্টারমুখী রাস্তা দিয়ে দক্ষিণ দিকে এগিয়ে সেন্ট জনপল রোডে পড়ার আগে আরও দু’টো গেট পাওয়া যাবে।
আহমদ মুসার জীপ তীর বেগে এগিয়ে চলল স্টাফ কোয়ার্টারের রাস্তা ধরে দক্ষিণ দিকে।
আহমদ মুসা গিয়ার চেঞ্জ করার সময় গিয়ারের পাশে রিভলভারের পোড়া বুলেট পড়ে থাকতে দেখল। উপরে তাকাল আহমদ মুসা। যে বুলেটটা গাড়ির ছাদে আঘাত করেছিল, সেটাই নিচে পড়েছে। লোক দু’টির অদ্ভুত ক্ষিপ্রতার কথা আহমদ মুসার মনে পড়ল। আহমদ মুসা মনে মনে হোয়াইট ওলফের ট্রেনিং এবং তাদের নিষ্ঠার প্রশংসা করল। কোন পরিস্থিতিতেই ওরা আক্রমণ থেকে পিছপা হয় না, এমনকি মৃত্যুকে অবধারিত জেনেও। মৃত্যুর আগে যেটুকুই সময় পায়, ওরা কাজে লাগায়। সত্যিই ওরা ভয়ংকর।
একেবারে সর্ব দক্ষিণের কর্মচারী কোয়ার্টার বরাবর গেট দিয়ে সেন্ট জনপল রোডে পড়ে দক্ষিণ দিকে বাঁক নেয়ার সময় একবার চকিতে উত্তর দিকে প্রশাসনিক ভবনের সম্মুখস্থ গেটের দিকে আহমদ মুসা চাইল। দেখল, সেখানে সেই মুহূর্তে তিনটি গাড়ির ছয়টি হেডলাইট জ্বলে উঠল। ছুটে আসছে ওরা।
আহমদ মুসা গিয়ার চেঞ্জ করে, পা দিয়ে একসেলেটর চেপে ধরল। দৃঢ় হাতে খামচে ধরল স্টিয়ারিং হুইল। লাফিয়ে উঠল জীপ। দেখতে দেখতে স্পিডোমিটারের কাঁটা ১২০ এ গিয়ে উঠল।
তুলনামূলকভাবে জনবিরল সেন্ট জনপল রোড রাতে আরও জনবিরল হয়ে উঠেছে। ঝড়ের বেগে এগিয়ে চলেছে আহমদ মুসার জীপ।
সামনেই মোড়। গ্রীন সিগন্যাল দেখা যাচ্ছে। আহমদ মুসা প্রার্থনা করল, গ্রীন সিগন্যালটা যেন আর বিশ-পঁচিশ সেকেন্ড থাকে।
ভাগ্য ভাল। আহমদ মুসা যখন সিগন্যাল ক্রস করল ঠিক তখনি হলুদ সিগন্যাল জ্বলে উঠেছে। হাফ ছেড়ে বাঁচল আহমদ মুসা। রেড সিগন্যালের বাঁধার সম্মুখীন ওরা হবে।
আহমদ মুসার সামনে ইয়েরেভেনের রোডম্যাপ খোলা ছিল।
সে মোড় পার হয়েই সেন্ট জনপল রোড ছেড়ে দিয়ে একটা গলির মধ্যে ঢুকে গেল। গলিটি দিয়ে শামিউন এভেনিউতে পড়া যাবে। শামিউন এভেনিউ দিয়ে কিছু এগিয়ে আরেকটা লেন পাওয়া যাবে। সে লেন দিয়ে এগোলে সংক্ষেপেই ভিক্টোরী রোডে পৌঁছা যায়। এ রোডেরই দক্ষিণ মাথায় ভিক্টোরী স্কোয়ার।
আহমদ মুসা লেনে প্রবেশ করে কিছুটা এগিয়ে একটা অন্ধকার মত স্থানে জীপ দাঁড় করাল। তারপর দ্রুত গাড়ি থেকে নেমে গাড়ির নাম্বার প্লেট পাল্টে দিল। আহমদ মুসা ভয় করছিল হোয়াইট ওলফরা ওয়্যারলেসে আহমদ মুসার জীপের নাম্বার সব জায়গায় পৌঁছে দিতে পারে। পুলিশও তাদের সহযোগী।
গাড়িতে উঠে আবার গাড়ি স্টার্ট দিল আহমদ মুসা। তাড়াহুড়া নেই। একটু ধীর গতিতেই এগিয়ে চলল আহমদ মুসার জীপ।
আহমদ মুসার জীপ যখন সোফিয়া এ্যাঞ্জেলাদের ফটকে গিয়ে পৌঁছল তখন রাত ৮টা ২৫মিনিট।
গেটের সামনে গাড়ি দাঁড়াতে দেখে দারোয়ান গেট না খুলে গাড়ির কাছে এল।
দারোয়ানের লম্বা-চওড়া, পরিশ্রমলব্ধ পেটা শরীর। মুখটি প্রসন্ন নয়। গাড়ির জানালার কাছে এসে আহমদ মুসাকে জিজ্ঞাসা করল, কাকে চাই?
সোফিয়া এ্যাঞ্জেলার সাথে দেখা করতে চাই।
দারোয়ান সঙ্গে সঙ্গে কোন উত্তর দিলনা। মুখটা যেন তার আরো মলিন হয়ে উঠল। বলল সে, সোফিয়া এ্যাঞ্জেলা নেই।
মাথা নিচু করে কথাটা বলল দারোয়ান।
দারোয়ানের এই ভাবান্তর আহমদ মুসার নজর এড়াল না। আহমদ মুসা আবার প্রশ্ন করল, কখন ফিরবে সোফিয়া এ্যাঞ্জেলা, কখন এলে দেখা পাব?
আমি জানি না।
কালকে আসি, তুমি সোফিয়াকে বলো।
কালকে দেখা পাবেন তা বলতে পারবো না।
কেন?
দারোয়ান কোন উত্তর দিল না। তার মুখ নিচু।
এ সময় দোতলার ব্যালকনি থেকে একটা নারী কণ্ঠ ধ্বনিত হলো, ডেভিড ওকে আসতে দাও। নিচের ড্রইংরুমে নিয়ে এস।
আহমদ মুসা মুখ তুলে উপরে তাকাল। দেখল, সাদা গাউন পরা একজন মহিলা ব্যালকনি থেকে ঘরে ঢুকে গেল।
দারোয়ান গেট খুলে দিল। আহমদ মুসা গাড়ি বারান্দায় নিয়ে গাড়ি দাঁড় করাল।
দারোয়ান গেট বন্ধ করে এসে আহমদ মুসাকে ড্রইংরুমে পৌঁছে দিল।
বিশাল ড্রইংরুম। সোফায় সাজানো। পশ্চিম দেয়ালের মাঝামাঝি জায়গায় শ্বেত পাথরের একটা মূর্তি। আহমদ মুসা চিনল, মূর্তিটা আর্মেনীয় খৃস্টানদের জাতীয় বীর শামিউনের।
মূর্তির পদতলেই সিংহাসন আকৃতির একটা চেয়ার। আহমদ মুসা বুঝল, চেয়ারটায় জর্জ সাইমন বসেন।
আহমদ মুসা চেয়ারটার বাম পাশের সোফায় গিয়ে বসল।
আহমদ মুসা ভাবল, সোফিয়া বাড়িতে নেই, কেন তাহলে তাকে ভিতরে আসতে বলল? কে তার সাথে কথা বলবে? জর্জ সাইমন কি? না ঐ মহিলা? মহিলাটি কে?
আবার ভাবল আহমদ মুসা, তাকে চিনতে পারেনি তো! চিনতে পেরেই কি আসতে বলেছে?
আহমদ মুসা তার ফুল লোড এম-১০ মেশিন রিভলভার একবার স্পর্শ করল।
বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না।
চেয়ারটির বাঁ পাশেই দরজা।
দরজা দিয়ে ধীর পদক্ষেপে প্রবেশ করল একজন মহিলা। একহারা, মাঝ বয়সী। সুন্দর, অভিজাত চেহারা। সবকিছু মিলিয়ে মাতৃসুলভ একটা ভঙ্গি। কিন্তু মুখ ম্লান, চেহারা জুড়ে বেদনার একটা কাল ছায়া। চোখের দৃষ্টি উদাস। আহমদ মুসার মনে পড়ল, দারোয়ানের মধ্যেও এই বিষণ্ণতাই সে দেখেছে।
মহিলাটি বড় চেয়ারটিতে না বসে আহমদ মুসার পাশের সোফায় এসে বসল।
হাঁটা বসার মধ্যে তার নিঃসংকোচ কিন্তু শান্ত ও সংযত ভঙ্গি।
মহিলাটি বসেই বলল, আমি সোফিয়ার মা।
আপনি সোফিয়ার খোঁজ করছিলেন?
জ্বি হ্যাঁ, বলল আহমদ মুসা।
আপনার পরিচয়?
আহমদ মুসা সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল না। একটু ভাবল। বলল, আমি সালমান শামিলের ভাই।
মহিলাটি চোখ তুলে আহমদ মুসার দিকে পরিপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকাল। বলল, আমি সোফিয়ার কাছে শুনেছি, সালমান শামিলের কোন ভাই-বোন নেই।
আমি সালমান শামিলের বিশ্বাসের ভাই। আহমদ মুসার মুখে হাসি।
সোফিয়াকে আপনার কেন প্রয়োজন?
আহমদ মুসা উত্তর দেবার আগে এবারও ভাবল। ভেবে নিয়ে ধীর কণ্ঠে বলল, আপনি জানেন সালমান শামিলকে অপহরণ করা হয়েছে। আমরা তার উদ্ধারের চেষ্টা করছি। কিন্তু সামনে এগোবার মত সূত্র আমরা পাচ্ছি না। আমি যতদূর জানি সোফিয়া সালমানের বন্ধু ছিল এবং অপহৃত হবার আগে সোফিয়ার সাথে সালমানের কথাও হয়েছে। আমরা চাইছিলাম, সোফিয়া আমাদের কোন সাহায্য করতে পারে কি না।
আহমদ মুসা থামলেও সোফিয়ার মা সংগে সংগে কথা বলতে পারল না। তার চোখ দিয়ে অশ্রু গড়াচ্ছিল।
আহমদ মুসা এই অভাবিত অবস্থায় পড়ে বিব্রত বোধ করতে লাগল। সে বিস্মিত হলো। এমন দৃশ্য সে এখানে আশা করেনি।
সোফিয়ার মা রুমালে মুখ মুছে নিয়ে বলল, সালমান শামিলের অপহরণ আমারও সর্বনাশ করেছে।
বলতে বলতে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল সোফিয়ার মা।
আহমদ মুসা কি বলবে, কি সান্ত্বনা দেবে তা ভেবে পেল না। তবে বুঝল, বড় ধরনের কিছু ঘটেছে। উদ্বিগ্ন হলো আহমদ মুসা।
দু’হাতে মুখ ঢেকে কাঁদছিল সোফিয়ার মা।
কিছু পর মুখ তুলল। চোখ মুছে আবার বলতে শুরু করল, যেদিন সালমান শামিল অপহৃত হয়, সেদিন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফিরে মা আমার সারা দিন কেঁদেছে, কিছু খায়নি। রাত দশটায় ওর আব্বা বাইরে যায়। ওর আব্বা বাইরে যাওয়ার পর পরই সে কিছু না বলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। আজ তিন দিন কেউ ফিরে আসেনি।
কান্না রোধ করতে দু’হাতে মুখ ঢাকল সোফিয়ার মা।
কোথাও সন্ধান করেছেন, পুলিশ কিছু করতে পারেনি? দ্রুত কন্ঠে জিজ্ঞাসা করল আহমদ মুসা।
সন্ধান করে কোন লাভ নেই, পুলিশ কিছুই করতে পারবে না। রুমালে চোখ মুছে শান্ত হবার চেষ্টা করে বলল সোফিয়ার মা।
কেন লাভ নেই? পুলিশ কোন কিছু করতে পারবে না? বিস্মিত কন্ঠে বলল আহমদ মুসা।
সোফিয়ার মা কোন উত্তর দিল না।
আহমদ মুসা বুঝল, সোফিয়ার মা প্রশ্নটির উত্তর দিতে চাচ্ছে না অথবা দ্বিধা করছে। তবু আহমদ মুসা আবার জিজ্ঞেস করল, আপনি কি জানেন তারা কোথায় গেছে কিংবা তাদের কি হয়েছে?
আমাকে জিজ্ঞেস করবেন না।
এটা কি আপনি মনে করেন যে, সালমান শামিলকে যারা অপহরণ করেছে, তারাই ওদেরও আটকেছে?
তাই মনে করি।
ওরা কি এক সাথে গেছে?
না। সোফিয়ার আব্বা প্রতি বৃহস্পতিবারে রাত দশটায় এভাবে যান।
সোফিয়া কি ওর আব্বাকে অনুসরণ করেছে বলে মনে করেন?
সোফিয়ার মা আহমদ মুসার দিকে পরিপূর্ণ দৃষ্টি মেলে বলল, আমি তা মনে করিনি। এমন কি ঘটতে পারে?
সোফিয়া কখন বেরিয়েছে, ওর আব্বার পরেই কি?
প্রায় সংগে সংগেই। ওর আব্বার গাড়ি রাস্তায় পড়লে, সোফিয়ার গাড়ি গেট দিয়ে বেরিয়েছে।
আমার মন বলছে, সোফিয়া তার আব্বাকে অনুসরণ করেছে এবং সোফিয়া সালমানের সন্ধানেই বের হয়।
আহমদ মুসা একটু থামল। তারপর বলল, একথা সত্য হলে এটাও সত্য বলে ধরে নিতে হবে যে, তার পিতাকে অনুসরণ করলে সালমানকে সন্ধান করার সুরাহা হবে, এটা সোফিয়া মনে করেছিল।
আহমদ মুসার শেষ কথাগুলো বেশ শক্ত শোনাল।
একটু থেমে আহমদ মুসাই আবার শুরু করল, দয়া করে বলবেন, প্রতি বৃহস্পতিবার রাত দশটায় সোফিয়ার আব্বা কোথায় যেতেন?
কোন উত্তর দিল না সোফিয়ার মা। তার মুখে একটা ভয়ের চিহ্ন ফুটে উঠল।
আহমদ মুসা বুঝল, সোফিয়ার মা কিছু বলতে ভয় করছে। তার ভয় দূর করার জন্যে আহমদ মুসা বলল, আপনি সোফিয়ার মা, আমারও মায়ের মত। কোন কথা বলতে দ্বিধা করবেন না, আপনার ভয় নেই। সবকিছু জানলে হয়ত আমি আপনাকেও সাহায্য করতে পারব, আমাদেরও উপকার হবে।
পারবে না বাবা। ওরা জানতে পারলে তুমিও বিপদে পড়বে, তুমিও হারিয়ে যাবে।
আহমদ মুসা এক মুহূর্ত চিন্তা করল। তারপর পকেট থেকে এম-১০ মেশিন রিভলভার বের করে সোফিয়ার মা’র কাছে ধরে বলল, দেখুন, রিভলভার এখনও গরম আছে, এখনও এতে বারুদের গন্ধ লেগে আছে। কিছুক্ষণ আগেই এ রিভলভার ওদের একটা ফাঁদ গুড়িয়ে দিয়েছে। আপনি বিশ্বাস করুন, আমরা পারব।
সোফিয়ার মা’র চোখে প্রবল ভয় ও আশংকার চিহ্ন ফুটে উঠল। সে বিস্ফারিত চোখে তাকিয়েছিল আহমদ মুসার দিকে। বলল সে ধীরে ধীরে, তুমি ওদের চেন, জান ওদের কত শক্তি?
হোয়াইট ওলফকে চিনি, ওদের শক্তি সম্পর্কেও জানি।
ভয় করো না ওদের?
না।
পিস্তল গরম থাকার কথা বলছ, কোথায় লড়াই করে এলে ওদের সাথে?
সালমান সম্পর্কে জানার জন্যে ডঃ পল জনসনের কাছে গিয়েছিলাম। সালমানের মত করেই আমাকে ধরার জন্যে ওরা ফাঁদ পেতেছিল। ফাঁদ ছিড়ে গেছে। ওদের মধ্যে চারজন সেখানে লাশ হয়ে পড়ে আছে।
কি বলছ তুমি? প্রায় আর্তনাদ করে উঠল সোফিয়ার মার কণ্ঠ।
আমি বলছি ওরা অজেয় নয়, ওদের ভয়ের কিছু নেই।
তুমি একা পারবে?
আমি একা নই। অন্যায় ও জুলুমের বিরুদ্ধে দাঁড়াবার লোক তৈরি আছে।
সোফিয়ার মা মাথা নিচু করে কিছুক্ষণ ভাবল। বলল, আমি বেশি কিছু জানি না, জানার চেষ্টা করাও অপরাধ ছিল। সোফিয়ার আব্বা প্রতি বৃহস্পতিবার রাত দশটায় কোথায় যেত আমি কোনদিন জিজ্ঞেস করিনি। তবে গাড়ির মিটার থেকে বুঝেছি জায়গাটা এখান থেকে তেত্রিশ-চৌত্রিশ মাইল দুরে। নাম জানতাম না জায়গাটার। কিন্তু আমার কৌতুহল ছিল। আমার স্বামীর চরিত্র সম্পর্কে আমার কোন সন্দেহ ছিল না, তবুও আশংকা মনে জাগতো যে, কেন তিনি রাতেই শুধু সেখানে যান! এক বৃহস্পতিবার অসুস্থ থাকায় তিনি যেতে পারলেন না। যেতে পারবেন না-একথা জানাবার জন্যে তিনি টেলিফোন করলেন। আমি পাশেই বসেছিলাম। নাম্বারটা মনে মনে আমি মুখস্ত করলাম। তারপর কৌতুহল চাপতে না পেরে একদিন সেখানে টেলিফোন করেই বসলাম। আমার লক্ষ্য ছিল জায়গাটার নাম জানা। টেলিফোন করার পর ওপার থেকে ‘হ্যালো’ বলতেই আমি বললাম, এটা কি ‘জেগার্ড মনেস্টারী?’ জেগার্ড মন্দির ইয়েরেভেন থেকে ৩৮ কিলোমিটার দুরে। ওপার থেকে সঙ্গে সঙ্গেই উত্তর এল, না আমবার্ড দুর্গ। জায়গাটার নাম আমি এভাবে জানতে পারি। কেন ঐ দিন নিয়মিত ওখানে তিনি যান, তা জানতে পারিনি। তবে সেখান থেকে ফিরে আসার বিভিন্ন সময় থেকে বুঝেছি সেখানে বিভিন্ন মেয়াদের মিটিং সিটিং হয়ে থাকে।
আহমদ মুসার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। বলল, আপনাকে ধন্যবাদ। এই তথ্যে আমাদের অনেক উপকার হবে।
একটু থেমে আহমদ মুসা আবার জিজ্ঞাসা করল, সোফিয়া তার পিতার এসব কি জানে? জানে কি সে, তার পিতা হোয়াইট ওলফের সাথে আছেন?
জানার কথা নয়। তবে বুদ্ধিমতী মেয়ে নিশ্চয় কিছু আঁচ করেছে।
আহমদ মুসা ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল, আমি আপনাকে অনেক কষ্ট দিয়েছি। বলে আহমদ মুসা উঠে দাঁড়াল।
সোফিয়ার মাও উঠে দাঁড়াল। বলল, বাবা তোমার এ দুঃখিনী মা কি কিছু আশা করতে পারে?
আল্লাহ ভরসা। নিশ্চয় আশা করতে পারেন আম্মা।
ঈশ্বর তোমাদের সফল করুন।
আহমদ মুসা আসার জন্য ফিরে দাঁড়িয়েছিল।
সোফিয়ার মা বলে উঠল, আচ্ছা বল তো, তোমার নামটাই তো জানা হয়নি।
আহমদ মুসা ফিরে দাঁড়াল আবার। বলল, আমি আহমদ মুসা।
নাম শুনে কপাল কুঞ্চিত হলো সোফিয়ার মা’র। বলল, এক আহমদ মুসার কাহিনী পড়েছি পত্রিকায়। ফিলিস্তিন, মিন্দানাও এবং মধ্য এশিয়া বিপ্লবের নায়ক সে। সে নওতো তুমি?
জ্বি, আমি সেই। নরম, বিনীত কণ্ঠ আহমদ মুসার।
শুনেই সোফিয়ার মা ধপ করে বসে পড়ল সোফায়। বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে থাকল আহমদ মুসার দিকে।
‘আচ্ছা চলি’ বলে ঘুরে দাঁড়িয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এল আহমদ মুসা।
সোফিয়ার মা বিস্ময়ের ধাক্কা সামলে নেবার আগেই আহমদ মুসা বেরিয়ে গেল। কিছু বলার আর সুযোগ হলো না। তবে আহমদ মুসার গমন পথের দিকে চেয়ে থাকা সোফিয়ার মা’র বিস্ময়-বিমূঢ় চোখে একটা আশার আলোও চিক চিক করে উঠতে দেখা গেল।
আহমদ মুসা বেরিয়ে এসে দেখল, দারোয়ান গেটের গার্ডরুমের দরজায় চুপচাপ বসে আছে। গেট বন্ধ। গাড়ির দরজা খুলে উঁকি মেরে দেখল, সব ঠিক-ঠাক আছে, এমনকি সিটের উপর রেখে যাওয়া ভুয়া টেলিফোন নাম্বারের স্লিপ পর্যন্ত যেভাবে রেখে গিয়েছিল সেভাবেই আছে।
আহমদ মুসা গাড়িতে উঠতেই দারোয়ান গেট খুলে দিল।
গেট দিয়ে বেরিয়ে রাস্তায় পড়ার আগে চারদিকে একবার তাকিয়ে নিল আহমদ মুসা, না, কোন মানুষ কিংবা কোন গাড়ি অপেক্ষা করে নেই। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল রাত ৯টা। আহমদ মুসা ভাবল, আমবার্ড দুর্গের যে ঠিকানা পাওয়া গেছে তাতেই চলে কি না? ডঃ জনসনের এ্যাটেনডেন্টের ওখানে ঢুঁ দেয়ার দরকার আছে কি না? কিন্তু চিন্তা করল, তারা যা খুঁজছে আমবার্ড দুর্গ তা নাও হতে পারে, সেটা নিছকই এক ঐতিহাসিক পবিত্র গীর্জা মাত্র। সুতরাং কোন সুযোগ হাতছাড়া না করে সবগুলো বাজিয়ে দেখা দরকার।
আহমদ মুসার জীপ তখন ছুটে চলছিল ওসমান এফেন্দীর বাড়ির দিকে। আলী আজিমভ ও ওসমান এফেন্দীকে নিয়ে যেতে হবে ডঃ পল জনসনের স্টাফ কোয়ার্টার অভিযানে।
রাত পৌনে বারটায় আহমদ মুসাদের জীপটি ডঃ পল জনসনের ইনস্টিটিউটের সীমানার কাছাকাছি পৌঁছল। আর গজ পঞ্চাশেক গেলেই স্টাফ কোয়ার্টারে প্রবেশের গেট পাওয়া যাবে।
আহমদ মুসা গাড়িটা সেখানেই থামাতে বলল। গাড়ি থামলে আহমদ মুসা আলী আজিমভকে নিয়ে নেমে গেল। ড্রাইভিং সিটে বসা ওসমান এফেন্দীকে লক্ষ্য করে বলল, তুমি ঠিক বারোটায় গাড়ি ২১নং স্টাফ কোয়ার্টারের সামনে নিয়ে আসবে।
আহমদ মুসা ও আলী আজিমভ দু’জনেই সেন্ট জন পল রোডের ফুটপাত ধরে হাঁটতে শুরু করল।
দু’জনেরই কাল ট্রাউজারের উপর কাল ওভারকোট। আহমদ মুসার মাথায় ফেল্ট হ্যাট কপাল পর্যন্ত নামানো। আলী আজিমভের মাথায় উলের টুপি। দু’জনেরই দু’হাত ওভারকোটের পকেটে। জনমানব শূন্য রাস্তা। মাঝে মাঝে দু’একটা গাড়ি তীরবেগে ছুটে যাচ্ছে।
আহমদ মুসা ও আলী আজিমভ স্টাফ কোয়ার্টারগামী রাস্তার মুখে গিয়ে মুহূর্তের জন্যে দাঁড়াল। দেখল, রাস্তা একদম ফাঁকা। সম্ভবতঃ আজ সন্ধ্যার এ ঘটনার পর কিছুটা অস্বাভাবিক ফাঁকা অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে এ এলাকায়।
স্টাফ কোয়ার্টারের রাস্তা দিয়ে হাঁটতে লাগল আহমদ মুসা এবং আলী আজিমভ।
স্টাফ কোয়ার্টারগুলো পূর্ব-পশ্চিমে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ানো। দক্ষিণের শেষ সারির পশ্চিমের শেষ বাড়িটা ডঃ পল জনসনের এ্যাটেনডেন্ট আলফ্রেডের।
অনেকখানি এগিয়েছে এমন সময় তারা পশ্চিম দিক থেকে একটা গাড়ি ছুটে আসতে দেখল। আলফ্রেডের বাড়ির দিক থেকেই আসছে গাড়িটা।
আহমদ মুসা ও আলী আজিমভ রাস্তার বামপাশ দিয়ে হাঁটছিল। গাড়িটা পঞ্চাশ গজের মধ্যে এসে পড়েছে। হেডলাইটের চোখ ধাঁধানো আলো তাদের প্লাবিত করেছে।
গাড়িটায় একটা ছোট হাফ ক্যারিয়ার।
গাড়িটা যখন পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিল, তখন আহমদ মুসার দৃষ্টি হঠাৎ গিয়ে পড়ল খোলা ক্যারিয়ারের উপর। দেখল, ক্যারিয়ারের মেঝেতে হাত-পা বাঁধা একজন লোক। মুখও তার কাপড় দিয়ে বাঁধা। উঠে বসার চেষ্টা করছে।
আহমদ মুসা সংগে সংগেই ঘুরে দাঁড়াল এবং কোটের পকেট থেকে তার হাত এম-১০ সহ বেরিয়ে এল একই সাথে। উঁচু হল এম-১০ এর মাথা গাড়ির চাকা লক্ষ্য করে।
গাড়িটি তখন মাত্র কয়েকগজ সামনে এগিয়েছিল। এম-১০ এর এক ঝাঁক গুলি গিয়ে ছেঁকে ধরল পেছনের দক্ষিণ পাশের চাকাটিকে। সাইলেনসার লাগানো রিভলভার কোন শব্দ তুলল না, কিন্তু টায়ার ফাটার বিকট শব্দ চারদিকের নীরবতাকে উচ্চকিত করে তুলল।
গাড়িটা খোঁড়াতে খোঁড়াতে আরও কয়েকগজ সামনে এগিয়ে ডান দিকে বেঁকে গিয়ে দক্ষিণমুখো হয়ে থেমে গেল।
থামবার আগেই দু’জন লোক এদিকের গেট দিয়ে রাস্তায় লাফিয়ে পড়ল। তাদের হাতে রিভলভার।
আহমদ মুসার এম-১০ তার মাথা উঁচু করেই ছিল। এবং ট্রিগারেও তর্জনী নির্দেশ পালনের জন্যে প্রস্তুত হয়ে ছিল। আহমদ মুসা যখন দেখল লোক দু’টির রিভলভার উঁচু হচ্ছে, তখন তর্জনী চেপে বসল ট্রিগারে। আবার একটানা এক শীষ উঠল এম-১০ থেকে। বেরিয়ে গেল আর এক ঝাঁক গুলি।
লোক দু’টির রিভলভার আর উঁচু হলো না। ঝরে পড়ল তারা মাটিতে।
আহমদ মুসা এবং আলী আজিমভ দ্রুত এগিয়ে গেল গাড়িটির ক্যারিয়ারের দিকে। আলী আজিমভ লাফিয়ে উঠল ক্যারিয়ারে।
ক্যারিয়ারে বাঁধা অবস্থায় পড়ে থাকা লোকটি উঠে বসেছিল। তার চোখ দু’টি বিস্ফারিত। কাঁপছিল সে।
আলী আজিমভ তার মুখ ও হাত-পায়ের বাঁধন খুলে দিল।
আহমদ মুসা লোকটির উপর চোখ পড়তেই বিস্মিত হলো। একি! এ যে ডঃ পল জনসনের এ্যাটেনডেন্ট আলফ্রেড!
রাস্তার আলোতে চারদিকে সবকিছু মোটামুটি স্বচ্ছ দেখাচ্ছিল।
আহমদ মুসা মাথার হ্যাট খুলে বলল, আলফ্রেড তুমি এখানে, এভাবে?
আলফ্রেড আহমদ মুসার দিকে ভালো করে চেয়েই ভীষণভাবে চমকে উঠল, তার মুখ ভয়ে ফ্যাকাশে হয়ে গেল। কাঁপতে লাগল সে।
পরমুহূর্তে ক্যারিয়ার থেকে লাফিয়ে পড়ে আহমদ মুসার পা জড়িয়ে ধরল এবং ডুকরে কেঁদে উঠল। কাঁদতে কাঁদতে বলল, আমাকে মাফ করে দিন, আমার স্যারকে বাঁচান, আমার স্যারকে ওরা মেরে ফেলবে।
আহমদ মুসা তাকে হাত ধরে টেনে তুলল। বলল, তুমি কি বলছ বুঝতে পারছি না। কি হয়েছে বুঝিয়ে বল।
আলফ্রেড একটু থেমে কাঁপতে কাঁপতে বলল, স্যার, প্রাণের ভয়ে ওদের হুকুম তামিল করেছি, সালমান শামিল স্যারকে ধরিয়ে দিয়েছি। তা না করলে বেটি-বাচ্চাসমেত আমাকে ওরা মেরে ফেলত। এখন ওরা আমার বড় স্যারের গায়েও হাত তুলেছে। আপনি তাকে বাঁচান, আপনি তাকে…….
বলে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল।
আহমদ মুসা ধমকে উঠে বলল, খবরদার কাঁদবে না, বলছি কি হয়েছে বল।
আলফ্রেড চুপ করল। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, আপনাকে ধরতে না পারায় ওরা ভয়ানক ক্ষেপে গেছে। ওদের মিটিং-এ আজ রায় হয়েছে, আপনাদের সাথে ডঃ স্যারের যোগসাজশ আছে। এবং আজই তাকে কিডন্যাপ করা, শাস্তি দেয়া এবং হত্যা করার সিদ্ধান্ত ওরা নিয়েছে।
–ডঃ স্যার কে? ডঃ পল জনসন?
–হ্যাঁ। বলল আলফ্রেড।
–কিন্তু তোমাকে ওরা কিডন্যাপ করছিল কেন?
–স্যার সম্পর্কিত সিদ্ধান্তটা আমি জানতে পেরেছিলাম এবং তাকে বাঁচাবার পক্ষে কথা বলেছিলাম এই অপরাধে।
–কোথায় সিদ্ধান্ত হয়েছিল?
–ওদের উত্তর ইয়েরেভেন ঘাঁটিতে।
প্রশ্নের উত্তর দিয়েই আলফ্রেড বলল, স্যার ওদের যতটুকু জানি আমি সব বলব, কিন্তু ডঃ স্যারকে এখন বাঁচান।
–কোথায় তিনি?
–ওর বাসায়। কিন্তু ওরা এতক্ষণে গেছে ওর বাসায়। রাত ১২টায় ওর বাসায় আজ ওরা হামলা চালাবে।
আহমদ মুসা ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল রাত ঠিক বারটা।
এই সময় ওসমান এফেন্দীর গাড়ি হাফ ক্যারিয়ারের ওপারে এসে থামল।
আহমদ মুসা ওসমান এফে্ন্দীকে লক্ষ্য করে বলল, ওসমান গাড়ি ওখানেই লক করে চলে এস।
তারপর আলফ্রেডকে সামনে রেখে ওরা ডঃ পল জনসনের বাড়ি লক্ষ্যে দ্রুত হাঁটতে শুরু করল।
আলফ্রেডের পাশেই হাঁটছিল আহমদ মুসা। হাঁটতে হাঁটতে বলল, হোয়াইট ওলফের হেডকোয়ার্টার কোথায় জান?
–জানি না, তবে শুনেছি ইয়েরেভেন থেকে পূর্বদিকে আরাগাত পাহাড়ের দিকে কোথায় যেন।
–সালমান শামিলের কোন খবর জান?
–এটুকু জানি তাকে মেরে ফেলেনি, তাকে খাদ্য-পানি না দিয়ে ধীরে ধীরে মেরে ফেলার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
হৃদয়টা কেঁপে উঠল আহমদ মুসার। কত ক্রুর, কত নৃশংস এই হোয়াইট ওলফ! তবু এই ভেবে আহমদ মুসা আনন্দিত হল যে, সালমান বেঁচে আছে।
–তাকে কোথায় রেখেছে?
–শুনেছি, হেডকোয়ার্টারেই ওদের বন্দীখানা।
প্রসঙ্গ পাল্টিয়ে আহমদ মুসা জিজ্ঞাসা করল, ডঃ পল জনসনের বাড়িতে কে কে থাকেন?
–তিনি, তার স্ত্রী এবং তার এক মেয়ে। তার ছেলে উচ্চশিক্ষার জন্যে আমেরিকায় আছে।
–দারোয়ান?
–জ্বি, গেটে একজন দারোয়ান আছে।
বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছে থমকে দাঁড়াল আলফ্রেড। বাংলোর দিকে ইংগিত করে বলল, ডঃ পল জনসনের বাড়ি।
বাড়ির চারদিকে বাগান। বুক পরিমাণ উঁচু প্রাচীরে ঘেরা। বাড়ির সামনে প্রাচীরের সাথে একটা গেটরুম। গেটে ইস্পাতের একটা দরজা। দরজা পেরুলে পাথর বিছানো রাস্তা গাড়ি বারান্দা পর্যন্ত উঠে গেছে।
আহমদ মুসারা দেখতে পেল গেটটি খোলা। খোলা গেট দিয়ে ঢুকল ওরা। গেটরুমে উঁকি দিয়ে দেখল, দারোয়ান বেঘোরে ঘুমুচ্ছে। বুঝল, হোয়াইট ওলফের লোকেরা তাহলে প্রথমে প্রাচীর টপকে প্রবেশ করে দরজা খুলে দিয়েছে।
আহমদ মুসা ওসমান এফেন্দীর দিকে তাকিয়ে বলল, তুমি আলফ্রেডকে নিয়ে এখানে অপেক্ষা কর।
বলে আহমদ মুসা এবং আলী আজিমভ সামনে এগোবার উদ্যোগ দিতেই আলফ্রেড বলল, ওরা কমপক্ষে পাঁচজন, আপনারা মাত্র দু’জন…..
ওসমান এফেন্দী ওকে থামিয়ে দিল।
আহমদ মুসা ওর দিকে তাকিয়ে হেসে বলল, তুমি কেমন করে বুঝলে কমপক্ষে পাঁচজন ওরা এসেছে?
–স্যার, যে কোন অপারেশনে কমপক্ষে পাঁচজন ওরা যায়।
‘ধন্যবাদ’ বলে আহমদ মুসা ঘুরে দাঁড়াল।
আহমদ মুসা এবং আলী আজিমভ বাগানের মধ্যে সেই পাথর বিছানো রাস্তা ধরে বাংলোর দিকে এগোতে থাকল। দুজনেরই হাত ওভারকোটের পকেটে।
আহমদ মুসা এবং আলী আজিমভ গাড়ি বারান্দায় পৌঁছে দেখল, সামনের বড় দরজাটি খোলা।
তারা সিঁড়ি ভেঙ্গে বারান্দায় উঠতেই নারী কণ্ঠের কান্না শুনতে পেল।
খোলা দরজা দিয়ে আহমদ মুসা ও আলী আজিমভ ভেতরে প্রবেশ করল। বিরাট হলরুম। কার্পেটে মোড়া। সোফাসেট দিয়ে সাজানো।
হলরুমটি পেরিয়ে তারা একটা করিডোরে প্রবেশ করল। করিডোরের মাথায় গিয়ে একটা দরজা পেল। দরজাটা খোলা। দরজার ওপার থেকে কান্নার শব্দ আসছে।
আহমদ মুসা বেড়ালের মত নিঃশব্দে এগিয়ে দরজা দিয়ে উঁকি দিল। বিরাট ঘর। মনে হল ডঃ পল জনসনের শোবার ঘর।
মেঝেয় পড়ে একজন মহিলা কাঁদছে। মাঝ বয়েসী। মনে হল ডঃ পল জনসনের স্ত্রী। ডঃ পল জনসন বাইরে বেরুবার মত পোশাকে প্রস্তুত। তার মুখ স্বাভাবিক। দুয়ারের একপাশে তিনজন স্টেনগান উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দু’জন ঘরের বিভিন্ন জায়গা সার্চ করছে। মনে হয় সার্চ শেষ হয়েছে। ওদের মধ্যেকার লিডার টাইপের লোকটি ডঃ পল জনসনকে লক্ষ্য করে বলল, চল ডক্টর।
ডঃ পল জনসন সঙ্গে সঙ্গেই যাবার জন্যে পা বাড়াল। মহিলাটি কাঁদতে কাঁদতে ছুটে দিয়ে এবার লিডার টাইপ লোকটির সামনে হাত জোড় করে দাঁড়ালো। বলল, তোমরা ওকে নিয়ে যেও না, ওর কোন দোষ নেই, উনি কোন দোষ করেননি।
ডঃ পল জনসন থমকে দাঁড়িয়ে মহিলাটিকে উদ্দেশ্য করে বলল, নিরর্থক অপমানজনক কোন আবেদন করে নিজেকে আর ছোট কর না ইভা, ধৈর্য্য ধর।
বলে ডঃ পল জনসন সামনে পা বাড়াতে চাইছিল। এমন সময় পাশের দরজা দিয়ে ছুটে এল একটি মেয়ে। ‘আব্বা’ বলে চিৎকার করে জড়িয়ে ধরল ডঃ পল জনসনকে। কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে সে বলতে লাগল, আব্বা তোমাকে যেতে দেব না। তোমাকে নিয়ে যেতে পারবে না।
মেয়েটির বয়স উনিশ-বিশ বছর। ডঃ পল জনসনের একমাত্র মেয়ে। নাম মারিয়া জনসন। ইয়েরেভেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের ছাত্রী।
ডঃ পল জনসন মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, তোমরা ধৈর্য্য ধর, সবাইকেই তো একদিন যেতে হবে। দুনিয়ার–
ডঃ পল জনসনের কথা শেষ হবার আগেই সেই লিডার টাইপের লোকটা মারিয়ার একটা হাত ধরে এক হ্যাঁচকা টানে মারিয়াকে সরিয়ে নিয়ে বলল, আমরা নাটক করতে আসিনি, সময় আমাদের মূল্যবান।
ক্রন্দনরত মারিয়া এবার লিডার লোকটার পায়ে গিয়ে পড়ল। বলল, তোমরা আমার আব্বাকে নিয়ে যেও না।
লিডার লোকটা সুন্দরী মারিয়ার দিকে একবার তাকাল। তার চোখটা যেন চক্ চক্ করে উঠল। সে ডঃ পল জনসনকে লক্ষ্য করে বলল, ডঃ, মেয়েটা তোমার খাসা, আমাদের দিয়ে দাও, তোমার অনেক পাপ মোচন হবে।
ডঃ পল জনসনের শান্ত চোখটি এবার আগুনের মত জ্বলে উঠল। গর্জে উঠল, অমানুষ কুকুর, মুখ সামলে কথা বল।
লিডার লোকটি হো হো করে হেসে উঠল। তারপর মুখ কঠিন করে ক্রুর হেসে বলল, কুকুর আমি, বেশ তাহলে কুকুরের ব্যবহার একবার দেখ ডক্টর।
বলে সে মারিয়াকে মেঝেতে ছুঁড়ে ফেলে তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল।
ডঃ পল জনসন বিদ্যুৎ গতিতে কয়েক পা এগিয়ে গেল। তারপর প্রচন্ড এক লাথি মারল লোকটির মুখে।
ছিটকে পড়ল লোকটি। পড়েই আবার উঠে বসল। তার নাক থেকে গল গল করে রক্ত বেরুচ্ছে। ঠোঁট দু’টিও থেতলে গেছে। তার চোখ দু’টি ভাটার মত জ্বলছে।
উঠে বসেই সে পকেট থেকে রিভলভার বের করে তাক করল ডঃ পল জনসনের দিকে।
আহমদ মুসার ডান হাতে এম-১০ রিভলভার। লিডার লোকটিকে রিভলভার বের করতে দেখেই কি ঘটতে যাচ্ছে বুঝতে পারল আহমদ মুসা। দ্রুত সে বাম হাতে পকেট থেকে ছোট কোল্ট রিভলভার বের করে নিল। লোকটির রিভলভারের নল ডঃ পল জনসনের উপর স্থির হবার আগেই আহমদ মুসার ক্ষুদ্র কোল্টটি অগ্নি উদগিরণ করল।
গুলি ঠিক তার মাথায় গিয়ে আঘাত করল। লোকটি নিঃশব্দে ঢলে পড়ে গেল মাটিতে।
গুলি করেই আহমদ মুসা ঘরে ঢুকে স্টেনগানধারী তিনজনের দিকে এম-১০ এর বাঘা নল তাক করল।
গুলির শব্দ শুনে ওরা তিনজনও এদিকে ফিরে দাঁড়িয়েছিল।
আহমদ মুসা শান্ত কণ্ঠে ওদের বলল, দেখ রক্তপাত আমি পছন্দ করি না। তোমরা স্টেনগান ফেলে দাও, তোমাদের কিছু বলা হবে না।
বেপরোয়া লোক তিনটি যেন আহমদ মুসার কথা শুনতেই পায়নি। ভয়েরও কোন চিহ্ন তাদের চোখে নেই, বরং সেখানে হিংসার এক প্রচন্ড আগুন। দ্রুত ওদের স্টেনগান ওপরে উঠে এল। নল তিনটি আহমদ মুসার সমান্তরালে উঠে আসছে।
কিন্তু আহমদ মুসা সে সুযোগ তাদের দিল না। কয়েক সেকেন্ডের জন্যে সে চেপে ধরলো এম-১০ এর ট্রিগার। ছুটে গেল এক পশলা গুলি।
পাশাপাশি দাঁড়ানো গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে যাওয়া তিন জনের দেহ ঢলে পড়ল মেঝেতে।
এদিকে লিডার লোকটি গুলি খাওয়ার সংগে সংগেই তার ওপাশে অল্প কিছুদূরে দাঁড়ানো ৫ম লোকটি রিভলভার বের করেছিল। বিদ্যুৎ গতিতে তা উঠে আসছিল আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে। আহমদ মুসার লক্ষ্য তখন সামনেই বাম পাশে দাঁড়ানো স্টেনগানধারী তিনজনের দিকে।
৫ম ঐ লোকটির দিকে নজর রাখছিল আলী আজিমভ। যখন সে দেখল লোকটি আহমদ মুসাকে টার্গেট করেছে, আলী আজিমভ তাকে আর সময় দিল না। পিস্তল তৈরি ছিল, শুধু ট্রিগারে চাপ দিতে হল। গুলি সরাসরি গিয়ে তার মাথায় আঘাত করল। দেহ তার ছিটকে পড়ে গেল মাটিতে।
মারিয়া গিয়ে তার পিতাকে জড়িয়ে ধরেছিল। আতংকে সে পিতার বুকে মুখ লুকিয়েছিল। আর ডঃ পল জনসনের স্ত্রী ভয়ে-আতংকে যেন পাথর হয়ে গেছে। ফ্যাল ফ্যাল দৃষ্টি তার। নড়াচড়া, এমনকি কথা বলার শক্তিও যেন হারিয়ে ফেলেছে।
ডঃ পল জনসন অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল আহমদ মুসার দিকে। গলা শুনেই আহমদ মুসাকে চিনতে পেরেছিল। কৃতজ্ঞতায় অন্তর তার ভরে উঠেছিল। সে ভেবে পাচ্ছিল না কিভাবে এটা ঘটল।
আহমদ মুসা দুই রিভলভার দুই পকেটে রেখে মাথার হ্যাট খুলে বলল, আপনার সামনে, আপনার ঘরে রক্তারক্তির জন্যে আমি দুঃখিত জনাব। এড়ানোর উপায় ছিল না, ওদের না মেরে বাঁচা কঠিন।
–দুঃখ পরে করো। এখন বল, এ সময় তোমরা কেমন করে এসে পৌঁছলে? এখনও সবটা ব্যাপার আমার কাছে স্বপ্ন বলে মনে হচ্ছে।
–আমরা এসেছিলাম আলফ্রেডের কাছ থেকে তথ্য আদায়ের জন্যে, দরকার হলে তাকে কিডন্যাপ করতে। কিন্তু রাস্তায় দেখলাম, তাকেই হোয়াইট ওলফরা কিডন্যাপ করে নিয়ে যাচ্ছে। তাকে আমরা উদ্ধার করলাম। তার কাছ থেকেই জানলাম আপনার উপর এ বিপদ এসেছে। তারপর তাকে সঙ্গে নিয়েই আমরা এখানে এসেছি।
–আমার কি মনে হচ্ছে জান, ঈশ্বর যেন সাক্ষাৎ নেমে এসেছেন।
–‌আল্লাহ যাকে সাহায্য করেন এভাবেই করেন।
–কিন্তু দুঃখ, সবখানে সবাই এ সাহায্য পায় না।
–যেখানে পায় না, সেটাও আল্লাহর বিশ্ব-পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই ঘটে।
–তুমি কি বুঝাতে চাচ্ছ?
–আমি বলতে চাচ্ছি, আল্লাহ যেখানে সাহায্য করেন সেখানে যেমন তার একটা মঙ্গল ইচ্ছা থাকে, তেমনি যেখানে সাহায্য করেন না, সেখানেও তার মাধ্যমে তিনি মঙ্গলকরই কিছু করতে চান।
–কিন্তু সালমান শামিলকে ঐ নরপশুদের হাতে তুলে দেবার মধ্যে মঙ্গলকর কি আছে?
–হয়তো এর মাধ্যমে আল্লাহ হোয়াইট ওলফের ধ্বংসের ব্যবস্থা করেছেন।
–তুমি একজন বিপ্লবী, দার্শনিকের মত এমন ঠান্ডা চিন্তা তুমি করতে পারো কেমন করে?
–ইসলাম ধর্মে বিপ্লবী, দার্শনিক, ধর্মনেতা, রাষ্ট্রনেতা ইত্যাদির জন্যে আলাদা আলাদা কোন অবস্থান নেই। একজন মুসলমান একই সাথে বিপ্লবী, দার্শনিক, ধর্মনেতা, রাষ্ট্রনেতা-সবই হতে পারে। আমাদের নবী তা-ই ছিলেন। এটাই তাঁর শিক্ষা।
–সালমান শামিলের চরিত্র আমাকে দুর্বল করেছে, তুমি আমাকে আরও দুর্বল করে দিচ্ছ। আমার মনে এ বিশ্বাস যেন দৃঢ় হয়ে যাচ্ছে, ইসলামই একমাত্র পরিপূর্ণ ধর্ম এবং ইসলামই একমাত্র সময়ের সব দাবি পূরণ করতে পারে।
বলে ডঃ পল জনসন মেয়ে মারিয়া এবং স্ত্রী ইভার দিকে ফিরে বলল, তোমাদের পরিচয় করিয়ে দেইনি।
এরা সালমান শামিলের ভাই।
আহমদ মুসাকে দেখিয়ে তিনি বললেন, আর ইনি আহমদ মুসা, যার নাম তোমরা খবরের কাগজে পড়েছ। সেই বিপ্লবী পুরুষ ইনি।
মেয়ে মারিয়া এবং স্ত্রী ইভা অবাক বিস্ময়ের সাথে আহমদ মুসার কথা শুনছিল। তাদের চোখের পানি শুকিয়ে গিয়েছিল।
ডঃ পল জনসন থামলে তার স্ত্রী ইভা জনসন আহমদ মুসার কাছে এসে বলল, বাবা ঈশ্বর তোমার মঙ্গল করুন, তুমি আমাদের জীবন-মান বাঁচিয়েছ। বলে কেঁদে উঠলো ইভা জনসন। দু’হাতে মুখ ঢাকল সে।
–আল্লাহরই সব প্রশংসা আম্মা। শক্তি, সুযোগ তিনিই দিয়েছেন।
মারিয়া আহমদ মুসার দিকে চেয়ে বলল, আমি আপনার কথা পড়েছি।
–কোথায় পড়েছ? ঈষৎ হেসে জিজ্ঞাসা করল আহমদ মুসা।
–‘ফ্র’ এবং ‘ক্লু ক্ল্যাকস ক্ল্যান’ দু’টো বই বের করেছে। দু’টোরই বিষয় ‘ইসলামের ভয়ংকর পুনরুজ্জীবন প্রবণতা’। সেখানে আপনার কথা বিস্তারিত আছে। বই দু’টিকে ইতিহাসের রেফারেন্স তালিকায় শামিল করা হয়েছে।
–ইসলামের বিরুদ্ধে, আমার বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়াবার জন্যেই তো?
–কাউকে গালি দিতে হলে তাকে গালি দেয়ার মত বড় করে তুলতে হয় এবং তা করতে গিয়ে ঘৃণা ছড়াবার সাথে সাথে প্রশংসা ছড়াবার কাজও হয়ে যায়।
–বাঃ বোন! তোমার খুব বুদ্ধি! তোমার সাথে তো আরও কথা বলতে হবে।
কথাটা শেষ করেই আহমদ মুসা ডঃ পল জনসনের দিকে ফিরে বলল, জনাব, আপনি এখন কি করবেন মনে করছেন?
–আমি এখন আমার সহকর্মী সবাইকে ডাকব। তারপর পুলিশে খবর দেব। তাদের বলব, এরা আমাকে কিডন্যাপ করতে এসেছিল। এ সময় আরেকটা গ্রুপ এসে আমাদের বাঁচায় এবং তারপরেই তারা চলে যায়।
আহমদ মুসার মুখে স্বস্তির হাসি ফুটে উঠল। বলল, আপনার চিন্তা ঠিক জনাব। ঘটনার এই ব্যাখ্যাই আমার মনে হয় স্বাভাবিক।
একটু থেমে আবার বলল, আপনারা কি এখানেই থাকবেন?
–হ্যাঁ, কেন? বলল ডঃ পল জনসন।
–আমার মনে হয় এখানে থাকা আপনাদের উচিত হবে না। অন্তত আগামী কয়েকদিন।
ডঃ পল জনসন মাথা নিচু করেছিল। ভাবছিল সে। বলল, তুমি ভয় করছ, ওরা আবার আসবে?
–জ্বি।
–তোমার ধারণা ঠিক। ঠিক আছে, আমার এক নিকটাত্মীয় দু’দিন হলো ইয়েরেভেনে এসেছে। তাকে কেউ এখনো চেনে নি। আমরা সেখানেই ক’দিন গিয়ে থাকতে পারবো।
এই সময় আলফ্রেড এসে ঘরে প্রবেশ করল। ঘরে চোখ পড়তেই সে আঁতকে উঠল। ভয়ে তার মুখ পাংশু হয়ে উঠল। শুকনো গলায় ডঃ পল জনসনকে লক্ষ্য করে বলল, আপনারা সব ঠিক তো স্যার?
–ঠিক আছি। তোমাকে ধন্যবাদ আলফ্রেড। তুমি——
–না স্যার, প্রশংসা এদের। এরা আমাকে বাঁচিয়েছেন, আপনাদেরকেও।
আলফ্রেড ডঃ জনসনের কথায় বাঁধা দিয়েই কথা কয়টি দ্রুত বলল। তারপর একটু থেমে ঢোক গিলে নিয়ে বলল, হোয়াইট ওলফের পক্ষে গোয়েন্দাগিরী করে যে পাপ করেছি তার কি হবে! বলে কেঁদে ফেলল আলফ্রেড।
–কেঁদো না আলফ্রেড। তোমার পাপ মোচন তুমিই করেছ। বলল ডঃ পল জনসন।
চোখ মুছে আলফ্রেড ডঃ পল জনসনের দিকে তাকিয়ে বলল, বাইরে আশপাশ থেকে কয়েকজন স্যার এসেছেন।
–তাই? দেখছি।
বলে যাওয়ার উদ্যোগ নিল ডঃ জনসন।
আহমদ মুসা বলল, তাহলে আমরা আসি জনাব।
ডঃ পল জনসন একটু থমকে দাঁড়াল। তারপর বলল, যাবে তোমরা? হ্যাঁ যেতেই তো হবে।
বলে মেয়েকে বলল, মারিয়া তোমাদের ভাইদের পেছনের দরজা দিয়ে রাস্তায় তুলে দিয়ে এস।
তারপর আহমদ মুসার মুখোমুখি হয়ে তার একটি হাত ধরে বলল, দেখা সাক্ষাত কবে কোথায় কিভাবে হবে বৎস?
একটু চিন্তা করে আহমদ মুসা বলল, সোফিয়া এ্যাঞ্জেলার মাকে বললেই আমি জানতে পারব।
–ওখানে কিছু পেলে?
–না, সোফিয়া এং তার আব্বা দু’জনেই কয়েকদিন ধরে নিখোঁজ।
‘কি বলছ, ওরাও নেই’ বলেই ডঃ পল জনসন হঠাৎ নীরব এবং পাথরের মত স্থির হয়ে গেল।
‘আসি জনাব’ বলে বেরিয়ে আসতে আসতে আহমদ মুসা আলফ্রেডকে বলল, ওসমান এফেন্দীকে গাড়ির কাছে পাঠিয়ে দাও।
মারিয়া জনসন আগে আগে চলছিল। পেছনে আহমদ মুসা এবং আলী আজিমভ।
তিনজনই নীরব। এক সময় নীরবতা ভেঙ্গে মারিয়া বলল, আচ্ছা ভাইজান, একটা প্রশ্ন করব।
–কর। বলল আহমদ মুসা।
–এই যে আব্বা বললেন, ইসলামই একমাত্র পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থা। এ দাবি তো সব ধর্মই করবে। তাহলে এ ঝগড়ার সমাধান কি? সেটা কি লড়াই?
–না, জ্ঞানার্জন। সৃষ্টি-প্রকৃতি ও বিশ্বব্যবস্থা সম্পকে জ্ঞানার্জন করতে হবে এবং সেই সাথে নিরপেক্ষভাবে সত্যের সন্ধান করতে হবে। তাহলে বুঝা যাবে, শেষ নবীর মাধ্যমে প্রেরিত ধর্ম ইসলামই মানবতার সর্বশেষ এবং পরিপূর্ণ জীবন-বিধান।
এক জায়গায় মারিয়া থমকে দাঁড়াল। বলল, এসে গেছি ভাইজান। এই তো রাস্তা।
আহমদ মুসা রাস্তায় উঠে বলল, তাহলে আসি বোন।
–আবার কবে দেখা হবে?
–জানি না, তবে হবে নিশ্চয়ই।
মারিয়া আহমদ মুসার দিকে দু’পা এগিয়ে এসে বলল, আমি সব কিছুই হারাতে বসেছিলাম। ভাইয়া আমাকে রক্ষা করেছেন। কিছুই করতে পারলাম না ভাইয়ার জন্যে।
–ভাইয়ার জন্যে আল্লাহর কাছে দোয়া কর বোন।
–ইসলামে কিভাবে দোয়া করে তা তো আমি জানি না।
–বেশ শিখবে। তবে এটুকু জান, ইসলামে বান্দাহ ও আল্লাহর মধ্যবর্তী কেউ নেই। তুমি যা চাইবে আল্লাহকেই সরাসরি বলবে।
–বেশ তাই করবো। আল্লাহকে বলবো, ভাইয়াকে যেন তাড়াতাড়ি আমাদের মাঝে ফিরিয়ে আনেন।
‘বেশ, তাই করো’ বলে আহমদ মুসা রাস্তায় পা বাড়াল। তার পেছনে আলী আজিমভ।
অনেকটা এগিয়ে আহমদ মুসা পেছনে তাকাল। দেখল, মারিয়া তখনও সেখানে একটা অন্ধকার ছায়ার মত স্থির দাঁড়িয়ে।
আহমদ মুসা ধীর কণ্ঠে বলল, দুনিয়াতে এত মায়া, এত মমতা থাকতে এত হানাহানি, রক্তপাত কেন আজিমভ!
‘যে রহমান নামের প্রকাশ এই মায়া, এই মমতা, তার রাজত্ব দুনিয়াতে এখনও কায়েম হয়নি বলেই হয়তো’- ধীর স্বগতঃ কণ্ঠে বলল আলী আজিমভ।