৫২. ক্লোন ষড়যন্ত্র

চ্যাপ্টার

ব্রুনার মায়ের ঘরের সামনের লাউঞ্জ।
লাউঞ্জের সোফায় বসে আছে ব্রুনার মা কারিনা কারলিন, তার প্রেমিক কনরাড এবং এই বাড়িতে অবস্থানকারী ব্ল্যাক লাইট-এর আরও দু’জন কর্মকর্তা।
তাদের সবার চোখে-মুখে উৎকন্ঠা।
সেদিন রাতে এ বাড়িতে কে প্রবেশ করেছিল, সে বাইরের বা ভেতরের কেউ কিনা, কি জন্যে প্রবেশ করেছিল, কোথায় কোথায় গেছে, এসব ব্যাপারে বিশদ তদন্ত হয়েছে গতকাল সারা দিন ধরে। ব্ল্যাক লাইটের নিজস্ব বিশেষজ্ঞের সাথে বাইরের বিশেষজ্ঞও আনা হয়েছিল। কারিনার গোটা ঘর টয়লেটসহ সন্দেহজনক বাড়ির সকল স্থানের জুতা ও হাতের আঙুলের ছাপ নেয়া হয়েছে অত্যাধুনিক কেমিকেল ও অত্যাধুনিক মাইক্রো লেন্স ক্যামেরা ব্যবহার করে। খুঁটে খুঁটে জিজ্ঞাসা করা হয়েছে সকলকে, বিশেষ করে প্রহরীদের।
এই তদন্তের আজ রেজাল্ট আসবে।
রেজাল্ট দেবেন স্বয়ং ব্ল্যাক বার্ড।
রেজাল্টটি কার মাধ্যমে আসবে কিভাবে তা তারা জানে না। তাদের নেতা ব্ল্যাক বার্ডের স্বাভাবিক আওয়াজ তাদের কেউ শোনেনি । দেখেনিও কেউ তাকে। সবার কাছে সে অদৃশ্য এক মহাশক্তি। সবার কাজ সে দেখে, সবার কথাও সে শোনে। কেউ যেহেতু তাকে দেখেনি, কেউ তার কথা শোনেনি, তাই সবাই আতংকে থাকে তাদের চারপাশের যে কেউ হতে পারে তাদের সেই নেতা। সবাই তাই সাবধানে কথা বলতে, কাজ করতে ও চলতে-ফিরতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। কেউ কখনো বেফাঁস কাজ করলে, কথা বললে তার ডাক পড়ে কোর্ট মার্শালে। তারপর সে আর ফিরে আসে না। ক্ষমা বলে কোন শব্দ নেই ব্ল্যাক বার্ডের অভিধানে। তবে কর্মীদের পারিশ্রমিক দেয়ার ব্যাপারে অত্যন্ত হাতখোলা। এখানে সাধারণ কর্মীরাও জার্মানির মন্ত্রীদের চেয়ে বেশি বেতন পায়। এ কারণেই সব কর্মী কাজে আন্তরিক। যে কোন ঝুঁকি নিয়ে তারা কাজ করে। কেউ দায়িত্ব পালনকালে নিহত হলে তার পরিবার প্রতিপালনের সব দায়িত্ব নেয়া হয়। এই কারণে ব্ল্যাক বার্ডের কঠোর সাজাকে বিনা বাক্যে মেনে নেয় সব কর্মী।
উপস্থিত যারা লাউঞ্জে, তাদের সবাই অপেক্ষা করছে রেজাল্টের।
কারিনা কারলিন তার হাতঘড়ির দিকে তাকাল। ১১টা বাজতে ৫ মিনিট বাকি। ঠিক ১১ টায় রেজাল্ট আসবে বলে জানানো হয়েছে। তাহলে আর ৫ মিনিট বাকি, কেউ তো এল না। কখন আসবে, কখন রেজাল্ট দেবে!
কারিনা কারলিন তাকাল কনরাডের দিকে।
আর মাত্র দু’মিনিট বাকি।
কনরাড তার ঘড়ির দিকে তাকিয়ে আছে। তার কথার অন্যথা তিনি করেন না।
এগারটা বাজল।
ঘড়ির ঘন্টার কাঁটা ১১টা এবং মিনিট ও সেকেন্ডের কাঁটা ১২টায় পৌঁছার সংগে সংগে কারিনা কারলিন ও কনরাডর সামনে লাউঞ্জের দেয়াল কথা বলে উঠল।
কারিনা কারলিন, কনরাড সকলের বিস্ময়বিমূঢ় চোখ আঠার মত গিয়ে দেয়ালের উপর আটকে গেল। দেয়ালের ভেতর থেকে ধাতব কন্ঠ ভেসে এল, ‘কনরাড, লাউঞ্জের দুই দরজা বন্ধ করে দাও। লাউঞ্জকে সাউন্ডপ্রুফ করা হয়েছে দরজা খোলা রাখার জন্যে নয়।
কনরাড দৌড়ে গিয়ে দুই দরজা বন্ধ করে দিয়ে এল। দেয়ালের কন্ঠ আবার কথা বলে উঠল, ‘কক্ষের সবাই শোন, সেদিন রাতে বাইরের কেউ একজন বাড়িতে ঢুকেছিল। কোন দিক দিয়ে ঢুকেছিল তার কোন হদিস করা যায়নি। প্রহরীদের ঘর, লাউঞ্জ, মধ্যবর্তী করিডোর এবং কারিনা কারলিনের ঘর ও টয়লেট ছাড়া আর কোথাও তার জুতার ছাপ ও ফিংগার প্রিন্ট পাওয়া যায়নি। কি করে সে এভাবে ভেতরে উড়ে এল সে রহস্যের উন্মোচন হয়নি। ভেতরের কেউ যে এর সাথে জড়িত নয় ফিংগার প্রিন্ট ও জুতার ছাপ থেকে তা প্রমাণিত হয়েছে। বাড়ির কিছুই খোয়া যায়নি। প্রমাণিত হয়েছে সে অন্য কোন ঘরে কোন কিছুতেই হাত দেয়নি। শুধু কারিনা কারলিনের বেডসাইড টপ টেবিলের ড্রয়ার হাতড়েছে, কারলিনের হ্যান্ড ব্যাগ খুঁজেছে, হ্যান্ড ব্যাগের ভেতরের প্রেসক্রিপশন সে হাতে নিয়েছে, টয়লেটের টেবিলের দুই ড্রয়ারই খুলেছে সে। টেবিলের ওষুধগুলোর কোন কোনটি সে হাতে নিয়েছে। ড্রয়ারের ভেতরে ফোল্ডার ওয়ালেটটা সে হাতে নিয়েছে, খুলেছে, ভেতরের আরেকটা প্রেসক্রিপশনও হাতে নিয়েছে। কিন্তু কিছুই নেয়নি সে। কারিনা কারলিনের বেডসাইড টেবিলের ড্রয়ার ও তার হ্যান্ড ব্যাগ মিলে লক্ষাধিক মার্ক ছিল। কিন্তু টাকায় সে হাত দেয়নি।
এ থেকে সুস্পষ্ট, যে এসেছিল তার একমাত্র টার্গেট ছিল কারিনা কারলিনের পরিচয় সন্ধান করা, তার সম্পর্কে জানা। যেসব জিনিস সে হাতে নিয়েছে, দেখেছে তাতে কতটা কি বুঝেছে সে, তা জানা যাচ্ছে না। কিন্তু প্রমাণ হলো যে, কারিনা কারলিনই এখন তাদের টার্গেট। তারা কারিনা কারলিনকে পুরোপুরিই সন্দেহ করেছে। তার বা তাদের পরবর্তী টার্গেট কি জানা যাচ্ছে না। তবে আমাদের করণীয় সম্পর্কে এখনি সচেতন হতে হবে। প্রথম কাজ হলো, কারিনা কারলিনের নিরাপত্তা। ধরে নিতে হবে কারিনা কারলিন যখন তাদের টার্গেট, তখন তাকে কিডন্যাপ তারা করতে পারে সব জানার জন্যে। সুতরাং এই মুহূর্তেই তাকে শিফট করতে হবে আমাদের এক নাম্বার স্থানে। তার স্টেট হস্তান্তরের দিনই শুধু তাকে নিয়ে যাওয়া হবে। দ্বিতীয় কাজ হলো, জুতার ছাপ ও ফিংগার প্রিন্ট পাঠানো হলো। লোকটিকে খুঁজে বের করতেই হবে। ব্রুমসারবার্গের প্রতিটি বাড়ি খুঁজতে হবে। তাকে খুঁজে বের করতেই হবে। কারিনা কারলিনের মেয়ে ব্রুনা ও তার বাবা আলদুনি সেনফ্রিডকেও খুঁজে বের করলেই লোকটিকে খুঁজে বের করা যাবে। লোকটি যে নকল আহমদ মুসাই হবে, সে আশংকাই বেশি। তৃতীয় কাজ হলো, কারলিনের স্টেট হস্তান্তরের কাজ দ্রুত করা। আর চতুর্থ কাজের কথা বলছি কারলিনকে, তার ঘরের ডিজিটাল লকের কোড শত্রুপক্ষ জানল কি করে! এটা একমাত্র কারিনা কারলিন ছাড়া এ বাড়ির আর কেউ জানে না। তাহলে কোডটা কেমন করে গেল তাদের হাতে, সেটা কারলিন কিছু জানে কিনা। কারও কাছে কোডটার কথা সে বলেছে কিনা। পরবর্তী বিষয় হলো, সেদিনের ঘটনার অনুসন্ধান অব্যাহত থাকবে। কি করে সে বাড়িতে ঢুকল, কোন পথ দিয়ে ঢুকল? তা খুঁজে বের করতে হবে। কথা শেষ। কথাগুলো মনে রেখ।’
দেয়ালের কন্ঠ বন্ধ হয়ে গেল।
স্তম্ভিত সবাই গোগ্রাসে গিলছিল দেয়ালের কথাগুলো।
কথা বন্ধ হয়ে গেলেও সবাই নির্বাক।
মাথা নিচু করে বসেছিল কারিনা কারলিন।
অবশেষে নিরবতা ভাঙল কারিনা কারলিনই। ধীরে ধীরে মাথা তুলে বলল সে, ‘ডিজিটাল লকের কোড ভেঙে ঘরে কি করে কোন মানুষ ঢুকতে পারে?
সেনফ্রিড ও ব্রুনারা চলে যাবার পর আমার ঘরের ডিজিটাল লকের কোড চেঞ্জ করা হয়েছে। এর কোড আমি ও বস ছাড়া আর কেউ জানে না। তাহলে কেউ ঘরে ঢুকল কি করে?’
‘ঘরে কেউ ঢোকা যখন প্রমাণিত হয়েছে, তখন কেউ কোড ভেঙেই সে ঘরে ঢুকেছে। বুঝা যাচ্ছে কারলিন যিনি ঘরে ঢুকেছেন তিনি অসাধারণ লোক। দেখ, লক্ষাধিক মার্ক হাতের কাছে পেয়েও যে ছোঁয় না সে অসাধারণ নি:সন্দেহে।’ বলল কনরাড।
‘ভয়ে আমার বুক কাঁপছে। ইচ্ছা করলেই তো সে আমাকে কিডন্যাপ করতে পারতে! ঠিক সিন্ধান্ত হয়েছে। এখানে আমি আর দু’দণ্ডও থাকতে চাই না। একটা কথা ভাবছি, আমাদের সাথে টক্কর দিতে এসেছে ওরা কারা? একা ঐ লোকটির পক্ষে তো এটা সম্ভব নয়। আর সেনফ্রিড, ব্রুনারা তো এসব ক্ষেত্রে অপদার্থ। তাহলে কাদের ওরা সাহায্য নিল?’ কারিনা কারলিন বলল।
যাদেরই সাহায্য নিক কোন লাভ হবে না। আর ক’টা দিন। স্টেটটা হস্তান্তর হয়ে গেলে তুমি আড়ালে চলে যাবে। তখন ওরা দৌড়াদৌড়ি করে কিছু করতে পারবে না। আর এর মধ্যে দেখো, ব্রুনা ও তার বাপকে আমরা ধরে ফেলব। কয়েক বার হাত ফসকে বেরিয়ে গেছে। আর পারবে না।’
কারিনা কারলিন কিছু বলার জন্যে হাঁ করেছিল। সে সময়েই তার মোবাইল বেজে উঠল। মোবাইলের স্ক্রীনের দিকে একবার তাকিয়েই ভীত-চকিতভাবে নিজের অজান্তেই যেন দাঁড়িয়ে গেল। আর সেই সাথে মোবাইলে সে বলছিল, ‘ইয়েস স্যার, আমি বিন্দী ব্রিজিট। কোন হুকুম স্যার?’
‘তুমি বিন্দী ব্রিজিট নও, তুমি কারিনা কারলিন। দ্বিতীয়বার এই ভুল করলে শুট করব।’ বলল ওপার থেকে ব্ল্যাক বার্ড।
ভয়ের প্রবল চাপেই হয়তো সে ধপ করে দেয়াল ধ্বসে পড়ার মত বসে পড়ল। বলল কম্পিত কন্ঠে, ‘ইয়েস স্যার, আপনার ইচ্ছার অধীন আমরা।’
‘শোন, আমাদের গোয়েন্দা সূত্রে আমি খবর পেয়েছি, আলদুনি সেনফ্রিড, ব্রুনা ও তাদের সাথের সেই কালপ্রিটটি গত রাত ১২টার দিকে ব্রুমসারবার্গ থেকে রাইন পার হয়ে উত্তরের হাইওয়ে ধরে যাত্রা করেছে। রাইনের সংশ্লিষ্ট টোল অফিস ও আমাদের অফিস থেকে জানা গেছে সেনফ্রিডদের গাড়ি রাইন পার হয়েছে। আমি আশংকা করছি তারা অ্যারেন্ডসীর দিকে আসছে কিনা। অ্যারেন্ডসীর নাম তোমার প্রেসক্রিপশনে দুই ডাক্তারই ভুল করে লিখে দিয়েছিল।’ বলল ও প্রান্ত থেকে ব্ল্যাক বার্ড।
‘তাহলে আপনার নির্দেশ স্যার?’ কারিনা কারলিন বলল।
‘তুমি ও কনরাড আজকেই হামবুর্গ চলে এস। তোমার আঙুলের আর কতটুকু প্রব্লেম আছে তা দেখে তাড়াতাড়ি আঙুল রেডি করে ফেলা দরকার। কোনও ভাবেই আর সময় নেয়া যাবে না। ঐ দুই বাপ-বেটিকে যদি এই মুহূর্তে ধরা নাও যায়, তবু স্টেটের হস্তান্তর করে ফেলতে হবে। কথা শেষ।’ ও প্রান্ত থেকে কল অফ হয়ে গেল।
মুহূর্ত কয়েক আশ্বস্ত কারিনা কারলিন তাকাল কনরাডের দিকে। বলল, ‘আজই আমদের হামবুর্গ যাত্রা করতে হবে।’
‘কোন খারাপ খবর আছে কি?’ কনরাড বলল।
‘খারাপ নয়, তবে আমার মনে হচ্ছে আমাদের চেয়ে দ্রুত চলছে আমাদের শত্রুরা। আর ঘটনার কেন্দ্র আমাদের কেন্দ্রের দিকেই আগাচ্ছে মনে হচ্ছে। রাইনের তীর থেকে ঘটনা যাচ্ছে অ্যারেন্ডসীর দিকে।’ বলল কারিনা কারলিন।
বলে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল, ‘চিন্তা কর না কারিনা কারলিন, রাইনের চেয়ে অ্যারেন্ডসী অনেক বেশি শীতল।’ দু’জনেই লাউঞ্জ থেকে বেরুল।

পরবর্তী বই
রাইন থেকে অ্যারেন্ডসী