৯. ককেশাসের পাহাড়ে

চ্যাপ্টার

বেলা তখন আটটা।
লেডি জোসেফাইন অনেকক্ষণ বিছানা থেকে উঠে বসেছে। রাত ৪টায় ওরা এজমেয়াদজিনে এসেছে। তাদের দু’জনের জন্যে দিয়েছে এই ছোট্ট ঘর। এক খানা খাটিয়া। কোন রকমে দু’জন শোয়া যায়। ঘরে কোন আসবাবপত্র নেই। বদলাবার মত কাপড়ও নেই। তাদেরকে কিছুই নিতে দেয়নি জর্জ জ্যাকব। খালি হাতে বের হয়ে আসতে হয়েছে ঘর থেকে। লেডি জোসেফাইন জেলখানা দেখেনি। কিন্তু এ ঘরটাকে তার জেলখানাই মনে হচ্ছে। ঘুমাবার জন্যে একটু শুয়েছিল, কিন্তু ঘুম একটুও আসেনি। তার নিজের জন্যে কোন চিন্তা নেই, চিন্তা তার মেরীকে নিয়ে।
মেরী পাশেই শুয়েছিল। আপাদমস্তক কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে সে। একটুও নড়া চড়া নেই। ঘুমোচ্ছে। ছেলে-মানুষ তো, স্ংসারের ঘোরপ্যাঁচ এবং ভবিষ্যত চিন্তা কিছুই ওদের মাথায় আসেনি। ছোট বেলা থেকেই খুব সরল মেরী মেয়েটি। অন্তরটা কাগজের মত সাদা। কাউকেও রাগ করে দুটো কথা বলতে জানে না। কিন্তু অভিমান খুব। সে অভিমান কাউকে আঘাত করে না, নিজের কষ্টটা নিজের মনেই পুষে রাখে। আমার এই মেয়ের ভাগ্যেই এই ছিল! চোখ দু’টি ভারি হয়ে উঠল জোসেফাইনের।
লেডি জোসেফাইন ধীরে ধীরে মেরীর মুখ থেকে কম্বল সরিয়ে ফেলল। কম্বল সরিয়ে বিস্মিত হলো সে। দেখল, মেরীর দু’চোখ দিয়ে অবিরল ধারায় অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। বালিশ ভিজে গেছে। মেরী ঘুমোয়নি। চোখ বন্ধ করে আছে।
লেডি জোসেফাইনের বুক তোলপাড় করে উঠল বেদনায়। তারও চোখ থেকে অশ্রু নেমে এল।
মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, মা খুব কষ্ট হচ্ছে?
মেরী চোখ খুলে চোখ মুছে বলল, না মা।
–এমন করে কাঁদছিস যে?
–কিছু না মা, ভালো লাগছে না তাই। অনেকক্ষণ পর জবাব দিল মেরী।
–আমি তোর মা, আমার চেয়ে তোকে কে বুঝে।
একটু থেমে লেডি জোসেফাইনই আবার কিছু বলতে যাচ্ছিল, এমন সময় ঘরে প্রবেশ করল জর্জ জ্যাকব। তার হাতে রিভলভার, চোখ দু’টি লাল।
তাকে ঐভাবে দেখে অন্তরটা কেঁপে উঠল লেডি জোসেফাইনের। হোয়াইট ওলফের নৃশংসতার কথা সে জানে। ভয়ে তার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
লেডি জোসেফাইনের দিকে তাকিয়ে ক্রুর হেসে বলল, ভয় পাবেন না, আমি গুলি করতে আসিনি। আমি কয়েকটা কথা জানতে এসেছি।
–কি কথা? বলল লেডি জোসেফাইন।
–আপনারা সালমান শামিলকে বন্দীখানা থেকে বের হতে সাহায্য করেছেন।
–না, এ কথা ঠিক নয়। সালমান শামিল বন্দী আছে-একথাই আমরা জানতাম না। আর সালমান শামিলকে সাহায্য করব কেন, তাকে তো আমরা চিনি না।
–মিথ্যা বলছেন আপনি। সালমান শামিল সোফিয়া এ্যাঞ্জেলারও বন্ধু, মেরীরও বন্ধু। মেরী সোফিয়াদের ওখানে যেত।
–সোফিয়া সেখানে গেছে দু’এক সময় কিন্তু সালমানের সাথে কোনদিনই দেখা হয়নি।
–আমি মেরীর মুখে এ প্রশ্নের উত্তর শুনতে চাই।
মেরী উঠে বসল। জর্জ জ্যাকবের দিকে না তাকিয়েই বলল, যেদিন সালমানকে অজ্ঞান অবস্থায় লেন থেকে আমরা তুলে নিয়ে যাই, তার আগে সালমানকে কোন দিন দেখিনি। আর শুনুন, আমরা মিথ্যা কথা বলি না।
–ষড়যন্ত্রকারীরা মিথ্যা কথা বলে না। বাঃ সুন্দর কথা।
বলে হো হো করে হেসে উঠল জর্জ জ্যাকব। বলল, সালমান শামিলকে বন্দীখানা থেকে উদ্ধার করে তাকে আমাদের মারার হাত থেকে বাঁচানোর পর আপনারাই ভেতর থেকে আহমদ মুসাকে খবর দিয়েছেন এবং কিভাবে ঢুকতে হবে তারও গোপন তথ্য তাকে জানিয়েছেন।
–মিথ্যা কথা জর্জ। ‘আহমদ মুসা’ না কি নাম বললে সে নাম এই প্রথম তোমার কাছ থেকে শুনলাম।
–আমি জানি, সোজাভাবে সত্য কথা আপনারা বলবেন না। জিজ্ঞেস করি, আপনার বাসা থেকে সালমানকে সরিয়ে দেবার কি কারণ ছিল, হোয়াইট ওলফের হাত থেকে তাকে বাঁচানো নয় কি? এরপরও বলবেন কোন ষড়যন্ত্র আপনাদের নেই?
–সবার উপর মানবতা বলে একটা জিনিস কি নেই? আমরা অসুস্থ সালমানকে বাঁচাতে চেয়েছিলাম, তার কি পরিচয় সে হিসেবে নয়। সে একজন মানুষ এই হিসেবে।
–আপনার কাহিনী কেউ বিশ্বাস করবে না, বিশ্বাসযোগ্য নয়। আপনারা বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন, বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই এ ব্যাপারে আমাদের।
একটু থামল জর্জ জ্যাকব। তারপর আবার বলতে শুরু করল, আপনাদের বিচার হয়ে গেছে। কিন্তু আমরা অপেক্ষা করছি ফাদার পলের। তাকেই বিচারের রায় বাস্তবায়ন করতে হবে। যদি তিনি পারেন তার মঙ্গল। না হলে তাকেও মরতে হবে।
বলে রিভলভার পকেটে ফেলে হন হন করে বেরিয়ে গেল জর্জ জ্যাকব।
জর্জ জ্যাকব কি বলে গেল তা কারও কাছেই অস্পষ্ট নয়। জর্জ জ্যাকব বেরিয়ে যেতেই কেঁদে উঠল লেডি জোসেফাইন।
কিন্তু মেরীর চোখের পানি শুকিয়ে গেছে। তার চোখে-মুখে একটা দৃঢ়তা। মাকে জড়িয়ে ধরে বলল, তুমি কেঁদ না মা, কাঁদলে ওরা খুশিই হবে। মৃত্যু তো একদিন আসবেই। ভয় পাব কেন মৃত্যুকে? আমার একটুও ভয় লাগছে না।
ঘরে এ সময় প্রবেশ করল সভেতলানা, পিটারের স্ত্রী। মেরীদের ঘর থেকে একটা ব্লক ওপারে বৃহৎ বিলাসবহুল এক ফ্ল্যাটে আশ্রয় পেয়েছে।
সে ঘরে প্রবেশ করেই চারদিকে তাকিয়ে বলল, আমি কিছুই বুঝতে পারছি না খালাম্মা। আপনাদের উপর এমন অভিযোগ এল কেমন করে?
–অপরাধ একটাই, আমরা আহত, অজ্ঞান একজন মানুষকে আশ্রয় দিয়েছিলাম, চিকিৎসা ও শুশ্রুষা করে তাকে বাঁচিয়ে তুলেছিলাম।
–কাকে?
–সালমান শামিলকে। একদিন গভীর রাতে আমাদের লনে তাকে আহত ও অজ্ঞান অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখি। আমরা তাকে তুলে নিয়ে যাই। পরে তার মুখেই শুনেছিলাম তার নাম শামিল। কিন্তু সে ককেশাস ক্রিসেন্টের লোক তা জানতাম না। জর্জের কাছেই তা শুনলাম।
সভেতলানার মনে পড়ল গত রাতের কথা। যে তিনজন তাদের বাড়ি সার্চ করতে গিয়েছিল তাদের মধ্যে সালমানও ছিল। মনে পড়ল নেতা লোকটির (আহমদ মুসার) কথা। সেই থেকেই তার মনে এক অপার বিস্ময় সৃষ্টি হয়ে আছে। শত্রু আবার অত সুন্দর হয়! জানের দুশমন শত্রুর স্ত্রীকে কেউ বোন বলে ডাকে!
শত্রুকে হত্যা করার সাথে সাথে তার স্ত্রীকে হত্যা করা অথবা শত্রুর সম্পদের সাথে শত্রুর স্ত্রীকে দখল করাই তো নিয়ম। বিশেষ করে হোয়াইট ওলফ তো এটাই করছে, এর উত্তরে ককেশাস ক্রিসেন্ট এ কি আচরণ করল! শত্রুর কেউ ঐভাবে আদর করে কাছে টেনে নেয়!
সভেতলানা তার চিন্তায় ছেদ টেনে বলল, জর্জের এটা বাড়াবাড়ি খালাম্মা। পরাজয় তাকে পাগল করে দিয়েছে।
একটু থামল সভেতলানা, তারপর আবার শুরু করল, আমি সারারাত কেঁদেছি খালাম্মা। কিন্তু একটা বিস্ময়কর জিনিসের কথা আমি ভুলতে পারছি না, যে শত্রুরা আমার স্বামীকে হত্যা করেছে, তারাই আমার স্বামীর মৃত্যুর খবর আমাকে দিয়েছে। কিন্তু এই শত্রুদের দেখে আমি অবাক হয়েছি।
–কার কথা বলছ সভেতলানা?
–সালমান শামিলদের কথা বলছি। সালমান শামিল, সোফিয়া এবং আর একজন নেতামত গত রাতে আমার বাড়িতে গিয়েছিল। তারা পিটারের কাগজপত্র সার্চ করেছে।
–সালমান শামিল, সোফিয়া তোমার বাড়ি গিয়েছিল? তারা পিটারকে হত্যা করেছে?
–কে হত্যা করেছে বলতে পারবো না, তাদের সাথের নেতামত লোকটিই পিটারের মৃত্যুর খবর আমাকে দিয়েছে।
মেরী কথা বলে উঠল এ সময়। বলল, নেতামত ঐ লোকটির নাম আহমদ মুসা। মধ্য এশিয়া, ফিলিস্তিন বিপ্লবের নায়ক হিসেবে যার নাম শুনেছেন তিনিই এ আহমদ মুসা। ককেশাস ক্রিসেন্টকে নেতৃত্ব দেবার জন্যে আর্মেনিয়ায় এসেছেন। আসল ব্যাপার হলো, আহমদ মুসার নেতৃত্বে ককেশাস ক্রিসেন্টের লোকেরা গত রাতে আমবার্ড দুর্গে অভিযান চালিয়েছিল বন্দী সোফিয়া ও সালমান শামিলকে উদ্ধারের জন্যে। এ অভিযানেই মারা যান চাচা পিটারসহ হোয়াইট ওলফের আরো লোকেরা। অভিযান শেষে মুক্ত হবার পর সোফিয়া ও সালমান সার্চ করার কাজে সহায়তা করেছে।
–তুমি এ কথা জান কি করে মেরী? বিস্মিত চোখে প্রশ্ন করল সভেতলানা।
–আমি সালমানকে গীর্জায় লুকিয়ে রাখতে গিয়েছিলাম। আমরা যাওয়ার অল্পক্ষণ পরেই আহমদ মুসা ওখানে আসে সালমানকে উদ্ধার করার জন্যে।
–জানল কি করে?
–ওরা কন্ট্রোল রুম দখল করে নেয়। টেলিভিশন ক্যামেরার মাধ্যমেই ওরা জানতে পারে।
একটু থেমে মেরী বলল, আমি যা বলছিলাম। গীর্জায় এসে আহমদ মুসা যখন সালমানকে নিয়ে যায় তখনই তাদের কথোপকথনে আমি তাদের অভিযানের কথা জানতে পারি।
–তোকে ওরা তো কিছু বলেনি মেরী? বলল লেডী জোসেফাইন।
–কি বলবে মা, আহমদ মুসা আমাকে বাড়ি পৌঁছে দিতে চেয়েছে, তোমাকে না বলে সালমানকে নিয়ে যেতে চায়নি। আমিই তো তাদের আসতে বাঁধা দিয়েছি কোন গন্ডগোল হয় এই ভয়ে।
–আমিও তো এই কথাই বলতে চাচ্ছিলাম খালাম্মা। এমন বিস্ময়কর শত্রু থাকতে পারে কোন দিন শুনিনি।
বলে একটু থামল সভেতলানা। তারপর কাঁদতে শুরু করলঃ জানেন খালাম্মা, পিটারের নিহত হওয়ার খবর পেয়ে আমি জ্ঞান হারালাম। তারাই আমার জ্ঞান ফিরিয়ে আনল।
নেতা লোকটি মানে আহমদ মুসা জ্ঞান ফিরলে আমাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলল, আপনার দুঃখের সাথে আমরাও দুঃখবোধ করছি বোন, কিন্তু আপনি জানেন কি জন্যে কি হয়েছে। তারপর আমার বাড়ি সার্চ করার জন্যে আমার অনুমতি চেয়েছে। আমি যখন বলেছি, পিটার থাকলে এ হুকুম যেমন দিত না, আমিও তা দিতে পারিনা; উত্তরে বলেছে, আপনার মতকে আমি শ্রদ্ধা করি, কিন্তু সার্চ আমাদের করতেই হবে। সার্চ করে ফিরে আসার সময় বলেছে, আমার কোন ভয় নেই, সবদিক থেকেই আমি স্বাধীন ও নিরাপদ। মেয়েটিকেও আদর করেছে। অদ্ভুতভাবে জানিয়েও দিয়েছে, তার পিতা ফিরে না আসতে পারে যেমন হাজারো শিশুর পিতা ফিরে আসেনি। আমার মেয়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে যেতে যেতে সুন্দর এই স্বগতোক্তি করেছেঃ দুনিয়ার সব মানুষ যদি শিশুদের মতো সুন্দর, সরল-সহজ হতো! আমি প্রথমে ওদের দেখে ভয় পেয়েছিলাম, পিটার নিহত হওয়ার খবর পাওয়ার পর আমার ও আমার মেয়ের পরিণতি ভেবে আঁতকে উঠেছিলাম। কিন্তু ব্যবহারে মনে হল, আমি আগের চেয়েও বেশি নিরুদ্বেগ। জর্জ চলে আসার জন্যে জেদ না ধরলে আমি আসতাম না। এমন সুন্দর শত্রুর কথা কোন দিন আমি শুনিনি।
–সত্যিকার মুসলমানদের আচরণ তো এমন। আপনি ক্রুসেডের কাহিনীতে গাজী সালাহউদ্দিনের অদ্ভুত সুন্দর ব্যবহারের কথা পড়েননি? বলল মেরী।
–ঠিক বলেছ মেরী, গাজী সালাহউদ্দিন শত্রু রিচার্ডকে নিরস্ত্র অবস্থায় আঘাত করেননি। নিজের ঘোড়া, তলোয়ার তাকে দিয়ে দিয়েছিলেন। তারপর অসুস্থ রিচার্ড এর চিকিৎসা করেছিলেন নিজের হেকিম পাঠিয়ে। বলল সভেতলানা।
–খৃস্টান রাজ্য ছেড়ে খৃস্টান প্রজারা পার্শ্ববর্তী মুসলমান রাজ্যে আশ্রয় নেয়ার কথাও তো আমরা পড়েছি। তারপর দেখুন, খৃস্টান বাহিনী জেরুসালেম দখল করার পর সেখানকার ৭০ হাজার বাসিন্দাকে হত্যা করে। অথচ মুসলিম বাহিনী যখন জেরুসালেম দখল করল তখন একজন মানুষেরও রক্তপাত হয়নি ক্রুসেডের ঘোর অরাজকতার সময়েও। বলল মেরী।
–তোমাদের আলোচনা কোথায় যাচ্ছে জান? বলল লেডি জাসেফাইন।
–জানি, ভালোকে আমরা ভালো বলছি। বলল মেরী।
–এ ভালো বলার অর্থ কি জান? ইসলাম ভালো হয়ে যাচ্ছে তোমাদের কাছে। বলল লেডি জোসেফাইন।
–হতে পারে। মেরী বলল।
–তাহলে তোর অবস্থানটা কোথায় গিয়ে দাঁড়াচ্ছে?
–মানুষ ভালোকেই তো গ্রহণ করবে।
–চুপ কর মেরী, ছেলে মানুষ তুই।
–ঠিক আছে খালাম্মা, ওটা ওর আবেগের কথা বলেছে। আমিও ওর সাথে একমত। গত রাতে শত্রুর যে চরিত্র দেখলাম, তার স্রষ্টা যদি ইসলাম হয় তাহলে সে ধর্ম অবশ্যই স্বাগত জানানোর যোগ্য। বলল সভেতলানা।
বলে সভেতলানা উঠে দাঁড়ালো। বলল, আসি খালাম্মা।
মেরীদের রুম থেকে একটা ব্লক পরেই সভেতলানার এপার্টমেন্ট। দু’টি শোবার ঘর, দু’টি বাথরুম, একটা রান্নাঘর ও একটা ড্রইংরুম নিয়ে এই এপার্টমেন্ট। সভেতলানার শোবার ঘরের পাশেই আরেকটি শোবার ঘর। সেখানে ঘুমোচ্ছে সভেতলানার মেয়ে। সভেতলানা এসে তার ঘরের ভেজানো দরজা ঠেলে ঘরে প্রবেশ করেই চমকে উঠলো। তার বিছানায় শুয়ে জর্জ জ্যাকব।
সভেতলানা ঘরে ঢুকতেই জর্জ জ্যাকব উঠে বসল। তার ঠোঁটে হাসি, চোখে চকচকে দৃষ্টি।
সে চোখের দিকে তাকিয়ে শিউরে উঠলো সভেতলানা। তবু সাহস করে বলল, আপনি এখানে কেন?
নির্লজ্জ হেসে জ্যাকব বলল, অনুমতি না নিয়ে তোমার বিছানায় শুয়েছি। অন্যায় হয়েছে। এবার অনুমতি দাও।
ঘৃণায় সর্বাঙ্গ রি রি করে উঠলো সভেতলানার। ঘর থেকে বেরিয়ে যাবার জন্যে ঘুরে দাঁড়াল সভেতলানা।
সংগে সংগেই লাফ দিয়ে নামলো জর্জ জ্যাকব বিছানা থেকে। দরজার দিকে ছুটলো সভেতলানাকে ধরার জন্যে।
সভেতলানা ঘর থেকে বেরিয়ে ছুটলো মেরীদের ঘরের দিকে। তার পেছনে ছুটলো জ্যাকব। সভেতলানা দৌঁড়ে জ্যাকবের সাথে পারবে কেন। উভয়ের দূরত্বটা তাড়াতাড়িই কমে এলো।
আহমদ মুসার জীপ এজমেয়াদজিন শহরের উপকণ্ঠে যখন পৌঁছল, তখন সকাল পৌনে আটটা।
মাইকেল পিটারের ডায়রী থেকে পাওয়া এজমেয়াদজিনে তৈরি হোয়াইট ওলফের ঘাঁটির স্কেচ চোখের সামনে মেলে ধরল। দেখল, ম্যাটেনাদারান রোডের উত্তর পার্শ্বে ঘাঁটিটি তৈরি হয়েছে। কিন্তু ঘাঁটির মুখ দক্ষিণমুখী অর্থাৎ রাস্তার দিকে নয়। ঘাঁটির সামনের দিকটা পশ্চিমে।
ম্যাটেনাদারান রোডের নাম বিশ্ববিখ্যাত ম‌্যাটেনাদারান লাইব্রেরীর নাম থেকে গ্রহণ করা হয়েছে।
ম্যাটেনাদারান লাইব্রেরী এবং রিপ সাইম গীর্জা ৭ম শতাব্দীতে প্রতিষ্ঠিত। এজমেয়াদজিন শহরের পত্তনও তখনি। পাহাড়ের উঁচু এক উপত্যকায় শহরটি অবস্থিত।
আহমদ মুসার জীপ আবার ছুটে চললো। নগরীর ভেতরে প্রবেশ করেছে জীপ। ড্রাইভিং সিটে ওসমান এফেন্দী। তার পাশে আলী আজিমভ। পেছনের সিটে আহমদ মুসা।
ম্যাটেনাদারান রাস্তা খুঁজে পেতে কষ্ট হলো না। প্রায় সব রাস্তার মোড়ে ম্যাটেনাদারান লাইব্রেরীর দিক নির্দেশিকা আছে। আর্মেনিয়ায় আসা কোন পর্যটকই ম্যাটেনাদারান লাইব্রেরী না দেখে ঘরে ফেরে না।
ম্যাটেনাদারান রোডে তারা পশ্চিম দিক দিয়ে প্রবেশ করলো। অতএব হোয়াইট ওলফের ঘাঁটি পড়বে বাম পাশে। আহমদ মুসা ওসমান এফেন্দীকে গাড়ি ধীরে চালাতে বলল।
আহমদ মুসা মনে মনে হিসাব করছিল, এজমেয়াদজিন আসলে সদ্য নির্মিত ঘাঁটি। এখানে প্রতিরোধের ভালো ব্যবস্থা থাকা স্বাভাবিক নয়। সুযোগ পেলেই তারা এখন এ ঘাঁটিটিকে সংহত করবে, শক্তিশালী করবে সন্দেহ নেই। কিন্তু সুযোগ তারা পায় নি এবং তারা এত দ্রুত আক্রান্ত হবে এমন ধারণা করা তাদের জন্যে স্বাভাবিক নয়। আমরা সোফিয়া ও সালমান শামিলকে মুক্ত করেই দু’একদিন ব্যস্ত থাকবো এ চিন্তা তারা করতে পারে।
ম্যাটেনাদারান রোডের মাঝামাঝি আসতেই প্রাচীর ঘেরা একটা বিশাল বাড়ির উপর তার চোখ আটকে গেল। স্কেচম্যাপের সাথে হুবহু মিলে যাচ্ছে বাড়িটি। এটাই তাহলে হোয়াইট ওলফের গোপন নতুন ঘাঁটি।
বাড়ির সামনে বাউন্ডারী ওয়ালের সাথে বিশাল গেট। ভেতরে গেটের সামনে বড় গেটরুম। গেটরুমটাও গেটের মতো উঁচু।
আর্মেনিয়ায় সকাল ৮টা মানে খুবই সকাল। রাস্তা প্রায় জনশূন্য। কদাচিত দু’একজন লোক চোখে পড়ে যারা দ্রুত হাঁটছে তাদের জরুরি কাজের তাড়ায়। অতি জরুরি কাজ না থাকলে এই সাত-সকালে কেউই ঘরের বাহির হয় না।
ঘাঁটির সীমানা পেরিয়ে অনেক দূর যাওয়ার পর গাড়ি আবার ঘুরলো। ঘাঁটি থেকে একটু আগে আহমদ মুসা নেমে গেল। বলল, আমি বাড়ির পেছন দিয়ে ঢুকবো। তোমরা ঠিক এখন থেকে পনের মিনিট পরে গেটে গিয়ে হাজির হবে।
গাড়ি চলে গেল।
আহমদ মুসা হেঁটে গিয়ে বাড়ির উত্তর দেয়ালের গোড়ায় গিয়ে দাঁড়ালো।
বাড়ি থেকে উত্তর দিকে গজ পঞ্চাশেক দূরে একটি গীর্জা। এদিকটি গীর্জার পেছন দিক।
আহমদ মুসা উত্তর প্রাচীরের পূর্বাংশে একটা জায়গা বেছে নিয়ে দাঁড়াল। প্রাচীরটি প্রায় ১৫ফিটের মতো উঁচু। আহমদ মুসা পকেট থেকে নাইলন কর্ড বের করে হুক লাগানো মাথা ছুঁড়লো প্রাচীরের মাথা লক্ষ্যে। অব্যর্থ লক্ষ্য। প্রাচীরের মাথার সাথে গেঁথে গেল হুক।
আহমদ মুসা দড়ি বেয়ে তর তর করে উঠে গেল প্রাচীরের মাথায়। কিন্তু মাথায় উঠেই তার মাথা ঘুরে গেল নিচের দিকে তাকিয়ে। নিচে প্রাচীর বরাবর গভীর খাদ। ছোট-খাট খালের মতই। কিন্তু শুকনো! মনে হয়, সময়ে এটা পানিতে পূর্ণ করে রাখা হবে। খাদের ওপার বরাবর অনুরূপ আরেকটা প্রাচীরের প্রতিবন্ধক।
আহমদ মুসা নিচে নামার চাইতে সামনের প্রাচীরে আরেকটা হুক লাগিয়ে দড়ির ব্রীজ তৈরি করে পার হওয়াই সহজ ও দ্রুততর হবে মনে করলো।
সংগে সংগে পিঠের ব্যাগ থেকে অপেক্ষাকৃত মোটা নাইলন কর্ড বের করে তার হুক ছুঁড়ে দিল ওপারের প্রাচীরের মাথায়। গেঁথে গেল হুক। তারপর নাইলন দড়ির মাথাটি এ প্রাচীরের হুকের সাথে বেঁধে ঝুলে পড়লো দড়িতে। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ওপারের প্রাচীরের মাথায় উঠে বসলো আহমদ মুসা। তারপর নাইলন কর্ড গুছিয়ে নিয়ে ব্যাগে রেখে লাফিয়ে পড়ল নিচে মাটিতে।
লাফিয়ে পড়ে নিচে মাটির উপর চোখ পড়তেই চমকে উঠল আহমদ মুসা। বিদ্যুৎবাহী সূক্ষ্ম তামার তার নগ্নভাবে মুখ ব্যাদান করে আছে।
গায়ে একটা হিমশীতল স্রোত বয়ে গেল আহমদ মুসার। পায়ে রাবার জুতা এবং হাতে রাবারের গ্লোভস না থাকলে কিংবা লাফ দিয়ে পড়ে গেলেই তার সব শেষ হয়ে যেত এতক্ষণে।
আহমদ মুসা একটু সরে গিয়ে দাঁড়াতেই আবার তার খেয়াল হলো, এই বিদ্যুৎবাহী তারের সাথে কোনো এলার্মের সংযোজন নেই তো!
আহমদ মুসা চঞ্চলভাবে চারদিকে তাকালো। দেখল, দক্ষিণ এবং পশ্চিমে সারিবদ্ধ বিল্ডিং। তবে সামনেই প্রাচীরঘেরা ছোট একটি একতলা বাড়ি। সে প্রাচীরের পাশেই দ্রাক্ষা লতার ছোট্ট একটা ঝোপ।
আহমদ মুসা দৌঁড় দিয়ে গিয়ে সেই দ্রাক্ষার ঝোপের আড়ালে লুকাল।
আহমদ মুসার অনুমান মিথ্যা হলো না। মিনিটখানেকের মধ্যেই বিল্ডিং এর সারির পেছন দিক দিয়ে তিনজন লোক স্টেনগান বাগিয়ে বেড়ালের মতো নিঃশব্দ পায়ে ছুটে এলো এবং তারা আহমদ মুসা যেখানে লাফ দিয়ে পড়েছিল, সেখানে ঝুঁকে পড়ে সম্ভবত মাটি পরীক্ষা করেই উঠে দাঁড়াল। চঞ্চল ও সন্ধানী চোখ তাদের চারদিকে ঘুরতে লাগল।
আহমদ মুসা বিস্মিত হলো, যেখানে সে লাফ দিয়ে পড়েছিল ঠিক সেখানে এসে তারা ঝুঁকে পড়ল কেন, জায়গাটা তারা চিহ্নিত করল কেমন করে? ওদের সিগন্যালিং সিস্টেম কি কম্পিউটারাইজড!
লোক তিনজন কয়েক মুহূর্ত এদিক-ওদিক দেখার পর ছুটে এল দ্রাক্ষার সেই ঝোপের দিকে।
আহমদ মুসা তৈরি ছিল। সাইলেন্সার লাগানো এম-১০ এর মুখ সে তুলে ধরল লোক তিনটির দিকে। তর্জনী দিয়ে চাপ দিল ট্রিগারে। হালকা একটা শিষ দিয়ে ছুটে গেল বুলেটের ঝাঁক। দ্রাক্ষার ঝোপ থেকে গজতিনেক দূরে তিনজনই মুখ থুবড়ে পড়ে গেল।
আহমদ মুসা এম-১০ এর নল নামাতে যাচ্ছে, এমন সময় দক্ষিণ থেকে আরও তিনজন ছুটে এল। ওরা তিনটি লাশের দিকে তাকিয়ে মুহূর্তের জন্যে থমকে দাঁড়াল।
আহমদ মুসা ওদের আর সুযোগ দিল না।
তার এম-১০ এর মাথা পুনরায় উঁচু হল। বেরিয়ে গেল নিঃশব্দে একরাশ গুলি। ওরা তিনজন যেখানে দাঁড়িয়েছিল সেখানেই পড়ে গেল।
আহমদ মুসা উঠে দাঁড়াল। উঠে দাঁড়িয়ে একটু উৎকর্ণ হল। কোত্থেকে মাঝে মাঝে যেন পুরুষ কণ্ঠে একটা আল্লাহ শব্দ ভেসে আসছে। কিছুক্ষণ উৎকর্ণ হয়ে থেকে বুঝল, শব্দটি আসছে প্রাচীর ঘেরা একতলা বাড়িটা থেকে।
বাড়িটা মনে হয় হোয়াইট ওলফের একটা বন্দীখানা হবে।
কিন্তু এদিকে এখন নজর দেয়ার সময় নেই। আগে ঘাঁটির প্রতিরোধকে নিষ্ক্রিয় করতে হবে।
আহমদ মুসা ছুটতে যাচ্ছিল প্রাচীর ও বিল্ডিং এর সারির মাঝখান দিয়ে পশ্চিম দিকে গেট লক্ষ্য করে। এমন সময় নারী কণ্ঠের একটা চিৎকার ভেসে এল, বাঁচাও, বাঁচাও—-।
আহমদ মুসা থমকে দাঁড়াল। তারপর শব্দ লক্ষ্য করে ঘুরে সেদিকে ছুটল। কিছুদূর এগিয়ে দুই ফ্ল্যাটের মাঝখান দিয়ে ফ্ল্যাটের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। দেখল, একজন পুরুষ একটি মেয়েকে করিডোর দিয়ে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে আসছে। মেয়েটিকে চিনতে পারল আহমদ মুসা, পিটারের স্ত্রী।
আহমদ মুসা থেকে ওরা পাঁচ-ছয় গজ দূরে। পুরুষটিকে লক্ষ্য করে আহমদ মুসা ধীর, কিন্তু কঠোর কণ্ঠে নির্দেশ দিল, ছেড়ে দাও মেয়েটিকে।
লোকটি মেয়েটিকে ধরে রেখেই আহমদ মুসার দিকে মুখ ফিরাল। বিস্ময় তার চোখে-মুখে। পরক্ষণেই মেয়েটিকে ছেড়ে দিয়ে চোখের পলকে লোকটি পকেট থেকে রিভলভার বের করল। মেয়েটি ছুটে সরে গেল।
আহমদ মুসার এম-১০ মুখ উঁচু করেই ছিল। যখন আহমদ মুসা দেখল, বেপরোয়া লোকটি গুলি করবেই, তখন আহমদ মুসা তার ট্রিগারে চাপ না দিয়ে পারল না।
লোকটি গুলিবিদ্ধ ঝাঁঝরা দেহ নিয়ে লুটিয়ে পড়ল করিডোরে।
লোকটি গুলিবিদ্ধ হবার আগেই সম্ভবত তার রিভলভারের ট্রিগার টিপেছিল। কিন্তু রিভলভারের নলটি তখনও আহমদ মুসা পর্যন্ত উঁচু হতে পারেনি। তার রিভলবারের গুলি গিয়ে বিদ্ধ করল করিডোরের মেঝেকে।
লোকটি যে ফ্ল্যাটের করিডোরে নিহত হলো, তার দক্ষিণ পাশের ছোট ফ্ল্যাটটিই মেরীদের। ভীত-সন্ত্রস্ত মেরীরা দরজায় দাঁড়িয়েছিল। ওখানেই গিয়ে তাদের পাশে দাঁড়িয়ে কাঁপছিল মাইকেল পিটারের স্ত্রী সভেতলানা।
গুলি করেই আহমদ মুসা ওদিকে তাকাল। মেরীকে দেখে তার চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। দ্রুত এগিয়ে গেল তাদের দিকে।
–মেরী, এই যে লোকটি মারা গেল, তাকে চেন? দ্রুত কণ্ঠে বলল আহমদ মুসা।
–চিনি, জর্জ জ্যাকব। উজ্জ্বল চোখে বলল মেরী।
–জর্জ জ্যাকব?
বলেই আহমদ মুসা জর্জ জ্যাকবের লাশের দিকে একবার তাকাল।
তারপর মুখ ফিরিয়েই বলল, মেরী তোমরা ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে থাক, আমি না ফেরা পর্যন্ত।
বলে আহমদ মুসা ঘুরে দাঁড়াল। ঘুরে দাঁড়িয়েই দেখল, সামনের পূর্ব-পশ্চিম লম্বা বিল্ডিং-এর করিডোর দিয়ে চারজন লোক ছুটে আসছে স্টেনগান উঁচিয়ে।
আহমদ মুসা চিৎকার করে মেরীদের আবার সরে যেতে বলেই শুয়ে পড়ল মাটিতে। তারপর দ্রুত গড়িয়ে একটি পিলারের আড়ালে চলে গেল এবং সংগে সংগেই শুয়ে থেকেই এম-১০ এর ট্রিগার চেপে ধরল তাদের লক্ষ্য করে।
ছুটে আসা লোকদের স্টেনগানের প্রথম এক ঝাঁক গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। আহমদ মুসা শুয়ে পড়ায় গুলির ঝাঁক তার মাথার উপর দিয়ে চলে যায়। কিন্তু দ্বিতীয়বার আহমদ মুসাকে টার্গেট করার আগেই আহমদ মুসার এম-১০ এর বৃষ্টির মত গুলির ঝাঁক তাদেরকে ছেঁকে ধরল। কিন্তু তাদের অব্যাহত এলোপাথাড়ি গুলির একটি আহমদ মুসার বাম কাঁধের নিচে বাহুর এক খাবলা গোশত তুলে নিয়ে গেল।
আহমদ মুসা উঠে দাঁড়াল। দেখল, স্টেনগানের গুলি মেরীরা যে ঘরে ঢুকেছে তার দরজা, দেয়াল ক্ষত-বিক্ষত করে দিয়েছে। আহমদ মুসা আরও কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়াল। না, কোন দিক থেকে কেউ আসছে না। আহমদ মুসা ঘড়ির দিকে তাকাল বেলা আটটা পনের মিনিট।
আহমদ মুসা পকেট থেকে মিনি ওয়াকি টকি বের করে বলল, আলী আজিমভ, তোমরা গেটে? আচ্ছা শোন। এদিকে ওদের এগার জন বিদায় হয়েছে, আমি গেটের দিকে আসছি।
মেরী ও সভেতলানা আস্তে আস্তে দরজা খুলে বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছিল। তারা দেখল, আহমদ মুসার বামবাহুর সোয়েটার রক্তে ভিজে গেছে। হাত দিয়ে ফোঁটা ফোঁটা রক্ত গড়িয়ে পড়ছে।
আহমদ মুসা ওয়াকি টকি পকেটে রেখে চলতে উদ্যত হল। এই সময় মেরী ও সভেতলানা সামনে এসে দাঁড়াল। বলল, কি সর্বনাশ, আপনার গুলি লেগেছে তো!
আহমদ মুসা থমকে দাঁড়িয়ে একটু হেসে বাম বাহুর দিকে তাকিয়ে ডান হাত দিয়ে বাম বাহুটা চেপে ধরে বলল, এখন দাঁড়াবার সময় নেই মেরী, আসছি। তোমরা ঘরে দরজা বন্ধ করে থাক। বলে আহমদ মুসা দ্রুত পা বাড়াল সামনে।
পেছনে তার দিকে অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকল মেরী ও সভেতলানা। সভেতলানা স্বগতঃ কণ্ঠে বলল, আশ্চর্য মানুষ, গত রাতে আমার দেখা আহমদ মুসা এবং আজকের রণাঙ্গনের আহমদ মুসার মধ্যে কত পার্থক্য! সময়ে মোমের মত নরম, আবার বজ্রের মত কঠোর।
গেট পর্যন্ত আহমদ মুসাকে আর কোন বাঁধার মুখোমুখি হতে হলো না। গেটে যাওয়ার আগে আড়ালে দাঁড়িয়ে দেখল, গেটরুমের এদিকের দরজার দু’জন লোক স্টেনগানের ট্রিগারে হাত রেখে অস্থিরভাবে পায়চারি করছে। মাঝে মাঝে ওয়াকি টকিতে অস্থিরভাবে কাকে যেন ডাকছে। ভাল করে শুনে বুঝল, জর্জ জ্যাকবকে কল করছে। থামল আহমদ মুসা। বেচারারা জানে না, জর্জ জ্যাকব আর এ আহবানে সাড়া দেবার জন্যে দুনিয়াতে নেই।
আহমদ মুসা এম-১০ এর স্থির লক্ষ্য তাদের দিকে তুলে ধরে আড়াল থেকে বেরিয়ে এল।
আহমদ মুসাকে দেখেই প্রহরী দু’জন বিদ্যুৎ বেগে তাদের স্টেনগান উপরে তুলল। তাদের চোখে চমকে উঠা বা ভয়ের লেশমাত্র নেই।
কিন্তু আহমদ মুসার লক্ষ্য আগে থেকেই স্থির ছিল। তারা তাদের স্টেনগান যখন উপরে তুলছিল, আহমদ মুসার এম-১০ থেকে তখন গুলির ঝাঁক বেরিয়ে গেল। তারা ট্রিগার চাপার আর সময় পেল না, লুটিয়ে পড়ল মাটিতে।
আহমদ মুসা লোক দু’টির দিকে সপ্রশংস দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল। অন্যায়ের জন্যে এত আন্তরিকভাবে, এমন নির্ভীকভাবে জীবন দিতে আর কাউকেই সে দেখেনি। সার্থক হোয়াইট ওলফের ট্রেনিং এবং মোটিভেশন।
আহমদ মুসা গেটরুমের ভেতরে গিয়ে সুইচ টিপে গেট খুলে দিল। গেটে দাঁড়িয়ে ছিল আলী আজিমভ ও ওসমান এফেন্দী। তারা ভেতরে ঢুকল।
আবার গেট বন্ধ হয়ে গেল।
আলী আজিমভ ও ওসমান এফেন্দী আহমদ মুসার বাম বাহুর দিকে তাকিয়ে আঁতকে উঠল।
মুসা ভাই আপনি আহত? দু’জনের স্বর একসংগেই কঁকিয়ে উঠল।
‘ও তেমন কিছু নয়, এস তোমরা ভেতরে’–বলে আহমদ মুসা ভেতরে হাঁটা দিল।
তার পেছনে পেছনে আলী আজিমভ ও ওসমান এফেন্দী। হাঁটতে হাঁটতে আহমদ মুসার মনে পড়ল বন্দীখানার সেই বন্দীর কথা যে ‘আল্লাহ আল্লাহ’ বলে বিলাপ করে চলেছে।
তার কথা মনে হতেই আহমদ মুসা তার হাঁটা দ্রুততর করে দিল।

সাইমুম সিরিজের পরবর্তী বই
বলকানের কান্না