৫১. প্যাসেফিকের ভয়ংকর দ্বীপে

চ্যাপ্টার

আহমদ মুসাদের গাড়ি যখন সে সুপার মার্কেটের কারপার্কিং-এ প্রবেশ করছিল, তখন ওরা তিনজনে ধরে মাহিনকে চ্যাং দোলা করে গাড়িতে তুলছিল।
আহমদ মুসা মাহিনকে গাড়িতে তুলতে দেখল। বুঝল মারেভাকে আগেই গাড়িতে পুরা হয়েছে। মারেভার চিৎকারও শোনা যাচ্ছে।
মারেভা ও মাহিনের ‘বাঁচাও বাঁচাও’ চিৎকার চারদিকের পরিবেশকে সত্যিই আতংকিত করে তুলেছে। আসলেই তারা অভিনয় করছে না, আতংকগ্রস্ত হয়ে বাঁচার জন্যে চিৎকার করছে। নিখুঁত অভিনয় ও বাস্তব আচরণের মধ্যে আসলেই বোধ হয় কোন পার্থক্য নেই।
তাদের চিৎকারে সুপার মার্কেটের সামনে অনেক লোক জমেছে। মার্কেটের ভেতর থেকেও লোক বেরিয়ে এসেছে। কিন্তু কেউ কিছু করছে না। তাদের দিকে ষ্টেনগান তাক করে আছে কিডন্যাপারদের সহচর একজন। তারা আগে ফাঁকা গুলিও ছুঁড়েছে। তাতেই আতংকগ্রস্ত হয়ে পড়েছে সকলে।
গাড়ি থামতেই আহমদ মুসা গাড়ি থেকে নামল। তার ডান হাতে রিভলবার।
বের হয়েই আহমদ মুসা বিরভলবার তুলল ষ্টেনগানধারীর উদ্দেশ্যে। বলল, ষ্টেনগান ফেলে দাও। আমি এক আদেশ দু’বার দেই না।
ষ্টেনগানধারী চরকির মত বোঁ করে ঘুরে দাঁড়াল। তার ষ্টেনগানের নলও ঘুরে এল আহমদ মুসার উদ্দেশ্যে অবিশ্বাস্য দ্রুততার সাথে। তারও আঙ্গুল ষ্টেনগানের ট্রিগারে।
আহমদ মুসা আত্মরক্ষার জন্যে মুহূর্তও সময় নষ্ট করেনি। ঠিক সময়েই তার তর্জনি চেপে বসেছে ট্রিগারে। ষ্টেনগানধারীর ষ্টেনগানের নলের গা ঘেঁষে বুলেটটি লোকটির বাঁ বুকে গিয়ে বিদ্ধ হলো।
যারা মাহিনকে গাড়িতে ঢুকাচ্ছিল, তারাও ঘুরে দাঁড়িয়েছে। তার তাদের গুলিবিদ্ধ সাথীর দিকে একবার তাকিয়ে দ্রুত পকেট থেকে রিভলবার বের করেছে। কিন্তু ইতিমধ্যেই তারা আহমদ মুসার টার্গেটে পরিণত হয়েছে।
আহমদ মুসা ষ্টেনগানধারীকে গুলি করেই ওদের তিনজনকে টার্গেট করেছে। ওদেরকে রিভলবার বের করতে দেখে আহমদ মুসা বলল, তোমরা রিভলবার ফেলে দাও, তা না হলে তোমাদেরকেও এই সাথীর মত…।
আহমদ মুসা কথা শেষ করতে পারলো না। ওদের রিভলবার তাকে টার্গেট করে উঠে আসছে দেখে আহমদ মুসা রিভলবারের ট্রিগার টিপে দিল পর পর তিনবার। কিন্তু সর্ববামের লোকটির ক্ষেত্রে টার্গেট মিস হলো। তার বাম কাঁধে গুলি লাগল। সে গুলি চালাবারও সুযোগ পেয়েছিল, কিন্তু আহমদ মুসার গুলি গিয়ে আঘাত করল আহমদ মুসার বাম বাহুসন্ধির উপরের অংশে। অদ্ভুত ষ্ট্যামিনা লোকটির! নিজের গুলিবিদ্ধ কাঁধের দিকে কোন খেয়াল নেই তার। প্রথম গুলিটা টার্গেটে লাগেনি দেখে রিভলবারসমেত তার ডান হাত উঠে আসছিল আহমদ মুসার লক্ষে।
কিন্তু আহমদ মুসা তা হতে দিল না। তার রিভলবার এই তৃতীয় টার্গেটের দিকে তাক করাই ছিল। শুধু ট্রিগার টেপার বাকি। ট্রিগার টিপে দিল সে। আহমদ মুসার লক্ষ এবার ছিল লোকটির ডান হাত।
ওদের একজনকে জীবন্ত ধরার প্রয়োজন ছিল খুব বেশি। কিন্তু সে সুযোগ এ পর্যন্ত হয়নি। এবারের সুযোগটিকে সে কাজে লাগাল।
আহমদ মুসার গুলি গিয়ে লোকটির একবারে কবজিতে বিদ্ধ হলো। তার হাত থেকে রিভলবার পড়ে গেল।
লোকটি সাংঘাতিক বেপরোয়া!
রিভলবারটি গুলিবিদ্ধ ডান হাত থেকে খসে পড়ার সাথে সাথে সে বসে পড়ল এবং বাম হাত দিয়ে রিভলবারটি তুলে নিল।
তার গুলিবিদ্ধ ডান কাঁধের অসম্ভব যন্ত্রণা সে উপেক্ষা করে রিভলবার বাম হাতে তুলে নিয়ে আহমদ মুসাকে টার্গেট করার চেষ্টা করল।
তার রিভলবার উঠে আসছিল আহমদ মুসার দিকে।
আহমদ মুসা নিরুপায়। গুলি করে লোকটির বাম হাতটা নিস্ক্রিয় করে দেয়াই আহমদ মুসার বাঁচার উপায়।
আহমদ মুসার রিভলবার লোকটির দিকে তাক করাই ছিল। ট্রিগার টিপল শুধু।
গুলিটি গিয়ে বিদ্ধ করল লোকটির ডান বাহুকে। রিভলবারসমেত তার বাম হাত আছড়ে পড়ল মাটিতে।
লোকটি সম্ভবত তার হতাশা ও ব্যর্থতায় মাটিতে শুয়ে পড়ল।
মাহিন ও মারেভা আগেই গাড়ির ওপাশের দরজা দিয়ে বেরিয়ে গাড়ির আড়ালে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল। আতংকগ্রস্ত তাদের চোখ-মুখ। আহমদ মুসার বাম বাহুসন্ধিতে গুলি লাগতে দেখে দু’জনেই যন্ত্রণায় ককিয়ে উঠেছিল, যেন গুলিটা তাদের লেগেছে।
গুলি বন্ধ হতেই মাহিন ও মারেভা দু’জন ছুটে গেল আহমদ মুসার কাছে।
ওদিকে সুপার মার্কেটের সামনের লোকরা গুলি শুরু হলে কেউ সুপার মার্কেটের ভেতরে সরে গিয়েছিল, কেউ সুপার মার্কেটের সিঁড়িতে শুয়ে বা বসে ছিল। গুলি বন্ধ হলে তারা সবাই বেরিয়ে এল। সবাই হাততালি দিয়ে কিডন্যাপিং থেকে মাহিন ও মারেভার উদ্ধার পাওয়াকে স্বাগত জানাল।
তেপাও এসে আহমদ মুসার পাশে দাঁড়িয়েছে।
তেপাও, মাহিন, তোমরা এস, লোকটিকে আমাদের গাড়িতে তোল। কুইক।
তেপাও মাহিনকে এ নির্দেশ দিয়ে আহমদ মুসা মারেভাকে বলল, তুমি তোমাদের ট্যাক্সির ভাড়া চুকিয়ে এস। ট্যাক্সিওয়ালাকে না পেলে টাকা তার ট্যাক্সির উপরে রেখে এস।
কথা শেষ করে আহমদ মুসা হাততালি দেয়া উৎসুক, অপেক্ষমাণ লোকদের দিকে এগিয়ে গিয়ে বলল, প্লিজ, আপনারা শুনুন, আহত লোকটির অবস্থা খুবই সংকটাপন্ন। তাকে অবিলম্বে হাসপাতালে নেয়া প্রয়োজন। কিডন্যাপিং-এর শিকার তরুণ-তরুণীকেও এখানে রেখে যাওয়া সম্ভব নয়। হতে পারে তাদের বিপদ এখনও কাটেনি। তাই তাদেরকেও সাথে নিয়ে যাচ্ছি। পুলিশ এসে যাবে। আপনারা যা দেখেছেন, দয়া করে তা পুলিশকে জানাবেন। ধন্যবাদ সকলকে।
উপস্থিত লোকেরা হাততালি দিয়ে আহমদ মুসার কথার জবাব দিল।
আহমদ মুসা গাড়িতে উঠে বসল। গাড়ি চলতে শুরু করল।
তেপাও সামনের বাঁক ঘুরে গাড়ি একটু দাঁড় করাবে। আহমদ মুসা বলল।
গাড়িটা বাঁকে এসে বাঁক ঘুরে একটা সেফ ল্যান্ডিং দেখে দাঁড়াল।
আহমদ মুসা গাড়ি থেকে নেমে গাড়ির দরজা বন্ধ করে গাড়ির পেছনে গিয়ে দাঁড়াল। কল করল তাহিতির স্বরাষ্ট্র সচিব ও পুলিশপ্রধান ফরাসি পুলিশ সার্ভিসের প্রধান সেই অফিসারকে। মাহিন ও মারেভার কিডন্যাপিং নিয়ে যা যা ঘটল সংক্ষেপে আহমদ মুসা সব জানাল তাকে এবং বলল, আমি আহত লোকটিকে গাড়িতে তুলে নিয়ে আসছি। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা আমার খুব জরুরি। এই প্রথম ওদের একজনকে জীবিত ধরা গেছে। তার কাছ থেকে কিছু কথা নেয়া আমার দরকার। কিন্তু আইন অনুসারে তাকে থানায় দেয়া দরকার অথবা হাসপাতালে নিয়ে পুলিশকে জানানো উচিত। আপনার পরামর্শ চাই স্যার।
মি. আহমদ মুসা, ঘটনাস্থলে কোন পুলিশ ছিল? বলল স্বরাষ্ট্র সচিব ও পুলিশপ্রধান।
জি না। আহমদ মুসা বলল।
যে গাড়ি ব্যবহার করছেন, তা কোন পুলিশ নিশ্চয় দেখেনি। বলল স্বরাষ্ট্র সচিব ও পুলিশপ্রধান।
দেখেনি। আহমদ মুসা বলল।
ঘটনাস্থলের লোকজন গাড়ির নাম্বার নিশ্চয় দেখেনি বা নেয়নি? জিজ্ঞাসা স্বরাষ্ট্র সচিব ও পুলিশপ্রধানের।
সেটা বলা মুশকিল স্যার। আহমদ মুসা বলল।
ঠিক আছে জানলেও ক্ষতি নেই। একটা কাজ করুন। আপনা গাড়ি এখন কোথায়? জিজ্ঞাসা স্বরাষ্ট্র সচিব ও পুলিশপ্রধানের।
অ্যাভেনিউ পোমা’তে উঠে পূর্ব দিকে যাচ্ছি। আমরা পাতোতোয়ার হোটেল প্যাসেফিক ইন্টারন্যাশনাল থেকে এসে পোমা সুপার মার্কেটটির পাশ দিয়ে অ্যাভনিউ পোমা’তে উঠেছি। আহমদ মুসা বলল।
ঠিক আছে। ভালোই হলো। আপনাদের সামনেই মায়েভা থানা। আপনার সাথে আর কয়জন আছে? জিজ্ঞাসা স্বরাষ্ট্র সচিব ও পুলিশ প্রধানের।
আমাদের ড্রাইভার তেপাও, মাহিন ও মারেভা। আহমদ মুসা বলল।
আপনি গাড়িটা ছেড়ে দিন। ওরা আহত লোকটিসহ গাড়ি নিয়ে এগোক ধীরে ধিরে। আর আপনি অন্য একটি গাড়ি নিয়ে সোজা মায়েভা থানায় চলে যান। সেখানে সব ঘটনা খুলে বলুন এবং শেষে বলুন, আপনি গুলিবিদ্ধ আহত লোকটিকে হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছিলেন। কিছু দূর এগোবার পর একটি মাইক্রো আপনার সামনে এসে দাঁড়ায় এবং আপনাকে আহত করে গাড়ি থেকে নামিয়ে দিয়ে গাড়িশুদ্ধ আহত লোকটিকে নিয়ে গেছে। আপনি থানায় গিয়ে এই ডাইরিটি করুন। থানা সন্দেহজনকভাবে আপনাকে কিছু করতে আসবে না। আমিও মিনিট পনের পরে থানায় টেলিফোন করব। থানা থেকে বেরিয়ে তারপর আহত লোকটিকে নিয়ে কোন নিরাপদ স্থানে চলে যান। আপনার প্রয়োজন পূরণে যা ইচ্ছা তাই করুন।
বলে থামল স্বরাষ্ট্র সচিব ও পুলিশপ্রধান। মুহূর্ত কয়েক চুপ থেকে আবার বলল, সেরকম নিরাপদ জায়গা আছে আপনাদের?
সে রকম নেই। তবে ব্যবস্থা একটা করে ফেলব। আহমদ মুসা বলল।
না, তার দরকার নেই। আপনাকে অত কষ্ট করতে হবে না। আপনি আহত লোকটিকে নিয়ে সোজা আমার এখানে চলে আসুন। এখানে আন্ডারগ্রাউন্ডে আমাদের একটা সেল আছে। আপাতত সেটা আপনারা ব্যবহার করবেন। বলল স্বরাষ্ট্র সচিব ও পুলিশপ্রধান।
ধন্যবাদ স্যার। আমরা আসছি। আহমদ মুসা বলল।
ওয়েলকাম। আসুন, কথা আপাতত শেষ। গুড বাই আহমদ মুসা। বলে ওপার থেকে কল অফ করে দিলেন।
কল অফ করে আহমদ মুসা ডাকল মাহিনকে।
মাহিন তাড়াতাড়ি গাড়ি থেকে বেরিয়ে আহমদ মুসার কাছে যেতেই সে মাহিনকে নিয়ে গাড়ি থেকে একটু দূরে সরে গেল। তাকে সব কথা বুঝিয়ে বলল। সব কথা শুনে মাহিনের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে বলল, এই সময়ের জন্যে এর চেয়ে ভাল সলিউশন আর হয় না স্যার।
হ্যাঁ মাহিন, তুমি ঠিক বলেছ। ঠিক আছে মাহিন। যেভাবে বলেছি, সেভাবে কাজ করবে।
বলে আহমদ মুসা গাড়ির জানালা দিয়ে ভেতরে উঁকি দিয়ে বলল, মারেভা, আমি একটু অন্য জায়গায় যাচ্ছি। তাড়াতাড়ি ফিরব। তোমরা চলতে থাক।
মাহিন উঠে বসেছে গাড়িতে।
গাড়ি তাদের চলতে শুরু করল।
আহমদ মুসা একটা ট্যাক্সি ডেকে তাতে উঠে বসে বলল, সামনে মায়েভা থানায় চল।
জি স্যার, বলে ট্যাক্সি ড্রাইভার তার গাড়িতে ষ্টার্ট দিল।

আহত লোকটির তিনটি ক্ষত স্থানেই ব্যান্ডেজ বেঁধে দিল আহমদ মুসা খুব যত্নের সাথে। গুলিবিদ্ধ তিন জায়গার কোনটাতেই বুলেট নেই। ঘাড়ের আঘাতটাই বেশি গভীর। কিন্তু সেখানেও বুলেট নেই। ঘাড়ের কিছু গোশত ছিঁড়ে নিয়ে বুলেট বেরিয়ে গেছে।
খুব ভাগ্যবান দেখছি আপনি। ওরা মরেছে, আপনি মরেননি। আর গুলির তিনটি আঘাত বড় হলেও তা মারাত্মক নয়। বুলেট নেই বলে অপারেশনের দরকার হলো না। বলল আহমদ মুসা নরম কণ্ঠে লোকটির দিকে চেয়ে।
লোকটির মধ্যে আগের সেই বেপরোয়া ভাব এখন নেই। আহমদ মুসা ব্যান্ডেজ বাঁধার শুরুতেই লোকটিকে সমবেদনা দেখিয়ে বলেছিল, আমি তোমাদেরকে মারতে বা আহত করতে চাইনি। চেয়েছিলাম তরুণ-তরুণী দু’জনকে উদ্ধার করতে। আমি তোমাদের বলেছিলাম। অস্ত্র ফেলে দিতে, তাহলে আর এই অঘটন ঘটতো না।
লোকটি কোন জবাব দিল না। কিন্তু আহমদ মুসার দিকে তাকিয়েছিল বিষ্ময়ের দৃষ্টিতে। এ ধরনের ব্যবহারে সে অবাক হয়েছে! সে বুঝেছে, যে দু’জনকে তারা কিডন্যাপ করেছিল তারা আহমদ মুসার আত্মীয় বা বন্ধু হবে নিশ্চয়ই। এখনও তারা তো উদ্ধারকারী আহমদ মুসার সাথেই আছে। সে দিক থেকে আহমদ মুসা তার প্রতি যতটা মারমুখো হওয়া দরকার ছিল, ততটা নয়, বরং ব্যাপারটা সমব্যথীর মতো। এটাই ছিল লোকটির বিষ্ময়ের কারণ।
আহমদ মুসার কথার উত্তরে এবার লোকটি বলল, আমার এই সৌভাগ্যই আমার জন্যে দুর্ভাগ্যের কারণ হলো।
কেন? বলল আহমদ মুসা।
অনেকের কাছে ব্যর্থতা ক্ষমাহীন অপরাধ। এই সব ক্ষেত্রে ব্যর্থতা নিয়ে বেঁচে যাওয়া দুর্ভাগ্যের। লোকটি বলল।
দুর্ভাগ্যটা কি রকম? বলল আহমদ মুসা।
দুর্ভাগ্যটা মৃত্যু পর্যন্ত গড়াতে পারে। বলল লোকটি।
কথা শেষ করেই লোকটি বলল আবার, কিন্তু এসব প্রশ্ন কেন?
দুনিয়াতে কত ধরনের লোক আছে, হত ধরনের দল, গ্রুপ আছে, তা জানার একটা কৌতুহল এটা। আচ্ছা, আপনার নাম কি?
লোকটি তাকাল আহমদ মুসার দিকে। বলল, নামের কি প্রয়োজন?
প্রয়োজনের প্রশ্ন নয়। মানব সমাজের একটা সাধারণ রীতি হলো কারো সাথে দেখা, লেনদেন বা পরিচয় হলে তার নাম জিজ্ঞাসা করা হয়।
লোকটি আহমদ মুসার দিকে আবার চোখ তুলে তাকাল। আহমদ মুসার মধ্যে শত্রু ধরনের কোন ছবি খুঁজে সে পেল না। আহমদ মুসাকে সহজ, সরল, স্বচ্ছ লোক বলে মনে হলো তার কাছে। আর তার যুক্তি ঠিক। এক্ষেত্রে নাম না বলাটাই বরং বেমানান। লোকটি বলল, আমার নাম মফ ফ্লেরি।
আপনাকে দেখে তো সহজ সরল বলে মনে হচ্ছে। কিন্তু আমার এই ভাই-বোনকে আপনারা কিডন্যাপ করতে চেয়েছিলেন কেন? আহমদ মুসা খুব নরম কণ্ঠে বলল।
লোকটি কোন উত্তর দিল না। অনেকক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর বলল, ওরা দুইজন কি সত্যিই আপনার ভাই-বোন?
শুধু ভাই-বোন নয়, ভাই-বোনের চেয়েও বড়। আহমদ মুসা বলল।
লোকটি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তাকাল আবার আহমদ মুসার দিকে। ভাবছে সে আহমদ মুসাকে নিয়েই। এই লোক ইচ্ছা করলে আমাকে মেরে ফেলতে পারতো, পুলিশের হাতেও তুলে দিতে পারতো। এসব কিছূ না করে সে আমার ক্ষত স্থান পরিষ্কার করেছে, সেলাই দিয়েছে এবং তাতে ব্যান্ডেজ বেঁধে দিয়েছে। নিজের আহত স্বজনের মতই সে আচরণ করছে আমার সাথে।
এসব চিন্তা করেই বলল, তাদের ধরার মধ্যে আমাদের ব্যক্তিগত কোন স্বার্থ ছিল না। আমরা নির্দেশ পালন করেছি মাত্র।
নির্দেশ কার ছিল? আহমদ মুসার জিজ্ঞাসা।
আমরা নির্দেশ পেয়েছিলাম, ‘ম্যাডাম গৌরী’ নামে এক কর্মকর্তার কাছ থেকে। লোকটি বলল।
কিসের কর্মকর্তা তিনি? বলল আহমদ মুসা।
লোকটি অল্পক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, সে সংগঠনের নাম নেয়া তাদের জন্যে নিষেধ। মাফ করুন স্যার আমাকে।
আহমদ মুসা মনে মনে ভাবল, কিসের কর্মকর্তা তা আমরা জানি। তারপর বলল, ঠিক আছে তোমাকে বিপদে ফেলবো না। সংগঠনের নাম শুনতে চাই না। তোমাদের দিয়ে কোথায় কাজ করায়, কি কাজ করায় তারা?
লোকটি বলল, তাহিতি, মুরিয়া, তোয়ামতু দ্বীপপুঞ্জ প্রভৃতি স্থানসহ পলিনেশীয়ার সব জায়গায় কাজ করি। কি কাজ করি আমরা তা বলতে পারবো না স্যার। সেটা বললে আমাদের প্রাণ যাবে।
কি কাজ করো সেটা আমরা জানি। সেটা তুমি না বললেও চলে। ঠিক আছে, যদি ক্ষতি হয় বলবে না। কিন্তু একটা বিষয়ে সাহায্য করতে পার। পলিনেশীয়ার দ্বীপপুঞ্জ ও দ্বীপ সম্পর্কে তোমার অনেক অভিজ্ঞতা। আচ্ছা বল তো ‘মতু’ নামে কোন দ্বীপ আছে? বলল আহমদ মুসা।
কেন, প্রায় সকলেরই জানা, তোয়ামতু দ্বীপপুঞ্জের ‘মতুতুংগা’ অ্যাটলকেই সংক্ষেপে ‘মতু বলা হয়।
ধন্যবাদ মি. মফ ফ্লেরি। ‘মতু’ দ্বীপ বা অ্যাটল নিয়ে খুব আগ্রহ আমার।
আহমদ মুসার কথা শুনে লোকটির ভ্রু কুঁচকে গেল মুহূর্তের জন্য। চোখে-মুখে তার নেমে এল উদ্বেগ ও বিষ্ময়। বলল, ‘মতু অ্যাটল নিয়ে আপনার এ আগ্রহ কেন?
সে অনেক কথা। পলিনেশীয় অঞ্চলের একটা রূপকথা শোনার পর থেকেই এই আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে। বলল আহমদ মুসা।
রূপকথা? কি রূপকথা? লোকটি বলল।
রাজকুমার হেসানা হোসানা ও সাগরকন্যা ভাইমিতি শাবানুর রূপকথা। ঐ রূপকথায় আছে গডেজ ‘হিনা’ দুই প্রেমিকের প্রতি দয়াপরবশ হয়ে তাদের মিলন ঘটিয়েছিলেন মতুতুংগা অ্যাটল দ্বীপে। ঐ অ্যাটল দ্বীপের অভ্যন্তরে একটি প্রাসাদ আছে। সেই প্রাসাদে মিলন হয়েছিল রাজপুত্র ও সাগরকন্যার। যত দিন তারা বেঁচে ছিল ঐ প্রাসাদেই তারা বাস করেছে। আমি মনে করি এই রূপকথা যেমন সত্য ঘটনা, তেমনি প্রাসাদও একটা বাস্তব সত্য। এই কারণেই ‘মতু’ বা ‘মতুতুংগা’ অ্যাটল দ্বীপ আমার স্বপ্নের জায়গা। থামল আহমদ মুসা।
লোকটি মানে মফ ফ্লেরির মুখ থেকে উদ্বেগ ও বিষ্ময়ভাব কেটে গেল। স্বস্তির ভাব ফুটে উঠল তার মনে। সে বুঝে নিল, তাদের ‘ক্যাপিটাল অব পাওয়ারে’র খোঁজ এরা জানে না।
আহমদ মুসার কথার উত্তরে কিছু বলল না মফ ফ্লেরি।
আহমদ মুসাই আবার কথা বলল, মি. মফ ফ্লেরি, আমার আগ্রহের কথা নিশ্চয় বুঝেছ। এখন বল, আমার আগ্রহটা ঠিক কিনা।
আগ্রহ ঠিক আছে। কিন্তু প্রাসাদের বিষয়টা রূপকথার মতই কল্পনা। মফ ফ্লেরি বলল।
ব্যাপক অনুসন্ধান ছাড়া কোন দাবী বা বিশ্বাসকে অস্বীকার করা যায় না। মতুতুংগা দ্বীপে তোমার কি এই অনুসন্ধান আছে? বলল আহমদ মুসা।
মফ ফ্লেরি তাকাল আহমদ মুসার দিকে। আহমদ মুসার কণ্ঠে একটা ভিন্ন সুর আঁচ করল সে। তার মনের কোণে একটা ছোট্ট আশংকাও জেগে উঠল। বলল, মতুতুংগাসহ সব দ্বীপ ও অ্যাটলে আমার বিচরণ আছে তাই বলছিলাম, প্রাসাদের বিষয়টা অবাস্তব।
তোমার কথা মানলাম। কিন্তু তোমার এই ‘অবাস্তব তত্ত্ব’ কি করে প্রমাণ করা যায় বল তো? তোমার এই ‘অবাস্তব তত্ত্বে’র প্রমাণ হয়ে গেলে তো আর এ ব্যাপারে কারো মাথা ঘামাতে হতো না। বলল আহমদ মুসা।
একটা বিব্রত ভাব ফুটে উঠল মফ ফ্লেরির চোখে-মুখে। বলল, আমি কি করে বলতে পারি? কথাগুলো ভাসা ভাসা মনে হলো। যেন কথাগুলো মনের গভীর থেকে উঠে আসেনি, কথাগুলোন শেকড় যেন তার মনে নেই!
আহমদ মুসার কানকে এসব ফাঁকি দিতে পারলো না। বলল, তুমি মতুতুংগা অ্যাটলটাকে ভালভাবে দেখেছ বলেই সেখানে প্রাসাদের অস্তিত্বের বিষয়কে ‘অবাস্তব’ বলতে পেরেছ। সেজন্যেই অবাস্তব প্রমাণ করার উপায়গুলোও তুমিই বলতে পারবে। বল, সেগুলো কি হতে পারে।
সংগে সংগে জবাব দিল না মফ ফ্লেরি। মুহূর্ত কয়েক চুপ থাকার পর বলল, অ্যাটলগুলো হলো ফাঁপা বা সলিড পর্বতপ্রমাণ উঁচু বেজের উপর সংকীর্ণ বা অপেক্ষাকৃত প্রশস্ত পাড় ঘেরা পুকুর বা হ্রদের মত। অ্যাটলগুলো বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কাছাকাছি হয়ে থাকে। সে ক্ষেত্রে একই বেজের উপর অনেক অ্যাটল হতে পারে, যেমন গাছের একই কাণ্ডের উপর অনেক শাখা হয়। এই ধরনের ক্ষেত্রগুলোতে দুই অ্যাটলের মাঝখানের পানি অগভীর হয়ে থাকে। অ্যাটলের এই সব বৈশিষ্ট সামনে রাখলে কোন অ্যাটলের ফাঁপা বেজের মধ্যে প্রাসাদ ধরনের কিছু আছে কিনা পরীক্ষার জন্যে দু’টি উপায় আছে। সহজ উপায়টি হলো, অ্যাটলের পাড় প্রশস্ত হলে সেখান থেকে অথবা পাশের কোন অ্যাটলের প্রশস্ত পাড় থেকে সুড়ঙ্গ কেটে অ্যাটলের ফাঁপা অংশে প্রবেশ করে ভেতরটা দেখা। আরেকটা উপায় আছে। কঠিন এবং তা হলো, পানির নিচে অ্যাটলের বেজের গায়ে কোন যথোপযুক্ত টেনলজির মাধ্যমে সুড়ঙ্গ করে ভেতরে প্রবেশ করা।
আহমদ মুসার ঠোঁটে সূক্ষ্ম একটা হাসির আভা ফুটে উঠল। বলল, ধন্যবাদ মফ ফ্লেরি, তুমি সুন্দর বর্ণনা দিয়েছ। যেন প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা! তাই নয় কি মফ ফ্লেরি?
আবার সেই বিব্রতকর অবস্থা ফুটে উঠল মফ ফ্লেরির মুখে। ব্যাপারটা অনেকখানি চোর ধরা পড়ার মত।
সংগে সংগে উত্তরদ দিতে পারল না মফ ফ্লেরি।
মফ ফ্লেরির এই অবস্থাকে আহমদ মুসা ইতিবাচক মনে করল। এ ধরনের সুড়ঙ্গ তার দেখার মধ্যে না থাকলে তার আচরণ এমন হতো না, মনস্তত্ত্বের দিক থেকে এটাই স্বতসিদ্ধ।
অবশেষে মফ ফ্লেরি বলল, আমি যা বলেছি, তার বেশি কিছু আমি জানি না।
আহমদ মুসা কোন প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করল না। আহমদ মুসা নিশ্চিতই বুঝল সে সত্য কথা বলেনি। তবু এ ব্যাপারে চাপ না দিয়ে বলল, তুমি যাদের সাথে বা যে সংগঠনের সাথে আছ, সেটা কত বছর?
তিন বছর। বলল মফ ফ্লেরি।
তোমাকে খুব বুদ্ধিমান ও সচেতন বলে মনে হচ্ছে। তুমি পেশায় আসলে কি? জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।
পেশায় মেরিন ইঞ্জিনিয়ার ছিলাম। বলল মফ ফ্লেরি।
সে তো মূল্যবান পেশা! কিন্তু এখন তো দেখা যাচ্ছে তুমি কিডন্যাপিং পেশায় নেমেছ। আহমদ মুসা বলল।
মফ ফ্লেরি মুখ তুলে আহমদ মুসার দিকে তাকাল। তার চোখে-মুখে একটা অস্বস্তির ছাপ। বলল, প্রয়োজনে নির্দেশ মত আমাদের সব কাজই করতে হয়। তবে মূলত সংগঠনের মেরিন সাইডটায় আমি কাজ করি।
তাহলে দলের অনেক সারফেস শীপ ও বোট আছে? বলল আহমদ মুসা।
কিছু তো আছেই। মফ ফ্লেরি বলল।
দলের আন্ডারওয়াটার ভেহিকল অর্থাৎ সাবমেরিন জাতীয় ভেহিকেল নেই? জিজ্ঞাসা করল আহমদ মুসা।
চমকে উঠল মফ ফ্লেরি। দুই চোখ ছানাবড়া করে তাকাল আহমদ মুসার দিকে!
কথা বলার খেই যেন হারিয়ে ফেলেছে মফ ফ্লেরি! কোন কথা বলল না সে।
আবার মিথ্যা বল। বল যে, সাবমেরিন জাতীয় কোন ভেহিকেল দলের নেই! আহমদ মুসাই আবার বলল। আহমদ মুসার ঠোঁটে হাসি।
মফ ফ্লেরি নির্বাক হয়ে গেছে। কোন কথাই সে বলতে পারল না। তার চোখের দৃষ্টির মধ্যে একটা অসহায়ত্ব আছে। তার মনে একটা কথা তোলপাড় করে উঠছে, কে এই লোক! আমাদের সব বিষয় সে জানে কি করে!
আবারও কথা বলল আহমদ মুসাই। বলল, একটা গোপন দলের সাথে তুমি শামিল হলোও তোমাকে সরল, সহজ মনে করেছিলাম। কিন্তু দেখছি তুমি খুব সহজভাবে মিথ্যা কথা বলতে পার। মতুতুংগার সৃড়ঙ্গ সম্পর্কে তুমি জান না, এই মিথ্যা কথা কেন বললে?
লোকটি অনেকখানি মুষড়ে পড়েছে। বলল, গোপনীয়তা রক্ষার জন্যে আমাদের শপথ করতে হয়। আত্মরক্ষার জন্যেই আমি মিথ্যা বলেছি। শপথ কেউ ভাঙলে তার মৃত্যুদণ্ড হয়, এটা দলের অপরিবর্তনীয় বিধান। আহমদ মুসার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। তার বুক থেকে অনিশ্চয়তার একটা পাহাড় যেন নেমে গেল! মতুর প্রাসাদে ঢোকার সুড়ঙ্গ তাহলে সত্য এবং প্রাসাদও সত্য!
আপনি সব জেনেও আমাকে প্রশ্ন করছেন, এর অর্থ আমি বুঝলাম না। বলল মফ ফ্লেরি।
দেখছিলাম যে, তুমি কি বল। অরেকটা জিনিস, মতুতুংগা অ্যাটলের পশ্চিমে কোন অ্যাটল নেই। উত্তরের অ্যাটলটা বেশ দূরে। তাদের মধ্যে কমন সংযোগ নেই। বাকি থাকে পূর্ব ও দক্ষিণ। এই দুই দিকে মতুতুংগার কাছাকাছি চারটি অ্যাটল আছে অর্থাৎ তাহানিয়া, টেপোটো, হিতি ও তোয়ানেকে। এই চারের মধ্যে ‘হিতি’ অ্যাটলের সাথে মতুতুংগার কমন বেজ নেই। অনুরূপভাবে ‘টোপোটো’ ও ‘তোয়ানেকে’ অ্যাটলের সাথেও মতুতুংগার কমন বেজ নেই। এই তিন অ্যাটল ও মতুতুংগার মাঝখানে বরং খাদের উত্তর প্রান্ত ঘুরে মতুতুংগা পর্যন্ত উঁচু ও সংযুক্ত একটা বেজ রয়েছে। কিন্তু টোপোটো অ্যাটলটি এতই ক্ষুদ্র ও ডোবা যে, সেখান থেকে সংযোগ সুড়ঙ্গ মতুতুংগা পর্যন্ত হতে পারে না। বাকি থাকে বড় আকারের তাহানিয়া অ্যাটল। এর পশ্চিম তটরেখার দক্ষিণ প্রান্ত বেশ প্রশস্ত ও উঁচু যেখানে কনষ্ট্রাকশন সম্ভব। এ প্রান্ত থেকে মতুতুংগা পর্যন্ত কিছুটা সংকীর্ণ হলেও উঁচু একক একটি বেজ লাইন চলে গেছে। এখন তুমি বল, সুড়ঙ্গের যে তত্ব দিয়েছ তাতে মতুতুংগার প্রাসাদে ঢোকার সুড়ঙ্গ কোন অ্যাটল থেকে হতে পারে?
দীর্ঘ বক্তব্য দিয়ে থামল আহমদ মুসা।
মফ ফ্লেরি হাঁ করে স্তম্ভিত দৃষ্টিতে দেখছিল আহমদ মুসাকে। সে ভেবে পাচ্ছে না অ্যাটলগুলো সম্পর্কে আহমদ মুসা এত বিস্তারিত তথ্য জানে কি করে! বহুদিন আমি ঘুরছি এ অঞ্চলে, কিন্তু এর সব কথা আমার জানা নেই। আসলে দেখছি সব জানে এই লোকটা। প্রাসাদের ভেতরের কথাও কি সে জানে? কেঁপে উঠল মফ ফ্লেরির বুকটা। আসলে ভেতরে কি আছে, কি ঘটে তার সব কিছু তারাও জানে না। শুধু অচেনা, অজানা লোকদের সেখানে ঢুকতে দেখে, তাদেরকে আর কখনো বের হতে দেখে না। এই লোকটি সে বিষয়েও কি জানে? কিন্তু কিভাবে?
মফ ফ্লেরির নিরব ও বিষ্ময়াবিষ্ট হয়ে হাঁ করে থাকতে দেখে আহমদ মুসা বলল, আমার কথায় অবাক হবার কিছু নেই। সবই তো তুমি জান! তোমার জানা বিষয়টা জানালে আমি উপকৃত হবো। প্লিজ বল।
আপনি সবই জানেন স্যার, এরপরও প্রশ্ন করছেন? আপনি তো অবস্থার পর্যালোচনা করে বলেই দিয়েছেন মতুতুংগা অ্যাটলের সুড়ঙ্গ কোন অ্যাটল থেকে আসতে পারে। আসলেই এর কোন বিকল্প নেই। বলল মফ ফ্লেরি।
হাফ ট্রুথ মানে অষ্পষ্ট সত্য কিন্তু সত্য নয়। তুমি পরিষ্কার করে বল। তুমি যার বিকল্প নেই বললে, সেটা প্রতক্ষদর্শীর কাছে সত্য এটা কিনা?
নিচু করে রাখা মুখ তুলল মফ ফ্লেরি। একটা ভীতি ও অসহায় ভাব তার চোখে-মুখে। বলল, হ্যাঁ তাই স্যার। আপনি সব জানার পরেও কেন এসব কথা বারবার বলছেন স্যার?
আমি তোমার পরীক্ষা নিচ্ছি বলতে পার। আচ্ছা, এতক্ষণ আমি বলেছি, এবার তুমিই বল, সুড়ঙ্গটির মুখ কোথায়?
সেটাও তো আপনিই বলে দিয়েছেন। তাহানিয়া দ্বীপের পশ্চিম তটরেখার দক্ষিণ প্রান্ত এলাকা কনষ্ট্রাকশনের জন্যে উপযুক্ত। উত্তর তো এখানেই আছে স্যার। বলল মফ ফ্লেরি।
খুশি হলো আহমদ মুসা। সে অবশ্যই মিথ্যা বলেনি। সুড়ঙ্গের মুখ তাহানিয়ার পশ্চিম তটরেখার দক্ষিণ প্রান্তেই রয়েছে। আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করল আহমদ মুসা।
উঠে দাঁড়াল সে। বলল, মি. মফ ফ্লেরি, আমি আসছি।
বলে পাশের ঘরে প্রবেশ করল আহমদ মুসা।
সে ঘরে দরজার পাশেই বসে ছিল মারেভা ও মাহিন।
তারাও ওঠে দাঁড়াল। বলল, ধন্যবাদ স্যার, কথা আদায় করার ক্ষেত্রেও দুনিয়ায় নিশ্চয় আপনার কোন জুড়ি নেই। কোন বকাবকি, হুমকি-ধমকি ও গায়ে হাত তোলা ছাড়াই আপনার যা প্রয়োজন সবই আদায় করে নিলেন অদ্ভুত কৌশলে। আবারও ধন্যবাদ স্যার। বলল মারেভা।
আমাকে ধন্যবাদ না দিয়ে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় কর। ভালোবাসা, মমতার চেয়ে বড় অস্ত্র দুনিয়ায় আর নেই। সে আমাকে শত্রু মনে করেনি এবং আমার কথাবার্তায় সে বিশ্বাস করে নিয়েছে আমি তাদের সব কিছু জানি। আমার জানা বিষয় তাই প্রকাশ করতে সে দ্বিধা করেনি। থাক, এসব কথা। আমি যাচ্ছি স্বরাষ্ট্র সচিব সাহেবের কাছে। বলে আহমদ মুসা হাঁটতে শুরু করল। মারেভা ও মাহিনও ঘর থেকে বের হবার জন্যে হাঁটতে শুরু করল।

পিএস গিয়ে স্বরাষ্ট্র সচিবকে বলল, স্যার, আহমদ মুসা নামে একজন ভদ্রলোক এসেছেন। আপনার সাথে দেখা করতে চান।
শুনেই স্বরাষ্ট্র সচিব উঠে দাঁড়াল। বলল, ভদ্রলোককে নিয়ে আসি।
পিএস বিষ্মিত হয়ে একবার স্বরাষ্ট্র সচিবের দিকে তাকাল। স্যার, নিজে যাবেন তাকে স্বাগত জানাতে? বলল, আপনি বসুন স্যার। আমি তাকে নিয়ে আসছি।
না, সে খুব মূল্যবান মানুষ। ফরাসিদের জামাই। তাছাড়াও তার আরও বড় পরিচয় আছে। বলে স্বরাষ্ট্র সচিব হাঁটতে শুরু করল।
পিএস-এর কক্ষে গিয়ে স্বরাষ্ট্র সচিব ও পুলিশ প্রধান স্বাগত জানালো আহমদ মুসাকে।
আহমদ মুসাকে নিয়ে স্বরাষ্ট্র সচিব ও পুলিশপ্রধান তার কক্ষে এসে বসল। আহমদ মুসাকে বসিয়ে নিজে গিয়ে তার আসনে বসল।
বসেই বলল, মি. আহমদ মুসা, আজকের জিজ্ঞাসাবাদের খবর কি, ভাল নিশ্চয়ই।
আল হামদুলিল্লাহ! ভাল স্যার। যা চেয়েছিলাম তা পেয়েছি। বলল আহমদ মুসা।
এত তাড়াতাড়ি মুখ খুলল! স্বরাষ্ট্র সচিব বলল। তার কণ্ঠে বিষ্ময়!
অনেক কথা বলতে হয়েছে স্যার।
আমি তার সমব্যথী ও বন্ধু-এ বিশ্বাস তার মধ্যে জেগেছিল। আমি কোন পক্ষ নই, কোন স্বার্থে আমি এসব জানতে চাচ্ছি না, এটাও সে ধরে নিয়েছিল। আমি নিছক তার ব্যাপারে আমার কৌতূহল নিবৃত্ত করছি, এটাও তাকে বুঝাতে পেরেছিলাম। আর তাদের সম্পর্কে এবং তাদের ঘাঁটি ও তাদের বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে আমি কথা বলে তার মধ্যে এ বিশ্বাস ঢুকিয়ে দিয়েছিলাম যে, তাদের ব্যাপারে আমি সব জানি, নিছক তাকে আমি বাজিয়ে দেখছি মাত্র। এজন্যে কোন তথ্য দেয়াকে সে খারাপ মনে করেনি এবং মিথ্যাও বলেনি এই কারণে যে তার মিথ্যা আমার কাছে ধরা পড়ে যাবে। বলল আহমদ মুসা।
বিষ্ময়মিশ্রিত প্রশংসার একটা ঢেউ খেলে গেল তাহিতির স্বরাষ্ট্র সচিব ও পুলিশপ্রধানের চোখে-মুখে। বলল, চমৎকার মি. আহমদ মুসা! চমৎকার আপনার কৌশল। আপনি ধমকি দিয়ে কিংবা গুলি ছুঁড়েও এত কথা উদ্ধার করতে পারতেন না। ধন্যবাদ আপনাকে। কিন্তু আহমদ মুসা, সব ক্ষেত্রেই এই কৌশল খাটিয়ে ফল পাওয়া যায়?
ভালবাসা, সহমর্মিতার শক্তি অত্যন্ত কঠিন ও কঠোর মানুষকেও দুর্বল করে, তাকে কাছে টানে, তার হৃদয় জয় করে নেয়া যায়। তার মনের কথাগুলোও তখন পাখা মেলে, ওপেন হয়ে যায়। কিন্তু শক্তির প্রয়োগ বা প্রদর্শণী মানুকে ভীত করে। ভয়ে অনেকেই মুখ খোলে। আবার অনেকেই শক্তিকে ভয় করে না, এদের বিরুদ্ধে শক্তি কোন কাজেও আসে না। আহমদ মুসা বলল।
ঠিক মি. আহমদ মুসা, দুনিয়ার পাষণ্ডতম মানুষও কাঁদে ভালবাসার ছোঁয়ায়, অস্ত্রের আঘাতে নয়। যাক, এখন বলুন আপনি কত দূর পৌঁছলেন? স্বরাষ্ট্র সচিব বলল।
স্যার, পথের সন্ধান পেয়েছি। সে পথে চলে এখন লক্ষে পৌঁছতে হবে। পথ চলে লক্ষে পৌঁছার কঠিন কাজটাই এখন বাকি। বলল আহমদ মুসা।
ঈশ্বর আপনাকে সাহায্য করুন ইয়ংম্যান। লক্ষে আপনি পৌঁছবেনই, এতে আমার কোন সন্দেহ নেই। আমাদের সাহায্য সব সময় আপনার সাথে থাকবে। বিজ্ঞানী-বিশেষজ্ঞদের নিরাপত্তা ও মুক্তি নিয়ে আমরাও উদ্বিগ্ন। যেন আমাদের ভুলে তাদের বড় কোন ক্ষতি না হয়, এ ব্যাপারে আমরা খুবই সতর্ক। এটা আপনার কেস। আমরা আপনার উপরেই নির্ভর করছি। স্বরাষ্ট্র সচিব বলল।
ধন্যবাদ আপনাদের এই দৃষ্টিভংগির জন্যে। উদ্বেগের বিষয় এটাই স্যার, ওরা সামান্য কিছু টের পেলেই বিজ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞদের জীবন বিপন্ন হতে পারে। এজন্যে ওদের কার্যকরি শক্তি নিষ্ক্রিয় করে দেয়ার আগে কিংবা ওদের ‘শক্তির কেন্দ্র’ দখলের আগে ওদের কিছুই জানতে দেয়া যাবে না। বলল আহমদ মুসা।
এ কারণেই এই কাজে বা অভিযানে দলবদ্ধভাবে যাওয়া যাবে না একেবারেই। এই বিপজ্জনক অভিযানে মাত্র দু’একজনকেই অংশ গ্রহণ করতে হবে ওদের চোখকে ফাঁকি দিয়ে। আমার মনে হচ্ছে বিষয়টা অত্যন্ত ষ্পর্শকাতর এবং অতি বিপজ্জনক বলেই ঈশ্বর আপনাকে পাঠিয়েছেন। আমি আপনার সম্পর্কে অনেক শুনেছি। কিন্তু কয়েক দিন ধরে আপনার কাজ দেখে মনে হচ্ছে আপনার সম্পর্কে যা শুনেছি তার চেয়ে অনেক বড় আপনি। ধন্যবাদ আহমদ মুসা। তাহাতির প্রধান স্বরাষ্ট্র সচিব বলল।
মফ ফ্লেরির বিষয়ে এখন কি করা যায়! সে যেহেতু আমাদের সাহায্য করেছে, এজন্যে সে বিচারের মুখোমুখি হোক, তা আমি চাচ্ছি না স্যার। আপনারা তাকে নিরাপত্তা হেফাজতে রাখুন আমাদের অপারেশন শেষ না হওয়া পর্যন্ত। আর তার পরিবার-পরিজনকেও আপনাদেরই দেখতে হবে, তাদের ভরণ-পোষণও করতে হবে। আমিও তাকে বলব, এখন সে বাইরে গেলে তার দলই তাকে মেরে ফেলবে এবং তার কোন চিন্তা নেই পরিবার-পরিজন নিয়ে। তাদের ভরণ-পোষণের ব্যবস্থা হয়ে গেছে। বলল আহমদ মুসা।
আপনি যা বলেছেন। সেটাই হবে মি. আহমদ মুসা। তাকেও আশ্বস্ত করুন, তার পরিবার নিয়ে তার কোন চিন্তা করতে হবে না। স্বরাষ্ট্র সচিব ও পুলিশপ্রধান বলল।
ধন্যবাদ জনাব। আর আমাকে সাহায্যের বিষয়টা সময় মত আমি আপনাকে জানব। বলল আহমদ মুসা।
আপনার একটা কনট্যাক্ট নাম্বার দিলে প্রয়োজনে আমরা আপনার সাথে যোগাযোগ করতে পারবো। স্বরাষ্ট্র সচিব-পুলিশপ্রধান বলল।
সেটা বিপজ্জনক হতে পারে স্যার। ওরা যেমন ভেতর থেকে পাঠানো মেসেজ মনিটর করতে পারে, তেমনি বাইরে থেকে পাঠানো মেসেজ মনিটরের ব্যবস্থা তার অবশ্যই রেখেছে। বলল আহমদ মুসা।
ঠিক মি. আহমদ মুসা। আপনি ঠিক চিন্তুা করেছেন। ধন্যবাদ!
তাহলে উঠতে পারি স্যার। বলল আহমদ মুসা।
ডিনারের সময় হয়ে আসছে। আমরা কি এক সংগে ডিনার করতে পারি না? ভুলবেন না আপনি কিন্তু আমাদের জামাই, ফরাসিদের জামাই। স্বরাষ্ট্র সচিব-পুলিশপ্রধান বলল।
ধন্যবাদ স্যার। আপনাদের স্নেহের এই অফার আমি প্রত্যাখ্যান করতে পারিনা। আমার সাথে কিন্তূ দু’জন ছেলেমেয়ে আছে। বলল আহমদ মুসা।
তামাহি মাহিন ও মারেভা মাইমিতি তো! ওদেরও দাওয়াত ডিনারে। আমরা খুব খুশি। ওরা আপনার ভাল সহকারী হয়ে উঠেছে। আমি চিন্তা করছি, ওদের আমি আমাদের গোয়েন্দা বিভাগে নিয়ে নেব। আপনি কি মনে করেন? স্বরাষ্ট্র সচিব-পুলিশ প্রধান বলল।
আমার মনের কথা বলেছেন। আমি আপনাকে এ ব্যাপারে অনুরোধ করতে চাচ্ছিলাম। বলল আহমদ মুসা।
মি, আহমদ মুসা, খুশি হলাম আপনার অভিমত পেয়ে। স্বরাষ্ট্র সচিব বলল।
আমি ‘মফ ফ্লেরি’র আর একটু কথা বলব। আমি তা হলে এখন উঠছি স্যার। বলল আহমদ মুসা।
মফ ফ্লেরির সাথে কথা বলার এই সিদ্ধান্ত আহমদ মুসা আরও একটা কারণে নিল। তাহানিয়া অ্যাটল থেকে মতুতুংগার প্রসাদে যাওয়ার সুড়ঙ্গ ও প্রসাদের ব্যাপারে আহমদ মুসা আর একটু কথা বলতে চায়। এ বিষয় যে কোন তথ্য তার কাজে আসবে।
ঠিক আছে আসুন। আমর পিএস ঠিক ১২টায় আপনার ডিনারে আসবে। আমি আপনাদের জন্যে অপেক্ষা করব। হ্যাঁ, আর একটা কথা বলতে ভূলে গেছি। আমি অ্যাটল ট্যুরিস্টদের ছদ্মবেশে কমান্ডো, পুলিশ, ও গোয়েন্দাদের নিয়োজিত করতে চাই যাতে যাতে কোন সন্দেহ সৃষ্টি না হয় এমনভাবে। স্বরাষ্ট সচিব-পুলিশ প্রধান বলল।
আহমদ মুসা একটু ভাবল। তারপর বলল, করতে পারেন। তবে তাদেরকে পোষাকে-আশাকে, কথাবার্তায় ও আচার-আচরণে একদম টুরিস্ট হতে হবে। বলল আহমদ মুসা।
ধন্যবাদ মিঃ আহমদ মুসা। আমি তাদের কাছে মানে তাহিতির সব পুলিশ ও গোয়েন্দার কাছে আপনার ফটো ও মেসেজ দিয়ে রাখতে চাই, যাতে আপনার যে কোন আদেশ তারা শুনতে বাধ্য থাকে। আর অ্যাটল গুলোতে যারা থাকবে তাদের কামান্ডারের কন্ট্যাকট নাম্বার আপনাকে দেব। তাকে আপনি যে কোন আদেশ দিতে পারবেন। স্বরাষ্ট সচিব ও পুলিশ প্রধান বলল।
ধন্যবাদ স্যার। আমি খুব খুশি হলাম। ধন্যবাদ আপনাকে।
বলে উঠে দাঁড়াল আহমদ মুসা। স্বরাষ্ট সচিব কাম পুলিশপ্রধানও উঠে দাঁড়াল। আহমদ মুসা তার সাথে হ্যান্ডশেক করে বেরিয়ে এল।