২৩. রাজচক্র

চ্যাপ্টার

পিতার সার্ট হাতে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েছিল ডোনা। আহমদ মুসা তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিল সব খারাপের মধ্যে ভালো খবর এই যে, তারা প্রিন্সেস ক্যাথারিনের মতই মিঃ প্লাতিনিকে সসন্মানে রেখেছে। বিছানাপত্র, পরিবেশ, ইত্যাদি সব মিলে মিঃ প্লাতিনিকে বড় ধরনের কোন অসুবিধায় রাখেনি।
‘কিন্তু আজ ভালো ব্যবহার দেখেছ, কাল যদি খারাপ আচরন করে!’ বলেছিল ডোনা।
‘দেখ, হাজার হোক মিঃ প্লাতিনি রাজপুত্র এবং ফরাসি সরকার বিষয়টাকে খুবই গুরুত্বের সাথে নিয়েছে। ফরাসি সরকারকে অসন্তুষ্ট করার মত কাজ গ্রেট বিয়ার করবে না। আর তোমার আব্বা তো তাঁদের শত্রু নন। তাঁকে বলা যায় পন বন্দী করে রেখেছে আমাকে হাতে পাওয়ার জন্যে। সুতরাং তিনি গ্রেট বিয়ারের টার্গেট নন, টার্গেট আমি। আজ আমি ধরা দিলে কাল উনি মুক্তি পাবেন।
আহমদ মুসার শেষ কথাটা শুনে চমকে উঠেছিল ডোনা। মুখ পাংশু হয়ে উঠেছিল তাঁর। বলেছিল, দেখ, এমন কথা কোন সময় বলনা। তুমি ও তোমার মিশন আমি, আমার পিতা, আমাদের পরিবারের যোগফলের চেয়েও অনেক অনেক বেশি মুল্যবান। তোমার জন্যে কোন কোরবানিই আমার কাছে বড় নয়। তুমি যদি এমনভাবে ভবিষ্যতে কথা বল, আমার পিতার নাম আমি আর মুখে আনব না’। বলে দু’হাতে মুখ ঢেকে কাঁদতে লাগল ডোনা।
আহমদ মুসা সান্ত্বনা দেয়ার সুরে নরম কণ্ঠে বলেছিল, ‘আমি দুঃখিত ডোনা। বলব না ঐ ধরনের কথা আর। আর শোন, নিজে আত্নসমর্পণ করে কাউকে মুক্ত করতে হবে, এমন চিন্তা কোন সময়ই আমি করি না, এমন কোন দুর্বলতাও আমার মধ্যে নেই। ইনশাআল্লাহ্‌ শয়তানদের হাত থেকে তাঁকে মুক্ত করবোই।
আল্লাহ্‌র উপর ভরসা করে এই কথা বলেছে আহমদ মুসা, কিন্তু ডোনার আব্বা এবং প্রিন্সেস ক্যাথারিনকে উদ্ধারের কোন পথই দেখতে পাচ্ছে না সে।
ইতিমধ্যে বার কয়েক সে রুশ রাষ্ট্রপ্রধানের ওখানে গেছে। উদ্দেশ্য গ্রেট বিয়ারের মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ করা। হঠাৎ করে ওঁরা যেন উধাও হয়ে গেছে। আহমদ মুসার মনে হয়েছে ওঁরা কোন নতুন ষড়যন্ত্র আঁটছে, কোন নতুন পথে ওঁরা অগ্রসর হতে যাচ্ছে। সেটা কি? ওঁরা কি কারও মাধ্যমে কিছু করার চেষ্টা করছে? মাঝে মাঝেই আহমদ মুসার আশংকা হয়, ফরাসি পুলিশের সাথে ব্ল্যাক ক্রস বা কারও মাধ্যমে একটা এমন চুক্তি হতে পারে যে, পুলিশ আহমদ মুসাকে তুলে দিবে ওদের হাতে, আর ওঁরা মুক্তি দিবে মিঃ প্লাতিনিকে। এই আশংকা সামনে রেখেই আহমদ মুসা পুলিশের দৃষ্টি থেকে নিজেকে আড়ালে রাখার চেষ্টা করছে।
মোবাইল টেলিফোনের বিপ বিপ শব্দে আহমদ মুসার ভাবনায় ছেদ ঘটালো। টেলিফোন তুলে নিল আহমদ মুসা।
রুশ রাষ্ট্রদূত মিঃ পাভেলের টেলিফোন। বলল সে ওপার থেকে, ‘মিঃ আবদুল্লাহ গুরুতর খবর আছে, তাতিয়ানা নিহত হয়েছেন জেনেভায়। তাতিয়ানার কাছে রক্ষিত অতি মুল্যবান রাজকীয় ডকুমেন্ট একজন এশিয়ান এবং দু’জন ফরাসি পুরুষ ও মহিলা প্যারিসে নিয়ে এসেছে প্রিন্সেস ক্যাথারিনের কাছে হস্তান্তরের জন্যে। একটি ভিডিওতে সবকিছু রেকর্ডেড ছিল। তাঁর সবগুলো কপি গ্রেট বিয়ার জেনেভা পুলিশকে বিভ্রান্ত করে নিয়ে এসেছে। সুতরাং যারা ডকুমেন্টগুলো প্যারিসে নিয়ে এসেছে, তাঁদের ফটো পাওয়া যায়নি। আমাদের সরকারের তথ্য মোতাবেক প্রিন্সেস তাতিয়ানা এবং সেই রাজকীয় ডকুমেন্টগুলো এখন প্যারিসেই রয়েছে। আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রী সত্বরই প্যারিসে আসছেন। ফরাসি সরকার ও পুলিশ তৎপর হয়ে উঠেছে। রাশিয়ায় গণতান্ত্রিক বিপ্লবের স্মৃতিবাহী মাস মার্চে রাশিয়ায় নিয়মতান্ত্রিক রাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সুতরাং দু’মাসের মধ্যেই সব কাজ সম্পন্ন করতে হবে। আমাদের সরকার এখন এই বিষয়টাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন’। থামল মিঃ পাভেল।
‘ধন্যবাদ এ সুখবরের জন্যে। আপনারা সফল হোন’। বলল আহমদ মুসা।
‘সাফল্যের জন্যে তোমারও সাহায্য চাই আমরা। আমাদের মিনিস্টার এলে তোমাকে ডাকব আমরা। নতুন তথ্যের ভিত্তিতে চিন্তা করার জন্যে তোমাকে অনুরোধ করছি’।
একটু থামল রাষ্ট্রদূত পাভেল। থেমেই আবার শুরু করল, ‘সত্যি তুমি বিস্মিত করেছ আমাকে, আমাদের সরকারকেও। তুমি প্রিন্সেস কে এখনও উদ্ধার করতে পারনি, কিন্তু প্রতিটি পদক্ষেপ তোমার সফল। গ্রেট বিয়ারের চারটির মত ঘাটির এ পর্যন্ত পতন ঘটেছে তোমার কারনে। তোমার সাহায্য আমরা চাই’।
‘আমাকে কি বলার প্রয়োজন আছে। আমিতো নিজের ইচ্ছাতেই কাজ করছি’।
‘এটাও আমার জন্যে একটা বিস্ময়ের। আমাদের প্রিন্সেসের জন্যে তুমি জীবন বিপন্ন করছ কেন? সত্যি বলতো, তোমার সাথে কোন হৃদয়ের সম্পর্ক নেই তো!’
‘একেবারেই নেই’।
‘তোমার এসব উত্তর ঔৎসুক্য আরও বাড়িয়ে তুলছে। তুমি কে, এই জিজ্ঞাসার চেয়ে বড় কিছু এখন আমার কাছে নেই। তুমি সাধারন কেউ নও আমি বুঝি। কে তুমি আসলে?’
‘সবচেয়ে বড় পরিচয় আমি মানুষ’।
‘দেখ, তোমাকে ‘তুমি’ বলে সম্বোধন করে ভুল করেছি বলে এখন মনে হচ্ছে। বয়সে যত ছোটই হও তুমি অনেক বড় তা প্রমান করেছ। এখন থেকে আমি ‘আপনি’ বলে সম্বোধন করব’।
‘দুরে ঠেলে দিবেন আমাকে?’
‘না, মাথায় রাখতে চাই’।
কথা শেষ করেই রাষ্ট্রদূত বলল, ‘এখন এ পর্যন্তই। প্রয়োজন হলেই কিন্তু টেলিফোন করব আপনাকে’।
‘অবশ্যই। ধন্যবাদ’। বলল আহমদ মুসা।
টেলিফোন রেখে দিয়ে সোফায় গা এলিয়ে দিল আহমদ মুসা। মনে মনে বলল, রুশ দুতাবাসের সাথে সম্পর্ক সম্ভবত খুব শীঘ্রই তাঁর শেষ হয়ে যাচ্ছে। রুশ সরকার সবই জেনে ফেলেছে। শুধু নাম আর ফটো পায়নি। পেলেই আহমদ মুসা, ডোনা আর তাঁর আব্বা টার্গেট হয়ে পড়বে রুশ সরকারেরও। রুশ সরকার চেষ্টা করবে আহমদ মুসার কাছ থেকেই রাজকীয় ডাইরি ও আংটি হাত করতে। কিন্তু আহমদ মুসা ক্যাথারিন ছাড়া কারও হাতে এই আমানত তুলে দিতে পারে না।
কিন্তু এগুবে সে কোন পথে?
যে সুত্র যখন খুঁজে পেয়েছে, সেটাই ছিঁড়ে গেছে। এমন বিদঘুটে অবস্থায় সে কোন সময়ই পড়েনি। সত্যিই চারদিকে শুধু অন্ধকার দেখছে সে।

প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিবেট সিরিজের একটা সেশন।
সন্ত্রাস ও মানবাধিকারের উপর বিতর্ক চলছে।
ডোনা জোসেফাইন বিতর্কে তাঁর বক্তব্য শেষ করে বক্তার প্যানেলে এসে বসল।
পাশের বিরোধী বক্তা ইভানোভা উঠে দাড়িয়ে ডোনার সাথে হ্যান্ডশেক করে বলল, ‘ভালো বলেছেন। কিন্তু আপনার বিরোধিতা করব’।
‘ওয়েলকাম। আমি বেশি কিছু বলিনি। মানবাধিকার একটি স্বাভাবিক চাহিদা যার উপর মানব সমাজের সামাজিক শৃঙ্খলা ও বিকাশ নির্ভর করে। আর সন্ত্রাস তাঁর নামেই অস্বাভাবিক একটা কর্মকাণ্ড যা বৈধ নয়। উদ্দেশ্য মহৎ হলেও একে অর্জন করা অসৎ মাধ্যমকে যৌক্তিক বলা যাবে না’। বলল ডোনা জোসেফাইন।
‘ধন্যবাদ, বলে ডোনার পিঠ চাপড়ে ডায়াসের দিকে চলল ইভানোভা। ডোনা জোসেফাইনের পরবর্তী স্পীকার হিসাবে ডাক পড়েছে তাঁর।
ইভানোভা একজন রুশ কিন্তু এখন ফরাসি নাগরিক। ডোনা জোসেফাইনের মতই বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন নামকরা ছাত্রী সে।
ইভানোভা তাঁর তুখোড় বক্তৃতার এক অংশে বলল, ‘মারিয়া জোসেফাইন যে যুক্তি দিয়েছেন মানবাধিকারের পক্ষে এবং সন্ত্রাসের সেটা আইনের শাসনের কথা, শান্তির সময়ের কথা। কিন্তু আইন যেখানে বেআইন, শান্তি যেখানে অশান্তি, দুর্নীতিই যেখানে নীতি, সত্য, ন্যায় ও সুবিচার যেখানে দুর্বলের নিস্ফল কান্না, সেখানে সন্ত্রাস মানবাধিকারের বিশ্বস্ত হাতিয়ার। ফিলিস্থানে হামাসের যে সন্ত্রাস, সেটা তাঁদের অধিকার অর্জনের জন্যই অপরিহার্য অস্ত্র। কাশ্মীরে মুসলিম গেরিলাদের যে সন্ত্রাস তা নিরুপায় মজলুমদের অধিকার অর্জনের শেষ অবলম্বন। অনুরূপভাবে পৃথিবীতে অধিকাংশ ক্ষেত্রে অব্যাহত জুলুম ও অধিকার পদদলিত করার বিচারহীন অবস্থা থেকে সন্ত্রাসের উদ্ভব ঘটেছে। এখানে মানবাধিকার ও সন্ত্রাস পরস্পর বৈরী নয়, সহযোগী। আমরা পশ্চিমারা মুসলিম বিপ্লবী নেতা আহমদ মুসার সমালোচনায় মুখর, কিন্তু শত শত বছর ধরে জুলুম শোষণ ও অবিচারের শিকার বিধ্বস্ত এক জাতির মধ্য থেকে ইতিহাসের অবশ্যম্ভাবী পরিণতি হিসাবেই তাঁর উদ্ভব ঘটেছে। ইতিহাসের এক চাবুক, মানবাধিকারের এক রক্ষাকবচ তাঁকে বলতে হবে। তাঁর বিরুধ্যে আমাদের সংবাদ মাধ্যমগুলোর অভিযোগ, তিনি ফ্রান্স, স্পেন, ককেশাস, মধ্য এশিয়া, কঙ্গো-ক্যামেরুন জুড়ে শত শত লোক হত্যা করেছেন। কিন্তু এই নিহতরা কারা? মজলুমের বিপন্ন জীবন বাঁচাতে গিয়ে জালেমের জীবন বিপন্ন হলে, সেটা অবশ্যই দূষণীয় নয়, আইনের চোখে তা অপরাধও নয়’।
বক্তৃতা শেষ করে ইভানোভা তাঁর আসনে ফিরে এলে ডোনা জড়িয়ে ধরল ইভানোভাকে। অভিনন্দন আপনাকে। আমি বলেছিলাম নীতির কথা, আর আপনি দেখিয়েছেন নীতির ব্যাতিক্রমগুলোকে। আপনাকে অভিনন্দন’।
ইভানোভাকে অভিনন্দন জানিয়েই ছেড়ে দেয়নি ডোনা। তাঁকে ধরে নিয়ে এসেছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যান্টিনে। বসেছিল দু’জন ক্যান্টিনের নির্জন কোনায়।
বসেই ইভানোভা বলল, ‘কি ব্যাপার মারিয়া জোসেফাইন, আপনার ক্ষেত্রে এই ঘটনাটা নতুন’।
‘আজ আপনাকে পেট পুরে খাওয়াব’।
‘কেন?’
‘আপনার সুন্দর বক্তৃতার জন্যে’।
‘ধন্যবাদ। কিন্তু বক্তৃতা এতটা তো সুন্দর হয় নি’।
‘এটা বলবে শ্রোতা’।
বলে একটু থামল ডোনা। পর মুহূর্তেই আবার শুরু করল, ‘কিন্তু একটা বিষয়। লেলিন, মাওসেতুং, হো-চি মিন, ক্যাস্ট্রো, প্রমুখ বিশ্ব বিপ্লবী থাকতে আপনি আহমদ মুসার দৃষ্টান্ত আনলেন কেন?’
ইভানোভা কথা বলার জন্যে মুখ খুলেছিল। ডোনা বলল, ‘একটু থামুন, আমি গিয়ে খাবারটা নিয়ে আসি। আপনি বসুন। দু’জনেরটাই আমি নিয়ে আসছি’।
ইভানোভা উঠে দাড়িয়ে হেসে বলল, বরং আপনি বসুন আমিই দু’জনেরটা নিয়ে আসছি’।
শেষে দু’জনেই গেল খাবার আনতে। খাবার নিয়ে দু’জনেই বসল টেবিলে। দু’জনেই খেতে শুরু করল।
‘এবার প্লিজ বলুন’। ইভানোভাকে লক্ষ্য করে বলল ডোনা।
‘আপনি একটা সিরিয়াস প্রশ্ন করেছেন। এর উত্তর প্রকাশ্যে দেয়া কঠিন, কিন্তু আপনাকে বলতে পারি’।
বলে একটু থামল ইভানোভা। এক টুকরো গোশত মুখে পুরে জুসের গ্লাসে একটা চুমুক দিয়ে বলল, ‘আপনি যে বিপ্লবীদের নাম করলেন, তারা মহা বিপ্লবী সন্দেহ নেই। কিন্তু তাঁদের কেউই সত্য, ন্যায় ও সুবিচার প্রতিষ্ঠার জন্যে লড়াই করেন নি। ঠিক হোক বে ঠিক হোক তাঁদের অনুসৃত মতাদর্শ এবং তাঁদের ব্যক্তিপ্রভুত্ব প্রতিষ্ঠার জন্যে তারা কাজ করেছেন। তাই তারা শ্রমিক-কৃষকের ভ্রাতা সেজে লাখো-কোটি শ্রমিক-কৃষককে হত্যা করেছে। সত্য ও সুন্দর তাঁর আদর্শিক শক্তির জোরেই মানুষের হৃদয় জয় করে প্রতিষ্ঠা লাভ করে, তাঁকে অস্ত্র ও খুন খারাবির আশ্রয় নিতে হয় না। নিজ জনগনের উপরই তারা অস্ত্র প্রয়োগ করেছে। কারন সত্য সুন্দরের বিপ্লবী তারা ছিল না। অন্যদিকে আহমদ মুসা তাঁর মজলুম জাতির পক্ষে জালেমের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন সুতরাং দৃষ্টান্ত হবার মত বিপ্লবী আজকের দুনিয়ায় একমাত্র তিনিই’।
ডোনার মনে বিস্ময় ও আনন্দের ঢেউ। কিন্তু সেটা চেপে রেখে বলল, ‘নিকট থেকে না দেখে একজন আন্ডার গ্রাউন্ড লিডার সম্পর্কে শুধু শোনা কথার উপর এতবড় সার্টিফিকেট দেয়া কি ঠিক?’
হাসল ইভানোভা। বলল, ‘এ ধরনের মন্তব্য আমরা সব সময় শোনা ও পড়ার উপর ভিত্তি করেই বলে থাকি। তাঁর উপর বাড়তি একটা দুর্লভ সুযোগও আমি পেয়েছি’।
‘বাড়তি সুযোগ, কি সেটা?’ প্রবল একটা আগ্রহ ঝরে পড়ল ডোনার কথায় এবং চোখে-মুখে।
ইভানোভা গভীর দৃষ্টিতে তাকাল ডোনার দিকে। বলল, ‘বলছি, কিন্তু আগে বলুন। আপনার মধ্যে আহমদ মুসা সম্পর্কে একটা প্রবল আগ্রহ দেখছি। সেটা কেন?’
সলজ্জ একটা হাসিতে ভরে গেল ডোনার মুখ। বলল, ‘কারন একটা অবশ্যই আছে। বলব। তার আগে আমার প্রশ্নের জবাব দিন’।
‘বলছি। কিন্তু এইটুকু প্রশ্নের জবাব দিন। সাইকোলজি আমার সবচেয়ে ফেভারিট সাবজেক্ট। আমার মনে হচ্ছে আপনার চোখ, মুখ ও আগ্রহ দেখে এবং কথা শুনে যে, আহমদ মুসা আপনার বা আপনাদের খুব কাছের কেউ হবে। আমার এ অনুমান ঠিক কিনা?’
ডোনা চোখ তুলে গভীর দৃষ্টিতে তাকাল ইভানোভার দিকে।
ইভানোভাও তাকিয়েছিল। চার চোখের মিলন হলো।
আবার সলজ্জ হাসি ফুটে উঠল ডোনার চোখে-মুখে। সেই সাথে কিছুটা বিব্রত ভাব। বলল, ‘খুব পয়েন্টেড প্রশ্ন করেছেন। উত্তর দিচ্ছি আমি। তাঁর আগে আমার প্রশ্নটার জবাব দিন। তবে এটুকু বলছি, তাঁর সম্পর্কে যে কোন কথা বলার ক্ষেত্রে আমার উপর আস্থা রাখতে পারেন’।
ইভানোভার দৃষ্টি আরও তীক্ষ্ণ হলো। বলল, ‘সেটা আমি আগেই বুঝেছি। তাই আমি আরো জানতে চাচ্ছিলাম’।
একটু থামল ইভানোভা। তারপর আবার শুরু করল, ‘সে দুর্লভ সুযোগটা ছিল আমার এক অকল্পনীয় সৌভাগ্য। একটা এ্যাকসিডেন্ট আমার সে সৌভাগ্য সৃষ্টি করেছিল। আমি তাঁর দেখা পেয়েছিলাম। কয়েক ঘণ্টার জন্যে তাঁকে কাছে পেয়েছিলাম। আমি তাঁর হাতের শুশ্রূষা পেয়েছিলাম। তাঁকে সামান্য সাহায্য করার গৌরবপূর্ণ সুযোগ আমার হয়েছিল’।
থামল ইভানোভা। তাঁর কণ্ঠ ধীরে ধীরে গম্ভীর ও ভারী হয়ে উঠেছিল। সে যখন কথা শেষ করল তখন এক অবরুদ্ধ আবেগে তাঁর কণ্ঠ কাঁপছিল।
ডোনার চোখও যেমন তীক্ষ্ণ হয়ে উঠেছিল,তেমনি চোখে-মুখে ফুটে উঠেছিল কিছু একটা খুঁজে পাবার আনন্দ। দ্রুত বলল ডোনা, ‘আপনি কি জাহরা ইভানোভা, পিটার পাওয়েল যার ভাই এবং নিকিতা স্ট্যালিন যার আব্বা?’
বিস্ময়ে চোখ কপালে তুলে জাহরা ইভানোভা বলল, ‘এসব জানলেন কি করে?’
‘আপনাদের আহত অবস্থায় বাসায় নিয়ে গিয়েছিল আহমদ মুসা। গ্রেট বিয়ারের লোকদের দেখে আহমদ মুসা সরে পড়েছিলেন। গ্রেট বিয়ারের ঘাটিতে আহমদ মুসা ঘেরাও হয়ে বিপন্ন হয়ে পড়লে আপনি তাঁকে উদ্ধার করেন নিজের জীবন বিপন্ন করেও এবং তাঁকে নিরাপদে সরে আসারও ব্যবস্থা করে দেন আপনি’।
এসব কথা আহমদ মুসা ছাড়া আর কেউ জানে না। এর অর্থ তাঁর কাছ থেকেই আপনি এ কথাগুলো শুনেছেন। কোথায় তাঁর দেখা পেলেন? কি ঘটনা বলুন তো’।
‘বলেছি তো সব বলব। কিন্তু তাঁর আগে আমার একটা বিস্ময় দূর করা দরকার। তাহলে সব কথা আপনাকে বলতে পারব’।
‘সেটা কি?’
‘আপনার আব্বা গ্রেট বিয়ারের আন্দোলনের একজন পরিচলনাকারী। আপনিও গ্রেট বিয়ারের একজন সক্রিয় কর্মী। আহমদ মুসাকে এই সাহায্য আপনি করলেন কেন? তিনি আহত অবস্থায় আপনাদের সাহায্য করেছিলেন বলে কি?’
‘না’।
‘তাহলে?’
একটা বেদনার হাসি ফুটে উঠল জাহরা ইভানোভার মুখে। হঠাৎ আনমনা হয়ে উঠল সে। বলল, ‘এ প্রশ্ন তিনিও জিজ্ঞাসা করেছিলেন। উত্তর দেইনি। কোনদিন সুযোগ পেলে বলব ভেবেছিলাম’। থামল জাহরা ইভানোভা।
আবার শুরু করল। বলল, ‘তিনি গ্রেট বিয়ারের ঘাটিতে যখন প্রিন্সেস ক্যাথারিনকে খুঁজে বেড়াচ্ছিলেন এঘর থেকে সে ঘরে, টিভি স্ক্রিনের সামনে বসে আমি তাঁকে ফলো করছিলাম। হঠাৎ এক সময় আমি তাঁকে নামাযে দাঁড়াতে দেখলাম। এই প্রথম জানলাম তিনি মুসলমান। এই জানাটাই আমার সব উলট পালট করে দিল’।
‘কেমন?’
‘আমি ভুলে গেলাম যে আমি একজন রুশ। মনে থাকল না যে আমি গ্রেট বিয়ারের একজন কর্মী। জীবনের পাতাগুলো এক এক করে উল্টে গেল। সুদূর এক অতীত জীবন্ত হয়ে আমার সামনে হাজির হলো। আমার সমগ্র সত্তা জুড়ে একটা কথাই বড় হয়ে উঠল আমি জাহরা ইভানোভা ফাতিমা জোহরার উত্তর-সন্তান। আমার রক্ত ফাতিমা জোহরার রক্ত। সেই ফাতিমা জোহরার একান্ত আপনজন সেই আহমদ মুসা। আজ আমার যায়গায় ফাতিমা জোহরা হলে জীবন দিয়ে সাহায্য করতেন আহমদ মুসাকে। এই চিন্তা থেকেই আমি জাহরা ইভানোভা হিসাবে নয় ফাতিমা জোহরা হিসাবে তাঁকে সাহায্য করেছি’।
ভারি হয়ে উঠেছিল জাহরা ইভানোভার গলা। শেষটায় আবেগে রুদ্ধ হয়ে গেল তাঁর কণ্ঠ।
ডোনার চোখ-মুখ সত্তা জুড়ে উন্মুখ এক বিস্ময়। মন্ত্রমুগ্ধ সে। জাহরা ইভানোভা থামতেই তাঁর মুখ থেকে ছুটে বেরিয়ে এল জিজ্ঞাসা, ‘ফাতিমা জোহরা কে?’
‘এক হতভাগিনী নারী। কয়েক জেনারেশন আগের আমার পূর্ব পুরুষ’।
‘তারপর?’
‘ফাতিমা জোহরা তুর্কি অধীন ক্রিমিয়ার ইতিহাস নন্দিত সুলতান করিম গিরাই এর কন্যা। রাশিয়ার সম্রাজ্ঞী জারিনা দ্বিতীয় ক্যাথারিন রাশিয়ার সিংহাসনে আরোহণ করার পর তুর্কি সম্রাজ্যের উত্তর-পূর্বাংশে হত্যা, লুণ্ঠন ও ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করেন। যার ফলে তুর্কি সম্রাজ্যের ক্রিমিয়া, মলদোভিয়া, জর্জিয়া আর্মেনিয়া এবং ককেশাস অঞ্চল অশান্ত অস্থিতিশীল হয়ে উঠে। বাধ্য হয়ে তুরস্কের সুলতান তৃতীয় মোস্তফা ১৭৬৮ সালে রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। এই যুদ্ধ ঘোষণার পর ক্রিমিয়ার ‘মহান খাঁ’ করিম গিরাই-ই সর্ব প্রথম রাশিয়ার উপর সিংহ বিক্রমে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। তাঁর ঘোড়সওয়ার বাহিনী সব বাধা অতিক্রম করে রাশিয়ার ভেতরে ১৪ দিনের পথ পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল। তাঁর বাহিনী পোল্যান্ডের প্রান্ত সীমা পর্যন্ত স্পর্শ করেছিল। যুদ্ধক্ষেত্রে করিম গিরাই কখনও হারেন নি, হারেন তিনি ষড়যন্ত্রের কাছে। অপ্রতিরোধ্য করিম গিরাই কে থামিয়ে দেয়ার পথ হিসাবে দ্বিতীয় ক্যাথারিনের সরকার তাঁর গ্রিক চিকিৎসকের মাধ্যমে বিষ প্রয়োগে তাঁকে হত্যা করেন’।
থামল জাহরা ইভানোভা। আবেগে তাঁর চোখ-মুখ ভারী হয়ে উঠেছে।
‘তারপর?’
‘করিম গিরাই ছিলেন সোনার টুকরো এক শাসক। ন্যায় বিচারের এক চির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত তিনি। একবার তাঁর কয়েকজন সৈনিক একটি গীর্জার ‘ক্রুশ’ এর অবমাননা করেছিল। করিম গিরাই সেই সৈন্যদের গীর্জার সামনে দাড় করিয়ে প্রত্যেককে ১০০ টি বেত্রাঘাত করেছিলেন। আরেকবার তাঁর বিজয়ী বাহিনীর একদল সৈনিক পোল্যান্ডের এক গ্রাম লুণ্ঠন করেছিল। করিম গিরাই সেই সৈনিকদের প্রত্যেককে ঘোড়ার লেজে বেঁধে হত্যার নির্দেশ দেন। এই মহান করিম গিরাই এর কন্যা ছিলেন ফাতিমা জোহরা-আমার পূর্ব পুরুষ। আমি গর্বিত যে, করিম গিরাই এর রক্ত আমার দেহে আছে। এই রক্তের দাবীই সেদিন আমাকে বাধ্য করেছিল আহমদ মুসাকে সাহায্য করতে’।
থামল জাহরা ইভানোভা। তাঁর দু-চোখের কোনায় দু’ফোটা জমাট অশ্রু। আর মুখে আনন্দের জ্যোতি।
‘কিন্তু এই ফাতিমা জোহরা কি করে আপনার পূর্ব পুরুষ হলো?’
‘করিম গিরাই নিহত হন ১৭৬৮ সালে, তখন ফাতেমা জোহরার বয়স আট বছর। দৌলত গিরাই নতুন সুলতান হন ক্রিমিয়ার। তুর্কি সম্রাজ্য ও রাশিয়ার মধ্যে যুদ্ধ বিরতি হয় ১৭৭৪ সালে। চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করে আবার রুশ সম্রাজ্ঞী ক্যাথারিনের বাহিনী তুর্কি সম্রাজ্য আক্রমন করে ১৭৮৩ সালে। ফাতেমা জোহরা তখন কৈশোর যৌবনে পা দিয়েছে। তখন সদ্য বিবাহিতা। তাঁর বিয়ে হয়েছিল দৌলত গিরাই-এর পুত্র যুবরাজ ওমর গিরাই-এর সাথে। ক্রিমিয়া সীমান্তে দৌলত গিরাই বাধা দিয়েছিল ক্যাথারিনের বাহিনিকে। পর পর কয়েকটি যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে চূড়ান্ত পরাজয় ঘটে দৌলত গিরাই –এর। যুদ্ধক্ষেত্রে যুবরাজ ওমর গিরাই নিহত হন। রাজধানী লুণ্ঠিত হয়। বন্দী ও ক্ষমতাচ্যুত হন দৌলত গিরাই। আহত অবস্থায় বন্দিনী হন ফাতিমা জোহরাও। দুর্ধর্ষ রুশ জেনারেল পটেমকিন অতুলনীয় সুন্দরী ফাতিমা জোহরাকে দেখে মুগ্ধ হন। অসংখ্য পুরুষ,নারী, শিশু নিহত হলেও তিনি বেঁচে যান। ফাতিমা জোহরা সুস্থ হয়ে উঠলে জেনারেল পটেমকিন তাঁর বড় ছেলে রুশ নৌবাহিনীর তরুন অফিসার ক্যাপ্টেন কমান্ডার সিপিলভের সাথে তাঁর বিয়ে দেন। ফাতিমা জোহরা ও সিপিলভেরই বংশধর আমি। আমি তাঁদের সপ্তম জেনারেশন’।
‘আপনারা একজন হতভাগ্য নারীকে এতদিন মনে রেখেছেন?’
‘মনে রাখার কারন ফাতিমা জোহরা নিজেই। তিনি তাঁকে কোনদিনই ভুলেন নি। তিনি ধর্ম ত্যাগ করেন নি। মৃত্যুর মুহূর্ত পর্যন্ত মুসলিম ধর্মের বিধি-বিধান মেনে চলেছেন। তাঁর ইচ্ছা মোতাবেক তাঁর কবরও হয়েছে মুসলিম নিয়মে। তিনি পরিবারের কাউকে ইসলাম ধর্ম গ্রহন করার জন্যে বলেন নি। কিন্তু তাঁর ব্যক্তিত্ব চরিত্র গোটা পরিবারকে মুসলিম পরিবারে পরিণত করেছিল। রুশ এডমিরাল সিপিলভ তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রীর প্রভাবে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু প্রকাশ করতে পারেন নি। যাবার মত সেন্ট পিটার্স বার্গে কোন মসজিদ ছিল না। কিন্তু গির্জাতেও তখন সিপিলভ পরিবারের কেউ যেত না। পরে এই অবস্থা আর থাকে নি। তবে ফাতিমা জোহরা অবস্মরনিয় হয়ে আছেন। সেন্ট পিটার্স বার্গের (এখন লেলিনগ্রাদ) পারিবারিক গোরস্থানে তাঁর বিশেষ কবরটি এখনও স্বযত্নে রক্ষিত। তাঁর নিজের লিখে যাওয়া আরবি অক্ষরে তাঁর নাম ফলক তাঁর পিতা করিম গিরাই-এর নাম সহ এখনও অক্ষত আছে। প্রতি চন্দ্র মাস রমজানের ২৭ তারিখের রাতে তাঁর কবরে বাতি দেয়া হয়, ফুল দেয়া হয়। আর তাঁর নামের একটা অংশ আমাদের পরিবারের অধিকাংশ মেয়ের সাথে যুক্ত হয়ে আছে। তাঁর ‘জোহরা’ নাম থেকেই আমার নামের প্রথম অংশ ‘জাহরা’ হয়েছে। আমরা গর্ব করি আমরা জেনারেল পটেমকিন এবং এডমিরাল সিপিলভের বংশ, কিন্তু আমরা তাঁর চেয়েও শত গুন বেশি গর্ব করি যে, আমাদের দেহে চির স্বাধীনচেতা মুসলিম তাতারদের অসম সাহসী, অবিশ্বাস্য ন্যায় পরায়ণ সুলতান করিম-গিরাই এর রক্ত রয়েছে। এ রক্ত আমাদের মর্যদার প্রতীক। করিম গিরাই-এর সেদিনের সালতানাত আজকের চেচনিয়া আমাদের পরিবারের কাছে তীর্থস্থানের মত। সুযোগ পেলেই আমাদের পরিবারের সদস্যরা অন্তত একবার গিয়ে করিম গিরাই-এর অস্তিত্বহীন প্রাসাদ এবং ফাতিমা জোহরার পদধূলি মাখা পাহাড়-উপত্যকার উপর চোখ বুলিয়ে আসি’।
আবেগে রুদ্ধ হয়ে থেমে গেল জাহরা ইভানোভার কণ্ঠ।
ডোনা জোসেফাইনেরও মন ভিজে উঠেছিল।
জাহরা ইভানোভা থামলেও কথা বলতে পারলনা ডোনা।
একটু পর ধীরে ধীরে বলল, ‘জানতে ইচ্ছে করে আপনার ধর্ম বিশ্বাস কি?’
‘আমি গির্জায় যাই না। আমার আব্বাকেও যেতে দেখিনি। অনেকে মনে করেন ধর্ম বিশ্বাস বিরোধী কম্যুনিস্ট আমরা। আমরা কম্যুনিস্টও নই। হঠাৎ কখনও কোথাও মসজিদের আযান কানে গেলে মনটা যেমন আনচান করে উঠে, গির্জার ঘণ্টা ধ্বনি কিন্তু মনকে ঐভাবে নাড়া দেয় না’।
‘ক্রিমিয়ার সে ‘খাঁ’ দের স্মৃতি বিজড়িত আজকের চেচনিয়া অঞ্চলে আপনি গেছেন?’
‘যাওয়ার ইচ্ছা আমার পুরন হয়নি এখনও’।
থামল একটু জাহরা ইভানোভা। কফির কাপটা টেনে নিয়ে চুমুক দিতে দিতে বলল, ‘চেচনিয়ায় আমাদের পারিবারিক সফরটা একটা বিশেষ নিয়মে হয়ে থাকে। চেচনিয়ায় একটা হেরিটেজ ফাউন্ডেশন আছে। সেই ফাউন্ডেশনে চেচনিয়ায় ইসলামের ইতিহাস ও ইসলামী ব্যক্তিত্ব, তাঁদের কাজ ও তাঁদের পারিবারিক ইতিহাস সংগ্রহীত আছে। সেখানে করিম গিরাই-এর কন্যা ফাতিমা জোহরার কাহিনীও লিপিবদ্ধ আছে। ফাতিমা জোহরার সিপিলভ পরিবার যে এখনও ফাতিমাকে স্মরন করে, এ জন্যে চেচনিয়া হেরিটেজ ফাউন্ডেশন আমাদের পরিবারকে সম্নান করে। আমরা তাঁদের মাধমেই চেচনিয়া সফর করে থাকি’।
‘ধন্যবাদ ইভানোভা। আরেকটা জিজ্ঞাসা, রাশিয়ায় রাজতন্ত্র ফিরিয়ে আনার চেষ্টা হচ্ছে। এ নিয়ে রাজ পরিবারকে ঘিরে সংঘাত বেধেছে। এই বিষয়ে আপনার কি চিন্তা?’
‘আমি একজন রুশ। রাশিয়ায় গনতন্ত্র চাই, কিন্তু গনতন্ত্রের পরিবেশ সেখানে গড়ে উঠছে না। প্রমানিত হয়েছে, সেখানে কেন্দ্রীয় একটা অভিভাবকত্ব দরকার। সেটা নিয়মতান্ত্রিক রাজতন্ত্র হতে পারে। আরো একটা কারণে রাজ পরিবার ক্ষমতায় ফিরে আসুক আমি চাই’।
‘সেটা কি?’
‘রাজ পরিবারকে তাঁদের কিছু পাপের প্রায়শ্চিত করার সুযোগ দেয়া দরকার’।
‘তাঁদের অনেক পাপ। কোন পাপের প্রায়শ্চিত আপনি চাচ্ছেন?’
‘তাঁদের সব পাপের প্রায়শ্চিত হওয়া উচিত। কিন্তু আমার আগ্রহ একটি ব্যাপারে বেশি’।
‘সেটা কি?’
রুশ সম্রাজ্ঞী জারিনা দ্বিতীয় ক্যাথারিন এবং জার প্রথম আলেকজান্ডারের আমলে তুর্কি সম্রাজ্যের ক্রিমিয়াসহ বিশাল অঞ্চলের যে সম্পদ লুণ্ঠন করা হয়েছে, তা ফেরত দেয়া দরকার’।
‘আমি জানি না, এটা কি খুব বড় বিষয়?’
‘অবশ্যই বড় বিষয়’।
বলে একটু থেমে আবার জাহরা ইভানোভা শুরু করল, ‘শুধু বড় নয়, অতি বড় বিষয় মারিয়া জোসেফাইন। রুশ সম্রাজ্ঞী দ্বিতীয় ক্যাথারিনের রুশ বাহিনী তুর্কি সম্রাজ্যের ক্রিমিয়া থেকে বোসনিয়ার পশ্চিম প্রান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলের ৫৪ টি নগরী ধ্বংস ও লুণ্ঠন করে, যার অধিকাংশই ছিল বিশ্বাসঘাতকতামুলক এবং সন্ধি শর্তের পরিপন্থী। এর মধ্যে ৭টি নগরীর কাউকে বাঁচিয়ে রাখা হয়নি। আমার গ্র্যান্ড গ্র্যান্ড গ্র্যান্ড মাদার ফাতিমা জোহরার মাতৃভূমি ক্রিমিয়া বার বার লুণ্ঠন ও গনহত্যার শিকার হয়েছে। ১৭৮৩ সালে আমার পূর্ব পুরুষ রুশ জেনারেল পটেমকিন শুধু ক্রিমিয়া (চেচনিয়ার রাজধানী) শহরেই তিরিশ হাজার লোক হত্যা করে। পালিয়ে যাওয়া ছাড়া কেউ সেখানে বাঁচেনি। তুর্কি সম্রাজ্যের দুঃসময়ের সুযোগ নিয়ে রুশ সম্রাট জার প্রথম আলেকজান্ডারের রুশ বাহিনিও তুর্কি সম্রাজ্যের বিশাল অঞ্চল সহ ১৪ টি মুসলিম নগরী ধ্বংস ও লুণ্ঠন করে। পরে যে সন্ধি চাপিয়ে দেয়া হয় তুর্কি সম্রাজ্যের উপর, তাতে অপরাধী বানানো হয় রুগ্নসিংহ তুর্কি সম্রাজ্যকে। যে রুশ সম্রাট অন্যায়ভাবে তুর্কি সম্রাজ্যের একটা অংশ বিধ্বস্ত করল, লুণ্ঠন করল, সে রুশ সম্রাটই সানস্টেফানোর (১৭৯২) সন্ধিতে তুর্কি সুলতানের কাছ থেকে ১ কোটি ২০ লক্ষ্য পাউন্ড ক্ষতিপূরণ আদায় করল। সব মিলিয়ে রুশ সম্রাটদ্বয় দ্বিতীয় ক্যাথারিন ও প্রথম আলেকজান্ডার দুই হাজার কোটি স্বর্ণ মুদ্রা তুর্কি সম্রাজ্য থেকে লুণ্ঠন করে নিয়ে যায়। এই লুণ্ঠন ছোট কোন ঘটনা নয়’। থামল জাহরা ইভানোভা।
বিস্ময় ও বেদনায় আচ্ছন্ন ডোনার সমগ্র মুখমণ্ডল। বলল সে ধীর কণ্ঠে, ধন্যবাদ জাহরা ইভানোভা। বেদনাদায়ক এই ইতিহাস এইভাবে এতটা জানতাম না। কিন্তু আমি বুঝতে পারছি না এর প্রায়শ্চিত্য হবে কিভাবে? জাররা না হয় ক্ষমতায় এল, কিন্তু তুর্কি সম্রাজ্য তো নেই’। জাহরা ইভানোভা গম্ভীর কণ্ঠে বলল, ‘প্রায়শ্চিত্য আছে। জাররা ক্ষমতায় এলে এ দাবী উঠা উচিত, তারা লুণ্ঠিত দুই হাজার কোটি স্বর্ণ মুসলমানদের ফেরত দিক। তুর্কি সম্রাজ্য নেই, কিন্তু এই টাকা গ্রহনের বৈধ কর্তৃপক্ষ রয়েছে’।
‘কোনটি সেটা?’
‘এখন বলব না, সময়ই বলে দিবে’।
‘কিন্তু টাকা কোথায়? রাশিয়ার কোষাগার তো এখন শূন্য’।
হাসল জাহরা ইভানোভা। বলল, ‘নিশ্চিত থাকুন, জারদের শত শত বছরের সঞ্চিত ধনভাণ্ডার এখনও অক্ষত আছে। এত বড় ধনভাণ্ডার পৃথিবীতে আর নেই’।
‘কোথায় সে ধনভাণ্ডার?’
‘কেউ জানে না। মাত্র জানতো প্রিন্সেস তাতিয়ানা। এখন এর চাবিকাঠি, সর্বশেষ খবর অনুসারে আহমদ মুসার হাতে। তাই উনি এখন গ্রেট বিয়ার ও রুশ সরকারের সবচেয়ে মূল্যবান টার্গেট। এই টার্গেটকে ধরার জন্যে গ্রেট বিয়ার জাল পেতেছে’।
উদ্বেগ নেমে এল ডোনা জোসেফাইনের চোখে। বলল, কি সে জাল?’
নড়ে-চড়ে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসল জাহরা ইভানোভা। বলল মুখে কৃত্রিম গাম্ভীর্য টেনে, ‘আর কোন প্রশ্নের জবাব দেব না আমি। আমার প্রশ্নের জবাব দেন নি। বলেননি, আহমদ মুসার সাথে আপনার সম্পর্ক বা যোগাযোগের কথা’।
ডোনা হাসল। বলল, ‘সে অনেক কথা’।
ঘড়ির দিকে একবার তাকিয়ে জাহরা ইভানোভা বলল, ‘সব কথাই আমি শুনব। সময়ের কোন প্রশ্ন নেই’।
সলজ্জ হাসি ফুটে উঠল ডোনা জোসেফাইনের মুখে। বলল, ‘একটা এক্সিডেন্টের মধ্য দিয়ে তাঁর সাথে আপনার যেমন সাক্ষাত, এমনিভাবেই তাঁর সাথে আমার সাক্ষাত হয়’।
বলে একটু থামল ডোনা জোসেফাইন। তারপর শুরু করল কাহিনী।
এক ঘণ্টা ব্যাপী দীর্ঘ কাহিনী শেষ করে ডোনা জোসেফাইন আবেগ রুদ্ধ কণ্ঠে কথা শেষ করল এই ভাবে, ‘আহমদ মুসা দেশহীন ঠিকানাহীন আল্লাহ্‌র এক সৈনিক। তাঁর এই সময়ের সমস্ত মনোযোগ ঐ একদিকে ধাবিত’।
বিস্ময়-বিমুগ্ধ জাহরা ইভানোভার মুখে ফুটে উঠল মিষ্টি এক হাসি। চেয়ার থেকে উঠে দাড়িয়ে ডোনাকে একটা বাউ করে বলল, ‘আমি ফরাসি প্রিন্সেসের কাছ থেকে এক মহান বিপ্লবীর অন্তরঙ্গ অপরুপ এক কাহিনী শুনলাম। আমি সৌভাগ্যবান। ধন্যবাদ আপনাকে’।
বলে জাহরা ইভানোভা ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালো। গিয়ে ডোনার পিছনে দাড়িয়ে দুই হাত দিয়ে তাঁর গলা জড়িয়ে ধরে বলল, ‘ঠিক বলত? মনোযোগ তাঁর আর কোনদিকে নেই?’
‘সমগ্র মনোযোগ বলতে আমি বুঝিয়েছি, উনি যে কাজে যখন হাত দেন, তখন সে ব্যাপারে তিনি একনিষ্ঠ হন’। ঠোঁটে হাসি টেনে বলল ডোনা।
‘আর আমি বুঝিয়েছি, মিশনের কাজ ছাড়া তাঁর মনোযোগ আর কোন দিকে আছে কিনা?’
‘এ প্রশ্নের কোন অর্থ নেই, মানুষের মনোযোগ একই সাথে কত দিকেই তো থাকতে পারে’। হাঁসতে হাঁসতে বলল ডোনা।
জাহরা ইভানোভা হেসে বলল, ‘তা থাকতে পারে। আমি কিন্তু সব মনোযোগের কথা বলনি। বিশেষ মনোযোগের কথা বলেছি’।
‘সেটা তো উনিই বলতে পারেন’।
‘ঠিক আছে। আপনার বিশেষ মনোযোগের কথাই তাহলে জিজ্ঞেস করব’।
বলে একটু থেমে আবার শুরু করল, ‘দেশহীন ঠিকানাহীন আল্লাহ্‌র সৈনিককে অবশেষে দেশ ও ঠিকানা তো আপনি দিয়েছেন। এখন তাঁকে দেশহীন ঠিকানাহীন বলতে পারেন না’।
লজ্জায় লাল হয়ে উঠল ডোনা জোসেফাইনের মুখ। ধীরে ধীরে গম্ভীর হয়ে উঠল তার মুখ। জাহরা ইভানোভার একটি হাত গলা থেকে টেনে হাতে তুলে নিয়ে বলল, ‘ঘটির কি সাধ্য যে সাগরকে ঠিকানা দেয় ইভানোভা!’
‘এক ক্ষুদ্র হৃদয় কিন্তু শত সাগরের চেয়েও বড় প্রিন্সেস মারিয়া’।
‘আপনি ওকে জানেন না ইভানোভা’।
‘তিনি মানুষের চেয়ে বেশি কিছু নন। আর বিপ্লবীদের মন হৃদয়ের একটা টুকরো সবুজ আশ্রয়ের ভিখারী হয়ে থাকে। আপনার কাহিনী এ কথাও প্রমাণ করেছে’।
‘হয়তো হবে। বুঝিনা আমি’।
‘যে জয় করে তাঁর বুঝার প্রয়োজন নেই। আপনাকে কনগ্রাচুলেট করছি প্রিন্সেস’।
বলে জাহরা ইভানোভা ডোনার চুলে মুখ গুঁজে বলল, ‘আপনি কিন্তু পর্বত প্রমান একটা ভার মাথায় তুলে নিয়েছেন। লুই প্রিন্সেসের জন্যে সত্যিই এটা মানিয়েছে’।
ডোনা নিজের দু’হাত উপরের দিকে তুলে জাহরা ইভানোভার গলা জড়িয়ে ধরল। ভারি এবং ভেজা কণ্ঠে বলল, ‘আমি ঐ ভার বহনের বোধ হয় উপযুক্ত নই ইভানোভা। আমি ওকে শুধু বাধাই দেই, একে এগিয়ে দিতে পারিনা’।
‘যাকে আপনি বাধা বলছেন, ওটা বাধা নয়। ওঁর জীবনের ভারসাম্য বিধানের জন্যে এটা খুবই জরুরী’।
‘কিন্তু আমার বাধা কোন কাজ করে না। বরং তাঁর মিশন থেকে সব সময় আমাকে দুরে রাখতে তিনি চেষ্টা করেন’।
‘এটাই স্বাভাবিক। একজন বিপ্লবী তাঁর পথ তিনি নিজেই নির্দিষ্ট করেন। তবু যে বাধা বা পরামর্শ আপনি দেন, তার প্রয়োজন আছে। কোন সৎ পরামর্শই বৃথা যায় না। তাঁর অশরীরী প্রভাব অবিরাম কাজ করে চলে। বুঝতেই পারবেন না কিভাবে আপনি ওঁর কাজ নিয়ন্ত্রন করছেন’।
‘ধন্যবাদ। আপনার কথা সত্য হোক’। বলে ইভানোভাকে টেনে নিয়ে পাশের চেয়ারে বসাল। বলল, ‘আপনি ওকে অমুল্য সাহায্য করেছেন। আরও সাহায্য আপনি ওকে করতে পারেন’।
‘অবশ্য পারি। সেদিন উনি আমাকে একটা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করেছিলেন। জানতে চেয়েছিলেন ক্যাথারিনকে কোথায় বন্দী করে রাখা হয়েছে। বিশ্বাসঘাতকতার পরিধি আর বাড়াবো না এই যুক্তিতে সেদিন তাঁকে প্রশ্নটির উত্তর দেইনি। আজ সে প্রশ্নের উত্তর দেব। কারন প্রিন্সেস ক্যাথারিন এখন একা বন্দী নন, তাঁর সাথে এখন বুঝলাম আপনার আব্বা প্রিন্স প্লাতিনিও বন্দী রয়েছেন’।
উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ভরা মুখে একরাশ প্রশ্ন নিয়ে ডোনা তাকাল জাহরা ইভানোভার দিকে।
গম্ভীর হয়ে উঠেছে জাহরা ইভানোভার মুখ। বলল, ‘প্রিন্সেস ক্যাথারিন এবং আপনার আব্বা প্রিন্স প্লাতিনিকে মস্কো নিয়ে যাওয়া হয়েছে’।
চমকে উঠল ডোনা। আর্তকণ্ঠে বলল, ‘মস্কো নিয়ে যাওয়া হয়েছে?’
‘হ্যাঁ। আমি ব্যাপারটা সংগে সংগেই জানতে পারি, কিন্তু আহমদ মুসাকে জানাবার কোন উপায় ছিলনা আমার। সেদিন তাঁর কোন ঠিকানা নেয়া বা টেলিফোন নাম্বার রাখার সুযোগ হয়নি’।
‘প্রিন্সেস ক্যাথারিনকে মস্কো নিয়ে যাওয়ার যুক্তি আছে। কিন্তু আব্বাকে নিয়ে গেল কেন?’
‘গ্রেট বিয়ার তাঁর যুদ্ধক্ষেত্র ফ্রান্স থেকে রাশিয়ায় শিফট করার জন্যেই এটা করেছে। আহমদ মুসাই এখন তাঁদের একমাত্র টার্গেট। এই টার্গেটকে তারা রাশিয়ায় নিয়ে যেতে চায়। নিজের দেশে যুদ্ধ করা গ্রেট বিয়ারের পক্ষে সহজ হবে, আহমদ মুসার জন্যে হবে অপেক্ষাকৃত কঠিন’।
একটু থামল জাহরা ইভানোভা। ধীরে ধীরে শুরু করল আবার, ‘প্রিন্সেস ক্যাথারিনকে রাশিয়ায় নিয়ে গিয়েই আহমদ মুসাকে তারা রাশিয়ায় নিয়ে যেতে বাধ্য করতে পারতো। কিন্তু তারা বাড়তি ব্যবস্থা হিসাবে মিঃ প্লাতিনিকেও রাশিয়ায় নিয়ে গেছে। যাতে আহমদ মুসার রাশিয়া গমন একেবারে নিঃসন্দেহ হয়’।
ডোনার মুখ একেবারে চুপসে গিয়েছিল। প্রায় ভেঙ্গে পড়ার অবস্থা হয়েছিল তাঁর। একদিকে তাঁর পিতাকে রাশিয়ায় নিয়ে যাবার খবর, অন্যদিকে আহমদ মুসা রাশিয়ায় যেতে বাধ্য হবে, এই দুই খবর তাঁকে ভীত-শংকিত করে তুলেছে।
জাহরা ইভানোভা ডোনার কাধে হাত রেখে সান্ত্বনা দিয়ে বলল, ‘আপনার আব্বাকে তারা মর্যাদা অনুসারেই রেখেছে। ভালো আছেন তিনি। তাঁর সাথে গ্রেট বিয়ারের শত্রুতা নেই। সুতরাং ওদিক থেকে খুব চিন্তার কিছু নেই’।
‘ধন্যবাদ ইভানোভা আপনাকে। আহমদ মুসা খুব খুশি হবে। চলুন না আমার সাথে’।
হাসল জাহরা ইভানোভা। বলল, ‘সমগ্র মন থেকে এমন একটা আমন্ত্রনের অপেক্ষায় ছিলাম। তবে আজ নয়। আমাকে ঠিকানা দিন। দু’একদিনের মধ্যেই যাব’।
‘আপনার ঠিকানাটা দিন। আহমদ মুসা নিশ্চয় চাইবে’। বলে ডোনা নিজের নেম কার্ড তুলে দিল ইভানোভার হাতে।
‘ধন্যবাদ’। বলে জাহরা ইভানোভাও নিজের নেম কার্ড ডোনাকে দিল।
‘ধন্যবাদ’। বলে ডোনা উঠে দাঁড়ালো।
জাহরা ইভানোভাও।

দোতলায় আহমদ মুসার ড্রয়িং রুমে প্রবেশ করে আহমদ মুসার সোফায় ধপ করে বসে পড়ল ডোনা জোসেফাইন।
আহমদ মুসা ডোনার দিকে তাকিয়ে কিছুটা উদ্বেগ নিয়ে বলল, ‘তোমাকে খুব ক্লান্ত, বিধ্বস্ত দেখাচ্ছে আর মনে হচ্ছে তুমি কিছু বলবে?’
‘বলব, বলছি। আব্বা ও প্রিন্সেসে ক্যাথারিনাকে মস্কো নিয়ে যাওয়া হয়েছে’।
বিস্ময়-উৎকণ্ঠা নেমে এল আহমদ মুসার চোখে। সোজা হয়ে বসল। বলল, ‘মস্কো নিয়ে গেছে! কেন? কি কারনে?’
‘গ্রেট বিয়ার যুদ্ধক্ষেত্র রাশিয়ায় নিয়ে যেতে চায়। তোমাকে সেখানে যেতে বাধ্য করবে তারা’।
তৎক্ষণাৎ কোন কথা বলল না আহমদ মুসা। ভাবছিল সে। বলল এক সময়, ‘ঠিকই বলেছ। যুদ্ধক্ষেত্রটা ওদের জন্যে রাশিয়ায় শিফট করাই এখন স্বাভাবিক। কিন্তু তুমি এসব জানলে কি করে?’
‘জাহরা ইভানোভা আমাকে বলেছে’।
‘জাহরা ইভানোভা? কোথায় পেলে তাঁকে, কেমন করে পরিচয় হলো? সে বলল তোমাকে এসব কথা?’
ডোনা সব ঘটনা আহমদ মুসাকে বলল।
ডোনার বলা শেষ হলেও আহমদ মুসা কোন কথা বলল না। যেন মন্ত্রমুগ্ধ সে। অনেকক্ষণ পর ধীরে ধীরে সে বলল, ‘ডোনা তুমি জাহরা ইভানোভার যে কাহিনী শুনালে, তা উপন্যাস নয়, কিন্তু উপন্যাসের চেয়ে অপরুপ। অপরুপ কাহিনীর অপরুপ নায়িকা জাহরা ইভানোভা। বুক বিদীর্ণ হবার মত এত কথা তাঁর মধ্যে ছিল, তাঁর এততুকুও প্রকাশ ঘটায়নি সে সেদিন। সত্যি ডোনা জাহরা ইভানোভা ভুলে যাওয়া এক ইতিহাস আমাদের সামনে এনেছেন। রাশিয়ায় যাওয়ার মধ্যে এক বাড়তি আগ্রহ আমি আমার মধ্যে দেখতে পারছি। রাশিয়ার রাজচক্রে জড়িয়ে পড়ার মধ্যে নতুন সার্থকতা খুঁজে পাচ্ছি আমি’।
‘রাশিয়ার জার সম্রাটদের ধনভাণ্ডারে মুসলিম অধিকারের কথা বলছ?’
‘অধিকার’ এর কথা বলছি না। জারদের ধনভাণ্ডারে মুসলিম সম্পদ থাকার কথা বলছি’।
‘অধিকার নয় কেন?’
‘তুর্কি সুলতানরা কিংবা তুর্কি সম্রাজ্যের কেউ এ অধিকারের কথা কখনও তুলেননি’।
‘না তুললেই কি অধিকার অধিকার থাকেনা?’
‘আইনগত দাবী থেকেই অধিকার সৃষ্টি হয়। রুশ ধনভাণ্ডারের এই অধিকার মুসলমানদের নেই’।
‘কিন্তু জাহরা ইভানোভা দাবীর কথাই তুলেছে’।
‘সে রুশ। সে দাবী তুলতে পারেনা। খুব বেশি হলে সে পারে মুসলিম সম্পদ ফিরিয়ে দিতে’।
‘বুঝেছি। তাহলে রাশিয়ার রাজচক্রে জড়িয়ে পড়ার মধ্যে নতুন সার্থকতা পেলে কোথায়?’
‘রাশিয়ায় যে রাজচক্রের সৃষ্টি হয়েছে, তাঁর কেন্দ্র বিন্দু হল জার সম্রাটদের ধনভাণ্ডার। এ ধনভাণ্ডারে মুসলিম অর্থও রয়েছে। সুতরাং এ ধনভাণ্ডার অবৈধ লুণ্ঠন থেকে রক্ষার মধ্যে বাড়তি একটা আকর্ষণ অবশ্যই আছে’।
‘যাক এ প্রসঙ্গ। নতুন সংকট সম্পর্কে বল’।
‘বলার তো কিছু নেই। কাজ করার প্রশ্ন। গ্রেট বিয়ার যে পরিকল্পনা করেছে, তা ব্যর্থ হবার নয়। আমি যাব রাশিয়ায়’।
মুহূর্তে বদলে গেল ডোনার মুখ। উদ্বেগ বেদনার ছায়া নামল সারা মুখমণ্ডল জুড়ে।
কথা বলতে পারল না ডোনা।
আহমদ মুসাই বলল, ‘বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এসেছ। ক্লান্ত তুমি। এখনও খাওয়া হয়নি। যাও উপরে। পরে কথা হবে’।
ডোনা মাথা নিচু করে উঠল। হাঁটতে শুরু করল তিনতলার সিঁড়ির দিকে।
আহমদ মুসার ঠোঁটে ফুটে উঠল এক টুকরো মিষ্টি হাসি। মনে মনে বলল, নারী সব সময় নারীই।