৩৩. সুরিনামের সংকটে

চ্যাপ্টার

চ্যাপ্টার

নিও নিকারী থেকে একটা মাত্র হাইওয়ে দক্ষিণে বেরিয়ে টটনস ও গ্রোনজা শহর হয়ে গেছে রাজধানী পারামারিবোতে।
আহমদ মূসার গাড়ি বেরিয়ে এল নিও নিকারী শহর থেকে।
শহর থেকে বের হওয়া বিভিন্ন রাস্তা গিয়ে মিশেছে হাইওয়েতে।
আহমদ মূসার গাড়ি গিয়ে সেই হাইয়েওতে প্রবেশ করল।
একজন পুলিশ অফিসার দাঁড়িয়েছিল রাস্তার পাশে। তার কোমরে ঝোলানো রিভলবার এবং তার হাতে একটা দূরবীন।
পুলিশ অফিসারটি রাস্তার পাশ থেকে হাত তুলে আহমদ মূসাকে গাড়ি দাঁড় করাতে বলল।
চেকপোস্ট নয়, অথচ গাড়ি দাঁড় করাতে বলা হোল।
এভাবে গাড়ি দাঁড় করার আদেশ পাওয়ায় বিরক্ত হলো আহমদ মুসা।
গাড়ি দাঁড় করাল।
গাড়ি দাঁড় করাতেই পুলিশ অফিসারটি জানালা দিয়ে ভেতরে উঁকি দিয়ে বলল, মাফ করবেন, ‘আমরা একজন লোক খুঁজছি’।
‘কাকে খুঁজছেন?’ প্রশ্ন করল ড্রাইভার রূপী আহমদ মুসা।
পুলিশ অফিসারটি একটা ফটো আহমদ মুসার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘এই লোকটি।’
ফটোটির দিকে তাকিয়ে আহমদ মুসা চমকে উঠলো। এ যে আহমদ হাত্তা নাসুমনের ফটো।
আহমদ মুসা জিজ্ঞেস করল, লোকটি চোর-ডাকাত, হাইজ্যাকার নাকি?
‘না ইনি পলিটিশিয়ান। ফেরার। এখন শোনা যাচ্ছে, সে গোপনে সুরিনামে প্রবেশ করেছে’।
‘কোথায় গিয়েছিল সে?’ জিজ্ঞেস করল আহমদ মুসা।
‘দেশের বাইরে কোথাও।‘
‘কি করে জানা গেল সুরিনামে প্রবেশ করেছেন তিনি।‘
‘সেটা জেনে লাভ নেই। এখন দরকার তাকে পাওয়া। ছবিটা দেখে রাখুন। তাকে পেলে পুলিশে ফোন করবেন।‘
বলে লোকটি গাড়ির জানালা থেকে মুখ সরাতে গিয়ে হাত্তা নাসুমনের দিকে তাকিয়ে চমকে উঠল। বলল, ‘আপনাকে পরিচিত মনে হচ্ছে’।
পুলিশ অফিসারের কথা শেষ না হতেই আহমদ মুসা সামনের সিটের দরজা খুলে দিয়ে বলল, ‘স্যার দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলার চাইতে গাড়িতে বসুন। বসে কথা বলুন’।
পুলিশ অফিসারটি উঠে বসল। তার মুখ গম্ভীর। চোখে সন্ধানী দৃষ্টি। আহমদ মুসার পাশের সিটে উঠে বসতে বসতে হাত্তা নাসুমনকে সে বলল, ‘আপনার নাম কি?’
‘আবুল হাত্তা’। বলল আহমদ হাত্তা নাসুমন।
‘আবুল হাত্তা, না আহমদ হাত্তা?
বলেই পুলিশ অফিসারটি পেছনের সিটে বসেই চোখের পলকে তার বাম হাতটা আহমদ হাত্তার দিকে চালনা করে তার দাড়ি ধরে টান দিল। দাড়ি খসে এল তার হাতে। সংগে সংগে চিৎকার করে উঠল পুলিশ অফিসার, ‘ও গড, পাওয়া গেছে। ইউরেকা, ইউরেকা’।
আবার পরক্ষণেই চিৎকার থামিয়ে পুলিশ অফিসারটি গম্ভীর কন্ঠে বলে উঠল, ‘গাড়ি থেকে নামুন মি. আহমদ হাত্তা নাসুমন। আপাতত নাম ভাঁড়ানো, ছদ্মবেশ নিয়ে প্রতারণা, ফেরার হওয়া, দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা, ইত্যাদি অভিযোগে আপনাকে আমি গ্রেফতার করলাম’।
বলে গাড়ির দরজা খুলতে গেল পুলিশ অফিসার।
ড্রাইভার রূপী আহমদ মুসা বলল, দরজা লক করে দিয়েছি পুলিশ অফিসার। আপাতত আমরা আপনাকেই এরেস্ট করলাম।
আহমদ মুসার কথা শুনে পুলিশ অফিসার হুংকার দিয়ে আহমদ মুসার দিকে মুখ ঘুরাল। মুখ ঘুরিয়ে দেখল, আহমদ মুসার রিভলবার তার দিকে হা করে তাকিয়ে আছে।
‘একি ড্রাইভার কি করছ তুমি। পুলিশের দিকে তুমি রিভলবার তাক করেছ, এর পরিণতি কি জান?’ ধমকের সুরে কথা কয়টি বলল পুলিশ অফিসার।
‘পরে জানলেও চলবে পুলিশ অফিসার, আপনার রিভলবারটি আমাকে দিন। দেরি করলে আমার প্রথম গুলিটার লক্ষ্য হবে আপনার ডান হাত’। কঠোর কন্ঠে বলল আহমদ মুসা।
পুলিশ অফিসার একবার আহমদ মুসার চোখের দিকে তাকাল। তারপর আস্তে রিভলবারটা বের করে আহমদ মুসার হাতে দিল।
‘ধন্যবাদ পুলিশ অফিসার’। বলে আহমদ মুসা পুলিশের রিভলবার পেছনের দিকে ছুঁড়ে দিয়ে বলল, ‘মি. হাত্তা, আপনি পুলিশ অফিসারের মাথা তাক করে রাখুন। কোন বেয়াদবি করার চেষ্টা করলে তার মাথাটা একেবারে উড়িয়ে দেবেন’।
আহমদ মুসা নিজের হাতের রিভলবারটা স্টিয়ারিং হুইলের সামনের ড্যাশ বোর্ডে রেখে পুলিশ অফিসারের দিকে চেয়ে বলল, মি. পুলিশ অফিসার আপনি মি. হাত্তার যে অপরাধের তালিকা দিলেন, তার মধ্যে তাঁর আসল দোষটাই তো নেই। জানেন দোষটা কি? দোষটা হলো, একুশ তারিখে তিনি তাঁর মনোনয়ন পত্র জমা দেয়ার জন্যে দেশে এসেছেন’।
পুলিশ অফিসারটি মুখ হাঁড়ি করে বসেছিল। সে ভীতও। কোন কথা বলল না সে। তাকাল না সে আহমদ মুসার দিকে।
আহমদ মুসা আবার বলল, ‘মি. পুলিশ অফিসার, আপনি বললেন মি.হাত্তা ফেরার। তিনি কি ফেরার হয়েছিলেন, না তাঁকে কিডন্যাপ করা হয়েছিল? তাঁর মেয়েকে কারা দেশ ছাড়া করেছে পুলিশ অফিসার? কারা তাঁর হবু জামাতাকে পণবন্দী করে রেখেছে? দেশে অপহরণ, কিডন্যাপের সয়লাব সৃষ্টি করেছে কারা? এসব অপরাধ কি মি. হাত্তার?
‘তুমি একজন ড্রাইভার। এসব তুমি জান কেমন করে? বলছ কোন স্বার্থে? মরার জন্যে পাখা উঠেছে বুঝি! চল চেকপোষ্টে, দেখবে, কি ঘটে?’ সাহস দেখিয়ে অপমান-ক্ষুব্ধ কন্ঠে বলল পুলিশ অফিসারটি।
‘ভালো কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন মি. পুলিশ অফিসার। চেকপোষ্টগুলোর ঝামেলা এড়াবার জন্যে আপনার সাহায্য আমাদের প্রয়োজন এবং আমরা আশা করি আপনি তা করবেন’। বলল আহমদ মুসা মুখে মৃদু হাসি টেনে।
‘চল দেখা যাবে। ওখানে গিয়ে রিভলবার তোমাদের লুকাতে হবে। তারপর কি ঘটে দেখবে’। পুলিশ অফিসারটি রাগে গরগর করতে করতে বলল।
‘মি. পুলিশ অফিসার, একজন উচ্চ পদস্থ পুলিশ অফিসারের গাড়ি চেকপোস্টে চেক হতে যাবে কেন? দেখবেন, আপনি তা হতে দেবেন না’।
‘পাগলের প্রলাপ থামাও ড্রাইভার’। বলে ভিন্ন দিকে মুখ ঘুরাল পুলিশ অফিসার।
আহমদ মুসার ঠোঁটে মিষ্টি হাসি ফুটে উঠল।
আহমদ মুসা পেছনে না তাকিয়েই আহমদ হাত্তা নাসুমনকে লক্ষ্য করে বলল, ‘মি. হাত্তা, একটু বিশ্রাম করতে চাই। সামনে কোথাও কি আড়াল পাওয়া যাবে?’
আহমদ হাত্তা নাসুমন পুলিশ অফিসারের দিকে তার রিভলবার তাক করেছিল বটে, কিন্তু তার মনে কোন জোর ছিল না। একজন পুলিশ অফিসারকে এভাবে কিডন্যাপ করায় ভীত হয়ে পড়েছে সে। বিষয়টা জানাজানি হবেই। তখন সাংঘাতিক বিপদে পড়তে হবে তাদেরকে। কিন্তু আহমদ মুসার সিদ্ধান্তের বাইরে তার করার কিছু নেই। সে পুলিশ অফিসারের সাথে আহমদ মুসার কথার কোন অর্থ খুঁজে পাচ্ছেনা। পুলিশ অফিসারকে আহমদ মুসা কি পুতুল মনে করছে! পুলিশ অফিসারের ধমককেই যুক্তি মনে হচ্ছে তার কাছে। আহমদ মুসা না হয়ে অন্য কেউ হলে হাত্তা এসব অর্থহীন কথাবার্তা থামিয়ে দিত ও বাস্তববাদী হতে বলত। কিন্তু আহমদ মুসার ক্ষেত্রে এ ধরনের কিছু ভাবার অবকাশ নেই। আহমদ মুসা কি ভেবে, কোন পরিকল্পনায় কি বলছে তা তার মত লোকদের মাথায় আসার কথা নয়।
আহমদ মুসার কথা আহমদ হাত্তা নাসুমনের চিন্তার সূত্র ছিন্ন করে দিল।
আহমদ মুসার বিশ্রাম নেবার কথা শুনে বিষ্মিত হলো হাত্তা নাসুমন। কিন্তু পরক্ষণেই তার মনে হলো, নিশ্চয় আহমদ মুসা নতুন কিছু ভাবছে। আহমদ মুসার প্রশ্নের জবাবে বলল সে, ‘আধা মাইল সামনে রাস্তার বাম পাশেই একটা বাগান পাওয়া যাবে। বাগানে একটা পুকুরও আছে’।
‘ধন্যবাদ মি. হাত্তা। আমাকে দেখিয়ে দেবেন’।
আহমদ মুসা থামল।
সবাই নিরব।
ছুটে চলছে গাড়ি।
রাস্তার বাম পাশে একটা বাগান আহমদ মুসা দেখতে পেল। বলল, ‘মি. হাত্তা ওটাই কি আপনার সেই বাগান?’
‘হ্যাঁ’। বলল হাত্তা নাসুমন।
হাইওয়ে থেকে একটা মেঠো রাস্তা বাগানে গিয়ে প্রবেশ করেছে।
আহমদ মুসা গাড়ি ঘুরিয়ে নিয়ে মেঠো পথ ধরে বাগানে প্রবেশ করল।
বাগানটা ফলের নয়, বনজ। মূল্যবান বনজ গাছে ভরা বাগান। সেই সাথে ঝোপ-ঝাড়ে ভর্তি।
খুশি হলো আহমদ মুসা। এ ধরনের বাগানই তার চাই।
আহমদ মুসা একটা ঘন ঝোপের আড়ালে নিয়ে গাড়ি দাঁড় করাল। বলল, ‘মি. হাত্তা আপনি রিভলবারসহ বের হোন’।
বের হলো হাত্তা নাসুমন।
তারপর আহমদ মুসা পুলিশ অফিসারের পাশের দরজা আনলক করে দিয়ে বলল, ‘মি. পুলিশ অফিসার আপনি বের হোন’।
চারদিকে তাকাল পুলিশ অফিসার।
তার চোখে-মুখে ভয়ের চিহ্ন দেখা গেল। বলল, ‘কেন নামতে হবে এখানে?’
‘কাজ না থাকলে এমনি তো আর আসিনি মি. পুলিশ অফিসার। নামুন মি. অফিসার, এক আদেশ আমি দুবার করি না’। আহমদ মুসার কন্ঠ কঠোর শোনাল।
গাড়ি থেকে নামল পুলিশ অফিসার।
ব্যাগ থেকে বেল্ট জাতীয় একটা ভারী জিনিস এবং সেই সাথে রিভলবার হাতে নিয়ে নামল আহমদ মুসা।
গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে আছে পুলিশ অফিসারটি। তার সামনে উদ্যত রিভলবার হাতে দাড়িয়ে আছে হাত্তা নাসুমন।
আহমদ মুসা গিয়ে পুলিশ অফিসারকে তার জামা খুলতে বলল।
পুলিশ অফিসার ভীত দৃষ্টিতে তাকাল আহমদ মুসার দিকে। মৃত্যুভয় ফুটে উঠেছে তার চোখে-মুখে।
আহমদ মুসা হাসল। বলল, ‘ভয় নেই মি. পুলিশ অফিসার, এখানে তোমাকে মারতে নিয়ে আসিনি। দেরি করো না’।
পুলিশ অফিসার জামা খুলে ফেলল।
আহমদ মুসা পুলিশ অফিসারের পেছনে দাড়িয়ে হাতের বেল্টটা তার বুকের উপর দিয়ে পরিয়ে দিল।
পেছনে হুক দিয়ে আটকে দিল বেল্ট।
বেল্ট দেখেই চোখ ছানাবড়া হয়ে গেছে পুলিশ অফিসারের।
‘ঠিক অনুমান করেছ পুলিশ অফিসার। তোমার বুকের উপর বেল্টের সাথে আটকানো ওটা বিশেষ ধরনের একটি এক্সপ্লোসিভ বুলেট, ঠিক বোমা নয়।বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে চারদিক ধ্বংস করে দেয়। আর এই এক্সপ্লোসিভ বুলেটের বিস্ফোরণ চারদিকে ছড়ায় না। বুলেটের মত ভেতরে ঢুকে গিয়ে বিস্ফোরণ ঘটায়। সেই লোকটির ভেতরের সবকিছু শেষ হয়ে যায় কিন্তু বাইরে অক্ষত থাকে। আশে-পাশের লোকদের গায়ে আঁচড় ও লাগেনা’। বলল আহমদ মুসা।
‘আমাকে তোমরা এভাবে হত্যা করতে চাইছ কেন?’ লোকটির কন্ঠ আর্তনাদ করে উঠল।
‘না, আমরা তোমাকে হত্যা করছি না। আমাদের কথা মেনে চললে তোমার কোন ক্ষতি হবে না’। বলল আহমদ মুসা।
‘তোমাদের কি কথা?’ বলল পুলিশ অফিসার।
‘চেকপোস্টগুলোতে যাতে গাড়ি না দাঁড় করাতে হয় সেই ব্যবস্থা তোমাকে করতে হবে’।
কথা শেষ করেই আবার বলল, ‘জামাটা এবার পরে নাও পুলিশ অফিসার।
যন্ত্রের মত হুকুম তামিল করল সে।
তারপর পুলিশ অফিসারকে গাড়িতে তুলে দিয়ে হাত্তা নাসুমনকে গাড়িতে উঠতে বলে আহমদ মুসা আবার ড্রাইভিং সিটে বসল।
বসার পর ব্যাগ থেকে সাদা রংয়ের একটা যন্ত্র বের করে স্টিয়ারিং হুইলের বাটে বাঁধল এবং পুলিশ অফিসারকে লক্ষ্য করে বলল, ‘এই সাদা যন্ত্রটা আপনার বুকে পাতা ‘বিস্ফোরণ বুলেট’টার রিমোট কনট্রোল। সাদা যন্ত্রটায় এই যে লাল বোতাম দেখছেন, এটা ডেটোনেটর। এটায় চাপ দিলেই আপনার বুকে বোমাটার বিস্ফোরণ ঘটবে’।
পুলিশ অফিসারের মুখ রক্তহীন সাদা হয়ে গেল।
‘কি আমাদের প্রস্তাবে রাজি তো মি. পুলিশ অফিসার?’ বলল আহমদ মুসা।
‘ঠিক আছে। কিন্তু জেনে রেখ একজন পুলিশ অফিসারের উপর জুলুম করার ফল ভাল হবে না’। ভীত ও ক্ষুব্ধ কন্ঠে বলল অফিসার।
‘মনে রেখ, তোমরা জুলুম করার জন্যে আহমদ হাত্তা নাসুমনকে গ্রেফতার করতে এসেছিলে এবং আরও যে সব জুলুম করেছ, তার কিছু শাস্তি তোমারও পাওনা’।
বলে একটু থেমেই আবার স্মরণ করিয়ে দিল পুলিশ অফিসারকে, মনে রেখ, পুলিশরা গাড়ি চেক করতে আসলেই কিন্তু লাল সুইচে চাপ দিয়ে আমি বিস্ফোরণ ঘটাব’।
‘দেখ, পুলিশ গাড়ির দিকে আসার অর্থ গাড়ি সার্চ হওয়া নয়। হঠাৎ আবার লাল বোতামে চাপ দিয়ে বসো না। আমি বলছি গাড়ি সার্চ হবে না’।
বলল পুলিশ অফিসার ভীত কন্ঠে।
‘দেখ অফিসার তুমি এমন ব্যবস্থা করবে যাতে গাড়ি না দাঁড় করাতে হয়। আমরা এটা চাই’। আহমদ মুসা বলল।
‘ঠিক আছে’। বলল পুলিশ অফিসার।
‘ধন্যবাদ মি. পুলিশ অফিসার’। বলে আহমদ মুসা গাড়ি স্টার্ট দিল।
গাড়ি আবার উঠে এল হাই ওয়েতে। ছুটতে লাগল গাড়ি আবার।
সামনেই মধ্য উপকূলের একমাত্র শহর টটনস। টটনস শহরের মুখে একটা চেকপোস্ট।
চেকপোস্টের কাছাকাছি হলো গাড়ি। পুলিশ রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে। দেখা গেল তারা দুটি গাড়ি দাঁড় করিয়ে চেক করছে।ও দুটি গাড়ি চেক শেষ হওয়ার আগেই আহমদ মুসার গাড়ি তাদের বরাবর পেৌঁছে গেল।
আহমদ মুসার গাড়িতে বসা পুলিশ অফিসার তার মাথার টুপি ড্যাশ বোর্ডে খুলে রেখেছিল। চেকপোস্টের কাছাকাছি হতেই সে টুপি পরে নিয়েছে।
আহমদ মুসার গাড়ি চেকপোস্টের কাছাকাছি পৌছতেই দুজন পুলিশ আহমদ মুসার গাড়ির দিকে তাকিয়েছিল। একজন পুলিশ অফিসারকে গাড়িতে দেখেই তারা স্যালুট দিল এবং গাড়ি চালিয়ে যেতে ইশারা করল।
আহমদ মুসার গাড়িতে বসা পুলিশ অফিসার হাত তুলে তাদের স্যালুট গ্রহণ করল এবং হাত নেড়ে হাসি মুখে তাদের ধন্যবাদ জানাল।
গাড়ি চেকপোস্ট পেরিয়ে এল।
আহমদ মুসা ধন্যবাদ জানাল পুলিশ অফিসারকে।
তারপর শস্যশ্যামল উপকূল-উপত্যকার পথ ধরে গাড়ি পাড়ি দিল এক দীর্ঘ পথ। দু’ঘন্টা পর গাড়ি পৌছল ট্যুরিস্টদের বড় আকর্ষনীয় উপকূল শহর গ্রোনিনজনে। শহরে ঢোকার পথে কোন চেকপোস্ট নেই। চেকপোস্ট এল শহর থেকে বের হবার পথে। এখানেও গাড়ি দাঁড় করাতে হলো না। গাড়িতে একজন পুলিশ অফিসারকে দেখেই গাড়ি চালিয়ে চলে যেতে ইশারা করল।
গ্রোনিনজন শহরের তিরিশ কিলোমিটার দক্ষিণে রাজধানী পারামারিবো।
রাজধানীর উপকন্ঠে রয়েছে বড় চেকপোস্ট। আহমদ মুসা আশংকা করল এ চেকপোস্টে উচ্চপদস্থ পুলিশ অফিসার থাকতে পারে। গাড়ি তারা দাঁড় করাতেও পারে। কিন্তু দাঁড় করাতে হলো না গাড়ি। চেকপোস্টের কাছে এসেই আহমদ মুসাদের পুলিশ অফিসারটি রাস্তার পাশে দাঁড়ানো পুলিশদের উদ্দেশ্যে হাত নেড়ে স্বাগত জানাল। পুলিশরাও হাত নেড়ে শুভেজ্ছা জ্ঞাপন করল।
ওঁরা গাড়ি দাঁড় করাতে ইশারা করল না।
হাঁফ ছেড়ে বাঁচল আহমদ মুসা। বলল, ‘ধন্যবাদ মি. পুলিশ অফিসার’।
‘ধন্যবাদ দিতে হবে না। সামনে আর চেকপোস্ট নেই। এবার দয়া করে আমার বুক থেকে আজরাইলটাকে নামান’। বলল পুলিশ অফিসারটি।
আহমদ মুসা হাসল। বলল, ‘আপনার ডিউটি অফিসের টেলিফোন নম্বর দিন’।
‘কেন?’ পুলিশ অফিসারের চোখে-মুখে বিস্ময়।
আমি ওদের সাথে যোগাযোগ করে দিচ্ছি, ওদের সাথে আপনাকে কথা বলতে হবে’। বলল আহমদ মুসা।
‘কি কথা?’
‘আপনি অফিসকে বলবেন, পারিবারিক জরুরী পরিস্থিতিতে হঠাৎ আপনাকে পারামারিবো আসতে হয়েছে। আরও তিনদিন আপনার ছুটি প্রয়োজন’। আহমদ মুসা বলল।
আমার তো ছুটির প্রয়োজন নেই। আপনারা পারামারিবো পেৌঁছে গেছেন, আমি আজই ফিরব’। বলল পুলিশ অফিসার।
‘আপনার ছুটির প্রয়োজন নেই, কিন্তু আমাদের আছে’।
‘তার অর্থ?’ ভ্রু কুঞ্চিত করে বলল পুলিশ অফিসার।
‘নির্বাচনের নমিনেশন পেপার সাবমিট হবার পর আগামী ২২ তারিখে আপনি ছাড়া পাবেন। আমরা কোন ঝুঁকি নিতে চাইনা। আহমদ হাত্তা পারামারিবো এসেছেন, এটা শুধু আপনিই জানেন। আপনি ফেরার সঙ্গে সঙ্গে সবাই এটা জানবে এবং এমন কিছু করা হবে, যাতে মি. হাত্তা নমিনেশন পেপার সাবমিট করতে না পারেন, ভোটে দাঁড়াতে না পারেন’।
‘তার মানে আপনারা আমাকে বন্দী করে রাখতে চান’।
‘হ্যাঁ একে বন্দী বলতে পারেন’। বলল আহমদ মুসা।
একটু থেমেই আবার বলল আহমদ মুসা, ‘বলুন আপনার ডিউটি অফিসের নম্বর বলুন’।
হঠাৎ পুলিশ অফিসারটির চোখেমুখে ভয়ের চিহ্ন ফুটে উঠল। বলল একটু সময় নিয়ে, ‘মোবাইল আমাকে দিন, আমি টেলিফোন করছি’।
‘না। আমি যোগাযোগ করে দেব, আপনি কথা বলবেন। আমি নিশ্চিত হতে চাই, ডিউটি অফিস আপনার কথা জেনেছে’। আহমদ মুসা বলল।
‘না জানালেও তো চলে’। বলল পুলিশ অফিসারটি।
‘অবশ্যই জানাতে হবে। না হলে একজন পুলিশ অফিসার নিখোঁজ হওয়া নিয়ে দেশব্যাপী হুলস্থুল পড়ে যাবে। আপনাকে রাস্তার চেকপোস্টে পুলিশরা দেখেছে। সুতরাং আমাদের গাড়ি উদ্ধার ও আমাদের ধরার জন্য পুলিশরা হন্যে হয়ে উঠবে’।
পুলিশ অফিসারটি কথা বলল না। তার চোখে-মুখে সেই ভয়ের চিহ্নটা আরও বাড়ল।
আহমদ মুসার মুখ কঠোর হয়ে উঠল। বলল, ‘আমাদের সময় নষ্ট করছেন মি. পুলিশ অফিসার। আপনি যদি নাম্বারটা না বলেন, তাহলে পুলিশরা যাতে কোন দিনই আপনাকে খুঁজে না পায় সেই ব্যবস্থা করব। সে জন্যে ডেটোনেটরের ঐ লাল বোতামটায় একটা চাপ দিতে হবে মাত্র’।
ভয়ে আঁৎকে উঠল পুলিশ অফিসার। বলল ভীত কন্ঠে, ‘নাম্বারটা এই মুহূর্তে আমার মনে পড়ছে না’।
ভ্রুকুঞ্চিত হলো আহমদ মুসার। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে সে তাকাল পুলিশ অফিসারটির দিকে। একটু চিন্তা করল। বলল তারপর, ‘আপনি কি তাহলে পুলিশ নন, ভুয়া পুলিশ? এজন্যেই কি আপনার ইউনিফর্মে নেমপ্লেট নেই?’
পুলিশ অফিসারটির মুখ ভয়ে ফ্যাকাশে হয়ে গেল। কথা বলল না।
‘আপনার নাম কি?’ তীব্র কন্ঠে জিজ্ঞেস করল আহমদ মুসা।
পুলিশ অফিসারটি আহমদ মুসার দিকে একবার চোখ তুলে তাকাল। তার চোখে-মুখে মৃত্যু ভয়। মুখ আবার নিচু করল। বলল, ‘রবার্ট ম্যাকভাল রায়’।
‘জম্ম ইউরোপে, না ভারতে?’
‘ইউরোপে’।
‘আপনাকে কেউ নিয়োগ করেছে, না আপনি নিয়োগকর্তাদের একজন?’
আহমদ মুসার জিজ্ঞাসার কোন জবাব দিল না রবার্ট ম্যাকভাল রায়। আহমদ মুসা আবার জিজ্ঞেস করল, ‘আপনাদের কত জন ভূয়া পুলিশ অফিসার এভাবে আহমদ হাত্তাদের বিরুদ্ধে কাজে নেমেছেন?’
এবারও জবাব দিল না রবার্ট রায়।
‘মি হাত্তা তাহলে আমরা আর হোটেলে যাচ্ছি না। আপনি পারামারিবোর যে ঠিকানাগুলো আমাকে দিয়েছিলেন, তার এক নম্বর ঠিকানায় আমি যেতে চাই’। পেছনে না তাকিয়েই আহমদ হাত্তা নাসুমনকে উদ্দেশ্য করে বলল আহমদ মুসা।
‘কেন ওখানে কেন? হোটেল নয় কেন?’ বলল হাত্তা নাসুমন।
‘রবার্ট রায়ের ব্যাপারটা আগে সেটেল করতে চাই মি. হাত্তা’। আহমদ মুসা বলল।
এয়ারপোর্ট থেকে জায়গাটা অনেক দূরে হবে। কালকে ফাতেমাকে নিয়ে প্রোগ্রামে কোন অসুবিধা হবে না তো?’
‘অবশ্যই না’।
‘ঠিক আছে চলুন। ওখানে কোন অসুবিধা নেই’।
‘এখন তো শহরে ঢুকেছি। রাস্তা বলে দিবেন মি. হাত্তা’। আহমদ মুসা বলল।
‘ঠিক আছে’। বলল হাত্তা নাসুমন।
‘বুঝলেন মি. হাত্তা, এরা আট-ঘাট বেঁধে নেমেছে। বর্ডার সীল করার আরেকটা কারণ দেখা যাচ্ছে আপনাকে ঠেকানো’। আহমদ মুসা বলল।
‘তাই তো মনে হচ্ছে’। হাত্তা নাসুমন বলল।
‘আচ্ছা রবার্ট রায়, আপনাকে একটা সহজ প্রশ্ন করি। আহমদ হাত্তা নাসুমন উদ্ধার পেয়েছেন, সুরিনামে আসছেন, এটা আপনারা জানলেন কি করে?’ রবার্ট রায়ের দিকে চেয়ে প্রশ্ন করল আহমদ মুসা।
রবার্ট রায় নির্বিকার। কোন জবাব দিল না।
আহমদ মুসা হাসল। বলল, ‘বুঝেছি আপনি এখন নিশ্চিত, আপনার সব কথা না জেনে আপনাকে আমরা হত্যা করব না। অতএব আর কোন কথা নেই আপাতত। ঠিক আছে তাই হোক’।
বলে আহমদ মুসা চুপ করল।
সবাই চুপচা্প।
চলছে গাড়ি।

‘মি. রবার্ট রায় আবার আপনাকে স্মরণ করিয়ে দেই এক প্রশ্ন আমি দুবার করি না। প্রথমে আপনাকে সেই সহজ প্রশ্নটাই করছি, ‘আহমদ হাত্তা মুক্ত হয়েছেন, সুরিনামে আসছেন, এটা আপনারা কিভাবে জেনেছেন?’ প্রশ্ন করল আহমদ মুসা রবার্ট ম্যাকভাল রায়কে।
রবার্ট রায় বসে আছে আহমদ মুসার সামনে এক চেয়ারে। মাঝখানে একটা টেবিল।
বেশ বড় ঘরটি। আগা-গোড়া কার্পেট মোড়া।
আহমদ মুসাদের পাশেই কিছু দূরে সোফায় বসে আছে আহমদ হাত্তা নাসুমন।
দরজায় দাঁড়িয়ে দুজন লোক। হাতে তাদের কোন অস্ত্র নেই। কিন্তু পকেটে তাদের রিভলবার রয়েছে। এরা হাত্তা নাসুমনের লোক। পার্টি ক্যাডারের সদস্য এরা।
এ বাড়িটাও পার্টির একটি রেস্টহাউজ। সুরিনাম নদীর ধার ঘেষে বাড়িটা। সুরিনাম নদীর ভেতর থেকেই উঠে এসেছে বাড়িটার দক্ষিণের দেয়াল। দক্ষিনের জানালায় দাঁড়ালে সুরিনাম নদীর স্নিগ্ধ বাতাসের পরশ পাওয়া যায়।
যে ঘরটিতে আহমদ মুসা বসে আছে, সে ঘরটিও দক্ষিণের নদী প্রান্তের একটি ঘর।
সুরিনাম নদীর দুপাড় নিয়েই গড়ে উঠেছে পারামারিবো শহর। তবে শহরের মূল অংশ নদীর উত্তর প্রান্তে।
পারামারিবোতে প্রবেশের পর নদীর পাড় বলতে আর কিছুই নেই। নদী-তীরের বাড়িগুলো নদীর পানিতে যেন ভাসছে।
আহমদ মুসার প্রশ্ন শুনে রবার্ট রায় আহমদ মুসার দিকে তাকাল। বোধ হয় আহমদ মুসাকে বুঝতে চেষ্টা করলো। বলল, আমি যতটুকু জানি তা হলো, তার উদ্ধার হওয়ার খবর নাকি সেখানকার কোন কাগজে বের হয়। সেই খবর টেলিফোনে সুরিনামে জানানো হয়’।
‘উনি সুরিনামে আসছেন, এটা জানা গেল কি করে?’
রবার্ট রায় একটু ভাবল। তারপর বলল, ‘আমি সব কথা জানি না। তবে মনে হয় ব্যাপারটা এরকম যে, তিনি মুক্তি পেলে দ্রুত সুরিনামে চলে আসবেন এটা মনে করাই স্বাভাবিক’।
‘আহমদ হাত্তাকে কারা কিডন্যাপ করেছিল, তাদের মধ্যে আপনি ছিলেন?’
‘না’।
‘কারা ছিল?’
‘আমি তাদের চিনি না। ঐ কিডন্যাপের সাথে জড়িত ছিল পারামারিবোর লোকেরা, নিও নিকারীর কেউ ছিল না’।
‘আপনাদের নেতাকে তো চিনেন?’
উত্তর দিল না রবার্ট রায়। সে মাথা নিচু করল।
আহমদ মুসা টেবিল থেকে রিভলবারটা হাতে তুলে নিল। বলল, ‘প্রথমে হাত যাওয়া পছন্দ করবেন, না কান যাওয়া পছন্দ করবেন?’
রবার্ট রায় মুখ তুলে ভীত দৃষ্টিতে তাকাল আহমদ মুসার দিকে। বলল, ‘বলছি স্যার’।
বলে একটু থামল। তারপর শুরু করল, মাসুস(মায়ের সূর্য সন্তান) নামে একটি সংগঠন আছে। গোটা দেশে হিন্দুদের মধ্যে এই সংগঠন গড়ে তোলা হয়েছে। এই সংগঠনের নেতা হলেন ‘তিলক লাজপত পাল’। তার নির্দেশেই সব কিছু হয়। ইউরোপীয় ও ইন্ডিয়ান কম্যুনিটির রাজনীতি এদেশে তিনিই নিয়ন্ত্রণ করেন’।
‘ওর হেড কোয়ার্টার কোথায়?’
‘ব্লুমেন্টেইন হ্রদের তীরে ব্রুকোপনডো’তে।
ব্রুকোপনডো’তো একটা বড় শহর। এ শহরের কোথায় তার হেড কোয়ার্টার?’
জবাব দিল না রবার্ট রায়।
‘বিরক্ত করবেন না রবার্ট রায়। বার বার রিভলবার নাচাতে আমি পারবো না। যা জিজ্ঞেস করব, সঙ্গে সঙ্গে ঠিক ঠিক তার জবাব দেবেন’। তীব্র কন্ঠে বলল আহমদ মুসা।
চমকে উঠে মুখ তুলল রবার্ট রায়। ভযে চোখ-মুখ তার কুঞ্চিত। বলল, স্যার আমি ব্রুকোপনডো’তে যাইনি। তবে আমি শুনেছি, সেখানে ‘শিবাজী কালী মন্দির’ নামে একটা মন্দির আছে। সেখানে বা তার পাশেই তিলক লাজপত পালের হেড কোয়ার্টার’।
‘গুম, হত্যা, অপহরণ, ইত্যাদি করছে কে? তিলকের লোকরা?’
‘এই কাজে ‘মাসুস’ কে সহযোগিতা করছে ইউরোপীয় ইন্ডিয়ান রাজনৈতিক দল ‘সুরিনাম পিপলস কংগ্রেস পার্টি’।
‘পারামারিবো’তে তিলক লাজপত পালের অফিস বা ঘাঁটিগুলো কোথায়?’
একটু দেরী করে আবার দ্রুত মুখ তুলল এবং বলতে লাগল সে, ‘সুরিনাম ও সাবামাক্কা নামে দুটি কালী মন্দিরে বা তার পাশে তিলকের দুটি অফিস বা ঘাঁটি আছে পারামারিবোতে। আর প্রত্যেক মহল্লায় মাসুস-এর একটা করে ইউনিট আছে। তার অফিসই ‘মাসুস-এর অফিস বলে পরিচিত’।
‘এ মন্দিরগুলো কোথায়?’ জিজ্ঞেস করল আহমদ মুসা।
দুটি মন্দিরই সুরিনাম নদীর ধারে এবং উত্তর পাশে। নদী পথ ও সড়ক পথ দুপথেই যাওয়া যায়। অধিকাংশ মন্দিরেই মন্দিরের পাশে পুরোহিতদের বাড়ি থাকে।
‘মাসুস-এর অফিস বা ঘাঁটি কি ঐ ধরনের বাড়িতে?’
‘ওয়াং আলীকে ওরা কোথায় রেখেছে?
আমি জানিনা। তবে আমি জানি যে, প্রত্যেক মন্দিরেই বন্দীখানা আছে। এ রকম জায়গায় বন্দী করে রাখা সবচেয়ে নিরাপদ। পুলিশরা মন্দিরকে সাধারণত এড়িয়ে চলে’।
‘আপনি জানেন ওয়াং আলীকে কোথায় রাখা হয়েছে?’ কঠোর কন্ঠে বলল আহমদ মুসা।
রবার্ট রায় মুখ তুলে তাকাল আহমদ মুসার দিকে। তার মুখে একটা অসহায় ভাব ফুটে উঠল। বলল, ‘সত্যিই আমি জানি না। একদিন আলোচনায় ওয়াং আলীর কথা উঠলে একজন বলেছিল, ওয়াং আলীকে কেউ উদ্ধার করতে পারবে না। পাশেই থানা। থানাও আমাদের। সংকেত পেলেই পুলিশ এসে পড়বে’।
আহমদ মুসার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। বলল, ‘মি. রবার্ট রায়, আপনি ‘মাসুস’ এর কোন দায়িত্বে?’
রবার্ট রায় আহমদ মুসার দিকে মুখ তুলে চাইল। তার চোখে ভয়। বলল, ‘আমি কোন দায়িত্বে নেই, নির্বাহী কমিটির সদস্য মাত্র’।
‘নির্বাহী কমিটির সদস্য কয়জন?’
‘দশজন’।
‘মাত্র দশজন?’
‘মহাকালী দশভূজা বলে ‘মায়ের সূর্য সন্তান’দের শীর্ষ কমিটিও দশজন’।
তাহলে তো আপনি অনেক কিছুই জানেন। আপনি মিথ্যা কথা বলছেন যে, আপনি ব্রুকোপনডোতে যান নি’।
‘না স্যার, আমি ব্রুকোপনডোতে যাইনি। ওখানে নির্বাহী কমিটির কোন মিটিং হয় না। ওটা হেড কোয়ার্টার হলেও তিলক লাজপত পাল তার পাসোর্নাল স্টাফদের নিয়ে ওখানে থাকেন। বাইরের লোকদের কোন যাতায়াত সেখানে নেই’। বলল রবার্ট রায়।
আহমদ মুসা উঠে দাঁড়াল। বলল, ‘ধন্যবাদ মি. রবার্ট রায়’।
আহমদ মুসা যেতে শুরু করলে রবার্ট রায় বলল, ‘স্যার আমাকে আর দরকার আছে? নিও নিকারীতে আমার পরিবার খুব অসুবিধায় আছে’।
‘আগে দেখি আপনার দেয়া তথ্য কতটা সত্য। আমাদের কাজ শেষ হলেই আপনি ছাড়া পাবেন’। আহমদ মুসা বলল।
আহমদ মুসা বেরিয়ে এল ঘর থেকে। তার সাথে সাথে বেরিয়ে এল হাত্তা নাসুমনও।
দুজন গিয়ে বসল আহমদ মুসার কক্ষে।
‘কেমন মনে হলো রবার্টের কথাকে?’ জিজ্ঞেস করল হাত্তা নাসুমন।
‘আমার মনে হয় ও যা বলেছে সত্য বলেছে। তাকে তো ছাড়ছি না। সত্য না বলে যাবে কোথায়’। আহমদ মুসা বলল।
‘এখন কি করণীয়? ওয়াং আলী ঠিক কোথায় আছে তাতো বলতে পারল না’। বলল হাত্তা নাসুমন।
‘যে ঠিকানাগুলো ও দিয়েছে তা যাচাই করার জন্য এখনই আমি বের হচ্ছি। আপনাদের লোকদের বলুন ছোটখাট একটা বোট জোগাড় করতে’।
‘বোট আমাদেরই আছে। কিন্তু এতবড় জার্নি করে আসার পর এখনি আবার বেরুবেন এটা ঠিক নয়’।
‘এখন সময় আমাদের খুব মূল্যবান। আগামী কাল সকালেই ওদের মুখোমুখি হতে হবে। তার আগেই ওদের সম্পর্কে যতটা পারা যায় জানা দরকার।
‘নদী পথে কেন?’
‘পারামারিবোতে ওদের যে দুটো ঘাঁটির সন্ধান রবার্ট দিয়েছে, সে দুটোই নদীর তীরে কালী মন্দির বা তার পাশে। নদী পথে গেলে নদী তীরের কালী মন্দির সহজেই বের করা যাবে’।
কথা শেষ করেই আহমদ মুসা উঠে দাঁড়াল। বলল, ‘যাই পোশাক পাল্টে নেই’।
বলে আহমদ মুসা এগুলো ড্রেসিং রুমের দিকে।
‘আমি কি পোশাক পরব?’ বলল আহমদ হাত্তা নাসুমন।
থমকে দাঁড়াল আহমদ মুসা। বলল, ‘আপনি তো এখন বেরুচ্ছেন না’।
‘কেন? তাহলে কে যাবে সাথে?’
‘কেউ নয়। এমন কি বোটও আমিই চালাব’।
হাত্তা নাসুমন যেন আকাশ থেকে পড়ল। চোখে-মুখে এমন বিষ্ময় নিয়ে সে বলল, ‘যে সাংঘাতিক পরিস্থিতি তাতে এ ধরনের কাজে আপনার একা বেরুনো ঠিক নয়। তার উপর আপনি এখানে নতুন’।
‘মি. হাত্তা, অবস্থা সাংঘাতিক বলেই দলে ভারী হয়ে নয়, একা বেরুনো দরকার। আমি বিদেশী ট্যুরিস্ট, শহর দেখতে বেরিয়েছি। সাথে লোক দরকার কি’।
একটু থেমেই আহমদ মুসা আবার বলল, মি. হাত্তা, আপনার জরুরী কাজ আছে। আপনি কি দেশের সব জায়গায় এ মেসেজ দিয়েছেন যে, যাদের ভোটে দাঁড়ানোর কথা সবাইকেই ভোটে দাঁড়াতে হবে। জেল বা হাজতে যারা আছে তাদেরকেও’।
‘ব্যবস্থা করেছি। সকালের মধ্যে সবাই খবার পেয়ে যাবে’। বলল হাত্তা নাসুমন।
‘২১ তারিখে নমিনেশন পেপার সাবমিট হবে, এই তারিখেই বিকালে জনসভার ব্যবস্থা করুন। সে জনসভায় বলে দেবেন আপনাকে কারা কিডন্যাপ করেছিল এবং কিভাবে মার্কিন প্রশাসন আপনাকে উদ্ধার করেছে’।
‘এত তাড়াতাড়ি এই কনফ্রন্টেশনে যাওয়া কি ঠিক হবে?’ বলল হাত্তা নাসুমন।
কনফ্রন্টেশন নয়, প্রকৃত ঘটনা জনগনকে অবহিত করবেন মাত্র। বর্তমান অবস্থায় অবশ্য এটা কিছুটা আক্রমণাত্মক হবে বটে, কিন্তু এটাই হবে আপনাদের সবচেয়ে বড় ডিফেন্স। অত:পর আপনাকে নিরাপত্তা দেয়া হবে সরকারের দায়িত্ব। সরকার যদি আপনাকে গ্রেফতারও করে সেটা হবে আপনার জন্যে লাভজনক।‘ আহমদ মুসা বলল।
‘ওয়াং আলী তো এখনও ওদের হাতে’। হাত্তা নাসুমনের মধ্যে দ্বিধা।
‘একুশ তারিখ বিকেল আসতে এখনও ৪৩ ঘন্টার মত বাকি। আল্লাহর উপর ভরসা করুন’।
বলে আহমদ মুসা ঢুকে গেল ড্রেসিং রুমে।
মিনিট দশেক পর বেরিয়ে এল ইউরোপীয় ট্যুরিস্ট হয়ে। তার হাতে পারামারিবো শহরের ট্যুরিস্ট গাইড।
ইঞ্জিন বোটটা স্টার্ট দেবার আগে আহমদ মুসা শহরের মানচিত্রটার উপর চোখ বুলাল। দেখল, সে যেখানে দাঁড়িয়ে আছে সেটা শহরের পূর্ব প্রান্তে। এর একটু পূর্বেই সাগর। আটলান্টিকের গর্জন বেশ কানে আসছে। তার মানে তাকে যেতে হবে পশ্চিম দিকে। শহরটির নব্বই ভাগই পশ্চিমে।
বোট স্টার্ট দিল আহমদ মুসা।
বোটটি সুরিনাম নদী ধরে এগিয়ে চলল।
আহমদ মুসার চোখ নদীর ডান পাড়ে, উত্তর পাশে। তার চোখ দুটি সন্ধান করছে কালী মন্দিরের ঐতিহ্যবাহী চূড়া।
সুরিনাম সুন্দর নদী। দেশের দীর্ঘতম এ নদীটি পশ্চিম সুরিনামের ইভার্ট দা মাউন্টেন থেকে বের হয়ে আটলান্টিকে গিয়ে পড়েছে।
নানা বর্ণ ও নানারকম বোটের আনাগোনায় মুখরিত থাকে নদীর বুক। কিন্তু নদীর বুক এখন অনেকটাই শান্ত। রাত বেশ হয়েছে।
সবচেয়ে সুন্দর লাগছে নদীর দুপাশে আদিগন্ত আলোর মেলা। যেন নদীটি পরেছে আকাশী তারার মালা।
মিনিট পনের চলার পর আহমদ মুসা দেখতে পেল একটা মন্দিরের আলোকজ্জ্বল চূড়া। মন্দিরটি নদীর তীর ঘেঁষে।
মন্দিরের একটা ঘাট রয়েছে। বেশ বড় ঘাট। একটা অংশ জেটির আকারে তৈরী।
আহমদ মুসা মানচিত্রে দেখেছে এ মন্দিরের আশে-পাশে কোথাও থানা নেই, থানা আছে সামনের সাবামাক্কা মন্দিরের কাছে। থানা আছে ব্রুকোপনডোর শিবাজী মন্দিরের পাশেও।
মন্দিরটা দেখার জন্যে নামতে ইচ্ছা হলো আহমদ মুসার। কিন্তু পরক্ষণে ভাবল, দ্বিতীয় মন্দিরটাও তার খুঁজে পাওয়া দরকার। সাবামাক্কা মন্দির দেখে এসে ফেরার পথে এ মন্দির দেখা যাবে।
আবার জোরে ছুটতে শুরু করল আহমদ মুসার বোট।
আরও বিশ মিনিট চলার পর অন্য আর একটা মন্দিরের চূড়া দেখতে পেল আহমদ মুসা।
কাছে এসে দেখল এ মন্দিরের ও একটা ঘাট আছে। ঘাটের সাথে জেটিও। জেটিতে একটা মটর বোট বাঁধা।
আহমদ মুসার বোট ধীরে ধীরে পা বাড়াল জেটির দিকে। ইতোমধ্যে আহমদ মুসা মন্দিরের চারদিকে যতটা সম্ভব চোখ বুলাল।
মন্দিরটা প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। প্রাচীর ও মন্দির বিল্ডিং এর মাঝখানে কিছুটা ফাঁকা জায়গা আছে আন্দাজ করা যাচ্ছে। মন্দিরের পশ্চিম পাশেই থানাটা। সুরিনামের পতাকা উড়তে দেখেই বুঝল ওটা থানা।
মন্দিরের জেটিতে বোট বেঁধে নামল আহমদ মুসা ঘাটে। এক দৌড়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠে মন্দিরের চত্বরে পা রাখল সে। মন্দির দক্ষিণ মুখী। মন্দিরের উত্তরের প্রাচীরে আরেকটা বড় গেট আছে। প্রাচীরের বাইরে দিয়ে প্রাচীর ঘেঁষে রাস্তা।
আহমদ মুসা চারদিকটা দেখে ফিরে এল মন্দিরের সম্মুখ চত্বরে।
মন্দিরটা গোল পিরামিড আকৃতির।
মন্দিরে ঢোকার একটাই দরজা।
অনেকগুলো সিঁড়ি ভেঙ্গে সে দরজায় পেৌঁছতে হয়। দরজা দুতলা পরিমাণ উঁচুতে।
দরজা পেরুলে বিশ ফুটের মত দীর্ঘ এক করিডোর। করিডোরের পর বিল্ডিং এর ঠিক কেন্দ্রে ডিম্বাকৃতি এক বিশাল হলঘর। হলঘরের চারদিকে অসংখ্য ঘর ও কুঠরী। হলঘরের অবস্থানই বলে দেয় হলঘরের নিচেও রয়েছে অনেক ঘর। আন্ডার গ্রাউন্ড বেজমেন্টেও থাকতে পারে গোপন কুঠরী।
ডিম্বাকৃতি হলঘরের শেষ কৌণিক প্রান্তে প্রতিষ্ঠিত রয়েছে বিশাল কালী মূর্তি।
কালী মূর্তির সামনে বসেছে কীর্তনের আসর। ধুপের ধোঁয়ায় চারদিক প্লাবিত, বাতাস ভারী।
দুজন পুরোহিত কালী মূর্তির সামনে ধ্যানমগ্ন। আরেকজন পুরোহিত সার্বিক তদারকিতে রয়েছে। সে বসছে, আবার মাঝে মাঝে উঠেও যাচ্ছে।
ট্যুরিস্ট রূপী আহমদ মুসা কীর্তন আসরের একপাশে দাঁড়িয়ে। তার বামদিকে একটু সামনেই কালী মূর্তি। ঠিক তার সামনেই একটু দূরে বসে আছে ধ্যানমগ্ন দুই পুরোহিত। তৃতীয় পুরোহিতও তার সামনে দিয়েই যাওয়া আসা করছে।
একবার পুরোহিতটি উঠে এলে আহমদ মুসা তার দিকে কিছুটা এগিয়ে গিয়ে বলল, ‘মহারাজ, আমি একজন ট্যুরিস্ট। মন্দিরটা আমি ঘুরে ফিরে দেখতে চাই’।
পুরোহিত লোকটি থমকে দাঁড়াল এবং দেখল আহমদ মুসাকে। বলল, ‘এইতো দেখছেন, আর কি দেখতে চান?’
‘যেখানে যাই, মন্দির আমি দেখি। মন্দিরের নির্মাণ শৈলীর ব্যাপারে আমি খুব আগ্রহী’। বলল আহমদ মুসা।
পুরোহিত আবার তার চোখ স্থির করল আহমদ মুসার দিকে। তারপর মুখ ঘুরিয়ে একটু ভাবল। তারপর বলল, ‘হ্যাঁ ট্যুরিস্টরা কেউ কেউ মন্দির এভাবে দেখতে চায়। ঠিক আছে। আজ শনিবার আষাঢ়ের অমাবস্যা, এখনি কীর্তন শেষ হবে। তারপরই শুরু হবে ভৈরবী নৃত্য। ওটা চলবে শেষ রাত পর্যন্ত। নাচ শুরু হলেই আমি আপনাকে ঘুরিয়ে সব দেখাব’।
‘অনেক ধন্যবাদ’। বলল আহমদ মুসা।
‘নমস্তে’। বলে হাঁটতে শুরু করল পুরোহিত।
আহমদ মুসা ফিরে এল যেখানে সে আগে দাঁড়িয়ে ছিল সেখানে। পনের মিনিট পর শুরু হলো ভৈরবী নৃত্য।
পুরোহিত এসে ডেকে নিয়ে গেল আহমদ মুসাকে।
হল সংলগ্ন বড় একটা ঘরে প্রবেশ করল তারা। ঘরটি বসার ঘর। ঘরে কার্পেট আছে। গোটা ঘর সোফায় সাজানো।
পুরোহিত বলল, ‘যে হল ঘর থেকে আমরা এলাম, সেই হলঘরের চারদিকে এই রকমের দু’সারি ঘর আছে। প্রথম সারিতে এই ধরনের কয়েকটা বসার ঘর আছে। প্রথম সারির বাদ বাকি ঘরগুলো বিভিন্ন দেবতা ও মুনি-ঋষির নামে উৎসর্গিত। দ্বিতীয় সারির ঘরগুলো পুরোহিতদের অফিস। এই ঘরগুলোর উপরে অর্থাৎ মন্দিরের তৃতীয় তলায় পুরোহিত ও মেহমানদের আবাসস্থল। আর মন্দিরের চতুর্থ তলা প্রধান পুরোহিতের বাসস্থান। হল রুমের নিচে মন্দিরের প্রথম তলা মন্দিরের সংগ্রহশালা। এই তো আমাদের ছোট্ট এই মন্দিরের বিবরণ’।
পুরোহিত থামতেই আহমদ মুসা চোখে-মুখে দারুন আগ্রহ এনে জিজ্ঞেস করল, ‘সংগ্রহশালায় কি আছে?’
পুরোহিতের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। গর্বের ঔজ্জ্বল্য। বলল, ‘বিভিন্ন দেশ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সংগ্রহ করা দেব-দেবীর মূর্তি, মুনি-ঋষিদের মূর্তি, চিত্র, ভারতের অজন্তার মত মন্দিরের দেয়াল চিত্রের অনুচিত্র, রামকৃষ্ঞ পরমহংসদেব, স্বামী বিবেকানন্দ, মহাত্মা গান্ধীর মত হিন্দু মহাগুরুদের ছবি, বাণী, চিত্র, ইত্যাদি।
‘অপূর্ব সংগ্রহশালা। না দেখলেই নয়। সব বাদ দিয়ে এই সংগ্রহ শালাই আমি দেখতে চাই’। বলল আহমদ মুসা এমন ভাব করে যে এই সংগ্রহশালা দেখতে তার দারুণ আগ্রহ।
‘রাতে তো এটা দেখানো যাবে না’। বলল পুরোহিত।
‘সর্বনাশ। আমি তো ব্যস্ত। আমার তো আর সময় হবে না!’ বলল আহমদ মুসা চরম হতাশ কন্ঠে। আহমদ মুসার চিন্তা, যে কোনভাবেই হোক মন্দিরের নিচের অংশটা দেখতে হবে। আহমদ মুসা আরো ভাবল, পুরোহিত তো বেসমেন্ট ফ্লোরের (আন্ডার গ্রাউন্ডের) কথা কিছু বলল না। সে কি এড়িয়ে গেল, না এ ধরনের কোন ফ্লোর এখানে নেই?
আহমদ মুসা হতাশা প্রকাশের পর পুরোহিত ভাবছিল। একটু পরে বলল, ঠিক আছে চলুন। মা দশভূজার পেছন দিক দিয়ে সিঁড়ি। ওদিক দিয়েই নামতে হবে’।
সিঁড়ি দিয়ে নামল তারা গ্রাউন্ড ফ্লোরে।
আলো জ্বালালো পুরোহিত।
গ্রাউন্ড ফ্লোর একটা হলঘর। কিন্তু এত পিলার যে এক নজরে কিছুই দেখা যায় না। তার উপর প্রত্যেক দুই পিলার আবার অর্ধ বৃত্তাকার গাঁথুনি দ্বারা সংযুক্ত। দু’ পিলার কার্যতঃ একটা দরজার আকার নিয়েছে। ফলে গোটা হলঘর চার দরজাওয়ালা অনেকগুলো ঘরের সমাহার হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সত্যি হলঘরটা দেব-দেবতার মূর্তি, চিত্র ও চিত্রলিপিতে ঠাসা। দেখার মত সংগ্রহ বটে। আহমদ মুসা জিজ্ঞেস করল, ‘এত বড় বড় মূর্তি কি করে ঢুকালেন? ঐ সংকীর্ণ সিঁড়ি দিয়ে?’
পুরোহিত হাসল। বলল, ‘নিশ্চয় লক্ষ্য করেছেন বা সামনে দেখবেন হলের বাইরের অংশে মা্ঝে মাঝে স্টিলের দেয়াল। আসলে ওটা দেয়াল নয় দরজা। যার গা তালা দিয়ে লক করা। এরকম মোট চারটা দরজা আছে হলঘরে। এগুলো দিয়েই মূর্তিগুলো আনা হয়েছে’।
অযাচিতভাবে এই তথ্যটি জানতে পেরে দারুণ খুশি হলো আহমদ মুসা।
পুরোহিতের সাথে সে ঘুরে ঘুরে দেখছে বটে, কিন্তু তার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে একটাই চিন্তা। এই মন্দিরেই কি ওয়াং আলী বন্দী আছে? পারামারিবো শহরে সুরিনাম নদী তীরের দুই মন্দিরের মধ্যে এ মন্দিরের সাথেই একটা থানা আছে। রবার্ট রায়ের কথা অনুসারে থানা সংলগ্ন এ মন্দিরেই তো ওয়াং আলী থাকার কথা।
ঘুরতে ঘুরতে তারা মেঝের উপর এক বেঢ়প দরজার সামনে এসে দাঁড়াল। বিল্ডিং এর সাইড ওয়াল থেকে চার ফুট দুরত্বের সমান্তরালে দুটি দেয়াল মেঝের অনেকখানি ভেতরে চলে এসেছে। দু’ দেয়ালের মুখে এক বিশাল দরজা।
বেশ দূরত্বে অবস্থিত বেঢ়প এই দরজা আহমদ মুসার দৃষ্টি আকর্ষণ করল। এটা ঘর হওয়ার মত প্রশস্ত নয়, আবার আলমারী হওয়ার মত ছোট নয়। তাহলে কি?
এ সময় আহমদ মুসার কানে একটা চিৎকার ভেসে এল।
উৎকর্ণ হলো আহমদ মুসা। সেই চিৎকার আর তার কানে এল না। কিন্তু একটু পরেই সেই ক্ষীণ চিৎকার ভেসে এল আবার।
উৎকর্ণ আহমদ মুসার মনে হলো বেঢপ ঐ দরজার দিক থেকেই চিৎকারটা ভেসে আসছে।
চমকে উঠল আহমদ মুসা। দরজাটা কি বন্দী সেলের? কিন্তু পরক্ষণেই মনে হলো চিৎকারটা এত কাছের নয়। চিৎকারটা মনে হয় কোন দূরবর্তী স্থান হতে ভেসে আসছে।
চট করে এ সময় আহমদ মুসার মাথায় এল, তাহলে এ দরজাটি কোন সিঁড়ি ঘরের? চিৎকারটা কি সিঁড়ি দিয়ে আন্ডার গ্রাউন্ড থেকে ভেসে আসা কোন শব্দ?
এই কথা মনে হতেই আহমদ মুসার গোটা দেহে উত্তেজনার একটা ঊষ্ঞ স্রোত বয়ে গেল। গোটা সত্ত্বা জুড়ে একটা প্রশ্ন জেগে উঠল, ওয়াং আলী কি এই আন্ডার গ্রাউন্ডে বন্দী আছে?
আহমদ মুসা পুরোহিতের দিকে মুখ ফিরাল। বলল, ‘এই বড় দরজাওয়ালা ঘরটি কি জন্যে মহারাজ?’
পুরোহিত চমকে উঠে তাকাল আহমদ মুসার দিকে। প্রথম দিকের একটা বিব্রতভাব কাটিয়েই সে বলে উঠল, ‘এর ভিতরে বিশেষ কিছু মূল্যবান বস্তু রাখা হয়েছে’।
বলেই পুরোহিত চলতে শুরু করল। বলল, ‘আসুন দেরি হয়ে যাচ্ছে’।
আহমদ মুসা পকেট থেকে রিভলবার বের করল। রিভলবার পুরোহিতের দিকে তাক করে বলল, ‘দাঁড়ান মহারাজ। দরজাটা খুলুন’।
পুরোহিত ঘুরে দাঁড়াল। তার দিকে রিভলবার তাক করা আহমদ মুসাকে দেখে ভূত দেখার মত চমকে উঠল সে।
‘দরজা খুলুন মহারাজ’। রিভলবার নাচিয়ে নির্দেশ দিল আহমদ মুসা।
‘প্রধান পুরোহিত ছাড়া এ দরজা কেউ খুলতে পারেনা’। ভয়ার্ত কন্ঠে বলল পুরোহিত।
আহমদ মুসা রিভলবারের ট্রিগারে আঙুল চেপে বলল, ‘আমার রিভলবারে সাইলেন্সার লাগানো আছে। আপনাকে হত্যা করব, একটুও শব্দ হবে না’।
‘আমাকে মেরে ফেললেও আমি দরজা খুলতে পারবো না। এর চাবি থাকে প্রধান পুরোহিতদের কাছে’। বলল পুরোহিতটি কাঁদো কাঁদো কন্ঠে।
আহমদ মুসা তার কথা বিশ্বাস করল। বলল, ‘ঠিক আছে তাহলে বল, নিচে কি বন্দী খানা?
পুরোহিত কম্পিত কন্ঠে বলল, হ্যাঁ।
আহমদ মুসা রিভলবার ঘুরিয়ে নিল দরজার দিকে। দরজার কী হোলে তাক করল তার রিভলবারের নল।
এ সময় পুরোহিত বলে উঠল, ‘তালা ভাঙলেও আপনি ভেতরে ঢুকতে পারবেন না। দরজার সাথে এ্যালার্ম সংযুক্ত আছে। দরজা খুললেই এলার্ম বেজে উঠবে। ছুটে আসবে মন্দিরের প্রহরীরা নিচে। এক রিভলবার দিয়ে আপনি কিছুই করতে পারবেন না’।
কিন্তু এই ভবিষ্যত ভাবার সময় তার ছিল না।আহমদ মুসা নিশ্চিত যে, এখানেই ওয়াং আলী বন্দী আছে। তাকে উদ্ধার করতেই হবে।
আহমদ মুসা গুলী করল কী হোলে।
কী হোল উড়ে গেল।
খুলে গেল দরজা।
আহমদ মুসা পুরোহিতের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘চল’।
দরজা থেকেই একটা সিঁড়ি নেমে গেছে নিচের দিকে।
পুরোহিত তার দিকে রিভলবার তাক করা আহমদ মুসার কঠোর মুখের দিকে একবার চেয়ে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে শুরু করল।
আহমদ মুসা দরজা বন্ধ করে পুরোহিতের পিছু পিছু সিঁড়ি দিয়ে আন্ডার গ্রাউন্ড ফ্লোরে নামতে শুরু করল।
নিচে সিঁড়ির পরেই বড় গোলাকার একটা হলঘর। হলঘরটিতে অনেকগুলো বড় বড় বাক্স। হলঘরের চারদিক ঘিরে অনেক কক্ষ।
সিঁড়ির সামনে দুটি ঘরের পরের ঘর থেকেই চিৎকার শোনা যাচ্ছে।
আহমদ মুসা পুরোহিতকে নিয়ে সেই ঘরের সামনে এসে হাজির হলো।
‘দরজা খোল মহারাজ’। বলল আহমদ মুসা পুরোহিতকে।
‘স্যার আমার কাছে চাবি নেই। এসব চাবি থাকে প্রধান পুরোহিতের কাছে’। অসহায় কন্ঠে বলল পুরোহিত।
আহমদ মুসাকে আবার রিভলবার ব্যবহার করতে হলো।
দরজার কী হোলে গুলী করে দরজা খুলে ফেলল আহমদ মুসা।
ঘরে ঢুকে দেখল একজন যুবককে উবু করে টাঙিয়ে রাখা হয়েছে। আহমদ মুসাকে রিভলবার হাতে ঘরে ঢুকতে দেখে যুবকটি আরো জোরে চিৎকার করে উঠল, ‘আমি কিছুই করিনি, আমি কিছুই জানি না। আমাকে আর কষ্ট দেবেন না, মেরে ফেলুন আমাকে’।
যুবকটি খুব ফর্সা। তার চেহারার মধ্যে চীনা বৈশিষ্ট্য আছে, ইউরোপীয় বৈশিষ্ট্যও আছে, আবার রেড ইন্ডিয়ান বৈশিষ্ট্যও আছে।
আহমদ মুসা ভাবল এই-ই ওয়াং আলী।
যুবকটিকে দেখে আহমদ মুসা একটু বেশী এগিয়ে গিয়েছিল। রিভলবার ধরা হাতটাও তার নিচে নেমে এসেছিল। আর পেছনে পড়ে গিয়েছিল পুরোহিত।
পেছনে পড়া পুরোহিতের মুখটা হঠাৎ পরিবর্তিত হয়ে গিয়েছিল। শক্ত হয়ে উঠেছিল তার মুখ।
হঠাৎ তার হাতটা চলে গেল তার গৈরিক চাদরের ভেতরে।
আহমদ মুসা একটু মুখ ঘুরিয়ে বলল, ‘মহারাজ আপনার ছুরিটার খুবই দরকার। ছুরিটা বের করে ওর পায়ের বাঁধন কেটে দিন’।
পুরোহিতের মুখ ছাইয়ের মত ফ্যাকাশে হয়ে গেল। কম্পিত হাতে ছুরি বের করল সে। ঘরের খাটিয়াটা টেনে এনে তার উপর উঠে যুবকটির পায়ের বাঁধন কেটে দিল সে।
যুবকটির দেহ আহমদ মুসা দুহাত দিয়ে ধরে নিল এবং ধীরে ধীরে দাঁড় করাতে লাগল।
আহমদ মুসার মনোযোগ পুরোহিতের দিক থেকে একটু বিচ্ছিন্ন হয়েছিল।
পুরোহিত এরই সুযোগ গ্রহণ করল। ছুরি বাগিয়ে সে ঝাঁপিয়ে পড়ল আহমদ মুসার উপর।
আহমদ মুসার দুহাত তখনও যুবকটিকে ধরে আছে। তাই পুরোহিতকে শেষ মূহুর্তে ঝাঁপিয়ে পড়তে দেখতে পেয়েও আত্মরক্ষার জন্যে কিছুই করতে পারল না সে। শুধু সেই মূহুর্তে যুবকটিকে নিয়ে সামনের দিকে সে ঝুঁকে গিয়েছিল।
পুরোহিত ঝাঁপিয়ে পড়েছিল আহমদ মুসার উপর। আহমদ মুসা তার মাথার বাম কানের পাশে তীব্র যন্ত্রণা অনুভব করল।
যুবকটিকে নিয়ে আহমদ মুসা পড়ে গিয়েছিল। কিন্তু পুরোহিত যা চেয়েছিল সেভাবে আহমদ মুসাকে ছুরি বসিয়ে জাপটে ধরে পড়তে পারেনি। তার ছুরির ফলা লাগে আহমদ মুসার মাথার বাম পাশে। শেষ মূহূর্তে আহমদ মুসা তার দেহটা সামনের দিকে সরিয়ে নেয়ায় পুরোহিতের দেহটা কিছুটা ভারসাম্য হারায় ও আহমদ মুসার পাশে পড়ে যায়। তবে তার হাতের ছুরিটা লক্ষ্যভ্রষ্ট হলেও আহমদ মুসার মাথার বাম পাশের অনেকটা জায়গা চিরে বেরিয়ে যায়।
আহমদ মুসা পড়ে গিয়েই তার হাত থেকে খসে পড়া রিভলবার কুড়িয়ে নিয়ে রিভলবারের ট্রিগারে হাত চেপেই নিজেকে ঘুরিয়ে নিল পুরোহিতের দিকে। দেখল পুরোহিতের চেহারা হয়ে উঠেছে হিংস্র বাঘের মত। তার হাতের উদ্যত ছুরি ছুটে আসছে তার বুক লক্ষ্য করে।
আহমদ মুসা তার তর্জনি চাপল রিভলবারের ট্রিগারে।
আহমদ মুসার বুক লক্ষ্যে ছুটে আসা পুরোহিতের ছুরি তখন মাঝ পথে।
আহমদ মুসার রিভলবারের গুলি পুরোহিতের ছুরি ধরা ডান হাতের কব্জীতে গিয়ে আঘাত করল।
ছুরি পড়ে গেল তার হাত থেকে।
আহমদ মুসা উঠে দাঁড়াল।
বা হাত দিয়ে আহমদ মুসা তার মাথার আহত স্থানটার একটা ধারণা নেয়ার চেষ্ট করল। দেখল ছুরির ফলায় চার ইঞ্চি পরিমাণ জায়গা চিরে গেছে।
যুবকটিও এ সময় ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। আহমদ মুসার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ইস, আপনার মাথার আহত জায়গা দিয়ে ভীষণ রক্ত বেরুচ্ছে’।
উপরে এ সময় অনেকগুলো উত্তেজিত কথা-বার্তা ও পায়ের শব্দ শোনা গেল।
আহমদ মুসা বুঝল, দরজা খোলার সংকেত পেয়েই নিশ্চয় ওরা এসেছে। এখনি ওরা নিচে আসবে।
আহমদ মুসা দ্রুত বলল যুবকটিকে, ‘তুমি রিভলবার চালাতে জান?’
যুবকটিও উপরের কথাবার্তা ও দৌড়াদৌড়ির শব্দ শুনতে পেয়েছে। ভয়ে ফ্যাকাশে হয়ে উঠেছে তার মুখ। বলল, ‘পারব’।
আহমদ মুসা তার পায়ের মোজায় গুঁজে রাখা একটা রিভলবার বের করে যুবকটির হাতে দিল।
তার পর আহমদ মুসা পুরোহিতকে টেনে তুলে দাঁড় করাল। বলল, ‘চল আমাদের সাথে’।
আহমদ মুসা তাকে নিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে এল। পেছনে পেছনে এল যুবকটি।
সিঁড়ির গোড়ায় আসতেই আহমদ মুসা সিঁড়ির মুখেই অনেকগুলো পায়ের শব্দ পেল।
এক ঝটকায় আহমদ মুসা পুরোহিতকে টেনে নিয়ে পেছনে সরে এল। পুরোহিতকে যুবকটির দিকে ঠেলে দিয়ে বলল, ‘তুমি এর দিকে নজর রাখ। কোন শয়তানী যেন না করতে পারে’।
যুবকটি পুরোহিতকে টেনে নিয়ে তার দিকে রিভলবার বাগিয়ে সিঁড়ির তলায় গিয়ে দাঁড়াল।
আহমদ মুসা তার ডান হাতে এম-১০ বাগিয়ে সিঁড়ির গোড়ায় গিয়ে গুঁড়ি মেরে বসল। ঘরের আলোটা সিঁড়ির বিপরীত দিকের প্রান্তে থাকায় সিঁড়ির ছায়া পড়েছে এদিকে। সে কারণে সিঁড়ির গোড়াটা মোটামুটি অন্ধকার।
সিঁড়ি মুখের দরজাটা প্রচন্ড শব্দে খুলে গেল। আহমদ মুসা সিঁড়ি দিয়ে নামার আগে দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে এসেছিল।
আহমদ মুসা বুঝল, কারও প্রচন্ড লাথিতে দরজাটা খুলে গেছে।
দরজা খুলে যাবার পরই গুলির বৃষ্টি ছুটে এলো সিঁড়ি দিয়ে নিচে।
পায়ের শব্দ পাচ্ছে আহমদ মুসা। অনেকগুলো পায়ের শব্দ। বুঝল, গুলী করতে করতে ওরা নামছে।
যতই ওরা নামছে, গুলি বৃষ্টির গতি সিঁড়ির গোড়া থেকে ততই সরে যাচ্ছে।
এক সময় গুলীর গতি সিঁড়ির গোড়া থেকে আরও সরে গেল এবং অনেকটা মেঝের সমান্তরাল হয়ে উঠল।
আহমদ মুসা বুঝল, ওরা সিঁড়ির মাঝামাঝি অংশে পৌঁছে গেছে।
আহমদ মুসা এম-১০ এর ট্রিগারে তর্জনি চেপে এক ধাপ পরিমাণ সামনে এগিয়ে এক ঝটকায় উঠে দাঁড়াল। তার এম-১০ মেশিন রিভলবারের নল তখন সিঁড়ির সমান্তরালে উপরের দিকে।
সিঁড়িতে ওরা তখন চারজন আর সিঁড়ির মুখে দাঁড়িয়েছিল দুজন। আহমদ মুসার আকস্মিক আক্রমণের মুখে ওরা ওদের স্টেনগান আহমদ মুসার দিকে ঘুরিয়ে নিতে পারল না।
আহমদ মুসা তার ভয়ংকর এম-১০ এর ট্রিগার মাত্র কয়েক সেকেন্ড চেপে রেখে সিঁড়ির ঐ লোকদের উপর ঘুরিয়ে নিয়ে এল। ছয়টি দেহ বুলেটের আঘাতে ঝাঁঝরা হয়ে গেল। ঝরে পড়ল সিঁড়ির উপর।
গুলি থামিয়েই আহমদ মুসা ডাকল যুবকটিকে। যুবকটি পুরোহিতকে সঙ্গে করে নিয়ে আহমদ মুসার কাছে এল। আহমদ মুসা পুরোহিতকে সামনে নিয়ে বলল, ‘ওঠ সিঁড়ি দিয়ে’।
পুরোহিত গুলিবিদ্ধ তার ডান হাতকে বাঁ হাত দিয়ে চেপে ধরে আছে। সে আহমদ মুসার নির্দেশের সংগে সংগে সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠতে লাগল। আহমদ মুসা তার ঠিক পেছনে। আর যুবকটি আহমদ মুসার পেছনে।
সিঁড়ির মুখের কাছাকাছি গিয়েই আহমদ মুসা তার বাঁ হাত দিয়ে পুরোহিতের গলা পেঁচিয়ে নিজের দেহের সাথে সেঁটে নিয়ে যুবকটিকে নির্দেশ দিল, ‘তুমি ঠিক আমার পেছনে থাকবে এবং পেছন দিকটা সামলাবে’।
পুরোহিতকে ঢাল হিসেবে সামনে রেখে আহমদ মুসা উঠে এল সিঁড়ির মাথায়। তার ডান হাতে উদ্যত এম-১০ মেশিন রিভলবার।
সিঁড়ির মাথায় উঠতেই আহমদ মুসা দেখল ওরা আরও চারজন ছুটে আসছে সিঁড়ির মুখের দিকে। ওদেরও হাতে উদ্যত স্টেনগান। কিন্তু গুলি করতে গিয়ে মুহূর্তের জন্যে দ্বিধার সৃষ্টি হয়েছিল তাদের মধ্যে। তারা দেখল, তারা গুলি করলে প্রথমেই মারা পড়ে পুরোহিত।
তাদের এই দ্বিধার সুযোগ নিল আহমদ মুসা। তার এম-১০ রিভলবার এক ঝাঁক গুলি ওদের চারজনকে ছেঁকে ধরল। ওদের চারজনের রক্তাক্ত দেহ ঝরে পড়ল মাটিতে।
দুতলা থেকে নেমে আসা সিঁড়ি দিয়ে আরো দুজন নামছিল। তারা চারজনের এই অবস্থা দেখে ছুটে পালাল সিঁড়ি দিয়ে উপরে।
শোনা যাচ্ছে, উপরে বিরাট হৈ চৈ চলছে।
আহমদ মুসা ভাবল দোতালার পথে প্রধান গেট দিয়ে বেরুনো সম্ভব নয়। মনে পড়ল তার পুরোহিতের কাছে শোনা এ হলঘরের চারটি স্টিলের গেটের কথা।
খুশি হয়ে উঠল আহমদ মুসা। তার বাঁ পাশেই এ হলঘরের দক্ষিণ দেয়াল। এ দেয়ালে খুব সামনেই এ ধরনের একটা গেট।
আহমদ মুসা পুরোহিতকে ঐভাবে সামনে ধরে রেখে পিছু হটে চলল দক্ষিণ দেয়ালের সেই স্টিল গেটের কাছে।
আহমদ মুসা আরও খুশি হলো এই ভেবে যে, এ দেয়ালের পর চত্বরটা। তার পরেই নদী।
বন্ধ স্টিল গেটের সামনে গিয়ে আহমদ মুসা ছেড়ে দিল পুরোহিতকে। সে বিস্মিত হলো, ওরা আর কেউ এ হলঘরে আসছে না কেন? নিহত এই দশজনই কি ওদের সশস্ত্র প্রহরী ছিল, না অন্য কোন পরিকল্পনা?
আহমদ মুসা স্টিলের দরজার কী হোলটা পরীক্ষা করতে করতে পুরোহিতকে জিজ্ঞেস করল, ‘মন্দিরে আপনাদের প্রহরী কতজন?’
‘চেৌদ্দজন। দুজন ছুটিতে’। বলল পুরোহিত।
‘এতক্ষণে কি পুলিশ এসে পৌঁছেছে বাইরে?’ বলল আহমদ মুসা।
‘পুলিশ?’ বিস্ময় প্রকাশ করল পুরোহিত।
আহমদ মুসা তার দিকে রিভলবার তাক করে বলল, ‘ভনিতা ছাড় মহারাজ। কোন ঘটনা ঘটলে সংগে সংগে পুলিশকে সংকেত দেবার ব্যবস্থা মন্দিরে আছে। আমি জিজ্ঞেস করছি, পুলিশ নিশ্চয় এসেছে। কিন্তু তারা এখানে আসছে না কেন?’
পুরোহিত বেদনায় কুঁকড়ে গিয়ে বিস্মিত চোখে তাকাল আহমদ মুসার দিকে। আহমদ মুসা ঐ গোপন বিষয়টা কি করে জানল এটাই বোধ হয় তার বিস্ময়ের কারণ। একটু সময় নিয়ে বলল সে, ‘পুলিশ উপরের হলরুমে এসে অপেক্ষা করতে পারে, আবার মন্দিরের চত্বরে পজিশন নিতে পারে। আমি ঠিক জানি না’।
আহমদ মুসা যুবকটির দিকে তাকাল। বলল, ‘এই দরজার পরে একটা চত্বর। তার পরেই নদী। নদীর ঘাটে গিয়ে আমাদের নৌকায় উঠতে হবে। আমার পেছন পেছন আসবে। যদি দরকার হয় পেছন দিকটা সামাল দেবে’।
আহমদ মুসা এবার ফিরে দাঁড়িয়ে দরজার দিকে মনোযোগ দিল। গুলি করে তালা ভাঙা ছাড়া আর কোন উপায় নেই। কিন্তু এ তালা ভাঙার শব্দে শত্রু পক্ষ আমাদের অবস্থান জেনে যাবে এবং আমাদের পরিকল্পনা কি তাও বুঝতে পারবে। কিন্তু গুলি করে তালা ভাঙা ছাড়া কোন উপায়ও নেই।
দরজার কী হোলে রিভলবারের নল ঠেকিয়ে গুলি করল আহমদ মুসা।
খুলে ফেলল দরজা এক ঝটকায়। তার হাতে উদ্যত এম-১০। অন্যদিকে পুরোহিতকে ধরে রেখেছে সামনে।
জায়গাটা মন্দিরের বিশালাকার মূল প্রবেশ সিঁড়ির পাশেই। সোজা এগুলে সিঁড়ির পাশ দিয়ে তারা প্রাচীরের দক্ষিণ দরজায় পৌঁছে যাবে।
আহমদ মুসা সামনে কাউকেই দেখল না। তবে সিঁড়ির উপর দিকে মানুষের হৈ চৈ ও পায়ের শব্দ পাওয়া গেল। আহমদ মুসা বুঝতে পারল ওরা নিচে শব্দ শুনে আসছে।
পেছনে তাকিয়ে আহমদ মুসা দ্রুত কন্ঠে যুবককে বলল, ‘তুমি সব সময় আমার পেছনে থাকবে’।
বলেই আহমদ মুসা পুরোহিতকে ঠেলে নিয়ে ছুটল সিঁড়ির গোড়া বরাবর।
সিঁড়ির গোড়ায় পৌঁছেই আহমদ মুসা ঘুরে দাঁড়াল। এম-১০ এর ট্রিগারে ছিল তার আঙুল। ঘুরবার সময় ট্রিগারে চেপে বসেছিল তার তর্জনিটা।
বৃষ্টির মত গুলি ছুটে গেল গোটা সিঁড়ি কভার করে উপর দিকে।
সিঁড়ি ধরে নামছিল কয়েকজন পুলিশ ও আরও কয়েকজন মানুষও।
গুলি বৃষ্টি হওয়ার সংগে সংগে পুলিশ ও লোকগুলো সিঁড়ির উপর পড়ে গেল। কয়জন গুলী খেয়ে পড়ল আর কয়জন বাঁচার জন্যে শুয়ে পড়ল তা বুঝল না আহমদ মুসা। বুঝার সময়ও তার নেই।
পুলিশ ও লোকগুলো সব সিঁড়ির উপর পড়ে যেতেই আহমদ মুসা পুরোহিতকে ছেড়ে দিয়ে বাম হাত দিয়ে পকেট থেকে ডিমের মত স্মোক বোমা বের করে ছুঁড়ে মারল সিঁড়ি লক্ষ্যে।
বোমা ফাটার চেয়ে হাল্কা শব্দে স্মোক বোমা বিস্ফোরিত হলো। সংগে সংগে কালো ধোঁয়ায় ছেয়ে গেল সিঁড়ি ও তার আশ পাশটা।
প্রাচীরের দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে যুবককে বলল, ‘দৌড় দাও’।
তারপর আহমদ মুসা পুরোহিতকে বলল, ‘তুমি এখানে শুয়ে পড়, না হলে গুলীতে মরবে’। বলে সে ছুটল প্রাচীরের দরজার দিকে। তার পেছনে ছুটছে যুবকটি। সিঁড়ির দিক থেকে গুলীর শব্দ হতে লাগল। কিন্তু আন্দাজের উপর ছোঁড়া গুলীর দু’একটা গুলী আশ-পাশ দিয়ে চলে গেল। আহমদ মুসারা নিরাপদে পার হল প্রাচীরের দরজা।
প্রাচীরের পাশের রাস্তা ধরে ছুটে চলল আহমদ মুসা ও যুবকটি। আহমদ মুসার লক্ষ্য ঘাটে বেঁধে রেখে আসা বোট।
বোটে উঠল তারা দুজন।
আহমদ মুসা বসল গিয়ে ড্রাইভিং সিটে। বোট স্টার্ট দিয়ে তার রিভলবার তাক করল জেটিতে বেঁধে রাখা অন্য একটি বোটকে। ট্রিগার টিপল আহমদ মুসা। কয়েকটা গুলী গিয়ে বিদ্ধ করল বোটের ওয়াটার লাইন ঘেঁসে। বোটের গায়ে কয়েকটা গর্তের সৃষ্টি হলো। আহমদ মুসা হাসল। বলল, ‘ওরা ঐ বোটটা নিয়ে পঞ্চাশ গজও এগুতে পারবে না’।
আহমদ মুসার বোট তখন চলতে শুরু করেছে। তারা দেখল তিনজন পুলিশ ও আরও কয়েকজন লোক মন্দিরের দিক থেকে ছুটে এসে জেটিতে বাঁধা সেই বোটে উঠল। স্টার্ট নিয়ে ছুটে চলতে শুরু করল তাদের বোট।
মাত্র কয়েক মিনিট, দূর থেকেই আহমদ মুসারা আলোর আঁকা বাঁকা গতি দেখে বুঝল ঐ বোটে হৈ চৈ শুরু হয়ে গেছে। আলোর গতি বেঁকে গেল। বোট তারা কুলে ভেড়াবার চেষ্টা করছে বুঝল আহমদ মুসারা। কিন্তু পারল না। আলোটা তলিয়ে গেল। তলিয়ে গেল বোট। অনুমান করল আহমদ মুসারা পানিতে হাবুডুবু খাচ্ছে নিশ্চয় ওরা সাত আটজন মানুষ।
আহমদ মুসারা তখন অনেক দূর চলে এসেছে। পুলিশরা বা ওরা নতুন করে বোট জোগাড় করে আবার আহমদ মুসাদের পিছু নেবে সেটা অসম্ভব।
স্বস্তির চিহ্ন ফুটে উঠেছে যুবকটির চোখে মুখে। বলল সে আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে, ‘ওদের বোট ফুটো করে আসতে হবে এই চিন্তাটা তখন আপনার মাথায় এলো কি করে?’
‘দেখ বাঁচার চেষ্টা যখন মানুষের মধ্যে মুখ্য হয়ে উঠে, তখন কত বুদ্ধি বের হয়!’ বলল আহমদ মুসা।
‘আপনাকে ধন্যবাদ স্যার। আপনি রীতিমত এক যুদ্ধ করেছেন। আমি নিজ চোখে না দেখলে একে মনে হতো এক সিনেমার গল্প। একজন মাত্র লোক এমন অসাধ্য সাধন করতে পারে, তা আমার কাছে এতদিন অবিশ্বাস্য ছিল’। বলল যুবকটি।
আহমদ মুসা কোন জবাব দিল না।
যুবকটিই আবার কথা বলল। বলল সে, ‘স্যার আজকের রাতই আমার শেষ রাত ছিল। আপনি আমাকে বাঁচিয়েছেন। কে আপনি স্যার?
যুবকটির প্রশ্নের জবাব না দিয়ে আহমদ মুসা জিজ্ঞেস করল,
‘তুমি কি ওয়াং আলী?’
‘জি না। আমি ওভানডো এল টেরেক। আপনি ওয়াং আলীকে চেনেন?’ বলল ওভানডো এল টেরেক নামের যুবকটি।
‘তুমি চেন?’ জিজ্ঞেস করল আহমদ মুসা।
‘চিনি না। ওদের কথাবার্তায় ওয়াং আলীর নাম শুনেছি। উনি তো এখানেই ছিলেন। আজ বিকেলে অন্য কোথাও নিয়ে গেছে’।
‘কোথায় নিয়ে গেছে?’
‘তা জানতে পারিনি। তবে ওদের কথা থেকে শুনেছি আগামী কাল বিশ তারিখের পর তারা ওয়াং আলীকে হত্যা করবে। কিন্তু আপনি তাকে চেনেন?’
‘চিনি না, কিন্তু জানি। তাকে উদ্ধার করার জন্যেই আমার এই ঘোরাঘুরি’।
‘ঈশ্বরকে ধন্যবাদ তাকে উদ্ধার করতে এসে আমাকে উদ্ধার করলেন’।
‘আমিও ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিচ্ছি। আমার অভিযান ব্যর্থ হয়নি। ওয়াং আলীকে উদ্ধার করত না পারলেও তোমাকে উদ্ধার করেছি’।
‘কিন্তু স্যার বিপদ আমার কাটেনি। আজ সন্ধ্যায় ওদের একজনের কাছে শুনলাম, আজই ওরা আমার স্ত্রীকে কিডন্যাপ করবে। তাকে এনে অত্যাচার করে আমাকে কথা বলতে বাধ্য করবে’। ভেঙে পড়া কন্ঠে বলল ওভানডো।
‘তোমাকে কি বলাতে চায়? কি শত্রুতা ওদের সাথে তোমার?’
‘বলল, ‘সে অনেক কথা স্যার। বলছি। কিন্তু তার আগে আপনার মাথার আঘাত থেকে রক্ত বন্ধ করা দরকার’।
উঠে দাঁড়াল ওভানডো।
‘না, ওভানডো বস। রক্ত যা পড়ার তা পড়ে গেছে। এখন তেমন একটা পড়ছে না।এখনই বন্ধ হয়ে যাবে।তুমি বল তোমার কথা’।
ওভানডো বসল আহমদ মুসার কাছাকাছি এসে। বলল, ‘স্যার এই সুরিনাম নদীর মুখে নদীর ঠিক উত্তর উপকুল ঘেঁষে, এই পারামারিবো শহরের পূর্ব প্রান্তে আমাদের পাঁচশ একরের একটা স্টেট আছে। স্টেটের ঠিক মাঝ বরাবর আমাদের বাড়ি। বাড়িটা প্রায় বিলীন হয়ে গেছে সেই দুর্গের মধ্যে। দুর্গকে ‘কাপ্তান দুর্গ’ বলত। সেই হিসেবে আমাদের বাড়িকেও ‘কাপ্তান বা টেরেক বাড়ি’ বলা হয়। ওদের চোখ দুর্গ এলাকার উপর। ওরা আমাদের গোটা স্টেটটাই দ্বিগুন-তিনগুন দাম দিয়ে কিনতে চেয়েছিল। আমরা রাজী হইনি। শেষে ওরা দুর্গ এলাকা কিনতে চায় এবং আমাদেরকে বাড়ি সরিয়ে নিতে বলে। ওরা কয়েক গুন বেশি দামে জায়গাটা কিনবে এবং অন্যত্র বাড়িও তারা তৈরী করে দেবে। কিন্তু এতে আমরা সম্মত হইনি। এটা নিয়েই বিরোধের সূত্রপাত। শেষ পর্যন্ত ওরা আমাকে কিডন্যাপ করেছে। ওরা আমার কাছে দুটি জিনিস জানতে চাচ্ছে। একটি হলো, পরিবারের পুরনো কাগজ পত্রের বাক্সটা কার কাছে, কোথায় আছে? দ্বিতীয়টি হলো, দুর্গ এলাকা বিক্রি করার সম্মতি’।
‘জায়গাটা তোমরা ছাড়ছো না কেন? পুরনো কাগজ পত্রে কি আছে?’
‘ঐ স্টেট-এর সাথে, ঐ দুর্গের সাথে আমাদের শতশত বছরের পারিবারিক ইতিহাস জড়িত। কোন মূল্যেই এটা আমরা কাউকে দিতে পারি না’।
‘আর পারিবারিক পুরনো কাগজ পত্র?’
‘ওটাও আমাদের পরিবারের এক অতি মূল্যবান সম্পদ। ঐ কাগজ পত্রের আমরা অনেক কিছুই বুঝিনা। ব্যবহারিক কোন মূল্যও নেই। তবু আমাদের পরিবার ওটা এতদিন যক্ষের ধনের মত আগলে রেখেছে। কাউকে কোন মূল্যেই আমরা দিতে পারিনা ওটা’।
‘এ সবের জন্য ওরা এমন মরিয়া হয়ে উঠেছে কেন?’
‘আমরা এর রহস্য জানতাম না। কিন্তু ওদের কাছ থেকে একটা কাহিনী শুনেছি। কয়েকদিন আগে চোখ বন্ধ করে মরার মত পড়েছিলাম। দীর্ঘক্ষণ নানারকম নির্যাতন চালাবার পর ওরা বসে জিরিয়ে নিচ্ছিল।ওরা মনে করেছিল আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছি। ওরা দুজন গল্প করছিল। ওদের গল্প থেকে জানলাম, দুর্গের কোন এক বিশেষ স্থানে জাহাজ ভরে আনা সোনা পুঁতে রাখা আছে। আমাদের পারিবারিক কাগজপত্রে কোথায় স্বর্ণ রাখা আছে তার সংকেত পাওয়া যাবে’।
‘এ ধরণের গুপ্তধনের কথা তোমার পরিবার জানে না, কিন্তু এরা জানল কি করে?’
‘ওদের গল্পে এ বিষয়েও কিছু জানলাম। ওরা বলল, ত্রিনিদাদের সামনে কোথায় যেন কলম্বাসের জাহাজ বহর হ্যারিকেনের কবলে পড়েছিল। সবাই জানে সে হ্যারিকেনে বিশটি জাহাজ ডুবে যায়, কিন্তু আসলে ডুবে উনিশটি। একটি জাহাজ ক্যাপ্টেনের অদ্ভূত দক্ষতায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েও বেঁচে যায়। কিন্তু হ্যারিকেন তাড়িত হয়ে চলে আসে সুরিনাম উপকুলে। ভীষণ ক্ষতিগ্রস্ত জাহাজ ডুবে যাবার আগেই জাহাজের ক্যাপ্টেন আরহমেন এল টেরেক জাহাজ বোঝাই সোনা কূলে নামিয়ে নেয়’।
‘শুনতে রূপকথার মত লাগল। সোনা পাগল ইউরোপীয়দের এমন হাজারো গল্প আছে। আবার হতে পারে এটা সত্য ঘটনা’।
‘আপনি ঠিকই বলেছেন। আমার কাছেও একে রূপ কথার মত মনে হয়েছে। ইউরোপের কথা বলছেন কেন, সোনা নিয়ে লাখো কাহিনী আছে আমাদের আমেরিকাতেও’।
‘আর সে গল্পের অনুসরণে সোনা খুঁজতে গিয়ে কত লোক যে কতভাবে হারিয়ে গেছে তার ইয়াত্তা নেই’।
‘যেমন আমরা ওদের সোনা খোঁজার পাল্লায় পড়ে সব হারাতে বসেছি’।
কথা বলেই ওভানডো দ্রুত চোখ তুলে আহমদ মুসার দিকে তাকাল এবং দ্রুত কন্ঠেই বলল, স্যার আমার ওয়াইফকে কিডন্যাপ করতে ওদের আজ যাওয়ার কথা, যদি গিয়ে থাকে!’ ওভানডো’র কথায় যেন কান্না ঝরে পড়ল।
আহমদ মুসা বোটের স্পিড বাড়িয়ে দিল। বলল, ‘আল্লাহ ভরসা ওভানডো। চল দেখা যাক। কিডন্যাপ করলে ওরা ওকে কোথায় নিয়ে যাবে?’
‘আমি যেখানে বন্দী ছিলাম সেখানে আমার কাছে ওঁকে নিয়ে যাবার কথা’।
‘আচ্ছা চল দেখা যাক’।
বলে আহমদ মুসা আবার সামনের দিকে মনোযোগ দিল।
ওভানডো বলে উঠল, ‘স্যার, আপনি আমার বাসায় যাবেন?’
‘কেন, আমাকে নিয়ে যাবার ইচ্ছা নেই?’
‘আছে বলেই জিজ্ঞেস করছি স্যার। আমার মা, আমার দাদী আপনাকে পেলে খুব খুশী হবে’।
‘তোমার দাদী আছে? কত বয়স?’
‘একশ পাঁচ’।
‘তাহলে বিরাট বহুদর্শী তো তিনি। আর কে আছে তোমার?’
‘আব্বার কথা বলছেন তো? তিনি নেই’।
‘স্যরি’। বলল আহমদ মুসা।
কোন উত্তর দিল না ওভানডো।
আহমদ মুসার দৃষ্টি সামনে নিবদ্ধ।
সবটুকু শক্তি দিয়ে এগিয়ে চলেছে বোট।

ওভানডো এল টেরেকের স্টেটে প্রবেশ করল ওভানডোদের গাড়ি। ড্রাইভ করছিল আহমদ মুসা।
স্টেটের মাঝখানে ওভানডোদের বাড়ি। বাড়ির চারদিকে স্টেট জুড়ে বাগান ও ফসলের ক্ষেত। মাঝে মাঝে জংগালাকীর্ণ টিলা।
নদীর তীর থেকে একটা প্রশস্ত পাথুরে রাস্তা স্টেটের গেট পেরিয়ে স্টেটের ভেতর দিয়ে এগিয়ে গেছে বাড়ির দিকে।
পাথুরে রাস্তার দুধারে ফসলের ক্ষেত। দু একটা টিলাকেও অতিক্রম করতে হয়েছে রাস্তাকে।
স্টেটের উত্তর ও পশ্চিম অংশে বাগান।
গোটা স্টেটটাই প্রাচীর দিয়ে ঘেরা।
স্টেটের রাস্তা দিয়ে বাড়িতে পেৌঁছার মাঝামাঝি পথে এসেছে আহমদ মুসার গাড়ি।
আহমদ মুসা দেখল ওভানডোর বাড়ির দিক থেকে চারটি হেডলাইট দ্রুত এগিয়ে আসছে।
‘তোমাদের কয়টি গাড়ি ওভানডো?’ জিজ্ঞেস করল আহমদ মুসা।
‘দুটো গাড়ি। এই একটা আর বাড়িতে আছে একটা’। বলল ওভানডো।
‘তাহলে এত রাতে তোমাদের বাড়ি থেকে দুটো গাড়ি একসাথে বেরিয় আসছে কেন?’ প্রশ্ন আহমদ মুসার।
‘আমিও তাই ভাবছি? তাহলে কি…..?’
কথা শেষ না করেই থেমে গেল ওভানডো। তার কন্ঠে ঝরে পড়ল উদ্বেগ।
‘তোমার আশংকা মনে হয় ঠিক ওভানডো’।
বলেই আহমদ মুসা তার গাড়ি রাস্তার ঠিক মাঝ বরাবর নিয়ে এগিয়ে চলল।
রাস্তা প্রশস্ত হলেও পাশাপাশি দুটি গাড়ি চলার মত পথ।
আহমদ মুসার গাড়ি রাস্তার মাঝখানে আসায় তার গাড়ি পাশ কাটিয়ে যাবার আর পথ থাকলো না।
রাস্তার দুপাশেই ধানের ক্ষেত। ক্ষেত রাস্তা থেকে নিচু এবং তাতে পানি রয়েছে।
‘ওভানডো গাড়ি দুটির গতি দেখে মনে হচ্ছে শত্রু পক্ষেরই। মনে হয় মিশন শেষ করে পালাচ্ছে’। আহমদ মুসা বলল।
‘তাহলে কিডন্যাপ করেছে ওরা আমার স্ত্রীকে?’ প্রায় আর্তনাদ করে উঠল ওভানডোর কন্ঠ।
‘ওভানডো দুর্বল হয়ে পড়ার সময় এটা নয়’।
বলে আহমদ মুসা তার গাড়ি ডেড স্টপ করার মত থামিয়ে দিল।
ঝোঁক সামলাতে না পেরে ওভানডো ড্যাশ বোর্ডের উপর মুখ থুবড়ে পড়তে যাচ্ছিল। আহমদ মুসা বাঁ হাত দিয়ে তাকে আটকে দিল।
সোজা হয়ে বসে ওভানডো বলল, ‘গাড়ি থামিয়ে দিলেন যে’।
‘থামিয়ে দেইনি। বলতে হবে আমাদের গাড়ি নষ্ট হয়ে গেছে’। আহমদ মুসা বলল।
‘তাতে কি হবে?’ জিজ্ঞেস করল ওভানডো। তার কন্ঠে বিস্ময়।
‘আমাদের গাড়ির পাশ কাটিয়ে ওরা যেতে পারবে না। থামাতে বাধ্য হবে ওদের গাড়ি। তারপর দেখবে কি ঘটে’। আহমদ মুসা বলল।
সামনের দুটি গাড়ি একদম কাছে চলে এসেছে। সাইড দেবার জন্যে অবিরাম হর্ন দিচ্ছে।
আহমদ মুসা তার রিভলবারটা কোটের বাম পকেটে রেখে ডান হাতে নিল এম-১০ মাইক্রো মেশিন গান। বলল ওভানডোকে, ‘তুমি গাড়িতেই বসে থাকবে। গোলাগুলী শুরু হলে তখন তুমি গাড়ির মেঝেয় শুয়ে পড়বে’।
আহমদ মুসা গাড়ি থেকে নামার সময় ওভানডো বলল, ‘আমার কাছেও রিভলবার আছে। আমিও নামতে পারি’।
‘তোমার পরিবারের কেউ যদি ওদের গাড়িতে থাকে, তাহলে আমাদের পক্ষ থেকে গুলী-গোলায় সাবধান হতে হবে। আপাততঃ গাড়িতেই থাক’।
আহমদ মুসা নামল গাড়ি থেকে। তারপর দ্রুত এগিয়ে গাড়ির সামনের ঢাকনা তুলে ফেলল। একটু ঝুঁকে পড়ে গাড়ির ইঞ্জিনের এটা ওটা পরীক্ষা করতে লাগল। যেন খারাপ গাড়ি সারাবার চেষ্টা করছে সে।
বাম হাত দিয়ে ইঞ্জিনের এটা ওটা দেখলেও তার কান সতর্ক এবং ডান হাতে তার এম-১০ প্রস্তুত।
ওদের দু গাড়ি এসে আহমদ মুসার গাড়ির পাঁচ ছয় গজ সামনে দাঁড়িয়ে পড়ল।
গাড়ি দাঁড় করিয়েই দু গাড়ি থেকে চার পাঁচজন এক সাথে নেমে পড়ল। প্রায় সমস্বরে চিৎকার করে উঠল। অকথ্য গালি দিয়ে তারা বলে উঠল, ‘শুয়োরের বাচ্চা গাড়ি সরা’।
আহমদ মুসা সোজা হয়ে দাঁড়াল। নরম কন্ঠে বলল, ‘কি করব স্যার, হঠাৎ গাড়ি খারাপ হয়ে গেল’।
‘কি করবি, গাড়ি ঠেলে ফেলে দে নিচে’। ওদের একজন চিৎকার করে বলল।
‘স্যার একটু অপেক্ষা করুন। আমি ‘কাপ্তান বাড়ি’ থেকে এক খন্ড তার নিয়ে আসি। তাহলেই গাড়ি ঠিক হয়ে যাবে’। আহমদ মুসার কন্ঠে অনুনয়ের সুর।
আরও দুজন ওদের গাড়ি থেকে নামল। ওরা এক সাথে চিৎকার করে উঠল, ‘এক মুহূর্তও সময় দেবনা। ঠেলে ফেলে দাও গাড়ি নিচে’।
‘স্যার, কাপ্তান বাড়ির একজন সম্মানিত মেহমান আছে গাড়িতে’। আহমদ মুসার অসহায় সুর।
‘শালা আবার কথা বলে। জাহান্নামে যাক কাপ্তান বাড়ির মেহমান। শালা সরা গাড়ি। না হলে গুলী খাবি কিন্তু’। বলল ওদের একজন চিৎকার করে।
‘আমি তো একা গাড়ি ঠেলে ফেলতে পারবো না স্যার। ফেললে তুলতে পারবো না। আপনারা একটু রহম করুন স্যার। আপনারাও তো কাপ্তান বাড়ি থেকেই এলেন’। আহমদ মুসা যেন ওদের বুঝাবার জন্য মরিয়া।
‘হ্যাঁ এলাম। আমরা কাপ্তান বাড়ির মাথায় বাড়ি মেরে এলাম। একটু কান পেতে শোন, ও বাড়ির কান্না শুনতে পাবি। আমরা ওদের ধ্বংস করতে চাই’।
বলেই লোকটি ওদের সবাইকে আহবান করে বলল, ‘এসো তোমরা সবাই। ও শালাকে দিয়ে হবে না। আমরা গাড়ি ফেলে দিয়ে পথ পরিষ্কার করি।
ওর সবাই এগিয়ে আসছে আহমদ মুসার গাড়ির দিকে।
দু’পক্ষের গাড়ির মাঝের ফাঁকা জায়গাটায় ওরা এসে পৌঁছেছে। সাতজন ওরা।
আহমদ মুসার ডান হাত বিদ্যুত বেগে বেরিয়ে এল তার কোটের আড়াল থেকে। তার তর্জনি ছিল এম-১০ এর ট্রিগারেই। শুধু তর্জনি চেপে ধরল সে ট্রিগারটায়। আর ঘুরিয়ে নিল এম ১০এর নল ওদের উপর দিয়ে।
আহমদ মুসার এম-১০ এর নল থেকে তখনও ধোঁয়া বেরুচ্ছিল। এ সময় দেখতে পেল সামনের কারটির এদিকের দরজা আস্তে আস্তে খুলে যাচ্ছে। একজন লোক আধখোলা দরজার ফাঁক দিয়ে গড়িয়ে পড়ল মাটিতে। তার হাতে তাক করা রিভলবার। সে মাটিতে পড়ার সাথে সাথেই তার রিভলবার থেকে গুলি বেরিয়ে আসত। কিন্তু আহমদ মুসা প্রস্তুত ছিল তার আগে থেকেই। তার এম ১০-এর এক ঝাঁক গুলি গিয়ে দরজা ও লোকটিকে আঘাত করল। গুলীর ধাক্কায় দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় লোকটির গোটা দেহই চলে এল আহমদ মুসার এম-১০ এর আওতায়। গুলীর ঝাঁক লোকটিকে একেবারে ভর্তা করে ফেলল।
এম ১০ বাগিয়েই আহমদ মুসা ছুটল গাড়ি দুটির দিকে।
কিন্তু সামনের গাড়িতে কাউকে দেখল না। পেছনের গাড়িতে লোকটির লাশ যেখানে পড়েছিল, সেই দরজার জানালা দিয়ে আহমদ মুসা দেখল একজন মেয়ে মুখ বাঁধা অবস্থায় পেছনের সিটে বসে আছে।
মেয়েটিকে দেখেই আহমদ মুসা মুখ ফিরিয়ে ডাকল, ‘ওভানডো বেরোও গাড়ি থেকে, এদিকে এসো’।
ছুটে এল ওভানডো।
আহমদ মুসা গাড়ির দরজা আগেই খুলে ফেলেছিল। ওভানডো দরজা দিয়ে একবার তাকিয়ে ঢুকে গেল ভেতরে। মুখের বাঁধন খুলে ফেলল মেয়েটির। বলল দ্রুত কন্ঠে, ‘জ্যাকি তুমি ঠিক আছ তো?’
ঢুকরে কেঁদে উঠল মেয়েটি। ঝাঁপিয়ে পড়ল ওভানডোর বুকে।
ওভানডো মেয়েটির পিঠ চাপড়ে বলল, ‘আর ভয় নেই জ্যাকি। আমি ফিরে আসতে পেরেছি, তুমি মুক্ত হয়েছ’।
ওভানডো মেয়েটিকে গাড়ি থেকে বের করে আনল।
এখান থেকে ওভানডোর বাড়ি বেশি দুরে নয়।
সেদিকে তাকিয়ে ওভানডো চিৎকার করে ডাকল, ‘জন, আলফ্রেড, দিয়েগো’।
তার ডাকার সাথে সাথেই ওদিকের অন্ধকার থেকে কয়েকটি টর্চ জ্বলে উঠল এবং কয়েকটি কন্ঠ চিৎকার করে উঠল, ‘আমরা আছি, আমরা আসছি’।
অল্পক্ষণের মধ্যেই ছুটে এল পাঁচজন লোক।
পাঁচজনের মধ্যে রয়েছে একজন তরুণী। সে এসেই কেঁদে উঠে জড়িয়ে ধরল ওভানডোকে।
ওভানডো তাকে সান্ত্বনা দিয়ে আহমদ মুসার দিকে তাকিয়ে তরুণীটিকে দেখিয়ে বলল, ‘এ আমার ছোট বোন লিসা টেরেক’।
আহমদ মুসা হাতের এম-১০ মেশিন রিভলবার কোটের নিচে শোল্ডার হোলস্টারে রাখতে রাখতে তরুণীটিকে স্নেহের স্বরে বলল, ‘কান্না কেন? ভাইকে ফিরে পেয়েছ, এখন হাসতে হবে’।
‘শুধু ভাইকে নয় ভাবীকেও ফিরে পেয়েছ’। বলল ওভানডো।
তরুণীটি সংগে সংগেই ওভানডোর পেছন দিকে তাকিয়ে ছুটে গেল। জড়িয়ে ধরল ভাবীকে।
‘ও! আমি ভূলে গিয়েছিলাম। তাহলে আনন্দ তো ডবল’।
বলে থামল আহমদ মুসা। অন্যান্য যারা এসেছে তাদের দিকে তাকাল।
ওভানডো বলল, ‘ওরা সবাই আমাদের স্টেটের কর্মচারী’।
একজন মাঝবয়সীকে দেখিয়ে বলল, ‘ইনি আমাদের স্টেটের ম্যানেজার’।
ওভানডো থামতেই আহমদ মুসা বলল, ‘ওভানডো তোমার এখানে কোন কাজ নেই। তুমি ম্যাডামকে নিয়ে বাড়িতে যাও’।
‘আপনিও চলুন’। বলল ওভানডো।
‘কথা বলো না। তুমি যাও। এদিকের কাজ সেরে ওদের নিয়ে আমি আসছি’। আহমদ মুসা বলল।
‘এখানে তো আর কোন কাজ নেই’। বলল ওভানডো।
‘ওভানডো আমি এদের আটজন এবং গাড়ি দুটো সার্চ করে দেখব। তারপর লাশগুলো ও গাড়ির ব্যবস্থা করে আমি আসছি’। আহমদ মুসা বলল।
‘লাশগুলোর ব্যবস্থা কি? ম্যানেজার পুলিশকে খবর দিলেই সব ব্যবস্থা হয়ে যাবে’। বলল ওভানডো।
‘আমি মনে করি পুলিশ জটিলতার সৃষ্টি করবে। যারা এই ঘটনা ঘটাল, সেই গ্রুপের সাথে বর্তমান সরকারের গভীর সম্পর্ক আছে এবং সেই সুত্রে পুলিশও এদের কথাই শুনবে’। আহমদ মুসা বলল।
উদ্বিগ্ন দেখাল ওভানডোকে। একটু চিন্তা করে বলল, ‘ঠিকই বলেছেন আপনি। আমি বন্দী থাকাকালে ওদের মুখে এ ধরনের কথাই শুনেছি। গতকাল বিকেলেও ওরা আমাকে বলেছে, সরকারও আমাদের, পুলিশও আমাদের। কারও সাহায্য তোমরা পাবে না’।
বলে একটু চিন্তা করে ওভানডো বলল, ‘তাহলে আপনি কি করতে চান?’
‘গাড়িতে তুলে তোমার লোকরা লাশগুলো নদীতে ফেলে দিয়ে আসবে। অল্পক্ষণেই ওগুলো চলে যাবে সাগরে’। আহমদ মুসা বলল।
‘ঠিক আছে আপনি তাই করুন। কিন্তু তাড়াতাড়ি চলে আসুন আপনি’।
বলে বোন লিসাকে নিয়ে স্ত্রী জ্যাকির হাত ধরে বাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করল ওভানডো।

ওভানডোর শোবার ঘরে ওভানডো, তার স্ত্রী জ্যাকুলিন, তার মা ও দাদী বসে গল্প করছিল। ঘরে প্রবেশ করল ওভানডোর ছোট বোন লিসা টেরেক। বলল, ‘সাতটা বাজে ভাইয়া। তোমার মেহমানকে তো ডাকতে হবে সাড়ে ৭টায়’।
‘এই তো ঘুমালো সাড়ে চারটায়, সাড়ে ৭টায় উঠবে কি করে?’ বলল ওভানডোর মা।
‘কিন্তু উনি বার বার বলেছেন সাড়ে ৭টায় ওঁকে উঠতে হবে’।
জোর দিয়ে বলল লিসা টেরেক।
‘ওঁর চেয়ে দেখি তোমার গরজ বেশি’।
মুখ লাল হয়ে উঠল লিসার।
লিসার বয়স ২০ বছরের মত হবে। পারামারিবো স্টেট ইউনিভার্সিটিতে পড়ে।
লিসা নিজেকে সামলে নিয়ে বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠল। বলল, ভাবী, মাত্র ঘন্টা দুয়েকের কথা-বার্তায় আমরা সবাই দেখেছি উনি কথা কম বলেন। কিন্তু যা বলেন, তার মধ্যে কথার কথা থাকেনা’।
‘তুমি এত খেয়াল করেছ লিসা?’ বলল তার ভাবী জ্যাকি।
মুখ লাল করে কিছু বলতে যাচ্ছিল লিসা। তার মা তাকে বাধা দিয়ে বলল, ‘ছেলেটার মাথা কিন্তু সাংঘাতিক আহত হয়েছে। নিশ্চয় অনেক রক্ত পড়েছে’।
‘হ্যাঁ মা, গোটা পথই রক্ত পড়েছে। আমি একবার কাপড় দিয়ে বেঁধে দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তিনি রাজী হননি। বলেছিলেন, রক্ত পড়া কমে গেছে, এমনিতেই বন্ধ হয়ে যাবে। অদ্ভূত লোক মা, মাথায় অতবড় আঘাত পেয়েছে, তার কথা বার্তা ও আচার আচরণে কখনও তা মনেই হয়নি’। বলল ওভানডো।
‘ও মানুষ নয় বেটা। ও নিশ্চয় কোন দেবদূত। তোমার কাছে ও বৌমার কাছে যা শুনলাম, যেভাবে তোমাকে ও জ্যাকিকে সে উদ্ধার করেছে, তা কোন একজন মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। ভেবে দেখো এই রাতে আঠার উনিশজন লোক মরেছে তার হাতে। নিজের জীবন বিপন্ন করেই সে এটা করেছে। ঈশ্বর বাছার মঙ্গল করুন’। বলল ওভানডোর মা।
‘যে ওয়াং আলীকে তিনি উদ্ধার করতে গিয়েছিলেন, সে ওয়াং আলী কে ভাইয়া?’ বলল লিসা।
‘তা ওঁকে জিজ্ঞেস করিনি’। বলল ওভানডো।
‘এক ওয়াং আলীর কথা আমি জানি। উনি আমাদের বিশ্ব বিদ্যালয়ের বোধ হয় শেষ বর্ষের ছাত্র। খুব ভালো ছাত্র, কিন্তু রাজনৈতিক কর্মী। ছাত্র আন্দোলনে সব সময় সক্রিয়। খুব জনপ্রিয়। শুনেছি উনি নিখোঁজ। ওর সাথে আমাদের সাবেক প্রধান মন্ত্রী আহমদ হাত্তা নাসুমনের মেয়ে ফাতিমা নাসুমনের বিয়ের কথা ছিল’। বলল লিসা।
‘সে ওয়াং আলীও হতে পারে। আমি জানি না’। ওভানডো বলল।
‘তোমার মেহমানের নাম কি ভাইয়া?’
ওভানডোর মুখে বিব্রত ভাব দেখা দিল। তারপর হাসল সে। বলল, ‘তাঁর নাম জিজ্ঞেস করার সুযোগ আমি পাইনি। বিরাট ভূল আমার এটা’।
‘আমার মনে হয় সে মুসলমান ভাইয়া’। বলল লিসা।
‘কেমন করে বুঝলি?’ জিজ্ঞেস করল ওভানডো।
‘সে শোবার আগে প্রার্থনা করছিল। মুসলমানরা ওভাবে প্রার্থনা করে’। বলল লিসা।
‘হতে পারে যাকে খুঁজছেন তিনি সেই ওয়াং আলীও তো মুসলমান’। বলল ওভানডো।
‘তোরা কি জানিস, আমাদের দুর্গে একটা ‘মস্ক’ মানে মসজিদ ছিল’। বলল ওভানডোর দাদী।
‘বল কি দাদী, আমাদের দুর্গে মসজিদ ছিল?’ ওভানডো বলল।
‘হ্যাঁ ওভানডো। আমি যখন নতুন বউ হয়ে আসি এ বাড়িতে, সে সময় একদিন দাদী শ্বাশুড়ী আমাকে ঘুরে ঘুরে দুর্গ দেখাচ্ছিলেন। একটা বড় ভাঙা ঘরের সামনের পাকা চত্বর পার হতে গিয়ে হঠাৎ দাঁড়িয়ে গেলেন। বললেন, বোন পায়ের জুতা খুলে ফেলো। বলে তিনিও তাঁর পায়ের জুতা খুলে ফেললেন। আমি জুতা খুলতে খুলতে বললাম, পায়ের জুতা খুলতে হবে কেন দাদী? তিনি বললেন, ‘এই ঘর একটা প্রার্থনার জায়গা। এই চত্বরও তার অংশ’। এ পবিত্র জায়গায় জুতা পায়ে ওঠা নিষেধ। আমি বললাম, কি বলছ তুমি দাদীমা, মন্দির, গীর্জা সব প্রার্থনার ঘরেই জুতা পায়ে ঢোকা যায়। তিনি বললেন, এটা মন্দির বা গীর্জা নয়, এটা মুসলমানদের মস্ক। এ প্রার্থনা গৃহে জুতা পায়ে ঢোকা যায় না। প্রার্থনা ঘরটির দেয়াল কোন কোন জায়গায় এখনও খাড়া আছে’।
ওভানডোর দাদী কথা শেষ করল।
ওভানডোর চোখে-মুখে বিষ্ময়। বলল, ‘কিন্তু দাদী, এ দুর্গে মুসলমানদের মসজিদ এল কি করে?’
‘আমি জানিনা। তোমার দাদা একটা গল্প করেছিলেন। গল্পটা তিনি শুনেছিলেন তার আব্বার কাছে। সে সময় নাকি একজন পুরাতত্ববিদ পর্যটক দুর্গ এলাকা পর্যবেক্ষণ করে বিষ্ময় প্রকাশ করেছিলেন। তিনি নাকি বলেছিলেন, এ দুর্গের কথা ইউরোপীয় বা আমেরিকান কোন বিবরণে নেই। অথচ বিশাল এই দুর্গটা তৈরী হয়েছে কলম্বাসের সময়ে। কলম্বাসের কোন জাহাজ সুরিনামে ল্যান্ড করার কোন দলীল নেই। দুর্গের মসজিদ দেখেও তিনি বিষ্ময় প্রকাশ করেছিলেন এবং তিনি বলেছিলেন, দুর্গের অবস্থানের বিচারে এই মসজিদই ছিল দুর্গের কেন্দ্রবিন্দু। তার মতে দুর্গের ভবনগুলোর মধ্যে মসজিদটাই সবচেয়ে সুনির্মিত। তার কথা সত্য। দেখ, গোটা দুর্গ মাটির সাথে মিশে গেছে। কিন্তু মসজিদের দেয়ালের অনেকাংশ এখনও খাড়া। আর মেঝে প্রায় অক্ষত’।
থামল ওভানডোর দাদী।
হঠাৎ ওভানডোর মুখটা ম্লান হয়ে গেল। বলল, ‘দাদী এই রহস্যের সাথে আরও রহস্য যোগ হয়েছে। আমাকে কিডন্যাপ করা হযেছিল কেন জান?’
হ্যাঁ, সেটা বলেছিস। স্টেট, স্টেট না হলে দুর্গ এলাকা বিক্রিতে রাজী হতে বাধ্য করার জন্যে’। বলল ওভানডোর মা।
‘কিনতে চায় কেন তার মধ্যেই রয়েছে আসল রহস্য আম্মা। আমি আড়ি পেতে ওদের আলোচনা শুনে জানতে পেরেছি, এই দুর্গ এলাকার কোথাও জাহাজ বোঝাই করে আনা স্বর্ণ পুঁতে রাখা হয়েছে। কোথায় পুঁতে রাখা হয়েছে, সেটাও নাকি পাওয়া যেতে পারে আমাদের পারিবারিক পুরনো কাগজ পত্রে। সে জন্যেই ওরা দুর্গ এলাকা কিনতে চায় এবং আমাদের পারিবারিক পুরনো কাগজ-পত্র চায়। শত নির্যাতনেও যখন রাজী হচ্ছিলাম না, তখন জ্যাকিকে ওরা কিডন্যাপ করার সিদ্ধান্ত নেয়। যাতে তার উপর অত্যাচার করলে বাধ্য হই বলতে’।
থামল ওভানডো।
সবার চোখে উদ্বেগ ও বিষ্ময়।
ওভানডোর মা-ই প্রথম কথা বলে উঠল। বলল, ‘ঈশ্বরকে অসংখ্য ধন্যবাদ। জ্যাকিকে তিনি রক্ষা করেছেন। কিন্তু তুমি একি খবর শোনালে। ওরকম গুপ্তধন থাকলে সেটা আমাদের জন্যে একটা বড় ঘটনা। কিন্তু তার চেয়েও বড় ঘটনা হলো, এ গুপ্তধন পাওয়ার জেদ যখন ওদের মাথায় চেপে বসেছে, তখন আমরা শান্তিতে থাকতে পারবো না। যে কোন সময় যে কোন ঘটনা ওরা ঘটাতে পারে। এর থেকে বাঁচার পথ বাড়ি-ঘর সব ছেড়ে চলে যাওয়া। কিন্তু………..!’
কান্নায় ভেঙে পড়ল ওভানডোর মা।
ওভানডোর মা কাঁদছে। আর অন্য সবার চোখে-মুখে ছড়িয়ে পড়েছে আতংক।
‘এভাবে ভেঙে পড়ো না আম্মা। দেখ ওদের কথা আমি শুনেছি, শুনেও কিন্তু ঠিক আছি’। বলল ওভানডো।
‘ঠিক থাকবি কি করে? আসলেই মহাবিপদ আমাদের উপরে। আমার ভয় হচ্ছে, ওরা দরকার হলে আমাদের গোটা পরিবারকেই ধ্বংস করবে’। বলল ওভানডোর মা।
ওভানডোর মা’র কথা এবার ওভানডোকেও উদ্বিগ্ন করে তুলল। বুঝল তার মা’র ভেঙে পড়ার মধ্যে যুক্তি আছে। মায়ের কথার উত্তরে কি বলবে ওভানডো তা খুঁজে পাচ্ছিল না।
এ সময় কাজের মেয়ে এসে খবর দিল, ‘মেহমান ঘুম থেকে উঠেছেন। ডাকছেন।
লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল ওভানডো।
ওভানডোর মাও উঠল। বলল, ‘চল আমিও যাব’।
ওভানডোর দাদীও তার হাতের লাঠিটা খাড়া করে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল, ‘চল আমরাও যাই। রাতে তো কথা বলা হয়নি’।
‘নাস্তা কি রেডি?’ কাজের মেয়েকে জিজ্ঞেস করল ওভানডোর মা।
‘হ্যাঁ রেডি’।
‘তাহলে টেবিলে দাও’। বলে ওভানডোর মা ওভানডোর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘যাও মেহমানকে নিয়ে এস।নাস্তা করে কথা বলা যাবে’।
ওভানডো চলে গেল মেহমানখানার দিকে। ওভানডোর মা চলল নাস্তার টেবিলের দিকে।
নাস্তা শেষে সবাই এসে ওভানডোদের ফ্যামিলি ড্রইংরুমে বসল।
ওভানডোর দাদী সোফায় আহমদ মুসার পাশে বসতে বসতে বলল, ‘ভাই, রাতেও তুমি মুরগী, খাসি কিছুই খাওনি। শুধু ডিম খেয়েছ। এখনও শুধু ডিম আর ব্রেডই খেলে। সবজিও খেলে না। কারণ কি বলত?’
আহমদ মুসাকে একটু বিব্রত দেখাল। বলল, ‘স্যরি দাদী আপনাদের বিপদে ফেলেছি। কিন্তু কি করব, আমাদের ধর্মের বিধান হলো, আল্লাহর নাম নিয়ে জবাই করা নয় এমন গোশত খাওয়া যাবে না। সাধারণত আমেরিকান দেশগুলোতে সবজিতে শুকরের গোশত ব্যবহার করে। এজন্যে আমি সবজি খাওয়া এড়িয়ে গেলাম’।
‘তুমি আগে বলনি কেন ভাই?’ বলল ওভানডোর দাদী।
হাসল আমদ মুসা। বলল, ‘খুবই ছোট একটা ব্যাপার জানিয়ে আপনাদের কষ্ট দেয়া আমি ঠিক মনে করিনি’।
‘কিন্তু নিজেকে কষ্ট দেয়া ঠিক বুঝি’।
বলেই ওভানডোর দাদী প্রসংগ পরিবর্তন করে বলে উঠল, ‘তোমাদের ঐ বিধানের তাৎপর্য কি বলত?’
আহমদ মুসা গম্ভীর হলো। বলল, ‘দু’ এক কথায় এর জবাব দেয়া মুশকিল। স্রষ্টা ও সৃষ্টির সম্পর্ক, সৃষ্টির পেছনে স্রষ্টার উদ্দেশ্য, স্রষ্টার প্রতি সৃষ্টির দায়িত্ব ইত্যাদি অনেক কথা বলতে হয়। সংক্ষেপে এটুকু বলতে পারি, সব কিছু আল্লাহর সৃষ্টি। এক সৃষ্টির অধিকার নেই আরেক সৃষ্টিকে হত্যা করার। তা করতে পারা যায় শুধু আল্লাহর বিধান অনুসারে। সে বিধান হলো, এক সৃষ্টিকে আরেক সৃষ্টির জন্য হালাল করা। আল্লাহ মুরগী, খাসি, গরু মানুষের জন্যে হালাল করেছেন। মানে খেতে বলেছেন। সুতরাং ওগুলো মানুষ জবাই করে খেতে পারে। কিন্তু জবাই করতে হবে আল্লাহর নাম নিয়ে, অর্থাৎ আল্লাহর বিধানকে স্মরণ করে’। তাহলেই জবাই বৈধ হবে, খাওয়াও বৈধ হবে’।
‘চমৎকার, চমৎকার দাদী’। বলল লিসা।
‘আমার মুখের কথা কেড়ে নিয়েছিস লিসা। আমি ওকথা বলতে যাচ্ছিলাম’। বলে লিসার দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে আহমদ মুসার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ভাই তুমি জান না, তুমি কি সাংঘাতিক কথা বলেছ। আমার এখন কি মনে হচ্ছে জান, এতদিন আমাদের গোশত খাওয়াটা অবৈধ হয়েছে। যাক আল্লাহকে স্মরণ করার মন্ত্রটা তুমি শিখিয়ে দিও’।
বলে একটু থামল। তারপরে আবার বলল, ‘তুমি বোধ হয় খুব ধর্ম পালন কর ভাই?’
‘হ্যাঁ দাদী। আল্লাহর নাম স্মরণ না করলে যেমন গোশত খাওয়া অবৈধ হয়ে যায়, তেমনি ধর্ম না মানলে মানুষের জীবন অবৈধ ও ক্ষতির পথে পরিচালিত হয়’। বলল আহমদ মুসা।
আহমদ মুসা কথা শেষ করল।
কিন্তু সংগে সংগে কোন উত্তর দিতে পারলো না ওভানডোর দাদী। হা করে তাকিয়ে থাকল আহমদ মুসার দিকে। তার চোখে-মুখে বিষ্ময়। বলল কিছুক্ষণ সময় নিয়ে, ‘তোমার কথার তাৎপর্য অনুভব করতে পারছি, বোঝার জন্যে যুক্তি খুঁজে পাচ্ছি না। একটু বুঝিয়ে বলতে পার?’
‘এখানেও অনেক কথা বলতে হবে। বিষয়টা সংক্ষেপে এভাবে বলা যায় যে, শান্তি না থাকার অর্থ অশান্তি, সুখ না থাকলে দুঃখের সৃষ্টি হয়, সমাজ-সম্পর্ক বিপর্যস্ত হলে মানুষের জীবন সংকট হয়, মানুষের জীবনধারা অসুস্থ হলে অন্যায়, অবিচার ইত্যাদির সৃষ্টি হয়। আর মানুষের জীবনধারা অসুস্থ হয়, মানুষের সমাজ-সম্পর্ক বিপর্যস্ত হয় এবং মানুষের শান্তি সুখ ধ্বসে পড়ে তখন, যখন আল্লাহর সার্বভৌমত্ব অস্বীকার করে, তার দেয়া বিধান বা ধর্ম উপেক্ষা করে কোন মানুষ নিজে প্রভূ সেজে বসে এবং অপরাপর মানুষকে তার স্বার্থের শিকার হিসেবে গণ্য করে। মানুষের এই স্বেচ্ছাচারিতাই সকল অন্যায়, অবিচার, চুরি, ডাকাতি, হত্যা, লুন্ঠন, আত্মসাৎ ইত্যাদি অপরাধের মূল উৎস। সুতরাং যে সমাজ ও যে মানুষ ধর্মের বিধান মেনে চলবেনা, সে মানুষ ও সে সমাজ ক্ষতি ও ধ্বংসের পথে পরিচালিত হবে’।
থামল আহমদ মুসা।
ওভানডোর দাদীসহ সকলের চোখে-মুখে স্তম্ভিত দৃষ্টি।
আহমদ মুসার উপর পলকহীন চোখ রেখে ওভানডোর দাদী বলল, আসলেই কি তুমি একজন ধর্ম প্রচারক ভাই? কিন্তু তাই বা কি করে বলি? গত রাতে তুমি নাকি দু’ডজন লোক হত্যা করেছ, ওভানডোদের মুক্ত করেছ’।
‘কেন দাদী, যাঁরা ধর্ম মেনে চলে, তারা কি অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করে না!’ আর আমাদের ধর্মে ধর্ম প্রচারক বলে কোন গোষ্ঠী নেই। যারা ধর্ম মেনে চলে, তারা অন্যকেও ধর্ম মানাবার চেষ্টা করে। সুতরাং যে ধর্ম মেনে চলে সে ধর্মের প্রচারকও’। বলল আহমদ মুসা।
ওভানডোর দাদী কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই বলে উঠল লিসা টেরেক, ‘আপনি ধর্মের যে রূপ তুলে ধরেছেন, সে রূপ সব ধর্মের নেই। যেমন আমাদের খৃষ্ট ধর্ম। তা থেকে আমরা আমাদের প্রাত্যাহিক জীবনের জন্যে কোন নির্দেশই পাই না’।
আহমদ মুসা লিসার দিকে মুখ ঘুরিয়ে নিল। বলল, ‘তোমার কথা ঠিক লিসা। তোমাদের কাছে মাফ চেয়ে বলছি, খৃষ্ট ধর্ম সর্বযুগের ধর্ম নয়। ঐ ধর্ম দুহাজার বছর আগের একটা সময়ের এক শ্রেণীর মানুষের জন্যে এসেছিল। এই ধর্ম সেই মানুষের জন্যে যথেষ্ট ছিল। কিন্তু এখন অচল হয়ে পড়েছে। পরবর্তীকালে ইসলাম এসেছে সর্বযুগের সকল মানুষের জন্যে। আধুনিক, উত্তর-আধুনিক সব মানুষের প্রয়োজন পূরণ করে ইসলাম’।
লিসার মুখে হাসি ফুটে উঠল। বলল, ‘আপনার সাজেশন আমি বুঝেছি। কিন্তু সব মানুষ কি ইসলাম গ্রহন করবে? আমরা না হয় আপনার চমৎকার ব্যাখ্যায় সব বুঝলাম, আপনি ক’জনকে……’।
‘লিসা এখন থাম, এ জটিল বিষয় নিয়ে পরে ওঁর সাতে আলোচনা করো’।
বলে একটু থামল ওভানডোর মা। তারপর আহমদ মুসার দিকে তাকাল। বলল, ‘বাছা, তোমাদের কথায় বাধা দেয়ার জন্য আমি দুঃথিত। এটা আমি করছি, কারণ তোমাকে কিছু কথা বলার জন্যে অস্থির হয়ে উঠেছি’।
‘কি কথা আম্মা, বলুন’। আহমদ মুসা বলল।
‘ঈশ্বর তোমার মঙ্গল করুন বাবা। তুমি আমার ছেলেকে উদ্ধার করেছ নিজের জীবন বিপন্ন করে। আমার বউমাকেও বাঁচিয়েছ। এর ফলে আমরা মরা দেহে প্রাণ ফিরে পেয়েছি। কিন্তু বাবা আমরা হাসবার সুযোগ পাচ্ছিনা। আরও গুরুতর বিপদ আমাদের উপর চেপে বসেছে’।
থামল ওভানডোর আম্মা।
‘ওরা আবার হামলা করবে, কিডন্যাপ করবে সেই চিন্তা করছেন?’ বলল আহমদ মুসা।
‘এই বিরান দুর্গের কোথাও জাহাজ বোঝাই সোনা এনে পুঁতে রাখা হয়েছে কিনা জানিনা। কিন্তু এই বিষয়টা যখন ওদের মাথায় ঢুকেছে, তখন আমাদের রক্ষা নেই। আমাদের গোটা পরিবারকে ধ্বংস করে হলেও ওরা শেষ দেখে ছাড়বে’। বলতে বলতে কান্নায় ভেংঙে পড়ল ওভানডোর মা।
আহমদ মুসার চোখে-মুখে একটা বিব্রত ভাব ফুটে উঠল।
‘আমার বৌমা ঠিকই বলেছে ভাই। আগে ছিল ওদের আমাদের উৎখাত করার টার্গেট। এবার প্রতিশোধ স্পৃহাও যোগ হলো।
গতরাতের প্রতিশোধ নিতে ওরা আসবে অবশ্যই। কিংবা আরও কোনভাবে প্রতিশোধ নিতে পারে’। বলল ওভানডোর দাদী।
আহমদ মুসা ভাবছিল। বলল, ‘ঠিক দাদীমা, ওরা এটা করতে পারে। পরাজয় ও ক্ষতির প্রতিশোধ ও ওরা নিবে। তবে ভয় পাবেন না। আল্লাহই সাহায্য করবেন’।
‘তুমি ক’দিন থাক বাবা। তাছাড়া তুমি অসুস্থ। ক’দিন বিশ্রামও নেয়া হবে’। বলল ওভানডোর মা।
‘কিন্তু আমাকে তো এখনি যেতে হবে’। বলল আহমদ মুসা চিন্তিত কন্ঠে।
‘কোথায়?’ বলল ওভানডোর মা।
‘আপনাদের সাবেক প্রধানমন্ত্রী আহমদ হাত্তা নাসুমনের মেয়ে সকাল দশটায় নামছে পারামারিবো বিমান বন্দরে। আমাকে সে সময় বিমান বন্দরে থাকতে হবে’। আহমদ মুসা বলল।
‘তোমার শরীরের এ অবস্থা নিয়ে?’ বিষ্ময় প্রকাশ করল ওভানডোর মা।
‘আমি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে এসেছি এয়ারপোর্টে হাজির থাকার জন্যে। আজ ২০ তারিখ সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে যদি আহমদ হাত্তার মেয়ে ফাতিমা নাসুমন ওদের হাতে ধরা না দেয়, তাহলে ওরা ফাতিমা নাসুমনের ভাবী স্বামী ওয়াং আলীকে হত্যা করবে। বাধ্য হয়ে ফাতিমা নাসুমনকে দেশে ফিরিয়ে আনা হচ্ছে। ওয়াং আলী……..’।
আহমদ মুসার কথায় বাধা দিল লিসা টেরেক। বলল, ‘আপনারা ফাতিমা নাসুমনকে ওদের হাতে তুলে দিবেন?’ লিসার কন্ঠে বিষ্ময়।
‘আমরা ফাতিমা নাসুমন ও ওয়াং আলী দুজনকেই বাঁচাতে চাই। ফাতিমা নাসুমনের পারামারিবো বিমান বন্দরে ল্যান্ড করার কথা ছিল আজ সন্ধ্যা ৬টায়। সন্ধ্যা ৬টায় সন্ত্রাসীদের গাড়ি অপেক্ষা করবে ফাতিমা নাসুমনের জন্যে। আমরা সময়টা এগিয়ে সকাল দশটায় এনেছি। শুরুতেই ফাতিমাকে ওদের হাতে তুলে দিতে চাই না’। বলল আহমদ মুসা।
‘এই যে বললেন ওয়াং আলী ও ফাতিমা নাসুমন দুজনকেই বাঁচাতে চান। তাহলে আবার ফাতিমা নাসুমনকে ওদের হাতে তুলে দেবার প্রশ্ন উঠছে কেন?’ বলল লিসা।
‘ফাতিমা নাসুমনকে ওদের হাতে তুলে দেয়া দরকার ওদের সন্ধান লাভের জন্যে। যাতে ফাতিমা নাসুমন ও ওয়াং আলী দু’জনকেই বাঁচানো যায়’। আহমদ মুসা বলল।
‘তাহলে আবার সন্ধ্যা ৬টার বদলে ফাতিমা নাসুমনকে সকাল ১০টায় আনছেন কেন? সন্ত্রাসীদের গাড়িতো সন্ধ্যা ৬টায় থাকবে ফাতিমার জন্যে!’
‘ফাতিমা নাসুমন যাতে আমাদের চোখের সামনেই ওদের হাতে পড়ে, সে জন্যেই এই ব্যবস্থা। সন্ধ্যা ৬টায় সন্ত্রাসীরাও বিমান বন্দরে থাকবে। বিমান বন্দরের ভেতর থেকেও ফাতিমাকে তারা কিডন্যাপ করতে পারে। তাহলে আমরা কিছুই জানতে পারবো না এবং তাদের ফলোও করতে পারবো না। তাতে ওদের দুজনকে বাঁচানো কঠিন হয়ে পড়বে। এ জন্যে আমরা ফাতিমাকে আগে নিয়ে আসছি। সন্ধ্যা ৬ টায় সে এয়ারপোর্টে আসবে। তখন আমরা ফাতিমার পেছনে পেছনেই থাকব’। আহমদ মুসা বলল।
‘বুঝতে পারছি বাছা, তুমি যাবে। কিন্তু আমাদের কি হবে’। বলল ওভানডোর মা উদ্বিগ্ন কন্ঠে।
ওভানডোর মা থামতেই ওভানডোর দাদী বলে উঠল, ‘তুমি কোথায় থাকছ ভাই? উঠেছো কোথায়?’
‘কোথাও থাকার সুযোগ পেলাম কই? পারামারিবোতে পেৌঁছার কিছুক্ষন পরই বেরিয়ে এসেছি। প্রথম তো ঘুমালাম আপনাদের এখানেই। আপনাদের সাবেক প্রধানমন্ত্রী রেস্টহাউস জাতীয় বাড়িতে তুলেছিলেন। আমাদের সাথে একজন বন্দী ছিলেন। কয়েক ঘন্টা ছিলাম সেখানে’। আহমদ মুসা বলল।
‘তাহলে ভাই আমাদের বাসাতেই থাক। আমরা সাহস পাব’। বলল ওভানডোর দাদী।
‘আমাদের একটা গাড়ি আপনার সাথে থাকবে। চলা ফেরায় কোন অসুবিধা হবে না’। ওভানডো বলল।
‘ঘটনা আমাকে কখন কোথায় নিয়ে যাবে, আমি জানি না। রাতে যদি ঘুমাবার সময় পাই, তাহলে আপনাদের এখানেই আসব’। বলল আহমদ মুসা।
‘ধন্যবাদ বেটা। মায়ের অনুরোধ তুমি শুনেছ। সত্যিই আমি আতংক বোধ করছি’। ওভানডোর মা বলল।
‘ওয়াংকে যারা কিডন্যাপ করেছে, ফাতিমা নাসুমনের পেছনে যারা লেগেছে, যারা দেশে একটা বিরাট রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি করেছে, তারা আপনাদের পেছনেও লেগেছে। এদের বিরুদ্ধে কাজ শুরু হয়েছে। আল্লাহর কাছে দোয়া করুন’। বলল আহমদ মুসা।
‘এরা তাহলে তো খুব বড় শক্তি! এরা কারা?’ জিজ্ঞেস করল ওভানডো।
‘কারা ঠিক জানি না। তবে তোমাদের সাবেক প্রধানমন্ত্রী হাত্তা নাসুমনের বিরুদ্ধে যে রাজনৈতিক জোট তৈরী হয়েছে, তাদের সাথে এদের যোগ রয়েছে’। আহমদ মুসা বলল।
‘রাজনৈতিক সংকটের কথা কি যেন বললেন?’ বলল ওভানডো।
‘এরা সুরিনামের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে নির্বাচন পিছিয়ে দিতে বাধ্য করেছে। আহমদ হাত্তার পক্ষের লোকদের ওরা ব্যাপকভাবে কিডন্যাপ করছে। ওরা আহমদ হাত্তার পক্ষের কাউকে নির্বাচনে দাঁড়াতে দিবে না। আহমদ হাত্তাকেও ওরা কিডন্যাপ করেছিল। ওদের হাত থেকে নিজেকে মুক্ত করে গত রাতে তিনি এখানে এসে পেৌঁছেছেন। এই সংকটের কথাই তোমাকে বলেছি’।বলল আহমদ মুসা।
‘জনগন ওদের এ ষড়যন্ত্র মানবে কেন? আমরা তো সকলে আহমদ হাত্তার সমর্থক’। বলল ওভানডো।
‘জনগণ জানতে পারলে তো? যেমন তোমরাও ব্যাপারটা জানতে না’।
‘আমরা এমনিতেই আহমদ হাত্তার পক্ষের’। বলল ওভানডো।
‘সব সময়?’ প্রশ্ন আহমদ মুসার।
‘শুধু তাঁকে নয়, সব সময় আমরা মুসলমানেদের সাথে আছি’। ওভানডো বলল।
‘কেন?’ প্রশ্ন করল আহমদ মুসা।
‘জানি না। আমি আমার আব্বাকে এ রকমই করতে দেখেছি। তবে আজ দাদীর কাছে এক মজার কথা শুনলাম। আমাদের ধ্বংস হওয়া দুর্গের মধ্যে নাকি একটা মসজিদ ছিল’। বলল ওভানডো।
‘মসজিদ ছিল?’ আহমদ মুসা বলল। চোখে-মুখে তার বিষ্ময়ের প্রকাশ।
প্রশ্ন করেই আহমদ মুসা একটু থেমে আবার বলল দাদীকে লক্ষ্য করে, ‘সত্যি দাদীমা? ওভানডো ঠিক বলছে?’
‘হ্যাঁ ভাই’। বলল ওভানডোর দাদী।
‘মসজিদটা নিশ্চয়ই এখন নেই। কি করে চেনা গেল মসজিদ?’ আহমদ মুসা বলল।
‘আমি চিনতে পারিনি’। বলে ওভানডোর দাদী দুর্গ দেখেতে গিয়ে যা ঘটেছিল, দাদী শ্বাশুড়ীর কাছে যা শুনেছিল সব বলল।
‘মসজিদের কোন চিহ্ন এখন নিশ্চয় নেই?’ আহমদ মুসার চোখে-মুখে আনন্দ। কন্ঠে ঝরে পড়ল অপার আগ্রহ।
‘গোটা দুর্গের মধ্যে মসজিদের দেয়ালেরই কিছুটা এখনও দাঁড়িয়ে আছে, মেঝেও অক্ষত আছে’। বলল ওভানডোর দাদী।
‘এখনি মসজিদের ধ্বংসাবশেষটা দেখতে ইচ্ছা করছে। ভাবতে ইচ্ছা করছে সুরিনামের প্রাচীন ও একমাত্র দুর্গে এই মসজিদ এল কি করে?’ আহমদ মুসা বলল।
‘চলুন, এখনি চলুন। আমরা সবাই যাব’। বলল লিসা টেরেক।
আহমদ মুসা ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘না এখন আর সময় হবে না। আমাকে ৯টার মধ্যে বিমান বন্দরে পৌঁছাতে হবে। আহমদ হাত্তা নাসুমনের সাথে টেলিফোনে কথা হয়েছে। উনিও ৯-টার মধ্যে বিমান বন্দরে এসে পৌঁছবেন’।
কথা শেষ করেই আহমদ মুসা সবার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তাহলে আমাকে এখন উঠতে হয়’।
‘তাহলে আমিও তৈরী হয়ে নেই। আমি আপনাকে পৌঁছে দেব এয়ারপোর্টে’। বলল ওভানডো।
‘না ওভানডো, তোমার রেস্ট দরকার। তাছাড়া তোমার বাড়ি ছাড়া চলবেনা এখন’। আহমদ মুসা বলল।
ওভানডোর মুখ ম্লান হয়ে গেল। বলল, ‘আপনি কোন কিছুর আশংকা করেন?’
‘দিনের বেলা তেমন আশংকা করি না। তবে ওদের কেউ না কেউ যে কোনভাবে খোঁজ নিতে আসবে, এটা নিশ্চিত। ফেরিওয়ালা বা কোন প্রকার হোম সার্ভিসের ছদ্মবেশেও আসতে পারে’। আহমদ মুসা বলল।
ওভানডোসহ সবার মুখ উদ্বেগ-আতংকে ভরে গেল। কেউ কোন কথা বলল না। বলতে পারলো না।
আহমদ মুসাই আবার বলল, ‘ভয়ের কিছু নেই দিনের বেলা তেমন কিছু ঘটবে না বলে মনে করি। তবে আমার অনুরোধ কেউ একা শহরে বেরুবেন না। কথা দিচ্ছি ওদিকের কাজ শেষ হলেই আমি চলে আসব। আহমদ মুসা বলল।
মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল ওভানডোর মায়ের। বলল, ‘বাবা তুমি আমাদের জন্যে ঈশ্বরের সাহায্য। আমরা তোমার পথ চেয়ে থাকব’।
মায়ের কথা শেষ হতেই ওভানডো আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে বলল, ‘তাহলে একটা গাড়ি নিয়ে যান। অসুবিধা হবে না’।
‘দরকার হবে না ওভানডো। একটু হাঁটতে ভালই লাগবে। রাস্তায় উঠলেই গাড়ি পেয়ে যাব। আর যে গাড়ি নিয়ে আমরা গতকাল নিও নিকারী থেকে এসেছি, সে গাড়ি বিমান বন্দরে আমাদের জন্যে অপেক্ষা করবে’।
বলে আহমদ মুসা উঠতে যাচ্ছিল। ওভানডোর মা বাধা দিয়ে বলল, ‘একটু বস বাবা। সবই হলো, কিন্তু তোমার নাম পরিচয়টাই জানা হয়নি আমাদের’।
এক টুকরো হাসি ফুটে উঠল আহমদ মুসার ঠোঁটে। মুখ নিচু করে থাকল। তারপর বলল, ‘আমি একজন মানুষ। আপনাদের শুভাকাঙ্খী। এটুকু পরিচয় থাকলে চলে না?
‘কি বল বাবা, তোমার নাম ধরে ডাকবো না?’ তোমার বাড়ি-ঘরের কথা জানবো না?’ বলল ওভানডোর মা মিষ্টি হেসে।
‘নাম আমার একটা আছে। কিন্তু আমার তো সে রকম কোন বাড়ি ঘর নেই’। আহমদ মুসা বলল।
‘কি বল বাছা! অমন কথা মুখে এনো না। প্রাসাদ দরকার নেই। একটা ঠিকানা হলেই চলে’। বলল ওভানডোর মা।
‘অমন একটা স্থায়ী ঠিকানা তো আমার নেই আম্মা’। বলল আহমদ মুসা।
ম্লান হয়ে গেল ওভানডোর মায়ের মুখ।
‘এরপর কি বলবে ভাই যে, তোমার নামও নেই?’ মিষ্টি হেসে বলল ওভানডোর দাদী।
‘না দাদী তা বলব না, আমার নাম আহমদ মুসা’। হাসতে হাসতে বলল আহমদ মুসা। উঠেও দাঁড়াল সেই সাথে।
নাম শুনেই বিষ্ময় বিস্ফারিত চোখে লিসা ছুটে এল আহমদ মুসার সামনে। বলল দ্রুত কন্ঠে, ‘কিছুদিন আগে টার্কস দ্বীপপুঞ্জের ঘটনা এবং সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কিছু ঘটনা নিয়ে যার নাম পত্র-পত্রিকা ও টেলিভিশনে এসেছে সেই আহমদ মুসা আপনি?’
‘ধরে নাও তাই’। হাসি মুখে কথাটা বলেই আহমদ মুসা সবার উদ্দেশ্যে বলল, আসি আমি, দেরি হয়ে যাবে আমার’। তারপর ওভানডোকে বলল, ‘এস তুমি আমাকে একটু এগিয়ে দেবে’।
আহমদ মুসা পা বাড়াল ঘর থেকে বেরুবার জন্যে।
ঘরের সবাই নির্বাক। সবার চোখে বিষ্ময় ও অসংখ্য প্রশ্ন। ওভানডোর অবস্থাও তাই। আহমদ মুসার নির্দেশ পেয়ে সে মন্ত্রমুগ্ধের মত তার পেছন পেছন চলল।
ওভানডো তাদের স্টেটের গেট পর্যন্ত আহমদ মুসাকে এগিয়ে দিয়ে এল। গোটা রাস্তায় ওভানডো একটা কথাও বলতে পারেনি। শুধু শুনেছে অহমদ মুসার কথা। নাম শুনে আহমদ মুসাকে সে চিনতে পারেনি। পরে লিসার কথা শুনে তার মনে পড়েছে আহমদ মুসার কথা। টার্কস দ্বীপপুঞ্জে যে ইতিহাস সৃষ্টি করেছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যে ঐতিহাসিক কান্ড ঘটাল সেই আহমদ মুসা ইনি, তার পাশে, তার বাড়িতে? এ কথা মনে আসতেই তার বাকরোধ হয়ে যাচ্ছে।
আহমদ মুসাকে বিদায় দিয়ে ফিরে এসে ওভানডো ঘরে ঢুকতেই লিসা ছুটে তার সামনে গিয়ে বলল, ‘ভাইয়া উনি আর কিছু বলেছেন?’
‘অন্য বিষয়ে বলেছেন। তার বিষয়ে শুধু বলেছেন, তাঁর সুরিনামে আসার ব্যাপারটা এই মুহূর্তে কাউকে না জানাতে’।
বলে ওভানডো ধপ করে বসে পড়ল সোফায়। বলে উঠল, ‘আজ বুঝতে পারছি, আমাকে যেভাবে উদ্ধার করেছেন, যেভাবে জ্যাকিকে বাঁচিয়েছেন, তা আহমদ মুসা বলেই সম্ভব হয়েছে। ঈশ্বর সবচেয়ে বড় সাহায্যটাই আমাদের জন্যে পাঠিয়েছেন। আমার আর কোন ভয় নেই’।
লিসা ওভানডোর পাশে বসতে বসতে বলল, ‘ভয় নেই বলছ কেন ভাইয়া?’
‘কারণ আহমদ মুসা বলেছেন ভয় নেই’। বলল ওভানডো।
‘আমার বিশ্বাস হতে চাচ্ছে না ভাইয়া যে, আহমদ মুসা আমাদের বাসায় এসেছিলেন, রাতে আমাদের বাসায় ঘুমিয়েছেন এবং এখন তিনি আমাদের সবার সামনে দিয়ে চলে গেলেন। সবই স্বপ্ন বলে মনে হচ্ছে। জানো ভাইয়া, পরশু আমাদের সেমিনার ক্লাসে সমসাময়িক ঘটনার আলোচনায় আহমদ মুসার প্রসঙ্গ উঠেছিল। আমাদের ভিসি স্যার তার সমাপনী বক্তব্যে বলেছিলেন, বিপ্লব যে কল্যাণের হতে পারে, বিপ্লবীর বুলেট যে মঙ্গলের হতে পারে, বিপ্লবী যে মহান মানবতাবাদী হতে পারেন, বিশ্বব্যাপী অসংখ্য ঘটনায় আহমদ মুসা তা প্রমাণ করেছেন’।
‘আমার এখন ভয় করছে, এত বড় বিশ্ব ব্যক্তিত্বকে কোথায় রাখবো। তিনি আসতে চেয়েছেন, অবশ্যই আসবেন’। আবেগ ঝরে পড়ল ওভানডোর কন্ঠে।
‘কি যে বলছিস! আমি তো দেখছি ও শান্ত, সুন্দর, লাজুক এক ছেলে আমার। থাকা, খাওয়া নিয়ে কোন চাওয়া নেই, অহংকার নেই। আমাদের অসুবিধা হবে ভেবে তার অসুবিধার কথা আমাদের জানতে দেয়নি। ওভানডো তুই তো এমনটা কোনদিনই পারবি না’। বলল ওভানডোর মা।
‘তুমি ঠিকই বলেছ বউমা, সামান্য সময়েই সে আমার শতবছর পরিচয়ের নাতি হয়ে গেছে। এক নিমিষে যে অমনভাবে মিশে যেতে পারে, সে বড়ত্বহীন খুব বড় মানুষ। তাকে নিয়ে ভাবছিস ওভানডো!’ ওভানডোর দাদী বলল।
‘কিন্তু দাদী আমার খুব ভয় করছে। আমরা না কোন ভূল করে বসি, কোন অমর্যাদা হয়ে যায় তাঁর। উনি কোন গোশতই খান নি আল্লাহর নাম নিয়ে জবাই করা নয় বলে। এটার আমরা কি করব?’ বলল জ্যাকি, ওভানডোর স্ত্রী।
‘আমরা আল্লাহর নাম নিয়েই জবাই করতে পারি তো’। বলল ওভানডোর মা।
‘কিভাবে আল্লাহর নাম নিয়ে জবাই করলে খাওয়া যায় তাতো আমরা জানি না’। ওভানডো বলল।
‘ঠিক আছে, আহমদ মুসা আজ এলে তার কাছ থেকে শিখে নিয়ে জবাই করলেই হবে’। বলল ওভানডোর মা।
‘দেখেছ মা, ওঁর প্রার্থনাটা কত সুন্দর। আমরা শিখতে পারি না?’ লিসা বলল।
‘তাহলে মুসলমান হবে নাকি? উনি তো মুসলমান’। বলল জ্যাকি। তার মুখে হাসি।
‘আমরা তো মন্দির, গীর্জা কোথাও যাই না। ক্ষতি কি, মুসলমান হলে? তাহলে বাড়িতে বসেও তো প্রার্থনা করা যাবে। আর আমাদের দুর্গে তো এককালে মসজিদ ছিলই’। বলল লিসা।
‘ঠিক বলেছিস লিসা। ভাইটি আমার আসুক। বলব যে, মুসলমান হতে হলে কি কি করতে হবে আমাদের শিখিয়ে দাও’। বলল ওভানডোর দাদী।
‘তাহলেতো ভালই হবে দাদীমা। আহমদ হাত্তা নাসুমনদের সাথে এক জাতি হয়ে যাব আমরা’। ওভানডো বলল।
‘আর তাহলে তো আমি ফাতিমা নাসুমনকে বলতে পারব, আমিও মুসলমান’। বলল লিসা।
‘দুর্গের মসজিদটাকেও তো তাহলে আমরা নতুন করে গড়তে পারব’। ওভানডোর মা বলল।
বলেই ওভানডোর মা উঠে দাঁড়াল। বলল, ‘যাই ওদিকে অনেক কাজ পড়ে আছে’।
তার সাথে সাথে ওভানডোর স্ত্রী জ্যাকিও উঠে দাঁড়াল। বলল সে ওভানডোকে লক্ষ্য করে, ‘তুমি গিয়ে রেস্ট নাও’।
ওরা সবাই বেরিয়ে গেলে লিসা গিয়ে দাদীর পাশে বসে তার গলা জড়িয়ে ধরল।
‘কিরে তোকে তো খুব খুশি দেখাচ্ছে। ব্যাপার কি?’ বলল ওভানডোর দাদী নাতনীকে আরও কাছে টেনে নিয়ে।
‘ব্যাপার কি আবার? ভাইয়া উদ্ধার পেয়েছে, ভাবী রক্ষা পেয়েছে। তুমি খুশি হওনি?’ লিসা বলল।
‘কিন্তু তোর খুশিতে লাল রং দেখছি’।
‘তোমার চশমা আবার বদলাতে হবে দাদী’।
‘আমার নতুন ভাইটিকে কেমন দেখলিরে? নাত জামাই…..’।
লিসা তার দাদীর কথা শেষ হতে দিল না। দাদীর মুখে আঙুল চাপা দিয়ে বলল, ‘যাকেই দেখ সেই তোমার নাত জামাই হয়ে যায়, অন্তত এঁকে তুমি রক্ষা কর’।
লিসার দাদী মুখ থেকে লিসার হাত সরিয়ে দিয়ে বলল, ‘কেন? আমার নাতনি কম কি! তার জন্যে সবচেয়ে ভালটাই আমি চাই’।
লিসা তার দাদীর দুই হাত জড়িয়ে ধরে বলল, ‘তোমার হাত ধরে অনুরোধ করছি দাদী, তোমার পাগলামী যেন ওঁর কান পর্যন্ত না যায়। তুমি জান না তোমার নাতনীর মত লক্ষ নাতনী জোড়া দিলেও তাঁর সমান হবে না। তাঁকে তুমি অপমান করো না দাদী’।
‘তুই আমার এ ভাইটিকে চিনতেই পারিস নি। এক নিমিষে আমি তাকে শত বছরের চেনা চিনেছি’। বলল দাদী হাসতে হাসতে।
দাদীকে ছেড়ে দিয়ে এক ঝটকায় উঠে দাঁড়াল লিসা। বলল, দাদী তুমি যদি এই কথা দ্বিতীয় বার আর কারো কাছে বল, তাঁর যদি কানে যায়, তাহলে জেনো এক দন্ড আর এ বাড়িতে থাকব না আমি’।
বলে মধ্যমা আঙুলের একটা গাট্টা দাদীর মাথায় মেরে ছুটে বেরিয়ে গেল লিসা।

সুরিনাম নদীর উত্তর তীরে নদীটির একমাত্র ব্রীজের পশ্চিম পাশে সুরিনাম হাইওয়ের গা ঘেঁষে বিশাল এলাকা জুড়ে পার্লামেন্ট কমপ্লেক্স। এখানে পার্লামেন্ট ভবন ছাড়াও আছে এমপিদের হোস্টেল, প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী ও সিনিয়র সেক্রেটারিয়েট স্টাফদের বাড়ি এবং প্রধান সেক্রেটারিয়েট ভবন।
তখন সকাল সাড়ে দশটা।
প্রেসিডেন্ট ভবনের ফ্যামিলি গাড়ি বারান্দাটা নদীর গা ঘেষে।
জনসাধারণের জন্যে এটা নিষিদ্ধ এলাকা। প্রেসিডেন্ট ভবনের অফিসিয়াল অংশ হলো সুরিনাম হাইওয়ে সংলগ্ন পূর্ব দিকে।
ফ্যামিলি গাড়ি বারান্দার ঠিক উপরে দুতলায় ফ্যামিলি ড্রইংরুম।
রুদ্ধ দ্বার ড্রইংরুম।
ড্রইংরুমে কথা বলছে তিনজন লোক। একজন জুলেস মেনডেল, সুরিনামের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রেসিডেন্ট। অন্যজন রোনাল্ড রঙ্গলাল, সুরিনাম পিপলস কংগ্রেস (এসপিসি)-এর সভাপতি। আর তৃতীয় জন হলেন দক্ষিণ আমেরিকার চরমপন্থী হিন্দু সংগঠন ‘মায়ের সূর্য সন্তান’(মাসুস)-এর সুরিনাম শাখার সভাপতি তিলক লাজপত পাল।
তিনজনই ভয়ানক গম্ভীর।
কথা বলছিল রোনাল্ড রঙ্গলাল। বলছিল, ‘আমাদের সব আশা দেখি গুড়ে বালি হবার পথে। রিপাবলিকান পার্টির একটা সূত্র থেকে খবর পাওয়া গেল আহমদ হাত্তা নাসুমন গত রাতে পারামারিবোতে পৌঁছেছেন। আগামীকাল নমিনেশন পেপার সাবমিটের মাধ্যমে ভোটে দাঁড়াবার সব প্রস্তুতি তিনি নাকি নিচ্ছেন। দেশের সব এলাকায় নাকি খবর পাঠানো হচ্ছে প্রত্যেক নির্বাচনী এলাকার সম্ভাব্য সব প্রার্থীকে নমিনেশন পেপার সাবমিট করার জন্যে। পরে বাছাই করে একজনকে মনোনয়ন দেয়া হবে। দশটার দিকে টেলিফোন পেলাম, আজ সকাল দশটার দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে পোর্টেরিকো হয়ে যে ফ্লাইট আসছে, তার যাত্রী তালিকায় এফ. নাসুমন নামে একটা মেয়ের নাম আছে। মনে করা হচ্ছে ফাতিমা নাসুমন এই ফ্লাইটে পারামারিবো আসছে’।
থামল রোনাল্ড রঙ্গলাল। থেমেই সামনে থেকে গ্লাস টেনে নিয়ে ঢক ঢক করে এক গ্লাস পানি খেয়ে নিল।
এই ফাঁকে তিলক লাজপত পাল নড়ে-চড়ে বসে বলে উঠল, ‘ফাতিমা নাসুমন আসছে, এই খবরটুকুই দিয়েছে? আর কিছু বলেনি?’
পানি খেয়ে গ্লাসটা টেবিলে রেখে রোনাল্ড রঙ্গলাল বলে উঠল, ‘হ্যাঁ, এয়ারপোর্টের লোকেরা খবর পাঠাবার পরই আমাদের লোকরা ছুটে গেছে এয়ারপোর্টে। ফাতিমা যদি আসেই, তাহলে তাকে ওখান থেকে কিডন্যাপ করা হবে’।
‘হ্যাঁ, এটা খুব দরকার। তাহলে আহমদ হাত্তাকে জব্দ করার একটা পথ হবে। ওয়াং আলী আমাদের হাতে তো রয়েছেই’। বলল তিলক লাজপত পাল।
‘কিন্তু পরিস্থিতি তো পাল্টে যাচ্ছে মি. পাল। কোরাজ নদীর কাছে সিকিমা এলাকায় যে শক্ত ঘাঁটি আমরা পেয়েছিলাম তার পতন ঘটেছে। ওখানে আমাদের বারজন লোকের সবাই খুন হয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগের ব্যাপার হলো, পশ্চিম নিও নিকারীর পঁচিশজন মুসলিম যুবককে সিকিমা হ্রদে নিয়ে যাচ্ছিল। যারা ওদের নিয়ে যাচ্ছিল তাদের দুজনের লাশ পাওয়া গেছে আমাদের সিকিমা ঘাঁটির নিচের সমতলে। অপর দুজনের কোন সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না, আর সেই পঁচিশজন যুবক নিও নিকারীর দিকে গেছে বলে খবর পাওয়া গেছে’। বলল রোনাল্ড রঙ্গলাল।
তিলক লাজপত পালের মুখ অন্ধকার হয়ে গেছে। বলল সে, ‘আমাদের চারজনের অপর দুজন ওদের হাতে ধরা পড়েছে। আমাদের সিকিমা ঘাঁটির নিচের সমতলে একটা নোটবুক কুড়িয়ে পাওয়া গেছে। নোট বুকটি ওদের হাতে গড়া গায়ানার নিকি এমবার’।
‘ওরা কারা, যারা এই সর্বনাশ ঘটাল?’ আমাদের দুজনের কাছ থেকে তো ওরা সব জেনে নেবে’। বলল রোনাল্ড রঙ্গলাল। তার কন্ঠে উদ্বেগ।
‘ওরা কারা জানতে পারলে তো ল্যাঠাই চুকে যেত। দেখে নিতাম তাকে। তবে ঐ দুর্গম অঞ্চলে কে যাবে। আমার যতদূর মনে হয় স্থানীয় কেউ বা কিছু লোক সুযোগ বুঝে এই কাজ করেছে’। বলল তিলক লাজপত পাল।
‘আপনি বিষয়টাকে যত সহজ করে দিলেন, বিষয়টা কি অতই সহজ? বলুন তো গত রাতে আমাদের অত লোককে খুন করে দূর্ভেদ্য স্থান থেকে ওভানডোকে মুক্ত করে নিয়ে গেল কে? মাত্র একজন এসে এতবড় কান্ড ঘটিয়ে গেছে বটে, কিন্তু সে অবশ্যই একা নয়। এদেরকে ছোট করে দেখা যায় না’। বলল রোনাল্ড রঙ্গলাল।
সে থামতেই তিলক লাজপত পালের মোবাইল বেজে উঠল।
মোবাইল তুলে নিল তিলক লাজপত পাল। কথা শুরু করল হাসি মুখে। কিন্তু ওপারের কথা শুনে মুহূর্তেই তার মুখে অমাবস্যার অন্ধকার নেমে এল। সব কথা শুনে মোবাইল রাখতে রাখতে সে বলল, ‘আরেকটা উদ্বেগজনক খবর। ওভানডোর স্ত্রীকে ধরার জন্যে দুগাড়ি লোক পাঠানো হয়েছিল। ওরা কেউ ফিরে আসেনি এবং কোন খবরও দেয়নি’। শুষ্ক কন্ঠ লাজপত পালের।
‘কি বলছেন মি. লাজপত। দশ বারো জন লোক হাওয়া হয়ে গেল? খোঁজ নেবার জন্যে ওখানে লোক যায়নি?’ বলল রোনাল্ড রঙ্গলাল উদ্বিগ্ন কন্ঠে।
‘ফল বিক্রেতার ছদ্মবেশ একজন লোককে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু স্টেটের ভেতরে গিয়ে অস্বাভাবিক সে কিছুই দেখেনি। স্টেটের চাকর-বাকর স্টেটের জমিতে কাজ করছে। তারাও স্বাভাবিক। থানা ও হাসপাতালেও খোঁজ নেয়া হয়েছে। নগরীতে কোন দুর্ঘটনা ঘটেনি। আমাদের মন্দিরের হত্যাকান্ড ছাড়া নগরীতে কোন হত্যাকান্ডের ঘটনাও ঘটেনি। ওভানডো বাড়িতে ফিরে আসার ঘটনা পুলিশ জানে। কিন্তু ও বাড়িতে গতরাতে কিছু ঘটার কথা পুলিশ বলেনি’। বলল লাজপত পাল উদ্বিগ্ন কন্ঠে।
সোফায় ঠেস দিয়ে বসল রোনাল্ড রঙ্গলাল। তার চোখে-মুখে হতাশা।
দীর্ঘ নিরবতা ভেঙে প্রেসিডেন্ট জুলেস মেনডেল বলল, ‘আপনারা কি ভাবছেন জানি না, তবে আমি মনে করছি সিকিমার ঘটনা এবং আহমদ হাত্তা ও ফাতিমা নাসুমনের ফিরে আসার ঘটনা পরস্পর বিচ্ছিন্ন নয়। এখন ওভানডো উদ্ধার হওয়া ও ওভানডোর বাড়িতে পাঠানো দুগাড়ি মানুষ গায়েব হয়ে যাওয়ার ঘটনাকে আগের তিন ঘটনার সাথে জোড়া দেয়া যায় কিনা দেখুন’।
প্রেসিডেন্ট থামতেই রোনাল্ড রঙ্গলাল বলে উঠল, ‘আগের তিন ঘটনাকে এক সাথে জুড়ে দেয়া যায়। তবে ওভানডো ও ওভানডোর বাড়ি কেন্দ্রিক ঘটনা মনে হয় বিচ্ছিন্নই। ওভানডোদের পরিবার একেবারে অরাজনৈতিক’।
থামল রোনাল্ড রঙ্গলাল। সঙ্গে সঙ্গেই কথা বলে উঠল লাজপত পাল। বলল, ‘আমার মনে হয় ওভানডোর আলোচনা এখন থাক। দুগাড়ি মানুষকে গায়েব করার সাধ্য ওভানডো পরিবারের নেই। সে দুগাড়ি মানুষ কোথায় গেল, ওভানডো মুক্ত হলো কিভাবে এ বিষয়টা আমরা পরে দেখব। যে কোন সময় আমরা হাতে টিপে মারতে পারি ওভানডেো পরিবারকে। আজ রাতে সময় হলে আমি নিজেই আরেক অভিযানে নেতৃত্ব দেব। এ বিষয়টা থাক। এখন আমরা আহমদ হাত্তার আলোচনায় আসি। কালকে নমিনেশন পেপার সাবমিটের গুরুত্বপূর্ণ দিন। যা সিদ্ধান্ত নেয়ার আজকেই নিতে হবে’।
থামল লাজপত পাল।
সংগে সংগে কেউ কথা বললো না। সবাই ভাবছে।
নিরবতা ভাঙল স্বয়ং প্রেসিডেন্ট। বলল, ‘মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর থেকে একটা নোট পেয়েছি। নোটে তারা বলেছে, ‘সুরিনামের সাবেক প্রধানমন্ত্রী আহমদ হাত্তা নাসুমনকে তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটা বাড়ি হতে বন্দী অবস্থা থেকে উদ্ধার করে।বাড়িটা ইহুদী গোয়েন্দা ও ভারতীয় আমেরিকানদের একটা সংস্থার নিয়ন্ত্রণে ছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মনে করে সুরিনামের কোন রাজনৈতিক পক্ষের স্বার্থে ওরা তাঁকে ওভাবে বন্দী করে রাখে’। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই নোটের ভাল মন্দ দুটি দিক আছে। মন্দ দিক হলো, আহমদ হাত্তার যাই ঘটুক, সে ব্যাপারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটা আগ্রহ থাকবে আর ভাল দিক হলো, আহমদ হাত্তার যাই ঘটুক, তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে নতুন বলে মনে হবে না। তারা মনে করবে, পুরনো সেই রাজনৈতিক বৈরিতা থেকেই ঘটনাটা ঘটেছে। এই দিকটা সামনে আনার পর আমি যে কথাটা বলতে চাচ্ছি তা হলো, আহমদ হাত্তা নতুন করে পাবলিক প্ল্যাটফর্মে যাবার আগেই যা করার তা করতে হবে। মানুষের একটা মোটামুটি বিশ্বাস দাঁড়িয়েছে যে, আহমদ হাত্তা নিখোঁজ নয় নিহতই হয়েছে। এই অবস্থার সুযোগ নেয়া। আহমদ হাত্তা যদি নতুন করে আবার জনগণের কাছে যাবার সুযোগ পায় এবং জনগণকে তার উপর নির্যাতন ও বন্দী জীবনের কাহিনী বলতে পারে, তাহলে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি তার আরও অনুকুলে চলে যাবে। তার ফলে বিপুল ভোটাধিক্যে বিজয়ের পথ তার জন্যে পরিষ্কার হয়ে যাবে। তাতে আমার ও আপনাদের সবারই রাজনৈতিক সমাধি রচিত হবে। সে ক্ষমতায় আসতে পারলে তার উপর নির্যাতনের শোধ সে সুদে আসলে গ্রহণ করবে’।
থামল প্রেসিডেন্ট জুলেস মেনডেস।
আবার নিরবতা।
এ নিরবতা ভেঙে রোনাল্ড রঙ্গলাল বলল, ‘মি. লাজপত, এসব ব্যাপারে আমরা আপনার উপরই নির্ভর করি বেশি। বলুন আপনি কি ভাবছেন?’
তিলক লাজপত পাল সোজা হয়ে সোফায় বসল। বলল, ‘আমার কথা হলো, আগামীকাল তাকে কোন মতেই নমিনেশন পেপার সাবমিট করতে দেয়া যাবে না’।
‘কিভাবে?’ বলল রোনাল্ড রঙ্গলাল।
‘আজ দিন ও রাতের মধ্যে তাকে জীবিত অথবা মৃত আমাদের হাতে আনতে হবে। তাকে যদি না পাওয়া যায়, তাহলে কাল নির্বাচন অফিস আমাদের ঘেরাও করে রাখতে হবে। সে ওখানে পৌঁছার সাথে সাথে পাকড়াও করতে হবে। আর আজ ও আগামীকাল নমিনেশন পেপার ফাইলের পূর্ব পর্যন্ত সে যাতে কোন পাবলিক প্রোগ্রামে না যেতে পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে চারদিকে পাহারা বসাবার মাধ্যমে। এবং সব শেষ কাজটি হলো, সে যে সুরিনামে ফিরেছে এ ধরনের কোন নিউজ যেন আগামীকালের পত্রিকায় না যায়’। বলল তিলক লাজপত পাল’।
‘ধন্যবাদ মি.লাজপত। আমাদের এগুবার একটি সুন্দর পথ আপনি বের করেছেন’।
কথাটা বলে রোনাল্ড রঙ্গলাল তাকাল প্রেসিডেন্টের দিকে। বলল, ‘মি. প্রেসিডেন্ট, মি. লাজপতের অভিমত সম্পর্কে আপনি কি ভাবছেন?’
‘মি. লাজপত যা বলেছেন তার বাইরে কোন পথ খোলা নেই। প্রশ্ন হলো এর বাস্তবায়ন কিভাবে? আমি এই সহযোগিতা করতে পারি যে, আপনাদের পাশাপাশি আমাদের গোয়েন্দা বিভাগের একটা বিশ্বস্ত অংশকে কাজে লাগাব তাকে খুঁজে বের করার জন্যে। পত্র-পত্রিকায় তার প্রত্যাবর্তনের নিউজ যাতে না বের হয়, সে চেষ্টা আপনারাও করবেন, আমাদের গোয়েন্দা বিভাগও করবে। আর কাল নমিনেশন পেপার সাবমিটের সময় আপনারা যাই করুন, আমাদের পুলিশ সেদিকে তাকাবেনা’।
থামল প্রেসিডেন্ট।
রোনাল্ড রঙ্গলাল খুশিতে দু’চোখ উজ্জ্বল করে বলল, ‘ধন্যবাদ মি. প্রেসিডেন্ট। আপনার ঐটুকু সাহায্য পেলেই আমাদের চলবে’।
‘আরেকটা কথা আমরা আহমদ হাত্তাকে নমিনেশন পেপার সাবমিট করা থেকে বিরত রাখতে পারলেও তার দলের লোকেরা নমিনেশন পেপার সাবমিট করেই ফেলবে। নমিনেশন পাওয়া নির্দিষ্ট কেউ থাকলে সেটা রোধ করার চেষ্ট করা যেত। কিন্তু তাতো হচ্ছে না। যেহেতু অনেকেই নমিনেশন পেপার ফাইল করতে আসবে, কাকে আমরা বাধা দেব’। বলল তিলক লাজপত পাল।
‘দরকার নেই কাউকে বাধা দেওয়ার। আহমদ হাত্তা যদি নমিনেশন পেপার ফাইল করতে না পারে, তাহলে ওরা এমনিতেই পালিয়ে যাবে’। বলল রোনাল্ড রঙ্গলাল।
‘ঠিক বলেছেন মি. রঙ্গলাল’। বলল প্রেসিডেন্ট।
‘আজ অনেক কাজ আমাদের। উঠতে পারি আমরা এখন’। বলল রঙ্গলাল।
‘ধন্যবাদ আপনাদের’। বলল প্রেসিডেন্ট।
প্রেসিডেন্ট উঠে দাঁড়াল।
সাথে সাথে সবাই উঠে দাঁড়াল।
ড্রইং রুম থেকে বেরুতে বেরুতে প্রেসিডেন্ট বলল, ‘ওভানডোদের ব্যাপারটা আমাকে উদ্বিগ্ন করেছে। ওভানডোর উদ্ধার এবং দুগাড়ি লোক উধাও হওয়া খুব বড় ঘটনা। দেখি আমিও চেষ্টা করব আমার অফিসিয়াল চ্যানেলে ঘটনা কি তা জানার জন্য’।
‘ধন্যবাদ প্রেসিডেন্ট। আমরা আপনার কাছে কৃতজ্ঞ থাকব’। বলল রোনাল্ড ও লাজপত পাল দুজনেই।
হাসল প্রেসিডেন্ট। বলল, ‘আমিও বিনা লাভে কিছু করছি না। আপনারা দেশ পাবেন, আর আমি পাব প্রেসিডেন্টের স্থায়ী চেয়ার। আমার পাওনাটাও খুব ছোট নয়’।
হেসে উঠল তিনজনই।

ডিপারচার লাউঞ্জের কারপার্কে প্রচুর গাড়ি।
সামনের সারিতে পাশাপাশি দুটি গাড়ি। একটা গাড়ি দামী জাপানী পাজেরো, তাতে শেড দেয়া কাঁচ। আরেকটা লেটেস্ট মডেলের আমেরিকান ট্যাক্সি।
পাজেরোর পেছনের সিটে বসে আছে আহমদ হাত্তা নাসুমন। আর ড্রাইভার তার সিটে। ফাতিমা নাসুমন এলে এই গাড়িতেই উঠবে।
ট্যাক্সিটায় ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে শিখের পোশাক পরা আহমদ মুসা। তার পাশে দাঁড়িয়ে জোয়াও বার্নারডো, ট্যাক্সির মালিক যার কাছ থেকে ট্যাক্সিটি ভাড়া নিয়েছিল আহমদ মুসা।
আহমদ মুসা, আহমদ হাত্তা নাসুমন, জোয়াও বার্নারডো সকলের দৃষ্টি ডিপারচার লাউঞ্জের গেটের দিকে।
প্লেন ল্যান্ড করেছে ৪৫ মিনিট হলো। অর্ধেকের বেশী যাত্রী বেরিয়ে গেছে। কিন্তু ফাতিমা নাসুমনের এখনো দেখাই নেই। সবার উদগ্রীব দৃষ্টি সন্ধান করছে ফাতিমা নাসুমনকে।
আহমদ মুসার ট্যাক্সির তিন চার গজ দূরে আর একটা প্রাইভেট কার। ডিপারচার লাউঞ্জ থেকে বেরিয়ে দুজন লোক গাড়িটার কাছে এল। দুজনের একজন তার হাতের ব্যাগ ড্রাইভারের হাতে দিয়ে গাড়ির দরজার দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বলল, ‘দেশটা দেখছি মগের মুল্লুকে পরিণত হয়েছে। প্রকাশ্য দিবালোকে সকলের চোখের সামনে একটা মেয়েকে এইভাবে হাইজ্যাক করল। পুলিশও কিছুই বলল না। একজন সাবেক প্রধান মন্ত্রীর মেয়ের যদি এই দুর্দশা হয় তাহলে সাধারণ মানুষ কোথায় যাবে!’
লোকটির সবগুলো কথাই আহমদ মুসার কানে গেল। তার বুকটা ছ্যাত করে উঠল। সাবেক প্রধান মন্ত্রীর মেয়ে? তাহলে কি…….।
আর চিন্তুা করতে পারল না আহমদ মুসা। ছুটে গেল লোকটির কাছে। বলল, ‘মাফ করবেন, কি বললেন আপনি, একজন সাবেক প্রধান মন্ত্রীর মেয়ে হাইজ্যাক হয়েছে? কোথ্থেকে? কোথায় ওরা?’
লোকটা গাড়ির দরজা খুলেছিল, সে ঘুরে দাঁড়াল। বলল, হ্যাঁ লাউঞ্জের ভেতর থেকে হাইজ্যাক হলো সাবেক প্রধানমন্ত্রী আহমদ হাত্তা নাসুমনের মেয়ে। সবাই দেখেছে। ঐ দেখুন তাকে স্ট্রেচারে করে রোগী সাজিয়ে মাইক্রোতে তুলছে। ঢেকে রাখা কাপড়টা তুললেই দেখা যাবে মেয়েটির মুখ ও হাত-পা বাঁধা’’।
লোকটির অংগুলি সংকেত অনুসরণ করে তাকিয়ে আহমদ মুসা মাইক্রোটি দেখতে পেল। স্ট্রেচার থেকে মেয়েটিকে গাড়িতে তোলা তখন হয়ে গেছে। স্ট্রেচারটি মাটিতে ফেলে দিয়ে পাঁচ ছয় জনকে গাড়িতে উঠতে দেখা গেল।
আহমদ মুসা ছুটল আহমদ হাত্তা নাসুমনের গাড়ির দিকে।
আহমদ মুসাকে আসতে দেখে আহমদ হাত্তা তাড়াতাড়ি গাড়ির দরজা খুলে ফেলল।
আহমদ মুসা একটু ঝুঁকে গাড়ির জানালায় মুখ নিয়ে বলল, ‘মি. হাত্তা, ফাতিমাকে ওরা লাউঞ্জের ভেতর থেকেই কিডন্যাপ করেছে। ওরা পালাচ্ছে। আপনি বাসায় ফিরে যান। আমি ওদের ফলো করছি। আল্লাহ ভরসা’।
বলে আহমদ মুসা আহমদ হাত্তার কোন উত্তরের অপেক্ষা না করে ঘুরে দাঁড়িয়ে ছুটল তার ট্যাক্সির দিকে।
ট্যাক্সির ড্রাইভিং সিটের দরজা খুলে উঠে বসতে বসতে বলল, ‘বার্নারডো তুমি আমার সাথে যেতেও পার, কিংবা তোমার হোটেলে আমার জন্য অপেক্ষা করতে পার’।
বলে আহমদ মুসা গাড়ির দরজা বন্ধ করে গাড়ি স্টার্ট দিল।
‘অবশ্যই আমি যাব’। বলে জোয়াও বার্নারডো ড্রাইভিং এর পাশের সিটে উঠে বসল।
মাইক্রোটি তখন কারপার্ক পার হয়ে রাস্তায় গিয়ে পড়েছে।
আহমদ মুসার গাড়ি ছুটল তার পেছনে।
এয়ারপোর্টটি পারামারিবো শহর থেকে উত্তর পূর্ব দিকে সাগর তীরের বিস্তৃত এলাকায়।
এয়ারপোর্ট থেকে একটা প্রশস্ত রাস্তা তীরের মত সোজা গিয়ে প্রবেশ করেছে পারামারিবো শহরে।
গাড়ি কম নয় এয়ারপোর্ট রোড়ে। এর মধ্যেও মাইক্রোটি বেশ স্পীড়ে চলছে। কিন্তু আহমদ মুসার গাড়িটিও নতুন। সুতরাং আহমদ মুসা অল্পক্ষণের মধ্যেই মাইক্রোটির কাছাকাছি পৌঁছে গেল।
‘মাইক্রোটি বোধ হয় সন্দেহ করল আহমদ মুসার ট্যাক্সিকে।
হঠাৎ স্পীড বেড়ে গেল মাইক্রোটির।
আহমদ মুসাও স্পীড বাড়িয়ে দিল।
এই অবস্হায় শহরে প্রবেশ করল দুটি গাড়ি।
মাইক্রোটি এ রাস্তা সে রাস্তা ঘুরে অনেক চেষ্টা করল আহমদ মুসার ট্যাক্সিকে পেছনে ফেলতে, কিন্তু পারল না। আহমদ মুসা সিদ্ধান্ত নিয়েছে, মাইক্রোটির ঠিকানায় অবশ্যই তাকে যেতে হবে। মাইক্রোটি যেখানে যাবে, সেখানেই তার উপর চড়াও হবে। হৈ চৈ গোলযোগ সৃষ্টি হলে তার লাভ। সে মানুষকে বলতে পারবে, ওরা সাবেক প্রধান মন্ত্রী আহমদ হাত্তার মেয়েকে কিডন্যাপ করে নিয়ে এসেছে। আর মানুষ তো জলজ্যান্ত দেখতেই পাবে তাকে। এতে তাদেরই বিপদ বেশি হবে।
মাইক্রো বোধ হয় আহমদ মুসার বেপরোয়া মনোভাব বুঝতে পেরেছিল। এক সময় দেখা গেলো, মাইক্রোটি সোজা পশ্চিম দিকে চলতে শুরু করেছে।
পারামারিবো রাজধানী শহর পার হয়ে আরও পশ্চিমে এগিয়ে চলল মাইক্রোটি।
আহমদ মুসার পাশ থেকে জোয়াও বার্নারডো বলল, ‘স্যার আমরা এখন ব্লুমেস্টেইন হাইওয়ে ধরে এগুচ্ছি। হাইওয়েটি ব্লুমেস্টেইন হ্রদের তীরস্থ ব্রুকোপনডো শহরে গিয়ে শেষ হয়েছে’।
‘মাইক্রোটি নিশ্চয় তাহলে ব্রুকোপনডোতেই যাচ্ছে। ওখানে ওদের একটা বড় ঘাঁটি আছে’। বলল আহমদ মুসা।
উপকূলের সমভূমি এলাকা পার হয়ে গাড়ি তখন প্রবেশ করেছে জংগলাকীর্ণ টিলাময় এলাকায়। উঁচু-নিচু পথ। গাড়ির গতি আগের চেয়ে কমে গেছে।
জংগলাচ্ছাদিত একটা প্রশস্ত টিলায় উঠল আহমদ মুসার ট্যাক্সি।
টিলায় উঠে আহমদ মুসা তার রিয়ারভিউতে দেখতে পেল সামনের মাইক্রোর মতই আরেকটা মাইক্রো টিলার গোড়ায়, উঠে আসছে টিলার উপরে।
অন্যদিকে সামনে তাকিয়ে আহমদ মুসা বিস্মিত হলো যে, সামনের মাইক্রোটি তার স্পীড কমিয়ে দিয়ে আয়েশি ভংগিতে চলছে।
চমকে উঠল আহমদ মুসা, ওরা কি তাকে ফাঁদে আটকালো? এই ফাঁদে আটকানোর জন্যে ওরা শহরের বাইরে এসেছে? এটাই ঠিক। শহর থেকে দূরে সবার অলক্ষ্যে সামনে ও পেছন থেকে আক্রমন করে তাকে ওরা শেষ করতে চায়।
হাসল আহমদ মুসা।
জায়গাটাও ওরা ভাল বেছে নিয়েছে। টিলাটাকে দৈর্ঘ্য-প্রস্থের দিক দিয়ে একটা বড় চড়াই বলা যায়। জংগল ও বড় বড় গাছ পালায় ঘেরা। কাউকে গুম করার উপযুক্ত জায়গা বটে। নিশ্চয় ওরা মোবাইলে যোগাযোগ করে এই জায়গাটা নির্ধারণ করেছে।
দাঁতে দাঁত চাপল আহমদ মুসা। ওদের খোশ-খেয়াল সফল হতে সে দেবে না। সামনে পেছনে একসাথে লড়াই না করে ভিন্ন ভিন্নভাবে লড়ার সিদ্ধান্ত নিল সে।
ট্যাক্সির গতি বাড়িয়ে দিল।
মাইক্রোটি রিভলবারের রেঞ্জে আসার সংগে সংগে আহমদ মুসা ড্যাশ বোর্ডে রাখা এম-১০ রিভলবারটি ডান হাত দিয়ে তুলে নিল এবং জানালায় হাত নিয়ে ধীরে সুস্থে গুলী করল মাইক্রোর পেছনের টায়ারে।
টায়ার সশব্দে ফেটে গেল এবং ঝাঁকি খেয়ে গাড়িটা রাস্তার বাঁ পাশে দাঁড়িয়ে গেল।
মাইক্রোটি দাঁড়ানোর সংগে সংগেই মাইক্রো থেকে নেমে এল ওরা ছয় জন গুলী করতে করতে।
ছয়জনের হাতেই রিভলবার।
একযোগে আহমদ মুসার ট্যাক্সি লক্ষ্যে গুলী করতে করতে ওরা ছুটে আসছে।
আহমদ মুসা তার হাতের রিভলবার আগেই রেখে দিয়েছিল ড্যাশ বোর্ডে। এবার সে তুলে নিল এম-১০ মেশিন রিভলবার।
জোয়াও বার্নারডোকে আহমদ মুসা আগেই সিটের উপর শুয়ে পড়তে বলেছিল।
আহমদ মুসা মাথা নিচু করে এম-১০ এর ট্রিগারে তর্জনি স্পর্শ করে এর নল জানালার বাইরে নিয়ে ট্যাক্সির মাথার উপর দিয়ে ওদের তাক করল।
ওরা তখন এসে গেছে ট্যাক্সি ও মাইক্রোর মাঝ বরাবর।
আহমদ মুসা তর্জনি চেপে ধরল এম-১০ এর ট্রিগারে।
ট্যাক্সির মাথার উপর দিয়ে গুলির ঝাঁক ছুটে গেল ৬ জন রিভলবারধারীর দিকে।
ওদের লুকাবার কোন জায়গা ছিল না। শুয়ে পড়ারও সময় পেল না। এক ঝাঁক গুলীতে ঝাঁঝরা হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল ৬টি লাশ।
আহমদম মুসা বার্নারডোর দিকে তার ড্যাশ বোর্ডের রিভলবার এগিয়ে ধরে বলল, ‘আমি মাইক্রোতে যাচ্ছি। তোমার উপরে দায়িত্ব হলো পেছনের মাইক্রোটি রিভলবারের রেঞ্জে আসার সংগে সংগে যতটা পার গুলী করবে মাইক্রোটির টায়ারে। আমি চাই ওরা গাড়ি থেকে নেমে এগিয়ে আসুক। পারবে তো?’
‘পারবো’। রিভলবার লাগবে না। আমার কাছে রিভলবার আছে’। বলল বার্নারডো।
‘ধন্যবাদ’। বলে আহমদ মুসা নেমে পড়ল ট্যাক্সি থেকে।
দৌড়ে গিয়ে উঠল মাইক্রোতে।
মুখ ও হাত-পা বাঁধা অবস্থায় বসে আছে ফাতিমা নাসুমন।
তার দুচোখে আতংক ঠিকরে পড়ছিল। আহমদ মুসাকে দেখে যেন প্রাণ ফিরে পেল ফাতিমা নাসুমন। তার দুচোখে আনন্দের বিদ্যুত খেলে গেল।
আহমদ মুসা দ্রুত তার হাতের বাঁধন খুলে দিল। বলল, ‘আরেকটা মাইক্রোতে ওরা আসছে। আমি ওদিকটা দেখি। তোমার বাঁধনগুলো খুলে নাও তুমি’।
বলে আহমদ মুসা ছুটে গেল মাইক্রোর পেছন দিকে। এম-১০ এর বাট দিয়ে মাইক্রোর পেছনের কাঁচ কিছুটা ভেঙে ফেলল।
দেখল পেছনের মাইক্রোটি উঠে এসেছে টিলায়। ছুটে আসছে ট্যাক্সির দিকে। আরও কিছুটা আসতেই রিভলবার গর্জন করে উঠার শব্দ পেল আহদম মুসা। পরপর কয়েকটা গুলির শব্দ।
খুশি হলো আহমদ মুসা। বার্নারডো ঠিক সময়েই গুলী করেছে।
গুলী খাওয়ার পরক্ষণেই বাঁ দিকের চাকা হারিয়ে মাইক্রোটি বাঁ দিকে একটু কাত হয়ে মুখ থুবড়ে পড়ল।
সংগে সংগেই মাইক্রোটি থেকে গুলী করতে করতে পাঁচজন লোক নেমে এল, তাদের সবার হাতে স্টেনগান।
তাদের লক্ষ্য ট্যাক্সিটি।
ছুটে আসছে ওরা ট্যাক্সির দিকে গুলী বৃষ্টি করতে করতে।
ওরা তখন ট্যাক্সি এবং ওদের মাইক্রোর মাঝামাঝি জায়গায়।
আহমদ মুসার তর্জনি চেপে ধরল এম-১০ এর ট্রিগার।
গুলীর ঝাঁক বেরিয়ে যেতে লাগল এম১০ থেকে।
ওরা মাইক্রোর দিক থেকে আক্রমণ আশা করেনি। লক্ষ্য ছিল ওদের ট্যাক্সির দিকে।
সুতরাং এম-১০ এর গুলী ওদের অরক্ষিত অবস্থায় পেল। মুহূর্তেই ঝাঁঝরা হয়ে গেল ওদের দেহ। পাঁচটি লাশ আছড়ে পড়ল রাস্তায়।
এদিকে ফাতিমা তার মুখ ও পায়ের বাঁধন খুলে ফেলেছিল।
আহমদ মুসা এগিয়ে গেল ফাতিমার কাছে। বলল, ‘তুমি ঠিকঠাক আছ ফাতিমা?’
কেঁদে উঠল ফাতিমা। কোন কথা বলতে পারল না সে।
‘আর কাঁদা কেন ফাতিমা? আল্লাহ আমাদের সাহায্য করেছেন’।
বলে মাইক্রো থেকে নামতে নামতে আহমদ মুসা বলল, ‘এস ট্যাক্সিতে যাই’।
আহমদ মুসা ও ফাতিমা এল ট্যাক্সির কাছে। দেখল আহমদ মুসা জোয়াও বার্নারডো শোয়া অবস্থা থেকে উঠেছে। বলল আহমদ মুসা, ‘তুমি ঠিক আছ তো বার্নারডো? মাইক্রোর চাকায় ঠিক সময়েই গুলী করেছিলে। ধন্যবাদ তোমাকে’।
জোয়াও বার্নারডো ড্রাইভিং সিটের পাশেই তার সিটে ফিরে আসতে আসতে বলল, ‘স্যার, আপনি যে অসাধ্য সাধন করলেন, এজন্য কে ধন্যবাদ দেবে আপনাকে?’
আহমদ মুসা হাসল। বলল, ‘আমি ধন্যবাদ চাই না। আমি আল্লাহর সন্তুষ্টি চাই বার্নারডো’।
বলেই আহমদ মুসা গাড়ির দিকে মনোযোগ দিল। বলল, ‘আলহামদুলিল্লাহ, গাড়ির চাকাগুলো ঠিক আছে। কিন্তু বডি শেষ হয়ে গেছে। আমরা বাঁচলেও তোমার গাড়িটা ঝাঁঝরা হয়ে গেছে’।
গাড়ির পেছনের দরজা খুলে ফাতিমাকে বসতে বলে আহমদ মুসা ফিরে এল তার ড্রাইভিং সিটে।
গাড়ি স্টার্ট দিল।
ছুটে চলল গাড়ি পারামারিবো শহরের দিকে।
এক সময় মুখটা পেছেনের দিকে একটু ঘুরিয়ে বলল, ‘ফাতিমা বাড়ি যাওয়া তোমার ঠিক হবে না। তোমার আব্বাও বাড়িতে থাকছেন না। তোমাদের পার্টির বেনামী কতগুলো বাড়ি আছে। তারই একটিতে তোমার আব্বাসহ আমরা উঠেছি। সেখানেই আমরা এখন যাব’।
আপনার মত আমার মত ভাইয়া’। বলল ফাতিমা।
সামনেই বাড়ি।
বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছতেই আহমদ মুসা দেখল, বাড়ির সামনে জটলা।
অস্বাভাবিক মনে হলো ব্যাপারটা আহমদ মুসার কাছে।
গাড়ি বারান্দায় পৌঁছার আগেই আহমদ মুসা গাড়ি দাঁড় করাল। এম-১০ কোটের ভেতরে শোল্ডার হোলস্টারে নিয়ে এল।
গাড়ির দরজা খুলল।
গাড়ি থেকে নামার আগে ফাতিমাকে বলল, ‘তুমি গাড়িতে থাক ঘটনা কি আমি দেখি’।
আহমদ মুসা নামল গাড়ি থেকে।
জটলার মধ্যে বাড়ির গেটে দাঁড়িয়েছিল দলের কয়েকজন এবং বাড়ির এটেনডেন্ট সুকর্ণ।
আহমদ মুসা শিখের পোশাকে থাকলেও সুকর্ণ আহমদ মুসাকে চিনতে পারল। কারণ সকালে আহমদ মুসা এই পোশাক তার সামনেই পরেছে।
ছুটে এল সুকর্ণ আহমদ মুসার কাছে। বলল, ‘স্যারকে ধরে নিয়ে গেছে’। বলেই কেঁদে উঠল সুকর্ণ।
শোনার সঙ্গে সঙ্গে আহমদ মুসার গোটা শরীরে শীতল স্রোত বয়ে গেল। বলল সুকর্ণকে লক্ষ্য করে, ‘কে ধরে নিয়ে গেছে, কখন ধরে নিয়ে গেছে?’
‘কারা জানি না। স্যার বিমান বন্দর থেকে এসে কাপড় ছেড়ে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন, এই সময় দুটি গাড়িতে দশ বারো জন লোক আসে। তাদের সবার কাছে রিভলবার, স্টেনগান ইত্যাদি ছিল। ওরাই ধরে নিয়ে গেছে’। বলল সুকর্ণ।
‘গেটে পাহারা ছিল না?’ জিজ্ঞেস করল আহমদ মুসা।
‘দুজন পাহারায় ছিল। কিন্তু তারা কিছু বুঝে উঠার আগেই তাদের উপর চড়াও হয় এবং বেঁধে ফেলে’। সুকর্ণ বলল।
‘যারা ধরে নিয়ে গেছে তারা কোন কথা বলেছিল?’ জিজ্ঞেস করল আহমদ মুসা।
‘কোন কথা বলেনি। গাড়িতে তোলার সময় ওদের সরদার মত লোকটা বলেছে স্যারকে লক্ষ্য করে, আবার প্রধানমন্ত্রী হতে চেয়েছিলেন স্যার। সে আশা আর পুরণ হলো না। তবে জামাই, মেয়ে নিয়ে একসাথে স্বর্গে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেব’। বলল সুকর্ণ।
‘গাড়ির নম্বর রেখেছ?’ বলল আহমদ মুসা।
‘জ্বি হ্যাঁ’ বলে একটা চিরকুট আহমদ মুসার হাতে তুলে দিতে দিতে বলল, ‘দুই গাড়ির নাম্বারই এতে আছে’।
আহমদ মুসা নম্বর দুটি কাগজে টুকে নিয়ে চিরকুটটা সুকর্ণকে ফেরত দিতে দিতে বলল, ‘এই নম্বর দিয়ে তোমরা থানায় একটা মামলা করবে আজই’।
একটু থেমেই আহমদ মুসা আবার বলল, ‘তোমাদের ছোট ম্যাডাম ফাতিমাকে উদ্ধার করা হয়েছে। সে এই গাড়িতে আছে। তাকে অন্য কোথাও নিয়ে যাচ্ছি। এখানে বা বাড়িতে সে নিরাপদ নয়। আর শোন একজন লোককে আমি এখানে রেখে যাচ্ছি। আমি কিছুক্ষণের মধ্যেই এখানে ফিরে আসছি’।
বলে আহমদ মুসা ট্যাক্সিতে ফিরে গেল।
আহমদ মুসাকে ফিরতে দেখেই উদ্বিগ্ন ফাতিমা নাসুমন বলল, ‘কি ঘটেছে? খারাপ কিছু?’
‘হ্যাঁ, বোন। তোমার আব্বা কিডন্যাপ হয়েছেন। আমি চলে গিয়েছিলাম তোমাকে যে গাড়ি কিডন্যাপ করেছে তার পেছনে, আর তিনি বাসায় ফিরে এসেছিলেন। ফিরে আসার কিছুক্ষণের মধ্যে উনি কিডন্যাপ হন। আমার মনে হয় বিমান বন্দরে কেউ তাকে দেখেছিল এবং তারা তাঁকে অনুসরণ করে’। বলল আহমদ মুসা।
ফাতিমা নাসুমন কিছু বলল না। আহমদ মুসা দেখল, সে দুহাত দিয়ে মুখ ঢাকছে’।
আহমদ মুসার বুঝতে বাকি রইল না, ফাতিমা নাসুমন কান্না রোধ করার চেষ্ট করছে।
আহমদ মুসা ফাতিমাকে কিছু না বলে তাকালো বার্নারডোর দিকে। বলল, বার্নারডো তুমি এ বাড়িতে কিছুক্ষণ অপেক্ষা কর। আমি আসছি’।
গাড়ি থেকে নামল বার্নারডো।
সুকর্ণ পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল। তাকে লক্ষ্য করে বলল আহমদ মুসা, ‘সুকর্ণ একে নিয়ে যাও, আমি আসছি’।
সুকর্ণ বার্নারডোকে নিয়ে চলে গেল।
আহমদ মুসা ড্রাইভিং সিটে উঠে বসল।
ফাতিমা নাসুমন পেছনের সিট থেকে এসে আহমদ মুসার পাশের সিটে বসল।
গাড়ি চলতে শুরু করল।
কিছুক্ষণ পর ফাতিমা চোখ মুছে বলল, ‘আমরা কোথায় যাচ্ছি?’
গতকাল পারামারিবোতে আসার পরই একজন মা পেয়ে গেছি, একজন দাদী পেয়ে গেছি, সেখানেই আপাতত তুমি থাকবে। তোমাকে ওখানে রেখে আমি বেরুবো মি. হাত্তার সন্ধানে’।
ফাতিমা নাসুমন তাকাল আহমদ মুসার দিকে। তার দুগন্ড বেয়ে গড়িয়ে পড়তে লাগল অশ্রুর দুটি ধারা। কিছুই বলল না সে।
আহমদ মুসাই আবার কথা বলল। বলল, ‘আল্লাহর উপর ভরসা কর বোন। ইনশাআল্লাহ আমরাই জিতব’।
চোখ মুছল ফাতিমা নাসুমন।
কিছুক্ষণ পর বলল, ‘কোথায় তাদের বাড়ি?’
‘টেরেক স্টেটে। টেরেক স্টেটটাই ওদের’।
‘টেরেক স্টেটের নাম শুনেছি। ঐ স্টেটেই সুরিনামের একমাত্র ও প্রাচীনতম দুর্গের ধ্বংসাবশেষ রয়েছে। তবে টেরেক পরিবারের কাউকে চিনিনা’। বলল ফাতিমা নাসুমন।
‘কিন্তু তোমাদের ওরা চেনে। তোমার আব্বার ভক্ত ওরা। ঐ পরিবারের মেয়ে লিসা টেরেক তো তোমাদের বিশ্ববিদ্যালয়েই পড়ে’। আহমদ মুসা বলল।
‘তাহলে দেখলে হয়তো চিনতেও পারি’। বলল ফাতিমা নাসুমন।তার মুখ অনেকখানি স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে।
‘আমি আশা করি ভালই থাকবে তুমি সেখানে। খুব পুরাতন ঐতিহ্যবাহী পরিবার ওরা। আমার মনে হয় ওদের একটা মুসলিম ব্যাকগ্রাউন্ড থাকতে পারে’। আহমদ মুসা বলল।
‘কেন, কিভাবে?’
‘ওদের বিরান হওয়া দুর্গে নাকি একটা মসজিদ ছিল। দুর্গ বিরান হয়ে গেলেও মসজিদের কিছু দেয়াল এবং মেঝে নাকি এখনো অক্ষত আছে’। বলল আহমদ মুসা।
ফাতিমা নাসুমন বিষ্মিত দৃষ্টিতে তাকাল আহমদ মুসার দিকে। বলল, ‘সুরিনামের প্রাচীন ইতিহাসের উপর আমার অনুসন্ধান আছে। কিন্তু প্রাচীন ও বিরান এই দুর্গের সাথে মুসলমানদের কোন সম্পর্ক থাকার কথা আমি কোথাও পাইনি। দুর্গ সম্পর্কে সকলেই একমত যে, ইউরোপীয়ান কলোনাইজেশনের সেই কালে কোন জলদস্যুদের ঘাঁটি এখানে ছিল। তারাই এই দুর্গ তৈরী করে। তবে, একথা অনেকেই লিখেছে, জলদস্যুরা স্পেন, পর্তুগাল, বৃটেন যে দেশেরই হোক মুসলিম স্থাপত্য সম্পর্কে তাদের অভিজ্ঞতা ছিল। স্পেনীয় মুসলিম স্থাপত্যের বহু জিনিসের এখানে অনুকরণ করা হয়েছে’।
‘কিন্তু আমি অন্য আরেক কাহিনী শুনেছি ফাতিমা। গত রাতে আমি পারামারিবো পৌঁছার পর রাতেই ওয়াং আলীর খোঁজে ওদের একটা ঘাটিতে ঢুকেছিলাম। সেই ঘাঁটি থেকে বন্দী একজন যুবককে উদ্ধার করে নিয়ে আসি। আমি মনে করেছিলাম সেই ওয়াং হবে। কিন্তু পরে দেখলাম সে ওভানডো টেরেক’।
বলে আহমদ মুসা ওভানডোর স্ত্রী জ্যাকুলিনের ঐ রাতে কিডন্যাপ হওয়া ও উদ্ধার কাহিনীসহ ওভানডো যে কাহিনী অপহরণকারীদের কাছ থেকে শুনছিল সব কথা ফাতিমার কাছে বর্ণনা করে শুনাল।
ফাতিমা বিষ্ময়ে চোখ কপালে তুলে বলল, ‘বলেন কি? ক্যারিবিয়ানের স্পেনীয় গভর্ণর ওভানডোর ডুবে যাওয়া ২০টি জাহাজের একটি তাহলে ডুবেনি এবং সেটা ভেসে এসছিল সুরিনাম উপকূলে? ঐ জাহাজের ক্যাপ্টেন কি কোন মুসলিম ছিল? সেই কি তৈরী করেছিল এই দুর্গ?’
থামল ফাতিমা। তার কন্ঠে প্রবল একটা আবেগ ঝরে পড়ল।
‘আমি কিছু জানি না ফাতিমা। তোমরা সুরিনামের মানুষ। এসব প্রশ্নের উত্তর তো তোমাদের কাছে আমরা চাই। বলল আহমদ মুসা।
‘জাহাজ ভরা সোনা এনে দুর্গের এলাকায় পুঁতে রাখা সম্পর্কে আপনি কি বলেন?’ ফাতিমা জিজ্ঞেস করল।
‘বলা মুশকিল। সেটা এমন একটা সময় ছিল যখন বিশ্বাস করা না করা উভয় অবস্থাই যুক্তিযুক্ত মনে হতে পারে’। বলল আহমদ মুসা।
‘কিন্তু বিশ্বাস করার পেছনে যুক্তিটাই বেশি শক্তিশালী। ওভানডোর সেই জাহাজ বহরে সোনা বোঝাই জাহাজ ছিল, ডুবে যাওয়া থেকে বেঁচে গিয়ে সোনা বোঝাই একটা জাহাজ স্পেনে পৌঁছেছিল, এটা ইতিহাস। ডুবে যাওয়া থেকে রক্ষা পাওয়া একটা জাহাজ যদি স্পেনে পৌঁছেতে পারে, তাহলে আরেকটা জাহাজ ঝড় তাড়িত হয়ে সুরিনামেও পৌঁছতে পারে’। ফাতিমা বলল।
‘তোমার কথায় যুক্তি আছে ফাতিমা। সত্য হলে সেটা খুশির কথাই হবে’। বলল আহমদ মুসা।
‘খুশির কারণ বলছেন কেমন করে? এই সোনা লোভীদের হাতে টেরেক পরিবার ধ্বংস হবার পথে। আমি নিশ্চিত, দুর্গের তলায় সোনা থাকার কথা যখন রটেছে, তখন টেরেক পরিবারের আর রক্ষা নেই। সোনা নিয়ে যে রক্তারক্তি আমেরাকায় হয়েছে, সে রকম রক্তারক্তি আমেরিকার যুদ্ধগুলোতেও হয়নি’। বলল ফাতিমা।
‘আমিও এ ব্যাপারটা নিয়ে উদ্বিগ্ন ফাতিমা’।
বলে একটু থেমেই আহমদ মুসা আবার বলল, ‘আচ্ছা বলতে পার, তোমার আব্বার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ আর এই সোনা সন্ধানীরা এক হয়ে গেল কি করে?’
‘এক হয়ে যায়নি। ওরা একটাই শক্তি। আর সম্পদ সংগ্রহে ওরা মরিয়া। ওরা বলে ‘মায়ের’ জন্যে তাদের ওগুলো। এ জন্যেই তারা তাদের রাজনৈতিক দল সুরিনাম পিপলস কংগ্রেসের পাশাপাশি ‘মায়ের সূর্য সন্তান’ (মাসুস) নামে একটা সন্ত্রাসী সংগঠন গড়েছে। ওরা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ধ্বংস করে যেমন রাজনীতিকে ওদের মনোপলি করতে চায়, তেমনিভাবে ওরা সম্পদও দখল করবে, এটাই স্বাভাবিক। আমার মনে হয় এক জাহাজ স্বর্ণের লোভ ওদের কাছে একটা দেশ দখলের চেয়ে কম নয়। তাই আমরা যে বিপদে পড়েছি, তার চেয়ে টেরেক পরিবারের বিপদ কোন অংশে ছোট নয়’। ফাতিমা বলল।
‘ফাতিমা, তুমি দেখছি আমাকে ভয় ধরিয়ে দিলে’। বলল আহমদ মুসা।
‘তা যদি পেরে থাকি, তাহলে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করছি’।
‘কেন?’
‘তাহলে টেরেক পরিবারের বাঁচার একটা পথ বের হবে। আপনাকে তারা পাশে পাবে, যেমন আমরা পেয়েছি’। হেসে বলল ফাতিমা।
‘ফাতিমা, আমরা্ এসে গেছি। ঐ তো ওদের বাড়ি। দেখো, গেটে দাঁড়িয়ে দুজন এদিকে তাকিয়ে আছে। ওদের একজন ওভানডো টেরেক, অন্যজন তার বোন লিসা টেরেক’।
বলেই আহমদ মুসা গাড়ির জানালা দিয়ে তাদের দিকে হাত নাড়তে লাগল।
উত্তরে ওরাও হাত নাড়ল এবং দৌড়ে আসতে লাগল গাড়ির দিকে।

তৈরী হয়ে আহমদ মুসা উঠে দাঁড়াল।
ঘরে উপস্থিত ওভানডোর মা, ওভানডোর দাদী, ওভানডো, ওভানডোর স্ত্রী জ্যাকুলিন, লিসা টেরেক, ফাতিমা নাসুমন সকলেই।
লিসা টেরেক জড়িয়ে ধরে আছে ফাতিমা নাসুমনকে।
আহমদ মুসা যাবার জন্য উঠে দাঁড়ালে ওভানডোর মা কাঁদো কাঁদো কন্ঠে বলে উঠল, ‘বাবা গত রাতের সব কথা তো আমি জানি। ফাতিমার কাছ থেকে আজ সকালের কথাও শুনলাম। গত রাত থেকে তোমার শরীরের উপর দিয়ে ঝড় বয়ে যাচ্ছে, এ শরীর নিয়ে তুমি কেমন করে বেরুচ্ছ?’
ওভানডোর মা থামতেই ফাতিমা বলে উঠল, ‘গত রাত থেকে নয় খালাম্মা, ১৯ তারিখে গায়ানার নিউ আমস্টারডামে পেৌঁছার পর আজ পর্যন্ত যা ওর উপর দিয়ে ঘটে গেছে, তা দিয়ে এক মহাকাব্য লেখা যাবে’।
হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘কাহিনী শেষ হবার পর তো মহাকাব্য লেখা হয়, কাহিনী তো এখনও শেষ হয়নি। এখন যে বেরুচ্ছি, তা কাহিনীরই একটা অংশ’।
গম্ভীর হলো ফাতিমার মুখ। বলল, ‘আপনি কোথায় বেরুচ্ছেন, আমরা জানতে পারি না?’
‘আমার কাছেও এখনও স্পষ্ট নয় যে, আমাকে কোথায় যেতে হবে। একাধিক বিকল্প আমার কাছে আছে। পথে বের হবার পর আমি আশা করছি আল্লাহই ঠিক করে দেবেন, আমাকে কোথায় যেতে হবে’। গম্ভীর কন্ঠ আহমদ মুসারও।
ঘরের পরিবেশটা হঠাৎ করে ভারী হয়ে উঠেছে।
‘আপনার মত এমন করে আমরা আল্লাহর উপর ভরসা করতে পারি না কেন?’ বলল লিসা। তার দু’চোখ ছল ছল হয়ে উঠেছে।
‘এই যে অনুভূতি তুমি লাভ করেছ, এটাই আল্লাহর প্রতি ভালোবাসার দিকে তোমাকে নিয়ে যাবে। ভালোবাসলে তার উপর ভরসা করা যায় লিসা’। আহমদ মুসা বলল।
‘আপনার কথা সত্য হোক’। বলল লিসা।
যাবার জন্য ব্যাগটা হাতে তুলে নিল আহমদ মুসা।
ওভানডো বলে উঠল, ‘আমাদের কিছু বলবেন ভাইয়া?’
আহমদ মুসা তার ডান হাতটা ওভানডোর ঘাড়ে রাখল। বলল, ‘সাবধান থেকো। রাত পর্যন্ত আমি ফিরে আসব ইনশাআল্লাহ’।
বলেই আহমদ মুসা তাকাল ফাতিমার দিকে। বলল, ‘চিন্তা করো না ফাতিমা। আল্লাহর সাহায্য আমাদের সাথে আছে’।
ফাতিমা কিছু বলতে পারলো না। ভিজে উঠেছে তার চোখের দু’কোণ।
‘আসি, সবাই দোয়া করবেন’। বলে বাইরে বেরুবার জন্যে পা বাড়াল আহমদ মুসা।
আহমদ মুসাকে গাড়ি পর্যন্ত এদিয়ে দিল ওভানডো। বলল, ‘ভাইয়া এ গাড়ি তো শেষ হয়ে গেছে। আমারটা নিয়ে যান’।
আহমদ মুসা গাড়ির ড্রাইভিং সিটে বসতে বসতে বলল, ‘এ গাড়ি নিয়ে যুদ্ধে একবার জিতেছি। এ গাড়ি দিয়েই আবার বিসমিল্লাহ করতে চাই’।
গাড়ির দরজা বন্ধ করে গাড়ি স্টার্ট দিল আহমদ মুসা।
ছুটতে শুরু করল গাড়ি।
পৌছল আহমদ মুসা আহমদ হাত্তার বাড়িতে।
গাড়ির শব্দ পেয়েই বেরিয়ে এল ভেতর থেকে জোয়াও বার্নারডো ও সুকর্ণ। আহমদ মুসা তাদের নিয়ে ভেতরে গিয়ে বসল।
আহমদ মুসা বার্নারডোর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তোমাকে ক্লান্ত দেখাচ্ছে। তুমি রেস্ট নাওনি?’
‘একটু বাইরে গিয়েছিলাম’। বলল জোয়াও বার্নারডো।
‘ও আচ্ছা’ বলে আহমদ মুসা একটু থামল। একটু ভাবল। তারপর বলল, ‘সুকর্ণ ওরা তোমার স্যারকে নিয়ে যাবার সময় বলেছিল যে, জামাই, মেয়ে ও তোমাকে এক সংগে স্বর্গে পাঠাব, একথা ঠিক তো?’
‘জি স্যার’। উত্তর দিল সুকর্ণ।
সোফায় গা এলিয়ে দিয়ে চোখ বুজল আহমদ মুসা। ভাবছে সে। কিছুক্ষণ পর চোখ খুলে জোয়াও বার্নারডোর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘বার্নারডো ফাতিমা নাসুমনকে ওরা ব্রুকোপনডোর দিকে মানে ব্রুকোপনডোতে নিয়ে যাচ্ছিল তাই না?’
‘হ্যাঁ সার, আমিও তাই মনে করি’। বলল বার্নারডো।
‘আমার মনে হয় ওয়াং আলীকে ওরা ব্রুকোপনডোতেই বন্দী করে রেখেছে’। আহমদ মুসা বলল।
‘কেন মনে করছেন?’ বলল বার্নারডো।
‘ঐ যে ওরা বলেছে তিনজনকে একসাথে স্বর্গে পাঠাবে। মানে তিনজনকে তারা একত্রিত করবে। আমার মনে হচ্ছে আহমদ হাত্তাকেও ওরা ব্রুকপনডোতেই নিয়ে গেছে’। আহমদ মুসা বলল।
বিষ্ময় ফুটে উঠল জোয়াও বার্নারডোর মুখে। বলল আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে, ‘আপনি অদ্ভূত নিখুঁত একটি অংক কষেছেন ওদের একটা উক্তিকে কেন্দ্র করে। ধন্যবাদ আপনাকে’।
‘এ অংকটা নিখুঁত কি করে বুঝলে?’ জিজ্ঞেস করল আহমদ মুসা।
জোয়াও বার্নারডো একটু হাসল। বলল, ‘আপনি চলে গেলে আমি একটু বাইরে গিয়েছিলাম। আমার পারিচিত মহলে কিছু খোঁজ খবর নিলাম। গাড়ির নম্বর দুটো চেক করে ওরা বলল, এ নাম্বারের দুটি গাড়ি সাড়ে ১১ টার সময় ব্রুকোপনডোর দিকে যেতে দেখা গেছে। আজ সাড়ে ১১টার সময় যে টিলায় ম্যাডাম ফাতিমাকে নিয়ে ঘটনা ঘটল ওরা সেই টিলা অতিক্রম করেছে’।
আহমদ মুসার চোখ দুটো চঞ্চল হয়ে উঠল। সে গভীর দৃষ্টিতে একবার তাকাল বার্নারডোর দিকে। একটু ভাবল। চোখ দুটি এক সময় উজ্জ্বল হয়ে উঠল আহমদ মুসার। বলল, ‘বার্নারডো তুমি তো গোয়েন্দা রিপোর্ট দিলে’।
চমকে উঠে বার্নারডো তাকাল আহমদ মুসার দিকে। কিন্তু পরক্ষণেই তারও মুখে এক টুকরো হাসি ফুটে উঠল। বলল, ‘আপনি এটাও বুঝে ফেলেছেন?’
‘বুঝার কিছুটা বাকি আছে’। আহমদ মুসা বলল।
‘কি?’ বলল বার্নারডো।
‘গোয়েন্দা অফিসারদের মধ্যে আত্মীয় বন্ধু আছে, না তুমিও গোয়েন্দা অফিসার?’ আহমদ মুসা বলল।
বিষ্ময় ফুটে উঠল বার্নারডোর চোখে মুখে। কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল আহমদ মুসার দিকে। তারপর বলল, ‘আপনার মত এমন দ্বিতীয় মানুষ আমি জীবনে দেখিনি। আপনার পরিচয় আমি জানি না। কিন্তু আপনি সাধারণ কেউ নন’।
বলে একটু থামল বার্নারডো। পরক্ষণেই আবার বলে উঠল, ‘আপনার দ্বিতীয় অনুমানটাই ঠিক। আমি একজন গোয়েন্দা অফিসার। তবে আরেকটা পরিচয় আমার আছে। আপনি সেটা অনুমান করতে পারেন নি’। মুখে হাসি বার্নারডোর।
আহমদ মুসার মুখেও হাসি ফুটে উঠল। বলল, ‘আগে অনুমান করতে পারিনি, কিন্তু এই মুহূর্তে অনুমান করতে পারছি’।
‘বলুন তো সেটা কি?’ বলল বার্নারডো হাসি মুখে।
‘তুমি মুসলমান’। আহমদ মুসা বলল।
বিষ্ময় ও আনন্দে চোখ দুটো নেচে উঠল বার্নারডোর। সে ছুটে এসে আহমদ মুসার পায়ের কাছে বসল। বলে উঠল, ‘আপনি অসাধারণ, অসাধারণ আপনি। বিশ্বাস করুন স্যার, শুরু থেকেই আমি গর্ববোধ করছি যে, এ ধরণের অসাধারণ মানুষ আমাদের মুসলমানদের মধ্যেও আছে’।
‘শুরুতে কি করে বুঝলে আমি মুসলমান?’ আহমদ মুসা বলল।
‘আপনি যখন আমার ট্যাক্সিতে উঠেন, তখনই আপনার কপালে সিজদার দাগ দেখে বুঝি যে আপনি মুসলমান। কোন বিশেষ কারণে আপনি শিখের ছদ্মবেশ নিয়েছেন। তারপর আপনি যখন পারামারিবো আসার জন্যে গাড়ি চাইলেন, তখন কেন জানি আমার মনে হয়েছিল, আপনাকে আমার সহযোগিতা করা দরকার’। বলল বার্নারডো।
‘তুমি পারামারিবো আসার সিদ্ধান্ত নিলে কেন? এটা আমাকে বিষ্মিত করেছে’। আহমদ মুসা বলল।
‘গাড়ি ফিরিয়ে নেওয়া একটা কারণ ছিল বটে, কিন্তু সবচেয়ে বড় কারণ ছিল আপনাদের সম্পর্কে আমার কৌতুহল। একজন মুসলিম শিখ সাজা এবং শুধু পারামারিবো যাবার জন্যে একটা গাড়ি কিনে ফেলা কম কথা নয়’। বলল বার্নারডো।
‘কিন্তু তোমার নাম জোয়াও বার্নারডো কেন?’ জিজ্ঞেস করল আহমদ মুসা।
‘সে অনেক কথা। কোপেনাস নদী তীরের উইটাগ্রো এলাকায় আমার বাড়ি। উইটাগ্রোসহ চারদিকের লোকেরা ছিল ট্রাইবাল ধর্মে বিশ্বাসী। উইটাগ্রো শহরে ছিল বেশ কিছু ক্যাথলিক খৃস্টান। দূর্গম এলাকা বলেই
হয়তো সেখানে তখনও কোন এশিয়ান যায়নি। উইটাগ্রোতে তখন ছিল একটাই স্কুল। মালিক ছিল ক্যাথলিক খৃষ্টানরা। সেই স্কুলে ভর্তি হতে হলে সবাইকে কোন ইউরোপীয় নাম নিতে হতো। তা না হলে বিনামূল্যে বই, টিফিন ও অর্থ সাহায্য পাওয়া যেতো না। সে জন্যে সবাই ইউরোপীয় নাম নিয়ে স্কুলে ভর্তি হতো। সবার মত আমিও আমার মুসলিম নাম মহসিন মুহাম্মাদ পরিবর্তন করে ইউরোপীয় নাম নিয়েছি’। বলল জোয়াও বার্নারডো।
‘তোমার মুসলিম নাম তো খুব সুন্দর’।
বলে আহমদ মুসা একটু থামল। পরক্ষণেই বলে উঠল, ‘এস এবার কাজের কথায় আসি মহসিন বার্নারডো। কি করা যায় বল তো? এটা বোধ হয় নিশ্চিত যে, আহমদ হাত্তাকে ওরা ব্রুকোপনডোতেই নিয়ে গেছে’।
বার্নারডো একটু ভাবল। তারপর বলল, ‘সুরিনামের অতিরিক্ত আইজিপি এবং পারামারিবোর সহকারী পুলিশ কমিশনার (অপারেশন) সাবেক প্রধানমন্ত্রী আহমদ হাত্তার সমর্থক। তারা ভালোবাসেন আহমদ হাত্তাকে। তাদের একটা পরামর্শ নেয়া যায় কিনা চিন্তা করে দেখুন’।
আহমদ মুসার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। বলল, ‘তাদের সাথে কি তোমার জানাশোনা আছে’।
‘হ্যাঁ, অতিরিক্ত আইজি আমার ট্রেইনার ছিলেন। তিনি আমাকে খুব স্নেহ করেন। গোয়েন্দা বিভাগের জন্য তিনিই আমাকে বাছাই করেন। আর পারামারিবোর সহকারী পুলিশ কমিশনার আমার এলাকার লোক। তিনিই আমাকে উৎসাহ দিয়ে পুলিশে ঢুকিয়েছেন’। বলল বার্নারডো।
‘আলহামদুলিল্লাহ। খুব সুখবর দিলে তুমি। কিন্তু বলত ওরা কোন ধর্মের কোন এলাকার লোক?’ আহমদ মুসা জিজ্ঞেস করল।
‘সহকারী পুলিশ কমিশনার কোন এলাকার তাতো আমি আগেই বলেছি। তিনি আফ্রো-ইউরোপীয় জাতি গোষ্ঠীর এবং খৃষ্টান। সৎ ও স্বাধীনচেতা অফিসার বলে সামরিক সরকারের আমলে তিনি অনেক নিগ্রহের শিকার হন ও তার পদাবনতি ঘটে। সামরিক শাসন পরবর্তী গণতান্ত্রিক সরকারের কাছেও তিনি সুবিচার পাননি। আহমদ হাত্তার সরকার তার সততার মূল্যায়ন করেন এবং তিনি দ্রুত পদোন্নতি পান। তিনি আহমদ হাত্তার সরকারকে পক্ষপাতহীন সুবিচারক সরকার বলে মনে করেন। আর অতিরিক্ত আইজিপি আহমদ হাত্তার এলাকার লোক। অহমদ হাত্তাদের জমিদারীতেই তাদের বাস। অতিরিক্ত আইজিপি সাহেবের বড় ভাই স্কুল থেকে কলেজ জীবন পর্যন্ত আহমদ হাত্তার সহপাঠী ও বন্ধু ছিলেন। পারিবারিক ভাবেই ওরা আহমদ হাত্তার ভক্ত’।
থামল বার্নারডো।
আহমদ মুসা কোন কথা বলল না। চিন্তা করছিল। এক সময় হাসি মুখে বলল আহমদ মুসা, ‘এই দুজন পুলিশ অফিসারের সন্ধান পাওয়াকে আল্লাহর সাহায্য বলে মনে হচ্ছে। বার্নারডো তুমি যাও ওদের কাছে। সব কথা গিয়ে বল। তারা কি বলেন, শুনে এস’। বলল আহমদ মুসা।
খুশি হলো বার্নারডো। বলল, ‘তাহলে যাচ্ছি স্যার’।
বলে বার্নারডো উঠে দাঁড়িয়ে ঘরের বাইরে চলে গেল।
ফিরে এল বার্নারডো পাকা তিন ঘন্টা পর।
আহমদ মুসা শুয়ে রেস্ট নিচ্ছিল। বার্নারডো ফিরে এসেছে একথা শুনেই আহমদ মুসা উঠে বসল।
বার্নারডো যেমন ছুটে বেরিয়ে গিয়েছিল, তেমনি ছুটে ঘরে প্রবেশ করল। তার হাতে একটা বড় প্যাকেট এবং মুখে হাসি।
‘তোমাকে তো খুব খুশি দেখাচ্ছে, মিশন সফল?’ বলল আহমদ মুসা।
বার্নারডো বসতে বসতে বলল, ‘মিশন সফলও বলব না, ব্যর্থও বলবনা’।
‘না বার্নারডো, মিশন ব্যর্থ না হলেই তা সফল’। আহমদ মুসা বলল।
‘তাহলে সকলে আমরা আলহামদুলিল্লাহ পড়ব’। বার্নারডো বলল।
‘আলহামদুলিল্লাহ কখনই কন্ডিশনাল নয় বার্নারডো। আলহামদুলিল্লাহে রাব্বিল আলামিন ওয়া আলা কুল্লে হালিন। সুখ-দুঃখে, সাফল্য-ব্যর্থতা সব অবস্থাতেই আমরা আল্লাহর প্রশংসা করি। বল, তোমার কথা বল’।
‘আমি প্রথম দেখা করেছি, এডিশনাল আইজি’র সাথে। দেখলাম ঘটনা তাঁরা জানতে পেরেছেন। কিন্তু হোম মিনিস্ট্রি এই ঘটনার সাথে পুলিশকে জড়িত হতে নিষেধ করেছে। তিনি বলেছেন এ ব্যাপারে পুলিশের পক্ষে কিছুই করা সম্ভব নয়। সুতরাং যা কিছু করার বেসরকারীভাবে করতে হবে। বলে তিনি আমাকে নির্দেশ দিলেন সহকারী পুলিশ কমিশনারের সাথে সাক্ষাৎ করতে। তিনি যা বলার পুলিশ কমিশনারের কাছে বলে দিলেন। এলাম সহকারী পুলিশ কমিশনারের কাছে। উদ্ভূত পরিস্থিতির জন্যে তিনি দুঃখ প্রকাশ করলেন। বললেন, আমাদের কিছুই করার নেই। অন্তবর্তীকালীন সরকার কথায় নিরপেক্ষ, কিন্তু কাজ করছেন সুরিনাম পিপলস কংগ্রেসের রোনাল্ড রঙ্গলাল এবং ‘মায়ের সূর্য্য সন্তান’ (মাসুস) এর তিলক লাজপত পালের নির্দেশ ক্রমে। স্যারের সাথে আমার কথা হয়েছে। আমরা এটুকু করতে পারি, পুলিশের একটা গাড়ি ও কিছু পোশাক তোমাদের দেব। যা কিছু করার তোমাদের করতে হবে’।
একটু দম নিয়েই বার্নারডো তার হাতের প্যাকেটের দিকে ইংগিত করে বলল, ‘এতে পুলিশের পাঁচ সেট পোশাক আছে। আর গাড়িটা ঠিক পাঁচটায় আমাদের গলির মুখে থাকবে’। থামল বার্নারডো।
আহমদ মুসা বলল, ‘মি. হাত্তা এখন কোথায় সে ব্যাপারে কিছু বলেনি?
‘হ্যাঁ, বলেছেন। সর্বশেষ গোয়েন্দা রিপোর্ট অনুসারে ব্রুকোপনডোর শিবাজী কালী মন্দিরের পেছনে মানে পশ্চিম দিকে একটা বাড়ি আছে। সে বাড়ির পরেই একটা বিরাট জিমনেশিয়াম আছে। জিমনেশিয়ামটা জংগী সংগঠন ‘মায়ের সূর্য সন্তান’ (মাসুস) এর ট্রেনিং কেন্দ্র। এরই আন্ডার গ্রাউন্ড ফ্লোরে মি. হাত্তাকে রাখা হয়েছে’। বলল বার্নারডো।
‘আলহামদুলিল্লাহ। খুব মূল্যবান ইনফরমেশন দিয়েছেন ওঁরা। আমরা গিয়ে খুঁজে মরতাম শিবাজী কালী মন্দিরে। পেতাম না’।
আহমদ মুসা একটু থামল এবং পোশাকের প্যাকেটটা টেনে নিতে নিতে বলল, ‘তোমার মিশন আশাতীত সফল বার্নারডো। পুলিশ নিজে এ্যাকশনে যাবে, তা আমি কোন সময়ই ভাবিনি। তারা যে সাহায্য করেছে তা অমূল্য’। থামল আহমদ মুসা।
‘এখন আপনার পরিকল্পনা কি বলুন’। বলল বার্নারডো।
‘এখন পাঁচ সদস্যের একটা শক্তিশালী পুলিশ টীম গঠিত হবে। পাঁচ সদস্যের মধ্যে আমরা দুজন আছি, আর দরকার তিনজন। তুমি যাও মি. হাত্তার লোকদের মধ্য থেকে তিনজন লোককে বাছাই করে নিয়ে এস। যারা ভালো গুলী চালাতে পারে এবং মি. হাত্তাকে উদ্ধারের জন্যে মরতে রাজী আছে’। আহমদ মুসা বলল।
লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল বার্নারডো। বলল, আমি এখুনি বাছাই করে নিয়ে আসছি’। চলে গেল বার্নারডো।
আধা ঘন্টা পর মি. হাত্তার বাড়ি থেকে পাঁচজন পুলিশ বেরিয়ে এল।
তাদের ইউনিফর্মে বড় বড় অক্ষরে লেখা সিআইবি পুলিশ।
সিআইবি (সেন্ট্রাল ইনভেস্টিগেশন ব্যুরো) পুলিশ সুরিনামের বেসামরিক প্রশাসনের সবচেয়ে শক্তিশালী বাহিনী। তারা তদন্তের স্বার্থে যে কোন জায়গায় যে কোন সময় প্রবেশ করতে পারে। বিনা ওয়ারেন্টে যে কোন কাউকে গ্রেফতার করতে পারে।
পাঁচজন পুলিশের মধ্যে একজনের ইউনিফর্মের কাঁধে লাল রংয়ের ডবল স্টার। তার মানে তিনি এসপি পর্যায়ের একজন সিনিয়র অফিসার। তার কোমরে ঝুলানো রিভলবার। শোল্ডার হোলস্টারে ঝুলানো এম-১০। অন্যদের কাঁধে ঝুলানো স্টেনগান।
এসপি’র পোশাকে আহমদ মুসা এবং জোয়াও বার্নারডোসহ অন্যরা সার্জেন্টের ইউনিফর্মে।
তারা গলির মুখে এসে দেখল, ঠিক সিআইবি পুলিশের একটা গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে।
আহমদ মুসা জোয়াও বার্নারডোকে বসতে বলল ড্রাইভিং সিটে এবং নিজে তার পাশের সিটে গিয়ে বসল। অন্য তিনজন পেছনের সিটে উঠল।
সবাই উঠলে বার্নারডো তাকাল আহমদ মুসার দিকে। আহমদ মুসা বলল, ‘বিসমিল্লাহ’।
গাড়ি স্টার্ট দিল বার্নারডো।
গাড়ি ছুটে চলল পশ্চিমে ব্রুকোপনডোর দিকে।

চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার।
আহমদ হাত্তা অনুমান করতে পারছে না এখন রাত না দিন। তাকে এখানে নিয়ে আসার পর কতটা সময় গেছে বুঝতে পারছে না সে। হাতের ঘড়িটা তারা খুলে নিয়েছে, সময় মাপার কোন উপায় নেই।
চোখ বেঁধে তাকে নিয়ে এসেছে, চোখ বেঁধেই তাকে এখানে ঢুকিয়েছে। তাই সে এখন কোন এলাকায় কোথায় তা জানার সুযোগ হয়নি।
ব্যথা বেদনায় গোটা শরীর তার টনটন করছে। দুই হাতসহ শরীরকে চেয়ারের সাথে এমনভাবে বেঁধেছে যে তিল পরিমাণ নড়াচড়ার ও কোন উপায় নেই। কয় ঘন্টা ধরে সে এভাবে চেয়ারের সাথে বাঁধা আছে? হয় তো হবে নয় দশ ঘন্টা। কিন্তু তার মনে হচ্ছে কয়েকদিন কেটে গেছে। গোটা শরীর তার পাথরের মত স্থির হয়ে গেছে। পাথরের বেদনা যন্ত্রণা থাকে না, কিন্তু তার শরীরে এটাই এখন প্রধান সমস্যা।
যারা তাকে ধরে নিয়ে এসেছে তারা মুখোশ পরা ছিল। তাদের কাউকেই চেনা যায়নি। কিন্তু আহমদ হাত্তার বুঝতে কষ্ট হয়নি যে, তারা কারা?
হঠাৎ তার মনে পড়ল ফাতিমার কথা। বুকটা তার কেঁপে উঠল। আহমদ মুসা কি তাকে উদ্ধার করতে পেরেছে? যদি না পেরে থাকে! না পারলে কি ঘটেছে, বা কি ঘটতে পারে, তা ভাবতে পারছে না আহমদ হাত্তা। নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসতে চাচ্ছে তার।
এরই মধ্যে ঘরে একটা তীব্র লাল বাতি জ্বলে উঠল। অসহনীয় একটা আলো ছড়িয়ে পড়ল গোটা ঘরে। এর তুলনায় অন্ধকার ছিল আশীর্বাদের মত।
চোখ খুলতে কষ্ট হচ্ছে আহমদ হাত্তার।
এ সময় পশ্চিম দেওয়ালে ঘরের একমাত্র দরজাটা নিঃশব্দে খুলে গেল। ঘরে প্রবেশ করল মুখোশধারী একজন লোক। তার পেছন পেছন আরও চারজন লোক এসে ঘরটির সেই দরজায় দাঁড়াল। তাদেরও মুখে মুখোশ। হাতে স্টেনগান।
ঘরে ঢোকা মুখোশধারী এগিয়ে এল আহমদ হাত্তার দিকে।
আহমদ হাত্তার মুখোমুখি দাঁড়াল সে। বলল, তোমার জন্যে খুশির খবর হাত্তা যে, তোমার মেয়েকে আমাদের লোকেরা ধরে আনতে পারেনি। আমাদের এগারজন লোককে খুন করে কে একজন তাকে উদ্ধার করে নিয়ে গেছে। আমাদের ধারণা এই লোকই সেদিন মন্দির থেকে আমাদের বার তেরজন লোককে খুন করে ওভানডো টেরেককে মুক্ত করে নিয়ে গেছে। আমাদের বিশ্বাস সে ওয়াং আলীকে উদ্ধার করতে এসে ওভানডোকে পেয়ে যায়। আমাদের ধারণা এই দুঃসাহসী ঘটনা যে ঘটিয়েছে, সে লোকই সেদিন আমাদের দুই গাড়ি ভর্তি নয় দশজন লোককে খুন করে ওভানডোর স্ত্রীকে উদ্ধার করেছে। আমরা জানতে চাই মি. হাত্তা, এই সর্বনেশে লোকটি কে বা কারা?’
খুশি হলো আহমদ হাত্তা, দারুণ খুশি। অন্ততঃ ফাতিমা এ পশুদের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে। সেই সাথে কৃতজ্ঞতায় নুয়ে এল আহমদ হাত্তার হৃদয় আহমদ মুসার প্রতি। ফাতিমার কিছু হবে না বলে যে নিশ্চয়তা তিনি দিয়েছিলেন, তা তিনি রক্ষা করেছেন। কিন্তু এক রাতে এত লোক নিহত হয়েছে! আহমদ মুসাকে তাহলে কত কঠোর পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হয়েছে!
চিন্তায় ডুবে গিয়েছিল আহমদ হাত্তা। উত্তর পেল না মুখোশধারী। ধমকে উঠল সে, ‘বলুন। আমার প্রশ্নের জবাব দিন। এই সব হত্যাকান্ড কে ঘটিয়েছে?’
‘তাকে খুঁজে বের করার গরজ আপনাদের। আমি সাহায্য করবো কেন?’
‘এভাবে উত্তর দেবেন না। এটা আপনার সাংবাদিক সম্মেলন নয় যে, প্রশ্ন পাশ কাটিয়ে যাবেন। সত্ত্বর জবাব দিন’। বলল মুখোশধারী।
‘আপনারা সুরিনামের অনেক ক্ষতি করেছেন। আপনাদের কোন প্রশ্নের জবাব আমি দেবো না’। আহমদ হাত্তা বলল।
‘বলবেন, বলবেন। ওয়াং আলীকে চেনেন?’ বলল মুখোশধারী।
‘আপনারা তো তাকে বন্দী করে রেখেছেন’। আহমদ হাত্তা বলল।
‘আর বন্দী করে রাখবো না। আমার প্রশ্নের উত্তর না দিলে তাকে এখনি যমের বাড়ি পাঠাবো’।
বলে মুখোশধারী গেটের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘যাও একজন গিয়ে ওয়াং আলীকে নিয়ে এস’।
সংগে সংগেই একজন প্রহরী ছুটল।
দু’মিনিটের মধ্যে হাত বাঁধা ওয়াং আলীকে নিয়ে ঘরে প্রবেশ করল সে।
একুশ বাইশ বছরের সুন্দর যুবক ওয়াং আলী। চীনা চেহারা। তার সাথে কিছুটা সেমেটিক মিশ্রণ আছে, যা তাকে আরও সুন্দর করে তুলেছে। কিন্তু বিধ্বস্ত চেহারা তার। মাথার চুল উস্কু-খুস্কু। জামা-কাপড় ময়লা-কুচকানো। মলিন চেহারা।
ওয়াং আলীকে দেখেই আহমদ হাত্তা বলে উঠল, ‘একি অবস্থা করেছ তার? তার তো কোন অপরাধ নেই’।
‘রাখুন ওসব কথা। আমাদের প্রশ্নের জবাব দিবেন কিনা বলুন’।
বলেই সে দেয়ালে টাঙ্গানো চাবুক নিয়ে এসে প্রচন্ড এক ঘা লাগাল ওয়াং আলীকে।
কঁকিয়ে উঠল ওয়াং আলী।
বলল মুখোশধারী, ‘সবে এক ঘা লাগিয়েছি। মৃত্যু পর্যন্ত তার উপর চাবুকের ঘা পড়তেই থাকবে, জলদি আমাদের প্রশ্নের জবাব দিন’।
‘দেখ এই জুলুমের পরিণতি তোমাদের ভাল হবে না’।
‘ভালো হবে না’। বলে হো হো করে হেসে উঠল মুখোশধারী। বলল, ‘ভালো হবে না তো কি হবে? তুমি আবার প্রধানমন্ত্রী হবে ভেবেছ? কাল নমিনেশন পেপার সাবমিটের শেষ দিন। তুমি ছাড়া পাচ্ছো না এবং কোন দিনই ছাড়া পাবে না। ভাবছ তোমার দল ক্ষমতায় আসবে, পার্লামেন্টে আসবে? তাতেও গুড়ে বালি। তারা নমিনেশন পেপার সাবমিট করলেও নির্বাচন করতে পারবে না। আমাদের এবং আমাদের অনুমোদিত লোক ছাড়া কেউই প্রার্থী থাকবে না। সবাই প্রার্থীতা প্রত্যাহার করবে। যে প্রত্যাহার করবে না দুনিয়া থেকেই তাকে বিদায় হতে হবে, নির্বাচন করার সুযোগ তার হবে না’।
‘কিন্তু মনে রেখ, সবার উপরে আল্লাহ আছেন’। আহমদ হাত্তা বলল।
‘আল্লাহ-মাল্লার কথা আমি শুনতে চাই না। এখন বলুন, আমার প্রশ্নের জবাব দেবেন কিনা?’
আহমদ হাত্তা কিছু বলার আগেই ওয়াং আলী বলে উঠল, ‘স্যার আপনি এদের কোন সহযোগিতা করবেন না। লাভ হবে না। এরা এমনিতেই আমাকে মেরে ফেলবে। আপনি ওদের সহযোগিতা করলেও আপনাকে আমাকে ওরা বাঁচতে দেবে না। সুতরাং আল্লাহর উপর ভরসা করুন। এদের কোন কথা শুনবেন না’।
ওয়াং আলীর কথা শেষ হতেই মুখোশধারীর হাতের চাবুক ছুটে এল ওয়াং আলীর দিকে। তারপর চাবুকের এলোপাথাড়ি ছোবল পড়তে লাগল তার উপর অবিরামভাবে।
রক্তে ভিজে উঠেছে ওয়াং আলীর জামাকাপড়। মেঝের উপর এলিয়ে পড়েছে তার দেহ। কিন্তু ওয়াং আলীর মুখে শব্দ নেই। দাঁতে দাঁত চেপে সে সহ্য করছে অসহনীয় যন্ত্রণা। চিৎকার করলে, কাঁদলে ওদের উৎসাহ আরও বাড়বে, আর দুর্বল হয়ে পড়বেন আহমদ হাত্তা। অসহ্য যন্ত্রণার মধ্যেই এসব ভাবছে ওয়াং আলী।
আহত, রক্তাক্ত, লুটিয়ে পড়া দেহের উপরই অবিরাম চাবুক চালাচ্ছে মুখোশধারী।
চোখ বন্ধ করেছে আহমদ হাত্তা। মনে মনে আকুল প্রার্থনা করছে সে, ‘হে আল্লাহ, ওয়াং আলীকে তুমি রক্ষা কর, বাঁচাও তুমি তাকে। আমি আহমদ মুসার নাম ওদের দিতে চাই না। আহমদ মুসাও চান, সুরিনামে তার আগমনের কথা গোপন থাকুক’।
মেঝের উপর গড়াগড়ি দিয়ে কাতরাচ্ছিল ওয়াং আলী।
এক সময় দেখা গেল তার কাতরানী কমে গেছে। থেমে যাচ্ছে তার গড়াগড়ি।
এটা দেখে চিৎকার করে উঠল আহমদ হাত্তা, তোমরা খুন করে ফেললে ওয়াংকে’।
বলেই উপর দিকে মুখ তুলে কঁকিয়ে উঠল আহমদ হাত্তা, ‘হে আল্লাহ তুমি বাঁচাও ওয়াং আলীকে’।
তার কন্ঠ বিশাল ঘরটায় ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হলো।
ঠিক এই ধ্বনি প্রতিধ্বনির সাথে হঠাৎ মিশে গেল কয়েকটা স্টেনগান ও মেশিন রিভলবারের অব্যাহত গুলি বর্ষনের শব্দ।
ঘরের দরজায় দাঁড়ানো চার স্টেনগানধারী ছুটে গেল ওদিকে।
অবিরাম গুলীর শব্দ ছাড়া আর কিছু শোনা যাচ্ছে না।
হাতের চাবুক থেমে গেছে মুখোশধারীর। তার হাতে উঠে এসেছে রিভলবার। দু’চোখ দরজার দিকে স্থির নিবদ্ধ। বোধ হয় চার স্টেনগানধারী কি খবর আনে তারই অপেক্ষা করছে।
না তারা এল না।
কিন্তু দ্রুত গুলির শব্দ এগিয়ে আসছে এদিকে।
এ সময় একজন স্টেনগানধারী ছুটে এল ঘরে। বলল হাঁপাতে হাঁপাতে, ‘বস, সিআইবি পুলিশ এসেছে। ওপরের ঘরগুলো তারা সার্চ করেছে। তারা আন্ডার গ্রাউন্ড ফ্লোরে নামতে চাইলে আমাদের লোকেরা বাঁধা দেয়। বাধা অমান্য করে তাঁরা এগুতে চাইলে আমাদের লোকরা গুলী চালাতে গেলে তারা পাল্টা গুলি বর্ষণ শুরু করে। ওরা এগিয়ে আসছে’।
‘কয়জন পুলিশ?’
‘ঢুকেছে চারজন পুলিশ’।
‘চারজনকে শেষ করতে এতক্ষণ লাগে?’
‘মনে হয় ওপরে আমাদের কোন লোক বেঁচে নেই। এখন নিচে আমাদের তিনজন স্টেনগানধারী গিয়ে ওদের বাধা দিচ্ছে’।
‘চল দেখে আসি পুলিশের বাচ্চাদেরকে’। বলে সে ছুটল দরজার দিকে। তার পেছনে স্টেনগানধারী।
দরজা ওরা পার হতেই অবিরাম গুলীর ঝাঁক এসে ওদের ঘিরে ধরল। চোখের নিমিষে দরজার মুখে লুটিয়ে পড়ল তাদের দুজনের ঝাঁঝরা দেহ।
মুখ উপরে তুলে আহমদ হাত্তা কম্পিত কন্ঠে উচ্চারণ করল, আলহামদুলিল্লাহ।
পরক্ষণেই দুজন পুলিশ অফিসার ঘরে প্রবেশ করল।
একজন ছুটে এল আহমদ হাত্তার কাছে। বলল, ‘মি. হাত্তা, আপনি ঠিক আছেন? মেঝেয় ওকি ওয়াং আলী?’
‘আপনি আহমদ মুসা? পুলিশের পোশাকে?’ বিষ্মিত কন্ঠ আহমদ হাত্তার।
আহমদ মুসা আহমদ হাত্তার বাঁধন খুলে দিতে দিতে বলল,’ও কি ওয়াং আলী?’
‘হ্যাঁ’।
‘ঠিক আছে সে?’
‘আল্লাহর ইচ্ছা’।বলল আহমদ হাত্তা।
বাঁধন খোলা হয়ে গেলে ছুটে গেল আহমদ মুসা ওয়াং আলীর কাছে এবং পাঁজাকোলা করে তুলে নিল তাকে। সাথের পুলিশ সার্জেন্টকে আহমদ মুসা বলল আহমদ হাত্তাকে চলতে সাহায্য করার জন্যে।
‘পাঁজাকোলা করে নিয়ে একটু এগুতেই চোখ খুলল ওয়াং আলী। তাকাল আহমদ মুসার দিকে।
‘ওয়াং আলী তুমি ঠিক আছ?’ বলল আহমদ মুসা তাকে লক্ষ্য করে।
‘শুকরিয়া, আমাদের বাঁচিয়েছেন স্যার। ওরা বলে, সব পুলিশ নাকে ওদের। সব পুলিশ ওদের অবশ্যই নয়’। বলল ওয়াং আলী অনেকটা আচ্ছন্ন স্বরে।
‘অবশ্যই নয়, ওয়াং’। আহমদ মুসা বলল।
আহমদ মুসার উঠে এল গ্রাউন্ড ফ্লোরে।
গ্রাউন্ড ফ্লোরের সিঁড়ির মুখে দাঁড়িয়ে ছিল আরও দুজন সিআইবি পুলিশ। আহমদ মুসা গ্রাউন্ড ফ্লোরে উঠে এলে তাদের একজন বলল, ‘স্যার বাইরের গেটে অনেক লোক জমেছে। ওসিসহ থানার কয়েকজন পুলিশ এসেছে। ওরা ভেতরে ঢুকতে চাচ্ছিল, কিন্তু গেটে দাঁড়ানো বার্নারডো ওদের বাধা দিয়েছে’।
‘থানায় খবর কে দিয়েছে, এদের কেউ কি?’ আহমদ মুসা বলল।
‘কেউ বোধহয় খবর দেয়নি। থানা নাকি পাশেই। গোলা-গুলির শব্দ শুনে ওরা এসেছে’।
‘ঠিক আছে, চল’।
বলে আহমদ মুসা আগে আগে চলল। তার পেছনে আহমদ হাত্তা। সব শেষে তিনজন পুলিশ।
হঠাৎ আহমদ মুসা থমকে দাঁড়াল। আহমদ হাত্তার দিকে তাকিয়ে বলল, মি. হাত্তা, আপনার গায়ের জামাটা ছিঁড়ে খুলে ফেলুন’।
আহমদ হাত্তার উদ্দেশ্যে কথা শেষ করেই একজন পুলিশকে লক্ষ্য করে বলল আহমদ মুসা, ‘তুমি ছেঁড়া জামাটার একটা অংশ রক্তে ভিজিয়ে মি. হাত্তার কপালে বেঁধে দাও যাতে ব্যান্ডেজ বঁধা জামার একটা অংশ মুখের একপাশ দিয়ে নেমে আসে। আমরা চাই সাবেক প্রধানমন্ত্রী মি. হাত্তাকে থানার পুলিশসহ কেউ না চিনুক এবং সেই সাথে তাদের এটাও বুঝাতে হবে যে, জরুরী অবস্থায় মি. হাত্তার জামা ছিঁড়ে তার কপালে ব্যান্ডেজ বাঁধা হয়েছে’।
আহমদ মুসার কথা শেষ হবার আগেই মি. হাত্তা তার গায়ের জামা ছিঁড়ে ফেলেছে।
মেঝের এখানে ওখানে লাশ। রক্তে ভাসছে মেঝে। সেই রক্তে জামার একটা অংশ ভিজিয়ে একজন সিআইবি পুলিশ আহমদ হাত্তার কপাল ও মাথা জুড়ে ব্যান্ডেজ বেঁধে দিল।
একেতো গায়ে জামা নেই। তার উপর চোখের প্রান্ত পর্যন্ত নামানো ব্যান্ডেজ ও অর্ধেক মুখ ঢাকা। চেনাই যাচ্ছে না আহমদ হাত্তাকে।
‘ফাইন হয়েছে’। বলল আহমদ মুসা।
আবার হাঁটতে শুরু করল সে।
বেরিয়ে এল বাড়ি থেকে।
বাউন্ডারী ওয়ালের সাথের গ্রীলের গেটটি বন্ধ। গ্রীল গেটের এ পারে দাঁড়িয়ে আছে পুলিশ বেশে বার্নারডো। ওপারে দাঁড়িয়ে আছে কয়েকজন পুলিশ। পুলিশের পেছনে কৌতুহলী কিছু মানুষ।
গট গট করে হেঁটে আহমদ মুসা গেটে দাঁড়ানো বার্নারডোর কাছাকাছি হয়েই বলল, ‘গেট খুলে দাও, এদের গাড়িতে তুলতে হবে’।
আহমদ মুসার কোলে পাঁজাকোলা করে ধরে রাখা আহত রক্তাক্ত ওয়াং আলী।
গেট খুলে গেল।
গেটের সামনে পৌঁছে আহমদ মুসা পুলিশদের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘থানার ওসি সাহেব কে?’
গেট খোলার সাথে সাথে গেটের ওপারে দাঁড়ানো থানার পুলিশরা গেটের এক পাশে সরে দাঁড়িয়েছিল।
তাদের একজন এক ধাপ সামনে এগিয়ে এসে আহমদ মুসাকে স্যালুট করে বলল, ‘আমি স্যার’।
‘আপনাদের থানার পাশে ক্রিমিনালদের এত বড় আড্ডা ছিল?’ বলল আহমদ মুসা।
থানার ওসির মূখে একটা বিব্রত ভাব ফুঠে উঠল। বলল, ‘আমরা জানতাম এরা খুব ভালো লোক স্যার। সাতদিন আগে একজন মন্ত্রী এদের একটা পুরুষ্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে এসেছিলেন। উপরের পুলিশ অফিসারেরাও মাঝে মাঝে এখানে আসেন’।
‘সবাইকে এরা বোকা বানিয়েছিল। আমাদের উদ্ধার করা এ দুজন লোককে তারা কিডন্যাপ করে এনেছিল। আমাদের পৌঁছতে দেরী হলে এদের মেরেই ফেলতো ওরা’।
বলে একটু থেমেই আহমদ মুসা আবার বলল, ‘ওসি সাহেব আপনারা ভেতরে গিয়ে লাশের ব্যবস্থা করুন। যা দেখলেন ও শুনলেন তার উপর একটা মামলা রেকর্ড করুন। এদের হাসপাতালে পৌঁছিয়েই প্রয়োজনীয় আরও বিষয় আমি আপনার থানাকে জানিয়ে দেব’।
আহমদ মুসা থামতেই ওসি লোকটি বলে উঠল, ‘আমাদেরকে এতক্ষণ ভেতরে ঢুকতে দেয়নি স্যার’।
হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘আমার নির্দেশ ছিল কাউকে ঢুকতে না দেবার। থানার পুলিশও ঢুকতে পারবে না, সে নির্দেশ আমার ছিল না। সে ভূল করেছে। তবে সে আমার নির্দেশ পালন করেছে’।
‘ধন্যবাদ স্যার। আমি বুঝেছি’। বলল থানার ওসি।
‘ধন্যবাদ ওসি সাহেব। আপনারা তাহলে ভেতরে যান। আমরা চলি’।
বলে আহমদ মুসা প্রাচীরের বাইরে দাঁড়ানো গাড়ির দিকে চলল। কৌতুহলী মানুষ যারা গেটের বাইরে ছিল তারা দূরে সরে গেছে।
আহমদ মুসার সাথে বাইরে বেরিয়ে এল সবাই।
সবাই গাড়িতে উঠল।
গাড়ির পেছনে তিনজন সিআইবি পুলিশবেশীর সাথে তোলা হলো আহমদ হাত্তা ও ওয়াং আলীকে। আর গাড়ির ড্রাইভং সিটে বসল বার্নারডো। তার পাশে আহমদ মুসা।
গাড়ি তখন চলতে শুরু করেছে। আহমদ মুসা বলল, ‘ধন্যবাদ বার্নারডো’।
‘কি জন্যে স্যার?’ বলল বার্নারডো।
‘তুমি গেটে থানা পুলিশকে ঠেকিয়ে রাখতে পেরেছিলে এজন্যে’। আহমদ মুসা বলল।
‘ওসি সাহেব জোরাজুরি শুরু করেছিলেন ঢোকার জন্যে। বলছিলেন যে, নিশ্চয় সিআইবি’র কিছু ভূল হচ্ছে। এখানে যারা থাকেন তারা সরকারেরই লোক। আমরা তাদের চিনি। আমি সিআইবি’র স্যারের সাথে কথা বললেই তিনি সব বুঝবেন’। আমি ধমক দিয়ে বলেছিলাম, গেটের এক ইঞ্চি ভেতরে ঢুকলে গুলি করবো। তারা আর ঢোকেনি, কিন্তু গজরাচ্ছিল’। বলল বার্নারডো।
‘তুমি ঠিক করেছ। ধন্যবাদ বার্নারডো’। আহমদ মুসা বলল।
‘ধন্যবাদ স্যার’। বার্নারডো বলল।
তীর বেগে চলছিল গাড়ি।
কিছুক্ষণের মধ্যে ব্রুকোপনডোর বাইরে বেরিয়ে এল গাড়ি। রাস্তা ছেড়ে প্রবেশ করল জংগলে।
জংগলটা একটা টিলা, টিলার শেষ প্রান্তে এসে দাঁড়াল গাড়ি। টিলার পরেই বিশাল এক জলাশয়।
সেখানে একটা মাইক্রো দাঁড়িয়েছিল।
আহমদ মুসা লাফ দিয়ে গাড়ি থেকে নামল। সাথে সাথে সবাই নেমে পড়ল।
পরিকল্পনা আগেই করা ছিল। সবাই পুলিশের পোশাক খুলে মাইক্রোতে রাখা নিজ নিজ পোশাক পরে নিল। পুলিশের পোশাক রেখে দিল সিআইবি পুলিশের গাড়িতে। আহমদ হাত্তাকে নতুন পোশাক পরানো হলো।
মাইক্রোতে আগেই তোলা হয়েছে ওয়াং আলীকে। আহমদ হাত্তাও মাইক্রোতে উঠলেন।
আহমদ মুসা অন্যদের নিয়ে সিআইবি পুলিশের গাড়িটাকে ঠেলে নিচের জলাশয়ে ফেলে দিল।
তারপর সবাই গাড়িতে উঠে বসল।
এবারও ড্রাইভিং সিটে বার্নারডো।
গাড়ি স্টার্ট নিল।
উঠে এল তাদের গাড়ি পারামারিবো হাইওয়েতে।
সন্ধ্যার অন্ধকার তখন গাঢ় হয়ে উঠেছে। গাড়িতেই মাগরিবের নামাজ পড়ে নিল সবাই। নামাজ পড়ল বার্নারডোও। নামাজ শেষে বার্নারডো বলল, ‘যতদিন গ্রামে পরিবারের সাথে ছিলাম নামাজ পড়েছি। আজ পনের বছর পর আবার নামাজ পড়লাম। খুব ভাল লাগল। মনে হচ্ছে আজ আমি নতুন মানুষ’।
আবার গাড়ি চলতে শুরু করল পারামারিবোর উদ্দেশ্যে।
‘মি. আহমদ মুসা, আপনাকে ধন্যবাদ। আপনাদের পুলিশের পোশাকে দেখে যে বিষ্ময়ের সৃষ্টি হয়েছিল তা আমার এখনও কাটেনি’। বলল আহমদ হাত্তা নাসুমন। প্রথম মুখ খুলল সে।
‘এ জন্যে ধন্যবাদ দিতে হবে এ্যডিশনাল আইজিপি ও পারামারিবোর সহকারী পুলিশ কমিশনারকে। আপনার স্বার্থে ওরা এই সহায়তা দিয়েছেন’। আহমদ মুসা বলল।
‘কিন্তু ওদের সাথে যোগাযোগ হলো কি করে?’ পুনরায় জিজ্ঞেস করল আহমদ হাত্তা।
‘এজন্য ধন্যবাদ দিতে হবে বার্নারডোকে। সেই যোগাযোগ করে পুলিশের পোশাক ও পুলিশের গাড়ির বন্দোবস্ত করেছে’। বলল আহমদ মুসা।
‘কিন্তু বার্নারডো এটা কিভাবে করল? সে তো নিও নিকারীর লোক। সকালে এসেছে পারামারিবোতে’। আহমদ হাত্তা বলল।
‘ও! আপনি জানেন না। তার আরও দুটি বড় পরিচয় আছে। একটি হলো, সে একজন গোয়েন্দা অফিসার। ট্যাক্সিক্যাব চালানো তার একটা ছদ্মবেশ। তাছাড়া পারামারিবোর সহকারী পুলিশ কমিশনার আপনার ভক্ত ও তার এলাকার লোক। এ্যডিশনাল আইজি আপনার লোক এবং বার্নারডোর পূর্ব পরিচিত। সুতরাং তাদের সাথে সাক্ষাত করতে তার অসুবিধা হয়নি’। আহমদ মুসা বলল।
‘ধন্যবাদ বার্নারডো’। বলল আহমদ হাত্তা।
আহমদ মুসা তড়িঘড়ি করে বলে উঠল, ‘একটু পরে ধন্যবাদ দেবেন। বলতে ভূলে গেছি, বার্নারডোর আরেকটা বড় পরিচয় আছে। সে মুসলমান’।
‘ও! অভিনন্দন বার্নারডো। দেখছি, আল্লাহ আমাদেরকে সব দিক থেকেই সাহায্য করেছেন’। উচ্ছসিত কন্ঠে বলল আহমদ হাত্তা।
একটু থেমেই আহমদ হাত্তা আবার বলে উঠল, ‘মি. আহমদ মুসা আপনাকে আপনার টিমকে ধন্যবাদ। আপনারা পৌঁছতে আরেকটু দেরী হলে ওয়াং আলীকে বাঁচানো যেতো না’।
‘আল্লাহ যেটা চেয়েছেন, সেটাই হয়েছে। সব প্রশংসা তাঁরই’। আহমদ মুসা বলল।
‘আলহামদুলিল্লাহ। ফাতিমা কোথায় মি. আহমদ মুসা?’ বলল আহমদ হাত্তা।
‘আপনি ওভানডোকে চেনেন, গতরাতে মন্দিরের বন্দীখানা থেকে তাকে উদ্ধার করেছি, ফাতিমা তার বাড়িতে আছে। ওভানডোর বোন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে এবং ফাতিমার সাথে পরিচিত’। আহমদ মুসা বলল।
আপনি ঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন আহমদ মুসা। তাকে বাড়িতে রাখা ঠিক হতো না এবং অন্য কোথাও তাকে রাখাও যেত না’। বলল আহমদ হাত্তা।
‘কিন্তু ওভানডোরা খুব বিপদে। সে কিডন্যাপ হয়েছিল, তার স্ত্রীকেও কিডন্যাপ করে নিয়ে যাচ্ছিল। তাদের বাড়ি আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা আছে। তিলক লাজপত পালের ‘মাসুস’-এর লোকরা এর সাথে জড়িত’। আহমদ মুসা বলল।
‘সর্বনাশ। তাহলে…….’।
কথা শেষ না করেই থেমে গেল আহমদ হাত্তা। তার কন্ঠে উদ্বেগ।
‘একটা বিহিত না হওয়া পর্যন্ত আমি ওখানে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছি’। আহমদ মুসা বলল।
‘কিন্তু তাদের এ বিপদ কেন?’ জিজ্ঞেস করল আহমদ হাত্তা।
‘এর পেছনে গুরুতর একটা কাহিনী আছে। আপনাকে পরে বলব। তবে একটা কথা বলে রাখি ওভানডোদের টেরেক পরিবার ও তাদের বিরান দুর্গের একটা মুসলিম ব্যাকগ্রাউন্ড আছে’। আহমদ মুসা বলল।
‘অদ্ভূত কথা শোনালেন আহমদ মুসা। গল্প শুনেছেন, না এর পেছনে কোন ফ্যাক্ট আছে?’ বিষ্ময়-বিজড়িত কন্ঠে বলল আহমদ হাত্তা।
‘ফ্যাক্ট আছে, রূপকথা নয়’। হেসে বলল আহমদ মুসা।
‘তবু আমার কাছে অবিশ্বাসই মনে হচ্ছে’। চিন্তিত কন্ঠে বলল আহমদ হাত্তা।
‘আপনার সংশয় ইনশাআল্লাহ দূর হবে’।
কথাটা শেষ করেই আহমদ মুসা একটু থামল এবং পরক্ষণেই আবার বলে উঠল, ‘আপনি কোথায় উঠবেন ঠিক করেছেন? বাড়িতে নিশ্চয় নয়?’
‘আপনার মত চাই আহমদ মুসা’। বলল আহমদ হাত্তা।
‘কালকে নমিনেশন পেপার সাবমিট পর্যন্ত অন্তত আপনার একটু সরে থাকা দরকার’। আহমদ মুসা বলল।
‘আমিও তাই ভাবছি। তাহলে আমাদের আরও একটা রেস্ট হাউজ আছে, সেখানে উঠতে চাই। ওটাও একটা প্রাইভেট বাসার মত। আমার পরিবার ছাড়া এর সন্ধান আর কেউ জানেনা’। বলল আহমদ হাত্তা।
‘নিরাপত্তা ব্যবস্থা ওখানে কেমন?’ জিজ্ঞেস করল আহমদ মুসা।
‘গেটের সিকিউরিটি বক্সে দুজন করে সার্বক্ষণিক প্রহরী থাকে। ওখানে গিয়ে আরও কিছু বাড়তি ব্যবস্থা করে ফেলা যাবে’। বলল আহমদ হাত্তা।
‘ঠিক আছে, তাদের সাথে বার্নারডো এবং এরা তিনজনও আপনার ওখানে থাকুক’। আহমদ মুসা বলল।
‘ওরা তিনজনতো থাকবেই। বার্নারডো থাকলে খুবই ভালো হয়। আমি খুবই কৃতজ্ঞ হবো’। বলল আহমদ হাত্তা।
‘ঠিক আছে, তাহলে এই কথাই। আমি আপনাদের ওখানে নামিয়ে ওভানডোর ওখানে যাবো’। আহমদ মুসা বলল।
‘ওখানে তো আপনার যেতেই হবে। কিন্তু আগামী কাল নিয়ে কি চিন্তা ভাবনা করছেন। আমি কিছুই ভাবতে পারছি না’।
‘নমিনেশন পেপার সাবমিট করতে যাওয়ার বিষয় নিয়ে কাল সকালে আমরা ভাবব। বার্নারডোকে কথা বলতে হবে সহকারী পুলিশ কমিশনারের সাথে। ইতোমধ্যে আপনাকে যে কাজটা করতে হবে সেটা হলো, আপনাদের নির্বাচনী অফিসের চারদিকটা কাউকে বুঝতে না দিয়ে আপনাদের নিজেদের লোকদের দখলে আনতে হবে। কটায় আপনি যাবেন সেটা তাদের জানানো হবে আপনি সেখানে পৌঁছার ৫ মিনিট আগে। তাদের দায়িত্ব হবে নির্বাচনী অফিসে ঢোকার পথটাকে নিরাপদ রাখা’। আহমদ মুসা বলল।
‘হ্যাঁ, এ ব্যবস্থা আমি রাতেই ঠিক করে ফেলব’। বলল আহমদ হাত্তা।
‘বাকি কাজটা আমি করব। আরও করণীয় থাকলে সেটা সহকারী পুলিশ কমিশনার করবেন’। আহমদ মুসা বলল।
‘ধন্যবাদ মি. আহমদ মুসা। এখন গাড়িটা সামনের এভিনিউ ধরে ডান দিকে যাবে’। এই এভিনিউ-এর শেষ মাথায় সুরিনাম নদীর একদম তীরের উপর রেস্ট হাউজটা’। বলল আহমদ হাত্তা।
আর মাত্র দশ মিনিটের মধ্যেই গাড়িটা পৌঁছে গেল এভিনিউটির শেষ মাথায় সুরিনাম নদীর তীরে।
গাড়ি দাঁড়াল।
‘মি. হাত্তা, ওয়াং আলীর চিকিৎসা নিশ্চয় বাসায় মানে এখানেই হবে?’ আহমদ মুসা বলল।
‘হ্যাঁ, মি. আহমদ মুসা। নিজস্ব ক্লিনিক আছে, তবু কোন ঝুঁকি নিতে চাইনা। এখানে কোন অসুবিধা হবে না। আমাদের পারিবারিক ডাক্তারকে টেলিফোন করলে এখুনি এসে যাবে’। বলল আহমদ হাত্তা।
‘আপনি ঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন মি. হাত্তা’। আহমদ মুসা বলল।
বার্নারডো নেমে গেছে ড্রাইভিং সিট থেকে। পেছনে ওরা নামিয়ে নিচ্ছে ওয়াং আলীকে। শেষে নামলেন আহমদ হাত্তা।
আহমদ মুসাও নামল।
প্রশস্ত গাড়ি বারান্দা।
রেস্ট হাউজটি চারতলা। খুব সুন্দর দেখতে।
মি. হাত্তা, এখানকার টেলিফোন নাম্বারটি দিন’। বলল আহমদ মুসা, আহমদ হাত্তাকে লক্ষ্য করে।
‘উপরে চলুন আহমদ মুসা, একটু দেখবেন’। বলল আহমদ হাত্তা।
‘না মি. হাত্তা, পোশাক আশাকের এই অবস্থা নিয়ে নয়’। আহমদ মুসা বলল।
রক্তাক্ত ওয়াং আলীকে কোলে নেয়া আহমদ মুসার দুহাত ও সামনের দিকটা রক্তে ভিজে গিয়েছিল। জামা পাল্টালেও নতুন সাদা শার্টটা নষ্ট হয়ে গেছে রক্তের দাগ লেগে।
‘ঠিক, তাহলে আজ নয়’। বলে আহমদ হাত্তা কিছু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা কেয়ার টেকারের দিকে এগিয়ে গেল। তাকে কিছু বলতেই সে পকেট থেকে একটা কার্ড বের করে মি. আহমদ হাত্তার হাতে দিল। আহমদ হাত্তা কার্ডটি নিয়ে আহমদ মুসাকে দিল।
আহমদ মুসা কার্ডে একবার চোখ বুলিয়ে দেখল তাতে রেস্টহাউজের ঠিকানা ও টেলিফোন নম্বর দুই-ই রয়েছে।
‘তাহলে চলি মি. হাত্তা’। বলে আহমদ মুসা হাত্তার সাথে হ্যান্ডশেক করে এগুলো ওয়াং আলীর দিকে।
ওয়াং আলীকে তখন স্ট্রেচারে তোলা হয়েছে। পূর্ণ সজ্ঞানে এখন ওয়াং আলী।
আহমদ মুসা তার মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, ‘সব ঠিক হয়ে যাবে ইয়াংম্যান। আল্লাহ তোমাকে সত্বর সুস্থ করুন’।
ওয়াং আলী প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকাল অপরিচিত ও অসাধারণ আকর্ষণীয় যুবক আহমদ মুসার দিকে। বিষ্ময় ফুটে উঠল তার চোখে রক্তের দাগ লাগা আহমদ মুসার জামা-কাপড় দেখে।
পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল আহমদ হাত্তা নাসুমন। সে ওয়াং আলীকে বলল আহমদ মুসার দিকে ইংগিত করে, ‘ইনিই আমাদের উদ্ধার করেছেন ওয়াং। সংজ্ঞাহীন অবস্থায় তোমাকে কোলে করে বের করে এনেছেন ইনিই। আরও অনেক চমকপ্রদ কাহিনী আছে, শুনবে তুমি’।
আহমদ মুসা সোজা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পাশের বার্নারডোকে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘সাবধান থেকো বার্নারডো’।
‘জ্বি স্যার। দোয়া করুন’। বলল বার্নারডো।
‘রাতেই তোমার সাথে একবার আমি কথা বলব। তোমাকে সকালেই সম্ভবতঃ সহকারী পুলিশ কমিশনারের কাছে যেতে হবে’।
‘ঠিক আছে স্যার। আমি সব সময়ের জন্য প্রস্তুত’। বলল বার্নারডো।
হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘আর স্যার নয় বার্নারডো। মুসলমানরা সবাই ভাই ভাই’।
‘আসি’। বলে সবাইকে সালাম জানিয়ে আহমদ মুসা এসে গাড়িতে উঠল।
স্টার্ট নিয়ে গাড়ি উঠে এল এভিনিউতে।
ছুটল গাড়ি পূর্ব পারামারিবোর টেরেক স্টেটের দিকে।

ওভানডোদের টেরেক স্টেটের এলাকায় পৌঁছে গেছে আহমদ মুসা।
টেরেক স্টেট এর নাম মনে পড়ায় আহমদ মুসার মনে প্রশ্ন জাগল ‘টেরেক’ কোন ভাষার শব্দ। ডেনিস, পর্তূগীজ, স্প্যানিশ কিংবা ইংরেজী ভাষায় এ ধরণের শব্দ নেই। সুরিনামের কোন ভাষারও শব্দ এটা নয়। আফ্রিকান কোন ভাষা থেকেও এ শব্দ আসেনি। ওভানডোরা ছাড়াও অনেককে জিজ্ঞেস করে আহমদ মুসা এ শব্দের কোন হদিস পায়নি। কারও নাম অনুসারে হয়তো এই নামকরণ করা হয়েছে। কিন্তু এমন নামতো কারো হবার কথা নয়।
আহমদ মুসার গাড়ি এখন চলছে টেরেক স্টেটের বাউন্ডারী ওয়ালের পাশ দিয়ে।
বিশাল টেরেক স্টেটটি চারদিক থেকে বাউন্ডারী প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। টেরেক স্টেটের পশ্চিম পাশে সরকারী অফিস এলাকা। বিশেষ করে কোর্ট ভবনগুলো এখানে অবস্থিত। উত্তর পাশে সমুদ্র উপকূলের সমান্তরালে বিশাল এলাকা জুড়ে সেনা ছাউনি এবং সেনা বাহিনীর সদর দফতর। দক্ষিণের বাউন্ডারী ওয়ালের সমান্তরালে ওসেয়ান হাইওয়ে। হাইওয়েটি সামনে বীচ পর্যন্ত এগিয়ে গিয়ে উত্তর দিকে মোড় নিয়ে বীচের পশ্চিম প্রান্ত ধরে এগিয়ে গেছে উত্তর সুরিনামের দিকে। টেরেক স্টেটের পূর্ব বাউন্ডারী ওয়ালের ধার ঘেঁষেই এ রাস্তা উত্তরে এগিয়েছে। আর টেরেক স্টেটের দক্ষিণ বাউন্ডারী প্রাচীরের পরেই যে ওসেয়ান হাইওয়ে তার সমান্তরালেই সুরিনাম নদী বয়ে গেছে সাগরের দিকে।
সবদিক থেকেই টেরেক স্টেটের অবস্থান অত্যন্ত লোভনীয়। খুব ভালো লাগে টেরেক স্টেট আহমদ মুসার। আহমদ মুসার যখন ভালো লেগেছে, তখন সবারই ভালো লাগার কথা। তার উপর এর সাথে যোগ হয়েছে টেরেক স্টেটের মাটির তলায় জাহাজ বোঝাই স্বর্ণ মজুদ থাকার কথা। সব মিলিয়েই আজ মহাবিপদ চেপেছে টেরেক স্টেটের মাথায়।
টেরেক স্টেটের একটাই মাত্র গেট। সেটা দক্ষিণ প্রাচীরে, ওসেয়ান হাইওয়ের মুখোমুখি।
টেরেক স্টেটের দক্ষিণ বাউন্ডারী প্রাচীরের সমান্তরালে ওসেয়ান হাইওয়ে ধরে চলছে আহমদ মুসার গাড়ি।
টেরেক স্টেটের গেট আর বেশি দূরে নয়। গেটের দুপাশের দুটি আলো দেখতে পাচ্ছে আহমদ মুসা।
হঠাৎ একটা তীক্ষ্ণ ও কর্কশ শব্দ কানে এল আহমদ মুসার।
শব্দটা সামনে থেকেই আসছে।
সামনে তাকিয়ে উৎকর্ণ হলো আহমদ মুসা।
হ্যাঁ, শব্দটা টেরেক স্টেটের গেট থেকে আসছে। কেউ ভারী রড দিয়ে যেন গেটে আঘাত করছে।
বুকটা ছ্যাৎ করে উঠল আহমদ মুসার। কেউ কি বাইরে থেকে গেট খোলার চেষ্টা করছে।
গাড়ির গতি স্লো করে দিয়েছিল আহমদ মুসা। এখন একেবারে থামিয়ে দিল গাড়ি।
আহমদ মুসা গাড়ির জানালা দিয়ে উঁকি মারল। গেটের আলোয় সে দেখতে পেল গেটের সামনে দুটি মিনি মাইক্রো দাঁড়িয়ে আছে।
দুজন লোক তাদের হাতের রড দিয়ে গেটে আঘাত করছে আর ডাকছে কাউকে। নিশ্চয় গেটম্যানকে।
দুটি গাড়িই অপরিচিত মানে ওভানডোদের নয়। আর গাড়ি দুটি ওভানডোদের হতে পারে না এই কারণে যে, ওভানডোরা গেটে ধাক্কাবার কথা নয়। নির্দিষ্ট সংকেত আছে সে সংকেত অনুসারে হর্ণ বাজালেই কিংবা টোকা দিলেই দরজা খুলে যায়।
সুতরাং গাড়ি দুটি বাইরের।
ঘড়ির দিকে তাকাল আহমদ মুসা। রাত ১১টা বাজে। এ সময় খবর না দিয়ে বাইরের কেউ টেরেক স্টেটে আসার কথা নয়। তাহলে কি ঐ শত্রুদের কেউ?
আহমদ মুসা গাড়ির আলো আগেই নিভিয়ে দিয়েছে। গাড়িটাকে প্রাচীরের পাশে অন্ধকার এলাকায় সরিয়ে নিল আহমদ মুসা।
আহমদ মুসা হোলস্টারে হাত দিয়ে তার এম-১০ একবার স্পর্শ করল। তারপর গাড়ি থেকে নেমে এল আহমদ মুসা।
গাড়ি থেকে নেমে আহমদ মুসা প্রাচীরের গোড়া ধরে ছায়ান্ধকারের মধ্যে দিয়ে বিড়ালেল মত নিঃশব্দে এগুতে লাগল। দেয়ালের গোড়া দিয়ে মাঝে মাঝে ছোটখাট গাছ-গাছড়া থাকায় এগুতে তার সুবিধা হলো।
গেটের একদম পাশে একটা ছোট্ট গাছের আড়ালে গুঁড়ি মেরে বসল আহমদ মুসা। গেটের সবটা দেখা যায় সেখান থেকে।
আহমদ মুসা দেখল, যে দুজন রড দিয়ে দরজায় আঘাত করে গেটম্যানের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছিল, তারা গেট থেকে সরে গাড়ি দুটির কাছে এসে বলল, ‘এভাবে দরজা খোলা যাবে না’। এর পরেই গাড়ি থেকে একজনের ভারী কন্ঠ ধ্বনিত হলো, ‘তোমরা সবাই নেমে পড়। গেট টপকাতে হবে’। কন্ঠটি থেমে যাবার সংগে সংগেই দুগাড়ি থেকে দশজন লোক নেমে এল। তাদের সবার হাতে স্টেনগান। সামনের গাড়ির সামনের সিট থেকে সর্বশেষে নামল গেরুয়া ইউনিফরম পরা কপালে তিলক আঁকা প্রায় ছয়ফুট দীর্ঘ একজন মধ্যবয়সী মানুষ। নেমেই সে বলল, ‘সবাই গেট ডিঙানোর দরকার নেই। চারজন গেটের উপরে উঠবে। দুজন পাহারা দেবে আর দুজন নিচে নেমে গেট খুলে দেবে’।
আহমদ মুসা চিন্তা করল, ওদেরকে গেট খুলে ভেতরে ঢোকার সুযোগ দেয়া ঠিক হবে না। এদের মটিভ এখন আহমদ মুসার কাছে পরিষ্কার। এরা তিলক লাজপত পালের ‘মায়ের সূর্য সন্তান’ দলের লোক নিশ্চয়। এসেছে ওভানডোর বাড়িতে হত্যা অভিযানে।
আহমদ মুসা তার এম-১০কে ওদের দিকে তাক করল। তারপর তর্জনি নিয়ে গেল এম-১০ এর ট্রিগারে।
উঠে দাঁড়াল আহমদ মুসা। বলে উঠল উচ্চ কন্ঠে, ‘আপনাদের মতলব সিদ্ধ হবে না। সবাই অস্ত্র ফেলে দিন’। ছুরির তীক্ষ্ণ ফলার মত ধারালো আহমদ মুসার কন্ঠস্বর।
ওরা সবাই চমকে ফিরে তাকিয়েছিল আহমদ মুসার দিকে। কিন্তু গেরুয়া ইউনিফরম ধারীর চোখ আহমদ মুসার দিকে ফেরার সাথে সাথে তার ভয়ংকর উজিগানটাও ফিরেছিল আহমদ মুসার দিকে।
আহমদ মুসার অতি সতর্ক দৃষ্টিতে ধরা পড়েছিল কি ঘটতে যাচ্ছে। চোখের পলক পরিমাণ সময়ও নষ্ট হয়নি তার। তার তর্জনি চেপে বসেছিল এম-১০ এর ট্রিগারে। গুলীর প্রথম ঝাঁকটা ছুটে গেল গেরুয়া ইউনিফরমধারীকে লক্ষ্য করে। তারপর চোখের পলকে তার এম-১০ এর ব্যারেল ঘুরে এল দুটি মাইক্রোর পাশে দাঁড়ানো লোকদের উপর দিয়ে।
ওদের কল্পনার বাইরে আকষ্মিকভাবে ঘটে গেল ঘটনা। আক্রমন ও আত্মরক্ষার কোন সুযোগই তারা পেল না। গেরুয়া ইউনিফরমধারী দারুণ ক্ষিপ্রতার সাথে আক্রমনে আসার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু সময়ে কুলায়নি। আহমদ মুসার প্রস্তুত এম-১০ তার আগেই আক্রমণে অবতীর্ণ হয়েছে। এরই ফল হিসেবে দুগাড়ির পাশে ৯টি লাশ পড়ে গেল।
এদের উপর দিয়ে এম-১০ ঘুরিয়ে নেবার পর আহমদ মুসা এম ১০-এর ট্রিগার থেকে তর্জনী সরিয়ে নিয়েছিল। তার এম-১০ এর নলও নিচের দিকে একটু নুইয়ে পড়েছিল। এ সময় হঠাৎ আহমদ মুসার খেয়াল হলো ওদের চারজন তো গেটে উঠছিল।
বিদ্যুত বেগে আহমদ মুসার চোখ ঘুরে গেল গেটে। দেখল, গেটের একজনের স্টেনগানের ব্যারেল উঠে আসছে তাকে লক্ষ্য করে।
দেখার পর এক মুহূর্তও সে নষ্ট করেনি। পা দুটোকে ঠিক রেখে দেহটাকে সে ঠেলে দিল প্রাচীরের গোড়ায়।
আহমদ মুসাকে তাক করা লোকটিও গুলী করতে দেরি করে ফেলেছিল। এক হাতে গেট ধরে রেখে অন্য এক হাতে স্টেগান আগলাতে একটু দেরি করে ফেলেছিল সে। তার গুলীর ঝাঁক যখন ছুটে এল আহমদ মুসার লক্ষ্যে, তখন আহমদ মুসার দেহটি প্রাচীরের গোড়ায়। গেটের পাল্লায় দাঁড়িয়ে ছোঁড়া গুলী দেয়ালের এই গোড়ায় আসা সম্ভব নয় মাঝখানে প্রাচীরের কোণা আড়াল সৃষ্টি করার কারণে।
কিন্তু ওদের স্টেনগানের গুলি সমানে ছুটছে আহমদ মুসা যেখানে দাঁড়িয়েছিল, সেই স্থান লক্ষ্যে।
আহমদ মুসা দেয়ালের গোড়া ধরে ক্রলিং করে দ্রুত এগুতে লাগল গেটের দিকে।
আহমদ মুসা লক্ষ্য করল, ওদের স্টেনগানের গুলীর উচ্চতা কমে আসছে। এর অর্থ ওরা গুলী ছুঁড়তে ছুঁড়তে ধীরে ধীরে গেট থেকে নেমে আসছে, বুঝল আহমদ মুসা। আহমদ মুসা তার ক্রলিং দ্রুত করল।
গেটের দিক থেকে এক গুচ্ছ শব্দ ভেসে এল। ওরা গেটের পাল্লা থেকে নিচে মাটিতে লাফিয়ে পড়েছে, বুঝল আহমদ মুসা।
আহমদ মুসা থেমে গেল।
তার এম -১০ তাক করল প্রাচীরের সমান্তরালে। তাকে খোঁজার জন্যে ওদেরকে অবশ্যই গেট ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে আসতে হবে। বেরিয়ে না এলে তাকে টার্গেটও করতে পারবে না। ওদের চেয়ে আহমদ মুসা সুবিধাজনক অবস্থানে আছে। খুশি হলো আহমদ মুসা।
ওদের গুলী বন্ধ হয়ে গেছে। বুঝল আহমদ মুসা এটা ঝড়ের পূর্বক্ষণ।
আহমদ মুসার তর্জনি এম-১০ এর ট্রিগারে।
রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করছে সে।
হঠাৎ ঝড় শুরু হয়ে গেল। ওরা চারজন গুলি করতে করতে ঝড়ের বেগে বেরিয়ে এল।
আহমদ মুসার তর্জনি পলক পরিমাণ সময়ও বিলম্ব করেনি। ওদের দেহ প্রাচীরের সমান্তরাল রেখা অতিক্রম করে দৃশ্যমান হবার সাথে সাথে তর্জনি চেপে বসেছে এম-১০ এর ট্রিগারে।
গুলীর অব্যাহত ঝাঁক ছুটে গেল গেটের সামনের প্রাচীরের সমান্তরাল এলাকা জুড়ে।
ওরা গুলী করতে করতে বেরুল বটে, কিন্তু এম-১০ এর গুলী বৃষ্টির দেয়াল তারা অতিক্রম করতে পারল না। ঝাঁক ধরে আসা বুলেটের আঘাত নিয়ে ওদের দেহ ছিটকে পড়ল এদিকে সেদিকে।
এ সময় পূর্ব দিক থেকে পুলিশের একাধিক হুইসেলের আওয়াজ ভেসে এল।
আহমদ মুসা বুঝল, গুলীর আওয়াজ পেয়ে টহল পুলিশ এদিকে এগিয়ে আসছে।
আহমদ মুসা সিদ্ধান্ত নিল, এই মুহূর্তেই তাকে এখান থেকে সরে যেতে হবে। পুলিশের হাংগামা চুকলে তারপর ফিরে আসা যাবে।
মাথা নিচু করে গুড়ি মেরে আহমদ মুসা দৌড় দিল প্রাচীরের গোড়া ধরে পশ্চিম দিকে।
কিছু দুরে প্রাচীরের পাশে আহমদ মুসার গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে।
আহমদ মুসা গিয়ে গাড়িতে উঠল। গাড়ির আলো নিভিয়ে রেখেই দ্রুত গাড়ি সে ঘুরিয়ে নিল।
ছুটল আহমদ মুসার গাড়ি ওসেয়ান হাইওয়ে ধরে পশ্চিম দিকে। একবার পেছনে তাকিয়ে আহমদ মুসা দেখল, পুলিশ গেটের কাছাকাছি পৌঁছেছে। আহমদ মুসা ভাবল, পুলিশের চোখ গেটের দিকে কেন্দ্রিভূত থাকায় তার আলো নেভানো গড়ি তাদের নজরে নাও পড়তে পারে।
কোর্ট কমপ্লেক্সের পশ্চিমে এবং সুরিনাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্বে মাঝখানের জায়গাটিতে একটা পার্ক আছে। নাম ইস্ট পার্ক। পার্কের বাউন্ডারী ও রাস্তা বরাবর মাঝখানে অনেক জায়গা। এ জায়গায় সারিবদ্ধ ঝাউ ও অন্যান্য গাছ।
আহমদ মুসা এইসব গাছের আড়াল নিয়ে তার গাড়ি দাঁড় করাল।
ঘড়ি দেখল আহমদ মুসা। রাত সাড়ে ১১টা বাজে।
আহমদ মুসা নিশ্চিত তাকে দীর্ঘ সময় এখানে কাটাতে হবে। ওখানকার পুলিশ হাংগামা কতক্ষণে চুকবে, তারপরই সে যেতে পারবে। পুলিশ নিশ্চয় ওভানডোদের ডাকবে, কারণ তাদেরই গেটে ঘটেছে ঘটনা।
পুলিশ কি ওভানডোদের জড়াতে পারে ঘটনার সাথে? তা পারবে না। লাশগুলোর অবস্থান ও আহত হওয়ার প্রকৃতি থেকেই প্রমাণ হবে গুলী পশ্চিম দিক থেকে হয়েছে। নিশ্চয় তাদের অনুসন্ধানে গুলীর খোশাও বেরিয়ে পড়বে।
এসব সাত পাঁচ চিন্তা নিয়ে অনেকক্ষণ বসে কাটাল আহমদ মুসা কিন্তু ক্লান্তিতে শরীর ভেঙে পড়ছে তার। বসে থাকতে পারছে না।
ড্রাইভিং সিটে মাথা রেখে পা ছড়িয়ে দিল পাশের সিটের উপর। কোন রকমে শোয়ার একটা ব্যবস্থা হলো।
খারাপ লাগছে না আহমদ মুসার। শোবার এতটুকু সুযোগকেই এখন তার কাছে অমৃত বলে মনে হচ্ছে।
হাসি পেল আহমদ মুসার। সময় ও সুযোগের পরিবর্তনে মানুষের চাওয়া-পাওয়ার প্রকৃতি কত যে রূপ পাল্টায়।
কাছেই কোথ্থেকে প্যাঁচার ডাক কানে এল আহমদ মুসার। নিশ্চয় পাশেই পার্কের কোন গাছে এসে বসেছে প্যাঁচাটা।
ডেকেই চলল প্যাঁচাটা।
রাতের নিঃশব্দ প্রহরে এই ডাক অপরিচিত এক পরিবেশের সৃস্টি করল।
হঠাৎ মনে পড়ল ডোনা জোসেফাইনের কথা। আহমদ মুসার ঠোঁটে এক টুকরো মিষ্টি হাসি ফুটে উঠল। এই প্যাঁচার ডাককে ডোনা অপছন্দ করে, ভয় করে। মনে পড়ল সৌদি আরবের আসির অঞ্চলের এক মরুদ্যানে রাত কাটাবার কথা। সেটা ছিল মরুভূমির ভীতিকর এক নিঃশব্দ রাত। মৃতপুরীর মত নিরবতা চারদিকে। এই সময় নিরবতার বুকে বোমা বিষ্ফোরণের মত ডেকে উঠেছিল প্যাঁচার কন্ঠ।
ডোনা বিছানার ওপ্রান্ত থেকে ছুটে এসে জড়িয়ে ধরেছিল আহমদ মুসাকে। প্যাঁচা চলে না যাওয়া পর্যন্ত ডোনা তাকে ছাড়েনি। আহমদ মুসা হাসলে ডোনা বলেছিল, ‘রাতের নিঃশব্দ প্রহরে প্যাঁচার ডাকের মধ্যে একটা হাহাকার আছে, আমি ওটা সহ্য করতে পারি না’। আহমদ মুসা ডোনাকে জড়িয়ে ধরে লুকিয়ে ফেলেছিল বুকের মধ্যে।
অতীতের এই স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে মনটা খারাপ হয়ে গেল আহমদ মুসার।
মনটা তার ছুটে গেল ডোনা জোসেফাইনের কাছে।
ডোনা এখন কি করছে? সৌদি আরবে এখন রাত সাড়ে ৮টা। ডোনা রাতের ডিনার সেরে এখন নিশ্চয় বাগান সংলগ্ন বারান্দায় পায়চারি করছে, অথবা ইজি চেয়ারে আধশোয়া অবস্থায় কোন বই পড়ছে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই শুতে যাবে ডোনা। শেষের চিঠিটায় ডোনা লিখেছে, শোবার সময় সে পশ্চিমের জানালাটা খুলে দেয়। বালিশে মাথা রেখে জানালা দিয়ে পশ্চিম দিগন্তের দিকে তার দুচোখ মেলে ধরে। তার চোখের সামনে এসে দাঁড়ায় ছবির মত সাজানো আমেরিকা দেশটি। আহমদ মুসা জীবন্ত রূপ ধরে হাজির হয় তার চোখে। সেদিকে অপলক তাকিয়ে হাজারো কল্পনার জাল বুনতে বুনতেই সে ঘুমিয়ে পড়ে।
আহমদ মুসারও দুচোখ হাজার হাজার মাইল পথ পাড়ি দিয়ে হাজির হলো মদিনা শরীফের তার সুন্দর বাড়িটিতে। দেখতে পাচ্ছে সে ইজি চেয়ারে আধশোয়া ডোনা জোসেফাইনকে। আরও অপরূপ হয়েছে ডোনা জোসেফাইন। তার পলকহীন চোখ তাকে দেখছে তো দেখছেই, মন বুনছে নানা সুখ-স্বপ্নের জাল।
এক সময় ধীরে ধীরে বুজে গেল আহমদ মুসার চোখ। ঘুমের রাজ্যে হারিয়ে গেল সে।

ঘুম ভাংতেই তড়িঘড়ি করে উঠে বসল আহমদ মুসা। দেখল, চারদিকটা একদম ফর্সা হয়ে গেছে। পাখির কল-কাকলীতে ভরে গেছে পাশের পার্ক। একটু মন খারাপ হয়ে গেল আহমদ মুসার। শেষ পর্যন্ত রাতটা এখানেই কেটে গেল। কখন ঘুমিয়ে পড়েছে বুঝতেই পারেনি। ওদিকে ওভানডোদের কি অবস্থা কে জানে।
আহমদ মুসা তাড়াতাড়ি নিচে নেমে তায়াম্মুম করে নামাজ পড়লো।
তারপর গাড়িতে উঠে গাড়ি চালিয়ে চলে এল রাস্তায়। ছুটে চলল গাড়ি ওভানডোদের বাড়িরে দিকে।
কিছুদূর থাকতেই ওভানডোদের গেটের দিকে লক্ষ্য করল আহমদ মুসা। না, গেটে কেউ নেই। গেট পরিষ্কার। আহমদ মুসা আশংকা করেছিল গেটে পুলিশ পাহারা বসতে পারে। পুলিশ কর্তৃপক্ষ যদি গেটের ঘটনার জন্যে ওভানডোদের সন্দেহ করে, তাহলে গেটে পুলিশ পাহারা বসতে পারে। আবার পুলিশ যদি ওভানডোদের নিরাপত্তার আশংকা করে, তাহলেও পুলিশ পাহারা বসতে পারে। মনে হয় পুলিশ ওভানডোদের সন্দেহ করে নি, আবার তাদের নিরাপত্তার আশংকাও করেনি। তাহলে কি পুলিশ গেটের ঘটনাকে রাস্তার কোন ঘটনা বলে মনে করেছে যা ঘটনাক্রমে ওভানডোদের গেটে সংঘটিত হয়েছে।
ওভানডোদের স্টেটের গেটে গিয়ে দাঁড়াল আহমদ মুসার গাড়ি।
নির্দিষ্ট নিয়মে দুবার হর্ণ বাজতেই খুলে গেল দরজা।
গেট খুলে দরজায় এস দাঁড়িয়েছে দুজন। আহমদ মুসাকে দেখে ওরা ভীষন খুশি হয়ে উঠল।
আহমদ মুসা গাড়ির জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে ওদের কুশল জিজ্ঞেস করতেই ওদের একজন চোখে মুখে আতংকের ভাব সৃষ্টি করে গড় গড় করে বলে চলল রাতে গেটে কি মহাঘটনা ঘটেছিল সেই কাহিনী। সব শেষে বলল, ‘স্যার বাড়ির কেউ আজ ঘুমায়নি, সবাই জেগে বসে আছে আপনার জন্যে। চিন্তিত সবাই’।
গেটম্যানদের ধন্যবাদ দিয়ে আহমদ মুসা চলল ওভানডোদের বাড়ির দিকে।
গাড়ি বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছতেই আহমদ মুসা দেখল, বাড়ির সবাই বেরিয়ে এসেছে। ওভানডোর দাদী পর্যন্ত তাদের মধ্যে রয়েছে। সবার চেহারার মধ্যে একটা বিপর্যস্ত ভাব। সত্যিই তাহলে ওরা ঘুমায়নি, ভাবল আহমদ মুসা। গেটের ঘটনা নিয়ে অবশ্যই সারারাত ওদের উদ্বেগে কেটেছে।
আহমদ মুসাকে দেখে ওদের বিপর্যস্ত অবস্থার মধ্যে নতুন জীবনের একটা আনন্দ ফুটে উঠেছে।
আহমদ মুসা ওদের সামনে গাড়ি দাঁড় করাতে যাচ্ছিল।
ওভানডোর মা দুধাপ এগিয়ে এসে হাত নেড়ে আহমদ মুসাকে গাড়ি দাঁড় করাতে নিষেধ করল। বলল, ‘বাছা তুমি যাও’।
রাস্তার উপর দাঁড়ানো ওরা সবাই দুধারে সরে গিয়ে গাড়ির পথ করে দিল।
আহমদ মুসা ধীরে ধীরে গাড়ি চালাল। গাড়ির দুধার দিয়ে ওরা হাঁটছে।
আহমদ মুসার ড্রাইভিং জানালার পাশ দিয়ে হাঁটছে ওভানডো, লিসা এবং ফাতিমা।
আহমদ মুসাকে উদ্দেশ্য করে লিসা বলল, ‘জানেন আমরা সারারাত কেউ ঘুমাতে পারিনি। আপনি কোথায় হারিয়ে গিয়েছিলেন?’
‘হারিয়ে গিয়েছিলাম মানে?’ বলল আহমদ মুসা।
‘বা! আপনি ফাতিমার আব্বার ওখান থেকে বেরিয়েছেন সাড়ে দশটায়, তারপর সারারাত খোঁজ নেই’। বলল লিসা অভিমান ক্ষুব্ধ ক্ষোভের সাথে।
‘এ খবর জানলে কি করে?’ আহমদ মুসা বলল।
‘রাত ১২টার দিকে ফাতিমার আব্বা টেলিফোন করেছিলেন। তারপর সারারাত ধরেই উনি টেলিফোন করেছেন। অন্ততঃ বিশবার তিনি টেলিফোন করেছেন। ওনার এবং আমাদের সবারই শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা’। আবেগ অভিমানে কাঁপছিল লিসার গলা।
গাড়ি তখন পৌঁছে গেছে গাড়ি বারান্দায়।
আহমদ মুসা গাড়ি থেকে নামল।
নেমেই লিসার কথার জবাব দিল। বলল, ‘এমনটা ঘটা স্বাভাবিক, সত্যি আমি দুঃখিত’।
ততক্ষণে আহমদ মুসার শরীরের উপর নজর পড়ে গেছে সবার। সবাই ছুটে এল।
‘গায়ে এত রক্ত?’ তোমার কি হয়েছে বাছা?’ ‘আপনি ঠিক আছেন তো?’ প্রায় সবাই এক সাথে নানা প্রশ্ন করল আহমদ মুসাকে।
ওভানডো এসে জড়িয়ে ধরল আহমদ মুসাকে। বলল, ‘চলুন, ভেতরে চলুন’।
‘তোমরা বাছাকে না দেখে-শুনেই তার সাথে ঝগড়া শুরু করে দিয়েছ’। বলল ওভানডোর মা লিসাকে লক্ষ্য করে।
আহমদ মুসা বুঝাতে চেষ্টা করল যে, তার কিছু হয়নি, ভালো আছে সে। কিন্তু তাকে কথা বলতেই দিল না কেউ। তাকে ধরে নিয়ে চলল বাড়ির ভেতর।
একেবারে তাকে নিয়ে গেল তার শোবার ঘরে। তাকে শুইয়ে দেবে, এই অবস্থা দাঁড়াল।
আহমদ মুসা ওভানডোর হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে সোফায় গিয়ে বসল। সবাই তাকে ঘিরে দাঁড়িয়েছে। সবাই দেখতে চায় তার আঘাত কোথায়। ডাক্তার ডাকা, এ্যাম্বুলেন্স ডাকা, ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়ে গেছে।
আহমদ মুসা সোফায় বসে দুহাত তুলে সবাইকে বসতে বলে বলল, ‘আপনাদের ঘাবড়াবার কোন কারণ নেই। আমি আহত হইনি, আমি ভালো আছি। আমার গায়ে যে রক্ত দেখছেন তা ওয়াং আলীর রক্ত। তাকে আহত অবস্থায় কোলে নিতে হয়েছিল’।
কথাটা শেষ করেই তাকাল ফাতিমা নাসুমনের দিকে। বলল, ‘তুমি আবার ভয় পেয়ো না। ওয়াং আলী গুরুতর আহত নয়। নিশ্চয় শুনেছ সে ভালো আছে’।
‘আলহামদুলিল্লাহ। আপনাকে ধন্যবাদ ভাইয়া। এবারও আব্বাকে আপনিই উদ্ধার করলেন, সেই সাথে ওয়াংকেও’। শেষের কথাগুলো কান্নায় বুঁজে গেল ফাতিমার।
লিসা ফাতিমাকে কাছে টেনে নিয়ে তার পিঠে হাত বুলাতে বুলাতে আহমদ মুসাকে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘স্যরি, আগের প্রশ্নই করছি, সারা রাত আপনি কোথায় ছিলেন?’
‘ইস্ট পার্কের সামনের ঝাউ গাছগুলোর আড়ালে গাড়ি রেখে গাড়িতে ঘুমিয়ে কাটিয়েছি সারা রাত।
বলে আহমদ মুসা উঠে দাঁড়ালো এবং সবাইকে উদ্দেশ্যে করে বলল, ‘দু মিনিট প্লিজ, আমি কাপড় ছেড়ে আসছি’।
আহমদ মুসা দুপ্রস্ত কাপড় নিয়ে টয়লেটে ঢুকে গেল।
ওভানডোর মা ওভানডোর স্ত্রীকে লক্ষ্য করে বলল, ‘বউমা তুমি গিয়ে বাছার জন্যে নাস্তা আর চা দিতে বলে এস। বাছা রাতে নিশ্চয় কিছু খায়নি’।
ওভানডোর স্ত্রী জ্যাকুলিন চলে গেল।
ঠিক দুমিনিট পর আহমদ মুসা নতুন কাপড় পরে তোয়ালে দিয়ে হাত-মুখ মুছতে মুছতে বেরিয়ে এল।
বসল আহমদ মুসা তার সোফায়।
এ সময় ওভানডোর স্ত্রী জ্যাকুলিন নাস্তার ট্রলি ঠেলে নিয়ে এসে পৌঁছল।
লিসা তাড়াতাড়ি ট্রলি থেকে আহমদ মুসার সামনে নাস্তা সাজাতে সাজাতে বলল, ‘এগুলো কিন্তু আপনার রাতের খানা। নাস্তার সময় আবার আমাদের সাথে নাস্তা করতে হবে’।
আহমদ মুসা হাসল। বলল, ‘যা ক্ষুধা লেগেছে, তাতে দুবার কেন, তিনবারও নাস্তা করতে পারব’।
সবাই হেসে উঠল।
আহমদ মুসা ফলের ঝুড়ি থেকে দুটো আঙুর তুলে নিয়ে পাশে বসা ওভানডোর দাদীর মুখোমুখি হয়ে বলল, ‘দাদী হা করুন, দুটো আঙুর খেয়ে শুরু করে দিন। আমি শেষ করব’।
ওভানডোর দাদী খুশিতে হা করল। আহমদ মুসা দুটো আঙুর পুরে দিল তার মুখে।
ওভানডোর দাদী আঙুর চিবোতে চিবোতে বলল, ‘ওভানডো দেখলি, তোর চেয়ে এ ভাই আমাকে বেশি ভালোবাসে। তুই খাবার সময় আমার কথা কখনও মনে করিস?’
হাসল ওভানডো। বলল, ‘ঠিক আছে, উনি তোমার নম্বর ওয়ান নাতি হলে আমি দু নম্বর নাতি হতে রাজি আছি’।
ওভানডো থামতেই লিসা বলে উঠল, ‘দাদী আমি কিন্তু এক নম্বর নাতনী’।
বলেই লিসা তাকাল ফাতিমার দিকে। বলল, ‘না তুমি আমার এক নম্বর আসন কেড়ে নেবার মতলব আঁটছ?’
হাসল ফাতিমা। সবাই হেসে উঠল।
আহমদ মুসা তখন খেতে শুরু করেছে। লিসা বলে উঠল আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে, ‘এবার তাহলে আমার প্রশ্ন শুরু করতে পারি?’
আহমদ মুসা কিছু বলার আগেই ওভানডোর মা বলে উঠল, ‘লিসা তোর পুলিশী জেরা এখন থাক। আমি বাছার সাথে একটু কথা বলি’।
তারপর ওভানডোর মা চাইল আহমদ মুসার দিকে। বলল, ‘তুমি সত্যিই ইস্ট পার্কে গাড়িতে শুয়েছিলে বাছা?’
‘জি হ্যাঁ’।
‘কিন্তু ঘটনা কি বাছা?’
আহমদ মুসা হাসল। বলছি আম্মা। তার আগে ওভানডোর কাছ থেকে একটা বিষয় জেনে নেই।
ওভানডোর দিকে তাকিয়ে আহমদ মুসা বলল, ‘ওভানডো, গেটের ঘটনার পর পুলিশ তোমাদের ডেকেছিল?’
‘হ্যাঁ ডেকেছিল’।
‘কেন ডেকেছিল?’
‘জিজ্ঞেস করেছিল, গাড়ি ও গাড়ির লোকদের আমরা চিনি কিনা। আমি বলেছিলাম, চিনি না। তারপর জিজ্ঞেস করেছিল, বাড়িতে কোন সময় ডাকাতি হয়েছে কিনা? আমি বলেছি, না হয়নি। এরপর জিজ্ঞেস করেছিল, ওরা গেটে ধাক্কা-ধাক্কি করেছিল কিনা? আমি না –সূচক জবাব দেই। আমাকে আর কিছু বলেনি ওরা’। বলল ওভানডো।
‘ঘটনা কিভাবে ঘটল, কে ওদের হত্যা করল এ সম্বন্ধে কিছু আলোচনা করেছে ওরা?’ আহমদ মুসা বলল।
‘ওদের আলোচনায় শুনলাম, গোলাগুলি শুনে পুলিশরা যখন গেটের দিকে ছুটে আসছিল, তখন ওদের দুজন নাকি একটা আলো নেভানো গাড়িকে পশ্চিম দিকে ছুটে যেতে দেখেছে। পুলিশের কথা শুনে মনে হলো, তিলক লাজপত পালের সংগঠন ও অন্য কোন সংগঠনের মধ্যেকার পারস্পরিক বৈরিতার ফলেই এই হত্যাকান্ড ঘটেছে। তিলক লাজপত পাল স্বয়ং নিহত হয়েছে এই ঘটনায়’। বলল ওভানডো।
তিলক লাজপত পাল নিহত হওয়ার কথা শুনে চমকে উঠল আহমদ মুসা। বলল দ্রুত কন্ঠে, ‘তিলক লাজপত পাল নিহত হয়েছে! তাহলে ঐ গেরুয়া ইউনিফরম পরা লোকটিই কি তিলক লাজপত পাল ছিল?’
বলে নাস্তার প্লেট থেকে হাত তুলে সোজা হয়ে বসল আহমদ মুসা। বলতে লাগল, ‘যদি তা ঘটে থাকে, ঐ লোকটিই যদি তিলক লাজপত পাল হয়ে থাকে, তাহলে বড় একটা ঘটনা ঘটেছে’।
লাজপত পালকে ওভানডোরা কেউ চেনে না। কিন্তু লাজপত পাল সম্পর্কে আহমদ মুসার কথা সকলের মধ্যে বিষ্ময় সৃষ্টি করেছে। বলল লিসা, ‘গেরুয়া ইউনিফরমধারীকে দেখলেন কি করে? সে খুন হয়েছে জানলেন কি করে?’
হাসল আহমদ মুসা। বলল রাতের সব ঘটনা। সব শেষে বলল, ‘পুলিশ এসে পড়ায় আমি আর ভেতরে ঢুকিনি। ভেবেছিলাম ইস্ট পার্কের ওখানে কিছুটা অপেক্ষা করে পুলিশ চলে গেলে ভেতরে ঢুকব। কিন্তু ঘুমিয়ে পড়ায় তা আর হয়নি’। থামল আহমদ মুসা।
আহমদ মুসার কাহিনী সবাই শুনল। আহমদ মুসা থামলেও কেউ কোন কথা বলল না। আতংক ও উদ্বেগের ছায়া সকলের চোখে-মুখে। ওভানডোর মা উঠল তার সোফা থেকে। ধীরে ধীরে গিয়ে দাঁড়াল আহমদ মুসার পেছন দিকে। ডান হাত দিয়ে আহমদ মুসার মাথা স্পর্শ করে বলল, ‘বাবা তোমাকে কি বলে আশীর্বাদ করব তার ভাষা আমার জানা নেই। ভাবতে আতংক বোধ হচ্ছে, তুমি ঠিক সময়ে গেটে না পৌঁছলে কিংবা ওদেরকে ঐভাবে শেষ করতে না পারলে ওরা ভেতরে প্রবেশ করত, তাহলে কি ঘটত! তুমি তৃতীয় বারের মত আমাদের পরিবারকে সর্বনাশ থেকে বাঁচালে বাবা’।
গম্ভীর হলো আহমদ মুসা। বলল, ‘আল্লাহর ইচ্ছায় সব হয়েছে, আমি নিমিত্তমাত্র।গুলী করতে আমার সেকেন্ড পরিমাণ বিলম্ব হলে তিলক লাজপতের গুলীতে আমার দেহ ঝাঁঝরা হয়ে যেত। অন্যদিকে তিলক লাজপত পালের গুলী করতে সেকেন্ড পরিমাণ দেরী হওয়ায় আমার গুলীতে তার দেহই শুধু ঝাঁঝরা হয়নি, তাদের সবাইকেই মরতে হয়েছে। জীবন-মৃত্যু নির্ধারিত হয়েছে সেকেন্ডের ব্যাবধানে। এই ব্যবধান সৃষ্টি হয়েছে আল্লাহর ইচ্ছায়’।
‘আর বলোনা বাছা। বুক কাঁপছে আমার। এক সেকেন্ড আগে যদি সে গুলী ছুঁড়ত, তাহলে তোমার কি হতো বাছা। এসব কি শুরু হলো?’ ভারী শোনাল ওভানডোর মায়ের কন্ঠ।
ওভানডোর মা ফিরে এল আসনে।
‘জীবন-মৃত্যুর এ খেলায় আপনি নেমেছেন পরের জন্যে, আপনার খারাপ লাগে না?’ বলল লিসা।
‘পরের জন্যে কোথায় লিসা?’ আমরা সকলে এক আদমের সন্তান না? আর কে কার জন্যে কি করবে, এটা আল্লাহই নির্ধারণ করে দেন। আমি তো কোনো দিন ইচ্ছা করিনি সুরিনামে আসবো। কিন্তু এসে গেছি। আল্লাহই আমাকে নিয়ে এসেছেন। আমি যা করছি আল্লাহরই কাজ করছি, আল্লাহর জন্যেই করছি’। বলল আহমদ মুসা।
কিছু বলতে যাচ্ছিল লিসা।
টেলিফোন বেজে উঠল। ধরল টেলিফোন ওভানডো। ওভানডো ওপারের কথা শুনেই বলে উঠল, ‘স্যার আপনি ওঁর সাথেই কথা বলুন’।
বলে টেলিফোন আহমদ মুসার হাতে তুলে দিতে দিতে বলল, ‘সাবেক প্রধানমন্ত্রী স্যারের টেলিফোন’।
আহমদ মুসা টেলিফোন ধরল। প্রথম কিছু সময় গেল গত রাতে বাড়িতে না ফেরার কারণ ব্যাখ্যায়। আহমদ মুসা টেলিফোনে যতটুকু বলা যায় ততটুকু বলল। তারপর জানাল, আমি ঠিক সকাল সাড়ে এগারটায় আপনার ওখানে পৌঁছব। আপনাকে সাথে নিয়ে সাড়ে বারটায় যাত্রা করব ইলেকশন অফিসের উদ্দেশ্যে। আমাদের থাকবে দুটি গাড়ি। সামনের গাড়ি ড্রাইভ করব আমি। আমার পাশে থাকবে বার্নারডো। পেছনের সিটের মাঝখানে বসবেন আপনি। আপনার এক পাশে বসবে আপনার দলের নির্বাচন পরিচালক, আরেক পাশে আপনার সেক্রেটারী বসবে। আর পেছনের গাড়িতে থাকবে আপনার বাছাই করা পাঁচজন লোক। তাদের প্রত্যেকের কাছে রিভলবার থাকতে হবে। সাড়ে বারটায় স্টার্ট করার আগেই সব কাগজ পত্র তৈরী, ফরমাদি ফিলাপ করে ব্রীফকেসে রেখে দেবেন। জামানতের টাকার ড্রাফটাও যেন কাগজপত্রের সাথে থাকে’।
থামল আহমদ মুসা। ওপারের কিছু কথা শোনার পর আহমদ মুসা বলল, ‘আপনি টেলিফোনটা বার্নারডোকে দিন’।
বার্নারডো টেলিফোন ধরলে আহমদ মুসা তার সাথে কুশল বিনিময়ের পর বলল, ‘আমি কিছু কথা মি. হাত্তাকে বলেছি। তুমি সেগুলো ওঁর কাছ থেকে জেনে নিও। আর তোমার জন্যে কথা হলো, তুমি এ্যাসিস্টেন্ট পুলিশ কমিশনারের সাথে দেখা করো। আমরা সাড়ে বারটার দিকে নির্বাচন অফিসের উদ্দেশ্যে যাত্রা করছি। ইলেকশন অফিসের জন্যে আমরা যা করেছি, সেটা ওঁকে বলে তাঁকে অনুরোধ করবে তাঁর যদি কিছু করণীয় থাকে তিনি যেন করেন। ঠিক আছে?’
ওপার থেকে বার্নারডোর কথা শুনে আহমদ মুসা বলল, ‘ঠিক আছে, রাখছি। ওয়াস সালাম’।
টেলিফোন আহমদ মুসা রেখে দিতেই ওভানডোর মা বলে উঠল, ‘সাড়ে এগারটায় আবার বেরুচ্ছ বাছা?’ তার কন্ঠে বিষ্ময়।
‘হ্যাঁ আম্মা। আজ নির্বাচনের জন্যে নমিনেশন পেপার সাবমিট করার শেষ দিন। ওরা সর্বাত্মক চেষ্টা করবে আহমদ হাত্তা যেন নমিনেশন পেপার জমা দিতে না পারে। আমরা চেষ্টা করব জমা দেয়ার জন্যে। আপনাদের সকলের দোয়া প্রয়োজন’। বলল আহমদ মুসা।
আহমদ মুসা থামলেও কেউ কোন কথা বললো না। সবাই ভাবছে। ঘটনার গুরুত্ব অনুভব করতে পারছে সবাই। তাদের পক্ষের, তাদের পছন্দের রাজনৈতিক শক্তি টিকে থাকা না থাকার সাথে তাদের ভাগ্যও কম জড়িত নয়। আহমদ হাত্তা সরকারের মেয়াদ শেষ হবার পর দেশ আজ সন্ত্রাসে ভরে গেছে। তাদের টেরেক পরিবারের উপর বিপদ নেমেছে এই সময়েই।
অবশেষে নিরবতায় ছেদ নামল। নিরবতা ভেঙে ওভানডোর দাদী বলল, ‘বুঝতে পারছি। একটা সংকটকাল চলছে। এ সংকটে তোমারই প্রধান দায়িত্ব। কিন্তু তুমি তোমার কথা ভাববে না ভাই। তুমি ঠিক না থাকলে কিছুই যে ঠিক থাকবে না’।
আহমদ মুসা হাসল। বলল, ‘আমি যদি আমাকে নিয়ে ভাবি, তাতে কোন লাভ হবে না। বরং তাতে দুর্বলই হয়ে পড়ব। যিনি ভাবলে আমার লাভ হবে, সেই আল্লাহ নিশ্চয়ই আমাকে নিয়ে ভাবছেন’।
আহমদ মুসার কথা শেষ হতেই লিসা বলে উঠল, ‘জানেন আমরা একটা কুরআন শরীফ জোগাড় করেছি। ফাতিমা আমাদের শেখাচ্ছে’।
‘এ সুখবরের জন্য ধন্যবাদ লিসা তোমাদেরকে’। তারপর ফাতিমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ফাতিমা তোমাকে ধন্যবাদ। তুমি কি কুরআনের অর্থও করতে পার?’
‘জি হ্যাঁ ভাইয়া। আমি পরিবার থেকেই এটা শিখেছি। ছোটকালেই গৃহ শিক্ষকের কাছে আরবী ভাষা শেখা হয়ে গেছে। এখন হাদিস কুরআন সবই অর্থসহ পড়তে পারি’। বলল ফাতিমা নাসুমন।
‘মোবারকবাদ ফাতিমা’। আহমদ মুসা বলল।
কিছু বলতে যাচ্ছিল লিসা।
কিন্তু তার আগেই ওভানডোর মা উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলে উঠল, ‘সবাই উঠ, আর কোন কথা নয়। বাছাকে বিশ্রাম করতে দাও’।
সবাই উঠে দাঁড়াল।
উঠতে উঠতেই লিসা বলল আহমদ মুসাকে, ‘আচ্ছা আপনার মত মনকে ভয়হীন করতে হলে কি করতে হবে?’
‘আল্লাহকে ভয় করতে হবে। আল্লাহকে যদি সত্যিকারের অর্থে ভয় কর, তাহলে অন্য সব ভয় মন থেকে দূর হয়ে যাবে। কারণ তখন তুমি ভাবতে শিখবে, আল্লাহ সব শক্তির বড় শক্তি। তিনি যখন ইচ্ছা করেন, তখনই তা হয়ে যায়, অতএব তার উপর ভরসা করলে কাউকে ভয় করার প্রশ্নই উঠে না’। বলল আহমদ মুসা।
‘আমি বুঝতে পারছি না, কিভাবে আমার মনটা ঐ রকম হবে’। হতাশ কন্ঠ লিসার।
আহমদ মুসা কিছু বলতে যাচ্ছিল। তার আগেই দাদী বলে উঠল, ‘মুখের কথায় হবে না বোন, বিশ্বাসের শক্তিতে মনকে সজ্জিত করতে হবে’।
দাদীর মুখে এ কথা শুনে বিষ্মিত হলো আহমদ মুসা। বলল, ‘দাদী এ কথাই আমি বলতে যাচ্ছিলাম। আপনি এটা শিখলেন বা পড়লেন কোথায়?’
দাদীর মুখ গম্ভীর হলো। বলল, ‘আমার দাদী শ্বাশুড়ীর ঘরে টাঙ্গানো কাঠের একটা বিলবোর্ডে এ ধরনের একটা কথা লেখা ছিল। বিল বোর্ডটা শুনেছি দুর্গের কোথাও ওঁরা পেয়েছিলেন’।
‘বিল বোর্ডটা এখন নেই দাদী?’ বলল আহমদ মুসা উৎসুক কন্ঠে।
‘থাকতে পারে পুরনো কোন বাক্স-পেটরায়। দুর্গের অংশ নিয়ে তৈরী পুরনো বাড়িটা ভেঙে এ নতুন বাড়ি তৈরী করা হয়। নতুন বাড়ি সাজাবার সময় পুরনো অনেক জিনিষই ব্যবহার করা হয়নি। তোমার কথায় বিলবোর্ডটার প্রতি আমার আগ্রহ জেগেছে। দেখব খুঁজে পাওয়া যায় কিনা’। দাদী বলল।
‘তুমি খুঁজবে কি দাদী, আমিই খুঁজে বের করব’। বলল লিসা।
হ্যাঁ, তুমি এক জিনিস বের করতে গিয়ে দশ জিনিস নষ্ট করবে। পুরনো কিছুতে তোমার হাত দিতে হবে না’।
কিছু বলতে যাচ্ছিল লিসা।
তার আগেই তার মা বলে উঠল, ‘না আর কথা নয়। যাও ওদিকে গিয়ে দাদীকে বুঝাতে চেষ্টা কর যে, পুরনো কোন জিনিস খোঁজার মত যথেষ্ট ধৈর্য্য তোমার আছে’।
‘আম্মা তুমি দাদীর পক্ষ নিলে’। প্রতিবাদের সুরে এ কথা বলতে বলতে লিসা ঘর থেকে বের হয়ে গেল।
ঘরের বাইরে এল সবাই।

প্রেসিডেন্ট ভবনের পারিবারিক অংশ দক্ষিণ অলিন্দের পারিবারিক ড্রইংরুম।
প্রেসিডেন্ট জুলেস মেনডেল বসে আছেন এক সোফায়। মুখটা তার ঈষৎ নিচু। বিমর্ষ চেহারা।
তার সামনের সোফায় পাশাপাশি বসে আছে রাজনৈতিক দল সুরিনাম পিপলস কংগ্রেস (এসপিসি) এর চেয়ারম্যান রোনাল্ড রঙ্গলাল এবং মাসুস (মায়ের সূর্য সন্তান) সংগঠনের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান শিবরাম শিবাজী। তাদের দুজনকেই দেখাচ্ছিল উত্তেজিত।
‘মাসুস’ সংগঠনের চেয়ারম্যান ছিলেন তিলক লাজপত পাল। গত রাতে টেরেক স্টেটের গেটে অন্যদের সাথে সে নিহত হওয়ায় শিবরাম শিবাজী ‘মাসুস’এর ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে সংগঠনের দায়িত্ব গ্রহণ করেছে।
কথা বলছিল শিবরাম শিবাজী। বলছিল সে, ‘মাত্র দুরাত দুদিনে সবকিছু লন্ডভন্ড হয়ে গেল আমাদের। প্রথম ঘটনা ঘটেছে উত্তর সুরিনামে কোরাজ নদী সংলগ্ন আমাদের ঘাঁটিতে। সেখানে আমাদের ৮ জন লোক নিহত হয়েছে, ঘাঁটি হাত ছাড়া হয়েছে এবং প্রথমবারের মত আমাদের হাত থেকে দু’ডজনের মত বন্দী পলিয়ে গেছে। এরপর গত দুরাত একদিনে আমাদের ৬০ জনের মত লোক নিহত হয়েছে, আমাদের শীর্ষ নেতা তিলকসহ। ওভানডো মুক্ত হয়েছে এবং ওয়াং মুক্ত হয়েছে। ফাতিমা ও আহমদ হাত্তাকে ধরেও আমরা রাখতে পারিনি। ভূমিকম্পের মত এ ঘটনাগুলো কিভাবে ঘটল, কে ঘটাল আমরা বুঝতে পারছি না’।
থামল শিবরাম শিবাজী। তার কন্ঠ ভীষণ উত্তেজিত। চোখ-মূখ তার লাল।
‘আমাদের কাছে এটা চরম বিষ্ময় যে, এ ঘটনাগুলো কে ঘটাল, কিভাবে ঘটল। আমরা আহমদ হাত্তাদের রিপাবলিকান পার্টির সবাইকে জানি। তাদের সাধ্য নেই এ ধরনের ঘটনা ঘটানোর’। বলল রোনাল্ড রঙ্গলাল। তার কন্ঠে উদ্বেগ।
‘তাহলে আহমদ হাত্তারা কি বাইরে থেকে লোক হায়ার করেছে?’
বলল প্রেসিডেন্ট জুলেস মেনডেল।
‘কিন্তু যে ঘটনাগুলো ঘটেছে, তাতে বেশী লোকের ভূমিকা দেখছিনা। মন্দিরের বন্দীখানা থেকে ওভানডোকে উদ্ধার করেছে একজন লোক। টেরেক স্টেটের গেটে গতরাতে যে ঘটনা ঘটেছে, পুলিশের বক্তব্য অনুসারে তা ঘটিয়েছে একজন লোক। ফাতিমাকে উদ্ধার করতে গিয়েছিল মাত্র দুজন লোক। শুধু আহমদ হাত্তা ও ওয়াংকে উদ্ধারের জন্যে পুলিশের পোশাকে পাঁচজন গিয়েছিল। কিন্তু প্রত্যক্ষদর্শী পুলিশের ধারণা হলো সেখানে সব ঘটনা একজনই ঘটিয়েছে। বাইরে থেকে এমন একজন দুজন লোক এসে এসব ঘটাতে পারে?’ বলল রোনাল্ড রঙ্গলাল।
‘তাহলে কি এসব এ দেশের কোন টপ টেররিস্ট কিংবা সাবেক কোন পুলিশ বা গোয়েন্দা অফিসারের কাজ? তারাতো ‘মাসুস’ ও সুরিনাম পিপলস পার্টির দুর্বলতা সম্পর্কে জানে’। বলল পেসিডেন্ট।
‘আমাদের পুলিশ ও গোয়েন্দাদের আমরা চিনি মি. প্রেসিডেন্ট। তাদের কারো মধ্যেই এই সাহস ও ক্ষিপ্রতা নেই’। বলল রোনাল্ড রঙ্গলাল।
‘তাহলে শত্রুকেই আমরা যখন চিনছি না, তখন আমরা তাদের মোকাবিলা করব কি করে? পারামারিবোতে আমাদের যে ফাইটিং ফোর্স ছিল, যে ফোর্স বছরের পর বছর ধরে গড়ে তুলেছিলাম, সে ফোর্স প্রায় নিঃশেষ। আমি এ বিপর্যয়কে কিছুতেই স্বাভাবিক বলে মেনে নিতে পারছিনা’। বলল শিবরাম শিবাজী।
‘অস্বাভাবিক কি আপনি চিন্তা করছেন?’ বলল রোনাল্ড রঙ্গলাল।
‘আমার মনে হচ্ছে দেশের পরিস্থিতিতে বড় রকমের একটা পরিবর্তন ঘটেছে। আমরা দেশের মুসলিম রাজনৈতিক শক্তিকে উৎখাত করতে চেয়েছিলাম। এ লক্ষ্যে কয়েক হাজার মুসলিম রাজনীতি সচেতন যুবককে শেষ করেছি। তাদের নেতাকে কিডন্যাপ করে দেশের বাইরে বন্দী করে রেখেছিলাম। আমার মনে হচ্ছে গত দুরাতেই এ পরিবর্তন হয়, তাহলে আমি মনে করি খুব বড় একটা শক্তি আমাদের দেশে প্রবেশ করেছে। যারা আমাদের প্রতি একটা মারাত্মক চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছে’। বলল শিবরাম শিবাজী।
‘আমি আপনার সাথে একমত মি. শিবরাম। নিশ্চয় ঐ রকম একটা কিছু ঘটেছে’। বলল রোনাল্ড রঙ্গলাল।
‘কিন্তু গত এক মাসে দেশের বিমান বন্দর ও সমুদ্র বন্দর দিয়ে যারা দেশে প্রবেশ করেছে এবং গত এক মাসে হোটেলগুলোয় যারা এসেছে, তাদের পূর্ণ তালিকা আমার কাছে আছে। অপরিচিত ও উল্লেখ করার মত কোন বিদেশী তাদের মধ্যে নেই’। বলল প্রেসিডেন্ট।
‘আসলে তারা ওভাবে জানান দিয়ে আসবে না’। শিবরাম শিবাজী বলল।
‘ঠিক আছে ধরে নেয়া হলো একটা গ্রুপ দেশে প্রবেশ করেছে। এখন কি করণীয়?’ বলল রোনাল্ড রঙ্গলাল।
‘যদি এ রকম কোন গ্রুপ দেশে এসে থাকে রিপাবলিকান পার্টিকে সহযোগিতা করার জন্যে, তাহলে অবশ্যই তারা আহমদ হাত্তাসহ রিপাবলিকান নেতৃবৃন্দের সাথে যোগাযোগ রাখবে। সুতরাং আহমদ হাত্তাসহ রিপাবলিকান নেতৃবৃন্দের উপর সার্বক্ষণিক নজর রাখতে হবে’। বলল শিবরাম শিবাজী।
‘আমাদের পুলিশ ও গোয়েন্দা বিভাগ তাদের উপর নজর রাখছে। ঠিক আছে এটা আরও জোরদার করা যাবে’। প্রেসিডেন্ট বলল।
‘ধন্যবাদ মি. প্রেসিডেন্ট। শুধু পুলিশের রুটিন পাহারা দিয়ে ওদের ধরা যাবে না। আমি মনে করি, দলের সাহসী ও চৌকশ ছেলে-মেয়েদেরকেও পুলিশের পাশাপাশি কাজে লাগাতে হবে’। বলল শিবরাম শিবাজী।
‘আমিও একমত। এখন আপনারা আসুন আজকের বিষয় নিয়ে আলোচনা করি। আজ নমিনেশন পেপার ফাইলের শেষ দিন। আহমদ হাত্তাকে কিছুতেই নমিনেশন পেপার দাখিল করতে দেয়া যাবে না। এখন কি করা উচিত বলুন’। রোনাল্ড রঙ্গলাল বলল।
‘আপনারা কি চিন্তা করেছেন বলুন। পুলিশের পক্ষে কিংবা সরকারীভাবে সরাসরি কিছু করা সম্ভব হবে না’। বলল প্রেসিডেন্ট।
‘অন্তবর্তীকালীন সরকার গঠনের পর এ পর্যন্ত আমরা যে সব পদক্ষেপ নিয়েছি তার লক্ষ্যই হলো আহমদ হাত্তার রাজনীতি বন্ধ করে দেয়া, তাকে নির্বাচনে দাঁড়াতে না দেয়া। আজ যদি আমরা তাকে নমিনেশন পেপার দাখিলে বাধা দিতে ব্যর্থ হই, তাহলে আমাদের এতদিনকার সব কাজ ব্যর্থ হয়ে যাবে। সুতরাং যে কোন মূল্যে তাকে আজ বাধা দিতে হবে। আমরা এ পর্যন্ত যে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি তা হলো নির্বাচন অফিসমূখী সব রাস্তায় আমাদের পাহারা থাকবে। প্রত্যেকটা গাড়ি সার্চ করা হবে।আহমদ হাত্তাকে যে কোন মূল্যে আটকানো হবে’। বলল রোনাল্ড রঙ্গলাল।
রোনাল্ড রঙ্গলাল থামতেই প্রেসিডেন্ট বলে উঠল, ‘গত দুদিনের ঘটনা সামনে রাখার পর আপনারা কিভাবে নিশ্চিত হচ্ছেন যে আহমদ হাত্তাকে আপনারা আটকাতে পারবেন?’
‘তারা রাস্তায় মারামারি করে হত্যাকান্ড ঘটিয়ে নমিনেশন পেপার জমা দিতে আসবে এবং জমা দিয়ে চলে যাবে আমরা এটা মনে করি না। আমাদের লোক যারা আহমদ হাত্তাদের বাধা দেবে, তাদেরকে যদি ওরা খুন করে, তাহলে সংগে সংগে অন্য চারটি স্থানে পাহারায় বসা লোকরা মোবাইলে খবর পেয়ে যাবে এবং তারা সংগে সংগেই চলে আসবে নির্বাচন অফিসের সামনে। তারা একযোগে আহমদ হাত্তাকে আটক করবে খুনি হিসেবে এবং নমিনেশন পেপার দাখিলের সময় পার হয়ে গেলে তাকে থানায় সোপর্দ করবে অথবা অন্য কোন ব্যবস্থা করবে’। বলল রোনাল্ড রঙ্গলাল।
‘অন্য কি ব্যবস্থা করবেন?’ জিজ্ঞেস করল প্রেসিডেন্ট।
‘যেমন ধরুন আমরা জিজ্ঞাসাবাদ করার পর পুলিশ ডেকে তাদের হাতে তুলে দিলাম। থানায় নিয়ে যাবার পথে আহমদ হাত্তা পালাতে গিয়ে পুলিশের গুলীতে মারা যাবে, ইত্যাদি’। বলল রোনাল্ড রঙ্গলাল।
‘না, না এরকম কিছু করা যাবে না। এতে আমাদের সরকারের বদনাম হবে। তার চেয়ে ভালো হবে যদি এ রকম হয় যে, আপনাদের গ্রুপগুলো নির্বাচন অফিসের সামনে থেকে তাকে ধরে নিয়ে গেল, কিন্তু কে ধরে নিয়ে গেল তা কেউ স্বীকার করল না। গায়েব হয়ে গেল আহমদ হাত্তা। এতে সরকারের উপর দায়টা কম বর্তাবে’। বলল প্রেসিডেন্ট।
‘প্রেসিডেন্ট, আপনি মোক্ষম ব্যবস্থাপত্র দিয়েছেন তাতে সাপও নিশ্চিত মারা পড়বে কিন্তু লাঠির কিছুই হবে না’। বলল শিবরাম শিবাজী উচ্ছসিত কন্ঠে।
রোনাল্ড রঙ্গলালও প্রেসিডেন্টকে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘আমারও ধন্যবাদ গ্রহণ করুন মি. প্রেসিডেন্ট। আপনি যে রকম বলেছেন, সে রকম ঘটা মানুষের কাছেও যুক্তিযুক্ত হবে। মানুষ মনে করবে, নির্বাচন নিয়ে রাস্তায় হানাহানিরই ফল এটা এবং আহমদ হাত্তাকে কেউ ধরে নিয়ে যেতে পারে, আবার পালিয়ে আত্মগোপনও করতে পারে খুনের দায় থেকে বাঁচার জন্যে’।
হেসে উঠল প্রেসিডেন্ট ও শিবরাম শিবাজী দুজনেই। বলল প্রেসিডেন্ট, ‘আর এ বিষয়টা মানুষকে বিশ্বাস করাবার মত প্রপাগান্ডা মেশিন আমাদের হাতে রয়েছে’।
কথাটা শেষ করে প্রেসিডেন্ট জুলেস মেনডেল গম্ভীর হয়ে উঠল। ভাবনার একটা চিহ্ন তার চোখে-মুখে ফুটে উঠল। বলল, ‘আহমদ হাত্তাকে না হয় এভাবে সরানো গেলো, কিন্তু ঐ অদৃশ্য শক্তির কি হবে যা মাত্র দুরাত এক দিনে আমাদের ষাট-সত্তর জন লোককে খুন করে আমাদের সব পরিকল্পনাকে লন্ড-ভন্ড করে দিল? আহমদ হাত্তার যদি এ রকম কিছু ঘটে তাহলে ঐ শক্তি নিশ্চয় প্রতিশোধ নিতে পাগল হয়ে উঠবে’।
রোনাল্ড রঙ্গলাল বলে উঠল, ‘প্রতিশোধ নিতে ছুটে আসতে পারে, আবার আহমদ হাত্তা নেই দেখে পালাতেও পারে। ভাড়াকারী বা হায়ারকারী না থাকলে, ভাড়ায় আসা লোকেরাও থাকে না’।
‘আপনার যুক্তি ঠিক মি. রোনাল্ড। কিছুই ঘটবে না, ওরা পালিয়ে যাবে। কিন্তু এ ভালো চিন্তার পাশে খারাপ দিকটাও আমাদের বিবেচনা করা দরকার’। বলল প্রেসিডেন্ট গম্ভীর কন্ঠে।
‘আপনি ঠিক বলেছেন মি. প্রেসিডেন্ট। খারাপ দিকটা নিয়েও আমাদের ভাবা দরকার। ঐ অদৃশ্য শক্তির মোকাবিলায় আমরা ব্যর্থ হয়েছি। নতুন সংঘাত বাধলে এ ব্যর্থতা আরও প্রকট হতে পারে। আমাদের স্বীকার করতেই হবে, আমাদের ট্রেইন্ড ও কার্যকরী জনশক্তি গত দুদিনে প্রায় শেষ হয়ে গেছে। আজ আহমদ হাত্তাকে ঠেকাবার জন্যে বিভিন্ন রাস্তায় যাদের আমরা পাহারায় বসাচ্ছি, তাদের অধিকাংশই সাদা পোশাকের পুলিশ। সিভিল ড্রেসে তারা আমাদের সহায়তা করছে। কিন্তু এভাবে পুলিশ দিয়ে আর কতদিন ওদের মোকাবিলা করা যাবে? এই অবস্থায় আমাদের নতুন কিছু চিন্তা করা দরকার’। শিবরাম শিবাজী বলল গম্ভীর কন্ঠে।
‘নতুন চিন্তাটা কি হতে পারে বলুন?’ বলল রোনাল্ড রঙ্গলাল।
‘বলছি। তার আগে আরেকটা কথা বলি, পারলে গোটা টেরেক স্টেট, না পারলে অন্তত টেরেক দুর্গ কব্জা করা ও তার মাটির তলা থেকে এক জাহাজ পরিমাণ লুকিয়ে রাখা সোনা উদ্ধার করা আমাদের বড় টার্গেট। এ জন্যেও আমাদের শক্তি প্রয়োজন। সব মিলিয়ে আমি মনে করি, কোন মাফিয়া গ্রুপের সাহায্য নেয়া আমাদের প্রয়োজন। তারা অত্যন্ত কূশলী ও পেশাদার যোদ্ধা। তারাই পারবে এখানকার অদৃশ্য শক্তির মোকাবিলা করে আমাদের কার্যোদ্ধার করে দিতে।
আমার মনে হয় হাত্তারাও কোন মাফিয়া গ্রুপকেই হায়ার করেছে। না হলে এত অল্প সময়ে এতবড় বিপর্যয় আমাদের ঘটতে পারে না’। শিবরাম শিবাজী বলল।
শিবরাম শিবাজী থামলেও সংগে সংগে কথা বলল না প্রেসিডেন্ট কিংবা রোনাল্ড রঙ্গলাল। তারা গম্ভীর হয়ে উঠেছে।ভাবছে তারা। মুখ খুলল প্রথমে প্রেসিডেন্ট। বলল, ‘তারা এ জন্যে বিরাট বিনিময় চাইবে। তাছাড়া রয়েছে অতগুলো সোনা উদ্ধারের ব্যাপার’।
‘আমার মনে হয় সোনার একটা ভাগ দিতে চাইলে আর কিছুই তারা চাইবে না’। শিবরাম শিবাজী বলল।
‘সোনার ভাগ কি তাদের দেয়া ঠিক হবে? আর সোনা যদি অবশেষে না পাওয়া যায়?’ বলল রোনাল্ড রঙ্গলাল।
হাসল শিবরাম শিবাজী। বলল, ‘সোনা না থাকার প্রশ্নই উঠে না। তিলক লাজপত পাল লক্ষ ডলার খরচ করে সান্টো ডোমিঙ্গোর তদানিন্তন গভর্নর ওভানডোর উত্তরাধিকারী পাওলো রোসীর কাছ থেকে যে পুরনো ডুকমেন্টগুলো কিনেছিলো, তার একটিতে ওভানডো নিজের হাতে লিখেছে, ‘১৫০২ সালের ১লা জুন কলম্বাসের পরামর্শ উপেক্ষা করে দুটি সোনা বোঝাই জাহাজসহ ২৭টি জাহাজ স্পেনের উদ্দেশ্যে সমুদ্রে পাঠালাম। সবাই জানে এর মধ্যে ২০টি জাহাজ ঝড়ের কবলে পড়ে ক্যারিবিয়ান সাগরে ডুবে গিয়েছিল। আর ছয়টি ফিরে এসেছিল সান্টো ডেমিোঙ্গোর উপকূলে। আর একটি সোনা বোঝাই জাহাজ পৌছেঁছিল স্পেনে। কিন্তু আসল ঘটনা হলো জাহাজ ডুবেছিল ১৯টি। একটি জাহাজ ঝড়ের ভিন্ন একটা ঘূর্নাবর্তে পড়ে দক্ষিণে ভেসে গিয়েছিল। এই জাহাজটি ছিল সোনা বোঝাই দ্বিতীয় জাহাজ। জাহাজের সৎ ও সত্যবাদী ক্যাপ্টেন সর্বশেষ বার্তায় আমাকে জানিয়েছিল, তার ক্ষতিগ্রস্ত ও নিমজ্জমান জাহাজটি সুরিনাম উপকূলে ল্যান্ড করেছে। তারপর সব যোগাযোগ তার সাথে আমার বন্ধ হয়ে যায়। এ জাহাজের তথ্যটি সবার থেকে আমি গোপন করি দুই কারণে। প্রথমতঃ স্পেন সরকারের অধিকতর শাস্তির হাত থেকে বাঁচতে, দ্বিতীয়তঃ সবাইকে বিশ্বাস করাতে পারব যে জাহাজটি ডুবে গেছে। আমার ইচ্ছা ছিল সুরিনাম থেকে সোনাগুলো নিজে উদ্ধার করার। কিন্তু পরিস্থিতি আমাকে সে সুযোগ দেয়নি। পরে এক সময় ভাবতে শুরু করি, যাক জাহাজটির ক্যাপ্টেন অত্যন্ত ভালো মানুষ সোনাগুলো ক্যাপ্টেন আব্দুর রহমান আল তারিকের কাজে লাগুক। সে আটলান্টিকের সমুদ্র অভিযান গুলোতে অমূল্য অবদান রেখেছে। সেই তূলনায় সে বঞ্চিত হয়েছে। নির্লোভ ও ভাল মানুষ বলে তাকে ঠকানো হয়েছে। সোনাগুলো বিধাতাই তাকে পুরুস্কার হিসেবে দিয়েছে’। ডকুমেন্টের এই কথাগুলোর পর কি কোন সন্দেহ থাকে যে, টেরেক দুর্গের মাটির তলায় সোনা নেই?’
‘আমি সন্দেহ করিনি। একটা আশংকা প্রকাশ করেছি মাত্র’। বলল রোনাল্ড রঙ্গলাল।
‘আশংকার কোন কারণ নেই। তিলক লাজপত পাল টেরেক দূর্গ সম্পর্কে অনেক অনুসন্ধান করেছেন এবং তিনি নিশ্চিত হয়েছেন যে, সোনা বোঝাই জাহাজ পারামারিবোতেই নোংগর করেছিল এবং সেই জাহাজের লোকরাই এই টেরেক দূর্গের নির্মাতা। তাছাড়া তিলক লাজপত পাল হাজার হাজার ডলার খরচ করে দক্ষিণ আমেরিকার এই অঞ্চলের ভূ-সম্পদ ও খনিজ সম্পদ বিষয়ক উপগ্রহ মনিটরিং রিপোর্ট যোগাড় করেছিলেন, তাতেও পারামারিবো এলাকায় সলিড গোল্ডের অস্তিত্ব ধরা পড়েছে’। শিবরাম শিবাজী বলল।
প্রেসিডেন্ট ও রোনাল্ড রঙ্গলালের চোখগুলো লোভে চকচক করে উঠল। বলল রোনাল্ড রঙ্গলাল, ‘উপগ্রহ মনিটরিং রিপোর্ট ও পাওলো রোসীর কাছ থেকে কেনা ওভানডোর ডকুমেন্টগুলো কোথায়?’
‘এগুলো ছিল তিলকের পার্সোনাল গোপন ডকুমেন্ট। কোথায় রেখেছেন বলা মুষ্কিল। আপনারা সবাই উদ্যোগ নিয়ে তার পরিবারকে বলে খোঁজাখুঁজি করলে নিশ্চয় পাওয়া যাবে’। বলল শিবরাম শিবাজী।
‘ঠিক আছে ওটা দেখা হবে। এখন আসুন আমরা ঠিক করি, কোন মাফিয়া গ্রুপের আমরা সাহায্য নিতে পারি’। বলল রোনাল্ড রঙ্গপাল।
‘এ ব্যাপারে সাহায্য করতে পারবে আপনার সহকারী সাগর আগরওয়াল। মধ্য ও ল্যাটিন আমেরিকায় তার ব্যবসা চালাতে গিয়ে অনেক মাফিয়ার সংস্পর্শে তাকে আসতে হয়েছে। মধ্য আমেরিকা ও আমাদের ল্যাটিন আমেরিকার মাফিয়ারাই এখন পৃথিবীকে ডমিনেট করছে’। বলল শিবরাম শিবাজী।
খুশি হয়ে রোনাল্ড রঙ্গলাল বলল, ‘তাহলে তো কাজটা অনেক সহজেই হয়ে গেল’।
এ কথার পর রোনাল্ড রঙ্গলাল প্রেসিডেন্টের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ওদের তো অর্থ দিলেই চলে, ওদের সাথে সোনা ভাগাভাগির দরকার আছে?’
‘সোনা ও অর্থ একই একই কথা। সোনার কথা যখন ওরা জানতেই পারবে, উদ্ধারও করবে তারা সোনা, তখন সোনার একটা অংশ তাদের দেয়াই সুবিধাজনক হবে। কারণ সোনা উদ্ধারকে তখন ওরা তাদের প্রাপ্তির সাথে সম্পর্ক যুক্ত হিসেবে দেখবে। ভাল কাজ পাওয়া যাবে তাদের কাছ থেকে’। বলল প্রেসিডেন্ট।
‘তাহলে তাই হবে। মি. প্রেসিডেন্ট আমরা এখন উঠি’।
বলে উঠে দাঁড়াল রোনাল্ড রংলাল। উঠতে উঠতে বলল, ‘মি. প্রেসিডেন্ট আপনিও একটু আইজিকে বলবেন নির্বাচন অফিসে পুলিশ যেন নিষ্ক্রিয় থাকে। যা করার আমাদের লোকরাই করবে। তারা যেন ঠিক সময়ে একটু সরে থাকে’।
প্রেসিডেন্টও উঠে দাঁড়িয়েছিল। বলল, ‘ঠিক আছে বলব আমি তাকে’।
বলার পরেই প্রেসিডেন্টের মুখমন্ডলে ভাবনার ছায়া প্রকাশ পেল। হঠাৎ মাথা নিচু করে একটু ভাবল। তারপর বলল, ‘মি. রোনাল্ড, পুলিশ নিষ্ক্রিয় থাকতে পারে, হাঙ্গামার সময় একটু সরেও থাকতে পারে, কিন্তু নির্বাচন অফিসের ভেতর থেকে বাড়তি কোন সুযোগ আপনারা পাবেন না। দেশ-বিদেশের সাংবাদিকরা সেখানে থাকবে। ইচ্ছা থাকলেও কোন অবৈধ সহযোগিতা তারা দিতে পারবে না’।
‘ইয়েস মি. প্রেসিডেন্ট, এটা আমরা জানি। পুলিশের ঐটুকু সহযোগিতা হলেই আমাদের চলবে’। বলল রোনাল্ড রঙ্গলাল।
বলেই হাত বাড়িয়ে হ্যান্ডশ্যাক করে তারা বিদায় নিল’।

সেন্ট্রাল রোড ধরে এগুচ্ছে আহমদ মুসাদের গাড়ি। দুটি গাড়ি এক লাইনে সামনে এগুচ্ছে।
আগের গাড়িটি পাজেরো শ্রেণীর আমেরিকান জীপ। আহমদ মুসা ড্রাইভ করছে। পাশের সিটে বার্নারডো। পেছনের সিটের মাঝখানে আহমদ হাত্তা। তার এক পাশে তার দলের নির্বাচন পরিচালক, অন্য পাশে আহমদ হাত্তার সেক্রেটারী।
পেছনের গাড়িটা একটা মিনি মাইক্রো। তাতে পাঁচজন লোক।
আহমদ মুসার জীপটির ফ্ল্যাগ স্ট্যান্ডে রিপাবলিকান পার্টির পতাকা।
গাড়িতে আহমদ হাত্তা এভাবে পতাকা তুলতে চায়নি। কিন্তু আহমদ মুসার ইচ্ছাতেই গাড়িতে পতাকা লাগাতে হয়েছে। এর স্বপক্ষে যুক্তি হিসেবে আহমদ মুসা বলেছে, ‘আপনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং রিপাবলিকান পার্টির প্রধান। আপনি গাড়িতে পার্টির পতাকা তুলে সবাইকে জানিয়ে নির্বাচন অফিসে যাচ্ছেন নমিনেশন পেপার দাখিল করতে। এরপর যদি আপনাকে বাধা দেয়ার মত কিছু ঘটে সেটা হবে পরিকল্পিত সন্ত্রাস। এই সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সোচ্চার হবে গোটা দুনিয়া’।
আহমদ মুসার এ যুক্তি হাসি মুখে মেনে নিয়েছিল আহমদ হাত্তা।
ঠিক ১২টা দশ মিনিটে গাড়ি সেন্ট্রাল সার্কেল পার হয়ে সেন্ট্রাল রোড ওয়ান-এ প্রবেশ করল।
সেন্ট্রাল সার্কেল নগরীর সবচেয়ে অভিজাত ও জনবহুল বাজার এলাকা। সার্কেলের মাঝখানে পার্কিং-এর বিশাল জায়গা।
সেন্ট্রাল সার্কেল থেকে সেন্ট্রাল রোড দু’ শাখায় বিভক্ত হয়ে পশ্চিমে এগিয়ে নির্বাচন অফিসের সামনে সুরিনাম এভিনিউতে গিয়ে পড়েছে। সেন্ট্রাল রোড ওয়ান হলো যাবার এবং সেন্ট্রাল রোড টু হলো ফেরার।
সেন্ট্রাল রোড ওয়ানে প্রবেশ করেই একটু সামনে দুটি মাইক্রোকে রাস্তার দু পাশে বেআইনিভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল। এই অসংগতি দেখে রাস্তার দুপাশে মনোযোগ দিল আহমদ মুসা। দেখতে পেল, রাস্তার দুপাশেই ফোল্ডিং চেয়ার পেতে বসে আছে বারো চৌদ্দজন লোক। প্রায় একই বয়সের। দেখেই মনে হচ্ছে রাস্তা পাহারা দিচ্ছে ওরা।
ভ্রু কুঞ্চিত হলো আহমদ মুসার।
ওদেরও দৃষ্টিতে পড়ে গেছে আহমদ মুসাদের গাড়ি। ওদের সবার দৃষ্টি আহমদ মুসাদের গাড়ির দিকে।
ওদের মধ্যে থেকে একটা চিৎকার ভেসে এল, ‘রিপাবলিকান পার্টির পতাকা গাড়িতে। শালা আহমদ হাত্তা এ গাড়িতেই যাচ্ছে নির্বাচন অফিসে। উঠে দাঁড়াও সকলে, আটকাও গাড়িকে’।
ওদের মধ্যে ছুটাছুটি শুরু হয়ে গেল। ওদের সবার হাতে উঠে এসেছে স্টেনগান।
কয়েকজন স্টেনগান উঁচিয়ে আহমদ মুসাদের গাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল। কয়েকজন ছুটে আসছে গাড়ির দিকে।
মুহূর্তেই ঘটে গেল এ ঘটনাগুলো।
আহমদ মুসার কাছে বিষয়টা তখন পরিষ্কার হয়ে গেছে। ওরা তাদেরই আপেক্ষায় বসে ছিল। যে কোন মূল্যে গাড়ি আটকাবে।
আহমদ মুসা রিভলবার তুলে নিল হাতে। বলে উঠল একটু উচ্চ কন্ঠে, ‘সবাই সিটের উপর শুয়ে পড়ুন। বার্নারডো তুমি বাম দিকের মাইক্রোর টায়ার ফুটো করে দাও’।
বলেই আহমদ মুসা গুলী ছুঁড়লো ডানদিকের মাইক্রোর পেছনের চাকার উদ্দেশ্যে।
প্রায় একই সাথে দুটি টায়ার ফাটার শব্দ উঠল।
গুলী করেই আহমদ মুসা সামনের রাস্তার উপর চোখ বুলিয়ে মাথা নিচু করে গাড়ি চালিয়ে দিল তীব্র গতিতে। ওদের স্টেনগান থেকে গুলী বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। প্রখম সেই গুলীর ঝাঁক আসতে লাগল সামনের দিক থেকে। পরক্ষণে পাশ থেকেও।
কিন্তু পাশ থেকে যখন গুলী বৃষ্টি শুরু হয়েছে, তখন আহমদ মুসাদের গাড়ি পাশের অস্ত্রধারীদের প্রায় পাশ কাটিয়ে চলে এসেছে সামনে। মাত্র কয়েকটা গুলী দুপাশ থেকে গাড়ির পাশটাকে আঘাত করল।
সামনের গুলী গাড়ির সামনের উইন্ড শিল্ডকে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে। ভাঙা কাঁচের বৃষ্টি এসে পড়ছে আহমদ মুসা ও বার্নারডোর গায়ে।
কিন্তু যে পাঁচ ছয়জন অস্ত্রধারী গাড়ি আটকাবার জন্যে গাড়ির সামনে অবস্থান নিয়েছিল ও গুলী বৃষ্টি করছিল প্রাণপনে, তারা সকলেই আহমদ মুসার গাড়ির চাকায় পিশে গেছে।
পাঁচ সাত সেকেন্ড পরে আহমদ মুসা মাথা তুলল। দেখল, সামনের রাস্তা পরিষ্কার। রিয়ার ভিউতে তাকিয়ে দেখল, কতগুলো লাশ পড়ে আছে রাস্তায়, আর অন্যেরা ছুটাছুটি করছে।
পাশ থেকে বার্নারডো বলে উঠল, ‘স্যার ওরা আমাদের পিছু নেবার জন্যে মাইক্রোতে উঠছে। এতটাই বেদিশা হয়ে গেছে যে, গাড়ি দুটোর চাকা যে ফেটে গেছে, সে কথা কারো মনে নেই। কিংবা খেয়ালও করেনি। মোবারকবাদ স্যার, গাড়ি দুটোর চাকা নষ্ট করার আপনার সিদ্ধান্তকে’।
‘আল্লাহ এভাবেই ষড়যন্ত্রকারীদের সাজানো স্বপ্নকে গুঁড়িয়ে দেন’।
বলে আহমদ মুসা একবার ঘড়ির দিকে তাকাল। বলল, ‘আর পাঁচ মিনিটে কি আমরা পৌঁছব নির্বাচন অফিসে?’
‘হ্যাঁ আমরা পৌঁছতে পারব’। বলল বার্নারডো।
আহমদ মুসা পেছন দিকে মাথা ঘুরিয়ে বলল, ‘মি. হাত্তা, আপনি আপনার লোকদের নির্দেশ দিন, নির্বাচন অফিসমূখী সব রাস্তা যেন তারা বন্ধ করে দেয়। কোন রাস্তা দিয়ে কোন গাড়ি যাতে নির্বাচন অফিসে পৌঁছতে না পারে। আমার মনে হচ্ছে, নির্বাচন অফিসমূখী সব রাস্তায় ওরা এভাবে পাহারা বসিয়েছে। মোবাইলে নিশ্চয় তারা জানতে পারবে যে, তাদের বাধা ভেঙে আমরা নির্বাচন অফিসে পৌঁছতে যাচ্ছি। জানতে পারার পর তারা সকলেই নির্বাচন অফিসের দিকে ছুটবে। এরা যাতে নির্বাচন অফিসে পৌঁছতে না পারে’।
‘ধন্যবাদ আহমদ মুসা আপনাকে। আমাদের বিষ্ময়ের ঘোর এখনো কাটেনি। এক সময় মনে হচ্ছিল চারদিকের ছুটে আসা বুলেট আমাদের ভর্তা করে ফেলবে। কিন্তু পর মুহূর্তেই সব পরিষ্কার হয়ে গেছে। আমাদের নির্বাচন পরিচালক ও আমার সেক্রেটা