২৭. মিসিসিপির তীরে

চ্যাপ্টার

কাহোকিয়া হলিক্রস হাসপাতালের বিলাসবহুল একটা বড় কক্ষ।
কক্ষে চারটি বেড।
চারটি বেডে চিকিৎসাধীন আছে গোল্ড ওয়াটারের সেই চারজন আহত লোক।
এদের চারজনেরই ডান হাত গুলীবিদ্ধ আহমদ মুসার রিভলবারের গুলীতে।
এই চারজন গোল্ড ওয়াটারের নির্দেশেই চোখ রাখছিল সান ওয়াকারের উপর আহমদ মুসাসহ তাকে ধরার জন্যে।
সান ওয়াকারের খোঁজ গোল্ড ওয়াটার পেয়েছিল ফেডারেল রেষ্টহাউজের কর্মচারী নাভাজোর কাছ থেকে।
ওঁৎ পেতে চোখ রাখার সময় সেদিন যখন তারা দেখেছিল সান ওয়াকার শিলা সুসান ও মেরী রোজকে নিয়ে এয়ারপোর্টে যাচ্ছে। তখন তারা ভেবেছিল সান ওয়াকার কাহোকিয়া ত্যাগ করছে এবং তাদের হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। এখন ওঁৎপেতে থাকা দু’জন মোবাইল টেলিফোনে গোল্ড ওয়াটারকে ঘটনা জানিয়েছিল। সংগে সংগেই গোল্ড ওয়াটার আরও দু’জনকে পাঠিয়েছিল এবং নির্দেশ দিয়েছিল সান ওয়াকারসহ তিনজনকেই কিডন্যাপ করার জন্যে।
গোল্ড ওয়াটার প্রেরিত দু’জন এয়ারপোর্ট রোডের ব্রীজে গাড়ি নিয়ে সান ওয়াকারদের অপেক্ষা করছিল এবং অন্য দু’জন গাড়ি নিয়ে অনুসরণ করছিল সান ওয়াকারদের ঘোড়ার গাড়ি।
কিন্তু তাদের কিডন্যাপ পরিকল্পনা বণ্ডুল হয়ে যায় হঠাৎ আহমদ মুসা এসে উদয় হওয়ায়।
ওদের চারজনের গুলীবিদ্ধ হাত সেরে উঠেছে। আজ তাদের হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাবার কথা।
ওদের চারজনের সকলেই শুয়ে আছে। কেউ আধ-শোয়া অবস্থায় গল্প করছে।
বলছিল একজন, ‘এ কয়দিন চিন্তা করেও আমি হিসেব মেলাতে পারছি না এমন নিশানার ঐ রকম বন্দুকবাজ হঠাৎ সেদিন কোথেকে এসে উদয় হয়েছিল’।
‘যাই হোক, লোকটা অসাধারণ। সেকেণ্ডের ব্যবধানও ছিল না একটা গুলী থেকে আরেকটা গুলীর মধ্যে। তার আটটা গুলীরই অব্যর্থ নিশানা’। বলল আরেকজন।
‘তোমাদের প্রশংসা বেশি হয়ে যাচ্ছে। পরিকল্পিত আক্রমণে আক্রমণকারীর একটা বাড়তি সুযোগ থাকে, সেটা সেদিন আমাদের ছিল না’। বলল তৃতীয় জন।
‘আজ আমরা ছাড়া পাচ্ছি, কালকেই আবার রাস্তায় নামতে হবে। বলা যায় না তার সাথে আবার দেখা হয়েও যেতে পারে। সে পুলিশের লোক নয় তো?’
‘এমন ধারণার কারণ?’ প্রথমজন বলল।
‘সে আমাদের কাউকেই হত্যা করার জন্যে গুলী করেনি। পুলিশরাই সাধারণত এ রকম করে’। বলল চতুর্থজন।
‘পুলিশ নয় তার প্রমাণ আমরা বহাল তবিয়তে হাসপাতালে আছি। পুলিশ এমনকি কোন জিজ্ঞাসাবাদও আমাদের করেনি’। বলল তৃতীয়জন।
‘পুলিশ এ বিষয়টা চেপেও যেতে পারে। কারণ আমরা গোল্ড ওয়াটারের লোক। আর গোল্ড ওয়াটার ফেডারেল সরকারের মেহমান এখানে। অন্যদিকে এখানকার পুলিশ সবাই রেড ইণ্ডিয়ান।’ বলল প্রথমজন।
‘হতেও পারে তোমার কথা ঠিক। যদি তোমার কথা ঠিক হয়, তাহলে একটা ভয়ের ব্যাপার হলো পুলিশ প্রত্যক্ষভাবে আমাদের কিছু না করতে পারলেও পরোক্ষভাবে আমাদের উপর নানাভাবে চড়াও হতে পারে’। বলল দ্বিতীয় জন।
দ্বিতীয়জন কথা শেষ করতেই ঘরে ঢুকল নার্স। বলল, ‘স্যার এসেছেন’।
তার কথা শেষ না হতেই ঘরে ঢুকর গোল্ড ওয়াটার। ঢুকেই বলল, ‘বাছারা সব ঠিক ঠাক আছে? প্রব্লেম নেই কিছু?’
চারজনই বলল, ‘সব ঠিক আছে। কোন সমস্যা নেই’।
‘তাহলে নার্স ওদের রিলিজের সব ব্যবস্থা কর। আমি তোমাদের অফিসে বলে এসেছি। আমি এখনি এদের নিয়ে যেতে চাই’। বলল গোল্ড ওয়াটার নার্সকে।
‘ওকে স্যার। আমি দেখছি। আপনি বসুন’।
বলে নার্স দ্রুত বেরিয়ে গেল।
নার্স বেরিয়ে যাওয়ার পরক্ষণেই হাসপাতালের ডিউটি অফিসার প্রবেশ করল কাহোকিয়ার ফেডারেল কমিশনার এ্যালেন ট্যালন্টকে সাথে নিয়ে।
ঘরে ঢুকেই ট্যালন্ট হ্যান্ডশেকের জন্যে হাত বাড়িয়ে গোল্ড ওয়াটারের দিকে এগিয়ে আসতে আসতে বলল, ‘আমি খুব দুঃখিত মিঃ গোল্ড ওয়াটার। ওয়াশিংটনে গিয়ে নানা সমস্যায় জড়িয়ে পড়ায় আপনার দুঃসময়ে আপনার পাশে থাকতে পারিনি’।
‘না না, কোন অসুবিধা হয়নি। আপনার লোকেরা যথেষ্ট করেছে আমাদের জন্যে। আমি আমি কৃতজ্ঞ’।
এ্যালেন ট্যালন্ট হ্যান্ডশেক করার জন্যে এগিয়ে গেলেন এক এক করে চারজনের কাছে। তাদের কুশল জিজ্ঞেস করলেন এবং পিঠ চাপড়ে তাদের উৎসাহিত করলেন।
তারপর গোল্ড ওয়াটারের দিকে ফিরে বললেন, ‘চলুন ওদিকে নিরিবিলি বসি। কিছু কথা বলা যাবে’।
‘চলুন’। বলল গোল্ড ওয়াটার।
এ্যালেন ট্যালন্ট গোল্ড ওয়াটারকে নিয়ে কক্ষ থেকে বেরিয়ে এসে হাসপাতাল অফিসের মিটিং রুমে এসে বসল।
বসেই ট্যালন্ট বলল, ‘আপনার আমাদের মেহমান, আপনাদেরকে এভাবে জঘণ্য হামলার শিকার হতে হয়েছে, এজন্যে দুঃখিত’।
‘না এতে আপনার বিচলিত হবার কিছু নেই। সন্ত্রাসীরা মেহমান, অমেহমান, স্বদেশী, বিদেশী বিচার করে সন্ত্রাস করে না’। বলল গোল্ড ওয়াটার।
‘বলেন কি, বিচলিত হবো না। কাহোকিয়াতে আমার কার্যকাল চার বছর হলো। এই চার বছরে এ ধরনের ঘটনা একটিও ঘটেনি।’
‘যা ঘটেনি, তা ঘটবে না এমন কথা বলা যায় না।’
‘তা ঠিক। কিন্তু যখন এমনটা ঘটেছে, তখন তা চিহ্ণিত হবার মতই বটে। আমি দেখছি ব্যাপারটা।’
‘ধন্যবাদ।’
‘শুনলাম, আপনার থানায় কোন কিছু জানাননি।’
‘বেড়াতে এসেছি। বিষয়টা নিয়ে আমরা ঝামেলা বাড়াতে চাইনি। তবে পুলিশ ইনফরমালি আমার লোকদের বক্তব্য নিয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদ করেছে।’
‘আর কোন অসুবিধা নেই তো?’
‘ধন্যবাদ। আপনার লোকেরা আমাদের কোনই অসুবিধা হতে দেয়নি।’
‘বেড়ালেন কেমন?’
‘প্রচুর বেড়িয়েছি। ‘রেড ইণ্ডিয়ান ইনিষ্টিটিউট অব হিষ্টোরিক্যাল রিসার্চ’-এ এখনো যাইনি। দু’একদিনের মধ্যে যাব। ভাল লাগলে আজও যেতে পারি। শহরের বাইরে গ্রাম এলাকায়ও যাব’।
‘খুশী হলাম’।
বলে একটু থেমেই আবার বলল, ‘আমি হাসপাতালকে বলে দিয়েছি, সম্পূর্ণ সুস্থ হবার জন্যে যতদিন প্রয়োজন ওরা হাসপাতালে থাকবে’।
গোল্ড ওয়াটার হাসল। বলল, ‘আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ আপনার শুভেচ্ছার জন্যে। ওরা সম্পূর্ণ সুস্থ হয়েছে। আজই ওদের রিলিজ নিচ্ছি।
আরও দু’দিন আগেই ওরা রিলিজ হতে পারতো, কিন্তু আপনার লোকেরা ছাড়েনি’।
‘ঠিক আছে। কোন অসুবিধা হলেই কিন্তু জানাবেন’।
বলে একটু থামল। বলল তারপর, ‘এযাজত দিন, উঠি।’
‘ঠিক আছে। আবার দেখা হবে। আপনি কষ্ট করে আসাতে খুব খুশী হয়েছি।
এ্যালেন ট্যালন্ট উঠে দাঁড়িয়েছিল। গোল্ড ওয়াটারও উঠল।
বিদায় নিয়ে এ্যালেন ট্যালন্ট কার পার্কে দাঁড়ানো তার গাড়িতে গিয়ে উঠল।
পাশেই দাঁড়ানো ছিল পুলিশ প্রধানের গাড়ি। পুলিশ প্রধান দাঁড়িয়েছিল তার গাড়ির পাশেই।
এ্যালেন ট্যালন্ট তাকে ডাকল গাড়ির জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে।
পুলিশ প্রধান তার কাছে এগিয়ে গেলে ট্যালন্ট বলল, ‘তুমি আমার পাশে উঠে বস। কথা আছে’।
পুলিশ প্রধান সংগে সংগে তার ড্রাইভারকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিয়ে এসে ট্যালন্টের পাশে উঠে বসল।
চলতে শুরু করল গাড়ি।
‘মিঃ চিনক, ঘটনা কি বলুন তো? চারজন লোক গুলীবিদ্ধ হলো। অথচ তার কোনই কিনারা করতে পারলাম না। লজ্জার বিষয় আমাদের জন্যে’। বলল ট্যালন্ট পুলিশ প্রধান চিনকে লক্ষ্য করে।
পুলিশ প্রধান চিনক রেড ইণ্ডিয়ান। বলল সে, ‘স্যার গোটা ব্যাপারটাই আমাদের কাছে রহস্যজনক মনে হচ্ছে। প্রথমত, তারা কোন অভিযোগ দায়ের করেনি। থানায় সাধারণ একটা ইনফরমেশন দিয়েছে মাত্র। হাসপাতালে গিয়ে আহতদের বক্তব্য নিতে হয়েছে। দ্বিতীয়ত, বক্তব্য তাদের পরিষ্কার নয়। কোথায়, কিভাবে, কি অবস্থায়, কার বা কাদের দ্বারা এই ঘটনা ঘটল, তা বিস্তারিত তারা বলেনি। যা বলেছে তা দিয়ে কিছু বুঝা যায় না। পুলিশের মনে হয়েছে, ঘটনার অধিকাংশই তারা লোকোচ্ছে। তৃতীয়ত, চারজনের আহত হওয়ার ধরনটা বিষ্ময়কর। প্রত্যেকের ডান হাতের প্রায় একই জায়গায় গুলীবিদ্ধ হয়েছে। এর কোন ব্যাখ্যা তারা দিতে পারেনি। পুলিশের ধারণা এই চারজন আক্রমণাত্মক কিছু করছিল। তা থেকে তাদের বিরত রাখার জন্যেই কেউ তাদের গুলী বর্ষণ করে। মনে করা হচ্ছে, এদের হাতেও রিভলবার ছিল। যারা এই চারজনকে গুলী করেছিল তারা এদেরকে হত্যা করতে চায়নি, শুধু কোন কাজ থেকে তাদের বিরত রাখতেই চেয়েছিল। হত্যা করতে চাইলে তারা সবার একই জায়গায় ঐভাবে গুলী করতো না। পুলিশের এই ধারণ সত্য বলে প্রতীয়মান হয় চারজনের বক্তব্যের রাখ-ঢাক দেখে।’
‘কিন্তু আক্রমণাত্মক কি ঘটনায় তারা জড়িত থাকতে পারে?’ প্রশ্ন ট্যালন্টের।
‘সেটাই আমরা উদ্ধার করতে পারিনি স্যার। যে জায়গায় ঘটনা ঘটেছে, সেটা এয়ারপোর্ট রোডের ব্রিজের পশ্চিম পাশের রাস্তা। জায়গাটা আমরা ভালভাবে পরীক্ষা করেছি। রাস্তার চার জায়গায় আমরা রক্তের দাগ পেয়েছি। এই চারটা পয়েন্টকে যুক্ত করলে একটা আয়তক্ষেত্র দাঁড়ায়। আয়তক্ষেত্রটা রাস্তার লম্বালম্বি। লম্বার পরিমাণ ২০ ফিটের মত। অর্থাৎ বিশ ফিট দূরত্বে রাস্তার দু’পাশে দু’জন করে ওরা আহত হয়েছে। চারজন দাঁড়ানোর এই অবস্থান বিশ্লেষণ করে পুলিশ ধারণা করছে, এই চার অবস্থানের মাঝখানে রাস্তার উপর কোন গাড়ি বা মানুষ কিংবা কিছু ছিল যাকে তারা চারজনে ঘিরে ফেলেছিল। তারপর তারা গুলীবিদ্ধ হয়।’
‘উল্টোভাবে তারাও তো কোন ঘেরাও-এর মধ্যে পড়তে পারে।’
‘তাদের অবস্থান তা প্রমাণ করে না স্যার।’
‘ধন্যবাদ চিনক। পুলিশ সঠিক পথেই এগিয়েছে। এখন কি ভাবছ তোমরা? আবার কোন কেলেংকারী না ঘটে।’
‘সে ব্যাপারে আমরা সতর্ক স্যার। আমরা স্থির করেছি, এঁরা যে ক’দিন কাহোকিয়া থাকেন, আমরা চোখ রাখতে চেষ্টা করব।’
‘নাইস চিনক। তোমরা ঠিক চিন্তা করেছ। ধন্যবাদ।’
‘আরেকটা ব্যাপার স্যার?’
‘কি?’
‘ব্যাপারটা তেমন ধর্তব্য নয়, তবু বলছি স্যার।’
‘কি সেটা?’
‘আমাদের গোয়েন্দা বিভাগের একজন কর্মী রেষ্ট হাউজে চাকুরী নিয়ে আছে। রেষ্ট হাউজে রুটিন ইনফরমেশন হিসাবে সে তথ্যে বলেছে, মিঃ গোল্ড ওয়াটার বার বার তাকিদ দিয়ে সান ওয়াকার কোথায় থাকে তা জেনে নিয়েছে।’
‘তারপর?’
‘এ টুকুই স্যার।’
ট্যালন্টের ভ্রু কুচকে উঠেছিল। ভাবছিল সে। বলল, ‘তুমি একে ছোট খবর বলছ কেন চিনক? সান ওয়াকার কিডন্যাপড হয়েছিল। পুলিশ তাকে উদ্ধার করতে ব্যর্থ হয়েছে। সে যেমনভাবে পালিয়ে এসে আত্মগোপন করে আছে। শ্বেতাংগ কেউ যখন তার অবস্থানের ব্যাপারে অতি আগ্রহ প্রকাশ করে, তখন সে ব্যাপারটাকে ছোট খবর হিসাবে দেখা যাবে না। তুমি তো জান, তাকে কিডন্যাপ করেছিল চরম বর্ণবাদী হোয়াইট ঈগল।’
‘ঠিক বলেছেন স্যার। এদিকটা আমি মোটেই চিন্তা করিনি। তাহলে সান ওয়াকার প্রশ্নে গোল্ড ওয়াটারের ব্যাপারে আপনি কিছু সন্দেহ করেন?’
‘অবশ্যই না। আবার আস্থাও নেই। তবে সত্য কি তা জানা প্রয়োজন?’
‘বুঝতে পেরেছি স্যার।’
ফেডারেল কমিশনার ট্যালন্ট পৌঁছে গেল তার অফিসে।
গাড়ি থেকে নেমে ট্যালন্ট পুলিশ প্রধান চিনককে বলল, ‘তুমি এস, আরেকটু কথা আছে’।
ট্যালন্ট ও চিনক হাঁটতে শুরু করল ট্যালন্টের অফিস কক্ষের দিকে।
ওদিকে গোল্ড ওয়াটার হাসপাতাল থেকে তার চারজনকে নিয়ে পৌঁছেছে তার কক্ষে।
পৌঁছেই ডেকে নিল সে জেনারেল শ্যারণকে।
সবাই বসলে মদ পরিবেশন করল গোল্ড ওয়াটার নিজে। বলল, ‘আসুন আমরা উৎযাপন করি হাসপাতাল থেকে ওদের চারজনের মুক্তির মুহূর্তকে।’
মদে শেষ চুমুকটি দিয়ে গোল্ড ওয়াটার বলল, ‘এখন তাহলে আমরা কিছু প্রয়োজনীয় কথা আলোচনা করতে পারি।’
হ্যাঁ, তবে আমার একটা কথা মিঃ গোল্ড ওয়াটার। আমি কিন্তু এখানে আর সময় দিতে পারবো না।’ বলল জেনারেল শ্যারণ।
‘হ্যাঁ, মিঃ জেনারেল। আমিও এই কথাই বলতে চাচ্ছি। এখানে এখন এক ঘন্টা বসে থাকা আমার কাছে এক বছরের মত মনে হচ্ছে। ওরা অসুস্থ না হলে কবে এখানকার পাঠ চুকে যেত।’
‘কিন্তু মিঃ গোল্ড ওয়াটার একজন লোক যদি চারজনের চারটি রিভলবারকে চোখের পলকে অকেজো করে দিতে পারে, তাহলে পাঠ চুকে কি করে।’
‘ঐ রকম কিংবদন্তীর বন্দুকবাজ মাত্র আমেরিকাতেই কিছু কিছু আছে। আর এরা চারজন ওকে আগে দেখতে পায়নি।’
কথা শেষ করে একটা দম নিয়ে গোল্ড ওয়াটার বলল ‘থাক অতীতের কথা। এখনকার যা কাজ দ্রুত আমাদের শেষ করা দরকার।’
‘কি শেষ করবে গোল্ড ওয়াটার। আহমদ মুসার কোন খোঁজই তো এখনও পাওয়া গেল না।’
‘আমি বুঝেছি, ফাঁদ না পাতলে ওকে ধরা যাবে না।’
‘ফাঁদ কোথায়?
‘সান ওয়াকার ও মেরী রোজ সেই ফাঁদ’।
‘কেমন?’
‘এই দু’জনকেই আমরা আটক করতে চাই। তাহলেই কান টানলে মাথা আসার মত আহমদ মুসা এদের উদ্ধারের জন্যে এসে উদয় হবে।’
‘না মিঃ গোল্ড ওয়াটার, শুনেছি মেরী রোজ চীফ জাস্টিসের মেয়ে। তাকে আটক করার সাথে শামিল থেকে আমি ঝামেলায় পড়তে চাই না।’
‘তা ঠিক নয়। সান ওয়াকারের সাথে তাকে ওয়াশিংটনে নিয়ে ছেড়ে দেব।’
‘এতে বিপদ আরও বাড়বে’।
‘সেটাও ঠিক। তাহল?’
‘শুধু সান ওয়াকারকে আটক করাই যথেষ্ট। তাছাড়া শিলা সুসান না কি যেন নাম ঐ মেয়েকে আটক করার কথা বলছেন না কেন। শুনেছি সেই বেশি সক্রিয়।’
‘সমস্যা হলো, সে ক্যারিবিয়ানের হোয়াইট ঈগলের নেতা জর্জ ফার্ডিন্যান্ডের মেয়ে। আমি নই, তার পিতাকে দিয়ে তাকে শায়েস্তা করতে হবে। ইতিমধ্যেই তার পিতাকে আমি জানিয়েছি।’
‘বুঝলাম; ফাঁদ হিসাবে সান ওয়াকার কি খুব ভাল হবে। তার সাথে আহমদ মুসার কি সম্পর্ক?’
‘সম্পর্ক কিছুই নেই। আহমদ মুসা সম্পর্ক বিচার করে কাজ করে না। অসহায় কেউ ভয়ানক বিপদে পড়েছে, এ টুকুই তার জড়িত হবার জন্যে যথেষ্ট। চিন্তা করবেন না জেনারেল। আহমদ মুসার জন্যে আরও ফাঁদ পাতছি। জর্জ ফার্ডিন্যান্ডের সাথে আজ সকালেই এ নিয়ে আলাপ করেছি। টার্কস দ্বীপপুঞ্জে ডাঃ মার্গারেট ও লায়লা জেনিফার তার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ্ তাদের গায়ে হাত পড়া মানে তার গায়ে হাত পড়া’।
‘ঠিক আছে, ঈশ্বর আমাদের সফল করুন।’ বলল জেনারেল শ্যারণ।
কথা শেষ করেই গোল্ড ওয়াটার তার মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছে হাসপাতাল থেকে ছাড়িয়ে আনা ঐ চারজনের দিকে। বলল, ‘নিশ্চিত জানা গেছে, সান ওয়াকার ও দুই বান্ধবী সবাই কাহোকিয়াতেই আছে। এখন খুঁজে বের করতে হবে কোথায় তারা আছে। আজ থেকেই তোমরা কাজে নেমে পড়। নাভাজোর সাহায্য পাওয়া যাবে, পুলিশও সাহায্য করবে’।
‘থাকাটা বিষ্ময়কর তো! সেদিন তো চলে যাচ্ছিল।’ বলল চারজনের একজন।
‘না সবাই যাচ্ছিল না। এয়ারপোর্ট থেকে খবর নিয়ে দেখা গেছে, সেদিন যাচ্ছিল শুধু মেরী রোজ ও শিলা সুসান’।
‘কোথায় থাকবে, কোন আত্মীয়ের বাড়িতে নিশ্চয়।’
‘বন্ধু-বান্ধব ও পরিচিতজনদের বাসাতেও থাকতে পারে। বাসা ভাড়া নিয়েও থাকতে পারে।’
‘তা থাকতে পারে।’
‘সুতরাং খুঁজতে হবে তোমাদের। পেতেই হবে তাকে।’
‘এবার মনে হচ্ছে কঠিনই হবে। নাভাজোর কাছ থেকে কাজের কথা বের করা খুব কঠিন।’
‘কঠিন, কিন্তু সফল আমাদের হতেই হবে। সান ওয়াকারকে আমাদের চাই।’
‘তার বান্ধবী দু’জনকে?’
‘দরকার নেই।’
‘সেই লোকটিকে, যে সেদিন আমাদের পরিকল্পনা ভণ্ডুল করে দিয়েছিল?’
‘সে লোকটিকে পেলে আমরা দলে নিতাম যে কোন মূল্যের বিনিময়ে। ও রকম বন্দুকবাজের কথা আমি শুনিনি’।
‘তার মুখ তো আমরা দেখিনি, চিনব কি করে? পাব কি করে?’
‘সান ওয়াকারকে পেলে তাকেও পাবার একটা পথ হতে পারে।’
‘ঠিক বলেছেন’।
‘তাহলে তোমরা কিভাবে সামনে ওগুবে, ভাবছ কি?’ নাভাজোর সাথে আমি কথা বলেছি, সেদিনের ঘটনার পর ওরা কোথায় থাকছে সে জানে না। সান ওয়াকারের বাবা-মা ও আত্মীয়-স্বজনের কাছে জানতে বলেছিলাম। কিন্তু তার আত্মীয় স্বজনরা এখন খুব সতর্ক। তারা মুখ খোলেনি। তবে কথাচ্ছলে এতটুকু বলেছে, সান ওয়াকারকে কাহোকিয়ার বাইরে পাঠাবার চেষ্টা করে তারা ব্যর্থ হয়েছে। সান ওয়াকারের এক কথা, মরতে হলেও নিজ জন্মভুমিতেই সে মরবে।’
‘কোন কিছুই অসম্ভব নয়। ছোট্ট কাহোকিয়া চষে ফেলা কঠিন হবে না।’
‘দরকার হলে তার বাপ-মাকে কিডন্যাপ করে তাদের মুখ খোলাতে হবে। পরাজয় মেনে এখান থেকে আমরা ফিরব না।’
‘অবশ্যই স্যার।’
‘শোন, এবার শুধু পুরোনো কাহোকিয়া নয়, নতুন কাহোকিয়ার উপরও চোখ রাখতে হবে।’
‘আমরা নতুন কাহোকিয়া থেকেই কাজ শুরু করব।’
‘ওকে। যাও, এখন তোমরা বিশ্রাম নাও।’
ওরা চারজন বেরিয়ে গেল।
‘শুধু ওদের চারজনের উপর ভরসা করলেই কি চলবে মিঃ গোল্ড ওয়াটার?’ বলল জেনারেল শ্যারণ।
‘দেখা যাক।’
‘ওকে’। বলে উঠে দাঁড়াল জেনারেল।
গোল্ড ওয়াটারও উঠল কাপড় ছাড়ার জন্যে।

প্রফেসর আরাপাহোর অফিস কক্ষ থেকে বেরিয়ে করিডোর ধরে প্রফেসর ও আহমদ মুসা হাঁটছিল ইনষ্টিটিউটের ডকুমেন্ট গ্যালারির দিকে।
রেড ইণ্ডিয়ান ইনষ্টিটিউট অব হিষ্টোরিক্যাল রিসার্চ-এর এই সুদৃশ্য ভবনটি সুন্দর ও সুপ্রশস্ত একটা টিলার উপর অবস্থিত। ভবনের চারদিকে বিস্তৃত বাগানের সারি। মাঝে মাঝে আবার প্রাকৃতিক ঝোপ-ঝাড়। নিচ থেকে পাথর বিছানো একটা রাস্তা এঁকেবেঁকে উঠে এসেছে ইনষ্টিটিউটে।
করিডোর ধরে হাঁটতে হাঁটতে আহমদ মুসা বলল, ‘ইণ্ডিয়ান অতীত ও মুসলমানদের অতীতের মধ্যে কোন যোগসূত্র আছে কিনা, থাকলে সেটা কি? এ বিষয় জানার আমার খুব আগ্রহ। ওগলালা বলেছিল, এ বিষয়ে আপনি জানেন।’
হাসল প্রফেসর আরাপাহো। বলল, ‘আমারও আগ্রহ এ বিষয়ে। এই আগ্রহ থেকেই তোমাকে ডেকে এনেছি এই ইনষ্টিটিউটে। চল দেখবে।’
ডকুমেন্ট গ্যালারিতে প্রবেশ করল প্রফেসর আরাপাহো এবং আহমদ মুসা। প্রফেসর আরাপাহো বলল, ‘অনেক সময় লাগবে ডকুমেন্ট গ্যালারী ঘুরে দেখতে। অত সময় তুমি দেবে না। সুতরাং কয়েকটা জিনিস মাত্র তোমাকে দেখাব।’
শুরুতেই একটা মানচিত্রের সামনে দাঁড়ালো প্রফেসর আরাপাহো। বলল, ‘অষ্টম শতাব্দীতে তৈরি এই মানচিত্র। পাথরের উপরে আঁকা এই মানচিত্র তৈরি হয় ইণ্ডিয়ানদের রূপ কথার উপর ভিত্তি করে। মানচিত্র বলতে যা বুঝায় এটা তা নয়। আসলে এটা পথের ম্যাপ। পথের ম্যাপ আঁকতে গিয়ে দুই মহাদেশ এবং এক সাগরের অবস্থান চিহ্ণিত হয়েছে এখানে। দেখ দুই মহাদেশের ঠোঁট একদম উত্তর প্রান্তে মুখোমুখি হয়েছে। দুইয়ের মাঝখান দিয়ে যে মার্কিন সাগর ওটাই বেরিং প্রণালী। বেরিং-এর দক্ষিণে বিস্তির্ণ এলাকায় ঢেউএর সিম্বল আঁকা এটাই প্রশান্ত মহাসাগর’।
একটু থামল প্রফেসর আরাপাহো।
আহমদ মুসা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিল ম্যাপটি।
প্রফেসর আরাপাহোই আবার শুরু করল। বলল, ‘এই ম্যাপের সবচেয়ে বড় আকর্ষণের বিষয় হলো, আমেরিকায় আদি বসতি স্থাপনকারীদের আগমন পথ। দেখ, দু’টি জনস্রোত এশিয়া থেকে আমেরিকায় প্রবেশ করেছে। ছবি এঁকে দু’টি পথই ভিন্ন ভিন্নভাবে দেখানো হয়েছে।’
থামল প্রফেসর আরাপাহো। তাকালো আহমদ মুসার দিকে। বলল, ‘আমেরিকামুখী এই দুই এশীয় জনস্রোত আমাদের কি জানাচ্ছে বলতে পারো?’
‘আপনিই বলুন জনাব। আমার মনে হয় জনস্রোত দু’টো অনেক কথা বলছে।’
‘ঠিক বলেছ আহমদ মুসা। জনস্রোতের ছবি দু’টো অনেক কথা বলছে।’
বলে একটু থেমে একটা ঢোক গিলে আবার শুরু করল। বলল, একটা জনস্রোতের মানুষগুলো দেখ প্রায় নগ্ন। এদের হাতে পাথর এবং বর্শার মত অস্ত্র। আর এদের পথ বেরিং প্রণালী দিয়ে নয়, বেরিং প্রণালী থেকে বেশ দক্ষিনে সাগরের মধ্যে দিয়ে। অথচ নৌকার কোণ সিম্বল আঁকা নেই। অর্থাৎ এশিয়ার এই মানুষগুলো শিকারের পেছনে বা শিকার ধাওয়া করে সাগর পাড়ি দেয় মহাকালের এমন এক সময়ে যখন প্রশান্ত সাগর, বিশেষ করে উত্তর প্রশান্ত মহাসাগর বরফে ঢাকা ছিল। এই জনস্রোত আমেরিকার আদি বসতি। দ্বিতীয় জনস্রোতের ছবিতে দেখ লোকগুলো সভ্য, কাপড় পরা এবং তাদের হাতে কোন অস্ত্র নেই। আর তারা বেরিং প্রণালী দিয়ে নৌকায় সাগর পাড়ি দিয়ে আমেরিকায় প্রবেশ করে। মজার ব্যাপার একটা দেখ, দুই জনস্রোতের উৎস মঙ্গোলিয়া। তৎসন্নিহিত চীন এবং মধ্য এশিয়া। তবে আদি সনস্রোতটর উৎস চীন, জাপান কোরিয়ার উপকুলীয় অঞ্চল। কিন্তু দ্বিতীয় জনস্রোতটির উৎস এশিয়ার আরো গভীরে, মঙ্গোলিয়া ও মধ্য এশিয়া অঞ্চল থেকে।’ থামল আরাপাহো একটু।
একটু ভাবল। বলল তারপর, ‘আরেকটি জিনিস দেখ, প্রশান্ত মহাসাগরে ঢেউ-এর বুকে কয়েকটা নৌকা ভাসছে। পাল তোলা, দাঁড় টানা এবং এদের গতি আমেরিকার দিকে। এটা আমেরিকামুখী তৃতীয় জনস্রোত। এই তিনটি জনস্রোতের মধ্যে প্রথমটি নিঃসন্দেহে বরফ যুগের। কিন্তু পরবর্তী দু’টি জনস্রোত অনেক অনেক পরে, এশীয় সভ্যতার যুগে। যে যুগ বলতে পার ম্যাপ নির্মাণের সময় অষ্টম শতাব্দী পর্যন্ত। এখন শোন, শেষের এই দুই জনস্রোতের মধ্যে মুসলমানরা শামিল ছিল। তবে গভীর প্রশান্ত সাগরের পথে নৌকা বা জাহাজবাহী যে স্রোত দেখছ, এটা ছিল এককভাবে মুসলমানদের। মুস…।’
প্রফেসর আরাপাহোকে বাধা দিয়ে আহমদ মুসা বলল, ‘এককভাবে মুসলমানদের ছিল একথা বলছেন কেমন করে?’
‘বলছি এ কারণে যে অষ্টম শতক থেকে চতুর্দশ শতক পর্যন্ত আটলান্টিক বল, প্রশান্ত মহাসাগর বল, সব সাগরের রাজা ছিল মুসলমানরা। এমনকি পঞ্চদশ শতকে সাগরের আধিপত্য (ভূমধ্য সাগর ছাড়া) ইউরোপীয়দের হাতে চলে গেলেও মুসলিম সমুদ্র বিশেষজ্ঞ ও মুসলমান নাবিকদের সাহায্য ছাড়া ইউরোপীয় ক্যাপ্টেনরা সমুদ্রে জাহাজ ছাড়ার কথা কল্পনাই করতো না। কলম্বাসকে আমেরিকা এবং ভাস্কোডাগামাকে ভারতে নিয়ে গিয়েছিল মুসলিম নৌ-কুশলীরাই। সব তো আমি জানি না। জানার মধ্যে থেকে একজনের কথা বলছি। তিনি মুসলিম নাবিক আবহারা। উত্তর প্রশান্ত মহাসাগর থেকে অষ্ট্রেলিয়া পর্যন্ত বিশাল সাগর তাঁর কাছে ছিল পুকুরের মত। কলম্বাসের আমেরিকা আসার সাত আট শ’বছর আগে থেকে শত-সহস্র আবহারা সাগর পাড়ি দিয়ে আমেরিকা পৌঁছেছে। আবহারা ধরনের নাম আমাদের রেড ইণ্ডিয়ানদের মধ্যে অনেক পাবে।’
থামল প্রফেসর আরাপাহো। আবার মনোযোগ দিল ম্যাপের দিকে। শুরু করল, ‘বলছিলাম, এই ম্যাপ সম্পর্কে। এই ম্যাপটা তৈরি হয় রেড ইণ্ডিয়ান রূপকথার ভিত্তিতে। ইতিহাস আজ এই রূপকথাকে সত্য প্রমাণ করেছে। আমার মনে হয় আহমদ মুসা রেড ইণ্ডিয়ানদের সাথে মুসলমানদের সম্পর্ক কি- তোমার এই প্রশ্নের জবার এই ম্যাপ থেকে কিছুটা পরিষ্কার হয়।’
‘আপনি যা বললেন তা যুক্তির কথা, কিছুটা ধারণার কথাও। নিশ্চিত হবার জন্যে মানুষ কি সুষ্পষ্ট প্রমাণ চাইবে না? তবে রেড ইণ্ডিয়ানরা এশীয় বংশোদ্ভুত। ম্যাপের এই কথা আজ ইতিহাসও বলছে।’
হাসল প্রফেসর আরাপাহো। বলল, ‘চল আরও সামনে চল।
আহমদ মুসাকে নিয়ে সামনে এগুলো প্রফেসর আরাপাহো। বলছিল ‘তুমি যে প্রমাণের কথা বলছ, সে ধরনের প্রমানের সন্ধান সবেমাত্র শুরু হয়েছে। এতদিন আমেরিকা এই ধারণায় বুদ হয়ে ছিল যে, কলম্বাসই প্রথম আমেরিকার মাটিতে পা রাখে। কিন্তু রেড ইণ্ডিয়ান ইতিহাসের বিভিন্ন দিক নিয়ে যে ম্যাপ দেখলাম সে ধরনের কিছু ম্যাপ ও দলিল পাওয়ার পর ঐতিহাসিক ও পুরাতত্ত্ববিদরা নতুন সম্ভাবনার উপর কাজ শুরু করেছেন। সর্ব প্রথম প্রফেসর হেনর ও বামহফ ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগে দেয়া এক রিপোর্টে বলেন, “বিভিন্ন অঞ্চলে আরবীয় ঐতিহ্যমণ্ডিত ইসলামের কিছু প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন পাওয়া যাচ্ছে। তাঁরা এসব নিদর্শনের একটা তালিকাও পেশ করেন। তাঁদের অনুসন্ধানের পথ ধরে আরও অনুসন্ধান কাজ এগিয়ে চলে। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত বিভাগের অধ্যাপক মিঃ বেরীফিল এমন কিছু প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হাজির করেন যা প্রমাণ করে কলম্বাস আমেরিকা আবিষ্কারের সাত আটশ বছর আগে মুসলমানরা আমেরিকায় ছিলেন। অনেক প্রত্নতত্ত্ববিদ প্রথমে এ বক্তব্যকে আমল দেননি। অনেকে তাকে বিদ্রুপ করে লিখেছেনও। কিন্তু ১৯৭৮ সালে কেসলিটন বীর মাউন্ট কলেজে প্রত্নতত্ত্ববিদদের সমাবেশে তিনি তার উপস্থাপিত তত্ত্বের পক্ষে তথ্য প্রমাণ হাজির করলে একটা নতুন বিষ্ময় হিসেবে সবাই একে গ্রহণ করেন।’
‘সে তথ্য প্রমাণগুলো কি?’ আহমদ মুসা জিজ্ঞেস করল।
‘হ্যাঁ, সে তথ্য প্রমাণের দু’একটা তোমাকে দেখাব বলেই বলেছি।’
তারা মেঝেতে চারটা পিলারের উপর রাখা কাচমোড়া একটা সেলফের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। আরও কয়েকটা সেলফ পর পর।
সেলফটির মধ্যে একটা বড় পাথর। তাতে খোদাই করে লেখা।
লেখাগুলো আরবী।
পড়ল আহমদ মুসা, ‘আল্লাহর নবী মুহাম্মাদ’।
প্রফেসর আরাপাহো বলল, ‘এই শিলালিপি অরজিন্যাল নয়, অরজিন্যালের ডামি। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পত্নতত্ত্ব গ্যালারির মূল শিলালিপি থেকে এটা নকল করে আনা হয়েছে।’
‘শিলালিপির বয়স?’ জিজ্ঞেস করল আহমদ মুসা।
‘ভাল করে দেখ শিলালিপিতেই লেখা আছে।’
ভাল করে দেখতে গিয়ে লিপির নিচে তারিখ লেখা দেখতে পেল। পড়ল ‘পহেলা রমজান, ছিয়ানব্বই হিজরী।’
বিষ্ময় বিমুগ্ধ আহমদ মুসার চোখ যেন আঠার মত লেগে গেল শিলালিপির গায়ে। শিলালিপিটি তার চোখকে টেনে নিয়ে গেল শত শত বছর আগের দিনে। এই মাত্র প্রফেসরের কাছে শোনা মুসলিম আবহারাদের যেন চোখে দেখতে পাচ্ছে সে। দেখতে পাচ্ছে ইসলামের পতাকা হাতে তাদের আমেরিকার বনজ, পাথুরে এবং মরুময় পথে প্রান্তরে ঘুরে বেড়াতে। ইসলামের কোন সে গতি, কোন সে সয়লাব তাদের ঠেলে নিয়ে এসেছিল এতদূরে।
চোখের দু’কোণ ভিজে উঠেছিল আহমদ মুসার।
‘পড়তে পেরেছ তারিখ?’ জিজ্ঞেস করল প্রফেসর আরাপাহো।
সম্বিত ফিরে পেল আহমদ মুসা।
পকেট থেকে রুমাল নিয়ে চোখের কোণ দু’টি মুছে আহমদ মুসা বলল, ‘পড়েছি জনাব।’
একটু থামল। তারপর বলল ‘ইংরেজী সালের হিসাবে এই শিলালিপি লিখিত হয়েয়ে ৭২৯ সালে। আর হিজরী সাল হিসাবে ৯৬ সালে। কার্বন টেষ্ট কিংবা এ ধরনের বৈজ্ঞানিক টেষ্ট শিলালিপির কাল সম্পর্কে কি বলে?’
‘কয়েক ধরনের পরীক্ষা হয়েছে। সব পরীক্ষাতেই প্রমাণ হয়েছে, লেখা তারিখ সত্য’।
‘আলহামদুলিল্লাহ’। বলল আহমদ মুসা অমূল্য দলিলটি ভূয়া না হওয়ার আনন্দে।
‘চল, সামনে আগাও।’
ঘরের কাঁচ ঢাকা সেলফের সামনে এসে হাজির হলো তারা।
এখানেও আরেক শিলালিপি। চোখ ছুটে গেল আহমদ মুসার। শিলালিপি পড়ল সে, ‘লা-ইলাহা ইল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকালাহু।’
এই শিলালিপির তারিখ কিছুটা পরের, পহেলা মহররম, ১০৮ হিজরী।
আহমদ মুসা কিছু বলার আগেই প্রফেসর আরাপাহো বলল, ‘এই শিলালিপিটি ওটার চেয়ে ১২ বছর পরের। এই শিলালিপিটি পাওয়া যায় ক্যালিফোর্নিয়ার সাউথটংক এলাকায় আর ওটা নেবদা এলাকায়।’
বলে চোখ ফিরিয়ে আহমদ মুসার দিকে তাকাল। বলল, ‘বুঝেছ কি লেখা ওখানে?’
‘বুঝেছি প্রথমটায় লেখা ‘আল্লাহর রসূল মুহাম্মাদ’। আর দ্বিতীয়টায় লেখা, ‘আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য নেই। তিনি এক ও শরীক বিহীন।’ আর মজার ব্যাপার হলো, এই দুটি মিলে যা দাঁড়াল সেটা ইসলামের মূল মন্ত্র। যা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ কালে প্রথমেই পড়তে হয়।’
‘বাঃ ওয়াণ্ডারফুল। তাহলে ওগুলো নিশ্চয় কোন ডেকোরেশনের বিষয় ছিল না, ছিল আসলে আগত মুসলমানদের মিশনারী উপকরণ।’
‘আমিও তাই মনে করছি জনাব।’
আহমদ মুসা থামলেও প্রফেসর তৎক্ষণাত কোন কথা বলল না। ভাবছিল সে। কুঞ্চিত তার ভ্রু দু’টি। জিজ্ঞেস করল একটু সময় নিয়ে, ‘তাহলে বুঝা যাচ্ছে, এ ধরনের প্রচার উপকরণ ব্যাপকভাবে ছড়ানো হয়েছিল। সেজন্যেই দুই স্থানের দুই শিলালিপি মিলে এক বিষয় হওয়ার সুযোগ হয়েছে।
‘তাই হবে।’
‘হবে মানে? এটাই হয়েছে। আর শোন এটা শুধু লস এঞ্জেলেস এলাকায় নয়, গোটা আমেরিকায়। মিনেসেটো, ডাকোটা, উইসকিনসিন বিশ্ববিদ্যালয়েও প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণার মাধ্যমে দেখিয়েছেন, কলম্বাসের অনেক, অনেক আগে মুসলমানরা আমেরিকায় আগমন করে। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে কলম্বাসকে আমেরিকার আবিষ্কারক হিসাবে না দেখাবার সিদ্ধান্ত হয়েছে। বল আরও প্রমাণ তোমার চাই? বল?’
আহমদ মুসা কিছু বলতে যাচ্ছিল এমন সময় কার পার্কের দিক থেকে একাধিক নারী কণ্ঠের ‘বাঁচাও’ ‘বাঁচাও’ চিৎকার ভেসে এল।
আহমদ মুসা মুহূর্তের জন্যে উৎকর্ণ হয়ে শুনেই বলল, ‘মেরী রোজ, ওগলালাদের গলা মনে হচ্ছে। আসুন জনাব।’
বলেই আহমদ মুসা ছুটল ঘর থেকে বেরুবার জন্যে। ঘর থেকে বেরিয়ে ছুটল আহমদ মুসা কার পার্কের দিকে। তার পেছনে পেছনে প্রফেসর আরাপাহো।
দূর থেকেই আহমদ মুসা দেখতে পেল, মেরী রোজ, ওগলালা, শিলা সুসান পাগলের মত চিৎকার করছে। তাদের পাশেই বিমূঢ় অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে জিভারো।
আহমদ মুসা তাদের সামনে যেতেই ওগলালা কান্না জড়িত কণ্ঠে বলে উঠল, ‘সর্বনাশ হয়ে গেছে ভাইয়া, সান ওয়াকারকে ওরা ধরে নিয়ে গেছে।’
চমকে উঠল আহমদ মুসা। বলল, ‘কারা?’
‘মনে হয় সেই চারজন। আমরা গাড়ি থেকে নেমে ঢুকতে যাচ্ছিলাম ইনষ্টিটিউটে। চারজন শ্বেতাংগ বেরিয়ে আসছিল ইনষ্টিটিউট থেকে। সান ওয়াকারকে দেখেই ওরা তার উপর ঝাপিয়ে পড়ল এবং চোখের পলকে ওরা চারজন সান ওয়াকারকে চ্যাং দোলা করে নিয়ে গাড়িতে তুলে পালিয়েছে’। ওগলালা বলল।
‘গাড়ির কি রং? নাম্বার কত?’
‘দুটোই নীল গাড়ি। গাড়ির নাম্বার খেয়াল করিনি’।
‘দুটোই গাড়ি ছিল?’ দ্রুত কণ্ঠে বলল আহমদ মুসা।
‘হ্যাঁ’।
‘নীল রং ছাড়া গাড়ির বিশেষ কোন চিহ্ণ?’
‘দুই গাড়িরই পেছনের উইন্ড স্ক্রীনে কার্ডিনাল বার্ডের ছবি আঁকা আছে’। চোখ মুছতে মুছতে বলল দ্রুত কণ্ঠে মেরী রোজ।
আহমদ মুসা চারদিকে একবার চেয়ে ছুটে গেল ওগলালাদের গাড়ির দিকে।
গাড়িতে উঠে গাড়িতে ষ্টার্ট দিতে দিতে জানালা দিয়ে প্রফেসর আরাপাহোর দিকে চেয়ে বলল, ‘আপনারা চিন্তা করবেন না জনাব। আমি দেখছি।’
আহমদ মুসার গাড়ি বেরিয়ে এল ইনষ্টিটিউট থেকে।
ইনষ্টিটিউট থেকে একটি মাত্র রাস্তা টিলার গা বেয়ে এঁকে বেঁকে নেমে গেছে নিচে।
ইনষ্টিটিউট এলাকাটা জনবিরল।
ইনষ্টিটিউটের টিলা থেকে একটা প্রশস্ত রাস্তা বেরিয়ে চলেছে কাহোকিয়ার নতুন অংশের দিকে। রাস্তাটির দু’পাশে মাঝে মাঝে দু’একটি বাড়ি ও অফিস দেখা যাচ্ছে।
আহমদ মুসা ভাবল,টিলার আঁকা-বাঁকা রাস্তা দিয়ে তারা নিশ্চয় খুব দ্রুত এগিয়ে যেতে পারেনি।টিলা থেকে নামার পরও তাদের কিছুটা পথ সরল সোজা একটা মাত্র রাস্তা ধরে এগুতে হবে।সুতরাং আহমদ মুসা নিশ্চিত যে গাড়ি দু’টির সাক্ষাত পাওয়া যাবে।
আহমদ মুসা ঝড়ের গতিতে গাড়ী চালিয়ে টিলার গোড়ায় এসে দূরে সোজা রাস্তাটি ধরে দুটি নীল গাড়িকে ছুটে যেতে দেখল।
সামনেই দুই নীল গাড়ি এবং আহমদ মুসার গাড়ি প্রানপণ ছুটে চলছে হরিণ ও নেকড়ের জীবন- মৃত্যুর লড়াইয়ের মত।
নীল গাড়ি দু’টির সাথে দুরত্ব কমে আসতেই আহমদ মুসা রিভলবার বের করল। ভাবল, ওদের গাড়ি থামাতে হলে টায়ার ফাটানো ছাড়া পথ নেই। সামনের দুই গাড়ির পেছনের গাড়িতে সান ওয়াকার না থাকলে এ গাড়ির সাথে লড়াইয়ে জড়িয়ে পরার ফাঁকে সামনের গাড়িটা পালিয়ে যাবে সান ওয়াকারকে নিয়ে।
এসব চিন্তায় আহমদ মুসা স্বীদ্ধান্ত নিয়ে সারেনি, এমন সময় সামনের দুটি গাড়ি পেছনেরটি থেকে প্রথমে দুটি, পরক্ষনেই আরও দুটি এভাবে অব্যাহত গুলী এগিয়ে আসতে লাগল।
প্রথম গুলীটি এসে আঘাত করেছিল আহমদ মুসার গাড়ির সামনের উইন্ড শিল্ডে। উইন্ড শিল্ড গুড়ো হয়ে গেল। একটা গুলী এসে আহমদ মুসার গাড়ির টায়ারে লাগল। হুমড়ি খেয়ে গাড়ি থেমে গেল আহমদ মুসার। আহমদ মুসা শংকিত হল, ওরা এই সুযোগে নিশ্চয় পালিয়ে যাবে।
আহমদ মুসা হতাশ ভাবেই তাকাল সামনের গাড়ির দিকে। কিন্তু বিস্ময়ের সাথে দেখল, সামনের দুই গাড়ির পেছনের গাড়িটা থেমে গেছে। আরও দেখল, পেছনের গাড়িকে দাড়াতে দেখে সামনের দ্বিতীয় নীল গাড়িটাও থেমে গেছে। তার মানে ওরা লড়াইয়ে নামতে চায়, ভাবল আহমদ মুসা। তারা যে সান ওয়াকারকে নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার স্বিদ্ধান্ত নেয়নি সেজন্য আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করল।
টায়ার ফেটে যাওয়ায় আহমদ মুসার গাড়িটা ডান দিকে একটা টার্ন নিয়ে থেমে গিয়েছিল। তার ফলে সামনের রাস্তাটা আহমদ মুসার ড্রাইভিং সীটের জানালার মুখোমুখি এসে গিয়েছিল।
আহমদ মুসা ড্রাইভিং সিটের ওপর মরার মত গা এলিয়ে বসেছিল এবং অস্পষ্ট ভাবে তাকিয়ে ছিল রাস্তার উপর। তার হাতে রিভলবার এবং হাতের তর্জনীটা ট্রিগারে।
দুই গাড়ি থেকে ওঁরা চারজনই নেমে এসেছে।
সামনের গাড়ির দু’জন ছুটে এসেছে পেছনের গাড়ির দু’জনের কাছে।
বলল তাদের একজন, কি ব্যাপার দাঁড়ালে কেন তোমরা?
‘শালাকে একটু দেখতে চাই। কে আমাদের পিছু নিয়েছিল।’
‘অক্কা পেয়েছে,নাকি বেঁচে আছে?’
‘চলো দেখি।’
‘না আমি দেরি করতে পারছিনা।স্যার অপেক্ষা করছেন।সান ওয়াকারকে আটকে রেখে তারপর ওখানে যেতে হবে। তুমি সোজা স্যারের ওখানে চলে যেও।’ নিজের গাড়ির দিকে ছুটতে ছুটতেই কথাগুলো বলছিল লোকটি।
কথাগুলো আহমদ মুসাও শুনতে পেল। শুনে উদ্বিগ্ন হলো সে। তাঁর কাছে এখন অবস্থা এই দাঁড়ালো, ওই দুজন সান ওয়াকারকে নিয়ে চলে যাবে, আর পেছনের দু’জনের সাথে তাঁকে এখন লড়তে হবে। অথচ এই অবস্থা এড়ানোর জন্যই আহমদ মুসা গুলি করে টায়ার ফাটিয়ে এ গাড়িকে থামাবার চেষ্টা করেনি। দুই গাড়িকে এক সাথে ধরতে চেয়েছে।
এই ভাবনার সাথে সাথে আহমদ মুসা স্বিদ্ধান্ত নিল সান ওয়াকারকে নিয়ে ওদের পালাতে দেয়া যাবেনা। আহমদ মুসা সোজা হয়ে বসল। রিভলবার ধরা ডান হাত নিয়ে এল জানালায়।
ওরা দুজন যখন তাঁদের গাড়ির দিকে ছুটছিল, এ দুজনও তখন আহমদ মুসার গাড়ির দিকে ছুটা আরম্ভ করে।
মাঝ পথে এসে আহমদ মুসাকে রিভলবার বাগিয়ে উঠে বসতে দেখে ভুত দেখার মত আঁতকে উঠল এবং আত্নরক্ষার জন্য দু’জন দু’দিকে ছিটকে পড়ল।
নিজেদের সামলে নিয়ে ওরা অতি দ্রুত ছিটকে পরবে আহমদ মুসা ভাবতে পারেনি। ফলে তার দুটি গুলী লক্ষ্য ভ্রষ্ট হলো।
লক্ষ্য সংশোধন করে আহমদ মুসা তৃতীয় গুলী ছুড়ল। ডান দিকে ছিটকে পরা লোকটিকে লক্ষ্য করে। এ গুলীটি একজনের মাথা গুড়িয়ে দিল। কিন্তু আহমদ মুসার চতুর্থ গুলী বাম দিকে ছিটকে পরা লোকটিকে আঘাত করার আগেই তার রিভলবার গুলী বর্ষণ করল। গুলীটি আহমদ মুসার বাম বাহুর কাঁধ সন্নিহিত অংশের কিছুটা ছিড়ে নিয়ে বেরিয়ে গেল। কিন্তু এই বুলেট আহমদ মুসাকে আঘাত করার আগেই আহমদ মুসাও ট্রিগার টিপেছিল। গুলীটি আঘাত করল দ্বিতীয় লোকটির একেবারে মাথায়।
গুলী খেয়ে আহমদ মুসার কেঁপে উঠেছিল দারুণভাবে। কুঁকড়ে গিয়েছিল তার দেহটি তার অজান্তেই। কিন্তু আহমদ মুসা মাথা ঝাঁকিয়ে নিজেকে সামলে নিয়ে দরজা খুলে বেরিয়ে এলো গাড়ি থেকে। তারপর ওদের রিভলবার দুটি কুড়িয়ে পকেটে পুরে ডান হাত দিয়ে আহত বাম বাহুর সন্ধিস্থলটা চেপে ধরে ছুটল ওদের গাড়ির দিকে।
গাড়িতে উঠে গাড়ির সিটে পরে থাকা তোয়ালে বাম কাঁধের ওপর দিয়ে আহত স্থানটা জানালায় চেপে ধরে গাড়িতে স্টার্ট দিল আহমদ মুসা। সামনের গাড়িটা এখন পর্যন্ত দেখা যাচ্ছিল, এইমাত্র একটা বাঁকে একটা বাড়ির আড়ালে তা ঢাকা পড়ল।
যততুকু স্পীড বাড়ানো যায়, ততটুকুও ব্যবহার করল আহমদ মুসা। বাঁক ঘুরার পর আবার সামনের গাড়িটা নজরে পড়ল আহমদ মুসার। আহমদ মুসা তার গাড়ির যতটা স্পীড বাড়িয়েছে, সামনের গাড়িটা ততটা স্পীড বাড়ায়নি।
আহমদ মুসার গাড়ি সামনের গাড়িটার নজরে পড়েছে, এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু তবু গাড়িটার মধ্যে কোন প্রতিক্রিয়া নেই কেন?
পরক্ষনেই নিজের বোকামিতে নিজেই হেসে উঠল আহমদ মুসা। এ গাড়িকে ওরা সন্দেহ করবে কেন? ওরা তো জানে আমি মরে গেছি। আর এটা ওদেরই গাড়ি এবং ওদের লোকই এ গাড়িতে।
আহমদ মুসা তার গাড়ির স্পীড আর বাড়াল না। ভাবতে লাগল, এখন তার করনীয় কি? সে ওদের একজনকে বলতে শুনেছে, সান ওয়াকারকে কোথাও বন্দী করে ওরা স্যারের সাথে দেখা করতে যাবে। সে কি ওদের অনুসরন করে ওদের আস্তানায় যাবে? ওদের স্যার কে তা কি সে দেখবে? না সামনের গাড়ির অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে ওদের ওপর চড়াও হয়ে সান ওয়াকারকে মুক্ত করে আনবে? দুই ক্ষেত্রেই ঝুকি আছে।
রাস্তায় এভাবে খুনাখুনি যেমন নিরাপদ নয়,তেমনি ওদের আস্তানা কি, কেমন তার কিছুই সে জানেনা।
সামনেই আরেকটি বাঁক। বাঁক নিয়ে রাস্তাটি সেখানে একটি বাগানে প্রবেশ করেছে। বাঁক নিয়ে সামনের গাড়িটা আবার চোখের আড়ালে চলে গেল।
আহমদ মুসা আবার দ্রুত করল গাড়ির গতি। আহমদ মুসা বাঁকে পৌঁছে দেখল, একটু সামনে রাস্তার ডান পাশে একটা গাছের ছায়ায় দাড়িয়ে সামনের সেই নীল গাড়িটা। আহমদ মুসা বুঝল,ওঁরা গাড়ি থামিয়ে ওদের সাথীদের অপেক্ষা করছে।
বাঁক থেকে প্রায় সিকি মাইল পরিমান জায়গা নিয়ে রাস্তার দু’পাশে ‘হোয়াইট ওক’ এর বাগান। অভ্যন্তরটা ঝোপ-ঝাড়ে একদম সড়কের প্রান্ত থেকেই।
আহমদ মুসা আকস্মিক এই নতুন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে মুহূর্তের জন্য দ্বিধায় পড়ে গিয়েছিল। কিন্তু দাঁড়াবার উপায় ছিল না। দাঁড়াবার অর্থ ধরা পড়ে যাওয়া। এখন প্রস্তুত শত্রুর বিরুদ্ধে তাকে লড়তে হবে। তার চেয়ে ধোঁকায় পড়া শত্রুর অপ্রস্তুত অবস্থার সুযোগ নিয়ে তাদের উপর আকস্মিকভাবে চড়াও হওয়া অনেক বেশি উত্তম।
আহমদ মুসা তার গাড়ির গতি না কমিয়ে এগিয়ে চলল সামনের গাড়িটার দিকে।
আহমদ মুসার গাড়ি সামনের দাড়িয়ে থাকা গাড়ি বরাবর রাস্তার উপর দাড়াতেই গাড়িটার দিকে তাকিয়ে চমকে উঠল আহমদ মুসা। গাড়িতে হাত,পা,মুখ বাঁধা অবস্থায় সান ওয়াকার বসে আছে, আর কেউ নেই। সঙ্গে সঙ্গেই আহমদ মুসা বুঝতে পারলো যে সে ওদের ফাঁদে পড়ে গেছে।
পাশ থেকে রিভলবার হাতে তুলে নিল আহমদ মুসা। দু’পাশে তাকাতে গিয়ে দেখল তার গাড়ির দু’পাশে দু’জন এসে দাঁড়িয়েছে। তাঁদের হাতের উদ্যত রিভলবার তাকে তাক করা।
তার জানালার পাশের জন হো হো করে হেসে উঠল। বলল, তুমি সত্যিই প্রথমে আমাদের বোকা বানিয়েছিলে। গাড়ি দেখে আমারা ভেবেছিলাম আমাদের সাথীরাই আসছে। কিন্তু তুমি আমাদের দুই সাথীকে হত্যা করে আমাদেরই গাড়ি নিয়ে আমাদের ধাওয়া করছ তা বুঝিনি। মোবাইলে যোগাযোগ করতে গিয়ে দেখলাম আমাদের সাথীর টেলিফোন নীরব। বুঝলাম আমাদের সাথীরা নেই। গাড়ি নিয়ে আসছে তাহলে আমাদের কোন শত্রু। সে শত্রুকে দেখার জন্যই আমরা এখানে দাঁড়িয়েছি।
বলে একটু থেমে আবার বলল, ‘তোমার রিভলবারটা আমাকে দিয়ে দাও’। ক্রুদ্ধ কণ্ঠ তার। চোখে তার খুনের নেশা চকচক করছে।
আহমদ মুসা তাকাল একবার তার দিকে। আরেকবার ডান পাশের রিভলবারধারীর দিকে। তারপর রিভলবারটা তুলে দিল নির্দেশকারীর হাতে।
‘গাড়ির দরজা খুলে বেরিয়ে এস। তোমার রক্তে আমাদের গাড়ি নষ্ট করতে চাই না, ইতিমধ্যে কিছুটা নষ্ট করেছ। রাস্তার চেয়ে জঙ্গলে তোমার লাশ পড়লে পশু-পাখিদের কিছুটা সুবিধে হবে’। দ্বিতীয় নির্দেশ ধ্বনিত হলো সেই প্রথম লোকটির কণ্ঠে।
আহত বাম হাত দিয়ে দরজা খুলতে গিয়ে ব্যাথায় অজান্তেই ‘আঃ’ বলে উঠল আহমদ মুসা।
‘নেমে এস আহতের ব্যাথা আর বেশিক্ষন থাকবে না’। বিদ্রুপ ঝরে পড়লো লোকটির কণ্ঠে।
আহমদ মুসা খুলে ফেলল গাড়ির দরজা। লোকটি দাঁড়িয়েছিল দরজা সোজা মাত্র দু’গজের মত দুরে। আহমদ মুসা ডান হাত দিয়ে বাম বাহুর আহত জায়গাটা চেপে ধরে বসে থেকেই দু’পা ঘুরিয়ে দরজার দিকে এল। দু’পা নামাল মাটি স্পর্শ করার ভঙ্গিতে। একবার তাকাল লোকটির দিকে।তার রিভলবার ধরা হাত কিছুটা নেমে গেছে।
আহমদ মুসা চোখ সরিয়ে নিয়েই তার দু’হাত বিদ্যুতবেগে মাটির দিকে ছুড়ে দিয়ে দেহটা উল্টিয়ে নিয়ে দু’পায়ের জোড়া লাথি চালাল সামনের লোকটির বুকে। লোকটি ছিটকে পড়ে গেল। তার হাতের রিভলবার ছিটকে পড়ে গেল হাত থেকে।
আহমদ মুসা মাটিতে পড়ে থাকা অবস্থাতেই পাশে দেখতে পেল রিভলবার। রিভলবার কুড়িয়ে নিল আহমদ মুসা।
লোকটি পড়ে গিয়েই তড়িঘড়ি করে উঠে দাঁড়াচ্ছিল।
আহমদ মুসা শুয়ে থেকেই তাকে গুলী করল।
সোজা হয়ে উঠে দাঁড়াবার আগেই লোকটি গুলী খেয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেল।
গাড়ির ডান পাশের রিভলবারধারী লোকটি ঘটনার আকস্মিকতা কাটিয়ে উঠার পর গাড়ির ওপাশ থেকে রিভলবার তাক করতে গিয়ে শুয়ে থাকা আহমদ মুসাকে নাগালের মধ্যে পেল না। সে ছুটল গাড়ির পাশ ঘুরে এদিকে আসার জন্য।
ওদিকে আহমদ মুসা গুলী করেই দ্রুত গতিতে গাড়ির পাশে এসে উঠে বসেছে।
সে উঠে বসেই গাড়ির খোলা দরজা পথে উইন্ডশিল্ডের কাঁচের মধ্য দিয়ে দেখতে পেল, ডান পাশের লোকটি দৌড়াচ্ছে গাড়ি ঘুরে এদিকে আসার জন্য।
আহমদ মুসা গুলী করল। কিন্তু গুলীটা লক্ষ্যভ্রষ্ট হলো। গুলীটা পেছন দিক দিয়ে চলে গেল।
গুলির শব্দে লোকটি সঙ্গে সঙ্গেই বসে পড়েছে।
লোকটির কোন সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছে না। আহমদ মুসা বসা অবস্থায় গুটি গুটি এগুল গাড়ির সামনের দিকে গাড়ির গা ঘেঁষে।
আহমদ মুসা যখন গাড়ির সামনের প্রান্তে পৌঁছে গেছে, তখন রাস্তার পাশে দাঁড়ানো ওদের গাড়ির স্টার্ট নেয়ার শব্দ পেল আহমদ মুসা।
আহমদ মুসা চমকে উঠে দাঁড়াল। পালাচ্ছে লোকটি সান ওয়াকারকে নিয়ে।
গাড়ি তখন ছুটতে শুরু করেছে, আহমদ মুসা ছুটন্ত গাড়ি লক্ষে গুলী করল পর পর দু’বার। একটি গুলী ব্যর্থ হলো। দ্বিতীয় গুলী গিয়ে আঘাত করল গাড়িটার পেছনের টায়ার।টায়ার ফাটা গাড়িটা এঁকে বেঁকে কিছুটা এগিয়ে নেমে গেল। আহমদ মুসা ছুটল গাড়ির দিকে। কিন্তু গাড়ির কাছাকাছি হয়ে দেখল লোকটি তার গাড়ির ডান পাশের দরজা দিয়ে বের হয়ে ছুটছে জঙ্গলের দিকে। আহমদ মুসা যখন গাড়ির পাশে এসে দাঁড়াল, তখন লোকটি জঙ্গলে ঢুকে গেছে।
আহমদ মুসা সেদিক থেকে চোখ ফিরিয়ে তাকাল সান ওয়াকারের দিকে। তাড়াতাড়ি গাড়ির দরজা খুলে মুখ ও হাত-পায়ের বাধন খুলে দিল তাঁর।
সে মুক্ত হয়েই দু’হাত দিয়ে চেপে ধরল আহমদ মুসার আহত বাহু-সন্ধিস্থল। আহত জায়গা দিয়ে তখনও রক্ত বেরুচ্ছে। বলল সান ওয়াকার, ‘আহমদ মুসা ভাই আপনি ভীষণ আহত।’ আর্ত কণ্ঠ সান ওয়াকারের।
‘সান ওয়াকার তাড়াতাড়ি চলো।’
বলে আহমদ মুসা গাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো। সান ওয়াকারও।
আহমদ মুসা ও সান ওয়াকার ওদের পরিত্যক্ত নীল গাড়িতে এসে উঠল।
আহমদ মুসা ড্রাইভিং সিটের পাশের সিটে বসে বলল, ‘তুমি গাড়ি চালাও সান ওয়াকার।’
সান ওয়াকার ড্রাইভিং সিটে বসে বলল, ‘আপনার আহত জায়গার রক্ত বন্ধ করার জন্য প্রথমেই কিছু করা দরকার আহমদ মুসা ভাই’।
সিটের পাশ থেকে তোয়ালে তুলে নিয়ে আহত জায়গায় চেপে ধরে বলল, ‘এ নিয়ে তুমি ভেবনা। তাড়াতাড়ি তুমি ইন্সটিটিউটে চলো। ওঁরা দারুন কান্নাকাটি করছে’।
সান ওয়াকার হাসল। কান্নার মত হাসি। বলল, ‘আপনি ওদের কান্নার কথা ভাবছেন। নিজের কথা একটুও ভাববেন না যে, আপনি গুলিবিদ্ধ, অবিরাম রক্ত ঝরছে আহত স্থান থেকে’।
বলে সান ওয়াকার গাড়ি স্টার্ট দিল।
তিরবেগে গাড়ি ছুটে চলল ইন্সটিটেউটের উল্টো দিকে।
‘কোথায় চললে সান ওয়াকার?’ বলল আহমদ মুসা।
‘আমাদের নিজস্ব একটা ক্লিনিকে,কাহোকিয়ার পুরানো অংশে। কাছেই’।
‘তাহলে তুমি ভালো আছো এটা ওদের জানাতে পারলে ভালো হতো।’
‘আমি কেমন আছি সেটা জানাবার জন্যে ব্যাস্ত হয়ে পড়লেন, আপনি কেমন আছেন তা কাউকে জানাবার বুঝি প্রয়োজন নেই?’
‘তুমি ভিন্ন দিকে নিয়ে যাচ্ছ। আমি একথা বলছি কারন, ‘ওঁরা ভীষণ উদ্বেগ-উৎকন্ঠার মধ্যে আছে।’
‘ঠিক আছে তোমার সাথে একমত হলাম’। হেসে বলল আহমদ মুসা।
‘ধন্যবাদ ভাইয়া।’
আহমদ মুসা কি যেন ভাবছিল। কোন কথা বলল না। ছুটে চলছে তখন গাড়ি।

ওগলালা কিভাবে সান ওয়াকার কিডন্যাপড হলো বিস্তারিত বিবরন দিয়ে থামল।
ওগলালার পাশে বসে ছিল তাঁর আব্বা প্রফেসর আরাপাহো এবং তাঁর অন্য পাশে বসেছিল মেরী রোজ ও শিলা সুসান। তাঁদের সামনে বসেছিল পুলিশ প্রধান চিনক এবং ফেডারেল কমিশনার মিঃ ট্যালন্ট।
আহমদ মুসা সান ওয়াকারের সন্ধানে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে যাবার পর পরই প্রফেসর আরাপাহো টেলিফোনে বিষয়টা পুলিশ প্রধান মিঃ চিনক ও ফেডারেল কমিশনার মিঃ ট্যালন্টকে জানান। প্রফেসর আরাপাহো একজন শীর্ষ রেড ইন্ডিয়ান তো বটেই গোটা দেশেও একজন সন্মানিত ব্যক্তি।তাঁর টেলিফোন উপর মহলে প্রচণ্ড আলোড়ন সৃষ্টি করে। তাছাড়া সান ওয়াকার মুক্ত হবার পর আবার এভাবে কিডন্যাপড হবে, পুলিশ কোনই দায়িত্ব পালন করবে না, এটা সরকারের জন্য অস্বস্থিকর। তাই প্রফেসর আরাপাহোর টেলিফোন পাবার পর পরই ফেডারেল কমিশনার ও পুলিশ প্রধান পুলিশ বাহিনী নিয়ে ছুটে আসে প্রফেসর আরাপাহোর অফিসে।
তারা প্রথমে প্রফেসর আরাপাহোর প্রাথমিক একটা বক্তব্য নেয়ার পর ঘটনাস্থলে উপস্থিতিদের মধ্য থেকে ওগলালার জবানবন্দী গ্রহন করছিল।
ওগলালার জবানবন্দী শেষ হবার সংগে সংগেই পুলিশ প্রধান চিনক বলল, ‘গাড়ির রঙ কি ছিল?’
‘নীল’। বলল ওগলালা।
‘দুই গাড়িরই?’
‘জ্বি’।
‘মানুষ চার জনই শ্বেতাঙ্গ?’
‘আপনাদের বন্ধু যে গাড়ি নিয়ে সান ওয়াকারের সন্ধানে গিয়েছিলেন, সে গাড়ির রঙ কি ছিল?’
‘সাদা’।
‘সাদা?’
প্রশ্নটা জিজ্ঞেস করেই পুলিশ প্রধান চিনক তাকাল ফেডারেল কমিশনার ট্যালন্টের দিকে।
বলল, ‘স্যার এদের আমরা স্পটে নিয়ে যেতে পারি। বিষয়টা তাহলে আমাদের কাছে আরও পরিষ্কার হবে’।
‘ঠিক বলেছ চিনক’। বলল ট্যালন্ট।
‘কোন স্পটে? কোথায়?’ বলল প্রফেসর আরাপাহো।
পুলিশ প্রধান বলল, ‘স্যার আমরা আসার সময় দুটি স্থানে টায়ার ফাটা ও উইন্ডশিল্ড ভাঙ্গা দু’টি গাড়ি রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখে এসেছি। একটি গাড়ির সামনে দেখে এসেছি দুটি লাশ, আরেকটির পাশে একটি’।
পুলিশ প্রধানের কথা শোনার সাথে সাথে প্রফেসর আরাপাহোসহ ওগলালাদের সকলের মুখ উদ্বেগ-উৎকন্ঠায় ভরে গেল।
‘গাড়ি দুটির রঙ কি?’ প্রশ্ন করল মেরী রোজ।
‘একটা নীল, অন্যটা সাদা’। বলল পুলিশ প্রধান।
সাদা রঙের কথা শুনে আরও মুষড়ে পড়ল ওগলালা ও মেরী রোজ।
আহমদ মুসা যে গাড়ি নিয়ে যায় তাঁর রঙ সাদা।
‘চলুন স্পটে যাওয়া যাক, কিছুই বুঝতে পারছিনা।’ বলল প্রফেসর আরাপাহো।
‘চলুন।’ পুলিশ প্রধান উঠে দাড়াতে দাড়াতে বলল।
প্রথম স্পটে তাঁরা গেল।
টায়ার ফাটা ও উইন্ডশিল্ড ভাঙ্গা ওই সাদা গাড়িতেই সান ওয়াকারের বন্ধু কিডন্যাপকারীদের পিছু নিয়েছিল, তা নিশ্চিত করল ওঁরা সবাই এবং ওঁরা বলল, গাড়ির সামনে পড়ে থাকা লাশ কিডন্যাপকারীদের দু’জনের।
আহমদ মুসার গাড়ি এভাবে পড়ে থাকতে দেখে ভয়ানকভাবে মুষড়ে পড়লো ওগলালা ও মেরী রোজ। তাঁদের বুঝতে বাকি রইল না, ওখানে কিডন্যাপকারীদের সাথে আহমদ মুসার সংঘাত হয়েছে। দু’জন কিডন্যাপকারী আহমদ মুসার হাতে মরেছে বটে, কিন্তু আহমদ মুসাও আক্রান্ত হয়। অবশেষে নিশ্চয়ই ওঁরা সান ওয়াকারের সাথে আহমদ মুসাকেও ধরে নিয়ে গেছে।
ওদিকে পুলিশ প্রধান এবার কিডন্যাপকারী বলে শনাক্তকৃত লাশ দুতিকে ভালো করে দেখতে গিয়ে চমকে উঠল, এরাতো মিঃ ডেভিডের সেই চার সাথীর দু’জন। চমকে উঠার পর উত্তেজিত হয়ে পড়লো চিনক। তাহলে মিঃ ডেভিডের চার সাথীই এখানে চার কিডন্যাপকারী?
পুলিশ প্রধান ফিস ফিস করে কথা বলল ট্যালন্টের কানে কানে।
ট্যালন্টও চমকে উঠল ভীষণ।
এগিয়ে এসে সেও ভালো করে দেখল দু’টি লাশকে। বলল ঠিকই বলেছ চিনক।
বলে একটু থেমেই বলল, ‘তাহলে চিনক তোমার প্রশ্নের সমাধান হয়ে যাচ্ছে, আগের ঘটনাতেও এই চারজন কোন কিডন্যাপ প্রচেষ্টার সাথেই জড়িত ছিল। তুমি যে অনুমান করে ছিলে তা সত্যি’।
‘ধন্যবাদ স্যার’।
বলেই কুঞ্চিত কপাল প্রফেসর আরাপাহোর দিকে চেয়ে দ্রুত কণ্ঠে বলল, ‘স্যার এ কিডন্যাপকারীদের আমরা চিনতে পেরেছি। এর আগেও এরা চারজন সম্ভবত কোন কিডন্যাপের চেষ্টা করতে গিয়ে আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল’।
‘কোথায় সে ঘটনা ঘটেছিল?’
‘এয়ারপোর্ট রোডে ব্রীজের পাশে’। শুনে চমকে উঠল প্রফেসর আরাপাহো এবং তাঁর সাথের অন্যরাও। বলল প্রফেসর আরাপাহো, ‘অবাক ব্যাপার, সেখানে তো সান ওয়াকার, এই মেরী রোজ ও শিলা সুসানরাই চারজন দুর্বৃত্তের কিডন্যাপ চেষ্টার মুখে পড়েছিল। আর সেখানেও তো এদের এই বন্ধু লোকটিই ঐ চারজনকে গুলী করে আহত করে এদের রক্ষা করেছিল। পালিয়ে গিয়েছিল কিডন্যাপকারীরা। সে ঘটনাতেও তাঁরা দুটি গাড়ি ব্যাবহার করেছিল, আজও দুটি ব্যাবহার করেছে’।
বিস্ময়ে ছানাবড়া হয়ে গেল পুলিশ প্রধান চিনক এবং ট্যালন্টের চোখ। তাঁরা কিছুক্ষন কথা বলতে পারলো না বিস্ময়ের ধাক্কায়।
একটু পর পুলিশ প্রধান বলল প্রফেসর আরাপাহোকে লক্ষ্য করে, ‘স্যার আপনার কথার পর এখন আমার মনে হচ্ছে, এই দুই কিডন্যাপ প্রচেষ্টার টার্গেট সান ওয়াকার। আমি জানিনা এই কিডন্যাপ প্রচেষ্টার সাথে ওয়াশিংটনে সান ওয়াকার কিডন্যাপ হওয়ার ঘটনার কোন যোগ আছে কিনা’।
‘আমি প্রার্থনা করি, তুমি যা বললে ঘটনা এমন হোক। হলে সেটা হবে বড় ঘটনা। এখন চলো দ্বিতীয় স্পটে যাওয়া যাক’। বলল ট্যালন্ট।
মেরী রোজ, ওগলালা এবং শিলা সুসান তিনজনই বসে গাড়ির কাছে। তিনজনেরই বিপর্যস্ত চেহারা। সবাই গাড়িতে উঠেছে। প্রফেসর আরাপাহো গাড়িতে উঠেছে। জিভারো গাড়ির দিকে এগুতে এগুতে সুসানকে লক্ষ্য করে বলল, ‘সুসান ওদের নিয়ে এস।’
সবাই গাড়িতে উঠল।
দ্বিতীয় স্পটে গিয়ে মেরী রোজ ও ওগলালা নিহত লোকটিকে দেখে বলল, ‘এ লোকটিও চার কিডন্যাপকারীদের একজন। গাড়ীকেও তাঁরা চিনতে পারল। তাঁরা বলল দুই গাড়িরই রঙ নীল ছিল এবং দুই গাড়িরই পেছনের উইন্ড স্ক্রীনে কার্ডিনাল বার্ড –এর ছবি আঁকা ছিল।’
প্রফেসর আরাপাহো বলল, ‘মিঃ চিনক, কি বুঝছেন বলুন? কিডন্যাপকারী তিনজন মারা গেল কিভাবে? আমাদের গাড়ির টায়ারে গুলী, উইন্ড স্ক্রীন ভাঙল কে? ওদের এই গাড়ি নষ্ট করল কে? কিডন্যাপকারীদের একজন এখানে মারা গেল কিভাবে?
পুলিশ প্রধান চিনক ভাবছিল। বলল, ‘কি ঘটেছিল বলা মুস্কিল। এটুকু বলা যায়, ঘোরতর লড়াই হয়েছে। ওঁরা আপনাদের গাড়ি প্রথমে নষ্ট করেছে। তারপর আপনাদের লোক ওদের দু’জনকে হত্যা করেছে, যারা তাঁর গাড়ির দিকে আসছিল। আপনাদের লোক অবশিষ্ট দুই কিডন্যাপকারীদের হাতে বন্দী হয়ে বা তাঁদের অনুসরন করে এখানে আসে। এখানে আসার পর আপনাদের লোকের হাতে কিডন্যাপকারীদের একটি গাড়ি নষ্ট হয় ও একজন মারা যায়। তারপর কি ঘটেছে বলা মুস্কিল। অবশিষ্ট একজন কিডন্যাপার সান ওয়াকার সহ আপনাদের লোককে বন্দী করে নিয়ে গেছে,এটা যেমন অবিশ্বাস্য ঠেকছে। তেমনি আপনাদের লোক অবশিষ্ট কিডন্যাপারকে বন্দী বা বিতারিত করে সান ওয়াকারকে মুক্ত করেছে, এর কোন প্রমান দেখা যাচ্ছেনা’। থামল পুলিশ প্রধান।
চিনক থামতেই ফেডারেল কমিশনার ট্যালন্ট বলল, ‘চলো চিনক। প্রথমে থানায় গিয়ে ত্বরিত পদক্ষেপের ব্যাবস্থা নিতে হবে। সান ওয়াকার যদি ওদের হাতে বন্দী হয়ে থাকে, তাহলে ওঁরা যাতে কাহোকিয়া এলাকার বাইরে যেতে না পারে তাঁর ব্যবস্থা এখুনি নিতে হবে। থানাকে তুমি-আমি বলেছি বটে, কি করল চল দেখি গিয়ে।’
একটু থামল। থেমেই তাকাল প্রফেসর আরাপাহোর দিকে। বলল, জ্বনাব, প্রয়োজনে আমরা আপনাদের ডাকব এবং আমরাও আসব। ঘটনার জন্য আমরা দুঃখিত। আমরা সব রকম সহায়তা দিতে চেষ্টা করব’। থামল ট্যালন্ট।
পুলিশ প্রধান চিনক বলল, স্যার, প্রথমে আমি মিঃ ডেভিডের ওখানে যেতে চাই। তাঁর একটা বক্তব্য না পেলে সবকিছু স্পষ্ট হবেনা।
‘ঠিক আছে। থানা হয়ে তুমি যাবে।’
‘অল রাইট স্যার।’
বলে পুলিশ প্রধান তাঁর পাশে দাঁড়ানো এক অফিসারকে নির্দেশ দিল লাশ ও গাড়িগুলোর ব্যাবস্থা করতে।
বিদায় নিয়ে ট্যালন্ট ও পুলিশ প্রধান চলে গেল তাঁদের অফিসের দিকে।
আর প্রফেসর আরাপাহো সবাইকে গাড়িতে উঠার ইঙ্গিত করে বলল, ‘চল সবাই অফিসে যাই। ওখানকার ব্যাবস্থা করে বাড়ি ফিরব।
সবাই গাড়িতে উঠল। গাড়ি স্টার্ট নিল। গাড়ি চলছিল। গাড়ির শব্দ শুনে পেছনে তাকাল ওগলালা।
পেছনে তাকিয়েই চিৎকার করে উঠল ওগলালা, ‘ভাইয়া, সান ওয়াকার।’
সবাই পেছনে তাকাল। জিভারো গাড়ি রাস্তার পাশে দাড় করাল।
পেছনের গাড়িটা ড্রাইভ করছিল সান ওয়াকার। পাশের সিটে বসে ছিল আহমদ মুসা। তাঁর বাম বাহুর গোঁড়ায় ব্যান্ডেজ বাঁধা, জামা-কাপড় রক্তে ভেজা।
তাঁরা ফিরছিল ক্লিনিক থেকে। জিভারো গাড়ি থামাতেই গাড়ির সবাই গাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছিল। সান ওয়াকার গাড়ি দাড় করাতেই চারদিক থেকে তাঁরা ঘিরে দাঁড়ালো গাড়ি। আহমদ মুসার রক্তাক্ত জামা-কাপড় এবং বাহুতে ব্যান্ডেজ দেখে আঁতকে উঠল সবাই।
গাড়ি থেকে নামল সান ওয়াকার। বলল, ‘আহমদ মুসা ভাই গুলিতে আহত। ভয়ের কিছু নেই। গুলীটা বাহুর গোঁড়ার মাসল-এর কিছুটা অংশ ছিড়ে নিয়ে বেরিয়ে গেছে’।
বেরিয়ে এলো আহমদ মুসাও। হাসল। বলল, ‘সব ঠিক আছে। ওদের চারজনের একজন পালিয়েছে। শত্রুরা ইতিমধ্যে সব খবর পেয়ে গেছে। চল তাড়াতাড়ি আমরা ফিরি। অনেক ভাববার আছে’।
‘কিছু করার চিন্তা বাদ দাও। তুমি আহত। তোমার বিশ্রাম ও চিকিৎসা দরকার। পুলিশ এসেছিল। তাঁরা বড় ধরনের সন্দেহ করেছে। মনে করছে ওয়াশিংটনে যারা সান ওয়াকারকে কিডন্যাপ করেছিল, তারাই এক্ষেত্রে জড়িত থাকতে পারে। তাঁরা কাজ শুরু করে দিয়েছে।’
‘আমার সন্দেহ তাই।’
‘আমরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলাম গাড়ি নষ্ট অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে। কি হয়েছিল আমাদের অল্প কথায় কিছু বল।’
‘ওটা সান ওয়াকারের কাছে শুনবেন। ওর হাত,পা ও মুখ বাঁধা থাকলেও চোখ খোলা ছিল। সে সবকিছু দেখেছে ওদের গাড়িতে বসে।’
‘সব বলব, অনেক সময় লাগবে। এখন এটুকু জানিয়ে রাখি, তাঁর গাড়ি আক্রান্ত ও অকেজো হয়ে পরার পর ভাইয়াকে মৃত মনে করে ওদের দু’জন যখন তাকে দেখতে যায়, তখন ঐ দু’জন নিহত হয়, আর ভাইয়া আহত হন। আহত অবস্থাতেই তিনি আমি যে গাড়িতে বন্দী ছিলাম সেই গাড়িকে অনুসরন করেন। অবশেষে ওদের একজনকে হত্যা করে আমাকে মুক্ত করেন। শ্ত্রুদের একজন পালিয়ে গেছে’।
সান ওয়াকার থামতেই আহমদ মুসা বলল প্রফেসর আরাপাহোকে লক্ষ্য করে, ‘পুলিশ ওদের পরিচয় সম্পর্কে কিছু বলেছে?’
‘পরিচয় সম্পর্কে বলেনি, তবে পুলিশ ওদের জানে। ওঁরা চারজন আহত অবস্থায় এর আগে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল। সম্ভবত এদের পরিচয় ঠিকানাও পুলিশ জানে’। বলল প্রফেসর আরাপাহো।
‘পুলিশ কি ওদের ঠিকানা জানে? জেনে নেয়া যাবে তাঁদের কাছ থেকে?’
‘চেষ্টা করতে পারি। কিন্তু কেন? ওদের তিনজন তো মারাই গেছে’।
‘ওঁরা চারজন সব নয়। আর আসল লোকও তাঁরা নয়। ওদের যারা চালাচ্ছে, কাজে লাগাচ্ছে তারাই আসল। এদের ঠিকানা পেলে ওঁদেরও সন্ধান করা যাবে।’
‘তুমি এসব নিয়ে এখন চিন্তা করোনা। পুলিশ এটা করছে।’
‘পুলিশ অবশ্যই করবে, কিন্তু আমাদেরও জানা প্রয়োজন।’
‘ঠিক আছে চল। খোঁজ করা যাবে।’
বলে গাড়িতে উঠল প্রফেসর আরাপাহো। সবাই গাড়িতে উঠে বসল। ছুটে চলল দুই গাড়ি।