২০. অন্ধকার আফ্রিকায়

চ্যাপ্টার

চ্যাপ্টার

কর্ডলেস টেলিফোন থেকে মুখ তুলে ফ্রান্সিস বাইক পিয়েরে পলের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘পি. এ. সাহেব বলেছেন চীফ জাষ্টিস এভাবে কথা বলেন না।’
‘বলবে না মানে? টেলিফোনটা আমাকে দিন।’ বলে টেলিফোন নেয়ার জন্যে হাত বাড়াল পিয়েরে পল। টেলিফোন মুখের কাছে এনেই বলল, ‘পি. এ. সাহেব?’
‘জি বলুন, বলছি আমি।’ বলল টেলিফোনের ওপ্রান্ত থেকে পি. এ.।
‘আপনাকে বলতে ভুলে গেছে, চীফ জাষ্টিসের সাথে ডঃ ডিফরজিস কথা বলবেন।’
‘কোন ডঃ ডিফরজিস? প্যারিসের?’
‘ঠিক। চীফ জাষ্টিস সাহেবের শিক্ষক।’
‘সব জানি। স্যরি স্যার। ওনাকে বলছি একটু ধরুন।’
পিয়েরে পল টেলিফোন থেকে মুখ একটু সরিয়ে ডঃ ডিফরজিসের দিকে চেয়ে বলল, ‘ডঃ গো ধরে থাকলে কোন লাভ হবে না। চীফ জাষ্টিসকে বলুন আমাদের সহযোগিতা করতে।’
বলেই মুখ টেলিফোনের কাছে নিয়ে বলল, ‘মাই লর্ড ডক্টর সাহেবকে দিচ্ছি।’ বলে পিয়েরে পল টেলিফোন ডঃ ডিফরজিসের হাতে তুলে দিল।
‘হ্যালো, উসাম কেমন আছ?’
‘ভালো। কিন্তু আমি কিছু বুঝতে পারছিনা। আমি আকাশ থেকে পড়েছি। না জানিয়ে আপনি ক্যামেরুন এসেছেন। বাসায় না এসে টেলিফোন করছেন। আপনি কোথায়? আমি আসব।’
‘আমি আসিনি, আমাকে আনা হয়েছে। আমি কোথায় আমি জানিনা।’
‘কি বলছেন আপনি? এটা বিশ্বাস করা যায়?’
‘যা চোখের সামনে উপস্থিত। তা বিশ্বাস-অবিশ্বাসের প্রশ্ন ওঠে না উসাম। আমাকে ওরা কিডন্যাপ করে এনেছে ক্যামেরুনে।’
‘কিডন্যাপ?’
ওপারের কথা শেষ হয়নি বুঝা যায়। কিন্তু কোন কথা ওপার থেকে শোনা গেল না। বিস্ময়ের ধাক্কা সামলে নিতে নিশ্চয় সময় লাগছে চীফ জাষ্টিসের।
আবার শোনা গেল ওপারের কণ্ঠ, ‘আমি কিছু বুঝতে পারছি না জনাব। কি ঘটেছে বলুন।’
‘আমাকে কারা যেন কিডন্যাপ করে এনেছে।’
‘কেন?’
‘আমাকে পণবন্দী করেছে ওরা।’
‘পণবন্দী? কিসের জন্যে?’
‘তোমার কাছ থেকে একটা কাজ চায় ওরা।’
‘আমার কাছে? কিন্তু আপনাকে পণবন্দী করে কেন?’
‘কাজটা বেআইনি। আমাকে ওরা বলেছিল তোমাকে বলে কাজটা করিয়ে দিতে। রাজী না হওয়ায় কিডন্যাপ করেছে। আমাকে পণবন্দী করে কাজটা বাগিয়ে নিতে চায়। তাদের ধারণা আমার জীবন বাঁচাবার জন্যে তুমি কাজটা তাদের করে দেবে।’
‘কাজটা কি?’ ওপারে চীফ জাষ্টিসের কণ্ঠ বড় শুকনো শুনাল।
‘কাজের কথা আমি তোমাকে বলব না এবং কোন অন্যায়ের কাছে নতি স্বীকার তুমি কর, এটা আমি চাইব না।’
‘স্যার, ওদের কেউ আছে? আমি কথা বলতে চাই। শুনতে চাই ব্যাপারটা কি?’
‘ঠিক আছে। দিচ্ছি কথা বল।’
টেলিফোন হাতে নিল পিয়েরে পল। বলল, ‘মাই লর্ড, বলুন।’
‘ডঃ ডিফরজিসের মত একজন বৃদ্ধ, সম্মানী, দরদী মানুষকে আপনারা কিডন্যাপ করেছেন! কে আপনারা?’
‘মাই লর্ড, পরিচয়টা এই মুহূর্তে দিতে পারছিনা।’
‘কেন তাঁকে আপনারা কিডন্যাপ করেছেন?’
‘আমরা দুঃখিত মাই লর্ড। আমাদের উপায় ছিল না। ছোট একটা সহযোগিতা করতে তিনি রাজী হননি। কাজটা মোটেই বড় নয়।’
‘কাজটা কি?’
‘দুঃখিত, টেলিফোনে বলা যাবে না। মনে হয় টেলিফোনে এ ধরনের আলোচনা শোভনও হবে না।’
‘কিন্তু আমি এ মুহূর্তে শুনতে চাই।’
‘তাতে আমরা খুব খুশী হবো। কিন্তু টেলিফোনে নয়।’
‘তাহলে?’
‘মাই লর্ড, আজ কোর্ট ছিল না। আপনার সান্ধ্য ভ্রমনের অভ্যাস আছে। আপনি ‘ইন্ডিপেনডেনস পার্ক’ -এর গেটে আসুন। গেট পেরুলে প্রথম যে বেঞ্চ সেখানে আমরা বসব।’
‘এটা সম্ভব নয়। আমার বাড়িতে আসুন। আমার বাগানের নিরিবিলিতে কোথাও বসে কথা বলব।’
‘আমার আপত্তি নেই। এখন ৬টা। আমি সাড়ে ৬টায় বাগানের গেটে পৌঁছব। ৭টা পর্যন্ত থাকব।’
‘ঠিক আছে আসুন।’
‘মাই লর্ড, সাড়ে ছয়টায় বাগানের বাইরের গেটটা খোলা রাখতে হবে। গাড়ি বাগানের মধ্যে নিয়ে আমি গাড়ি থেকে নামব। চামড়া রংয়ের মুখোশ থাকবে মুখে।’
‘অলরাইট।’
‘আর একটা কথা। আশা করি অন্য কিছু ঘটবে না। আমি যদি ৮টার মধ্যে ফিরে না আসি তাহলে ডঃ ডিফরজিসের জীবন বিপন্ন হবে।’
‘আমি বিচারক। আপনার সাথে লড়াই-এ নামিনি আমি। একটি বিষয় জানার জন্যে আমি আপনাকে ডাকছি।’
‘ধন্যবাদ, মাই লর্ড।’
‘ধন্যবাদ।’
টেলিফোন রেখে পিয়েরে পল বলল, ‘মিঃ ফ্রান্সিস বাইক আমি তৈরী হতে গেলাম। আপনি ড্রাইভারকে গাড়ি বের করতে খবর দিন।
তারপর ডঃ ডিফরজিসের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আপনার পক্ষ থেকে তাকে কিছু বলার আছে?’
‘নেই। তবে আমার একটা জিজ্ঞাসা আছে।’
‘কি?’
‘আমার সন্তান ও বৌমাকে কোথায় রেখেছেন আপনারা?’
‘দুঃখিত, আমাদের কথায় রাজী না হওয়া পর্যন্ত বলব না।’
‘আরেকটা কথা। কুমেটে যে বাড়িতে আপনারা আমাদের রেখেছিলেন, সেখান থেকে আমাদের আসার মুহূর্তে গোলা-গুলি হয়েছিল কেন? আমাদের সন্তানদের কোন ক্ষতি হয়নি তো?’
‘বলেছি, কোন সহযোগিতাই আমরা আপনাকে করব না।’
বলে পিয়েরে পল বেরিয়ে এল ঘর থেকে।
চীফ জাষ্টিসের বাড়ি এবং বাড়ির রাস্তা পিয়েরে পলের মুখস্থ। ইয়াউন্ডি আসার পর বেশ কয়েকবার এখানে এসেছে।
পিয়েরে পল যখন চীফ জাষ্টিস উসাম বাইকের বাগানের গেটে পৌঁছল, তখন ঠিক সাড়ে ছয়টা।
গেট খোলা ছিল বাগানের।
গেট দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে গাড়ি থেকে নামল পিয়েরে পল। তার আগে গাড়িতে বসেই মুখে মুখোশ লাগিয়ে নিয়েছিল।
গাড়ি থেকে নেমেই পিয়েরে পল দেখতে পেল অল্প দূরে বড় একটি আলো-শেড-এর নিচে একটা চেয়ারে একজন বসে আছে। চারদিকের আলোর মাঝখানে সেখানে অন্ধকারের একটা পাতলা আবরণ।
পিয়েরে পল ওদিকে চলল।
পিয়েরে পল সেখানে পৌঁছতেই উঠে দাঁড়াল চেয়ারে বসা সেই লোকটি।
‘গুড ইভেনিং, আসুন।’ বলে পিয়েরে পলকে বসার জন্য চেয়ার দেখিয়ে দিল।
বসল দু’জনে।
চীফ জাষ্টিস মধ্য বয়সী একজন লোক। রঙে সে খাস আফ্রিকান নিগ্রো। কিন্তু চোখ, চুল, ঠোঁট ইত্যাদির গড়ন তার বলে দেয় সে আফ্রো-ইউরোপীয় অথবা আফ্রো-এশীয় মিশ্র পরিবারের সন্তান। তার চেহারার মধ্যে একটা পবিত্র প্রসন্নতা।
চীফ জাষ্টিস বসেই বলল, ‘আমি ফ্রাংকোইস উসাম বাইক। আমি আপনার কথা শোনার জন্যে প্রস্তুত। বলুন।’
‘মাই লর্ড, আপনাকে কষ্ট দেয়ার জন্যে আমি প্রথমেই ক্ষমা প্রার্থনা করছি। আমরা নিরুপায় হয়েই এই অবস্থায় পৌঁছেছি। আপনার সাথে আমাদের কোন পরিচয় নেই। তাই চেয়েছিলাম ডঃ ডিফরজিস আমাদেরকে সহযোগিতা করবেন।কিন্তু স্বেচ্ছায় তিনি তা করেননি।’
বলে একটু থামল পিয়েরে পল। সম্ভবত কথাগুলো একটু গুছিয়ে নিল। শুরু করল আবার, ‘প্রথমেই বলে রাখি, আমার কিংবা কারও ব্যক্তিগত স্বার্থের জন্যে আমি আসিনি। আমরা যা করতে চাই তা করতে পারলে লাভবান হবে জাতি, কোন ব্যক্তি নয়।’
একটু দম নিল পিয়েরে পল।
‘শুনছি, বলুন’ বলল চীফ জাষ্টিস।
‘মাই লর্ড, দক্ষিণ ক্যামেরুনের উপকূলীয় কাম্পু উপত্যকার দশ হাজার একরের একটা জমি খন্ড নিয়ে গন্ডগোল। ঐ জমি খন্ডের চারদিকের সব জমিই চার্চের। মাঝখানের ঐ জমি খন্ড একজন মুসলমানের। এই এক খন্ড জমি নানা দিক দিয়ে আমাদের অসুবিধা সৃষ্টি করছে এবং আরও অসুবিধার কারণ হতে পারে। তাই অনেক বছর ধরে আমরা ঐ জমির মালিককে অনুরোধ করে আসছি, জমির যা মূল্য তার চেয়ে কয়েকগুন বেশী মূল্য দেবো। কিন্তু জমি হস্তান্তরে সে রাজী হয়নি। পরে আমরা জানতে পেরেছি, তার এ অস্বাভাবিক অস্বীকৃতির মূলে একটা ষড়যন্ত্র রয়েছে। মক্কা ভিত্তিক ইসলামী সংগঠন রাবেতায়ে আলম আল-ইসলামী সেখানে বড় রকমের একটা ঘাঁটি বানাতে চায়। এই পরিস্থিতি আমাদের ভীষণ উদ্বিগ্ন করে। কারণ, তারা শান্তিপূর্ণ এ অঞ্চলে সংঘাত বাধাবার জন্যেই এটা করতে চায়। এসব জেনে আমরা নতুন করে যখন তাকে অনুরোধ করলাম, তখন সে রাবেতার পরামর্শে আপনার কোর্টে একটা উইল করে দেশ থেকে পালিয়ে যায়। আসলে জমি তার লক্ষ্য নয়, গন্ডগোল বাধানোই তার লক্ষ্য। আমরা জাতীয় স্বার্থেই এটা হতে দিতে পারি না।’
থামল পিয়েরে পল।
‘বলুন।’ বলল চীফ জাস্টিস উসাম বাইক।
‘এই অবস্থায় আমরা চাই, আপনি আমাদের সাহায্য করুন।’
‘উইলে কি আছে?’
‘সে কোর্টে হাজির হয়ে জমি হস্তান্তর না করলে তার জমি হস্তান্তর বৈধ হবে না। দ্বিতীয়তঃ সে যদি দুই বছর পর্যন্ত নিখোঁজ থাকে, তাহলে জমি ক্যামেরুন মুসলিম ট্রাস্টের সম্পত্তি বলে গণ্য হবে।’
‘আমার কাছে কি সাহায্য চান?’
‘জমি হস্তান্তর দলিলে ওমর বায়ার দস্তখতকে তার উপস্থিতি বলে ধরে নিতে হবে।’
‘ওমর বায়া কোথায়?’
‘আমাদের হাতে আছে।’
‘তাহলে ওকে কোর্টে হাজির করিয়ে দস্তখত নিন।’
‘কোর্টে হাজির করে তার কাছ থেকে দলিলে দস্তখত পাওয়া যাবে না।’
‘তার উইল অনুসারে তাকে কোর্টে হাজির না করে তার জমি হস্তান্তর হবে না।’
‘ধরুন, সে জমি হস্তান্তর করল না। এর বদলে সে যদি আগের উইল বাতিল করার আবেদন করে কিংবা নতুন উইল করে!’
‘তার জন্যেও উপস্থিতি একটা শর্ত।’
‘কিন্তু এ শর্তটা জমি হস্তান্তরের মত অত কঠিন নয়।’
‘শর্ত শর্তই, কঠিন-সহজ হয়না।’
‘তাহলে আপনার সাহায্য আমরা কিভাবে পাব?’
‘আপনিই বলুন।’
‘আমি দুইটা পথের কথা বলেছি। এক, জমি হস্তান্তর দলিলে তার দস্তখত উপস্থিতি হিসেবে ধরে নিতে হবে। অথবা দুই, তার আগের উইল বাতিল করার আবেদন গ্রহন করতে হবে।’
‘হাজির না করে দুই পদ্ধতির কোনটাই আইনসিদ্ধ নয়।’
‘মাই লর্ড, আমরা সেটা জানি। জানি বলেই আপনার দ্বারস্থ হয়েছি। এখন বলুন আপনি আমাদের সাহায্য করবেন কিনা?’
‘এ অন্যায় সাহায্য না করলে কি করবেন?’
‘প্রথম কাজ হবে, আমরা পণবন্দীকে হত্যা করব। আরও কি করব সেটা আমরা এখন বলব না। শুধু জেনে রাখবেন, যত রক্তপাতের প্রয়োজন হোক, ‘ক্রস’ পরাজিত হবে না।’
‘আপনারা ওমর বায়ার জমির কি পরিমান মূল্য দিতে রাজি আছেন?’
‘ক্যামেরুনের সর্বোচ্চ যে রেট তার দ্বিগুন দিতে রাজি আছি।
‘এই টাকা কোর্টের সামনে অথবা কোর্টকে পরিশোধ করতে হবে।’
‘আমরা রাজি।’
‘দ্বিতীয়ত, ওমর বায়াকে কোর্টে এতটুকু হাজির করতে হবে যাতে আমরা তাকে দেখতে পাই। তার কথার কোন প্রয়োজন নেই।’
‘ঠিক আছে, এতে অসুবিধা নেই।’
‘তৃতীয়ত, ডঃ ডিফরজিস ও ওমর বায়াকে উইল রেজিস্ট্রির পর ছেড়ে দিতে হবে এবং চেম্বারে পৌঁছাতে হবে।’
‘আমরা ডঃ ডিফরজিসকে পৌঁছাব, কিন্তু ওমর বায়াকে নয়। তাকে আমরা ছাড়ব আমাদের জমির দখল সম্পূর্ণ হওয়ার পর। প্রয়োজন বোধ করলে আমরা তাকে দলিল সম্পর্কে আপত্তি উত্থাপনের শেষ মেয়াদতক রাখতে পারি।’
‘ঠিক আছে, আপনারা প্রসেস করুন। আপনার উকিল যেন আমার অফিস থেকে কেসের তারিখটা ঠিক করে নেয়।’
‘ইয়েস মাই লর্ড। আমার একটা শর্ত আছে। আজকের কথাগুলো এবং জমি সংক্রান্ত ব্যাপার আপনার কান ছাড়া যতগুলো কানে পৌঁছবে তারা আমাদের হত্যা তালিকায় থাকবে।’
‘এ কথাগুলো আমাকে না বললেও চলতো। বিচারপতিরা ক্যামেরুনের পুলিশ কিংবা গোয়েন্দার দায়িত্ব পালন করেন না।’
‘থ্যাংকস মাই লর্ড। উঠি।’
বলে পিয়েরে পল উঠে দাঁড়াল।
চীফ জাস্টিস উসাম বাইক মাথা নাড়ল, মুখে কোন কথা বলল না।

ইয়াউন্ডি সুপার মার্কেট থেকে ফিরছিল ডোনা, ডোনার আব্বা এবং এলিসা গ্রেস।
আজ সকালেই তারা কুমেট থেকে ইয়াউন্ডি এসেছে।
সেদিন আহমদ মুসা কুমেট বিমান বন্দরে চলে যাবার এক ঘন্টা পর ডোনারা কুমেটে গার্লস ব্রিগেডের রেস্ট হাউসে সুমাইয়াদের কাছে পৌছে।
আহমদ মুসার প্লেন ১২টায় ক্যামেরুনরে উদ্দেশ্যে ছাড়ার কথা। সুতরাং ডোনাদের এয়ারপোর্টে নেয়ার সময় ছিল না।
আহমদ মুসার চলে যাবার সংবাদে ডোনা বিস্মিত হয়নি, কিন্তু আহত হয়েছিল। আহমদ মুসার সন্ধানে সে ছুটে এসেছিল প্যারিস থেকে সেন্টপোল ডে-লিউন-এ। কিন্তু অল্পের জন্যে দেখা পায়নি। আবার তারা ছুটে আসে কুমেটে। এক ঘন্টা দেরীর জন্যে এখানেও দেখা হয় নি।
আহমদ মুসার চলে যাবার খবর যখন সুমাইয়া দ্বিধাগ্রস্থ কন্ঠে ডোনাকে দিয়েছিল, তখন ডোনা মুহূর্তের জন্যে চোখ বুজে আঘাতটা সামলে নিয়েছিল।
পরে সুমাইয়া আহমদ মুসার রেখে যাওয়া চিঠি ডোনাকে দিয়েছিল।
কম্পিত হাতে ডোনা চিঠি নিয়েছিল। তার কাছে আহমদ মুসার এটাই প্রথম চিঠি। কি লিখেছে! প্যারিস থেকে তার চলে আসার জন্যে রাগ করেনি তো!
চিঠি নিয়ে ডোনা পাশের ঘরে চলে গিয়েছিল। চিঠিতে সে পড়েঃ
“মারিয়া,
আমি আমার কথা রাখতে পারিনি বলেই তোমাকে কষ্ট করে ডে-লিউন পর্যন্ত ছুটে আসতে হয়েছে। আবার কুমেট থেকেও টেলিফোন করতে পারিনি তোমাকে। করতে পারিনি ঠিক নয়, ভুলে গিয়েছিলাম। এ ভুলের মাশুল তোমাকেই দিতে হচ্ছে। তবু কুমেটে আমাদের দেখা হবে বলে মনে হচ্ছে না। এ সব কিছুর জন্যে নিজেকে দোষী ভাবার সাথে সাথে কিছুটা আনন্দবোধও আমার হচ্ছে। বুক ভরা উদ্বেগ নিয়ে কেউ কখনও এভাবে আমার পেছনে ছুটে আসেনি। কারও দুটি সজল চোখ এইভাবে কখনও আমাকে খুঁজে ফেরেনি। কিন্তু আমার জন্যে যা আনন্দ, তোমার জন্যে সেটা কষ্ট। তোমার এ কষ্টের জন্যে দুঃখ প্রকাশ ছাড়া আর কি করতে পারি আমি বলো।”
চিঠি শেষ করেও অনেক্ষন চিঠি থেকে চোখ সরাতে পারেনি ডোনা। তারপর তার চোখ দু’টি সরে গিয়ে দক্ষিনের জানালা দিয়ে নিবদ্ধ হয়েছিল দক্ষিন দিগন্তে। যেন দেখতে পাচ্ছে সে ক্যামেরুনের পথে ছুটে চলা আহমদ মুসার প্লেন। কান্নার মত এক টুকরো হাসি ফুটে উঠেছিল ডোনার ম্লান ঠোঁটে। ঠোঁটের বাঁধন ডিঙিয়ে বেরিয়ে এসেছিল তার স্বগত উচ্চারনঃ ‘তুমি যাকে আমার কষ্ট বলছ, তা আমার কত আনন্দের, কত তৃপ্তির, কত প্রশান্তির সেটা তুমি কি বুঝ!’
কক্ষ থেকে বেরিয়ে এসে ডোনা তার আব্বাকে বলেছিল, ‘ও আমাদের ক্যামেরুন যেতে নিষেধ করেনি।’
‘যেতে কি বলেছে?’ বলেছিল ডোনার আব্বা।
‘তার নিষেধ না করাটাই যেতে বলা আব্বা।’
‘হ্যাঁ, এটাও ঠিক।’ বলে মিষ্টি হেসেছিল ডোনার আব্বা।
‘আব্বা তুমি ইয়াউন্ডির ফরাসী দুতাবাসকে বলে দাও আমার ও এলিসার জন্যে একটা ভাল ব্যবস্থা করতে।’
‘ওখানে রাষ্ট্রদূত হিসেবে আছেন আমার বন্ধু তোমার আংকেল ‘জিন মিশেল ব্রেন্ডার’। বাড়ির মতই থাকতে পারবে। কিন্তু তোমার আব্বাকে বাদ রাখছ কেন?’ হেসে বলেছিল ডোনার আব্বা।
‘লং জার্নিতে তোমার কষ্ট হবে আব্বা।’ বলেছিল ডোনা।
‘তার চেয়েও বেশী কষ্ট হবে মা কাছে না থাকলে।’ বলেছিল ডোনার আব্বা সস্নেহে হেসে।
ডোনা উঠে গিয়ে তার আব্বার পাশে বসে তার কাঁধে মাথা রেখে বলেছিল, ‘ঠিক আছে তুমিও যাবে।’
বলে একটু হেসেছিল ডোনা। তারপর ধীরে ধীরে বলেছিল, ‘মাঝে মাঝে ভেবে আমার কষ্ট হয় আব্বা আমি তোমাকে বিরাট টেনশনে ফেলেছি।’
‘দুনিয়াতে অনেক টেনশন আছে, যা সুখ স্বপ্নের চেয়েও মধুর।’
‘ধন্যবাদ আব্বা। আমার আব্বা দুনিয়ার সেরা আব্বা।’ বলেছিল ডোনা তার আব্বার কাঁধে কপাল ঘষতে ঘষতে।’
ডোনারা ক্যামেরুন যাবার আগে সুমাইয়া, ডেবরা ও রালফের সাথে অনেক কথা হয়েছে তাদের। শুনেছিল ক্লাউডিয়া ও ডাঃ জিয়ানার আত্মত্যাগের কাহিনী। শুনে কেঁদেছিল ডোনা। তার মনে পড়েছিল আহমদ মুসার কাছে শোনা রুশ কন্যা তাতিয়ানার কাহিনী, কেঁপে উঠেছিল ডোনার মন। কত ভাঙা হৃদয়ের কত দাবী যে আহমদ মুসাকে ঘিরে আছে! ডোনার ছোট্ট হৃদয়ের দুর্বল দাবী কি অবশেষে তার প্রিয়তম ঠিকানা খুঁজে পাবে!’
ডোনার আব্বা ঠিক বলেছিল। ক্যামেরুনের ফরাসী রাষ্ট্রদূত জিন মিশেল ব্রেন্ডার ডোনাদেরকে পরম আত্মীয়ের মতই গ্রহন করেছে। এ্যামবেসির গেস্ট হাউসে তাদের থাকতে দেয়নি। বাড়ির একটা বিরাট অংশ ছেড়ে দিয়েছে এ্যামবেসেডর ডোনাদের জন্যে। জিন মিশেল ব্রেন্ডারের কুটনৈতিক জীবনের শুরু ডোনার আব্বা মিশেল প্লাতিনীর পারসোনাল সেক্রেটারী হিসেবে।
ইয়াউন্ডিতে এসে খাওয়া দাওয়া শেষে দীর্ঘ ঘুম দেবার পর জরুরী কিছূ কেনা কাটা এবং শহর দেখার জন্যে ডোনারা বেরিয়েছিল।
মার্কেট থেকেই ফিরছিল তারা।
এ্যামবেসেডর জিন মিশেল একটা গাড়ি দিয়েছিল ডোনাদের স্বাধীনভাবে ব্যবহারের জন্যে। তার সাথে ডোনা চেয়েছিল ইয়াউন্ডির একটা রোড ম্যাপ। ড্রাইভারও দিয়েছিল। কিন্তু ডোনা ড্রাইভার নেয়নি। ডোনা দেখেছিল, যে মিশন নিয়ে সে ক্যামেরুনে এসেছে তাতে ড্রাইভার নিলে ঝামেলার সম্ভাবনা আছে। আহমদ মুসার সাক্ষাৎ না পাওয়া পর্যন্ত তাকেই তার দায়িত্ব বহন করার মত যোগ্যতা দেখাতে হবে।
গাড়ি ড্রাইভ করছিল ডোনা।
গাড়ি চলছিল ইয়াউন্ডির সেন্ট্রাল রোড ধরে।
বেলা তখন ৩টা।
ডোনা দেখল, রাস্তার পাশে একটা সুন্দর গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। গাড়িটির পাশে দাঁড়িয়ে আছে একজন তরুনী। ইউরোপীয়ান পোশাক। মেয়েটি কালোও নয় আবার সাদাও নয়। কালো ও সাদার মাঝখানে অব্যক্ত এক রঙের সুষমা তার দেহে।
মেয়েটি গাড়িতে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে অসহায়ভাবে এদিক-ওদিক চাইছে।
ডোনা গাড়িটির পাশাপাশি এসে ব্রেক কষল গাড়িতে। জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে ফরাসি ভাষায় ডোনা জিজ্ঞেস করল, ‘গুড ইভনিং, কোন সমস্যা?’
‘গুড ইভনিং, গাড়ি স্টার্ট নিচ্ছে না।’ বলল মেয়েটি বিব্রত কন্ঠে।
‘আমি কি চেষ্টা করে দেখতে পারি?’ বলল ডোনা।
‘ওয়েলকাম। আমি বাধিত হবো।’
ডোনা তার গাড়িটি রাস্তার পাশে নিয়ে দাঁড় করাল। বলল, ‘আব্বা, আমার মনে হচ্ছে মেয়েটি বিপদে পড়েছে। একটু দেখি।’
‘যাও দেখ।’ পেছনের সিট থেকে বলল ডোনার আব্বা।
ডোনা এবং এলিসা গ্রেস দুজনেই নামল গাড়ি থেকে।
ডোনা গিয়ে হ্যান্ডশেক করল মেয়েটির সাথে। বলল, ‘নামটা কি জানতে পারি?’
‘ভেনেসা রোসেলিন। আপনি?’
‘আমি মারিয়া জোসেফাইন। আর এ এলিসা গ্রেস।’
ডোনা প্রথমে ড্রাইভিং সিটে বসে সব কিছু চেক করে বলল, ‘দোষটা ইঞ্জিনে।’
বলে বেরিয়ে এল গাড়ি থেকে।
তারপর গাড়ির সামনে গেল ডোনা। রোসেলিন চাবি দিয়ে কভার আনলক করল এবং কভারটি তুলে ছিটকিনিতে ঠেস দিয়ে রাখল।
ইঞ্জিন পরীক্ষা করে রোসেলিন-এর দিকে মুখ তুলে বলল, ‘বড় কিছু ঘটেনি। আমি ঠিক করে দিচ্ছি।’
স্ক্রুড্রাইভার নিয়ে এল ডোনা নিজের গাড়ি থেকে। দু’মিনিটের মধ্যে ঠিক হয়ে গেল।
কাজ শেষ করে রোসেলিনকে বলল, ‘স্টার্ট দিয়ে দেখুন ঠিক আছে কিনা।’
রোসেলিন ড্রাইভিং সিটে গিয়ে গাড়ি স্টার্ট দিল। মিষ্টি গর্জন করে জেগে উঠল ইঞ্জিন।
হাসিতে মুখ উজ্জ্বল করে গাড়ি থেকে বেরিয়ে এল রোসেলিন। বলল, ‘ধন্যবাদ, অনেক ধন্যবাদ। গাড়ির কিছু আমি বুঝি না। কি যে বিপদে পড়তাম আপনাকে না পেলে।’
বলে একটু থামল রোসেলিন। কিন্তু ডোনাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই বলল, ‘আপনার কথা শুনে মনে হচ্ছে আপনি ফরাসি। তাই কি?’
‘ঠিক বলেছেন, আজ সকালেই আমরা ক্যামেরুন এসে পৌঁছেছি।’
‘কোথায় উঠেছেন?’ বেড়াতে এসেছন বুঝি?’
‘ফরাসি রাষ্ট্রদূতের অতিথি আমরা।’
‘তাহলে তো আমরা শহরের একই এলাকায় আছি। আমি কি আপনাদের চায়ের দাওয়াত করতে পারি?’
‘ধন্যবাদ। কেন নয়?’
রোসেলিন খুশীতে ডোনার সাথে হ্যান্ডশেক করল।
‘গাড়ির ফ্ল্যাগ স্টান্ডে একটা পতাকা ঢাকা দেখছি। কি পতাকা?’
রোসেলিন একটু সলজ্জ হাসল। বলল, ‘আমার আব্বা চিপ জাস্টিস তো। ওঁর গাড়ি। ওটা ক্যামেরুনের জাতীয় পতাকা।’
‘ও, ওয়ান্ডারফুল। সৌভাগ্য যে, আপনার সাথে পরিচিত হবার সুযোগ হলো।’ উচ্ছ্বসিত কন্ঠে বলল ডোনা। তার মনে পড়েছিল ব্ল্যাকক্রস ডঃ ডিফরজিস্কে কিডন্যাপ করেছে এই চীফ জাস্টিসকে বাগে আনার জন্যে। খুশী হলো। ঘটনার একটা পক্ষের সাথে পরিচিত হবার সুযোগ তো অন্তত হলো!
‘সৌভাগ্য আমারও।’ বলে হেসে রোসেলিন বলল, ‘একটা কথা জিজ্ঞেস করি?’
‘অবশ্যই।’ বলল ডোনা।
‘আপনাদের পোশাক, বিশেষ করে গায়ে মাথায় ওড়না – এ ধরনের পোশাক তো ফরাসীরা পরে না।’
‘ফরাসীরা সবাই পরে না তা নয়। মুসলিম ফরাসীরা পরে।’ হেসে বলল ডোনা।
‘তাহলে আপনারা মুসলিম?’ বিস্ময় মিশ্রিত কন্ঠে বলল রোসেলিন।
‘খুশী হননি বুঝি?’ বলল ডোনা।
হাসিতে মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল রোসেলিনের। বলল, ‘আমার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বান্ধবী মুসলিম।’ কথাগুলো বলতে গিয়ে আবেগ-অনুরাগের একটা ঢেউ খেলে গেল রোসেলিনের মুখে।
ডোনা তাকিয়েছিল রোসেলিনের মুখের দিকে। সে বিস্মিত হলো রোসেলিনের মুখ ভাবের এই পরিবর্তনে। ডোনার মনে হলো রোসেলিন যেন কথা শেষ করেও করল না।
‘ও! নাইস! কি নাম আপনার বান্ধবীর?’ আনন্দে উচ্ছ্বসিত হয়ে বলল ডোনা।
‘লায়লা ইয়েসুগো। ইয়েসুগো রাজ পরিবারের মেয়ে। ইয়াউন্ডি বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার ক্লাসমেট।’
‘ইয়েসুগো রাজপরিবার ক্যামেরুনের?’ বলল ডোনা।
‘হ্যাঁ। ক্যামেরুনের একদম উত্তরে গারুয়া উপত্যকা থেকে ‘লেক চাঁদ’ পর্যন্ত এক সময় ওদের রাজত্ব ছিল।’
‘ও! খুশী হবো যদি আমাদের পরিচয় করিয়ে দেন।’
‘অবশ্যই। ওরাও খুশী হবে।’
বলেই রোসেলিন পকেট থেকে একটা কার্ড বের করে ডোনার দিকে তুলে ধরে বলল, আমার ‘নেম কার্ড’। যে কোন প্রয়োজনে টেলিফোন করবেন।
ডোনা কার্ড হাতে নিয়ে বলল, ‘আসুন আমার আব্বা গাড়িতে। তার সাথে পরিচয় করিয়ে দেই।’
বলে রোসেলিনের একটা হাত ধরে এগুল সে তার গাড়ির দিকে।
ওদেরকে গাড়ির দিকে আসতে দেখে ডোনার আব্বা মিশেল প্লাতিনি গাড়ি থেকে নেমে এল।
‘আব্বা, এ ভেনেসা রোসেলিন। ক্যামেরুনের চীফ জাস্টিস উসাম বাইকের মেয়ে।’
তারপর রোসেলিনের দিকে মুখ তুলে ডোনা বলল, ‘ইনি আমার আব্বা মিশেল প্লাতিনি লুই।’
দু’জন শুভেচ্ছা বিনিময় করছে, তখন ডোনা ড্যাশ বোর্ডের কার্ড কেস থেকে তার ‘নেম কার্ড’ নিয়ে এল।
কার্ড রোসেলিনকে দিয়ে বলল, ‘এতে এখানকার টেলিফোন নম্বারও আছে।’
‘ধন্যবাদ।’
বলে রোসেলিন ডোনার আব্বার দিকে চেয়ে বলল, ‘আংকেল, এখনকার মত চলি। আমি কিন্তু চায়ের দাওয়াত দিয়েছি।’
‘ঠিক আছে মা। আমরা খুশী হয়েছি।’ বলল ডোনার আব্বা।
তারপর রোসেলিন ডোনা ও এলিসা গ্রেসের সাথে হ্যান্ডশেক করে বলল, ‘চলি, মনে থাকে যেন চায়ের দাওয়াতের কথা। আমি টেলিফোন করব।’
রোসেলিন এবং ডোনার গাড়ি এক সাথেই ছাড়ল।

‘খাওয়ার সব ব্যবস্থা ঠিক-ঠাক আছে তো মা?’ চীফ জাস্টিস উসাম বাইক জিজ্ঞেস করলো রোসেলিনকে।
রোসেলিন ড্রইং রুমে প্রবেশ করছিল। সে এসে তার আব্বার পাশে বসতে বসতে বলল, ‘সব ঠিক-ঠাক আব্বা, কোন চিন্তা করো না।’
রোসেলিন ডোনাদের দাওয়াত দিয়েছিল চায়ের। কিন্তু চীফ জাস্টিস ডোনার আব্বার পরিচয় পেয়ে শুধু চায়ের দাওয়াত দিতে রাজী হয়নি। ডোনার কার্ড দেখেই চীফ জাস্টিস চিনতে পেরেছিল ডোনার আব্বা মিশেল প্লাতিনি ডি-বেরী লুইকে।
‘জানো তো মা, ফ্রান্সের সম্রাট লুই-এর পরিবারের লোক ওরা। রাজত্ব না থাকলেও ঐ পরিবারের মান একটুও কমেনি। ওদের রুচি তো জানি না।’ বলল চীফ জাস্টিস।
‘তুমি কিছু ভেবনা আব্বা। আম্মাও তো ফরাসী মেয়ে। সব তিনি দেখেছেন। আর সেদিন আমি আংকেলকে দেখেছি, মারিয়াদের সাথে কথা বলেছি। খুব খোলা-মেলা ওঁরা। রাজকীয় মেজাজ বা গাম্ভীর্যের চিহ্ন ওদের মধ্যে নেই। আমার খুব ভালো লেগেছে। বলত আব্বা, মিস মারিয়া তোমার ভাষায় রাজকুমারী হয়েও যেভাবে শ্রমিকের মত আমার গাড়ি ঠিক করে দিয়েছে, ক্যামেরুনের গাড়ির মালিক কোন মেয়ে কি এটা করতো?’
‘বড়দের বড় হৃদয় হওয়া উচিত। ওঁদের ওটা আছে।’
কাঁটায় কাঁটায় সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় এল ডোনা, ডোনার আব্বা এবং এলিসা গ্রেস।
রোসেলিন, তার আম্মা এবং তার আব্বা চীফ জাস্টিস উসাম বাইক তাদেরকে স্বাগত জানালেন বাড়ির গেটে।
ডিনার হলো রাত আটটায়।

ডিনার শেষে চীফ জাস্টিস উসাম বাইক এবং ডোনার আব্বা মিশেল প্লাতিনি বসে আলাপ করছে ড্রইং রুমে।
তখন কথা বলছিল চীফ জাস্টিস উসাম বাইক, হ্যাঁ, আমার জন্ম ক্যামেরুনে বটে, কিন্তু আমি মানুষ হয়েছি ফ্রান্সে। আমি তখন ১০ বছরের বালক। ডঃ ডিফরজিস আমাকে ফ্রান্সে নিয়ে যান। তাঁর বাড়িতে রেখে তিনি আমাকে লেখাপড়া শেখান। আইন শাস্ত্রে ডক্টরেট করার পর ২৫ বছর বয়সে আমি ক্যামেরুনে চলে আসি। ফ্রান্সে তিনি আমাকে বিয়েও করান।‘
‘কোন ডঃ ডিফরজিস? সাবেক কুটনীতিক এবং প্যারিস আইন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা ডঃ ডিফরজিস? তিনি তো আমার বন্ধু।’
‘জি, হ্যাঁ, তিনিই।’
ডোনার আব্বা একটু দ্বিধা করল। কিন্তু শেষে বললই, ‘ডঃ ডিফরজিসের খবর কিছু জানেন?’
চমকে উঠল চীফ জাস্টিস উসাম বাইক। বলল, তাঁর সম্পর্কে কিছু জানেন আপনি?
‘জানি।’
‘তাকে কিডন্যাপ করে ক্যামেরুনে আনা হয়েছে, জানেন আপনি?’
‘জানি। ব্ল্যাকক্রস ও ওকুয়া তাঁকে কিডন্যাপ করেছে।’
‘আর কিছু জানেন?’
‘মনে হয় সবটাই জানি। তাঁকে পণবন্দী করে আনা হয়েছে। চীফ জাস্টিসের কাছ থেকে কিছু আদায় করার জন্যে।’
‘কি আদায় করতে চায়, সেটাও কি আপনি জানেন?’
‘জানি। ওমর বায়ার জমি আত্মসাতকে তারা বৈধ করে নিতে চায়।’
‘আপনি সবই জানেন। এসব কি ডঃ ডিফরজিস কিংবা র‍্যালফ–এর কাছে আপনি শুনেছেন?’
‘এখানে আসার আগে কুমেটে র‍্যালফ, ডেবরা এবং আমরা এক রেস্ট হাউসে এক সাথেই ছিলাম। কিন্তু ওমর বায়ার ঘটনা আমি আগে থেকেই জানি।’
‘আগে থেকে?’
‘আপনি হয়তো জানেন, ব্ল্যাক ক্রস র‌্যালফ এবং ডেবরাকেও কিডন্যাপ করেছিল। পরে তাকে উদ্ধার করা হয়েছে।’
চমকে সোজা হয়ে বসল চীফ জাস্টিস উসাম বাইক। বলল, ‘তারাও কিডন্যাপ হয়েছিল? কেন?’
‘তাদেরকে কিডন্যাপ করে ডঃ ডিফরজিসকে তারা বাধ্য করতে চেয়েছিল যাতে তিনি আপনাকে বলে তাদের কাজটা করিয়ে দেন। কিন্তু র‌্যালফরা মুক্ত হওয়ায় তাদের উদ্দেশ্য বানচাল হয়ে যায়। তখন তারা খোদ ডঃ ডিফরজিসকেই পণবন্দী করে ক্যামেরুনে নিয়ে এসেছে।’
বিস্ময় ও বেদনায় চীফ জাস্টিসের চেহারা ভারি হয়ে উঠেছে। কিছুক্ষণ কথা বলতে পারলো না। কথা বলল অনেকক্ষণ পর। বলল, ‘এত কিছু ঘটেছে, কিছুই জানতে পারিনি আমি। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ। তিনি আপনার সাথে দেখা করিয়ে দিয়েছেন।’
‘আমি আরও কিছু জানি মিঃ চীফ জাস্টিস।’
ডোনার আব্বার কথা শেষ হতেই চীফ জাস্টিস বলল, ‘দেখুন আপনি আমার সবচেয়ে সম্মানিত গুরুজনের বন্ধু। আপনিও আমার গুরুজন। মিষ্টার বলে সম্বোধন করলে আমি দুঃখ পাব। আর এখানে চীফ জাস্টিস হিসেবে কথা বলছি না।’
একটু থামল চীফ জাস্টিস। তারপর বলল, ‘এ সম্পর্কে যা জানেন দয়া করে বললে বাধিত হবো।’
ডোনার আব্বা র‌্যালফদের উদ্ধারের কথা, ডঃ ডিফরজিসের কিডন্যাপ এবং তাকে ও ওমর বায়াকে উদ্ধার প্রচেষ্টার সব কাহিনী বর্ণনার পর বলল, ‘যিনি র‌্যালফদের উদ্ধার করেছিলেন এবং ডঃ ডিফরজিসদের উদ্ধারের চেষ্টা করেছিলেন, তিনি এখন ক্যামেরুনে।’
‘ক্যামেরুনে? কে তিনি?’ চীফ জাস্টিসের চোখে একরাশ বিস্ময়।
‘তিনি একজন সমাজসেবী। যেখানে মানুষের বিপদ সেখানে তিনি।’
‘র‌্যালফ কি তাকে নিয়োগ করেছে?’
‘আসলে তিনি চেষ্টা করছেন ওমর বায়াকে উদ্ধার করতে। এখন তো ওমর বায়া এবং ডঃ ডিফরজিস এক হয়ে গেছেন।’
‘তাহলে লোকটি মুসলমান।’
‘হ্যা। কিন্তু আপনি বুঝলেন কি করে?’
‘কোন খৃষ্টান ব্ল্যাক ক্রস ও ওকুয়া’র বিরোধিতার মুখে ওমর বায়াকে সাহায্য করতে যাবে না বা যেতে পারবে না। দ্বিতীয়ত, আপনারা তাকে চেনেন। আপনারা ইসলাম গ্রহণ করেছেন এটা রোসেলিনের কাছে শুনেছি।’
‘আপনার অনুমান ঠিক।’
‘আপনার খবর আমার জন্যে পরম সুসংবাদ। কিন্তু তিনি একা কি করবেন বিরাট শক্তির বিরুদ্ধে!’
‘এটা বলা মুস্কিল। তবে তার অতীত হলো, ‘তিনি যেখানে যান একাই এক বিশ্ব হয়ে দাঁড়ান।’
‘তার সাফল্য কামনা করি। যে কাজ আমার করার ছিল, তা তিনি করছেন। জানেন, তিনি কোথায় কি করছেন?’
‘আপনার সবই জানা দরকার। আসলে আমরা এসেছি তাঁরই সন্ধানে। আমরা জানি না তিনি কোথায়।’
‘কিন্তু আপনাদের সাথে তাঁর সম্পর্ক কি? আপনারা তাঁর খোঁজে কেন আসলেন?’
ডোনার আব্বা উত্তর দিল না তৎক্ষণা। একটু ভাবল। তারপর মুখ তুলে তাকাল চীফ জাস্টিসের দিকে। বলল, ‘একটু স্বার্থের সম্পর্ক আছে। মারিয়া (ডোনা) আমার একমাত্র মেয়ে। তার স্বার্থেই এসেছি।’
চীফ জাস্টিসের মুখে এক টুকরো প্রসন্ন হাসি ফুটে উঠল। বলল, ‘মাফ করবেন। আপনাদের পারিবারিক ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করেছি। কিন্তু একটা কৌতুহল আমি চেপে রাখতে পারছি না।’
‘বলুন।’
‘ঐ মুসলিম ছেলেটি কে, যার সাথে ‘লুই’ রাজকুমারীর বিয়ে হচ্ছে এবং যার জন্যে ‘লুই’ পরিবারের একমাত্র উত্তরাধিকারীরা ইসলাম গ্রহণ করেছেন। আর ছেলেটি কে যে, বিনা স্বার্থে অন্যের জন্যে এ ভাবে জীবনের ঝুঁকি নেয়।’
ডোনার আব্বা চুপ করে থাকল। কোন উত্তর দিলনা তৎক্ষণাৎ। পরে ধীরে ধীরে বলল, ‘আমি বুঝতে পারছি না, তার পরিচয়ের প্রকাশ, তার, আপনার এবং আমাদের সকলের জন্যে কল্যাণকর হবে কিনা।’
‘আমি এখানে আপনাদের সাথে আলোচনা করছি আপনাদের একজন এবং ডঃ ডিফরজিসের একজন দত্তক সন্তান হিসেবে, চীফ জাস্টিস হিসেবে কিংবা সরকারী কোন লোক হিসেবে নয়।’
‘ধন্যবাদ। আপনি কি আহমদ মুসার নাম শুনেছেন?’
চীফ জাষ্টিস ভ্রু কুঁচকে কিছুক্ষণ চিন্তা করল। তারপর বলল, ‘একটা নাম শুনেছি। মানে তার সম্পর্কে অনেক পড়েছি। সে তো একজন ভয়ানক বিপ্লবী। ফিলিস্তিন থেকে শুরু করে অনেক দেশের অনেক পরিবর্তনের সাথে সে জড়িত। এর কথা বলছেন কেন?’
‘আপনি যে ছেলেটির পরিচয় জানতে চাচ্ছেন সেই ছেলেটিই আহমদ মুসা।’
ডোনার আব্বার শেষ দু’টি শব্দ বিদ্যুত শকের মত কাজ করল যেন চীফ জাস্টিসের উপর। তাঁর চেহারায় হতবাক ও হতবুদ্ধির ভাব ফুটে উঠল। অনেকক্ষণ সে বিহ্বল চোখে তাকিয়ে থাকল ডোনার আব্বার দিকে। অনেক সময় নিয়ে সে ধীরে ধীরে বলল, ‘আপনি কি সত্যি বলছেন? তাঁর মত বিপ্লবী কেন কোন কাজে এ ঘটনায় জড়াবে? লুই পরিবারই বা তাঁর সাথে জড়িয়ে পড়বার হেতু কি?’
‘সে এক দূর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে। যখন আহমদ মুসা স্পেনে কাজ করছিল, তখন সে আমার মেয়েকে অবধারিত কিডন্যাপ হওয়ার হাত থেকে বাঁচায়। সেই থেকেই তার সাথে আমাদের পরিচয় ঐ সময়ই সে ওমর বায়ার সাথে পরিচিত হয় তাকে গুন্ডাদের হাত থেকে রক্ষা করতে গিয়ে।’
তারপর ডোনার আব্বা ওমর বায়ার সাথে আহমদ মুসার পরবর্তী সম্পর্কের বিষয় তুলে ধরে বলল, ‘আসলে আহমদ মুসার ব্যক্তি, দেশ ও জাতি প্রেম সবই অমূল্য।’
‘ঈশ্বর আপনাদের মঙ্গল করুন। আপনার শেষ সুখবরটি শুনে আমি মনে বল পাচ্ছি, একটা বড় সংকট থেকে হয়তো আমি বাঁচবো এবং ডঃ ডিফরজিসেরও জীবন বাঁচবে। কিন্তু উদ্বেগ বোধ হচ্ছে, সে তো একা। অন্যদিকে ‘ব্ল্যাক ক্রস’, ‘ওকুয়া’ এবং ‘কোক’-এর মিলিত শক্তি তার বিরুদ্ধে।’
‘সে কোথায় জানি না। কি করছে জানি না। প্রার্থনা ছাড়া আমাদের আর কি করার আছে!’
‘তার যদি সন্ধান পাওয়া যেত।’
ডোনার আব্বা ও চীফ জাস্টিস উসাম বাইক যখন এই আলোচনা করছিল, তখন বাড়ির বাগান ঘেরা একটা ছোট্ট লনে ডোনা, রোসেলিন এবং এলিসা গ্রেসদের মধ্যে গল্প চলছিল।
ডোনা বলছিল, ‘রোসেলিন আপনার সাথে দেখা হয়ে কি যে ভালো লাগছে! কখনও কোন প্রয়োজন বোধ করলে আপনাকে টেলিফোন করা যাবে, ক্যামেরুন সম্পর্কে কিছু জানতে চাইলে আপনাকে টেলিফোন করা যাবে’।
‘আর আমাদের পরিবারের সাথে আপনাদের পরিচয় আমার জন্যে ঈশ্বরের আশীর্বাদের মত হয়েছে’।
‘কেমন করে?’ বলল ডোনা।
‘লুই’ পরিবারের উত্তরাধিকারীরা মুসলমান হয়েছে এটা আব্বার জানা এবং আপনাদের দেখা আব্বার প্রয়োজন ছিল।’
‘কেন? কেন?’ বিস্ময় ভরা কন্ঠে বলল ডোনা।
‘এ ‘কেন’-এর উত্তর অনেক বড়। আজ থাক।’ বলল রোসেলিন সলজ্জ হেসে।
‘কিন্তু আপনার জন্যে এটা আশীর্বাদ হলো কি করে, এর উত্তর আপনি এক বাক্যেও দিতে পারেন।’ বলল ডোনা।
কথা বলল না রোসেলিন। মুখ সে নিচু করল। তার ঠৌঁটে এক টুকরো সলজ্জ হাসি।
ডোনা এই হাসি দেখে লায়লা ইয়েসুগোর কথা বলতে গিয়ে সেদিন রোসেলিনের মুখে যে হাসি দেখেছিল তার কথা মনে পড়ল। অনুরাগরঞ্জিত সলজ্জ এই হাসি ডোনার অপরিচিত নয়।
‘আজ থাক, আরেকদিন বলব।’ নীরবতা ভেঙে বলল রোসেলিন।
‘দেখুন মিস রোসেলিন, আমি কুটনীতিকের মেয়ে। কথার কুটনীতি দিয়ে ঠিক বের করে ফেলব কথা।’ হেসে বলল ডোনা।
‘ঠিক আছে বের করুন। শুধু তো কুটনীতিক নয়, আপনি রাজারও মেয়ে।’ হাসতে হাসতে বলল রোসেলিন।
ডোনা একটু ভাবল। তারপর বলল, ‘নিশ্চয় আপনার আব্বা কোন মুসলিমের সাথে আপনার সম্পর্ককে ভালো চোখে দেখেন না বা দেখবেন না, এমন আশংকা আছে।’
রোসেলিনের মুখ ভরা হাসিতে একটু ভাটা পড়ল তার চোখের দৃষ্টিতে কিছুটা বিস্ময় ফুটে উঠল। ঠৌঁটে সেই সলজ্জ হাসি ছড়িয়ে বলল, ‘এটুকু ঠিক আছে।’
‘নিশ্চয় সেই সম্পর্কের সাথে আপনার এবং আপনার আব্বার একটা স্বার্থের প্রশ্ন জড়িত আছে।’ রোসেলিনের চোখে চোখ রেখে ব্যারিস্টারের মত প্রশ্ন করল ডোনা।
‘এমন প্রশ্ন করছেন কোন যুক্তিতে?’ মুখে কৃত্রিম গাম্ভীর্য টেনে প্রশ্ন করল রোসেলিন।
‘না, আগে প্রশ্নের ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ উত্তর দিন। আপনার প্রশ্নের জবাব পরে দিচ্ছি।’ ঝানু উকিলের মত ডোনা চাপ দিল রোসেলিনকে।
রোসেলিন হেসে উঠল। বলল, ‘উত্তর ‘হ্যাঁ’।’
‘এখন আপনার প্রশ্নের জবাব দিচ্ছি। স্বার্থের সম্পর্ক না থাকলে আপনার আব্বা এমন আচরণ কেন করবেন যাতে আপনার আহত হওয়ার সম্ভাবনা আছে? দ্বিতীয়ত বড় কোন স্বার্থের সম্পর্ক না থাকলে আপনার আব্বার মনোভাব পরিবর্তনের সম্ভবনাকে অবশ্যই আপনি আশীর্বাদ বলতেন না।’
রোসেলিন হেসে উঠল। বলল, ‘খুব সুন্দর যুক্তি। আপনার ব্যবসায় বা যুডিসিয়াল প্রফেশনে আসা উচিত। আমি আংকলকে বলব।’
‘ধন্যবাদ। আমার তৃতীয় প্রশ্ন হলোঃ ঐ স্বার্থের সম্পর্ক যার সাথে তিনি অবশ্যই লায়লা ইয়েসুগো কিংবা কোন মেয়ে নন’।
ডোনার এই প্রশ্নের সাথে সাথে রোসেলিনের মুখের হাসি বিব্রতকর লজ্জায় রুপান্তরিত হল। বলল, ‘এই প্রশ্ন কেন আসে?’
‘এ প্রশ্নেরও জবাব পাবেন। কিন্তু আগে উত্তর দিন ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’।’
রোসেলিন নিচু হয়ে পড়া তার চোখ তুলে তাকাল ডোনার দিকে। তারপর একটু সলজ্জ হেসে বলল, ‘হ্যাঁ।’
মুখ টিপে হাসল ডোনা। বলল, ‘এবার আপনার প্রশ্নের উত্তর: কোন মেয়ের সাথে কোন মেয়ের স্বার্থের সম্পর্ক এমন হয় না যার বিরোধিতায় নামতে হবে আংকলকে এবং যে সম্পর্কের রক্ষাকে আপনি আর্শীবাদ মনে করবেন।’
উজ্জ্বল হাসিতে ভরে উঠল রোসেলিনের মুখ। বলল, ‘আপনি চমৎকার। এরপরের প্রশ্নে আপনি কি বলেন, দেখি।’
ডোনা হাসল, বলল, ‘এটাই শেষ প্রশ্ন। বলুন প্রশ্নটা করবো তো?’
‘অবশ্যই।’ রোসেলিনের মুখের হাসিতে এবার লজ্জা মেশানো।
‘ঠিক আছে, আমার দিকে তাকান।’ ডোনা বলল রোসেলিনকে। রোসেলিন তাকাল ডোনার দিকে।
ডোনা তার চোখে চোখ রেখে মুখ টিপে হেসে বলল, ‘মুসলিম ছেলেটি কে?’
রোসেলিন দু’হাতে মুখ ঢেকে উঠে দাঁড়াল। বলল, ‘চলুন যাই, আংকলরা একা আছেন।’
ডোনা উঠে দাঁড়াল। রোসেলিনকে কাছে টেনে নিল হাত ধরে। বলল,‘প্রতিশ্রুতিবদ্ধ আপনি উত্তর দেবার জন্যে।’
‘আপনি শুনতে খারাপ লাগছে। আমরা তো বন্ধু।’ বলল রোসেলিন ডোনার একটা হাত আঁকড়ে ধরে।
ডোনা রোসেলিনের কাঁধে হাত রেখে বলল, ‘ঠিক আছে বন্ধু। উত্তর দাও এবার প্রশ্নের।’
রোসেলিন ডোনাকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘প্লিজ আজ থাক। চল ওদিকে যাই।’
‘বেশ চল।’ বলে তিনজনই হাঁটতে লাগল ড্রইং রুমের দিকে। হাঁটতে হাঁটতে এলিসা গ্রেস বলল, ‘মারিয়া আপার প্রশ্ন শেষ। আমি একটা প্রশ্ন করি?’
হাসল রোসেলিন। বলল, ‘ভয় করছি এখন প্রশ্নকে।’
‘খুব সহজ প্রশ্ন। মুসলিম ছেলেটা লায়লা ইয়েসুগোর কেউ?’
দৌড়ে পালাতে যাচ্ছিল রোসেলিন। ধরে ফেলল ডোনা। বলল, ‘ধরা পড়ে গেছ, আর পালিয়ে লাভ কি?’
দাঁড়িয়ে পড়ল রোসেলিন। লজ্জায় রাঙা গোটা মুখ। বলল, ‘কি বলব, বোধহয় একটা অসম্ভব সুখ স্বপ্ন দেখছি আমি।’ কথাগুলো শেষের দিকে ভারি হয়ে উঠল তার।
ডোনা রোসেলিনের পিঠে হাত দিয়ে কাছে টেনে নিয়ে বলল, ‘স্বপ্ন সফল হওয়ার আগে এমনটাই মনে হয়। নাম কি ছেলেটার? জানতে পারি না আমরা?’
রোসেলিন মুখ নিচু করল। ঠোঁটে লাজ-রাঙা হাসি ফুটে উঠল। বলল, ‘আবদুল্লাহ রাশিদি ইয়েসুগো, লায়লার ভাই।’
বলেই রোসেলিন দৌড় দিল ড্রইংরুমের দিকে।
পেছনে পেছনে ছুটল ডোনা এবং এলিসা গ্রেস।

ইয়েসুগো প্যালেস।
ইয়াউন্ডির অন্যতম প্রধান সড়ক ‘নর্থ এ্যাভেনিউ’-এর পশ্চিম পাশে পূর্বমূখী হয়ে দাঁড়ানো বিশাল বাড়ি। বাড়ির সামনে একটা বিশাল গেট। ইয়েসুগো রাজ পরিবার এই বাড়িটি তৈরী করে ক্যামেরুনে ফরাসি শাসনের মাঝামাঝি সময়ে, যখন ফরাসী শাসকদের ষড়যন্ত্রে ইয়েসুগো সালতানাতের উপর একের পর এক বিপদ নেমে আসতে থাকে। বাড়িটি তৈরী করা হয় রাজ-পরিবারের একটা বিকল্প বাসস্থান হিসেবে। লেখাপড়া উপলক্ষ্যে আবদুল্লাহ রাশিদি ইয়েসুগো এবং তার বোন লায়লা ইয়েসুগোর বসবাস এই বাড়িতে এখন প্রায় স্থায়ী হয়ে গেছে। ইয়েসুগো প্যালেসে ইয়েসুগো পরিবারের পারিবারিক একটা ড্রইংরুম। ঘরটা খুব বড় নয়, কিন্তু খুব ছোটও নয়। ঘরের গোটা মেঝে লাল কার্পেটে মোড়া। সোফা সেট দিয়ে সাজানো ড্রইংরুম। ড্রইংরুমের এক পাশে একটা বড় টিভি সেট। তার পাশে একটা রেডিও। সে পাশেরই এক কোনায় রয়েছে ছোট্ট একটা ফ্রিজ এবং অন্য কোণায় রয়েছে ছোট্ট একটা বুক সেলফ। বুক সেলফে আছে দেশি-বিদেশী ম্যাগাজিন।
টিভি’র ঠিক বিপরীত দিকে তিন সোফায় পাশাপাশি তিনজন বসে।
মাঝখানে আহমদ মুসা।
তার বাম পাশে মুহাম্মদ ইয়েকিনি। এবং ডান পাশে আরেকজন নব্য যুবক। চুল কোঁকড়া কিন্তু রং প্রায় ফর্সা। ঠোঁট পাতলা। তার চেহারায় আরবীয় একটা ভাব আছে।
এই যুবকই আবদুল্লাহ রাশিদি ইয়েসুগো।
সে ইয়েসুগো রাজপরিবারের ৭ম পুরুষ। ৫ম পুরুষ পর্যন্ত তাদের রাজত্ব টিকে ছিল। রাশিদির আব্বা আমীর আবদুল্লাহ ইয়েসুগো যখন যুবরাজ, তখন তাদের হাত থেকে ক্ষমতা চলে যায়্
রাশিদি ইয়েসুগোর মা মিসরীয় এবং দাদিও মিশরীয় ছিলেন।
গতকাল আহমদ মুসা এসেছে।
তারপর থেকে শুধু গল্পই শুনছে রাশিদি ইযেসুগো আহমদ মুসার কাছ থেকে। অসীম তার উৎসাহ।
আজ ক্যামেরুনের সাধারণ ছুটির দিন। অফিস-আদালত-শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সব বন্ধ। আজ সকাল থেকেই রাশিদি ইয়েসুগো আহমদ মুসাকে নিয়ে বসেছে।
মাঝখানে তারা যোহরের নামায সেরেছে এবং লাঞ্চ করেছে। তারপর আবার এসে বসেছে সোফায়।
রাশিদি বলছিল, ‘বড় ভুল করেছি। কাল থেকে যদি রেকর্ডার কাছে রাখতাম, তাহলে একা ইতিহাস রেকর্ড হয়ে যেত।’
‘ঠিক বলেছেন, আহমদ মুসা ভাইয়ের ভয়েসও রেকর্ড হয়ে যেত।’
বলল ইয়েকিনি।
‘সত্যি বিরাট একটা লস হলো’ বলল ইয়েসুগো।
‘অতীতের কথা নয়, এস ভবিষ্যতের কথা ভাবি।’ বলল আহমদ মুসা।
‘আমার কাছে ভবিষ্যতের চেয়ে অতীতই বেশী প্রয়োজনীয়।’ বলল রাশিদি ইয়েসুগো।
‘কেন?’ বলল আহমদ মুসা।
‘ইতিহাস না জনালে ইতিহাস গড়াও যায়না। অতীত না জানলে ভবিষ্যত বুঝাও যায় না। আমরা অতীত জানি না, তাই আমাদের ভবিষ্যত সম্পর্কে আমরা অসচেতন।’ বলল রাশিদি ইয়েসুগো।
‘তোমার কথা ঠিক। কিন্তু ইতিহাসের এই অতীত এবং একজনের কাহিনী এক জিনিস নয়।’ বলল আহমদ মুসা।
‘বিষয়টাকে এইভাবে দেখা আমি মনে করি ঠিক নয়। মুসলমানদের বিপ্লব ও পরিবর্তনের এই ঘটনাগুলোকে এক ব্যক্তি মূখ্য ছিলেন বটে, কিন্তু কাজটা ছিল মুসলিম জনগণের জন্যে আত্ববিশ্বাস ও প্রেরণার উৎস। আজ বেশীর ভাগ মুসলিম সমাজে অবস্থার স্রোতে গা ভাসিয়ে চলার দৃশ্য দেখা যায়। এর কারণ, অনেকের ধারণা অবস্থার পরিবর্তন সম্ভব নয়, চেষ্টা করে লাভ নেই। বিপ্লব ও পরিবর্তনের কাহিনী এদের জন্যে বিরাট শিক্ষকের কাজ করবে এবং নতুন প্রাণের সঞ্চার করবে এদের দেহে। সুতরাং আমার মতে এই কাহিনীগুলোর সংগ্রহ ও প্রচার খুবই জরুরী।’
‘ঠিক আছে, জাগরণ সৃষ্টির এটাও একটা পথ। কিন্তু এই মুহূর্তে আমরা জাগরণ নয় এ্যাকশন প্রোগ্রামে আছি।’
‘ঠিক। কিন্তু কি করণীয় তা মাথায় আসছে না।’ বলল রাশিদি ইয়েসুগো।
‘ব্ল্যাক ক্রস কিংবা ওকুয়ার সাক্ষাত না পেলে তো আমরা কাজ শুরুই করতে পারছি না।’ বলল ইয়েকিনি।
‘পথ বেরিয়ে যাবে। আজ একটু বেরুব। অন্ততঃ চীফ জাস্টিসের বাড়ি এবং সুপ্রীম কোর্ট দেখে আসব।’
বলে আহমদ মুসা ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘রাশিদি ইয়েসুগো ফ্রি ওয়ার্ল্ড টিভি’র সময় হয়ে এল। আর দশ মিনিট। টিভি’টা খুলে দাও।’
‘কিন্তু বললেন না ভাইয়া, FW টিভির আজকের অনুষ্ঠানের জন্যে এত উদগ্রীব কেন আপনি?’
আহমদ মুসা হাসল। বলল, ‘না শুনলেই আনন্দ পাবে বেশী। তোমার আনন্দ কমাতে চাই না।’
একটু থেমেই আবার বলল, ‘আজ তোমাদের পত্রিকাও দেরীতে বেরুচ্ছে।’
‘গুরুত্বপূর্ণ কিছু ন্যাশনাল ডে’তে সকালের জাতীয় অনুষ্ঠানের খবর নিয়ে পত্রিকা বের হয় তো তাই এ রকম দিনে বিকেল তিনটায় বেরোয়। পরের দিন পত্রিকা বের হয় না বলেই এই ব্যবস্থা।’ বলল ইয়েসুগো।
‘বাইরের দৈনিক পত্রিকা ইয়াউন্ডিতে কি আসে?’
‘নিয়মিত পাওয়া যায় ফ্রান্সের ‘লা মন্ডে’ এবং মিসরের আল-আহরাম।’ বলল ইয়েসুগো।
আহমদ মুসা সোজা হয়ে বসল। বলল, ‘তুমি কাউকে পাঠিয়ে ঐ দু’টিসহ আজকের এখানকার পত্রিকাগুলো আনাও। ৩টা তো বেজে যাচ্ছে।’
‘পাঠাচ্ছি, বিশেষ কিছু কি থাকবে পত্রিকায়?’ বলল ইয়েসুগো।
‘আশা করি বিশেষ কিছু থাকতে পারে।’
‘কি?’
‘যদি থাকে। খুশী হবে। অপেক্ষা কর।’
রাশিদি ইয়েসুগো উঠে গিয়ে টিভি অন করে এসে আবার সোফায় বসল।
টেলিফোন বেজে উঠল এ সময়।
ইয়েসুগো উঠে গিয়ে টেলিফোন ধরল।
‘হ্যাঁ, লায়লা?’
‘হ্যাঁ, ভাইয়া।‘
‘এসে গেছ? কোথায় তুমি?’
‘এই তো শহরে ঢুকলাম। গাড়ি থেকে টেলিফোন করছি। জরুরী কিছু? খবর দিয়েছ কেন?’
‘বড় ঘটনা ঘটেছে।’
‘কি?’
‘বলব না, আসলে চোখে দেখবে।’
‘আমার টেনশন হচ্ছে। বল, খারাপ কিছু না আনন্দের।’
‘আনন্দের, তবে তার সাথে উদ্ধেগের খবরও আছে।’
‘তুমি না বললেই ভাল করতে। এখন খারাপ লাগছে।’
‘আম্মা আসছেন তো?’
‘আসছেন কিন্তু একটু পরে পৌছবেন।’
‘ও. কে। ফি আমানিল্লাহ। আসসালামু আলাইকুম।’
‘ওয়া আলাইকুমসসালাম।’
ইয়েসুগো টেলিফোন রেখে তার জায়গায় ফিরে এল।
‘আহমদ মুসা ভাইয়ের কথা লায়লাকে বলেছ?’ বলল ইয়েকিনি।
‘না বলিনি।’
‘এখন বললে না?’
‘ওকে একটা সারপ্রাইজ দেয়া যাবে।’
ফ্রি ওয়ার্ল্ড টিভি’র প্রোগ্রাম শুরু হয়ে গেল। এই টিভির প্রোগ্রামে প্রথমে ৫ মিনিট আগের দিনের বিশ্ব সংবাদের প্রধান বিষয় গুলোর ফলোআপ হয় তারপর দিনের প্রো প্রোগ্রামের বিবরন দেয়া হয়।
খবর প্রায় শেষ সেই সময় একজন তরুণী প্রবেশ করল ড্রইং রুমে। ফুলহাতা পা পর্যন্ত নামানো আরবীয় স্টাইলের গাউন পরা। মাথায় একটা সাদা রুমাল বাঁধা। তার উপর দিয়ে পরেছে চাদর। তরুণীটির রংও ফর্সা। তরুণী ড্রইং রুমে প্রবেশ করে সালাম দিয়েই আহমদ মুসার উপর নজর পড়ল। অপরিচিত লোককে দেখে সংকুচিত হয়ে উঠল এবং মাথার ওড়নাটাকে কপালের উপর আরও টেনে দিল।
রশিদি ইয়েসুগো উঠে দাঁড়িয়েছিল। মেয়েটি আরও এগিয়ে এলে আহমদ মুসার দিকে তাকিয়ে মেয়েটিকে দেখিয়ে বলল, ‘এই আমার সেই বোন।’ আর লায়লাকে আহমদ মুসাকে দেখিয়ে বলল, ‘ইনি আমাদের সম্মানিত মেহেমান।’
‘নাম তো লায়লা ইয়েসুগো না? লায়লার আগে-পিছে তো আর কোন শব্দ নেই।’ বলল আহমদ মুসা।
কথা শেষ করেই রশিদি ইয়েসুগো বসে পড়েছিল। লায়লাকে ইংগিত করেছিল বসতে। লায়লা গিয়ে ওদের তিনজনের বিপরীত দিকে একটা সোফায় ভিন্ন হয়ে বসল।
‘বল লায়লা। তোমার পুরো নামটা।’ বলল রশিদি ইয়েসুগো।
রশিদির কথায় লায়লা মনে মনে বিরক্ত হলো। কপালটা কুঞ্চিত হলো অসন্তুষ্টির প্রকাশ হিসাবে। না চেনা, না জানা একজন লোকের তার নাম সংক্রান্ত প্রশ্নের তাকে জবাব দিতে হবে কেন? ভাইয়া নিজে না বলে তাকে জবাব দিতে বলল কেন? ভাইয়ার এই আচরন তার কাছে নতুন মনে হচ্ছে। অপরিচিত জনের সামনে এভাবে বসা তাদের ঐতিহ্যেই নেই। তার উপর তাকে অপরিচিত জনের প্রশ্নের জবাব দিতে হবে এবং সেটা তার ব্যক্তিগত বিষয়ে।
লায়লা বিস্মিত দৃষ্টিতে একবার ভাইয়ার দিকে তাকাল। তারপর চকিতে একবার আহমদ মুসার দিকে চোখ তুলল। দেখল আহমদ মুসার মুখ নিচু। একবারই তার দিকে তাকিয়েছিল। আর সে তাকায়নি। লায়লা মনে হল মেহমানটি ভদ্র এবং ভালো। ক্যামেরুনের মুসলিম সমাজে চোখের পর্দা খুব কমই দেখা যায়। আসল পর্দা তো চোখের পর্দাই।
‘‘লায়লা’র পর একটি শব্দ আছে। আমার নাম ‘লায়লা নুর ইয়েসুগো’।’
‘ধন্যবাদ বোন’, মাথা না তুলেই বলা শুরু করল, ‘খুব ভাল নাম। লায়লা নুর অর্থ নুরের বা আলোর মত রাত। এই অর্থের দিক দিয়ে বিজয়ের রাত বা সফল্যের রাতও বলা যায়।’
‘আমিন। সামনের দিন গুলো আমাদের সাফল্যের হোক।’ বলল রশিদি ইয়েসুগো।
বিব্রত লায়লা কিছু বলতে যাচ্ছিল।
এই সময় ফ্রি ওয়ার্ল্ড টিভিতে দিনের পরবর্তী প্রোগামের বিবরণ দিতে শুরু করেছে।
সঙ্গে সঙ্গেই আহমদ মুসা সবাইকে থামিয়ে দেয়ার ভঙ্গিতে দু’হাত তুলে বলল, ‘এস আমরা টিভি প্রোগামের দিকে মনযোগী হই।’
আহমদ মুসার আকস্মিক এবং নির্দেশমূলক আচরন লায়লার কাছে অসৌজন্যমুলক বলে মনে হলো। কিন্তু সবাইকে টিভির প্রতি মনোযোগী হতে বলে সেও টিভির দিকে তাকাল। লায়লার মনে প্রশ্ন জাগল। টিভিতে এমন কি প্রোগ্রাম আছে যে ওরা সবাই এভাবে টিভিমুখী হলো।
অনুষ্ঠানসুচির শুরুতেই ঘোষক বলল, ‘আজকের অনুষ্ঠানে নিউজ ফিচার পর্যায়ের শুরুতেই রয়েছে ক্যামেরুনের জাতিগত অবস্থার উপর একটা আনুসিন্ধান রিপোর্ট। এতে আপনারা শুনবেন দক্ষিণ ক্যামেরুনের মুসলিম জাতি গোষ্ঠী কি ধরণের নির্মূল অভিযানের শিকার হয়েছে।’
ঘোষনা শুনে রশিদি ইয়েসুগো সোজা হয়ে বসল। তার চোখে মুখে বিস্ময়ের একটা ঢেউ আছড়ে পড়ল। সে তাকাল আহমদ মুসার দিকে। বলল, ‘একি শুনছি মুসা ভাই। সত্যি শুনছি তো? আপনি কি এ প্রোগ্রামের কথাই বলেছিলেন?’
লায়লার চোখে-মুখেও প্রশ্ন।
‘হ্যাঁ, রশিদি। আমি এ প্রোগ্রামের কথাই বলছিলাম। এস দেখি, সব কথা ঠিক ভাবে এসেছে কিনা?’ বলল আহমদ মুসা।
আহমদ মুসার কথার ধরনে বিস্মিত হলো লায়লা। কথায় মনে হচ্ছে টিভি অনুষ্ঠানটির সব আয়োজনই যেন মেহেমান লোকটি করেছে। কে লোকটি!
টিভি’র অনুষ্ঠানসুচি শেষ হলো। শুরু হলো ক্যামরুনের নিউজ ফিচারটি।
আহমদ মুসাদের আটটি চোখ টিভি পর্দার উপর স্থিরভাবে নিবন্ধ।
ফ্রি ওয়ার্ল্ড টিভি (FWTV) তার দীর্ঘ দশ মিনিটের নিউজ ফিচারে যে রিপোর্ট পেশ করল তা সংক্ষেপে এইঃ
“আফ্রিকার কথিত অন্ধকারের আড়ালে জাতি নির্মূলের নীরব অভিযান চলছে। এই অভিযানের প্রধান চাপ আফ্রিকার পশ্চিম উপকূলের মধ্যাঞ্চলে কেন্দ্রীভুত হয়েছে। দক্ষিণ ক্যামেরুন ইতিমধ্যেই এই নির্মূল অভিযানের পূর্ণ গ্রাসের মধ্যে এসে পড়েছে। পেছন থেকে এই অভিযানে নেতৃত্ব দিচ্ছে কিংডোম অব ক্রাইস্ট বা ‘কোক’। আর ‘কোক’-এর পেছনে রয়েছে জঙ্গি খৃষ্টান সংগঠন ‘ওকুয়া’।
কোক তার পুরনো কৌশল নিয়ে সামনে এগুচ্ছে। ওয়াকিফহাল মহলের বরাত দিয়ে আমাদের প্রতিনিধি জানাচ্ছেন, দক্ষিণ ক্যামেরুনের সব জমি স্বেচ্ছা বিক্রয়, জবরদস্তি ক্রয় এবং ভুয়া দলিলের মাধ্যমে ‘কোক’ দখল করে নিয়েছে। দক্ষিণ ক্যামেরুনের ৪০লাখ একর মুসলিম মালিকানাধীন জমির মধ্যে মাত্র ২ লাখ একর জমি তারা মালিকের কাছ থেকে স্বেচ্ছা বিক্রয়ের মাধ্যমে কিনেছে। অবশিষ্ট জমির ষাট ভাগ তারা কিনেছে জবরদস্তি ক্রয়ের মাধ্যেমে। বাকি ৪০ ভাগ জমি তারা মালিকেদের উচ্ছেদ করে তাড়িয়ে দিয়ে ভুয়া দলিলের মাধ্যমে আত্মসাৎ করেছে। গত পাঁচ বছরে ‘কোক’ দক্ষিণ ক্যামেরুন থেকে ১০ লাখ মুসলমানকে সম্পত্তি ও ঘর বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করেছে। খৃস্টান সংগঠন ‘কোক’ দৃশ্যের আড়ালে থেকে বিভিন্ন ব্যক্তি এবং নানা নামের এনজিও-এর মাধ্যমে দক্ষিণ ক্যামেরুনে এই ভুমি দখলের কাজ সম্পন্ন করেছে। ‘কোক’ এর এই ভুমি দখল এবং মুসলিম নির্মল অভিযানে শত শত মুসলিম জীবন দিয়েছে, শত শত পরিবার ধ্বংস হয়ে গেছে। কারন এরা আপোসে জমি তাদের হাতে তুলে দিয়ে নীরবে এলাকা ত্যাগ করতে রাজী হয়নি। ভুমি দখলে তারা কত বেপরোয়া তার দৃষ্টান্ত হিসাবে আমাদের প্রতিনিধি দক্ষিণ ক্যামেরুনের একটি মুসলিম পরিবারের মর্মান্তিক কাহিনী তুলে ধরেছেন।
সমগ্র দক্ষিণ ক্যামেরুনে একটি মাত্র মুসলিম পরিবার অবশিষ্ট ছিল। ওমর বায়ার পরিবার। ক্যম্পু উপত্যাকায় তাদের বাড়ি। উপত্যকায় একটি সম্মানিত পরিবার ছিল এটা। দশ হাজার একরের একটা প্লটের মালিক ছিল এই পরিবার। শুর থেকেই ‘কোক’ এর নজর পড়ে এই জমি খণ্ডের উপর। কিন্তু যখন ওরা বুজল ওমার বায়ার আব্বার কাছ থেকে এ জমি তারা হস্তগত করতে পারবেনা, পরিবারটিকে দুর্বল ও ভিত করার পথ হিসাবে কোক হত্যা করল ওমার বায়ার আব্বাকে।
পিতা নিহত হবার পর ওমার বায়ার উপর অব্যাহতভাবে চাপ দিতে থাকল তারা। আশে পাশের মুসলমানরা উচ্ছেদ হয়ে যাবার পর ওমর বায়ার পরিবার একা পড়ে গেল। বিপন্ন হয়ে উঠল তাদের জীবন। ওমর বায়া তার মা’কে নিয়ে জীবন বাঁচাবার জন্যে উত্তর ক্যামেরুনের কুম্বায় পালিয়ে গেল পালিয়ে গিয়েও তারা বাঁচতে পারল না। ‘কোক’ ও ‘ওকুয়া’র লোকেরা ওমর বায়াকে হত্যা প্রচেষ্টা চালায়। ওমর বায়া পালাতে সমর্থ হলেও নিহত হয় তার মা। কিন্তু এরপরও তার সম্পত্তি ওমর বায়া খৃস্টানদের হাতে ছেড়ে দিতে রাজী হয় না। ক্যামেরুনে থেকে তার জীবন বাঁচানো অসম্ভব হয়ে উঠল। অবশেষে ক্যামেরুনের একটা উচ্চ আদালতে তার সম্পত্তির ব্যাপারে একটা উইল রেজিস্ট্রি করে তার অনুপস্থিতিতে তার সম্পত্তি হস্তান্তর ও দখলের সকল পথ বন্ধ করে সে ফ্রান্সে পালিয়ে গেল।
কিন্তু রক্ষা পায়নি সে। জানা গেছে কয়েকদিন আগে ওমর বায়াকে কিডন্যাপ করে ক্যামেরুনে আনা হয়েছে। এখন তারা ওমর বায়াকে হাতে রেখে সংশ্লিষ্ট আদালতের বিচারকের উপর চাপ প্রয়োগ করে ওমর বায়ার জমিটা হস্তগত করতে চায়। সংশ্লিষ্ট বিচারককে বাধ্য করার জন্যে তার এক অতি আপনজনকে কিডন্যাপ করেছে তারা।
আমরা যখন এই রিপোর্ট সম্পুর্ন করছি, তখন ইয়াউন্ডির কুন্তে কুম্বা এলাকার ভীতিকর একটা রিপোর্ট আমরা পেলাম। কুন্তে কুম্বা এলাকায় কোক জবরদস্তি জমি কেনা শুরু করেছে। ‘কোক’কে তার দাবীকৃত একটি ভূমিখন্ড দিতে রাজী না হওয়ায় কোক কুন্তে কুম্বার দু’জন লোককে হত্যা এবং সেখানকার মসজিদের সম্মানিত ইমামকে কিডন্যাপ করে। এছাড়াও কোক কয়েকবার ঐ এলাকায় হামলা চালায়। ৪ দিন আগে অনুরুপ একটি হামলা সংঘটিত হয়। দু’টি মাইক্রোবাসে বোঝাই পনের বিশ জনের একটি সশস্ত্র দল খুব ভোরে এই হামলা চালায়। স্থানীয় মুসলমানদের পক্ষ থেকে সব সময় এসব বিষয় পুলিশকে যথারীতি অবহিত করা হয়। কিন্তু অজ্ঞাত কারনে পুলিশ ‘কোক’-এর বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ গ্রহন করে না। দক্ষিন ক্যামেরুনের ক্ষেত্রেও এটাই দেখা গেছে।
ক্যামেরুনের সরকার এবং বিশ্বের মানবতাবাদী সংস্থাসমুহের দৃষ্টি এদিকে আকৃষ্ট হওয়া আবশ্যক। ‘কোক’-এর জাতি নির্মূল অভিযান অবিলম্বে বাদ এবং তাদের অতীত কৃতকর্মের প্রতিকার হওয়া উচিত।”
দশ মিনিটের প্রোগ্রামটি শেষ হলো ফ্রি ওয়াল্ড টিভি”র। আহমদ মুসা উঠে গিয়ে টিভি অফ করে দিয়ে এল।
টিভি প্রোগ্রাম শেষ হলেও রশিদি ইয়েসুগো এবং লায়লা টিভি স্ক্রিন থেকে তাদের চোখ সরায়নি। বিস্ময়ে যেন তারা পাথর হয়ে গেছে। ফ্রি ওয়ার্ল্ড টিভি’তে ক্যামেরুনের মুসলমানদের এই বিবরন তাদের কাছে স্বপ্নের মত মনে হচ্ছে। কি করে সম্ভব হলো এটা। রাশিদি ভাবল, টিভি’তে এই প্রোগ্রাম আজ হবে আহমদ মুসা তা আগাম জানল কি করে!
এই সময় একটি অল্প বয়সের ছেলে কতগুলি খবরের কাগজ নিয়ে ড্রইংরুমে প্রবেশ করল।
রাশিদি ইয়েসুগো সেদিকে তাকিয়ে শান্ত স্বরে বলল, ‘যা বলেছিলাম, সব কাগজ পেয়েছ?’
‘পেয়েছি।’ বলল ছেলেটি।
ছেলেটি কাগজগুলো এনে রাশিদি ইয়েসুগোর কাছে খুব সম্মানের সাথে রেখে বেরিয়ে গেল।
লায়লা ছাড়া আহমদ মুসারা তিনজন সংগে সংগে টেবিল থেকে কাগজ তুলে নিল।
আহমদ মুসা তুলে নিয়েছিল ফ্রান্সের ‘লা-মন্ডে’। আহমদ মুসা প্রথম পাতার উপর একবার নজর বুলিয়েই বলল, ‘ইয়েসুগো লা-মন্ডে এই খবর প্রথম পাতায় ডাবল কলাম হেডিং-এ ছেপেছে।’
‘কোন খবর?’ পত্রিকা থেকে মুখ তুলে বলল ইয়েসুগো। সে আল আহরামের উপর নজর বুলচ্ছিল।
‘ক্যামেরুনের যে রিপোর্ট টিভিতে দেখলে সেই রিপোর্ট। ’
আহমদ মুসর কথা শেষ না হতেই ইয়েসুগো চিৎকার করে উঠল, ‘কি আশ্চর্য, টিভি’র এই খবর আল আহরাম প্রথম লিড আইটেম হিসাবে ছেপেছে।’
রাশিদি ইয়েসুগোর কথা শেষ না হতেই কথা বলে উঠল ইয়েকিনি। বলল, ‘দেখ দেখ, আমাদের ‘দি লিবার্টি’ও সিঙ্গল কলামে খবরটি ছেপেছে।’
দেখা গেল ক্যামেরুনের স্থানীয় অন্যান্য কাগজও সংক্ষেপে সিংগল কলামে হলেও খবরটি ছেপেছে। শুধু ‘কোক’-এর সিজার পত্রিকা ‘দিস ক্রস’ খবরটি ছাপেনি।
‘কিন্তু আমি বুঝতে পারছি না কিভাবে এটা সম্ভব হলো? টিভি এবং খবরের কাগজে এক সাথে খবরগুলো এলো?’ বিস্মিত কন্ঠে বলল রাশিদি ইয়েসুগো।
রাশিদি ইয়েসুগো, লায়লা, ইয়েকিনি সবার দুষ্টি আহমদ মুসার উপর নিবদ্ধ। লায়লা বুঝতে পারছেনা, তার ভাইয়া রাশিদি, ইয়াকিনি সবাই মেহমানকে এত গুরুত্ব দিচ্ছে কেন? মেহমানের সামনে তাদের আচরনকে অনেকটা জড়োসড়ো বলে মনে হচ্ছে। কে এই মেহমান?
‘আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করছি যে, কাজটা পরিকল্পনা মোতাবেক হয়ে গেছে।’ বলল আহমদ মুসা।
‘পরিকল্পনা? কার পরিকল্পনা?’ বলল রাশিদি ইয়েসুগো।
‘ওমর বায়ার খবরটা পাঠিয়েছে ফ্রান্স থেকে আমাদেরই এক সাংবাদিক বোন।’
‘সে জানল কি করে?’
‘আমি তাকে নিউজটা করতে বলেছিলাম আর কুন্তে কুম্বা’র রিপোর্ট লিখেছে ইয়েকিনির বোন ফাতেমা মুনেকা। তোমাদের সামনেই তো গতকাল আমি তা পাঠালাম।’ বলল আহমদ মুসা।
‘কিন্তু টিভি ও নিউজ মিডিয়া রিপোর্ট পেলেই কি এভাবে প্রচার করে? কিভাবে এটা হলো?’ বলল রাশিদি ইয়েসুগো।
‘FWTV এবং ওয়ার্ল্ড নিউজ এজেন্সী (WNA)-এর সাথে আমাদের সুসম্পর্ক আছে। এ ধরনের নিউজ প্রচার করা ওদের একটা দায়িত্ব।’
‘তার মানে সংস্থা দু’টি কি মুসলমানদের?’ বলল লায়লা। তার চোখে-মুখে বিস্ময়।
‘মুসলমানদের। কিন্তু বাইরে এ পরিচয় নেই। মুসলিম পুঁজি এ সংস্থা দু’টি গড়ে তুলেছে এবং পরিচালনা করছে। কিন্তু কাজ-কামে এর মুসলিম পরিচয়কে মূখ্য করা হয় না। এটা সম্পুর্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। মুসলিম স্বার্থের পক্ষে কাজ করে, কিন্তু সেটা বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার দৃষ্টিকোণ থেকেই করা হয়।’ বলল আহমদ মুসা।
‘বুঝা গেল, আপনার পরিকল্পনাতেই এটা হয়েছে। কিন্তু কি লক্ষ আমরা অর্জন করতে চাচ্ছি এর দ্বারা?’ বলল রাশিদি ইয়েসুগো।
‘প্রথমত, নীরব জাতি নির্মূলের এই ঘটনা বিশ্ববাসীকে জানানো। চক্ষু লজ্জার খাতিরে হলেও বিশ্বের মানবাধিকার সংস্থাগুলো এখানে কি ঘটেছে তা এখন জানতে চেষ্টা করবে। দ্বিতীয়ত, ক্যামেরুন সরকারকে সক্রিয় করা, যাতে তারা মুসলমানদের অভিযোগগুলোর দিকে নজর দেয়। বিশ্বব্যাপী এই প্রচারের ফলে ক্যামেরুন সরকার নিজেদেরকে কিছুটা অপরাধী ভাবতে বাধ্য হবে এবং কিছুটা হলেও নিরেপেক্ষ হবার চেষ্টা করবে। তৃতীয়ত, ওমর বায়ার সম্পত্তি হস্তান্তরে একটা বাধার সৃষ্টি হবে।’
‘ঠিক বলেছেন। ব্যাপারটাকে কোনদিন তো আমরা এই ভাবে চিন্তা করিনি। এভাবে এক ঢিলে যে বহু পাখি মারা যায়, তা আমাদের কখনও মাথায় আসেনি।’
‘দেখ, আনবিক বোমার চাইতে মিডিয়া অস্ত্র অনেক বেশী পাওয়ারফুল। একটা আনবিক বোমা একটা শহরে বা একটা এলাকায় আগুন লাগাতে পারে, কিন্তু একটা মিডিয়া আগুন লাগাতে পারে গোটা দুনিয়ায়।’
‘FWTV’এবং ‘WNA’ কি এই লক্ষ্য সামনে রেখেই মুসলমানরা করেছে?’
‘অবশ্যই।’
‘কিন্তু আমরা তো জানি না।’
‘আজ জানলে। এভাবেই যাদের জানা উচিত তারা জানবে। এ সংস্থা দু’টি মুসলমানরা বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে করেছে। তা যদি সবাই জেনে ফেলে, তাহলে এ সংস্থা দু’টির ক্রেডিবিলিটি নষ্ট হয়ে যাবে। সবাই এর বক্তব্যকে দলীয় ভাষ্য হিসেবে ভাববে।’
‘ঠিক। এই কৌশল যে আমারা নিতে পেরেছি, এ জন্যে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করছি।’
লায়লা ইয়েসুগোর বিস্ময় তখন চরমে। কে এই মেহমান? দেখতে অনেকটা তুর্কিদের মত চেহারা। তাদের পরিবারের পরিচিত এমন তো কেউ নেই! মনে হচ্ছে সে অনেক জানে, অনেক প্রভাব-প্রতিপত্তি তার!
লায়লা একটু পাশে ঝুঁকে রাশিদি ইয়েসুগোর কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল, ‘ভাইয়া, মেহমানের পরিচয় দাওনি।’
রাশিদি ইয়েসুগো হেসে উঠল। বলল,‘স্যরি, লায়লা। তোমাকে সারপ্রাইজ দেব বলে ওঁর পরিচয় রিজার্ভ রেখেছিলাম।’
বলে একটু থামল রাশিদি ইয়েসুগো। গম্ভীর হলো সে। বলল, ‘ইনি আমাদের অতি সম্মানিত ভাই বিশ্ব-বিশ্রুত আহমদ মুসা।’
শক খাওয়ার মত চমকে উঠল লায়লা। তার চোখ প্রথমে ছুটে গেল আহমদ মুসার দিকে। তারপর এসে নিবদ্ধ হলো রাশিদি ইয়েসুগোর উপর। বলল, ‘কি বলছ ভাইয়া! তিনি! তিনি ক্যামেরুনে! আমাদের এখানে।’
‘যখন ইয়েকিনি ওঁকে আমার এখানে নিয়ে এল, তখন ব্যাপারটা তার চেয়েও অবিশ্বাস্য ঠেকছিল আমার কাছে। কিন্তু অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, আল্লাহ আহমদ মুসাকে ক্যামেরুনে এনেছেন। তাঁর আসার সাথে সাথে আমাদের সৌভাগ্যের যাত্রাও আলহামদুলিল্লাহ শুরু হয়েছে। এই মাত্র ক্যামেরুনের উপর যে টিভি রিপোর্ট শুনলাম এবং সংবাদপত্রে যে রিপোর্ট দেখেছি, এগুলো তারই প্রমান। কুন্তে কুম্বায় আরও কি ঘটেছে ইয়েকিনির কাছে শুনবে। দেখবে কিভাবে রাতের অন্ধকার দিনের আলোতে রুপান্তরিত হয়েছে।’
থামল রাশিদি ইয়েসুগো।
লায়লা ইয়েসুগো সংগে সংগে উঠে দাঁড়াল। আহমদ মুসার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আসসালামু আলাইকুম। মাফ করবেন। আমি যা শুনলাম, আমি যা দেখছি সব আমার কাছে স্বপ্ন মনে হচ্ছে।’
আহমদ মুসা সালাম গ্রহন করে মুখ না তুলেই বলল, ‘কোন কাউকে অস্বাভাবিকভাবে বড় কল্পনা করলে বাস্তবে তার যখন সাক্ষ্য পাওয়া যায়, তখন এ রকমই হয়। তাই কোন কাউকে খুব বড় করে দেখা ঠিক নয়।’
‘বড়কে ছোট করে দেখাও বোধহয় ঠিক নয়।’ বলল লায়লা।
‘যে যা তাকে তাই ভাবা উচিত।’
‘সেটা ভাবতে গেলে তো ডিকশনারীতে যত বিশেষণ তার অধিকাংশই তো আপনার নামের আগে বসাতে হয়।’ বলল ইয়েকিনি।
‘থাক, এসব কথা। এস কাজের কথা ভাবি। আমার ক্যামেরুনে আসার চতুর্থ দিন আজ। কিন্তু এখনও আসল কাজ শুরু করতে পারিনি।’ বলল আহমদ মুসা।
‘মাফ করবেন। গতকাল থেকে ভাইয়ারা আপনার অনেক কাহিনী শুনেছেন। আমি কিন্তু বঞ্চিত হলাম।’ বলল লায়লা।
‘আমি আশা করি রাশিদি সব বলবে তোমাকে।’ বলল, আহমদ মুসা মুখ না তুলেই।
‘অবশ্যই বলব।’ এসব কাজে ওর খুব আগ্রহ বলেই তো জরুরী খবর দিয়ে নিয়ে এসেছি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছুটি সত্বেও। বলল রাশিদি ইয়েসুগো।
‘আপনার ক্যামেরুন মিশনের লক্ষ্য কি?’ বলল লায়লা আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে।
‘আমার ক্যামেরুন মিশনের লক্ষ্য ছিল ওমর বায়া এবং ড. ডিফরজিসকে উদ্ধার করা এবং ওমর বায়ার সম্পত্তি তার দখলে আনার ব্যবস্থা। করা কিন্তু ক্যামেরুন আসার পর, বিশেষ করে কুন্তে কুম্বায় দু’দিন কাটিয়ে যে ক্যামেরুনকে দেখলাম, তাতে লক্ষ্য আরও বড় হয়েছে।’
‘ক্যামেরুনের সৌভাগ্য এটা।’ বলল রাশিদি ইয়েসুগো।
‘এমন কিছু যদি ক্যামেরুনে না ঘটত, সেটাই হতো ক্যামেরুনের সৌভাগ্য।’ বলল আহমদ মুসা।
‘ঘটে গেছে বলেই তো আমরা দূর্ভাগ্যের শিকার। এখন আমরা সন্ধান করছি সৌভাগ্যের।’ বলল লায়লা।
‘এ সন্ধানকে আল্লাহ সফল করুন।’ আহমদ মুসা বলল।
‘আপনার সম্পর্কে আমাদের সীমাহীন কৌতুহল। কিছু প্রশ্ন করতে পারি?’ বলল লায়লা।
‘অবশ্যই।’ আহমদ মুসা বলল।
‘আপনার ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে প্রশ্ন।’ বলল লায়লা।
‘আমার ব্যক্তিগত তেমন কিছু নেই, যা কিছু আছে বোন ফাতেমা মুনেকা মনে হয় সব কিছু জেনেছে। তুমি তাকে জিজ্ঞেস কর।’ বলল আহমদ মুসা।
‘আপনার বোন তো একটা নয়।’ বলল লায়লা।
‘তা হবে কেন। হাজারো বোন, হাজারো ভাই নিয়ে আমার পৃথিবী।’ বলল আহমদ মুসা।
‘আমার জানার খুব ইচ্ছা, এই কঠিন পথে আপনার যাত্রা কিভাবে?’
‘এ প্রশ্নের উত্তর আমার জন্য কঠিন। ফিলিস্তিনের উদ্বাস্তু ক্যাম্পে সংঘাত-সংঘর্ষের মধ্যে বেড়ে উঠা একজন ফিলিস্তিনি বলতে পারবেন তার বিপ্লবী শুরু কিভাবে। আমার ব্যাপারটাও ঐ রকম। আমার চোখের সামনে আমার মা জীবন বিসর্জন দিয়েছেন। আরও হাজারো জনের সাথে আব্বা ও ছোট ভাইয়ের দেহ ছিন্ন বিচ্ছিন্ন হয়েছে বোমায়, ক্ষুধা-তৃষ্ণা-শীতে সাথীদের একে একে ঢলে পড়তে দেখেছি মৃত্যুর কোলে হিমালয়ের উপত্যকায়। তাদের সকলের একটা অপরাধ ছিল, তারা মুসলমান। এই বোধ কখন যে কিভাবে আমাকে দূর্ভাগা মুসলিম সমাজের একজন সেবকে পরিনত করেছে আমি জানিনা।’ আহমদ মুসা বলল।
‘আপনি সবচেয়ে খুশী হন কিসে?’ বলল লায়লা।
‘যখন কারো মুখে আমি নির্মল হাসি দেখি।’ বলল আহমদ মুসা।
‘সবচেয়ে দুঃখিত হন কিসে?’
‘যখন মানুষের চোখে অশ্রু দেখি।’
‘তাহলে মানুষকে কেন্দ্র করেই আপনার সব কিছু। মানুষকে এত ভালোবাসেন কেন?’
‘মানুষকে ভালোবাসলে আল্লাহ সবচেয়ে খুশী হন বলে।’
‘সত্যিই খুশী হন? কেন?’
‘মানুষকে দিয়েই তো আল্লাহর সব আয়োজন। এই দুনিয়া, এই মহা-বিশ্ব, সব কিছুই আল্লাহ করেছেন মানুষের জন্যেই।’
‘মানুষকে এই নির্বিচার ভলোবাসা কি সেকুলার ভালোবাসা নয়?’
হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘মানুষকে নির্বিচারে ভালোবাসতে না পারলে পথভ্রষ্ট মানুষকে, দূর্ভাগা পাপীদের কিভাবে আলোর পথে, মুক্তির পথে নিয়ে আসবো?’
‘তাহলে মুসলিম এবং অমুসলিমকে ভালোবাসায় কোন পার্থক্য থাকবে না?’
‘মুসলিমরা তোমার দেহের অংগ, আর অমুসলিমরা তোমার আশ্রিত অসহায় জন। পার্থক্য বুঝেছ?’
‘বুঝেছি। বড় একটা বিভ্রান্তি আমার দূর হলো।’
‘লায়লার মধ্যে যে একটা ভ্রান্তি ছিল তার স্বীকৃতি অনন্ত পাওয়া গেল। কী বল ইয়েকিনি।’ বলল রাশিদি মুখ টিপে হেসে।
‘যাই বল আমি কিছু বলব না আজ। তবে ইয়েকিনিকে সাক্ষী মানা ঠিক হয় নি। ভুল স্বীকারকে সে কুইনাইনের চেয়েও তেতো মনে করে।’ বলল লায়লা।
‘দোষ করলে রাশিদি তুমি, লায়লা শোধ নিল আমার ওপর।’ বলল ইয়েকিনি। ‘নিরাপদ জায়গা কোনটা লায়লা চিনে।’
লায়লা কিছু বলতে চাচ্ছিল। তার আগে আহমদ মুসা বলল, ‘তোমাদের মধুর বিতর্ক আপাতত স্থগিত। আমার ঘুম পাচ্ছে। তোমাদের এখানে আরামের জীবন আমাকে অলস করে তুলল মনে হচ্ছে।’
‘স্যরি, না, ঠিক আছে। খাওয়ার পর একটু রেষ্ট নেওয়া প্রয়োজন।’ উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল রাশিদি ইয়েসুগো।
‘আরামের জীবন মানে কি অলস জীবন?’ বলল লায়লা।
‘আরামের জীবন মানে অলস জীবন নয়। তবে আরামের জীবন যদি লক্ষ্যহীনতা ও নিশ্চিন্ততায় আক্রান্ত হয়, তাহলে জীবন কাজ না পেয়ে অলস হয়ে দাঁড়াতে পারে।’
‘নিশ্চিন্ততা ও লক্ষ্যহীনতা দ্বারা আপনি কি বুঝতে চাচ্ছেন?’ লায়লা বলল।
‘মানব জীবনের লক্ষ্য সম্পর্কে উদাসিনতা এবং মানুষ হিসেবে নিজের দ্বায়িত্ব কর্তব্য সম্পর্কে কোন চিন্তা না করা।’
‘মাফ করবেন। এক কথায় মানব জীবনের লক্ষ্যকে আপনি কিভাবে বর্ণনা করবেন?’ উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে লায়লা বলল।
‘মানুষের ইহকালীন কল্যাণ ও পরকালীন মুক্তির জন্যে কাজ করা।’
‘সব মানুষের কল্যাণ সব মানুষের মুক্তির জন্য?’
‘অবশ্যই, আল্লাহর কোন বান্দা কি তোমার পর যে তার কল্যাণ ও মুক্তির কথা ভাববে না? তবে প্রথম ভাবতে হবে আয়ুর কথা, পরে আশ্রিত’দের কথা।’
‘আমার মনে হচ্ছে কি জানেন, আমাদের মত আপনার ভাই-বোনদের শিক্ষিত করার জন্যে গোটা দুনিয়ায় আপনার শিক্ষা কোর্স চালানো দরকার। আমরা অনেক কিছুই জানি না।’ লায়লা বলল, ইয়েসুগোদের পেছনে হাঁটতে হাঁটতে।
সাংঘাতিক দামী কথা বলেছ লায়লা তুমি। বলল রাশিদী ইয়েসুগো।
‘রাশিদী তুমি আরও স্বীকার করবে, আমাদের মেয়েরা দামী কথাই বেশী বলে। আসলে ইসলামের প্রতি ওদের চিন্তা আন্তরিকই বেশী।’ বলল ইয়েকিনি।
‘আচ্ছা ইয়েকিনি, লায়লা তোমাকে অতবড় আঘাত করল, আর তুমি তাকে এত বড় সমর্থন দিলে?’ মুখ টিপে হেসে বলল রাশিদী।
‘সমর্থন নয়, সত্যের প্রতি স্বীকৃতি।’ বলল লায়লা। লজ্জার একটি ঢেউ তার মুখের ওপর দিয়ে বয়ে গেল।
ইয়েসুগো ও আহমদ মুসার পেছনে পাশাপাশি হাটছিল লায়লা এবং ইয়েকিনি।
কথা শেষ করেই লায়লা তাকাল ইয়েকিনির দিকে। ইয়েকিনি কিছু বলতে যাচ্ছিল। যেন মুখ ফস্কে বেরুচ্ছিল কিছু কথা।
লায়লা ঠোঁটে আঙ্গুল চাপা দিয়ে আহমদ মুসাদের দিকে ইংগিত করে কিছু না বলার জন্যে অনুরোধ করল।
লায়লার চোখে-মুখে রক্তিম লাজ-নম্রতা।
লায়লা কথা শেষ করার পর মূহুর্ত কয়েক নিরবতা। নিরবতা ভাঙল আহমদ মুসার কন্ঠ। বলল, ‘ইয়েকিনি ঠিকই বলেছে। প্রমাণিত হয়েছে প্রতিকূল পরিবেশে মেয়েরাই ইসলামকে ধরে রাখতে পারে বেশী। ইসলামের শিক্ষাও তাদের মাধ্যেমে বেশী সম্প্রসারিত হয়। সাবেক কম্যুনিষ্ট দেশগুলোতে এটা আমরা দেখেছি। আফ্রিকাতেও তোমরা এটা দেখবে।’
‘ব্যাস লায়লা, তোমার আর কি চাই, দলিল পেয়ে গেছ।’ পেছনে তাকিয়ে হেসে বলল রাশিদি ইয়েসুগো।
‘দেখ ভাইয়া ধর্মের কল এভাবেই বাতাসে নড়ে।’
লায়লার কথায় হেসে উঠল ওরা তিনজন সকলেই এক সাথে।

ইয়াউন্ডির বাণিজ্যিক এলাকায় একটা চারতলা ভবন। ভবনের তিনতলার একটা প্রশস্ত কক্ষ। কক্ষের বড় একটা টেবিলকে সামনে রেখে এক চেয়ারে বসে আছে পিয়েরে পল। তার ডানপাশে ফ্রান্সিস বাইক, ওকুয়ার প্রধান।
তাদের সামনের টেবিল ঘিরে আরো অনেকগুলো চেয়ার।
টেবিল থেকে অল্পদূরে দেয়ালে আটা একটা টিভি স্ক্রীনে ফ্রি-ওয়াল্ড টিভি’র প্রোগ্রাম চলতে দেখা যাচ্ছে।
কিন্তু সেদিকে পিয়েরে পলের কোন খেয়াল নেই। তার চোখ-মুখ আগুনের মত লাল। ফ্রান্সিস বাইকের মুখ নিচু। আষাঢ়ের মেঘের মত ভারী। কথা বলছিল পিয়েরে পল ‘এতবড় ঘটনা কিভাবে ঘটল। ফ্রিওয়াল্ড টিভির মত একটা বিখ্যাত আন্তর্জাতিক মিডিয়া ১০মিনিট ধরে মুসলিম উচ্ছেদ এবং ‘কোক’ এর কুকীর্তি বর্ণনা করল! এটা কি করে সম্ভব হলো? রীতিমত এটা মিডিয়া জগতে বিপ্লবের মত। ওমর বায়ার কাহিনী সর্বস্তরে বর্ণনা করেছে। কত লাখ একর জমি কিভাবে দখল হয়েছে তাও বলেছে। বলতে গেলে হাটে হাঁড়ি ভেঙে দিয়েছে। নিশ্চয় এর তীব্র প্রতিক্রিয়া হিসেবে ও.আই.সি, রাবেতা সহ মুসলিম দেশ গুলো চিৎকার করবেই। পশ্চিমা অনেক মানবধিকার সংস্থা দেখবেন সোচ্চার না হয়ে পারবে না। এখানকার সরকারও এখন চাপের মুখে পড়বে। তাদের কাছ থেকে যে সহযোগিতা আমরা পাচ্ছিলাম, ভবিষ্যতে তা পাওয়া আর আগের মত সহজ হবে না। সবচেয়ে বড় কথা ওমর বায়ার জমি হস্তান্তরের কাজটাও জটিলতায় পড়বে।’
থামল একটু পিয়েরে পল। সে আবার মুখ খোলার আগেই কথা বলে উঠল ফ্রান্সিস বাইক। বলল, ‘এ রকম কত নিউজ হয়। চীফ জাস্টিস কি তার কথা থেকে সরবেন? সরলে আমাদের অস্ত্র তো আছেই। চীফ জাস্টিস তার জীবনের চাইতেও ডঃ ডিফরজিসকে ভালবাসেন। সুতরাং………’
‘সুতরাং কাজটা সহজ হতেও পারে।’ ফ্রান্সিস বাইককে বাধা দিয়ে বলতে শুরু করল পিয়েরে পল, ‘কিন্তু সরকার যদি বাইরের চাপে এনিয়ে ঘাটাঘাটি শুরু করে, তাহলে কাজটা কঠিন হতে পারে।’
‘তা হতে পারে। তাই চীফ জাস্টিস কে দিয়ে কাজটা আমাদের আগেই সেরে ফেলতে হবে। তাছাড়া সরকার চাপে পড়লেই যে সরকার সঙ্গে সঙ্গে গলে যাবে, ব্যাপার তা নয়। সরকারের দু’একজন মানবতাবাদী ছাড়া সকলেই আমাদের পক্ষে। সরকার চাপে পড়ে তদন্তের কথা বলতে পারে, কিন্তু সেটা লোক দেখানোই হবে। তাদের ভাই-ভাতিজা ও পুত্র-কন্যা-জামাইদের আমাদের এনজিওগুলো বড়বড় বেতন দিয়ে পুষছে।’
‘সুখবরের জন্য ধন্যবাদ। কিন্তু জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার কমিশন কিংবা পশ্চিমের অন্যান্য মানবাধিকার সংস্থা সরেজমিন তদন্তের জন্যে আসতে পারে। বলা যায় আসবেই। ও. আই. সি. এবং মুসলিম দেশগুলো অবশ্যই এর ব্যবস্থা করবে।’
‘সেগুলো মোকাবিলার পথ করা যাবে। কাগজে কলমে কোথাও আমাদের কোন ত্রুটি নেই। দক্ষিণ ক্যামেরুনের কোথাও মুসলিম জনপদ ছিল তা কেউ প্রমাণ করতে পারবে না। কোন মসজিদই আস্ত রাখা হয়নি। ভেঙ্গে সেখানে গীর্জা তৈরী করা হয়েছে।’
একটু থামল ফ্রান্সিস বাইক। তারপর বলল, ‘অন্য একটা কথা ভেবে আমি বিস্মিত হচ্ছি, রিপোর্টের কোথাও ব্ল্যাক ক্রস-এর নাম নেই। ডঃ ডিফরজিস এবং চীফ জাস্টিস এর আদালতের উল্লেখ নেই। বোধহয় এ ব্যাপারগুলো পুরো জানেনা যে রিপোর্ট পাঠিয়েছে।’
‘আমার তা মনে হয় না। সংশ্লিষ্ট বিচারকের আত্মীয়কে ফ্রান্স থেকে কিডন্যাপ করে আনা হয়েছে, সে কথা রিপোর্টে বলেছে। এ তথ্য যারা জানে, তারা ঐসব ব্যাপারও জানে। আমার মনে হচ্ছে, যারা এখবর প্রচারের পেছনে আছে তারা খুব ঠান্ডা মাথার লোক। তারা গোটা রিপোর্টে সরকারের জন্যে সামনে এগুবার কোন ক্লু রাখেনি। চীফ জাস্টিস এবং ডঃ ডিফরজিসের নাম করলে সরকার ক্লু পেয়ে যেত। আমার মনে হয় যারা খবর প্রচারের পেছনে আছে তারা চাচ্ছে নিজেরাই ব্যাপারটা হ্যান্ডেল করতে। তারা সরকারকে মনে হয় বিশ্বাস করে না।’
‘ঠান্ডা মাথার এ লোকটা কে হতে পারে, যে ফ্রিওয়ার্ল্ড কে দিয়েও নিউজ করিয়ে নিতে পারে।’
‘এটাই তো বুঝতে পারছিনা। এ ধরণের একজন লোক আহমদ মুসাই। কিন্তু সে কি বেঁচে আছে? অবশ্য দুয়ালা’য় যে লোকটি আমাদের পরাজিত করে পালাতে সমর্থ হয়, তার চেহারার যে বিবরণ পাওয়া গেছে তাতে আহমদ মুসার সাথে মিলে যায়। আবার আমাদের দুয়ালা ঘাঁটি থেকে আমরা চলে আসার পর যে লোকটি হানা দেয় তার চেহারাও আহমদ মুসার মতই। সব মিলিয়ে আমার মনে হচ্ছে লোকটি আহমদ মুসাই। কিন্তু ভাবছি, সে বাঁচল কি করে ধ্বংস হওয়া মটর থেকে।’
একটা ঢোক গিলল পিয়েরে পল। থামল একটু। শুরু করল আবার, ‘রিপোর্টে কুন্তে কুম্বা’র কি শুনলাম? কি ঘটেছে সেখানে?’
এই সময় ইন্টারকম কথা বলে উঠল, ‘মিঃ ফ্রান্সিস বাইক, ইদেজা থেকে লোক এসেছে। জরুরী মেসেজ।’
‘নিয়ে এস।’ ফ্রান্সিস বাইক বলে উঠল, ‘এখনি জানা যাবে সব কিছু। কুন্তে কুম্বার সবচেয়ে কাছের ঘাটি ইদেজা থেকে লোক এসেছে।’ ফ্রান্সিস বাইকের কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে টেবিলের পাশে রক্ষিত ইন্টারকমে একটা নীল বাতি জ্বলে উঠল। ফ্রান্সিস ইন্টারকমের দিকে মুখ নিয়ে বলল, ‘গেটে কে?’
ইন্টারকমেই উত্তরটা ধ্বনিত হলো। বলা হলো, ‘স্যার ইদেজার লোককে নিয়ে এসেছি।’
‘এস।’ বলল ফ্রান্সিস বাইক।
দরজা খুলে গেল। প্রবেশ করল একজন শ্বেতাঙ্গ যুবক। খৃষ্টান ফাদারের পোশাক পরা।
‘মিঃ পিয়েরে পল, যুবকটি আমাদের ইদেজা গীর্জার একজন ফাদার এবং ‘কোক’-এর ইদেজা-ঘাঁটির ইনফরমেশন ডাইরেক্টর।’
যুবকটি টেবিলের সামনে এলে ফ্রান্সিস বাইক উঠে দাঁড়িয়ে যুবকটির সাথে হ্যান্ডশেক করে বলল, ‘বসুন ফাদার জেমস।’
ফাদার জেমস পিয়েরে পলের সাথেও হ্যান্ডশেক করল। তারপর বসল।
ফাদার জেমস হ্যান্ডশেক করার সময় হাসার চেষ্টা করছিল। কিন্তু হাসিটা কান্নার চেয়েও কাল হয়ে উঠেছিল।
‘বলুন ফাদার জেমস। নিশ্চয় ইদেজা’র কিছু দুঃসংবাদ আমাদের শুনাবেন।’
‘শুধু দুঃসংবাদ নয়, বিপর্যয় ঘটে গেছে।’ বলল ফাদার জেমস।
‘বিপর্যয়! কেমন বিপর্যয়?’
‘কুন্তে কুম্বার ওরা ইদেজা’র ‘কোক’ প্রধান জন স্টিফেনসহ আমাদের ১৬জনকে বন্দী করেছে এবং তাদের সাথের দু’জনকে হত্যা করেছে। পরে ইদেজা থেকে ওদের ইমামকে মুক্ত এবং ইদেজার ডেপুটি ‘কোক’ প্রধান ফ্রাসোয়া বিবসিয়ের’কে বন্দী করে নিয়ে গেছে।’ থামল ফাদার জেমস।
‘কি বলছ তুমি? তোমার মাথা ঠিক আছে তো?’ বলল ফ্রান্সিস বাইক।
মাথা নিচু করল ফাদার জেমস। বলল, ‘অবিশ্বাস্য বটে, কিন্তু যা বলেছি তাই ঘটেছে।’
‘ইদেজায় ওরা কয়জন লোক এসেছিল?’
‘তিনজন।’
‘কি বলছ? তিনজন লোক এসে আমাদের ঘাটিতে ঢুকে তাদের ইমামকে খুলে নিয়ে গেল। আর ফ্রাসোয়াকেও বন্দী করে নিয়ে গেল। তোমরা কি করছিলে?’
‘বাধা দিতে গিয়ে আমাদের দু’জন খুন হয়েছে ইদেজায়।’
‘এবং কুন্তে কুম্বায় দু’জন। ওদের কেউ মারা যায়নি?’
‘না। ওদের কেউ মারা যায়নি।’
‘আচ্ছা, বলত ঘটনা। শুনি কি করে ঘটতে পারল এই অসম্ভব ঘটনা।’
ফাদার জেমস কুন্তে কুম্বার সব ঘটনা এবং ইদেজাতে যেভাবে যা ঘটেছিল সবিস্তারে সব বর্ণনা করল।
ফাদার জেমস কথা শেষ করে থামতেই পিয়েরে পল বলে উঠল, ‘দেখা যাচ্ছে গোটা বিপর্যয়, ঘটেছে মাত্র একজন লোকের হাতে।’
‘তাই তো দেখছি। কিন্তু কুন্তে কুম্বা তো দুরে, ক্যামেরুনের কোথাও তো এ ধরণের লোক গত দশ বছরে আমাদের চোখে পড়েনি।’ বলল ফ্রান্সিস বাইক।
‘লোকটিকে আপনি দেখেছেন?’ জিজ্ঞেস করল পিয়েরে পল ফাদার জেমস কে।
দেখেছি।
‘বলুন তো লোকটা কেমন?’ বল পিয়েরে পল।
‘লোকটা ফর্সা এশিয়ান। তুর্কিদের সাথেই তার চেহারার মিল বেশী।’
‘ঘন কাল চুল মাথায়?’ বলল পিয়রে পল।
‘হ্যাঁ।’
‘চুল কিছু কোকড়ানো?’
‘ঠিকই বলেছেন।’
‘মুখের চেহারায় কি শিশু সুলভ সহজ ভাব?’
‘হ্যাঁ।’ বলল জেমস।
পিয়েরে পল মুখ ঘুরিয়ে তাকাল ফ্রান্সিস বাইকের দিকে। বলল, ‘তাহলে আহমদ মুসা সেদিনের গাড়ি বিস্ফোরণে মরেনি। এই চেহারা নিঃসন্দেহে আহমদ মুসার। বুঝা যাচ্ছে, কুমেটে আমাদের ঘাটিতে সেদিন আহমদ মুসাই তাহলে হানা দিয়েছিল।’
‘আমি বুঝতে পারছিনা মিঃ পল এই ওমর বায়ার সাথে আহমদ মুসার কি সম্পর্ক? আহমদ মুসার সাথে আমাদের কোন শত্রুতা নেই! তাহলে সে আমাদের পিছু ছাড়ছে না কেন?’
‘মিঃ ফ্রান্সিস বাইক আহমদ মুসাকে আপনি চিনতেই পারেননি। সে তো জাতির জন্যে কাজ করছে। ওমর বায়া তার জাতির একজন। আমরা ওমর বায়ার শত্রু মানে তার শত্রু।’ বলল পিয়েরে পল।
পিয়েরে পল আবার ফিরল ফাদার জেমসের দিকে। বলল, ‘ফ্রাসোয়া বিবসিয়ের’কে ওরা ইদেজা থেকে ধরে নিয়ে গেছে, দু’জনকে হত্যা করে গেছে, জন স্টিফেনসহ ১৬জনকে কুন্তে কুম্বায় বন্দী করে রেখেছে-এই বিষয়গুলো আপনারা পুলিশকে জানিয়েছেন তো?’
মুখটা ম্লান হয়ে গেল ফাদার জেমসের। বলল, ‘আমরা গিয়েছিলাম থানায় মামলা দায়ের করতে। কিন্তু দেখা গেল, তারা আগেই মামলা দায়ের করে গেছে।’
‘ওরা কি মামলা দায়ের করেছে?’ বলল পিয়েরে পল।
‘ওরা ঐদিন পরপর দুইটি মামলা দায়ের করেছে। প্রথমটিতে মূল অভিযোগ, জন স্টিফেন ও ফ্রাসোয়া বিবসিয়েরের নেতৃত্বে জনা বিশেক সশস্ত্র লোক কুন্তে কুম্বার উপর আক্রমণ চালায়। এলাকাবাসী চারদিক থেকে ছুটে এসে ওদের প্রতিরোধের চেষ্টা করে। প্রতিরোধের মুখে ওরা কয়েকটি লাশ সহ পালিয়ে গেছে। ওদের দুটি গাড়ি আটক করা হয়েছে। আর ২য় মামলায় বলেছে, ওরা ইদেজা থেকে কুন্তে কুম্বায় আক্রমণ করতে এলে সুযোগ পেয়ে ওরা কিডন্যাপ করে রাখা আমাদের ইমাম আলী ওকেচুকু ওদের দু’জন লোককে পরাভুত করে পালিয়ে আসতে সমর্থ হয়েছে। আমরা তার নিরাপত্তাহীনতার ভয় করছি।’
‘তার মানে ওরা জন স্টিফেন সহ আমাদের ১৬জন লোককে যে বন্দী করে রেখেছে এবং ইদেজা ঘাটিতে এসে আমাদের দু’জনকে হত্যা করে ফ্রাসোয়া বিবসিয়েরকে ধরে নিয়ে গেছে সব অস্বীকার করছে।’ চিৎকার করে উঠল ফ্রান্সিস বাইক।
ফাদার জেমস কোন কথা বলল না।
‘সাংঘাতিক ব্যাপার। আপনারা ওদের মুক্ত করার জন্যে ওখানে আর অভিযান করেননি?’ বলল পিয়েরে পল।
‘আমরা লুলমডোর, ম্যালমায়া, ইবোলোয়া এবং ক্রিবি ঘাঁটির সাথে আলোচনা করেছি। তারা সব শুনে বলেছে, বড় ধরনের যুদ্ধ ছাড়া কুন্তে কুম্বায় এখন ঢোকা যাবে না। ওদের হাতে অনেকগুলো মেশিনগান, সাব মেশিনগান ও গোলা-গুলী চলে গেছে। এখন ওদের মোকাবিলা করতে গেলে বিরাট ক্ষয়-ক্ষতি হতে পারে। বড় ধরনের সিদ্ধান্ত ছাড়া এটা করা যাবে না। ইতিমধ্যে আমরা খবর পেলাম আপনারা ক্যামেরুন ফিরেছেন। ইয়াউন্ডি এসেছেন। তাই শুনেই এখানে ছুটে এলাম।’
‘কি মনে করেন, বন্দীদেরকে কি ওরা মেরে ফেলতে পারে? বন্দী করার কথা যখন ওরা গোপন করেছে, তখন মেরে ফেলাই ওদের জন্যে স্বাভাবিক।’ বলল পিয়েরে পল।
‘না মেরে ফেলেনি। ইতিমধ্যে আরও কিছু ঘটনা ঘটেছে স্যার। যার কারণে আরও বেশী ছুটে আসা এখানে?’ বলল ফাদার জেমস।
‘খারাপ কিছু? কি ঘটনা?’ বলল ফ্রান্সিস বাইক।
‘কুন্তে কুম্বা থেকে ভায়া-মিডিয়া মেসেজ এসেছে, তাদের চারটি দাবী পূরণ হলে ওরা বন্দীদের ছেড়ে দেবে।’
‘চারটি দাবী কি?’ বলল ফ্রান্সিস বাইক।
‘তাদের প্রথম দাবী ইয়াউন্ডি হাইওয়ে থেকে দক্ষিণে ইদেজা অঞ্চলে জবরদস্তি ও ভুয়া দলিলের মাধ্যমে আত্মসাতকৃত সকল মুসলিম জমি ফেরত দিতে হবে। দুই, গত পাঁচ বছরে যাদেরকে এই অঞ্চল থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছে, তাদের ক্ষতিপূরণসহ পূনর্বাসন করতে হবে। তিন, গোটা দক্ষিণ ক্যামেরুনে খৃষ্টানদের সত্যিকার মিশনারী সংস্থাগুলো থাকবে, কিন্তু সেবার নামে ষড়যন্ত্ররত এনজিও-দের তৎপরতা বন্ধ করে দিতে হবে। চার, ‘কোক’ কে তার সকল দুস্কর্ম লিখিতভাবে স্বীকার করতে হবে।’
‘দাবীগুলো ও প্রতিশ্রুতি কি তারা লিখিতভাবে দিয়েছে? আমাদের দলিল প্রয়োজন, যাতে প্রমাণ হয় স্টিফেনরা তাদের হাতে বন্দী আছে।’ বলল পিয়েরে পল।
‘ওরা লিখিত কিছু দেয়নি। একটা অডিও ক্যাসেটে জন স্টিফেন তাদের দাবীগুলো আমাদের শুনিয়েছে। তারপর ক্যাসেট তারা ফেরত নিয়ে গেছে।’ বলল ফাদার জেমস।
‘জন স্টিফেনকে দিয়ে ওরা কথা বলিয়েছে?’
‘হ্যাঁ।’
‘আর কিছু বলেছে?’
‘পনের দিন ওরা সময় দিয়েছে। দাবী পূরণ না হলে বন্দীদের তারা কি করবে তা তারাই জানে।’
‘ওদের কাজগুলো নিখুঁত দেখছি। আইনের দিক দিয়ে ওদের ধরার কোন পথ তারা রাখেনি। শক্তি প্রয়োগ করতে গেলেও ঝুঁকি আছে। বন্দীদের ওরা খুন করে ফেলতে পারে।’ বলল পিয়েরে পল।
‘কিন্তু এমন বুদ্ধি ওরা কোথায় পেল? ক্যামেরুনে বহুদিন কাজ করছি। এমন তো ঘটেনি?’ বলল ফ্রান্সিস বাইক।
‘ভুলে যাচ্ছ কেন, ওদের মাঝে এখন আহমদ মুসা। তারই কাজ এসব।’
‘আমরা এখন কি করব মিঃ পল?’
‘চিন্তা করতে হবে। তবে অন্য কিছুর দিকে মন দেবার আগে ওমর বায়ার সম্পত্তির ফয়সালা করে ফেলতে হবে। আহমদ মুসা কুন্তে কুম্বায় ব্যস্ত থাকতে থাকতে আমাদের এই কাজটা শেষ করতে হবে।’
‘ঠিক বলেছেন মিঃ পল।’ বলল ফ্রান্সিস বাইক।
বলে ফ্রান্সিস বাইক ফাদার জেমসের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘জন স্টিফেনদের ওরা কোথায় আটকে রেখেছে?’
‘এটা জানার কোন উপায় নেই। ওদের এলাকায় এখন এমন পাহারা অপরিচিত কোন লোক সেখানে প্রবেশ করতে পারছে না।’ বলল ফাদার জেমস।
‘পুলিশ পাঠানো যায় না?’
‘পুলিশের সাথে আলোচনা করেছি। তারা ওদের কম্যুনিটি সেন্টার মসজিদ পর্যন্ত যেতে পারে। পুলিশ বলেছে, ওদের এলাকা সার্চের কোন সুযোগ পুলিশের নেই। কারণ, কেস গেছে ওদের পক্ষে। ওরা বাদী।
‘বুদ্ধিতে আপনারা পরাজিত হয়েছেন। এখন তার মাশুল তো দিতেই হবে।’ তীব্র ক্ষোভ ঝরে পড়ল ফাদার ফ্রান্সিস বাইকের কন্ঠে।
একটু থেমে একটু শান্ত হয়ে ফ্রান্সিস বাইক বলল, ‘ঠিক আছে মিঃ জেমস আপনি যান। পরে কথা হবে আপনার সাথে।’
ফাদার জেমস চলে গেলে ফ্রান্সিস বাইক পিয়েরে পলের দিকে চেয়ে বলল, ‘আমি বুঝতে পারছি না ওমর বায়ার লোকরা এত বড় ‘মিডিয়া ক্যু’ করল কি করে?’
‘তৎক্ষণাৎ উত্তর দিল না পিয়েরে পল। শূন্য দৃষ্টিতে অনেকক্ষণ বাইরে তাকিয়ে থাকার পর বলল, ফ্রি ওয়ার্ল্ড টিভি এবং ওয়ার্ল্ড নিউজ এজেন্সীকে এ ধরনের নিউজ মাঝে মাঝেই করতে দেখা যাচ্ছে। এটা ওদের নিছক ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণ না ওরা কোন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে কাজ করছে তা দেখা প্রয়োজন। আপনি একটা ভালো বিষয়ের দিকে ইংগিত করেছেন। ও দু’টি সংবাদ মাধ্যমকে ভালো করে এক্স-রে করা প্রয়োজন। এ ব্যাপারে আমাদের ব্ল্যাক-ক্রস ইনটেলিজেন্স এবং ইসরাইলি ইনটেলিজেন্স এক সাথে কাজ করতে পারে। আমি এখনি আমাদের ইনটেলিজেন্স চীফ সাইরাস শিরাককে টেলিফোন করে দিচ্ছি।’
বলে টেলিফোন তুলল পিয়েরে পল।
সাইরাস শিরাক থাকেন প্যারিস। ‘হ্যালো, শিরাক।’ টেলিফোন সংযোগ প্রতিষ্ঠিত হলে বলল পিয়েরে পল।
‘ইয়েস স্যার।’ ওপার থেকে বলল সাইরাস শিরাক।
‘আজকের FWTV দেখেছ?’
‘মনিটর করা হয়েছিল, আমি দেখলাম।’
‘কি বুঝলে?’
‘উদ্দেশ্যমূলকভাবে তারা এটা প্রচার করেছে।’
‘তুমিও বলছ একথা?’
‘কেউ নিশ্চয় করিয়েছে এটা।’
‘কিন্তু সি এন এন কে দিয়ে কেউ করাতে পারে এটা?’
‘না পারে না।’
‘তাহলে কি বুঝছ?’
‘বুঝতে পারছি FWTV-তে ইসলামী মৌলবাদের জীবাণু ঢুকেছে।’
‘এই জীবাণু তোমাকে ধ্বংস করতে হবে।’
‘বুঝেছি।’
‘কাজ শুরু করে দাও। প্রথমে সন্ধান, তারপর চিহ্নিতকরণ এবং শেষ কাজ ধ্বংস করা।’
‘শুরু করছি। ওদিকের কি খবর?’
‘চীফ জাষ্টিসের সাথে যোগাযোগ হয়েছে। কাজ হবে।’
‘খুশীর খবর স্যার।’
‘প্রভু যিশু সদয় হোন। রাখি।’
‘ও, কে স্যার।’
‘ও, কে। বাই।’
টেলিফোন রেখে ফ্রান্সিস বাইকের দিকে চেয়ে বলল, ‘আমাদের শিরাক করিতকর্মা। সেও ব্যাপারটা ধরে ফেলেছে।’
‘ভালই হলো, সব দিকেই আমাদের নজর দেয়া দরকার।’ বলল ফ্রান্সিস বাইক।
‘কিন্তু সবচেয়ে বেশী নজর রাখতে হবে রেডিও, টিভি, সংবাদ সংস্থা ও সংবাদপত্রের দিকে। এ চারটি সংবাদ মাধ্যমের আন্তর্জাতিক কোন চ্যানেলে মুসলমানদের ঢুকতে দেয়া যাবে না।
‘কিন্তু ওদের টাকার জোর তো কম নেই। আন্তর্জাতিক চ্যানেল তো ওরাও গড়তে পারে।’
‘পারে। কিন্তু সেগুলোকে বাঁচতে দেয়া হবে না। যেমন ওদের ‘ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক নিউজ এজেন্সী’ (IINA) এবং ওদের মক্কা ভিত্তিক ‘ভয়েস অব ইসলাম’ বেঁচে থেকেও মৃতপ্রায়।’
কথা শেষ করেই উঠে দাঁড়াল পিয়েরে পল। বলল, ‘বসুন, আমি আসছি। চীফ জাষ্টিসের সাথে কথা বলতে হবে।’

চীফ জাষ্টিস উসাম বাইকের ড্রইং রুম।
পাশাপাশি দু’টি সোফায় বসেছিলেন চীফ জাষ্টিস এবং ল’সেক্রেটারী লাউস মেইডি।
ল’সেক্রেটারী নতুন নিয়োগ লাভের পর চীফ জাষ্টিসের সাথে সৌজন্য সাক্ষাতের জন্যে এসেছে। লাউস মেইডি এর আগে ছিলেন স্বরাষ্ট্র সেক্রেটারী।
চা খেতে খেতে দু’জনে গল্প করছিলেন।
FWTV- এর প্রোগ্রাম শুরু হলে তাদের গল্প থেমে গেল। ক্যামেরুন সংক্রান্ত ফিচার নিউজের ঘোষণা শুনে তারা অবাক হয়ে গিয়েছিল।
পুরো ফিচার নিউজটি তারা দু’জনে সম্মোহিতের মত দেখল।
চীফ জাষ্টিসের মুখে একটা প্রবল উত্তেজনার ছাপ। আর ল’সেক্রেটারীর চোখ তো রীতিমত ছানাবড়া হয়ে উঠেছে।
নিউজ ফিচারটি শেষ হলে প্রথমে কথা বলল ল’ সেক্রেটারী লাউস মেইডি। বলল, ‘স্যার, ক্যামেরুনের মান-ইজ্জত সব ধুলায় লুটিয়ে দিয়েছে। এ ভয়ানক রিপোর্ট তারা কোথায় পেল।’
চীফ জাষ্টিসের মনে তখন অন্য চিন্তার ঝড়। তাঁর চোখের সামনে ভেসে উঠেছে পিয়েরে পলের মুখ এবং পণ-বন্দী হিসেবে আটক ডঃ ডিফরজিসের মুখ। তার মনে পড়ল পিয়েরে পলের সাথে তার কথোপকথন এবং ডঃ ডিপরজিসের মুক্তির জন্যে পিয়েরে পলের প্রস্তাবে তার মৌন স্বীকৃতির কথা। এই নিউজ তো সব লন্ড-ভন্ড করে দেয়ার মত পরিস্থিতি সৃষ্টি করল, ভাবল সে। মিশেল প্লাতিনির কথা তার মনে পড়ল। মনে পড়ল আহমদ মুসার কথাও। ওরা কি ওমর বায়া ও ডঃ ডিফরজিসকে সথাসময়ে উদ্ধার করতে পারবে? পুলিশের সাহায্য নেয়ার কথাও তার মনে হলো। কিন্তু পরক্ষণেই ভাবল, তাতে নিস্ফল হৈ চৈ বাড়বে এবং ডঃ ডিফরজিসের জীবন তাতে বিপন্ন হতে পারে। তার পিতৃপ্রতিম ডঃ ডিফরজিসের মুখ তার মনের আকাশে ভেসে উঠল। কেঁপে উঠল উসাম বাইকের হৃদয়। সে কোন ভাবেই তার প্রিয় এ লোকটির জীবন বিপন্ন হতে দিতে পারে না। আবার তার কাছে FWTV এর নিউজ যে সঙ্কট সৃষ্টি করল তাও বড় হয়ে উঠল। ‘কোক’ এবং খ্রিস্টান এনজিও’রা খ্রিস্টান স্বার্থে বেআইনি কিছু করেছে এটা তার অজানা নয়, কিন্তু তার প্রকৃত রুপ যে এত ভয়াবহ তা সে কোনদিন কল্পনাও করেনি।
ল’সেক্রেটারি লাউস মেইডির প্রশ্নে চীফ জাস্টিস উসাম বাইকের চিন্তায় ছেদ পড়ল।
লাউস মেইডি থামার পর সঙ্গে সঙ্গেই উত্তর দিল না চীফ জাস্টিস। একটু ভাবল। বলল তারপর, ‘এ ভয়ানক রিপোর্ট তারা কোথায় পেল তার চেয়ে বড় কথা হল, যা বলল তা সত্য কিনা। যদি সত্য হয়, তাহলে ইজ্জত আর আছে কোথায়?’
‘সব কথা সত্য বলাও কঠিন, মিথ্যা বলাও সম্ভব নয় স্যার।’
‘কেন?’
‘তদন্ত ছাড়া নিশ্চিত করে কিছুই বলা যাবে না।’
‘স্পেসিফিক ঘটনার সত্য-মিথ্যা তদন্ত-সাপেক্ষে হতে পারে। কিন্তু মূল অভিযোগ সত্য কিনা? কোক দক্ষিণ ক্যামেরুন থেকে মুসলমানদের সমূলে উচ্ছেদ করেছে কিনা? জোর করে মুসলিম ভূমি ক্রয় ও আত্মসাৎ করেছে কিনা?’
‘এই মূল অভিযোগ সত্য স্যার। তিন বছর আমি স্বরাষ্ট্র বিভাগের দায়িত্বে ছিলাম। আমার অনেক সরেজমিন অভিজ্ঞতা রয়েছে।’
‘কিন্তু প্রশাসন এর প্রতিকার কি করেছে?’
‘স্যার অন্য কোন জায়গায় হলে বলতাম, প্রশাসন এর কাছে এসব ঘটনা আসেনি, প্রশাসন কি করবে? কিন্তু এ কথা আপনার কাছে বলতে পারি না। আসলে প্রশাসন দেখেও না দেখার ভান করেছে। এ না করে উপায়ও ছিল না।’
‘একথা কি আসলেই সত্য?’
‘স্যার, আমাদের দলে ও সরকারে ওরা সংখ্যা গরিষ্ঠ নয়, কিন্তু প্রভাব-প্রতিপত্তির দিক দিয়ে নিরঙ্কুশ। তাছাড়া দেশের খ্রিস্টান এনজিও এবং সংস্থা-সংগঠনসমূহ গ্রাম ও শহরের অধিকাংশ ভোট নিয়ন্ত্রণ করেছে। সুতরাং এরা যা চায়, সরকার এবং দল তার বাইরে যেতে পারে না। দ্বিতীয়ত, বাইরের দাতা দেশ ও সংস্থা গুলো প্রায় সবই খ্রিস্টান। তারা খ্রিস্টান এনজিও ও সংস্থাগুলোকেই বেশি বিশ্বাস করে। সুতরাং সরকার ঘরে বাইরে সব দিকে থেকেই অব্যাহত চাপের শিকার, যা উপেক্ষা করার সাধ্য সরকারের নেই।’
‘এ সবের কিছু কিছু আমিও জানি। কিন্তু এখন ঐ পশ্চিমা দাতা দেশগুলো এবং তাদের সংস্থা-সংগঠনগুলোই তো মানবাধিকার এর স্লোগান তুলে সরকারের উপর চড়াও হবে। যে কারন আপনি শুরুতেই সরকারের ইজ্জতের ভয় করেছেন।’
‘না, পশ্চিম এর সবাই এটা নিয়ে হৈচৈ করবেনা। দেখুন না আমেরিকার ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে বোমা পড়ল। তাতে কয়েকজন লোক মারা গেল, কিন্তু গায়ে কোন আঁচড় পড়ল না বিল্ডিং এর। এটা নিয়ে কি হৈচৈ। ঘটা করে অপরাধীর বিচার হল, শাস্তি হল। কিন্তু সেই আমেরিকায় ওকলাহোমার সিটি সেন্টারে বোমা পড়ল। লোক নিহত হল প্রায় শ-এর কাছাকাছি। বিল্ডিং এমন ক্ষতিগ্রস্ত হল যে, বহুতল বিশিষ্ট বিল্ডিং ধ্বসিয়ে দিতে হল। কিন্তু ঘটনার ঘটা করে তদন্তও হল না। ঢাক-ঢোল পিটিয়ে বিচারও হল না। এরকমটা কেন হল? কারন ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের ঘটনায় আসামি ছিল মুসলমান এবং ওকলাহোমার ঘটনায় আসামি ছিল খ্রিস্টান। আমাদের ক্ষেত্রেও এটাই ঘটবে। কথা, সমালোচনা কিছু হবে না তা নয়, কিন্তু সেটা হবে অনেকটা লোক দেখানো। তবে ভয় হল মুসলিম দেশগুলোকে নিয়ে। তারা অথবা তাদের সংস্থা-সংগঠনগুলো বিরাট রকমের হৈচৈ করবে। বিষয়টা জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনে উঠবে এবং জাতিসংঘের উদ্বাস্তু কমিশনও সক্রিয় হয়ে উঠবে। তাদের সাথে সাথে ইসলামি সম্মেলন সংস্থার প্রতিনিধিরাও ক্যামেরুনে ছুটে আসবে। আমি আমাদের বেইজ্জতির কথা বলেছি এসব ভেবেই।’
‘এই পরিস্থিতিতে কি ভাবছেন? দুটো বিষয় এখন আমাদের সামনে। একটা দক্ষিণ ক্যামেরুন থেকে মুসলিম উচ্ছেদের বিরাট অভিযোগ। অন্যটি ওমর বায়ার পরিবার সম্পর্কিত ঘটনা।’
‘আমাদের মাথা কিছু ঘামাতে হবে প্রথম বিষয়টা নিয়ে। ওমর বায়ার পরিবারের ব্যাপারটা ওরা রিপোর্টে বললেও আমাদের সামনে নেই। এব্যাপারে বন্দী হিসেবে কেউ আমাদের কাছে আসছে না। সুতরাং ঐ ব্যাপারে আমরা চুপ থাকতে পারি স্যার।’
চীফ জাস্টিস ওসাম বাইক একবার ভাবল, ওমর বায়ার ঘটনা ল’সেক্রেটারি লাউস মেইডিকে বলেই ফেলি। কিন্তু পরক্ষনেই তার মনে হল, এ নিয়ে সরকারিভাবে কোন তৎপরতা শুরু হলে ওরা ডঃ ডিফরজিসকে মেরেই ফেলবে। প্রশাসন শুধু হৈচৈ ছাড়া তাকে উদ্ধারের কিছুই করতে পারবে না। তার কাছে এখন ডঃ ডিফরজিসের উদ্ধারই সবচেয়ে বড়।
‘প্রথম বিষয়টা নিয়ে এখন কি করার আছে?’
‘প্রতিকারমূলক কিছু করার সুযোগ আমাদের কমই আছে। ইচ্ছা করলে কিছু করতে পারে কোক এবং অন্যান্য খ্রিষ্টান সংস্থাগুলো। আমরা উদ্বাস্তু সম্পর্কিত অভিযোগের খোঁজ-খবর নিতে পারি, ভুমি রেজিস্ট্রি রেকর্ড আমরা চেক করতে পারি এবং বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে সরেজমিনে তদন্ত করতে পারি, অভিযোগ শুনতে পারি।’
‘তাছাড়া বিভিন্ন থানায় মুসলমানদের অভিযোগগুলোর খোঁজ-খবর নিয়ে দেখা যেতে পারে।’
‘জি স্যার, এটাও আমরা পারি।’
‘আমার মনে হয়, এসব যদি আমরা করি, কোকসহ খ্রিষ্টান এনজিও এবং মিশনারিদের উপর একটা চাপ পড়বে। তারা এ ব্যাপারে আমাদের দোষ দিতে পারবে না। কারন তারা বুঝবে আমরা চাপে পড়ে করছি। অন্য দিকে এসব করে আমরা জাতিসংঘ ও মুসলিম দেশগুলোকেও একটা বুঝ দিতে পারবো।’
‘ঠিক বলেছেন স্যার।’
বলে লাউস মেইডী হাতের ঘড়ি দেখল। তারপর বলল, ‘স্যার আজকের মত উঠি।’
‘ঠিক আছে। খুব খুশি হলাম আপনি এসেছেন।’
দু’জনেই উঠে দাঁড়াল।
ল’সেক্রেটারি লাউস মেইডিকে বিদায় দিয়ে চীফ জাস্টিস উসাম বাইক এসে তার স্টাডিতে ঢুকলেন। বসলেন পড়ার টেবিলে।
ঠিক এসময়েই তার টেলিফোন বেজে উঠল। কর্ডলেস টেলিফোন হাতে তুলে নিলেন তিনি।
টেলিফোনে পার্সোনাল সেক্রেটারির কণ্ঠ পেয়ে তিনি বললেন, ‘বল’।
‘স্যার, ফ্রান্স থেকে আসা সেই লোকটি কথা বলতে চায়।’ বলল চীফ জাস্টিসের পার্সোনাল সেক্রেটারি।
‘দাও লাইন।’
‘গুড ইভেনিং। আমি পিয়েরে পল মাই লর্ড। সেদিন আপনার বাসায় গিয়ে কথা বলেছিলাম।’
‘গুড ইভেনিং। বলুন।’
‘মাই লর্ড, আমি জানতে চাচ্ছি, আমরা কবে আমাদের কাজটা শেষ করতে পারি।’
‘FWTV আজ ক্যমেরুন এর উপর যে ফিচার নিউজ প্রচার করেছে, সেটা দেখেছেন?’
‘ইয়েস মাই লর্ড।’
‘এই নিউজে আমাকে, আমার আদালতকে টার্গেট করা হয়েছে বুঝতে পেরেছেন?’
‘কিন্তু তার চেয়ে বড় টার্গেট করা হয়েছে আমাদের।’
‘স্বার্থের কারনে সেটা আপনারা বরদাশত করতে পারছেন।’
‘মাই লর্ড স্বার্থ আমাদের নয়, স্বার্থ প্রভু খ্রিষ্টের, তাই সবার।’
‘আমি তর্ক করব না। তারপর বলুন।’
‘মাই লর্ড আমি বলেছি। কাজটা আমরা তাড়াতাড়ি শেষ করতে চাই। ডেটটা কবে হতে পারে?’
‘FWTV এর আজকের নিউজের পর সত্তর কিছু করা যাবে না। অপেক্ষা করতে হবে।’ ‘কিন্তু আপনার পিতা ডঃডিফরজিসের মুক্তি তাতে বিলম্বিত হবে। তাছাড়া অনির্দিষ্ট ভাবে তাকে এইভাবে আমরা রাখতে চাই না। হয় আপনি তাড়াতাড়ি তাকে মুক্ত করবেন। না হলে আমরা তাকে দুনিয়া থেকে বিদায় দিয়ে মুক্ত হবো।’
পিয়েরে পলের কথা শুনে কেঁপে উঠল চীফ জাস্টিস উসাম বাইকের হৃদয়। নিজেকে একটু সামলে নিয়ে বলল, ‘তার ক্ষতি করে আপনারা কি লাভ করবেন?’
‘লাভ করার পথ বের করব। দেখুন, আপনি অত্যন্ত সম্মনিত বাক্তি। কিন্তু আমাদের লক্ষ্য অর্জনে আপনি বাঁধা দিলে সব ধরনের অসম্মানের কাজ আমরা করতে পারবো।’
আবার বুকটা কেঁপে উঠল চীফ জাস্টিসের। তার বুঝতে বাকি রইলনা পিয়েরে পল কি বলতে চাচ্ছে।
চীফ জাস্টিসের উত্তর দিতে একটু দেরি হল। কথা বলল আবার পিয়েরে পলই। বলল, ‘আমাদের উদ্দেশ্য সাধনের মাধ্যম হিসেবে এক ডঃ ডিফরজিস নয়, শত ডঃ ডিফরজিসকে কিডন্যাপ করতে পারি। আমার অনুরোধ মাই লর্ড, আপনি FWTV কি বলল সেটা একদম ভুলে যান।’
‘আমি ভুলে গেলেই তো বিষয়টা মিথ্যা হয়ে যাবে না। কিংবা যারা ওটা করিয়েছে তারা বসে যাবে না।’
‘ওসব নিয়ে আমাদের বিন্দুমাত্র চিন্তা নেই মাই লর্ড। আমাদের সমস্যা আপনি, আপনি ঠিক হয়ে গেলে আর কোন চিন্তা নেই।’
একটু থামল পিয়েরে পল। একটা ঢোঁক গেলার জন্য। পরক্ষনেই আবার শুরু করল, ‘কথা আর বাড়াতে চাই নি মাই লর্ড। আমরা কাজ শুরু করে দিচ্ছি। আমাদের লোকরা ওমর বায়ার পক্ষ থেকে তার মামলা প্রত্যাহার এবং উইল বাতিলের একটা দরখাস্ত দেবে। আমরা চাই আপনি সত্তর একটা ডেট দেবেন।’
কথা শেষ করে ‘থ্যাংস মাই লর্ড’ বলে চীফ জাস্টিসকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে টেলিফোন রেখে দিল।
অপমানে-উদ্বেগে পাথরের মত হয়ে গেলেন চীফ জাস্টিস।
টেলিফোনটা কানে যেভাবে ধরেছিল, সেভাবেই ধরে থাকল। চোখে-মুখে অসহনীয় অপমান ও প্রবল উদ্বেগের কালোছায়া।
চীফ জাস্টিসের মেয়ে রোসেলিন ঘরে প্রবেশ করল। সে তার পিতাকে দেখে ভীত হয়ে পড়ল।
সে দ্রুত এগিয়ে তার পিতার কাঁধে হাত রাখল। ডাকল, ‘আব্বা।’
চীফ জাস্টিসের হাত থেকে টেলিফোনটা পড়ে গেল। চমকে উঠে নড়ে-চড়ে বসল চীফ জাস্টিস উসাম বাইক।
রোসেলিন টেলিফোনটা মেঝে থেকে তুলে নিয়ে বলল, ‘তোমার কি হয়েছে আব্বা? অসুস্থ বোধ করছ?’ রোসেলিনের চোখে-মুখে উদ্বেগ।
চীফ জাস্টিস হাসতে চেষ্টা করে বলল, ‘না মা আমি ভাল আছি।’
‘তাহলে নিশ্চয় তুমি খারাপ টেলিফোন পেয়েছো?’
‘হ্যাঁ মা।’
‘সত্যি? কি সেটা? কোত্থেকে?’ আবার উদ্বেগ ঝরে পড়ল রোসেলিনের কন্ঠে।
মেয়েকে কাছে টেনে নিয়ে আদর করে বলল, ‘কত রকম কেস করি মা। তুমি এসব নিয়ে ভেব না।’
‘তুমি ভাববে, আর আমি ভাবব না?’
‘মেয়ের ভাবনা তো তার পিতারাই ভাবেন মা।’
‘তা ঠিক। কিন্তু অনেক ক্ষেত্র আছে যখন মেয়েরা ভাবনার কিছু অংশ পাওয়ার দাবী করতে পারে।’
‘তুমি একটা সহযোগিতা আমাকে করবে মা?’
‘সেটা কি?’
চীফ জাস্টিস মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, ‘তোমাকে একটু সাবধানে থাকতে হবে মা।’
‘কেমন সাবধানে?’
‘বাইরে একটু কম বেরুবে। বেরুলে রাতে বেরুবে না, সম্ভব হলে একা বেরুবে না। এই রকম।’
রোসেলিন পিতার দিকে তাকিয়ে উদ্বিগ্ন কন্ঠে বলল, ‘তুমি খারাপ কিছু আশংকা করছ? কিন্তু তোমার আমার তো কোন শত্রু নেই!’
‘বললাম তো। কত রকম কেসের সাথে আমি জড়িত। আমি কাউকে শত্রু না ভাবলেও, কেউ আমাকে তার স্বার্থের শত্রু ভাবতে পারে।’
‘বুঝেছি আব্বা।’ ম্লান কন্ঠে বলল রোসেলিন।
‘ভেবনা মা, সব ঠিক হয়ে যাবে।’
বলে একটু থামল চীফ জাস্টিস। তারপর বলল আবার, ‘মারিয়াদের সাথে এর মধ্যে কথা বলেছ? লাগাও তো টেলিফোন ওদের ওখানে। আমি মশিয়ে প্লাতিনির সাথে একটু কথা বলব।’
রোসেলিন বলল, ‘নাম্বারটা নিয়ে আসি আব্বা। আমি কালকেই কথা বলেছি মারিয়ার সাথে।’ বলে রোসেলিন ছুটে বেরিয়ে গেল স্টাডি রুম থেকে।

ইয়াউন্ডি বিশ্ববিদ্যালয়ের বোটানিক্যাল গার্ডেন।
ছোট, কিন্তু সুন্দর বাগানটি।
গোটা বাগান জুড়ে মাকড়সার জালের মত লাল সুড়কির রাস্তা। মাঝে মাঝে বেঞ্চ পাতা।
একটা বেঞ্চিতে বসে রোসেলিন, লায়লা ইয়েসুগো এবং ডোনা।
আজ বিশ্ববিদ্যালয় খুলেছে। রোসেলিন ডোনাকে নিয়ে এসেছে বিশ্ববিদ্যালয়ে।
তিনজন গল্প করছে।
ডোনা চোখ কপালে তুলে বলছিল, ‘বেনু নদীর তীরের গারুয়া শহর? সে তো আফ্রিকার বুকের গভীরে, চাদ হ্রদের তীরে প্রায়।’
‘প্রায় নয়, ‘লেক চাদ’-এর পশ্চিম তীর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল ইয়েসুগো রাজবংশের রাজত্ব।’ বলল লায়লা ইয়েসুগো।
‘কিন্তু আফ্রিকার এত গভীরে একটি মুসলিম রাজত্বের প্রতিষ্ঠা কিভাবে হলো?’ বলল ডোনা।
‘লেক চাদ-এর তীরে ইসলামকে দেখে বিস্মিত হচ্ছেন? আমাদের ক্যামেরুনের দক্ষিণে, গ্যাবনের পুবে কাম্পুর উত্তরাংশ যেখানে সভ্যতার কোন আলোই এখনও পড়েনি, সেই ‘এনডোকি’ এলাকাতে গেলেও ‘আল্লাহ’ এবং ‘মুহাম্মাদ (সঃ)’-এর নাম (যদিও ভাঙা উচ্চারণে) আপনি শুনতে পাবেন। আমাদের গারুয়া উপত্যকা তো ভাগ্যবান। নাইজেরিয়ার ‘লাগোস’ এবং ‘বেনু’ নদীর পথে এবং উত্তর নাইজেরিয়ার ঐতিহাসিক মুসলিম মহানগরী ‘কানো’ থেকে নদী ও সড়ক পথে ইসলাম এখানে পৌঁছেছে।’
‘যাই বলুন। যতই ভাবছি, ততই বিস্মিত হচ্ছি, কিভাবে আফ্রিকার এই গভীরে, অকল্পনীয় দুর্গম অঞ্চলে ইসলাম প্রবেশ করল। আমি জানি আফ্রিকার এই অঞ্চলে ইসলামের বড় ধরনের কোন সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তাহলে ইসলাম কিভাবে, কিসের জোরে পাহাড়-জংগল-নদীর দুর্গম গভীরে পথ করে নিল?’
‘আমাদের এই আফ্রিকা অঞ্চলে কোন সাম্রাজ্য বা রাষ্ট্রশক্তির দ্বারা তো নয়ই, এমনকি কোন মিশনারী সংগঠন বা পেশাদার মিশনারীদের দ্বারাও ইসলাম প্রচার হয়নি। স্ট্যানলি লেনপুলের বইতে আমি পড়েছি। ‘The Preaching of Islam’ বইতে তিনি বলেন, ‘ইসলাম প্রচারের জন্যে গঠিত কোন সংস্থা বা এই উদ্দেশ্যে তৈরী কোন প্রচারবিদের দ্বারা ইসলামের প্রচার কাজ পরিচালিত হয়নি। মুসলমানদের প্রত্যেকেই ছিলেন একজন করে সক্রিয় মিশনারী।’ বলল লায়লা ইয়েসুগো।
‘বিস্ময়টা আমার এই জন্যেই বেশী। এই অবস্থায় ইসলাম কি করে আফ্রিকার এই অঞ্চলে প্রবেশ করল।’ বলল ডোনা।
‘সেই কাহিনী লিখলে আমার মনে হয় পৃথিবীর বৃহত্তম মহাকাব্য রচিত হতো।’
বলে একটু দম নিল লায়লা। তারপর শুরু করল, ‘আরবী অশ্বারোহী সৈনিকের বিজয়ী পদক্ষেপ মরক্কো-মৌরতানিয়ায় এসে থেমে গিয়েছিল। আরও দক্ষিণে সেনেগালের বিজন জংগলে তারা প্রবেশ করেনি। পরবর্তীকালে সেনেগালের উপকূল ধরে ইসলামের যাত্রা শুরু হয় মুসলমানদের ব্যক্তিগত উদ্যোগের আকারে। সুদান ও লিবিয়ার মরুভূমি পাড়ি দিয়ে বাণিজ্য-কাফেলার পথ ধরে যেভাবে স্থলপথে ইসলামের দক্ষিণ মুখী যাত্রা শুরু হয়, সেভাবে সেনেগাল থেকে উপকূলের পথ ধরে ইসলাম দক্ষিণ দিকে বিস্তৃত হতে থাকে। সেনেগাল থেকে গাম্বিয়া, গাম্বিয়া থেকে গিনি বিসাউ, গিনি, তারপর সিয়েরা লিওন- এভাবে ধীরে ও নিরবে ইসলাম অগ্রসর হয়েছে এক জনপদ থেকে আরেক জনপদে, এক দেশ থেকে আরেক দেশে।’
একটু থামল লায়লা ইয়েসুগো। একটু নড়ে বসল। তারপর বলল, ‘ব্যক্তি উদ্যোগে ইসলামের এই প্রচার কত যে অমর ঘটনা, কত যে অপরূপ কাহিনী এবং অশ্রু ভেজা কত যে গাঁথা সৃষ্টি করে। কিন্তু সবই হারিয়ে গেছে, তার সাথে হারিয়ে গেছে সংখ্যাহীন ত্যাগী মানুষের উজ্জ্বল জীবনচিত্র। আপনার মত আমারও ইচ্ছা করত এসব জানবার। অনেক বই ঘাটাঘাটি করেছি আমাদের ঐ মহান অতীতকে জানার জন্যে। যা পেয়েছি তা সামান্য ইংগিতমাত্র।’
‘সেটা কেমন?’ বলল ডোনা।
‘মুসলমানরা যখনই এ অঞ্চলে কোন নতুন ভূখন্ডে এসেছে ব্যবসার উদ্দেশ্যে কিংবা বসবাসের জন্যে, তারা প্রথমেই গেছে স্থানীয় গোত্র সরদারের কাছে। আবেদন করেছে তাদের প্রার্থনা গৃহ (মসজিদ) তৈরীর অনুমতি দানের। এইভাবে তারা মসজিদ গড়েছে, স্কুল তৈরী করেছে। শীঘ্রই তাদের সততা ও নিষ্ঠা এবং উন্নত সাংস্কৃতিক আচার-ব্যবহার স্থানীয় বিধর্মী নিগ্রোদের অভিভুত করেছে।’ এই কথাগুলো লিখেছেন, ‘Islam and Mission’ বইতে একজন ইউরোপীয় ঐতিহাসিক। আর ‘Rise of British West Africa’ বইতে জর্জ ক্লাউডে যে বিবরণ দিয়েছেন তা হলোঃ ‘মুসলমানদের স্কুলগুলো ছিল স্থানীয় আফ্রিকানদের জন্যে বিস্ময়কর। স্কুলে যে সব বিষয় ও আচার-ব্যবহার শিক্ষা দেয়া হতো, তা মুগ্ধ ও অভিভুত করত তাদেরকে। আফ্রিকান ছাত্ররা এই শিক্ষা ও আচার-ব্যবহার ছড়িয়ে দিত, এখান থেকে সেখানে, এক এলাকা থেকে আরেক এলাকায়। ইসলামের মেসেজ ছড়িয়ে পড়ে তার সাথে। ইসলামের আরও দু’টি বিষয় আফ্রিকার নিগ্রোদের সম্মোহিত করে। তার একটি হলো দাস ব্যবসার প্রতি মুসলমানদের বিরোধিতা। অন্যটি হলো আইন-শৃংখলার প্রতি মুসলমানদের গুরুত্ব দান। সে সময় উপকূল জুড়ে ছিল প্রচন্ড নৈরাজ্য। যার কারণে আফ্রিকান নিগ্রোরা তাদের উপকূল থেকে সব সময় দূরে থাকতে চেষ্টা করতো। মুসলমানরা যেখানেই গেছে এবং কিছুটা শক্তি অর্জন করতে পেরেছে, সেখানেই তারা শান্তি প্রতিষ্ঠা করেছে এবং মানুষের নিরাপত্তা বিধান করেছে। এর ফলে নিগ্রো মানুষেরা ছুটে এসেছে শান্তি ও স্বস্তির সন্ধান পেয়ে। এভাবে মুসলমানদের ইমেজ বিধর্মী নিগ্রোদের মধ্যে এতটাই বেড়ে যায় যে গোত্র সর্দাররা মুসলমান না হয়েও মুসলিম নাম গ্রহণ করতে গৌরব বোধ করত। নাম গ্রহণ করার সাথে সাথে তারা ইসলামও গ্রহণ করে বসতো। আফ্রিকার পশ্চিম উপকূলের শ্রেষ্ঠ নিগ্রো গোত্রগুলো যেমন ‘ফুলবি’, ‘ম্যানডিংগো’, ‘হাউসা’ এবং ‘ফুলানি’ ইসলামের ছায়ায় আশ্রয় নেয় এইভাবে।’
থামল লায়লা ইয়েসুগো।
‘চমৎকার। বিস্ময়কর ইতিহাস।’ বলল ডোনা।
‘পশ্চিমা ঐতিহাসিক ‘ব্লাডেন’ এবং ‘ওয়াস্টারম্যান’ কি বলেছেন জানেন? বলেছেন, সেনেগাল এবং নাইজেরিয়ার উপকূল পর্যন্ত দু’হাজার মাইল উপকূল রেখায় এমন কোন শহর দেখা যেত না যা মসজিদের গম্বুজে শোভিত ছিল না। এই বিপ্লব সংঘটিত হয় উনিশ ও বিশ শতকে এবং গিজ গিজ করা খৃস্টান মিশনারীদের চোখের সামনেই।’
‘কি সর্বনাশা, এই বিপ্লব উনিশ-বিশ শতকের? পশ্চিমা আধিপত্যের কালে?’
‘অবশ্যই। আপনি শুনে বিস্মিত হবেন, উনিশ ও বিশ শতকের মাঝা-মাঝি সময় পর্যন্ত, মুসলমানদের রাজনৈতিক সৌভাগ্য সূর্য যখন অস্তমিত, যখন অধিকাংশ মুসলিম দেশ দুর্ভাগ্যের অন্ধকারে নিমজ্জিত, ঠিক তখনই আফ্রিকার এই অঞ্চলে কালো মানুষদের জীবনে সৌভাগ্য সূর্য দীপ্ত হয়ে উঠে। ইসলাম এই সময় কত দ্রুত বিস্তার লাভ করে তার একটা হিসেব দিচ্ছিঃ

দেশের নাম — উনিশ শতকের পূর্ব পর্যন্ত মুসলিম জনসংখ্যার হার — বিশ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত মুসলিম জনসংখ্যার হার
সেনেগাল — ৪০% — ৯৫%
গিনি বিসাউ — ৩০% — ৮০%
গিনি — ১৫% — ৬৫%
সিয়েরা লিওন — ১০% — ৮০%
লাইবেরিয়া — ৫% — ৪৫%
আইভরি কোস্ট — ৫% — ৫৫%
ঘানা — ২% — ৪৫%
টোগো — ৩% — ৫৫%
বেনিন — ০% — ১১%
নাইজেরিয়া — ৩০% — ৬৫%
ক্যামেরুন — ১% — ৫৫%

এই হিসেবে দেখা যাবে, উনিশ ও বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে সেনেগানল থেকে ক্যামরুন উপকূল পর্যন্ত একটা বিপ্লব ঘটে গেছে।’
‘কিন্তু কেন, কিভাবে?’ বলল ডোনা।
লায়লা ইয়েসুগো মুখ খোলার আগেই কথা বলে উঠল রোসেলিন। বলল, ‘আমার মনে হয় এর সবচেয়ে বড় কারণ হলো, পশ্চিমীরা এ সময় নিগ্রোদেরকে পশুতে পরিণত করেছিল দাস ব্যবসায়ের মাধ্যমে আর ইসলাম এসেছিল তাদেরকে মানুষের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করতে। আরেকটা কারণ হলো, যেটা লায়লা বলল, মুসলমানদের চরিত্র মাধুর্য এবং শান্তিপ্রিয়তা।’
‘কি রোসেলিন, তুমি খৃষ্টানদের বদনাম করছ আর মুসলমানদের প্রশংসা করছ তোমার মুখে?’ মুখ টিপে হেসে বলল ডোনা।
‘করবে না? রাশিদি ইয়েসুগো মুসলমান না?’ বলল লায়লা দুষ্টুমি হেসে।
‘তোমার মুহাম্মদ ইয়েকিনির কথা কেউ জানে না বুঝি?’
‘ঠিক আছে। সবাই জানুক। আমি তো অস্বীকার করছি না।’ বলল লায়লা।
‘মুহাম্মদ ইয়েকিনি কে রোসেলিন?’ বলল ডোনা।
‘ইয়াউন্ডি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। কুন্তে কুম্বায় বাড়ি।’
এ সময় ওরা তাদের পেছন থেকে কাশির আওয়াজ পেল।
ফিরে তাকাল তিনজনেই।
একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে রাশিদি ইয়েসুগো।
রাশিদি ইয়েসুগোর দিকে ইংগিত করে লায়লা ডোনাকে বলল, ‘আমার ভাই রাশিদি ইয়েসুগো।’
বলেই লায়লা উঠে দাঁড়াল। বলল, ‘তোমরা একটু বস। আমি আসছি।’
লায়লা ছুটলো রাশিদির দিকে। সেখানে পৌছে বলল, ‘কিছু বলবে ভাইয়া?’
‘রোসেলিনকে একটু দরকার। কিন্তু নতুন মেয়েটা কে? এ বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন কেউ নাকি?’ কিন্তু মাথায় ওড়না কেন?’
‘বিশ্ববিদ্যালয়ের কেউ না ভাইয়া। ও ফ্রান্সের মেয়ে। কিন্তু মুসলমান। নাম মারিয়া। এখানকার ফরাসি রাষ্ট্রদূতের মেহমান। ওঁর আব্বাসহ বেড়াতে এসেছেন।’
‘মুসলমান জেনে খুশী হলাম। কিন্তু শোন, আহমদ মুসা সম্পর্কে একটি কথাও ওঁকে কিংবা রোসেলিনকে এক কথায় বাইরের কাউকেই বলবে না।’
‘এটা আমি জানি।’
বলে একটু থেমেই আবার বলল, ‘চল ওঁর সাথে তোমার পরিচয় করিয়ে দেই।’
‘না উনি কিছু মনে করতে পারেন। পর্দা করেন মনে হচ্ছে।’
‘ঠিক আছে। একটু দাঁড়াও। রোসেলিনকে পাঠাচ্ছি।’ বলে এক দৌড়ে ফিরে গেল।
লায়লা রোসেলিনের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গম্ভীর কন্ঠে বলল, ‘রোসেলিন, যাও ভাইয়ার হুকুম।’
‘কি হুকুম? কোথায় যাব?’ বলল রোসেলিন।
‘ভাইয়া তোমাকে ডাকছেন।’
‘আমি কেন যাব। উনি তো আসতে পারেন।’
‘আসবেন না। আমি মারিয়া আপার কথা ভাইয়াকে বলেছি। আমি পরিচয় করিয়ে দেয়ার জন্যে আসতে বললে তিনি বললেন, মারিয়া নিশ্চয় এটা ভালোভাবে নিবেন না।’
‘কেন?’ বলল রোসেলিন।
‘কারণ, মারিয়া আপার গায়ে আমার মত চাদর দেখেই ভাইয়া বুঝেছেন মারিয়া পর্দা করেন।’
‘বুঝেছি।’ বলে উঠে দাঁড়াল রোসেলিন।
ধীরে ধীরে সে গিয়ে দাঁড়াল রাশিদি ইয়েসুগোর সামনে। বলল, ‘বল তোমার এত জরুরী বিষয়টা কি?’
‘আমি দুঃখিত রোসেলিন, তোমাদের জমজমাট গল্পের আসরে ছেদ টানার জন্যে। কিন্তু আমি কি জরুরী বিষয় ছাড়া তোমাকে ডাকতে পারি না।’
‘কোন দিন ডাক না। তুমি আমাকে এড়িয়ে চলতেই ভালবাস। ভাই বলছিলাম।’
‘এড়িয়ে চলি কথাটা ঠিক নয় রোসেলিন। কারণ এর মধ্যে উপেক্ষার ভাব আছে। তুমি কি বলতে পার আমি তোমাকে উপেক্ষা করি?’
‘না সেটা অবশ্যই নয়। কিন্তু তোমার আলগা চলার হেতু কি? সেদিন দেখ ডিপার্টমেন্টাল পিকনিকে সবাই কিভাবে সময় কাটাল, আর আমি-তুমি কিভাবে সময় কাটালাম। প্রায় সকলেই যখন জোড়ায় জোড়ায় ঘুরে বেড়িয়েছে, তখন তুমি তাঁবুর পাশে গাছতলায় বসে বই পড়ে সময় কাটিয়েছ, আর আমি একটু দূরে একটা ঝোপের পাশে বসে তোমার দিকে তাকিয়ে সময় কাটিয়েছি। আমার কান্না পাচ্ছিল। কেন তুমি এমন নিষ্ঠুরতা কর?’ আবেগে কাঁপল রোসেলিনের গলা।
রাশিদি ইয়েসুগো একটু হাসার চেষ্টা করল। বলল, ‘তুমি ব্যথা পেয়েছ। আমি দুঃখিত রোসেলিন। তোমার কোন কষ্ট আমাকেও কষ্ট দেয়।’
রাশিদি ইয়েসুগো একটু থামল। গম্ভীর হয়ে উঠল তার মুখ। বলল, ‘কিন্তু সমস্যা হলো রোসেলিন, আমাদের ধর্ম ইসলাম বিবাহ-পূর্ব এ ধরনের অবাধ মেলামেশার সুযোগ দেয় না এবং এই না দেয়াটা সবদিক থেকে যুক্তিসংগত।’
‘আমি জানি রাশিদি। আমার ভালো লাগে তোমাদের এই কালচার। কিন্তু ভুলে যাই, যখন হৃদয়ের এক সাগর অবুঝ তৃষ্ণা উন্মুখ হয়ে ওঠে।’
একটু থামল রোসেলিন। তারপর মুখে এক টুকরো হাসি টেনে বলল, ‘বল, কি বলতে ডেকেছ?’
রাশিদি ইয়েসুগো হেসে বলল, ‘তেমন কিছু না। বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধ গেল। কেমন ছিলে তাই জানতে চাচ্ছিলাম।’
‘ভালই ছিলাম। তবে আমার বাইরে বেরুনোর ব্যাপার নিয়ে মনে হচ্ছে আব্বা খুব চিন্তিত।’
‘কেন? তিনি কিছু বলেছেন?’
‘আমাকে একটু সাবধানে থাকতে বলেছেন। একা একা আমাকে বাইরে বেরুতে বলা যায় নিষেধ করেছেন। দেখ না আজ আমার নতুন বান্ধবী মারিয়াকে নিয়ে এসেছি!’
‘কারণ কি?’
‘আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম। উত্তরে বলেছেন, সময় ভালো যাচ্ছে না তো তাই।’
‘কিন্তু তেমন খারাপ কিছু তো দেখা যাচ্ছে না। তোমাদের পারিবারিক কিংবা কোর্টের কোন ঘটনার কারণে কোনো অসুবিধা নেই তো?’
‘না, পারিবারিক কোন সমস্যা নেই। তবে আব্বা কারণ সম্পর্কে বলতে গিয়ে এ কথাও বলেছিলেন যে, তাকে কত রকম বিচারের সাথে জড়িত থাকতে হয়, বিচারে কত মানুষের কত স্বার্থের হানি ঘটে।’
রোসেলিনের শেষ কথায় রাশিদির মনকে চঞ্চল করে তুলল। সে ভাবল, পিয়েরে পল কিংবা তার লোকেরা চীফ জাস্টিসের সাথে তাহলে অবশ্যই যোগাযোগ করেছে। চীফ জাস্টিসের মত কি, প্রতিক্রিয়া কি তা জানার জন্যে তার মন আকুলি-বিকুলি করে উঠল। কিন্তু জানার উপায় নেই। বুঝা যাচ্ছে, রোসেলিনও কিছু জানে না। অবশ্য জানার কথাও নয়। চীফ জাস্টিস তার মেয়ের সাথে এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা করবেন তা স্বাভাবিক নয়। যাক তবু এটুকু জানা গেল যে, পিয়েরে পলরা চীফ জাস্টিসের সাথে যোগাযোগ করেছে। এ খবরটা আহমদ মুসাকে এখনই জানানো দরকার। খুশী হলো রাশিদি ইয়েসুগো, আহমদ মুসার প্রথম এ্যাসাইনমেন্ট পুরো না হলেও কিছুটা সমাধা করতে পেরেছে।
রোসেলিনই আবার কথা বলল, ‘মনে হচ্ছে তুমি কিছু ভাবছ?’
‘হ্যাঁ। তুমি তো একটা খারাপ খবর শোনালে।’
‘এ নিয়ে তুমি ভেব না। আমিও ভাবছি না।’
‘কিন্তু তোমার সাবধান থাকা দরকার।’
‘না থাকলে তোমার কোন ক্ষতি হবে?’ মুখ টিপে হেসে বলল রোসেলিন।
‘না, কিছু ক্ষতি হবে না।’ রাশিদিও হেসে জবাব দিল।
‘জান, কেউ আমাকে নিয়ে ভাবলে আমার খুব ভালো লাগে।’
‘এই ‘কেউ’ একজন না বহুজন?’
‘বলব না।’ হাসি চাপতে চাপতে বলল রোসেলিন।
কথা শেষ করেই ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল, ‘আসি। ওদিকে লায়লা দুষ্টটা কত গল্প ফাঁদছে কে জানে।’
বলে দৌড় দিলে রোসেলিন।

আহমদ মুসা, রাশিদি ইয়েসুগো এবং মুহাম্মদ ইয়েকিনি যখন সুপ্রীম কোর্ট ভবনে পৌঁছল, তখন বেলা ১১ টা।
কোর্ট ভবনে নেমে আহমদ মুসা চীফ জাস্টিসের এজলাসের দিকে এগুলো। উদ্দেশ্য চীফ জাস্টিসকে একনজর দেখা। তবে তাদের লক্ষ্য চীফ জাস্টিসের রেজিস্টার অফিসে গিয়ে খোঁজ-খবর নেয়া।
রাশিদি ইয়েসুগোর কাছে রোসেলিনের কথা শুনেই আহমদ মুসা নিশ্চিত হয়েছিল পিয়েরে পলরা চীফ জাস্টিসের সাথে যোগাযোগ করেছে। কিন্তু এই যোগাযোগের ফলাফলটা যে কি তা রোসেলিনের কথায় বুঝা যায়নি, তবে চীফ জাস্টিস তার মেয়ের চলাচলে সাবধানতা অবলম্বন করায় বুঝা গেছে তিনি পিয়েরে পলদেরকে ভয় করছেন। কিন্তু ভয়টা পিয়েরে পলদের প্রস্তাব প্রত্যাখান করা জনিত, না এটা কোন বাড়তি সাবধানতা তা পরিস্কার হয়নি। তবে আহমদ মুসা খুশী রোসেলিন রাশিদিদের পরিচিত হওয়ায়। প্রয়োজনে চীফ জাস্টিসের সাথে যোগাযোগের একটা মাধ্যম সে হতে পারে। আহমদ মুসার মনে প্রশ্ন জাগল, রোসেলিন ও রাশিদি ইয়েসুগোর মধ্যে প্রেম আছে এটা চীফ জাস্টিস জানেন কিনা? তিনি যদি মেয়ের এ সম্পর্ককে গ্রহণ করতেন, তাহলে বড় একটা লাভ হতো। চীফ জাস্টিস মুসলমানদের ভালবাসতেন।
আহমদ মুসা, রাশিদি ইয়েসুগো এবং মুহাম্মদ ইয়েকিনি পাশাপাশি হাঁটছিল। আহমদ মুসা রাশিদি ইয়েসুগোর দিকে মুখ ফিরিয়ে জিজ্ঞেস করল, রাশিদি তোমার রোসেলিনের সম্পর্কের ব্যাপারটা চীফ জাস্টিস সাহেব জানেন?
প্রশ্ন শুনে রাশিদির চোখে-মুখে লজ্জার একটা আবরণ নেমে এল। রাশিদির ঠোঁটে এক টুকরো লজ্জা-পীড়িত হাসি ফুটে উঠল। বলল, ‘না উনি জানেন না।’
‘জানলে তার প্রতিক্রিয়া কি হবে তুমি অনুমান করতে পার?’
‘রোসেলিন বলে, ইয়েসুগো রাজ-পরিবার সম্পর্কে চীফ জাস্টিসের খুব সুধারণা আছে। এ ব্যাপারটা আমিও জানি। ‘ইয়েসুগো রাজ পরিবার বনাম রাষ্ট্র’ শীর্ষক একটা বড় মামলায় রায় দিয়েছিল হাইকোর্ট বছর পাঁচেক আগে। রায়টা এসেছিল ইয়েসুগো রাজ পরিবারের পক্ষে। এই রায়ের ফলে গারুয়া উপত্যকায় বেনু নদী তীরের বিশাল এলাকা ইয়েসুগো রাজ পরিবার ফিরে পেয়েছে। হাইকোর্টের যে বেঞ্চ এই রায় দিয়েছিল, সে বেঞ্চের চেয়ারম্যান ছিলেন বর্তমান চীফ জাস্টিস। তবে রোসেলিন বলেছে, একটা মুসলিম পরিবারে নিজের মেয়েকে বিয়ে দেয়ার ব্যাপারটা চীফ জাস্টিস হয়তো সহজভাবে নেবেন না।’
‘এটা স্বাভাবিক।’
চীফ জাস্টিসের এজলাসের দরজায় পৌঁছে গিয়েছিল আহমদ মুসা।
চীফ জাস্টিস তাঁর বেঞ্চসহ এজলাসে।
ক্যামেরুনে সুপ্রীম কোর্টে ‘ওয়ানম্যান বেঞ্চ’ বেঞ্চে বসে। জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ কোন বিষয়েই শুধু ফুল বেঞ্চ গঠিত হয়। আজ ফুল বেঞ্চ বসেছে। শাসনতান্ত্রিক একটা বিষয়ে তাদের রায় দিতে হবে।
প্রধান বিচারপতিকে চিনিয়ে দিল রাশিদি ইয়েসুগো। রঙে খাস আফ্রিকান নিগ্রো, চেহারায় নয়।
‘ওঁর স্ত্রী বোধ হয় ইউরোপীয়?’
‘হ্যাঁ, ওঁর স্ত্রী ফরাসী। কেন বলছেন এ কথা?’ জিজ্ঞেস করল রাশিদি।
‘রোসেলিনের যে বিবরণ তোমার কাছে শুনেছি, তাতে তার মা অবশ্যই শ্বেতাংগ বা নন-আফ্রিকান হবেন।’
কথা শেষ করেই আবার আহমদ মুসা বলল, চল রেজিস্ট্রার অফিসে যাওয়া যাক।
বেরিয়ে এল তারা চীফ জাস্টিসের কোর্ট রুম থেকে।
রেজিস্ট্রার অফিসে প্রবেশ করল তারা।
ওয়েটিং রুমে গিয়ে বসল।
বসেই রাশিদি ইয়েসুগো আহমদ মুসাকে ফিস ফিস করে বললো, ‘ভাইয়া রিট সেকশনে ‘ক্যামেরুন ক্রিসেন্ট’-এর একজন ভাই আছেন। একজন সেকশন অফিসার সে। আমরা তার সাহায্য নিতে পারি না?’
‘অবশ্যই পার।’
‘তাহলে তার সাথে গিয়ে আলোচনা করি। তার সময় হলে তাকে নিয়ে আসি?’
‘হ্যাঁ, যাও।’
‘তাহলে আমি ও ইয়েকিনি একটু ঘুরে আসি। আপনি একটু বসুন।’ উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল রাশিদি।
বেরিয়ে গেল ওরা দু’জন ওয়েটিং রুম থেকে।
ওয়েটিং রুমে বসেছিল আরও দু’জন। আহমদ মুসার পাশের সোফাতেই।
সামনে লম্বা একটা টিপয়।
টিপয়ের উপর কয়েকটা ম্যাগাজিন।
আহমদ মুসার পাশের দু’জন কৃষ্ণাংগ। বয়সে যুবক। একজন আহমদ মুসার কিছু বড় হবে, আরেকজন সমান সমান। আহমদ মুসার পাশে বসা লোকটির হাতে একটা কলম। সে কলমটা দিয়ে একটা ম্যাগাজিনের মলাটে লিখছিল, আঁচড় কাটছিল। দেখলেই বুঝা যায় সে উদ্দেশ্যহীন ভাবে এটা করছে। যেন সময় কাটাচ্ছে সে।
আহম্মদ মুসারও করার কিছু ছিল না। গল্প করার মত দু’জন ছিল, তাও চলে গেল।
আহমদ মুসা পাশের লোক দু’জনের দিকে তাকাল। তাদের দিকে তাকিয়ে চোখ সরিয়ে নিতে পারল না আহমদ মুসা। হাতের পেশি, ঘাড়ের গঠন, মুখের চোয়াল, আর ঋজু শরীর দেখে মনে হলো যেন স্টিলের তৈরী কোন রোবট।
আহমদ মুসার মুগ্ধ দৃষ্টি একসময় পাশের লোকটির হাত বেয়ে নেমে গেল তার লেখার উপর।
তার লেখাগুলোয় চোখ বুলাতে গিয়ে একটা স্কেচের উপর নজর পড়তেই ভূত দেখার মত চমকে উঠল আহমদ মুসা। কলমের কালি দিয়ে তৈরী মানুষের একটা স্কেচ। কালো কালি দিয়ে তৈরী কালো একটা মনুষ্য মূর্তি। মূর্তিটির বাম হাতে কালো কালির ক্রস। খুব সাধারণ একটা স্কেচ।
কিন্তু স্কেচটার উপর নজর পড়তেই আহমদ মুসার মনে পড়ল ‘ওকুয়া’র প্রতীক চিহ্নের কথা। একজন সৈনিকের ছবি, হাতে তার একটি ক্রস।
আহমদ মুসা দেখল, লোকটির কলম সৈনিকের সেই স্কেচটির উপর আবার উঠে এল। কালো কালির গভীর আঁচড়ে শীঘ্রই সৈনিকের স্কেচটি কালো সৈনিকে রূপ নিল। হাতে তার কালো ক্রস।
আহমদ মুসার কোন সন্দেহ রইল না, ওকুয়ার প্রতীক চিহ্ন এটা।
আহমদ মুসার বিস্মিত দৃষ্টি উঠে এল লোকটির মুখের উপর। লোকটি ওকুয়ার কেউ?
এ সময় তাদের দু’জনের ওপাশের জন উঠে দাঁড়াল। বলল, ‘পাওল তুই বস। কাজটা কতদূর একটু খোঁজ নিয়ে আসি।’
বলে লোকটি রেজিস্ট্রার অফিসের ভেতরে ঢুকে গেল।
আহমদ মুসা ভাবল, লোকটি নিশ্চয় ‘ওকুয়া’র কেউ। আনমনে কাগজে আঁচড়াতে গিয়ে প্রিয় প্রতীক চিহ্ন সে এঁকে ফেলেছে। লোকটির চেহারাও বলে ওকুয়ার মত সংগঠনের সাথেই তাকে মানায়।
ওকুয়ার এই লোকরা নিশ্চয় ওমর বায়ার কেসের ব্যাপারে এসেছে! ওর সাথের লোকটা কি এই কাজেই ভেতরে গেছে?
ঠিক এ সময় সেই লোকটা বেরিয়ে এল।
আহমদ মুসার পাশের লোকটাকে লক্ষ্য করে বলল, ‘পাওল, রেজিস্ট্রার সাহেব দুইদিন পরে একবার খোঁজ নিতে বললেন। আমাদের ব্যাপারটা চীফ জাস্টিসের আগামী পরশুদিনের কর্মসূচীতে উঠেছে। পরদিন এলেই ডেট জানা যাবে। চল।’
আহমদ মুসার পাশের লোকটিও উঠে দাঁড়াল। বলল, ‘চল।’
ওরা কক্ষ থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিল।
মন চঞ্চল হয়ে উঠল আহমদ মুসার। এখন কি করবে সে? ‘ওকুয়া’র লোককে তো ছাড়া যায় না। মোক্ষম একটা সুযোগ। ওদের ফলো করে নিশ্চয় ওকুয়া’র কোন এক ঠিকানায় পৌঁছা যাবে। তার ফলে ওমর বায়া ও ডঃ ডিফরজিসের সন্ধান পাওয়া অথবা উদ্ধার করার একটা সুযোগ পাওয়া যাবে।
কিন্তু রাশিদিরা দু’জন নেই, ভাবল আহমদ মুসা।
লোক দু’জন কক্ষের বাইরে চলে গেছে।
আর চিন্তা করতে পারলো না আহমদ মুসা।
আহমদ মুসা দ্রুত উঠে দাঁড়াল।
বেরিয়ে এল কক্ষ থেকে। দেখল, ওকুয়ার ওরা দু’জন পাশা-পাশি হেঁটে এগোচ্ছে সিঁড়ির দিকে।
আহমদ মুসা পিছু নিল ওদের।
ওদের অনুসরণ করে আহমদ মুসা নিচে লনে নেমে এল।
সুপ্রীম কোর্টের গাড়ি বারান্দা থেকে বেরুলেই হাতের বাম দিকে বিশাল পার্কিং প্লেস।
অনেকগুলো গাড়ি পার্ক করা আছে।
ওকুয়া’র ওরা দু’জন গাড়িগুলোর দিকে এগুচ্ছে। আহমদ মুসা বুঝল, ওরা নিজস্ব গাড়ি নিয়ে এসেছে।
আহমদ মুসার হাতে রাশিদির গাড়ির চাবি। সেদিকে একবার তাকিয়ে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করল আহমদ মুসা। গাড়ি না থাকলে ওদের পিছু নেয়া মুস্কিল হতো। রাশিদির গাড়ি আহমদ মুসা ড্রাইভ করেছিল বলে চাবিটা তার হাতেই রয়ে গিয়েছিল।
ওরা তাদের গাড়ির কাছে গিয়ে থামলে আহমদ মুসা চাবির রিংটা আঙুলে নাচাতে নাচাতে আনমনাভাবে গুণ গুণ করে গাড়ির দিকে এগুলো।
ওদের গাড়ি লন পেরিয়ে যখন গেটের কাছাকাছি পৌঁছল, তখন আহমদ মুসার গাড়ি স্টার্ট নিল।
ওদের পিছু পিছু বেরিয়ে এসে রাস্তায় পড়ল আহমদ মুসার গাড়ি।
সুপ্রীম কোর্ট লন থেকে বেরিইয়ে ওদের গাড়ি ‘ইয়াউন্ডি সার্কুলার’ ধরে দক্ষিণে এগিয়ে চলল।
‘ইয়াউন্ডি সার্কুলার’কে রাজধানী ইয়াউন্ডির ‘মাদার রোড’ বলা হয়। রোডটি ইয়াউন্ডিকে চারটি বৃত্তে ভাগ করেছে। চারটি বৃত্ত শহরের কেন্দ্রে এসে মিলিত হয়েছে। এই কেন্দ্রেই সুপ্রীম কোর্ট। বৃত্তগুলো থেকে দু’পাশে ডজন ডজন রোড বেরিয়ে রাজধানী শহরকে মাকড়শার জালের মত ভাগ করেছে। বৃত্ত চারটিকে এ, বি, সি, ডি- এই চার নামে চিহিৃত করা হয়েছে। বৃত্ত থেকে বের হওয়া বাইরোডগুলোকে এক, দুই, তিন- এইভাবে নামকরন করা হয়েছে।
আহমদ মুসা রাস্তার রোড সাইন দেখে বুঝল তারা ‘ইয়াউন্ডি সার্কুলার সি’ ধরে এগিয়া চলছে। ‘ওকুয়া’র গাড়িটি তার দু’শ গজ সামনে।
প্রায় পনের মিনিট চলার পর ওকুয়ার গাড়ি বাঁ দিকে বাঁক নিয়ে একটা বাইরোডে প্রবেশ করল। রোড সাইনে দেখল ‘সি-৭’, অর্থাৎ সি নম্বর বৃত্তের সাত নম্বর বাইরোড।
মিনিট পাঁচেক চলার পর সামনের গাড়িটি হঠাৎ দাড়িয়ে পড়ল।
বিপদে পড়ল আহমদ মুসা। তারা কি তার গাড়িকে সন্দেহ করছে? নাকি কোন প্রয়োজনে তারা দাঁড়িয়েছে। যেখানে সামনের গাড়িটি দাঁড়িয়েছে, সেটা একটা রাস্তার মুখ, সি-৭ থেকে বেরিয়ে সামনের দিকে চলে গেছে।
সে কি দাঁড়াবে, ভাবল আহমদ মুসা। দাঁড়ানো ঠিক মনে করল না। তারা যদি সন্দেহ করেই থাকে, তাহলে দাঁড়ানোর অর্থ তাদের সন্দেহ পাকাপোক্ত করা।
সুতরাং আহমদ মুসা না দাঁড়িয়ে একি গতিতে গাড়ি চালিয়ে ‘ওকুয়া’র গাড়ি পাশ কাটিয়ে সামনে এগিয়া দু’শ গজের মত গিয়ে একটা গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে পড়ল।
দাঁড়িয়েই পেছনে ফিরে তাকাল। ‘ওকুয়া’র গাড়িটি তখনও দাঁড়িয়ে।
আধা মিনিটও গেল না। ‘ওকুয়া’র গাড়িটি দক্ষিন গামী সেই রাস্তায় ঢুকে গেল।
সঙ্গে সঙ্গে আহমদ মুসা তার গাড়িটি ঘুরিয়ে নিয়ে ছুটল সেই রাস্তার দিকে।
আহমদ মুসা লক্ষ্য করল না, তার গাড়িটি দাঁড়াবার পর পরই আরেকটা নীল রঙের গাড়ি তার গাড়িকে পাশ কাটিয়ে দু’শ-আড়াইশ গজ দূরে একটা ঝোপের আড়ালে দাঁড়িয়ে পড়েছিল। গাড়িতে দু’জন আরোহী। তারা চোখ রাখছিল আহমদ মুসার উপর। আহমদ মুসা যখন তার গাড়ী নিয়ে ছুটল ‘ওকুয়া’র গাড়ী যে রাস্তার ঢুকেছে সে রাস্তার দিকে, তখন দু’জনের মুখেই একটা ক্রুর হাসি ফুটে উঠল। একজন বলল, ভাব দেখেই বুঝা গিয়েছিল বেটা ফেউ হবে। এখন আর সন্দেহ রইল না। ও ঐ গাড়িকেই ফলো করছে। আহমদ মুসার গাড়ি চলতে শুরু করার পর তারা আহমদ মুসার গাড়ির পিছু নিল।
ওকুয়ার গাড়িটি বেশ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছিল। আগের চেয়ে গতিটা এখন অনেক বেশি।
প্রায় দশ মিনিট চলার পর বেশ প্রশস্ত রাস্তায় উঠে এল গাড়ি। রাস্তাটি ইয়াউন্ডি সার্কুলার সি-র অপর একটি অংশ।
ওকুয়া’র গাড়ি ‘ইয়াউন্ডি সার্কুলার সি’-কে পাশ বরাবর ক্রস করে আরেকটি বাইরোডে প্রবেশ করল।
আহমদ মুসার গাড়িও সেই বাইরোডে প্রবেশ করল। রোড় সাইন দেখে আহমদ মুসা বুঝল বাই রোডটি ‘সি-৪১’। আহমদ মুসা লক্ষ্য করল না সেই নীল গাড়িটিও বিড়ালের মত তার পিছু পিছু প্রবেশ করছে ‘সি-৪১’ বাইরোডে।
আরও দশ মিনিট চলল গাড়ি।
একটানা একই গতিতে এগিয়ে চলছিল ওকুয়ার গাড়ি। এই রাস্তায় গাড়িও কম। আহমদ মুসা নিশ্চিন্তে অনুসরন করছিল ওকুয়ার গাড়িটার। এই নিশ্চিন্ততায় আনমনা হয়ে পড়েছিল সে।
সামনের গাড়িটাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আনমনা ভাবটি মুহুর্তে কেটে গেল। হার্ড ব্রেক কষল আহমদ মুসা। তবু তার গাড়িটা গিয়ে ‘ওকুয়া’র গাড়ির ঠিক পেছনে গিয়ে দাঁড়ালো।
দ্রুত আহমদ মুসা নজর বুলালো সামনে-ডাইনে-বামে।
রাস্তার দু’পাশে জংগল। চারপাশের পরিবেশটা কোন পরিত্যক্ত এলাকার মত বিশৃংখল। শহরের কোন মসৃণতা নেই।
ভ্রু কুঞ্চিত হল আহমদ মুসার। ওকুয়ার গাড়িটা এখানে এল কেন? এতো লোকালয়হীন পরিত্যক্ত এক শহরতলী!
ঠিক এই সময়ই পেছনের নীল গাড়িটি আহমদ মুসার গাড়ির পেছনে এসে দাঁড়াল। আহমদ মুসা সেই গাড়িটাকে দেখল।
হঠাৎ করেই প্রচন্ড এক চিন্তার ঝলক নামল আহমদ মুসার দেহে।
সে কি ট্র্যাপে পড়েছে? তাকে কি পরিকল্পনা করে এই নির্জন শহরতলী এলাকায় নিয়ে আসা হয়েছে?
মূহুর্তেই শক্ত হয়ে উঠল আহমদ মুসার দেহ। অজান্তেই তার হাতটা ছুটে গেল পকেটে রাখা পিস্তলের বাটে। কিন্তু বিস্ময়ের সাথে সে সময় সে দেখল পেছনের নীল গাড়ীর দু’পাশের দু’দরজা দিয়ে দু’জন নেমে ছুটে আসছে তার গাড়ীর দিকে।
দ্রুত আহমদ মুসার হাত রিভলবার সমেত পকেট থেকে বেরিয়ে এল।
গাড়ী থেকে বেরুবার জন্য আহমদ মুসা মুখ ফিরাতেই দেখল, তার গাড়ীর দু’পাশের দুই দরজায় দু’জন তার দিকে রিভলবার তাক করে দাঁড়িয়ে আছে। দেখেই ওদের চিনতে পারল আহমদ মুসা সুপ্রীম কোর্ট থেকে এ দু’জন লোককে অনুসরন করেই সে আসছে।
ডান হাতে রিভলবার ধরে রেখে ওদের একজন একটানে গাড়ীর দরজা খুলে ফেলল। হেসে উঠল হো হো করে। বলল, ‘ও! তোমাকেই তো বসে থাকতে দেখেছিলাম সুপ্রীম কোর্টে আমাদের পাশে। তুমিই ফলো করছ তাহলে আমাদের!’
‘পাওল চেন একে?’ পেছনের নীল গাড়ী থেকে আসা দুজনের একজন বলল।
‘না, চিনি না, আজ একবার দেখেছি। সুপ্রীম কোর্টের রেজিস্ট্রার অফিসে আমাদের পাশে বসেছিল।’
চারটি রিভলবারই আহমদ মুসার দিকে তাক করা। নীল গাড়ী থেকে নেমে আসা পুর্বের সেই লোকটিই আবার বলল, ‘তাহলে ব্যাটা টিকটিকি নাকি? আমরা যদি পেছনে পাহারায় না থাকতাম, ধরাই হয়তো পড়তনা ব্যাটা। ফাদারকে ধন্যবাদ যে, তিনি বুদ্ধিটা করেছিলেন। পিছনে নজর রাখতে হবে এমন কথা আমাদের চিন্তাও আসেনি।’
নীল গাড়ীর সেই লোকটি পকেট থেকে ওয়াকিটকি বের করল। বলল, ‘তোমরা একটু দাঁড়াও, ফাদারের সঙ্গে কথা বলে নেই।’
বলে লোকটি ওয়াকিটকির বোতাম টিপে মুখের কাছে তুলে ধরল।
ওয়াকিটকি থেকে কন্ঠ ভেসে এল ‘আমি পল’।
‘গুড ইভেনিং স্যার। আমি ‘অপারেশন সুপ্রীম’-এর রজার।
ফাদারকে চাচ্ছিলাম।’
‘ফ্রান্সিস বাইক ইদেজা গেছেন। আমাকে বল। আমি তোমাদের কলের অপেক্ষা করছি।’
‘ধন্যবাদ স্যার, কোর্ট থেকে আমাদের ফলো করে আসছিল একজন, আমরা তাকে ধরেছি।’
‘ধরেছ? ব্রাভো! ব্রাভো! টিকটিকি নাকি?’
‘তাই মনে হচ্ছে স্যার’
‘সর্বনাশ তাহলে চীপ জাস্টিস উসাম বাইক আমাদের পেছনে গোয়েন্দা লাগিয়েছে।’
‘তাই মনে হচ্ছে, চীপ জাস্টিসেরই টিকটিকি এ। কোট রুম থেকে আমাদের ফলো করছে।’
‘ঠিক আছে। চীপ জাস্টিসের কপাল মন্দ। আমাদের সাথে বিশ্বাস ঘাতকতা করেছে। আমরা এর প্রতিশোধ নেব।’
‘হ্যাঁ, প্রতিশোধ নিতে হবে স্যার। আমরা এখন কি করব স্যার?’
‘তোমরা ওকে আটকে রাখ। কাল সকালে ফ্রান্সিস বাইক ফিরবে। দু’জন একসাথে টিকটিকির পেটটাকে একবার সাফ করব। কি কথা আছে ওর পেটে দেখব। তারপর…’
‘তাহলে কাল সকালে ফাদার ফ্রান্সিস বাইক ফেরা পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা করতে হবে স্যার।’
‘হ্যাঁ’, বলে একটু থেমে গুড ইভেনিং বলে লাইন কেটে দিল ওপাশ থেকে।
এই আকস্মিক কথা বন্ধে রজার লোকটা আহত হল মনে হয়। হঠাৎ তার কপালটা কুঞ্চিত হল। অস্ফুটে তার মুখে উচ্চারিত, ‘ব্যাটা শ্বেতাংগের বাচ্চা, গুড ইভেনিংটাও দিতে দিল না।’
বলে এন্টেনা গুটিয়ে রেখে ওয়াকিটকি পকেটে রাখল।
উদ্যত রিভলবারের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আহমদ মুসা ওয়াকিটকিতে কথা বলা শুনতে পেল। খুব লো ভয়েসে কথা বলছিল না তারা।
আহমদ মুসা নিশ্চিত হলো যে, তাকে ওরা টিকটিকি অর্থাৎ সরকারী গোয়েন্দা মনে করছে।
আহমদ মুসা চিন্তা ভেঙে পড়ল কথার শব্দে।
ওয়াকিটকিওয়ালা বলছিল, ‘পাওল টিকটিকি ব্যাটার পকেট সার্চ করে ওর হাত-পা বেঁধে গাড়িতে তোল।’
ওয়াকিটকিওয়ালা ওয়াকিটকি পকেটে রেখে রিভলবার হাতে তুলে নিল।
‘পাওল’ নামের লোকটি তার ডান হাতের রিভলবার আহরদ মুসার পিঠে ঠেকিয়ে তার বাম হাত দিয়ে আহমদ মুসার পকেট সার্চ করল। একটা রিভলবার ছাড়া আর কিছুই পেল না আহমদ মুসার পকেটে।
তারপর আহমদ মুসাকে বেঁধে আহমদ মুসার গাড়িতে তুলল।
আহমদ মুসার পাশে ‘পাওল’ নামের লোকটি বসল হাতে রিভলবার নিয়ে। আর এ গাড়ির সিটে বসল ওয়াকিটকি ওয়ালা ‘রজার’ নামের লোকটি।
গাড়ি স্টার্ট নিয়ে চলতে শুরু করল।
তিনটি গাড়িই একসাথে চলল।
ভাবছিল আহমেদ মুসা। ‘ওকুয়া’র বুদ্ধিমত্তা ও সতর্কতার ব্যাপারে আহমেদ মুসার নিম্নমানের ধারণা সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু গত কয়েক মিনিটের ঘটনাগুলো থেকে আহমেদ মুসার পুর্বের ধারণা পাল্টে গেল। ওরা যথেষ্ট সতর্ক ও বুদ্ধিমান। তাকে ঘিরে ফেলা থেকে শুরু করে বেঁধে গাড়িতে তোলা পর্যন্ত কোন ভুল বা অসতর্কতা ছিল না।
কো্থায় নিয়ে যাচ্ছে আহমেদ মুসাকে ওরা? এই বিপদের মাঝেও আহমেদ মুসার মনে আনন্দ। এভাবে সে নিশ্চয় ‘ওকুয়া’র কোন ঘাটিতে পৌছতে পারবে। ওদের কাছে পৌছা খুব প্রয়োজন।
‘টিকটিকি মহাশয় আপনার নাম কি?’ আহমদ মুসাকে পাশের লোকটা প্রশ্ন করল।
‘টিকটিকি।’ নির্বিকার কন্ঠে বলল আহমদ মুসা।
আহমদ মুসার কথা শেষ হতেই ‘পাওল’ নামের লোকটি গভীর দৃষ্টিতে তাকাল আহমদ মুসার দিকে। বলল, ‘সাহস তো খুব দেখছি। আমাদের যতটা ভদ্র দেখাচ্ছে, তার এক ভাগ ভদ্রও আমরা নই। কিন্তু কি করব, ফাদার বাইকের শিকারে তো আর আমরা হাত দিতে পারি না।’
‘পাওল টিকটিকিকে বলে দে, কোন টিকটিকি আমাদের পিছু নিলে তার একটাই শাস্তি- মৃত্যুদন্ড।’ ড্রাইভিং সিট থেকে বলল রজার।
‘কিন্তু এক টিকটিকি মরলে আরেক টিকটিকি আসবে। টিকটিকি মেরে শেষ করা যায় না।’ বলল আহমদ মুসা।
‘তুমি বোধ হয় নতুন রিক্রুট। তাই জাননা যে তোমাদের বস’রা আমাদের নেতাদের ড্রইংরুমে একটু বসতে পারলে কৃতার্থ হন। তোমরা মত দশটা মরলেও তারা রা করবে না।’
‘বস’রা শেষ কথা নয়, সরকারও আছে।’
হো হো করে হেসে উঠল পাওল ও রজার দু’জনেই। পাওল বলল, ‘টিকটিকি সব খবর রাখ, এ খবর রাখ না যে, আমাদের এনজিওগুলোর আশীর্বাদ ও অর্থ না হলে সরকার সরকার হতে পারবে না, সরকার সরকার থাকবে না।’
শহরের পূর্ব প্রান্তে শহরতলীর একটা পুরনো বাড়ির সামনে গিয়ে তিনটা গাড়ি দাঁড়াল।
প্রাচীর ঘেরা বিশাল এলাকার মধ্যে দু’তলা একটা বাড়ি। বেশ বড়।
বাড়িতে প্রবেশের একটা মাত্র গেট।
সিংহ দুয়ারের মত বিশাল। বন্ধ।
সামনের গাড়ি যে ড্রাইভ করছিল সে নেমে দরজা খুলে দিল। এর অর্থ এ বাড়িতে গেটের দরজা খুলে দেবার কেউ নেই।
গেট দিয়ে প্রবেশ করল তিনটি গাড়ি।
ভেতরটা আরও বেশী অপরিষ্কার।
এক সময়ের পাথর বিছানো রাস্তাটা ধুলা-ময়লায় একদম ঢেকে গেছে।
তিনটি গাড়ি গিয়ে দাঁড়াল বাড়িটির সামনে। একটা সিংহ দরজার মুখে।
‘আপনাদের বস ফাদার বাইক এই পোড়ো বাড়িতে থাকে?’ প্রশ্ন করল আহমদ মুসা।
হো হো করে হেসে উঠল ‘পাওল’ নামের পাশের লোকটা। বলল, ‘টিকটিকি মশায়, এটা কোর্ট ও বন্দীখানা। এখানে বিচার হয় এবং শাস্তি বাস্তবায়ন হয়।’
‘বন্দীখানা, কিন্তু লোক তো দেখছি না। পাহারাদার কোথায়? এত ময়লা-আবর্জনা কেন?’
‘যখন প্রয়োজন পাহারাদার থাকে। প্রদর্শনীর জন্যে কোন পাহারাদার রাখা হয় না।’
পায়ের বাঁধন খুলে আহমদ মুসাকে ওরা গাড়ি থেকে নামাল।
আহমদ মুসা যতই বাড়িটা দেখছে স্তম্ভিত হচ্ছে। চুন-কাম, প্লাষ্টার খসে পড়েছে বাড়িটির, ইটও অনেক জায়গা থেকে খসে গেছে। কিন্তু বাড়িটার নির্মাণ শৈলী অপরূপ। মনে হচ্ছে সে যেন স্পেনের কোন ভাঙা প্রাসাদের সামনে দাঁড়িয়ে।
দেয়ালের ইট দেখে আহমদ মুসার মনে হলো এক বা একাধিক শতাব্দীর বেশী বয়স হবে বাড়িটার।
অনেকগুলো সিঁড়ি ভেঙে সিংহ দরজার সামনে প্রশস্ত উঠানে গিয়ে দাঁড়ালো তারা। সিঁড়ি দেখে আহমদ মুসা বুঝল দামী পাথর লাগানো ছিল সিঁড়ির ধাপগুলোতে। খুলে নেয়া হয়েছে সেগুলো। সিংহ দরজা ও দেয়ালের চেহারা দেখেও আহমদ মুসা বুঝল এক সময় সেগুলোতেও দামী পাথর লাগানো ছিল।
দরজায় নক করল রজার।
কয়েক বার একরাশ ভয়ংকর গর্জন শোনা গেল। তারপরই দরজা খুলে গেল।
দরজায় দেখা গেল নেড়ে মাথা পর্বতাকৃতি একজনকে। কয়লার মত কালো গায়ের রং। তিনটি ভীষণাকৃতির ব্লাক-হাউন্ড তার সাথে। কুকুরগুলো চেন দিয়ে বাঁধা। চেনগুলো গরিলা-লোকটির হাতে।
তিনটি ব্লাক-হাউন্ডের চোখই আহমদ মুসার উপর নিবদ্ধ। চোখে আগুন তাদের। আহমদ মুসার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ার মত পোঁজ তাদের।
কুকুরগুলো টেনে নিয়ে প্রশস্ত করিডোরের এক পাশে সরে দাঁড়াল গরিলা লোকটা।
গরিলা লোকটি মাথা ঝুকিয়ে অভিবাদনের জবাবে রজার বলেছিল ‘ব্ল্যাক-বুল তোমার আরেকটা শিকার নিয়ে এলাম। তবে বিচার এখনো হয়নি, কাল ফাদার আসবেন।’
বলে ভেতরে প্রবেশ করল ওরা আহমদ মুসাকে নিয়ে।
বাইরের থেকে বাড়ির ভেতরের অবস্থা ভাল। পাথর তুলে নেয়ায় দেয়ালের গা ক্ষতবিক্ষত, কিন্তু অধিকাংশ জায়গায় প্লাস্টার টিকে আছে।
করিডোর আরেকটা বড় দরজার সামনে নিয়ে গেল। দরজার দিকে তাকাতে গিয়ে দরজার অনেকখানি উপরে ভেন্টিলেটরে আটকে গেল আহমদ মুসার চোখ। ভেন্টিলেটরটায় লতা-পাতার সুন্দর জ্যামিতিক ডিজাইন। ডিজাইনের কেন্দ্রে একটা অর্ধচন্দ্র। অর্ধচন্দ্রের পেটে একটা ভাঙা ডিজাইন। যাকে একটা গম্বুজের অর্ধাংশ বলে মনে হচ্ছে।
চমকে উঠল আহমদ মুসা। ক্রিসেন্ট এল কোথেকে এখানে?
আনমনা হয়ে পড়ায় চলার গতি কমে গিয়েছিল আহমদ মুসার।
পেছন থেকে পাওলের রিভলবারের বাঁট আহমদ মুসার মাথা সামনের দিকে ঠেলে দিল।
সম্বিত ফিরে পেয়ে আবার চলতে শুরু করল সে।
দরজাটা পেরুলেই দেখা গেল ডিম্বাকৃতির একটা বিরাট হলঘর। ডিম্বাকৃতি হলঘরের দৈর্ঘ্যের একটা প্রান্ত শুরু হয়েছে এই দরজা থেকে। দরজায় দাঁড়িয়ে সামনে তাকালে নাক বরাবর সোজা আরেক প্রান্তে একটা বড় সিংহাসন। আর সিংহাসনের সামনে হল ঘরের দুই প্রান্ত দিয়ে ধনুকের মত সারিবদ্ধ গদী আঁটা আসন। কিন্তু সিংহাসন কিংবা এসব আসনের সবগুলোই ক্ষত-বিক্ষত, কংকাল মাত্র।
হল ঘরটিকে আহমদ মুসার একটা দরজার কক্ষ বলে মনে হলো। সিংহাসনের উপর নজর বুলাতে গিয়ে আহমদ মুসা আবার সেই বিস্ময়ের মুখোমুখি হলো। সিংহাসনের শীর্ষে সে একটা অর্ধচন্দ্র খোদিত দেখল।
আগে আগে হাঁটছিল আহমদ মুসা। পেছনে রজার, পাওল এবং তাদের সাথী দু’জন ও ব্ল্যাক বুল নামের লোকটি তার পিছনে তিনটি কুকুর হাতে।
আহমদ মুসা হলঘরের মাঝামাঝি পৌঁছতেই পেছন থেকে রজার বলল, ‘বাঁয়ের বড় দরজা দিয়ে।’
আহমদ মুসা বাঁয়ে ঘুরে দরজার মুখোমুখি গিয়ে দাঁড়াল। দরজায় চাপ দিতেই দরজা খুলে গেল। দরজাটি একটা সিঁড়ির মুখে। সিঁড়িটা নেমে গেছে নিচের দিকে, ভূগর্ভে।
আহমদ মুসা দাঁড়ালো সিঁড়ি মুখে।
পেছন থেকে রজার বলে উঠল, ‘ব্ল্যাক বুল টিকটিকির হাতে-পায়ে বেড়ি পরিয়ে রেখে এসো নিচে।’
এগিয়ে এল ব্ল্যাক বুল। প্রথমে সে লোহার বেড়ি পরিয়ে দিল আহমদ মুসার পায়ে। তারপর হাতের বাঁধন খুলে হাতে লোহার বেড়ি পরিয়ে দিল।
আহমদ মুসা বিস্মিত। হাত-পায়ের বেড়িগুলোর প্রাচীন ডিজাইন, কিন্তু তাতে মডার্ন তালা সিস্টেম।
হাতে-পায়ে বেড়ি পরিয়ে ব্ল্যাক বুল লোকটি খেলনার মতই আহমদ মুসাকে কাঁধে তুলে নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামল নিচে।
সিঁড়ির দু’টি বাঁক ঘুরে ব্ল্যাক বুল মেঝেয় নামল, লক্ষ্য করল আহমদ মুসা। তার মনে হলো তারা পনের ফুট নিচে নেমেছে।
মেঝেতে নেমেই ব্ল্যাক বুল কাঁধ থেকে আহমদ মুসাকে ছুঁড়ে দিল মেঝেতে।
আহমদ মুসা এর জন্যে প্রস্তুত ছিল না। হাত-পা বাঁধা অবস্থায় শক্ত মেঝের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষারও কোন উপায় ছিল না।
কাত হয়ে আঁছড়ে পড়েছিল শক্ত মেঝের উপর। শেষ মুহূর্তে শ্বাস বন্ধ করে আঘাত সামলে নেবার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু তবু ঘাড় ও পাঁজরটা তার যেন থেঁতলে গেল। আঘাতের তীব্র প্রতিক্রিয়ায় মাথাটা ঝিম ঝিম করে উঠল।
ধীরে ধীরে মাথাটা সে মেঝের উপর রেখে চিৎ হয়ে শুয়ে আঘাতটা হজম করার চেষ্টা করলো।
‘তুই বিদেশী কি করে টিকটিকি হলি?’ ভাঙা ফরাসীতে বলল ব্ল্যাক বুল।
আহমদ মুসা কোন জবাব দিল না। চোখ বুজে ছিল সে।
ব্ল্যাক বুল তার থামের মত পা দিয়ে আহমদ মুসার শরীরটাকে বলের মত গড়িয়ে বলল, ‘রেষ্ট নে, কাল তো যমের বাড়ি যেতে হবে!’
আহমদ মুসা হতাশ হয়ে পড়েছিল। তার আশা বন্দী হবার পর ওকুয়ার কোন ঘাটিতে যাবার সুযোগ হবে এবং ওমর বায়াদের মুক্ত করার একটা পথ সে পাবে। কিন্তু এটা ওকুয়া’র কোন ঘাটি নয়। মনে হচ্ছে এ পোড়ো বাড়িটা ওদের নিকৃষ্ট ধরনের কোন বন্দী খানা এবং এ ধরনের বন্দীখানায় ওমর বায়া এবং ডঃ ডিফারজিসকে তারা রাখবে না। ব্ল্যাক বুল-এর কথা আহমদ মুসার চিন্তায় নাড়া দিল। ব্ল্যাক বুলের মত মোটা বুদ্ধির লোকের কাছ থেকে কিছু কথা বের করা যেতে পারে।
এসব চিন্তা করে আহমদ মুসা ব্ল্যাক বুলের কথার জবাবে বলল, ‘যম বুঝি তোমাদের বলে গেছে?’
‘এই অন্ধ কুঠরিতে ঢোকার পর কেউ এখান থেকে বের হয়নি। এখান থেকে গেছে সোজা যমালয়ে।’
‘মনে হচ্ছে মিছিল করে মানুষ এখানে আসে যমালয়ে যাবার জন্যে!’
‘এই অন্ধ কুঠরিতে কংকাল ও নরমুন্ডের মিছিল দেখলেই সেটা বুঝতে পারবে।’
আহমদ মুসা চারদিকে তাকাল।
অন্ধ কুঠরিটি বিশাল। দু’প্রান্তের শেষটা বেঁকে গেছে বলে দেখা যাচ্ছে না।
মেঝের এখানে-সেখানে ছড়িয়ে আছে নরকংকাল এবং মানুষের মাথার খুলি।
অন্ধ কুঠরির বাতাস নাকে লাগতেই একটা তীব্র গন্ধ পেয়েছিল আহমদ মুসা। এখন সে বুঝতে পারল গন্ধের উৎস কি।
আহমদ মুসার কাছে পরিষ্কার হলো, খুনে ‘ওকুয়া’ এই পুরানো বাড়িটাকে অতীতে রাজা-বাদশাহদের মতো বধ্যভুমি হিসাবে ব্যবহার করছে। যাকে তারা হত্যা করবে তাকে এখানেই নিয়ে আসে। জিজ্ঞাসাবাদ বা নির্যাতেনর পর তাদের হত্যা করা হয় বা তিলে তিলে তাদের মৃত্যুবরণ করতে হয়।
‘এত লোককে তোমরা হত্যা করেছ?’ ব্ল্যাক বুলের কথার জবাবে বলল আহমদ মুসা।
‘এ আর কত! বড় ও বিপজ্জনক শিকার ছাড়া এখানে কাউকে আমরা আনি না।’
‘বড় ও বিপজ্জনক বন্দী এখন তাহলে তোমাদের নেই দেখছি, আমি একা এখানে!’
‘নেই কেন? আছে অন্য জায়গায়।’
‘আরও জায়গা তোমাদের আছে?’
‘অবশ্যই আছে।’
‘এই ইয়াউন্ডিতেই?’
‘এত প্রশ্ন করছ কেন? ও, তুমি তো টিকটিকি। আচ্ছা কত বেতন পাও যে, এভাবে মরতে এসেছ? সরকারের বেশীর ভাগ লোকই তো ‘ওকুয়া’কে ঘাটায় না। তোমার ভীমরতি হলো কেন?’
‘মনে কর কি যে, তোমরা ঠিক কাজ করছ?’
‘অবশ্যই। আমরা খৃষ্টের সৈনিক।’
‘কিন্তু তোমরা একজন বিখ্যাত ফরাসী লোককে পণবন্দী করে রেখেছো। অথচ সে নির্দোষ-নিরপরাধ। এটা কি খৃষ্টের সৈনিকের কাজ?’
‘এটা নেতাদের ব্যাপার। তাঁরা যা করেন খৃষ্টের জন্যেই করেন।’
‘ফরাসি ঐ ভদ্রলোককে তোমরা নিশ্চয় আমার মত করে রাখনি।’
‘তুমি তো দেখি সাংঘাতিক লোক, যমের বাড়ির দুয়ারে দাঁড়িয়ে অন্যকে নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছ।’
‘কেন তুমিও কি মানুষ নও? তোমার মন নেই? মানুষের দুঃখ তোমার মনকে নাড়া দেয় না?’
‘দেখ ওসব কিছু আমরা বুঝি না। চৌদ্দ পুরুষ ধরে আমাদের পেশা খুন করা।’
‘বাপের মত ছেলে হয় না। চৌদ্দ পুরুষের কথা বলছ কেন?’
হো হো করে হেসে উঠল ব্ল্যাক বুল। বলল, ‘আমাদের ক্ষেত্রে ওসব নীতিকথা খাটে না। খুন আমাদের বিজনেস। তাই আমরা সব সময় শক্তিমানের হাতে থাকি। একটা গল্প বলি শোন। এই বাড়ির যিনি নির্মাতা ও মালিক, তিনি আমার দাদাকে নিয়েছিলেন বডি গার্ড হিসেবে। ফরাসীরা এলে তারাই শাসনের মালিক হয়। আমার দাদা তাদের একটা মিশনারী পক্ষের সাথে যোগ দিয়ে এই বাড়ি লুট করায় এবং বাড়ির বৃদ্ধ মালিক ও তার স্ত্রীকে হত্যা করে। এই ঘর তাদের ছিল ধন ভান্ডার। পরে ফরাসী দেশীয় মিশনারী ঐ সংস্থা দাদাকে দিয়ে ঐ বৃদ্ধ ও তার স্ত্রীকে খুন করায়। সেই থেকে আমরা ঐ মিশনারী পক্ষের পেশাদার খুনি।’
‘তোমার এ মিশনারী পক্ষের নাম কি?’
‘তোমার প্রশ্নের উত্তর দিতে আমি এখানে আসিনি। তুমি মর, আমি চললাম।’ বলে ব্ল্যাক বুল ঘুরে দাঁড়াল চলে যাওয়ার জন্যে।
আহমদ মুসা বলল, ‘মিঃ ব্ল্যাক বুল প্রশ্নের উত্তর দিও না ঠিক আছে। কিন্তু তুমি তোমার দাদা ও আব্বার মত নও। হলে দাদার ঐ গল্প তুমি করতে না।’
ব্ল্যাক বুল ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল।
তার চোখ দু’টি নিবদ্ধ হলো আহমদ মুসার দিকে।
চোখ দু’টি শান্ত। কয়লার মত কালো মুখে পাপের কুৎসিত আবরণ ভেদ করে নিষ্পাপ বিষ্ময়ের একটা আভা ফুটে উঠল।
একইভাবে অনেকক্ষণ চেয়ে রইল আহমদ মুসার দিকে।
অনেকক্ষণ চেয়ে থেকে ধীর কন্ঠে বলল, ‘তুমি টিকটিকি নও, তুমি কে?’
‘কেন? এ প্রশ্ন কেন?’
‘টিকটিকিদের আমি চিনি। ওরা তোমার মত করে কথা বলে না। তোমার কথায় সংষ্কারকের কন্ঠ, তোমার চোখে সংস্কারকের দৃষ্টি। বল তুমি কে?’
‘তার আগে আমার প্রশ্নের জবাব দাও।’
হো হো করে হেসে উঠল ব্ল্যাক বুল। কিন্তু তার শুকনো হাসিকে একটা জমাট বিদ্রুপ বলে মনে হলো। বলল সে, ‘দাদা ও আব্বা মিলে যত খুন করেছে, আমি তার দ্বিগুণ খুন করেছি। সুতরাং বুঝতেই পারছ তোমার কথা সত্য নয়।’
‘পেশা এবং মন আলাদা হতে পারে মিঃ ব্ল্যাক বুল।’
‘রক্তের সাগর সে মনকে রাখেনি, চাপা দিয়েছে। যাক। তোমার জন্যে দুঃখ হচ্ছে। তুমি কে?’
‘আমি টিকটিকি নই। আমি বাইরে থেকে এসেছি দু’জন লোককে বন্দীদশা থেকে উদ্ধারের জন্যে।’
‘কিন্তু এদের পিছু নিয়েছিলে কেন?’
‘এদের হাতেই ওঁরা দু’জন বন্দী আছেন।’
‘আমার মনে হচ্ছে, তুমি একজন ভাল মানুষ। কিন্তু তোমার ভাগ্য খারাপ। তোমাকে হত্যা করতে আমার কষ্ট হবে।’
‘তাহলে আমার কথাই ঠিক। তোমার পেশা এবং মন আলাদা।’
ব্ল্যাক বুল বসে পড়ল। তার চোখে শুন্য দৃষ্টি। বলল, ‘সত্যি বলছ আমার মন নামক কিছু আছে?’ তার কথা খুব ভেজা শোনাল।
‘কেন মন তোমার নেই মনে কর?’
‘না নেই। আমার দাদার ছিল না, আব্বার ছিল না, আমারও নেই।’
‘আবার তুমি পেশা এবং মনকে এক করে দেখছ।’
‘তুমি সব জান না। লোভ, বিশ্বাসঘাতকতা, নেমকহারামি ইত্যাদি পেশা হতে পারে না। তাহলে শোন।’
বলে একটু থামল ব্ল্যাক বুল। তারপর শুরু করল, ‘আমার পিতৃপুরুষের বাসভূমি ছিল মধ্য আফ্রিকা প্রজাতন্ত্রের ‘সলো’ শহরে। সংঘ নদীর তীরে ছিল আমাদের বাড়ি। আমার দাদু ‘কমন্ড কাল্লা’ তখন নব্য যুবক। কুস্তিগীর হিসেবে বিখ্যাত। সংঘ নদী তখন দাস ব্যবসায়ীদের আনাগোনায় বিপজ্জনক হয়ে উঠেছিল। এক ভোরে আমাদের নদী তীরের বাড়ি আক্রান্ত হলো দাস ব্যবসায়ীদের দ্বারা। ওদের বন্দুকের কাছে আমাদের তীর এবং বর্ষার প্রতিরোধ বেশিক্ষণ টিকল না। দাদুর আব্বা-আম্মা নিহত হলো। আর বন্দী হলেন দাদু। হাত-পা বেঁধে দাদুকে আরও অনেকের সাথে নৌকার খোলে ফেলে রাখা হলো। সংঘ নদী বেয়ে তাদের আনা হলো কংগোর ‘ওয়েসু’ শহরে। দাস-ব্যবসায়ীদের বড় কেন্দ্র ছিল এটা।
নিয়ম ছিল, দাস ব্যবসায়ের জন্যে বন্দীদের না খাইয়ে রেখে দুর্বল করে ফেলা হতো।
দাদুরা যখন ‘ওয়েসু’তে পৌঁছলেন, তখন তারা ক্ষুধা-তৃষ্ণায় জর্জরিত। মধ্য আফ্রিকা প্রজাতন্ত্রের ‘সলো’ থেকে ‘ওয়েসু’ পর্যন্ত এক সপ্তাহের পথ এসেছে। সাত দিনের মধ্যে মাত্র একদিন একবেলা খেতে দিয়েছে। পানি খেতে দিয়েছে প্রতিদিন একবার।
দাদুরা যখন ‘ওয়েসু’তে পৌঁছল, তখন তারা শয্যাশায়ী।
ওয়েসু’তে আসার পর দাস ব্যবসায়ীরা মনে হয় কিছু সদয় হলো বন্দীদের প্রতি। ওদের খেতে দেয়া হলো এবং খোলের বাইরে মুক্ত বাতাসে নিয়ে আসা হলো তাদেরকে। পায়ের বেড়ি খুলে দেয়া হলো খোলের উপর হাঁটাহাঁটি করার জন্যে।
নৌকার দুই প্রান্তে দুইজন রাইফেলধারী তাদের পাহারা দিচ্ছিল।
দাদু মুক্তির জন্যে মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন। এইটুকু সুযোগও তিনি নষ্ট করলেন না। নৌকা থেকে ঝাঁপিয়ে পড়লেন তিনি পানিতে।
দাদু সাঁতরে নদীর উত্তর পাড়ে ওঠার জন্যে ছুটেছিলেন। ওদের দু’জনও পানিতে ঝাঁপিয়ে দাদুর পিছু নিলেন। পরে একটা ছোট বোটও দাদুকে ধরার জন্যে ছুটল।
অপ্রতিদ্বন্দ্বী সাঁতারু ছিলেন দাদু। সুতরাং সাঁতারে ওরা পারল না দাদুর সাথে।
তীরে উঠার পর দৌঁড়েও তারা পারল না দাদুর সাথে। নদীর তীর ধরে পশ্চিম দিকে পাগলের মত ছুটছিলেন দাদু।
দৌঁড়ে ওরা যখন দাদুর সাথে পেরে উঠল না, তখন গুলী করল। গুলী গিয়ে বিদ্ধ হলো দাদুর পায়ে।
সামনেই একটা মোটর বোট বাঁধা ছিল ঘাটে। দাদু গুলীবিদ্ধ হয়ে পড়ে গেলেন নৌকার সামনের তীরটায়।
ওরা ছুটে গিয়ে গুলী বিদ্ধ যন্ত্রণা কাতর দাদুকে ঘিরে দাঁড়াল।
এই সময় বোট থেকে নেমে এলেন মধ্য বয়সী একজন ভদ্রলোক। ভদ্রলোকটি কৃষ্ণাংগ, কিন্তু ঠিক নিগ্রো নয়। নাক খাড়া, চুল সরল, মুখে এশিয়ান বা ইউরোপীয় চেহারা।
ভদ্রলোক বোট থেকে নেমে চারজন শ্বেতাংগকে একজন গুলী বিদ্ধ কৃষ্ণাংগকে ঘিরে থাকতে দেখে এগিয়ে এলেন এবং পরিষ্কার ফরাসী ভাষায় জিজ্ঞেস করলেন, ‘কি ব্যাপার? কি ঘটেছে?’
দাস ব্যবসায়ী শ্বেতাংগরা তার কথার দিকে কর্ণপাত না করে দাদুকে হিড় হিড় করে টেনে নিয়ে যেতে শুরু করল।
ভদ্রলোক ছুটে এসে ওদের পথ রোধ করে দাঁড়ালেন।
ওদের একজন বলল, ‘পথ ছেড়ে দিন। এ আমাদের ক্রীতদাস।’
‘আমি ওকে জিজ্ঞেস করব, ও ক্রীতদাস কিনা। তোমরা ওকে কোথা থেকে কিনেছ, ও বলুক।’
দাদু চিৎকার করে উঠল, ‘ওরা ধরে এনেছে আমাকে আমার আব্বা-আম্মাকে হত্যা করে।’
সঙ্গে সঙ্গে ওরা পিস্তল তুলল ভদ্রলোককে লক্ষ্য করে। ভদ্রলোকের হাতে ছিল ষ্টেনগান। বিদ্যুত গতিতে তা উঠে এসে গুলী বৃষ্টি করল।
এ রকমটা ওরা ভাবেনি। কোন কৃষ্ণাংগ শ্বেতাংগকে এইভাবে গুলী ছুড়তে সাহস পাবে তা তারা চিন্তা করেনি। সম্ভবত পিস্তল তুলেছিল ভয় দেখাবার জন্যে। গুলীতে ওদের চারজনের দেহ ঝাঁঝরা হয়ে গেল।
ভদ্রলোক দাদুকে পাঁজাকোলা করে তুলে বোটে নিয়ে এল এবং সঙ্গে সঙ্গেই ষ্টার্ট দিল বোট। বলল, ‘খবর পাবার পর ‘ওয়েসু’ থেকে দাস ব্যবসায়ী শয়তানরা এক জোট হয়ে ছুটে আসবে।’
‘কিন্তু কোথায় পালাবেন। নদী পথে কি ওদের হাত থেকে বাঁচা যাবে?’ জিজ্ঞেস করেছিল ক্রু।
‘আমি সংঘ নদী দিয়ে যাব না। আমি ক্যামেরুনের দিজা নদীতে ঢুকব। দিজার মত ছোট ও দুর্গম নদীতে ওরা ঢুকবে না’।
এই ভাবেই দাদু ভদ্রলোকটির আশ্রয় লাভ করলো। ভদ্রলোক দীর্ঘ পনের দিন এ নদী সে নদী বেয়ে ইয়াউন্ডিতে এসে হাজির হলেন। যেদিন তিনি ইয়াউন্ডিতে পৌঁছিলেন, সেদিনই পনের ষোল বছরের তাঁর একমাত্র ছেলে মারা গেল।
ছেলেটির কবর দেয়া হলো ইয়াউন্ডিতে। কবর দেয়ার সময় আমার দাদু বুঝলেন ভদ্রলোকটি মুসলমান।
ভদ্রলোকের গন্তব্য ছিল নাইজেরিয়ার লাগোস অথবা ‘কানো’ শহর এবং সেখান থেকে হজ্জে চলে যাওয়া এবং হজ্জ শেষে মদিনায় স্থায়ী হওয়া।
কিন্তু ছেলে মারা যাওয়ার পর একেবারে ভেঙে পড়লেন ভদ্রলোক। নিজেও অসুস্থ হয়ে পড়লেন। ঠিক করলেন, ছেলের কবরের পাশেই গড়ে তুলবেন স্থায়ী নিবাস। দাদুকে বললেন, তুমি সম্পূর্ণ মুক্ত। বাড়িতে ফিরে যাও। কিংবা তোমার যেখানে ভালো লাগে যেতে পার।
দাদু বললেন, বাড়িতে আমার কেউ নেই। আপনি আমাকে নতুন জীবন দিয়েছেন। আপনার ধর্মও আমার ভালো লেগেছে। আমি ইসলাম গ্রহণ করে আপনার পায়ের কাছেই থাকতে চাই।
ভদ্রলোক দাদুকে সন্তান হিসেবে বুকে টেনে নিয়েছিলেন। এবং একমাত্র মেয়ে আয়েশাকে বিয়ে দিয়েছিলেন দাদুর সাথে।’
থামল ব্ল্যাক বুল।
‘কিন্তু তোমার এ কাহিনীতে কি বুঝা গেল?’ বলল আহমদ মুসা।
‘শেষ করতে দাও।’ বলে আবার শুরু করল ব্ল্যাক বুল, ‘আসল কাহিনী শুরুই হয়নি। ভদ্রলোক ছিলেন মহৎ হৃদয় এক রাজপুত্র। তার নাম ছিল যায়দ রাশিদি। উত্তর ক্যামেরুনের মারুয়া উপত্যাকায় এদের রাজত্ব ছিল। পার্শ্ববর্তী চাদ ও নাইজেরিয়ারও কিছু এলাকা ছিল এই রাজত্বের অধীন। পিতার মৃত্যুর পর যায়দ রাশিদি রাজ্যের সুলতান হন। কিন্তু রাজত্বের অভিলাসী ছোট ভাইয়ের ষড়যন্ত্রে অত্যন্ত ব্যথিত হয়ে ছোট ভাইকে সিংহাসন ছেড়ে দিয়ে পরিবার সমেত নিরুদ্দেশ হন। প্রথমে যান চাদে, তারপর মধ্য আফ্রিকা প্রজাতন্ত্রের দুর্গম অঞ্চল ‘বোমাসায়’ বসবাস করতে থাকেন। সংঘ নদী তীরবর্তী ‘বোমাসা’ বন্দরটি ক্যামেরুন, মধ্য আফ্রিকা প্রজাতন্ত্র ও কংগোর সংগম স্থলে। দীর্ঘ ২০ বছর এখানে বসবাস করার পর হজ্জের উদ্দেশ্যে ‘বোমাসা’ ত্যাগ করেন। তারপর ‘ওয়েসু’তে অবস্থান কালে দাদুর সাথে তার সাক্ষাত হয়।’
থামল ব্ল্যাক বুল।
‘থামলে কেন। চমৎকার তোমার কাহিনী। কিন্তু তুমি কি বলতে চাও এখনো বুঝিনি।’ বলল আহমদ মুসা।
‘বলছি। এর পরের কাহিনী আমার দাদুর বিশ্বাসঘাতকতার কাহিনী। যায়দ রাশিদি ইয়াউন্ডির বিশাল এলাকা কিনে অল্পদিনেই বিখ্যাত হয়ে উঠেছিলেন এবং ব্যবহার ও বদান্যতার গুণে তিনি স্থাণীয় লোকদের হৃদয় জয় করেছিলেন। কিন্তু তার এই জনপ্রিয়তা তার জন্যে কাল হয়ে দাঁড়ায়। ক্যামেরুনে পশ্চিমী শাসকদের সাথে খৃষ্টান মিশনারী সংগঠন সমূহেরও আগমন ঘটে। যায়দ রাশিদি তাদের চক্ষুশূল হয়ে দাঁড়ায়। আমার দাদু খৃষ্টান মিশনারীদের প্রলোভনের শিকার হয়ে পড়েন। অর্থ বিশেষ করে নারী দিয়ে ফাঁদে ফেলে তাকে সম্পূর্ণ বশীভূত করা হয়। খৃষ্টান মিশনারীদের টার্গেট ছিল যায়দ রাশিদির ধর্ম প্রচার বন্ধ করা এবং তাঁর অর্থ ও সম্পত্তি আত্মসাত করা। দাদুকে দিয়ে অত্যন্ত মর্মান্তিকভাবে এ কাজটি আঞ্জাম দেয়া হয়।
একদিন ভোরে প্রার্থনারত অবস্থায় যায়দ রাশিদি ও তার স্ত্রীকে হত্যা করেন দাদু ছুরি দিয়ে নিজ হাতে।
চিৎকার শুনে পাশের রুম থেকে প্রার্থনারত দাদী প্রার্থনা ছেড়ে ছুটে আসেন। পিতা-মাতার রক্তে ভাসমান দেহ এবং দু’হাতে ছুরি নিয়ে দাদুকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে অজ্ঞান হয়ে পড়ে যান।
যায়দ রাশিদি ও তার স্ত্রীর হত্যার পর বাড়ি ও সমগ্র সম্পত্তি দখল করে খৃষ্টান মিশনারীরা। এবং দাদীকে বন্দী করে রাখা হয় এই অন্ধ কুঠরীতে। তার উপর নির্যাতন চলে দিনের পর দিন।
যায়দ রাশিদির সব সম্পদ-সম্পত্তিই খৃষ্টান মিশনারীরা পেয়ে যায়, কিন্তু যায়দের স্বর্ণ মুদ্রার বিশাল বাক্সটি কোথাও পাওয়া যায় না। ঐ বাক্সটির সন্ধানে সবগুলো ঘরের মেঝে এবং দেয়ালের সন্দেহজনক সব জায়গা খুড়ে ও ভেঙ্গে দেখা হয়। এই অন্ধ কুঠরীর মেঝে কয়েকবার খুঁড়ে দেখা হয়। কিন্তু কোথাও সেই বাক্স খুঁজে পাওয়া যায়নি। এই বাক্সের সন্ধানেই দাদীর উপর নির্যাতন চলে।
দাদী সেই যে জ্ঞান হারিয়েছিলেন, তারপর তিনি যেন একদম বোবা হয়ে গিয়েছিলেন। কথা বলতেন না। তাঁর উপর নির্যাতন চলার প্রথম দিকে একদিন একটি মাত্র বাক্য দাদুর উদ্দেশ্যে বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘তুমি গলায় ক্রস পরেছ, ঐ অর্থ ক্রিসেন্টের জন্য, ক্রসের জন্যে নয়।’
এই কথাটুকুর পর দাদী আবার বোবা হয়ে গিয়েছিলেন। তার উপর নির্যাতন চালাত দাদু এবং দাদুর সাথী ফ্লোরেন্স নামের মিশনারীদের একটি মেয়ে। শত নির্যাতনেও দাদী আর মুখ খোলেননি। শুধু আব্বাকে দেখলে ডুকরে কেঁদে উঠতেন। আব্বা তখন সাত-আট বছরের ছেলে। আব্বাকে দাদীর কাছে আনা হতো টোপ হিসেবে, যাতে তিনি কথা বলেন। দাদী কাঁদতেন, কিন্তু কথা বলতেন না। একদিন ফ্লোরেন্স মেয়েটি কথা বলতে দাদীকে বাধ্য করার জন্যে আব্বার গলায় ছুরি ধরেছিল। দাদী চিৎকার করে চোখ বুজেছিলেন, কিন্তু মুখ খোলেননি।
নির্যাতন, রোগ-শোক এবং অনাহারে দাদী এই অন্ধ কুঠরিতেই একদিন প্রাণ ত্যাগ করেন।
দাদুও পরবর্তীকালে সুস্থ ছিলেন না। দাদীর মৃত্যুর পর ফ্লোরেন্স ও মিশনারীদের কাছে দাদুর প্রয়োজন আর থাকে না। দাদু পরিণত হন তাদের চাকরে। ধীরে ধীরে তিনি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন।
এই বাড়ি ও এই অন্ধ কুঠরি পরিণত হয় খৃষ্টান মিশনারীদের বধ্যভূমিতে। আর দাদু পরিণত হন তাদের অসহায় এক জল্লাদে।
জল্লাদি করে আব্বাও প্রায়শ্চিত্ত করে গেছেন দাদুর পাপের। আমিও করছি। এ পাপ আমাদের ঘাড় থেকে কখনই নামবে না। পেশা এবং পাপক্লিষ্ট মন আমাদের এক হয়ে গেছে। তুমি পেশা ও মনকে আলাদা করছ, আমাদের ক্ষেত্রে এটা সত্য নয়।’
একটু থামল ব্ল্যাক বুল। শেষ দিকে তার মুখে ফুটে উঠেছিল কান্নার মত হাসি।
পরে গম্ভীর হয়ে উঠল তার মুখ। বলল, ‘জানো, আমি আমার পেশা নিয়ে খুশি আছি। কারণ এই বাড়ি ছাড়তে চাই না। যায়দ রাশিদির এই বাড়ি আমার কাছে স্বর্ণের টুকরার চেয়েও মূল্যবান। আর এই অন্ধ কুঠরী ঘর আমার সবচেয়ে বেশী প্রিয়। এখানে এলে আমি দাদীর গন্ধ পাই, কথা শুনি।’
বলে উঠে দাঁড়াল ব্ল্যাক বুল।
আহমদ মুসা কাহিনী শুনে নিজেই যেন বোবা হয়ে গিয়েছিল। হৃদয়ের গভীরে একটা ব্যথা চিন চিন করে উঠেছিল তার। যায়দ রাশিদির সেই অতীত তার কাছে ভেসে উঠতে চাচ্ছিল।
ব্ল্যাক বুলের উঠে দাঁড়ানো দেখে সম্বিত ফিরে পেল আহমদ মুসা।
একটু নড়ে বসল আহমদ মুসা। বলল, ‘তোমার এই কাহিনী বলা, এই বাড়ি এবং এই অন্ধ কুঠরীকে তোমার ভালোবাসা প্রমাণ করে, তোমার কাছে তোমার পেশার চেয়ে তোমার মন বড়। যাক সে কথা। তোমার মত করে এই বাড়ি এবং এই অন্ধ কুঠরীকে যে আমিও ভালোবেসে ফেললাম!’
‘কেন? বিদ্রুপ করছ?’ বলল ব্ল্যাক বুল।
‘না, বিদ্রুপ করিনি। তোমার হতভাগ্য যায়দ রাশিদি এবং তোমার হতভাগ্য দাদী তো আমার ভাই-বোন!’
‘কি বলছ তুমি?’
‘হ্যাঁ। এক মুসলমান অন্য মুসলমানের ভাই। সেই হিসেবে তারা আমার ভাই-বোন।’
‘তুমি মুসলমান?’ চোখে একরাশ বিষ্ময় নিয়ে জিজ্ঞেস করল ব্ল্যাক বুল।
মুহূর্তকাল থামল। তারপর সেই বিষ্ময় নিয়েই জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি মুসলিম, তুমি টিকটিকি নও। তাহলে তুমি আমাদের লোকদের পিছু নিয়েছিলে কেন?’
জবাব দিতে মুহূর্তকাল দেরী করল আহমদ মুসা। একটু সময় নিয়ে বলল, ‘তোমার সংগঠন ‘ওকুয়া’ আমার এক মুসলিম ভাই এবং নিরপরাধ এক ফরাসী ভদ্রলোককে বন্দী করে রেখেছে। তাদের মুক্ত করার জন্যে ‘ওকুয়া’র ঘাটির সন্ধানে আমি ওদের পিছু নিয়েছিলাম।’
‘কেন ওদের বন্দী করেছে?’
‘যায়দ রাশিদির মতই ওমর বায়াকে ওরা বন্দী করেছে তার দশ হাজার একর সম্পত্তি আত্মসাত করার জন্যে।’
‘এটা ওদের খুব সাধারণ একটা কৌশল। কিন্তু ওদের বাধা দিয়ে কেউ কোনদিন সফল হতে পারেনি। যারা বেশী বেয়াড়া, তাদের এই অন্ধ কুঠরীতে আনা হতো। আর তাদের জীবন যেত আমার হাতে। কিন্তু কোন বুদ্ধিতে তুমি একা এদের বিরুদ্ধে লড়তে এসেছ?’
‘একা নই। সাথে আল্লাহ আছেন। এবং আরও অনেকে আছেন। যাক একথা। তুমি কি বলতে পার ওদের কোথায় আটকে রাখা হয়েছে?’
‘আমি এই বাড়িটা ছাড়া ওদের কিছুই চিনি না, কিছুই জানি না।’
বলেই উঠে দাঁড়াল ব্ল্যাক বুল। বলল, ‘এই প্রথম কোন বন্দীর জন্যে আমার দুঃখ হচ্ছে। মনে হচ্ছে জীবন দিয়ে হলেও তোমাকে সাহায্য করি। কিন্তু জীবন দিয়েও এখান থেকে তোমাকে মুক্ত করতে পারবো না। ওরা চারজন পাহারায় আছে। কাল দুই সাহেব আসার পর তোমার বিচার করবে। আমাকে দিয়ে তোমাকে খুন করাবে। তারপর যাবে।’
‘আমার জন্যে তুমি ভেবনা। একটা কথা বল, যায়দ রাশিদির এই বাড়ি এবং তার সকল সম্পত্তির বৈধ মালিক যে তুমি, একথা তোমার মনে জাগে না?’
‘জাগে। আরও জাগে, আমার দেহে মুসলিম রক্ত আছে। কিন্তু পাপের জগদ্দল পাথর ঠেলে তা বেরিয়ে আসতে পারে না। আমি একজন পাপিষ্ঠ।’
‘পাপ যেমন হয়, পাপ তেমনি মোচনও হয়।’
‘কিন্তু আমার পাপ?’
‘সব পাপই মোচন হয়।’
‘আমি মানুষের মধ্যে গণ্য হতে পারব বলে তুমি মনে কর?’
‘তোমার চেয়ে বড় পাপী শুধু মানুষ হওয়া নয়, মহামানুষও হতে পারে।’
‘সত্যি পারব?’
বলে ব্ল্যাক বুল এগিয়ে এল আহমদ মুসার দিকে। বলল, ‘এখন আমার মনে হচ্ছে আমি তোমাকে সাহায্য করতে পারব।’
ব্ল্যাক বুল তার পকেট থেকে চাবী বের করে আহমদ মুসার হাত ও পায়ের বেড়ি খুলে দিল।
ঠিক এই সময়েই সিঁড়িতে পায়ের শব্দ শোনা গেল।
আহমদ মুসা এবং ব্ল্যাক বুল দু’জনেই সেদিকে চোখ ফিরাল। দেখল, ব্ল্যাক ক্রসের সেই চারজনের দু’জন উদ্যত রিভলবার হাতে সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসছে। তাদের চোখে আগুনের ফুলকি।
ব্ল্যাক বুল ওদের দিকে তাকিয়ে যেন পাথর হয়ে গেছে। আহমদ মুসাও উঠে দাঁড়িয়েছে। তারও স্থির দৃষ্টি ওদের দিকে।
ওরা সিঁড়ি দিয়ে নেমে এল। দাঁড়াল আহমদ মুসা ও ব্ল্যাক বুলের মাঝখানে।
ওদের একজনের রিভলবার ব্ল্যাক বুলের দিকে এবং আরেকজনের আহমদ মুসার দিকে।
ব্ল্যাক বুলের দিক হয়ে দাঁড়ানো লোকটি চিৎকার করে উঠল, ‘জান বিশ্বাসঘাতকতার কি শাস্তি এখানে? দেখা মাত্র হত্যা করা। ঈশ্বরের নাম নাও। তিন গোণা পর্যন্ত সময় পাবে।’
বলে সে এক….. দুই….. করে গোণা শুরু করল।
আহমদ মুসা বুঝতে পারছিল ওরা ফাঁকা ভয় দেখাচ্ছে না। আফ্রিকার গোত্রীয় ঐতিহ্য সে জানে, বিশ্বাসঘাতকতার শাস্তি তাদের সর্বোচ্চ এবং তাৎক্ষণিক। ওরা ব্ল্যাক বুলকে হত্যা করবে।
আহমদ মুসার মনে নানা চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছিল। তার স্থির দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিল তার দিকে রিভলবার উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটির দিকে।
ব্ল্যাক বুলের দিকে বন্দুক উঁচানো লোকটি যখন এক….. দুই…. গুনছিল, তখন আহমদ মুসার সামনের লোকটি সম্ভবত অপ্রতিরোধ্য কৌতূহল বশতই ব্ল্যাক বুলের অবস্থা দেখার জন্যে মুখ ঘুরিয়েছিল মুহূর্তের জন্যে।
এমন একটি সুযোগের জন্যেই অপেক্ষা করছিল আহমদ মুসা।
লোকটি তার মুখ ঘুরিয়ে নেবার সাথে সাথেই আহমদ মুসা তার হাত থেকে রিভলবার কেড়ে নিয়ে চিৎকার করে উঠল, ‘রিভলবার ফেলে দাও, হাত তুলে দাঁড়াও।’
আহমদ মুসার হুকুম তামিল হলো না।
যার রিভলবার আহমদ মুসা কেড়ে নিয়েছিল, সে তার মুখ ঘুরিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ছিল আহমদ মুসার উপর। আহমদ মুসার লক্ষ্য তখন ব্ল্যাক বুলের সামনের রিভলবারধারী লোকটি। এই সময় রিভলবারধারী লোকটিও রিভলবার ফেলে না দিয়ে ঘুরে দাঁড়াচ্ছিল।
আহমদ মুসাও সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছিল।
তার হাতের রিভলবার চোখের পলকে দু’বার অগ্নিবৃষ্টি করল। যে লোকটি আহমদ মুসার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ছিল, সে গুলী খেয়ে উল্টে পড়ে গেল। আর ব্ল্যাক বুলের কাছের যে লোকটি আহমদ মুসার দিকে ঘুরিয়ে নিচ্ছিল তার রিভলবার, সে মাথায় গুলী খেয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে গেল ব্ল্যাক বুলের পায়ের কাছে।
আহমদ মুসা কিছু বলতে যাচ্ছিল, এমন সময় কঠোর একটি কণ্ঠে ধ্বনিত হলো, ‘হাত থেকে রিভলবার……..।’
প্রথম শব্দ শোনার সাথে সাথেই আহমদ মুসা বিদ্যুৎ গতিতে মাথা তুলেছিল। দেখল, স্টেনগান হাতে সেই চারজনের অবশিষ্ট দু’জন রজার এবং পাওল সিঁড়ির মাথায় দাঁড়িয়ে। সামনে আছে রজার তার স্টেনগানটি আহমদ মুসার দিকে উদ্যত।
আহমদ মুসার চোখ ওদের উপর পড়ার সংগে সংগেই উঠে এসেছিল তার রিভলবার। রজারের কথা শেষ হবার আগেই আহমদ মুসা দু’বার ট্রিগার টিপল তার রিভলবারের। দু’টি গুলী পর পর গিয়ে বিদ্ধ করল রজার ও পাওলকে। দু’জনে