৩৪. সুরিনামে মাফিয়া

চ্যাপ্টার

চ্যাপ্টার

হ্যারিকেন ঝড়ের মত ঘাড়ের উপর এসে আপতিতপ্রায় ট্রাকটি দেখে শেষ মুহূর্তে যে আশঙ্কার চিন্তা আহমদ মুসার মাথায় ঝিলিক দিয়ে উঠেছিল, তা তার অনুভূতিকে ভোঁতা করে দেয়া নয় বরং তার ব্রেনের কমান্ড অফিসকে বিদ্যুৎগতির সক্রিয়তা দান করেছিল। আহমদ মুসার ব্রেনের কমান্ড যত দ্রুত ছিল, তার চেয়েও দ্রুত গতিতে গাড়ির ব্রেক কষল আহমদ মুসার পা।
তার মানে ট্রাকের সর্বনেশে মতলবের চিন্তাটা আহমদ মুসার মাথায় ঝিলিক দিয়ে ওঠার সাথে সাথেই সে কঠিন এক ব্রেক কষেছিল গাড়ির। গাড়ি আর এক ইঞ্চিও না এগিয়ে ডেডস্টপ হয়ে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল।
কিন্তু আহমদ মুসার গাড়ির সমান্তরালে চলে আসা গাড়িটা দাঁড়ায়নি। আহমদ মুসার গাড়িকে অতিক্রম করে এগিয়ে গেল সামনে।
আহমদ মুসার গাড়িকে অতিক্রম করে পাঁচ ফুটও এগোয়নি গাড়িটা। ঘটে গেল মর্মান্তিক ঘটনা।
দু’হাতে স্টিয়ারিং ধরে বিমূঢ়ভাবে সামনে তাকিয়ে থাকা আহমদ মুসার চোখের উপর চলন্ত দেয়ালের একটা পর্দা সৃষ্টি করে আহমদ মুসার গাড়ির প্রায় নাক ঘেষে ট্রাকটি গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল গাড়িটার উপর।
আহমদ মুসা সঙ্গে সঙ্গেই গাড়ি থেকে লাফ দিয়ে নামল।
গাড়ির পেছন ঘুরে দ্রুত সে গেল গাড়িটার কাছে যার ঘাড়ে এসে পড়েছে ট্রাকটি।
গাড়িটা দুমড়ে-মুচড়ে একদম ভর্তা হয়ে গেছে।
গাড়ির আরোহীর কি অবস্থা হয়েছে সেটা দেখার জন্যে আহমদ মুসা গাড়িটার ঘনিষ্ঠ হচ্ছিল।
এ সময় ট্রাকটির ইঞ্জিন গর্জন করে উঠল। সেই সাথে নড়ে উঠল ট্রাকটি।
পিছু হটছে ট্রাক।
পালাচ্ছে?
গাড়ির দিক থেকে ট্রাকটির দিকে ঘুরে দাঁড়াল আহমদ মুসা। সেই সাথে আহমদ মুসার হাতে উঠে এসেছে তার রিভলবার।
আহমদ মুসা ট্রাকের টায়ারে গুলী করতে গিয়ে তার চোখ পড়ল ট্রাকের জানালা দিয়ে ড্রাইভিং সিটের উপর। দেখল, একজন নেড়ে মাথা লোকের বাম হাত স্টিয়ারিং হুইলে এবং তার রিভলবার ধরা ডান হাত প্রসারিত হচ্ছে তার দিকে।
দেখেই আহমদ মুসা ঝাপ দিল ট্রাকের গাড়ির বিপরীত দিকে ছিঁড়ে-চ্যাপটা হওয়া গাড়িটির পাশে এবং মাটিতে পড়েই আহমদ মুসা অবিরাম চারটি গুলী করল। তার দুটি ড্রাইভারকে লক্ষ্য করে উইন্ডস্ক্রিনে, অন্য দুটি ট্রাকের সামনের দুই টায়ারে।
প্রথম দুটি গুলীতে উইন্ডস্ক্রিন সম্পূর্ণটাই ভেঙ্গে পড়েছে। কিন্তু নেড়ে মাথা লোকটি বেঁচে গেছে। তবে একটা কাজ হয়েছে নেড়ে মাথা লোকটির রিভলবার আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে একটা ব্যর্থ গুলী করার পর তাক করছিল গাড়ির লোকদের যাদের মধ্যে রয়েছে আহমদ হাত্তা ও ওয়াং আলী। কিন্তু আহমদ মুসা গুলীর মুখে পড়ে সে তার রিভলবার সরিয়ে নিয়েছিল এবং শরীরটাকে সিটের সাথে গুটিয়ে ট্রাক পেছনে সরিয়ে নিচ্ছিল।
কিন্তু আহমদ মুসার তৃতীয় গুলী ট্রাকের সামনের একটি চাকা ফাটিয়ে দিল।
ভারী ট্রাকের সামনের চাকা মুখ থুবড়ে পড়ার পর ট্রাক আর এক ইঞ্চিও পেছনে সরতে পারলো না।
ট্রাকের চাকা বিস্ফোরিত হতেই আহমদ মুসা চিৎকার করে বলল, ‘ওয়াং তুমি গাড়ি পেছনে সরিয়ে নিয়ে যাও।’
এই কথাগুলো বলার সাথে সাথেই আহমদ মুসা শোয়া অবস্থাতেই শরীরটাকে দ্রুত গড়িয়ে চিড়ে-চ্যাপটা হয়ে পড়া গাড়ির পেছনে নিয়ে এল।
আহমদ মুসার আশঙ্কা ঠিক, ট্রাকের টায়ার ফেটে যাওয়ার পর যখন গাড়িকে আর পেছনে নেয়া গেল না, তখন ন্যাড়ামাথা লোকটি তার রিভলবার ফেলে স্টেনগান হাতে তুলে নিয়ে সামনে ডানে বেপরোয়া গুলী করতে শুরু করেছে।
ততক্ষনে ওয়াং তাদের গাড়িকে অনেক-খানি সরিয়ে নিয়েছে। আহমদ মুসা গাড়ির পেছনে সরে না গেলে এবং ওয়াং গাড়িটাকে সরিয়ে না নিলে আহমদ মুসা যেমন স্টেনগানের গুলীর মুখে পড়ে যেত, তেমনি গাড়িটাও ঝাঁঝরা হয়ে যেত।
আহমদ মুসা গাড়িতে বসে হাসল। মনে মনে বলল, ন্যাড়া মাথা বন্ধু, তোমার ট্রাকের দুই পাশই এখন এম-১০ এর পাহারায়। তোমাকে তো নামতেই………।
আহমদ মুসার চিন্তা তখনও শেষ হয়নি।
ন্যাড়ামাথা লোকটি বাম দরজার সমান্তরালে স্টেনগানের নল দক্ষিণমুখী করে অবিরাম তার গুলী বৃষ্টির মধ্যে ট্রাক থেকে নেমে ঐ গুলীর কভারে ট্রাকের পুবপাশে ঘেষে উত্তর দিকে ছুটল।
আহমদ মুসা অপ্রস্তুত থাকায় আগেই গুলী বৃষ্টি শুরু করতে পারেনি। ন্যাড়া লোকটির অবিরাম গুলী বৃষ্টির মুখে দরজার সমান্তরালে তার এম-১০ কে আর তুলে ধরতে পারলো না।
কিন্তু আহমদ মুসা গুলীর মুখোমুখি অবস্থান থেকে সরে যাবার বিকল্প ব্যবস্থা ঠিক করে ফেলেছে।
আহমদ মুসা গুঁড়ি মেরে বসা তার শরীরটাকে পুবদিকে দু’বার উল্টিয়ে নিল। বিধ্বস্ত গাড়িটির পুব মাথায় গিয়ে পৌঁছল।
গুলীর নিশানা থেকে বেরিয়ে এল আহমদ মুসা। ন্যাড়া লোকটি তখন পিছু হটে ছুটছিল, আর একই নিশানায় গুলী ছুঁড়ছিল। এরই সুযোগ গ্রহণ করলো আহমদ মুসা।
আহমদ মুসা এম-১০ রেখে রিভলবার তুলে নিয়ে ধীরে সুস্থে লোকটির স্টেনগান ধরা ডান হাত লক্ষ্যে গুলী করল।
ন্যাড়া লোকটির হাত থেকে ছিটকে পড়ে গেল স্টেনগান।
আহমদ মুসা রিভলবার বাগিয়ে সঙ্গে সঙ্গেই উঠে দাঁড়াল। বলল চিৎকার করে, ‘শুন ন্যাড়া মাথা বন্ধু, ডান হাতটা গেছে, জীবন হারাতে না চাইলে বাঁ হাত উপরে তুলে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাক।’
বলে আহমদ মুসা লোকটির উপর চোখ রেখেই চিৎকার করে উঠল, ‘ওয়াং গাড়ি নিয়ে এসো।’
মুহূর্ত কয়েকের মধ্যেই ওয়াং গাড়ি এনে আহমদ মুসার পাশে দাঁড় করাল।
ন্যাড়া মাথা লোকটি আহমদ মুসার নির্দেশ মানেনি। হাত তোলেনি সে। তাকিয়ে আছে সে আহমদ মুসার দিকে। দু’চোখে তার আগুন ঝরছে।
আহমদ মুসা এগুলো তার দিকে।
লোকটি মরিয়া হয়ে বাঁ হাত দিয়ে স্টেনগান তুলে নিতে যাচ্ছিল।
আহমদ মুসা বেপরোয়া এই লোকটিকে নিস্ক্রিয় করার জন্যে গুলী করে তার বাম হাতকেও নিস্ক্রিয় করে দিল। বলল আহমদ মুসা, ‘তোমাকে মারব না। ধরতে চাই তোমাকে। কার ভাড়া খাটছ তোমরা তা জানতে চাই।’
ন্যাড়া মাথা লোকটি হো হো করে হেসে উঠল।
বলল, ‘মারতে তুমি পার, ধরতে পারবে না আমাদের।’ বলেই তার আহত ডান হাতটি মুখে তুলে কামড়ে ধরল একটা আঙুল।
সঙ্গে সঙ্গেই বুঝতে পারল আহমদ মুসা, নিশ্চয় লোকটির হাতে সাইনায়েড বিষের আংটি আছে। সেটাই সে কামড়ে ধরেছে।
দৌড় দিয়েছিল আহমদ মুসা লোকটিকে বাঁচাবার জন্যে। কিন্তু পারল না। আহমদ মুসা যখন গিয়ে তার হাতটি মুখ থেকে সরিয়ে নিল, তখন তার নিষ্প্রাণ দেহটি আহমদ মুসার হাতেই ঢলে পড়ল।
লোকটিকে বাঁচাতে না পারা আহমদ মুসাকে যতখানি কষ্ট দিল, তার চেয়ে অনেক বিস্মিত হলো সে ধরা পড়া থেকে বাঁচার জন্যে আত্মাহুতি দেয়ার এ ঘটনায়।
ঝড়ের বেগে অনেক প্রশ্ন অনেক ভাবনা এসে প্রবেশ করল আহমদ মুসার মনে।
কোন পলিটিক্যাল একটিভিস্টরা এ ধরনের কাজ করতে পারে না! তারা রাজনীতি করে জীবনের জন্যে, তারা এভাবে ধরা পড়ার ভয়ে জীবন বিসর্জন দিতে পারে না। কিংবা কোন পলিটিক্যাল ক্রিমিনাল এভাবে জীবন বিসর্জন দেবে কেন? একথা তারাও জানে এবং সবাই জানে যে রাজনৈতিক রাঘব বোয়ালরা তাদের নিয়োগ করে। সুতরাং তারা ধরা পরলে তাদের ক্ষতি তো তেমন নেই। বিশেষ করে সুরিনামে যারা আহমদ হাত্তাদের বিরুদ্ধে কাজ করেছে, তারা তো সরকারের আশীর্বাদ পুষ্ট। তারা ধরা পড়লে থানায় গেলেই ছাড়া পেয়ে যেতে পারে। কিংবা কোর্টে গেলেও তারা বেল পেয়ে যাবে। সুতরাং তারা ধরা পড়ার ভয়ে মরতে যাবে কোন দুঃখে? কিন্তু এ লোক তাহলে এভাবে আত্মহত্যা করল কেন?
অবাক করা এই নতুন চিন্তাগুলো আহমদ মুসাকে পেয়ে বসেছিল।
আহমদ হাত্তা, ওয়াং আলীরা কখন তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে টের পায়নি আহমদ মুসা। অবশেষে আহমদ হাত্তা বলে উঠল, ‘কি ব্যাপার মি. আহমদ মুসা? কি ভাবছেন? লোকটি কি মারা গেল?’
আহমদ মুসা তাকাল আহমদ হাত্তার দিকে। বলল, ‘লোকটি পটাশিয়াম সাইনায়েড খেয়ে আত্মহত্যা করেছে।’
আহমদ মুসা লোকটির দেহ মাটিতে রেখে উঠে দাঁড়াল। বলল, ‘চলুন মি. হাত্তা, গাড়ির লোকটির কি অবস্থা হয়েছে দেখি।’
সবাই চলল গাড়ির দিকে।
গাড়িটা একদম চিড়ে-চ্যাপটা হয়ে গেছে, কেউ বাঁচার নয়। গাড়িটা ছিল লেফট হ্যান্ড ড্রাইভ। তার উপর বাঁ দিক থেকেই আঘাত খেয়েছে।
গাড়ির ড্রাইভিং সিটের আরোহীই একমাত্র আরোহী ছিল।
সবাই গাড়ি ঘিরে দাঁড়াল।
উঁকি দিয়ে দেখা গেল, ড্রাইভার লোকটার শরীরের পেছন দিকের বৃহত্তর অংশ অদৃশ্য, দুমড়ে আসা গাড়ির একটা অংশের নিচে চাপা পড়ে আছে। যেটুকু দেখা যাচ্ছে তা রক্তে ভাসছে।
আহমদ মুসা কোন মতে একটা হাত ঢুকিয়ে পরীক্ষা করে দেখল লোকটা মারা গেছে।
লোকটির বাম হাত প্রায় গুঁড়ো হয়ে গেছে, আর ডান হাতটা কাঁধ ও পিঠের নিচে পড়ে গেছে।
আহমদ মুসা টেনে বের করল তার হাতটা। তার অনামিকায় একটা আংটি দেখতে পেল। পরীক্ষা করে নিশ্চিত হলো, এটাও ঐ লোকটার মতই সাইনায়েড রিং।
ভ্রুকুঞ্চিত হলো আহমদ মুসার। তার মনে পড়ল এ পর্যন্ত সুরিনামে প্রতিপক্ষের যারা নিহত হয়েছে, তাদের যাদেরকে তার পরীক্ষা করার সুযোগ ঘটেছে, কারও হাতেই এই সাইনায়েড রিং দেখেনি। কিন্তু এখানে দুজনের হাতে সাইনায়েডের রিং পাওয়ার অর্থ হলো, এরা দুজন একদলের শুধু নয়, বিশেষ একটা গ্রুপের অংশ।
আহমদ মুসা এই নতুন ভাবনার সাথে সাথে ধীরে ধীরে গাড়ির দিকে এগুলো।
গাড়িতে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে আহমদ হাত্তার সেক্রেটারীকে লক্ষ্য করে বলল, ‘আপনি মি. আহমদ হাত্তার সেক্রেটারীর পরিচয় দিয়ে পুলিশকে টেলিফোন করুন। বলুন যে, এখানে অন্তর্ঘাতমূলক এ্যাকসিডেন্ট ঘটেছে। দুজন মারা গেছে। আপনারা শীঘ্র আসুন। আমরা অপেক্ষা করছি।’
আহমদ হাত্তার সেক্রেটারী তার মোবাইল তুলে নিল টেলিফোন করার জন্য।
সেক্রেটারীর টেলিফোন শেষ হতেই আহমদ হাত্তা আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে বলে ওঠল, ‘মি. আহমদ মুসা, বিশেষ কিছু আপনি ভাবছেন বলে মনে হচ্ছে?’
‘হ্যাঁ মি. হাত্তা। আমার মনে হচ্ছে গত কয়েকদিন যাদের সাথে আমাদের সংঘাত হয়েছে, গত কয়েকদিন যারা আমাদের উপর আক্রমণ পরিচালনা করেছে, তারা এবং এরা এক নয়।’ বলল আহমদ মুসা।
‘কেন একথা বলছেন?’ আহমদ হাত্তা বলল।
‘রঙ্গলালদের লোক হলে এরা ধরা পড়ার ভয়ে এইভাবে আত্মহত্যার কথা নয়। যারা কোন মতেই নিজেদের পরিচয় প্রকাশ করতে চায় না, কিংবা নিজেদের কোন তথ্য বাইরে প্রকাশ হতে দিতে চায় না, তারা এইভাবে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। কিন্তু রঙ্গলালের লোকরা তো এসব চিন্তা করার কথা নয়। তাদের ষড়যন্ত্র এখন সবাই জানে এবং রঙ্গলালের মত রাজনীতিকরা এসবকে ভয়ও করে না।’ বলল আহমদ মুসা।
‘এভাবে বিষয়টাকে তো আমি ভাবিনি! ঠিকই বলেছেন আপনি। রঙ্গলাল ও ‘মাসুস’ – এর ক্যাডাররা এমন প্রফেশনাল নয়।’
একটু থামল আহমদ হাত্তা এবং পরক্ষণেই আবার বলে উঠল, ‘তাহলে এরা কারা?’ রঙ্গলালরা আমাদের রাজনৈতিক শত্রু হওয়া ছাড়া আর তো কোন শত্রু আমাদের নেই।’
‘আরেকটা বিষয় লক্ষ্য করেছেন, লোকগুলোর চেহারা কিন্তু পুরোপুরি সুরিনামের নয়, কলম্বিয়া বা ভেনিজুয়েলানদের সাথে এদের মিল বেশি।’ বলল আহমদ মুসা।
বিস্মিত চোখে তাকাল আহমদ হাত্তা আহমদ মুসার দিকে। বলল, ‘প্রথম দেখে আমার মনে প্রশ্ন জেগেছিল। কিন্তু সেটা খুব দুর্বল প্রশ্ন। আপনি বিষয়টাকে এত গভীরভাবে দেখেছেন? ঠিকই বলেছেন, এদের ইউনিফরম পরালে ঠিক কলম্বিয়ান সৈনিক অথবা ড্রাগ বাহিনীর সদস্যদের মত দেখাবে।’
‘ওদের পোশাকের দিকে খেয়াল করেছেন? যে ধরনের শার্ট ও প্যান্ট ওরা পরে আছে, এ পর্যন্ত সুরিনামে কারো পরনে এমন ডিজাইনের শার্ট-প্যান্ট আমি দেখিনি।’
ট্রাকের পাশে পরে থাকা লাশের দিকে আবার তাকাল আহমদ হাত্তা। একটু দেখে নিয়ে বলল, ‘ঠিক বলেছেন মি. আহমদ মুসা, প্যান্টের বটম ফল্ডিংটা সুরিনামে, বিশেষ করে শহরাঞ্চলে একেবারেই অনুপস্থিত। শার্টের কলার ও চেস্ট প্লেটও সুরিনামে নতুন।’
বলে একটু হাসল আহমদ হাত্তা তারপর বলল, ‘কিন্তু আহমদ মুসা এত সব বিষয় এক সাথে আপনার নজরে পড়ল কি করে? আমিও দেখেছি, আমার তো কিছু মনে হয়নি?’
‘সব দেখা, দেখা নয় মি. হাত্তা। আপনি মনোযোগ দিয়ে দেখলে ওসব আপনার চোখেও ধরা পড়তো।’ আহমদ মুসা বলল।
‘সব দেখা যেমন দেখা নয়, তেমনি সব চোখেই সব দেখার আইকিউ থাকে না- এটাও সম্ভবত ঠিক। যাক। এখন বলুন, এরা সুরিনামের লোক না হলে তার অর্থ কি দাঁড়ায়?’ বলল আহমদ হাত্তা।
‘এরা বাইরের এবং প্রফেশনাল। এটা ঠিক হলে বলতে হবে আপনার শত্রু সংখ্যা বাড়লো। এখন দেখতে হবে এই শত্রু কারা, এই শত্রু এবং আগের শত্রুর মধ্যে সম্পর্ক কি, কিংবা দুই শত্রু এক শত্রু কিনা। তবে আমার মনে হচ্ছে এরা বিপজ্জনক। কারণ যারা বিনা দ্বিধায় মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে পারে, তাদের সামনে ভয় বলে কোন জিনিস থাকে না। এমন বেপরোয়া শত্রুকে সামাল দেয়া খুবই কঠিন।’ থামল আহমদ মুসা।
মুখ শুকিয়ে গেল আহমদ হাত্তার। বলল, ‘আজ ওদের টার্গেট কি ছিল?’
‘ওদের টার্গেট ছিল আমাদের গাড়িকে ধ্বংস করা।’ আহমদ মুসা বলল।
‘তার অর্থ আমাকে হত্যা করা।’ বলল আহমদ হাত্তা।
‘সাধারণ হিসেব এটাই। কিন্তু শত্রুকে চেনার আগে এটা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। বিষয়টা কোন মিস ফায়ারিং-এর ঘটনাও হতে পারে। আবার নিছক এক্সিডেন্টও হতে পারে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘কিন্তু তাদের আত্মহত্যার ঘটনা এবং এক্সিডেন্টের পর আমাদেরকে হত্যা চেষ্টার কি ব্যাখ্যা হবে তাহলে?’ বলল আহমদ হাত্তা।
‘হ্যাঁ, মি. হাত্তা। এ দুটি ঘটনার ব্যাখ্যা পাওয়া কঠিন। বিষয়টা আমাদের ভাবতে হবে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘পুলিশ তো আসছে, পুলিশকে আমরা কি বলব?’
‘যা ঘটেছে, যা আমরা দেখেছি সব বলব। তবে আমরা যা বুঝেছি সেটা বলব না।’ আহমদ মুসা বলল।
‘আমরা কি বুঝেছি?’ জিজ্ঞেস করল আহমদ হাত্তা।
‘আমরা বুঝেছি এরা পেশাদার সন্ত্রাসী এবং এরা সম্ভবত সুরিনামের বাইরের লোক। আরেকটা জিনিস আমরা বুঝেছি। সেটা হলো, এদের আক্রমণের টার্গেট ছিলাম আমরা। শুধু আমরা বুঝতে পারিনি, আমরাই যদি এদের আক্রমণের টার্গেট হয়ে থাকি, তাহলে কেন এই আক্রমণ? এরা কারা?’ আহমদ মুসা বলল।
এ সময় পুলিশের গাড়ির সাইরেন তাদের কানে এল।
সামনে তাকিয়ে তারা দেখল পারামারিবোর দিক থেকে পুলিশের গাড়ি আসছে। দুটি গাড়ি।
সবাই ঘুরে দাঁড়াল সামনের দিকে।
অপেক্ষা করতে লাগল তারা পুলিশের গাড়ির।

খবরের কাগজটা হাতে নিয়ে সেদিনের সচিত্র লিড নিউজটার উপর নজর পড়তেই চিৎকার করে উঠল শিবরাম শিবাজী, ‘সর্বনাশ মি. রঙ্গলাল, সর্বনাশ।’
শিবরাম শিবাজীর চোখ সচিত্র নিউজটার একটা ছবির উপর নিবদ্ধ।
বিস্ময় ও আতংক ঠিকরে পড়ছে তার চোখ দিয়ে।
রোনাল্ড রঙ্গলাল উঠে গিয়েছিল তার রাইটিং প্যাড ও কলম আনতে।
ছুটে এল রঙ্গলাল।
বসল শিবরাম শিবাজীর পাশের সোফায়। শিবরাম শিবাজী তার হাতের কাগজটা একটু এগিয়ে সচিত্র খবরটা মেলে ধরল রোনাল্ড রঙ্গলালের চোখের সামনে।
ছবির ন্যাড়া মাথা একটা লোকের উপর চোখ পড়তেই ভীষণ চমকে উঠল। রঙ্গলাল বলল, ‘একি! এযে আমাদের সেই মাফিয়া দুই নেতার একজন!’
দ্রুত নজর বুলাল সে ক্যাপশনের উপর। পড়ল, ‘এক্সিডেন্ট ঘটিয়ে একজন লোক হত্যার পর ধরা পড়ার ভয়ে পটাশিয়াম সাইনায়েড রিং চুষে আত্মহত্যা করেছে এই অজ্ঞাত পরিচয় লোকটি।’
ক্যাপশন পড়েই তাড়াতাড়ি দৃষ্টি ফেরাল নিউজ আইটেমের হেডিং এর দিকে।
পড়লঃ ‘আহমদ হাত্তাকে হত্যার আবার পরিকল্পিত প্রচেষ্টা। দুর্ঘটনায় অজ্ঞাতনামা একজন নিহত। হন্তা ট্রাক ড্রাইভারের আত্মহত্যা।’
হেডিং পরে রোনাল্ড রঙ্গলালের ভ্রু-কুঞ্চিত হয়ে উঠল। বলল দ্রুত, ‘আবারও ব্যর্থ? পড়ুন তো মি. শিবরাম শিবাজী নিউজটা।’ কম্পিত কণ্ঠ রঙ্গলালের।
শিবরাম শিবাজী পত্রিকাটা তার দিকে টেনে নিল। পড়তে শুরু করলঃ
গতকাল ব্রুকোপনডো হাইওয়েতে পরনাম শহর ও রাজধানী পারামারিবোর মাঝামাঝি জায়গায় এক ভয়াবহ ঘটনায় একটি ট্রাক একটি কার কে পিষ্ট করলে কারটির একমাত্র আরোহী ড্রাইভার নিহত হয়। হন্তা ট্রাকটির ড্রাইভার ধরা পড়া আসন্ন দেখে পটাশিয়াম সাইনায়েড রিং চুষে আত্মহত্যা করে। অন্যদিকে ড্রাইভারের অপূর্ব দক্ষতার জন্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও তার ভাবী জামাতা ওয়াং আলী অল্পের জন্যে সাক্ষাত মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে যান।
তদন্তকারী পুলিশ ও সাংবাদিকদের মতে মর্মান্তিক ঘটনাটি সাবেক প্রধানমন্ত্রী আহমদ হাত্তাকে হত্যারই একটা প্রচেষ্টা ছিল। প্রাপ্ত আলামত ও ঘটনার সুরতহাল রিপোর্টের ভিত্তিতে গঠিত পুলিশের প্রাথমিক ধারণা হলো, হন্তা ট্রাকের আত্মহত্যাকারী ড্রাইভার ও পিষ্ট কার- এর নিহত একমাত্র আরোহী একই গ্রুপের, তাদের উভয়ের হাতেই পটাশিয়াম সাইনায়েড রিং পাওয়া গেছে। পুলিশের মতে ষড়যন্ত্রটা ছিল এই রকম- পিষ্ট কারটি আহমদ হাত্তার গাড়িকে ডান দিক থেকে ব্লক করবে, যাতে আহমদ হাত্তার গাড়ি টের পেয়ে গেলেও দুর্ঘটনা এড়ানোর জন্য শেষ মুহূর্তেও ডান দিকে টার্ন নিতে না পারে। নির্দিষ্ট পয়েন্টে পৌঁছতেই ক্রসিং-এর পথে দ্রুত বেগে আসা ট্রাক আহমদ হাত্তার গাড়িকে আঘাত করবে। আর তার আগেই ব্লক করে থাকা সহযোগী কারটি থেমে যাবে। তার ফলে বেঘোরে পিষ্ট হয়ে যাবে আহমদ হাত্তার গাড়ি সব যাত্রী সমেত।
কিন্তু এ ষড়যন্ত্র সফল হয়নি। আহমদ হাত্তার অতিদক্ষ ড্রাইভার বিপদ আঁচ করার সঙ্গে সঙ্গেই ব্রেক কষে গাড়ি ডেডস্টপ করতে সমর্থ হয়। ডানদিক থেকে আহমদ হাত্তার গাড়ি ব্লককারী কারটি কিন্তু তা পারেনি। কারটি সামনে এগিয়ে যায়। ফলে ঘটনাটা সেমসাইড হয়ে যায়। ট্রাকটি যেখানে পিষ্ট করার কথা আহমদ হাত্তার গাড়িকে, সেখানে তা পিষ্ট করে তার সহযোগীকে।
আহমদ হাত্তার সেক্রেটারির মোবাইলে খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে হাজির হয়।
থানায় আহমদ হাত্তার দায়ের কৃত মামলার বিবরণ থেকে ঘটনার আরও বিবরণ পাওয়া গেছে। হন্তা ট্রাকটি যখন ঘটনার পর পালাতে চেষ্টা করে তখন আহমদ হাত্তার ড্রাইভার ট্রাকটির টায়ার লক্ষ্যে গুলী করে এবং গুলীতে টায়ার ফেটে যাওয়ায় ট্রাকটি থেমে যায়। ট্রাকটির ড্রাইভার তখন আহমদ হাত্তার গাড়ির লক্ষ্যে গুলী করতে করতে ট্রাক থেকে নেমে আসে। আকস্মিক এই গুলীর মুখে পরে আহমদ হাত্তার কারটি দ্রুত পেছনে সরে যায়। এই সুযোগে ট্রাকের লোকটি তার ট্রাকের আড়াল নিয়ে ছুটে পালাতে চেষ্টা করে। তখন আহমদ হাত্তার কারটি দ্রুত আবার সামনে চলে আসে। আহমদ হাত্তার গাড়িকে তার পেছনে আসতে দেখে লোকটি ঘুরে দাঁড়িয়ে গাড়ি লক্ষ্যে স্টেনগানের ব্রাশ ফায়ার করতে চেষ্টা করে। কিন্তু তার আগেই আহমদ হাত্তার ড্রাইভারের গুলী খেয়ে লোকটি আহত হয়ে পড়ে যায় এবং ধরা পড়া আসন্ন দেখে সাইনায়েড খেয়ে আত্মহত্যা করে।
ঘটনাস্থলে পরবর্তীতে উপস্থিত সহকারী পুলিশ কমিশনার একটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। তার মতে আক্রমণ করা লোক দুটি সুরিনামের নয়। কলম্বিয়া বা ল্যাটিন অঞ্চলের অন্য কোন দেশের হতে পারে। তবে তিনি এও জানান পরীক্ষার পরেই এ ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া যাবে। তিনি বলেন, তাদের এই অনুমান যদি সত্য হয় তাহলে তা দেশের আইন-শৃঙ্খলার জন্যে খুবই উদ্বেগজনক হবে। কারণ আমাদের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে বাইরের কেউ বা কোন গ্রুপ আগ্রহী হলে বা দেশের কেউ বা কোন গ্রুপ যদি তাদের হীন স্বার্থ চরিতার্থের জন্যে বাইরের সন্ত্রাসীদের দেশে ডেকে আনে, তাহলে আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ঘটতে পারে।
সব মিলিয়ে নির্বাচনের প্রাক্কালে দেশের অশান্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতির সাথে উদ্বেগজনক নতুন মাত্রা যোগ হলো বলে ওয়াকিফহাল মহল মনে করেন। তারা মনে করছেন, এই ঘটনার পর রাজনীতিকদের বিশেষ করে সাবেক প্রধানমন্ত্রী আহমদ হাত্তার জন্যে শক্তিশালী নিরাপত্তা ব্যবস্থা দরকার।’
পড়া শেষ করেই শিবরাম শিবাজী বলে উঠল, ‘এবারও দেখছি ড্রাইভারই বাঁচাল আহমদ হাত্তাকে এবং ড্রাইভারই গুলী করে ফেলে দেয় আত্মহত্যাকারী ন্যাড়া মাথাকে।’
‘তাতো হলো, কিন্তু আমাদের হায়ার করা মাফিয়াদের দুজন পরিকল্পনা করে দুদিক থেকে ঘিরেও কাবু করতে পারলো না এক ড্রাইভারকে?’ বলল রঙ্গলাল।
‘শিখ ড্রাইভারতো, নিশ্চয় তাঁর সামরিক ট্রেনিং আছে। ড্রাইভার ও বডিগার্ড দুয়ের দায়িত্ব পালন করছে।’ বলল শিবরাম শিবাজী।
মুখ তখন ভীষণ গম্ভীর হয়ে উঠেছে রোনাল্ড রঙ্গলালের। বলল, ‘এই আক্রমণটায় আমাদের কোন লাভ হলো না, লাভ হলো শত্রুদের আর ক্ষতিগ্রস্ত হলাম আমরা।’
‘যেমন?’
‘আরও বেশি সহানুভূতি অর্জন করবে আহমদ হাত্তা। অন্যদিকে এই হত্যা প্রচেষ্টার দায় আমাদের ঘাড়েই চাপাবে অনেক মানুষ। আমরা তাদের সমর্থন হারাব। তাছাড়া মাফিয়ারা যে এদেশে প্রবেশ করেছে এবং আমাদের সহায়তার জন্যেই প্রবেশ করেছে, এটাও প্রকাশ হয়ে পড়তে পারে।’ রঙ্গলাল বলল।
‘এর মধ্যে রাজনৈতিক দিকটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ মি. রঙ্গলাল। এমনিতেই বিরাট সমবেদনা ভোট তার দিকে চলে গেছে। এই ঘটনার পর তার সংখ্যাটা আরও বাড়ল।’ শিবরাম শিবাজী বলল।
‘কিন্তু মি. শিবাজী, এই ক্ষতির চেয়েও বড় ক্ষতি হয়ে গেল।’
‘সেটা কি?’
‘সেটা হলো, এখন আহমদ হাত্তা যেভাবে যেখানেই নিহত হোক, তার জন্যে আমাদেরকেই সন্দেহ করা হবে। ইতিহাসেও এ দায় আমাদের বহন করতে হবে।’ বলল রঙ্গলাল।
‘আহমদ হাত্তাকে যদি এখনই সরিয়ে দেয়া যায়, টেরেক দুর্গের স্বর্ণ যদি আমরা পেয়ে যাই, তাহলে এ দায় বহন করতে রাজি আছি।’ শিবরাম শিবাজী বলল।
‘কিন্তু তা পারছি কই? দুজন মাফিয়ার মৃত্যু বিরাট ঘটনা। কিন্তু লাভ কিছুই হলো না।’ বলল রঙ্গলাল।
‘ক্ষতি হয়েছে মাফিয়াদের কিন্তু একটা লাভ আমাদের হয়েছে।’
‘কি সেটা?’
‘এতে নিশ্চয় ক্ষেপে গেছে মাফিয়ারা। সাপের লেজে পাড়া দিলে সাপ যেমন ছোবল মারে সঙ্গে সঙ্গেই, তেমনি মাফিয়ারাও পাগলের মত ছোবল মারতে ছুটে যাবে আহমদ হাত্তাকে।’
কিছু বলতে যাচ্ছিল রঙ্গলাল, এ সময়ে টেলিফোন বেজে উঠল।
টেলিফোন ধরল রঙ্গলাল। বলল, ‘গুড মর্নিং।’
ওপারের কণ্ঠ শোনা গেল। বলল, ‘গুড মর্নিং স্যার। কিন্তু সময় খুব ভালো ঠেকছে না।’
‘কেন, কি হয়েছে?’ বলল রঙ্গলাল।
‘গতকাল ব্রুকোপনডো হাইওয়েতে যে ঘটনা ঘটেছে, সে রিপোর্ট নিশ্চয় পড়েছেন স্যার।’ বলল ওপার থেকে।
‘হ্যাঁ পড়েছি।’
‘রিপোর্টে পুলিশের বরাত দিয়ে ভিকটিম দুজনকে বিদেশী বলা হয়েছে। আর গোয়েন্দা রিপোর্ট ঘটনাকে একটা হত্যা ষড়যন্ত্র বলেছে। বলা হয়েছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং নির্বাচন প্রার্থী আহমদ হাত্তাকে হত্যার জন্যেই এই ষড়যন্ত্র করা হয়। এর সাগথে সদ্য ক্ষমতাত্যাগী প্রধানমন্ত্রী রঙ্গলালদের যোগসাজস থাকতে পারে বলে রিপোর্টে উল্লেখ করেছে।’ বলল টেলিফোনের ও প্রান্ত থেকে।
‘খুনের চেষ্টা করল বিদেশী সন্ত্রাসীরা। আমাকে জড়ানো হবে কেন?’ রঙ্গলাল বলল।
‘সন্দেহ করা হচ্ছে ওরা ভাড়াটিয়া পেশাদার। আপনারা তাদের নিয়োগ করেছেন।’ বলল ওপার থেকে।
‘সন্দেহ করলেই হলো?’ রঙ্গলাল বলল।
‘তদন্ত শুরু হয়েছে। সাবধানে থাকবেন। আপনি কোথায় যান, কার সাথে চলেন, সব মনিটর করা হচ্ছে। আমি পুলিশের প্রধান হলেও আমার কিছু করার নেই।’ বলল টেলিফোনের ওপার থেকে।
‘করুকগে, কিছুই পাবে না।’ বলল রঙ্গলাল।
‘কিন্তু কয়েকদিন আগে দুজন বিদেশী আপনার ও শিবরাম শিবাজীর সাথে দেখা করেছিল।’
‘তাতে কি প্রমাণ হয়? আমি রাজনীতিক, সেই সাথে বড় ব্যবসায়ীও। বিদেশীরা তো আসতেই পারে আমার কাছে।’ রঙ্গলাল বলল।
‘যারা ব্রুকোপনডো হাইওয়ের ঘটনায় মারা গেল এবং যারা আপনার সাথে দেখা করেছিল, তারা একই গ্রুপের এবং তাদের ব্যবসায়ী বলে মনে করা হচ্ছে না। তারা কোন হোটেলে ওঠেনি। কৌশলে তারা তাদের থাকার জায়গা আড়াল করে রাখছে।’
‘তার মানে তুমিও আমাকে সন্দেহ করছ?’
‘সন্দেহ নয় সাহায্য করতে চাচ্ছি।’
‘বল কি পরামর্শ।’ রঙ্গলাল বলল নরম গলায়।
‘নির্বাচনের আগে আহমদ হাত্তার যাতে কোন ক্ষতি না হয়, আপনি দেখুন। এটা আপনার স্বার্থেই। কারণ মানুষের সব সন্দেহ এখন আপনার দিকে। আইন যাই করুক, তাঁর কিছু হলে মানুষের অসন্তোষ থেকে আপনি বাঁচবেন না।’ বলল টেলিফোনের ওপ্রান্ত থেকে।
‘নির্বাচনের ফল সম্পর্কে কি ভাবছ?’
‘সিমপেথী ভোট আহমদ হাত্তার পক্ষে গেছে! দয়া করে আর বাড়তে দেবেন না। এখনও আপনার হতাশ হবার কিছু নেই বলে আমি মনে করি।’
‘থ্যাংকস অফিসার।’ বলল রঙ্গলাল।
‘থ্যাংকস স্যার।’ বলল টেলিফোনের ওপ্রান্ত থেকে।
কথা শেষ করে টেলিফোন রেখেই রঙ্গলাল শিবরাম শিবাজীর দিকে চেয়ে বলল, ‘এখন কি করা যায়?’
‘কি বলল পুলিশের কর্তা?’ শিবরাম শিবাজী বলল।
‘নির্বাচনের আগে আহমদ হাত্তার যেন কিছু না হয় তা দেখার জন্যে।’
ভাবল শিবরাম শিবাজী একটু। তারপর বলল, ‘কিভাবে সেটা সম্ভব?’
‘পুলিশের কর্তা কথা ঠিকই বলেছেন, কিন্তু ওদের নিষেধ করতে চাইলেও তো সে সুযোগ নেই। ওদের কোন ঠিকানা তো আমরা জানি না।’ বলল রঙ্গলাল।
‘তীর ছোড়া হয়ে গেছে মি. রঙ্গলাল। এখন কি করার আছে।’
‘চিন্তা নেই শিবরাম। ভালটাই আমরা করেছি। আহমদ হাত্তাকে যদি দৃশ্যপট থেকে সরিয়ে দেয়া যায়, তাহলে আর কিছুই ঘটবে না। সব ঠিক হয়ে যাবে, সবাই ঠিক হয়ে যাবে।’
‘আর ওরা যদি তাকে দৃশ্যপট ঠেকে সরিয়ে দিতে না পারে?’ শিবরাম শিবাজী বলল।
‘যদি নিয়ে চিন্তা করে লাভ নেই। তুমি যা বলেছো তীর ছোড়া তো হয়েই গেছে। দেখা যাক। এটাই শেষ তীর নয়। চল উঠা যাক।’
বলে উঠে দাঁড়াল রোনাল্ড রঙ্গলাল।
উঠল শিবরাম শিবাজীও।

‘হ্যালো।’ টেলিফোন কানেকশন পেতেই বলে উঠল ফাতিমা নাসুমন।
‘হ্যালো, ফাতিমা আপা, কেমন আছেন?’ টেলিফোনের ও প্রান্ত থেকে বলল লিসা টেরেক, ওভানডো টেরেকের বোন।
‘ভালো, কিন্তু খোঁজ তো নাওনা।’ বলল ফাতিমা।
‘দুদিন মাত্র তো টেলিফোন করিনি। সময়টা খুব টেনশনে যাচ্ছে আপা। আপনারও তো।’ লিসা টেরেক বলল।
‘ঠিক বলেছ লিসা, আব্বাকে নিয়ে খুব উদ্বেগের মধ্যে আছি।’ বলল ফাতিমা।
‘এ সময় আহমদ মুসা না থাকলে যে কি হতো! কল্পনা করতেও ভয় লাগে।’ লিসা টেরেক বলল।
‘উনিতো সাক্ষাত আল্লাহর সাহায্য। উনি না থাকলে হয়তো আব্বাকেই উদ্ধার করা যেত না, তাঁর দেশে আসা ও নির্বাচন করা তো দূরের কথা।’ বলল ফাতিমা।
কথা শেষ করেই ফাতিমা নাসুমন আবার বলে উঠল, ‘উনি কোথায়? জরুরী কথা আছে।’
‘নামাজ পড়ছেন।’ লিসা জানাল।
‘তুমি নামাজ পড়ছ তো?’ বলল ফাতিমা।
‘আমি শুধু একা কেন সবাই পড়তে শুরু করেছে। এদিকে কি হয়েছে তাতো জানেন না।’
‘কি হয়েছে?’ উদগ্রীব কণ্ঠে বলল ফাতিমা।
‘গত পরশু আহমদ মুসা ভাই আমাদের পরিবারের লাইব্রেরীর একটা পুরানো বইয়ের ভেতর থেকে কাগজের কয়েকটা শিট পেয়েছেন, তা পরীক্ষা করে এক অকল্পনীয় জিনিস আবিষ্কার করেছেন।’
কথায় একটু ছেদ নেমে আসতেই ফাতিমা বলে উঠল, ‘অকল্পনীয় জিনিসটা কি?’
‘বলছি, সাংঘাতিক জিনিস, অকল্পনীয় ব্যাপার।’ বলে আবার থামল লিসা টেরেক।
অস্থির কণ্ঠে বলল ফাতিমা নাসুমন, ‘আমাকে আর অন্ধকারে রেখ না। তাড়াতাড়ি বল।’
‘আমাদের পুরনো দলিল বইয়ের ভেতর থেকে পাওয়া কগজের শিটগুলো আরবী ভাষায় লেখা একটা খসড়া দলিলের কয়েকটা পাতা। তা তিনি পেয়েছেন সুরিনামে আমাদের বংশের প্রতিষ্ঠাতা ও টেরেক দুর্গের নির্মাতা ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে স্পেনের প্রথম গভর্নর এবং তিনি ওভানডোর একজন ক্যাপ্টেন ছিলেন। ১৫০২ সালে আটলান্টিকে কথিত ডুবে যাওয়া জাহাজগুলোর একটি ছিল তার জাহাজ। জাহাজটি ছিল সোনা বোঝাই। আসলে জাহাজটি তখন ডোবেনি, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল এবং ঝড়ের ধাক্কায় ভাসতে ভাসতে এসে ঠেকেছিল আমাদের সুরিনাম উপকূলে।’ একটু থামল লিসা টেরেক।
সঙ্গে সঙ্গেই বলে উঠল ফাতিমা, ‘টেরেক দুর্গের স্বর্ণ-সন্ধানীরা তো এই একই কথাই বলে। তাহলে তাদের কথা তো দেখা যাচ্ছে ঠিক। এই কথা বলতে চাচ্ছিলে?’
‘না। আসল কথাই তো বলিনি।’ বলল লিসা টেরেক।
‘সেটা আবার কি? বল তাড়াতাড়ি।’
‘আমাদের ঐ পূর্ব পুরুষ মুসলমান ছিলেন। নাম আব্দুর রহমান আল-তারিক। তার আল-তারিক নাম অনুসারেই দুর্গের ও আমাদের পরিবারের নাম ‘এল-টেরেক’ হয়েছে।’
লিসা টেরেক কথা শেষ করলেও এদিক থেকে ফাতিমা কিছুক্ষণ কথা বলতে পারলো না। বিস্ময়ের ধাক্কা কাটিয়ে উঠে একটু পর বলল, ‘সত্যি বলছ লিসা? আমার সাথে মজা করছ না তো?’
‘কাগজের কয়েকটা শিটে তার যেটুকু অসম্পূর্ণ জীবন কাহিনী আছে তাও এক রুপকথা আপা।’
‘তোমাদের অভিনন্দন লিসা। ভাগ্যবান তোমরা। কাহিনী পড়তে আসব আমি সুযোগ পেলেই।’
‘পরবেন কি করে, সে তো আরবী ভাষায় লেখা। শুধু………।’
আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল লিসা, আহমদ মুসা এ সময় এসে পড়ল।
লিসা তার মাথার কাপড়টা কপাল পর্যন্ত টেনে নিতে নিতে বলল, ‘ফাতিমা আপা, ভাইয়া এসে গেছে। তুমি তার সাথে কথা বল। পরে এক সময় আমি তোমার সাথে কথা বলব।’
আহমদ মুসা টেলিফোন হাতে নিল। বলল, ‘আসসালামু আলাইকুম। ফাতিমা, কি খবর?’
‘ওয়া আলাইকুমুস সালাম। ভাইয়া, আপনি কি আব্বার পিএসকে কিছুক্ষণ আগে টেলিফোন করেছিলেন?’
‘না। এ প্রশ্ন কেন? এ ধরনের টেলিফোন তিনি পেয়েছিলেন?’
‘হ্যাঁ, তিনি বললেন, আপনি কিছুক্ষন আগে টেলিফোন করেছিলেন।’ বলল ফাতিমা।
‘বুঝেছি, কেউ আমার নামে টেলিফোন করেছিলেন। তিনি কি বলেছিলেন?’ জিজ্ঞেস করল আহমদ মুসা।
‘আব্বা আছেন কিনা জিজ্ঞেস করেছিলেন। পিএস সাহেব যখন বলেন, ‘আছেন ঘুমুচ্ছেন’ তখন তিনি বলেন, ‘ঠিক আছে ডিস্টার্ব করব না। পরে আবার টেলিফোন করব’ বলে টেলিফোন রেখে দেন। পিএস সাহেব এ খবর আমাকে জানাবার পর আমি আপনাকে টেলিফোন করলাম কি কারণে টেলিফোন করেছিলেন তা জানার জন্যে।’
‘বুঝেছি ফাতিমা। ওটা শত্রুর টেলিফোন ছিল। তোমার আব্বা কোথায়?’
‘ঘুমুচ্ছেন।’
‘ঠিক আছে। আমি আসছি। তোমরা সাবধানে থেকো। গেটে পুলিশ পাহারা আছে তো?’
আহমদ মুসার কণ্ঠে উদ্ধেগ।
‘হ্যাঁ ভাইয়া, গেটে পুলিশ পাহারা আছে। খারাপ কিছু আশংকা করছেন?’ ফাতিমা নাসুমনের কণ্ঠেও উদ্ধেগ।
ফাতিমার প্রশ্ন এড়িয়ে আহমদ মুসা বলল, ‘আল্লাহ ভরসা। আমি আসছি।’
বলে আহমদ মুসা সালাম দিয়ে টেলিফোন রেখে দিল।
দ্রুত ছুটল ঘরের দিকে তৈরি হওয়ার জন্যে।
আহমদ মুসা যখন তৈরি হয়ে ঘর থেকে বেরুচ্ছিল তখন সামনে পড়ে গেল ওভানডো। লিসাও দাঁড়িয়েছিল ওখানে।
আহমদ মুসাকে ওভাবে তাড়াহুড়ো করে বেরুতে দেখে ওভানডো জিজ্ঞেস করল, ‘কোথায় বেরুচ্ছেন ভাইয়া?’
মি. হাত্তার ওখানে। আমার অনুমান মিথ্যা না হলে সেখানে একটা ঘটনা ঘটতে পারে।’
‘আমি যেতে পারি?’ বলল ওভানডো।
আহমদ মুসা থমকে দাঁড়িয়ে ওভানডোর দিকে ফিরে বলল, ‘না ওভানডো বাসায় থাকা দরকার। গেটে পুলিশ থাকলেও সাবধানতার প্রয়োজন আছে।’
বলে আহমদ মুসা ঘুরে দাঁড়িয়ে পা বাড়াল বাইরে বেরুবার জন্যে।

একটা কার এবং তার পিছে একটা মাইক্রো সেন্ট্রাল রোড ধরে এসে নর্থ-সাউথ রোডে পড়ে তীব্র গতিতে এগিয়ে চলল।
এ রাস্তাতেই আহমদ হাত্তার বাড়ি। বাড়িটা রাস্তার একদম শেষ প্রান্তে সুরিনাম নদীর একেবারে তীর ঘেঁষে।
কারে আরোহী চারজন। দুজন সামনের সিটে দুজন পেছনে। চারজন আরোহী মাইক্রোতেও।
৮ জন আরোহীর সকলেই সুরিনাম সেনাবাহিনীর কমান্ডোর পোশাক পরা। মাথায় বাঁধা কাল কাপড় পিঠ পর্যন্ত নেমে এসেছে। গায়ে কাল জামা, পরনে কাল ট্রাউজার। আর চোখে কাল গগলস।
কার যে ড্রাইভ করছে তার কাঁধে দুটি লাল স্টার। আটজনের টিমটির সেই সবচেয়ে বড় অফিসার। মুখটা তার পাথরের মত শক্ত। তার চোখ দুটির দৃষ্টি মানুষকে ভীত করে তোলার মত কঠোর। অন্য সকলের মত তার কোমরে ঝুলানো ফুট খানেকের মত লম্বা ভয়ংকর ‘উজি’ স্টেনগান। একটা রিভলবার, একটা খাপবদ্ধ ছুরি ও একটা ওয়্যারলেস সেট। কাঁধ ঝুলে থাকা একটা বোমা ভর্তি থলে, তবে যে জিনিসটা তার কাছে বেশি আছে সেটা হলো তার গলায় ঝুলানো একটা পকেট কম্পিউটার। এই কম্পিউটারে রেকর্ড করা আছে শহরের বিভিন্ন রাস্তা ও উল্লেখযোগ্য বাড়ি-ঘরের অবস্থান এবং বাড়ি-ঘরের অভ্যন্তরীণ নক্সা। এ ধরনের গোনী কম্পিউটার গোয়েন্দা বিভাগের শীর্ষ পর্যায়ের জন্যে সংরক্ষিত।
একই গতিতে এক লাইনে চলছিল কার ও মাইক্রোটি।
কারের ড্রাইভিং সিটে বসা লোকটি সামনে প্রসারিত তার দৃষ্টি না ঘুরিয়েই পাশের লোকটিকে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘এনড্রা, সবাইকে তাদের ‘উজি’তে সাইলেন্সার লাগাতে বল।’
এনড্রা নামের পাশের লোকটি ওয়্যারলেস তুলে নির্দেশ দিল সবাইকে এবং সেই সাথে নিজের ‘উজি’তেও সাইলেন্সার লাগিয়ে নিল।
‘নিচের তলায় ছয়জন পুলিশ গার্ড ছাড়া আর তো কোন প্রহরী নেই মনে হয়।’ বলল এনড্রা নামের লোকটি।
ড্রাইভিং সিটের লোকটি আগের মত সামনে চোখ রেখেই ধীর কণ্ঠে জবাব দিল, ‘পুলিশ গুনছ কেন? পুলিশের সংখ্যা বেশি হলে কি ফিরে যাবে?
ধীর কিন্তু কঠোর শুনাল তার কথা।
মুহূর্তে মুখের ভাব পরিবর্তিত হয়ে গেল এনড্রার। ভয় পেয়েছে বুঝা গেল। বলল সে, ‘মাফ করুন বস। ভয় শব্দটি মাফিয়া কিনিক কোবরা-এর অভিধানে নেই। আমি ভয় পেয়ে পুলিশের সংখ্যা গুণিনি, আমি সাবধান হতে চেয়েছি।’
‘কিন্তু তোমার সাবধানী চিন্তা এই প্রথম দেখলাম।’
এনড্রা নামের লোকটা সঙ্গে সঙ্গে উত্তর না দিয়ে একটু চিন্তা করে বলল, ‘ধন্যবাদ বস। আপনি ঠিক ধরেছেন। কি জানি ব্রুকোপনডো হাইওয়েতে আমাদের ভেলাকুয়েজ ও হামবারটো নিহত হওয়ার ঘটনা আমি কিছুতেই ভুলতে পারছি না। ওরা ‘কিনিক কোবরা’-এর দুই অজেয় সদস্য ছিল। প্রথম পরাজয় ও মৃত্যু তাদের একই সাথে ঘটল।’
‘পরাজিত হবার পর বাঁচার তাদের অধিকার ছিল না।’ কঠোর কণ্ঠ ধ্বনিত হলো বসের।
‘কিনিক কোবরা’-এর এটাই বিধান এবং এজন্য তাদের মৃত্যুতে আমি গর্বিত। কিন্তু ‘ব্রুকোপনডো’র ঐ ঘটনা আমি স্মরণ করছি অন্য কারণে। আমি বুঝতে পারছি না বস আমরা কার মোকাবিলা করছি? সেকি আহমদ হাত্তা নাসুমন?’ বলল এনড্রা।
‘তাহলে কি আমরা মোকাবিলা করছি শিখ ড্রাইভারকে?’
‘তাও ভাবতে পারছি না বস।’
‘কেন পারছ না, এখন পর্যন্ত সব ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে তো সে-ই?’
‘কিন্তু অজেয় ‘কিনিক কোবরা’-এর প্রতিদ্বন্দ্বী হবে কি একজন ড্রাইভার?’
‘তুমি ঠিক বলেছ এনড্রা। আমরা সত্যিই এক ধাঁধায় পড়েছি। অতীতে কোন সময়ই এমন হয়নি। টার্গেট হিসেবে আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে আহমদ হাত্তা নাসুমন। কিন্তু সে কিছুই করছেই না। অদৃশ্য কে যেন হাত্তার পক্ষ থেকে সব কিছু সম্পাদন করে চলছে।’
‘বস আমার মনে হয়, কান টানলে মাথা আসার মত, সব কিছুই আমরা জানতে পারব যদি আহমদ হাত্তাকে হাতের মুঠোয় আনি।’
‘আমিও সেই কথাই ভাবছি এনড্রা। আমরা আহমদ হাত্তাকে কিডন্যাপ করব। রঙ্গলালের সাথে আমাদের চুক্তি তাকে খুন করার। কিন্তু খুন করলে সব ক্লু হারিয়ে যেতে পারে। তাহলে ভেলাকুয়েজ ও হামবারটো হত্যার প্রতিশোধ নেয়া হবে না। এখন আমাদের দুটি টার্গেট। এক, রঙ্গলালদের দেয়া মিশন পুরা করা এবং দুই, আমাদের লোক হত্যার প্রতিশোধ নেয়া।’
‘তাহলে আমরা আজ আহমদ হাত্তাকে হত্যা না করে তাকে কিডন্যাপ করব এই তো?’
‘হ্যাঁ। তার পেছনে অদৃশ্যে কে কাজ করছে তা জানার এটাই পথ।’
‘অল রাইট বস। এই পরিকল্পনার জন্যে আপনাকে ধন্যবাদ।’
বলে মুহুর্তের জন্যে থেমেই আবার শুরু করল এনড্রা। বলল, ‘একটা বিষয় লক্ষ্য করুন বস, আহমদ হাত্তা আমেরিকায় বন্দীদশা থেকে মুক্ত হবার পর হঠাৎ করে যেন শক্তিশালী হয়ে গেছে। তার বিজয় শুরু হয়ে গেছে সে সময় থেকেই। আমি ভাবছি, মার্কিন সরকার মানে সিআইএ তাকে সাহায্য করছে কিনা। জানা গেছে, বন্দী দশা থেকে মুক্ত হবার সে সামরিক হাসপাতালের ভিআইপি সেকশনে চিকিৎসা পেয়েছে। এই চিন্তার সমর্থনে আরেকটা বিষয়ও সামনে আনা যায়। সেটা হলো, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ইহুদীদের বিপর্যয় ঘটার পর মার্কিন সরকার মুসলমানদের বন্ধু হয়ে গেছে। আহমদ হাত্তাও একজন মুসলিম রাজনীতিক।’ থামল এনড্রা।
ড্রাইভিং সিটে বসা ‘বস’ সম্বোধন পাওয়া লোকটি এই প্রথমবারের মত এনড্রার দিকে তাকাল। কিন্তু তার মুখের পাথুরে কাঠিন্যে একটুও পরিবর্তন আসেনি। বলল সে গম্ভীর কণ্ঠে, ‘ধন্যবাদ এনড্রা, তোমার এই ভাবনার জন্যে। যুগ-যুগান্তের ইহুদী ষড়যন্ত্র ধ্বংসে মুসলমানদের সাহায্য পাবার পর মার্কিন সরকার মুসলমানদের বন্ধু হয়ে গেছে একথা ঠিক। কিন্তু সিআইএ আহমদ হাত্তাকে সাহায্য করলে ‘কিনিক কোবরা’ তা জানতে পারতো। তোমার অজানা নয়, সব মাফিয়া দলের সাথে সিআইএ-র গোনী সম্পর্ক আছে, পারস্পরিক সহযোগিতা আছে যদি প্রয়োজন পড়ে। সুতরাং আহমদ হাত্তার সাথে সিআইএ যুক্ত থাকলে আমরা জানতে পারতাম এবং সেক্ষেত্রে রঙ্গলালদের সাথে কোন ‘ড্রীল’ আমরা করতাম না।’
‘তাহলে কারা জুটল আহমদ হাত্তার সাথে? আহমদ মুসা আমেরিকায় অসাধ্য সাধন করেছেন। তিনি কি আসতে পারেন আহমদ হাত্তার সাহায্যে?’ বলল এনড্রা।
এতক্ষণে ‘বস’ লোকটার ঠোঁটে এক টুকরো হাসি ফুটে উঠল। তাচ্ছিল্যের হাসি। বলল, ‘কিসে আর কিসে ধানে আর তুষে। আহমদ মুসা আসবে সুরিনামে! জান তার মাথার মূল্য এখন কত? বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার। ইহুদীরা তাকে পাওয়ার জন্যে যা চাইবে তাই দেবে। চুনোপুটি আহমদ হাত্তার জন্যে সে আসতে যাবে কেন?’
‘যাই বলুন আহমদ মুসা লাকী মানুষ। সে যেখানে যায়, সাফল্য তার আগে আগে যায়।’ বলল এনড্রা।
‘না তা ঠিক নয় এনড্রা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তার অমানুষিক কষ্ট করতে হয়েছে সাফল্য ছিনিয়ে আনার জন্যে। এক সময় এমন হয়েছিল মার্কিন সরকারসহ গোটা দেশ তার বৈরী। পা রাখার নিরাপদ জায়গা ছিল না তার জন্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে।’
‘কিন্তু আমার মনে হয় আহমদ মুসা বাঁচতে পারবে না ইহুদীদের হাত থেকে।’ বলল এনড্রা।
‘আমারও তাই মনে হয়। ইতিমধ্যেই ইহুদী গোয়েন্দা সংস্থা আমেরিকা ইউরোপের সব মাফিয়া গ্রুপের সাথে আলোচনা করেছে। সকলের সাহায্য চেয়েছে আহমদ মুসাকে ধরে দেয়ার জন্যে।’
‘আহমদ মুসা একজন ব্যক্তিমাত্র। তার কোন দল নেই। সে কি করে মাতব্বরী করছে?’ এনড্রার কণ্ঠে বিস্ময়।
‘তিনি দল নিয়ে ঘুরে বেড়ান না এটা ঠিক। কিন্তু তার দল নেই কে বলল? যেখানে যে দেশেই বাস করুক প্রতিটি মুসলিম তার দলের সদস্য। এখন অজস্র খৃষ্টানও তার পক্ষ হয়ে গেছে।’
‘এটা কি করে সম্ভব হলো?’ বলল এনড্রা।
‘তিনি এক নীতিবোধের পক্ষে কাজ করছেন। সেটা জালেমের বিরুদ্ধে মজলুমকে সাহায্য। এ জন্যেই দুনিয়ার সব মজলুম ও বিবেকবানরা তাকে ভালোবাসে।’
‘কিন্তু সে তো দেখছি শুধু মুসলমানদের পক্ষেই কাজ করে।’
‘কারণ মুসলমানরাই আজ জাতি হিসেবে নির্যাতন-নিপীড়ন ও ষড়যন্ত্রের শিকার। যেমন দেখছ এই সুরিনামে। রঙ্গলালরা কিছুতেই মুসলমানদের শাসন ক্ষমতায় আসতে দেবে না।’
‘কিন্তু আমরা যে এই রঙ্গলালদেরই সাহায্য করছি?’
‘কারণ আমরা আহমদ মুসার নীতিবোধকে বহু আগেই পদ-পিষ্ট করে শেষ করে এসেছি। ‘কিনিক কোবরা’র এখন টাকা কামানোর যন্ত্র। ‘কিনিক কোবরা’র অর্থ সূর্যের ছোবল জান? মানুষ একে দেখে না, জানে না, বুঝে না, কিন্তু এর সর্বগ্রাসী দহনজ্বালায় সে শেষ হয়ে যায়। আমরা পৃথিবীটাকেই জ্বালিয়ে দিতে চাই। আহমদ মুসাকেও।’
‘বস’ লোকটি থামল।
কিন্তু কোন জবাব এল না এনড্রার কাছ থেকে। ‘বস’ লোকটিই আবার বলল, ‘জান, কেন?’
‘জানি না।’ বলল এনড্রা সম্ভ্রমের সাথে।
‘স্বার্থের সর্প গোটা পৃথিবীকে তার অক্টোপাসে বেঁধে ফেলেছে। তার বিষ নিঃশ্বাসে জ্বলছে গোটা দুনিয়া। এ দুনিয়া আজ ধংসের যোগ্য। আর……।’
আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল ‘বস’ লোকটি। তাকে বাঁধা দিয়ে এনড্রা বলে উঠল, ‘বস’ এই তো আমরা এসে গেছি। ঐ সামনের পুব পাশের গেটটাই আহমদ হাত্তা নাসুমনের।’
‘বস’ বলে কথিত লোকটির হাত ছিল স্টিয়ারিং হুইলে। এনড্রার কথা শুনে সে সোজা হয়ে বসল।
তার দু’চোখে ছুটে গেল আহমদ হাত্তা নাসুমনের বাড়ির দিকে। নিবদ্ধ হলো গিয়ে বাড়ির উপর।
আহমদ হাত্তার তিন তলা বাড়িটি বিরাট। বন্ধ গেট।
দুটি গাড়ি গিয়ে গেটের সামনে দাঁড়াতেই ‘বস’ বলে কথিত লোকটি লাফ দিয়ে গেটের সামনে দাঁড়াল। একই সময়ে দুজন পুলিশ পাশের গার্ড রুম থেকে বেরিয়ে এল। তারা সুরিনাম আর্মির কমান্ডো অফিসারকে দেখেই কড়া একটা স্যালুট দিল।
‘আমরা স্যারকে নিতে এসেছি।’ বলল কমান্ডো অফিসারের পোশাকে ‘বস’ বলে কথিত লোকটি।
এসময় আরও দুজন পুলিশ বেরিয়ে এল। তারা সালাম ঠুকে গেট খোলার কাজে অন্য দুজন পুলিশকে সাহায্য করতে লেগে গেল।
গেট খুলতেই কমান্ডো অফিসারের পোশাক পরা ‘বস’ লোকটি গট গট করে ভেতরে ঢুকে গেল। তিনজন কমান্ডো তার পেছন পেছন চলল। অবশিষ্ট চারজনের দুজন গেটের দরজা একটু ভেজিয়ে দিয়ে চারজন পুলিশ কে সামনে রেখে গেটের ভেতরে দাঁড়াল। অন্য দুজন গেটের বাইরে গাড়ির পাসে এ্যাটেনশন অবস্থায় দাঁড়িয়ে রইল।
কমান্ডো অফিসারবেশী ‘বস’ লোকটি ভেতরে ঢুকেই সিঁড়ি দিয়ে এক লাফে দোতলায় উঠে গেল। তার পেছনে তিনজন কমান্ডোও।
দোতলায় উঠার সিঁড়ির মুখেই অভ্যর্থনা কক্ষ। সেখানে বসেছিল আহমদ হাত্তার পিএস হাসান মুসতো।
কমান্ডো অফিসারকে দেখেই সে ছুটে বেরিয়ে এল। কমান্ডো অফিসারের সামনে দাঁড়িয়ে বলল, ‘কি ব্যাপার? আপনারা?’
‘আমরা স্যারকে নিয়ে যেতে এসেছি।’ বলল অফিসারবেশী কমান্ডো।
‘আমরা তো কিছু জানি না। এ ধরনের কোন নির্দেশ তো আমাদের কাছে আসেনি।’ বলল হাসান মুসতো।
‘তা আমরা জানি।’ বলে কমান্ডো অফিসার তিন তলায় উঠার জন্য পা বাড়াল সিঁড়ির দিকে।
দু’ধাপ এগিয়ে গেলে বাঁধা দিল হাসান মুসতো। বলল, ‘একটু দাঁড়ান, আমি স্যারকে জিজ্ঞেস করি।’
বলে মোবাইল বের করলো হাসান মুসতো। সঙ্গে সঙ্গে অফিসারবেশী কমান্ডোর ‘উজি’র নল উঠে এল হাসান মুসতোর লক্ষ্যে। বেরিয়ে এল এক ঝাঁক গুলী নিঃশব্দে।
ছিটকে পড়ল হাসান মুসতোর দেহ সিঁড়ির মুখে এবং গড়িয়ে পড়ে গেল নিচে, এক তলায়।
চারজন পুলিশেরই বোধ হয় চোখে পড়েছিল ব্যাপারটা। হাসান মুসতোর দেহ গড়িয়ে পড়ে স্থির হবার আগেই ছুটে আসা চারজন পুলিশকে সেখানে এসে দাঁড়াতে দেখা গেল। তারা তাকাল উপরে। দেখল, অফিসারবেশী কমান্ডোর ‘উজি’ ধরা হাত তখনও উদ্যত।
অকস্মাৎ অভাবিত দ্রুততায় উঠে এল পুলিশের চারটি স্টেনগানের নল।
কিন্তু পরক্ষণেই পেছন থেকে এক ঝাঁক গুলী এসে ঝাঁঝরা করে দিল তাদের দেহ। হাসান মুসতোর লাশের পাশেই পড়ে গেল তাদের লাশ।
গেটের ভেতরে দাঁড়ানো দুজন কমান্ডো ওদের গুলী করেছিল।
‘থ্যাংকস টু আওয়ার শুটারস’ বলে অফিসারবেশী ‘বস’ কমান্ডো লাফিয়ে উঠতে লাগল তিন তলার সিঁড়ি দিয়ে।
সাথের তিনজন কমান্ডোর একজন দোতলার সিঁড়ির মুখে দাঁড়িয়ে থাকল। আর দুজন উঠে গেল অফিসারবেশী কমান্ডোর সাথে। অফিসার কমান্ডো লোকটি তিন তলায় উঠেই লিভিং রুমের মধ্যে দিয়ে ছুটল এবং ছোট্ট একটা করিডোর অতিক্রম করে একটা দরজায় প্রচণ্ড জোরে একটা লাথি মারল।
তার যেন সব মুখস্ত। কোন পথে কোথায় কোন ঘরে যেতে হবে তা আগে থেকেই যেন ঠিক করে রাখা। আসলেই তাই। এখানে আসার আগে বিস্তারিত মুখস্ত করে কোন ঘরে এ সময় আহমদ হাত্তা রেস্ট নেন তা জেনেই তারা এসেছে।
অফিসার কমান্ডোর সাথে তিনতলায় উঠে আসা দুজন কমান্ডোর একজন তিন তলার সিঁড়ির মুখে অবস্থান নিলে, অন্যজন অফিসার কমান্ডোর পেছনে ছুটে এল।
প্রচণ্ড লাথিতে দরজার হুক ছিটকে গিয়ে দরজা খুলে গেল। আফিসার কমান্ডো দেখতে পেল আহমদ হাত্তা বিছানায় বসা এবং একজন তরুণী টেলিফোনে ব্যস্ত।
কমান্ডো অফিসারকে দরজায় দেখতে পেয়েই আহমদ হাত্তা শক্ত কণ্ঠে বলে উঠল, ‘অনুমতি না নিয়ে তোমরা এখানে কেন? তোমরা পুলিশকে খুন করেছ কেন?’ ভয় মিশ্রিত উত্তেজিত কণ্ঠ আহমদ হাত্তার।
কমান্ডো অফিসার কোন উত্তর দিল না। পাশে দাঁড়ানো তার কমান্ডোকে একটা ইংগিত করলো। তারপর রিভলবারের ব্যারেল ফাতিমার হাতে ধরা টেলিফোনের দিকে ফিরিয়ে গুলী করলো। টেলিফোনের রিসিভার ধরা থাকল আহমদ হাত্তার মেয়ে ফাতিমার হাতে, কিন্তু টেলিফোন সেটটি গুঁড়ো হয়ে গেল।
এদিকে অফিসারের ইংগিত পাওয়ার পর সাথে সাথে অন্য কমান্ডো ঝাঁপিয়ে পড়েছে আহমদ হাত্তার উপর এবং ক্লোরোফরম ভেজানো একটা রুমাল চেপে ধরেছে তার নাকে। সেই অবস্থাতেই হাত-পা ছোঁড়া রত আহমদ হাত্তাকে সে কাঁধে তুলে নিল।
‘আমার আব্বাকে নিয়ে যেও না’ বলে প্রচণ্ড চিৎকার দিল ফাতিমা নাসুমন এবং পরে তার সংজ্ঞাহীন দেহ লুটিয়ে পড়ল মেঝের উপর।
আহমদ হাত্তার দেহ কাঁধে তুলে নিয়েই ছুটল কমান্ডোটি। ইতিমধ্যেই কমান্ডো অফিসারটি ঘরের বাইরে গিয়ে পৌঁছেছিল।
কাঁধে নেয়ার পরও হাত-পা ছুঁড়ছিল আহমদ হাত্তা। কিন্তু কয়েক মুহূর্ত পরেই নিস্তেজ হয়ে পড়ল তার দেহ।
কমাডো অফিসারটি ও অন্য কমান্ডোরা দ্রুত নামছিল নিচে সংজ্ঞাহীন আহমদ হাত্তাকে নিয়ে।
দুতলা থেকে নামার সিঁড়ির মুখে পৌঁছতেই বাইরে থেকে ব্রাশ ফায়ারের শব্দ কানে এল।
কমান্ডো অফিসারটি দুতলায় নামার সিঁড়ির দিকে পা বাড়াল এবং বলল, ‘নিশ্চয় বাইরে পুলিশ এসেছে। হাত্তার ঐ মেয়েটাই তাহলে পুলিশকে ডেকেছে।’
তারা সিঁড়ি দিয়ে এক তলায় নেমে এসে সেই লাশগুলোর পাশে দাঁড়াল। বাইরে ব্রাশ ফায়ার তখনও চলছে।
যে দুজন কমান্ডো গেটের ভেতরের চত্বরে দাঁড়িয়ে ছিল, তারা তখনও সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে। কমান্ডো অফিসারের সাথে তিনজন কমান্ডোও গিয়ে তাদের পাশে দাঁড়াল। তাদের একজন বলল কমান্ডো অফিসারকে লক্ষ্য করে, ‘বস, আমরা কি বাইরে বেরুব?’
‘বাইরে পরিস্থিতি ট্যাকেল করার দায়িত্ব তাদের দুজনের। শত্রুরা ভেতরে এলে, তবেই তোমাদের দায়িত্ব বর্তাবে ওদের মোকাবিলা করার।’
বলে একটু থামল, তারপর আবার শুরু করলো, ‘চিন্তা করো না, প্রথম দিকে পুলিশের পাল্টা গুলীই ছিল প্রবল, কিন্তু এখন চলছে আমাদের এক তরফা গুলী। সম্ভবত পুলিশ ভিতরে ঢোকার জন্যে এক সাথে সবাই নেমেছিল। সুতরাং সবাই এক সাথে গুলীর মুখে পড়েছে। আমাদের লোকরা ছিল গাড়িতে, আড়ালে, আর ওরা উন্মুক্ত রাস্তার উপর। তাই লড়াই বেশিক্ষণ চলেনি।’
কমান্ডো অফিসারের কথা থামতেই বাইরের গুলীও থেমে গেল।
‘অল ক্লিয়ার। চল গাড়িতে সকলে।’ বলল দ্রুত কণ্ঠে কমান্ডো অফিসার এবং নিজেও ছুটল বাইরে বেরুবার জন্যে।
বাইরে বেরিয়ে গেটের সামনেই পাঁচজন পুলিশের লাশ দেখতে পেল।
আহমদ হাত্তাসহ ওরা মাইক্রোতে উঠার পর কমান্ডো অফিসার কার-এ উঠার সময় মাইক্রোর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘জরগ, ইউরিকো তোমাদের ধন্যবাদ, পুলিশ তোমাদের প্রতিরক্ষা লাইন অতিক্রম করতে পারেনি।’
কার ও মাইক্রো গাড়ি দুটি এবাউট টার্ন করে যে দিক থেকে এসেছিল সেদিকে আবার এগিয়ে চলল।

তীব্র গতিতে ছুটে আসছিল আহমদ মুসার গাড়ি। কিন্তু ওসেয়ান রোড থেকে নর্থ-সাউথ রোডে পড়ার সময় সাবধানতার জন্যে গতি কমিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু তারপরও তীব্র গতিতে ছুটে আসা একটা প্রাইভেট কার আহমদ মুসার কার-এর ফ্রন্ট গার্ডারের সাথে ঠোকর খেল।
সঙ্গে সঙ্গে আহমদ মুসার কার বাম দিকে বেঁকে গিয়ে কয়েকবার ঘুরপাক খেয়ে উল্টে গিয়েও আবার সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে গেল রাস্তার কিনারায় এসে। অন্যদিকে প্রবল বেগে ধাক্কা দেয়া কারটি ডান দিকে ছিটকে যায় এবং কারের পেছনের দরজাটি খুলে যায়। ফলে অন্য গাড়ির সাথে এ্যাক্সিডেন্ট হওয়া থেকে বেঁচে যায়।
এই এ্যাক্সিডেন্টের পর পরই আগের কারটির মতই বিদ্যুৎবেগে ধেয়ে আসা একটা মাইক্রো এ্যাক্সিডেন্ট এর জায়গায় হার্ড ব্রেক কষে থেমে যায়। হার্ড ব্রেকের ফলে প্রবল ঝাঁকুনি খায়।
মাইক্রোটি থামতেই সামনের কারটিও থেমে যায়। বেরিয়ে আসে কারের পেছনের সিট থেকে একজন। চিৎকার করে বলে মাইক্রোটিকে লক্ষ্য করে, ‘জরগ, ইউরিকো, তোমরা ওকে?’
মাইক্রো থেকেও একজন লোক নেমে এসেছিল। সে জবাব দিল। বলল, ‘ওকে ট্রিজিল্লো, তোমরা ঠিক আছ?’
‘হ্যাঁ তাড়াতাড়ি এস।’ বলে সামনের গাড়ির ট্রিজিল্লো নামের লোকটি গাড়ির দরজা খুলে যাওয়ার ফলে রাস্তায় ছিটকে পরা হাতব্যাগটা তুলে নিয়ে গাড়িতে ঢুকে গেল।
প্রায় একই সাথে মাইক্রোর লোকটিও গাড়িতে উঠে গেছে।
ভাবছিল আহমদ মুসা, সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে এ্যাকসিডেন্ট ঘটাল, অথচ একটু দুঃখ প্রকাশ করল না! সুরিনাম আর্মির সৌজন্যবোধের মান কি এত নিচু! এ্যাকসিডেন্ট ঘটানো কার ও মাইক্রো থেকে বেরিয়ে আসা লোক দুজনের পোশাক দেখেই আহমদ মুসা বুঝতে পেরেছিল ওরা সুরিনাম আর্মির কমান্ডো ইউনিটের লোক।
হঠাৎ আহমদ মুসার মনে আরেকটা চিন্তার উদয় হলো, কারের লোকটি কলম্বিয়া রাষ্ট্রের একটা ক্ষুদ্র গোষ্ঠী মোল্লটোদের ভাষায় কথা বলল কেন? আর মাইক্রোটির লোকই বা গুয়েতেমালা রাষ্ট্রের মায়া ভাষায় কথা বলল কেন? এই প্রশ্ন আহমদ মুসাকে আরেকটা প্রশ্নের দিকে টেনে নিয়ে গেল। লোক দুটিকে আহমদ মুসা যতটুকু দেখেছে, তাতে মনে হয়েছে ওরা সুরিনামের লোক নয়। ওদের একজন কলম্বিয়ার মোল্লটো গোষ্ঠীর, অন্যজন গুয়েতেমালার মায়া গোষ্ঠীর লোক হবে। তাহলে কি সুরিনাম আর্মিতে কলম্বিয়া, গুয়েতেমালাসহ মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকার অন্যান্য দেশের লোকও আছে? কিন্তু আহমদ মুসার মন মানতে চাইলো না, একটা দেশের কমান্ডো ইউনিটে কি করে অন্য দেশের লোক থাকতে পারে! তাহলে কি ওরা সুরিনামের নাগরিক? বাইরে থেকে এসে এখানে বসতি গড়েছে। যদি তাই হয় তাহলে সেনাবাহিনীর সবচেয়ে এলিট অংশে চাকুরী করেও বিদেশের ভাষায় ওরা কথা বলবে এবং দুজন দুই ভিন্ন ভাষায়!
অবাক হলো আহমদ মুসা।
এসব চিন্তা ঝেড়ে ফেলে সোজা হয়ে দাঁড়াল আহমদ মুসা। নিজের গাড়ির দিকে ঘুরে দাঁড়াতে গিয়ে তার চোখ পড়ল রাস্তার উপর। দেখল একটা ক্যাশ মেমোর মত কাগজ রাস্তার ওদিক থেকে উড়ে এসে তার গাড়ির চাকায় আটকে গেল।
মেমোটিকে আনকোরা নতুন দেখে খেয়াল বশেই উদ্দেশ্য বিহীনভাবে তুলে নিল আহমদ মুসা। শহরের একটা বিখ্যাত লন্ড্রীর মেমো। নামের দিকে চোখ পড়তেই আগ্রহ বেড়ে গেল আহমদ মুসার। ‘ট্রিজিল্লো’ মানে যে কার তার গাড়িকে ধাক্কা দিয়েছিল, সেই গাড়ি থেকে নেমে আসা লোকটিরই তাহলে স্লিপটা। তারিখ দেখল, সেটা মাত্র একদিন আগে। তার মানে লন্ড্রীর স্লিপটা তার জন্যে খুব মূল্যবান। আপাতত স্লিপটা নিজের কাছে রেখে দেয়ার চিন্তা করল আহমদ মুসা। পকেটে রাখার আগে ঠিকানার দিকে নজর বুলাল সে। দেখল ঠিকানা ও টেলিফোন নম্বর দুই-ই আছে। খুশি হলো আহমদ মুসা। ওদের কারটা তাকে আঘাত করলেও তাদের সে একটা উপকার করতে পারবে।
মেমোটা পকেটে ফেলে আহমদ মুসা গাড়িতে উঠে বসল। আহমদ মুসা খুশি হলো গাড়ির সামনের পাশটা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও গাড়ির সবকিছু ঠিক আছে।
গাড়ি স্টার্ট দিয়ে ঘুরিয়ে নিয়ে ছুটে চলল নর্থ-সাউথ রোড ধরে।
বেশ কিছুটা সময় নষ্ট হয়েছে এই ঘটনায়। গতি বাড়িয়ে দিল সে গাড়ির।
ফাতিমা নাসুমনের টেলিফোন পাওয়ার পর থেকেই একটা অস্বস্তি তাকে পেয়ে বসেছে। অস্বস্তিটা দূর হচ্ছে না কিছুতেই। আহমদ মুসার পরিচয় দিয়ে কারা টেলিফোন করতে পারে আহমদ হাত্তার খোঁজ নেবার জন্যে, নিশ্চয় তারা সহজ এবং সাধারণ কেউ নয়। আহমদ মুসা বেশ কিছু দিন আহমদ হাত্তার গাড়ি ড্রাইভ করছে, কিন্তু তার পরিচয় ড্রাইভার তা কেউ মনে করছে না। সবাই মনে করছে ড্রাইভাররূপী ব্যক্তিটি আহমদ হাত্তার নিরাপত্তার দায়িত্বশীল কিংবা আরও ঘনিষ্ঠ কেউ। আহমদ মুসার পরিচয় ব্যবহার করে যা তারা জানতে চেয়েছে সেটা নিশ্চয় খুব বড় ও গুরুতর বিষয়। নিশ্চয় ঐ টেলিফোনের দ্বারা তারা নিশ্চিত হতে চেয়েছে আহমদ হাত্তা বাসায় আছেন কিনা। কিন্তু কেন? দিনের বেলায় পুলিশ প্রহরাধীন বাসায় হামলা হওয়ার কথা নয়। তাহলে?
অস্বস্তিটার কোন কিনারা হলো না। ভাবনাও তার শেষ হলো না।
গাড়ি এসে গেছে।
বাঁকটা ঘুরলেই আহমদ হাত্তা নাসুমনের গেট দেখা যাবে।
বাঁক ঘুরল গাড়ি।
আহমদ হাত্তার বাড়ি নজরে এল আহমদ মুসার। আহমদ হাত্তার গেটে পুলিশের অনেকগুলো গাড়ি ও পুলিশের ছুটাছুটি দেখে বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠল আহমদ মুসার। বড় কিছু না ঘটলে পুলিশের এত গাড়ি ও এত পুলিশের সমাগম হতে পারে না।
কি ঘটতে পারে?
নানা আশংকায় দুলে উঠল আহমদ মুসার মন।
গেটের আরও কাছে আসতেই পুলিশ চলাচলের ফাঁক দিয়ে গেটের সামনে এবং আরও একটু পিছনে রাস্তার উপর বিক্ষিপ্ত কিছু লাশ দেখতে পেল।
প্রবল আশংকায় কেঁপে উঠল তার মন। বড় ধরনের সংঘাত ছাড়া তো এত লাশ পড়তে পারে না।
সংঘাতের কেন্দ্র বিন্দুতে আহমদ হাত্তা নিশ্চয়। তিনি কেমন আছেন?
আহমদ মুসার আশংকা কাতর মনে কথাগুলো একের পর এক উঠে আসতে লাগল।
আহমদ হাত্তার গেটের কয়েক গজ সামনে দাঁড়াল আহমদ মুসার গাড়ি।
গাড়ি থেকে নামল আহমদ মুসা। এগুলো গেটের দিকে।
দেখল গেটের ওপাশের লাশগুলো পুলিশের। ডানদিকে একটু এদিকে যে লাশগুলো পড়ে আছে তাও পুলিশের। সে লাশগুলোর পাশেই পুলিশের পেট্রোল গাড়ি।
আহমদ মুসা বুঝল, গেটের ওপাশের লাশগুলো বাড়ির প্রহরী পুলিশদের। কিন্তু এই পুলিশরা কোত্থেকে এল, মারা পড়ল কিভাবে?
আহমদ মুসা গেটের দিকে অগ্রসর হলে পুলিশ বাঁধা দিল। বলল, ‘উপরের স্যারদের হুকুম ছাড়া ভেতরে কাউকে যেতে দেয়া হবে না।’
‘আপনার স্যারদের বলুন আমাকে ভেতরে যেতে হবে। কিন্তু তার আগে বলুন আহমদ হাত্তা ঠিক আছেন তো?’
‘স্যার ঠিক থাকলে কি আর হুলস্থুল হতো? কারা যেন তাকে কিডন্যাপ করেছে।’ বলল একজন পুলিশ।
আহমদ হাত্তার কিডন্যাপের খবরটি দারুণভাবে বিদ্ধ করল আহমদ মুসার হৃদয়কে।
দ্রুত কন্ঠে জিজ্ঞেস করল, ‘তাঁর মেয়ে ফাতিমা নাসুমন কেমন আছে?’
‘ভাল আছেন, তবে আহত।’ বলল পুলিশটি।
‘আমাকে তাড়াতাড়ি যেতে হবে। সময় এখন খুব মূল্যবান। আপনি আপনার স্যারদের খবর দিন।’ আহমদ মুসা বলল।
এই সময় পুলিশ কমিশনারকে দ্রুত আসতে দেখা গেল আহমদ মুসার দিকে। একটু কাছাকাছি এসেই বলে উঠল, ‘সর্বনাশ হয়ে গেছে মি. আব্দুল্লাহ। এত কিছু করেও শেষ রক্ষা করতে পারলেন না। স্যারকে ওরা নিয়ে গেছে।’
পুলিশ কমিশনার থামতেই আহমদ মুসা বলে উঠল, ‘মি. কমিশনার, তাকে কিডন্যাপ হতে কে দেখেছে?’
‘যারা দেখেছেন তাদের মধ্যে ম্যাডাম ফাতেমাই শুধু বেঁচে আছেন। নিচের তলার চাকর-বাকরদেরও দুএকজন দেখেছে।’ বলল পুলিশ কমিশনার।
‘মি. কমিশনার, আমি ম্যাডাম ফাতেমার সাথে কথা বলতে চাই। দয়া করে তাড়াতাড়ি ব্যবস্থা করুন।’
‘ঠিক আছে একজন অফিসার পাঠাচ্ছি। তার অনুমতি নিয়ে আসার। উনিও কিছুটা আহত।’ বলে পুলিশ মুখ ঘুরিয়ে একজন পুলিশ অফিসারকে নির্দেশ দিল।
এ সময় তিন তলার বারান্দা থেকে একটা কণ্ঠ ভেসে এল, ‘ভাইয়া আপনি আসুন।’ ভারী ও কান্না চাপা কণ্ঠটি।
আহমদ মুসাসহ সবাই তাকাল সেদিকে। দেখল, তিন তলার বারান্দায় মুখে রুমাল চেপে দাঁড়িয়ে আছে ফাতিমা নাসুমন।
‘আসছি ফাতিমা।’ বলে ভেতরে যাবার জন্যে পা বাড়াল আহমদ মুসা।
‘চলুন।’ বলল পুলিশ কমিশনার।
ফাতিমা নাসুমন দাঁড়িয়েছিল তার আব্বার ঘরের দরজায়।
আহমদ মুসা তিন তলায় উঠে ফাতিমা নাসুমনের নিকটবর্তী হতেই ফুফিয়ে কেঁদে উঠল ফাতিমা।
‘ধৈর্য ধর ফাতিমা সব ঠিক হয়ে যাবে।’ গম্ভীর কণ্ঠে বলল আহমদ মুসা।
একটু থেমেই আবার বলল, ‘চল কোথা থেকে ওঁকে নিয়ে গেছে একটু দেখতে চাই।’
ফাতিমা নাসুমন রুমালে চোখ মুছে বলল, ‘আসুন।’
তারা প্রবেশ করল আহমদ হাত্তার শোবার ঘরে।
ঘরের ডিভানটা দেখিয়ে বলল ফাতিমা, ‘আব্বা এখানে শুয়েছিলেন। ওরা দরজা ভেঙ্গে ঘরে ঢুকলে তিনি উঠে বসেন। ঐ অবস্থা থেকেই তাকে ক্লোরোফরম করে ধরে নিয়ে গেছে।’ কান্নায় আবার ভেঙ্গে পড়ল ফাতিমার কণ্ঠ।
আহমদ মুসা বেড এবং চারদিকটায় ভালো করে নজর বুলাল। না বাড়তি কোন চিহ্ন কোথাও নেই। ঘর, করিডোর সব জায়গায় কার্পেট থাকায় জুতার দাগও কোথাও পড়েনি। কিন্তু হতাশ হলো না সে।
‘চল ফাতিমা আমরা বসি। বসে কথা বলি।’ বলল আহমদ মুসা ফাতিমা নাসুমনকে। পাশেই একটা প্রশস্ত করিডোর। করিডোরের টি সার্কেলে গিয়ে দাঁড়াল তারা। পুলিশ কমিশনারও তাদের সাথে গেল। গিয়ে তারা একটা টি টেবিল ঘিরে তিনজন তিন সোফায় বসল।
বসেই আহমদ মুসা পুলিশ কইমিশনারকে বলল, ‘ঘটনার যেটুকু ফাতিমা নাসুমন জানেন, সেটুকু তো আপনারা জেনে নিয়েছেন, না?’
‘হ্যাঁ সেটা জেনেই আমরা চারদিকে খোঁজ-খবর নেবার নির্দেশ দিয়েছি। সহকারী পুলিশ কমিশনার নিজে এ ব্যাপারটা হাতে নিয়েছেন।’ বলল পুলিশ কমিশনার।
‘এখন আমিও একটু জেনে নিতে চাই।’ আহমদ মুসা বলল।
‘মাফ করবেন, আপনার কথা আমার সহকারী কমিশনারের কাছ থেকে অনেক শুনেছি। অবশ্য আমি এখনও জানি না, আপনার সাথে মি. হাত্তার সম্পর্ক কি।’ বলল পুলিশ কমিশনার অনেকটা সংকোচের সাথে। সংকোচ ভাবটা মেকি। আসলে আহমদ মুসার আগমন তার পছন্দ হয়নি।
হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘আমেরিকায় ওনার সাথে আমার পরিচয় হয়। ওনার নানা রকম বিপদ আপদ যাচ্ছে। ওনার সাথে থাকার জন্যে এমন সার্বক্ষণিক একজন লোকের প্রয়োজন পড়ে যিনি তাকে পরামর্শও দিতে পারবেন। সেই সময় হতে আমি তার সাথে থেকে যাই, তারপর এখনও আছি।’
‘আপনি তো সব সময় তার সাথে আছেন, আজ যা ঘটল এমন ঘটনার কি তিনি কোন আশংকা করেছিলেন?’ বলল পুলিশ কমিশনার।
‘সব সময়ই তিনি নানা আশংকার মধ্যে ছিলেন। কিন্তু বাসায় হামলা হবে, এমন আশংকা তিনি কখনও করেননি।’ আহমদ মুসা বলল।
‘আজ যারা ভূয়া নামে টেলিফোন করে স্যারের বাড়িতে থাকা সম্পর্কে কনফার্ম হয়েছিল, তারাই তাকে কিডন্যাপ করেছে। তারা আপনার নাম নিয়ে যেহেতু টেলিফোন করেছে, বুঝা যাচ্ছে তারা আপনাকে চেনে।’ বলল পুলিশ কমিশনার কূটনৈতিক ডায়ালগের ঢংগে।
‘আহমদ হাত্তা সাহেবের যারা শত্রু, তারা তো অবশ্যই আমাকে চিনবে।’ বলল আহমদ মুসা।
‘তা ঠিক তা ঠিক। ঠিক আছে আপনি ওর সাথে কথা বলুন।’ কিছুটা অপ্রস্তুত হওয়ার ভঙ্গিতে বলল পুলিশ কমিশনার।
আহমদ মুসা সোফায় হেলান দিল। একটু ভাবল। তারপর আবার সোজা হয়ে বসল। ফাতিমাকে লক্ষ্য করে বলল, ‘ফাতিমা ঘটনা যা দেখেছ বল।’
‘টেলিফোনে যখন আপনি আমাদের এখানে এক্ষুনি আসছেন বললেন এবং সাবধান থাকতে বললেন, তখনি অজানা আশংকায় আমার বুক কেঁপে ওঠে। আপনার টেলিফোন রাখার তিন চার মিনিটের মধ্যেই আমাদের গেটে দুটি গাড়ি দাঁড়াবার শব্দ পেলাম। কেন জানি বুকটা আমার ছ্যাৎ করে উঠল সঙ্গে সঙ্গেই। আপনি তো অতদূর থেকে এসময় আসার প্রশ্নই ওঠে না, তাহলে কে এল? আমি বেরিয়ে গিয়ে ব্যালকনি থেকে উঁকি দিলাম গেটে। দেখলাম একটা সাদা কার ও একটা সাদা মাইক্রো গেটে এসে দাঁড়িয়েছে। তা থেকে নামছে আমাদের সেনাবাহিনীর কালো ইউনিফরম পরা কমান্ডোরা। সেটি………।’
ফাতিমাকে বাঁধা দিয়ে বলল, ‘তুমি কি বললে একটা সাদা কার ও একটা সাদা মাইক্রো। তুমি এটা ঠিক দেখেছো তো?’
‘হ্যাঁ ঠিক দেখেছি।’
‘তুমি কি ঠিক বলছ ওরা সেনাবাহিনীর কমান্ডোর কালো পোষাকে অন্য কেউ তো হতে পারে!’ আহমদ মুসা বলল।
‘তা হতে পারে। কিন্তু আমি ওদের ইউনিফর্মে আমাদের সেনাবাহিনীর ইনসিগনিয়ার সাথে কমান্ডো ইউনিটের ইনসিগনিয়া পরিষ্কার দেখেছি।’ বলল ফাতিমা দৃঢ়তার সাথে।
‘ঠিক আছে, বলে যাও।’ আহমদ মুসা বলল।
একটু থেমেই সে আবার বলতে শুরু করল, ‘সেনাবাহিনীর কমান্ডোদের নামতে দেখে আমি খুশি হলাম। ভাবলাম, সরকার আমাদের নিরাপত্তার জন্যে ওদের পাঠিয়েছি। আমি ব্যালকনিতে দাঁড়িয়েই থাকলাম এই আশায় যে, নিশ্চয় আব্বার পিএ হাসান মুসতো আমাকে ডাকবে এবং আমাকে কিছু বলতে হবে। ওরা ঢুকে গেল ভেতরে। আমি দাঁড়িয়েই আছি। মাত্র কয়েক মুহূর্ত। হঠাৎ দেখলাম চত্বরের চারজন পুলিশ বাড়ির ভেতরে দিকে কাউকে লক্ষ্য করে স্টেনগান তুলছে। পরক্ষণেই চারজন পুলিশ একসাথে গুলী বিদ্ধ হয়ে পড়ে গেল। গুলীগুলো ভেতর দিক থেকে এসেছে এবং সাইলেন্সার লাগানো থাকায় কোন শব্দ হয়নি। সঙ্গে সঙ্গেই আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল কমান্ডোরা আমাদের মিত্র নয়, শত্রু। বিষয়টা বুঝতে পেরেই আমি দ্রুত ছুটে এলাম আব্বার ঘরে আব্বাকে সব কিছু জানাবার ও পুলিশকে টেলিফোন করার জন্যে।
এরপর আমি ঘরে এসেই ছিটকিনি লাগিয়ে দিয়ে আব্বার কাছে গেলাম তাঁকে জাগাবার জন্যে। কিন্তু ভাবলাম এতে দেরী হয়ে যাবে টেলিফোন করতে। আব্বাকে না ডেকে ছুটলাম টেলিফোন করতে। পুলিশকে টেলিফোন করা প্রায় শেষ হওয়ার পথে এই সময় দরজা ভেঙ্গে দু’জন কমান্ডো ঘরের ভেতরে ঢুকল। তাদের একজন গুলী করে আমার টেলিফোনের সেট ভেঙ্গে ফেলল। আরেকজন আব্বাকে নিয়ে ক্লোরোফরম করে তাকে কাঁধে তুলে নিল। ‘আমার আব্বাকে নিয়ে যেও না’ বলে চিৎকার করে উঠেছিলাম, তারপরে আর কিছু মনে নেই। সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলেছিলাম আমি।’ থামল ফাতিমা নাসুমন।
‘ঠিক আছে আপনারা কথা বলুন আমি ওদিকে একটু দেখি।’ বলে উঠে দাঁড়াল পুলিশ কমিশনার। চলে গেল সে।
সে চলে যেতেই আহমদ মুসা প্রশ্ন করল ফাতিমাকে, ‘আচ্ছা বলত, তুমি কার ও মাইক্রো এই গাড়ি দুটোকে যখন গেটে দেখলে, তখন গাড়ি দুটোর মাথা কোন দিকে ছিল?’
‘উত্তর দিকে।’
‘মাইক্রোর দরজা দুপাশে, না এক পাশে ছিল, মনে করতে পার তুমি?’
‘অবশ্যই, মাইক্রোর পশ্চিম পাশের দরজা দিয়ে নেমে গাড়ি ঘুরে ওরা এদিকে এসেছে। সুতরাং দরজা একপাশেই ছিল।’
আহমদ মুসা চোখ-মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
কথা শেষ করে ফাতিমা একটু থেমেই আবার বলে উঠল, ‘এ তথ্যে সাংঘাতিক আগ্রহ দেখছি আপনার! কিন্তু কি হবে এসব দিয়ে?’
‘পরে বলব। তুমি খুবই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে। এখন বল, কমান্ডোদের মুখের চেহারা তো দেখেছ, বিশেষ করে যারা কিডন্যাপ করতে ঘরে ঢুকেছিল?’
‘হ্যাঁ দেখেছি। ওদের কাউকেই সুরিনামের বলে মনে হয়নি।’
‘কোথাকার লোক বলে মনে হয়েছে?’
‘ওদের যে দুজন ঘরে ঢুকেছিল তাদের একজন ‘মায়া’, আরেকজনের চেহারায় ‘মোল্লাটো’র ভাব বেশি ছিল।’
ভ্রু-কুঞ্চিত হলো আহমদ মুসার। রাস্তায় যে কারটির সাথে তার এক্সিডেন্ট হয়েছিল, তার একজনের নাম সে শুনেছে ‘ট্রিজিল্লো’ এবং ‘জারগো ইউরিকো’। এ দুটির একটি ‘মায়া’ নাম, আরেকটা ‘মোল্লাটো’ জাতির মানুষের নাম এবং এরা কেউ সুরিনামের নয়। ‘মায়া’দের প্রধানত বাস গুয়েতেমালায় আর ‘মোল্লাটো’ জাতির প্রধান আবাস কলম্বিয়ায়। তাহলে তো ফাতিমার বর্ণনার সাথে সবকিছু মিলে যাচ্ছে। তাহলে ঐ গাড়ি দুটিই কি আহমদ হাত্তাকে কিডন্যাপ করে নিয়ে ঐ ভাবে পাগলের মত ছুটছিল!
‘আপনি কি কিছু ভাবছেন?’ বলল ফাতিমা।
ফাতিমার কথায় সম্বিত ফিরে পেল আহমদ মুসা।
‘হ্যাঁ ভাবছি ফাতিমা। আল্লাহ্‌কে ধন্যবাদ। মি. হাত্তাকে যারা কিডন্যাপ করে নিয়ে যাচ্ছিল, তাদের সাথে মনে হয় রাস্তায় সাক্ষাত হয়েছিল।’ বলল আহমদ মুসা।
বিস্ময় ও প্রবল উত্সুক্য ফুটে উঠল ফাতিমা নাসুমনের চোখে-মুখে। সোজা হয়ে বসল। বলল, ‘দেখা হয়েছিল? কিভাবে?’
আসার সময় তার এক্সিডেন্টের উল্লেখ করে আহমদ মুসা বলল, ‘বেপরোয়া গতির একটা কার আমার কারকে ধাক্কা দেয়। চরকির মত আমার কারটি ঘুরপাক খেলেও আমার গাড়ি বড় ধরনের এক্সিডেন্ট থেকে বেঁচে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। এই সময় একটা মাইক্রোও সেখানে এসে দাঁড়িয়ে যায় এবং আমার গাড়িকে ধাক্কা দেয়া কারটাও সামান্য একটু এগিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। ঐ কার ও মাইক্রো থেকে দুজন লোক নামে। তারা একে অপরের নাম ধরে ডেকে কথা বলছিল। তোমার বর্ণনা শুনে মনে হচ্ছে তারাই মি. হাত্তাকে কিডন্যাপ করেছে।’ বলল আহমদ মুসা।
‘কিন্তু কেন মনে হচ্ছে? কি প্রমাণ পেয়েছেন?’ ফাতিমা নাসুমন বলল।
‘প্রথম প্রমাণ হলো কিডন্যাপকারীদের একটা কার ও একটা মাইক্রো ছিল, ওখানেও তাই। দুই ক্ষেত্রেই গাড়ির রং সাদা। তুমি বলেছ কমান্ডোরা সুরিনামের নয়, আমি যে দুজনকে দেখেছি তারাও সুরিনামের নয়। সবচেয়ে বড় কথা হলো, যে দুজন ঘরে ঢুকেছিল তাদের একজনকে ‘মায়া’ অন্যজনকে ‘মোল্লাটো’ বলে তোমার মনে হয়েছে। অন্যদিকে আমি যে দুজনকে দেখেছি তাদের একজনের নাম ‘মায়া’দের অন্য নামটি ‘মোল্লাটো’ গোষ্ঠীর।’ থামল আহমদ মুসা।
কথা বলল না ফাতিমা। বিমর্ষভাব তার চেহারায়। একটু পর ভাঙ্গা গলায় বলল, ‘ওরা তো চলে গেছে। এখন কি হবে। গাড়ির নম্বর আপনি দেখেছেন?’
হতাশ কণ্ঠ ফাতিমার।
‘দেখার চেষ্টা করিনি। দেখলেও এবং মনে রাখলেও কোন লাভ হতো না। গাড়িতে লাগানো নম্বর অবশ্যই ভূয়া ছিল।’
কথা শেষ করেই আহমদ মুসার মনে পড়ে গেল লন্ড্রির স্লিপের কথা। ওতে তো গাড়ির অন্যতম আরোহী ট্রিজিল্লোর ঠিকানা আছে।
খুশিতে ভরে গেল আহমদ মুসার মুখমন্ডল। মুখ ফুড়ে সে বলে ফেলল, ‘আল হামদুলিল্লাহ।’ আনন্দের উচ্ছাস তার কণ্ঠে।
‘কি ব্যাপার ভাইয়া, কি হল?’ বলল ফাতিমা।
‘আমি এখন বেরুতে চাই ফাতিমা।’ আহমদ মুসা বলল।
‘কোথায়?’
‘মি. হাত্তার সন্ধানে।’
‘ওদের ঠিকানা জেনেছেন তাহলে?’ বলল ফাতিমা। তার চোখ-মুখে ফুতে উঠেছে আশার আনন্দ।
‘মনে হচ্ছে।’ বলে আহমদ মুসা লন্ড্রির স্লিপের সব কথা তাকে জানিয়ে বলল, ‘আল্লাহ্‌ তার বান্দাহদের প্রয়োজনে এভাবেই সাহায্য করে থাকেন।’
‘আল হামদুলিল্লাহ। আপনি এখনি বের হবেন?’ ফাতিমা বলল।
‘হ্যাঁ।’
‘পুলিশকে বলবেন না?’
‘পুলিশ কমিশনারকে বলব না। আমি নিঃসন্দেহ যে রঙ্গলালের লোকরাই আহমদ হাত্তাকে কিডন্যাপ করেছে এবং এখন আমার মনে হচ্ছে, রঙ্গলালরা বাইরে থেকে মাফিয়া ভাড়া করে এনেছে। সেদিন ব্রুকোপনডো হাইওয়ের ঘটনায় যারা মরেছে, তারা এবং আজকের কিডন্যাপকারীরা একই গ্রুপের লোক, রঙ্গলালরা নিজে না পেরে মাফিয়াদের ডেকে এনেছে। সাংঘাতিক কিছু ঘটানো ওদের লক্ষ্য। আমি একটা ঠিকানা পেয়েছি এটা পুলিশ কমিশনার জানতে পারলে সঙ্গে সঙ্গেই সে তা জানিয়ে দেবে রঙ্গলালকে। তার ফলে আমি ঠিকানায় পৌঁছার আগেই ওরা হাওয়া হয়ে যাবে।’ থামল আহমদ মুসা।
‘বুঝেছি ভাইয়া। আপনি একা মাফিয়া ও রঙ্গলালদের বিরুদ্ধে এভাবে যাওয়া কি ঠিক হবে?’ বলল ফাতিমা চোখে-মুখে অসহায় ভানব নিয়ে।
‘তুমি টেলিফোনে ওভানডো বা লিসাকে ঠিকানাটা জানিয়ে দাও। আর বলে দাও এখনি যেন তারা এটা বার্নারডোকে জানিয়ে দেয়। বার্নারডো সহকারী পুলিশ কমিশনারকে বিষয়টা জানাবে এবং নিজের কর্তব্যও সে ঠিক করে নেবে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘বার্নারডো আপনার সাহায্যে সঙ্গে সঙ্গে যেন যায় এটা বলব না?’
আহমদ মুসা হাসল। বলল, ‘সেটা বার্নারডোকেই ঠিক করতে দাও।’
‘আপনি আশ্চর্য লোক ভাইয়া। তাকে আপনি হুকুম দেবেন না, সব দুর্বহ ভার একাই বইবেন।’ বলল ফাতিমা ভারী কণ্ঠে।
‘তা নয় ফাতিমা। নিউ নিকারী থেকে গতকাল সে সিনিয়র গোয়েন্দা অফিসার হিসেবে বদলী হয়ে এসেছে পারামারিবোতে। সে তো এখন আমার হুকুমের অধীন নয়।’
বলে আহমদ মুসা উঠে দাঁড়াল।

‘যতই অত্যাচার-নিপীড়ন কর তোমাদের পরিচয় না বললে তোমার কোন প্রশ্নেরই জবাব আমি দেব না। তোমরা আমাদের সেনা-কমান্ডোদের পোশাকে পরে এই অপরাধ করেছ। কারা তোমরা?’ আহত ও কম্পিত কণ্ঠ আহমদ হাত্তা নাসুমনের।
আহমদ হাত্তা পড়ে আছে মেঝেতে।
তার জামা-কাপড়ে রক্তের দাগ। চুল তার উস্কো-খুস্কো। বিপর্যস্ত চেহারা।
তার পাশেই এক চেয়ারে বসে আছে সেই বস কমান্ডো অফিসার লোকটি।
একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে গুন্ডা মার্কা একজন লোক। তার হাতে চামড়ার একটি চাবুক। চাবুকে রক্তের দাগ।
এই চাবুক দিয়েই নির্যাতন করা হয়েছে আহমদ হাত্তাকে।
আরও একজন লোক রয়েছে ওখানে। সে পাথরের মত স্থিরভাবে দাঁড়িয়ে আছে চেয়ারে বসা লোকটির ঠিক পিছনে। অনেকটা এটেনন্ডেট কিংবা বডিগার্ডের মত।
ঘরটি একটি হলঘর।
চারদিকেই দরজা। মনে হয় সম্মেলন কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহ্রত হয়।
আহমদ হাত্তা থামতেই চেয়ারে বসা সাপের মত ঠান্ডা দৃষ্টি ও ইস্পাতের মত কঠিন কাঠামোর লোকটা বলে উঠল, ‘আমাদের পরিচয় জানার জন্যে অত ব্যস্ত হয়ে উঠছেন কেন? পরিচয় জানলেও পৃথিবীর কাউকে তা বলার সুযোগ পাবেন না। বাড়িতেই আমরা আপনাকে হত্যা করে আসতাম। কিন্তু হত্যা করিনি একটা কারণে। সেটা হলো, আমরা আপনার বডিগার্ড-কাম ড্রাইভারকে হাতে পেতে চাই এবং জানতে চাই তার পরিচয়, যা আপনাকে আগেই বলেছি। এতক্ষণ আপনি বেঁচেও আছেন এই কারণেই। আমাদের কাছে আপনার কোন মূল্য নেই। এখন আপনার বডিগার্ড-ড্রাইভার আমাদের কাছে মূল্যবান। সে আমাদের দুজন লোককে হত্যা করেছে। তার প্রতিশোধ আমরা তার উপর নেব।’
‘তাহলে তোমরা আমাকে খুন করতে চাও কেন?’ বলল আহমদ হাত্তা।
‘আমরা চাই না, অন্যেরা এটা চায়। সেই ‘অন্য’দের আমরা সাহায্য করছি।’ বলল চেয়ারে বসা লোকটা।
‘অর্থের বিনিময়ে?’
‘অবশ্যই।’
‘তাহলে তোমরা ভাড়াটে মাফিয়া। শুধু টাকার জন্যে তোমরা এত নিচে নেমেছ?’ বলল আহমদ হাত্তা।
‘শুধু টাকার অভাব যখন মানুষকে নিচে নামায়, তখন টাকা উপার্জনের জন্যে মানুষ নিচে নামবে না কেন?’
‘শুধুই টাকার অভাব সত্যিকার মানুষকে নিচে নামাতে পারে না।’ আহমদ হাত্তা বলল।
হাসল লোকটা। ঠান্ডা হাসি।
বলল, ‘দুএকজনকে পাবেন, তারা কোন না কোনভাবে সুবিধাভোগী ভাগ্যবান। বাকি ৯০ ভাগ অভাগ্যবানরা টাকার অভাবে সব হারায়। সব পাবার জন্যে এদের কাছে টাকাই সবচেয়ে বড়, অন্য সব কাজই টাকার চেয়ে ছোট।’
সাপের মত ঠান্ডা দৃষ্টির এবং ইস্পাতের কাঠামোর লোকটার মুখ থেকে বেরিয়ে আসা এই কথাগুলোকে অনেকটা বিলাপের মত মনে হলো।
আহমদ হাত্তা কিছুটা অবাক হয়ে তাকাল লোকটার দিকে। মুখ খলেছিল কিছু বলার জন্যে। কিন্তু তার আগেই গর্জে উঠল লোকটার কণ্ঠ।
‘বলুন লোকটি কে?’
‘তোমার পরিচয় এখনও বলনি। তুমিই তো দেখছি দলনেতা।’ বলল আহমদ মুসা।
‘আমার পরিচয় তো আপনিই বলেছেন। আমি মাফিয়া। টাকার বিনিময়ে সব কাজ করি।’ বলল লোকটি।
‘এটা কোন পরিচয় নয়। কাজের পরিচয় বল। তোমাদের দলের নাম কি? তোমার নাম কি? রঙ্গলালই তোমাদের নিয়োগ করেছে কিনা?’ বলল আহমদ হাত্তা।
হাসল চেয়ারে বসা লোকটা। করুণার হাসি। বলল, তাহলে বাঁচার আশা এখনও করেন! এসব জেনে রঙ্গলালের বিরুদ্ধে কাজে লাগাবেন, এ সুখ স্বপ্ন এখনও দেখছেন! অথচ মৃত্যু আপনার জন্যে অবধারিত। এখন বলুন আপনার গার্ড-কাম ড্রাইভার লোকটি কে, তার নাম কি?’
‘বারবার একই প্রশ্ন কেন? এ প্রশ্নের উত্তর আমি দেব না। এ প্রশ্নের উত্তর না দেয়া পর্যন্তই তো আমি বেঁচে আছি। মরবার জন্যে এ প্রশ্নের উত্তর আমি দেব না।’ বলল আহমদ হাত্তা।
‘অনেক সময় মৃত্যুর চেয়ে জীবন বেশি ভীতিকর হতে পারে। এখন মৃত্যুর ভয়ে যা বলছেন না, জীবনের ভয়ে তা বলবেন।’ বলল চেয়ারে বসা নেতা লোকটি।
‘জীবনের কোন ভয়ই মৃত্যুর ভয়ের চেয়ে বড় হতে পারে না।’ আহমদ হাত্তা বলল।
চেয়ারে বসা লোকটির চোখ দুটি আরও ঠান্ডা, মুখ তার আরও শক্ত হয়ে উঠল। বলে উঠল ঠান্ডা গলায়, ‘বলবেন না তাহলে?’
‘বলব না। কিন্তু কি করবে তার পরিচয় দিয়ে? আমার মত তাকেও তোমরা মারতে চাও। মারার জন্যে ঠিকানা দরকার, তার পরিচয় দরকার হয় না।’
‘আমাদের লোক হত্যার প্রতিশোধ হিসেবে তাকে মারা প্রয়োজন। কিন্তু এর চেয়ে বেশি প্রয়োজন তার পরিচয় জানা। আমাদের ‘কিনিক কোবরা’র কোন সদস্যকে এ পর্যন্ত দুনিয়ার কেউ কোথাও হত্যা করতে পারেনি। সেই প্রথম আমাদের দুজনকে হত্যা করেছে। শুনেছি, সুরিনামে আরও কিছু অসাধ্য সাধন সে করেছে। সব মিলিয়ে সে আমাদের কাছে অজানা এক বিস্ময়। সেজন্য তার পরিচয় আমাদের জানতেই হবে।’ বলল লোকটি।
‘ঠিক আছে তার পরিচয় তাহলে উদ্ধার কর।’ আহমদ হাত্তা বলল।
‘হ্যাঁ সে চেষ্টাই আমি এবার করব।’ আরও অস্পষ্ট ঠান্ডা গলায় সে বলল। তার সাপের মত ঠান্ডা চোখ দুটি আরও ছোট হয়ে এল।
বলেই লোকটি চাবুকধারীর দিকে তাকাল। বলল, ‘এঁকে নাচের আসনে নিয়ে বসাও।’
চাবুকধারী এগিয়ে এল আহমদ হাত্তার দিকে। আহমদ হাত্তাকে সে দুহাতে পাঁজাকোলা করে তুলে নিল এবং অল্প দূরে ঘরের দেয়ালের সাথে সেঁটে রাখা একটা উঁচু চেয়ারে নিয়ে বসিয়ে দিল।
চেয়ারটা বিশেষ ধরনের। উঁচু ও মজবুত লোহার তৈরি। চেয়ারের চারটি পায়া বিশেষ কংক্রিট বেদির সাথে আটকানো। চেয়ারের আসন ও পেছনটা সলিড কাঠের।
আহমদ হাত্তা চেয়ারে বসতে বসতে চেয়ারে বসা সেই লোকটিকে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘তোমার দলের নাম খুবই সুন্দর ভয়ংকর। তোমার নাম কি?’
চেয়ারে বসা নেতা লোকটির ঠান্ডা চোখ দুটি নিবদ্ধ হলো আহমদ হাত্তার প্রতি। তার ঠান্ডা চোখে হাল্কা একটা ঔজ্জ্বল্য। বলল, ‘ভয়ংকর শব্দের আগে সুন্দর শব্দ আপনাদের মত গণতন্ত্রীরা, আইনের ধ্বজাধারীরা বসাতে পারেন না। এটা ‘কিনিক কোবরা’র একক অধিকার। সব নিষ্ঠুরতা তার কাছে শিল্প, সব ভয়ংকরতা তার কাছে আনন্দের।’
‘ধ্বনিগত সৌন্দর্যের কথা বলেছি। কোবরার অঙ্গ-কাঠামো একটা শিল্প হলেও তার ছোবলে আছে মৃত্যু, তা আমি জানি। তবুও জিজ্ঞেস করছিলাম এজন্য যে তোমার নামটাও এরকমই কিনা।’
‘শুনবেন না, এখনি দেখবেন।’ বলে উঠল সেই নেতা লোকটি।
ততক্ষণে আহমদ হাত্তাকে চেয়ারের সাথে বাঁধা শুরু হয়ে গেছে। চেয়ারের দুই হাতলের সাথে তার দুই হাত বাঁধা হলো। তার দেহকেও বাঁধা হলো চেয়ারের সাথে। চেয়ারের পাদানিতে আটকে দেয়া হয়েছে তার দু’পাকে।
আহমদ হাত্তা তার দেহের বাঁধনের দিকে নিরাসক্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, ‘মেরে ফেলার চেয়ে বড় তোমরা আর কি করতে পার?’
দুটি তামার ক্লিপ পরানো হলো আহমদ হাত্তার পায়ের দুই বুড়ো আঙ্গুলে রিং-এর মত করে। তামার দুই ক্লিপের সাথে বিদ্যুতের তার বাঁধা।
‘তা এখনি দেখবেন মি. হাত্তা।’ বলল লোকটি।
বাঁধা শেষ করে চাবুকধারী লোকটি একটু দূরে গিয়ে দাঁড়াল। তার হাতে একটা ক্ষুদ্র সুইচ বোর্ড। সে সুইচ বোর্ড থেকে একটা তার গিয়ে আহমদ হাত্তার দুই বুড়ো আঙ্গুলে যুক্ত হয়েছে। তারের আরেকটা প্রান্ত দেয়ালের সুইচ বোর্ডে।
‘স্যার বুঝতে পেরেছেন, কি ঘটতে যাচ্ছে? দেখুন, ঐ লোকটির হাতে সুইচ আছে। সুইচ চাপ দিলেই বিদ্যুৎ প্রবাহ গিয়ে ছোবল হানবে আপনার দেহের প্রতিটি অণু-পরমাণুতে।’ বলল নেতা লোকটি খুবই নিরাশক্ত ভঙ্গিতে ঠান্ডা গলায়।
মুহূর্তের জন্যে চোখ বুজেছিল আহমদ হাত্তা। ধীরে ধীরে চোখ খুলল সে। তার চোখে-মুখে একটা চাঞ্চল্য। বলল, ‘তুমিই বলেছ, আরও আগেই আমার মরে যাবার কথা ছিল। সুতরাং মৃত মানুষকে ভয় দেখিয়ে লাভ কি!’
‘ঠিক আছে।’ বলে নেতা লোকটি তাকাল সুইচ হাতে দাঁড়ানো লোকটার দিকে।
লোকটি মুহূর্তেই এটেনশন হয়ে দাঁড়াল। তার ডান হাতটি উঠে এল আরেকটু সামনে। বুড়ো আঙ্গুল তার চেপে ধরল সুইচ বোর্ডের লাল বোতাম। বোতামটির সামনেই একটা মনিটরিং মিটার-উইনডো। লাল বোতাম চাপ দেবার সাথে সাথেই একটা লাল ইনডিকেটর ডানে ছুটে চলল।
অন্যদিকে লোকটি লাল বোতাম চাপ দেবার সাথে সাথেই আহমদ হাত্তার দেহ লাফ দিয়ে উঠার মত ভয়ানকভাবে কেঁপে উঠল। সেই সাথে বুক ফাটা চিৎকার বেরিয়ে এল আহমদ হাত্তার মুখ থেকে। চোখ দুটি বড় বড় হয়ে চক্ষু কোটর থেকে বেরিয়ে আসতে চাইল। অসহ্য যন্ত্রণা তাড়িত দেহের প্রবল ঝাঁকুনিতে হাত ও দেহের বাঁধনগুলো আরও কামড়ে ধরল দেহকে।
সুইচ ধরা লোকটির নজর ছিল সুইচ ইনডিকেটরের দিকে। চলমান বৈদ্যুতিক কাঁটাটা লাল ডটলাইন স্পর্শ করার সঙ্গে সঙ্গেই সুইচ অফ করে দিল লোকটি। লাল ডটলাইনটা ডেঞ্জার পয়েন্ট। এ পয়েন্ট অতিক্রম করলে মানুষ মৃত্যুর দিকে অগ্রসর হয়। আহমদ হাত্তার দেহ থেকে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হতেই চিৎকার থেমে গেল তার। চোখ বুজল সে। দেহটা নেতিয়ে পড়ল চেয়ারের উপর।
‘স্যার কেমন লাগল। আমাদের কথায় কি রাজী আছেন? বলবেন কি লোকটার পরিচয়?’
আহমদ হাত্তা কোন কথা বলল না। চোখ খুললও না।
নেতা লোকটার ঠান্ডা চোখ উঠল বিদ্যুতের সুইচ ধরা লোকটির দিকে।
সঙ্গে সঙ্গেই লোকটি তার চোখ ফিরিয়ে নিল হাতের সুইচ বোর্ডটার দিকে তার বুড়ো আঙ্গুল আবার চেপে বসল লাল বোতামটার উপর।
কানফাটা শব্দে আবার কঁকিয়ে উঠল আহমদ হাত্তা। বিস্ফোরিত চোখ দুটির গোলাকার অক্ষিগোলক তার যেন ছিটকে বেরিয়ে পড়বে। চিৎকাররত আহমদ হাত্তার মুখের ভাঁজে ভাঁজে অসহনীয় যন্ত্রণার ছাপ।
এর আগের মতই এক সময় আহমদ হাত্তার দেহ থেকে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হলো।
সঙ্গে সঙ্গে চিৎকার থেমে গেল আহমদ হাত্তার এবং এর সাথে সাথেই মাথাটা তার নেতিয়ে পড়ল চেয়ারের উপর। চোখ দুটিও তার বুজে গেছে। কম্পিত শ্বাস-প্রশ্বাসে তার অসীম ক্লান্তি।
হাসল চেয়ারে বসা লোকটি সেদিকে তাকিয়ে। বলল ঠান্ডা কণ্ঠে, ‘ মাত্র দুই ছোবলেই এতটা ভেঙ্গে পড়েছেন মি. হাত্তা। বিদ্যুতের এই ছোবল চলতেই থাকবে যতক্ষণ আপনি না বলবেন লোকটির পরিচয়। বলুন কি ভাবছেন?’
আহমদ হাত্তার মধ্যে লোকটার কথার কোন প্রতিক্রিয়া হলো না। তার দেহটা চেয়ারের উপর যেমন নেতিয়ে পড়েছিল, তেমনি পড়ে থাকল। মাথাটা সামান্যও নড়ল না। চোখ দুটিও তার খুলল না।
কয়েক মুহূর্ত জবাবের জন্যে অপেক্ষা করে প্রথম বারের মত অসহিষ্ণু কণ্ঠে গর্জন করে উঠল, ‘মি. হাত্তা কথা আপনাকে বলতেই হবে। মরে বাঁচবেন সে পথ আপনার নেই। মরতে চাইলেও আমাদের প্রশ্নের উত্তর আপনাকে দিয়েই তবে মরতে হবে।’ থামল লোকটি।
পল পল করে আবার বয়ে চলল সময়।
আহমদ হাত্তার মধ্যে কোনই ভাবান্তর নেই। যেন কোন কিছুই শুনছে না।
লোকটি বলে উঠল, ‘ঠিক আছে, কথা না বললে চিৎকারই আমরা তাহলে শুনি। নির্দেশ দিচ্ছি আবার ছোবল মারার জন্যে।’
লোকটি থামতেই চোখ খুলল আহমদ হাত্তা। কিন্তু মাথাটি তার খাড়া হলো না। বলল ধীরে ধীরে, ‘শোন, ইসলামের নবীকে জীবন্ত করাত দিয়ে চেরা হয়েছে। তোমার দেয়া যন্ত্রণা তার চেয়ে বড় নয়। কিন্তু তাঁদের তুলনায় আমি দুর্বল ব্যক্তি। সহ্য করতে পারছি না এই যন্ত্রণা। কিন্তু যন্ত্রণা যদি তুমি দাও, সহ্য করা ছাড়া আমার কোন উপায় নেই। তাঁর পরিচয় গোনী রাখার যে কথা দিয়েছি, সে কথা ভাঙ্গার চাইতে আমার নিঃশেষ হয়ে যাওয়া অনেক সহজ। সুতরাং অযথা কথা বাড়াচ্ছ কেন?’
জ্বলে উঠল লোকটির চোখ। তাকাল সে সুইচ বোর্ডধারীর দিকে। বলল, ‘শুরু কর ছোবল এবং অব্যাহতভাবে চালিয়ে যাও। তুমি মাঝে মাঝে থামবে, কিন্তু তাকে স্বাভাবিক নিঃশ্বাস ফেলার সুযোগ দেবে না। তাঁর দেহের নাচন আর চিৎকার যেন স্থির হবার সুযোগ না পায়।’ বলে লোকটা চেয়ার থেকে উঠে ধীর পদক্ষেপে ঘর থেকে বের হয়ে গেল।
নড়ে-চড়ে দাঁড়াল সুইচধারী লোকটি। সুইচ বোর্ডটি এবার সে বাঁ হাতে নিল। ডান হাতের চার আঙ্গুল নিল বাঁ হাতের নিচে এবং ডান হাতের বুড়ো আঙ্গুল ন্যাস্ত করল লাল সুইচটির উপর। দুহাতে সে সুইচ বোর্ডটি চোখের আরও কাছে তুলে নিল।
ডান হাতের বুড়ো আঙ্গুল তার চেপে বসল লাল সুইচটার উপর।
প্রবল ঝাঁকুনি খেল আহমদ হাত্তার দেহ। মুখ ফেটে তাঁর বেরিয়ে এল আবার সেই আর্ত চিৎকার, অসহ্য যন্ত্রণায় অসহায় বুক ফাটা চিৎকার।

বাড়ির নেম প্লেটের উপর নজর পড়তেই খুশি হয়ে উঠল আহমদ মুসার মন। কাঠের প্লেটের সাদা অক্ষরে লেখা- ‘১৩১ ক্যানাল স্ট্রীট’। এই ঠিকানাই লেখা আছে লন্ড্রির স্লিপে।
বাড়িটা ক্যানাল স্ট্রীটের পশ্চিম পাশের শেষ বাড়ি। তার পরেই একটি খাল। খালটি গিয়ে পড়েছে সুরিনাম নদীতে।
রাস্তার শেষ প্রান্ত হওয়ার কারণে গাড়ি-ঘোড়া নেই বললেই চলে। অনেকটাই নির্জন-নিরিবিলি পরিবেশ। দুষ্কৃতকারীদের অবস্থানের জন্য এ ধরণের স্থান খুবই লোভনীয়।
কিন্তু আহমদ মুসা নেম প্লেটের উপরে দ্বিতীয়বার চোখ বুলাতে গিয়ে দমে গেল। প্লেটের ঠিকানার উপরে নামের জায়গায় লেখা রয়েছে ‘সিভিল ডিফেন্স-৩’। তার মানে এটা সিভিল ডিফেন্সের তিন নম্বর অফিস, ভাবল আহমদ মুসা।
তাহলে কি লন্ড্রির স্লিপে ভুল ঠিকানা লেখা হয়েছে? ধাঁধায় পড়ে গেল আহমদ মুসা।
হতাশ ভঙ্গিতে আহমদ মুসা তাকাল বাড়িটার দিকে।
প্রাচীর ঘেরা বাড়ি।
নিচু প্রাচীর।
স্টিলের গেট। গেট বন্ধ।
প্রাচীরের উপর দিয়ে বাড়ির গোটা অবয়ব দেখা যাচ্ছে। তিন তলা বাড়ি।
প্রাচীরের পর ছোট ঘাসে ঢাকা একটা চত্বর। চত্বরের পর তিন ধাপের সিঁড়ি ডিঙিয়ে বারান্দায় উঠা যায়। তারপর সোজা এগুলেই বাড়ির ভেতরে ঢোকার দরজা। দরজা বন্ধ। বাড়ির এদিকের কোন জানালা খোলা নেই।
এটা সিভিল ডিফেন্সের কোন অফিস, না বাসা? ভেতরে গিয়ে খোঁজ নেয়া যায়। পরক্ষণেই আবার ভাবল আহমদ মুসা, লন্ড্রির স্লিপের ঠিকানা ঠিকও হতে পারে। লোকটি সিভিল ডিফেন্স অফিস কিংবা বাসাতেও তো থাকতে পারে! শেষের এ চিন্তাকেই আহমদ মুসা সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য বিকল্প বলে ধরে নিল।
চারদিকে তাকালো। জন মানুষের চিহ্ন কোথাও নেই। আবার বাড়ির দিকে তাকাল আহমদ মুসা। চারদিকের মত বাড়িটাও নিরব। কোন মানুষ দেখা যাচ্ছে না, কোন শব্দও আসছে না।
ভেতরে ঢুকবে কি আহমদ মুসা।
মনে পড়ল আহমদ হাত্তার কথা। তাকে উদ্ধারের একটাই মাত্র ক্লু তার হাতে। সেটা হলো এই ঠিকানা। সুতরাং এই ঠিকানার সূত্র ধরে আগানো ছাড়া কোন বিকল্প তার কাছে নেই।
আহমদ মুসা প্রাচীরের পাশ থেকে সরে এসে এগুলো গেটের দিকে।
গেটে তালা নেই। হুক দিয়ে গেট বন্ধ। খুশি হলো আহমদ মুসা। বাড়ি বা অফিসটিতে নিশ্চয় মানুষ আছে। না থাকলে গেটে তালা দেয়া থাকত। গেটে তালাটি ঝুলছে।
হুক খুলে আহমদ মুসা প্রবেশ করল ভেতরের চত্বরে।
এগুলো বারান্দার দিকে। বারান্দায় উঠে দরজায় নক করবে সে? নিজেকে নিজেই প্রশ্ন করল আহমদ মুসা। অফিস বাঁ বাসার নিশ্চয় কেউ বেরিয়ে আসবে। কিন্তু বাসায় যদি ট্রিজিল্লোরা থাকে, তাহলে তো জিজ্ঞেস করলে হিতে বিপরীত ঘটবে।
তাহলে কি করবে সে?
অন্য কোনভাবে বাড়িতে ঢুকতে চেষ্টা করবে? তাতে চোর হিসেবে ধরা পড়ার সম্ভাবনা আছে।
সেটাই বরং ভালো। সে অবস্থায় মোকাবিলা করা যাবে।
পরক্ষণেই আবার ভাবল আহমদ মুসা, যদি এটা নিছকই একটি সিভিল ডিফেন্স অফিস হয়, তাহলে এখানে এভাবে ঢোকা বিব্রতকর হবে। ট্রিজিল্লোরা এখানেই থাকে এটা নিশ্চিত না হয়ে ঢোকা উচিত হবে না।
তাহলে?
আবার প্রথম চিন্তাতেই ফিরে এল আহমদ মুসা। গেটে নক করেই সে ঢুকবে। ট্রিজিল্লো যদি দরজা খোলে, তাহলে বুঝা-পড়া সেখানেই শুরু হয়ে যাবে। ট্রিজিল্লো দরজা না খুললে যে খুলবে তাকে ট্রিজিল্লো সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতে হবে। তারপর অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নেয়া যাবে।
বিসমিল্লাহ বলে আহমদ মুসা উঠলো বারান্দায়। এগুলো দরজার দিকে।
বারান্দা পাকা। লাল রং-এর। দরজা সামনে বেশ ধুলা। ধুলায় একাধিক মানুষের পায়ের এবড়ো থেবড়ো চিহ্ন। ভাবল আহমদ মুসা, তার মানে ভেতরে লোক আছে।
দ্বিধাহীনভাবে দরজায় নক করলো আহমদ মুসা। থেমে থেমে তিনবার দরজায় নক করলো সে। তৃতীয় বার নক করার পর ঘরের ভেতরে পায়ের শব্দ পেল আহমদ মুসা।
কয়েক মুহূর্ত। দরজা খুলে গেল।। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে একজন যুবক। পরনে জিন্সের প্যান্ট। গায়ে টি সার্ট, ইন করা কোমরে চওড়া বেল্ট। দুই বাহু পেশীবহুল। পেট, মুখ কোথাও বাড়তি মেদ নেই। চোখে-মুখে উত্তেজনা। নতুন করে বিরক্তির ভাব ফুটে উঠেছে তাতে। এই মাত্র কোথাও মারামারি করে এল, অনেকটা এই রকম ভাব। তবে এটা পরিষ্কার যে, আহমদ মুসাকে সে অনাকাঙ্ক্ষিত অতিথি হিসেবে নিয়েছে।
আহমদ মুসার পরনে শিখের পোশাক নেই। শিখের সেই দাঁড়িও নেই। পোশাকে-আষাকে এক নিরীহ ভদ্রলোকের চেহারা আহমদ মুসার।
‘কি চাই আপনার?’ বিরক্তির সাথে জিজ্ঞেস করল লোকটি।
‘আমি ট্রিজিল্লোর কাছে এসেছি।’
আহমদ মুসা এমন নিশ্চিত কণ্ঠে কথাটা বলল যেন সে জানে ট্রিজিল্লো এখানে আছে।
লোকটির চোখ তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল।
তাতে সন্ধানি দৃষ্টি। বলল, ‘কে আপনি?’
প্রশ্নটা শুনে খুব খুশি হলো আহমদ মুসা। বুঝল সে, ট্রিজিল্লো এখানে না থাকলে এমন প্রশ্ন লোকটি করত না। বলল, ‘ট্রিজিল্লোকে ডাকুন। সে আমাকে চেনে। সেই আসতে বলেছে আমাকে।’
লোকটির চোখে-মুখে বিস্ময়। তারপর সেখানে প্রবল অবিশ্বাসের চিহ্ন ফুটে উঠল। পরে তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক টুকরো বাঁকা হাসি। সে হাসির মধ্যে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ছাপ আছে।
‘ট্রিজিল্লোর সাথে দেখা করবেন, তাহলে ভেতরে আসুন।’
বলে লোকটি একপাশে সরে দাঁড়াল এবং আহমদ মুসাকে ভেতরে ঢোকার জায়গা করে দিল।
লোকটির চোখ-মুখের অবিশ্বাস ও তার ঠোঁটের সূক্ষ্ম হাসিটা আহমদ মুসার নজর এড়ায়নি।
কিন্তু গোবেচারা লোকের মতই আহমদ মুসা ঘরে ঢুকল। সাথে সাথেই লোকটি বন্ধ করে দিল দরজা। দরজা বন্ধ করেই লোকটি পকেট থেকে রিভলবার বের করে তেড়ে এল আহমদ মুসার দিকে। রিভলবারটি সে আহমদ মুসার মাথায় তাক করে বলল, ‘তুমি নিশ্চয় সরকারের গোয়েন্দা কিংবা আহমদ হাত্তার লোক। কিন্তু এই ঠিকানা পেলে কি করে?’
আহমদ মুসা মুখে বিস্ময় ও ভয়ের ভাব ফুটিয়ে তুলে বলল, ‘এসব কি বলছেন! আমি তো ট্রিজিল্লোর সাথে দেখা করতে এসেছি।’
‘ভনিতা ছাড়। ‘কিনিক কোবরা’র লোকরা নিজের পিতা-মাতা, স্ত্রীকেও বিশ্বাস করে না, তারা কাউকেই ঠিকানা জানায় না। আর তোমাকে………।’
লোকটি কথা শেষ করতে পারল না। আহমদ মুসার ডান পা বুলেটের গতিতে গিয়ে লোকটির পায়ের গোড়ালীর উপরের স্থানটায় আঘাত করল। লোকটির বাম পা ছিটকে গেল পেছন দিকে এবং গোড়া কাটা গাছের মত লোকটি আহমদ মুসার বাঁ পাশ দিয়ে আছড়ে পড়ে গেল। মেঝের উপর।
লোকটি মুখ থুবড়ে পড়ে গিয়েছিল মাটির উপরে। রিভলভার ধরা ডান বাহুটা তার বুকের তলে পড়ে গিয়েছিল। কিন্তু তার রিভলবার সমেত ডান হাতটা বাইরে বেরিয়ে ছিল।
আহমদ মুসা ঘুরে দাঁড়িয়ে বাম পা দিয়ে লোকটির কব্জি চেপে ধরল এবং বাঁ হাত দিয়ে কেড়ে নিল রিভলবার।
কিন্তু এই সময়েই লোকটি আকস্মিকভাবে অদ্ভুত ক্ষিপ্রতার সাথে তার দেহটাকে ডান দিকে মোচড় দিয়ে দেহের সবটুকু ভার ছুড়ে দিল আহমদ মুসার পা লক্ষ্যে।
আহমদ মুসা দেহের ভারসাম্য হারিয়ে লোকটির দেহের উপর দিয়ে কাত হয়ে পড়ে গেল মাটিতে। পড়ে গিয়েও আহমদ মুসা তার হাতের রিভলবার ছাড়েনি।
লোকটি মোচড় দেয়ায় তার দেহটি চিৎ হয়ে পড়েছিল এবং আহমদ মুসা পড়ে যাওয়ায় লোকটি তৈরি হওয়ার সুযোগ পেয়ে গিয়েছিল। লোকটি উঠে ঝাঁপিয়ে পড়ল আহমদ মুসার উপর। আহমদ মুসা তার রিভলবার রেডি করে নিয়েছিল এবং ইচ্ছে করলে লোকটির মাথা উড়িয়ে দিতে পারতো। কিন্তু আহমদ মুসা এখনি রিভলবার ব্যবহার করে অন্যদের এ্যালার্ট করতে চায় না। সুতরাং অন্য পথ বেছে নিল আহমদ মুসা।
একজন দক্ষ এ্যাক্রব্যাটের মত আহমদ মুসা তার পা দুটি আকাশের দিকে ছুড়ে দিল এবং তার দেহ অর্ধচন্দ্রাকারে ঘুরে মাটিতে গিয়ে পড়ল। আহমদ মুসার দেহের প্রবল ধাক্কা লোকটির দেহকেও ছিটকে দিয়েছিল। দুই দেহ যখন ছিটকে মাটিতে পড়ল, তখন আহমদ মুসা লোকটির বুকের উপর। রিভলবার তখনও আহমদ মুসার হাতে।
আহমদ মুসা রিভলবারটা লোকটার কপালে চেপে ধরে বলল, ‘একেবারে চুপ, সামান্য বেয়াদবি করলে মাথা গুড়ো করে দেব। মনে রেখ এক কথা আমি দু’বার বলি না। বল আহমদ হাত্তাকে তোমরা কোথায় রেখেছ?’
লোকটি একটুও ভয় পেল না। বলল ক্রুদ্ধ কণ্ঠে, ‘তুমি আমাকে মেরে ফেলতে পার, কিন্তু ‘কিনিক কোবরা’র ছোবল থেকে দুনিয়ার কেউ তোমাকে রক্ষা করতে পারবে না। আহমদ হাত্তার খোঁজ করে লাভ নেই, কিনিক কোবরা’র হাতে পড়লে আর কেউ বাঁচে না।’
লোকটার কথা বাগাড়ম্বর নয়। তা বিশ্বাস করল আহমদ মুসা। তার মনে পড়ে গেল ব্রুকোপনডো রোডে ওদের একজন ধরা পড়া এড়াতে গিয়ে আত্মহত্যা করেছিল। আহমদ মুসার নজরে পড়েছে এরও হাতে সেই সাইনায়েড রিং।
এই সিদ্ধান্তের সাথে সাথেই আহমদ মুসার রিভলবার ধরা হাতটি ওপরে উঠল এবং বিদ্যুৎবেগে গিয়ে আঘাত করল লোকটার কানের উপরের নরম জায়গায়টায়।
আহমদ মুসার মুঠো থেকে বেরিয়ে থাকা রিভলবারের ভোতা মাথা ভয়ংকর হাতুড়ির কাজ করল। মুহূর্তেই লোকটি সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলল।
আহমদ মুসা উঠে দাঁড়াল। চারদিকে তাকিয়ে দেখল সে একটা করিডোরে দাঁড়িয়ে। করিডোরটা বাড়িতে ঢোকা ও বেরুনোর প্যাসেজে। প্যাসেজটির দু’পাশে দেয়াল। দেয়ালে একটি করে দরজা। দরজা দুটির একটি বন্ধ, অন্যটি খোলা।
আহমদ মুসা দ্রুত সংজ্ঞাহীন লোকটাকে টেনে নিয়ে দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকে গেল।
ঘরটি বেশ বড়।
তারপর সংজ্ঞাহীন লোকটাকে টেনে পাশের ঘরের দরজার পাশে অপেক্ষাকৃত অন্ধকার কোণটায় রাখল।
লোকটিকে রেখে সোজা হয়ে দাঁড়াতেই ঘরের দরজার বরাবর বিপরীত দিকের দেয়ালে একটা স্টিকার দেখতে পেল। তাতে লেখাঃ আপনার প্রয়োজন রিসেপশনিস্টকে বলুন এবং অপেক্ষা করুন।
আহমদ মুসা দেখল ঘরটি সিভিল ডিফেন্স অফিসের অভ্যর্থনা কক্ষ। কিন্তু চেয়ার-টেবিল কোথায়? কোন আসবাবপত্র নেই কেন?
মনের কোণে একটা চিন্তা ঝিলিক দিয়ে উঠল আহমদ মুসার। তাহলে কি সিভিল ডিফেন্স অফিস এখান থেকে উঠে গেছে? বাড়িটা ছেড়ে দিয়েছে তারা? বাড়িটা অন্য কেউ ভাড়া নিয়েছে? কিন্তু গেটের সাইনবোর্ডটা বদলায়নি কেন? ভুল হতে পারে। পরক্ষণেই আবার ভাবল আহমদ মুসা, এটা ক্যামোফ্লেজও হতে পারে। কি বলল লোকটা?
‘কিনিক কোবরা’? তাহলে ওদের দলের নাম ওটা, ভাবল আহমদ মুসা। নামই বলছে সাংঘাতিক এক মাফিয়া চক্র এটা। ‘কিনিক কোবরা’ই তাহলে বাড়িটা ভাড়া নিয়েছে। ক্যামোফ্লেজ হিসেবে ব্যবহার করছে সিভিল ডিফেন্স অফিসের সাইনবোর্ডটাকে।
দরজার দিকে এগুলো আহমদ মুসা। দরজা দিয়ে মুখ বাড়াতেই একজনের মুখোমুখি হয়ে গেল সে। এ লোকটির পরনেও জিন্সের প্যান্ট। তবে গায়ে হাফ জ্যাকেট। এ লোকটিও আগের লোকটির মতই পেশীবহুল, পেটা শরীর। পায়ে তার কেটস। মনে হচ্ছে যেন সে মারামারি করতে বেরিয়েছে।
এই মুখোমুখি হওয়াটা আহমদ মুসার কাছে অপ্রত্যাশিত ছিল, তেমনি লোকটিও ভূত দেখার মত চমকে উঠেছিল আহমদ মুসাকে দেখে।
কিন্তু তা মুহূর্তের জন্যেই। মুহূর্তেই বিমর্ষ ভাব উবে গিয়ে জ্বলে উঠল তার চোখ-মুখ। নেকড়ের মত সে ঝাঁপিয়ে পড়ল আহমদ মুসার উপর।
আহমদ মুসা এর জন্যে প্রস্তুত ছিল না। এই অস্বাভাবিক ক্ষিপ্রতা তার কাছ থেকে আহমদ মুসা কল্পনাও করেনি। বিস্মিত হলো আহমদ মুসা, অকল্পনীয়ভাবে শত্রুর মুখোমুখি হবার চরম বিমূঢ় ভাব কাটিয়ে কেউ এত দ্রুত আক্রমণে যেতে পারে! এই শত্রুর ব্যাপারে তার অবমূল্যায়ন হয়েছে।
এসব চিন্তা নিয়েই আহমদ মুসাকে ভূমি শয্যা নিতে হলো। আত্মরক্ষার কোনই সুযোগ নিতে পারল না সে। লোকটি তার বুকের উপর চেপে দু’হাত দিয়ে শাঁড়াসির মত টিপে ধরেছে তার গলা।
ঝিম ঝিম করে উঠল আহমদ মুসার মাথা। বুঝতে পারল সে, মাথায় অক্সিজেন সাপ্লাই হচ্ছে না। তার মানে শ্বাস বন্ধ হয়ে গেছে তার।
দুই হাত দিয়ে গলা থেকে লোকটির দু’হাত খুলে ফেলার মত যথেষ্ট শক্তি সে হাত দুটিতে পাচ্ছে না।
আবার বেকায়দা অবস্থার জন্যে দু’হাত দিয়ে তার গলা টিপে ধরার সুযোগও সে করতে পারছে না।
পা দুটি তার মুক্ত আছে।
পা দুটি উপরে ছুঁড়ে লোকটিকে বুক থেকে ছিটকে ফেলার দু’একবার চেষ্টা করল, কিন্তু লোকটিকে বুক থেকে নড়ানো গেল না।
নিঃশ্বাস বন্ধ হওয়ায় বুকে চাপ বাড়ছে আহমদ মুসার। অসহনীয় অবস্থার দিকে যাচ্ছে সে।
মরিয়া হয়ে আহমদ মুসা হাঁটু ভাঁজ করে দু’পা মাটির উপর খুঁটির মত দাঁড় করিয়ে সমস্ত শক্তি দু’পায়ের উপর কেন্দ্রীভূত করে প্রবল এক ঝাঁকুনি দিয়ে কোমরটাকে উপরে ছুঁড়ে দিল।
এতে কাজ হলো।
লোকটা নড়ে উঠল। কিছুটা ছিটকে সে সামনের দিকে সরে এসেছিল।
আহমদ মুসার পা দুটি এবার এর সুযোগ গ্রহণ করাল। পা দুটি তার ছিটকে উঠে দেহটাকে উল্টে দিয়ে পিছনে গিয়ে পড়ল।
লোকটির হাত দুটি খসে গেল গলা থেকে। পাশেই গড়িয়ে পড়ল লোকটি।
বুক ভরে শ্বাস নিয়ে স্প্রিং এর মত উঠে দাঁড়াল আহমদ মুসা।
লোকটিও উঠে দাঁড়িয়েছে।
জ্যাকেটের পকেটে হাত ঢুকাচ্ছিল সে।
আহমদ মুসা তার ডান পা’টা তীব্র গতিতে ছুঁড়ে দিল লোকটির ডান পা লক্ষ্যে।
লোকটি বাঁ দিকে কাত হয়ে পড়ে গেল মাটিতে, অনেকটা আহমদ মুসার দিকে মুখ করে।
আহমদ মুসার ডান পা ততক্ষণে আবার প্রস্তুত হয়েছে। এবার ডান পায়ের লাথি চালাল সে লোকটির তলপেট লক্ষ্যে।
কুঁকড়ে গেল লোকটির দেহ। তার কুঁকড়ে যাওয়া দেহের উন্মুক্ত ঘাড়ের উপর কানের পাশ লক্ষ্যে আরও একটা কারাত চালাল আহমদ মুসা।
সংজ্ঞা হারাল লোকটি।
এ লোকটিকে আগের লোকটির পাশে টেনে এনে তাদের জামা ছিড়ে পিছমোড়া করে তাদের হাত-পা বেঁধে ফেলল। কিছুটা মুখে পুরে চিৎকারের পথ বন্ধ করে রাখল।
ঘর থেকে বেরিয়ে এল আহমদ মুসা।
রিভলবার সমেত হাত পকেটে পুরে এগুলো সামনে। করিডোরটি শেষ হয়েছে বিশাল লেগাকার লাউঞ্জে। লাউঞ্জটি ফাঁকা। এটি সম্ভবত সম্মেলন, সমাবেশসহ নানা কাজে ব্যবহৃত হয়। লাউঞ্জটির চারদিক ঘিরে ঘরের সারি। থামের লেগাকার সারি রয়েছে হল ঘরটির চারদিক ঘিরে।
কোন দিকে যাবে আহমদ মুসা? সন্দেহ নেই এখানেই বন্দী রয়েছে আহমদ হাত্তা। কিন্তু কোথায়? উপরের দুটি ফ্লোরের কোথাও?
উপরে উঠার সিঁড়ি কোথায়?
এ সময় একটা নারী কণ্ঠ ভেসে এল আহমদ মুসার কানেঃ ‘ক্রিস্টিনা আসছ না কেন? এস। আমি যাচ্ছি।’
নারী কণ্ঠটি উপর থেকে নিচে নেমে আসার মত শোনাল।
আহমদ মুসা যেখানে দাঁড়িয়ে আছে তার বিপরীত দিকে অর্থাৎ লাউঞ্জটির পশ্চিম দিকের ঘর থেকে এই কণ্ঠ ভেসে এল। তার মানে ওখানেই কোথাও উপরে ওঠার সিঁড়ি।
কিন্তু ব্যাপারটা বিদ্ঘুটে লাগল আহমদ মুসার কাছে। অফিসের প্রবেশ পথ থেকে অত দূরে উপরে উঠার সিঁড়ি হতে পারে না।
আবার ভাবল আহমদ মুসা, এদিকেও আরেকটা সিঁড়ি থাকতে পারে। হয়তো সিঁড়ি ঘরে দরজা বন্ধ থাকার জন্যে তার চোখে পড়ছে না।
যে নারী কণ্ঠটি কথা বলল, সে কি বেরিয়ে আসছে? তাহলে তো এখনি লাউঞ্জে বেরিয়ে পড়বে।
একটা থামের আড়ালে লুকালো আহমদ মুসা। বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল। না, কেউ বেরিয়ে এল না।
মেয়েটি তাহলে গেল কোথায়?
চিন্তায় পড়ে গেল আহমদ মুসা।
থামের আড়াল থেকে বেরিয়ে আহমদ মুসা বন্ধ দরজারগুলোর সামনে দিয়ে ধীরে ধীরে এগুলো পশ্চিম দিকে। সহজে কারো চোখে পড়ে যেতে না হয় এজন্যে সে লাউঞ্জের মধ্যে দিয়ে সোজা যাওয়ার পথ পরিহার করেছে।
যে দরজার দিক থেকে নারী কণ্ঠের আওয়াজ সে পেয়েছিল, সে দরজার সামনে গিয়ে সে দাঁড়াল।
আহমদ মুসা আনন্দিত হলো যে, দরজাটা অন্যান্য দরজা থেকে চওড়া। তার মানে এটা সিঁড়ি ঘরের দরজা হবারই কথা।
আস্তে করে দরজায় চাপ দিল আহমদ মুসা।
আহমদ মুসাকে বিস্মিত করে দিয়ে প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই এক ঝটকায় দরজা খুলে গেল।
আহমদ মুসা দেখল, কোন নারীর বদলে তার সামনে একজন যুবক। তার হাতে রিভলবার। তার রিভলবারের নল আহমদ মুসার নাক বরাবর তোলা।
এ যুবকটির পরনেও সেই জিন্সের প্যান্ট। তবে গায়ে গোল গলার হাতাওয়ালা পুরু গেঞ্জি।
ফাঁক হওয়া দরজা আকস্মিকভাবে খুলে যেতে দেখেই কি ঘটতে যাচ্ছে আহমদ মুসা বুঝতে পেরেছিল। যে কোন পরিস্থিতির জন্যে সে প্রস্তুত হয়েছিল।
তার নাক বরাবর উদ্যত রিভলবার দেখে বিন্দুমাত্র চিত্ত চাঞ্চল্য ঘটেনি আহমদ মুসার। সে জানে এই পরিস্থিতিতে তার পরিচয় না জেনে কিংবা কথা না বলে গুলী করবে না লোকটি। এরই সুযোগ গ্রহণ করল আহমদ মুসা।
দরজা খুলে যাওয়া এবং রিভলবারের নল তার দিকে তাক করা এটা দেখার সাথে সাথে আহমদ মুসার মাথা তড়িত গতিতে নিচু হলো এবং পা দুটি তার ছুটল সামনে। মনে হবে আহমদ মুসা অবস্থার আকস্মিকতায় ভয়ে ভীমরি খেয়ে চিৎপটাং হয়েছে। হয়তো যুবকটিও তাই মনে করেছিল। দেখা গেল তার রিভলবারের নল কয়েক মুহূর্ত পর্যন্ত স্থির ছিল।
কিন্তু যখন বিপদ আঁচ করতে পারল, আহমদ মুসার তীরের মত ছুটে যাওয়া পা দুটি তখন তার দুই পায়ে তীব্র গতিতে আঘাত করেছে। সে হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেল।
যুবকটি পড়ে যেতেই আহমদ মুসা পাশ ফিরে উঠে বসল এবং ডান হাতের কুনই দিয়ে প্রচণ্ড আঘাত হানল লোকটির ঘাড়ে। তার হাত থেকে কেড়ে নিল রিভলবার। রিভলবারের বাঁট দিয়ে আরেকটা প্রচণ্ড আঘাত করল যুবকটির মাথায়।
ঘাড়ের আঘাতেই যুবকটি নিস্তেজ হয়ে পড়েছিল। মাথায় ঘা খেয়ে সে সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলল।
যুবকটিকে আহমদ মুসা টেনে নিয়ে গেল সিঁড়ির নিচে। সেখানে একটা প্যাকিং বাক্সের সাথে প্লাস্টিক কর্ড পেল। যুবকটির পা সহ হাত পিছ মোড়া করে বাঁধল এবং গায়ের গেঞ্জি ছিঁড়ে তার মুখে ঢুকিয়ে দিল।
উঠে দাঁড়াল আহমদ মুসা। আল্লাহ্‌র শুকরিয়া আদায় করল সে। এখনও রিভলবার ব্যবহার করতে হয়নি, নিরবেই তিন জনকে নিস্ক্রিয় করা গেছে।
সিঁড়ির গোড়ায় এসে আহমদ মুসা উপর দিকে তাকাল। এ সময় আহমদ মুসার আবার মনে পড়ল নারী কণ্ঠের কথা। আহমদ মুসার নিশ্চিত বিশ্বাস মেয়েটি দু’তলা থেকে নামতে নামতে কথা বলেছে।
কিন্তু এক তলায় নেমে ‘আমি যাচ্ছি’ বলে মেয়েটি গেল কোথায়? সিঁড়ি ঘর থেকে না বেরিয়ে নিচ তলার আর কোন ঘরে যাবার তার উপায় নেই।
হঠাৎ আহমদ মুসার নজরে পড়ল অস্বাভাবিক অবস্থানে একটা দরজা।
দু’তলা থেকে আসা সিঁড়ির দেয়াল ল্যান্ডিং-এর বাউন্ডারী ওয়াল হয়ে ঘরের দেয়ালের সাথে গিয়ে মেশার কথা। সিঁড়িঘরের গঠনও এই কথাই বলে। কিন্তু এখানে একতলার ল্যান্ডিংটা ডানদিকে প্রায় ৪ ফুট পরিমাণ বেড়ে গেছে। এই বাড়তি ল্যান্ডিং-এর মুখোমুখি সিঁড়ির দেয়ালের সাথে লাগানো একটা দরজা। এই বিদ্ঘুটে দরজার অর্থ খুঁজে পেল না আহমদ মুসা।
দরজার দিকে এগুলো সে।
দরজার দুই পাল্লায় টানা বা ঠেলার হাতল। দরজার একটা পাল্লায় চাবি প্রবেশ করানোর ছিদ্র দেখে বুঝা যাচ্ছে দরজায় বডিলক।
আহমদ মুসা দুই দরজার দুই হুক হাত দিয়ে ধরে টান দিল। সঙ্গে সঙ্গে খুলে গেল দরজা।
খোলা দরজা দিয়ে সামনে তাকিয়ে বিস্ময়ে হা হয়ে গেল তার মুখ। দেখল, দরজার পর ছোট্ট একটা স্ট্যান্ডিং। তারপর নিচের দিকে একটা সিঁড়ি নেমে গেছে।
বিস্ময়ের ঘোর কেটে গেলে আনন্দে ভরে গেল আহমদ মুসার মন। এই সিঁড়ির অর্থ নিচে আন্ডার গ্রাউন্ড ফ্লোর রয়েছে এবং নিঃসন্দেহ যে, এই বিল্ডিং-এ যদি আহমদ হাত্তা বন্দী থাকে, তাহলে এই আন্ডার ফ্লোরেই রয়েছে। আর ‘আমি যাচ্ছি’ বলে মেয়েটি কোথায় গেছে, তাও এই সিঁড়িটাই বলে দিচ্ছে।
মেয়েটির ব্যাপারে আরেকটা প্রশ্নের সে সমাধান পাচ্ছে না। ‘কিনিক কোবরা’র কথা মাফিয়ারা তাদের পিতা, মাতা, স্ত্রীকেও বলে না, তাদের ঘাঁটি দেখায় না। তাহলে এই মেয়েটা এখানে এল কোত্থেকে। মেয়াটাও কি তাহলে একজন মাফিয়া সদস্য।
আহমদ মুসা দরজা পার হয়ে সিঁড়ির স্ট্যান্ডিং-এ গিয়ে দাঁড়াল এবং সিঁড়ি মুখের দরজাটা বন্ধ করে দিল।
সিঁড়ির দরজা বন্ধ করতেই সিঁড়িতে আলো জ্বলে উঠল। সিঁড়ির আল-অন্ধকার তাহলে সিঁড়ির দরজা খোলা বন্ধ করার সাথে সম্পর্কিত বুঝল আহমদ মুসা।
সিঁড়ির দরজা কি সিঁড়ির আলোর সাথেই শুধু সম্পর্কিত? কোন এলার্ম এর সাথে সম্পর্কিত থাকতে পারে না? থাকতে পারাটাই স্বাভাবিক। যদি তাই থাকে, তাহলে এখিনি কেউ ছুটে আসবে।
আহমদ মুসা দুই পকেট থেকে দুই রিভলবার দু’হাতে তুলে নিয়ে অপেক্ষা করতে লাগল।
পল পল করে সময় বয়ে চলল।
দু’মিনিট পার হয়ে গেল কেউ এল না।
আহমদ মুসা নিশ্চিন্ত হলো যে, এলার্ম বেল নেই। তারপর দরজা খুলে রাখল। সিঁড়ি অন্ধকার হলে ক্ষতি নেই। অন্ধকারই তার প্রয়োজন। দরজা খোলা রেখেই অন্ধকার সিঁড়ি দিয়ে অতি সন্তর্পণে নামা শুরু করল।
সিঁড়ির অর্ধেকটা নামতেই চিৎকারের শব্দ তার কানে এল।
উৎকর্ণ হলো আহমদ মুসা। মনে হচ্ছে চিৎকারটি আহমদ হাত্তার।
সিঁড়ি দিয়ে দ্রুত নামতে লাগল আহমদ মুসা। যখন সিঁড়ির গোড়ায় নামল, তখন চিৎকারটা বন্ধ হয়ে গেল।
চিৎকারটা কোন দিক থেকে এসেছিল, তা ঠিক করার চেষ্টা করল। কিন্তু পারল না।
সিঁড়ি থেকে যেখানে নামল সেটাও একটা লাউঞ্জের মত। সম্ভবত এই আন্ডার গ্রাউন্ড ফ্লোর বিপদকালীন আশ্রয় কেন্দ্র হিসেবে তৈরি হয়েছিল, অনুমান করল আহমদ মুসা।
আহমদ মুসা চারদিকে তাকাল। দেখল, লাউঞ্জ থেকে অনেকগুলো করিডোর বিভিন্ন দিকে চলে গেছে। দেখে আহমদ মুসার মনে হলো আন্ডার গ্রাউন্ড ফ্লোরে অনেক কক্ষ রয়েছে।
এক মিনিটও হয়নি আবার শুরু হলো সেই চিৎকার।
আহমদ মুসা তখনও সিঁড়ির গোড়ায় দাঁড়িয়ে। এবার আহমদ মুসা নিশ্চিত হলো, বাঁ দিকের কোন ঘর থেকে আহমদ হাত্তার এই চিৎকার আসছে।
আহমদ মুসা ছুটল সেদিকে।
লাউঞ্জ থেকে করিডোরে প্রবেশ করল আহমদ মুসা। শিকারের পেছনে ধাওয়া করা নেকড়ের মত নিঃশব্দে ছুটছে সে। অনেক ঘর, আড়াআড়ি অনেক করিডোর পার হলো সে। অবশেষে একটা দরজায় এসে করিডোরটা শেষ হলো। এই ঘর থেকেই চিৎকারের শব্দ আসছে।
আহমদ হাত্তাকে নির্যাতন করছে, এটা সে বুঝতে পারছে। কি নির্যাতন করা হচ্ছে তাকে? এমন বুক ফাটা চিৎকার করছে কেন?
করিডোরের শেষ প্রান্তে ঘরটির দরজায় এসে যখন সে পৌঁছেছে, তখন আবার চিৎকার থেমে গেল।
আহমদ মুসাও একটু থমকে দাঁড়াল দরজায়। আন্ডার গ্রাউন্ডে নামার পর কোন বাধা সে এখনও পায়নি। আন্ডার গ্রাউন্ডের প্রবেশ পথ ও হল ঘর এলাকায় কোন প্রহরী তারা রাখেনি। বুঝা যাচ্ছে বাইরে তিনজনকে পাহারায় রেখেই তারা নিশ্চিত হয়েছে। তবে ঘরের ভেতর নিশ্চয় লোক আছে। সুতরাং ঢুকতে হলে হিসেব করেই ঢুকতে হবে।
আবার চিৎকার শুরু হলো আহমদ হাত্তার।
চঞ্চল হয়ে উঠল আহমদ মুসা।
হিসেব করার সময় নেই।
আহমদ মুসা দুই হাতে দুই রিভলবার নিয়ে ডান হাতের রিভলবারের নল দিয়েই দরজা ঠেলা দিল।
দরজা খুলে গেল। বেশ বড় একটা হল ঘর।
বাঁধা অবস্থায় একটা চেয়ারে বসে আছে আহমদ হাত্তা। দেখেই বুঝল আহমদ মুসা, আহমদ হাত্তাকে ইলেকট্রিক শক দেয়া হচ্ছে।
আহমদ হাত্তার একটু দূরে একজন লোককে দেখতে পেল আহমদ মুসা। তার দুই হাতের মুঠো থেকে দুটি বৈদ্যুতিক তার বেরিয়ে আসা দেখেই বুঝল তার হাতে বৈদ্যুতিক সুইচ। জ্বলে উঠল আহমদ মুসার শরীর। চিন্তা করার জন্যে আর অপেক্ষা সে করতে পারল না। গর্জে উঠল তার ডান হাতের রিভলবার। গুলী গিয়ে বিদ্ধ করল সুইচ ধরা লোকটার দুই হাতকে এক সাথে।
লোকটিও আহমদ মুসাকে দেখতে পেয়েছিল। কিন্তু কিছু ভাবার আগেই মুঠোবদ্ধ দুই হাতে গুলী খেয়ে আর্তনাদ করে বসে পড়ল।
আহমদ হাত্তার চেয়ারের সাথে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। চিৎকার বন্ধ হয়ে গেছে আহমদ হাত্তার।
আহমদ মুসা ছুটল আহমদ হাত্তার কাছে।
ভীষণ ক্লান্তিতে আহমদ হাত্তা ধুঁকছিল। তার দুই চোখ বন্ধ।
‘মি. হাত্তা আমি এসেছি। আর ভয় নেই।’ এই কথাগুলো বলতে বলতে আহমদ মুসা ডান হাতের রিভলবার পকেটে পুরে বাম হাতের রিভলবারকে পাহারায় রেখে ডান হাতে আহমদ হাত্তার বাঁধন খুলছিল।
আহমদ মুসার কথা শুনে চোখ খুলল আহমদ হাত্তা। বলল, ‘আমি জানতাম আল্লাহ আপনাকে পাঠাবেন। তাই ওদের শত নিপীড়ন সত্ত্বেও ওদের কাছে নতি স্বীকার করিনি। ধৈর্য্য ধরে অপেক্ষা করছিলাম। আল হামদুলিল্লাহ। আল্লাহরই সব প্রশংসা।’
‘আপনাকে মেরে ফেলা বা বন্দী রাখার কথা নির্বাচন পর্যন্ত, নির্যাতন করবে কেন!’ বাঁধন খুলতে খুলতেই বলল আহমদ মুসা।
‘ওরা আমাকে নির্যাতন করছিল আপনার পরিচয় জানার জন্যে। আপনার পরিচয় জানা পর্যন্ত ওরা আমার হত্যা স্থগিত রেখেছিল এবং মৃত্যুর চেয়েও ভয়াবহ যন্ত্রণা দিচ্ছিল আমার মুখ খোলার জন্যে। ওদের আসল নেতা লোকটা এখন নেই। চলে গেল এই মিনিট খানেক আগে। একেবারে ঠান্ডা মাথার লোকটা।’ বলল আহমদ হাত্তা।
বাঁধন খোলা হয়ে গেছে আহমদ হাত্তার। ঠিক এই সময় ঘরের দুই প্রান্তের দুই দরজা দিয়ে গুলী করতে করতে দুই গ্রুপকে আসতে দেখল আহমদ মুসা। আহমদ হাত্তাকে চেয়ার সমেত ধাক্কা দিয়ে ওদিকে ফেলে দিয়ে নিজে শুয়ে পড়ল এবং সেই সাথে শোল্ডার হোলস্টার থেকে এম-১০ বের করে নিল। শুয়ে থেকেই আহমদ মুসা গুলী করতে লাগল একবার এ দরজায়, আরেকবার ওই দরজায়। যারা গুলী করতে করতে আসছিল তারা দরজার আড়ালে পিছিয়ে গেছে। আড়াল থেকেই দু’একটা গুলী করছে।
এ সময় দরজার দিক থেকেই দুটি বোমা এসে সশব্দে বিস্ফোরিত হলো ঘরের মাঝখানে।
মুহূর্তে কাল অন্ধকারে ঢেকে গেল গোটা ঘর। আহমদ মুসা বুঝতে পারল ওদের চালাকি। সে একবার এ দরজায় আবার ওই দরজায় গুলী বৃষ্টি অব্যাহত রাখল।
কিন্তু ওদিক থেকে কোন গুলীর শব্দ এল না। মিনিটেরও বেশি পার হয়ে গেল। হঠাৎ আহমদ মুসার খেয়াল হলো, ঘরটিতে মাত্র ঐ দুটি দরজাই নয়, আরও দুটি দরজা রয়েছে। নিশ্চয় ওই দরজা পথে ওরা এতক্ষণ আহমদ হাত্তাকে নিয়ে গেছে।
উঠে দাঁড়াল আহমদ মুসা।
এ সময় আহমদ মুসা যে দরজা দিয়ে ঢুকেছিল তার বিপরীত দিকের দরজার দিক থেকে একটা শব্দ ভেসে এল, ‘দেখো এ লোকটিও যেন পালাতে না পারে।’ ধীর ঠাণ্ডা কণ্ঠস্বর লোকটির।
‘এই উত্তেজনাকর মুহূর্তে এত ঠান্ডা কণ্ঠস্বর! এই কি ‘কিনিক কোবরা’র নেতা, আহমদ হাত্তার কথায় যে ‘ঠান্ডা শয়তান!’ ভাবল আহমদ মুসা। ভাবার সাথে সাথে ধোঁয়ার অন্ধকার ঠেলে আহমদ মুসা ছুটল ঐ দরজার দিকে, ঐ শব্দে লক্ষ্যে।’
দরজার ওপাশে ধোঁয়া অনেক পাতলা। আহমদ মুসা দেখল ইংলিশ পোশাক পরা সুবেশধারী একজন লোক রাজার মত হেঁটে এগিয়ে যাচ্ছে।
আহমদ মুসার মনে কোন সন্দেহ রইল না, এই সেই ঠান্ডা গলায় কথা বলা লোক, মানে ‘কিনিক কোবরা’র নেতা।
আহমদ মুসা তার পিছু নিল। সে নিশ্চিত যে, আহমদ হাত্তাকে যেখানে নিয়ে গেছে, কিনিক কোবরা’র নেতাও নিশ্চয় সেখানে যাচ্ছে।
আহমদ মুসা ওপারের করিডোর দিয়ে আসার সময় যা দেখেছে, এখানেও তাই দেখল। দু’পাশে কক্ষের সারি। মনে হয় সিভিল ডিফেন্সের লোকরা কক্ষগুলোকে স্টোর হিসেবে ব্যবহার করেছে।
লোকটি একই গতিতে চলছে। আহমদ মুসা অনেক খানি দূরত্ব বজায় রেখে বিড়ালের মত নিঃশব্দে তার পিছু পিছু যাচ্ছে।
এক সময় লোকটি ডান দিকে মোড় নিয়ে রুট পরিবর্তন করল।
ডানে ঘোরার সময়ও লোকটি পেছন ফিরে তাকাল না। হাঁটার গতি চোখের ডাইরেকশন একই রেখে শুধু রাইট টার্ন করে একই গতিতে হেঁটে চলল।
লোকটি রোবট নাকি, ভাবল আহমদ মুসা। রোবটই এভাবে পথ চলে, কোন জ্যান্ত মানুষ এভাবে চলার কথা নয়।
রাইট টার্নের পর করিডোর দিয়ে কিছু দূর এগিয়ে গিয়ে বাঁ দিকে আবার টার্ন নিল আগের সেই একই ভঙ্গিতে।
এবার এ করিডোর ধরে এগিয়ে চলল লোকটি।
অনেক খানি দূরত্ব রেখে আহমদ মুসা তাকে অনুসরণ করছে।
এ করিডোরটি একটা দরজায় গিয়ে শেষ হয়েছে।
লোকটি দরজার মুখোমুখি হয়েই বাম হাত তুলে বাম পাশের চৌকাঠ স্পর্শ করল। সঙ্গে সঙ্গে দরজার দুই পাল্লা খুলে দেয়ালের ভেতরে ঢুকে গেল।
আহমদ মুসা বুঝল, দরজাটা নিয়ন্ত্রিত।
লোকটি ঘরে ঢুকে গেল।
কিন্তু দরজা বন্ধ হলো না। লোকটা দরজা বন্ধ করল না।
আহমদ মুসা কাছাকাছি হয়েছে দরজার।
দরজা বরাবর ঘরের ভেতরে ওপ্রান্তে দুটি সোফা নজরে পড়ল আহমদ মুসার। সোফার পেছনে দেখতে পেল একটি দরজা। লোকটা ঘরে ঢুকে সোফা সামনে রেখে দাঁড়িয়ে এ দিকে পেছন ফিরে সিগারেট ধরাচ্ছে। সিগারেট ধরানো শেষ হলে লোকটি লাইটার রাখার জন্যে পকেটে হাত রাখল।
আহমদ মুসা তখন দরজায় পৌঁছে গিয়েছিলো। ঘরে না ঢুকে দরজায় থমকে দাঁড়াল সে।
আহমদ মুসা দরজায় থমকে দাঁড়াতেই লোকটি হা হা করে একটা ঠান্ডা হাসি দিয়ে উঠল।
এই হাসির সঙ্গে সঙ্গেই দরজার পাল্লা দেয়ালের ভেতর থেকে বেরিয়ে এল বিদ্যুৎ গতিতে এবং দরজার পাল্লার ভেতর থেকে বেরিয়ে এল চারটি রোবট হাত। আহমদ মুসা কিছু বুঝে উঠার আগেই দরজা এসে দু’দিক থেকে তাকে চেপে ধরল এবং চারটি রোবট হাত তাকে অক্টোপাসের মত জড়িয়ে ফেলল।
দরজার পাল্লা দুটিকে তার দিকে আসতে দেখে আহমদ মুসা হাত দুটি তুলেছিল বাঁধা দেয়ার জন্যে। তার ফলে দুই হাত তার আটকে পড়া থেকে বেঁচে গেল।
আহমদ মুসা হাত দুটি আটকে পড়া থেকে বেঁচে যাওয়ার কারণে লোকটির হাসি বন্ধ হয়ে গেল। হাসি বন্ধ করেই ঘুরে দাঁড়াল লোকটি।
লোকটির উপর চোখ পড়তেই আহমদ মুসা বুঝল, সে মায়া জাতি-গোষ্ঠী বা মায়া-মেস্টিগো মিশ্রণ জাতি-গোষ্ঠীর কেউ হবে লোকটা।
ঠান্ডা হাসি শুনে তাকে যতটা বীভৎস ক্রিমিনাল মনে করেছিল আহমদ মুসার, ততটা বীভৎস সে নয়। তার মুখের পাপের চিহ্নগুলো বাদ দিলে তার মুখের পরিচ্ছন্ন কাঠামোই বেরিয়ে আসে। তবে তার চোখের দৃষ্টি ও মুখের ভাব দেখে তাকে একজন খুব ঠান্ডা মাথার ক্রিমিনাল বলে মনে হয়।
ঘুরে দাঁড়িয়ে আহমদ মুসার উপর চোখ ফেলেই লোকটি বলে উঠল, ‘ও তুমি বিদেশী। তাইতো আহমদ হাত্তাকে উদ্ধারের জন্যে বোকার মত এখানে আসতে পেরেছ।’ ঠান্ডা গলা লোকটির।
‘তুমিও তো বিদেশী। তুমি আহমদ হাত্তাকে কিডন্যাপ করেছ কোন স্বার্থে কোন সাহসে?’ বলল আহমদ মুসা শান্ত ও নিরুদ্বিগ্ন কণ্ঠে।
‘তোমার দেখছি ভয়ও নেই। মনে হচ্ছে তোমার বৈঠকখানায় বসে তুমি আমাকে শাসন করছ! কে তুমি?’
‘আমারও ঐ একই প্রশ্ন, কে তুমি আহমদ হাত্তাকে কিডন্যাপ করেছ?’ বলল আহমদ মুসা।
‘দেখ আমি সাহস পছন্দ করি, কিন্তু বেয়াদবি সহ্য করতে পারি না।
তোমাকে এভাবে না আটকে গুলী করে মারতে পারতাম। কিন্তু মারিনি, তুমি কে তা জানার আগ্রহ জেগেছে। তুমি যে কায়দায় আমার তিনজন লোককে কুপোকাত করেছ, সে রকম যোগ্যতার লোক আমেরিকায় আছে বলে আমার বিশ্বাস হয়নি। আমার বিশ্বাসই ঠিক। তুমি নন আমেরিকান। দেখ, আমি তিন পর্যন্ত গুনব, এর মধ্যে তুমি কে, কোন দেশের লোক না বললে আমি তোমাকে গুলী করে মারব।’ বলল লোকটি খুব শান্ত কণ্ঠে।
‘যদি বলি, তাহলে তুমি কি করবে?’ হেসে বলল আহমদ মুসা।
‘আশ্চর্য! তুমি হাসছ? পাগল নাকি তুমি?’ লোকটি বলল।
‘হাসছি তোমার ভাব দেখে। মনে হচ্ছে জীবন এবং মৃত্যু দুটোরই মালিক তুমি।’ বলল আহমদ মুসা।
‘অবশ্যই, আমার রিভলবারের আজকের প্রথম বুলেটে তোমার মৃত্যু, সে বুলেট না ছুড়লেই তোমার জীবন।’ বলল লোকটি।
‘তুমি কেন দুনিয়ার কোন মানুষ একথা বলতে পারেনা। মানুষ তার ভবিষ্যতের এক ইঞ্চিও দেখতে পায় না।’ আহমদ মুসা বলল।
‘এখনই তা প্রমাণ হবে। আমি গুণতে শুরু করছি তিন পর্যন্ত।’
বলেই লোকটি গুণা শুরু করল, এক………
জীবন-মৃত্যু লোকটির হাতে নেই এটা আহমদ মুসার দৃঢ় বিশ্বাস। তবে সে যে গুলী করতে চেয়েছে, এ কথায় সে অবিশ্বাস করেনি।
আহমদ মুসার চিন্তা ঘুরছিল শত মাইল বেগে।
হঠাৎ আহমদ মুসার মনে হলো, এ দরজারটি সুইচ টিপে এবং দূর নিয়ন্ত্রণ দুভাবেই ব্যবহার করা যায়। লোকটাও দু’পন্থাই ব্যবহার করেছে।
মনে হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আহমদ মুসা বাম হাতটা কোনভাবে দরজার বাঁ পাল্লাটার বাইরে টেনে নিয়ে বাঁ চৌকাঠের কোণায় অবস্থিত বোতাম হাতড়িয়ে বের করে নিয়ে টিপে দিল।
লোকটা তখন গুনছিল, দুই……
আহমদ মুসা কি করছে সে তা খেয়াল করেনি।
সুইচ টিপতেই চোখের নিমিষে দরজার রোবট হাতসহ দরজার পাল্লা দুটি দেয়ালের মধ্যে ঢুকে গেল।
চোখের সামনে ঘটা অভাবিত ঘটনা বোধ হয় বুঝার চেষ্টা করছিল লোকটি।
কিন্তু আহমদ মুসা এক মুহূর্তও নষ্ট করেনি।
দরজার ফাঁকে পড়া তার দু’হাত উপরে তোলাই ছিল। দরজা সরে যেতেই আহমদ মুসা দু’হাত মেঝের উপর ছুঁড়ে দিয়ে পা দুটি শূন্যে তুলে বৃত্তাকারে তা চালিয়ে দিল লোকটাকে লক্ষ্য করে।
আহমদ মুসার দু’পা গিয়ে আঘাত করল লোকটির বুকে। লোকটি ছিটকে পড়ে গেল সোফার উপর। আর আহমদ মুসা চিৎ হয়ে পড়ে গেল মেঝের উপর। আহমদ মুসা পড়ে গিয়েই দক্ষ এ্যাক্রোব্যাটের মত দেহকে উপরে ছুঁড়ে দিয়ে উঠে দাঁড়াল। সেই সাথে পকেট থেকে রিভলবারটাও তার হাতে উঠে এসেছে।
লোকটি সোফায় পড়েই সোজা হয়ে বসেছে। তার হাতও পকেট থেকে বের হচ্ছিল। হাতে রিভলবার।
‘হাত যেভাবে আছে, সেভাবেই রাখ। তোলার চেষ্টা করো না, মাথার খুলি উড়ে যাবে।’
শান্ত, কিন্তু কঠোর কণ্ঠে বলল আহমদ মুসা রিভলবার লোকটার দিকে তাক করে।
এই সময় আকস্মিকভাবে একটি বালিকা ‘মাম্মি’ ‘মাম্মি’ বলে ডাকতে ডাকতে লোকটির পেছনের দরজা দিয়ে ছুটে ঘরে প্রবেশ করল এবং উদ্যত রিভলবার হাতে দাঁড়ানো আহমদ মুসার উপর চোখ পড়তেই থমকে দাঁড়াল। ততক্ষণে সে লোকটির পাশে পৌঁছে গিয়েছিল।
লোকটি চোখের পলকেই মেয়েটিকে সামনে নিয়ে রিভলবার তুলল আহমদ মুসার দিকে। হেসে উঠল। বলল, ‘রিভলবার ফেলে দাও তুমি। না হলে তোমার মাথাই ছাতু হয়ে যাবে।’
মেয়েটি আট নয় বছরের। সুন্দর ফুট-ফুটে নিষ্পাপ চেহারা। কিন্তু আতংকে বিস্ফারিত দুই চোখ।
মুশকিলে পড়ে গেল আহমদ মুসা।
মেয়েটিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছে লোকটি। লোকটিকে গুলী করতে গেলে মেয়েটিই হয়তো প্রথম বলি হবে তার বুলেটের।
পারল না আহমদ মুসা গুলী করতে।
এ সময় ঘরের পাশের আরেক দরজা দিয়ে একটি মেয়ে ছুটে এসে প্রবেশ করল ঘরে। চিৎকার করে বলে উঠল, ‘জোয়াও, তোমাদের লড়াইতে আমার মেয়েটিকে গিনিপিগ বানিও না। ছেড়ে দাও তাকে।’
আটাশ উনত্রিশ বছরের মেয়েটি খুবই সুন্দরী। কিন্তু মায়া বা মেস্টিগো চেহারা নয়। কিছুটা সুরিনামীয়, কিছুটা আবার এশীয়।
লোকটি মেয়েটির কথায় কর্ণপাত করল না। আবার বলে উঠল, ‘তুমি সুযোগ হারিয়েছ। মেয়েটিকে মারতে পারোনি। অতএব আমাকেও আর মারতে পারবে না। ফেলে দাও রিভলবার।’ শান্ত, ঠান্ডা এবং কতকটা কৌতুকপূর্ণ কণ্ঠ তার।
সত্যিই মেয়েটিকে সে যেভাবে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছে তাতে মেয়েটিকে না মেরে লোকটিকে আঘাত করার সিদ্ধান্ত নেয়া যায় না। এই অবস্থায় আহমদ মুসাই এখন অরক্ষিত হয়ে পড়েছে। লোকটি তাকে রিভলবার ফেলে দিতে না বলে গুলীও করতে পারতো। সম্ভবত আহমদ হাত্তার মত তাকেও লোকটি বাঁচিয়ে রাখতে চায়। ভাবল আহমদ মুসা। পরক্ষণেই আবার প্রশ্ন জাগল, কেন বাঁচিয়ে রাখতে চায়? হতে পারে, আহমদ হাত্তার শিখ ড্রাইভারের পরিচয় উদ্ধারের যে প্রয়োজনে আহমদ হাত্তাকে এতক্ষণ বাঁচিয়ে রেখেছে, সেই একই প্রয়োজনে হয়তো তাকে বাঁচিয়ে রাখতে চায়।
অবশেষে আহমদ মুসা সিদ্ধান্ত নিল, হাতের রিভলবার ফেলে না দিয়ে তার উপায় নেই। তাছাড়া পকেটে রিভলবার তার আরও আছে। পরবর্তী কোন সুযোগের অপেক্ষা তাকে করতে হবে।
আহমদ মুসা হাতের রিভলবার ফেলে দিতে দিতে বলল, ‘তোমার পরিচয় কি আমি জানি না। কিন্তু একজন শিশুকে ঢাল বানানোর চেয়ে বড় কাপুরুষতা আর নেই।’
লোকটির মুখে এক টুকরো নিরুত্তাপ হাসি দেখা দিল।
ঠিক এই সময়ে যে পথ দিয়ে আহমদ মুসা প্রবেশ করেছিল ঘরে, সে পথ দিয়ে দুজন লোক হন্তদন্ত হয়ে প্রবেশ করল। তারা দরজা পেরিয়েই একযোগে কিছু বলতে যাচ্ছিল লোকটিকে লক্ষ্য করে।
আহত-রক্তাক্ত লোক দুজনের দিকে একবার গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়েই জোয়াও লোকটি ধমকে উঠল, ‘থাম, তোমরা কি বলবে আমি তা জানি। এখন এই লোকটিকে বেঁধে ফেল।’
জোয়াও তার রিভলবারের নল কোন সময়ই একটু নড়ায়নি আহমদ মুসার দিক থেকে।
লোক দুজন এসে আহমদ মুসাকে পিছমোড়া করে বেঁধে ফেলল।
তারা যখন তাকে বাঁধছিল, তখন জোয়াও লোকটি তাদেরকে প্রশ্ন করে, ‘আমাদের ক’জন লোককে ওরা মেরেছে?’
দুজনের একজন জবাবে বলল, ‘পাঁচজন।’
‘আহমদ হাত্তাকে উদ্ধার করে নিয়ে গেল ওরা কারা? পুলিশ নিশ্চয় নয়।’ জিজ্ঞেস করে জোয়াও।
‘নয় বলেই মনে হয়। সাদা পোষাকে ওরা চারজন ছিল। আমরা আহমদ হাত্তাকে নিয়ে বের হবার মুখে ওরা অতর্কিত আক্রমণ করে বসে।’ বলে দুজনের সেই আগের লোকটিই।
‘আহমদ হাত্তাকে নিয়ে সবাই তো চলে যায়নি।’ বলল জোয়াও।
‘না, একজন রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে।’ বলল দুজনের সেই একজন।
‘ওরা আবার আসবে। লোকটি পুলিশের অপেক্ষা করছে। লোপেজ কোথায়?’ বলল জোয়াও।
আহমদ মুসা ওদের কথা শুনছিল। খুব খুশি হলো এই ভেবে যে, আহমদ হাত্তা উদ্ধার হয়েছে। পরশু তার নির্বাচন। খুব প্রয়োজন ছিল তার বাইরে বেরুনোর। কিন্তু তাকে উদ্ধার করল কে? চারজন কারা ছিল? তাহলে বার্নারডো এসেছিল আরও তিনজনকে নিয়ে? মনে মনে ধন্যবাদ দিল বার্নারডোকে। সে যোগ্য-সাথীর কাজ করেছে। বাইরে রাস্তায় কে দাঁড়িয়ে আছে? নিশ্চয় বার্নারডো। এই জোয়াও লোকটি ঠিক বলেছে সে পুলিশের অপেক্ষা করছে। আহমদ মুসা মনে মনে প্রশংসা করল জোয়াও লোকটির। পরিস্থিতি অনুধাবন করার তার অসীম ক্ষমতা দেখে আহমদ মুসা মুগ্ধ হয়েছে। মাফিয়ার নেতার এমন ঠান্ডা আচরণ ও তীক্ষ্ণ বুদ্ধি বিস্ময়কর নিঃসন্দেহে।
লোকটি থামতেই দুজনের একজন কিছু বলার জন্যে মুখ খুলেছিল। ঠিক এই সময় ঘরে দৌড়ে প্রবেশ করল একজন।
তাকে দেখেই জোয়াও বলে উঠল, ‘কি ব্যাপার লোপেজ?’
লোকটি জোয়াও-এর সামনে এসে চারদিক তাকাতে গিয়ে চোখ পড়ল তার হাত বাঁধা আহমদ মুসার উপর। লোকটাকে দু’চোখ যেন আটকে গেল আহমদ মুসার মুখে। প্রথমে তার চোখে-মুখে ফুটে উঠল বিস্ময়। পরক্ষণেই তার চোখে-মুখে নেমে এল বিহ্বলতা।
কোন কথা ফুটল না তার মুখে।
বোবা হয়ে গেছে যেন।
জোয়াও তার হাত বাঁধা বন্দীর দিকে লোপেজকে ঐভাবে চেয়ে থাকতে দেখে এবং লোপেজের বিহ্বল অবস্থা দেখে সে ভাবল, লোপেজ লোকটাকে চেনে নাকি? তা না হলে তার এ বিহ্বলতা কেন? বন্দী লোকটা ভয়ের বস্তু হলেও বন্দী অবস্থায় তাকে তো ভয় পাবার কথা নয়! এসব চিন্তা থেকেই জোয়াও লোপেজকে জিজ্ঞেস করল, ‘লোপেজ লোকটাকে তুমি চেন নাকি? মনে হচ্ছে তুমি বাঘের মুখে পড়েছ। কি ব্যাপার বলত?’
‘এ শুধু বাঘ নয় বস, এ হাজার বাঘের বাপ। কোত্থেকে এলেন ইনি? আমার ভয় হচ্ছে, আমি স্বপ্ন দেখছি কিনা!’ বলল লোপেজ লোকটা।
ভ্রুকুঞ্চিত হলো জোয়াও-এর। লোপেজ ‘কিনিক কোবরা’র টপ অপারেশন কমান্ডোদের একজন। বিশ্বের দূরতম অঞ্চলে এবং কঠিন অপারেশনের প্রতিই তার বেশি আগ্রহ। একটাও বাজে কথা বলার লোক সে নয়। কিন্তু সেই লোপেজ যাকে দেখে বিহ্বল হয়ে পড়তে পারে সে ব্যক্তিটি কে? জিজ্ঞেস করল জোয়াও, ‘হেয়ালী করো না লোপেজ। খুলে বল লোকটি কে?’
লোপেজ জোয়াওকে মাথা ঝুঁকিয়ে একটা বাউ করে বলল, ‘স্যরি বস। সত্যিই এঁকে দেখে আমার বুদ্ধি লোপ পাবার অবস্থা। আকাশের চাঁদ যদি হঠাৎ করে হাতে এসে যায়, তাহলে ব্যাপারটা কেমন হবে! চাঁদ হাতে পাওয়ার চেয়েও বড় ঘটনা এটা। অনুর্বর চাঁদ কখনো কেউ মূল্য দিয়ে কিনবে না। কিন্তু এই লোকটির যা ওজন তার কয়েকগুন বেশি ডলার এর বিনিময়ে পাওয়া যেতে পারে বস।’
লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল জোয়াও। তার দুই চোখ বিস্ফারিত। বলল, ‘কে ইনি? আহমদ মুসা! আমাদের আন্ডার ওয়ার্ল্ডের খবরে এমন মূল্যবান ব্যক্তি বর্তমানে আহমদ মুসাই!’
‘হ্যাঁ, বস। ইনি সেই সাত রাজার ধন আহমদ মুসা।’
বিস্ময়ে কিছুক্ষণের জন্যে যেন নির্বাক হয়ে গেল জোয়াও। আহমদ মুসার দিকে নির্বাক অপলক দৃষ্টি ফের প্রশ্ন করল, ‘লোপেজ, তুমি ঠিক চিনেছ?’
‘কোন সন্দেহ নেই বস। এঁর ফটো আমি অনেকবার দেখেছি ইউরোপে থাকা কালে। সম্প্রতি ইহুদি গোয়েন্দা সংস্থা ইরগুনজাই লিউমি ও ইসরাইল গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ তাঁর ছবি আবার সরবরাহ করেছে। আপনিও দেখেছেন।’ থামল লোপেজ।
কিন্তু তৎক্ষণাৎ কথা বলল না জোয়াও। ভাবছিল সে। শোনা আহমদ মুসার সাথে এই দেখা আহমদ মুসাকে সে মিলিয়ে নিচ্ছিল। তাঁর মনে হতে লাগল এ পর্যন্ত এই লোকের যে বৈশিষ্ট্য সে দেখেছে তাতে এই লোকটি আহমদ মুসা হলেই শুধু মানায়। যেভাবে দরজায় আটকে পড়া অবস্থা থেকে মুক্ত হলো, তার আগে আমাদের তিনজন লোককে সংজ্ঞাহীন করে এ ঘাটিতে যেভাবে প্রবেশ করেছে, তা আহমদ মুসার মত সর্বময় প্রতিভার অধিকারীর পক্ষেই সম্ভব। কিন্তু যে জিনিসটি তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় হয়ে দেখা দিল সেটা হলো, জোয়াও নিজেকে রক্ষার জন্যে একজন শিশুকে ঢাল বানাল, কিন্তু লোকটি একটি শিশুকে হত্যা না করে নিজেকে বন্দী হওয়ার মত চরম বিপদের মধ্যে ঠেলে দিল। আজকের বিপ্লবী ও অস্ত্র-বাজদের মধ্যে এই মহত্ গুণ শুধু আহমদ মুসার মধ্যেই আছে। তাছাড়া তাকে ঘাঁটিতে ঢোকার পথে বাধাদানকারী তাদের ‘কিনিক কোবরা’র তিনজন লোকের একজনকেও সে হত্যা করেনি, সংজ্ঞাহীন অবস্থায় বেঁধে রেখে তাদের নিস্ক্রিয় করেছে মাত্র। পারতপক্ষে কোন মানুষকে হত্যা না করার মত গুণ শুধু আহমদ মুসারই আছে।
মুগ্ধ দৃষ্টি ফুটে উঠল জোয়াও-এর চোখে। কিন্তু তারপরেই তার দুই চোখকে আচ্ছন্ন করল চকচকে লোভ। তার দুই ঠোঁট প্রসন্ন হাসিতে ভরে গেল। বলল, ‘তোমাকে ধন্যবাদ লোপেজ। কিনিক কোবরার জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ দিন আজ। মোসাদ ও লিউমি আহমদ মুসার কত দাম দেবে বলতে পার?’
‘তুমি যতটা চাইতে পার জোয়াও। আহমদ মুসার বিনিময় হিসেবে কোন অঙ্কই তাদের কাছে বড় হবে না।’
‘হ্যাঁ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ ঘটনায় চূড়ান্ত মার খাওয়ার পর ইহুদীরা আহমদ মুসার প্রতি আগুন হয়ে আছে।’
মুহূর্তের জন্যে থামল জোয়াও। তারপর আহমদ মুসার দিকে চেয়ে বলল, ‘আপনাকে ওয়েলকাম স্যার। আমাদের অতিথ্যে আপনার সময় ভালই কাটবে। আপনি এখন আমাদের সবচেয়ে বড় পুঁজি।’
বলে জোয়াও আবার থামল। তাকাল আহমদ মুসাকে যারা বেঁধেছিল সেই লোক দুজনের দিকে। একজনকে লক্ষ্য করে বলল, ‘যাও তুমি পায়ের বেড়ি ও হ্যান্ডকাফ নিয়ে এস।’
দৌড়ে বেরিয়ে গেল সেই লোকটি। দেড় দু’মিনিটের মধ্যেই ফিরে এল বেড়ি ও হ্যান্ডকাফ নিয়ে।
জোয়াও এবার তাকাল আহমদ মুসার দিকে। বলল, ‘এক্সকিউজ মি স্যার, আমরা এভাবে আপনাকে রেখে আমাদের মনের ভয় দূর করতে পারছি না। আমরা এখন মুভ করবো তো! আমরা যাতে নিশ্চিন্তে থাকতে পারি এজন্যেই আপনার হাত পায়ে এ দুটি পরিয়ে দিতে চাই। কিছু মনে করবেন না।’
কথা শেষ করে হ্যান্ডকাফ যে এনেছিল তাকে ইংগিত করল।
লোকটি আহমদ মুসার হাত ও পায়ে লোহার শিকল পরিয়ে দিল এবং তা তালাবদ্ধ করে চাবি দুটি তুলে দিল জোয়াও-এর হাতে।
আহমদ মুসা শান্তভাবে দাঁড়িয়ে থেকে ওদের কথা শুনছিল ও কাজ দেখছিল।
হাত ও পায়ের শিকল পরানো হয়ে গেলে আহমদ মুসা বলল, ‘আমার হাত পা লক করেই কি নিশ্চিন্তে থাকতে পারবেন?’
জোয়াও এবার আহমদ মুসার দিকে তাক করা রিভলবার সরিয়ে নিয়ে পকেটে পুরে বলল, ‘নিশ্চিন্ত হবার জন্যে নিরাপদ জায়গায় আপনাকে আমরা রাখব। আমরা জানি বর্তমান অবস্থায় আপনি শত চেষ্টা করলেও সেখান থেকে বের হতে পারবেন না। জেনে রাখুন, কিনিক কোবরা বাগাড়ম্বর করে না।’
আহমদ মুসা হাসল। কিছু বলল না।
‘মোসাদ ও লিউমি’র হাতে আপনাকে তুলে দেবার কথা শুনে আপনার কি মনে হচ্ছে?’ বলল জোয়াও।
‘দুই কারণে খুশি লাগছে। এক, এর দ্বারা আপনারা অনেক টাকা পাবেন। দুই, পুরনো বন্ধুদের সাথে আমার আবার দেখা হবে।’ শান্ত কণ্ঠে বলল আহমদ মুসা।
বিস্ময় ফুটে উঠল জোয়াও-এর চোখে-মুখে। লোপেজের মুখও বিস্ময়ে হা হয়ে গেছে।
মহিলাটি তখনও দাঁড়িয়েছিল যে দরজা দিয়ে সে প্রবেশ করেছিল সেই দরজার সামনেই। বালিকাটিও জোয়াও-এর হাত থেকে ছাড়া পেয়ে মাকে জড়িয়ে ধরে আহমদ মুসার দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সে তার মাকে ফিস ফিস করে বলল, ‘লোকটির ভয় নেই কেন আম্মা?’
মহিলা স্তম্ভিত অবস্থায় স্থানুর মত দাঁড়িয়েছিল। জোয়াও ক্রিস্টিনাকে রক্ষা করতে গিয়ে বন্দী হলো। এ ঘটনায় হতবাক হয়ে গিয়েছিল মহিলাটি। তারপর লোপেজের কাছে আহমদ মুসার পরিচয় শোনার পর বুঝেছে আহমদ মুসা বলেই একটি বালিকাকে বাঁচানোর মত মহত্ কাজটা করতে পেরেছে। এখন আরেক ধরণের বিস্ময় তাকে অভিভূত করে তুলছে। আহমদ মুসাকে চোখের সামনে দেখার অসম্ভব ঘটনায় সে বুদ্ধিলোপ পাবার মত আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে।
ক্রিস্টিনার কথায় সম্বিত ফিরে পেল মহিলাটি।
মহিলাটি বালিকার দিকে তাকাল। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে ধীরে ধীরে বলল, ‘দুনিয়াতে অনেক মানুষ আছে ক্রিস্টিনা যারা কোন কিছুতেই ভয় পায় না।’
‘কোন কিছুতেই না? কেন?’ বলল বালিকা ক্রিস্টিনা।
‘তা ওরাই বলতে পারে ক্রিস্টিনা।’ বলল মহিলাটি।
‘সত্যিই লোকটিকে কি বিক্রি করা হবে মাম্মি?’ ক্রিস্টিনার কণ্ঠে উদ্ধেগ।
‘কেন জিজ্ঞেস করছ?’ জিজ্ঞেস করল মহিলাটি।
‘লোকটা ভালো মাম্মি। আমাকে গুলী করেনি।’
মহিলাটি কিছু বলার জন্যে মুখ খুলেছিল।
ওদিকে জোয়াও বিস্ময়ের ঘোর কাটিয়ে আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে বলল, ‘মি. আহমদ মুসা, আপনি না বুঝে এ কথাগুলো বলেছেন তা আমি মনে করি না। আবার আপনি বেশি সাহসের বড়াই দেখাবেন তাও মানতে আমার মন চায় না। তাহলে ঘটনা কি বলুন তো!’
‘এসব কথা থাক।’ বলল আহমদ মুসা। কথা শেষ করেই আহমদ মুসা আবার বলল, ‘বলুন তো আপনারা আহমদ হাত্তার পিছনে লেগেছেন কেন? আপনারা বিদেশী। তিনি বা তাঁর দল তো আপনাদের কোন ক্ষতি করেনি!’
আহমদ মুসার কথা শোনার পর জোয়াও অল্পক্ষণের জন্যে মাথা নিচু করল। তারপর সোজা আহমদ মুসার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘মি. আহমদ মুসা, কিনিক কোবরা’র কার্যক্রম সম্পর্কে কোন প্রশ্নের জবাব আমরা দেব না। তবু এটুকু বলি, আহমদ হাত্তাকে আমরা হত্যা করবো। কে বা কারা তাকে ছাড়িয়ে নিয়ে গেছে জানি না। তবে আজ সে ছাড়া পেয়েছে, কাল তাকে মরতেই হবে। ‘কিনিক কোবরা’ কাউকে টার্গেট করলে সে আর বাঁচে না।’
বলেই জোয়াও তাকাল মহিলার দিকে। তাকিয়ে বলল, ‘লিন্ডা তুমি ক্রিস্টিনাকে নিয়ে সুড়ঙ্গ পথে বোটে চলে যাও এখনি।’
মহিলাটিকে অর্থাৎ লিন্ডাকে নির্দেশ দিয়েই জোয়াও তাকাল লোপেজসহ তাঁর লোকদের দিকে। বলল, ‘তোমরা আহমদ মুসাকে সুড়ঙ্গ পথে বোটে নিয়ে চলে যাও। আমি এদিকের ব্যবস্থা করে আসছি। আমার ধারণা মিথ্যা না হলে এখন থেকে দশ-পনের মিনিটের মধ্যে পুলিশ এসে পৌঁছবে।’
তারপর জোয়াও তাকাল আবার আহমদ মুসার দিকে। বলল, ‘আপনি ভাববেন না। আপনাকে বেটার জায়গাতেই আমরা নিচ্ছি। তবে একটু অসুবিধা আপনার হবে। সেটা হলো ওখান থেকে পালানো কঠিন হবে। পালাতে চেষ্টা করলে নির্ঘাত মারা পড়বেন।’ বলে জোয়াও উঠে দাঁড়াল।
মেয়েটি ক্রিস্টিনাকে নিয়ে লিন্ডা এবং লোপেজরা আহমদ মুসাকে নিয়ে তখন ঘর থেকে বেরুবার যাত্রা শুরু করেছে।

‘লিন্ডা লোরেন, সুরিনামে আমার কাজ সমাপ্ত হওয়ার পথে। এখন আমার কাজটুকুই…।’
জোয়াও-এর কোথায় ছেদ নামল লিন্ডা কথা বলে উঠায়। লিন্ডা বলল, ‘কাজ শেষ হবার পথে! আহমদ হাত্তাই তো বেঁচে আছে। কোথায় কাজ শেষ হলো?’
‘কিনিক কোবরা’র জীবনে এটাই প্রথম ওয়াদা খেলাপী। আমি রঙ্গলালকে তাদের দেয়া অগ্রীম টাকা ফেরত দিয়েছি। আহমদ হাত্তা আমাদের হাত থেকে মুক্ত হবার একদিন পরেই নির্বাচন হয়েছে, তাতে তিনি প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছেন। একটা দেশের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীকে হত্যার চুক্তি তাদের সাথে আমাদের হয়নি। তাছাড়া আহমদ মুসাকে পাওয়ার পর এসব ছোট-খাটো কাজের প্রতি আকর্ষণ কমে গেছে। এখন টেরেক স্টেট-এর কাজটা হলেই আমরা চলে যাব। তুমি ডকুমেন্টটা আমাদের দাও।’
ডকুমেন্টের কথা শুনতেই লিন্ডা লোরেনের মুখ বিষণ্ণ হয়ে গেল। বলল, ‘তুমি জান, তোমার এ সব কাজে কোন সহযোগিতা আমি করবো না। তবু কেন তুমি আমাকে সুরিনামে নিয়ে এসেছ?’
‘তোমাকে আমার প্রয়োজন ছিল না। কিন্তু পরিস্থিতি তোমাকে নিয়ে এসেছে, তা তুমি জান। তুমি বলেছ, তোমার ডকুমেন্ট সুরিনামে আছে তাই তোমাকেও সুরিনামে আসতে হয়েছে। ডকুমেন্টটা তুমি আমার হাতে দিলে, তখনই তুমি চলে যেতে পারবে সুরিনাম থেকে।’ শান্ত ঠান্ডা কণ্ঠে বলল জোয়াও লেগার্ট।
‘আগে কি করতাম জানি না। কিন্তু এখন সবকিছু জানার পরে এ ডকুমেন্ট তোমাকে আমি দেব না। ভালো লোকদের সম্পদ তোমাদের মত লোকদের হাতে পড়ুক, তা আমি চাই না।’
রুখে দাঁড়ানোর ভঙ্গিতে বলল লিন্ডা লোরেন।
ঠান্ডা হাসি হাসল জোয়াও লেগার্ট। বলল, ‘তোমার এই কোথায় আমি রাগছি না। কারণ আমি জানি ডকুমেন্টটা তুমি আমাদের দেবে। কারণ তুমি জান, আমি যা চাই তা আদায় করেই ছাড়ি।’
‘কি করে আদায় করবে?’
‘অমানুষ হবো।’
‘অমানুষ হবার তোমার কিছু বাকি আছে? একবার তুমি নিজের দিকে চেয়ে দেখ, কোথায় ছিলে কোথায় এসেছ।’
‘আমি পেছনে তাকাই না। ভাল চাইলে আমার কথা তোমাকে শুনতে হবে।’ বলল জোয়াও লেগার্ট।
‘আমাকে তুমি অমঙ্গলের ভয় দেখিও না। আমার অমঙ্গলের তুমি কি বাকি রেখেছ। আমি আর মানুষ নেই। জীবনের প্রতিও আমার কোন মায়া নেই।’ শুষ্ক কণ্ঠে বলল লিন্ডা লোরেন।
‘তোমার জীবনের প্রতি মায়া না থাকলেও ক্রিস্টিনার জীবনের প্রতি মায়া তোমার আছে।’ শয়তানের মত ক্রুর কণ্ঠ জোয়াও লেগার্টের।
চমকে উঠল লিন্ডা লোরেন।
ভয়ে তাঁর মুখ কুচকে গেল। বলল, ‘তোমার এ কথার অর্থ কি জোয়াও লেগার্ট?’
‘আমার কথার অর্থ তুমি জান। ক্রিস্টিনা আমার মূল্যবান অস্ত্র। তোমাকে লাইনে আমার জন্য এটাই শেষ অস্ত্র সব সময় ছিল, এখনও আছে।’
‘তুমি কি করতে চাও ক্রিস্টিনাকে? তুমি সেদিন নিজেকে রক্ষার জন্যে তাকে ঢাল বানিয়েছিলে। একজন শত্রু যে মানবতার পরিচয় দিয়েছে, সেটাও তুমি দেখাতে পারনি।’ বলল লিন্ডা লোরেন ক্ষু্ব্ধ কণ্ঠে।
‘ক্রিস্টিনাকে কি করবো সেটা পরের কথা। আগে তুমি বল, ডকুমেন্ট তুমি দিচ্ছ কি না।’
কথা বলল না লিন্ডা লোরেন।
জোয়াও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল।
তারপর বলল, ‘আমার সময় এখন খুব মূল্যবান লিন্ডা। নষ্ট করার মত সময় আমার নেই। আজই আমি ডকুমেন্টটা চাই। আসছে রাত ভোর ৪টায় একটা জাহাজ এখানে আসবে। সে জাহাজে করে আহমদ মুসাকে নিয়ে বাইরে যাব ক’দিনের জন্যে। যাবার আগে আমাকে ডকুমেন্টটা হাতে পেতেই হবে। আমি এখন বাইরে যাচ্ছি। ডকুমেন্ট ঠিকঠাক করে রাখবে। আমাকে তুমি চেন। আর একবারও তোমাকে আমি অনুরোধ করবো না। এরপর দেখবে, আমি কি করতে পারি।’
বলে উঠে দাঁড়াল জোয়াও লেগার্ট।
বেরিয়ে গেল ধীর পায়ে সে ঘর থেকে।
জোয়াও লেগার্টের শেষ কথায় লিন্ডা লোরেনের চোখে-মুখে নতুন করে আবার ভয়ের চিহ্ন ফুটে উঠল। তাঁর ভয়ার্ত দুই চোখ তাকিয়ে থাকল ধীর গতিতে বেরিয়ে যাওয়া লেগার্টের দিকে। জোয়াও যত ধীর, কথায় যত ঠান্ডা হয়, ততই সে নিষ্ঠুর হয়।
জোয়াও লেগার্ট চলে গেল।
লিন্ডা লোরেন কিন্তু সে দিকেই চেয়ে আছে। চোখে তাঁর শুন্য দৃষ্টি।
অতীতে চলে গেছে তাঁর মন।
ডুবে গেল মন স্মৃতির অথৈ সমুদ্রে।
দু’চোখের কোণায় জমে উঠল অশ্রু।

বিছানায় উঠে বসল লিন্ডা লোরেন। সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে সে।
সে তো মরে গেছেই। ক্রিস্টিনাকেও সে বাঁচাতে পারবে না। তাই ডকুমেন্ট সে কিছুতেই জোয়াওদের হাতে তুলে দেবে না। এই ডকুমেন্ট তার বংশীয় আমানত। তাছাড়া এখানে এসে সে জানতে পেরেছে, এই ডকুমেন্টে যে ডায়াগ্রাম রয়েছে, সেটা অনুসরণ করে যাওয়া যাবে টেরেক স্টেটের এক স্বর্ণ ভান্ডারে। যে স্বর্ণ তার পূর্ব পুরুষ কলম্বাসের ক্যাপ্টেন সঞ্চিত করে রেখেছেন, সেটা উদ্ধার করা যাবে। এই পবিত্র সম্পদ সে কিছুতেই সন্ত্রাসীদের হাতে তুলে দেবে না। এই সম্পদ ওদেরকে দিলেও ওরা ক্রিস্টিনাকে মানুষের মত বাঁচতে দেবে না, যেমন সে নিজেকে বাঁচাতে পারেনি। পিতৃপুরুষের এই সম্পদ রক্ষার জন্যে তার জীবন দিতে হলেও দেবে। তার আগে চেষ্টা করবে আহমদ মুসার মত ভালো মানুষকে উদ্ধার করতে। আহমদ মুসার মত বিশ্ব ব্যক্তিত্ব নিজের জীবন বিপন্ন করে একজন অখ্যাত বালিকাকে বাঁচিয়েছেন। তাঁকে বাঁচাতে যদি তাদের দুই মা-বেটির জীবন কোরবানি হয়, তাতে পৃথিবীই উপকৃত হবে।
হাত ঘড়ির দিকে তাকাল লিন্ডা। রাত ১২ টা বাজে।
উঠে দাঁড়াল লিন্ডা।
ঘরের গুমোট বাতাসে হাঁপিয়ে উঠেছে সে।
ছাদের উন্মুক্ত বাতাসের জন্যে মন আকুলি-বিকুলি করে উঠল।
লিন্ডার কক্ষটি চারতলায়। সিঁড়ির পাশেই। এখানে আসার পর থেকে সুযোগ পেলেই সময়টা সে ছাদে গিয়ে কাটিয়েছে।
লিন্ডা উঠে গেল ছাদে।
ছাদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে বুক ভরে শ্বাস নিল লিন্ডা। মুক্ত পরিবেশ, মুক্ত আকাশ তার ভালো লাগে। এ খোলা প্রকৃতি তার বিশালত্ব ও উদারতা দিয়ে তার বুক ভরা বেদনায় শান্তির পরশ বুলায়।
ছাদের বেঞ্চিটার উপর বসল লিন্ডা।
তার চোখটা ঘুরে এল একবার চারদিক।
সমুদ্রে ভাসমান একটা টিলার উপর এই বাড়িটা। চারদিকেই পানি। অবশ্য পশ্চিম দিকে অল্প দূরেই উপকূল। সুরিনাম নদীর মোহনাতেই বলতে গেলে এই টিলাটা। সুরিনাম নদীর পলি দিয়েই গড়ে উঠেছে এটা। নদী মুখে পারামারিবো বন্দরের আলো চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছে, কোলাহলও শোনা যাচ্ছে কিছু কিছু।
লিন্ডা শুনেছে, টিলার এই বাড়িটা তৈরি করেছিল সুরিনামের এক ধনাঢ্য ব্যবসায়ী দ্বীপটা কিনে নিয়ে। কিন্তু চোরাচালান আর সন্ত্রাসীদের অত্যাচারে সে টিকতে পারেনি। বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছে। এখন এটা মাফিয়া চক্রের রাজধানী। কিনিক কোবরা কয়েকদিনের জন্যে এটা নিয়েছে।
চারদিকের পরিবেশসহ বাড়িটা লিন্ডার ভাল লেগেছিল। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে বাড়িটা একটা বন্দীখানা। এখান থেকে আহমদ মুসাকে কেমন করে সে পালিয়ে যেতে সাহায্য করবে?
লিন্ডা লোরেন আবার তার ঘড়ির দিকে তাকাল। রাত সোয়া ১২টা।
উঠল বেঞ্চি থেকে। নেমে এল তার ঘরে আবার।
দ্রুত পড়ে নিল ক্যাবারে ড্যান্সারের মত সেক্সী পোশাক। তাকে নির্লজ্জ মাতাল ক্যাবারে ড্যান্সারের ভূমিকায় অভিনয় করতে হবে, তা না হলে আহমদ মুসার কাছে পৌঁছানো যাবে না।
কাপড় পড়ে তার সেতারের পকেট থেকে বের করল ছোট্ট একটা রিভলবার এবং তা গুজে রাখল ঘাড়ের সাথে লেগে থাকা আস্তিনের একটা পকেটে।
প্রস্তুত হয়ে পার্টিশন ডোর দিয়ে প্রবেশ করল পাশের কক্ষে। সে ঘরে একটা বেডে অঘোরে ঘুমুচ্ছে ক্রিস্টিনা।
বেডের উপর ঝুঁকে পড়ে একটা চুমু খেল ক্রিস্টিনাকে।
ঘর থেকে বেরিয়ে এল লিন্ডা।
দাঁড়াল করিডোরে।
কি করতে হবে তা আরেক বার তাকে ঠিক করে নিতে হবে।
আহমদ মুসাকে রাখা হয়েছে আন্ডারগ্রাউন্ড ফ্লোরের একটা রুমে।
দোতলার সিঁড়ির পাশের একটি কক্ষে রয়েছে আন্ডারগ্রাউন্ডে নামার সিঁড়ি। জোয়াও লেগার্ট স্বয়ং থাকে ঐ কক্ষটিতে।
দোতলা থেকে একতলা পর্যন্ত রয়েছে টাইট নিরাপত্তার ব্যবস্থা। দোতলার সিঁড়ির মুখে এবং জোয়াও লেগার্টের কক্ষের দরজায় দুজন করে চারজনের সার্বক্ষণিক পাহারা সে দেখেছে। এক তলায় নিরাপত্তার কি ব্যবস্থা রয়েছে তা সে জানে না। তবে জোয়াও লেগার্টের কাছে সে শুনেছে, এখান থেকে যেই পালাতে চেষ্টা করুক মারা পড়বে। কেন মারা পড়বে তা সে জানতে পারেনি।
এসব চিন্তা করতে করতে তার মাথাটা ভারী হয়ে উঠল।
কিন্তু পরক্ষণেই সে মাথা সোজা করে দাঁড়াল। সব চিন্তা সে ছুড়ে ফেলল মাথা থেকে। সে ভাবল, এসব তার ভাবনা নয়। তার লক্ষ্য আহমদ মুসাকে মুক্ত করা। তারপর যা ঘটার ঘটবে।
চারতলা থেকে নামার সিঁড়ির দিকে পা বাড়াল লিন্ডা লোরেন।
অভিনয় শুরু করল। টলতে টলতে নামছে সে। মুখে তার অসংলগ্ন কথা।
দেখলেই মনে হবে মদ খেয়ে মাতাল হয়েছে লিন্ডা লোরেন।
দোতলার ল্যান্ডিং-এ নামল সে টলতে টলতে।
নেমেই সে দেখতে পেল এক তলায় নামার সিঁড়ির মুখে দাঁড়িয়ে দুজন প্রহরী।
মাথাটা একদিকে ঝুঁকিয়ে টলায়মান অবস্থায় থমকে দাঁড়াল লিন্ডা লোরেন। তারপর বলল ওদেরকে লক্ষ্য করে মাতালের মত জড়িত ভাষায়, ‘এই তোরা কি করছিস এখানে! জোয়াও কোথায়? কোথায় আমার ডারলিং?’
বলে ওদের দিকে এগুলো।
প্রহরী দুজন দু’ধাপ পিছিয়ে সিঁড়ির একেবারে মুখে গিয়ে দাঁড়াল। তাদের চোখে বিস্ময় ও সম্ভ্রমের দৃষ্টি। তারা জানে, লিন্ডা তাদের বস এর খাস লোক। বস তাকে মানিয়ে চলে।
তার কোন অসুবিধা বস হতে দেয় না।
একজন প্রহরী সংকুচিতভাবে সম্ভ্রম জড়িত কণ্ঠে বলল, ‘ম্যাডাম, বস বাইরে গেছেন।’
‘তোরা সব মিথ্যাবাদী। এইতো জোয়াও আমাকে আসতে বলল।’ বলে লিন্ডা প্রহরীদের থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে জোয়াও-এর ঘরের দিকে চলল।
জোয়াও-এর ঘরের সামনেও ছিল দুজন প্রহরী।
লিন্ডা টলতে টলতে বলল, ‘তোরা এখানে কি করছিস? তোদের ষড়যন্ত্র সব বলে দেব জোয়াওকে। যা দুর হ।’
বলে সাতার কাটার মত কষ্ট করে এগুতে লাগল দরজার দিকে।
দরজার দুজন প্রহরী স্তম্ভিত ও ভীত। একজন কিছুটা এগিয়ে লিন্ডাকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে বলল, ‘ম্যাডাম, দরজা বন্ধ। বস দরজা লক করে বাইরে গেছেন। আপনি……।’
লিন্ডা চলা অব্যাহত রেখে মুখ ঘুরিয়ে জড়িত কণ্ঠে বলল, ‘চুপ, একটা কথাও নয়। জোয়াও তোদের আস্ত রাখবে না।’
দরজায় পৌঁছে গেছে লিন্ডা।
ধাক্কা দিল দরজায়। বন্ধ দরজা।
মাতাল কণ্ঠে লিন্ডা বলে উঠল, ‘জোয়াও ডার্লিং, দরজা খোল। আমি তোমার কাছে এসেছি।’
কথা শেষ করে পরক্ষণেই বলে উঠল, ‘কি জোয়াও দরজা খুলবে না। ঘুমিয়ে গেছ? আমার সাথে রসিকতা?’
বলে লিন্ডা পকেট থেকে তার দ্বিতীয় রিভলবার বের করে নিয়ে মাতাল –কম্পিত হাতে রিভলবারের নল অতিকষ্টে দরজার কিহোলে লাগিয়ে গুলী করল।
দরজার লক গুড়ো হয়ে গেল।
দরজা ফাঁক করল লিন্ডা। বলে উঠল, ‘তুমি কোথায়? আমার খুব ঘুম পাচ্ছে।’
বলে দু’ধাপ ভেতরে এগিয়ে পেছনে না ঘুরেই দরজা বন্ধ করে দিল এবং বলে উঠল। ‘কোথায় তুমি, আমি ঘুমাব, আমি ঘু..মা….ব।’
কথা শেষে লিন্ডা সোজা হয়ে দাঁড়াল। ঘুরে দাঁড়িয়ে আস্তে আস্তে দরজার উপর ও নিচের দুটি ছিটকিনিই লাগিয়ে দিল। তারপর ঘুরে দাঁড়িয়ে রিভলবারটা পকেটে রেখে এগুল ঘরের একমাত্র আলমারিটার দিকে। সে জোয়াও-এর কাছ থেকেই শুনেছে এই ঘর থেকেই আন্ডারগ্রাউন্ডে নামবার সিঁড়ি আছে। ঘরের মেঝেতে এমন কোন সিঁড়ি সে দেখেনি। নিশ্চয় তাহলে সিঁড়িটা আলমারির ভিতর থেকে নিচে নেমে গেছে।
আলামারির সামনে গিয়ে দাঁড়াল লিন্ডা। হাত ঘুরিয়ে আলমারি খোলার চেষ্টা করল।
আলমারি বন্ধ।
আবার রিভলবার বের করল।
আলমারির কিহোলে রিভলবারের নল লাগিয়ে গুলী করল।
খুলে গেল আলমারি।
আলমারি খুলে ভেতরে তাকিয়ে একেবারে চুপসে গেল লিন্ডা। আলমারি থেকে সিঁড়ি জাতীয় কিছু নেই। ফাঁকা আলমারি। আলামারিতে কোন তাকও নেই। দেখতে ঠিক ওয়ানম্যান মিনি লিফট রুমের মত। আলমারির তলায় শুধু একটা মিনি মেশিনগান ‘উজি’ ও তার সাথে কয়েকটা ম্যাগাজিন পড়ে আছে মাত্র।
উদ্বিগ্ন হলো লিন্ডা। তার হাতে সময় বেশি নেই। সাধারণত সে শেষ রাতে ফিরলেও কোন সময় যে সে এসে পড়বে তার ঠিক নেই।
লিন্ডা আলমারির পাল্লা লাগিয়ে সরে এল। নজর বুলাল গোটা মেঝের উপর। খাটের তলাসহ সবটা মেঝে সে পরীক্ষা করল। মিনি মেশিনগান ‘উজি’র বাঁট দিয়ে টোকা দিয়ে দেখল দেয়ালও। না সন্দেহ করার মত কিছুই সে পেল না।
দাঁড়াল সে মেঝের মাঝখানে।
ঘড়ির দিকে তাকাল লিন্ডা। রাত পৌনে একটা বাজে।
আতংক, ক্লান্তি এসে তাকে ঘিরে ধরল। ঘাম ঝরে পড়তে লাগল কপাল থেকে।
আকুলি-বিকুলি করে উঠল তার মন। তাহলে কি সে ব্যর্থ হয়ে যাবে? এ ব্যর্থতার অর্থ আহমদ মুসা, সে এবং ক্রিস্টিনা সবারই জীবন যাবে। আর সফল হলে অন্তত আহমদ মুসার মত একজন ভালো লোক বেঁচে যাবে।
মনটাকে আবার শক্ত করল লিন্ডা।
সিঁড়ি খোঁজার জন্যে আবার মরিয়া হয়ে উঠল সে।
আলমারির পাশের দেয়াল পরীক্ষা করতে গিয়ে হঠাত্ তার নজরে পড়ল, আলমারিটা দেয়ালের ভেতর সেঁটে যাওয়া। এমন কেন? পরক্ষণেই তার মনে হলো, আলমারির পিছনটা সিঁড়ি মুখের দরজা হতে পারে।
ভাবনাটা মাথায় আসতেই ছুটল লিন্ডা আলমারির দিকে। পাল্লা খুলে ফেলল আলমারির। ডান হাত বাড়িয়ে চাপ দিল আলমারির পেছনটায়। না, নড়ার কথা নেই, বেশ শক্ত। মনে মনে কথাগুলো আওড়াল লিন্ডা। আলমারির পেছনটায় চাপ দিতে গিয়ে লিন্ডা একটা জিনিস খেয়াল করল, আলমারির পেছনের পাল্লাটার তিন দিকে্ ওয়েল্ডিং করে আলমারির সাথে আটকে দেয়া নেই। তার উপর সে দেখল পেছন পাল্লার ডানদিকের উপর-নিচ লম্বা-লম্বি প্রান্তটা কব্জা দিয়ে আলমারির সাথে আটকানো। অর্থাত্ এটা সিড়িঁর মুখের দরজা নি:সন্দেহে বুঝল লিন্ডা।
কিন্তু দরজাটা খুলবে কিভাবে?
ছিটকিনি, হাতল অথবা বৈদ্যুতিক বোতামের সন্ধানে প্রতিটি ইঞ্চি স্থানে নজর বুলাল লিন্ডা। কিন্তু কিছুই পেলনা। হাত দিয়ে আবার ধাক্কা-ধাক্কি করল। কিন্তু অনড় দরজা।
আবার হতাশা এসে ঘিরে ধরল লিন্ডাকে। দরজা খুলতে না পারলে তো সব চেষ্টাই তার বৃথা যাবে। তার ও ক্রিস্টিনার জীবন যাবে, কিন্তু এ জীবন দান কোন কাজে আসবে না।
অস্থির হয়ে পড়ল লিন্ডা।
এ সময় ঘরের দরজার বাইরে থেকে জোয়াও-এর গলা শোনা গেল। লিন্ডাকে ডাকছে সে।
কয়েকটা ডাকের পর লিন্ডার সাড়া না পেয়ে দরজায় করাঘাত করতে লাগল।
জোয়াও-এর কণ্ঠ শুনেই লিন্ডার গোটা শরীর উদ্বেগ-আতংকে অসাড় হয়ে পড়ার উপক্রম হয়েছে। সাজানো দুনিয়া তার কাছে উলট-পালট হয়ে গেল। জোয়াও-এর কণ্ঠকে তার আজরাঈলের কণ্ঠ বলে মনে হচ্ছে।
দরজার ধাক্কা বেড়ে গেল।
এবার লাথি পড়ছে দরজায়।
লিন্ডার বুঝতে বাকি রইলনা এখনি দরজা ওরা ভেঙে ফেলবে। কি করবে লিন্ডা এখন?
লিন্ডা আতংকের সাথে দেখল দরজার নিচের ছিটকিনি ভেঙে খসে পড়েছে। উপরেরটাও এখনি ভেঙে পড়বে। লিন্ডা তখনও দাঁড়িয়ে আলমারির ভেতর। সে আর কোন দিশা না পেয়ে আলমারির দরজা লাগিয়ে দিল। দেখল, আলমারির দরজার ভেতর দিকে উপরে ও নিচে দুটি ছিটকিনি আছে।
লিন্ডার মনে হল স্বয়ং ঈশ্বর যেন ছিটকিনি তার জন্যেই এইমাত্র তৈরী করে দিলেন।
লিন্ডা ত্বরিত হাত চালিয়ে আলমারির দরজার দুটি ছিটকিনিই লাগিয়ে দিল।
ছিটকিনি বন্ধ করার সঙ্গে সঙ্গেই ঘটে গেল অভাবনীয় ঘটনাটা। আলমারির পেছনের স্টিলের পাল্লাটা খুলে গেল।
লিন্ডা পিছনের ক্লিক শব্দে পেছন ফিরে দেখল। স্তম্ভিত হয়ে গেল সে। তার সামনে আলোকজ্জ্বল সিঁড়ি।
তার বিস্ময় পরক্ষণেই আনন্দে রুপান্তরিত হলো।
পেছনে ঘরের ভেতর ভীষণ শব্দে কি যেন ভেঙে পড়ল। নিশ্চয় ঘরের দরজা ভেঙে পড়েছে, ভাবল লিন্ডা। আতংকিত হয়ে উঠল সে। এক হাতে ‘উজি’ কারবাইন, অন্য হাতে রিভলবার নিয়ে দৌড় দিল সিঁড়ি পথে।
সিঁড়ি গিয়ে শেষ হয়েছে লাউঞ্জ ধরনের একটা হলঘরে। প্রায় চারদিক ঘিরেই ঘর।
চারদিকে তাকিয়ে নিজেকে নিজেই প্রশ্ন করে বসল লিন্ডা, কোথায় বন্দী আহমদ মুসা? সময় তো বেশি নেই। এখনি জোয়াও আলমারির দরজা ভেঙে ফেলবে। তারপর যা ঘটবে, তা কল্পনাও করতে পারে না সে। সবাই তারা বেঘোরে মারা পড়বে। বাঁচতে হলে আহমদ মুসাকে বাঁচাতে হবে, জোয়াও আসার আগে আহমদ মুসাকে মুক্ত করতে হবে।
কিন্তু কিভাবে তাকে মুক্ত করব? সব ঘর খোঁজা তার পক্ষে সম্ভব?
প্রচন্ড শব্দ এল উপর থেকে।
ওরা আলমারির দরজা ভাঙার চেষ্টা করছে।
বিমূঢ় হয়ে পড়ল লিন্ডা। সে ব্যাকুল কণ্ঠে চিত্কার করতে লাগল, ‘মি আহমদ মুসা আপনি কোথায়?’
এ সময় সিঁড়ির গোড়ায় দাঁড়ানো লিন্ডার ঠিক নাক বরাবর সামনে লাউঞ্জের ওপারের একটি কক্ষের দরজা থেকে শব্দ এল। লিন্ডা ছুটল সে দরজার দিকে নিশ্চয় আহমদ মুসাই তার ডাকে সাড়া দিয়েছে।
দাঁড়াল দরজার সামনে।
দরজাটি মজবুত কাঠের। তাতে ইস্পাতের শীট বসানো।
লিন্ডা দরজার কিহোলে রিভলবারের নল লাগিয়ে গুলী করল। একবার নয়, দুবার। আতংকিত লিন্ডার বুদ্ধি-জ্ঞান হারিয়ে যাবার দশা।
আলমারিতে ধাক্কানো বন্ধ হয়ে গেছে। সিঁড়ির মাথার দিক থেকে শব্দ আসছে। ঢুকে পড়েছে জোয়াওরা।
লিন্ডার গুলীর তোড়েই দরজার লক ভেঙে দরজা খুলে গেছে। লিন্ডার চোখে পড়ল দরজার বাঁ দিকের দেয়ালের পাশে দাঁড়িয়ে আছে আহমদ মুসা তার হাতে পায়ে লোহার কড়া পরানো।
লিন্ডা দ্রুত কিছু বলতে যাচ্ছিল আহমদ মুসাকে। কিন্তু মুখ খুললেও তা থেকে শব্দ বেরুল না। পেছন থেকে গর্জে উঠেছে জোয়াও-এর কণ্ঠ, ‘লিন্ডা আর এক ইঞ্চিও এগিয়ো না। হাত থেকে অস্ত্র-ফেলে দাও। হাত উপরে তোল।’
লিন্ডার বাম হাতে ‘উজি’ এবং ডান হাতে ছিল রিভলবার।
লিন্ডা জোয়াও-এর নির্দেশের সাথে সাথেই দুহাত থেকে অস্ত্র ছেড়ে দিল। কিন্তু ‘উজি’ মিনি মেশিনগানটাকে সে আর একটু বাঁ দিকে ছুঁড়ে দিল। যাতে অস্ত্রটা দরজার একটু আড়াল হয় এবং সেটা আহমদ মুসা পায়।
অস্ত্র ফেলে দিয়ে দুহাত উপরে তুলেছে লিন্ডা।
পেছন থেকে জোয়াও-এর কণ্ঠ আবার দ্রুত ধ্বনিত হলো, ‘ডোমান তাড়াতাড়ি যাও অস্ত্রগুলো কুড়িয়ে নাও।’
ডোমান আসা শুরু করল।
লিন্ডা দুহাত উপরে রেখেই ঘুরে দাঁড়াল। তার ভেতরে তখন ঝড় বইছে। সবই তো শেষ হয়ে যাচ্ছে। এখন শেষ চেষ্টা করেই সে মরবে।
লিন্ডার মাথার উপরে তোলা দু হাত কান বরাবর নেমে এসেছে। তার হাত থেকে ঘাড়ের আস্তিনে গুঁজে রাখা রিভলবারের বাটের দূরত্ব তিন ইঞ্চির বেশি হবে না।
ওদিকে আহমদ মুসা গুটি গুটি এগিয়ে এসে বসে পড়েছে মেঝেয়। হ্যান্ডকাফে বাধা দু হাত এগিয়ে নিচ্ছে সে ‘উজি’ কারবাইনটার দিকে। সে বুঝেছে লিন্ডা তার জন্যেই অস্ত্রটাকে তার দিকে ছুঁড়ে দিয়েছে। মনে মনে লিন্ডার বুদ্ধির প্রশংসা করল আহমদ মুসা এবং ঠিক করল যা করবার ডোমান লোকটা আসার আগেই করতে হবে।
লিন্ডা ঘুরতেই জোয়াও বলে উঠল, ‘লিন্ডা পেছন ফিরেই থাকো, মুখটা দেখাতে লজ্জা…।’ কথা শেষ করতে পারল না জোয়াও। লিন্ডার ডান হাতে উঠে এসেছে আস্তিনে গুজে রাখা রিভলবার এবং চোখের পলকে তা থেকে ছুটে যাওয়া গুলী গিয়ে বিদ্ধ করল জোয়াও-এর ডান কাঁধের প্রান্তের ডান বাহুর সন্ধিস্থলকে।
আহমদ মুসার দুহাতে উঠে এসেছিল ‘উজি’টা।
লিন্ডার গুলীর প্রায় সাথে সাথেই আহমদ মুসার উজিটাও গর্জন করে উঠল এবং এক ঝাঁক গুলী গিয়ে ডোমান, জোয়াও এবং সিড়ির গোড়ায় দাড়ানো তিনজনকে ঘিরে ধরল।
পাঁচটি দেহই ভুলুণ্ঠিত হলো।
ঘুরে দাঁড়াল লিন্ডা। বলল আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে, ‘ধন্যবাদ মি. আহমদ মুসা। একবার মেয়েকে রক্ষা করেছিলেন, এবার আমাকে রক্ষা করলেন।’
‘ধন্যবাদ আমিই তো আপনাকে দেব। আপনিই …।’
কথা শেষ করতে পারলো না আহমদ মুসা। লিন্ডা তার কথায় বাধা দিয়ে বলল, ‘আপনার হাত-পায়ের লোহার কড়া এখন কিভাবে খুলব বলুন। নিচের লোকরা উপরে এসে পড়তে পারে।’
‘আপনার রিভলবার দিযে কড়া দুটোর লক-এ গুলী করুন।’ বলল আহমদ মুসা।
সঙ্গে সঙ্গে লিন্ডা হাতের রিভলবার তুলে গুলী করল লকের কিহোল দুটোর উপর।
খুলে গেল আহমদ মুসার হাত-পায়ের কড়া।
আহমদ মুসার হাতেই ছিল ‘উজি’টা, উঠে দাঁড়াল সে।
লিন্ডা চলতে শুরু করে বলল, ‘আসুন মি. আহমদ মুসা।’
লিন্ডা জোয়াও-এর পাশে গিয়ে থমকে দাঁড়াল।
জোয়াও-এর কাধে একটা গুলী লেগেছে। এছাড়া আরও দুটি গুলী লেগেছে। একটা পাঁজরে, অন্যটি বাম বাহুতে।
বলল লিন্ডা তাকে লক্ষ্য করে, ‘তোমাকে মারতে চাইনি এবং মারব না জোয়াও। তোমার হাতে গুলী করেছিলাম লেগেছে কাঁধে। তুমি এভাবে গুরুতর আহত হবার জন্যে আমি দু:খিত। তোমার লোকদের বলছি তোমাকে হাসপাতালে নিতে।’
বলে হাঁটতে শুরু করেই আবার থমকে দাঁড়াল লিন্ডা। বলল, ‘তুমি আমাকে এবং আমার ক্রিস্টিনাকে হত্যা করতে চাইবে। আমি আর মৃত্যুকে ভয় করি না। বিদেশী একজন ভালো মানুষ আহমদ মুসাকে মুক্ত করতে পেরে আমি খুশি এবং এইভাবে আমার পিতৃপুরুষের পবিত্র সম্পদ তোমার হাত থেকে রক্ষা করতে পারলে আমি খুশি হবো।’
কথা শেষ করেই আবার হাঁটতে শুরু করল লিন্ডা।
তার পেছনে পেছনে চলল আহমদ মুসা। উঠে এল তারা দু’তলার বারান্দায়।
বলল লিন্ডা আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে, ‘নিচে এদের আরও কিছু লোক আছে। তাদের সাফ করতে পারলেই আপনি ঘাটে পৌঁছবেন। সেখানে একাধিক বোট আছে। আমি কি …।’
লিন্ডার কথার মাঝখানে আহমদ মুসা বলে উঠল, ‘না আরও কিছু আছে নিচে। এদের একদল শিকারী কুকুর আছে, যারা বন্দুকধারী লোকদের চেয়েও বেশি বিপজ্জনক। এছাড়া পাতা আছে বিদ্যুতের ফাঁদ।
লিন্ডা আহমদ মুসার খালি পায়ের দিকে তাকিয়ে হাসল। বলল, ‘আহমদ মুসা অবশ্যই সব কিছু জানবেন, সেটাই স্বাভাবিক। আমি আপনাকে রাবার সোলের এক জোড়া জুতা দিচ্ছি। সেটা পায়ে থাকলে বিদ্যুতের ফাঁদ কোন কাজে আসবে না। ওরা বন্দীদের খালি পায়ে এ জন্যেই রাখে যাতে বন্দী পালালে খালি পায়ে পালাতে বাধ্য হয়।’
কথাটুকু শেষ করে একটু দম নিয়েই আবার বলে উঠল, ‘কুকুরগুলো আমাকে চেনে। ওদের ভয় নেই। ওদের পার করে দিয়ে আসব আমি আপনাকে।’
‘আসব মানে, আপনি যাবেন না আমার সাথে?’
‘কোথায় যাব?’
‘আপাতত আমার সাথে বের হবেন। জোয়াও তো এখনি আপনাকে ও আপনার মেয়েকে মেরে ফেলবে।’ আহমদ মুসা বলল। ‘কোথাও গিয়েই আমি জোয়াও এর হাত থেকে বাঁচতে পারব না। ওদের ‌কিনিক কোবরা’র হাত থেকে কারও নিস্তার নাই। সুতরাং আমি পালিয়ে কারও আশ্রয়ে গিয়ে আরো অনেককে বিপদগ্রস্ত করতে চাই না।’ থামল একটু।
কিন্তু আহমদ মুসা কথা শুরু করার আগেই আবার বলে উঠল, ‘একটু দাঁড়ান, আমি আপনাকে জুতা এনে দেই।’
বলেই ছুটল জোয়াও-এর পাশের ঘরে। সেখান থেকে একটা কেটস এনে আহমদ মুসাকে দিল। বলল, ‘পরে নিন।’
আহমদ মুসার জুতা পরা হলে বলল, ‘চলুন আপনাকে কুকুর বাহিনীর রাজত্ব পার করে দিয়ে আসি।’
‘না আপনি আসবেন না, আমার সাথে যেতে হবে আপনাকে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘আমি কি বলেছি বুঝেছেন তো?’ বলল লিন্ডা।
‘বুঝেই বলছি। আপনাকে মৃত্যুর মুখে ফেলে আমি যাবনা। এই আমি বসলাম।’ বলেই সত্যিই বসে পড়ল আহমদ মুসা।
একটু বিব্রত হলো লিন্ডা। একটু ভাবল। তারপর বলল, ‘আপনি নিজে বিদেশী। আপনি দয়া করে বিপদ বাড়াবেন না। আমার ব্যাপারটা আমার উপর ছেড়ে দিন।’
‘ঠিক আছে, তাহলে আমি সাথেই থাকছি। কি হয় সেটা দেখেই আমি যাব।’ আহমদ মুসা বলল।
‘প্লিজ দয়া করে আমার সাথে আপনাকে জড়াবেন না। আমি জানি আপনার জীবন অনেক মূল্যবান। দুনিয়ার অনেক কাজ হবে আপনাকে দিয়ে।’ বলল লিন্ডা।
‘আমার এই মুহূর্তের কাজ হলো, আপনাকে এবং ক্রিস্টিনাকে রক্ষা করা। সুতরাং আমাকে আপনাদের সাথেই থাকতে হবে।’ আহমদ মুসা বলল।
লিন্ডা চোখ তুলে আহমদ মুসার দিকে একবার তাকাল। বুঝল, আহমদ মুসা যা বলছে তাই করবে। বলল, ‘ঠিক আছে। আপনি একটু দাঁড়ান আমি ক্রিস্টিনাকে নিয়ে আসি।’
বলেই সে দৌড়ে উপরে উঠতে লাগল।
আহমদ মুসা দাঁড়াল দোতলার সিঁড়ির মুখে। আহমদ মুসার মাথায় নানা চিন্তা ঘুর পাক খাচ্ছে। লিন্ডা জোয়াওকে মারতে চায় না, আবার জোয়াও-এর হাতে সে ও ক্রিস্টিনা মরবে, কোথাও গিয়ে বাঁচবেনা, এ ব্যাপারে লিন্ডা নিশ্চিত। তাহলে সে জোয়াওকে মারতে চায়না কেন? জোয়াও-এর সাথে লিন্ডার কি সম্পর্ক?
তারা অবশ্যই স্বামী-স্ত্রী নয়। তাহলে ক্রিস্টিনা কি জোয়াও-এর মেয়ে? তারা কি বন্ধু ছিল? বা এখনও আছে? লিন্ডার পিতৃপুরুষের সম্পদের বিষয়টা কি? কেন লিন্ডা জীবন দিয়েও সে সম্পদ জোয়াও-এর হাত থেকে বাঁচাতে চায়? সব সম্পদ দিয়ে হলেও সবাই নিজেকে বাঁচাতে চাইবে, এটাই তো সাধারণ প্রবণতা?
আহমদ মুসা একটু আনমনা হয়ে পড়েছিল। সিঁড়িতে পায়ের শব্দে সম্বিত ফিরে পেল সে। তাকাল সিঁড়ির দিকে। চারজন উঠে আসছে সিঁড়ি দিয়ে। তাদের চারজনের হাতে মিনি মেশিনগান ‘উজি’। একজেনর ‘উজি’ আহমদ মুসার দিকে তাক করা।
আহমদ মুসার ‘উজি’টা ঝুলছে তার হাতে।
কি করণীয় দ্রুত ভাবছে আহমদ মুসা।
এ সময় আহমদ মুসার পেছনে তিন তলার সিড়ির দিক থেকে একটা গুলীর শব্দ এল।
সিঁড়ি দিয়ে উঠে আসা চারজনের যে লোকটির ‘উজি’ আহমদ মুসার দিকে তাক করা ছিল তার হাত থেকে ‘উজি’টা ছিটকে পড়ে গেল। আর লোকটি আর্তনাদ করে উঠে তার গুলীবিদ্ধ ডান হাতটি বাঁ হাত দিয়ে চেপে ধরে বসে পড়ল।
আহমদ মুসা শব্দ শুনেই বুঝতে পেরেছিল লিন্ডা তিন তলার সিঁড়ি দিয়ে নামছে। সেই গুলী করেছে। আহমদ মুসাও এক মুহূর্ত নষ্ট করেনি। লোকটির হাত থেকে ‌‌‌‌‌‌‌‍‍‍‍‍‍‍‘উজিটি’ ছিটকে পড়ার সাথে সাথেই আহমদ মুসার ‘উজি’ উঠে এসেছিল সিঁড়ি দিয়ে উঠে আসা অবশিষ্ট তিনজনের লক্ষ্যে।
আহমদ মুসা ‘উজি’র ট্রিগার চেপে ধরেছিল বেশ কয়েক সেকেন্ড। গুলি বৃষ্টি গিয়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠে আসা চারজনকেও ঝাঁঝরা করে দিল।
ক্রিস্টিনাকে নিয়ে নেমে এসেছে লিন্ডা।
এসে দাঁড়াল সে আহমদ মুসার পাশে।
আহমদ মুসা তার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ধন্যবাদ লিন্ডা দ্বিতীয়বার আপনি গুলীর মুখ থেকে আমাকে বাঁচালেন। ’
‘লজ্জা দেবেন না। আপনার চোখ তো সিঁড়ির দিকে ছিল। কিন্তু ওরা উঠে আসছে তা টের পেলেন না কেন?’ বলল লিন্ডা।
হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘স্যরি, একটা ভাবনায় ডুবে গিয়েছিলাম।’
‘এমন জরুরী ভাবনাটা কি?’ বলল লিন্ডা।
‘বলব এক সময়, এখন আসুন, চলি।’ আহমদ মুসা বলল।
চলতে শুরু করে ক্রিস্টিনাকে লক্ষ্য করে বলল, ‘এস মা ক্রিস্টিনা।
আমাকে এবং ক্রিস্টিনাকে আগে যেতে হবে মি. আহমদ মুসা। দরজা পেরোলেই কিন্তু ছুটে আসবে কুকুর বাহিনী।’ বলে লিন্ডা ক্রিস্টিনার হাত ধরে আহমদ মুসাকে ডিঙিয়ে আগে চলতে শুরু করল।
‘নিচে কি এদের আরও লোক আছে?’ জিজ্ঞেস করল আহমদ মুসা।
‘মনে হয় নেই। এত গুলী গোলার শব্দ শোনার পর কেউ বাইরে থাকার কথা নয়। ‘কিনিক কোবরা’র যারা সুরিনামে এসেছে, তাদের বেশির ভাগই থাকে মূল শহরে। জোয়াও-এর কয়জন খাস লোকই শুধু এখানে থাকে, এখানকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্যে।’
তারা এক তলায় নেমে এল।
এক তলায়ও কাউকে দেখা গেল না।
বাইরে বেরুবার গেটে এসে পৌঁছল তারা। গেটের বাইরে একটা ফাঁকা চত্বর। এ চত্বরটা বাড়িটাকে চারদিক থেকে ঘিরে আছে। এ চত্বরটাকেই পাহারা দেয় কুকুর বাহিনী।
চত্বরটার পর পানির ধার ঘেঁষে চারদিক জুড়ে ঘিরে আছে কাঁটাতারের বেড়া।
গেট খুলে প্রথম বেরুল লিন্ডা। তার সাথে ক্রিস্টিনা। সবশেষে আহমদ মুসা।
গেট থেকে পাথর বিছানো একটা পথ চলে গেছে ঘাট পর্যন্ত। ঘাট পাওয়ার আগে কাঠের তৈরি আরেকটা গেট পার হতে হয়। দুই দিক থেকে কাঁটাতারের বেড়া এসে রাস্তাটার দু’প্রান্তে শেষ হয়েছে। দু’প্রান্তের বেড়াকে সংযোগ করে দাঁড়িয়ে আছে গেটটা। গেটের নিচের রাস্তায় বসানো হয়েছে একটা ইস্পাতের বড় শীট। গেটের এপ্রান্ত-ওপ্রান্ত জুড়েই রয়েছে শীটটা। গেট পার হতে হলে এই লোহার শিটে সবাইকে পা রাখতে হবে।
আহমদ মুসারা বাড়ি থেকে বের হওয়ার প্রায় সাথে সাথেই দুদিক থেকে ছুটে এল পাঁচ ছয়টা কুকুরের একটা দল। তাদের মুখে হিংস্র হুংকার। কুকুর গুলোর জ্বলন্ত চোখগুলো যেন আহমদ মুসাকে পুড়িয়ে ছারখার করে দিতে চায়।
আহমদ মুসা দাড়িয়েছে লিন্ডা ও ক্রিস্টিনার মাঝখানে।
লিন্ডা ও ক্রিস্টিনা দুজনেই হাত তুলে মুখে এক প্রকার শব্দ করে কুকুরগুলোকে শান্ত করার চেষ্টা করল।
লিন্ডা ও ক্রিস্টিনার কথায় কুকুরগুলো শান্ত হলো ও লেজ নাড়তে শুরু করল। নিশ্চয় কুকুরগুলো বুঝেছে আহমদ মুসা অপরিচিত হলেও অনাত্মীয় নয়।
ধীরে ধীরে ফিরে গেল কুকুরগুলো।
তিনজন এগিয়ে চলল ঘাটের দিকে।
সবার সামনে ছিল লিন্ডা।
লিন্ডা কাঠের গেটটা খুলতে খুলতে বলল, ‘গেটের নিচে রাস্তার উপর এই যে আইরন শীটটা দেখছেন, তা সম্পূর্ণটাই বিদ্যুতায়িত এবং বাড়ির চারদিক ঘিরে এই যে কাঁটাতারের বেড়া দেখছেন এটাও বিদ্যুত্ বহন করছে। এই বাড়িতে আটক কোন বন্দী পালাতে গেলে ভেতরের প্রহরী ও বাইরের কুকুরের হাত থেকে কোনভাবে বাঁচলেও কাটাতারের বেড়া অথবা গেটের এই বৈদ্যুতিক ফাঁদ থেকে বাঁচতে পারবেনা।’
‘কিন্তু আমি বেঁচে গেলাম। যাদের বাঁচার কথা, তারা এভাবেই বেঁচে যায়।’ বলল আহমদ মুসা।
‘তা ঠিক।’ বলল লিন্ডা।
ঘাটে পৌঁছল তারা।
ঘাটে একটা বোট বাঁধা আছে।
বোটটি আটলান্টিকের অব্যাহত তরঙ্গ দোলায় অবিরাম দুলছে। লিন্ডা গিয়ে বোটে উঠল এবং ক্রিস্টিনাকে হাত ধরে বোটে তুলল।
আহমদ মুসা বোটে উঠতে উঠতে বলল, ‘একটিই তো বোট দেখছি। আমরা নিয়ে গেলে এরা তো আটকা পড়ে যাবে।’
‘না আশে-পাশে কিংবা বন্দর এলাকায় এদের আরও বোট আছে। ওগুলো কালোবাজারিতে লিপ্ত। মোবাইলে সংকেত পেলে সংগে সংগেই চলে আসবে।’ বলল লিন্ডা।
‘তাহলে এখনও আমরা বিপদমুক্ত নই! ওরা মোবাইল করলে বোটগুলো আমাদের ধাওয়া করতে পরে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘তা পারে, যদি জোয়াও তাদের মোবাইল করতে পারে। কিন্তু জোয়াও এর কাছে মোবাইল নেই। জ্যাকেটসহ তার মোবাইলটা ছিল সিঁড়ি ঘরের বাইরের রেলিং-এ। আমি মোবাইলটা নিয়ে এসেছি।’ বলল লিন্ডা।
‘ধন্যবাদ আপনাকে । এ পর্যন্ত আপনার প্রত্যেকটা কাজই একজন ঝাঁনু গোয়েন্দার মত ।’
আমহদ মুসা বলল।
হাসল লিন্ডা। ম্লান হাসি। বলল, ‘আমি কিনিক কোবরা’র সদস্য ছিলাম না । কিন্তু অনেক বছর থেকে তাদের দেখছি । সুতরাং কিছু তো শেখার কথা।’
‘আপনি কিনিক কোবরা’র সদস্য নন, কিন্তু তারা আপনাকে তাদের কাজ দেখতে দিচ্ছে কেন?’ আহমদ মুসা বলল।
ম্লান হয়ে গেল লিন্ডার মুখ।
কিছু বলতে যাচ্ছিল লিন্ডা, কিন্তু তার আগেই ক্রিস্টিনা বলল, ‘ঘুম পাচ্ছে আম্মা আমার ।’
ব্যস্ত হয়ে উঠল লিন্ডা। বলল, ‘মি. আহমদ মুসা আমি আসছি ওকে শুইয়ে দিয়ে।’
বলে ক্রিস্টিনাকে নিয়ে দোতলার কেবিনে উঠার জন্যে অগ্রসর হলো লিন্ডা।
‘ঠিক আছে আপনি আসুন। আমি ততক্ষণে বোট স্টার্ট দিয়ে দেই।’
বলে আহমদ মুসাও এগুলো বোটের ইঞ্জিনের দিকে।
মিনিট পাঁচেক পর ফিরে এল লিন্ডা । বসল সে আহমদ মুসার ড্রাইভিং চেয়ারের পাশের চেয়ারটায়।
লিন্ডা বসতেই আহমদ মুসা বলে উঠল, ‘আপনি ক্রিস্টিনাকে আনতে গেলে দোতলার সিঁড়ির মুখে দাঁড়িয়ে আমি আপনার কথাই ভাবছিলাম।’
‘কি ভাবছিলেন?’ ম্লান কণ্ঠ লিন্ডার।
‘আমি ভাবছিলাম, আপনি সুযোগ পেয়েও জোয়াও কে মারলেন না, অথচ জোয়াও আপনাকে ও ক্রিস্টিনাকে মেরে ফেলবে, এটা আপনি নিশ্চিতভাবে জানেন। আপনাকে আমি বলতে শুনেছি আপনার পিতৃপুরুষের পবিত্র সম্পদ তার হাত থেকে রক্ষা করতে চান। আপনার সাথে জোয়াও-এর সম্পর্কটা কি? আপনার পিতৃপুরুষের সম্পদ পবিত্রই বা হলো কি করে? এসব প্রশ্নই আমার মাথায় তখন কিলবিল করছিল।’
প্রায় এক নিশ্বাসে কথাগুলো বলে গেল আহমদ মুসা।
আহমদ মুসা থামলেও কথা বলল না লিন্ডা। তার মুখ নিচু এবং ম্লান। ভাবছিল সে। একটু পর মুখ তুলল লিন্ডা। বলল, ‘প্রশ্নগুলোর উত্তর অনেক কাহিনীর সাথে জড়িত। এক অখ্যাত-অজ্ঞাত ভাগ্যাহত মহিলার সে কাহিনী আপনার শুনে কি লাভ!’
‘কি লাভ হবে আমি জানি না। কিন্তু জোয়াও-এর কারাগার থেকে আপনার দ্বারা মুক্তি লাভের মাধ্যমে যে লাভ আমি পেয়েছি, তাতে এ জিজ্ঞাসার জবাব আমার জানা দরকার।’
আহমদ মুসা বলল।
‘আপনি আমাকে দয়া করতে চান, তাই না?’ বলল লিন্ডা।
‘হ্যাঁ। কারণ আপনি আমাকে দয়া করেছেন।’ আহমদ মুসা বলল।
উত্তরে কিছু বলল না লিন্ডা।
মুখ নিচু করে চুপ করে থাকল কিছুক্ষণ। একটু পর মুখ তুলল। তাকাল আহমদ মুসার দিকে। লজ্জামিশ্রিত এক টুকরো ম্লান হাসি ফুটে উঠল তার ঠোঁটে। বলতে শুরু করল, ‘আমার পুরো নাম লিন্ডা লোরেন। আমরা ও জোয়াও লেগার্টরা গুয়েতেমালার রাজধানী গুয়েতেমালা শহরের এক অভিজাত এলাকায় প্রতিবেশী ছিলাম। আমার আব্বা ছিলেন জাতি-সংঘের একটা এজেন্সীর কর্মকর্তা, আর জোয়াও লেগার্টের আব্বা ছিলেন একজন ধনী রাজনীতিক। আমরা একই স্কুলে পড়তাম। আমরা খুব ঘনিষ্ঠ ছিলাম। পরে আমি উচ্চতর লেখাপড়ার জন্যে চলে যাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় এবং অবশেষে পেশা হিসবে বিমান বালার চাকুরী গ্রহণ করি সেন্ট্রাল আমেরিকান এয়ার লাইন্সে। আমি বিমানবালা হিসেবে খুব সফল হই দীর্ঘদেহী ও একটু ভিন্নতর চেহারা হওয়ার কারণেই। একজন পাইলটকে বিয়ে করি। কিন্তু দুর্ভাগ্য ক্রিস্ট্রিনা হওয়ার কিছুদিন পর আমার স্বামী বিমান দুর্ঘটনায় মারা যান। আমি ফিরে আসি গুয়েতেমালায় বাবার কছে। তখন তিনি জাতিসংঘের চাকুরী থেকে অবসর নিয়ে গুয়েতেমালার স্থায়ী বাসিন্দা হয়েয়েছন। আমি গুয়েতেমালায় আসার পর জোয়াও লেগার্টের সাথে ঘনঘন দেখা হওয়া শুরু হয়। আগের সেই সম্পর্ক আবার ফিরে আসে। অনেক দিন পর বুঝতে পারি এই জোয়াও লেগার্ট আগের জোয়াও লেগার্ট নয়। তার পিতার রাজনৈতিক বিপর্যয়ের পর তার স্নেহময় সৎ রাজনীতিক পিতার প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ পরায়ণ হয়ে সে যোগ দেয় এক সন্ত্রাসী দলে। যখন আমি এ বিষয়টা জানতে পারি, তখন সে সন্ত্রাসী দল ‘কিনিক কোবরা’র এক নম্বর নেতা।’ তখন আমার আব্বা মারা গেছেন। অসহায় আমি তখন । সব জেনেও আমি জোয়াও লেগার্টের কাছ থেকে সরে যেতে পারিনি। জোয়াও তা হতে দেয়নি। ক্রিস্টিনার নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে এবং তার বড় হবার অপেক্ষায় আমার ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে কোরবানী দেই। সবশেষে আমাদের পবিত্র সম্পদ হস্তগত করার সে চেষ্টা করে, তাতে রাজী না হলে আমাদের দুই মা-বেটিকে হত্যা করার সে সিদ্ধান্ত নেয় এবং এজন্যে সে আমাকে ও আমার মেয়েকে গুয়েতেমালা থেকে সুরিনামে নিয়ে এসেছে। আর….।’
‘সুরিনামে কেন?’ লিন্ডার কথার মাঝখানে বলে উঠল আহমদ মুসা।
‘তাদের কথায় ‘অমূল্য সেই সম্পদ’ সুরিনামে আমার পিতৃপুরুষের ভিটার তলায় লুকায়িত আছে।’ বলল লিন্ডা।
‘পিতৃপুরুষের ভিটা কোথায়?’ জিজ্ঞেস করল আহমদ মুসা।
‘আমি ঠিক জানিনা, দলিলেই নাকি সব লেখা আছে। দলিলটা আমি ঠিক বুঝিনা। কৌতূহল বশে জোয়াও ওটা আমার কাছে থেকে নিয়ে অন্য কারো কাছ থেকে পড়িয়ে নেয়। তখন কিন্তু জোয়াও দলিলগুলোকে গুরুত্ব দেয়নি।’ কিন্তু রঙ্গলালদের এ্যাসাইনমেন্ট নিয়ে সুরিনাম আসার পর কি ঘটল আমি জানি না। হঠাৎ করে গুয়েতেমালায় ফিরে যায় এবং দলিলগুলো আমার কাছ থেকে নিতে চায়। তার উদ্দেশ্য নিয়ে আমার সন্দেহ হয়। তাছাড়া দলিলগুলো পিতার পবিত্র আমানত আমার কাছে। সেই আমানত আমি একজন সন্ত্রাসী নেতার হাতে দেব কেন? অথচ দেব না বলে রক্ষা পাওয়াও মুশকিল। অবশেষে আমি মিথ্যা বলি। তাকে জানাই যে, আমি যখন কিছু দিন আগে সুরিনাম গিয়েছিলাম ইউনেস্কোর এক সম্মেলনে তখন দলিলগুলো নিয়ে গিয়েছিলাম একজন পুরাতত্ববিদকে দেখাবার জন্যে। ওখানেই এক বিশ্বস্ত স্থানে রেখে এসেছি। সে আমার কথায় সন্দিগ্ধ হয়ে ওঠে এবং ভীষণ রেগে যায়। সে ভাবে, আমি দলিলগুলো নিয়ে কোন মতলব আঁটছি। সঙ্গে সঙ্গেই সে আমাকে ও ক্রিস্টিনাকে সুরিনাম নিয়ে আসে জোর করে এবং তখন থেকেই দলিলগুলো হাত করার জন্যে মরিয়া হয়ে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আগে আমি বুঝিনি দলিলগুলো সে কেন চায়। কিন্তু সুরিনাম এসে ধীরে ধীরে জানতে পারলাম, দলিলগুলোর মধ্যে ডায়াগ্রাম ও দিকনির্দেশনা আছে যা অনুসরণ করে আমার পিতৃপুরুষের রাখা বিশাল সম্পদ মাটির তলা থেকে তুলে আনা যাবে। এটা জানার পর আমি আরও শক্ত হয়ে যাই এবং জীবন গেলেও পবিত্র ঐ পৈত্রিক সম্পদ তার মত সন্ত্রাসীর হাতে যেতে দেবনা, এই সিদ্ধান্ত নেই।’
‘আপনার পৈত্রিক সম্পত্তি সুরিনামে কেন?’ জিজ্ঞেস করল আহমদ মুসা।
‘এর সবটুকু উত্তর আমার জানা নেই। তবু এটুকু বলতে পারি, আমি শুনেছি আমার গ্রেট গ্র্যান্ড ফাদার ছাত্র জীবনে সুরিনাম থেকে সান্টো ডোমিংগোতে চলে আসেন এবং সেখানেই স্থায়ী নিবাস গড়েন। দাদাও সান্টো ডোমিংগোতে বাস করেন। আব্বা লেখা-পড়া করেন ফ্লোরিডায়। সেখান থেকেই জাতিসংঘ সংস্থায় চাকুরী নিয়ে আসেন গুয়েতেমালায়। দাদার মৃত্যুর পর আব্বা গুয়েতেমালাতেই স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করেন। আব্বা দলিলগুলো পেয়েছিলেন দাদার কাছ থেকে। আব্বা এগুলো আমাকে দিয়ে যান। তিনি সুরিনামে আমাদের পুর্বপুরুষ ও আত্মীয়স্বজন সম্পর্কে তেমন কিছু জানতেন না। শুধু বলতেন দাদার কাছে তিনি শুনেছেন সুরিনামে ছিল তাদের বিরাট ও প্রাচীন পরিবার। রাজধানী পারামারিবো নাকি তাদেরই গড়া। যখন তাদের সুদিন ছিল, তখন তাদের বাড়িই প্রায় একটা শহর ছিল। দাদা কোনদিন যান নি। তবে আব্বা সুরিনামে তার পরিবারের জন্য গর্ব করতেন। এই গর্ব আমাদের মধ্যেও আছে। সুরিনামে এলে মন আকুলি-বিকুলি করে পরিবারের সন্ধান করার জন্যে। কিন্তু কিছুই তো জানি না এখানকার পরিবার সম্পর্কে।
‘দলিলে কিছু নেই এ সম্পর্কে?’ আহমদ মুসা বলল।
‘দলিল আমি পড়িনি। দলিলটা ইংরেজি ভাষায় নয়।’
‘তাহলে কি সুরিনামের ভাষায়?’
‘তাও নয়।’
‘তাহলে কি ভাষায়?’
‘আব্বাও পড়তে পারতেন না বলে আমিও কোনদিন ভাল করে দেখার চেষ্টা করিনি।’ বলল লিন্ডা।
‘দলিলটা কোথায়? আমাকে কি দেখানো যাবে?’ আহমদ মুসা বলল।
‘আপনাকে দেখাতে না পারলে দুনিয়ার কাউকে আর দেখানো যাবে না।’ বলল লিন্ডা।
‘এই বিশ্বাসের কারণ?’
‘কারণ অনেকগুলো। একটি হল, জীবনের প্রতি আপনার কোন লোভ নেই। দুনিয়ার প্রতি যার কোন লোভ থাকে না, দুনিয়ার সম্পদের প্রতিও সে কোন লোভ রাখে না। আরেকটি কারণ হল, আপনি মুসলমান।’ বলল লিন্ডা।
‘মুসলমানদের প্রতি আপনার এই পক্ষপাতিত্ব কেন?’ আহমদ মুসার জিজ্ঞাসা।
‘জানি না। তবে আমি এয়ার হোস্টেস থাকা কালে অনেক জাতির মানুষের সংস্পর্শে এসেছি। তাদের মধ্যে মুসলমানদেরকেই আমি মদ ও নারীর ব্যাপারে সবচেয়ে সংযত দেখেছি। আর তারা ধর্ম পালন করা জাতিও। প্লেনের মধ্যেও তারা প্রার্থনা করতে ভোলে না। আর সবচেয়ে বড় হল, দাদুর কাছে একটা শোনা কথা। তিনি বলতেন, আমাদের পরিবারের সাথে মুসলমানদের একটা যোগসূত্র রয়েছে। তাছাড়া আপনি মুসলমান জেনে সত্যিই আমার খুব খুশি লেগেছে।’
‘মিস লিন্ডা, আপনার কথা শুনে আমারও খুশি ও কৌতূহল দুই-ই সৃষ্টি হয়েছে। আপনার সেই দলিলগুলো কোথায়?’ আহমদ মুসা বলল।
হাসল লিন্ডা। বলল, ‘দলিলগুলো আমার এই হ্যান্ডব্যাগের তলায় চামড়ার দুই লেয়ারের মাঝখানে রয়েছে।’
‘আপনার নাইস বুদ্ধিতো!’ হেসে বলল আহমদ মুসা।
ততক্ষণে লিন্ডা লোরেন ব্যাগ থেকে ছোট করে একটা কাঁচি বের করে ব্যাগের তলা কাটতে শুরু করেছে। ব্যাগের একটা প্রান্ত কেটে ভেতরে দুই আঙ্গুল ঢুকিয়ে বের করে আনল কয়েকখণ্ড কাগজ। কাগজের ভাঁজ খুলতে লাগল লিন্ডা।
আহমদ মুসা কাগজের দিকে চেয়ে বলল, ‘মিস লিন্ডা, কাগজগুলো খুব প্রাচীন মনে হচ্ছে না।’
‘ঠিকই বলেছেন। এগুলো আসলে মূল দলিলের ফটোকপি। দেখেই বোঝা যায়। সম্ভবত আমার গ্রেট গ্রান্ডফাদার যখন ফাইনালি সুরিনাম থেকে চলে আসেন তখন দলিলগুলো ফটোকপি করে নিয়ে আসেন। মূল দলিল নিশ্চয় পরিবারের মূল অংশের সাথেই রয়েছে।’
এতক্ষণে কাগজগুলোর ভাঁজ খোলা হয়ে গেছে।
কথা শেষ করে একটু থেমেই আবার বলল, ‘দলিলগুলোর মধ্যে একটা পাল তোলা জাহাজের স্কেচ আছে, অর্ধ ডুবন্ত। পাশেই উপকূল। উপকূলের নাম ও জাহাজের নাম স্প্যানিশ ভাষাতেই লেখা আছে। জাহাজের নাম দেখছি সান্তামারিয়া এবং উপকূলের নাম দেখছি সুরিনাম কোস্ট।’ থামল লিন্ডা লোরেন।
‘কলম্বাসের প্রথম সমুদ্র যাত্রায় যে জাহাজগুলো ছিল, তার একটির নাম সান্তামারিয়া। কিন্তু কলম্বাসের প্রথম অভিযানতো সুরিনাম কোস্ট পর্যন্ত আসেনি। তাহলে এখানে সান্তামারিয়া ডুববে কেন?’ বলল আহমদ মুসা।
‘মি. আহমদ মুসা, বোটের হুইলটা আমি ধরেছি। আপনি এ কাগজগুলো একটু দেখুন। আপনি বুঝতে পারেন কি না। দলিলগুলোর মধ্যে সান্তামারিয়াকে সুরিনাম কোস্টে যখন ডুবতে দেখেছি তখন দলিলগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য থাকতে পারে।’
বলে লিন্ডা উঠে বোটের হুইলটা ধরল এবং আহমদ মুসা ড্রাইভিং সিট থেকে পাশের সিটে সরে এল।
আহমদ মুসা চেয়ারে বসে ডেক টেবিল থেকে তুলে নিল দলিলগুলো। দলিলগুলোর উপর নজর পড়তেই ভূত দেখার মত চমকে উঠল আহমদ মুসা। দলিলগুলো সবই আরবীতে লেখা। দ্রুত চোখ বুলাল সে। প্রথম দলিলটির শিরোনাম ‘আমার কথা’। দ্রুত পাতা উল্টিয়ে শেষ পাতায় দেখল নাম স্বাক্ষর ‘আব্দুর রহমান আত-তারিক’। পরিচয় লেখা আছে ‘ক্যাপ্টেন, শিপ সান্তামারিয়া।’ দ্বিতীয় দলিলটির শিরোনাম ‘আল্লাহর দান আল্লাহর জন্যে’। এ দলিলেরও শেষ পাতায় সেই একই স্বাক্ষর ও একই পরিচয়। তৃতীয় দলিলটা হল ‘সান্তামারিয়া জাহাজের স্কেচ’। এর শিরোনাম আগামী দিনের সুরিনামিদের জন্যে সুভেনীর। এখানেও ঐ একই স্বাক্ষর এবং পরিচয়।
বিস্ময়-আনন্দে বোবা হয়ে গেল আহমদ মুসা। তার মনে এখন আর কিছুমাত্র সন্দেহ নেই, টেরেক দুর্গেরই এসব দলিল পত্র। টেরেক, মানে আল-তারিক দুর্গের প্রতিষ্ঠাতা সান্তামারিয়া জাহাজের ক্যাপ্টেন আব্দুর রহমান আল-তারিক! এটা মুসলিম দুর্গ! সম্ভবত সমগ্র দক্ষিণ আমেরিকার এটাই প্রথম এবং হয়তো একমাত্র মুসলিম নির্মিত দুর্গ। আর ওভানডোরা এবং লিন্ডা লোরেনরা একই পরিবার।
আরও কতক্ষণ আহমদ মুসা বিস্ময় ও আনন্দের সমুদ্রে সম্বিতহারা হয়ে থাকতো কে জানে। কিন্তু লিন্ডা লোরেনের কথায় সম্বিত ফিরে পেল আহমদ মুসা। লিন্ডা লোরেন বলছিল, ‘কি ব্যাপার মি. আহমদ মুসা, আপনি এরকম হয়ে গেলেন কেন? ভূত দেখলেন নাকি?’
আহমদ মুসা ধীরে ধীরে মুখ তুলল। বলল, ‘না মিস লিন্ডা, ভূতের চেয়ে বড় কিছু।’
‘কি ব্যাপার?’ বলল লিন্ডা। তার চোখে-মুখে উদ্বেগ।
‘জানেন, দলিলগুলো আরবীতে লেখা।’
‘আঁকা-বাঁকা হাতের লেখা দেখে আমি বুঝতে পারি নি। তবে শুনেছি বিদেশী ভাষায় লেখা। কিন্তু এর কারণ কি? আরবী ভাষায় কেন?’ বলল লিন্ডা।
‘শুধু আরবী ভাষার কথা নয়। যার দলিল তিনি একজন মুসলমান!’ আহমদ মুসা বলল।
‘মুসলমান?’ চোখ কপালে তুলে বলল লিন্ডা লোরেন।
‘হ্যাঁ। নাম আব্দুর রহমান আল-তারিক।’
‘তার মানে আমাদের পূর্বপুরুষ মুসলমান এবং তার নাম আব্দুর রহমান আল-তারিক?’ প্রায় চিৎকার করে বলল লিন্ডা লোরেন। তার চোখে-মুখে আবার বিস্ময়।
‘আমিও বিস্মিত মিস লিন্ডা। কিন্তু বিস্মিত এই কারণে যে, আমার অপূর্ণ জিজ্ঞাসার জবাব এই দলিলে মিলবে তা ভাবিনি।’ বলল আহমদ মুসা।
‘বুঝলাম না মি. আহমদ মুসা।’
‘আপনার অপূর্ণ জিজ্ঞাসাটা কি ছিল?’ লিন্ডা বলল।
মুখে হাসি টেনে আহমদ মুসা বলল, ‘আমার দ্বিতীয় জিজ্ঞাসা ছিল, আপনার পরিচয় সম্পর্কে আপনার পিতৃপুরুষের বিশাল স্টেট ধ্বংস প্রাপ্ত দুর্গে মুসলমানদের প্রার্থনা গৃহ মসজিদের ধ্বংসাবশেষ রয়েছে। আপনার আত্মীয়-স্বজনরা এখনও সেখানে বসবাস করেন।’
লিন্ডা লোরেনের চোখে বিস্ময়। বলল, ‘আমার পূর্ব পুরুষের স্টেট আছে, তাদের ভাঙ্গা দুর্গ আছে, আমি জানি না। আপনি জানলেন কি করে?’
হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘আপনার পূর্ব পুরুষের স্টেটেই তো আপনাকে নিয়ে যাচ্ছি।’
‘সেটা আমার জন্য মহা আনন্দের কথা। কিন্তু আমার প্রশ্নের জবাব তো দিলেন না, আমার পিতৃ পুরুষের পরিবার, তাদের স্টেট আপনি চিনলেন কি করে?’ বলল লিন্ডা।
‘আমি সেখানে থাকি। আপনার পিতৃপুরুষের পরিবারের আমি অতিথি।’ বলল আহমদ মুসা।
‘কিন্তু আপনি বিদেশী। পরিচয় হল কি করে তাদের সাথে?’ জিজ্ঞেস করল লিন্ডা।
আহমদ মুসা ওভানডোকে কিভাবে উদ্ধার করে, তারপর কি সব ঘটে এবং কিভাবে সে তাদের স্থায়ী অতিথি হয়ে গেল, বলল সব সংক্ষেপে।
‘ধন্যবাদ মি. আহমদ মুসা। অশেষ ধন্যবাদ ঈশ্বরকে। আমার জীবনের সবচেয়ে খুশির দিন আজ। সৌভাগ্য যে আপনার সাথে দেখা হয়েছিল। এখনও আমার কাছে সবকিছু স্বপ্ন বলে মনে হচ্ছে। ঈশ্বর এ সৌভাগ্যস্বপ্ন যেন ভেঙ্গে না দেন।’ বলল লিন্ডা।
‘আপনার চেয়ে আমার আনন্দ কম নয় মিস লিন্ডা। সুদূর সুরিনামে এসে যদি দেখি যে আধুনিক সুরিনামের প্রতিষ্ঠাতা একজন মুসলমান, আমার ভাই, তাহলে আনন্দ রাখার জায়গা কি থাকে?’ আহমদ মুসা বলল।
‘আমার পূর্ব পুরুষ আব্দুর রহমান আল-তারিককে যদি আপনি ভাই বলেন, তাহলে আমি তো আপনার বোন হয়ে গেলাম।’
‘বোন হয়ে গেলেন নয়, বোন হয়ে গেছেন। কিন্তু একটা কথা স্মরণ করিয়ে দেই, আব্দুর রহমান আল-তারিক মুসলমান ছিলেন। কিন্তু বোন লিন্ডা লোরেন কিন্তু আব্দুর রহমান আল-তারিকের ধর্মে নেই।’
‘দেখুন ভাইজান, আমি তো আগেই বলেছি মুসলমানদের আমার ভাল লাগে। আহমদ মুসার বোন হওয়ার আগে মুসলমানদের ভাল লেগে থাকলে, আহমদ মুসার বোন হবার পর এবং পিতৃপুরুষের মুসলিম পরিচয় পাবার পর মুসলমান হবার বাকি থাকে কি!’ বলল লিন্ডা।
‘ধন্যবাদ বোন। এটা আমার জন্য আরেকটা খুশির খবর।’ আহমদ মুসা বলল।
‘বুঝা গেল আমি মুসলমান না হলে আপনার এই খুশিটা পেতাম না। আপনি তো সাম্প্রদায়িক খুব!’ হাসতে হাসতে বলল লিন্ডা লোরেন।
‘কল্যাণ গ্রহণ ও তার প্রতিষ্ঠায় একনিষ্ঠ হওয়া যদি সাম্প্রদায়িকতা হয়, তাহলে অবশ্যই আমি সাম্প্রদায়িক এবং সব মানুষেরই সাম্প্রদায়িক হওয়া উচিত।’ আহমদ মুসা বলল।
‘মুসলমানিত্ব ও কল্যাণকে তাহলে তো আপনি এক করে ফেলেছেন।’ বলল লিন্ডা।
‘আমি এক করে ফেলছি না। মুসলমানিত্ব ও কল্যাণ আসলেই এক। ইসলাম হল মানুষের জন্য স্রষ্টার মনোনীত জীবন-যাপন পদ্ধতি। মানুষের ইহকালীন সব কল্যাণ, পরকালীন মুক্তি এই জীবন-যাপন পদ্ধতির মধ্যেই নিহিত রয়েছে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘আপনি যা বললেন এই বিশ্বাসের প্রতি যদি একনিষ্ঠ হতে হয়, তাহলে তো মানুষকে এই পথে নিয়ে আসার জন্য শক্তি প্রয়োগও বৈধ, যেমন ঔষধ খাওয়ার জন্যে রোগীর উপর প্রয়োজন হলে ডাক্তার শক্তি প্রয়োগ করেন।’ বলল লিন্ডা লোরেন।
আহমদ মুসা হাসল। বলল, ‘ইসলাম ঔষধ নয়। রোগীর ঔষধ খাওয়া-না খাওয়ার পিছনে তার বেঁচে থাকা, না থাকার প্রশ্ন জড়িত। কিন্তু ইসলাম গ্রহণ করা- না করার সাথে এই প্রশ্ন জড়িত নয়। কল্যাণের পথ যদি মানুষ গ্রহণ না করে, তাহলে তার অকল্যাণ হবে। তখন সে অকল্যাণ থেকে সতর্ক হবে ও কল্যাণের পথে ফিরে আসতে চাইবে। তাকে এই পথে সাহায্য করতে হবে মাত্র। এজন্যই ইসলাম বা কল্যাণের পতাকাবাহীকে নিরন্তর কল্যাণের পথ মানুষের সামনে তুলে ধরতে হবে। মানুষ চাইলে তা গ্রহণ করবে, না চাইলে তা গ্রহণ করবে না। মানুষের মাথায় বাড়ি মেরে বা বাধ্য করে মানুষকে ইসলামের পথে আনা ইসলামের পথ নয়।’
‘তাহলে তো ইসলাম অর্থাৎ কল্যাণের প্রতিষ্ঠা হবে না।’ বলল লিন্ডা লোরেন।
‘কল্যাণের প্রতিষ্ঠা না হলে অকল্যাণের প্রতিষ্ঠা হবে। অকল্যাণের প্রতিষ্ঠা হলে মানুষ অকল্যাণ সম্পর্কে সতর্ক ও সচেতন হবে এবং কল্যাণের দিকে ফিরে আসবে। কল্যাণের পথ অব্যাহতভাবে মানুষের সামনে তুলে ধরে মানুষের এই পরিবর্তনকেই উৎসাহিত করতে হবে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘যদি মানুষের পরিবর্তন না হয়? অধিকাংশ মানুষ যদি কল্যাণের পথে না আসে?’ জিজ্ঞেস করল লিন্ডা।
‘যে আসবে না, তার পরিণতি সেই ভোগ করবে। দুনিয়াতে সে অকল্যাণের মধ্যে নিমিজ্জিত হবে এবং পরকালে তাকে জাহান্নামের শাস্তির স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। স্রষ্টা তো এজন্য পুরষ্কার ও শাস্তির জায়গা বেহেশত ও দোজখ দুই-ই সৃষ্টি করে রেখেছেন’।
‘তার মানে আপনি বলতে চাচ্ছেন, ইসলাম আইনের পথ, গণতন্ত্রের পথ এবং মানুষের স্বাধীন চিন্তাকে স্বীকার করে নেয়ার পথ।’ বলল লিন্ডা।
‘ঠিক স্বীকার করে নেয়া নয়। ইসলাম মানুষের অকল্যাণের পথে চলার স্বাধীন চিন্তাকে পরিবর্তন করার অবিরাম প্রচেষ্টা, কিন্তু সেটা গায়ের জোরে নয়, ঘৃণা ছড়িয়ে নয় কিংবা অসহযোগ করে নয়।’ আহমদ মুসা বলল।
‘তাহলে তো এটা আইন ও গণতন্ত্রের পথ হল।’ বলল লিন্ডা।
‘হ্যাঁ অবশ্যই।’
‘ঠিক আছে। তাহলে আপনি সাম্প্রদায়িক নন, চরমপন্থীও নন। কিন্তু একটা প্রশ্নের উত্তর দিন, অমঙ্গলের স্বাধীন চিন্তাকে আপনি গায়ের জোরে বাঁধা দিচ্ছেন না, আইনানুগ ও গণতন্ত্রের পথে তার পরিবর্তনের চেষ্টা করছেন, কিন্তু অমঙ্গলের পথচারীরা যদি গায়ের জোরে আপনার অর্থাৎ ইসলামের এই চেষ্টায় বাঁধ সাধে, তাহলে কি হবে?’
‘তাহলে এই বেআইনি ও অগণতান্ত্রিক বাঁধা ডিঙানোর সব বৈধ উপায়ই গ্রহণ করতে হবে। অমঙ্গল যে শক্তি নিয়ে আসবে, মঙ্গলের শক্তিকে তার চেয়ে বেশী শক্তি নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। তাতে যুদ্ধ লড়াই সবই হতে পারে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘আপনি অমঙ্গলের বেআইনি ও অগণতান্ত্রিক বাঁধা ডিঙানোর সব বৈধ পথ গ্রহণের কথা বলেছেন। এখানে ‘বৈধ পথ’ বলতে কি বোঝাতে চেয়েছেন?’ বলল লিন্ডা।
‘যারা বাঁধা দিতে আসছে, যারা লড়াই করতে আসছে, তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করুন। কিন্তু প্রত্যক্ষ লড়াই-এ নেই এমন অসামরিক, নিরপরাধ মানুষ, নারী, শিশুকে হত্যা করা, নির্যাতন করা বৈধ পথ নয়। প্রত্যক্ষ যুদ্ধের সাথে সংশ্লিষ্ট না হলে শত্রুপক্ষের হলেও ধর্মস্থান, ফসলের ক্ষেত, বাগান ইত্যাদি ধ্বংস করাও বৈধ কাজ নয়। ইসলাম এগুলোকে অবৈধ ঘোষণা করেছে।’
আহমদ মুসা বলল।
থামল আহমদ মুসা। প্রশান্ত মুখ লিন্ডার। আহমদ মুসা থামার পর একটু ভেবে নিয়ে সে বলল, ‘আইন ও গণতন্ত্রের পথে চলেও এবং মানুষের মঙ্গল কামনা করে কল্যাণের পথে চলার পরেও কিন্তু ইসলাম যুদ্ধ বন্ধ করতে পারল না ভাইজান।’
‘পৃথিবী যতদিন থাকবে, আদম ও ইবলিসও ততদিন থাকবে এবং ইবলিস- আদমের শান্তির সংসারে হানা দেবেই। তাই আদম অর্থাৎ মঙ্গলের শক্তি চাইলেও যুদ্ধ-লড়াই বন্ধ হচ্ছে না।’ থামল আহমদ মুসা।
কথা বলল না লিন্ডাও। ভাবছিল সে। একটু পর বলল, ‘এসব ভারী কথা এখন থাক ভাইজান। দলিলগুলোতে কি আছে তা দেখতে অনুরোধ করেছিলাম আমি।’
আহমদ মুসা প্রথম দলিলটা তার চোখের সামনে তুলে ধরল। ডেক টেবিলের আলোটা এডজাস্ট করে নিয়ে বলল, ‘বোন আমি অনুবাদটাই শুধু আপনাকে শোনাচ্ছি। শুনুন।’ বলে আরবীটা আস্তে আস্তে পড়ে অনুবাদটা জোরে বলতে লাগলঃ
‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম। আমি আমার ভবিষ্যত বংশধরদের জন্য কিছু কথা লিখে যাচ্ছি। আমার মাতৃভাষা আরবীতেই লিখছি। স্বর্ণভাণ্ডারের নির্দেশিকা দলিলটাও আরবীতে লিখলাম। কারণ, আমি চাই আরবী পাঠোদ্ধারের মত এক উপযুক্ত সময়ে আল-তারিক দুর্গের ইতিহাস ও দুর্গের তলার স্বর্ণভাণ্ডার আমার বংশধরদের হাতে পড়ুক। আমি চাই, আল্লাহর দন এই স্বর্ণ ভাণ্ডারের বৃহত্তর অংশ আল্লাহর কাজে ব্যয় হোক।
আমি আব্দুর রহমান আল-তারিক। ১৫০১ সালের দিকে স্পেনের রাজা ফার্ডিনান্ড ও রানী ইসাবেলা ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের হিসপানিওয়ালা এলাকার গভর্নর হিসেবে ওভানডোকে প্রেরণ করেন ৩০ টি জাহাজসহ। আমাকে জোর করে জাহাজ বহরের চীফ নেভীগেটর ও অগ্রবর্তী জাহাজটির ক্যাপ্টেন করে গভর্নর ওভানডোর সাথে ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জে পাঠানো হয়। কিন্তু আমি এ জীবন চাইনি।
আমি আমার ছাত্র জীবনের শুরু থেকেই ভূগোল ও সমুদ্রবিজ্ঞানের প্রতি অনুরক্ত। আমার ছাত্রজীবনের সকল পর্যায়ে আমি এই দুই বিষয়ে ভাল রেজাল্ট করেছি। আমি এই দুই বিষয়ে কর্ডোভা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সর্বোচ্চ ডিগ্রী লাভ করি। আমার আবাল্য স্বপ্ন ছিল কর্ডোভার মত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হব। আমি শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ লাভ করি এবং এর মাধ্যমে আমার সে স্বপ্ন সফল হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্য, শিক্ষক হিসেবে ক্লাস নেয়া শুরু করার আগেই কর্ডোভা এলাকা মুসলমানদের হাত ছাড়া হয়ে যায় এবং ফার্ডিনান্ড ও ইসাবেলার বাহিনী কর্ডোভা দখল করে নেয়। অন্যান্য অনেকের সাথে আমিও পালিয়ে যাই কর্ডোভা থেকে। কিন্তু শীঘ্রই আমার কপাল ভাঙে। আমার এক খৃস্টান সহপাঠী আমার ব্যাপারে ফার্ডিনান্ডকে বলে দেয়। আমাকে ভূগোল সমুদ্র বিজ্ঞানী হিসেবে ফার্ডিনান্ডের কাছে তুলে ধরা হয়। ফার্ডিনান্ড সরকার আমার সন্ধান করতে থাকে। আমি তখন গ্রানাডা থেকে তিরিশ-চল্লিশ মাইল দূরে এক সুন্দর পার্বত্য উপত্যকায় আমার নিজের গ্রাম ‘ওয়াদিউল গানী’তে বাস করছি। আমি তখনও বিয়ে করিনি। এক বৃদ্ধা মা ছাড়া আমার কেউ ছিল না। দুজনের অত্যন্ত সুখী ও স্বচ্ছল সংসার আমাদের। এক রাতে সেখানেই হাজির হল ফার্ডিনান্ডের লোকরা। রাস্তা চিনিয়েছিল আমার সেই খৃস্টান সহপাঠী। জোর করে আমাকে তুলে নিয়ে আসে আমার শয্যা থেকে। পাশের ঘরে ঘুমিয়ে থাকা মা’র কাছ থেকেও বিদায় নিতে দেয় নি। এভাবেই আমাকে শামিল করা হয় ওভানডোর জাহাজ বহরে। আমার নতুন নাম হয় ‘কটিজ পিজারো’।
এক মাসের সমুদ্র যাত্রা শেষে আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে আমরা সান্টো ডোমিংগোতে পৌঁছলাম।
ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের হিস্পানিওয়ালা অঞ্চলের রাজধানী তখন এই সান্টো ডোমিংগো। ’ সান্টো ডোমিংগোর সমুদ্র তীরে এক ছোট বাড়িতে হল আমার নিবাস। কিন্তু এক মুহুর্তের জন্যে একে আমার নিবাস বলে মেনে নিতে পারিনি। প্রতিদিনের অবসর সময়টা জানালায় বসে ক্যারিবিয়ান সাগরের দিকে নিস্পলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা ছিল আমার অভ্যাস। ক্যারিবিয়ান সাগর পেরিয়ে আটলান্টিক সাগর পাড়ি দিয়ে আমার মন ছুটে যেত স্পেনের পাহাড় ঘেরা ‘ওয়াদিউল গানী’তে। চোখে ফুটে উঠতো মায়ের মমতাময়ী চেহারা। পরক্ষণেই আবার চোখের সামনে ফুটে উঠতো পাগল পারা হয়ে আমাকে খুঁজে ফেরা মায়ের দৃশ্য। ভাবতাম মা আমার নিশ্চয় বেঁচে নেই। সন্তানের খোঁজে ছুটে বেড়ানো নাওয়া-খাওয়াহীন মা কোথায় পড়ে একদিন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছে! এসব ভাবতে গিয়ে চোখ দিয়ে অবিরাম অশ্রু গড়াত।
এমনি অবস্থায় যখন আমার কাল কাটছে, তখন একদিন গভর্নর ওভানডো আমাকে ডেকে পাঠাল। আমি হাজির হলে বলল, ‘দেশে যাবার জন্যে তুমি পাগল হয়ে আছ। কিছুদিনের জন্যে তোমাকে দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছি। জিনিসপত্রসহ ২৪টি জাহাজের একটা বহর পাঠাচ্ছি স্পেনে। তুমি একটা জাহাজের ক্যাপ্টেন থাকবে।’
সম্ভবত তারিখটা ১৫০২ সালের জুনের ১৫ তারিখ। আমরা ২৪টি জাহাজ নিয়ে সান্টো ডোমিংগো বন্দর ত্যাগ করে আটলান্টিকে পাড়ি জমালাম। নোঙর তোলার মুহূর্তে গভর্নর এসে আমাকে বলল, ‘বহরের দুটি জাহাজে স্বর্ণ বোঝাই আছে। দুটি জাহাজের মধ্যে তোমারটা একটা। সাবধানে যেও।’ কিন্তু সাবধানতা কাজে এল না। যাত্রা করার দ্বিতীয় দিন শেষে ভয়াবহ হারিকেন ঝড়ে আক্রান্ত হল আমাদের জাহাজ বহর। চোখের সামনেই একের পর এক জাহাজ ডুবে যেতে লাগল। আমার জাহাজ মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হল। অর্ধেকের বেশী নাবিক মারা গেল। সামনে এগুবার চিন্তা বাদ দিয়ে জাহাজকে বাঁচিয়ে রাখার ব্যবস্থা করে ঝড়ের হাতে সপে দিলাম জাহাজের ভাগ্য। দিনের কোন হিসেব ছিল না। সম্ভবত দিন সাতেক পর আমার জাহাজ একটা কূলে ভিড়ল। কূলে ভেড়ার কয়েক ঘন্টার মধ্যেই জাহাজ ডুবে গেল। অস্ত্র-শস্ত্র, খাবার ও অতি প্রয়োজনীয় কিছু জিনিসসহ আমরা তীরে নেমে এলাম। এই দেশটি হল সুরিনাম। আর জায়গাটা ছিল সুরিনাম নদীর পারামারিবো মোহনা।
আমরা জাহাজ থেকে নেমেছিলাম ১৭ জন। এই ১৭ জনের মধ্যে ১০ জন নাবিকই ছিল মুসলমান। অবশিষ্টরা ছিল ক্যাথলিক। আমরা ১৭ জন একটা পরিবারে পরিণত হলাম। গড়ে তুললাম সুরিনামে ইউরোপের প্রথম কলোনি। কলোনি গড়লেও কলোনিয়ালিস্টদের মত আচরণ আমরা করিনি। সুখে-দুখে সব কাজে সব সময় স্থানীয় রেড ইন্ডিয়ানরা ও আমরা একসাথে থেকেছি। ধীরে ধীরে অতি গোপনে আমরা সোনা খালাশ করছিলাম জাহাজ থেকে। রেড ইন্ডিয়ান ও স্থানীয় উপজাতিদের আমরা বিষয়টা না জানালেও একটা ভাগ হিসেব করে প্রচুর অর্থ আমরা ওদের দিয়েছি।
সকলের সহযোগিতা নিয়ে প্রচুর অর্থ খরচ করে সুরিনাম নদীর মোহনার পাশে আমরা আল-তারিক দুর্গ গড়ে তুললাম। দুর্গটার ডিজাইন করলাম স্পেনের প্রথম মুসলিম দুর্গ ‘আত-তারিক’ এর অনুকরণে। দুর্গের কেন্দ্রে তৈরী করলাম বিশাল মসজিদ। নিজের বাড়িটা তৈরী করলাম মসজিদের পাশে। আমাদের ১৭ জনের পরিবারের ক্যাথলিক কয়জনও ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছে। দুর্গের মধ্যেই অবশিষ্ট সতের জনের বাড়ি তৈরি হল। আমরা সকলেই তখন বিয়ে করেছি রেড ইন্ডিয়ান পরিবারে। এই বিবাহ-সূত্রে রেড ইন্ডিয়ানরা আর আমরা এক হয়ে গেলাম। তাদেরও আধুনিক বাড়িঘর তৈরি করে দেয়া হল পারামারিবো মোহনায়। এভাবে ভিত্তি স্থাপিত হল পারামারিবো শহরের।
দুর্গ তৈরির পর ষোল জনকে তাদের চাহিদা অনুযায়ী স্বর্ণ দিয়ে অবশিষ্ট স্বর্ণের বিশাল ভাণ্ডার আমি সঞ্চিত করে রাখলাম মাটির তলায়। আল্লাহর দান এ স্বর্ণ আমি আল্লাহর জন্যেই রাখলাম মাটির তলায়। আল্লাহ আমার ইচ্ছাকে কবুল করুন। পরিবার পরিজন নিয়ে আমি সুখী। সুরিনামকে নিজের দেশ হিসেবে গ্রহণ করেছি। মা’র জন্য কাঁদা আমার অনেক কমে গেছে। ধরে নিয়েছি এবং সত্যও যে মা এতদিনে মারা গেছেন। অতএব তাঁকে দেখার, তিনি কেমন আছেন তা জানার জন্যে মন আকুলি-বিকুলি করে ওঠে না। কিন্তু এর পরও স্পেনের আমার দুঃখী স্বজন-স্বজাতির জন্যে মন কাঁদে। আমার প্রিয় ‘ওয়াদিউল গানী’ কর্ডোভা বিশ্ববিদ্যালয় ও কর্ডোভা-গ্রানাডার কথা মনে হলে আমি আবার পাগল হয়ে যাই। অশ্রু নেমে আসে দু’গাল বেয়ে। ঘুমের মধ্যে ‘ওয়াদিউল গানী’ ছাড়া কোন স্বপ্নই আমি দেখি না। দিনের সজাগ মুহূর্তে আমি থাকি এই সুরিনামের আল-তারিক দুর্গে। কিন্তু রাতের স্বপ্নে আমি ফিরে যাই আমার শৈশব, কৈশোর আর যৌবনের স্বপ্নভূমি ওয়াদিউল গানীতে। কোনদিন আর কি যেতে পারব সেখানে? আমি না পারলেও আমার বংশধররা কেউ সেখানে যাবে। আমার মায়ের কবর কি তারা খুঁজে পাবে সেখানে? এ প্রশ্নের উত্তর আমি জানি না। কিন্তু তবু লিখে গেলাম আমার হৃদয়ের আকুতি। আল্লাহ একে কবুল করুন।’
দলিলটা পড়া যখন আহমদ মুসা শেষ করল, তখন তার চোখের ফোটা ফোটা অশ্রুতে দলিলের অনেকখানি ভিজে গেছে।
পড়া শেষ করে আহমদ মুসা চোখ তুলল লিন্ডা লোরেনের দিকে। দেখল তার অপলক চোখ দুটি সামনের দিকে নিবদ্ধ। দুচোখ থেকে নেমে আসা অশ্রুর ঢলে তার দুই গণ্ড ধুয়ে যাচ্ছে। তার দাঁত কামড়ে ধরেছে তার নিচের ঠোঁটটাকে।
পড়া শেষ হলেও অনেকক্ষণ কেউ কথা বলল না।
প্রথম নিরবতা ভাঙল লিন্ডা লোরেন। বলল, ‘আমি গর্বিত ভাইজান এমন একজন পূর্বপুরুষের উত্তর সূরী আমি।’ তার কণ্ঠ ভেঙে পড়ল কান্নায়।
নিজেকে একটু সামলে নিয়ে আবার বলে উঠল, ‘মনে হচ্ছে কি জানেন! তার ‘ওয়াদিউল গানী’টা যেন আমার ওয়াদিউল গানী। মন আমার ছুটে যেতে চাচ্ছে সেখানে।’ থামল লিন্ডা লোরেন।
আহমদ মুসাও কথা বলল না। তার শূন্য দৃষ্টিটা হারিয়ে গেছে সাগরের অন্ধকারে।
এক সময় ধীর কণ্ঠে আহমদ মুসা বলল, ‘আজ টেরেক স্টেটে অর্থাৎ আল তারিক স্টেটে কিভাবে ঢুকব তাই ভাবছি। আব্দুর রহমান আল-তারিকের গড়া স্টেটের ধুলি কণায় পা পড়লে, তার বিশাল দুর্গের দিকে চাইলে, মসজিদের ধ্বংসাবশেষের পাশে তার বাড়িটা দেখতে না পেলে মনটা হুহু করে কেঁদে উঠবে।’
‘আর আমার হবে আরেক অভিজ্ঞতা। মনে হবে আমি প্রবেশ করছি স্বপ্নের দেশ অর্থাৎ চাঁদের দেশে।’ বলল লিন্ডা লোরেন উদাস কণ্ঠে।
আহমদ মুসা আবার তার চোখ ফিরিয়ে আনল দলিলের পাতায়। পাতা উল্টিয়ে দ্বিতীয় দলিল সে বের করল। বলল, ‘এবার তাহলে মিস লিন্ডা স্বর্ণ ভান্ডারের নির্দেশিকাটা পড়ি?’
লিন্ডা সংগে সংগেই জবাব দিল না। কিছুক্ষণ পর বলল, ‘না ভাইজান। ওটা বরং আপনি ওভানডো ভাইজানকে পড়ে শোনাবেন। ঐ স্বর্ণের সাথে যে দায়িত্ব জড়িয়ে আছে তার ভার বহন করার ক্ষমতা আপনার আছে, ওভানডো ভাইয়ারও হতে পারে। আমি অনুরোধ করব, আমাকে স্বর্ণ ভান্ডরের নির্দেশিকা নয়, আমাকে দয়া করে আপনি ‘ওয়াদিউল গানী’র দিক নির্দেশিকা শোনান। আর কিছু না হোক, আমার মহান দাদুর শেষ ইচ্ছাটুকু যদি পূরণ করতে পারি, তবে জীবন জনম সব আমার সার্থক হবে।’ কান্নায় জড়িয়ে গেল তার শেষ কথাগুলো।
লিন্ডা লোরেনের হৃদয় ভাঙা আহমদ মুসাকেও স্পর্শ করেছে। তার দু’চোখের কোনায়ও জমে উঠেছে অশ্রু।
আহমদ মুসা কোন কথা বলল না। তার দু’চোখ আবার ফিরে গেছে সাগরের অন্ধকারে। লিন্ডা লোরেনেরও দুই চোখ সামনে নিবদ্ধ।
জমাট নিরবতা।
এই নিরবতার মাঝে বোট তার ইঞ্জিনের বেসুরো শব্দ চারদিকে ছড়িয়ে তীব্র গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে পারামারিবো বন্দর ছাড়িয়ে টেরেক স্টেটের নিজস্ব ঘাটের দিকে।

‘না মা, আজও আহমদ মুসার কোন খোঁজ মেলেনি।’ নীচু কণ্ঠে বিষণ্ন মুখে বলল সুরিনামের নতুন প্রধানমন্ত্রী আহমদ হাত্তা।
পাশেই আরেক সোফায় মাথা নিচু করে দু’হাতের তালুতে মুখ রেখে বসেছিল ফাতিমা নাসুমন। ছল ছল করছে তার দুই চোখ। বলল, ‘আমার খুব খারাপ লাগছে আব্বা। তুমি কিডন্যাপ হবার পর তোমাকে খুঁজে পেতে আহমদ মুসার সময় লাগেনি। কিন্তু আজ কয়েক দিনেও তোমার গোটা পুলিশ বাহিনী মিলেও আহমদ মুসার সন্ধান করতে পারলো না।’
‘আহমদ মুসার পাশে আমাদের গোটা পুলিশ বাহিনীকেও দাঁড় করানো চলে না মা। তুমি তো জান, গোটা মার্কিন গোয়েন্দা ও পুলিশ বিভাগ বছরের পর বছর ধরে যা পারেনি, আহমদ মুসা তাই পেরেছি। তবু মা, আমাদের পুলিশ বাহিনী চেষ্টার কোন ত্রুটি করছে না। পারামারিবোর সন্দেহজনক প্রতিটি বাড়ি-ঘর তারা তন্নতন্ন করে খুঁজছে। মনে হচ্ছে আহমদ মুসা পারামারিবোতেই নেই।’ বলল আহমদ হাত্তা।
‘আমার মনে হয় রঙ্গলালরা জানে আব্বা। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে?’ বলল ফাতিমা নাসুমন।
‘পুলিশ তাকে নজরে রেখেছে। কথাও বলেছে তার সাথে। আমিও তাকে ডেকেছিলাম। কথা বলেছি। সব দোষ সে স্বীকার করেছে, তবে আমাকে কিডন্যাপ করা ও আমার ড্রাইভার (আহমদ মুসা) উধাও হবার ব্যাপারে সে কিছুই জানে না বলে জানিয়েছে। তাদের অজান্তেই মাফিয়ারা কিছু করে থাকতে পারে তাদের লোক হত্যার প্রতিশোধ নেবার জন্যে। আমি বন্দী অবস্থায় তাদের যে কথা শুনেছি, তাতে রঙ্গলালের কথা সত্য। মাফিয়াদের সব রাগ আহমদ মুসার উপর। তারা নিশ্চিত যে, আহমদ মুসার হাতেই তাদের লোক মরেছে।’
ভয়ে-উদ্বেগে আরও ফ্যাকাসে হয়ে উঠল ফাতিমা নাসুমনের মুখ। বুক তার থরথর করে কেঁপে উঠল, আহমদ মুসা তো ওদের হাতেই পড়েছে! আর চিন্তা করতে পারল না ফাতিমা। তার পিতা থামলেও কোন কথা সে বলতে পারল না।
তার পিতা প্রধানমন্ত্রী আহমদ হাত্তাই আবার কথা বলল। বলল, ‘আমার খুব খারাপ লাগছে মা। সারা রাত ধরে এই আনন্দ প্রোগামটা আমি করতে চাইনি। কিন্তু দেশের রেওয়াজ হিসেবে আমাকে রাজী হতে হয়েছে। তোমার মতই আমারও অনুষ্ঠান ভালো লাগছে না বলে এখানে এসে বসেছি।’
‘স্যরি আব্বা। রাষ্ট্রের যে নিয়মনীতি তা তো মেনে চলাই উচিত। বুক থেকে উদ্বেগের পাথরটা সরাতে পারছি না বলেই হৈ হুল্লোড় থেকে একটু সরে এসেছি।’ বলল ফাতিমা।
‘তার জন্যে আমাদের এই উদ্বেগ স্বাভাবিক মা। তার সাহায্য না পেলে প্রধানমন্ত্রী হওয়া দূরের কথা ওদের হাতে আটক অবস্থাতেই হয়তো আমার জীবন শেষ হয়ে যেত। তোমারও দেখা পেতাম না।’ বলতে বলতে আহমদ হাত্তার কণ্ঠ কান্নায় ভারী হয়ে উঠল। তার দুই চোখ অশ্রুতে ভরে উঠেছে।
ফাতিমা নাসুমন উঠে দাঁড়াল। ধীরে ধীরে উঠে এল তার আব্বার কাছে। আস্তে পিতার কাঁধে হাত রেখে বলল, ‘আব্বা তুমি দুর্বল হয়ে পড়বে না। তুমি ভেঙে পড়লে আমরা আশ্রয় পাব কোথায়। এতক্ষণ তোমার অনুষ্ঠানের বাইরে থাকা ভাল দেখাচ্ছে না। চল আব্বা, আমিও যাচ্ছি তোমার সাথে।’
ফাতিমার কথা শেষ হতেই দরজায় প্রধানমন্ত্রীর পিএস-এর কণ্ঠ শোনা গেল। সে ভেতরে আসার অনুমতি চাচ্ছিল।
আহমদ হাত্তা তাড়াতাড়ি রুমাল দিয়ে চোখ মুছে বলল, ‘এস।’
পিএস ঘরে ঢুকে বলল, ‘স্যার পুলিশ প্রধান ও গোয়েন্দা প্রধান আপনার সাথে কথা বলতে চান।’
‘যাও আসতে বলো।’ বলল প্রধানমন্ত্রী।
চলে গেল পিএস।
আহমদ হাত্তা ঘড়ির দিকে তাকাল। বলল ফাতিমাকে লক্ষ্য করে, ‘মা রাত তিনটা বাজে। তুমি পাশের ঘরে গিয়ে রেস্ট নাও। আমি তোমাকে ডাকব।’
‘ধন্যবাদ আব্বা।’ বলে ফাতিমা চলে গেল পাশের ঘরে।
ঘরে ঢুকল পুলিশ প্রধান আলী সিলভু ও গোয়েন্দা প্রধান আহমাদু সিফু।
প্রধানমন্ত্রী আহমদ হাত্তা উঠে ওদের স্বাগত জানিয়ে বলল, ‘মি. আলী এবং মি. আহমাদু কোন খবর পেলেন?’
পুলিশ প্রধান আলী সিলভু ও গোয়েন্দা প্রধান আহমাদু সিফূ বসল। তাদের চোখে–মুখে বিষণ্নতা। বলল আলী সিলভু, ‘স্যার গতকাল পর্যন্ত আমরা প্রধানত বিদেশী ও মি. রঙ্গলালদের দলে ও অবস্থানে আমাদের অনুসন্ধান সীমাবদ্ধ রেখেছিলাম। আমরা আমাদের পুলিশ ও গোয়েন্দা শক্তির গোটাটাই এই কাজে নিয়োজিত করেছিলাম। কিন্তু তার কোন খোঁজ আমরা পাইনি। আজ আমরা ভিন্ন আরেকটা চ্যানেল ওপেন করেছি।’
‘কি সেটা?’ উদগ্রীব কণ্ঠে বলল প্রধানমন্ত্রী আহমদ হাত্তা।
পুলিশ প্রধান আলী সিলভু গোয়েন্দা প্রধান আহমাদু সিফুকে লক্ষ্য করে বলল, ‘বলুন মি. আহমাদু। আপনিই তো বিষয়টা প্রত্যক্ষভাবে ড্রীল করছেন।’
নড়ে-চড়ে বসল গোয়েন্দা প্রধান আহমাদু সিফু। বলল সে প্রধানমন্ত্রীকে লক্ষ্য করে, ‘স্যার আমাদের বিশ্বাস এবং রঙ্গলালের সাথে আলোচনা করে যা বুঝেছি, আটক করার ঘটনাটা একটা মাফিয়া গ্রুপের দ্বারা সংঘটিত হয়েছে এবং আমরা নিশ্চিত রঙ্গলাল সাহেবরা যে মাফিয়া গ্রুপকে হায়ার করে এনেছিল ঘটনাটা তারাই ঘটিয়েছে। আমরা……।’
গোয়েন্দা প্রধান আহমাদু সিফের কথা শেষ হলো না, তার আগেই কথা বলে উঠল প্রধানমন্ত্রী, ‘তারা কোন গ্রুপ, কোথাকার, তাদের নেতা কে, এটা কি রঙ্গলালরা বলেছে?’
‘স্যার, রঙ্গলালরা তা বলতে পারেনি। আর মাফিয়ারা কখনই তা জানতে দেয় না স্যার।’ বলল আহমাদু সিফু।
‘ইয়েস, আপনার কথা শেষ করুন মি. আহমাদু।’ প্রধানমন্ত্রী বলল।
‘ইয়েস স্যার।’ বলে আহমাদু সিফু আবার কথা শুরু করল, ‘স্যার আন্ডার ওয়ার্ল্ডের এক বিদেশী গ্রুপের সাথে আজ যোগাযোগ করেছি। ব্রুকোপনডোর ঘটনায় যারা নিহত হয়েছে এবং আপনাকে উদ্ধারের ঘটনায় যারা নিহত হয়েছে, সেই বিদেশী মাফিয়াদের লাশের ছবি আমরা তাদের দেখিয়েছি। তারা দেখেই বলেছে নিহত লোকরা ‘কিনিক কোবরা’র মাফিয়া দলের সদস্য। ওরা শুনেছে ‘কিনিক কোবরা’র নেতাও নাকি এখন পারামারিবোতে।’
‘কিনিক কোবরা’ কারা?’ জিজ্ঞেস করল প্রধানমন্ত্রী।
‘কিনিক কোবরা’ মধ্য আমেরিকার একটা দুর্ধর্ষ মাফিয়া চক্র। গুয়েতেমালায় ওদের হেড কোয়ার্টার হলেও গোটা আমেরিকা জুড়েই ওরা ঘুরে বেড়ায়। কখন কোথায় থাকে তার ঠিক নেই।’ বলল গোয়েন্দা প্রধান আহমাদু সিফু।
‘রঙ্গলালরা তাহলে এদেরকেই হায়ার করেছিল?’ জিজ্ঞেস করল প্রধানমন্ত্রী।
‘তাইতো প্রমাণ হচ্ছে স্যার।’ বলল গোয়েন্দা প্রধানই।
‘আসল কথা কি হয়েছে, তাদের কাছে কোন সহযোগিতা চেয়েছ?’ জিজ্ঞেস করল প্রধানমন্ত্রী আহমদ হাত্তা। তার কণ্ঠে অধৈর্য্য ভাব।
‘ঠিক ফরমাল সাহায্য আমরা চাইনি। তবে কোন সাহায্য তাদের করার আছে কিনা, এমন প্রশ্ন আমরা তুলেছিলাম। তারা যে জবাব দিয়েছে, তাকে আমাদের ইতিবাচক বলে মনে হয়নি। তারা বলেছে, ‘কিনিক কোবরা’ তাদের সিনিয়র দল। তাদের সাথে সংঘাতে নামা ওদের জন্যে অসৌজন্যমূলক হবে, বিশেষ করে ‘কিনিক কোবরা’ যখন তাদের কোন ক্ষতি করেনি। তারা আরও বলেছে, ‘কিনিক কোবরা’র মত দুর্ধর্ষ গ্রুপ আর আমেরিকায় নেই। কোন অপারেশনে তাদের লোক মারা যাবার কোন নজীর নেই। অথচ সুরিনামে এ পর্যন্ত তারা প্রায় পৌনে একডজনের মত লোক হারিয়েছে। এর ভয়াবহ রকমের প্রতিশোধ না নিয়ে ওরা ছাড়বে না।’ থামল গোয়েন্দা প্রধান।
‘কিনিক কোবরা’র কোন লোকেশন বা ঠিকানা পেয়েছে কি না তারা?’ প্রধানমন্ত্রী আহমদ হাত্তার আবার জিজ্ঞেসা।
‘কেন কিনিক কোবরা’র সুরিনামে’- এই কৌতুহল থেকে তারা নিজেরাই কিনিক কোরবা’র সন্ধান শুরু করেছে। কিন্তু এখনো পায়নি তাদের ঠিকানা।’
‘তাহলে এখন এগুবেন কোন পথে?’ জিজ্ঞেস করল প্রধানমন্ত্রী আহমদ হাত্তা।
‘স্যার, গুয়েতেমালা সরকারকে অনুরোধ করেছি ‘কিনিক কোবরা’ মাফিয়া গ্রুপের প্রধানসহ তার লোকদের ফটো সরবরাহ করতে। আশা করছি সত্তরই আমরা পেয়ে যাব। ফটোগুলো পেলেই আমরা চিরুনী তল্লাশিতে নেমে যাব।’ বলল গোয়েন্দা প্রধান আহমাদু সিফু।
প্রধানমন্ত্রী আহমদ হাত্তা কিছু বলার জন্যে মুখ খুলেছিল। এ সময় বেজে উঠল তার পাশের মোবাইলটা।
আহমদ হাত্তা মোবাইলটা হাতে তুলে নিল।
সালাম বিনিময়ের পর ওপারের কথা শুনে ভ্রু কুঞ্চিত হলো আহমদ হাত্তার। বলল, ‘ঠিক আছে। তোমরা দরজা খুল না আর যতটা পার বাধা দাও। আমাদের পুলিশ যাচ্ছে।’
বলে টেলিফোন রেখে দিল আহমদ হাত্তা। উত্তেজিত সে। পুলিশ প্রধান আলী সিলভু ও গোয়েন্দা প্রধান আহমাদুর চোখে-মুখেও উদ্বেগ ফুটে উঠেছে। তারা উদগ্রীবভাবে অপেক্ষা করছে প্রধানমন্ত্রীর কথার।
টেলিফোন রেখে দিয়েই আহমদ হাত্তা বলে উঠল, ‘মি. আলী সিলভু আপনি তাড়াতাড়ি টেরেক স্টেটে ওভানডোদের বাড়িতে পুলিশ পাঠান। নতুন পুলিশ কমিশনার সাহেব যেন নিজে একটা বড় পুলিশ দল নিয়ে সেখানে যান।’
‘কি ঘটনা স্যার?’ বলল পুলিশ প্রধান আলী সিলভু।
‘ওভানডোর বাড়িতে কে বা কারা হামলা করেছে। হামলাকারীরা তাদের ঘরের দরজা ভাঙতে চাচ্ছে।’ বলল প্রধানমন্ত্রী এক নিশ্বাসে।
‘ও আল্লাহ।’ বলে উঠল পুলিশ প্রধান এবং ঘুড়ে দাঁড়াল। বলল, ‘স্যার, পুলিশ কমিশনার সাহেব এখানেই আছেন। আমি তাকে এখনি পাঠিয়ে দিচ্ছি স্যার।’ বলে সালাম দিয়ে যাবার জন্যে ঘুরে দাঁড়াল পুলিশ প্রধান।
গোয়েন্দা প্রধান বলল, ‘আমিও উঠতে চাচ্ছি স্যার, অনুমতি দিন। আমিও একটু খোঁজ-খবর নেই।’ বলে উঠে দাঁড়াল গোযেন্দা প্রধানও।
‘আপনারা আসুন। আল্লাহ আমাদের সাহায্য করুন।’ বলে প্রধানমন্ত্রী তার মোবাইলটা আবার তুলে নিল হাতে।

‘ইয়েস বস, আমরা এখন টেরেক স্টেটে। ওভানডোদের বাড়ি আমরা ঘিরে ফেলেছি। গেটের তিনজন পুলিশ আমাদের ঠেকিয়েছিল। কিন্তু তাদের দিকে স্টেনগান তাক করে তিনটি একশ ডলারের নোট তাদেরকে দেখিয়ে বলেছিলাম, তোমরা জান দেবে, না টাকা নেবে। তারা টাকাই পছন্দ করেছে। তবে তাদের অনুরোধে তাদেরকে ক্লোরেফরম দিয়ে ঘুম পাড়াতে হয়েছে।’ এক নিশ্বাসে কথাগুলো বলে থামলো লিউনার্দো।
টেলিফোনের ওপ্রান্ত থেকে জবাব এল, ‘ধন্যবাদ লিউনার্দো। কিন্তু আসল কাজটা ঠিকমত হওয়া চাই। যে কোন মূল্যে ওদের বাড়িতে ঢুকতে হবে। বাড়ির সবাইকে বেঁধে ফেলে বাড়ি দখল করে বসে থাকতে হবে। আজ রাতে আহমদ মুসা অবশ্যই সেখানে যাবে। গেলে দরজা খুলে সবাই মিলে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে আহমদ মুসা ও লিন্ডার উপর। তাদের দু’জনকেই আমি জীবন্ত চাই লিউনার্দো। আমার দেহের যত ফোটা রক্ত ওরা ঝরিয়েছে, প্রতি ফোঁটা রক্তের মূল্য আমি ওদের গা থেকে তুলব। ঠিক আছে?’ ওপ্রান্তের কণ্ঠ থেমে গেল।
লিউনার্দো বলে উঠল, ‘ইয়েস বস, আমরা সব বুঝেছি। আমরা আপনার নির্দেশ পালন করব।’ থামল লিউনার্দো।
ওপ্রান্ত থেকে কথা ভেসে এল আবার, ‘চেষ্টা করবে দরজা না ভেঙে এবং দরজায় কোন গুলী-গোলার দাগ না রেখে প্রবেশ করতে। আহমদ মুসার চেয়ে ধড়িবাজ আর কেউ নেই। সে এসব দেখলে সন্দেহ করবে এবং সরে পড়তে পারে। সে সুযোগ তাকে দেয়া যাবে না লিউনার্দো।’ থামল ওপারের কণ্ঠ।
লিউনার্দো বলল, ‘ইয়েস বস, আমরা এই চেষ্টাই করব। আরেকটা কথা বস, আমরা যদি কয়েকজন বারে অবস্থান করি এবং কয়েকজন ভেতরে ঢুকে অপেক্ষা করি, তাহলে কেমন হয়? তাতে তার পালানো আটকানো যাবে এবং সামনে-পিছনে দুদিক থেকেই তাকে আক্রমণ করা যাবে।’ থামল লিউনার্দো।
ওপ্রান্ত থেকে আবার কথা বলে উঠল, ‘তোমরা যা ভাল বোঝ তাই কর। আমি চাই তারা তোমাদের হাতে ধরা পড়ুক, তা যেভাবেই হোক। আমি আর ভাবতে পারছি না।’
‘জানি আপনার খুব কষ্ট হচ্ছে বস। অপারেশনের পর সব ঠিক হয়ে যাবে। অপারেশনের সব কিছু ঠিকঠাক হয়ে যায়নি ইতিমধ্যে?’ থামল লিউনার্দো।
ওপার থেকে বলল, ‘হ্যাঁ, লিউনার্দো। ডাক্তার প্রস্তুত, অপারেশেনের সব কিছু প্রস্তুত। অপারেশনের টেবিলে শোবার আগে তোমাকে এই টেলিফোন করেছি।’ থামলো ওপারের কন্ঠ।
লিউনার্দো বলল, ‘ঈশ্বর সাহায্য করুন।’
‘ধন্যবাদ, গুডবাই লিউনার্দো।’ বলল ওপারের কণ্ঠ।
ওপার থেকে লাইন কেটে গেছে। লিউনার্দো মোবাইল অফ করে পকেটে রাখল। টেলিফোনের ওপ্রান্ত থেকে লিউনার্দোর সাথে কথা বলল ভীষণভাবে আহত জোয়াও লেগার্ট।
আহমদ মুসা ও লিন্ডা জোয়াও কে আহত অবস্থায় রেখে চলে আসার পর সে বহুকষ্টে শরীরের সব শক্তি ব্যবহার করে উঠে আসে আন্ডার গ্রাউন্ড কক্ষ থেকে উপরে তার যোগাযোগ কক্ষে। টেলিফোন করে পারামারিবো শহরে অবস্থানকারী তার প্রধান সহকারী লিউনার্দোকে। সব কথা তাকে জানিয়ে নির্দেশ দেয় তখনি টেরেক স্টেটে ওভানডোদের বাড়িতে অভিযান চালাতে সবটা জনশক্তি নিয়ে। নির্দেশ পাওয়ার সাথে সাথেই লিউনার্দো তার এগারজন কমান্ডো নিয়ে যাত্রা করে টেরেক স্টেটে ওভানডোদের বাড়িতে। রাত পৌনে তিনটার মধ্যেই তারা টেরেক স্টেটের বাইরের গেটে পৌছে যায়।
জোয়াও লেগার্টের সাথে কথা বলে টেলিফোন পকেটে রেখে দিয়েই মুখ তুলল তার সহকারীর দিকে। বলল, ‘ওদিকের কি খবর?’
‘ধাক্কিয়ে, ডাকাডাকি করে দরজা খোলানো যাবে না। প্রথমে দু’একটা কথা বলেছে। এখন একেবারে নিরব।’ বলল লিউনার্দোর সহকারী রবার্তো।
‘বস বলেছেন, বাইরের দিকের দরজা ভাঙা যাবে না কিংবা গুলী করে তালা আনলক করা ও ছিটকিনি নষ্ট করাও যাবে না। কারণ বাইরে থেকেই বাড়িতে কিছু ঘটেছে এটা আঁচ করতে পারলে আহমদ মুসা পালিয়ে যাবে।’ বলল লিউনার্দো।
‘তা হবে কেন? আমরা তাকে পালাতে দেব কেন। আমরা যদি চারদিকে ওঁৎ পেতে থাকি, পালাতে পারবে কেমন করে সে?’ বলল রবার্তো।
‘আমার যুক্তিও তোমার মতই অনেকটা। কিন্তু বস অতি সাবধানী। তিনি আহমদ মুসা ও ম্যাডাম লিন্ডাকে চার দেয়ালের মধ্যে ঢুকাতে চান, তারপর তাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ার কথা বলেছেন। তার কথায় বাস্তবতা আছে। আহমদ মুসাকে তিনি আমাদের চেয়ে বেশি চেনেন। জানো কিছুক্ষণ আগে দুর্ভেদ্য বন্দীখানা থেকে আমাদের কিনিক কোবরা’র ৮ জনকে হত্যা করে এবং বসকে মারাত্মক আহত করে লিন্ডা ও তার মেয়েকে নিয়ে পালিয়ে এসেছে। কল্পনা করতে পার কতবড় ধড়িবাজ কুশলী সে!
বন্দী অবস্থায় আটজনকে হত্যা করে যে পালিয়ে আসতে পারে, আমরা ১১জন বাইরে লড়াই করে তাকে হারাতে পারব, এ নিশ্চিত দাবি আমরা কি করতে পারি? এই কারণেই বস চান নিঃসন্দেহ মনে অপ্রস্তুত অবস্থায় যেন সে আমাদের ফাঁদে পা দেয়, তার ব্যবস্থা করতে। থামল লিউনার্দো।
অপ্রস্তুত তিনি নাও তো থাকতে পারেন। আমরা এসেছি দরজা ধাক্কিয়েছি, ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করছি, এ সব বিষয় ভেতরের সবার জানা হয়ে গেছে এবং আমরা যে তাদের শত্রু পক্ষ সে সম্বন্ধে তাদের মনে সন্দেহ নেই। যদি তাই হয় তাহলে এতক্ষণে বিষয়টা তারা পুলিশে জানিয়ে দিয়েছে। বলল, রবার্তো।
কিন্তু টেলিফোনের সব লাইন তো আমরা কেটে দিয়েছি। বলল লিউনার্দো।
মোবাইল যদি ওদের থাকে। বলল, রবার্তো।
ওহ গড এ কথা তো মনে আসে নি। আছে কি ওদের কারো মোবাইল? বলল লিউনার্দো।
জানি না। কিন্তু আছে ধরে নিতে হবে। বলল রবার্তো।
ঠিক বলেছ রবার্তো।
কথাটার পর একটু থেমেই আবার বলে উঠল লিউনার্দো, রবার্তো তুমি দু’জনকে নিয়ে চলে যাও গেটে। সংজ্ঞাহীন তিনজন পুলিশের পোশাক খুলে নিয়ে তা তোমরা তিনজন পরে নিয়ে গেটে অপেক্ষা কর। পুলিশ যদি আসে তাহলে তারা যেন এ বাড়ি পর্যন্ত পৌছতে না পারে তার ব্যবস্থা করবে। কি ভাবে করবে তা তোমরাই ঠিক করবে। তোমাদেরকে ওরা সন্দেহ করবে না, এটাই হবে তোমাদের জন্যে বড় প্লাস পয়েন্ট। আর এদিকে ফাঁদ পাতার কাজটা আমরা করছি। থামল লিউনার্দো।
লিউনার্দো থামতেই রবার্তো বলে উঠল, যাচ্ছি বস। একটা কথা বলে যাই। আমি বাড়িটার চার দিক ঘুরে দেখেছি। দূর্গের নিয়মে তৈরী বাড়িটা। কোন প্রাচীর নেই যে টপকে ভেতরে যাওয়া যাবে। চার দিক দিয়েই ঘরের সারি। দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকতে না চাইলে ছাদে উঠতে হবে। আমার বিশ্বাস ভেতরে বাড়ির মাঝখানে একটা চত্বর আছে। ছাদ দিয়ে সেখানে নামতে পারলে বাড়ির লোকদের সহজে কব্জায় আনা যাবে।
বলা শেষ করে ধন্যবাদের অপেক্ষা না করে রবার্তো দু’জনকে নিয়ে ছুটল গেটের দিকে।
গেটের কাছাকাছি চলে এসেছে রবার্তোরা। পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে তারা গেট। কিন্তু গেট খোলা দেখে রবার্তোরা বিস্মিত হলো। সংজ্ঞাহীন পুলিশ তিনজনকে গেটের এপাশে রেখে গেটতো তারা ভেতর থেকে বন্ধ করে গিয়েছিল। কে গেট খুলল। যেই খুলুক তাকে প্রাচীর ডিঙিয়ে ভেতরে ঢুকতে হয়েছে। আর যদি কেউ ভেতরে ঢুকে থাকে, গেট খুলে থাকে তাহলে তো তারা গেটের পাশের সংজ্ঞাহীন পুলিশদেরকেও দেখতে পেয়েছে, আহমদ মুসা কি এসেছে লিন্ডাকে নিয়ে? না আহমদ মুসা গেট বন্ধ দেখলে প্রাচীর ডিঙিয়ে ঢুকবে না। তাছাড়া টেরেক স্টেটে ঢুকবার একটা গোনী পথ নাকি আছে। সেটা আহমদ মুসা অবশ্যই জানে। সে লিন্ডাকে নিয়ে টেরেক স্টেটে ঢুকবার জন্যে সামনের গেট অবশ্যই ব্যবহার করবে না। তাহলে কি পুলিশ এসেছে? হতে পারে।
রবার্তোরা রাস্তা ছেড়ে দিয়ে পাশেই একটা টিলার পাশে গুঁটি মেরে বসল।
এক মিনিটও গেল না।
গেট দিয়ে পুলিশের দু’টি জীপ এবং দু’টি বড় ক্যরিয়ার প্রবেশ করল।
পুলিশের গাড়িবহর এগুচ্ছে ওভোনডোদের বাড়ির দিকে।
তার ওপর নির্দেশ পুলিশকে বাঁধা দিতে হবে ওভানডোদের বাড়ি যাওয়া থেকে। কিন্তু কিভাবে এটা সম্ভব? পুলিশের সংখ্যা ত্রিশের বেশী হবে। পুলিশরা যেহেতু গাড়ির প্রোটেকশনে এবং আড়াল অবস্থায় আছে তাই তাদের স্টেনগানের প্রথম আক্রমণে ক’জনকেই বা তারা নিষ্ক্রিয় করতে পারবে? কিন্তু তারপরেই তারা এ্যাকশনে আসবে। তাদের হাতে গাড়ি থাকায় তারা সুবিধা বেশী পাবে। তার ফলে পুলিশদেরকে ওভানডোদের বাড়ি যাওয়া থেকে বিরত রাখা যাবে না। এই অবস্থায় পুলিশকে দু’দিক থেকে আক্রমণ করে কাবু করতে পারলে আহমদ মুসার জন্যে নিরাপদে অপেক্ষা করার একটা সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
এই চিন্তা করে রবার্তো তার মোবাইলে ফোন করল লিউনার্দোকে। তাকে বলল তার চিন্তার কথা। লিউনার্দো সব শুনে তাকে বলল রবার্তো যে প্রস্তাব দিয়েছে সেটাই এখন বেষ্ট বিকল্প। কিন্তু পুলিশের লড়াইয়ে নামলে আহমদ মুসাকে ফাঁদে আটকাবার আমাদের পরিকল্পনা মাঠে মারা যেতে পারে। একটাই শুধু আশা, আমরা যদি পুলিশের ঝামেলাটা তাড়াতাড়ি মিটিয়ে ফেলতে পারি, তাহলে আমাদের উদ্দেশ্য সফল হতে পারে। উত্তরে রবার্তো তাকে বলল, আসুন আমরা এ চেষ্টাই করি। ওপ্রান্ত থেকে লিউনার্দো সম্মতি জানালো, ঠিক আছে আসছি।
টেরেক স্টেটে ঢোকার পর পুলিশের গাড়ি ধীর গতিতে এগুচ্ছে। রবার্তো তার দু’ই সাথীদের নিয়ে যতটা সম্ভব দেহ গুটিয়ে মাথা নিচু করে দ্রুত এগিয়ে চলল গাড়ির পেছনে। গাড়ির সাথে একটা অনূকুল এ্যাংগেলে আসার পর তার দুই সাথীকে লক্ষ্য করে বলল, তোমরা গাড়ীগুলোর উপরের অংশে ফায়ার কর আর আমি গাড়িগুলোর টায়ার কতটা নষ্ট করা যায় দেখি।
রবার্তোদের ফায়ার শুরু হলো।
গাড়িগুলো তখন ওভানডোদের বাড়ির পথে অর্ধেকেরও বেশি এগিয়েছে?
রবার্তোদের ফায়ার শুরু হবার সাথে সাথে চারটি গাড়িই থেমে গেল।
দু’টি টায়ার ফাটার শব্দ হলো, তাও পেছনের দু’টি ক্যারিয়ারের।
গাড়ির ওপর গুলীবর্ষণ চলতে থাকল অবিরামভাবে যাতে ওরা গাড়ি থেকে নেমে পজিশন নেওয়ার সু্যোগ না পায়। আর যদি গাড়ির ওপাশে ওরা নামার চেষ্টা করে তাহলে লিউনার্দো ওদের টার্গেট করবে।
রবার্তোর এই চিন্তার সাথে সাথেই ওপার থেকে অনেকগুলো স্টেনগান গর্জন করে উঠল। গাড়ীর আরও কয়েকটি টায়ার ফাটার শব্দ হলো।
গাড়ি থেকে কোন গুলী হচ্ছে না। এদিক থেকে রবার্তো ওদিক থেকে লিউনার্দো গুলী বর্ষণ অব্যাহত রেখে গাড়ির দিকে এগিয়ে আসছে। তাদের টার্গেট গাড়িগুলোকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে লড়াইটাকে মুখোমুখি পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া। কারণ তাদের দরকার তাড়াতাড়ি লড়াই সমাপ্ত হওয়া।
কিন্তু রবার্তো ও লিউনার্দো গাড়ির কাছাকাছি পৌঁছতেই চারটি গাড়ি থেকে একসাথে গুলী বর্ষণ শুরু হলো।
রবার্তো ভাবল পুলিশ তাদের কাছে আসারই অপেক্ষা করছে যাতে তারা টার্গেট সুনির্দিষ্ট করতে পারে।
কিন্তু তাদের টার্গেট সুনির্দিষ্ট হচ্ছে না। পুলিশকে এলোপাতাড়ি গুলী ছুড়তে হচ্ছে।
গাড়ি চারটি ঝাঁঝরা হয়ে গেল। কিন্তু পুলিশ কয়জন আহত-নিহত হয়েছে বুঝতে পারল না রবার্তোরা। তবে পুলিশ অবরুদ্ধ হয়ে বেকায়দায় পড়েছে নিঃসন্দেহ।
আবারও হঠাৎ পুলিশের গুলী বর্ষণ একসাথে বন্ধ হয়ে গেল। লিউনার্দো রবার্তোকে টেলিফোনে জানাল পুলিশ আমাদের আরও ক্লোজ করতে চাচ্ছে তাদের কাছে। এর অর্থ তাদের আরও সুনির্দিষ্ট হওয়ার সুযোগ দেয়া অথবা লড়াই লংগার করার জন্যে তাদের গুলী তারা সাশ্রয় করতে চাচ্ছে।
রবার্তো উত্তরে বলল, এ সুযোগ তাদের দেয়া যাবে না বস। সময় পেলে টেলিফোন করে আরও পুলিশ তারা আনবে। আমরা তাতে বিপদে পড়ব। আমার প্রস্তাব হলো আমরা চারদিক থেকে গুলী অব্যাহত রাখি, আর কয়েকজন ক্রলিং করে গিয়ে গাড়ি দখল করুক। এই অন্ধকারে ওদের চোখকে ফাঁকি দেয়া যাবে। তাছাড়া ওদের নজর থাকবে গুলীর উৎসের দিকে।
লিউনার্দো বলল টেলিফোনে, ঠিক আছে। আমি পাঁচজনকে পাঠাচ্ছি, তুমি একজনকে পা………………। হঠাৎ কন্ঠ থেমে গেল লিউনার্দোর।

ওভানডোদের বাড়িতে প্রায় এসে গেছে আহমদ মুসা। দু’শ গজ দূরেও নয় আর বাড়িটা। হঠাৎ প্রচন্ড গোলা-গুলীর শব্দে থমকে দাঁড়াল আহমদ মুসা এবং লিন্ডা ও ক্রিস্টিনাও।
আগে হাঁটছিল আহমদ মুসা। আহমদ মুসার পেছনে ক্রিস্টিনা। সবার শেষে লিন্ডা।
রবার্তোর ধারণাই ঠিক। আহমদ মুসা টেরেক স্টেটে প্রবেশ করেছে গোণী দরজা দিয়ে। দরজাটা ধ্বংস প্রাপ্ত দুর্গ থেকে সোজা পূর্বদিকের প্রাচীরে।
গোণী দরজার জায়গাটায় সমুদ্র-তীরের কোষ্টাল হাইওয়ে এবং টেরেক স্টেটের মাঝখানে রয়েছে ভাঙা মিনারের মত উঁচু স্থাপনা। এক সময় এটা বাতিঘর ছিল বলে মনে করা হয়। ভাঙা মিনারটি টেরেক স্টেটেরই অংশ। টেরেক স্টেটের প্রাচীর এবং ভাঙা মিনারের পশ্চিম দেয়াল একই। এই দেয়ালের মাঝ বরাবর প্রায় ছয় ফুট উঁচুতে দেখা যাবে একটা মরিচা ধরা পেরেকের মাথা। আর ঠিক তার নিচে মেঝে থেকে দুই ফুট উপরে আড়াই বর্গফুট আয়তনের একটা জানালা। জানালাটা ভারী ইস্পাতের প্লেট দিয়ে ঢাকা। এটাই টেরেক স্টেটে ঢোকার গোনী দরজা। স্প্রিং লকের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। পেরেকের মাথাটা টানলে দরজা উপরে উঠে যায়। দরজা পার হয়ে ওপারে গিয়ে দরজাটা টেনে নিচে নামিয়ে আনলে পেরেকটা আবার ভেতরে ঢুকে গিয়ে দরজা বন্ধ রাখে। ভেতরের পাশেও অনুরুপ পেরেকের সুইচ আছে।
গুলী গোলার শব্দে থমকে দাঁড়িয়েই আহমদ মুসা শব্দ লক্ষ্যে ফিরে তাকাল। বলল, ‘লিন্ডা সংঘর্ষটা চলছে টেরেক স্টেটের ভেতরে দুই গ্রুপের মধ্যে। আমি মনে করছি, এই সংঘর্ষের সাথে ওভানডোদের সর্ম্পক আছে। তোমরা এস, আমার সাথে দৌড়াও।’
বলে আহমদ মুসা ছুটল ওভানডোদের বাড়ির দিকে।
দাঁড়াল গিয়ে ওভানডোদের গেটে। দরজা বন্ধ। বাইরে কেউ নেই, ভেতরেও কোন সাড়া শব্দ নেই। তাহলে ঘুমুচ্ছে কি সবাই? সংঘর্ষটা তাহলে কাদের মধ্যে? গেটে কয়েকবার করাঘাত করল। কেউ সাড়া দিল না।
ইতিমধ্যে লিন্ডা ও ক্রিস্টিনা এসে আহমদ মুসার পাশে দাঁড়িয়েছে।
আহমদ মুসা তার দিকে মুখ ঘুরিয়ে বলল, ‘লিন্ডা এটাই ওভানডোদের বাড়ি। দুর্গ থেকে সরে আসার পর এখানেই একটা বাড়ি বানানো হয়। সেটাও ভেঙে গেলে পরে এই বাড়ি বানানো হয়েছে।’
কথা শেষ করেই আহমদ মুসা বলল, ‘লিন্ডা ও ক্রিস্টিনা তোমরা এখানে দাঁড়াও বা আসতে পার। ‍ওদিকে গিয়ে ডেকে দেখি। এখান থেকে ওদের জাগানো যাবে না।
‘আমাদের ভয় করছে, আপনার সাথে যাব।’
বলে লিন্ডা ও ক্রিস্টিনা হাঁটা শুরু করল আহমদ মুসার পেছনে পেছনে।
ওভানডোর ঘরটা বাড়ির দক্ষিণ দিকের একেবারে মাঝামাঝি জায়গায়।
আহমদ মুসা গিয়ে দাঁড়াল ওভানডোর জানালা বরাবর নিচে।
ওভানডো থাকে দোতলায়। লোহার গরাদে ঢাকা। আহমদ মুসা সেখানে দাঁড়িয়ে উপর দিকে চোখ তুলতে গিয়ে একতলার গরাদের ফাঁক দিয়ে আলো দেখতে পেল। কথার অস্পষ্ট শব্দও তার কানে এল।
যে ফাঁক দিয়ে আলো আসছে সে ফাঁকে চোখ লাগাল আহমদ মুসা। ফ্যামিলি গ্যাদারিং-এর সবচেয়ে বড় লাউঞ্জ এখানে। এবং এখানেই বাড়ির আন্ডার গ্রাউন্ড সেন্টারে নামার গোনী