৫১. প্যাসেফিকের ভয়ংকর দ্বীপে

চ্যাপ্টার

তোমরা বলতে চাও, ‘আহমদ মুসা সুপারম্যান?’ তীব্র কন্ঠ আলেক্সি গ্যারিনের।
আলেক্সি গ্যারিনের সামনে মাথা নত করে দাঁড়িয়েছিল জিজর ও ডারথ ভাদের। আর আলেক্সি গ্যারিনের কিছুটা পেছনে দাঁড়িয়েছিল গৌরী।
জিজর ও ডারথ ভাদের কোন কথা বলল না।
আলেক্সি গ্যারিনই কথা বলল আবার।
এটা কি বিশ্বাসযোগ্য যে, আমাদের চারজন শ্রেষ্ঠ কমান্ডো জনমানবশূন্য এক পরিবেশে মেটালিক জ্যামার দিয়ে ওদের গাড়িটাকে অচল করে দিল, তারপর অচল করে দিল তাদের অস্ত্রশস্ত্রও। এর পরে চারজন চারদিক থেকে গাড়িটার উপর আক্রমণ চালাল, কাচের বডি ভেঙে গিয়ে গাড়ি উন্মুক্ত হয়ে পড়ল। তারপরেও চারদিক থেকে চারটি মিনি মেশিনগানের ডজন ডজন বুলেট গাড়ির একজনকেও মারতে পারল না। উল্টো গাড়ি থেকে চারদিকের চার লোককে একা আহমদ মুসা আক্রমণ করল, আর মারা গেল আমাদের চারজন শ্রেষ্ঠ কমান্ডো। একে আমাদের আত্মসমর্পণ ছাড়া আর কি বলা যেতে পারে?
মাই লর্ড, আমরা যাকে হত্যার জন্যে হন্যে হয়ে ঘুরছি, সম্পূর্ন হাতের মুঠোয় পেয়েও তাকে হত্যা করতে না পারা, উল্টো আমাদের সবাই তার হাতে নিহত হওয়া এটা অবিশ্বাস্য। আমি মনে করি আমাদের লোকদের অতি আত্মবিশ্বাস ও যে কোন পরিস্থিতির জন্য তৈরী না থাকার কারণেই এই বিপর্যয় ঘটেছে। আহমদ মুসার লেজারগানের অস্ত্র থাকতে পারে এটা আমরা বিবেচনায় আনতে ব্যর্থ হয়েছি। বলল জিজর নত মুখে বিনীত কন্ঠে।
তা নয়, আহমদ মুসাকে চিনতেই তারা পারেনি বারবার বলা সত্ত্বেও। আহমদ মুসার ক্ষিপ্রতা ও তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতাই সবচেয়ে বড় অস্ত্র। গাড়ির বডির কাচের অংশ ভেঙে গাড়িকে উন্মুক্ত করার পর কোন সময় না দিয়ে চারদিক থেকে চারজন আহমদ মুসার উপে ঝাঁপিয়ে পড়লে সে পাল্টা আক্রমণের সুযোগ নিতে পারত না। বলল আলেক্সি গ্যারিন।
ইয়েস মাই লর্ড। একই সংগে বলল জিজর ও ডারথ ভাদের।
তোমরা আজ যা করলে, আগামীতেও তাই কি করতে থাকবে? বলল আলেক্সি গ্যারিন। তীব্র কন্ঠ তার।
মাই লর্ড। আমাদের লোকরা যথেষ্ট প্রস্তুত না হয়েই তাদের ফলো করছিল। তাই বিষয়টি তারা কাউকেই জানায়নি। আহমদ মুসাকে যখন তারা পেয়েছে এবং তাকে ফলো করেছে, তখন তা তাহিতির হেড কোয়ার্টারে ও আশেপাশের আমাদের লোকদের জানানো উচিত ছিল। হয়তো তাতে এই বিপর্যয় রোধ করা যেত এবং আহমদ মুসাকে ফাঁদে আটকানো যেত। ভুল আমাদের কমান্ডোরা করেছে মাই লর্ড। এ রকম ভুল আর হবে না। বলল জিজর।
আলেক্সি গ্যারিন তাকাল ডারথ ভাদেরের দিকে। বলল, ঘটনার পর আহমদ মুসা কোথায়, কি করছে? এ বিষয়টা মনিটর করা হচ্ছে কি না?
ইয়েস মাই লর্ড। ঘটনার পর আমাদের লোকরা জেলের ছদ্মবেশে ঘটনাস্থল ও নেভাক ডক ইয়ার্ডে যায়। তারা জানিয়েছে, আহমদ মুসা নেভাল ডক ইয়ার্ডের হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিল। চিকিৎসা নেয়ার পর সে এখন কোথায়, তা জানা যায়নি। তবে…।
ডারথ ভাদেরের কথার মাঝখানেই আলেক্সি গ্যারিন বলল, আচ্ছা, আহমদ মুসা, স্বরাষ্ট্র সচিব দ্যাগলের সাথে নেভাল ডক ইয়ার্ডে গিয়েছিল কেন?
স্বরাষ্ট্র সচিবের সাথে আহমদ মুসার ঘনিষ্ঠতা রয়েছে। স্বরাষ্ট্র সচিব ফ্রান্সের লোক। আর আহমদ মুসার স্ত্রীও ফ্রান্সের রাজকুমারী। তাই স্বরাষ্ট্র সচিব আহমদ মুসাকে সম্মানের চোখে দেখেন বলে জানা গেছে। তিনিই হয়তো আহমদ মুসাকে নেভাল ডক ইয়ার্ড দেখাবার জন্যে নিয়ে যান। ডারথ ভাদের বলল।
তুমি কি বলতে যাচ্ছিলে? বলল আলেক্সি গ্যারিন জিজরকে লক্ষ করে।
ইয়েস মাই লর্ড, আহমদ মুসার বিষয়ে বলতে যাচ্ছিলাম, ঘটনার সন্ধ্যার দিকে একটা হেলিকপ্টার নেভাল ডক ইয়ার্ড থেকে পাপেতি যায়। জানা গেছে স্বরাষ্ট্র সচিব ঐ হেলিকপ্টারে পাপেতি ফিরেছেন। সবারই ধারনা স্বরাষ্ট্র সচিবের সাথে আহমদ মুসাও পাপেতি ফিরেছেন। আহমদ মুসা আহত বলেই তাকে স্বরাষ্ট্র সচিব হেলিকপ্টারে করে পাপেতি নিয়ে গেছেন। বলল জিজর।
আহমদ মুসা আহত হয়েছে নিশ্চয় ঐ ঘটনায়। তাহলে তো আমাদের কমান্ডোরা তাকে আঘাত হানতে পেরেছিল। কি রকম আহত, কতটা আঘাত সে পেয়েছে? খোঁজ নাও। নিশ্চয় পাপেতিরই কোন এক হাসপাতালে সে থাকবে।
হাসপাতালে সে নাও থাকতে পারে মাই লর্ড। কোন বাড়িতে রেখেও তার চিকিৎসা হতে পারে। বলল গৌরী। এই প্রথম কথা বলল সে। তার মনও চাচ্ছিল যে, কোন হাসপাতালে আহমদ মুসা না থাকুক। কারণ পাপেতির হাসপাতালগুলোতে গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা কোনটাই নেই। তার মনের এই চাওয়াটাই প্রকাশ হয়ে পড়েছে তার কথায়। মনের এই চাওয়াটায় চমকে উঠল সে। কেন সে আহমদ মুসার নিরাপত্তা চাইবে?
গৌরীর মনের এই বিব্রত অবস্থা বেশি দুর এগোতে পারল না। কথা বলল আলেক্সি গ্যারিন, গৌরী ঠিক বলেছে। শুধু হাসপাতাল খুঁজলে হয়তো তাকে পাওয়া যাবে না। আসলে আহমদ মুসাকে কোন বাড়িতে রাখার সম্ভাবনাই বেশি।
কিন্তু মাই লর্ড। আহমদ মুসা এ পর্যন্ত হোটেলেই থেকেছে। তাহিতি সরকার তাকে কোন বিশেষ মর্যাদা দিলে সরকারি আতিথ্যে রাখতো। হতে পারে স্বরাষ্ট্র সচিবের সাথে তার সম্পর্কটা পারসোনাল। বলল ডারথ ভাদের।
তোমার কথা সত্য হলেও তার কোন বাড়িতে থাকার সম্ভাবনা রদ হয় না। হোটেল নিরাপদ নয় দেখেই তো সে কয়েক দিন বাড়িতেই আত্মগোপন করে থাকছে। অতএব, বাড়িতে থেকে চিকিৎসা নেবে এটাই স্বাভাবিক।
বলে একটু থামল আলেক্সি গ্যারিন। একটু ভেবে আবার শুরু করল, তাকে খুঁজে পাওয়ার কাজটা একটু কঠিনই হয়ে গেল। হাসপাতালে থাকলে আমাদের কাজ সহজ হতো। যাক, সে আহত এটা আমাদের জন্যে একটা বড় খবর। অবশ্যই সে দুর্বল হয়ে পড়েছে। এই সুযোগকে আমাদের কাজে লাগাতে হবে। থামল আলেক্সি গ্যারিন।
মাই লর্ড, তাকে আমরা খুঁজে বের করবই।
শুধু পাপেতি নয়, পাপেতির আশেপাশের বসতিগুলোকেই আমরা টার্গেট করেছি। পাহাড় ও উপকূলের হোটেল-মোটেল, রেষ্ট হাউস, মেস সব আমাদের টার্গেটের ভেতরে। আমরা প্রতি ইঞ্চি মাটি সার্চ করব এবং সেটা একই সাথে শুরু করবো। যে অঞ্চল সার্চ হবে, সেখানে গিয়ে আবার যাতে আশ্রয় নিতে না পারে, এজন্যে সে অঞ্চলকে আমরা পাহারায় রাখব। আর আমরা যে সার্চ করেছি তাকে, সেটা সে বুঝতেই পারবে না। বিভিন্ন সেবা প্রতিষ্ঠান, পুলিশ, হোম সার্ভিস কোম্পানী ইত্যাদির নামে বিভিন্ন প্রয়োজন ও অজুহাতে সার্চ চলবে। এর মধ্যে কারও সন্দেহ করার কিছুই থাকবে না। আমাদের প্রায় সব জনশক্তিকেই তাহিতিতে এই কাজে নিয়োগ করা হবে। আমাদের এই ক্যাপিটাল অব পাওয়ার থেকেও লোক নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তারাই নেতৃত্ব দেবে এই সার্চে। যে কয়দিন সার্চ চলবে, সে কয়দিন আমাদের ক্যাপিটাল অব পাওয়ারে বিজ্ঞানীদের কাজ বন্ধ থাকবে। তারা তাদের ক্যাপসুলে তালাবদ্ধ থাকবে। ম্যাডাম গৌরীর নেতৃত্বে রুটিন পাহারা ও ডিউটির জন্যে একটা ছোট দল থাকবে মাত্র ক্যাপিটাল অব পাওয়ারে।
একটু থামল জিজর। থেমেই আবার বলল, মাই লর্ড, মোটামুটিভাবে এটাই আমাদের চিন্তা। প্ল্যানের আরও ডিটেইলডটা আমরা তাহিতিতে বসেই করব।
তোমাদের চিন্তা ঠিক আছে জিজর। ম্যান পাওয়ার প্ল্যানিংটাও ঠিক আছে। এক এলাকায় এক সাথে সার্চ। আবার সার্চ হওয়া এলাকায় পাহারা বসানো। অনেক লোক তো লাগবেই। কিন্তু এই কাজে তোমরা কয়দিন সময় নেবে? বলল আলেক্সি গ্যারিন।
দু’দিনের বেশি নয়, মাই লর্ড। রাত-দিন ২৪ ঘন্টা আমাদের সার্চ চলবে। বলল জিজর।
ও কে। মনে রেখ আর কোন ব্যর্থতা আমি বরদাশত করবো না। কার কি পরিচয় আমি বুঝি না, মানি না। সাফল্যের বাইরে আমার আর কোন বিবেচনা নেই। ওকে। উইশ ইউ গুড লাক।
বলে আলেক্সি গ্যারিন গৌরীর দিকে তাকিয়ে বলল, তুমি একটু পর এস।
আলেক্সি গ্যারিনের কথা শেষ হবার সাথে সাথেই তার চেয়ারটা পিছু হটে পেছনের দেয়ালের ভেতরে ঢুকে গেল।
জিজর ও ডারথ ভাদেরও গৌরীকে ‘গুড নাইট’ বলে কক্ষ থেকে বের হয়ে গেল।
গৌরী তার হাতঘড়ির দিকে তাকাল। রাত ২টা। ক্লান্তির একটা হাই উঠল তার মুখ থেকে। তার শয়নকক্ষের সুন্দর বেড তার ক্লান্ত শরীরকে ডাকছে। কিন্তু উপায় নেই। তার ‘মাই লর্ড’ আলেক্সি গ্যারিন তাকে ডেকেছে।
বিক্ষোভের একটা বিচ্ছুরণ ঘটল গৌরীর চোখে-মুখে। কিন্তু উপায় নেই।
কোন আইন, নীতি-নিয়ম নয়, সে ইচ্ছার দাস। তার উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল, সে থ্রীল ও ঝুঁকি পছন্দ করতো। বড় কিছু করার জন্যে, বড় ঝুঁকি নেয়া যাবে, সে এমন ধরনের একটা জীবন চাইতো। কিন্তু এই জীবন তো সে চায়নি, যে জীবনে নারীত্ব, ব্যক্তিত্বের কোন সম্মান থাকবে না, যে জীবন হবে স্বেচ্ছাচারের অধীন। সে আগে কেন দেখা পায়নি আহমদ মুসার মত লোকের। তার জীবনে অনেক, অনেক বড় কাজ আছে, থ্রীল আছে, ঝুঁকি আছে, কিন্তু সেই সাথে নীতি-নৈতিকতা, আদর্শ ও মনুষ্যত্ব আছে। এমন জীবনই তো সে চেয়েছিল।
গৌরীর এ ভাবনার মধ্যেই তার পা গিয়ে উঠল লাল এলিভেটরে যা তাকে নিয়ে যাবে আলেক্সি গ্যারিনের কাছে।

আহমদ মুসার অনুমান ঠিক প্রমানিত হলো। তাহানিয়া অ্যাটলের পশ্চিম উপকূলের দক্ষিণ প্রান্তে যে সরবরাহ কেন্দ্র, সেটাই হলো ব্ল্যাক সান সিন্ডিকেটের ‘ক্যাপিটাল অব পাওয়ার’ মতুতুংগা অ্যাটলের রহস্যের সিংহদ্বার।
আহমদ মুসা তাহিতির স্বরাষ্ট্র সচিব দ্যাগলের সৌজন্যে পাওয়া আন্ডারওয়াটার ভেহিকেল ‘সীবেড ক্যাপসুল’ চালিয়ে এসে অবস্থান নিয়েছিল তাহানিয়া অ্যাটলের সেই সরবরাহ কেন্দ্রের সামনে উপকূল ঘেঁষে পানির নিচে। তার রাডার ও ক্যামেরা রেসিস্ট্যান্ট পোষাক আপাদমস্তক খোলসের মত পরে নিয়ে পানি থেকে উপকূলে উঠেছিল এবং গড়িয়ে পৌছেছিল গিয়ে সরবরাহ কেন্দ্রের নিচে, একদম দরজার গোড়ায়।
শুয়ে থেকেই আহমদ মুসা মাথা তুকে দেখেছিল, কোন আলো কোথাও জ্বলছে না, কেউ কোথাও নেই। দৃষ্টি সীমার মধ্যে সমুদ্রেও কোন আলো দেখতে পায়নি। ডান হাতের চেইন খুলে হাতঘড়ি বের করে রিস্টওয়াচের দিকে তাকিয়ে দেখল হিউম্যান ওয়াচ ইন্ডিকেটর গ্রীন সিগনাল দিয়ে যাচ্ছে। তার মানে এখান থেকে দশ বর্গগজের মধ্যে কোন মানুষ নেই।
সরবরাহ কেন্দ্রের দরজা স্টিলের। ডবল লক করা।
আহমদ মুসা নিশ্চিত ছিল, সরবরাহ কেন্দ্রের ভেতরে-বাইরে দু’দিকেই ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা আছে। কিন্তু যেহেতু গায়ে ক্যামেরা রেসিস্ট্যান্ট পোষাক আছে, সেজন্য উঠে দাঁড়িয়ে সাইলেন্সার লাগানো রিভলবার দিয়ে গুলি করে দু’টি তালাই ভেঙে ফেলল।
সরবরাহ কেন্দ্রটি এয়ারকন্ডিশন করা।
ঘরে সোফার সারি। তার সাথে কয়েকটা ডীপ ফ্রিজ ও কয়েকটা সেলফ। শাক-সবজি থেকে আটা-চাল, মসলাপাতি সবই সাজানো সেলফগুলোতে। ডীপ ফ্রিজগুলোও খুলে দেখল আহমদ মুসা। নানা রকম নাছ-গোশত ও ডেয়ারি দ্রব্যে ভরপুর ডীপ ফ্রিজগুলো। আহমদ মুসা নিঃসন্দেহে স্বীকার করে নিল, ক্যামোফ্লেজ নয়, এটা সত্যিই সরবরাহ কেন্দ্র এবং এটাও বুঝে নিল, এ সঞ্চয়গুলো মতুতুংগা অ্যাটলের ‘ক্যাপিটাল অব পাওয়ার’ – এর জন্যই।
কিন্তু রহস্যের দরজা কোথায়?
সরবরাহ কেন্দ্রের বিশাল ঘরটা তন্নতন্ন খুঁজে কিছুই পায় না সে। এক জায়গায় দু’টি রেফ্রিজারেটরের মাঝখানে ফাঁকা দেয়াল দেখতে পায়। অস্বাভাবিক মনে হয় দেয়ালটাকে। হাতের রিভলবার দিয়ে টোকা দেয় স্টিলের পরে। একটা হালকা ধাতব শব্দ হয়। তার মানে ওটা দেয়াল নয়, স্টিলের কিছু, দরজাই হবে হয়তো।
দু’টি রেফ্রিজারেটরের মাঝের স্পেসটা একজন মানুষের সাধারণভাবে চলাচলের জন্য যথেষ্ট নয়।
নিজেকে সংকুচিত করে আহমদ মুসা দেয়ালের নিকটে পৌছে চাপ দেয় দরজা আকারের স্টিলের পাল্লার উপর। সংগে সংগে খুলে যায় পাল্লা। পুরোপুরিই একটা দরজা এটা।
দরজা খুলে গেলে আহমদ মুসা দেখতে পায়, ওপারে আরও বড় একটা ঘর। গোটাটাই একটা কোল্ডস্টোরেজ। সেখানে আলু, টমেটো, বীট, গাজর ইত্যাদির স্তূপ।
কক্ষটি অনেকখানি নিচু। প্রায় পাচ-ছয়টা ধাপ পেরিয়ে কক্ষটিতে নামতে হয়। কক্ষটিতে নামে আহমদ মুসা।
ঘরটিতে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের বিশাল সংগ্রহ দেখে বিস্মিত হয় না আহমদ মুসা। ‘ ক্যাপিটাল অব পাওয়ার’ অর্থাৎ মতুতুংগার প্রাসাদে শুধু বিজ্ঞানী-বিশেষজ্ঞই বন্দী আছে ৭৬ জন। এঁরা ছাড়াও তো সেখানে আরও লোক আছে। সুতরাং তাদের জন্য খাবারের এ ধরনের বড় আয়োজন তো থাকবেই হবে।
কিন্তু রহস্যপুরীতে ঢোকার সিংহদ্বারটা কোথায়? খুঁজতে শুরু করে আহমদ মুসা।
ঘরের চারিদিকের দেয়াল ঘেঁষে বড় বড় ডীপ ফ্রিজের সারি। আর মাঝখানে মেঝেতে রাখা আলু, টমেটো ইত্যাদির স্তুপ।
ডীপ ফ্রিজগুলো একের পর এক খুলে ভেতরটা দেখতে থাকে আহমদ মুসা। সেগুলো আগের মতই মাছ, গোশত, ডেয়ারি পণ্যে ঠাসা। দুই ঘরের পার্টিশন ওয়ালের পাশ ঘেঁষে রাখা একটা বড় ডীপ ফ্রিজার খুলে আহমদ মুসা দেখে, ফ্রিজটা অন্যগুলো থেকে একটু ভিন্ন। ডীপ ফ্রিজের মাঝামাঝি বরাবরের মতই কিছু উপরে, কিছু নিচে মানে পুরো আয়তন জোড়া একটা ট্রের উপর টিনজাত খাদ্য সাজানো। ট্রের নিচে গোটা ফ্রিজটাই খালি। ডীপ ফ্রিজের তলা সবচেয়ে বিস্ময়ের ঠেকেছিল আহমদ মুসার কাছে। তলাটা মেটালিক নয়! পুরোটাই যেন একটা শ্বেত পাথর! পাথরটির চার প্রান্তই ডীপ ফ্রিজটির চারদিকের ওয়াল থেকে কিছুটা আলগা অর্থাৎ ডীপ ফ্রিজের আয়তনের তুলনায় সাদা পাথরটি ছোট। তাছাড়া এর উত্তর প্রান্তের মাঝখানে একটা বড় সাদা কাপ উপুর করে রাখা। কাপটা মনে হচ্ছে প্লাস্টিকের।
এই অস্বাভাবিকতা আকর্ষণ করে আহমদ মুসাকে। ট্রেটি তুলে নেয় ডীপ ফ্রিজ থেকে। তারপর ঢুকে যায় ডীপ ফ্রিজের মধ্যে। ঠিক তলাটি সলিড শ্বেত পাথরের। আহমদ মুসা কাপটি তুলে নেয়। অমনি তার নজরে পড়ে কাপের নিচের সাদা রিংটি। রিংটি শ্বেত পাথরের প্লেটটার সাথে আটকানো।
আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠে আহমদ মুসার মুখ। এটাই তাহলে সিংহদ্বার!
আহমদ মুসা এক পাশে সরে দাঁড়িয়ে রিং ধরে টেনে তুলে ফেলে পাথরটাকে।
আনন্দ-বিস্ময়ে চোখ দু’টি বিস্ফারিত হলো আহমদ মুসার। তার সামনে উন্মুক্ত হয়ে পড়েছে একটি সিঁড়ি পথ।
আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করল আহমদ মুসা। খুশি হলো। তার অনুমান সত্য তা প্রমাণিত হতে চলেছে। এই সরবরাহ কেন্দ্রের মধ্যেই রয়েছে ব্ল্যাক সান সিন্ডিকেটের ‘ক্যাপিটাল অব পাওয়ার’ মতুতুংগা অ্যাটলের রহস্যের সিংহদ্বার।
আহমদ মুসা ব্যাগ থেকে গ্যাস মাস্কটা বের করে মুখে লাগিয়ে সিঁড়িতে নেমে গেল। সিঁড়িটা পরিচ্ছন্ন ও আলোকিতও।
সিঁড়িমুখের পাথর আবার সিঁড়ি মুখে সেট করল আহমদ মুসা।
দেখা যাচ্ছে সিঁড়িটা অনেক দুর পর্যন্ত নিচে নেমে গেছে। সাদা পাথরের সিঁড়িকে শেষ পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে। সিঁড়ি যেখানে শেষ সেখান থেকে রাস্তাটা সমতল হয়ে সামনে এগিয়েছে।
আহমদ মুসা যাত্রা শুরুর আগে ডান হাতের রিস্টওয়াচের হিউম্যান ইন্ডিকেটর, বিস্ফোরক ও মেটাল ইন্ডকেটর সব ঠিক আছে একবার দেখে নিল। মুখের গ্যাস মাস্কও ঠিক আছে কিনা দেখল। কাঁধে ঝুলানো তার সাইলেন্সার মিনি মেশিনগান। ডান হাতে লেজারগান।
নিজেকে প্রস্তুত দেখার পর আহমদ মুসা নজর দিল সিঁড়ি ও দু’পাশের দেয়ালের দিকে।
সিঁড়ি সাদা পাথরের। প্রতিটি সিঁড়িতে রয়েছে তিনটি করে পাথর। তিনটি পাথরই একটি অন্যটি থেকে আলগা। সব ধাপে একই অবস্থা।
সিঁড়ির দু’পাশের দেয়ালেও পাথর বসানো। বিভিন্ন রঙের। দেয়ালের মাঝ বরাবর পাথরগুলো সবই কালো। আরেকটা মজার ব্যাপার হলো, কালো পাথরের মাঝটায় রাউন্ড করা অনেক ফুটো। প্রতিটি কালো পাথরে এই একই রকম ডিজাইন। সিঁড়ির ছাদটার প্লাস্টার সাদা রঙের।
সিঁড়ি থেকে নামতে গিয়ে আহমদ মুসা আরও একবার ভেবে নিল, সিঁড়ি পথে নিরাপত্তামূলক কি কি ব্যবস্থা থাকতে পারে। পাহারায় লোক থাকতে পারে। সিঁড়ি পথে বিস্ফোরকও পেতে রাখতে পারে। হয়তো তারা সিঁড়ির নির্দিষ্ট রুটে চলে। এর বাইরে গেলেই বিস্ফোরকের ফাঁদে পড়তে হতে পারে। শত্রুর আগমন টের পেলে ওরা বিষাক্ত গ্যাস বোমাও ছুঁড়তে পারে সিঁড়ি ও সুড়ঙ্গে। এছাড়া আর কি ব্যবস্থা সুরঙ্গ পথের নিরাপত্তার তা জানা নেয় আহমদ মুসার। তবে তাকে এই অবস্থায় হিউম্যান ওয়াচ মনিটর (HWM) ও মেটাল বিস্ফোরক ডিটেক্টরের নির্দেশনা সামনে রেখেই চলা ছাড়া উপায় নেই।
সিঁড়ি দিয়ে নামতে শুরু করল আহমদ মুসা।
কতকগুলো ধাপ নামার পর অনেকটা নিশ্চিন্তই হয়ে উঠেছিল আহমদ মুসা।
হঠাৎ বিপ বিপ শব্দ হলো ডান হাতের রিষ্টওয়াচ থেকে। হাত ঘুরিয়ে রিস্টওয়াচের দিকে তাকিয়ে দেখল, মেটাল ও বিস্ফোরক ইন্ডিকেটর লাল সিগন্যাল দিচ্ছে।
সংগে সংগে দাঁড়িয়ে গেল আহমদ মুসা।
এখান থেকে কয়েক গজের মধ্যে কোথাও মেটালিক কিছু বা বিস্ফোরক আছে। ইন্ডিকেটর মেটাল ও বিস্ফোরক দু’য়েরই উপস্থিতির সংকেত দিচ্ছে।
কিন্তু সিঁড়ি, সিঁড়ির দু’পাশের দেয়াল ও সিঁড়ির উপরের ছাদ সবই ত আনেকদুর পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে পরিস্কার! কিছু কোথাও নেই। তাহলে সিগন্যাল আসছে কেন?
আহমদ মুসা চোখ উপরে তুলল, ছাদের দিকে। বিপ বিপ শব্দ কিঞ্চিত কমে গেল। বুঝল আহমদ মুসা, ইন্ডিকেটরটা বিস্ফোরক বা মেটালের উৎস থেকে একটু দূরে সরে গেছে।
ইন্ডিকেটরের বিপ বিপ শব্দ উৎসের যত কাছে যায় তত বাড়ে, দূরে সরলে কমে।
আহমদ মুসা এবার ডান হাতটা পাশের দেয়ালের দিকে নিল। আওয়াজ বেরে গেল বিপ বিপ শব্দের।
আহমদ মুসা নিশ্চিত হলো, কাছেই দেয়ালের কোথাও বিস্ফোরক বা এ জাতীয় কিছু লুকানো আছে। লুকানো আছে কেন? এর ব্যবহার তাহলে কিভাবে হবে?
আহমদ মুসা লুকানো জায়গাটাকে সঠিকভাবে লোকেট করার জন্য রিস্টওয়াচ পরা ডান হাত সিঁড়ির দেয়ালের আরও সামনে এগিয়ে নিল। এগিয়ে নিতে গিয়ে তার বাম পাতা সিঁড়িতে রাখার সাথে সাথেই তা দেবে গেল সামান্য। দেহের ভারসাম্য হারিয়ে আছড়ে পড়ার মত উপরের সিঁড়িতে বসে পরল।
ঠিক যে সময় আহমদ মুসার দেহ উপরের সিঁড়িতে বসে পড়ছিল, তখন সিঁড়ির দু’পাশের দেয়াল থেকে এক পশলা গুলির বৃষ্টি সিঁড়ির মাঝের দিকে ছুটে এল। মাঝখানে কোন টার্গেট না পাওয়ায় গুলির পশলা পরস্পর বিপরীত দিকের দেয়ালে গিয়ে আঘাত করল। গুলিগুলো নিঃশব্দে এসেছিল।
বিস্ময়-বিস্ফারিত চোখে দেখল আহমদ মুসা এই দৃশ্য। নিচের ধাপে পা রেখে যদি সে দাঁড়িয়ে যেত ধাপটির উপর, তাহলে বুকের দু’পাশের দুই পাঁজর দিয়ে গুলির ঝাঁক তার বুকে ঢুকে যেত। অদ্ভুত পরিকল্পনা ব্ল্যাক সান সিন্ডিকেটের।
মুখের গ্যাস মাস্ক ঠিক আছে কিনা দেখে নিয়ে সিঁড়ির অবশিষ্ট অংশ ক্রলিং করে নামার সিদ্ধান্ত নিল আহমদ মুসা।
সিঁড়ির গোঁড়ায় এসে আহমদ মুসা উঠে দাঁড়াল।
সামনের দিকে তাকাল। সুড়ঙ্গের মেঝেটা একই রকমের কংক্রিটের এবং নিট-ফিনিশিং করা। কোন বিশেষ বিশেষত্ব চোখে পড়ল না।
সুড়ঙ্গটা টিউবের মত, শুধু মেঝেটাই সমতল। মেঝে ছাড়া অর্ধ বৃত্তাকার অংশটি প্লাস্টার করা। এখানেও কোন কিছু তেমন আহমদ মুসার নজরে পড়ল না।
বিসমিল্লাহ বলে রিস্টওয়াচের ইনডিকেটরের দিকে নজর রেখে চলতে লাগল আহমদ মুসা।
এক জায়গায় এসে সুড়ঙ্গের একটা ছোট বাঁক। বাঁকে মাথার উপরের বাল্বটা খুবই উজ্জ্বল। বাঁক নেয়ার জন্যেই কি এটা! হতে পারে।
কিন্তু কয়েক ধাপ এগোলেই মেটাল ইনডিকেটর সাংঘাতিকভাবে বিপ বিপ করতে লাগল, অনেকটা চিৎকারের মত।
সংগে সংগে দাঁড়িয়ে পড়ল আহমদ মুসা।
ডান হাতটা সব দিকে ঘুরিয়ে ইনডিকেটর পরীক্ষা করে দেখল, বিপ বিপ- এর তীব্রতা উপর দিকে বেশি, মনে হলো কেন্দ্রটা উজ্জ্বল বাল্বের দিকে। কিন্তু বাল্ব বরাবর গোটা সুড়ঙ্গেই ইনডিকেটর বিপ বিপ সিগন্যাল দিচ্ছে।
আহমদ মুসা বাল্বের দিকে মনোযোগ দিয়ে তাকিয়ে দেখল বাল্বের হোল্ডারটা স্টিলের। সুড়ঙ্গে এ পর্যন্ত দেখা সব বাল্বের হোল্ডার প্লাস্টিকের।
আহমদ মুসা নিশ্চিত হলো, বাল্বের হোল্ডারের কারনেই ইনডিকেটরের এই বিপ বিপ। কিন্তু এত বড় স্টিল হোল্ডারে এত বড় বাল্ব কি এই বাঁকের জন্যে দেয়া হয়েছে? এর কোন সদুত্তর সে খুঁজে পেল না।
আহমদ মুসা চলতে শুরু করল।
বাল্বের ঠিক নিচে পৌঁছাতেই বাল্বটার বিস্ফরন ঘটল। সংগে সংগে হালকা এক প্রকার গ্যাসে আহমদ মুসার চারিদিকটা ভরে গেল।
বিস্ফোরণের আকস্মিকতায় চমকে উঠেছিলো আহমদ মুসা। বুঝে নিয়েছিল কি ঘটেছে। সংগে সংগে বাড়তি সতর্কতার জন্যে মুখের গ্যাস মাস্কের ইলাস্টিক বাটন ঠিক আছে কিনা দেখে নিল।
সংগে সংগেই আবার হাটা শুরু করল আহমদ মুসা।
কয়েক গজ হাটার পর দেখল গ্যাস মাস্কের স্ক্রিনে ইয়েলো রঙ আর নেই। আহমদ মুসা বুঝল, প্রাণঘাতী গ্যাস স্পোক শুধু বাল্বের নিচে আসা শত্রুদের মারার জন্যে কয়েক গজের মধ্যে নিয়ন্ত্রিত রাখা হয়েছে।
চলা অব্যাহত রাখল আহমদ মুসা।
ভাবল, দুই ফাঁদ সে পার হয়েছে। আর কি ফাঁদ পাতা আছে সামনে?
আরও ভাবল, সুড়ঙ্গে তারা কোন প্রহরী রাখেনি তো! তারা তাদের পাতা ফাঁদের উপর নির্ভর করেছে। আহমদ মুসা মন মনে সেই সাথে স্বীকার করল, তাদের ফাঁদগুলো বিস্ময়কর ধরনের নতুন, যা থেকে বাঁচা আল্লাহর সাহায্যেই শুধু সম্ভব। প্রথম ফাঁদের ক্রস ফায়ার থেকে আল্লাহ তাকে বাঁচিয়েছেন। আর এই বিশেষ গ্যাস মাস্ক তার কাছে ছিলনা, এটা সে পেয়েছে ওপরের সরবরাহ কেন্দ্রে। এটাও আল্লাহর সাক্ষাত সাহায্য।
সুড়ঙ্গ পথ শেষ হল।
এবার সিঁড়ি পথে উপরে উঠতে হবে।
সিঁড়িতে পা দেবার আগে আহমদ মুসা সিঁড়ির দিকে একবার তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাল। এ সিঁড়ি পথটা আগের চেয়ে ভিন্ন। সাদা পাথরের সিঁড়ি। সাদা পাথরের মধ্যে এখানে ওখানে ঘন কালো পাথর বসানো। কালো পাথরগুলো শৃঙ্খলার সাথে বসানো নয়, বিক্ষিপ্ত ও কালো পাথরগুলো আকারেও এক রকম নয়। মোজাইকে এমন পাথর বসানোর নজির আছে। বলা যায়, মোজাইকের ডিজাইনই এখানে অনুসরন করা হয়েছে এবং সন্দেহ নেই তা সৌন্দর্যেরও সৃষ্টি করেছে।
সিঁড়ি বেয়ে উঠতে লাগল আহমদ মুসা। চারিদিকে বিশেষ করে সিঁড়ির দিকে ভাল করে চোখ রেখেছে আহমদ মুসা।
সিঁড়ির প্রায় অর্ধেকটা পথ উঠেছে।
এখানে একটা ধাপে পা চেপে অন্য পা উপরের ধাপে ওঠাবার জন্যে তুলল আহমদ মুসা। শরীরের পুরো ওজন যখন নিচের পায়ের উপর পড়ল। তখন পা রাখার জায়গাটা অল্প দেবে গেল।
চমকে উঠল আহমদ মুসা! কিন্তু কিছু করার সময় ছিল না।
পারল শুধু নিচের পায়ের উপর শরীরটাকে রেখে নিচে নামিয়ে নিতে। তাতে নিচের ধাপের উপর পায়ের উপর চাপ আরও বাড়ল।
নিচের ধাপে পায়ের একটা আঘাত টের পেয়েছে সে। আঘাতটা তার জুতার সোলে। তীক্ষ্ণ একটা শব্দও তার কানে এসেছে।
মুহূর্ত কয়েক অপেখা করে আহমদ মুসা উঠে দাঁড়াল উপরের ধাপে। নিচের ধাপে রাখা পা তুলে আহমদ মুসা দেখল, স্টিলের একটা স্পোক ঢুকে গেছে জুতার সোলে। স্পোকটার আধা ইঞ্চির মত অংশ বাইরে বেরিয়ে আছে। বুঝল, স্পোকটা জুতার সোলের প্রথেমে রাবার, পরে চামড়ার অংশ ভেদ করে গিয়ে আটকা পড়েছে সোলের স্টিলের অংশে। জুতাটি বিশেষভাবে তৈরি। স্টিলের একটা প্লেট জুতার গোড়ালি থেকে আগা পর্যন্ত জুড়ে দেয়া আছে।
আহমদ মুসা হাতে গ্লাভস লাগিয়ে টেনে বের করল স্পোকটি। অত্যন্ত তীক্ষ্ণ স্পোকটির আকৃতি দেখেই বুঝল, বিশেষ অস্ত্রের জন্য বিশেষভাবে তৈরি এটা। স্পোকটি বিষাক্ত হবে নিশ্চয়।
আহমদ মুসা গ্যাস মাস্কের একটা বোতাম টিপে একটা বিশেষ স্ক্রিন চোখের সামনে নিয়ে এলো। এই স্ক্রিনের সামনে এনে স্পোকটি পরীক্ষা করল আহমদ মুসা। নিশ্চিত হলো, স্পোকটি গোটাই বিষাক্ত। জুতার সোলে স্টিলের প্লেট না থাকলে এই স্পোকটি আঘাত করত পায়ের তালুতে। প্রাণঘাতী বিষে সংগে সংগেই মৃত্যু নেমে আসত।
আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করল আহমদ মুসা।
তাহিতির স্বরাষ্ট্র সচিব দ্যাগল তাকে জুতাটি প্রেজেন্ট করেছে এই অভিযানের জন্যে। এই জুতার আরও কার্যকারিতা রয়েছে। আহমদ মুসারও এই ধরনের একটা জুতা ছিল। কিন্তু সে জুতাটি সে হারিয়ে ফেলেছে হোটেল লা ডায়মন্ড ড্রপে আসার পর।
নিচের ধাপের যে জায়গা থেকে স্পোকটি বেরিয়ে এসেছে, সেটাও পরীক্ষা করল আহমদ মুসা।
নিচের ধাপের যেখানে পা রেখেছিল, তাও সেট করা একটা কালো পাথরের উপর। এটা কালো পাথরটির মাঝের প্রায় গোটা অংশই জুড়ে রয়েছে। পাথরতিতে দুই সারি ছিদ্র। ছিদ্রগুলোও কালো। কালো পাথরের সূক্ষ্ম কালো ছিদ্রগুলো দাঁড়ানো অবস্থায় সাধারনত চোখে পড়ার মত নয়।
আহমদ মুসা মনে মনে বলল, অদ্ভুত সব ফাঁদ পেতে এঁরা এদের সুড়ঙ্গ পথকে সুরক্ষিত করেছে! মানুষের শক্তিকেও এরা বদলে দিয়েছে যান্ত্রিক কৌশলের ভয়াবহতা দিয়ে। ভেতরের অবস্থা আরও কতটা ভয়াবহ জানি না!
হাঁটা শেষ করে সিঁড়ির স্ট্যান্ডিং-এ উঠে দাঁড়াল আহমদ মুসা। মুখোমুখি হলো একটা বড় দরজার। সলিড স্টিলের দরজার দু’পাশটাই দু’পাশের দেয়ালে ঢুকে পড়েছে, , উপর ও নিচের অংশটাও একই রকম।
দরজার চারপাশটা আহমদ মুসা খুটে খুটে দেখল।
দরজা খোলার ক্লু খুঁজছে সে। নিশ্চয় কোথাও সে ক্লু আছে। কোথায় সেটা?
হঠাৎ আহমদ মুসা দেখতে পেল দরজার মাথার সমান উঁচুতে স্টিলের গায়ে স্টিল কালারের মার্বেলের মত গোলাকার টাচ লকের ক্যালকুলেটর বোর্ড। চারদিক খুঁজল, আশেপাশে কিংবা দরজার অন্য কোথাও এ ধরনের কিছু নেই।
নিশ্চিত হলো আহমদ মুসা, দরজা খোলার লক এটাই।
কিন্তু এর অপারেটিং সিস্টেম কেমন? এ টাচ লকে ক্যাল্কুলেট বা কম্পিউটারের মত ডিলিট, অ্যাড, মাইনাস ইত্যাদির মত কোন অপশন নেই। শুধু রয়েছে এক থেকে শূন্য পর্যন্ত নাম্বার।
এই অবস্থায় ডিজিটাল লক বিপজ্জনক হতে পারে। টাচ করলে যে নাম্বার উঠবে, তা ডিলিট করা সম্ভব হবে না। আর সে নাম্বার বা নাম্বারগুলো যদি সঠিক কোড না হয়, তাহলে দরজা খোলার আর সুযোগ থাকবে না।
এই প্রথম একটা উদ্বেগ এসে আহমদ মুসাকে আচ্ছন্ন করল।
ঘড়ি দেখল আহমদ মুসা। রাত ৮টা। তার সব কাজ রাত ১২টার মধ্যেই শেষ করতে হবে।
রাত ১২টা পর্যন্ত ঘুমায় ব্ল্যাক সান সিন্ডিকেটের এই ক্যাপিটাল অব পাওয়ার। এদের ঘুম শুরু হয় সন্ধ্যা ৬টায়। এসব কথা সে শুনেছে তাদের নিরাপত্তা হেফাজতে থাকা ব্ল্যাক সান সিন্ডিকেটের মফ ফ্লেরির কাছ থেকে।
উদ্বেগ নিয়ে দরজাকে পাশে রেখে বসে পড়ল আহমদ মুসা। বুঝতে পারল সে, সুড়ঙ্গ ও গেটের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে এতটাই নিশ্চিত করেছে যে, প্রহরী রাখারও প্রয়োজন হয়নি।
বসেই আহমদ মুসা হাত বাড়াল দরজার গোড়ায় দরজা ও ফ্লোরের মাঝখানে যে সংকীর্ণ ফাঁক রয়েছে সেখানে।
বসার সময়ই সে দেখতে পেয়েছে দরজা ও ফ্লোরের প্রান্তটির মাঝখানের ফাঁকে ঠিক দরজার রঙেরই একটা ভাজ করা কাগজ।
একটা আঙুল দিয়ে কোনমতে তুলে নিল ভাঁজ করা কাগজ খণ্ডটি। দ্রুত কাগজ খণ্ডটির ভাঁজ খুলল আহমদ মুসা।
৮ সেন্টিমিটারের মত বর্গাকৃতির একটা কাগজ। শুরুতেই একদম টপে এক পাশে ছোট একটা বৃত্ত। তাও স্টিল কালারের। তার পাশে সমান্তরালে অনেক ডিজিট। তার নিচে একটা রঙিন ডায়াগ্রাম। ডায়াগ্রামটি শুরু হয়েছে বটম থেকে। লাল ও সবুজ দু’টি রেখা। সবুজ রেখাটি বাম পাশে বেঁকে নিচের দিকে গেছে তারপর শাখা-প্রশাখায় বিভক্ত হয়েছে সবুজ রেখাগুলোর মাথায় শৃঙ্খলিত মানুষের রেখাচিত্র। লাল লেখাটি উপরে উঠে গেছে।লাল রেখাটি শেষ হয়েছে একটা রেখাচিত্রের সামনে। রেখাচিত্রটির মাথায় রাজমুকুট। আহমদ মুসার চোখে-মুখে বিস্ময়।
এই বিস্ময় নিয়েই আহমদ মুসা কাগজ খণ্ডটি আর উপরের ডিজিটাল নাম্বারের উপর আবার নজর দিল।
আহমদ মুসার মনে হলো, এই কাগজের সাথে এই দরজার সম্পর্ক আছে। তা না হলে কাগজটি এখানে থাকবে কেন, তার রংও দরজার মতই হবে কেন?
ডিজিটাল নাম্বারের পাশে বৃত্তকে দরজার ডিজিটাল লক এবং পাশের নাম্বারকে লক খোলার ডিজিটাল কোড হিসেবে ধরে নিল।
কিন্তু নিচের ডায়াগ্রামটা?
এরও অর্থ আছে। কি সেই অর্থ?
মানুষের শৃঙ্খলিত রেখচিত্র কি বিপদ্গ্রস্ত মানুষের মানে বিজ্ঞানীদের বুঝানো হয়েছে? কিন্তু রাজমুকুটওয়ালা রেখাচিত্রটি কার? এ কি ক্যাপিটাল অব পাওয়ার, অন্য কথায় ব্ল্যাক সান সিন্ডিকেটের কি সর্বময় কর্তার? আর লাল-সবুজ রেখার তাৎপর্য কি? সবুজ কি শান্তি, আর লাল কি অশান্তি বা অত্যাচারের প্রতীক? এ প্রতীকটা তো মোটামুটি সকলেরই জানা! এটা এখানে দেখাবার অর্থ কি?
আহমদ মুসা অবশেষে ভাবল ভেতরে না ঢুকলে এ সবের অর্থ খুঁজে পাওয়া যাবে না।
আহমদ মুসা আবার ফিরে এল ডিজিটাল নাম্বারের কাছে। বৃত্ত ও ডিজিটাল নাম্বারগুলো সম্পর্কে তার ভাবনাটা ঠিক হলে টাচ লকটি একটা ডিজিটাল লক। কোড নাম্বারগুলো টাইপ করলেই দরজা খুলে যাবে।
কিন্তু লক খুলে যাক এটা চাচ্ছে কে? কে তাকে এটা সরবরাহ করল? কেন?
এর কোন উত্তর আহমদ মুসার জানা নেই।
এটা তার জন্যে একটা ফাঁদ কিংবা দরজা খোলা অসম্ভব করে তোলার একটা কৌশল নয় তো?
এরও কোন উত্তর জানা নেই আহমদ মুসার।
কি করার আছে এখন আহমদ মুসার?
ডিজিটাল নাম্বারটির দিকে আবার তাকাল আহমদ মুসা।
১৮ ডিজিটাল নাম্বারটি কিছুটা মজার। ১ থেকে ৯ পর্যন্ত সিরিয়ালি লেখা হয়েছে। তারপর এ ডিজিটগুলোকেই উল্টোভাবে সাজানো হয়েছে, নাম্বারগুলো আবার ৯ থেকে ১ পর্যন্ত লেখা। এই ১৮ ডিজিটকে এই সিরিয়ালে ১ শুরুতে বা বটমে রেখে ক্লকওয়াইজ সাজালে ক্লকবৃত্তের বটমে থাকে ডবল ১ এবং শীর্ষে থাকে ডবল ৯, সর্বোচ্চ নাম্বারের জোড়া যার যোগফল আঠার এবং বেজোড় সংখ্যা হিসেবে নিরানব্বই। ১৮ আঠারটি ডিজিটের যে কোনটির চেয়ে বড়। আর ৯৯ আঠার ডিজিটের সম্মিলিত যোগফলের চেয়ে বড়। আহমদ মুসা খুশি হলো, ১৮ ডিজিটের সংখ্যাবাচক কনসেপ্টের সাথে ব্ল্যাক সান সিন্ডিকেটের মনোগ্রামের কনসেপ্টের মিল আছে। ব্ল্যাক সান সিন্ডিকেটের মনোগ্রাম ‘সূর্য’টির টপ-এর কিরণটিই সর্বোচ্চ, অন্যগুলো ছোট-বড়, যেমন ডিজিটাল বৃত্তের ১৬টি ডিজিট।
আহমদ মুসা নিশ্চিত হলো, লক খোলার ডিজিটাল কোড ঠিক আছে।
আহমদ মুসা এগিয়ে গেল ডিজিটাল লক-এর দিকে। হাত তুলল টাচ লকের দিকে। কিন্তু সংগে সংগেই আবার এক পা পিছিয়ে এল।
দরজা খোলার আগে সব ঠিক আছে কি না দেখতে হবে তাকে।
জুতা, মোজার আড়াল, প্যান্টের পকেট, জ্যাকেটের পকেট, কলারের আড়ালটা সব ঠিক আছে কিনা দেখে নিয়ে সাইলেন্সারযুক্ত মাইক্রো মেশিনগান বাম হাতে নিল। ডান হাতের কাছে জ্যাকেটের ডান পকেটে লেজারগান রেখেছে।
আহমদ মুসা আবার এগিয়ে গিয়ে ডিজিটাল লকের সামনে দাঁড়াল।
বিসমিল্লাহ্ বলে আহমদ মুসা শাহাদাত আঙুলি দিয়ে ১ থেকে ৯ পর্যন্ত ‘টাচ কী’গুলো চাপল। তরপর ৯ থেকে ‘টাচ কী’ চেপে ১-এ ফিরে এল।
৯ম টাচ কীতে চাপ দিয়েই আহমদ মুসা ঠিক দরজার মাঝখানে সরে এল। দরজা যেদিকে যাবে সেদিকেই সরে যাবে সে, যাতে গুলির সামনে প্রথমেই পড়ে না যায়। ওরা যদি ভেতরে বেশি সংখ্যাক লোক থাকে, তাহলে ক্রস ফায়ারের সুবিধা ওরা পেয়ে যেতে পারে। মুখোমুখি না পড়ে মুহূর্তকালের জন্যে হলেও ওদের চোখের আড়ালে গিয়ে পাশ থেকে আক্রমন করতে চায় সে।
দরজা বাম দিকে সরছিল। কিন্তু যতটা চোখের পলকে সরবে মনে করেছিল, ততটা বেগে সরল না। ভারি দরজা স্বাভাবিক গতিতে সরছিল।
এসে সুবিধা হলো আহমদ মুসার।
দরজা সরে আসা শুরু হওয়ার সংগে সংগেই লাফ দিয়ে যেয়ে বামে কোণে শুয়ে রিভলবার তাক করল।
আহমদ মুসা দরজার পেছনেই স্টেনগান তাক করে হাঁটু গেড়ে বসে থাকা একজনকে দেখতে পেয়েছে, সেও দেখতে পেয়েছে আহমদ মুসাকে। আহমদ মুসা গুলি করেছে, সেও গুলি করেছে। আহমদ মুসা শুয়ে থেকেই গুলি করেছে, আর সেও গুলি করেছে হাঁটু গেড়ে বসা অবস্থায়। কিন্তু দেখতে পাওয়ার এবং গুলি করা মাত্র কয়েক মিলি সেকেন্ডের ব্যবধান, শুয়ে থাকা অবস্থায় গুলি করার কারণে বেশি সুবিধা পাওয়ায় জিতে গেল আহমদ মুসা।
আহমদ মুসার মাইক্রো মেশিনগানের এক ঝাঁক গুলি তাকে বিদ্ধ করল, আর লোকটির সব গুলিই লক্ষচ্যুত হয়েছে সে গুলিবিদ্ধ হয়ে হাতের আঙুল কেঁপে যাওয়ায়।
আহমদ মুসা গুলি শুরু করার পর আর বন্ধ করেনি। ট্রিগারে আঙুল চেপে রেখে তা বামে সরিয়ে নিচ্ছে দরজা সরে যাওয়ার সমান গতিতে।
ওরাও গুলি ছুঁড়ছে। কিন্তু সেগুলোর বেশির ভাগই দরজাকেই আঘাত করছে এবং কিছু দরজার খোলা পাশ দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে।

কিন্তু আহমদ মুসার গুলি দরজার আড়াল থেকে হওয়ায় কিছূটা কৌণিক হলেও তার অব্যাহত গুলি কাজে লাগছে দরজা অব্যাহতভাবে সরে যাওয়ার কারণে। ওরা দরজার পেছনে সারিবদ্ধভাবে বসে ছিল, সারিবদ্ধভাবেই ওদের লাশ পড়ে গেল।
দরজা খোলা শুরু হওয়া থেকে শেষ পর্যন্ডত সময় বেশি নয়, ওরাও গুলি করছিল, আর ওরাও দু’দেয়ালের মাঝখানে সারিবদ্ধ অবস্থায় বসে ছিল, এই সব কারণে তারা আড়াল নেয়নি, নেয়ার সুযোগও ছীল না। তারা ডানে সরে এসে সরাসরি আহমদ মুসাকে আক্রমণ করবে, তা পারেনি আহমদ মুসার অব্যহত গুলির জন্য। আবার ওরা পালায়নি পেছনে গিয়ে আলাদা অবস্থান নেবার জন্যে, কারণ ওরা পালায় না, আহমদ মুসা এটা দেখেছে।
ওদের আটটা লাশ দেখা যাচ্ছে দরজার পেছনে।
ঐ কোনটায় আহমদ মুসা শোয়া অবস্থায় আরও কিছুটা সময় অপেক্ষা করল। কেউ এল না। নিরব চারদিক।
আহমদ মুসা না উঠে ক্রলিং করে ভেতরে ঢুকল।
ভেতরে ঢুকে সামনে তাকাতেই চমকে উঠল আহমদ মুসা। ডায়াগ্রামে দেখা গেল লাল-সবুজের জীবন্ত দৃশ্য সামনে ভাসছে।
ভেতরে ঢুকেই প্রথমে প্রশস্ত স্ট্যান্ডিং। স্ট্যান্ডিং-এর পরেই মুভিং এলিভেটর। এলিভেটরের লাল-সবুজ দু’টি অংশ। দু’টিই চলছে পাশাপাশি বিপরীত দিকে। লালটা উপরে উঠছে এবং সবুজটা নামছে নিচে।
বিস্মিত আহমদ মুসা! একদম মিলে যাচ্ছে ডায়াগ্রামের সাথে। দরজা খোলার কোড নাম্বার দিয়ে এবং ভেতরের গাইডলাইন দিয়ে কে তাকে সাহায্য করল!। কিন্তু আহমদ মুসা আজ এখানে আসছে কে জানত!
আহমদ মুসা নিশ্চিত, ডায়াগ্রামকে অনুসরণ করেই সে লক্ষে পৌঁছতে পারবে। সবুজ এলিভেটর তাকে নিয়ে এল বন্দী বিজ্ঞানীদের কাছে এবং লাল এলিভেটরে সে যেতে পারবে ‘কিং’-এর কাছে। এই ‘কিং’টা কে? ব্ল্যাক সান সিন্ডিকেটের হেড? সেটাই হবে।
কোথায় আহমদ মুসা আগে যাবে? বন্দী বিজ্ঞানীদের কাছে, না ব্ল্যাক সান সিন্ডিকেটের সাথেই বুঝা-পড়া আগে শেষ করবে।
বিজ্ঞানী-বিশেষজ্ঞদের মুক্ত করে নিরাপদে তাদের নিয়ে যেতে হলে ব্ল্যাক সান সিন্ডিকেটের প্রধান ও অন্যদের হাত থেকে এই প্রাসাদকেই আগে মুক্ত করতে হবে। এটাই সিদ্ধান্ত নিল আহমদ মুসা।
আহমদ মুসা তাকাল লাল এলিভেটরের দিকে।
কিন্তু এদের লোকজন কোথায়?
এরা ৮ জন যে রকম প্রস্তুত অবস্থায় ছিল তাতে বুঝা যাচ্ছে, এরা তার জন্যে প্রস্তুত হয়ে অপেক্ষায় ছিল। তাহলে অন্যেরাও তো এটা জানবে! তারাও সাবধান থাকবে, প্রস্তুত থাকবে। তাহলে তারা কোথায়? এল না কেন এত গুলির শব্দ শোনার পরেও!
আহমদ মুসার মাইক্রো মেশিনগান সাইলেন্সারযুক্ত, কিন্তু ওদের গুলির তো শব্দ হয়েছে।
এ জিজ্ঞাসার জবাব পেল না আহমদ মুসা। বুঝতে পারলো না ঘটনা কি! তাহলে কি ওরা অন্য কোথাও অবস্থান নিয়েছে?
সিদ্ধান্ত আগেই নিয়ে নিয়েছিল আহমদ মুসা।
এবার বিসমিল্লাহ্ বলে লাল এলিভেটরের লাল সিনথেটিক কার্পেটে পা রাখল আহমদ মুসা।
ধীরে ধীরে এলিভেটর উঠতে লাগল উপরে।
আহমদ মুসার বাম হাতে ঝুলছে মাইক্রো মেশিনগান আর তার হাতের মুঠোয় রয়েছে লেজারগান।
আহমদ মুসা দেখতে পাচ্ছে এলিভেটর এক লেয়ার থেকে অন্য লেয়ারে উঠছে।
এক সময় দেখল এলিভেটর করিডোর, চত্বর দিয়ে চলছে। দু’পাশে ঘর, লাউঞ্জের সারি। এ সময় এলিভেটর সমতল অবস্থায় চলছিল। হঠাৎ এলিভেটর ৩০ ডিগ্রি কোণে উপরে উঠতে লাগল। এলিভেটরের দু’পাশেই অনেক উচু দেয়াল।অনেক উচুতে আহমদ মুসা এলিভেটরের মতই প্রশস্ত দরজা দেখতে পেল। দরজাটা অত্যন্ত দর্শনীয়। রাজা-বাদশাদের ঘরের দরজার মতই। আধুনিক যুগের এ্যান্টিকের একটা চমৎকার নিদর্শন। আহমদ মুসা ভাবল, এই দরজার ওপাশেই তাহলে ব্ল্যাক সান সিন্ডিকেটের রাজা থাকেন। দরজাটা ঠিক এলিভেটরের উপরে দাঁড়িয়ে আছে। এলিভেটর চলার উপযোগী ফাঁকটুকুই মাত্র রয়েছে দরজার নিচে।
প্রথম বুঝল আহমদ মুসা, দরজা বন্ধ। কিন্তু তার নিচ দিয়ে এলিভেটর চলছে। তার মানে তাকে এখনই প্রচণ্ড ধাক্কা দেবে। এর সাথে সাথেই প্রচণ্ড ধাক্কা খেয়ে নিচের ল্যান্ডিং-এ পড়ে যেতে হবে তাকে।
দরজা এসে গেছে।
আহমদ মুসা তাড়াতাড়ি ডান হাত বের করে সামনে বাড়িয়ে দিল যাতে ধাক্কা থেকে শরীরটাকে রক্ষা করা যায়।
কিন্তু হাত দরজা স্পর্শ করার আগেই দরজা খুলে গেল।
দরজা পার হবার পর এলিভেটরের পথ আবার সমতল হয়ে গেল।
কিন্তু অল্প দূরেই আরেকটা দরজা, ঘরের দরজা। ঘরটির সামনের দেয়ালটিই শুধু দেখা যাচ্ছে। পাথরের দেয়ালটি অদ্ভুত কারুকাজে সাজানো! দরজাটি মনে হয় সোনার অংশ দিয়েই কারুকাজ করা।
দরজার সামনে গিয়ে পৌঁছতেই এলিভেটর থেমে গেল আপনা-আপনি।
আহমদ মুসা নিশ্চিত হলো, স্বর্ণদরজার এ ঘরটাই ব্ল্যাক সান সিন্ডিকেটের রাজা’র বাসস্থান, যার রেখাচিত্র ডায়াগ্রামে আছে। এলিভেটর থেকে আহমদ মুসা দরজার সামনে ল্যান্ডিং-এ উঠে দাঁড়াল।
এখন কি করবে সে? দরজার ওপারে কি আছে?
আহমদ মুসা শাহাদাত আঙুল দিয়ে দরজার উপর চাপ দিল। খুলে গেল দরজা। বিস্মিত হলো আহমদ মুসা। এসব কি কোন যাদু বলে হচ্ছে?
খুলে গেল সম্পূর্ণ দরজা।
দরজার পরেই রাজকীয় কার্পেটে মোড়া করিডোর।
করিডোরের দু’পাশে দু’টি দরজা।
করিডোরের সামনে সুসজ্জিত লাউঞ্জ।
মিষ্টি সাদা আলোতে হাসছে যেন লাউঞ্জটা।
বাম হাতে মাইক্রো মেশিনগানটি বাগিয়ে ধরে ডান হাতে জ্যাকেটের ডান পকেটে রেখে দু’তিন ধাপ এগোলো।
হঠাৎ লাউঞ্জের ওপাশ থেকে কথা বলে উঠল একটা কণ্ঠ।
সংগে সংগে থমকে দাঁড়াল আহমদ মুসা।
কণ্ঠটি বলছিল, আহমদ মুসা, তুমি শুধু সাংঘাতিক ধূর্তই নও, তুমি ভাগ্যবানও। ক্যাপিটাল অব পাওয়ারে ঢোকার অসম্ভব কাজও তুমি করেছ। আমাদের কোন এক বিশ্বাসঘাতকের বিশ্বাসঘাতকতায় তুমি ভাগ্যবান হয়েছ। আমাদের প্রধান গেটের দরজা ছিল অজেয়, সেটা খোলার কোড তুমি পেয়ে গেছ। এই প্রসাদের ডায়াগ্রামও নিশ্চয় তোমাকে দেয়া হয়েছে। তুমি ভাগ্যবান যে, আমার ঘুমাবার সময়কে তুমি বেছে নিতে পেরেছ তোমার অভিযানের জন্য। তুমি ভাগ্যবান বলেই আমরা ক্যাপিটাল অব পাওয়ারকে খালি করে সবাইকে পাঠিয়েছি তাহিতিতে ডোর টু ডোর খুঁজে তোমাকে বের করে আনতে। ঠিক এই সময় তুমি ক্যাপিটাল অব পাওয়ারে অভিযানে এসেছ। কোন এক বিশ্বাসঘাতকের সাহায্যই তোমাকে ভাগ্যবান করেছে। আমাকে যখন ঘুম থেকে জাগানো হয, তখন তুমি হার্ড লেয়ার পর্যন্ত এসে গেছ। তার পর আমি তোমাকে এই স্বর্ণপ্রসাদের গেটে আসতে আর বাধা দেইনি। কারণ এই স্বর্ণপ্রসাদ এখনও উদ্বোধণ পর্যন্ত হয়নি। তোমার রক্ত দিয়েই তার উদ্বোধন হবে। স্বরণীয় হয়ে থাকবে এই উদ্বোধন। থেমে গেল কণ্ঠ।
থেমে গেল লাউড স্পীকার।
পল পল করে বয়ে গেল কয়েক মুহূর্ত।
কি ঘটতে যাচ্ছে, কি করবে আহমদ মুসা, তা ভাবছিল সে।
হঠাৎ আহমদ মুসার পায়ের তলা থেকে কার্পেট কোন এক অদৃশ্য শক্তির হ্যাঁচকা টানে প্রবল বেগে সরে গেল।
একদম চিৎ হয়ে পড়ে গেল আহমদ মুসা।
টানটা এত আকস্মিক ও প্রবল ছিল যে, আহমদ মুসা তার দেহের উপর নিয়ন্ত্রণ পুরোটাই হারিয়ে ফেলেছিল। বাম হাত থেকে মাইক্রো মেশিনগানটি ছিটকে পড়ে গিয়েছিল। কিন্তু ডান হাতটি জ্যাকেটের পকেট থেকে ছিটকে বিরিয়ে এলেও বিস্ময়করভাবে লেজারগানটি হাতের মুঠোতেই ছিল।
আহমদ মুসা পড়ে যাবার মুহূর্তেই করিডোরটির সামনে এসে দাঁড়াল ব্ল্যাক সান সিন্ডিকেটের প্রধান অ্যালেক্সি গ্যারিন। তার দুই হাতে দু’টি রিভলবার। তার দুই চোখে আগুন।
সে এসে দাঁড়িয়ে স্থির হবার আগেই তার দুই রিভলবার থেকে দু’টি গুলি বর্ষিত হলো আহমদ মুসার লক্ষ্যে, ঠিক দেখামাত্র গুলি করার মত। আহমদ মুসাকে দেখার পর আর অপেক্ষা করেনি অ্যালেক্সি গ্যারিন।
আহমদ মুসা চিৎ হয়ে পড়ে যাবার পর প্রাথমিক ধাক্কাই সে সামলাতে পারেনি, আক্রমণে যাবার কোন প্রশ্নই ওঠে না তার।
আহমদ মুসা দেখতে পেয়েছে, গুলি ছুঁড়ছে অ্যালেক্সি গ্যারিন।
করণীয় কিছু নেই, একটা বিমূঢ় অবস্থা আহমদ মুসার। মৃত্যুর অপেক্ষা ছাড়া আর কিছুই তার করার নেই।
কিন্তু গুলি তাকে স্পর্শ করল না।
এক নারী মূর্তী দু’টি গুলিই তার বুক পেতে দিয়ে গ্রহণ করেছে। সামান্য টলে উঠে ঢলে পড়ছে নারী মূর্তির দেহটি।
অ্যালেক্সি গ্যারিন মেয়েটিকে গুলি খেতে দেখে কিছুটা হকচকিয়ে গিয়েছিল মুহূর্তের জন্যে। তারপরই আবার তার দু’হাতের রিভলবার উঠে এসেছে আহমদ মুসার লক্ষে।
কিন্তু অ্যালেক্সি গ্যারিনকে আর সুযোগ দিল না আহমদ মুসা। সে আগেই উঠে দাঁড়িয়েছি। হাতের লেজারগানও তার তৈরি ছিল। বাটন টিপে ফায়ার করল অ্যালেক্সি গ্যারিনকে। ভয়ংকর আলোর এক স্রোত আলোর গতিতেই ছুটে গিয়ে আঘাত করল অ্যালেক্সি গ্যারিনকে।
গাছ যেমন ভেঙে পরে, তেমনি ভেঙে পড়ল অ্যালেক্সি গ্যারিনের দেহ।
আহমদ মুসা ইতিমধ্যেই চিনতে পেরেছে গৌরীকে। গৌরীই আহমদ মুসাকে বাঁচাবার জন্যে বুক পেতে দিয়েছে গুলির সামনে।
গৌরী পড়ে গেলে করিডোরের কার্পেটের উপর।
আহমদ মুসা দ্রুত গিয়ে গৌরীর পাশে বসে হাঁটুর উপর মাথা তুলে নিল। বলল, মিস গৌরী, আপনি আমাকে বাঁচাবার জন্যে এভাবে. . .।
যন্ত্রণায় অস্থির গৌরীর চেহারা। সে মুখ ফিরিয়ে আহমদ মুসার দিকে চেয়ে বলল, জীবনে একটিই ভালো কাজ করলাম। জনাব ঈশ্বরকে বলার মত এই একটা কাজই আমার হয়েছে।
গৌরী একটু থেমেই আবার বলল, আমার সময় বেশি নেই, শুনুন। আবার জ্যাকেটের কলারের একটা পকেটে এক খন্ড কাগজ আছে। কোড নাম্বার ছাড়া ক্যাপসুলগুলো খোলার কোন উপায় নেই। ওগুলো বুলেটপ্রুফ, ফায়ারপ্রুফ ও আনব্রোকেবল। যদি ওগুলো জোর করে ভাঙার চেষ্টা করা হয় তাহলে বিজ্ঞানীরা মারা যাবে। এই কাগজ খণ্ডে বিজ্ঞানীদের ক্যাপসুলগুলো খোলার কোড নাম্বার আছে। তৃতীয় তলায় একটা কনট্রোল সেন্টার আছে। সেই সেন্টারে একটা ডিজিটাল কী বোর্ড দেখবেন। সেই কী বোর্ডে এই কোড টাইপ করলে ক্যাপসুলগুলো খুলে যাবে।
আহমদ মুসা গৌরীর জ্যাকেটের কলারের গোপন পকেট থেকে কাগজটি বের করে নিতে নিতে বলল, এখানে চিকিৎসার ব্যবস্থা নিশ্চয় আছে, সেটা কথায়? আপনার বুকের দুই পাশে গুলি লেগেছে। আপনি সেরে উঠবেন।
সে চেষ্টা করবেন না। আমি বুঝতে পারছি আমার সময় বেশি নেই। জানেন এই মৃত্যুতে আমি খুব তৃপ্ত আমি। একজন ভালো মানুষের কোলে আমি মরতে পারছি, এটা আমার সৌভাগ্য। এতে আমি খুব খুশিও। কারণ আমাকে যে ধ্বংস করেছে, মৃত্যুর আগে তার ধ্বংস আমি দেখলাম। স্রষ্টার কাছে তার বিরুদ্ধে আমার অভিযোগ আছে, জীবনের অন্তিম লগ্নে এসে কেন আপনার সাথে দেখা হলো? কেন আরো আগে আপনার দেখা পাইনি? আমি উচ্চাভিলাষী ছিলাম। আমি বড় কিছু করতে চাইতাম। কিন্তু তা মনুষ্যত্ব ও আমার মানবিক অধিকারের বিনিময়ে নয়। কিন্তু তাই হয়েছে।
গৌরীর শেষের কথাগুলো অস্পষ্ট হয়ে উঠল। ধুঁকছিল সে। চোখটা তার বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।
আপনি প্লিজ বলুন, এখানে কোথায় চিকিৎসার ব্যবস্থা আছে?
বলে আহমদ মুসা তাকে পাঁজাকোলা করে ওঠাতে যাচ্ছিল।
চোখ খুলল গৌরী। সে মাথা নেড়ে বলল, না, কোন প্রয়োজন নেই। সত্যিই সময় আমার নেই। বলে থামল সে।
আমাকে আপনার কিছু বলার আছে? আত্মীয়-স্বজন কিংবা অন্য কোন ব্যাপারে? বলল আহমদ মুসা।
গৌরী চোখ তুলে তাকাল আহমদ মুসার দিকে। ক্ষীণ কণ্ঠে বলল, আছে। আমার জ্যাকেটের পকেটে দেখুন একটা ছোট্ট ডাইরি আছে। ওতে আমি কথাগুলো লিখে রেখেছি। এই রাতে যখন সুড়ঙ্গে প্রবেশ করতে আসেন, তখনই আমি তাড়াহুড়া করে লিখেছি।
আমি সুড়ঙ্গে প্রবেশ করতে আসছি, এটা আপনি দেখেছেন? জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।
হ্যাঁ। বলল গৌরী।
কিভাবে? আহমদ মুসা বলল।
আপনি রাডার ও ক্যামেরাসজ্জিত রেসিস্ট্যান্ট যে পোষাক পরেছিলেন, তা আমাদের ক্যামেরার জন্যে অচল। তাই আমি আপনাকে দেখতে পেয়েছি এবং চিনতেও পেরেছি।
আর কেউ দেখিনি? জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।
না। ক্যাপিটাল অব পাওয়ার-এর নিরাপত্তার দায়িত্ব আমার উপর ছিল।
তাই আটজন কমান্ড নিয়ে আমি জেগে বসে ছিলাম। বলল গৌরী। ধীরে ধীরে তার কণ্ঠ ক্ষীণ হয়ে আসছে।
প্রধান দরজা খোলার কোড ও ডায়াগ্রাম আপনিই দিয়েছিলেন? আহমদ মুসা বলল।
হ্যাঁ। কারন আমি মুক্ত চেয়েছিলাম এবং ওদের ধ্বংসও চেয়েছিলাম।
আল্লাহ আপনাকে এর যাযাহ দিন! আপনি শুধু কিছু বিজ্ঞানীর নয়, গোটা দুনিয়ার আপনি উপকার করেছেন। আল্লাহর অসীম দয়া আপনি পাবেন! আহমদ মুসা বলল।
আল্লাহ্ মানে স্রষ্টার প্রতি আপনার তো খুব বিশ্বাস, তাই না? বলল গৌরী।
কেন? আপনি স্রষ্টায় বিশ্বাস করেন না? আহমদ মুসা বলল।
আমার বিশ্বাস দিয়ে কি হবে? আমি তাঁর জন্যে মানে আমার বিশ্বাসের পক্ষে কিছূই করিনি। সুতরাং পরজগতেও আমার কোন ভবিষ্যত নেই। বলল অশ্রুরদ্ধ ক্ষীণ কণ্ঠে।
আছে। আপনি এক স্রষ্টায় বিশ্বাস করেন? আহমদ মুসা বলল।
করি। দৃঢ়ভাবে করি। কারণ পরমাণু থেকে গ্যালাক্সি পর্যন্ত গোটা সৃষ্টির মধ্যে রয়েছে একক এক বিধান। স্রষ্টা একজন না হলে এটা হতো না। বলল গৌরী নরম ও ক্ষীণ কণ্ঠে। দু’চোখ থেকে তার গড়িয়ে আসছিল অশ্রু।
আপনি কি পৃথিবীতে স্রষ্টার বাণীবাহক অর্থাৎ নবী-রসূলে বিশ্বাস করেন না?
খুব মৃদভাবে চোখ তুলে তাকাল গৌরী আহমদ মুসার দিকে। বলল, জেসাসকে আমি মানি। কিন্তু তাঁর জন্যে কোন কাজ করিনি।
নবী-রসূলদের ধারাবাহিকতায় শেষ নবী মুহাম্মাদ স. এর কথা আপনি জানেন? আহমদ মুসা বলল।
জানি। বলল গৌরী।
আল্লাহ্‌র পাঠানো নবী-রসূল স.-দের মধ্যে তিনি শেষ নবী, এটা আপনি মানেন?
চোখ বুজে ছিল গৌরী। কিছুক্ষণ পর চোখ খুলল। বলল, বিশ্বাসের জন্যে যতটা জানা দরকার ততটা জানি না। তবে আপনার উপর আস্থা আমার সীমাহীন। আপনি তাঁকে শেষ নবী বলছেন, আমি তাঁকে শেষ নবী মানলাম।
মিস গৌরীঁ! পরকালে আমার পরিণতি কি হবে আমি জানি না, কিন্তু একটা কথা বলছি, আপনি আল্লাহ্‌র একত্বে বিশ্বাস করেন এবং আল্লাহর শেষ নবী মোহাম্মাদুর রসূলল্লাহ্ স.-এর উপর আস্থা পোষণ করেন, সুতরাং সৃষ্ট মানুষের প্রতি আল্লাহর যে প্রতিশ্রুতি, সে অনুসারে আল্লাহ্ আপনাকে মাফ করতে পারেন এবং গ্রহণ করতে পারেন তাঁর জান্নাতের জন্যে। আহমদ মুসা বলল।
যন্ত্রণায় কাতর গৌরীর গোটা দেহ। তবে তার চোখ দু’টি উজ্জল।
অশ্রু ঝরছিল সে চোখ দিয়ে চোখ বুজল, যেন ক্লান্তি ও কষ্ট শামলে নেবার চেষ্টা করছে সে!
চোখ খুলল আবার সে। বলল, স্রষ্টা অনুগ্রহ করলে, তাঁর দয়া হলেই সবই সম্ভব। আপনার মত সকলের ন্যায় আমিও তাঁর দয়র মুখাপেক্ষী হলাম। গৌরীর কথাগুলো জড়িয়ে যাচ্ছে। যেন ঘুমিয়ে পড়ছে সে।
একটু থেমেছিল। আবার অস্পষ্ট ক্ষীণ কণ্ঠে বলল, বিজ্ঞানীদের নিয়ে যাবার জন্যে সুড়ঙ্গকে নিরাপদ করতে হবে। এজন্যে সেন্ট্রাল কন্ট্রোলের সিস্টেম কন্ট্রোল প্যানেলে ‘অ’ চিহ্নিত সুইচটা অফ করে দিলেই সুড়ঙ্গে যে ফাঁদগুলো আছে তা অকেজো হয়ে যাবে। কাঁপা গলায় আস্তে আস্তে বলল কথাগুলো।
গোটা দেহেই তার নিঃসাড় হয়ে পড়েছে যেন!
তার হাত পায়ের কোন চেতনা দেখা যাচ্ছে না।
চোখ বুজেছে আবার সে।
কাঁপছে গৌরীর ঠোঁট দু’টি। যেন নিজের সাথে নিজেই সে লড়াই করছে! চোখ দু’টি তার খুলে গেল আবার।
ঠোঁট দু’টি তার নড়ে উঠল। অস্ফুট ও কাঁপা গলায় বলল, আহমদ মুসা, ডা-য়েরি-তে আ-মি যা আপ-না-কে ব-লে-ছি তা আপ-নাকে জা-নাবার জন্যে? কো-ন দা-য়িত্বের ভাব আ-মি আপ-নাকে জা-নাবার জন্যে? কো-ন-দা-য়িত্বের ভার আ-মি আ-পনাকে দিচ্ছি না। সে অধি-কা-রও আ-মা-র নে-ই।
কণ্ঠ থেমে গেল গৌরীর। চোখ দু’টিও বুজে গেল তার।
নিথর হয়ে গেল তার শরীর।
যেন প্রশান্তিতে ঘুমিয়ে পড়ল গৌরী। কিন্তু ঘুম নয়, মৃত্যুর সিংহদ্বার দিয়ে এ এক মহাযাত্রার শুরু।
আহমদ মুসা ধীরে ধীরে গৌরীর মাথাটা কার্পেটে নামিয়ে রাখল।
গৌরীর প্রাণহীন দেহের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল আহমদ মুসা, আল্লাহ তোমার শাহাদাৎ মঞ্জুর করুন। আল্লাহর এক নগণ্য বান্দাকে বাঁচাতে এবং আল্লাহর হাজারো বান্দার উপকারের জন্যে তুমি জীবন দিয়েছে। আল্লাহর কাছে এই সাক্ষ্য আমি দিচ্ছি।

তাহিতির নৌবহর ঘিরে ফেলেছে তাহনিয়া ও মাতুতুংগা অ্যাটল।
আহমদ মুসা বন্দী বিজ্ঞানীদের সুড়ঙ্গ দিয়ে তাহনিয়া অ্যাটলের পাড়ে নিয়ে এসেছে। এক এক করে সব বিজ্ঞানীকে তুলে নেয়া হলো তাহিতি নৌবাহিনীর জাহাজে।
জাহাজে ওঠার আগে সৌদি আরবের মুক্তিপ্রাপ্ত স্পেস মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং বিজ্ঞানী খালেদ মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ আল মক্বী আহমদ মুসাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলল। বলল, আল্লাহ আপনাকে উত্তম যাযাহ দিন ও দীর্ঘ জীবন দান করুন। শুধু আমাকে নয়, পৃথিবীর প্রায় পৌঁনে একশ’ শীর্ষ বিজ্ঞানীকে আল্লাহর সাহায্যে নতুন জীবন দিয়েছেন। অনেক সালাম আপনাকে।
এই সময় হেলিকপ্টার ল্যান্ড করল।
হেলিকপ্টার থেকে নেমে এল স্বরাষ্ট্র ও পুলিশ প্রধান দ্যাগল ও তাহিতির গভর্নর ফ্রাঁসোয়া বুরবন।
আহমদ মুসা এগিয়ে গেল তাদে রদিকে। তারাও এগিয়ে এল। দ্যাগল আহমদ মুসাকে কংগ্রাচুলেশন জানিয়ে জড়িয়ে ধরল এবং বলল, জানেন গোটা দুনিয়ার এটাই আজ হট নিউজ! আপনার নাম ছড়িয়ে পড়েছে গোটা দুনিয়ায়।
দ্যাগল আহমদ মুসাকে পরিচয় করিয়ে দিল গভর্নরের সাথে। গভর্নর আহমদ মুসাকে বুকে টেনে নিয়ে বলল, তোমার জন্যে আমরা গর্বিত। গোটা দুনিয়ায় তাহিতি অসাধ্য সাধন করেছে। এর সব কৃতিত্ব তোমার।
গভর্নরকে ধন্যবাদ দিয়ে আহমদ মুসা একটু আলগা হতেই দ্যাগল বলল, পেছনে তাকিয়ে দেখ আহমদ মুসা।
আহমদ মুসা পেছনে তাকাল। দেখল, মাহিত ও মারেভা। ওরা হেলিকপ্টারে দ্যাগলের সাথেই এসেছে।
আহমদ মুসা ওদের দিকে এগোলো।
মাহিন এসে আহমদ মুসাকে জড়িয়ে ধরে বলল, স্যার, আমাদের দারুণ গর্ব হচ্ছে।
মারেভা এসে পাশে দাঁড়াল। বলল, স্যার, আপনি ঠিক আছেন তো?

হাসল আহমদ মুসা। বলল, দেখো কেউ আমার এই খোজ নেয়নি, আমার বোন নিয়েছে। বোনদের, মা’দের ধর্ম এটাই!
একটু থামল আহমদ মুসা। আবার বলল মারেভাদের দিকে চেয়ে, হ্যাঁ, ভাল আছি বোন!
ভাইয়া, আমি ও মাহিন চাকুরি পেয়েছি। বলল মারেভা।
কি চাকুরি? আহমদ মুসা বলল।
গোয়েন্দা বিভাগে। প্রথমে আমাদের ট্রেনিং চলবে। তার সাথে পড়ার সুযোগটাও থাকবে। বলল মারেভা।
অভিনন্দন তোমাদের! ভাল চাকুরি। দেশের জন্য, মানুষের জন্য কাজ করতে পারবে। আহমদ মুসা বলল।
কথা শেষ করেই আহমদ মুসা এগোলো গভর্নরের দিকে।
এ সময় মোবাইল বেজে উঠল আহমদ মুসার।
কল ধরতেই আহমদ মুসা ওপার থেকে কণ্ঠ পেল সৌদি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ আব্দুল ওয়াহাব আল-নজদীর।
আহমদ মুসা তাকে সালাম দিল। সালামের জবাব দিয়েই সে বলল, অভিনন্দন আহমদ মুসা, শুধু আমাদের বিজ্ঞানী নয়, প্রায় পৌনে একশ’ বিজ্ঞানীকে তুমি মুক্ত করেছ। গোটা দুনিয়া তোমাদের অভিনন্দিত করছে। আমি মহামান্য বাদশাহকে জানিয়েছি। তিনি আপনাকে সালাম দিয়েছেন।
ধন্যবাদ স্যার। আল্লাহর সাহায্যেই সব হয়েছে। বলল আহমদ মুসা।
আবারও ধন্যবাদ তোমাকে। আমরা এখানে সবাই তোমার জন্যে অপেক্ষা করছি। ম্যাডামরা সবাই ভাল আছেন। বলল সৌদি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
আহমদ মুসা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সালামের জবাব দিয়ে টেলিফোন রেখে দিল।
এগিয়ে গেল আহমদ মুসা গভর্নরের দিকে।

তাহানিয়া এ্যাটল থেকে তাহিতি নৌবাহিনীর একটা জাহাজ প্যাসেফিকের বুক চিরে ধীর গতিতে দুলে দুলে চলছে তাহিতির দিকে। জাহাজের একটা কেবিনে শুয়ে আছে আহমদ মুসা। তার হাতে গৌরীর দেয়া সেই ডায়েরিটা। ডায়েরি পড়ার জন্য সে খুলল।
তখনই তার মোবাইলে কল বেজে উঠল। ধরল টেলিফোন আহমদ মুসা।
ওপার থেকে কণ্ঠ তাহিতির গভর্নরের, গুড মর্নিং মি. আহমদ মুসা।
আহমদ মুসা গুড মর্নিং জানাল।
মি. আহমদ মুসা। একটা খবর আপনাকে না জানিয়ে পারলাম না।
প্যারিস থেকে এই মাত্র প্রধানমন্ত্রী জানালেন, মতুতুংগা অ্যাটলের প্রসাদটিকে ফরাসি সরকার পর্যটকদের জন্যে খুলে দেবার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর বার্ষিক আয়ের এক-চতুর্থাংশ শিশুদের কল্যাণে ব্যয় করা হবে। অর্ধেকটা পাবে তাহিতি ও পলিনেশীয়া দ্বীপপুঞ্জ। অবশিষ্ট এক-চতুর্থাংশ খরচ করা হবে প্রশান্ত মহাসাগরীয় সব ধর্মের শিশুদের ধর্ম শিক্ষার উন্নয়নে। আপনার কাছে এই পরামর্শ ফরাসি সরকার রেখেছেন। আর প্রসাদটির ‘ক্যাপিটাল অব পাওয়ার” নাম পরিবর্তন করে রাখা হয়েছে ‘আহমদ প্যালেস অব ওয়েলফেয়ার’। আর ব্ল্যাক সান সিন্ডিকেটের গোপন ঘাটিগুলো ধ্বংস করা হচ্ছে এবং ওদের মিনি সাবমেরিন, টিউব সাবমেরিন সমৃদ্ধ ওদের যে নৌবহর আছে পানির তলায়, তা খুঁজে বের করা ও পাকড়াও করার কাজ শুরু হয়েছে। অস্ট্রেলিয়া ও মার্কিন সরকার আমাদের সাহায্য করছে। বলল গভর্নর।
অন্য সব সিদ্ধান্তের জন্য ফরাসি সরকারকে ধন্যবাদ। কিন্তু স্যার, আমার নাম জড়ানো হলো কেমন প্যালেসের নামের সাথে? আহমদ মুসা বলল।
এ সিদ্ধান্ত ফরাসি ক্যাবিনেটের, আমি কি করে বলব মি. আহমদ মুসা। ভাবল সে, নামটা আমার নয়। ‘আহমদ’ আল্লাহর রসূলের নাম বলেই তো এটা আমার নামেরও একটা অংশ। থাক না অ্যাটল প্রসাদের মত দুনিয়ার এক বিস্ময়ের সাথে আমার রসূল মানে মানুষের রসূলের নাম জড়িয়ে! অ্যাটল দ্বীপের নিচের এই বিস্ময়কর প্রসাদটি তো দুনিয়ার মানুষ ও পর্যটকদের কাছে এক নজর দেখার এক অপার আকর্ষণের কেন্দ্র হয়ে উঠবে।
আহমদ মুসা কিছূ বলার আগে গভর্নর নিজেই আবার বলে উঠল, ঠিক আছে মি. আহমদ মুসা, আপনি তো এখন শীপে। আসুন, আমরা আপনার অপেক্ষা করছি। দেশ-বিদেশের বহু সাংবাদিক এসে পৌঁছেছে। আর মনে আছে তো, আজ রাতে আমার বাড়িতে ডিনার।
মনে আছে স্যার। আর ঠিক সময়েই আমি সংবাদিক সম্মেলনে পৌঁছব স্যার। কিন্তু স্যার, আমি শুধু উপস্থিত থাকবো, আমার পরিচয় দিতে পারবেন না। আহমদ মুসা বলল।

হ্যাঁ, একথা আমাকে মি. দ্যাগল জানিয়েছেন কিন্তু পরিচিত হতে, কয়েকটা কথা বলতে দোষ কি মি. আহমদ মুসা? বলল গভর্নর।
স্যার, আমি কোন রাজনীতিক নই, কোন প্রফেশনাল পুলিশ বা সেনাবাহিনীর কেউ নই। কোন পরিচয় ছাড়াই মানুষের জন্যে কাজ করছি, কাজ করবো। আহমদ মুসা বলল।
ধন্যবাদ আহমদ মুসা। আপনি সত্যই সকলের জন্যে দৃষ্টান্ত হওয়ার মত একজন। ঈশ্বর আপনাকে দীর্ঘজীবী করুন! রাখছি তাহলে টেলিফোন। বলল গভর্নর।
আপনার টেলিফোনের জন্যে আপনাকে ধন্যবাদ, আমি আসছি স্যার। আহমদ মুসা বলল।
আহমদ মুসা মোবাইল রেখে গৌরীর ডাইরিতে হাত দিতে যাচ্ছিল।
আবার মোবাইলে কল বেজে উঠল আহমদ মুসার।
মোবাইল তুলে নিয়ে কল অন করল আহমদ মুসা।
আচ্ছালামু আলাইকুম। ওপার থেকে জোসেফাইনের কণ্ঠ।
ওয়া আলাইকুম সালাম, জোসেফাইন কেমন আছ? তোমাকে কয়েকবার টেলিফোন করে পাইনি। বলল আহমদ মুসা।
তোমার প্রশ্নের জবাব দেবার আগে তোমাকে কংগ্রাচুলেশন দিয়ে নেই। কংগ্রাচু. . .।
জোসেফাইনের কথার মধ্যেই আহমদ মুসা বলে উঠল, না, ম্যাডাম জোসেফাইন, তোমার কংগ্রাচুলেশন নয়, কনসুলেশন চাই তোমার কাছে। তোমাকে ছেড়ে অনেক দিন আমি বাইরে, অনেক কষ্টে আছি।
আমি সব জানি। আমার ননদ সব আমাকে জানিয়েছে। তুমি যে লড়াইয়ে আছো, তাতে আমাকে স্মরণ করার, আমার জন্যে কষ্ট পাবার মত সময় কোথায় তোমার? তুমি গুলিতে আহমত হয়েছে একাধিকবার। সেটাও তো আমাকে জানাওনি! তার পরেও তোমাকে অভিনন্দন! থামল জোসেফাইন।
বেদনায় ভারি কণ্ঠ জোসেফাইনের। শেষ কয়েকটা শব্দ তার গলায় বেঁধে গিয়েছিল।
আহমদ মুসা গম্ভীর হয়ে উঠল। বলল, জোসেফাইন, তুমি না আমার জোসেফাইন! তুমিতো অনেক শক্ত। তুমি ভেঙে পড়লে আমিও তো ভেঙে পড়ব জোসেফাইন!
স্যরি! মাফ কর আমাকে। কিন্তু তুমি তোমার সব খবর আমাকে জানাবে না কেন? না জানানোর জন্যই এই কষ্ট আমার লেগেছে। বলল জোসেফাইন।
স্যরি, জানানো উচিত ছিল। কিন্তু ঘটনাগুলো একের পর এক এমনভাবে ঘটেছে, যাতে সুস্থির সময় খুব কম পাওয়া গেছে। আর ভয় হয়েছে তুমি ভয়ানক উদ্বেগের মধ্যে পড়বে। ভেবেছি, সমস্যাগুলো ক্লিয়ার হলেই তোমাকে জানাবো। মারেভা তোমাকে টেলিফোনে এসব জানিয়েছে? বলল আহমদ মুসা।
তাহিতিতে যখণ আজ ভোর, তখন সে টেলিফোন করে বিজয়ের কথা জানিয়েছে। সে এর আগেও আরও দু’দিন টেলিফোন করেছে। ও হ্যাঁ, আরও একদিন সে আমাকে টেলিফোন করেছে। ওদের বিয়ের ঠিক পর মুহূর্তেই সে ওদের বিয়ের খবর আমাকে জানিয়েছে। আমি ওকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেছিলাম, তোমার ভাইয়াকে ছাড়া বিয়ে করছ! জবাবে সে বলেছিল, ভাইয়া ডেট ঠিক করে দিয়ে বলেছিলেন, যাই ঘটুক, কেউ না আসুক ঐদিন যেন বিয়ে হয়ে যায়! ঐ দিনের পর তোমরা বিয়ে না হওয়া অবস্থায় আমার কাছে আসতে পারবে না। অতএব, উপায় কি বিয়ে করতেই হলো। খুব ভাল মেয়ে মারেভা। বলল জোসেফাইন।
হ্যাঁ, ওরা দু’জন আমাকে অনেক সাহায্য করেছে। আরেকজনের কথা বলতে হচ্ছে জোসেফাইন সে হলো গৌরী-ব্ল্যাক সান সিন্ডিকেটের সর্বময় কর্তা আলেক্সি গ্যারিনের পার্সোনাল সেক্রেটারি, তার বডিগার্ড ও গ্যারিনের নিজস্ব বাহিনীর কমান্ডার। আলেক্সি গ্যারিনের যে দু’টি গুলি আমার বুকে বিদ্ধ হবার কথা ছিল, ছুটে এসে সে এই দু’টি গুলি নিজেই বুক পেতে নেয়। এই সুযোগেই আমি লেজার গানের ফায়ার করে আলেক্সি গ্যারিনকে হত্যা করি। গৌরী মারা গেছে জোসেফাইন।আহমদ মুসার অবিচল কণ্ঠও যেন শেষ বাক্যে কেঁপে উঠেছিল!
ইন্নালিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজেউন। বলল জোসেফাইন।
ইন্নালিল্লাহ পড়লে যে জোসেফাইন? আহমদ মুসা বলল।
তোমার জন্যে যে জীবন দিতে পারে, তোমাকে যে এতটা চেনে, সে তোমার ধর্মকেও ভালো না বসে পারে না। বলল জোসেফাইন।
হ্যাঁ জোসেফাইন, মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে সে এক আল্লাহ ও শেষ নবীর উপর তার বিশ্বাসের ঘোষণা দিয়েছে। আহমদ মুসা বলল।
আল্লাহ্ গৌরীকে কবুল করুন! কিন্তু এত বড় অবস্থানে থেকে কেন সে তোমাকে সাহায্য করল? জিজ্ঞাসা জোসেফাইনের।
আহমদ মুসার সাথে অ্যাপেক্স রেস্টুরেন্টে গৌরীর প্রথম দেখা ও কথাবার্তা হয়। গৌরীরা আহমদ মুসাকে কিডন্যাপ করার পর সে ওদের গাড়ি দখল করা, ওদের বন্দী করা, মেটাল জ্যামিং মেশিন রেখে গিয়ে আহমদ মুসাকে নিরবে সাহায্য করা, মতুংগা অ্যাটলের তলদেশে ‘ক্যাপিটাল অব পাওয়ার’ প্রসাদে প্রবেশে গৌরীর সাহায্য এবং সর্বেশেষ ঘটনা ও তার কথাবার্তা সব জোসেফাইনকে জানাল।
সত্যিই দুর্ভাগ্য আমাদের গৌরীর। সে বঞ্চনা ও নারীত্বের চরম অপমানের শিকার। এ সব কিছু কিন্তু তার হৃদয়ের মহৎ বৃত্তিকে হত্যা করতে পারেনি। তাই সে তোমাকে অবলম্বন করে নতুন করে জেগে উঠতে চেয়েছে। সে সৌভাগ্যবানও বটে! সে জীবন দিয়ে যা করেছে, তা করার সৌভাঘ্য কচিৎ কারও ভাগ্যে জোটে। আল্লাহ তাকে কবুল করুন এবং উত্তম যাযাহ দান করুন! তার কবর কোথায় হয়েছে? বলল জোসেফাইন।
আমি অনুরোধ করেছি, তাহিতেই তার কবর হবে। আহমদ মুসা বলল।
তুমি তার জানাজা পড়বে। বলল জোসেফাইন।
অবশ্যই পড়বো জোসেফাইন। আহমদ মুসা বলল।
ধন্যবাদ! বলে একটু থামল জোসেফাইন। কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে বলল, তোমাকে একটা খবর দিতে চাই।
কি খবর? আহমদ মুসা বলল।
আমি ও আহমদ আব্দুল্লাহ আমেরিকা যাচ্ছি।
আমেরিকা যাচ্ছ? আহমদ মুসার কণ্ঠে বিস্ময়!
বিস্মিত হচ্ছ কেন? অনুমতি তো অনেক আগেই দিয়েছ। বলল জোসেফাইন।
হাসল আহমদ মুসা। বলল, অবশ্যই যাবে। কেন যাচ্ছ এটাই বুঝছি না, বেড়াতে গেলে তো আমাকে সাথে নিতে চাইতে! আহমদ মুসা বলল।
তোমার এত ভক্ত সেখানে যে, নিরবে বেড়ানো যেত না। যেখানে যেতাম, সেখানে জনসভা হয়ে যেত। বলল জোসেফাইন।
কবে যাচ্ছ? কোথায় উঠবে? আহমদ মুসা বলল।
আমার হোস্ট হচ্ছেন খালাম্মা, সারা জেফারসনের মা। আমেরিকা যাব শুনেই বললেন, আমার বাড়িতেই উঠতে হবে, গেষ্ট হিসেবে নয়, মেয়ে হিসেবে। আমি তাঁর অনুরোধ উপেক্ষা করতে পারিনি। বলল জোসেফাইন।
ধন্যবাদ জোসেফাইন, তোমার আমেরিকা সফর সুন্দর হবে, সফল হবে। খালাম্মা অত্যন্ত স্নেহময়ী এক মা। সারা জেফারসনের সাথে কি তার আগে কথা বলেছ? আহমদ মুসা বলল। সারা নিউমেক্সিকোতে, চাকুরিতে। মাস খানেকের ছুটিতে দু’একদিনের মধ্যেই সে বাড়িতে আসবে। তাকে আমি কিছু বলিনি। খালাম্মাকেও বলতে নিষেধ করেছি। আমি তাকে সারপ্রাইজ দিতে চাই। বলল জোসেফাইন।
কবে যাচ্ছো? জিজ্ঞাসা আহমদ মুসা।
তোমার এই মিশনের সমাপ্তির অপেক্ষায় ছিলাম। আজ টিকেট করে ফেলব।
সৌদি আরবের সরকারি কর্তৃপক্ষ কি জানে? জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।
আমি মার্কিন দূতাবাসকে জানাবার পর রাষ্ট্রদূত ও সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালের ডিজি সাহেব এসেছিলেন। তারা সব জানিয়ে গেছেন, ওয়াশিংটন বিমান রিসিভ করবেন এবং সরকারী নিরাপত্তায় আমাকে সারা জেফারসনের বাসায় পৌঁছে দেবে। নিরাপত্তা নিয়ে আমাকে কিছু ভাবতে হবে না। আমি যেখানে থাকব এবং যেখানেই যাব, আমাদের জন্যে সরকারী নিরাপত্তা থাকবে। বলল জোসেফাইন।
আলহামদুলিল্লাহ! বিদেশ-বিভূয়ে যাবে, কোথায় কি করবে, এ নিয়ে আমার দুশ্চিন্তা ছিল। সেটা কাটল। দোয়া করি তোমার সফর আনন্দদায়ক হোক! আহমদ মুসা বলল।
শুধু আনন্দদায়ক নয়, সফল হোক, এই দোয়া কর। বলল জোসেফাইন।
কিন্তু কি চাও তুমি এই সফরে? কিসের সাফল্য চাইবে? আহমদ মুসা বলল।
জোসেফাইন হাসল। বলল, ‘আনন্দদায়ক’ শব্দের পরিপূরক হলো সাফল্য। মানুষ বলে না যে, তোমার সফল সফল ও আনন্দদায়ক হোক? বলল জোসেফাইন।
ঠিক আছে আমিও তাই চাইছি। তোমার সফল সফল ও আনন্দদায়ক হোক? বলল আহমদ মুসা।
আমিন! বলল জোসেফাইন।
কিন্তু আমার কষ্টটা বাড়ল জোসেফাইন। বলল আহমদ মুসা।
কি কষ্ট? গম্ভীর কণ্ঠ জোসেফাইনের।
তোমাকে দেখা পাওয়ার সময়টা আরও দীর্ঘ হলো।
জোসেফাইন হাসল। বলল, এসব ডান-বামের কথা রেখে বল তোমার পরবর্তী ডেস্টিনেশন কি? গৌরীর ডাইরিতে কি আছে? আমি ওতে ‘বিপদ’ মানে ‘রহস্যের গন্ধ’ পাচ্ছি।
আমি ওটা পড়িনি। পড়ব আহমদ মুসা বলল।
পড়ার পর কিন্তু আমাকে জানাবে। বলল জোসেফাইন।
অবশ্যই। আহমদ মুসা বলল।
কথা শেষ করেই আবার বলল, আহমদ আব্দুল্লাহ কোথায়? এতক্ষণ যে তুমি নিরাপদে কথা বলল।
ও ঘুমিয়ে আছে। বলল জোসেফাইন।
বিদেশে যাবে, দেখ ওকে, চোখে চোখে রেখ। আহমদ মুসা বলল।
সারা ওকে পেলে আমি কতক্ষণ তাকে দেখতে পাব, সেটা বলা মুস্কিল। বলল জোসেফাইন।
তবু সব দায়িত্ব তো তোমারই। আহমদ মুসা বলল।
দোয়া করো। আর কোন কথা? বলল জোসেফাইন।
আরো একটা কথা আছে তবে. . .। আহমদ মুসা বলল।
বুঝেছি, আমি রাখলাম। আহমদ আব্দুল্লাহ উঠলে আবার টেলিফোন করব। আচ্ছালামু আলায়কুম। বলল জোসেফাইন।
অনেকক্ষণ রইলাম। ওয়া আলাইকুম সালাম। আহমদ মুসা বলল।
মোবাইলটা রেখেও আহমদ মুসা অনেকক্ষণ চুপ করে থাকল। তার চোখে শূণ্য দৃষ্টি। চোখে ভাসছে জোসেফাইনের হাসি মাখা সুন্দর মুখটা। সত্যই হৃদয়ে সে অনুভব করছে জোসেফাইনের দূরত্ব।
অনেকক্ষণ পর বালিশটা টেনে শুয়ে পড়ল আহমদ মুসা। পাশ থেকে টেনে নিল গৌরীর ডাইরিটা।

পরবর্তী বই
ক্লোন ষড়যন্ত্র