৯. ককেশাসের পাহাড়ে

চ্যাপ্টার

সোফিয়ার মা এবং আলফ্রেডের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য একত্রিত করে আহমদ মুসা সিদ্ধান্ত পৌঁছল, হোয়াইট ওলফের হেডকোয়ার্টার আরাগাত পর্বতের আমবার্ড দুর্গেই হবে।
তারপর পুরাতত্ত্ব বিষয়ক লাইব্রেরী ঘেঁটে আহমদ মুসা আমবার্ড দুর্গের ইতিহাসও পেল। আমবার্ড দুর্গ আরাগাত পর্বতের ক্রমশ সুন্দর ও সুপ্রশস্ত ধাপে অবস্থিত, যার চারদিক বেষ্টন করে ঝর্ণা-সৃষ্ট একটি পাহাড়ী নদী ধাপটির দক্ষিণ পাশের একটা অংশ দিয়ে জলপ্রপাতের আকারে গভীর উপত্যকায় নেমে যাচ্ছে।
আমবার্ড দুর্গের মুখে একটি কাঠের ব্রীজ। এই কাঠের ব্রীজ দিয়ে নদী পার হয়ে দুর্গে প্রবেশ করা যায়।
দুর্গে সাধারণের যথেচ্ছ প্রবেশাধিকার নেই। দুর্গাভ্যন্তরে পবিত্র সানাইন গীর্জা আর্মেনিয়ার ধর্মনেতাদের সাপ্তাহিক প্রার্থনা মন্দির হিসেবে ব্যবহৃত। আর্মেনিয়ার ক্যাথলিক গীর্জা-সমিতির হেডকোয়ার্টারও এই আমবার্ড দুর্গে।
এইভাবে সবদিক থেকেই আমবার্ড দুর্গ হোয়াইট ওলফের হেডকোয়ার্টার হবার সবচেয়ে অনুকূল স্থান। আর্মেনিয়ার খৃস্টান ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা মহান সেন্ট গ্রেগরীর প্রতিষ্ঠিত প্রথম গীর্জা ছিল এই আমবার্ড দুর্গে। সেই প্রথম গীর্জার স্থানেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সানাইন গীর্জা। সানাইন গীর্জার ফাদার সেন্ট পল সেন্ট গ্রেগরীর উত্তর পুরুষ।
সবদিক থেকে নিশ্চিত হবার পর আহমদ মুসা আমবার্ড দুর্গে অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল।
সেদিন সন্ধা ৬টা। সন্ধ্যার কাল অন্ধকারে চারদিক তখন ঢাকা পড়েছে। আহমদ মুসার জীপ এসে আমবার্ড দুর্গ থেকে পুরানো রাস্তাটা যেখানে এসে হাইওয়েতে মিশেছে সেখানে থামল।
গাড়ি থেকে প্রথমে নেমে এল আহমদ মুসা। তারপর আলী আজিমভ। সবশেষে ড্রাইভিং সিট থেকে ওসমান এফেন্দী।
তিন জনেরই দেহ কাল পোশাকে ঢাকা। কাল ট্রাউজার, কাল দীর্ঘ ওভারকোট এবং আর্মেনিয়ার ধর্মনেতারা যে ধরনের লম্বা কাল টুপি পরেন মাথায় সে ধরনের টুপি।
গাড়ি থেকে নামার পর গাড়িটা তারা রাস্তার পাশে একটা টিলার আড়ালে রেখে দিল।
তারপর তিন ছায়ামূর্তি আরাগাত পর্বতগামী পুরানো রাস্তাটা ধরে দ্রুত হাঁটতে শুরু করল। তিনজনের হাত ওভারকোটের পকেটে রিভলভারের বাঁটে।
আরাগাত রোড ধরে মাইল সাতেক এগুবার পর আহমদ মুসা থমকে দাঁড়াল, সেইসাথে সাথী দু’জনও। সমতল রাস্তার সমতল যাত্রা প্রায় শেষ। আর সিকি মাইল পর্যন্ত পথটা কোন রকমে গেছে, তারপরেই পর্বতারোহণ শুরু। আজ দিনের বেলা ওসমান এফেন্দী এ এলাকাটা ঘুরে গেছে, ট্যাক্সি ড্রাইভারের ছদ্মবেশে। খৃস্টান ফাদার, ধর্মনেতারা প্রায়ই আমবার্ড দুর্গে আসা-যাওয়া করেন। বিশেষ করে রোববার এবং সোমবার দিনের প্রথম ভাগে তাদের আসা-যাওয়া। সুতরাং এ সময় ট্যাক্সিওয়ালারা বেশ কাজ পায়। ওসমান এফেন্দী এমনি একজন ফাদারকে আজ দুপুরেই আরাগাত পর্বত থেকে ফিরতি দেবার সুযোগ পেয়েছিল। সেই সুবাদে ওসমান এফেন্দী এসেছিল আরাগাত রোডের দক্ষিণ প্রান্ত পর্যন্ত।
আরাগাত রোড যেখানে শেষ হয়েছে, সেখান থেকে একটা পথের চিহ্ন ধাপে ধাপে পাহাড়ের উপরে উঠে গেছে, সেখানে রাস্তার পূর্ব পারে একটা বড় টিলা। টিলার দক্ষিণপারে আরাগাত পাহাড়ের গায়ে একটা বড় গুহা। রাস্তা থেকে কিংবা দূর থেকে গুহাটা দেখা যায় না। টিলাটা যেন গুহা মুখের দরজা-সবার চোখ থেকে গুহাটাকে আড়াল করে রেখেছে। গুহার মুখে একটা ক্রস। দিনের বেলা গুহাতে দু’একজন খৃস্টান সাধুকে সব সময়ই দেখা যায়। মাঝে মাঝে গুহামুখ থেকে ধোঁয়াও ওঠে। সাধুরা ওখানে রান্না-বান্নাও করে। মানুষ মনে করে ওটা সাধুদের পবিত্র আস্তানা-দুনিয়াত্যাগী সাধুদের সাধনার একটা স্থান। মানুষ যারা এদিকে আসে, তারা সাধুদের কিছু নজর-নিয়াজ দিয়ে পুণ্য কামাবার চেষ্টা করে। ওসমান এফেন্দীও সেই উসিলায় গুহামুখে গিয়েছিল। যখন দেখতে এসেছে, সবটাই দেখা দরকার।
গুহামুখ থেকে ভেতরে তখন একজন সাধু বসে ছিল। লম্বা দাড়ি, লম্বা চুল। গলায় বিরাট ক্রস ঝুলানো। যোগাসনে বসা, চোখ বন্ধ। ওসমান এফেন্দীর মনে হয়েছিল, তার উপর চোখ পড়ার পরেই যেন সাধু বাবাজী চোখ বন্ধ করলেন।
রীতি মোতাবেক সাধু বাবাজীর কাছে হাঁটু গেড়ে বসে সামান্য কিছু টাকা বিনীতভাবে তার সামনে রেখেছিল।
সাধু বাবাজীর শরীর দেখে ওসমান এফেন্দী বিস্মিত হয়েছিল। তার চোখে, মুখে-চেহারায় কৃচ্ছতার কোন ছাপ নেই। বরং মুষ্টিযোদ্ধার মত পেটা শরীর থেকে যেন শক্তির প্রাচুর্য ঠিকরে পড়ছে। উপঢৌকন দিয়ে উঠে দাঁড়াবার সময় ওসমান এফেন্দী সাধু বাবাজীর দিকে চেয়ে ভাবছিল, এ কেমন সাধুরে বাবা!
উঠে দাঁড়াবার পর নিচের দিকে চাইতেই সাধু বাবাজীর ডান উরুর পাশে পড়ে থাকা একটা জিনিসের দিকে নজর পড়তেই ওসমান এফেন্দী ভীষণ চমকে উঠল। সাধু বাবাজী দূরবীন দিয়ে কি করেন? ভালো করে তাকিয়ে দেখল, দূরবীনটা সাধারণ নয়। জার্মানীর সর্বাধুনিক মডেলের এ দূরবীনটির ইনফ্রা রেড আই রাত্রেও দেখতে পায়।
আহমদ মুসা আরাগাত রোডের উপর থমকে দাঁড়িয়ে ওসমান এফেন্দীর দেয়া এসব তথ্যের উপর আরেকবার চোখ বুলাচ্ছিল। আহমদ মুসা পরিষ্কার বুঝেছিল, আরাগাত পর্বতের ঐ গুহাটা আসলে হোয়াইট ওলফের অগ্রবর্তী ঘাঁটি। আর ঐ সাধুরা হোয়াইট ওলফের অগ্রবর্তী প্রহরী। আহমদ মুসা খুশিই হয়েছে, আমবার্ড দুর্গেই হোয়াইট ওলফের হেডকোয়ার্টার, এ বিষয়ে আর কোন সন্দেহ নেই।
আহমদ মুসা আলী আজিমভ ও ওসমান এফেন্দীকে লক্ষ্য করে ফিসফিসিয়ে বলল, রাস্তা ধরে আর সামনে এগুনো যাবে না, ওদের দূরবীনের ইনফ্রা রেড লেন্সে ধরা পড়ে যাব।
একটু থেমে আহমদ মুসা বলল, আরাগাতের সেই গুহাটা রাস্তার বাম পাশে না?
জ্বি, হ্যাঁ। বলল ওসমান এফেন্দী।
রাস্তা থেকে বাম পাশে উঠে গেল আহমদ মুসা। আলী আজিমভ এবং ওসমান এফেন্দী তাকে অনুসরণ করল।
বাম পাশের মাটি ছোট-বড় পাথরে ঢাকা, উঁচু-নিচু, এবড়ো-থেবড়ো।
রাস্তা থেকে অনেকখানি পূর্বদিকে এগিয়ে তারা দক্ষিণ দিকে আরাগাত পর্বত অভিমুখে যাত্রা শুরু করল। হামাগুড়ি দিয়ে সামনে এগুচ্ছে। তাদের লক্ষ্য আরাগাতের সেই গুহা।
কিছুক্ষণ চলার পর আহমদ মুসা চোখে দূরবীন লাগিয়ে সামনেটা পর্যবেক্ষণ করল। ইনফ্রা রেড দূরবীন সামনের অন্ধকার স্বচ্ছ করে দিয়েছে। দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে কিছু দূরে সেই বড় টিলাটা দেখতে পেল। ওই টিলার দক্ষিণ পাশেই গুহা।
আরও কিছুক্ষণ চলল। গুহায় তারা সামনের দিক থেকে নয়, পূর্ব পাশ থেকে পৌঁছতে চায়। যাতে করে ওদের সন্ধানী চোখ ফাঁকি দেয়া যায়। আহমদ মুসারা এদের চোখ এড়িয়েও পাহাড়ে উঠতে পারতো, আমবার্ড দুর্গে যেতে পারতো। কিন্তু শত্রুকে পেছনে অক্ষত রেখে সামনে এগুনো আহমদ মুসা ঠিক মনে করেনি।
আরও কিছুটা এগিয়ে আহমদ মুসা চোখে আবার দূরবীন লাগাল। দেখল, টিলাটা এবার সোজা ডানপাশে এসে গেছে। অর্থাৎ তারা এখন গুহার সমান্তরালে পূর্ব দিকে অবস্থান করছে। এখন তারা গুহা লক্ষ্যে পশ্চিম দিকে এগুতে পারে।
এবার প্রায় ক্রলিং করে তারা সামনে এগুতে লাগল। নিঃশব্দে সাপের মত এগুচ্ছে। তিনজন পাশাপাশি।
গুহার কাছাকাছি পৌঁছে চোখে আবার দূরবীন লাগায় আহমদ মুসা। গুহামুখটা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। কেউ সেখানে নেই। গুহার ভেরতটা দেখতে হলে আরও অনেকখানি এগিয়ে গুহার লম্বা-লম্বি পৌঁছতে হবে।
আহমদ মুসা দূরবীনের চোখটা উত্তর দিকে টিলার দিকে সরিয়ে নিল। টিলার মাথায় দূরবীনের চোখটা স্থির হতে চমকে উঠল আহমদ মুসা। কাল ওভারকোটে সর্বাঙ্গ ঢাকা একজন লোক বসে। তার দৃষ্টি উত্তরে রাস্তার দিকে। তার কাঁধে ঝুলছে খাট-মোটা ব্যারেলের রাইফেল। ওর নিউট্রন বুলেট আশে-পাশে কোথাও এসে পড়লেও রক্ষা নেই। সংগে সংগেই মৃত্যু, নিঃশ্বাস ফেলার মত সময়ও দেয় না।
এসময় রাস্তার দিক থেকে একটা কুকুরের ঘেউ ঘেউ আওয়াজ শুনা গেল। ঘেউ ঘেউ আওয়াজটা ছুটে আসছে এদিকে।
আহমদ মুসা প্রমাদ গুনল। লুকিয়ে এসে মানুষের চোখ এড়ানো যায়, গন্ধবিশারদ কুকুরকে তো ফাঁকি দেওয়া যায় না।
টিলায় বসা লোকটা কুকুরকে এদিকে ছুটে আসতে দেখে এদিকে ফিরে বসেছে।
আহমদ মুসা বাম হাতে দূরবীন আর ডান হাতে হাসান তারিকের দেয়া লেসার পিস্তল তুলে নিয়েছে।
কুকুরটি একদম কাছে চলে এসেছে। প্রচন্ড রকম ঘেউ ঘেউ করছে। চোখ দু’টো জ্বলছে ভাটার মত। যেন লাফিয়ে পড়বে।
আজিমভ পিস্তল তাক করেছিল তার দিকে।
আহমদ মুসা হাত নাড়ল গুলি না করার জন্যে।
কুকুরটা যতক্ষণ এখানে আছে, ততক্ষণ নিউট্রন বুলেট এদিকে আসবে না।
এসময় গুহামুখে একজন লোক দেখা গেল। একটা শীষ দিল সে। সংগে সংগে শিক্ষিত কুকুর পেছন দিকে ছুটতে লাগল। গুহা মুখের লোকটির মুখে মুখোশ, হাতে রিভলভার।
কুকুরটি যখন ছুটে সরে যাচ্ছে, সে সময় টিলার সেই লোকটি, আহমদ মুসা দেখল, নিউট্রন রাইফেলটি হাতে তুলে নিচ্ছে।
আহমদ মুসা বুঝল, সেই ভয়ংকর সময়টি দ্রুত ঘনিয়ে আসছে। আর তাকে সময় দেয়া ঠিক হবে না।
আহমদ মুসা বাম হাতে দূরবীনটি চোখে ধরে ডান হাতে লেসার পিস্তলটি তাক করল টিলার সেই লোকটির দিকে।
সাদা পিস্তলের লাল ট্রিগার বোতামটি আস্তে টিপে দিল আহমদ মুসা। সংগে সংগে চোখ ধাঁধানো আলোর এক সরল রেখা বেরিয়ে গেল পিস্তল থেকে।
পরমুহূর্তেই টিলার লোকটি গড়িয়ে পড়ে গেল টিলার মাথা থেকে।
গুহামুখের লোকটি হতচকিত হয়ে ছুটে গেল টিলা থেকে পড়া লোকটির কাছে।
পরমুহূর্তেই তাকে নিউট্রন রাইফেল হাতে উঠে দাঁড়াতে দেখা গেল। তার চোখে শংকা নয়, আগুন। নিউট্রন রাইফেলটি সে তাক করল কুকুরটি ছুটে এসে যেখানে থমকে দাঁড়িয়েছিল সেদিকে।
আহমদ মুসা লেসার পিস্তলটি তাক করেই ছিল, সেই লাল বোতামে চাপ দিল আহমদ মুসা। বোতাম থেকে আঙুল সরে যাবার আগেই লোকটি পাকা ফলের মত মাটিতে ঝরে পড়ল।
আহমদ মুসারা কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল। কেউ আর বেরিয়ে এল না। নিশ্চয় আর কেউ নেই।
তারপর আহমদ মুসা উঠে দাঁড়াল এবং গুহার দিকে এগিয়ে চলল।
গুহায় ঢোকার আগে প্রাণহীন পড়ে থাকা লোক দু’টির ওভারকোটের কলার ব্যান্ড উল্টিয়ে পরীক্ষা করল। দেখল, সাদা নেকড়ের হিংস্র মুখ জ্বলজ্বল করছে। আহমদ মুসার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল, তারা ঠিক জায়গাতেই এসেছে।
লোক দু’জনের পকেট সার্চ করে কিছু টাকা ছাড়া কিছুই পাওয়া গেল না। একজনের পকেটে একটা ছোট্ট চিরকুট পাওয়া গেল, তাতে একটা টেলিফোন নাম্বার লেখা। আহমদ মুসা চিরকুটটি পকেটে ফেলে গুহায় প্রবেশ করল।
গুহাতেও কিছু পাওয়া গেল না। আহমদ মুসার মনে পড়ল হোয়াইট ওলফের এ পর্যন্ত যতলোক মারা গেছে, তাদের কারো পকেটে তেমন কিছু পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ তারা সর্বাবস্থায় সাবধান থাকে।
দু’জনের কাছে দু’টি ওয়াকি টকি ছিল। সে দু’টি ওয়াকি টকি এবং পিস্তল ও নিউট্রন রাইফেল নিয়ে উপরে উঠার জন্যে তৈরি হল আহমদ মুসারা। দু’টো স্টেনগানও ছিল। সে দু’টি একটা পাথরের নিচে লুকিয়ে রাখল।
তারপর আহমদ মুসা, আলী আজিমভ এবং ওসমান এফেন্দী আরাগাত পর্বতের গা বেয়ে উঠা শুরু করল। পর্বতের গা কেটে আমবার্ড দুর্গ পর্যন্ত ধাপে ধাপে রাস্তা তৈরি হয়েছিল এক সময়। কিন্তু রাস্তাটি আজ আর তেমন নেই। চিহৃ আছে মাত্র। তবু সেই আঁকা-বাঁকা পথ ধরে পুরানো ধাপে ধাপে পা রেখে উঠা বেশ আরামদায়ক।
আহমদ মুসারা অতি সন্তর্পণে অনেকটা হামাগুড়ি দিয়ে সেই পথ ধরে উঠতে লাগল। সামনে আহমদ মুসা, তার পেছনে আলী আজিমভ এবং সবশেষে ওসমান এফেন্দী।
আঁকা-বাঁকা রাস্তাটি পর্বতের গা বেয়ে দেড় হাজার ফিট চলার পর দু’টি শৃংগের মাঝখানে একটি সংকীর্ণ লেনে গিয়ে শেষ হয়েছে।
লেনটির কাছাকাছি তখন পৌঁছেছে আহমদ মুসারা। এই সময় আহমদ মুসার কাঁধে ঝুলানো ওয়াকি টকি কথা বলে উঠল। চমকে উঠল আহমদ মুসা। থমকে দাঁড়াল এবং কানের কাছে তুলে নিল ওয়াকি টকিটা।
‘জন, জন……..’ কেউ যেন ওয়াকি টকিতে ডেকে চলেছে জন নামের একজন লোককে।
আহমদ মুসা বুঝল, টিলার উপর পাহারায় সেই লোকটিই ছিল এই জন। কান খাড়া করল, আরও সতর্ক হলো। নিশ্চয় আমবার্ড দুর্গের কল এটা।
‘জন জন’ বলে কিছু ডাক দেয়ার পর জনের সাড়া না পেয়ে কাউকে লক্ষ্য করে লোকটি বলল, শালা জন নিশ্চয় ঘুমিয়েছে, কি সর্বনাশ! তোমরা ক’জন যাও দেখ।
‘টক’ করে কানেকশান বন্ধ হয়ে গেল ওপার থেকে।
আহমদ মুসা পেছন দিকে মাথা ঘুরিয়ে বলল, তোমরা তাড়াতাড়ি কর, এখনি এপথে ওদের ক’জন আসবে।
লেনের মুখটি এখনও প্রায় ৫০ গজ উপরে। তাড়াহুড়া করে উঠার উপার নেই। একেতো অন্ধকার, তার উপর সিঁড়িগুলো ভাঙা। তাড়াহুড়া করতে গেলে বিপদ ঘটতে পারে।
পাহাড়ের গা বেয়ে রাস্তাটি ধাপে ধাপে উঠে যেখানে গিয়ে শেষ হয়েছে, সেখানে দু’শৃংগের মাঝখানে অনেকখানি প্রশস্ত জায়গা। সে জায়গাটায় রয়েছে ছোট-বড় বেশ কিছু টিলা। এই প্রশস্ত জায়গাটি কয়েকগজ দক্ষিণে এগিয়ে সংকীর্ণ হয়ে লেন আকারে দুই শৃংগের মাঝখান দিয়ে দক্ষিণে এগিয়েছে। আহমদ মুসা ইনফ্রা রেড় দূরবীন দিয়ে উপরে যতদূর দেখা যায় দেখেই বুঝেছিল, ওখানে পৌঁছতে পারলে শত্রুর নজর এড়াবার মত আড়াল পাওয়া যাবে।
কিন্তু আহমদ মুসা শেষ ধাপটা পেরিয়ে দুই শৃংগের মাঝখানের সেই প্রশস্ত জায়গাটার প্রান্তে ডান পা রেখে উঠে দাঁড়াতেই তার চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল সামনে তাকিয়ে। লেন থেকে বেরিয়ে এল তিনটি ছায়ামূর্তি। ওরাও থমকে দাঁড়িয়েছে আহমদ মুসাকে দেখে।
আহমদ মুসা দেখল, ওদের হাতে অস্ত্র উঠে আসেনি। বুঝল, ওরাও সম্ভবত পরিস্থিতির অভাবনীয় দৃশ্যে হতচকিত হয়েছে।
কিন্তু আহমদ মুসার হাতে অস্ত্র উঠে আসার সাথে সাথে ওদের হাতেও অস্ত্র উঠে এসেছে।
আহমদ মুসা এম-১০ হাতে নিয়েই বামপাশে ছুড়ে দিল নিজের দেহটাকে। স্টেনগানের একঝাঁক গুলি উড়ে গেল মাথার উপর দিয়ে। গুলি করার জন্যে আহমদ মুসা মুহূর্তকাল দেরি করলে গুলি করতে পারলেও সে ওদের গুলির মুখে পড়ত। আহমদ মুসা মনে মনে আবার ওদের প্রশংসা করল। অদ্ভুত ক্ষিপ্র ওরা, সময় এক মুহূর্তও নষ্ট করে না।
আহমদ মুসা দেহটাকে ছুঁড়ে দিয়েই ভূমি স্পর্শ করেই চেপে ধরল এম-১০-এর ট্রিগার।
ওরা বুঝে উঠে স্টেনগানের ব্যারেল নিচে নামানোর আগেই এম-১০ থেকে ছুটে যাওয়া গুলির ঝাঁক গিয়ে ওদের ওপর আপতিত হলো। ওরা পাশাপাশি দাঁড়িয়েছিল তিনজন। তিনজন এক সাথে মুখ থুবড়ে পড়ে গেল মাটিতে।
আহমদ মুসা উঠে দাঁড়াল।
আলী আজিমভ এবং ওসমান এফেন্দীও তখন উঠে এসেছে। ওরা উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলল, মুসা ভাই আপনি ভাল আছেন তো?
‘আলহামদুলিল্লাহ, তোমরা এস, দেখি ওদের’ বলে আহমদ মুসা দ্রুত চলল ঐ তিনটি লাশের দিকে। তার পিছনে আলী আজিমভ এবং ওসমান এফেন্দীও।
তিনটি লাশেরই কলার-ব্যান্ডে সাদা নেকড়ের মুখ আঁকা পাওয়া গেল অর্থাৎ তারা হোয়াইট ওলফের লোক।
ওদের পরনে কাল ট্রাউজার, কাল ওভারকোট এবং মাথায় বিশেষ ধরনের কাল পশমী টুপি।
আহমদ মুসা বলল, এদের কাল টুপি পরে নিলেই তো এদের পোশাকের সাথে আমাদের আর কোন পার্থক্য থাকে না।
ওদের তিনটি টুপি আহমদ মুসারা তিনজনে পরে নিল।
পকেটে ওদের কিছুই পাওয়া গেল না।
লাশ তিনটি লেনের একপাশে একটু আড়ালে সরিয়ে রেখে ওরা লেন ধরে সামনে এগুলো।
লেনের দু’ধারে পাহাড়ের খাড়া দেয়াল হঠাৎ করেই শেষ হয়ে গেল।
থমকে দাঁড়াল আহমদ মুসা। কি যেন শব্দ কানে আসছে। কান পাতল আহমদ মুসা। হ্যাঁ, ঝর্ণার জমাটবদ্ধ শব্দ। বেশ কিছু ঝর্ণা উপর থেকে নিচে নেমে আসার সময় মিশ্র যে শব্দ তোলে ঠিক তেমনটা।
আহমদ মুসা ধীরে ধীরে লেনের মুখে গিয়ে বাইরে উঁকি দিল। তার চোখে ইনফ্রা রেড দূরবীন। দেখল সে, লেনটা কয়েকগজ নিচে গিয়ে উপত্যকায় মিশেছে। সামনে নজর পড়তেই ইতঃস্তত অনেক আলো দেখতে পেল। আমবার্ড দুর্গের বিখ্যাত উপত্যকা তাহলে এটাই, মনে মনে বলল আহমদ মুসা। তিনদিকে পাহাড় ঘেরা উপত্যকাটিকে বিশালই বলা যায়।
আহমদ মুসার চোখ সরে এল একেবারে কাছে সামনে।
সামনে যেখানে লেনটা গিয়ে উপত্যকায় মিশেছে সেখানে একটা পাথরের ঘর। ঘরের পাশ দিয়ে লম্বা কাল ফিতার মত ওটা কি? নদী না? হ্যাঁ, নদী। তাহলে আমবার্ড দুর্গের চারদিকে ঘিরে থাকা পাহাড়ী উচ্ছলা সে নদী এটাই।
আহমদ মুসার গোটা দেহে আনন্দের একটা শিহরণ খেলে গেল। নদী পেরুলেই আলো খচিত ঐ আমবার্ড দুর্গে তারা পৌঁছতে পারবে। কিন্তু নদীর এপারে এ ঘরটা কি?
হঠাৎ আহমদ মুসার মনে একটা চিন্তা ঝিলিক দিয়ে উঠল, আমবার্ড দুর্গে প্রবেশের পথে এটাই প্রথম চেকপোস্ট কি? এটাই কি আমবার্ড দুর্গে প্রবেশের পথ? ব্রীজটা কি এখানেই?
আহমদ মুসা পকেট থেকে আমবার্ড দুর্গের স্কেচটা বের করল। নজর বুলাল ভাল করে। আমবার্ড দুর্গের উত্তর পাশ দিয়ে প্রবাহিত নদীর উপর যেখানে ব্রীজের চিহ্ন আঁকা সেখান থেকে একটা ডট লাইন উত্তরে এগিয়ে গেছে, মিশেছে গিয়ে হাইওয়েতে। আহমদ মুসা খুশি হল, তারা ডট লাইনটির শেষপ্রান্তে ব্রীজের মুখে এখন দাঁড়িয়ে। সম্ভবত নদীর এপারের ঐ পাথুরে ঘরটিই ব্রীজের গেটরুম। এ ঘরের মধ্যে দিয়ে ব্রীজে উঠা যাবে। আহমদ মুসা হাসল, নদীর এপারে ঐ ঘরটিই তাহলে হোয়াইট ওলফের প্রতিরোধ ঘাঁটি। পাহারা কি ঘরটি ঘিরেই? বাইরেও কি ওঁৎ পেতে থাকা আরও পাহারা আছে?
আহমদ মুসা আলী আজিমভ ও ওসমান এফেন্দীর সাথে করণীয় সম্পর্কে পরামর্শ করল। তারপর বিসমিল্লাহ বলে প্রথমে সামনে পা বাড়াল আহমদ মুসা।
হামাগুড়ি দিয়ে এগুচ্ছিল ওরা।
দু’পাশে ছোট-বড় অনেক পাথর। ছোট ছোট টিলাও বেশ আছে। এর মধ্যে দিয়েই পথের রেখা এগিয়ে সামনে গেছে। ঠিক পথ বলা যায় না। দু’পাশের তুলনায় কিছুটা সমতল ভূমি মাত্র।
গেটরুম থেকে তখনও তারা গজ পঞ্চাশেক দূরে। গেটরুমের দরজা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। দরজা বন্ধ। ঠিক দরজার উপরে একটি বাল্ব। আলো জ্বলছে। আলোটা দরজার সামনের অনেকখানি জায়গা আলোকিত করছে। কিন্তু সেই আলো চারদিকের অন্ধকার যেন আরও গাঢ় করে তুলেছে।
আহমদ মুসা যখন গেটরুমটি পর্যবেক্ষণ করছিল, সেই সময় ঘরের দু’পাশের অন্ধকার থেকে দু’জন লোক বেরিয়ে এসে দরজার সামনে দাঁড়াল। সংগে সংগেই দরজাটা খুলে গেল।
ঘরের ভেতরেও আলো। কিন্তু কোন লোক দেখা গেল না। লোক দু’জন ঘরের ভেতরে ঢুকে গেল। সাথে সাথেই দরজা বন্ধ হয়ে গেল। দরজা খুলে যাওয়া ও বন্ধ হওয়া দেখে আহমদ মুসা পরিষ্কার বুঝল, দরজা খোলা ও বন্ধ করার স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা আছে। কিন্তু লোক এসেছে, দরজা এখন খুলতে হবে এটা ভেতর থেকে বুঝল কি করে? লোক দু’টি তো কোন সংকেত দেয়নি, দরজাও তারা স্পর্শ করেনি।
হঠাৎ আহমদ মুসার মনে পড়ল, লোক দু’টি আলোতে এসে কিছুক্ষণ দাঁড়াবার পর দরজা খুলে গেছে। তাহলে কি দরজায় টেলিভিশন ক্যামেরা সেট করা আছে?
কথাটা মনে হবার সাথে সাথেই মন তার বলে উঠল, হোয়াইট ওলফের হোডকোয়ার্টারের জন্যে এ ধরনের ব্যবস্থাই স্বাভাবিক।
আহমদ মুসা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। আর একটু হলেই তারা আলোর নিচে গিয়ে পড়ত এবং তাদের আগমনের কথা শত্রুর জানা হয়ে যেত।
আহমদ মুসা পাশে আলী আজিমভকে তার সন্দেহের কথা জানাল এবং বলল যে, দরজা দিয়ে নয়, বিকল্প পথে আমাদের ব্রীজে পৌঁছতে হবে।
আলী আজিমভ তার কথায় সায় দিয়ে বলল, লোক দু’জন চলে গেল কেন?
আহমদ মুসা একটু চিন্তা করে বলল, প্রহরীদের ওটা ডিউটি পরিবর্তন হতে পারে। যদি তাই হয়, তাহলে নতুন দু’জনকে আমরা শীঘ্রই আসতে দেখব।
কথা শেষ করেই আহমদ মুসা রাস্তা থেকে ডান দিকে নেমে পড়ল। পাথর ডিঙিয়ে টিলা পাশ কাটিয়ে গেটরুমের দিকে এগিয়ে চলল তারা।
আহমদ মুসারা গেটরুমের উত্তর দেয়ালের গোড়ায় গিয়ে পৌঁছল। পশ্চিমে অল্প নিচে দিয়ে পাহাড়ি নদী বয়ে যাচ্ছে। ফ্লাশ ওয়েভের মত প্রচন্ড বেগে বয়ে চলেছে নদী। নদীর ওপারের তীর বরাবর দুর্গের উঁচু দেয়াল। ২৫ফুট উঁচু পাথরের দেয়ালের উপর দিয়ে আবার কাঁটাতারের বেষ্টনি। দেখেই আহমদ মুসা বুঝল, কাঁটাতারের ঐ বেষ্টনি বিদ্যুতায়িত।
গেটরুমের দেয়াল ১০ফিটের মত উচু। এ দেয়ালের সাথে ব্রীজের ইস্পাতের দেয়াল একসাথে মিশে গেছে। ব্রীজটা চারদিক থেকে ঘেরা সুড়ঙ্গের মত। ব্রীজের উপরেও ইস্পাতের ছাদ দেখল আহমদ মুসা।
আহমদ মুসা মনে মনে প্রশংসাই করল, হোয়াইট ওলফ তাদের ঘাঁটিকে সত্যই দুর্ভেদ্য করে তুলেছে।
দুর্ভেদ্য বটে, কিন্তু কোন দুর্গই অজেয় নয়-মনকে বুঝ দিল আহমদ মুসা।
আহমদ মুসা পকেট থেকে সিল্কের কর্ড বের করে ছুঁড়ে দিল গেটরুমের ছাদে। তারপর টেনে দেখল, হুকটি ঠিকমতই আটকে গেছে ছাদের দেয়ালে।
আহমদ মুসা কর্ড বেয়ে প্রথমে ছাদে উঠল। পরে আলী আজিমভ ও ওসমান এফেন্দী উঠে এল।
আহমদ মুসা বলল, চল আমরা ব্রীজের ওপারে গিয়ে ছাদ কেটে ব্রীজে নামব।
ব্রীজের ছাদ দিয়ে ওরা চলে এল ব্রীজের পশ্চিম মাথায়।
ব্রীজের ছাদের পশ্চিম প্রান্ত দুর্গের দেয়ালের ভেতরে ঢুকে গেছে। ব্রীজের ইস্পাতের ছাদ এবং দুর্গের দেয়াল ভাল করে পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে আহমদ মুসার চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। দেখল, ব্রীজের ছাদের ঠিক উপরে দুর্গের দেয়ালের দুই বর্গফুট পরিমাণ একটা অংশ ইস্পাতের পুরু পাত দিয়ে ঢাকা। আহমদ মুসা ভাবল, দুর্গ থেকে বেরুবার এটা একটা চোরা দরজা হতে পারে।
ইস্পাতের পাতটি টানাটানি করে, টোকা দিয়ে আহমদ মুসা বুঝল ভেতর থেকে হুক দিযে আটকানো।
ভালোভাবে পরীক্ষা করার পর আহমদ মুসা পকেট থেকে ‘লেসার কাটার’ বের করে লেসার রশ্মি দিয়ে ইস্পাতের গরাদটির ডানপাশের খাড়া-খাড়ি প্রান্তটি কেটে ফেলল। তারপর গরাদটির উপরের প্রান্ত ধরে টান দিতেই গরাদটি খুলে গেল।
গরাদ খুলে যেতেই এক গরম বাতাস বেরিয়ে এল। ওপারে ঘুটঘুটে অন্ধকার। বদ্ধ বাতাস বেরিয়ে যাবার অল্প কিছুক্ষণ সুযোগ দিয়ে আহমদ মুসা ভেতরে ঢুকে গেল। তারপর আলী আজিমভ এবং ওসমান এফেন্দীও।
ওপারে গিয়ে তারা যেখানে দাঁড়াল তা একটি সিঁড়ির মুখ। সিঁড়িটি এক অন্ধকার ঘরে নেমে গেছে। আহমদ মুসা ইনফ্রা রেড গগলস দিয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে দেখল একটা শূন্য ঘর। সিঁড়ি নেমে গিয়ে ঘরের যেখানে শেষ হয়েছে তার সামনেই দরজা।
আহমদ মুসা ঘরে নামার জন্যে সিঁড়িতে পা রাখতে যাবে, এমন সময় সিঁড়ির সামনে যে দরজা তার উপর একটি বাল্ব জ্বলে উঠল।
চমকে উঠল আহমদ মুসা, তাদের উপস্থিতি ওদের কাছে ধরা পড়ে গেছে। কিন্তু কিভাবে? তাহলে গরাদের সাথে কি কোন ইলেকট্রনিক সংকেত ব্যবস্থা ছিল? অস্বাভাবিক নয়। গোপন দরজার নিরাপত্তা বিধানের একটা ব্যবস্থা ওদের অবশ্যই থাকবে।
আলী আজিমভ ফিসফিস করে বলল, বাল্ব জ্বলে উঠল, আমরা কি ধরা পড়ে গেছি?
হ্যাঁ। দরজার সাথে কিংবা ঘরের কোথাও টেলিভিশন ক্যামেরার চোখ আছে। ওদের চোখ এড়িয়ে আমরা এক কদমও এগুতে পারবো না।
কথা শেষ করে আহমদ মুসা পকেট থেকে সাইলেন্সার লাগানো ছোট পিস্তলটা বের করে একটু ঝুঁকে পড়ে তাক করল আলো ছড়ানো বৈদ্যুতিক বাল্বটাকে। নিঃশব্দে একটা গুলি এগিয়ে গেল। ঠুস করে একটা শব্দ হল। সেই সাথে কাঁচের বাল্ব ভেঙে পড়ার শব্দ উঠল। ঘর আবার অন্ধকারে ডুবে গেল।
আহমদ মুসা দ্রুত সিঁড়ি ভেঙ্গে নামতে শুরু করল। মেঝেতে পা দিয়েই ছুটল দরজার দিকে। দরজা ধরে টানল। খুলতে পারলো না। বাইরে থেকে কি বন্ধ দরজা? হঠাৎ একটা চিন্তা আহমদ মুসার মনে ঝিলিক দিয়ে উঠল, দরজা কি গেটরুমের দরজার মতই স্বয়ংক্রিয়?
ঘেমে উঠল আহমদ মুসা উত্তেজনার চাপে। তাহলে কি তাদের মিশন ব্যর্থ হবে?
মনকে সান্ত্বনা দিল আহমদ মুসা। ওদের এই অতি সতর্কতাই প্রমাণ করে ওরা ভীত, ওদের দুর্বলতা আছে ওদের হেডকোয়ার্টারের রক্ষা ব্যবস্থায়।
আহমদ মুসা দ্রুত তার পকেট থেকে বের করল ‘লেসার কাটার’। বাটের নিচের লাল সুইচটা টিপে দরজার একটা অংশের চারদিক দিয়ে ঘুরিয়ে নিল। ইস্পাতের দরজার বিচ্ছিন্ন অংশটি সরিয়ে রেখে বেরিয়ে এল ঘর থেকে আহমদ মুসা। তার সাথে সাথে আলী আজিমভরাও।
দরজা থেকে বেরিয়ে লম্বা করিডোরে পড়ল। করিডোরটি দক্ষিণ দিকে এগিয়ে গেছে। করিডোর আলোকিত। আলোর উৎসের দিকে তাকিয়ে দেখল, করিডোরটি দক্ষিণ দিকে এগিয়ে যেখানে পশ্চিম দিকে বাঁক নিয়েছে সেখানে উত্তরমুখী একটা সার্চ লাইট।
আহমদ মুসা এম-১০ হাতে তুলে নিল সার্চ লাইটের চোখ অন্ধ করে দেবার জন্যে। এমন সময় করিডোরের দক্ষিণ মাথায় চার-পাঁচজন লোককে উদ্যত স্টেনগান হাতে আবির্ভূত হতে দেখা গেল। তারা ছুটে আসছে করিডোর দিয়ে। ওদের চোখ পড়েছে আহমদ মুসাদের উপর। ওরা দৌঁড়াতে দৌঁড়াতেই স্টেনগানের ব্যারেল ঠিক করে নিচ্ছিল। হাত ওদের স্টেনগানের ট্রিগারে। আহমদ মুসার এম-১০ এর নল উপরে উঠেই ছিল। শুধুমাত্র কিঞ্চিত নামিয়ে ট্রিগারে চাপ দিল। করিডোর ধরে ছুটে গেল এক পশলা গুলি। মুহূর্তে ওরা পাঁচজন লোকই আছড়ে পড়ল করিডোরে।
আহমদ মুসা ট্রিগার থেকে হাত না সরিয়ে এম-১০ এর মাথা সার্চ লাইটের চোখ বরাবর তুলে নিল। মুহূর্তে অন্ধ হয়ে গেল সার্চ লাইটের চোখ। অন্ধকারে ডুবে গেল করিডোর।
আহমদ মুসা ছুটলো করিডোর ধরে দক্ষিণ দিকে।
করিডোরটি দক্ষিণ দিকে কিছুদূর এগোবার পর পশ্চিম দিকে বাঁক নিয়েছে।
আহমদ মুসা করিডোর ধরে পশ্চিমে এগিয়ে চলল। এ করিডোরটি অন্ধকার। দু’পাশ দিয়ে সারিবদ্ধ কক্ষ। দরজা বন্ধ। করিডোর পশ্চিমে অনেক দূর এগুবার পর প্রশস্ত আলোকোজ্জ্বল আরেকটা করিডোরে গিয়ে পড়েছে।
আহমদ মুসা করিডোরটিতে পা দিতে গিয়েও পা টেনে নিল। নিজেকে দেয়ালের আড়ালে লুকিয়ে রেখে করিডোরটিতে উঁকি দিল।
উত্তর-দক্ষিণে লম্বা করিডোর। করিডোরটি উত্তর দিকে এগিয়ে পশ্চিম দিকে বাঁক নিয়েছে। আর দক্ষিণ দিকে এগিয়ে নিকটেই একটা সুন্দর সাদা গোলাকার বিল্ডিং-এর বারান্দায় গিয়ে শেষ হয়েছে।
আহমদ মুসা চোখ সরাতে যাচ্ছিল এমন সময় দেখল বিল্ডিংটির সামনের কক্ষের খোলা দরজা দিয়ে চারজন লোক বাইরে এসে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে কি কথা বলতে লাগল। তাদের চোখে উত্তেজনা, তারা করিডোরটির দিকে তাকাচ্ছে ঘন ঘন। তাদের তিনজনের হাতে স্টেনগান, একজনের হাতে নিউট্রন রাইফেল।
আহমদ মুসা চোখ সরিয়ে নিচ্ছিল, এমন সময় উত্তর দিক থেকে অনেকগুলি পায়ের শব্দ তার চোখ টেনে নিয়ে গেল উত্তর দিকে। দেখল, চারজন লোক ছুটে আসছে। তাদের হাতে উদ্যত স্টেনগান।
দু’দিক থেকেই সমান বিপদ। একপক্ষকে রুখতে গেলে অন্য পক্ষ ছুটে আসবে।
আহমদ মুসা নিজের কাঁধ থেকে নিউট্রন রাইফেল নামিয়ে হাতে নিতে নিতে বলল, আলী আজিমভ তুমি উত্তর দিক সামলাও, আমি দক্ষিণ দিকে দেখছি।
আলী আজিমভের হাতে এম-১০ রেডি ছিল। সংগে সংগেই সে করিডোরের উত্তর দিকের দেয়াল ঘেঁষে শুয়ে পড়লো। এক ঝলক দেখে নিয়ে এম-১০ এর মাথা বাড়িয়ে দিল। তারপর ট্রিগারে চাপ দিয়ে মাথাটা দেয়ালের বাইরে নিল সে।
আলী আজিমভের এম-১০ যখন গর্জে উঠল, তার আগেই মনে হয় আলী আজিমভ দক্ষিণ দিকে ঘরের দরজার সামনে বারান্দায় দাঁড়ানো লোকদের চোখে পড়ে গিয়েছিল। বিদ্যুৎবেগে ওরা সোজা হয়ে দাঁড়াল, চোখের পলকে ওদের স্টেনগান ওদের হাতে এসে গিয়েছিল। সেই নিউট্রন রাইফেলধারীই তার রাইফেল তাক করেছিল।
আহমদ মুসার নিউট্রন রাইফেল তার অনেক আগেই তার হাতে এসে গিয়েছিল। দেয়ালের আড়ালে দাঁড়িয়ে লক্ষ্যও সে স্থির করে নিয়েছিল। আলী আজিমভের এম-১০ গর্জে উঠার সাথে সাথেই আহমদ মুসা তার নিউট্রন রাইফেলের ট্রিগারে চাপ দিল। পর পর দু’বার।
নিউট্রন রাইফেলের প্রথম বুলেটটি বিষ্ফোরিত হলো বিল্ডিংটির বারান্দায়। আর দ্বিতীয়টি খোলা দরজা পথে চলে গেল ঘরের ভেতরে।
ভোজবাজির মতই ঘটল ঘটনা। নিউট্রন বুলেট বিস্ফোরিত হবার পরমুহূর্তেই চারজন যে যেভাবে ছিল ঝরে পড়ল মাটিতে। মাটিতে পড়ার পর একটু নড়লও না। একটা আঘাত সূঁচের মত বিদ্ধ হলো আহমদ মুসার মনে। কত ভয়াবহ মারণযন্ত্র তৈরি করেছে মানুষ। ট্রিগার টেপার সুযোগ সে আগে নিতে না পারলে নিউট্রন বুলেটের বিষ নিঃশ্বাসে তারাই ঐভাবে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ত। জীবন-মৃত্যু এত কাছাকাছি!
আহমদ মুসা রাইফেল নামিয়ে উত্তর দিকে তাকাল। দেখল, আলী আজিমভ উত্তর দিক থেকে ছুটে আসা চারজনের সামাল ভালভাবেই দিয়েছে। স্তুপের মত চারটি লাশ পড়ে আছে জড়াজড়ি করে।
আর কোন দিক থেকে কেউ এলো না।
আহমদ মুসা বলল, চল আমরা আগে ঐ সাদা সুন্দর গোলাকার বিল্ডিংটা দেখবো।
–বিল্ডিংটার উপরে ওয়্যারলেস এ্যান্টেনা দেখা যাচ্ছে। নিশ্চয় ওটা কোন অফিস হবে। বলল আলী আজিমভ।
নিউট্রন বুলেটের ক্রিয়া শেষ হবার জন্যে আরও কয়েক মিনিট অপেক্ষা করার পর তারা বিল্ডিংটার দিকে এগিয়ে গেল।
উঁচু বেদীর উপর উঁচু একতলা বিল্ডিং। সিঁড়ির চারটি ধাপ পেরিয়ে ওরা বারান্দায় উঠল। দরজার সামনেই পড়ে থাকা লাশের পাশ কাটিয়ে ওরা ঘরে ঢুকলো। আহমদ মুসার নির্দেশে ওসমান এফেন্দী বারান্দায় পাহারায় থাকল স্টেনগান উঁচিয়ে। পোশাকে তাকে একজন হোয়াইট ওলফের প্রহরীর মতই দেখাচ্ছে।
ঘরটি গোলাকার। সাদা দেয়াল, সাদা কার্পেটে মোড়া। দরজা দিয়ে ঢুকতেই সামনের অর্থাৎ দক্ষিণ দেওয়ালে সাদা নেকড়ের মুখ ব্যাদানকারী হিংস্র মুখের এক বিশাল প্রতিকৃতি। প্রতিকৃতির নিচে ঘর লম্বালম্বি লম্বা সাদা টেবিল দেয়ালের সাথে সেঁটে তৈরি। লম্বা টেবিলের এক পাশে পাশাপাশি চারটি টিভি স্ক্রীন। আর এক পাশে কয়েকটি বাঘা ধরনের ওয়্যারলেস সেট।
আহমদ মুসা ঘরে প্রবেশ করে আরেক দফা শিউরে উঠল। দেখল, লম্বা টেবিলের সামনে বসা চার চেয়ারে চারজন এবং ঘরের মাঝখানে বড় একটা চেয়ারে আরেকজন ঢলে পড়ে আছে। যেন ঘুমিয়ে। ঘুমের মত করেই তাদের অজান্তে তারা নীরব মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে।
আহমদ মুসা বুঝল, দ্বিতীয় নিউট্রন বুলেটটা দরজা দিয়ে ঘরে প্রবেশ করেছিল। তারই কাজ এটা।
একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস বেরিয়ে এল আহমদ মুসার বুক থেকে। ভাবল, মানুষ অন্যকে মারার জন্য খাদ খুঁড়ে, কিন্তু সে খাদে সেও যে পড়তে পারে-মানুষ তা মোটেই চিন্তা করে না।
ঘরটির চারদিকে একবার চোখ বুলিয়েই বুঝল, হোয়াইট ওলফের কেন্দ্রীয় কন্ট্রোল রুম এটা। আনন্দে মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল আহমদ মুসার।
টেলিভিশন স্ক্রীনগুলো সজীব। স্ক্রীনগুলোয় ঘাঁটির বিভিন্ন কক্ষ ও স্থানের ছবি ভেসে উঠেছে। টেলিভিশন স্ক্রীনগুলোর পাশেই সুইচ প্যানেল। প্রতিটি সুইচের নিচে আর্মেনীয় ভাষায় স্থানের নাম লেখা আছে। যেমন, গেটরুম, গেটব্রীজ, এত নম্বর কক্ষ, এত নম্বর করিডোর, প্রিজন ব্রীজ, প্রিজন ইত্যাদি। প্রতিটি কক্ষ, প্রতিটি করিডোরের জন্যে ভিন্ন ভিন্ন সুইচ আছে। সে সুইচ টিপলে আলোও জ্বলে, টেলিভিশন ক্যামেরাও সক্রিয় হয়।
আহমদ মুসার দৃষ্টি একটি টেলিভিশন স্ক্রীনের উপর গিয়ে আঠার মত আটকে গেল। দেখল, একটি কক্ষের মেঝেতে প্রৌঢ় একজন সৌম্যদর্শন মানুষ রক্তে ভাসছে। তার বুকের উপর পড়ে একটি তরুণী কাঁদছে। মুখ দেখা যাচ্ছে না। তাদের পাশেই রক্তে ভাসছে আরেকটি দেহ। তার মুখের দিকে তাকিয়ে চমকে উঠল আহমদ মুসা। এ তো মাইকেল পিটার–হোয়াইট ওলফের প্রধান! মাইকেল পিটারের ছবি সে এরকমই দেখেছে। তার এই ভাবনায় ছেদ পড়ল। টিভি স্ক্রীনে সে দেখল, দরজা ঠেলে জনা সাতেক লোক প্রবেশ করলো ঘরে। তার মধ্যে দু’জনের হাতে পিস্তল। অন্যদের হাতে স্টেনগান। তাদের চোখে-মুখে বিস্ময় ও আতঙ্ক। তাদের সামনের দু’জনের একজন মুখ ফাঁক করলো বিরাট রকমের। মনে হয় চিৎকার করে কিছু যেন বলল। সঙ্গে সঙ্গে মেয়েটি সেই লাশের বুক থেকে মুখ তুলল এবং দ্রুত হাত বাড়িয়ে পাশে পড়ে থাকা রিভলভারটি নিতে গেল। কিন্তু চিৎকার করে ওঠা লোকটিও লাফ দিল পিস্তলের লক্ষ্যে।
আহমদ মুসা আর দেখতে পারলো না। তার হঠাৎ যেন মনে হল মেয়েটি সোফিয়া এ্যাঞ্জেলা এবং সেই প্রৌঢ় সৌম্যদর্শন লোকটি সোফিয়া এ্যাঞ্জেলার আব্বা সেন্ট জর্জ সাইমন।
আহমদ মুসা আর মুহূর্ত দেরি করলো না। প্যানেল বোর্ডের দিকে একবার তাকিয়ে ঘরের নাম্বারটি দেখে নিয়ে দ্রুত আলী আজিমভকে বলল, তোমার দায়িত্বে এখন কন্ট্রোলরুম, আমি আসছি। বলে মুসা দ্রুত বেরিয়ে এল ঘর থেকে।
প্যানেল বোর্ডে সুইচের অবস্থান এবং এ পর্যন্ত দেখা কক্ষসমূহের নম্বর দেখে আহমদ মুসা বুঝে নিয়েছিল ঘটনা যেখানে ঘটছে সেই কক্ষটি পশ্চিম দিকে হবে এবং খুব দূরে হবে না।
আহমদ মুসা কন্ট্রোল রুম থেকে বেরিয়ে পশ্চিমমুখী একটা করিডোর ধরে ছুটতে লাগল। করিডোরটি অন্ধকার।
করিডোরটি কিছুটা এগিয়ে একটা উত্তর-দক্ষিণ লম্বা বারান্দায় গিয়ে শেষ হয়েছে। বারান্দার পশ্চিমে বড় একটা লন। তার পরেই আর একটা বিল্ডিং। বিল্ডিংটা একতলা এবং খুব বড় নয়। ঘরে আলো জ্বলছে। পর্দাবিহীন কাঁচের জানালা দিয়ে উজ্জ্বল আলো দেখা যাচ্ছে।
আহমদ মুসা বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছিল। বারান্দা থেকে একটা পাথর বিছানো রাস্তা বেরিয়ে সামনের ঐ বিল্ডিং এবং উত্তর পাশ দিয়ে পশ্চিম দিকে এগিয়ে গেছে। আহমদ মুসা তাড়াহুড়ার জন্যে খেয়াল করেনি, বারান্দা থেকে কয়েক গজ পশ্চিমে রাস্তার উপর দাঁড়িয়ে আছে তিনজন স্টেনগান হাতে। লনে আলো জ্বলছে। সে আলোতে বারান্দাও আলোকিত।
আহমদ মুসার চোখ যখন ও তিনজনের উপর পড়েছে, তখন দেখল ওরা স্টেনগান হাতে তুলে নিয়েছে। আহমদ মুসার হাতেও এম-১০। কিন্তু তা তুলবার সময় নেই।
সামনেই ছিল বারান্দার প্রশস্ত পিলার। আহমদ মুসা নিজের দেহকে ছুড়ে দিল বারান্দার উপর সেই পিলারের আড়ালে। সংগে সংগেই এক ঝাঁক গুলি বেরিয়ে গেল পাশ দিয়ে। একটু দেরি হলে বুকটা তার ঝাঁঝরা হয়ে যেত।
আহমদ মুসা নিজেকে টেনে নিয়ে গেল পিলারের গোড়ায়। তারপর পিলারের সাথে গা মিশিয়ে উঠে দাঁড়াল আহমদ মুসা। গুলি তখন বৃষ্টির মত এসে আঘাত করছে পিলারকে।
আহমদ মুসা এম-১০ এর নল একটু বের করে পিলারের গায়ের সাথে চেপে ধরল ট্রিগার। গুলি বর্ষণরত অবস্থায় নলটা একবার উপরে, আরেকবার নিচে নামিয়ে নিল। বেরিয়ে গেল গুলির বৃষ্টি।
মনে হল ওপক্ষের গুলিবৃষ্টিতে একটা ছন্দ পতন হলো। অর্থাৎ ফাঁকা জায়গায় দাঁড়ানো ওরা স্থান পরিবর্তন করছে। এটাই চেয়েছিল আহমদ মুসা।
বিদ্যুৎ ঝলকের মত তার ডান হাত বেরিয়ে গেল পিলারের বাইরে। ট্রিগার চেপে ধরে একবার ঘুরিয়ে নিল এম-১০ এর নল এবং তারপরেই মাথা বের করল পিলারের আড়াল থেকে। দেখল, দু’জন পড়ে গেছে মাটিতে, আর একজন ছুটে আসছে বারান্দার দিকে। সেও দেখে ফেলেছে আহমদ মুসাকে। কিন্তু তার স্টেনগানের নল আহমদ মুসার দিকে উঠে আসার আগেই আহমদ মুসার এম-১০ এর গুলি বর্ষণরত মুখ লোকটির দিকে ঘুরে গেল। স্টেনগানসমেত উপুড় হয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে গেল লোকটি।
আহমদ মুসা বেরিয়ে এল পিলারের আড়াল থেকে। ওদের দিকে ফিরে তাকাবার মত সময় নষ্ট না করে আহমদ মুসা ছুটল সামনের বিল্ডিংটার দিকে।
বিল্ডিংটা পশ্চিমমুখী এল টাইপ। ‘এল’ এর বাঁকা অংশটা উত্তরদিকে। বিল্ডিং এর এই উত্তর পাশ ঘেঁষেই এগিয়ে এসেছে রাস্তাটা।
আহমদ মুসা রাস্তা থেকে উঠে এল বিল্ডিং এর বাঁকা অংশের বারান্দায়। দেখল, বিল্ডিংটা যেখানে গিয়ে দক্ষিণ দিকে বাঁক নিয়েছে, তারপরের দরজাটা খোলা। ভেতরের একফালি আলো এসে বারান্দায় পড়েছে।
আহমদ মুসা লাফ দিয়ে এগিয়ে চলল দরজার দিকে। আহমদ মুসা যখন বিল্ডিং এর বাঁকে গিয়ে পৌঁছেছে, সে সময়েই ওরা ছয়জন বেরিয়ে এল দরজা দিয়ে। সামনেই রবার্ট র‍্যাফেলো। তার পেছনে আরও পাঁচজন। জর্জ জ্যাকব তখনও দরজার আড়ালে।
ওদের দৃষ্টি প্রথমত ছিল সামনের দিকে। কিন্তু ডান দিকে ফিরে তাকাতেই নজর পড়ল আহমদ মুসার উপর। আহমদ মুসার এম-১০ মেশিন রিভলভার তখন ওদের দিকে স্থির লক্ষ্যে উদ্যত।
–তোমরা পিস্তল স্টেনগান সব ফেলে দাও।
আহমদ মুসার শান্ত, কঠোর কণ্ঠের নির্দেশ চারদিকের নীরবতাকে ভেঙ্গে দিল খান খান করে।
কিন্তু পিস্তল স্টেনগান তাদের হাত থেকে পড়ল না। ভয়ের বদলে তাদের চোখ-মুখ আরও কঠোরই হয়ে উঠল। বিদ্যুৎ গতিতে রবার্ট র‍্যাফেলোর পিস্তল ঘুরে আসছিল আহমদ মুসার দিকে।
আহমদ মুসার বাজের মত চোখকে ফাঁকি দেয়া সম্ভব হয়নি রবার্ট র‍্যাফেলোর। তার পিস্তল ঘুরে এসে স্থির হবার আগেই আহমদ মুসার তর্জনী চেপে বসেছিল এম-১০ এর ট্রিগারে। গুলির ঝাঁক বেরিয়ে গেল এম-১০ এর নল থেকে। ঝাঁঝরা হয়ে গেল গজ চারেক সামনে দাঁড়ানো দেহগুলো।
মুহূর্ত কয়েক অপেক্ষা করল আহমদ মুসা। টেলিভিশন স্ক্রীনে লম্বা-ভারিমত আরেকজনকে দেখা গিয়েছিল সে কই? নিশ্চয় সে দরজার আড়ালে। সুযোগের সন্ধান করছে।
আহমদ মুসা দেয়াল ঘেঁষে এক পা এক পা করে দরজার দিকে এগুলো। দরজার কাছে গিয়ে আরও মুহূর্ত কয়েক দেরি করল, না, কারো সাড়া নেই।
আহমদ মুসা মুখ বাড়িয়ে দরজায় উঁকি দিল। দেখল, মেয়েটি দরজার দিকে এগিয়ে আসছে। তার বিস্ফারিত দৃষ্টি লাশের স্তুপের দিকে। ভয়ে তার মুখ ফ্যাকাশে।
আহমদ মুসা তার এম-১০ এর নল নামিয়ে বলল, বোন, আর একজন লোক ছিল সে কই?
মেয়েটি ঘরের দক্ষিণ দিকে অংগুলি সংকেত করে বলল, ঐ দিক দিয়ে পালিয়েছে।
আহমদ মুসা লাফ দিয়ে ঘরে ঢুকল। কিন্তু দক্ষিণ দিকে তাকিয়ে কিছু বুঝতে পারলো না। কাঠের পার্টিশন ওয়াল, কোন দরজার চিহ্ন কোথাও নেই।
মেয়েটি এগিয়ে গিয়ে দেয়ালে একটা সুইচ টিপে বলল, এই সুইচ টিপে সে পালিয়ে গেছে।
সুইচ টেপার সাথে সাথে কাঠের পার্টিশনটি অনেকখানি সরে গেল।
আহমদ মুসা সে দরজা পথে ঐ ঘরে ছুটে গেল। দেখল, ওপারের দরজা খোলা।
আহমদ মুসা ফিরে এসে বলল, ও পালিয়েছে। হোয়াইট ওলফের কাউকে এই প্রথম পালাতে দেখলাম। কে ছিল সে? কোন নেতা নিশ্চয়ই?
–জর্জ জ্যাকব, হোয়াইট ওলফের ডেপুটি প্রধান। বলল মেয়েটি।
–এ হোয়াইট ওলফের প্রধান মাইকেল পিটার না?
–জ্বি।
— তুমি তো সোফিয়া এ্যাঞ্জেলা?
–জ্বি। বিস্ময়ে চোখ কপালে তুলে উত্তর দিল সোফিয়া এ্যাঞ্জেলা।
সোফিয়া এ্যাঞ্জেলা বিস্ময়ের সাথে দেখছে আহমদ মুসাকে। কে এই যুবক? শিশুর মত সরল, পবিত্র মুখ। চোখ দু’টি অদ্ভুত রকমের উজ্জ্বল। প্রত্যেকটি কথা ও চলাফেরার মধ্যে শালীনতা ও সৌন্দর্য্য। কিন্তু এই লোকটিকে শত্রুর মোকাবিলায় কি কঠোর দেখা গেল!
–ইনি তোমার আব্বা সেন্ট সাইমন না?
–জ্বি। আপনি আমাকে, আমার আব্বাকে চেনেন কি করে? বলল সোফিয়া এ্যাঞ্জেলা।
–বুঝতে পারছি, তুমি মাইকেল পিটারকে মেরেছ, কিন্তু তোমার আব্বা নিহত হলেন কি করে?
সোফিয়া সব ঘটনা আহমদ মুসাকে বলল। শেষ দিকে কান্নায় গলা তার রুদ্ধ হয়ে গেল।
আহমদ মুসা তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলল, আর আধা ঘন্টা আগে যদি আসতে পারতাম!
সোফিয়া এ্যাঞ্জেলা চোখ মুছে বলল, আব্বা বাঁচেন নি, কিন্তু আমাকে বাঁচিয়েছেন।
একটু থেমে সোফিয়া এ্যাঞ্জেলা বলল, আপনি কে? আমাদের চেনেন কি করে আপনি?
–আমি আহমদ মুসা, সালমান শামিলের ভাই।
–মধ্য এশিয়ার আহমদ মুসা? কপালে চোখ তুলে প্রশ্ন করলো সোফিয়া এ্যাঞ্জেলা।
–হ্যাঁ।
–আপনিই সেই মহান বিপ্লবী?
আহমদ মুসা কোন জবাব দিল না।
সোফিয়া এ্যাঞ্জেলাই আবার বলল, এতক্ষণে মনের প্রশ্নটার জবাব পেলাম, আহমদ মুসা ছাড়া হোয়াইট ওলফের প্রধান ঘাঁটিকে এভাবে কে পদানত করতে পারে!
–আল্লাহ সাহায্য করেছেন, বলল আহমদ মুসা।
একটু থেমে আহমদ মুসা বলল, সালমান শামিল কোথায়?
আহমদ মুসার কণ্ঠে উদ্বেগের সুর।
সোফিয়া এ্যাঞ্জেলার চোখে মুখে অন্ধকার নেমে এল। বলল, আমি ওর কোন খোঁজ করতে পারি নি। সে এই ঘাঁটিতেই থাকবে।
একটু থেমে বলল, ওরা মরিয়া হয়ে তার কোন ক্ষতি করবে না তো? সোফিয়া এ্যাঞ্জেলার কথা কাঁপছে। তার মুখ ফ্যাকাশে।
–আল্লাহ সাহায্য করবেন বোন। চল আমরা কন্ট্রোল রুমে যাই। সেখান থেকে গোটা ঘাঁটিটা একবার পর্যবেক্ষণ করা যাবে। তারপর করণীয় ঠিক করব।
বলে আহমদ মুসা দরজা দিয়ে বেরিয়ে এল।
সোফিয়া যাবার আগে পিতার লাশের দিকে ফিরে একবার থমকে দাঁড়াল।
আহমদ মুসা তা দেখতে পেল। বলল, ভেব না বোন, আমরা সব ব্যবস্থাই করব।
আহমদ মুসা আগে চলছে। সোফিয়া এ্র্যাঞ্জেলা তার পেছনে।
চলতে চলতে সোফিয়া বলল, আপনি কিন্তু আমার একটা প্রশ্নের জবাব দেননি। আপনি আমাদের চিনলেন কি করে? সালমান ছাড়া আমাদের তো আর কেউ চেনে না।
–ডঃ পল জনসন আমাকে সব বলেছেন। তারপর তোমার সাথে দেখা করার জন্যে তোমার বাড়িতে যাই। সেখানে তোমার মা’র কাছ থেকে তোমার হারিয়ে যাবার কথা শুনি।
মায়ের কথায় সোফিয়ার মুখ বেদনার্ত হয়ে গেল। তার পিতার কথাও এ সময় মনে পড়ল। চোখে পানি এসে গেল তার। বলল, মা কেমন আছেন? খুব বুঝি কাঁদছেন মা?
–খুব স্বাভাবিক বোন। মায়েরা তো মা-ই।
নরম, মমতাপূর্ণ কথা আহমদ মুসার।
আহমদ মুসার মমতাভেজানো স্বর সোফিয়ার অন্তর স্পর্শ করল। অপরিচিত লোকটির প্রথম সম্বোধন থেকেই মনে হচ্ছে, বড় ভাইয়ের মত কত আপন! কত পবিত্র ব্যবহার! সোফিয়ার দিকে সে চোখ তুলছেই না। সালমান শামিলের মধ্যেই এ পবিত্রতা সে দেখেছে। সত্যিকার মুসলমানরা এত ভালো! এ চরিত্র তো জগৎ জয় করবেই!
পথে সামনে আশে-পাশে অনেক রক্ত, অনেক লাশ দেখে, পাশ কাটিয়ে সোফিয়া আহমদ মুসার সাথে কন্ট্রোল রুমে প্রবেশ করল। বিস্ময়ের সাথে সে ভাবছিল, এ নরম, পবিত্র মানুষগুলো যুদ্ধে আবার এত কঠোর! একেই কি বলে জীবনের ভারসাম্যতা!
লেডি জোসেফাইন দোতলার দক্ষিণ দিকের উন্মুক্ত ব্যালকনিতে বসে ছিল। রাত তখন আটটা বাজতে যাচ্ছে।
লেডি জোসেফাইনের মুখ দারুণ উদ্বেগে পীড়িত। আধা ঘন্টাখানেক আগে হোয়াইট ওলফের একজন লোক ফাদার পলের খোঁজে তাদের বাড়িতে এসেছিল। বৈঠকখানায় লেডি, সিস্টার মেরী তার সাথে কথা বলছিল। এমন সময় সালমান শামিল সেখানে ঢুকে পড়ে। কিন্তু ঢুকেই আবার ফিরে আসে। ঐ একঝলক দেখাতেই হোয়াইট ওলফের লোক তাকে মনে হয় চিনতে পারে। সে সালমান শামিলকে দেখে চমকে উঠেছিল। এরপর লোকটা আর দেরি করেনি।
লেডি জোসেফাইন উদ্বিগ্ন তার পরিবারের জন্যে, সালমান শামিলের জন্যেও। হোয়াইট ওলফের দয়ামায়াহীন নৃশংসতার কথা সে জানে। বারে বারে ভয়ে শিউরে উঠছে সে।
সিস্টার মেরী পেছন থেকে ধীরে ধীরে এসে মায়ের কাঁধে হাত রাখল। সিস্টার মেরীর মুখও শুকনো।
ফিরে তাকিয়েই লেডি জোসেফাইন মেয়েকে কোলে টেনে নিল।
–মা, তুমি বোধ হয় খুব ভাবছ? বলল সিস্টার মেরী।
–ভাবনার কথাই তো মা!
–ভাবনার কি আছে মা, একজন অসুস্থ মানুষকে চিনে তো আর আশ্রয় দাওনি।
–আমরা তাতে বাঁচব, কিন্তু তুই কি পারবি এভাবে ভাবতে?
সিস্টার মেরী জবাব দিল না। মায়ের কোলে মুখ গুঁজে চুপ করে রইল।
লেডি জোসেফাইন মেরীর মুখটা নিজের মুখের কাছে তুলে ধরল। চোখের জলে ভেসে যাচ্ছে মেরীর মুখ।
লেডি জোসেফাইন মেয়েকে বুকে জড়িয়ে কেঁদে উঠল, একি করেছিস মা!
সিস্টার মেরীরও কান্নার বাঁধ ভেঙ্গে গেল। মাকে জড়িয়ে কান্নায় সে ভেঙ্গে পড়ল।
অনেকক্ষণ পর নিজের চোখ মুছে, মেরীর চোখ মুছে দিয়ে বলল, তুই বুদ্ধিমতি, কিছু বুঝলি না কেন তুই?
মায়ের বুকে মুখ গুঁজে মেরী বলল, আমি জানি না——।
কান্নায় তার কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে গেল।
সালমানকে কিছু বলেছিস তুই?
কি বলব?
জানে সে?
জানি না আমি।
লেডি জোসেফাইন মেরীর মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, তুই এত অবুঝ!
লেডি জোসেফাইন মেরীকে পাশে বসিয়ে বলল, সালমানকে তো আজকের ঘটনা বলিসনি।
না।
ওকে জানাতে হবে, এখনই ওকে কোথাও সরাতে হবে।
কোথায়?
অন্ততঃ এ বাড়ি থেকে অন্য কোথাও যাতে ওরা ওকে খুঁজে না পায়।
ওকে একা কোথাও পাঠাতে পারব না। মেরীর কন্ঠ ভারি।
একটু দম নিল মেরী। চিন্তা করল। বলল, মা, ওকে গীর্জায় লুকিয়ে রেখে আসি।
গীর্জায়?
লেডি জোসেফাইন একটু চিন্তা করল, দ্বিধা করল, তারপর মুখটা উজ্জ্বল করে বলল, তোর প্রস্তাবটা ভালো। তাই কর।
ঠিক এই সময় স্টেনগানের ব্রাশফায়ারের শব্দ ভেসে এল। একটানা তা চলতেই থাকল।
সালমান শামিল্ও দ্রুত এসে ব্যালকনিতে দাঁড়িয়েছে। সে উৎকর্ণ হয়ে শুনছে।
হঠাৎ ব্রাশফায়ারের শব্দ থেমে গেল।
লেডি জোসেফাইন, সিস্টার মেরী এবয়ং সালমান শামিল নির্বাকভাবে দাঁড়িয়ে আছে।
দু’মিনিটও যায় নি।
একটানা গুলি বর্ষণের আরেকটা শব্দ ভেসে এল। তারপর চুপচাপ।
লেডি জোসেফাইন ও সিস্টার মেরীর মুখ ভয়ে সাদা হয়ে গেছে। কাঁপছে মেরী।
সালমান শামিলের মুখ গম্ভীর এবং শক্ত। সে মেরীদের দিকে তাকিয়ে বলল, দু’পক্ষের মধ্যে গুলি বিনিময় হচ্ছে।
বুঝলে কি করে? শুকনো কণ্ঠে বলল লেডি জোসেফাইন।
দু’ধরনের গান ব্যবহার হয়েছে।
কথা শেষ করে একটু থামল সালমান শামিল। তারপর লেডি জোসেফাইনের দিকে তাকিয়ে বলল, আমি একটু বেরুতে চাই আম্মা।
কোথায়?
কি ঘটছে দেখা দরকার, জানা দরকার।
না বাবা, তুমি সুস্থ হওনি। গুলি গোলার মধ্যে তোমার যেয়ে কাজ নেই। তুমি একটু সরে থাক। মেরী তোমাকে গীর্জায় রেখে আসবে। অসুবিধা নেই, আমার ছেলের অফিস কক্ষে থাকবে।
কিন্তু—-
কোন কিন্তু নয়, পরিস্থিতি দেখে যা করা যায় করা হবে।
সালমান শামিল নীরব রইল।
সিস্টার মেরী বলল, মা ঠিকই বলেছেন, চলুন।
সালমান শামিল চোখ তুলল মেরীর দিকে। দেখল মেরীর দু’নীল চোখ ভরা উদ্বেগ, আকুলতা। অসহায়া হরিণীর দু’চোখের মত অতলান্ত মমতা সেখানে। সে চোখে চোখ রাখতে গিয়ে কেঁপে উঠল শামিল। সালমান শামিল নীরবে চোখ নামিয়ে নিল। বলল, চল।
সোজা সদর রাস্তা দিয়ে গেল না ওরা গীর্জায়। পেছন দরজা দিয়ে আঁকা-বাঁকা অন্ধকার গলিপথ দিয়ে ওরা চলল গীর্জার দিকে।
কারো মুখে কথা নেই।
সালমান শামিল ভাবছিল গোলাগুলির ব্যাপার নিয়ে। কি ঘটল সেখানে? কোন সেম সাইডের ব্যাপার? না ককেশাস ক্রিসেন্ট থেকে কেউ হানা দিয়েছে? কে হানা দেবে হোয়াইট ওলফের হেডকোয়ার্টারে? সে সাহস, সে শক্তি, সে বুদ্ধি কি ককেশাস ক্রিসেন্টের হয়েছে? যে অবস্থা ককেশাস ক্রিসেন্টের, তাতে উপরে আল্লাহ আর নিচে তিনিই আমাদের ভরসা। তিনি ক্রমে হাল ধরলে ককেশাস ক্রিসেন্টের ডুবন্ত তরী আবার জেগে উঠতে পারে।
নীরবতা ভাঙল মেরীই অবশেষে। বলল, আম্মা আপনাকে গীর্জায় সরিয়ে রাখছেন কেন জানেন?
–এসব গুলি-গোলা দেখে?
–না।
–তাহলে?
–তখন ড্রইংরুমে একজন লোক দেখেছিলেন, সে কে জানেন?
–না, তবে লোকটার দৃষ্টি আমার কাছে ভালো মনে হয়নি।
–লোকটা হোয়াইট ওলফের। আপনাকে চিনতে পেরেছে বলে আমার মনে হয়েছে।
–আমাকে তো বল নি? কেমন করে বুঝলে আমাকে চিনতে পেরেছে?
–আপনাকে দেখার পর আর দেরি করেনি। তার চোখ দেখেই বুঝেছি। সে চমকে উঠেছিল আপনাকে দেখে।
–আমাকে আগে বল নি কেন?
–বলতে পারিনি।
–কেন?
সিস্টার মেরী কোন জবাব দিল না প্রশ্নের। কি জবাব দেবে সে। হঠাৎ যদি কোথাও চলে যায়–এমন একটা ভয় তাকে পীড়িত করেছে। কিন্তু এই ছেলেমানুষির কথা বলবে কি করে।
কিছুক্ষণ নীরব থেকে বলল, পরে বুঝতে পেরেছি সঙ্গে সঙ্গেই আপনাকে সাবধান করা উচিত ছিল।
–অবশেষে মা-মেয়ে পরামর্শ করে আমার জন্যে গীর্জার ব্যবস্থা করেছ, এই তো! সালমান হাসল।
–আপনার ভয় করছে না?
–কেন ভয় করব? জীবনের?
–কেন, জীবনের কি ভয় নেই?
–আল্লাহ যখন মৃত্যু নির্দিষ্ট রেখেছেন, তার আগে মৃত্যু আসবে না। সুতরাং ভয় করব কেন?
–সাবধান থাকা কি ভয়?
–অবশ্যই না।
গীর্জায় এসে পড়ল ওরা। গীর্জার পেছনের দরজা খুলে ওরা গীর্জায় প্রবেশ করল।
গীর্জার পেছন অংশে প্রার্থনা-মঞ্চের সাথে লাগানো কয়েকটা কক্ষ নিয়ে ফাদার পলের অফিস। অফিসে একটা বিশ্রাম কক্ষ আছে। সেখানে শোবার খাট, ওয়ার্ড্রোব প্রভৃতি প্রয়োজনীয় সব কিছুই আছে।
সিস্টার মেরী আলো জ্বেলে চাদর ও বালিশের কভার পাল্টিয়ে বিছানাটা ঠিক করে দিল।
সালমান শামিল মাথা নিচু করে দেখছিল মেরীর কাজ। তার চোখে বেদনার একটা ছায়া। মেরী বিছানা ঠিক করে উঠে দাঁড়াল। সালমান তার মুখ নিচু রেখেই বলল, মেরী তোমাদের এত ঋণ আমি শোধ দেব কি করে?
মেরীও চোখ নিচে নামিয়ে নিয়েছিল। মাথা নিচু হয়েছিল অনেকখানি।
অনেকক্ষণ কোন কথা বলল না মেরী। অবশেষে চোখ না তুলেই বলল, দাতা-ঘাতকের পরিচয়ই কি সব? মেরীর কণ্ঠ ভারি শোনাল।
–না মেরী, আমার কথার অর্থ তা নয়, আমি বলতে চাচ্ছিলাম, তোমরা আমার জন্যে যা করেছ………
–ঠিকই বলেছেন, কাজই যেখানে বড়, হৃদয় নয় উপকার যেখানে বিবেচনার মানদন্ড, সেখানে তো এভাবেই কথা বলতে হয়। কেঁপে কেঁপে কথাগুলো বেরিয়ে এল সিস্টার মেরীর কণ্ঠ থেকে। যেন কান্না চাপার চেষ্টা করছে সে।
–আমার প্রতি অবিচার করো না মেরী। আমার কথা তোমাকে বুঝাতে পারি নি।
সিস্টার মেরী কোন উত্তর দিল না।
মাথা না তুলেই কয়েক পা এগিয়ে ফ্রিজ খুলে দেখল। তারপর পাশের স্টোররুম থেকে একটা নরমাল ওয়াটারের বোতল এনে টেবিলে রেখে বলল, নরমাল ওয়াটার থাকল, ঠান্ডা পানি খাবেন না।
তারপরে ঘুরে দাঁড়িয়ে সালমান শামিলের দিকে চোখ তুলে ম্লান হেসে বলল, আপনাকে ব্যথা দিয়েছি।
–না, তুমিই কষ্ট পেয়েছ।
সিস্টার মেরী কোন উত্তর না দিয়ে চোখ নামিয়ে বলল, এখন যাই, আসুন দরজাটা লাগিয়ে দেবেন।
গেটের দিকে কিছুটা এগিয়ে ফিরে দাঁড়িয়ে বলল, বাথরুমে গরম পানিও আছে। গরম পানি দিয়ে অজু করবেন।
দরজার কাছাকাছি পৌঁছেছে মেরী এমন সময় দরজায় কেউ নক করল এবং সঙ্গে সঙ্গে সালমানের নাম ধরে ডাকল। থমকে দাঁড়াল মেরী। তার মুখ মুহূর্তে কাগজের মত সাদা হয়ে গেল ভয়ে।
সালমান শামিল তার পাশে এসে দাঁড়াল। তার চোখেও বিস্ময়।
আবার ডাক এল সালমানের নামে।
সালমান শামিলের মন বলল, এটা শত্রুর কণ্ঠস্বর নয়। সালমান শামিল দরজা খোলার জন্যে এগিয়ে গেল।
মেরী তার সামনে গিয়ে দু’হাত বাড়িয়ে তাকে আগলে দাঁড়াল। বলল, খুলতে হয় আমি খুলব, আপনি নন।
ভয় ও উত্তেজনায় কাঁপছে মেরী।
সালমান শামিল মেরীর চোখে চোখ রেখে বলল, আমার চোখে দেখ মেরী, কোন ভয়, দুর্বলতা দেখতে পাও? মুসলমানরা মেয়েদের বিপদের মুখে ঠেলে দিয়ে পেছনে থাকে না।
একটু থেমেই একটু হেসে বলল আবার, তুমি একটু পাশে দাঁড়াও, আমি দেখি। ভয় করো না। রিভলভার আমারও আছে।
বলে সালমান শামিল বাইরের সুইচ টিপে দিয়ে ডান হাত পকেটে পিস্তলের উপর রেখে বাম হাতে দরজা খুলল।
দরজার একেবারে সামনেই ওরা দাঁড়ানো। কাল টুপি, কাল ওভারকোটে দেহ ঢাকা একজন পুরুষ। তার মুখটাই শুধু দেখা যাচ্ছে। শ্মশ্রূমণ্ডিত সুন্দর মুখ। তার স্থির দৃষ্টি সালমান শামিলের উপর নিবদ্ধ। তার দৃষ্টিতে প্রসন্নতা। তার পাশেই কাল ওভারকোট জড়ানো একটা নারী মূর্তি। তার ওভারকোটের কলার কান পর্যন্ত উঠে আসা। মাথা খোলা। তারও স্থির দৃষ্টি সালমান শামিলের উপর। সে দৃষ্টিতে তীব্র এক আবেগ এবং আকুলতা।
সালমান শামিলের দৃষ্টি মেয়েটির উপর পড়তেই ভূত দেখার মতই চমকে উঠল। মুখ থেকে অস্ফুটে বেরিয়ে এল, সোফিয়া তুমি……তুমি!
কথা শেষ করার আগেই সালমান শামিলের কণ্ঠ থেমে গেল।
সালমান শামিলের মাথায় তখনও ব্যান্ডেজ বাঁধা।
সোফিয়ার চোখ সালমান শামিলের উপর আটকে গেছে। এক অব্যক্ত আবেগে তার ঠোঁট থর থর করে কাঁপছে। দু’গন্ড বেয়ে গড়িয়ে এসেছে অশ্রু।
সোফিয়া দু’কদম এগিয়ে সালমানের আরও কাছে সরে এল। বলল, তুমি ভাল আছ তো?
সোফিয়ার আবেগরুদ্ধ কণ্ঠ থেকে কথাগুলো খুব কষ্ট করে বেরিয়ে এল। একটা উচ্ছ্বাস চাপতে সোফিয়া দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরেছে ঠোঁট।
–সোফিয়া তুমি আমবার্ড দুর্গে! আমি স্বপ্ন দেখছি না তো!
সোফিয়ার প্রশ্নের কোন জবাব না দিয়ে বলল সালমান শামিল। তার চোখে তখনও বিস্ময়ের ঘোর। সোফিয়া চোখ মুছে পাশে দাঁড়ানো লোকটির দিকে ইঙ্গিত করে বলল, ওকে চেন?
সালমান শামিল লোকটির দিকে চোখ তুলে দ্বিধাজড়িত কণ্ঠে বলল, না সোফিয়া।
লোকটি মাথার কাল টুপি খুলে ফেলল। টুপির তল থেকে তার বেরিয়ে এল উন্নত ললাট। মাথা ভর্তি কাল কোঁকড়ানো চুল। লোকটির ঠোঁট মিষ্টি হাসিতে ভরা। টুপি খুলেই বলল, আহমদ মুসা।
মুহূর্তেই সালমান শামিলের চেহারা পাল্টে গেল। চোখ-মুখ জুড়ে নেমে এল আনন্দ-আবেগের একটা বাঁধ-ভাঙ্গা তরঙ্গ। মুখ থেকে বেরিয়ে এল, আপনি…… আপনি…… আপনি আহমদ মুসা!
বলে দু’হাত বাড়িয়ে ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরল আহমদ মুসাকে। আহমদ মুসা বুকে জড়িয়ে ধরল সালমান শামিলকে। বেশ কিছুক্ষণ থাকল ঐভাবে ওরা। যেন নীরবে হৃদয়ের ভাষায় কথা বলছে ওরা দু’জন।
পরে আহমদ মুসা তাকে বুক থেকে তুলে সালমান শামিলকে একটা চুমু দিয়ে বলল, আল্লাহর হাজার শুকরিয়া সালমান। মাঝে মাঝে আমরা হতাশ হয়েছি তোমাকে আবার আমাদের মাঝে ফিরে পাওয়া সম্পর্কে।
–আমরা জানি মুসা ভাই, আল্লাহ তাঁর সৈনিক আহমদ মুসার কপালে শুধু সাফল্যই লিখে রেখেছেন।
–এভাবে কথা বলো না সালমান। দোয়া করো, দুনিয়ার মজলুম মুসলমানরা যাতে স্বাধীনতা ও স্বস্তির মুক্ত বাতাসে প্রাণভরে শ্বাস নিতে পারে।
সালমান শামিল আহমদ মুসাকে ছেড়ে দিয়ে সোফিয়ার দিকে চেয়ে বলল, তুমি মেরীকে দেখেছো?
বলে সালমান শামিল পেছন দিকে তাকালো। দেখল, দরজার ওপারে আধো আলো-অন্ধকারের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে মেরী।
সালমান ওদিকে এগিয়ে গেল। দেখল, মেরী কাঠের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে। তার মুখ ফ্যাকাশে, বিধ্বস্ত। চমকে উঠল সালমান শামিল। হৃদয়ের কোথায় যেন একটা খোঁচা লাগলো। যে আশংকা সে ক’দিন থেকে করে আসছে, তা আবার তার মধ্যে মাথা তুলল। মেরী ক্রমেই অবুঝ হয়ে পড়ছে।
যেন কিছু হয়নি এমন কণ্ঠে সালমান শামিল বলল, মেরী, আমাদের নেতা আহমদ মুসা এসেছেন।
তারপর পেছন ফিরে বলল, সোফিয়া এস, দেখ কে।
সোফিয়া ছুটে এল।
মেরীর সামনে এসে মেরীর দিকে চোখ পড়তেই মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়াল। তাকিয়ে রইল মেরীর দিকে। মেরীও চোখ তুলল। মেরীর ঠোঁটে হাসি, কিন্তু চোখের কোণায় অশ্রু। সোফিয়ার মুখে একটা কালো ছায়া ভেসে ওঠে আবার দ্রুত মিলিয়ে গেল। পরক্ষণেই সোফিয়া ঠোঁটে উজ্জ্বল হাসি টেনে জড়িয়ে ধরল মেরীকে।
–কেমন আছিস্ মেরী? বলল সোফিয়া।
–ভাল।
–সালমান শামিলকে কোথায় পেলি?
–দু’দিন আগে রাতে আমাদের বাড়ির সামনে আহত-অজ্ঞান অবস্থায় পেয়েছিলাম। দুই পুরনো বান্ধবী সোফিয়া ও মেরী কথা যেন শেষ করতে পারছিল না। একসময় আহমদ মুসা কথা বলে উঠল, দুঃখিত—সোফিয়া, এখন প্রতিটা মিনিট আমাদের জন্যে একটা দিনের সমান।
সোফিয়া মেরীকে ছেড়ে দিয়ে একটু সরে দাঁড়াল। তাকাল আহমদ মুসার দিকে।
সালমান শামিল আহমদ মুসাকে বলল, আমার উপর কি নির্দেশ মুসা ভাই?
–ককেশাসে নেতৃত্ব তোমার। ককেশাস ক্রিসেন্টের নেতৃত্ব এখন তোমাকেই দিতে হবে। আমার কোন নির্দেশ নেই, অনুরোধ আছে। মুখে মিষ্টি হাসি টেনে বলল আহমদ মুসা।
–ওসব কথা শুনিয়ে লাভ হবে না মুসা ভাই। এখন বলুন আপনার নির্দেশ।
–কন্ট্রোল রুমসহ ঘাঁটি আমাদের দখলে। কিন্তু হোয়াইট ওলফের ডেপুটি চীফ জর্জ জ্যাকব পালিয়েছে। কন্ট্রোল রুমে চল, অত্যন্ত জরুরি কাজ পড়ে আছে। কন্ট্রোল রুমের টেলিভিশন স্ক্রীনে তোমাকে এখানে দেখে সব ফেলে আমরা ছুটে এসেছিলাম। আল্লাহ আমাদের মিশন সফল করেছেন।
সালমান শামিল মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকল।
কিছু বলবে সালমান?
আজ কিছুক্ষণ আগে হোয়াইট ওলফের লোক মেরীর বাড়িতে আমাকে হঠাৎ দেখে ফেলে এবং অকস্মাৎ এ গোলাগুলির আওয়াজ শোনার পর মেরীর মা গীর্জায় আমাকে লুকিয়ে রাখার জন্যে পাঠিয়েছিল। মেরীর মাকে কিছু না বলে—-
সালমান শামিল কথা শেষ না করেই চুপ করে গেল।
আহমদ মুসা ভাবছিল।
এমন সময় মেরী এগিয়ে এসে সালমানকে বলল, আমি মাকে সব বুঝিয়ে বলব, উনি ঠিক বলেছেন। আপনি ভাববেন না, মা বুঝবেন।
সালমান শামিল চোখ তুলে তাকাল মেরীর দিকে। মেরী চোখ নামিয়ে নিল।
কথা বলল আহমদ মুসা। বলল, সালমান ঠিক বলেছে বোন। আমি ওদিকটা চিন্তা করিনি। তুমি আমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে চল তোমার বাসায়।
আহমদ মুসার কণ্ঠে নরম স্নেহের সুর।
মেরী আহমদ মুসার দিকে চোখ তুলল। ভাই ফাদার পল এবং মা লেডি জোসেফাইন ছাড়া এমন স্নেহমাখা কণ্ঠ তো আর কোথাও শুনেনি সে! মেরী চোখ নামিয়ে নিয়ে ধীরে ধীরে বলল, শুধু মা’র সাথে দেখা করার জন্যে যদি এই পরিমাণ সময় নষ্ট করেন, তাহলে আমি দুঃখ পাব।
–‘সুযোগ পেল আর বলার সৌজন্যটুকু না করেই চলে গেল’ এটা কি মানবতায় বাঁধে না? বলল আহমদ মুসা।
–বাঁধে হয়তো। কিন্তু সেটা সাধারণ ক্ষেত্রে। যুদ্ধকালীন বা কোন জরুরি পরিস্থিতিতে এটা কেউ ধরে না। তাছাড়া মা’র কাছে সৌজন্য প্রকাশের কোন প্রয়োজন নেই। তিনি সালমান সাহেবকে খুবই ভালবাসেন। সালমানের নিরাপত্তাকেই তিনি সবচেয়ে বড় করে দেখবেন।
–কিন্তু আমার খারাপ লাগছে মেরী। বলল সালমান শামিল।
–এমন খারাপ লাগার চেয়ে বাস্তবতার দাবি অনেক বড়।
সালমান শামিল মাথা নিচু করল। কোন কথা মুখে জোগাল না।
আহমদ মুসা এবং সোফিয়া এ্যাঞ্জেলাও নীরব। মেরী গীর্জার দরজা টেনে বন্ধ করে তাতে তালা লাগাল। তারপর ফিরে দাঁড়িয়ে বলল, আপনারা যান, আমি বাড়ি যাচ্ছি।
মেরীর কথার শেষ কয়েকটা শব্দ রুদ্ধ হয়ে আসা তার কণ্ঠে যেন আটকে গেল। মাথা নিচু করে কথাগুলো বলেই দৌঁড় দিল মেরী। মনে হল সে টলছে। মাথা নিচু করে, ছুটে পালিয়ে সে যেন কিছু গোপন করতে চাচ্ছে।
সোফিয়া এ্যাঞ্জেলার মুখে কোন কথা নেই। তার চোখে-মুখে একটা কালো ছায়া। রক্তিম, পাতলা ঠোঁটে তার বেদনার একটা সূক্ষ্ম কম্পন।
সালমান শামিল যখন মুখ তুলল, তার চোখে শূন্য দৃষ্টি। মুখে একটা অপ্রস্তুত ভাব। আহমদ মুসার মুখ গম্ভীর। কয়েক মুহূর্ত নীরব থাকার পর ওদের তাড়া দিয়ে বলল, এস যাই।
বলে আহমদ মুসা হাঁটা শুরু করল। সালমান ও সোফিয়াও পা তুলল তার পেছনে পেছনে। হাঁটতে হাঁটতে আহমদ মুসা বলল, ওদের কন্ট্রোল রুমের একটা গোপন ডেস্কে হোয়াইট ওলফের ঘাঁটিগুলোর ঠিকানা, টেলিফোন নাম্বার ও ওয়্যারলেস কোডসহ তাদের নেটওয়ার্কের গোটা লগ পেয়ে গেছি। এখনই আঘাত হানার উপযুক্ত সময়। ওরা জানতে পারার আগে, সরে পড়ার আগে আমাদের আঘাত হানতে হবে।
–আমরা যদি ওয়্যারলেসে এখনি বাকু, কামি, সুমগেইট, ইয়েরেভেন, আলবার্দি, লেনিনাকান ঘাঁটিতে নির্দেশ পাঠাতে পারি, তাহলে রাতের মধ্যেই সবখানে খবর পৌঁছে যাবে এবং ভোর হবার আগেই আমরা সবখানে ওদের ওপর আঘাত হানতে পারি।
–তুমি এখনও জান না সালমান, ককেশাস ক্রিসেন্ট আগের সব ঘাঁটি ছেড়ে দিয়ে নতুন ঘাঁটিতে উঠেছে। আমরা ইচ্ছে করলেও আমাদের সব ঘাঁটিতে খবর পৌঁছাতে পারব না। তবে তুমি যা বলেছ বাকু, কামি, সুমগেইট, ইয়েরেভেন, আলবার্দি, লেলিনাকান, কিরোভাকান প্রভৃতি প্রধান ঘাঁটিগুলোর সাথে এখানে আমবার্ড দুর্গে আসার আগে আমাদের যোগাযোগ হয়েছে। আমরা ওদের কাছে নির্দেশ পৌঁছাতে পারি।
–আমরা ঘাঁটিগুলো পরিবর্তন করলাম কেন?
–শুধু তো ঘাঁটি নয়, ককেশাস ক্রিসেন্টের সব পরিচিত ব্যক্তিত্বকে আন্ডারগ্রাউন্ডে যেতে বলা হয়েছে। এসব করা হয়েছে ককেশাস ক্রিসেন্টের সব তৎপরতা ওদের চোখ থেকে আড়াল করার জন্যে। ওরা আমাদের জানত বলে ইচ্ছেমতো আঘাত করতো। কিন্তু আমরা ওদের জানতাম না, ফলে কিছু করতেও পারতাম না।
–একেই বলে নেতৃত্ব মুসা ভাই। আপনি দু’তিন দিনে যুদ্ধের মোড় একদম ঘুরিয়ে দিয়েছেন। এ সহজ বিষয়গুলোও আমরা আগে চিন্তা করতে পারিনি।
একটু থামল সালমান শামিল। তারপর বলল, আমার বিস্ময় এখনও কাটেনি মুসা ভাই, সোফিয়া এ্যাঞ্জেলাকে আপনি পেলেন কোথায়, আমবার্ড দুর্গের সন্ধান কি করে পেলেন, কেমন করে জানলেন এখানেই আমি বন্দী আছি, আর সিংহের এই অতি শক্তিশালী গুহায় কি করেই বা ঢুকলেন!
–তোমাদের স্যার ডঃ পল জনসন এবং সোফিয়া এ্যাঞ্জেলার মা আমাকে সাহায্য করেছেন। সোফিয়ার মা এবং ডঃ পল জনসনের এ্যাটেনডেন্ট আলফ্রেড যে তথ্য দিয়েছেন, তাতেই আমি স্থির নিশ্চিত হয়েছিলাম, আমবার্ড দুর্গই ওদের হেড কোয়ার্টার এবং এখানেই তোমাকে বন্দী করে রাখা হয়েছে।
সোফিয়ার মা আপনাকে সাহায্য করেছে? কেন? আপনি এদের চিনলেনই বা কিভাবে?
সোফিয়ার মুখ বেদনায় মলিন। সেও আগ্রহের সাথে শুনছিল আহমেদ মুসার কথা।
আহমদ মুসা সালমান শামিলের কথার জবাব দিতে গিয়ে বলল, এখনও তুমি অনেক কিছুই জান না সালমান।
বলে একটু থামল আহমদ মুসা। তারপর আবার শুরু করল, তুমি কিডন্যাপ হবার পর সোফিয়া এ্যাঞ্জেলা গোপনে তার পিতাকে অনুসরণ করে তোমার সন্ধানে আমবার্ড দুর্গে এসেছিল। ধরা পড়ে যায় সোফিয়া। সোফিয়ার অপরাধের সাথে তার পিতাকেও জড়ানো হয়। মৃত্যুদন্ড হয় সোফিয়ার। হোয়াইট ওলফের নেতা মাইকেল পিটার সোফিয়ার আব্বার হাতে রিভলভার দিয়ে সোফিয়াকে হত্যার নির্দেশ দেয়। কিন্তু সোফিয়ার আব্বা সোফিয়াকে হত্যা না করে নিজের মাথায় গুলি করে হত্যা করে নিজেকে। এর পরপরই আমরা সেখানে পৌঁছি।
আহমদ মুসার শেষ বাক্য শেষ হবার আগেই থমকে দাঁড়িয়েছিল সালমান শামিল সোফিয়ার পথ রোধ করে তার মুখোমুখি। বেদনায় নীল হয়ে গেছে সালমান শামিলের মুখ। সোফিয়া সালমান শামিলের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। তার মুখ নিচু। জলে ভরে গেছে তার দুই চোখ। দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে সে নিজেকে সামলাবার চেষ্টা করছে।
সোফিয়া? ডাকল সালমান শামিল। তার কণ্ঠ ভারি।
সোফিয়া কোন উত্তর দিল না, মাথা তুলল না। দু’হাত দিয়ে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল সোফিয়া এ্যাঞ্জেলা।
সালমান শামিলও পাথরের মত দাঁড়িয়ে। অন্তরে তার বেদনার ঝড়। সোফিয়া তার জন্যে এত করেছে, এত হারিয়েছে!
জল গড়িয়ে পড়ছিল সালমান শামিলের দু’গন্ড বেয়ে।
আহমদ মুসা কয়েক পা পিছিয়ে এল। অত্যন্ত নরম, অত্যন্ত দৃঢ় কণ্ঠে বলল, সালমান, সোফিয়া এখন কাঁদার সময় নয়, সময় এখন এ্যাকশনের। অনেক কাজ বাকি আমাদের। এস।
বলে আহমদ মুসা আবার হাঁটা শুরু করল।
চোখ মুছে সালমান ও সোফিয়াও পা তুলল।
আহমদ মুসারা কন্ট্রোল রুমে পৌঁছলে প্রাথমিক সালাম, আলাপ-আলিঙ্গনের পর আলী আজিমভ বলল, জর্জ জ্যাকব সম্ভবত দুর্গের দক্ষিণ অঞ্চলে প্রিজন এলাকার কোথাও লুকিয়েছে। প্রিজন গেটের আলোটা কিছুক্ষণ হল হঠাৎ নিভে গেছে। জর্জ জ্যাকবই সম্ভবত বাল্ব ভেঙে দিয়েছে।
দুর্গ থেকে বের হওয়ার গেট তো ঠিক নজরে রেখেছ?
জ্বি, গেট আমরা সব সময় চোখের সামনে রেখেছি। এখন ওসমান এফেন্দীকে ওখানে কাজে লাগাতে পারি।
ঠিক আছে। জর্জ জ্যাকবকে আমরা পরে দেখছি। ওয়্যারলেসের কাজ আমরা সেরে নিই। পালাবে কোথায়? হোয়াইট ওলফের কোন সক্রিয় লোক আর আমবার্ড দুর্গে বেঁচে নেই। বেঁচে থাকলে না মেরে বা না মরে ওরা চুপ থাকতো না।
বলে আহমদ মুসা ওয়্যারলেস সেটের সামনে গিয়ে বসল। সালমান শামিলও গিয়ে বসল তার পাশেই এক চেয়ারে।
আহমদ মুসা হোয়াইট ওলফের নেটওয়ার্ক লগ বই বের করল। তারপর শুরু করল ককেশাস ক্রিসেন্টের ঘাঁটিগুলোতে নির্দেশ প্রেরণ। নির্দেশ তো নয় যেন হোয়াইট ওলফের মৃত্যু পরোয়ানা।
প্রত্যেক ঘাঁটিতে নির্দেশের শেষ কথা হলো, আগামীকাল ভোরের সূর্য যেন হোয়াইট ওলফের কোন ঘাঁটি আর না দেখে।